মোল্লা নাসিরুদ্দিন-এর রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক কাহিনী
মোল্লা নাসিরুদ্দিন-রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক
কাহিনী
মোল্লা নাসিরুদ্দিন (১২০৮-১২৮৫)মুসলিম বিশ্বের এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র ছিলেন। তিনি মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বলকান থেকে চীন পর্যন্ত অনেক হাস্যকর এবং ব্যঙ্গাত্মক উপখ্যানের নায়ক ছিলেন। তাঁর বাস্তব জীবন সম্পর্কে নানান মত রয়েছে। তাই তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন তথ্য ভিত্তিক পাওয়া যায় না। তাঁর যেগুলি হাস্য রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মককাহিনীরয়েছে, সেই কাহিনীগুলির কয়েকটা এখানে লেখার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি পাঠকের কাহিনীগুলি ভালো লাগবে।*
মুখ্য অতিথি
এক সময়ের কথা। মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গ্রামে একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। গ্রামের লোকেরা মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে ভাষণ প্রদানের জন্য মুখ্য অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করার কথা ভাবলেন। অনুষ্ঠান আয়োজিত করা কিছু লোক মোল্লা সাহেবের বাড়ী এসে বললেন- মোল্লা সাহেব, আমাদের অনুষ্ঠানে আপনাকে আমরা মুখ্য অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনি আমাদের আমন্ত্রণ স্বীকার করে সভায় উপস্থিত হয়ে লোকদের ভাষণ প্রদান করে ধন্য করবেন বলে আশা করছি। আপনি আমাদের আমন্ত্রণ স্বীকার করুন।
মোল্লা সাহেব ভাষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ স্বীকার করলেন এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে গিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। তিনি অনুষ্ঠনে উপস্থিত হয়ে জনতাদের উদ্দেশ্যে করে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনারা জানেন নাকি আমি ভাষণে কি বলবো?
না, জানিনা। উপস্থিত জনতা সমস্বরে বললেন।
মোল্লা বললেন- যদি আপনারা জানেনই না আমি কি বলব, তাহলে এখানে আমার ভাষণ প্রদানের কোন প্রয়োজনই নেই। আমি চললাম ৷ এভাবে বলেই নাসিরুদ্দিন অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন।
উপস্থিত জনতা ভাবতে লাগলেন, আমরা কি এমন বললাম যে, মোল্লা সাহেব নারাজ হয়ে ভাষণ প্রদান না করেই অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন! সেজন্য আয়োজক কমিটি ক্ষমা চেয়ে পরের দিন আবার মোল্লা সাহেবকে অনুষ্ঠানে ডেকে আনলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মোল্লা সাহেব সেদিনও জিজ্ঞাসা করলেন- আপনারা জানেন না কি আমি কি বলব? সেদিন জনতা আগের দিনের ভুল সংশশোধন করে বললেন- হ্যাঁ, জানি।
যদি আপনারা জানেনই আমি কি বলব, তাহলে ভাষণ প্রদান করে কি করব। এভাবে বলেই সেদিনও মোল্লা সাহেব অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন।
জনতা হতভম্ব! তাঁদের মোল্লা সাহেবের ব্যবহার কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হলো এবং জনতা খুবই রাগান্বিত হলো। তবে তাঁরা আবার মোল্লা সাহেবকে অনুষ্ঠানে ডেকে আনার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা এইবার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মোল্লা সাহেব ভাষণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তখন অৰ্দ্ধেক লোক ‘হ্যা” এবং অর্দ্ধেক লোক ‘না’ বলবেন।
সেদিন এসেও মোল্লা সাহেব আগের মতই জিজ্ঞাসা করলেন- আপনারা কি জানেন, আমি কি বলব ?
তখন পূর্বের সিদ্ধান্ত মতেই অৰ্দ্ধেক লোক ‘হ্যাঁ” এবং অর্দ্ধেক লোক ‘না’ বললেন।
যদি আপনাদের অর্দ্ধেক লোক জানেনই আমি কি বলব, তাহলে আপনারা বাকী অর্দ্ধেক লোকদের বলে দিন আমি কি বলব। এভাবে বলেই মোল্লা সাহেব অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন।
কাটলেও রক্ত বের হয় না, এমন লোককে অনুষ্ঠানে ডাকার কোনো মানেই হয় না। এভাবে ভেবে এর পর থেকে আর কোনোদিন মেল্লাহ সাহেবকে কোনো অনুষ্ঠানে ডাকা হয়নি।
গাছে চড়া লোক
একদিন একজন মুসাফির মোল্লা নাসিরুদ্দিনদের গ্রামে বেড়াতে এসে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করার পর তাঁর প্রচণ্ড ক্ষিদে পেলো । সে পাশেই একটি ফলের বাগান দেখতে পেয়ে ধীরে ধীরে বাগানের ভেতর প্রবেশ করলো।
বাগানটাতে নানা রকম ফলের গাছ ছিলো। ফল দেখে তার ক্ষিদে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলো এবং সে দ্রুত একটি গাছের উপড়ে চড়ে গেলো। গাছে চড়ে সে পেট পূরে ফল খেলো, তবে গাছ থেকে নামার সময় সে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলো। কারণ পেটের ক্ষিদেয় সে গাছে চড়ছিলো ঠিকই, তবে সে গাছ থেকে নামার উপায় জানত না। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে সে সহায়ের আশায় গাছের উপর বসে রইল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাগানের মালিক সেখানে এসে পৌছোঁল। বাগানে অনধিকার প্রবেশ করার জন্য বাগানের মালিক খুবই রেগে গেলো এবং সে মুসাফিরের উপর চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো। তখন মুসাফির বললো যে, সে গাছ চড়েছে ঠিকই কিন্তু এখন সে থেকে নামতে পারছে না। তাই তাকে গাছ থেকে নামতে সহায় করার জন্য বাগানের মালিককে অনুরোধ করতে লাগলো।
বাগানের মালিক প্রথমে রেগে গেলেও মুসাফিরের অবস্থা দেখে তার দয়া হলো এবং সে আশপাশের লোকজন ডেকে এনে মুসাফিরকে গাছ থেকে নামার জন্য সহায় করতে বললো। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন রকম উপায় চিন্তা করতে লাগলো। এমন সময় মোল্লা নাসিরুদ্দিন হাঁটতে হাঁটতে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- এখানে কি হয়েছে? এতো লোক জড়ো হয়েছে কেন?
বাগানের মালিক সমস্যার কথা জানালো।
মোল্লা সাহেব বললেন- অ' এই কথা! এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এতো মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? একটি রশি যোগাড় করুন। আমি এক্ষুণি লোকটিকে গাছ থেকে নামিয়ে আনব বাগানের মালিক তড়িঘড়ি একটি রশি যোগাড় করে আনলেন। মোল্লাহ সাহেব রশির একটি প্রান্ত গাছে চড়া মুসাফিরটির দিকে ঢিল ছুড়ে দিয়ে বললেন- রশিটি ধরে তোমার কোমরের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে বেঁধে ফেলো।
দুই তিনবার প্রয়াসের পর লোকটি রশির প্রান্ত ধরে ফেলল এবং মোল্লা সাহেবের নির্দেশ মতো রশিটি কোমরে জড়িয়ে বাঁধলো ৷ রশি বাঁধা হলে মোল্লা সাহেব একটানে লোকটিকে গাছের তলে ফেলে দিলেন। ফলে লোকটি যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলো । যেন কিছুই হয়নি এরূপ শান্ত গলায় মোল্লা সাহেব বললেন- আমি কুয়ায় পড়ার পর এভাবেই আমার কোমরে রশি বেঁধে কুয়া থেকে টেনে তুলে আমার জীবন রক্ষা করেছিলো।
এভাবে বলে মোল্লা নাসিরুদ্দিন সেখান থেকে ধীরস্থিরভাবে চলে গেলেন৷
আলস্যের দাওয়াত
নাসিরুদ্দিন মোল্লাদের গ্রামে একজন আলস্য লোক ছিলো। সে কোন কাজ করত না। সব সময় সে অন্যের দ্বারা কীভাবে তার কাজ করিয়ে নেওয়া যায় এই ফিকিরে থাকত এবং কাজ করানোর জন্য লোকের পেছনে লেগে থাকত ৷
গ্রামের লোক তার স্বভাবের বিষয়ে অবগত ছিলো এবং তাই তাকে দেখলেই সবাই কেটে পড়ত। তবু আলস্য লোকটি তার স্বভাব থেকে বিরত হচ্ছিল না।
লোকের মুখে শুনে মোল্লা সাহেবও আলস্য লোকটির স্বভাবের বিষয়ে অবগত হয়েছিলেন। গ্রামের লোক আলস্য লোকটিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য মোল্লাহ সাহেবকে অনুরোধও করতেন। ফলে মোল্লা সাহেব লোকটিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছিলেন। একদিন সংযোগবশত আলস্য লোকটির সাথে মোল্লা সাহেবের দেখা হয়ে গেলো। মোল্লা সাহেব খোশ মেজাজে লোকটির ভালমন্দ খোঁজ-খবর নেওয়ার পর বললেন- ভাই সাহেব, সুযোগ বুঝে কোন একদিন আমাদের বাড়ীতে খেতে যাবেন।
তখন আলস্য লোকটি বলল- তাহলে এটাকে কি আমি নিমন্ত্রণ বলে ধরে নেব?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যেই নিমন্ত্রণ। মোল্লা সাহেব বললেন- যদি আপনার অসুবিধা নেই তো কালই যাবেন আমাদের বাড়ী দাওয়াত খেতে। আপনার জন্য কালকের দাওয়াত রইলো।
আলস্য লোকটি দাওয়াত পেয়ে খুবই খুশি হলো। এই প্রথম তাকে কেও দাওয়াত দিয়েছে, না হলে তো সবাই তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাায় !
