ফিলিস্তিনী যুবতী আহেদ তামিমি

 


ফিলিস্তিনী যুবতী আহেদ তামিমি

     আহেদ তামিমি একজন ফিলিস্তিনি কর্মী। তিনি ইসরায়েলি সৈন্যের মুখ চড় মারার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তামিমির উকিলরা তাঁকে মালালা ইউসুফজাইয়ের সাথে তুলনা করেন এবং তাকে ফিলিস্তিনের একজন মুক্তিযোদ্ধা বলে অভিহিত করেন। পক্ষান্তরে তাঁর বিরোধিতারা যুক্তি দেন যে, তিনি তার রাজনৈতিক পিতামাতার দ্বারা চালিত এবং সহিংসতার সাথে জড়িত বলে অভিহিত করেন।

     ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে, একজন সৈন্যকে চড় মারার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করেছিল। ঘটনাটি চিত্রায়িত হয়েছিল এবং সেটি ভাইরাল হয়েছিল। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। উক্ত ঘটনার জন্য তামিমিকে আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো এবং 2018 সালের 29 জুলাই তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

     প্রাথমিক জীবন- আহেদ তামিমির জন্ম ২০০১ সালের ৩১ জানুয়ারী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পশ্চিম তীরে রামাল্লা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার ( ১২মাইল) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম নবী সালিহ-এ।তার বাবা, ফিলিস্তিনি অ্যাক্টিভিস্ট বাসেম তামিমির জন্ম, ১৯৬৭ সালে। বাসেম তামিমি একজন তৃণমূল পর্যায়ের ফিলিস্তিনি কর্মী। ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসে হ্যারিয়েট শেরউড লিখেছিলেন যে, তিনি এবং তাঁর সন্তানরা শুধু চেকপয়েন্ট, পরিচয়পত্র, আটক, বাড়ি ধ্বংস, ভয়ভীতি, অপমান এবং সহিংসতার সাথে পরিচিত।এটাই ছিলো তাদের স্বাভাবিক জীবন। তাই আহেদ তামিমিও এর সাথে সম্পর্কিত। আহেদ তামিমি ২০০১ সালে জেরুজালেমের Sbarro রেস্টুরেন্ট আত্মঘাতী বোমা হামলায় সহায়তা করার জন্য পরিচিত আহলাম তামিমির সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।

     আহেদ তামিমির বাবা বাসেম তামিমির মতে, আহেদ তামিমি স্কুলে যাওয়ার পথে চেকপয়েন্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ইসরায়েলি বাহিনীর হুমকির মুখে পড়তে হত। তাই ইসরাইলি বাহিনীর হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁকে রামাল্লায় একজন আত্মীয়ের বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো, যাতে সে তার মাধ্যমিক শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইসরায়েলি চেকপয়েন্টের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। বাসেমের অনুমান অনুসারে, তাঁদের পারিবারিক বাড়িটি, যা ২০১০সালে গ্রামের সাপ্তাহিক প্রতিবাদে অংশ গ্রহণের ঠিক আগে ধ্বংস করা হয়েছিলো এবং বাড়ীটি ২০১৭ সালের সেপ্তেম্বর পর্যন্ত ১৫০টি সামরিক অভিযানের শিকার হয়েছে।

     তামিমি ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের আটক করে রাখার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদ ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য করা সংগ্রামকে ব্যাপক স্বীকৃতির দিকে নিয়ে যাবে। তাঁর প্ৰতিবাদের ভাইরাল ছবি এবং ভিডিও ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে জনসাধারণের মাঝে প্রতিক্রিয়ার ঢেউ সৃষ্টি করেছে।

            ২০১২ সালের আগস্ট মাসে তাঁর মাতৃর গ্রেপ্তারের সময় মাত্র ১১ বছর বয়সে মাতৃর গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করার জন্য তামিমি ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিলেন। ২০১২ সালে একজন ইসরায়েলি সৈন্য তাঁর বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করার সময় তামিমি সৈন্যটির গালে চড় মারার জন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার লাভ করেছিল। তামিমির চড় মারার দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলো এবং তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান তাকে তুরস্ক ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।এর তিন বছর পর তাঁর ছোট ভাই একজন মুখোশধারী ইসরায়েলি সৈন্যকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছিলো। যারজন্য সৈন্যটি তাঁর ছোট ভাইকে ধরে নিয়ে য়াওযার জন্য উদ্যত হয়েছিলো। তখন তামিমি ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে আনার জন্য সৈন্যটিকে কামড়ে দিয়েছিলো ও আঘাত করেছিলো। সেই দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়ার পর তিনি আবার জনতার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র "নো চাইল্ড বিহাইন্ড বার/লিভিং রেজিস্ট্যান্স" শিরোনামে একটি স্পিকিং ট্যুরের জন্য তামিমিকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিলো।

            ২০১৭  সালের ১৫  ই ডিসেম্বর তামিমি তার গ্রামের কাছে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে নবী সালেহ-এ একটি বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।২০০ জন বিক্ষোভকারী ইসরায়েলি সেনাদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করার ফলে বিক্ষোভ সমাবেশ হিংসাত্মক হয়ে উঠেছিলো এবং সৈন্যরা অশান্ত পরিবেশ শান্ত করার জন্য সংগঠিত হয়েছিলো। সৈন্যরা বিক্ষোভকারীদের দমন করার জন্য তামিমির বাড়িতে প্রবেশ করেছিলো। কারণ সেনাবাহিনীর মতে, তামিমিদের বাড়ির ভেতর থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। পক্ষান্তরে তামিমির পরিবারের মতে, প্রতিবাদের সময় তামিমির ১৫বছর বয়সী চাচাতো ভাই মোহাম্মদ তামিমির মাথায় রাবার-কোটেড স্টিলের বুলেট দিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করার ফলে সে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলো। ফলে তার পরিচর্যার জন্য ব্যস্ত ছিলো। এই সৈন্য প্রবেশের প্রতিবাদে তামিমি, তাঁর মা এবং চাচাতো বোন নূর তামিমিদের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন সৈন্যের কাছে গিয়ে তাদের চড়, লাথি এবং ধাক্কা মেরেছিলো। সেই দৃশ্য কেমেরাবন্দি করা হয়েছিলো। সৈন্যরা অবশ্যে প্রতিশোধ নেয়নি।ক্ৰমশঃ

            আহেদ তামিমির চাচাতো ভাই মোহাম্মদ তামিমি মাথার আঘাতের জন্য কোমায় চলে গিয়েছিলো এবং কযেকদিন চিকিৎসার পরে তার চেতনা ফিরে এসেছিলো। ঘটনার ফুটেজ তামিমির মা নরিমান তামিমির ফেসবুক পেজে আপলোড করার পর ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলো। তিন দিন পরে, 19 ডিসেম্বর রাতে তামিমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজন নাবালকের জন্য সামরিক আদালতের ব্যবহার সম্পর্কে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তের দিন পরে তামিমির বিরুদ্ধে হামলা, উসকানি এবং পাথর নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয় এবং ঘটনার সাথে জড়িত থাকার জন্য তাঁকে, তাঁর মাকে এবং চাচাতে বোন নূরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে তার মার বিরুদ্ধে উসকানি ও লাঞ্ছনার অভিযোগ আনা হয়। তামিমির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক হামলার আহ্বান জানানোর অভিযোগ আনা হয়। এই মামলাটি বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি সৈন্যদের সংযম নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তখন উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে তামিমির সমর্থনে মিছিল বের করা হয়েছিলো।

            সৈন্যদের বাধা প্রদান ও আক্রমণ, আক্রমণের জন্য উস্কানি প্রদান এবং 2017 সালের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে কোর্ট তামিমিকে দোষী সাব্যস্ত করে 2018 সালের 24 মার্চ আট মাসের জেল এবং 5,000-শেকেল ($1,437) জরিমানা আদায়ের হুকুম প্রদান করেন। কারাগারে থাকাকালীন, তামিমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেন। 29 জুলাই তিনি জেল থোকে ছাড়া পান। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি আইন অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেপারেশন দেয়ালে(ইসরায়েলি পশ্চিম তীরের বাধা প্রাচীর) তামিমির মুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মূরাল(দেয়ালে অঙ্কন করা ছবি) অঙ্কনের জন্য দুই ইটালীয় শিল্পী যারিত আগোচ ও তাঁর সহকারী শিল্পীকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো এবং ইসরায়েল ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিলো।

            তামিমিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের নতুন প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অনেক ফিলিস্তিনি-ই ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেছে, তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতপ্রাপ্ত কয়েকজন প্রতিবাদকারীর মধ্যে তামিমি একজন। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলিদের বসতি স্থাপনের জন্য ক্ষোভগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের উজ্জীবিত এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের প্রতি নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তামিমিকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। একজন নাবালক হিসাবে ইসরায়েল সৈন্য দ্বারা তাঁকে আটক করা ও তাঁর বিচার প্রক্রিয়াটি ভুল ছিলো বলেও আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছিলো।

            তামিমির বিরোধিরা মনে করে যে, তাঁর ক্রিয়াকলাপ ইস্রায়েলকে অসম্মান করার লক্ষ্যে সংঘটিত করা হয়েছিল। তিনি এবং তাঁর পরিবারকে ইস্রায়েলে "সহানুভূতিশীল সন্ত্রাসী" হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে।ইসরায়েলি পার্লামেন্টারিয়ান মাইকেল ওরেনসহ অনেকে, সৈন্যদের উস্কে দেওয়ার জন্য তামিমি আমেরিকান পোশাক পড়েছিলেন বলে তাঁকে অভিযুক্ত করেছিলেন।

থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে 2018 সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিখ্যাত ইসরায়েলি কবি ইহোনাটান গেফেন মোশে দায়ানের ভাগ্নে তাঁর ইনস্টাগ্রামের পৃষ্ঠায় নিন্ম প্রদত্ত কবিতার লাইন পোস্ট করেছিলেন-

তুমি, আহেদ তামিমি,

লাল কেশিক,

ডেভিডের মতো, যে গলিয়াথকে চড় মেরেছিল,

(তোমাকে)গণনা করা হবে

জোয়ান অফ আর্ক, হান্না সেনেশ এবং অ্যান ফ্রাঙ্কের সাথে।

এর প্রতিক্রিয়ায়, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আভিগডর লিবারম্যান ইসরায়েলের জনপ্রিয় আর্মি রেডিওতে গেফেনের কাজ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী মিরি রেগেভ বলেছেছিলেন যে, গেফেন "ইতিহাস পুনর্লিখনের জন্য লাল রেখা অতিক্রম করছেন।" একটি পারফরম্যান্সের সময় গেফেন তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, কিন্তু তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে কবিতাটি মুছে ফেলেন নি।

            তথ্যচিত্র- রাইজ আপ ইন্টারন্যাশনালের জেসি রবার্টস এবং এএমজেড প্রোডাকশনের জেসি লক রেডিয়েন্স অফ রেজিস্ট্যান্সশিরোনামে একটি তথ্যচিত্র চিত্রায়িত করেছেন, যেটিতে তৎকালীন 14 বছর বয়সী তামিমি এবং 9 বছর বয়সী জান্না জিহাদ (একজন ফিলিস্তিনি যুব কর্মী এবং অপেশাদার সাংবাদিক যিনি ফেসবুক এবং টুইটারে ব্লগ করেন।) কে দেখানো হয়েছে। 2017 সালে তথ্যচিত্রটি উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে রেসপেক্ট হিউম্যান রাইটস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ বেশ কয়েকটি উৎসবে বিশ্বব্যাপী প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছে। "তির্যক আখ্যান"-এর জন্য দেশে "বৈষম্য" সৃষ্টি করার আশঙ্কা করে সিঙ্গাপুর সরকারের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (IMDA) রেডিয়েন্স অফ রেজিস্ট্যান্-এর পাবলিক স্ক্রীনিং নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে সেন্সরশিপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

বিএ পড়ার সময় 2022 সালে তামিমি দেনা টাকরুরি(দেনা তাকরুরি হলেন একজন আমেরিকান সাংবাদিক, অন-এয়ার উপস্থাপক, এবং, আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানাধীন অনলাইন সংবাদ পরিষেবার ডিজিটাল প্রযোজক)র সাথে মিলে তারা আমাকে সিংহী বলে ডাকেশিরোনামে স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন।*

                             সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

ভাৰত তথা অসমৰ সাধাৰণ নিৰ্বাচনৰ সাৰাংশ-১৯৫২-২০২৪

শাস্তি (অনুবাদ উপন্যাস)