মোল্লা সাহেবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে আলস্য লোকটি বাড়ী চলে এলো এবং দাওয়াতের বিষয়ে ভাবতে লাগলো। পরের দিন সকালেও তার চোখের সামনে নানা বিধ উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী ভেসে বেড়াতে লাগলো। সে সারাদিন কোন ভোজন করল না, যাতে মোল্লা সাহেবের বাড়ী গিয়ে পেট পূরে খেতে পারে !
সন্ধ্যেবেলা আলস্য লোকটি মোল্লা সাহেবের বাড়ী এসে বাইর বাড়ী থেকে ডেকে বললো- মোল্লা সাহেব আমি এসে গেছি। খাওয়ার আগে হাতমুখ ধুইয়ে নিই। জল নিয়ে আসুন।
মোল্লা সাহেব জল নিয়ে এসে আলস্য লোকটির হাতে জল ঢালার সময় বললেন- ভাই সাহেব, মাফ করবেন, আজ আপনাকে আমি দাওয়াত খাওয়াতে পারব না।
আলস্য লোকটি অবাক কণ্ঠে বললো- কেন ভাই, কি হয়েছে?
সব জিনিস প্রস্তুত, তবে একটি জিনিস নাজাই আছে। মোল্লা সাহেব বললেন।
আলস্য লোকটি বললো- কি জিনিস নাজাই আছে, ভাই?
মোল্লাহ সাহেব হাসিমুখে বললেন- কাম করার জন্য হাত।
আলস্য লোকটি সারাদিনের উপোসী ছিলো। তার পেটে ইঁদুর দৌড়োচ্ছিল। তার সারাদিনের সব চিন্তাভাবনা মাটি হয়ে গেলো। সে বুঝে গেলো যে, তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই মোল্লা সাহেব এ কাজ করেছেন। সে রোষায়িত চোখে মোল্লা সাহেবের দিকে তাকিয়ে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো।এর পর থেকে মোল্লা সাহেবকে দেখলেই সেই আলস্য লোকটি পাশ কাটিয়ে চলে যেতো।
মোল্লাহ সাহেবের আচরিত চিকিৎসা
মোল্লা নাসিরুদ্দিন এক সময়ে কবিরাজী করতেন। অনেক লোক তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসতেন। একবার এক মোটা শেঠ তাঁর নিকট এসে বললেন- মোল্লা সাহেব, আমি মোটা হওয়ার জন্য খুবই অসুবিধার মধ্যে আছি। আমার সর্বশরীরে চর্বি জমা হয়েছে। আমি এখন ওজন কমাতে চাই। আপনি কী এমন কিছু করতে পারবেন যাতে আমার চর্বি কমে যাবে এবং আমি সরু চিকন হয়ে উঠব? মোল্লা সাহেব শেঠ সাহেবের শরীর পর্যবক্ষেণ করে বললেন- হ্যাঁ, জরুর করতে পারব।
শেঠ সাহেব খুশি হয়ে বললেন- যদি আপনি তা করতে পারেন তো আপনাকে আমি আপনার চাহিদা অনুযায়ী বক্শিশ প্রদান করব। তবে আমার একটি শর্ত আছে। বলুন, আপনি শর্ত মানতে রাজি?
মোল্লা সাহেব বললেন- কি শর্ত সেটা তো আগে আপনি বলুন ?
শর্ত এই যে, আমি শরীর পাতলা সরু করার জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করব না। আপনি ওষুধের পরিবর্তে অন্য যে কোনো উপায় প্রয়োগ করতে পারবেন। তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না ।
মোল্লা সাহেব শেঠ সাহেবের শর্তের কথা শুনে কাগজের মধ্যে কিছু একটা উপায় লিখে কাগজটা মুড়িয়ে শেঠ সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন- কাগজটা এখানে খুলবেন না। একেবারে বাড়ী গিয়ে খুলবেন।
বাড়ীতে এসে যখন শেঠ সাহেব কাগজ খুললেন, তখন দেখতে পেলেন, কাগজে লেখা রয়েছে, আপনি চৌদ্দ দিনের মধ্যে মারা যাবেন।
লেখা দেখে শেঠ সাহেবের চেতনা শক্তি লোপ পেলো। তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিলো। মৃত্যু ভয়ে তাঁর খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেলো। তিনি বিছানায় শোয়ে শোয়ে শুধু মৃত্যুর কথা ভাবতে লাগলেন ।
খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে চৌদ্দ দিন বিছানায় শোয়ে থাকার ফলে তাঁর শরীরের সমস্ত চর্বি গায়েব হয়ে গেলো। শরীরে শুধু কংকাল কয়টি অবশিষ্ট রইলো। চৌদ্দ দিন পর শরীরের দিকে লক্ষ্য করে তিনি মোল্লা সাহেবের প্রতি রাগান্বিত হয়ে উঠলেন।
শেঠ কোন মতে মোল্লাহ সাহেবের বাড়ী এসে চিৎকার করে বললেন- মোল্লা, তুমি বাইরে বেরিয়ে এসো।
মোল্লাহ সাহেব বাইরে বেরিয়ে এসে শেঠ সাহেবের অবস্থা দেখে হেসে হেসে বললেন- আরে বাহঃ, শেঠজী, আমার উপায় তো খুবই কাজ করেছে। আপনার শরীর থেকে সমস্ত চর্বি গায়েব হয়ে গেছে। এখন কেউ বলতে পারবে না, আপনি মোটা। দিন আমার বকশিশ দিন।
ঘটনাটা উপলব্ধি করতে পেরে শেঠ সাহেব অবাক দৃষ্টিতে মোল্লাহ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শেঠের আদেশ
নাসিরুদ্দিনদের অবস্থা ছেলেবেলা খুব একটা ভালো ছিল না। যারজন্য তিনি ছেলেবেলাতেই এখানে সেখানে কাজ করতে হতো। এক সময় তিনি একজন শেঠের গৃহে সাফাইর কাজ করতেন। পরিবর্তে শেঠ তাঁকে ভোজন, কাপড়চোপড় ঠিকই দিতেন, তবে বেতন দিতেন একেবারে বছর শেষে। তার মধ্যেও শেঠ এটা ওটা ভুল ধরে বেতন কর্তন করার তালে থাকতেন।
বছরের শেষের একদিন সকাল বেলা শেঠ তাঁকে ডেকে পাঠালেন। শেঠ মনে মনে ভাবছিলেন, তিনি যেনতেন প্রকারে মোল্লাকে বুৰ্বক বানাবে এবং তিনি মোল্লাকে বেতন দিবেন না।
শেঠ মোল্লাকে বললেন- মোল্লা সম্পূর্ণ গৃহ পরিষ্কার করতে হবে, কাজ শুরু করে দাও। কিন্তু মনে রেখ, সাফাই করার সময় এক ফোটা জলও ব্যবহার করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, সাফাই করার পর মেঝে সিক্ত সিক্ত দেখা যেতে হবে। এ রকমভাবে পরিষ্কার করতে না পারলে তোমার বেতন কর্তন করা হবে এবং তোমাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
এর পর শেঠ নতুন বছরের জন্য জিনিসপত্র কেনার জন্য বাজারে চলে গেলেন।
মোল্লাহ সাহেব শান্তিপূর্ণভাবে গৃহ সাফাইয়ের কাজ করতে লাগলেন। সমস্ত গৃহ সাফাই করার পর উঠোন সাফাইয়ের পালা পড়লো। উঠোনে ঝাড়ু মেরে তিনি গোদামে গেলেন এবং সেখান থেকে তেলের পিপা তোলে এনে সমস্ত তেল মেঝেতে ঢেলে দিলেন। এর পর তিনি এক কোনায় বসে শেঠ আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর শেঠ বাজার থেকে গৃহে এলেন এবং মেঝেতে তেল দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন- আরে মোল্লা, এ তুমি কি করেছ ? আমার সমস্ত তেল মেঝেতে ঢেলে দিয়েছ, এখন দাও এর ক্ষতিপূরণ।
রাগ করছেন কেন, শেঠ? মোল্লা সাহেব বললেন- আমি তো শুধু আপনার আদেশ প্রতিপালন করেছি। দেখেন, আমি মেঝে সাফ করার জন্য এক ফোটা জলও ব্যবহার করিনি। তবু মেঝেটা সিক্ত সিক্ত লাগতেছে।
মোল্লার কথা শুনে শেঠ অবাক হয়ে গেলেন। মোল্লা সাহেব বলে চললেন- শেঠজী, আপনার নির্দেশ মতোই আমি কাজ করেছি।এখন তো আপনি পূরা বেতনই আমাকে দিতে হবে। আপনার গৃহে আগামী বছর কাজের কথা বলছেন, আপনি যতই তোষামোদ করুন না কেন, আমি আর আপনার গৃহে কাজ করব না ।
শেঠের কাছে পূরা বেতন প্রদানের বাইরে উপায় ছিল না। শেঠ পূরা বেতনই মোল্লা সাহেবকে দিতে বাধ্য হলেন। এর পর মোল্লা সাহেব আর কোনদিন শেঠের গৃহে কাজ করতে আসেন নি।
ভিক্ষুককে রক্ষা
মোল্লাহ নাসিরুদ্দিনদের গ্রামের মসজিদটা একটি পুকুরের পারে ছিলো। মুসুল্লিরাঁ পুকুরে অজু করে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে প্রবেশ করতেন।
একদিন একজন ভিক্ষুক মসজিদের পুকুরে অজু করতে গিয়ে হঠাৎপা ফসকে পুকুরের জলে পড়ে গেলো। সে সাঁতরাতে জানত না। তাই সে পুকুরের জলে তলিয়ে যেতে লাগলো।
বাঁচার জন্য সে হাত পা মারতে লাগলো এবং সাথে সাথে সহায়ের জন্য চিৎকার করতে লাগলো- বাঁচাও, বাঁচাও। কে কোথায় আছ, আমাকে বাঁচাও।
তার চিৎকার শুনে মসজিদ থেকে লোক দৌড়ে বেরিয়ে এলো এবং তাঁরা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগলো- আমরা তোমার সহায়ের জন্য এসেছি। হাত বাড়িয়ে দাও, তোমাকে আমরা টেনে পারে তুলব ।
একদিকে মসজিদের লোকগুলি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য চিল্লাতে লাগলো এবং অন্য দিকে ভিক্ষুকটি হাত না বাড়িয়ে ‘বাঁচাও, বাঁচাও' বলে চিৎকার করতে লাগলো।
মোল্লা নাসিরুদ্দিনও মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। লোকের চিল্লাচিল্লি শুনে তিনিও মসজিদের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং পুকুরের পারে লোকের ভিড় দেখে তিনি সেখানে চলে এলেন। ভিক্ষুকটিকে জলে ডুবতে দেখে তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন- ধর, আমার হাত ধর। আমি তোমাকে টেনে পারে তুলব।
ভিক্ষুকটি তৎক্ষণাৎ মোল্লা সাহেবের হাত ধরে ফেললেন এবং মোল্লাহ সাহেব লোকটিকে টেনে পারে তুললেন।
তখন সমবেত লোকগুলি আচরিত হয়ে বললেন- ব্যাপার কি? আমারাও তো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের হাত ধরলো না, অথচ আপনি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে লোকটি আপনার হাতে ধরে পারে চলে এলো। এর কারণ কি?
তখন মোল্লাহ সাহেব বললেন- আপনারা সবাই ভিক্ষুকটিকে তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলছিলেন। কিন্তু আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাত ধরার কথা বলছিলাম। রহস্যটা এখানেই। একটা কথা মনে রাখবেন, ভিক্ষুকরা সব সময় নিতে জানে, তারা দিতে জানে না।*
লোকের রায়
একবার মোল্লা নাসিরুদ্দিন তাঁর ছেলেকে নিয়ে অন্য একটি গ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁদের সাথে ছিলো একটি গাধা । কাজ সেরে ফিরে আসার সময় গাধাটি তাঁদের সাথেই ছিলো। মোল্লা এবং তাঁর ছেলে গাধার পেছনে পেছনে হেঁটে আসছিলেন। কিছুদূর আসার পর তাঁর ছেলেটি ক্লান্ত হয়ে হাঁফাতে লাগলেন।
ছেলেকে হাঁফাতে দেখে মোল্লাহ সাহেব বললেন- তুমি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছো। তুমি গাধার পিঠে চড়ে বস। আমি তোমাদের পেছন পেছন হেঁটে যাব ।
ছেলে গাধার পিঠে চড়ে বসলো এবং মোল্লাহ সাহেব তাঁদের পেছনে পেছনে হেঁটে আসতে লাগলেন।
কিছুদূর আসার পর তাঁরা দেখলো, কয়েকজন লোক একটি গাছের নিচে বসে রয়েছে। লোকগুলি লক্ষ্য করলো, মোল্লা সাহেব হেঁটে আসতেছে এবং তাঁর ছেলে মজা করে গাধার পিঠে চড়ে রয়েছে।
তখন লোকগুলির মধ্য থেকে একজন মন্তব্য করলো- কেমন ছেলে? তার পিতার জন্য কোন চিন্তা নেই ছেলেটার ৷ পিতা হেঁটে আসছেন এবং ছেলে মজা করে গাধার পিঠে বসে আসছে। বয়োজ্যেষ্ঠের সন্মানের যুগ চলে গেছে।
মোল্লার ছেলের লোকটার মন্তব্য খুবই খারাপ লাগলো। সে বললো- আব্বা, আপনি গাধার পিঠে চড়ে বসুন। আমি হেঁটে যাই। মোল্লা গাধার পিঠে চড়ে বসলেন এবং ছেলে তাঁদের পেছন পেছন হেঁটে আসতে লাগলো।
কিছুদূর আসার পর রাস্তায় কয়েকজন লোকের সাথে দেখা হলো। তারা মন্তব্য করলো- কেমন নির্দয় বাপ! বাপের ছেলের প্রতি কোন গুরুত্ব নেই। নিজে মজা করে গাধার পিঠে বসে আসছেন এবং ছেলে পেছন পেছন হেঁটে যাইতেছে।
লোকগুলোর মন্তব্য মোল্লা সাহেবের খুব খারাপ লাগলো। তিনি বললেন- বেটা, তুমিও গাধার পিঠে চড়ে বস।
উভয়ে গাধার পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলো। কিছুদূর আসার পর রাস্তায় কয়েকজন লোকের সাথে সাক্ষাত হলো। মোল্লা সাহেব এবং তাঁর ছেলেকে গাধার পিঠে চড়ে আসতে দেখে একজন বললো- কেমন নির্দয় লোক! বেচারা গাধার পিঠে দুজন লোক মজা করে বসে আসছে। গাধার কি অবস্থা হয়েছে, সেদিকে এদের কোন খেয়াল নেই।
এ কথা শুনে পিতাপুত্র উভয়ে গাধার পিঠ থেকে নেমে গাধার পেছনে পেছনে হেঁটে যেতে লাগলো ।
গ্রামে পৌঁছানোর পর একজন পরিচিত লোকের সাথে তাঁদের রাস্তায় দেখা হলো। লোকটি বললো- মোল্লা সাহেব, মূর্খামীরওএকটা সীমা থাকে। সুস্থ সবল একটা গাধা থাকতে দুজনই হেঁটে চলেছেন। আপনারা গাধার পিঠে চড়ে আসতে পারতেন। নিজের মাথাটা একটু কাজে লাগাতে হয় ।
লোকটির কথা শুনে মোল্লা সাহেব ভাবতে লাগলেন, তুমি যাই কর না কেন লোক কিছু না কিছু সমালোচনা করবেই। সেজন্য লোকের কথায় কান না দেওয়াই ভালো।*
গাধার আত্মীয়
মোল্লাহ সাহেবের একজন প্রতিবেশী সব সময় মোল্লাহ সাহেবকে নিচা দেখানো এবং ঠাট্টা করার জন্য সুযোগ খুঁজতো। এ রকম করে সে খুবই মজা পেতো।
একবার মোল্লাহ তাঁর গাধা নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাস্তায় সেই প্রতিবেশী লোকটির সাথে তাঁর দেখা হয়ে গেলো। মোল্লা এবং গাধাটিকে এক সাথে দেখে তার ঠাট্টা করার সুযোগ মিলল।
সে মোল্লাকে থামিয়ে বললো- আরে মোল্লা, তোমার খবরবার্তা কি? তোমার দোস্ত গাধা কেমন আছে?
মোল্লা সাহেব উত্তরে বললো- সবার অবস্থা ভালো আছে।
প্রতিবেশী লোকটি এখানেও ক্ষ্যান্ত হল না। বললো- মোল্লাহ, তুমি তো কয়েক বছর ধরে গাধা পোষতেছ। এখন পর্যন্ত নিশ্চয় গাধার ভাষা বুঝে উঠেছ। বলতো, ক্ষিদে পেলে গাধা কেমন করে জানায় ?
যখন গাধার ক্ষিদে পায় তখন আমার নিকটে আসে এবং আমাকে চাটতে শুরু করে। তখন আমি বুঝতে পারি গাধার ক্ষিদে পেয়েছে। তখন আমি গাধাটাকে ঘাস খেতে দিই। মোল্লা সাহেব শান্ত স্বরে বললেন।
আচ্ছা, আচ্ছা। যখন গাধা যখন উদাস হয়, তখন তুমি কেমনে টের পাও ?
মোল্লা সাহেব বুঝে গেলেন, আসলে প্রতিবেশীর উদ্দেশ্য তাঁকে হেনস্থা করা। তবুও তিনি শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন- যখন গাধা উদাস হয় তখন সে হেঁকে ডাক ছাড়ে।
বলার সাথে সাথেই গাধা হেঁকে উঠলো।
গাধাকে হাঁকতে দেখে প্রতিবেশী লোকটি বললো- তোমার গাধা তো হাঁকতে শুরু করে দিলো। এর মতলব এখন গাধা উদাস হয়েছে। এখন বলতো, গাধা উদাস কেন ?
এখন গাধা উদাস এ জন্যই যে, আমি আমার গাধাটাকে ছেড়ে অন্য একটি গাধার সাথে কথা বলতেছি। মোল্লাহ সাহেব হেসে হেসে
বললেন।
মোল্লার উত্তর শুনে প্রতিবেশী লোকটির হাসি গায়েব হয়ে গেলো। সেই ভাবলো, এত অপমানের পর এখান থেকে এখন চলে যাওয়াই ভালো।
শক্তি পরীক্ষা
একদিনের কথা। মোল্লা নাসিরুদ্দিন তাঁর বন্ধুদের সাথে গ্রামের এক জায়গায় বসে গল্প করছিলেন।
হঠাৎ শৈশব এবং যুবক বয়সের কথা উঠে গেলো। তাঁরা চর্চা করতে লাগলেন, পূর্বে অবস্থা কেমন ছিলো এবং বর্তমান অবস্থা কেমন চলছে। গ্রামের ক্ষেত্রে কি কি রকম পরিবর্তন হয়েছে।
একজন বন্ধু বললেন- এখন গ্রামের লোক পূর্বের থেকে অনেক জ্ঞানী হয়েছে।
অন্য একজন বললেন- জ্ঞানী অবশ্যেই হয়েছে, তবে পূর্বের থেকে লোক কমজোর হয়েছে।
যখন মোল্লাহ সাহেবের পালা এলো, তখন তিনি বললেন-বন্ধুসব, আমি পূর্বেও জ্ঞানী ছিলাম এবং এখনও জ্ঞানীই রয়েছি। আর
হ্যাঁ, শক্তির কথা বলছো, আমি পূর্বেও শক্তিমান ছিলাম এবং এখনও আছি।
আচ্ছা মোল্লাহ, তোমার কি আগের মতই শক্তি আছে? এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন।
মোল্লা সাহেব বললেন-কয়েক বছর ধরে আমাদের বাড়ীর সামনে একটি পাথর রয়েছে। আমি পাথরটি যৌবনেও তুলতে পারতাম, এখনও তুলতে পারি। তাহলে আমি আগের মতই শক্তিমান আছি, কথাটা ঠিক বলছি কি না ?
বেইমান কাজী
একদিনের কথা। মোল্লা নাসিরুদ্দিন বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ একজন লোক তাঁর সন্মুখে এসে গালে জোরে চপেটাঘাত
লোকটির হঠাৎ এ রকম আচরণের জন্য মোল্লাহ সাহেব থ’ মেরে গেলেন। তিনি কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আগেই, চপেটাঘাত করা লোকটি তাঁর সামনে নতমস্তক হয়ে ক্ষমা যাচ্ঞা করতে লাগলো।সে বলতে লাগলো- ভাই সাহেব, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনাকে অন্য কেউ ভেবেছিলাম । আমাকে ক্ষমা করে দিন। মোল্লা সাহেব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর সেই লোকটির কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই তিনি লোকটিকে ধরে কাজীর নিকট নিয়ে গেলেন।
কাজীর নিকটে এসে মোল্লা সাহেব পূরা কাহিনী খোলাসা করে বললেন এবং ন্যায়ের জন্য আর্জি জানালেন। কাজী যখন এ বাবত চপেটাঘাত করা লোকটির কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন লোকটি কোন রকম বাহানা না করে নিজের ভুল স্বীকার করলো ।
কাজী তৎক্ষণাৎ নিজের রায় শুনিয়ে দিলেন- মোল্লাকে চপেটাঘাত করাটা লোকটির ভুল হয়েছে। তবে সে নিজের ভুল স্বীকার করেছে। সেজন্য শাস্তি হিসাবে লোকটি মোল্লাকে এক টাকা জরিমানা আদায় দিতে হবে।
মোল্লাকে চপেটাঘাত করা লোকটি বললো- কাজী সাহেব, এখন আমার নিকট এক টাকা নেই ।
যদি নেই তো এক্ষুণি কোথা থেকে এক টাকার ব্যবস্থা করে নিয়ে এসো। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত মোল্লা এখানে অপেক্ষা করবে। কাজী বললেন ।
লোকটি এক টাকার ব্যবস্থা করার জন্য চলে গেলো এবং মোল্লা সাহেব কাজীর নিকট বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু অনেক সময় পার হওয়ার পরেও লোকটি ফিরে এলো না ।
মোল্লা সাহেবের বুঝতে অসুবিধা হল না যে, কাজী এবং লোকটির মধ্যে বুঝাপড়া আছে। তাই লোকটি ফিরে আসছে না। মোল্লা সাহেব কাজীকে জিজ্ঞাসা করলেন- কাজী সাহেব, আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই। জিজ্ঞাসা করতে পারব কি ?
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় পারবে। কর, কি জিজ্ঞাসা করবে।
এক থাপ্পড়ের জরিমানা তাহলে এক টাকাই, না কি বলেন? মোল্লা সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ, এক থাপ্পড়ের জরিমানা এক টাকাই। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কাজী উত্তরে বললেন।
আর যায় কোথায়! মোল্লা সাহেব বসা থেকে উঠলেন এবং কাজীর নিকট এসে কাজীর গালে জোরে চপেটাঘাত করে বললেন- কাজী সাহেব! লোকটি ফিরে এলে আপনি আমার এক টাকাটা নিয়ে নিবেন। আমি চললাম।
বলেই মোল্লা সাহেব সেখান থেকে চলে এলেন এবং কাজী সাহেব গালের মাঝে হাত রেখে মোল্লার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ।*
মোল্লাহ নাসিরুদ্দিনের কুর্তা
সময় সন্ধ্যা। মোল্লা নাসিরুদ্দিন ছাদের উপরে বসে বই পড়ছিলেন। এমন সময় তাঁর স্ত্রী চা নিয়ে এলেন এবং উভয়ে ছাদের উপরে বসে চা খেতে লাগলেন। এমন সময় হঠাৎ ধমকা বাতাস এলো এবং তাঁরের মাঝে শুকোতে দেওয়া কুর্তা উড়ে এসে নাসিরুদ্দিনের স্ত্রীর পায়ের উপর পড়লো।
নাসিরুদ্দিন বলে উঠলেন- আল্লাহ তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
নাসিরুদ্দিনের স্ত্রী কথাটার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনি কি জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলেন? ধন্যবাদ এই জন্যই দিলাম যে, আমি কুর্তার ভেতর ছিলাম না। মোল্লাহ সাহেব হেসে বললেন।*
মোল্লাহ নাসিরুদ্দিনের দুই বিবি
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের দুই বিবি ছিলেন। উভয় বিবি আশা করতেন যে, মোল্লা যেন তাঁকেই বেশি ভালোবাসেন ।
মোল্লা কাকে বেশি ভালোবাসেন সেটা জানার জন্য উভয় বিবি প্রায়শই জিজ্ঞাসা করতেন যে, মোল্লা বলুন তো আমাদের দুজনের মধ্যে আপনি কাকে বেশি ভালোবাসেন?
মোল্লা বাড়ীতে কোন রকমের কলহ চাইতেন না। সেজন্য তিনি চালাকি করে জবাব দিতেন- আমি তো তোমাদের দুজনকেই সমান সমান ভালোবাসি।
মোল্লা সাহেবের এই কথায় তাঁর উভয় বিবির আস্থা ছিল না। ফলে মোল্লা সাহেব বারবার একই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতেন। অবশেষে মোল্লা সাহেব বিরক্ত হয়ে এক উপায় বের করলেন। তিনি একদিন উভয় বিবির নিকট পৃথকে পৃথকে গিয়ে উভয়কে একটি করে নীল মোতি দিয়ে বললেন- এই মোতি বিশেষ করে আমি তোমার জন্য এনেছি। এটা তুমি তোমার কাছে রাখবে, কিন্তু সাবধান, এই মোতির কথা তুমি অন্য কাউকে বলবে না ।
উভয়ে নীল মোতি পেয়ে খুশি হয়ে নিজের কাছে রেখে দিলেন এবং উভয় বিবি একে অপরকে মোতির বিষয়ে বললেন না। এর পরে যখন বিবিরাঁ জিজ্ঞাসা করতেন, কাকে বেশি ভালোবাসেন তখন মোল্লাহ সাহেব বলতেন- যার কাছে নীল মোতি আছে তাঁকেই আমি বেশি ভালোবাসি ।জবাব শুনে উভয় বিবি খুশি হয়ে যেতেন এবং ফলে মোল্লাহ সাহেবও খুশি হতেন।*
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের প্রতিবেশী
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের এক প্রতিবেশী সব সময় কিছু না কিছু একটা খুঁজার জন্য নাসিরুদ্দিনের বাড়ী আসতো। প্রতিবেশীর আচরণের ফলে মোল্লা সাহেব খুবই বিরক্ত হতেন এবং তিনি হাবভাবে বিরক্তি প্রকাশও করতেন। তবু প্রতিবেশী এ কাজ থেকে বিরত হতো না । একদিন প্রতিবেশী মোল্লাহদের বাড়ী এসে দরজা খটখটিয়ে ডাকতে লাগলো- মোল্লাহ, মোল্লাহ সাহেব, একটু বাইরে বেরিয়ে আসুন। মোল্লা গৃহের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন- কেন ভাই, কি জন্য আসা হয়েছে? মোল্লা সাহেব, আমি খুবই একটা প্রয়োজনে আপনার নিকট এসেছি। আমি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে শহরে যাব। আপনি আপনার গাধাটা একদিনের জন্য আমাকে দিতে হবে। প্রতিবেশী তার প্রয়োজনের কথা জানালো ।
আরে ভাই, তুমি তো দেরি করে ফেলেছ। আমি সকালে গাধাটা অন্য কাউকে দিয়ে ফেলেছি। মোল্লা সাহেব বললেন। বাস্তবে মোল্লা সাহেব গাধাটা কাউকে দেন নি। গাধাটা প্রতিবেশীকে দিবেন না বলে তিনি এভাবে বাহানা করে বললেন।
এ কথা শুনে প্রতিবেশী যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো, এমন সময় গাধাটা গৃহের ভেতর থেকে হেঁকে উঠলো। প্রতিবেশী বুঝে গেলো যে, মোল্লাহ সাহেব গাধাটা কাউকে দেননি। গাধাটা তাকে দিবে না বলে মোল্লাহ সাহেব বাহানা করেছে।
তাই প্রতিবেশী বললো- মোল্লাহ আপনি তো বললেন, গাধাটা কাউকে দিয়ে দিয়েছন, গাধার চিৎকার তো আপনাদের গৃহের ভেতর থেকেই আসছে!
মোল্লা সাহেব বললেন- তুমি কাকে বিশ্বাস করবে, আমাকে না গাধাটাকে? এভাবে বলেই মোল্লাহ গৃহের ভেতর চলে গেলেন ৷ প্রতিবেশী হতাশ হয়ে বাড়ী চলে গেলেন।*
মোল্লা নাসিরুদ্দিন এবং ভিক্ষুক
একজন ভিক্ষুক নাসিরুদ্দিনদের গ্রামে ভিক্ষা করতে এসেছিলো। সে ঘুরতে ঘুরতে মোল্লাদের বাড়ীর সামনে এসে দরজা খটখটাতে লাগলো। মোল্লা সাহেব নিজের গৃহের দোতালায় বসে ছিলেন। দরজায় খটখটানোর আওয়াজ পেয়ে তিনি খিড়কি খুলে নিচের দিকে তাকালেন।
নিচে দরজার সামনে একজন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- কি চাই?
ভিক্ষুক বললো- নিচে আসুন জ্বনাব, পরে বলছি।
মোল্লা ভাবলেন, নিশ্চয় এই ব্যক্তিটির তাঁর নিকট কোন জরুরি কাজ আছে। তাই তিনি নিচে নেমে এসে দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করলেন- হ্যাঁ, এখন বলো কি চাই?
কিছু টাকা পয়সা দিন, আল্লাহ আপনাকে বেহেস্ত নছিব করবেন। ভিক্ষুক ফরিয়াদ করে বললো ।
এই কথা শুনে মোল্লা বিরক্ত হয়ে দরজা বন্ধ করে কিছু না বলেই দোতালায় উঠে এলেন। ওপড়ে এসে খিড়কি খুলে তিনি নিচের দিকে তাকিয়ে ভিক্ষুকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুন, একটু ওপড়ে উঠে এসো।
ভিক্ষুকটি কিছু পাওয়ার আশায় সিড়ি ভেঙে ওপড়ে উঠে এসে মোল্লার সামনে দাঁড়ালো ৷
তখন মোল্লা বললেন- আজ আমার নিকট কিছুই নেই। তাই তোমাকে কিছুই দিতে পাড়লাম না ।
এ কথা শুনে ভিক্ষুক ক্ষুণ্ণ হয়ে বললো- এই কথা তো আপনি আমাকে খিড়কি খুলেই বলে দিতে পারতেন। এত সিড়ি ভাঙিয়ে ওপড়ে উঠিয়ে আনার কি প্রয়োজন ছিলো?
তুমিও তো নিচে থেকে ডেকে বলতে পারতে তোমার কি প্রয়োজন? আমাকে সিড়ি ভাঙিয়ে নিচে নামিয়ে নেওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? মোল্লা বললেন।
ভিক্ষুক আর কি করবে, রাগে ওঠ কামড়াতে কামড়াতে চলে গেলো।*
ধর্মগুরুর চর্চা
এক সময়ের কথা। নাসিরুদ্দিনদের গ্রামে মুসলিম ধর্মগুরুদের মধ্যে আপোসে ধর্ম নিয়ে চর্চা চলছিলো। বিভিন্ন বিষয়ের ওপড় চর্চা করতে করতে চর্চা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছোল যে, শবযাত্রার সময় শবানুগমন করা ব্যক্তিরা শবযানের বাম দিকে চলতে হয়, না ডান দিকে চলতে হয় এ নিয়ে চর্চা চলতে লাগলো ।
সবার মত ভিন্ন ভিন্ন ছিলো। ফলে তাঁদের মধ্যে তর্ক চলতে লাগলো। কেউ বললেন, শবযানের বাম দিকে এবং কেউ আবার বললেন,শবযানের ডান দিকে চলতে হয়।তর্ক যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছোল তখন মোল্লা সাহেব ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে ধর্মগুরুসকলে তর্কের বিষয়বস্তুর বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- বলুন তো মোল্লা, এই বিষয়ে আপনার মত কি ?
মোল্লা হেসে হেসে বললেন- ভাই,যেদিকে মর্জি সেই দিকে চলেন। তাতে কিছু যায় আসে না। শবযানের ডান দিকেও চলতে পারেন, ইচ্ছে করলে বাম দিকেও চলতে পারেন। তবে, সব চেয়ে জরুরি কথা হলো, কেউ যেন শবাধারের ভেতরে চলে না যায়।*
চাকাবিশিষ্ট চৌকা
একদিন নাসিরুদ্দিনের স্ত্রী তাঁকে বললো- শুনুন তো, উঠোনে একটি চৌকা বানিয়ে দিন। গৃহের ভেতর খুব গরম। তাই বাইরে বসে আরামে রান্নাবান্না করব।
মোল্লাহ স্ত্রীর আবদার শুনে চৌকা বানানোর উপযোগী জিনিসপত্র যোগার করে চৌকা বানানোর কাজে লেগে গেলেন এবং অনেক পরিশ্রমের পর একটি চৌকা বানিয়ে ফেললেন।
স্ত্রী চৌকা দেখে খুব খুশি হলো। মোল্লা সাহেব প্রশংসা শুনার জন্য তাঁর বন্ধুবান্ধবদের ডেকে আনলেন। বন্ধুরা চৌকা দেখে প্রশংসা করতে লাগলো- বাঃ, মোল্লা সাহেবের তুলনা নেই, কেমন চমৎকার চৌকা বানিয়েছে। মাশাল্লাহ !
মোল্লা সাহেব মনে মনে খুশিতে উপচে পড়লেন। কিন্তু তাঁর খুশি শুধু একটি মুহূর্তের জন্য ছিলো। চৌকাটা খুব ধ্যানপূর্বক নিরীক্ষণ করে এক বন্ধু বললেন- মোল্লা, চৌকার মুখটা উত্তর দিকে বানিয়েছ, তোমার এ রকম লাগছে না যে, উত্তর দিক থেকে বাতাস এলে চৌকার সমগ্র আগুন উড়ে যাবে?
বন্ধুর কথা মোল্লাহর যথাযথ লাগলো। তিনি তৎক্ষণাৎ চৌকা ভেঙে ফেললেন এবং আরেকটা চৌকা ফেললেন। সেই চৌকাটাও খুব সন্দর হলো। চৌকাটার মুখ দক্ষিণ দিকে বানালো ।
তিনি আবার বন্ধুদের ডেকে চৌকাটা দেখালেন এবং তাঁদের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বন্ধুরা চৌকার প্রশংসা করতে লাগলেন- বাঃ, মোল্লা কামাল করে দিয়েছ। এর আগে আমরা এমন সুন্দর চৌকা কখনো দেখিনি ।
কিন্তু এক বন্ধু মনে মনে ছিলেন। মোল্লা জিজ্ঞাসা করলেন- বন্ধু, তুমিও কিছু বলো। এভাবে মনে মনে আছ কেন?
চৌকাটা খুবই সুন্দর হয়েছে, তবে এর মুখটা দক্ষিণ তরফ রয়েছে। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস এলে তখন কি করবে? আগুন বেরিয়ে আসবে, তখন তোমার খানা বানানো মস্কিল হবে।
মোল্লাহ সাহেবের কথাটা যথাযথ লাগলো এবং তিনি চৌকা ভেঙে মুখ পূর্ব দিকে মুখ করে অন্য একটি নতুন চৌকা বানালেন । বন্ধুরাঁ আবার চৌকা দেখতে এলেন। এইবার এক বন্ধু বললেন- কয়েক মাস পূর্বদিক থেকেও বাতাস চলে। তখন তুমি চৌকাটা নিয়ে খুবই অসুবিধায় পড়বে।
মোল্লাহ সাহেব আবার চৌকা ভেঙে ফেললেন। এইবার পূরা মাথা খাটিয়ে চাকাবিশিষ্ট একটি চৌকা বানালেন। যাতে চৌকা প্রয়োজনে ঘুরাতে পারেন। তিনি নিজের চৌকা দেখে খুবই খুশি হলেন।
তাঁর বন্ধুরাঁ আবার চৌকা দেখতে এলেন। বন্ধুরাঁ চৌকার খুবই প্রসংসা করলেন-বাঃ মোল্লা, এখন তোমার চৌকা নিয়ে কোন রকম অসুবিধা হবে না। চৌকা তোমার মর্জি মাফিক যেখানে ইচ্ছা সেখানে রাখতে পারবে। তুমি সত্যিই কামাল করেছ।
মোল্লাহ গর্বে ফুলে উঠলেন। তবে এক বন্ধু বললেন- মোল্লা তোমার নিকট আমার একটা অনুরোধ, আমি ভাবি তুমি আমার অনুরোধ উপেক্ষা করবে না।
মোল্লা বললেন- বল, কি অনুরোধ?
আমি আজ চৌকাটা আমাদের বাড়ী নিয়ে যেতে চাই। কাল সকালেই ফেরত দিয়ে যাব। বন্ধু বললেন।
মোল্লাহ সাহেব অস্বীকার করতে পারলেন না। তিনি 'হ্যাঁ' বললেন। বন্ধু সেই চাকাবিশিষ্ট চৌকা নিজের বাড়ী নিয়ে গেলেন। রাতে তিনি সেই চৌকায় খানা বানালেন এবং পরের দিন সকালে চৌকাটা ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন ।
মোল্লাহ সাহেব চৌকাটা উঠোনে রেখে দিলেন এবং স্ত্রীকে খানা প্রস্তুত করতে বলে নিজের কাজে চলে গেলেন। দুপর বেলা মোল্লা সাহেব খাদ্য গ্রহণের জন্য বাড়ী এলেন। তিনি দেখলেন তাঁর স্ত্রী একটি চারপায়ার ওপড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছেন।
মোল্লাহ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- কি হয়েছে? খাদ্য প্রস্তুত করেছ নাকি?
স্ত্রী গোস্বায় চিল্লায়ে বললেন- তুমি চৌকা বানিয়েছ, না আপদ বানিয়েছ? এদিক ওদিকের কথা ছেড়ে আসল কথা বল, কি হয়েছে?
চাকাবিশিষ্ট চৌকা বানিয়ে তুমি খুব গর্ব করছিলে না ! এখন ভোগো। তুমি বাজারে যাওয়ার পর চোর এসে চৌকাটা চুরি করে নিয়ে গেছে।
স্ত্রীর কথা শুনে মোল্লাহ সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন*।
ভদ্র চোর
মোল্লাহ নাসিরুদ্দিনের একটি গাধা ছিলো। গাধাটা তিনি বাড়ীর পেছনে নির্মিত একটি আস্তাবলে বেঁধে রাখতেন। একদিন সকালে উঠে দেখলেন, গাধাটা আস্তাবলে নেই। তাঁর সন্দেহ হলো, গাধাটা নিশ্চয় চুরি হয়ে গেছে।
তিনি গাধা খুঁজতে লাগলেন। তিনি প্রতিবেশীদের কাছে গাধাটার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন।
যখন প্রতিবেশীরা গাধা চুরির বিষয়ে জানতে পাড়লেন, তখন তারা মোল্লাহ সাহেবকেই দুই কথা শুনাতে লাগলেন।
এক প্রতিবেশী বললো- মোল্লাহ, তুমি নিশ্চয় রাতে আস্তাবলের দরজা খোলা রেখে শোয়েছিলে। তারজন্য গাধাটা চুরি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় প্রতিবেশী বললো- তুমি রাতে সজাগ থাকা উচিত ছিলো। তোমার অবহেলার জন্যই গাধাটা চুরি হয়ে গেছে।
তৃতীয় প্রতিবেশী বললো- মোল্লা, তুমিও একজন লোক! তুমি কেন এভাবে বেঘোরে নিদ্রা যাও? তুমি ঘুমালে তখন তোমার বাইরের দুনিয়ার প্রতি খেয়ালই থাকে না। এজন্য চোর গাধাটা চুরি করে নিয়ে গেছে। বেঘোরে ঘুমানোর জন্য তুমি কথাটা জানতেই পারনি।
গাধা চুরি হওয়ার জন্য মোল্লাহ সাহেব এমনিতেই পেরেশান ছিলেন, অন্যদিকে প্রতিবেশীর কথা শুনে তিনি রাগে লাল হয়ে উঠলেন। বললেন- হ্যাঁ হ্যাঁ, সবই আমার দোষ। সেই চোরটা কিন্তু ভদ্র ছিলো।*
গরিবের ঝোলা
একদিনের কথা। মোল্লাহ সাহেব নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর চোখ একজন লোকের উপড়ে পড়লো। লোকটি আশমানের দিকে তাকিয়ে বড়বড় করে কিছু বলছিলো। লোকটিকে দেখে মোল্লাহ আশ্বর্যচকিত হয়ে গেলেন।
লোকটির নিকটে যাওয়ার পর মোল্লাহ সাহেব বুঝতে পারলেন, লোকটি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতেছে। সে বলছিলো-ইয়া আল্লাহ, তুমি আমাকে কেন এ রকম ভাগ্য দিয়েছ? কী রকম দীনহীন জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছি আমি। আমার কাছে কি আছে! এই শতছিন্ন ঝোলার বাইরে কিছুই নেই আমার। এই শতচ্ছিন্ন ঝোলায় রাখার জন্যই কিছু দাও, খোদা। আমার কপালই পোরা। এই পোরা কপাল নিয়ে এখন আমি কি করি?
লোকটির কথা শুনার পর হঠাৎ মোল্লাহ সাহেবের কি মনে হলো, তিনি লোকটির নিকটে এসে চিলের মতো ছোঁ মেড়ে ঝোলাটা কেড়ে নিলেন এবং সেখান থেকে দ্রুত চলে এলেন। নিজের দীনদরিদ্র অবস্থার জন্য বেহাল লোকটি ঝোলা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আরও দুঃখী হয়ে পড়লো । কিন্তু কি করবে? সে বড়বড় করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগলো।
এদিকে ঝোলা কেড়ে নিয়ে মোল্লাহ সাহেব কিছুদূর এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং রাস্তার ধারে ঝোলাটা রেখে দিলেন। গরিব লোকটি সেই রাস্তা দিয়েই আসছিলো। সে ঝোলাটা দেখে খুবই খুশি হলো। সে ঝোলাটা তুলে নিয়ে নিজের বুকের সাথে লাগালো। ঝোলা পাওয়ার পরে সে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে লাগলো।
মোল্লাহ একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তিনি সব কিছুই দেখছিলেন। তিনি মনে মনে খুশি হলেন এই ভেবে যে, তাঁর এই আচরণের জন্য লোকটি কিছু সময়ের জন্য অন্তত খুশি হয়েছে। সাথে সাথে সে তার নিজের জিনিসের মূল্যের বিষয়েও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এখন সে আল্লাহর নিকট অভিযোগ করার পরিবর্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেছে।*
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের ছাগল
মোল্লাহ নাসিরুদ্দিনের একটি মোটা তাজা ছাগল ছিলো। মোল্লা সাহেব ছাগটির খোরাকের প্রতি খুব ধ্যান রাখতেন। ছাগলটিকে তিনি খুব দানাপানী খাওয়াতেন। তাঁর আশা ছিলো, ঈদের সময় ছাগলটা বিক্রী করে ভালো রকম টাকা কামাই করবেন ।
মোল্লাহ সাহেবের প্রতিবেশীদের কিছুদিন ধরে ছাগলটার প্রতি চোখ ছিলো। তারা যখনই ছাগলটা দেখতো, তাদের মুখে জল এসে যেতো । তারা ছাগলটা খাওয়ার কথা ভাবছিলো । তারা একদিন মোল্লা সাহেবকে বুৰ্বক বানিয়ে ছাগলটা হাতিয়ে নেওয়ার কথা ভাবলো । তারা মোল্লা সাহেবের নিকটে এলো। এক প্রতিবেশী বললো- মোল্লা শুনেছ নাকি, কাল বোলে প্রলয় হবে? প্রলয়? মোল্লা হতচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ প্রলয় ! কাল সারা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ জিন্দা বেঁচে থাকবে না। আজকের রাতই আমাদের জন্য আখেরি রাত হবে। অন্য এক প্রতিবেশী বললো।
এ রকম হবে তোমাদের কে বললো? মোল্লা সাহেব কথাটা জানার জন্য ওৎসুক্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
চারদিকেই এই খবর প্রচার হয়ে গেছে। তুমি এখন পর্যন্ত জাননি নাকি? কাল সবারই জীবন চলে যাবে, সেজন্য আমরা সবাই ফয়সলা করেছি যে, আজকের রাতে আমরা উৎসব পালন করব। আমরা মহল্লায় খানাপিনার আয়োজন করেছি। তুমিও চল আমাদের সাথে।
ঠিক আছে, নিশ্চয় যাব। মোল্লাহ সাহেব শান্তিপূর্বক বললেন।
আমরা সবাই কিছু না কিছু দিয়েছি, মোল্লাহ। দুনিয়াই যখন থাকবে না, তখন জিনিসপত্র দিয়ে কি করব! তুমিও কিছু দাও। এ রকম কর, তোমার ছাগলটাই দিয়ে দাও৷ চালাকি করে এক প্রতিবেশী বললো ৷
মোল্লাহ সাহেবের সন্দেহ হলো যে, প্রতিবেশীরা তাঁকে বুৰ্বক বানাতে এসেছে। কিন্তু তিনি ছাগলটা দেওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেলেন। বললেন- ঠিক আছে, আমার ছাগলটা নিয়ে যাও এবং ঘটা করে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করো । আমি খাওয়ার সময় গিয়ে উপস্থিত হব। প্রতিবেশীদের মনের আশা পূর্ণ হলো। তারা সবাই খুশি হয়ে মোল্লার ছাগল নিয়ে চলে গেলো।
সন্ধ্যের সময় সেই ছাগল জবাই করে সবাই মজা করে পেট পূরে ভোজন করলো। মোল্লা নিজেও দাওয়াতে শামিল হলো। শীতের দিন ছিলো। সারারাত প্রতিবেশীরা আমোদস্ফূর্তি করবে। তাদের যাতে শীতে কষ্ট করতে না হয়, তারজন্য মোল্লা সাহেব জ্বালানির ব্যবস্থা করে দিলো। সারা রাত আগুন জ্বেলে সবাই নাচগান করে কাটিয়ে দিলো। তাদের শীতের কোন অনুভবই হল না।
পরের দিন সকালে প্রতিবেশীরা মোল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বললো- তোমার জন্যই কাল রাতের দাওয়াত খুবই শানদার হয়েছে। ছাগলের মাংসও খুব সুস্বাদু ছিলো। তুমি সমস্ত রাত আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য শীতের অনুভব পর্যন্ত হয়নি। তোমার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা রইলো।
তোমাদেরও আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। মোল্লাহ সাহেব বললেন।
প্রতিবেশীরা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো, এমন সময় এক প্রতিবেশী তার কাপড় ছাইয়ের মাঝে দেখতে পেয়ে মোল্লাহ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলো- আরে মোল্লাহ, এটা তো আমার শার্টের মতোই লাগতেছে। তুমি এটা কোথায় পেয়েছ?
মোল্লাহ সাহেব শান্ত স্বরে বললেন- তোমরা তো বলেছিলে আজ প্রলয় আসবে। দুনিয়াটা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাহলে এই সিল্কের শার্টের কি দর্কার? সেজন্য আগুন জ্বালানোর জন্য সবার সিল্কের শার্ট এনে জ্বালানির কাজ করেছি। কেন কাজটা ঠিক করিনি ?
প্রতিবেশীরা আর কি করবে? মোল্লার ছাগলের দাম তাদের নিজেদের সিল্কের শার্ট দিয়ে চুকাইতে হলো। সবাই মাথা নত করে সেখান থেকে যার যার বাড়ী চলে গেলো।*
দক্ষতা
মোল্লা নাসিরুদ্দিন যেখানে কাজ করতেন, সেখানে তাঁর মালিক তাঁর কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। একদিন তাঁর মালিক ভাবলেন, মোল্লাহকে ভালো করে বুঝাতে হবে, যাতে সে কাজ ভালো করে করেন।
মালিক মোল্লাহকে ডেকে পাঠালেন এবং মোল্লাহ সাহেব উপস্থিত হওয়ার পর তাঁকে বুঝাতে লাগলেন- দেখ মোল্লাহ, তুমি কাজ কর ঠিকই, তবে খুব ধীরে ধীরে করো। সময় বাঁচিয়ে তারাতারি কাজ করতে শেখো। যদি কোন জিনিস কেনার জন্য তোমাকে বাজারে যেতে হয়, তাহলে প্রতিটি জিনিসের জন্য বারে বারে বাজারে যাবে না। বাজারে একবার যাবে এবং প্রতিটি জিনিস একবারেই নিয়ে আসবে। এতে তুমিও পেরেশান হবে না এবং কাজও ঠিক মতো হয়ে যাবে।
মোল্লাহ বললেন- আচ্ছা, আজ থেকে আপনার পরামর্শ মতোই কাজ করব।
মালিক খুশি হলেন, এই ভেবে যে, মোল্লাহ তাঁর কথা বুঝতে পেরেছে।
একদিন মালিকের অসুখ হলো। তিনি মোল্লাহকে ডেকে বললেন- মোল্লাহ যাও, হেকিমকে ডেকে নিয়ে এসো। আমার শরীর একটু খারাপ লাগতেছে।
‘জী মালিক’ বলে মোল্লাহ হেকিম ডাকতে চলে গেলেন।
যখন তিনি হেকিম ডেকে নিয়ে এলেন তখন হেকিমের সাথে আরও দু'জন লোক নিয়ে এলেন।
লোক দু'জনকে দেখে মালিক অসন্তুষ্ট হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন- মোল্লাহ, এই দু'জন লোক আবার কীজন্য ?
মোল্লাহ বললেন- এখন আমি সময় অপব্যয় করি না। দেখেন এক সাথেই আমি সমস্ত বন্দবস্ত করে এসেছি। হেকিম আপনার চিকিৎসার জন্য এবং আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য দোয়া করার প্রয়োজন হবে বলে ইমাম সাহেবকেও সাথে নিয়ে এসেছি। যদি আপনি মরে যান তো, দাফন করার জন্য এই লোকটিকে সাথে নিয়ে এসেছি।
কথা শুনে মালিক রাগে জ্বলে উঠলেন এবং ধাক্কা মেরে মোল্লাহকে কাজ থেকে বের করে দিলেন।*
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের উপস্থিত বুদ্ধি
এক সময় মোল্লা নাসিরুদ্দিনের কাজকাম ঠিক মতো চলছিলো না। যেন তেন প্রকারে দিনপাত করছিলেন। কোন কোন দিন তো এমনও হতো পকেটে একটি পয়সাও থাকত না। তখন তিনি লোকের নিকট থেকে টাকা ধার করে সংসার চালাতেন ৷
একবার প্রয়োজনে মোল্লাহ নিজের প্রতিবেশীর নিকট থেকে চারশ টাকা ধার করলেন। টাকা পরিশোধ করার জন্য তারিখ ধার্য ছিলো । কিন্তু তারিখ মতো তিনি টাকা পরিশোধ করতে পারলেন না। প্রতিবেশী কয়েক দিন টাকার তাগিদা দেওয়ার জন্য মোল্লার বাড়ী এলেন, কিন্তু মোল্লাহ আজ দেব, কাল দেব বলে টালবাহানা করে সময় পার করতে লাগলেন ।
একদিন অসহ্য হয়ে প্রতিবেশী লোকটি বাদশাহের নিকট নালিশ করলো। বাদশাহ মোল্লাহকে হাজির হওয়ার জন্য আদেশ দিলেন। মোল্লাহ বাদশাহের সামনে হাজির হলেন।
বাদশাহ প্রতিবেশী লোকটিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- মোল্লাহ, তুমি এর নিকট থেকে চারশ দীনার ধার নিয়েছ, কথাটা ঠিক কি না?
মোল্লা বললেন- হ্যাঁ জাহাপনা, চারশ দীনার ধার নিয়েছি, কথাটা সত্য।
বাদশাহ আবার জিজ্ঞাসা করলেন- তাহলে তুমি ধার পরিশোধ করছ না কেন ?
হ্যাঁ জাহাপনা, আমি এখন পর্যন্ত ধার পরিশোধ করতে পারি নি। তবে খুব শীঘ্রই পাই পাই পরিশোধ করে দিব। যদি এর জন্য আমার ঘোড়া এবং গাইও বিক্রী করতে হয়, তাই করব। মোল্লা দৃঢ়কণ্ঠে বললেন।
বাদশাহ কিছু বলার আগেই প্রতিবেশী লোকটি বললো- জাহাপনা, এ মিথ্যা কথা বলতেছে। এর নিকট ঘোড়াও নেই, গাইও নেই। এ কাঙাল জাহাপনা। এক মুষ্ঠি খাওয়ার জন্য এ দ্বারে দ্বারে খুঁজে বেরায়। এ আমার টাকা পরিশোধ করবে কীভাবে?
মোল্লাহ হাতজোড় করে বললেন- আমার অবস্থা তো আপনি এর মুখ থেকেই শুনলেন, জাহাপনা। এখন আপনিই বলুন, এই পরিস্থিতিতে আমি এর ধার কীভাবে পরিশোধ করব? কোথা থেকে করব এর টাকা বন্দবস্ত? যখন আমার নিজেরই খানাদাওয়ার ব্যবস্থা নাই ।
মোল্লাহর অবস্থা দেখে বাদশাহ পূরা মামলা রফাদফা করে দিলেন। বাদশাহ বললেন- তোমার অবস্থা যখন এতই খারাপ তাহলে তোমাকে এখন
টাকা পরিশোধ করতে হবে না। টাটা হাতে এলে তখন
পরিশোধ করে দিও।
এই প্রকারে মোল্লাহ নিজের উপস্থিত বুদ্ধির বলে তখনকার মতো ধার পরিশোধ করা থেকে বেঁচে গেলেন।*
খসবু এবং সিক্কার ঝনঝন শব্দ
একদিন মোল্লাহ নাসিরুদ্দিন নিজেদের বাজারে ঘুরাঘুরি করছিলেন। তাঁর কাবাব খাওয়ার ইচ্ছে হলো এবং তিনি একটি কাবাবের দোকানে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, অনেক লোক একজন ভিক্ষুককে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভিক্ষুক হাতজোড় করে মাথা নুইয়ে আঁঠু গেড়ে বসে কাবাবয়ালার সামনে অনুনয় বিনয় করতেছে।
দৃশ্য দেখে মোল্লাহ নাসিরুদ্দিন হয়রান হয়ে গেলেন। তিনি কাবাবওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলেন- জ্বনাব, কি হয়েছে? এখানে এত ভিড় জমেছে কেন? এই লোকটি কি করেছে? এ এরকম কেন অনুনয়বিনয় করতেছে?
কাবাবওয়ালা বললো- কিছুক্ষণ আগে এই ভিক্ষুকটি হাতে করে একটি রুটি নিয়ে আমার কাছে এসে রুটিটা আমার চৌকায় সেঁকার জন্য অনুমতি চাইল। কিন্তু সে আমার চৌকার পরিবর্তে আমার তাওয়ায় রুটিটা সেঁকেছে। সেই তাওয়ায় আমি কিছুক্ষণ আগে কাবাব বানিয়েছি। এর জন্য কাবাবের খশবু ভিক্ষুকের রুটিতে চলে গেছে। আমি সেই খশবুর পয়সা খুঁজতেছি। এ দিতে অস্বীকার করতেছে।
সকল বৃত্তান্ত শুনার পর মোল্লাহ সাহেব ভিক্ষুককে বললেন- কেন, তুমি জান না নাকি যে, সব জিনিসেরই মূল্য আছে? অন্যের জিনিস ব্যবহার করলে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তাই তুমিও খশবুর মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
মোল্লাহর কথা শুনে কাবাবওয়ালা খুব খুশি হলো এবং মোল্লাহর কথা শুনে ভিক্ষুক নিজের পকেট হাতাতে লাগলো। তাঁর পকেটে কিছু সিক্কা ছিলো। সিক্কা কয়টি ছিলো তার সমস্ত দিনের রোজগার।
সে সমস্ত সিক্কা পকেট থেকে বের করে কাবাবওয়ালার দিকে বাড়াতে গেলো। তখন মোল্লাহ তার হাত থেকে সিক্কা কয়টি নিজের হাতে নিয়ে বললেন- তোমার তরফ থেকে এই সিক্কা আমি কাবাবওয়ালাকে দিয়ে দিতেছি।
ভিক্ষুক সমস্ত সিক্কা মোল্লাহ সাহেবের হাতে দিলো। মোল্লাহ সাহেব সেই সিক্কা কাবাবওয়ালার কানের পাশে নিয়ে গিয়ে ঝনঝনাতে লাগলো। সিক্কার ঝনঝন শব্দ শুনার পর কাবাবওয়ালা বললো- এখন এই সিক্কা কয়টি আমাকে দিয়ে দিন।
না জ্বনাব, এই ভিক্ষুক আপনার কাবাবের শুধু খশবু নিয়েছে, সে খায়নি। সেজন্য আপনি সিক্কার ঝনঝন শব্দ শুনুন, সিক্কা নেওয়ার হক আপনার নেই।
এভাবে বলে মোল্লাহ সাহেব সিক্কা কয়টি ভিক্ষুককে ফেরৎ দিলেন। কাবাবওয়ালার মুখ পাংশু হয়ে গেলো এবং জড়ো হওয়া ভিড় ধীরে ধীরে সেখান থেকে কেটে পড়ল।*
গৃহের ভেতর ভিড়
একদিন একজন লোক মোল্লা সাহেবের কাছে এসে বললো- মোল্লা সাহেব, আমি খুবই পেরেশানের মধ্যে আছি। আমি আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি।
মোল্লাহ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- বল, কি তোমার পেরেশানী?
লোকটি তার পেরেশানীর কথা জানালো- আমার পেরেশানী আমার গৃহ। আমি একটি ছোট গৃহে আমার স্ত্রী এবং তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করি। গৃহে জায়গা এত কম যে, সেখানে থাকাটা মস্কিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার এত পয়সাও নেই যে, আমি বড় একটি গৃহ নির্মাণ করব। এখন আপনিই বলুন, এখন আমি কি করব?
লোকটির পেরেশানীর কথা শুনে মোল্লাহ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার বাড়ীতে মুর্গী আছে কি?
লোকটি বললো- হ্যাঁ জ্বনাব, আছে।
এখন থেকে তুমি মূৰ্গীগুলো গৃহের বাইরে না রেখে গৃহের ভেতরে রাখবে। মোল্লাহ সাহেব শান্ত স্বরে বললেন।
কথাটা শুনে লোকটি আশ্বর্যচকিত হয়ে গেলো। তবে তিনি ভাবলেন, মোল্লাহ সাহেব যেমন বলেছে তেমনই করে দেখি। দেখি কি হয় ! সন্ধ্যে বাড়ী ফিরে এসে মুর্গী কয়টি খোঁয়াড়ের পরিবর্তে গৃহের ভেতর রাখলো।
মুর্গী কয়টি গৃহের ভেতর আনার জন্য গৃহে থাকাটা আরও মস্কিল হয়ে উঠলো। কোন রকমে দুই তিন দিন থাকার পর লোকটি আবার মোল্লাহ সাহেবের নিকট এসে বললো- মোল্লাহ সাহেব, তুমি যেমন বলেছিলে আমি তেমনই করেছি। মুর্গী গৃহের ভেতর রাখার পর আমাদের অবস্থা অধিক শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এখন বলুন, আমি কি করব?
মোল্লাহ সাহেব শান্ত স্বরে বললেন- বাড়ীতে ছাগল আছে?
লোকটি বললো- হ্যাঁ আছে।
তুমি আজ থেকে ছাগল কয়টিও গৃহের ভেতর রাখবে।
লোকটি আচরিত হয়ে মোল্লাহ সাহেবের দিকে তাকাতে লাগলো।
তখন মোল্লাহ সাহেব বললেন- আমি যা বলছি, তাই করগে’।
লোকটি বাড়ীতে এসে মোল্লাহ যেভাবে বলেছিলো সেভাবেই করলো। সমস্ত ছাগল গৃহের ভেতর এনে বাঁধলো। ফলে গৃহে আরও স্থান কমে গেল৷ তাদের খুবই পেরেশান হতে লাগলো। কয়েক দিন সেভাবে থাকার পর লোকটি মোল্লাহ সাহেবের নিকট এসে রাগের সাথে বললো- আমার গৃহ ভরে গিয়েছে। মুর্গী এবং ছাগলের জন্য গৃহে থাকাটাই মস্কিল হয়ে পড়েছে।
লোকটির কথায় গুরুত্ব না দিয়ে মোল্লাহ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার বাড়ীতে গাধা আছে?
লোকটি রাগের সাথে বললো- গাধাটাও গৃহের ভেতর ভরাব নাকি?
হ্যাঁ, তাই ভরাওগে’ । মোল্লাহ সাহেব হেসে বললেন।
লোকটি বাড়ী এসে গাধাটিও গৃহের ভেতর বাঁধলো। মুর্গী, ছাগল এবং গাধার সাথে পরিবার নিয়ে কোন রকমে কয়েক দিন থাকার পর লোকটি মোল্লাহ সাহেবের নিকট এসে বললো- তোমার কাছে আমি পরামর্শের জন্য এসেছিলাম। তুমি এমন পরামর্শ দিয়েছ যে, এখন আমাদের বেঁচে থাকাটাই মস্কিল হয়ে পড়েছে। আমিই গাধা। যারজন্য তোমার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছিলাম !
মোল্লাহ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- সত্যিই গৃহের ভেতর জায়গা নাই নাকি?
আমি তোমাকে প্রথমেই বলেছিলাম যে, আমার গৃহটি খুবই ছোট। এখন মানুষ কেন, গৃহে পা রাখার মত জায়গা পর্যন্ত নেই।
তাহলে এমন কর, গৃহ থেকে মুর্গী, ছাগল এবং গাধা বের করে দাওগে’।
লোকটি বাড়ী এসে মুর্গী, ছাগল এবং গাধা গৃহ থেকে বের করে দিলো।
কিছুদিন পর লোকটি মোল্লাহ সাহেবের নিকট এসে বললো- আমি শুকরিয়া আদায় করতে এসেছি। তুমি সত্যিই কামাল করেছ। এখন আমি আমার পরিবার নিয়ে সেই ছোট গৃহটিতেই খুব সুখ শান্তি আছি। সেই জন্তুগুলোকে গৃহ থেকে বের করে দেওয়ার পর, গৃহে যেন অনেক জায়গা রয়েছে এমন লাগতেছে। এখন আমরা সেখানে কোন অভিযোগ ছাড়াই আরামে থাকতেছি।
লোকটি শেষে মন্তব্য করলো- এখন আমরা শিখে ফেলেছি, যা কাছে রয়েছে, তা কেমনে ঠিক মতো ব্যবহার করতে হয় এবং যা সাথে আছে তা নিয়ে কেমনে সুখ শান্তিতে বসবাস করতে হয়।*
সমাপ্ত


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন