রক্তাক্ত ফিলিস্তিন
রক্তাক্ত ফিলিস্তিন
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন চলমান সংঘাত
গাজার
ফিলিস্তিনিদের ডি ফ্যাক্টো সরকার,
হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের
৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা
থেকে হঠাৎ ইসরায়েলের ওপড় রকেট নিক্ষেপের ফলে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনি
ফেদায়েন গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি চলমান যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে। ৭ তারিখের রকেট
নিক্ষেপের ফলে পাল্টা আক্রমণ
হিসাবে ইসরায়েল একদিন পরে
আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। যুদ্ধটি কয়েক দশকের আরব-ইসরায়েল সংঘাতের অংশ, বিশেষ করে গাজা-ইসরায়েল সংঘাতের ফল হিসাবে
সংঘটিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩,০০০
রকেটের রকেট ব্যারেজ
নিক্ষেপ এবং ইসরাইলের ভূখণ্ডে
ফিলিস্তিনি যানবাহন অনুপ্রবেশের সাথে আক্রমণটি শুরু হয়েছিল। ফিলিস্তিনি জঙ্গিরা(?) গাজা-ইসরায়েল বাধা(ব্যারিয়ার)লঙ্ঘন করে কমপক্ষে ২,৫০০ ফিলিস্তিনি ইসরাইল ভূখণ্ডে অনুপ্ৰবেশ করে ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটি
আক্রমণ করে এবং ইসরায়েলি সম্প্রদায়ের বেসামরিক লোকদের হত্যা করে। উক্ত আক্ৰমণের
ফলে কমপক্ষে ১৪০০
জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। এদের
২৬০ জনকে একটি মিউজিক
অনুষ্ঠানে আক্ৰমণ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার
পর নিরস্ত্র বেসামরিক লোকসহ ইসরায়েলি সৈন্যদের বন্দি করে জিম্মি হিসাবে গাজা উপত্যকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, যার মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলো।
ইসরাইলি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ
করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
থেকে হামাস বাহিনীকে উৎখাত করার পর গাজা
উপত্যকায় বিমান আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।এই আক্রমণের ফলে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ২,২১৫ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ প্ৰতিবেদন
প্ৰকাশ করেছে যে, প্রায় ১ মিলিয়ন ফিলিস্তিনি, যা
গাজার জনসংখ্যার প্রায়
অর্ধেক, আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইসরায়েল গাজা থেকে খাদ্য,
পানি, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার পর মানবিক
সংকটের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্যে এসব অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর সরবরাহ পূর্ব থেকেই মিশর ও ইসরায়েল উভয়ের দ্বারা
অবরুদ্ধ ছিল। ইসরায়েল ১.১ মিলিয়ন গাজাবাসীকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, পক্ষান্তরে হামাস বাসিন্দাদের তাদের বাড়িতে থাকার
জন্য আহ্বান জানিয়েছে। বিমান আক্রমণের
ফলে ব্যাপক বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। ফলে হামাস ও ইসরায়েল পরষ্পরের বিরুদ্ধে
যুদ্ধাপরাধের অনেক অভিযোগ এনেছে। আন্তর্জাতিকভাবে,
অনেক জায়গায়
প্রতিবাদ সাব্যস্ত হচ্ছে এবং ঘৃণামূলক অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৬ সালে হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ
সংঘটিত হলেও ২০২২ এবং ২০২৩ সালের বেশিরভাগ সময় ইসরায়েলের সাথে হামাস বড়
ধরনের কোন আক্ৰমণে জড়ায়নি বরং
পরিবর্তে, তাঁরা বড় আক্রমণের জন্য গোপনে
প্রস্তুতি চালাচ্ছিলো বলে ধারণা করা
হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এই আক্ৰমণকে ‘অপারেশন আল-আকসা বন্যা” (বা প্রলয়) নামে অভিহিত করেছে এবং ইসরাইলিরা তাঁদের পাল্টা আক্রমণকে “অপারেশন সোর্ডস অফ আয়রন” নামে অভিহিত করেছে।
এই আক্রমণের ফলে সমগ্র বিশ্ব দুটি শিবিরে বিভক্ত হযেছে। কমপক্ষে চৌয়াল্লিশটি দেশ হামাসকে নিন্দা করেছে এবং এর
কৌশলপূর্ণ আক্রমণকে সন্ত্রাসবাদ
হিসাবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে মধ্য প্রাচ্যের কাতার, সৌদি
আরব, কুয়েত, সিরিয়া
এবং ইরাকের মতো দেশগুলি এই আক্রমণের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের
পর ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূমি দশকব্যাপী
দখল করে রাখার জন্য যুদ্ধ সংঘিটত হয়েছে বলে অনেক আরব রাষ্ট্র দাবি করছে। ৮ এবং
৯ অক্টোবর হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর
পাওয়া গেছে। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে এবং যুক্তরাজ্য ইসরাইলকে যুদ্ধ
জাহাজ এবং বিমান সরবরাহ করার কথা ঘোষণা করেছে। জার্মানিও ইসরায়েলকে
সামরিক সাহায্য সরবরাহ শুরু করবে বলে ঘোষণা করেছে।
পূর্ববর্তী প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পরে ফিলিস্তিনিদের এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত করবে কিনা, সে বিষয়ে বেশ কিছু সংবাদ সংস্থা এবং পর্যবেক্ষক জল্পনা-কল্পনা
শুরু করেছেন। অন্যরা এটিকে ১৯৭৩ সালে সংঘটিত
ইয়োম কিপপুর যুদ্ধের সাথে তুলনা করেছে, যা ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে
রমজান মাসে শুরু হয়েছিলো। ইয়োম কিপপুর যুদ্ধ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ
বা চতুর্থ
আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ নামেও পরিচিত। এই সশস্ত্র সংঘৰ্ষ ১৯৭৩ সালের ৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত
ইজিপ্ত ও সিরিযার নেতৃত্বে আরব রাষ্ট্রসমূহের মিত্রজোঁট এবং ইসরায়েলের মধ্যে
সংঘটিত হয়েছিলো।উভয় পক্ষের মধ্যে বেশিরভাগ যুদ্ধ ১৯৬৭ সালে ইসরাইল
দ্বারা দখলকৃত ভূমি সিনাই উপদ্বীপ এবং গোলান মালভূমিতে সংঘটিত হয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক এবং কর্মকর্তারা এই যুদ্ধকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্তেম্বরে আল কায়দার দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত
আত্মঘাতী আক্রমণের সাথে তুলনা করেছে।
মার্কিন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি
জে ব্লিঙ্কেন
বলেন যে, এটি ৯/১১
এর আক্রমণের চেয়েও দশগুণ ভয়াবহ আক্রমণ ছিল।
২০০৫ সালে গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করে। ২০০৭ সালে হামাস এবং ফাতাহ(ফাতাহ, ফিলিস্তিনের গেরিলা
সংগঠন ও রাজনৈতিক দল, যার নামের অর্থ আরবি ভাষায় "বিজয়"। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে ১৯৫৯ সালে ইয়াসির আরাফাত এবং
খলিল আল-ওয়াজির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ফাতাহ
ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ থেকে ফিলিস্তিনকে ছিনিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে গেরিলা যুদ্ধ
সংঘটিত করে এবং মাঝে মাঝে সন্ত্রাসবাদের
উপর নির্ভর করে। এটি অবশেষে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশনের মধ্যে সবচেয়ে
বড় দল হিসেবে গড়ে ওঠে এবং
বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলি স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। মূলত দলটি দামেস্কে অবস্থিত। ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলের সাথে
রাজনৈতিক চুক্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত দলটিকে বেশ কয়েকবার স্থানান্তর হতে বাধ্য করা
হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনি
কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ফাতাহ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের গভর্নিং
বডিতে আধিপত্য করে। ফিলিস্তিন আইন পরিষদের ২০০৬ সালের নির্বাচনে দলটি অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী
সংগঠন হামাসের কাছে পরাজিত হয়েছিল।)র
সাথে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই গৃহযুদ্ধে জয়লাভের পর হামাস গাজা
উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। তারপর
থেকে গাজা উপত্যকা মিশরীয় এবং ইসরায়েলি অবরোধের অধীনে রয়েছে।হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে
"উন্মুক্ত কারাগার" বলে অভিহিত করে এবং বলে যে "ইসরায়েলের গাজার উপর আরোপ করা সাধারণ নিষেধাজ্ঞা সমাপ্ত করে গাজা ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা
করার অনুমতি প্রদান করা উচিত"। এই অবরোধ
গাজার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অচলাবস্থা
সৃষ্টি করেছে। পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ইসরায়েলি
ইহুদি এবং তাদের সমর্থকদের দ্বারা ফিলিস্তিনিরা সহিংসতার শিকার
হযে আসছে। হামাস এই
সংহিংসতাকেও তাঁদের আক্রমণের কিছু
কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইসরায়েল বলেছে যে, ইসরায়েলি নাগরিকদের ফিলিস্তিনি সন্ত্রাস, রকেট হামলা এবং অন্যান্য শত্রুতামূলক কার্যকলাপ
থেকে রক্ষা এবং গাজায় অবৈধ পণ্যের সরবরাহ রোধ করার জন্য নিষেধাজ্ঞাটির প্রয়োজন রয়েছে। মিশরে হামসকে মুসলিম ব্ৰাদারহুডের সাথে
ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হিসাবে দেখা হয় এবং হামাসকে
তারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মনে করেন।
মুসলিম ব্রদারহুড একটি
আন্তর্জাতিক সুন্নি ইসলামিক সংগঠন। সংগঠনটি
মিশরে ইসলামিক পণ্ডিত এবং স্কুল শিক্ষক হাসান আল-বান্না দ্বারা ১৯২৮ সালে
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল-বান্নার শিক্ষা
মিশরের বাইরেও অন্যত্র ছড়িয়ে
পড়েছে, যা সম্প্ৰতি দাতব্য সংস্থা থেকে শুরু করে রাজনীতি ও বিভিন্ন ধরনের ইসলামিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে চলেছে।
৭ অক্টোবর-এর আক্রমণ সংঘটিত
করার পূৰ্বে সৌদি আরব উভয় দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আলোচনা চালিয়েছিলো। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সোলেমান
সম্প্রতি বলেছেন যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিককরণের জন্য বাস্তবসন্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত"। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে বলেছে, যে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে, গাজায় ইসরায়েলের চলমান দখলদারিত্ব
সহিংসতাকে আরও প্ররোচিত করবে। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল এবং হামাস কর্মকর্তাদের
মধ্যে উত্তেজনা কমাতে বন্ধ ক্রসিং পয়েন্ট পুনরায় চালু করার জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর কাতার, জাতিসংঘ
এবং মিশর মধ্যস্থতা করেছিলেন।
২০০০ সালের গোঁড়ার দিকে সামাজিক গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ
দলগুলির দ্বারা বিশেষত অসলো চুক্তির সময় ইতিজাক রাবিনের নেতৃত্বে ইসরায়েল
ফিলিস্তিনিদের সাথে শান্তি স্থাপনের
জন্য "শান্তি
শিবির"প্ৰতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
২০০০-২০০৫
সালে ইসরায়েল-অধিকৃত
ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ফিলিস্তিনি বিদ্রোহের ফলে শান্তি শিবির প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রধানত
ইসরায়েলি বেসামরিক ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করে ফিলিস্তিনিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা ছিল এই বিদ্রোহের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ক্যাম্প ডেভিড
শীৰ্ষ সন্মেলন(ক্যাম্প ডেভিড শীর্ষ সন্মেলন ছিল মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বিগিন কর্তৃক ১৯৭৮ সালের
১৭ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত রাজনৈতিক চুক্তি। ক্যাম্প ডেভিডের মেরিল্যান্ডে
বার দিন ব্যাপী গোপন আলোচনা চলার
পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হোয়াইট হাউসে চুক্তিটি
স্বক্ষরিত হয়েছিলো। এই
চুক্তির সাক্ষী ছিলেন আমেরিকার
রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার। এই
চুক্তির কারণে আনোয়ার
সাদাত এবং বেগিন যৌথভাবে ১৯৭৮ সালের নোবেল
শান্তি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। চুক্তিটি
ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে জাতিসংঘ
কর্তৃক চুক্তিটিকে নিন্দা করা হয়েছিল।)এর ব্যৰ্থতার উপর এই বিদ্ৰোহ কেন্দ্রীভূত
ছিলো বলে অনুমান করা হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছেন: ২০০০-এর দশকে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টা
শুরু হয়েছিল, তবে ফিলিস্তিনি সহিংসতার জন্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি বিরোধের
শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো।
২০২২ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি আইনসভা নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী
সরকার পরের মাসে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ক্ষমতা গ্ৰহণের পর নেতানিয়াহু সরকার ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের গতি বাড়িয়েছে এবং সেখানে বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের দ্বারা
ফিলিস্তিনিদের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শত শত ফিলিস্তিনি
বাস্তুচ্যুত হযেছে। এর ফলে জেরুজালেমের পবিত্র স্থান আল-আকসা
মসজিদের চারপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।২০২৩ সালে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের
মধ্যে কয়েকটি ছোটখাট সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে। এই সংঘর্ষের পূর্বে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন সেনা এবং অসামরিক
নাগিরক নিহত হয়েছিলো। ইসরাইলি বাহিনী দ্বারা ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি
নাগরিক এবং ফিলিস্তিনিদের দ্বারা ৩২ জন ইসরাইলি ও
দুই জন বিদেশী নাগরিক নিহত হয়েছিলো।
হামাস বলেছে, যে গাজার উপর
মিশরীয়-ইসরায়েল অবরোধ,
গাজায় ইহুদিদের ধারাবাহিক
বসতি স্থাপন, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে চলাচলে নিষেধাজ্ঞার
প্রতিক্রিয়ায় তারা এই আক্রমণ সংঘটিত করেছে। হামলার
পর, আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ বিশ্লেষক ব্রুস
হফম্যান ১৯৮৮ সালের হামাসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন
যে, হামাসের উদ্দেশ্য ছিলো গণহত্যা। তাদের শান্তির পথ
নির্মাণের কোন উদ্দেশ্য ছিল না। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালেস্টাইন স্টাডিজ
ফোরামের প্রধান এবং সাবেক ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলশটাইন
যুক্তি দিয়েছেন যে, আক্রমণগুলি ইসরায়েলকে নির্মূল করার
জন্য হামাসের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অংশ ছিল... এবং হামাস জিহাদ পরিত্যাগ করতে
প্রস্তুত নয়।
আক্রমণটি ইহুদিদের শব্বাতে সিমচাট তোরাহের ছুটির সময় সংঘটিত হয়েছে এবং ইয়োম কিপপুর যুদ্ধ শুরুর ৫০তম
বার্ষিকীর একদিন পরে
আশ্চর্যচকিত
আক্রমণের সাথে সংঘটিত হয়েছে।এর পর সংঘাত
ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হয়ে চলেছে। হয়েছিল।হামাসের সামরিক বাহিনীকে নির্মূল এবং গাজায় তাদের শাসনকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ৩,০০,০০০ জন আইডিএফ সেনা মোতায়েন করা
হয়েছে। আইডিএফ পশ্চিম তীরে লকডাউন আরোপ
করেছে।বিমান হামলা এবং রকেট হামলা দ্বারা ফিলিস্তিনিদের জনজীবন বিপর্যস্ত করার সাথে সাথে গাজা উপত্যকা কবরস্থানে
পরিণত করেছে।
ইসরাইল ও প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্ব – ভূমিকা
ইসরাইল ও ফিলিস্তিন দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের কাহিনী শুরু করার আগে আমাদের এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ভালোভাবে
বোঝাটা প্রাসংগিক হবে। এর পরই আমরা এই দুই দেশের মধ্যে চলমান এই দীর্ঘ দ্বন্দ্বকে ভালোভাবে বুঝতে
পারব।
প্রকৃতপক্ষে, ইসরাইল অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ। ইসরাইলের মোট মাটিকালি ২২,১৪৫ বর্গ কিলোমিটার(৮,৬৩০ বর্গ মাইল)। এর ২১,৬৭১ বর্গ কিলোমিটার স্থলভাগ। বাকী অংশ জল।কোন
কোন অঞ্চলে দৈর্ঘ ৪২০ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১১৫
কিলোমিটার। জন সংখ্যা ২০২৩
সালের জন গণনা অনুসারে ৯১,৭৪,৫২০ জন।ইসরায়েলের উত্তরে লেবানন এবং
দক্ষিণে মিশর অবস্থিত।উত্তর-পূৰ্বে সিরিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে জর্ডান, দক্ষিণ-পশ্চিমে ইজিপ্ত, পশ্চিমে ভূমধ্য সাগর। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন।
ইসলাম ধর্মমতে এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের কথা বলা হয়
যদিও আমরা আল্লামা ইবনে কাছীর(রহঃ)রচিত কাসাসুল আম্বিয়ার তথ্য অনুসারে হজরত মোহাম্মদ(সাঃ)এর বাইরে আর মাত্র
পঁচিশ জন পয়গম্বরের নাম উল্লেখ দেখতে পাই। এই পঁচিশ জনের মধ্যে প্রথম
পয়গম্বর ছিলেন হজরত আদম(আঃ। হজরত আদম(আঃ) এর পর হজরত ইদ্রিস(আঃ),হজরত
নূহ (আঃ),হজরত হূদ (আঃ), হজরত সালেহ(আঃ),হজরত ইব্রাহীম(আব্রাহাম)(আঃ), হজরত লুত(আঃ),
হজরত ইসমাইল(আঃ),হজরত ইসহাক(আঃ),হজরত ইয়াকূব(আঃ),হজরত ইউসুফ(জোসেফ) (আঃ),হজরত আয়ূব(জুব)(আঃ),হজরত
সোয়াইব(জেথ্রু)(আঃ),হজরত ইউনূস(আঃ), হজরত মুসা(মোসেস)(আঃ) (আঃ),হজরত হারুন(আঃ),হজরত
ইলিয়াস (আঃ), হজরত শামভীল(আঃ), হজরত দাউদ(ডেভিড)(আঃ),হজরত সোলায়মান(আঃ),হজরত আল
ইয়াসা(আঃ), হজরত উযায়ের(আঃ), হজরত জাকারিয়া(আঃ),হজরত ইয়াহিয়া(আঃ),হজরত ইসা(আঃ) এবং
সর্বেশষ পয়গম্বর হজরত মহম্মদ(সাঃ)।
ইহুদি ধর্ম হজরত ইব্রাহীম(আব্রাহাম)(আঃ))থেকে শুরু হয়েছিলো। হজরত ইব্রাহীম-এর উত্তর পুরুষ হজরত দাউদ (আঃ)এর পুত্র সোলায়মান(আঃ)ও
আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন। সম্প্রতি যেখানে মসজিদ-আল-আকসা রয়েছে সেখানে আল্লাহর
উপাসনার জন্য দাউদ আঃ (ডেভিড)একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন এবং মসজিদটি
নির্মাণের কাজ দাউদ(আঃ)এর পুত্র সোলেমান(আঃ)সম্পূর্ণ করেছিলেন। মসজিদটি নির্মাণ
করার জন্য তিনি জ্বীনের সহায় নিয়েছিলেন।এই মসজিদটিকে ইহুদিরা
হেকল-এ-সোলেমানী হিসাবে উল্লেখ করেন।এটাই বিশ্বের প্রথম মসজিদ হিসাবে পরিচিত।৫৮৬ খ্রীষ্টপূর্বে বেবীলনীয় সম্রাট বখত-ই-নসর মসজিদটি শহীদ
করেছিলেন।শহীদ করার পরে মসজিদটি আবার নির্মাণ করা হযেছিলো। এটি
দ্বিতীয় মসজিদ হিসাবে জনাজাত।৭০ খ্রীষ্টাব্দে রোমান সম্রাট শাহ টাইটাস আবার মসজিদটি শ্বহীদ করে। এর পরে আর
মসজিদটি নির্মাণ করা হয়নি। মসজিদটির শুধু একটা দেয়াল
অবশিষ্ট রয়েছে। দেয়ালটি ‘ওয়েষ্টার্ণ ওয়াল’ নামে পরিচিত। এই দেয়ালের
পাশে গিয়ে ইহুদিরা উপাসনা করেন। ইহুদিরা
সম্প্রতি মসজিদ-আল-আকসা শহীদ করে হেকল-এ-সোলেমানী আবার নির্মাণ করার
জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
হজরত আব্রাহাম(আঃ)এর দুই বিবি ছিলেন। হজরত
হাজেরা ও হজরত সারা। হজরত হাজেরার সন্তান হজরত ইসমাইল(আঃ)। হজরত ইসমাইল(আঃ)-এর জন্ম মক্কায়। হজরত সারার সন্তান হজরত ইসহাক(আঃ)। জন্ম
জেরুজালেমে। হজরত ইসহাক (আঃ)এর পুত্র হজরত ইয়াকুব(আঃ)। হজরত
ইয়াকুব (আঃ)এর ১২ জন সন্তান ছিলেন। এই বারজন সন্তানের একজনের
নাম ছিলো জুডাহ। জুডাহ ইয়াহুদা
নামেও পরিচিত ছিলেন। ইয়াহুদার সন্তানদেরই ইহুদি বলা হয়।
ইসরাইল, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া প্রভৃতি ভূ-খণ্ডকে সামগ্রিকভাবে লেভান্ত বলা হয়। দক্ষিণ লেভান্তের একটি এলাকার ঐতিহ্যবাহী ইহুদি নাম ইসরাইল। ইসরাইলের নাম বাইবেল এবং ঐতিহাসিক ইংরেজি পদগুলির মধ্যে কেনান ভূমি, প্রতিশ্রুত ভূমি(প্রতিশ্রুত ভূমি হল
মধ্যপ্রাচ্যের ভূমি)হিসেবে পরিচিত। এই ভূমি দুধ ও মধুর দেশ হিসাবেও পরিচিত। আব্রাহামিক
ধর্মগুলো দাবি করেন যে, ঈশ্বর আব্রাহামকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন- "তোমার দেশ, তোমার
প্রজা ও তোমার পিতার পরিবার পরিত্যাগ কর এবং আমি তোমাকে যে দেশ দেখাব সেই দেশে চলে
যাও।" সেই দিন ঈশ্বর আব্রাহামের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন
এবং বলেছিলেন, "আমি
মিশরের ওয়াদি(প্ৰাচীন ইজিপ্তের উল্লেখযোগ্য
ভূমি।কাইরো
থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত) থেকে মহান নদী ইউফ্রেটিস পর্যন্ত তোমার বংশধরদের দেশ
দিচ্ছি। এবং পরেও তাঁর বংশধরদের আরও কয়েকবার এই একই প্রতিশ্রুতি
দিয়েছিলেন।আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইহুদি জনগণের জন্য ইসরাইল তাঁদের স্বদেশ এবং তাঁদের
পরিত্রাণ ও মুক্তির ধারণাকে চিহ্নিত করে। এই পবিত্র ভূমি প্যালেস্টিন হিসাবে উল্লেখ রয়েছে।
ইহুদি ধর্ম বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মগুলির মধ্যে একটি এবং
বিশ্বের প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসাবে বিবেচিত। এটি ইসরায়েল এবং হিব্রু ভাষাভাষীদের রাষ্ট্র ধর্ম। এই ধর্মে ঈশ্বর ও তাঁর
নবীর প্রতি বিশ্বাস প্রধান। তানাখ(হিব্রু বাইবেল, ইহুদিদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ) তালমুদ(ইহুদিদের
পরম্পরার সংগ্রহ) এবং মিদ্রাশ(ইহুদি ধর্মের দর্শন সংকলন)প্রভৃতি ইহুদিদের ধর্মীয়
গ্রন্থের মধ্যে বিশিষ্ট গ্রন্থ। ইহুদিরা বিশ্বাস করে, যে এগুলো মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় থেকেই
বিদ্যমান। ইহুদিদের ধর্মীয় স্থানকে মন্দির এবং প্রার্থনার স্থানকে সিনাগগ বলা
হয়। এই ঐতিহ্য ও আদর্শ খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই একে আব্রাহামিক ধর্মও বলা হয়।
জুডাহর সম্ৰাট জেহুইয়াকিম
এক সময় ব্যাবিলনের নিকট নতি স্বীকার করে কর পরিশোধ করতে সন্মত হয়েছিলেন। জুডাহর
সর্বেশষ সম্রাট জেডাকিয়াহ ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুছানেজ্জার-দ্বিতীয়কে সেই কর
পরিশোধ করতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলস্বরূপ, নেবুছানেচ্ছার-দ্বিতীয় জুডাহের বিরুদ্ধে ৫৯৭
অথবা ৫৮৬ খ্ৰীষ্টপূৰ্বাব্দে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং সেই যুদ্ধে নেবুছানেচ্ছার-দ্বিতীয় জেরুজালেম দখল করে ইহুদি জনগণকে জোরপূর্বক তাদের মাতৃভূমি
থেকে বন্দী অবস্থায় ব্যাবিলনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
পাৰ্চীয়ান সম্ৰাট চাইরাচ ৫৩৮ খ্ৰীষ্টপূৰ্বাব্দে তাদের নির্বাসন থেকে মুক্ত করে দেওয়ার পর তারা ব্যাবিলনীয়
নির্বাসন থেকে ফিরে আসে এবং ফিরে আসার
পর ইসরায়েলি সম্প্রদায় প্রধানত জেরুজালেম এবং এর আশেপাশের জুডাহ নামক অঞ্চলে
বসতি স্থাপন করে। আগেই বলা
হয়েছে, হজরত ইয়াকুবের এক সন্তানের নাম ছিলো 'জুডাহ'। জুডাহ, ইয়াহুদা নামেও পরিচিত ছিলেন, তাই ইস্রায়েলীয়দের এই ধর্মীয় ও সামাজিক
সংগঠনকে ইহুদি ধর্ম বলা হয়।
ইহুদিরা ব্যাবিলনীয় নির্বাসন থেকে ফিরে আসার
পর জেরুজালেমের মন্দির ইহুদি
ধর্মের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং খ্রিস্টের আগমন হবে বলে ইহুদিরা আশাবাদী ছিল।
এমনকি নির্বাসনের আগে এবং নির্বাসনের সময়, নবী ইশাইয়া, জেরেমিয়া, ইজেকিয়েল এবং ড্যানিয়েল এই ইহুদি ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।তাঁরা
ইহুদিদের নিকট বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদী ধর্ম প্রচার করেছিলেন এবং শিখিয়েছিলেন যে,
ইহুদিদের যারা নির্বাসন থেকে ফিলিস্তিনে ফিরে এসেছে তারা আবার নতুন করে পূর্ণ
উদ্যমের সাথে ঈশ্বরের আইন অনুসরণ করবে এবং খ্রিস্টের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে।
নির্বাসনের পর এজরা, নেহেমিয়া, অ্যাডেস, জাকারিয়াস এবং মালাচি এই ধর্মীয় নবজাগরণের নেতা ছিলেন। ৫৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলন থেকে ৪০,০০০
জনের প্রথম কাফেলা জেরুজালেমে ফিরে আসে এবং তারা মন্দির এবং
দেয়াল সংস্কার করে। পরে আরও কাফেলা ফিরে আসে। জুডাহর সেই ইস্রায়েলীয়রা
নিজেদেরকে তখন ঈশ্বরের প্রজা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। অনেক ইহুদি, যারা
ব্যাবিলনে ধনী হয়েছিলেন, তারা সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। তবুও জুডাহ জেরুজালেম, ব্যাবিলন এবং অন্যান্য দেশের প্রবাসী
ইহুদিদের আসল কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো এবং জুডাহর ইহুদিরা নিজেদের তাদের অন্যান্য
ইহুদিদের নেতা হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলো।
যে কোন রকমের মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা এবং অন্যান্য
ধর্মের সাথে সমন্বয়বাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা হলো ইহুদি ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেই সময় ইহুদিদের কোন রাজা ছিলেন
না। ফলে তখন ইহুদি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে শাসন করতেন প্রধান যাজকরা। প্রকৃতপক্ষে, ইয়াহওয়েহ (ঈশ্বর) ছিলেন ইহুদিদের রাজা
এবং বাইবেল থেকে সংগৃহীত মোজেস(মুসা)এর ধর্মীয় বিধান ছিলো সমগ্র ইহুদি জাতির ধর্মীয় ও নাগরিক
জীবনের সংবিধান। এই শর্তে অ-ইহুদিরা এই সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পারতেন, যারা ইয়াহুদার ধর্ম এবং
মূসার নিয়ম মেনে চলতে সন্মত হতেন। এটা বিশ্বাস করা হয়েছিল যে, যখন যীশুখ্রীস্ট আসবেন, তখন সমস্ত মানবজাতি তাঁর রাজ্যের
অন্তর্ভুক্ত হবে।
গ্ৰীক সম্রাট অ্যান্টিওকাস-চতুর্থ (১৭৫-১৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)এর আগে পর্যন্ত ইহুদি ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে অব্যাহত ছিল, কিন্তু এই সম্রাট অ্যান্টিওকাস-চতুর্থ ইহুদিদের উপর গ্রীক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা
করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ ইহুদিদের
গেরিলা নেতা ম্যাকাবেউসের
নেতৃত্বে ইহুদিরা এই কাৰ্যের বিরোধিতা করেছিলেন।
সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ইহুদিদের বিশ্বাস
ইহুদি বিশ্বাস অনুসারে, ঈশ্বর এক এবং তাঁর কোন অবতার বা স্বরূপ নেই, তবে তিনি বার্তাবাহকদের মাধ্যমে তাঁর নিজের বার্তা প্রেরণ করেন।
খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম ধৰ্মও এই বিশ্বাসের ভিত্তির উপর
প্ৰতিষ্ঠিত, তবে ইসলাম-এ
ঈশ্বরের নিরাকারের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ইহুদিদের মতে, মুসাকে ঈশ্বরের বার্তা লিখিত (তানাখ) এবং মৌখিক আকারে বিশ্বে ছড়িয়ে
দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইয়াহুদা ইস্রায়েলের লোকদের এক ঈশ্বরের উপাসনা
করার জন্য আদেশ প্রদান করেছিলেন।
ধর্মগ্রন্থ
ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলি বিভিন্ন লেখক দ্বারা কয়েক শতাব্দী
ধরে লিখা হয়েছিল। এগুলো মূলত ইব্রানী(ইব্রানী ভাষা সামী-হামী ভাষা পরিবারের সামী
শাখার ভাষা থেকে উদ্ভূত ভাষা। এই ভাষা ইসরাইলিদের মুখ্য
এবং রাষ্ট্রভাষা) ও আরামাইক(আরমাইক এক ঐতিহাসিক ভাষা। যা
মধ্য-পূর্ব এবং তার উত্তরের কেন্দ্রীয় ভাগে গত ৩০০০
বছর ধরে প্রচলন হয়ে আসছে।এই ভাষা প্রাচীন ইহুদি তথা
খ্রীষ্টান ধর্মগ্রন্থের ভাষা। কথিত রয়েছে, আরমাইক যীশুখ্রীষ্টের
মাতৃভাষা ছিলো।
এই ধর্মীয় গ্রন্থগুলি হল তানাখ, তালমুদ এবং মিদ্রাশ। এগুলো ছাড়াও সিদ্দুর,
হালাখা, কাব্বালা ইত্যাদিও ইহুদিদের ধর্মীয়
গ্রন্থের অন্তর্গত।
নূহ নবী- হজরত আদম(আঃ)এর পর নূহই হলেন প্রথম ব্যক্তি যাঁকে নবুওয়তের সন্মানে ভূষিত
করা হয়েছিলো। সহীহ মুসলিম শরিফের শাফাআত অধ্যায়ে হজরত আবু হোরায়রা
থেকে বৰ্ণিত একটি দীৰ্ঘ বৰ্ণনা রয়েছে। সেখান এক স্থানে বলা হয়েছে ‘হে নূহ তুমি হচ্ছো পৃথিবীতে প্ৰথম রাসুল।‘ ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তাওরাত অনুসারে, আল্লাহর নির্দেশে হজরত নূহ বন্যার সময়
একটি বিশাল জাহাজ তৈরি করেছিলেন এবং তাতে তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন।
ইব্রাহীম (আব্রাহাম) (আঃ)- ইহুদি, ইসলাম এবং খ্রিস্টান এই তিনটি ধর্মের জনক হিসেবে আব্রাহাম
(আঃ)কে বিবেচনা করা হয়। তাওরাত গ্রন্থ অনুসারে, আব্রাহাম তাঁর
ইব্রানী (হিব্রু) গোত্রের সাথে আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্যের উর অঞ্চলে প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বসবাস করতেন। যেখানে প্রচলিত মূর্তি
পূজার জন্য ব্যথিত হয়ে তিনি তার গোত্র নিয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে দীর্ঘ যাত্রা শুরু
করেছিলেন।
জর্ডান নদী উপত্যকার অঞ্চলে পৌঁছানোর পর ইব্রাহীম(আঃ)
প্রথম ইসরায়েলি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী, কেনান অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে হিব্রুরা সমৃদ্ধ মিশরে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মূসা- মুসা (আঃ)এর জন্ম মিশরের গোশেন শহরে। ইহুদি ইতিহাস অনুসারে, তিনি হিব্রুদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং
মিশরের ৪০০ বছরের দাসত্ব থেকে তাঁদের মুক্ত করেছিলেন। মুক্ত
করার পর তিনি তাঁদের নিয়ে কেনান
দেশে এসেছিলেন। মূসা(আঃ)কে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের মধ্যে
তাওরাতের রচিয়তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তিনিই ঈশ্বরের দশটি আইন ও ব্যবস্থা
হিব্রুদের জন্য প্রদান করেছিলেন।তানাখের মতে, রামসেস- দ্বিতীয়(রামসেস-দ্বিতীয় বা রামসেস মহান প্রাচীন মিশর
সাম্রাজ্যের উন্নিশতম বংশের তৃতীয় ফেরো ছিলেন তিনি নিজের যুদ্ধনীতি এবং সফল
অভিযানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন)এর রাজত্বকালে খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ সালের দিকে মূসা মিশরে বাস করতেন।
ইহুদিদের ধর্মমত- ইহুদিরা মৃত্যুর পরের দুনিয়ায় বিশ্বাস
করেন না। তাঁদের মতে, সব
মানুষের ইহুদি হওয়াটা জরুরি নয়। ইহুদি দর্শনে, বর্তমানকে
গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পূর্ণভাবে বেঁচে থাকাটাকে প্রয়োজন বলে মনে
করা হয়। ঈশ্বর সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী পাঠিয়েছেন। ইহুদিদের ধর্মমতে,
নিজেদের হাতে বানানো মূর্তিকে ভগবান বলে পূজা করাটা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রকৃত
ধর্ম হলো, নিজের সমস্ত কর্তব্য ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ করা এবং ধর্মীয় নির্দেশ
নিষ্ঠার সাথে পালন করা। ইহুদি ধর্ম কোন নির্দিষ্ট পাপকে স্বীকৃতি দেয় না।
ইহুদি ধর্মের মূলনীতি
ইহুদি ধর্ম এবং দর্শন নিম্নলিখিত মৌলিক নীতিগুলির উপর
আধারিত বলে বাইবেলের প্রথমার্ধে বর্ণনা করা হয়েছে-
(১)এক সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। ঈশ্বর
ইসরায়েল এবং অন্যান্য জাতির উপর শাসন করেন। ঈশ্বর পৃথিবীর ইতিহাস এবং
ঘটনার স্থপতি। তিনি পবিত্র এবং তিনি তাঁর অনুসারিদের পাপ পরিহার করে পবিত্র জীবন যাপনের
জন্য দাবি জানান। ঈশ্বর একজন ন্যায়পরায়ণ এবং নিরপেক্ষ বিচারক। তিনি দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তি প্রদান করেন এবং ভাল লোকেদের পুরস্কৃত করেন। তিনি করুণাময় এবং অনুতাপের পর তিনি তাঁর অনুসারিদের
পাপ মোচন করেন।
(২) ইব্রাহীম(আঃ) এবং তাঁর মহান বংশধরদের নিকট ঈশ্বর নিজেকে
প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁদের শিখিয়েছেন যে, তিনি স্বর্গ, পৃথিবী এবং সমস্ত কিছুর স্রষ্টা। সৃষ্টি ঈশ্বরের বৈচিত্র নয়, কারণ সৃষ্টি ঈশ্বরের
অস্তিত্ব থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বহির্জাগতিক ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছায় সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
ইহুদিরা স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে করেন।
(৩)ঈশ্বর সমগ্র মানব জাতির পরিত্রাণের জন্য তাঁর বিধান প্রকাশ
করার লক্ষ্যে ইহুদি জাতিকে বেছে নিয়েছেন। ইব্রাহীম (আঃ)থেকে এই গোত্রের শুরু
হযেছে।
(৪)যীশু খ্রিস্টের আগমন ইহুদি জাতির জন্য ভবিষ্যত ঐতিহাসিক বিকাশের
চূড়ান্ত পরিণতি হবে। যীশুখ্রীষ্ট সারা পৃথিবীতে ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন
এবং যীশুখ্রীষ্টের মাধ্যমে ঈশ্বর ইহুদি জাতির প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।
কিন্তু যীশুখ্রিস্ট কখন এবং কোথায় আবির্ভূত হবেন, সে বিষয়ে বাইবেলের প্রথমার্ধে কোথাও স্পষ্ট উল্লেখ নেই।
(৫)মোজেস(মুসা)এর বিধান ছিল ইহুদিদের আচার-আচরণ এবং আচার-অনুষ্ঠানের
মানদণ্ড নিরূপণ, কিন্তু ইহুদিদের ইতিহাসে এমন এক সময় এসেছিলো, যখন তারা মোজেসের বিধানগুলিকে উপেক্ষা করতে শুরু করেছিলো। ঈশ্বর ও তাঁর আইনের প্রতি ইহুদিদের এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণে, ইহুদিদের ব্যাবিলনে নির্বাসনের শাস্তি ভোগ
করতে হয়েছিল। অবশ্যে তখনও অনেক ইহুদি প্রার্থনা, উপবাস এবং
দানের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের প্রকৃত ভক্তি প্রমাণ করেছিলেন।
(৬)ইহুদি ধর্মের উপাসনা জেরুজালেমের মহান উপাসনাগৃহে
কেন্দ্রীভূত ছিল। সেই উপাসনাগৃহের সেবা ও প্রশাসনের জন্য পুরোহিতদের একটি
শ্রেণিবদ্ধ সংগঠন তৈরি করা হয়েছিল। ইহুদিদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, ঈশ্বর
বিশেষভাবে জেরুজালেমের উপাসনাগৃহে উপস্থিত ছিলেন এবং ফলে তাঁরা সকলেই সেই উপাসনাগৃহে
তীর্থযাত্রা করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা ঈশ্বরের সামনে উপস্থিত হয়ে ঈশ্বরের প্রতি তাদের
হৃদয়ের আবেদন প্রকাশ করতে পারে। উপাসনা গৃহে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং
উৎসব ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের জন্য আনন্দ বইয়ে নিয়ে আসত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্বাসনের পর, ইহুদিরা বিভিন্ন স্থানীয় উপাসনাগৃহে ঈশ্বরের উপাসনা শুরু
করেছিলেন।
(৭)শুরু থেকেই কিছু ইহুদি এবং পরে মুসলমানরা বাইবেলের
প্রথমার্ধে উপস্থাপিত ধর্ম ও দর্শনকে তাঁদের নিজস্ব মত অনুসারে ব্যাখ্যা করেছেন। খ্রিস্টানরা
বিশ্বাস করেন যে, যীশুই হলেন বাইবেলে প্রতিশ্রুত মসীহ, কিন্তু যীশুখ্ৰীষ্টের সময়ে অনেক ইহুদি যীশুকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজও ইহুদি
ধর্মের অনুসারীরা সত্যিকারের মসীহের জন্য অপেক্ষা করে
চলেছে। সেন্ট পলের মতে, ইহুদি জাতি এক পর্যায়ে যীশুকে মসীহ হিসেবে
মেনে নেবেন।
ইহুদিদের উৎসব-
ইয়োম কিপ্পুর- ইয়োম কিপ্পু ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসী লোকদের একটি প্রধান উৎসব। এই দিনটিতে মুসা ১০
টি আদেশ নিয়ে কোহেতুর থেকে নেমে এসেছিলেন এবং তখন তাঁর গোত্র
ইস্রায়েল তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। ইয়োম কিপ্পুর ইহুদিদের প্রায়শ্চিত্তের
দিন এবং ইহুদিদের জন্য বছরের সবচেয়ে পবিত্র দিন হিসাবে
পরিচিত। এই দিনে ইহুদিরা
ঐতিহ্যগতভাবে ঈশ্বর এবং মানুষের কাছে করা
অন্যায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
শুক্কেহ- ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি উৎসব।
হুনক্কা-ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি উৎসব।
পুরীম- ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি প্রমুখ উৎসব।
রৌশন-শানাহ- ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি উৎসব।
পাসয়োবর- ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি উৎসব।
টেম্পল মাউণ্ট- পুরাতন জেরুজালেমে অবস্থিত একটি পর্বত। এটি একটি
গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা হাজার হাজার বছর ধরে এখানে উপাসনা করে
আসছেন।
ফিলিস্তিন
পশ্চিম তীর- ফিলিস্তিনের ভূমিভাগ দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম তীর
ও গাজা পট্টি। পশ্চিম তীরের মাটিকালি ৫৮৬০
বর্গকিলোমিটার। এর ২২০ বর্গ কিলোমিটার জলভাগ। পশ্চিম তীর ভুমধ্য সাগরের তীরে অবস্থিত। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের পূবে জর্ডান নদী, উত্তরে ইসরাইলের
কিছু অংশ এবং লেবাবন, পশ্চিমে ভূমধ্য সাগর, দক্ষিণে আকাবা উপসাগর।
ফিলিস্তিনের ভূমিভাগ বিতর্কিত।পশ্চিম তীর হল পশ্চিম এশিয়ার
একটি স্থলবেষ্টিত অঞ্চল। অঞ্চলটি লেভানরানের নিকটবর্তী ও এশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল। এর
পূর্বে জর্ডান ও মৃত সাগর এবং দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তরে ইসরায়েলর দ্বারা সীমানাযুক্ত।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের
পর থেকে এই অঞ্চল ইসরায়েলি সামরিক দখলের অধীনে রয়েছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৫ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে, এই এলাকা ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অথরিটি (PNA)
দ্বারা ১৬৫টি ফিলিস্তিনি ছিটমহলে বিভক্ত করা হয়েছে এবং এই এলেকা মোট
বা আংশিকভাবে ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অথরিটির বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে রয়েছে। পূর্ব জেরুজালেম
এই পশ্চিম তীরের অন্তর্ভুক্ত।জনসংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য অনুসারে ২৯,৪৯,২৪৬ জন। এই এলাকায় ২৩০টি ইসরায়েলি বসতিপ্রধান এলাকা রয়েছে। পশ্চিম
তীরের ভূখণ্ডের প্রায় ৬১ শতাংশ এই এলেকার অন্তর্ভূক্ত। পূর্ব জেরুজালেম ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত এলাকায় ইসরায়েলি
বসতি রয়েছে এবং ৯৯% এরও বেশি এলাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য আংশিক বা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। এলাকাটি ১৯৯৫ সালের অসলো-২ চূড়ান্ত চুক্তির অধীনে জমি অদলবদলের মধ্যমে "ধীরে
ধীরে ফিলিস্তিনের এখতিয়ারে স্থানান্তরিত" করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল।কিন্তু
বাস্তবে এই ধরনের স্থানান্তর ঘটেনি। এই এলেকা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলে
ইসরাইলি জনসংখ্যা ৬,৭০,০০০ জন।
গাজা স্ট্রিপ-গাজা
স্ট্রিপ সহজভাবে গাজাপট্টি ভূমধ্য সাগরের পূর্ব
উপকূলবর্তী এক সংকীর্ণ ভূমি।মাটিকালি মাত্র ৩৬৫
বর্গকিলোমিটার। এর পূর্ব ও উত্তরে ইসরাইল
এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর। জন সংখ্যা ২,২০,০০০ জন। গাজা বিশ্বের শীর্ষ-স্তরের রাজনৈতিক ইউনিট হিসাবে বিবেচিত
এবং বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ
অঞ্চল। পশ্চিম তীর এবং গাজাপট্টি এই দুই অঞ্চল মিলে সামগ্রিকভাবে ফিলিস্তিন
হিসাবে পরিচিত। ২০০৭ সাল থেকে, গাজা উপত্যকা ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী(!) হামাসের শাসনের অধীনে রয়েছে। হামাস গাজাপট্টিতে
প্রকৃতপক্ষে এক-দলীয় রাষ্ট্র হিসাবে শাসন করে
আসছেন।
১৯৪৮
সালে সংঘটিত ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাতের
সময় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দ্বারা কয়েক ডজন গণহত্যা সংঘটিত
করা
হয়েছিল এবং ৪০০ থেকে ৬০০ ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছিল।বিতাড়িত ফিলিস্তিনি
উদ্বাস্তুদের ফিরে যেতে বাধা দেওয়ার জন্য জৈবিক যুদ্ধের কর্মসূচি হিসেবে গ্রামের
কূপগুলিকে বিষাক্ত করা হয়েছিল এবং সম্পত্তি লুট করা হয়েছিল। ১৯৪৭-১৯৪৮
সালের
এই গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় ২,৫০,০০০
থেকে ৩,০০,০০০ ফিলিস্তিনি
পালিয়ে গিয়েছিলো অথবা বহিষ্কৃত করা হয়েছিলো। ফলে পলাতক ও বিতাড়িত ফিলিস্তিনিরা গাজায় শরণার্থী হিসাবে
বসতি স্থাপন করে। মে মাসে ইসরায়েলিদের স্বাধীনতা ঘোষণার আগে ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আরব-ইসরায়েল
এই যুদ্ধের পর গাজা স্ট্রিপ মিশরীয় অধিকৃত অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত হয়।
১৯৫৬
সালে আবার তিরান প্রণালী নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যা সুয়েজ সংকট নামে
পরিচিত। ইসরায়েলি
শিপিংয়ের জন্য মিশর মিশরীয় সামুদ্রিক যাত্রাপথ বন্ধ করে দিয়েছিলো।ফলে ইসরায়েল
মিশর আক্রমণ করে।
তখন জাতিসংঘ ইসরায়েলের পাশাপাশি মিশর-ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর জরুরি বাহিনী (UNEF) মোতায়েন করে। .শেষ পর্যন্ত তিরান প্রণালী পুনরায় চালু করা হয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সময় ইসরায়েল গাজা
উপত্যকা দখল করে। এই দখলদারিত্বের সময় ৯৩০ থেকে ১২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, বিশেষ করে খান ইউনিস এবং রাফাহ
গণহত্যার ফলে। গাজা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১% লোক ইসরায়েল সেনা দ্বারা হয় নিহত, আহত, নির্যাতিত বা
কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার চাপের পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে সেনা
প্রত্যাহার করে।
১৯৬৭ সালের মে মাসে,
মিশরীয় রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের ঘোষণা করেন যে, তিরান প্রণালী
আবারও ইসরায়েলি জাহাজের জন্য বন্ধ করা হবে। এই ঘোষণার পর তিনি
ইসরায়েলের সাথে সংলগ্ন মিশরীয় সীমান্তে সামরিক বাহিনীকে প্রতিরক্ষামূলক লাইনে
সংগঠিত করেন এবং অবিলম্বে সমস্ত ইউএনইএফ(ইউনাটেড ন্যাশন ইমার্জেন্সি ফোর্স) কর্মীদের
প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। ১৯৬৭
সালের
জুন মাসের ৫
থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ইসরায়েল এবং আরব রাষ্ট্রগুলির জোট(প্রাথমিকভাবে মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডান)এর মধ্যে তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ সংঘটিত হয়।এই যুদ্ধ ছয়দিনের যুদ্ধ হিসেবে জনাজাত।এই যুদ্ধে
ইসরায়েল সিনাই, গোলান
হাইটস এবং পশ্চিম তীর সহ গাজা উপত্যকা দখল করে। এই ছয় দিনের যুদ্ধের পর এই অঞ্চলটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের দখলে ছিলো।এর মাঝে পিএলও
কর্তৃপক্ষ এবং ইসরাইলের মাঝে দুই দফা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।প্রথম দফা নরওযের ওসলোতে পিএলও কর্তৃপক্ষ এবং ইসরাইলের মধ্যে গোপন বৈঠকের পর ১৯৯৩ সালে ওযাশিংটন ডিচিতে এবং দ্বিতীয় দফা ২০০৫
সালে মিশরের টাবা সহরে।অসলো
চুক্তির অংশ হিসাবে ২০০৫ সালে ইসরাইল গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা
প্রত্যাহার করে এবং ২০০৬ সালে হামাস ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে। ২০০৭ সালে হামাস ও ফাতাহের মধ্যে একটি গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং
উক্ত গৃহযুদ্ধের পর হামাস গাজার ওপড় নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। হামাস
গাজা উপত্যকা দখলের পর মিসরের সমৰ্থনে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় ব্যাপক অবরোধ আরোপ
করে।এই
অবরোধের ফলে গাজার অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানব অধিকার গোষ্ঠীগুলি এই অবরোধকে সম্মিলিত শাস্তির একটি রূপ
হিসাবে ঘোষণা করেছে।
ইসরায়েল অস্ত্র-শস্ত্ৰ এবং দ্বৈত-ব্যবহারের পণ্যগুলিকে গাজা ভূখণ্ডে প্রবেশ করা
থেকে বিরত রাখার জন্য এই অবরোধ
সক্রিয় করে রেখেছে। ফলে ২০০৬ সাল থেকে হামাস
এবং ইসরায়েলর
মধ্যে পাঁচটি যুদ্ধ সংঘটিত
হয়েছে। সাম্প্রতিক ২০২৩ সালে হামাস ইসরাইলের ওপড় রকেট উৎক্ষেপনের ফলে আবার
যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে।
১৯৯০-এর দশকের অসলো চুক্তির অংশ হিসাবে ইসরায়েলি বসতিগুলির
পাশাপাশি গাজাপট্টির ইসরাইলি বসতিপ্ৰধান বেশিরভাগ এলাকার প্রশাসন ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের
কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। চুক্তির শর্ত সাপেক্ষে কিছু এলাকার ইসরাইলি বসতি ২০০৫ সালে খালিও করা হয়েছিল।
২০০৬
সালের ২৫ জুন-এ ফিলিস্তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত সাত বা আট জনের একটি গাজান সশস্ত্র বাহিনী
কেরাম শালোম ক্রসিংয়ের কাছে গাজা আন্তর্জাতিক সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে অ্যাটাক
টানেলে(ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অনুমান অনুসারে
গাজা উপত্যকা জুড়ে ৩০০ মাইল বিস্তৃত ১,৩০০টি টানেল রয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী
নেটওয়ার্কটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়াৰ্ক হিসেবে বর্ণনা
করে। গাজা উপত্যকায় বিদ্যমান এই টানেলগুলো চোরাচালান এবং যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় বলে ধারণা করা
হয়।
এতে
বলা হয়েছে, গাজার হাসপাতালের নিচে ভূগর্ভস্থ
বাঙ্কার রয়েছে। তবে, ফিলিস্তিনি চিকিৎসকরা
বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।)র মাধ্যমে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস(আইডিএফ)এর অবস্থানগুলিতে আক্রমণ করে। এই হামলায়, দুইজন আইডিএফ
সৈন্য এবং দুইজন ফিলিস্তিনি জঙ্গি নিহত হয়। চারজন আইডিএফ সৈন্য আহত হয় এবং গিলাদ শালিত নামক একজন আহত
সৈন্যকে বন্দী করে গাজা উপত্যকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ফিলিস্তিনি জঙ্গীরা গিলাদ শালিদকে বন্দি করে নিয়ে যাওযার
জন্য গাজা উপত্যকায় ২০০৬ সালের ২৮ জুন থেকে ফিলিস্তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা
বাহিনী (IDF) এর মধ্যে প্রথাগত যুদ্ধের একটি সিরিজ
সংঘটিত হয়েছিল।এটিই গাজা উপত্যকায় প্রথম বড় স্থল অভিযান ছিলো। এই অভিযানে ফিলিস্তিনরা জয় লাভ করে এবং ২০০৬
সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে গাজার শাসনভার গ্রহণ করে।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন
দ্বন্দ্ব
৭০
খ্রিস্টাব্দে প্রথম ইহুদি-রোমান যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো।
রোমান সেনাবাহিনী
ভবিষ্যত রোমান সম্রাট
টাইটাসের নেতৃত্বে জেরুজালেম অবরোধ করেছিল। পাঁচ মাসের অবরোধের পর রোমানরা জেরুজালেম শহর পুড়িয়ে দেয় এবং দ্বিতীয় ইহুদি
মন্দির ধ্বংস করে। জেরুজালেম পুড়িয়ে দেওয়ার পরে ইহুদিরা সারা বিশ্বে
ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং তারা যেখানেই গিয়েছিল সেখানেই তাদের যন্ত্রণা সহ্য করতে
হয়েছিল। সেই দিন থেকে তারা এমন একজন ত্রাণকর্তা, একজন মশীহের জন্য অপেক্ষা করে আসছে, যিনি
এক রাষ্ট্রের অধীনে তাদের একত্রিত করবেন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মশীহের আগমন
বিলম্বিত হওয়ায়, কিছু আদর্শবাদী ইহুদি একটি ইসরায়েলি
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে সমবেত হয়েছিলেন। এই দলটিকেই জায়োনিস্ট(ইহুদিবাদী) বলা হয়। এই জায়োনিস্টরাই প্যালেস্টিন-এ নিজেদের জন্য
স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার
জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
ইহুদিবাদীরা প্রথমে তদানীন্তন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশরা তাঁদের দাবিগুলো তখন গুরুত্বের সাথে নেয়নি। তবে জায়োনিস্টরা হতাশ না হয়ে তলে তলে
সংগঠিত হচ্ছিলো। সময়ের সাথে সাথে
ব্রিটিশরা যখন উপলব্ধি করতে পারে যে, এই
ইহুদি আন্দোলন ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, তখন ব্রিটিশরা তাঁদের উগান্ডা, সাইবেরিয়া এবং সাইপ্রাসের মতো অঞ্চলগুলি প্রদান
করতে সন্মত হয়েছিল। তবে জায়োনিস্টরা এসব অঞ্চলে নিতে তখন অস্বীকার করেছিলো। তাঁরা তখন কয়েক হাজার বছরের তাঁদের আরবের বাসস্থান, তাওরাতে উল্লিখিত
প্রতিশ্রুত ভূমি প্যালেস্টাইন দাবি করেছিলো।
ইহুদিবাদীদের আন্দোলন অটোমান সরকারের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে
হুমকির মুখে ফেলে, তাই অটোম্যন সরকার জায়োনিস্টদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে কিছু
সতর্কতা অবলম্বন করেন। অবশ্যে ইহুদিবাদীদের আন্দোলনের আগেই ১৮৭১
সালে অটোমান সরকার ফিলিস্তিনের ৮০ শতাংশ ভূমি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। সুলতান আবদুল হামিদ-দ্বিতীয় শাসনভার গ্রহণের পর তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি
স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বৃদ্ধি করেছিলেন। ১৮৮৩ সালে তিনি ফিলিস্তিনে বসবাসরত ইহুদিদের জমি অধিগ্রহণ নিষিদ্ধ করেন এবং কৌশলগতভাবে অঞ্চলটি নিজের দখলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯০০ সালে সুলতান আবদুল
হামিদ-দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিদের অবস্থান ৩০দিনের জন্য সীমাবদ্ধ করেন এবং তিনি ফিলিস্তিনসহ অটোমান
সাম্রাজ্যে বিদেশী ইহুদিদের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জমি অধিগ্রহণকে নিষিদ্ধ করেন। সাথে সাথে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, অটোমান সাম্রাজ্য ইউরোপ থেকে নির্বাসিত লোকদের জন্য
বসতি এলাকা নয়।
ফলে বুদাপেস্টের ইহুদিবাদী আন্দোলনের নেতা থিওডর হার্জল, সুলতান আবদুল হামিদ-দ্বিতীয়র সাথে আলোচনায়
বসার জন্য অনুরোধ করেন। আব্দুল হামিদ-২য় দ্বারা এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হলে, তিনি ১৯০১
সালের মে মাসে আবার তাঁর ঘনিষ্ঠ পোলিশ বন্ধু ফিলিপ নিউলিনস্কির মাধ্যমে
সুলতানের কাছে তাঁর প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে বলা হয় যে,
ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য অনুমতি প্রদান করলে, তাঁরা
উসমানীয়দের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করবেন এবং ইউরোপে অটোমান সুলতানের জন্য প্রচারের
ব্যবস্থা করবেন।
সুলতান এই বিখ্যাত উক্তি দিয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
করেছিলেন: "আমি কিছু বিক্রি করব না, এমনকি এই অঞ্চলের এক ইঞ্চি ভূমিও নয়, কারণ এই দেশটি আমার নয়,
সমস্ত অটোমানদের। আমার লোকেরা তাদের রক্ত দিয়ে এই জমিগুলি জিতেছে।"
থিওডর হার্জল পরের বছর আবার তার প্রস্তাবের পুনরাবৃত্তি
করেছিলেন, কিন্তু তখনও সুলতানের একই উত্তর ছিল। ১৯০৯ সালে সুলতানকে সিংহাসনচ্যূত করে
গৃহবন্দি করে
রাখা হয়েছিলো।
এটা
লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সুলতান আব্দুল হামিদ-দ্বিতীয়কে ইহুদি বিরোধী হিসাবে
বিবেচনা করা উচিত নয়। তিনি সমস্যাগুলির প্রতি আবেগপ্রবণ পদ্ধতির পরিবর্তে
বাস্তববাদীতার জন্য পরিচিত ছিলেন। মুসলিম-তুর্কি সংস্কৃতিতে এন্টি-সেমিটিজম
শব্দটির কোনো স্থান নেই। এই সময়কালে গৃহীত সমস্ত সতর্কতা ছিল দেশের অখণ্ডতা এবং এই অখণ্ডতা শুধু একটি
নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়। তখন অটোমান সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ইহুদি
জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল।
ইহুদিরা তখন স্বাধীনভাবে অটোমান
সাম্রাজ্য বসবাস করত। থেসালোনিকি তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এবং এটি বিশ্বের
বৃহত্তম ইহুদি শহর ছিল।
১৯০৯
সালে সুলতান আব্দুল হামিদ-দ্বিতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করে তরুণ তুর্কিরা সুলতানকে
থেসালোনিকিতে নির্বাসিত করে এবং তাঁকে আল্লাতিনি নামে একজন ইহুদি ব্যাংকারের বাড়িতে
বন্দী করে রাখে। সুলতানের মালিকানাধীন সমস্ত অঞ্চল জাতীয়করণ করা হয়
এবং তরুণ
তুর্কিদের দ্বারা ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হয়। কারণ ইহুদিরা তরুণ তুর্কিদের
ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিল।
তরুণ
তুর্কিদের মধ্যে অনেক ফ্রিম্যাসন(পরস্পর সহায়কারী গুপ্ত সংগঠনের সদস্য) এবং সাবাতাবাদী(একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়)
ইহুদি ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ইহুদি ব্যাংকার এবং
ফ্রিম্যাসন ইমানুয়েল কারাসো ছিলেন গ্র্যান্ড ভিজিয়ার তালাত পাশার বন্ধু এবং
সুলতান আবদুল হামিদ-দ্বিতীয়কে সিংহাসনচ্যুত হিসেবে ঘোষণাকারী প্রতিনিধি
দলের সদস্য। থেসালোনিকি ডেপুটি ইমানুল কারাসো তাঁর সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী
ব্যক্তি এবং প্যালেস্টাইনে ইহুদি অভিবাসনের সংগঠকও ছিলেন। তরুণ তুর্কিরা কারাসোকে
একটি কালো খাদ্য বাজার পরিচালনা করার অনুমতি দিয়ে তাঁদের ঋণ পরিশোধ করেছিলেন।
কিন্তু ফিলিস্তিনে তুর্কি শক্তির বিপর্যয় ও সেখানে ব্রিটিশ
ঔপনিবেশিকের আগমণের পর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ভূমি দখল শুরু হয়। ১৯১৭
সালে জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং ছ’বছর পর তুরস্কে উসমানীয় খিলাফতের অবসান ঘটে। ইহুদিদের
জন্য এটা ছিলো সুবর্ণ সুযোগ। ১৮৯৫
সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের মোট সংখ্যা ছিলো ৪৭,০০০ জন এবং মুসলমান ছিলো ৪,৫৩,০০০ জন।১৯১৯ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা ৪৭,০০০ থেকে বেড়ে ৫৮,০০০ পৰ্যন্ত বৃদ্ধি হয়। কিন্তু এর পর থেকে ব্রিটিশ
আনুকল্যে ইহুদিদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে
থাকে। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ইহুদিদের সংখ্যা ৩,৮৭,০০০ জনে দাঁড়ায়। পরবর্তী ৪
বছরে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৬,৪০০০ জনে।এই সময়ে মুসলমানদের সংখ্যা
ছিলো ১৩ লাখেরও কিছু বেশি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, ১৯১৬
সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের
মধ্যে 'সাইকস
পিকট' নামে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। এই চুক্তির অধীনে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
শেষ হলে ফিলিস্তিনের ওপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তখন ইহুদিদের জন্য
পৃথক স্বাধীন ভূমি প্রতিষ্ঠা করা হবে। ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস
বেলফোরের সভাপতিত্বে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বরে আরও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের অধীনে ইহুদিদের জন্য পৃথক আবাসভূমি
প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মতি প্রকাশ করা হয় এবং তাঁদের জন্য একটি দেশ গঠনের দাবি গৃহীত
হয়। এই ঘোষণাটি ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে বিখ্যাত।এই ঘোষণার পর ইসরায়েলের জন্য আলাদা দেশ গঠনের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় এবং
অ্যাংলো ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা লিওনেল ওয়াল্টারের নিকট এই বিষয়ে একটি চিঠি প্ৰেরণ করা হয়।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে
জার্মানিতে নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯৩৪ সাল থেকে জার্মানীর এক নায়কত্ববাদী শাসক
হিটলারের শাসন শুরু হয়। হিটলারের শাসনকালে ইহুদিরা বিশেষভাবে
নির্যাতিত হয়। হিটলার বিশেষভাবে নির্মিত গেটো এবং বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে আবদ্ধ করে ৪ বছরে ৬০ লাখ ইহুদি হত্যা করা হয়েছিলো। এর ফলস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সমগ্র বিশ্বের ৩ কোটি লোক নিহত হয়েছিলো। ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্তেম্বর যুদ্ধের
অবসান হয়। হিটলারের নির্যাতন থেকে বাঁচতে ইহুদিরা তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইংল্যাণ্ড,
ফ্রান্স, স্পেন, ইটালি, পোল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো।ইউরোপের কোনো খ্রীষ্টান দেশই তখন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ইহুদিদের আশ্রয় দিতে
প্রস্তুত ছিল না। অবশেষে প্রাণ রক্ষার তাগিদে ইহুদিদের নির্যাতিত একটি দল প্যালেস্টিন সরকারের
নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলো। ফিলিস্তিনিরা জীর্ণবস্ত্র পরিহিত, কংকালসার ইহুদিদের নিজেদের দেশে দয়াপরবশ হয়ে
আশ্রয় প্রদান করেছিলেন। এভাবে প্যালেস্টাইন এলাকায় ধীরে ধীরে ইহুদি বসতি স্থাপন হতে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে আরবের অধিবাসীরা এই এলাকায়
ইহুদিদের বসতি স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে এবং এখান থেকেই ইহুদি ও আরবদের মধ্যে
বিরোধ শুরু হয়। এই বিরোধ এক সময় সংঘাতের রূপ নেয় এবং এই সংঘাত ধীরে ধীরে আরও গুরুতর আকার ধারণ করে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে নিজ
নিজ এলাকা দখলের জন্য বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বিশ্বব্যাপী কিছু দেশ ইসরায়েলকে
সমর্থন করে, যেখানে প্রধানত সমস্ত আরব দেশ ফিলিস্তিনকে
সমর্থন করে। এই সময়কালে ফিলিস্তিন এবং আরব দেশগুলির
আপত্তি উপেক্ষা করে ব্রিটেইন জাতিসংঘকে ব্যবহার করে জোরপূর্বক ইসরাইল নামক রাষ্ট্র গঠন
করে।১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে ১৮১ নং প্রস্তাব যোগে ফিলিস্তিনিদের মোট আয়তনের ৫৬ ভাগ এলাকায় ইহুদি রাষ্ট্র এবং অবশিষ্ট এলাকায় আরব রাষ্ট্র গঠনের জন্য আহ্বান জানায়। অর্থাৎ ফিলিস্তিনের ৮
শতাংশ ইহুদিরা পেল দেশের ৫৬ ভাগ এলেকা, পক্ষান্তরে ৯২
শতাংশ মুসলিমরা পেল ৪৪
ভাগ এলেকা। ১৮৯৭ সালের থিওডর পরিকল্পনা, ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা এবং ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাবের আশ্বাস ও আশীর্বাদে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ব্রিটিশ-মার্কিন
সহায়তায় তেল আবিবের মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ডেভিড বেন গোরিওন ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার সাথে শুরু হয়
ফিলিস্তিনি মুসলমানদের হত্যা, লুণ্ঠন ও উচ্ছেদের কাজ। লক্ষ লক্ষ মুসলিম সবকিছু ফেলে
পার্শ্ববর্তী মুসিলম দেশসমূহে আশ্রয় গ্রহণ করে। উপায়ন্তর হয়ে আরব দেশসমূহের মিশর, ইরাক,
সিরিয়া ও জর্ডান নামে চারটি আরব দেশ মিলে ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য ইসরাইল আক্রমণ করে। ফলে আরব
অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
জর্ডান ফিলিস্তিনসহ পূর্ব
ফিলিস্তিন মুক্ত করে। ইরাক বাহিনী ত্বরিত গতিতে তেল আবিবের তিন মাইলের মধ্যে
গিয়ে পৌঁছায়। অ্যনদিকে মিশরীয় সৈন্যরা গাজা এলেকার উপর নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠা করে। নব্য ইসরাইল রাষ্ট্রের এরূপ মুমুর্ষু অবস্থায় ইসরাইলের
মুরব্বীদের চাপে জাতিসংঘের মাধ্যমে ফয়শলার স্বার্থে ৪ সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করা হয়। এই সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
ব্রিটেন ও ইসরাইলের অন্যান্য মুরব্বীরা ইসরাইলকে অঢেল অর্থ, অস্ত্র ও অন্যান্য
সাহায্য প্রদান করে প্রতি আক্রমণের জন্য ইসরালকে প্রস্তুত করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ
ইসরায়েলি সরকারকে উন্নত অস্ত্র, পারমাণবিক বোমা ইত্যাদি
তৈরির প্রযুক্তি সরবরাহ করার পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে ইসরায়েলের ইহুদিরা
ফিলিস্তিনিদের উপর নির্মমভাবে অত্যাচার শুরু করে। তারা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি
বুলডোজর দিয়ে ভেঙে ফেলে
এবং নতুন নতুন এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু করে। ফিলিস্তিনি নারী ও বয়স্কদের
নির্যাতন করা হয় এবং তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হয়। ইসরাইলিরা AK-47 রাইফল নিয়ে স্কুলে যাওয়া শিশুদের গুলি করতে থাকে। এর সাথে তারা যুবকদের বন্দী, নির্যাতন ও হত্যা করে। বন্দীরা
পানি চাইলে তাদের একজনকে আরেকজনের মুখে প্রস্রাব করতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
এই যুদ্ধের ফলে চরম সহিংসতা হয় এবং বিভিন্ন মানুষ
বাস্তুচ্যুত হয়। অত্যন্ত কঠিন সংগ্রামের পর অবশেষে এই যুদ্ধে ইসরাইল জয়ী হয়।
আরবের মানুষ এবং ইজরাইলের এই প্রথম যুদ্ধের ফলস্বরূপ জেরুজালেমের
পশ্চিম অংশে ইজরাইলের রাজধানী স্থাপন হয় এবং জেরুজালেমের পূর্বের অংশ জর্ডনের দখলে
যায়। এই যুদ্ধের পরেই ইজরায়েল বিস্তৃতিবাদী নীতি গ্রহণ করে এবং তাঁরা জেরুজালেমের পূর্ব
অংশের দিকে তাঁদের আধিপত্য বিস্তারের উপর জোর দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে ইজরাইল সংসদ ১৯৮০ সালে একটি আইন পাস করে, যার অধীনে তাঁরা সমগ্র জেরুজালেমকে
ইজারায়ালের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে।
উপরন্তু, ইজরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে প্রথম যুদ্ধের ফলস্বরূপ বৃহৎ সংখ্যায় ফিলিস্তিনি লোক নিহত হয় এবং অনকে জীবন
বাঁচাতে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। ফলে ফিলিস্তিনি শরণার্থীর
সংকট সৃষ্টি হয়।
প্যালেস্টাইন
লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এর উত্থান
ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত ভয়াবহ সংঘর্ষের
আলোকে ফিলিস্তিনের জনগণ একটি সংগঠন তৈরি করে। এই সংগঠনের নাম ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশন (পিএলও)’। এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ফিলিস্তিনের জনগণের পুনর্বাসন, তাদের সুরক্ষা প্রদান এবং ফিলিস্তিনের
জনগণের মঙ্গল নিশ্চিত করার জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কাজ করা।
ভারত ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এই ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’কে স্বীকৃতি প্রদান করে। তখন ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা ভারতই ছিলো
একমাত্র অমুসলিম দেশ। এর উপরেও ভারত ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের মর্যদা প্রদান করে।
ছয়
দিনের যুদ্ধ (১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ)
১৯৬৭
খ্রিস্টাব্দে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধ সংঘিটত
হয়েছিল। যেহেতু এই যুদ্ধ ৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল, তাই এই যুদ্ধটি ইতিহাসে 'ছয় দিনের যুদ্ধ' নামে
বিখ্যাত। এই যুদ্ধেও আরব দেশগুলোর যৌথ সংগঠনের বিরুদ্ধে ইসরাইল বিজয়ী হয়েছিলো।
ছয় দিনের এই যুদ্ধে তিন আরব দেশ সিরিয়া, জর্ডান ও মিশরের যৌথ সংগঠন ইসরাইল আক্রমণ
করেছিলো। এই যুদ্ধে ইসরাইল এই তিন দেশের সম্মিলিত বাহিনীকে বাজেভাবে পরাজিত করে এবং এই
দেশগুলোর বিভিন্ন এলেকা দখল করে। এই ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল সিরিযার গোলন হেইটস দখল করে নিজেদের দেশের
অন্তর্ভূক্ত করে। এর উপরেও ইসরাইল জর্ডানের পশ্চিম উপকূল এবং জেরুজালেমের পূর্ব
অংশ দখল করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। এই যুদ্ধের পরে ইসরাইল
মিশরের নিকট থেকে গাজাপট্টি ও সিনাই উপদ্বীপের ক্ষেত্র কেড়ে নেয়। যাইহোক, পরে, ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইসরাইল এবং মিশরের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত
হয়। এই চুক্তির অধীনে ইসরাইল ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সিনাই উপদ্বীপ মিশরকে ফিরিয়ে দেয়। বিনিময়ে
মিশর ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে
দেশের মর্যদা প্রদান করার ক্ষেত্রে আরব দেশগুলোর মধ্যে মিশরই
ছিলো প্রথম দেশ।
হামাস নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের এই দীর্ঘ দ্বন্দ্বের মধ্যে
ফিলিস্তিনের জনগণ সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য অর্জনের কথা চিন্তা করে এবং
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে তারা 'হামাস'
নামে একটি সংগঠন গঠন করে। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য হলো, জিহাদের মাধ্যমে
স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভূখণ্ড দখল এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে
ইসরাইলকে দুর্বল করা।
হামাস নামের এই সংগঠনটি
একটি মৌলবাদী সুন্নি মুসলিম সংগঠন। এই সংগঠনটি সিরিয়া ও ইরান দ্বারা সমর্থিত। বর্তমান এই
সংগঠন গাজাপট্টি নামক ভূখণ্ড দখল করে রয়েছে। গাজাপট্টি ফিলিস্তিনি
বসতিপ্রধান অঞ্চল এবং ভূমধ্য সাগরের তীরে অবস্থিত।
হামাস সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘ
দ্বারা
প্ৰস্তাবিত ওসলো চুক্তির দুই
রাষ্ট্রের সমাধান মানতে সন্মত নয়। এই সংগঠন তাঁদের ভুখণ্ডে
ইসরাইলের সব রকমের দাবি সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে।
ফাতাহ সংগঠনের উত্থান
হামাসের মতো ফাতাহ নামক একটি সংগঠনও ফিলিস্তিনে সক্রিয় হয়ে রয়েছে। এই সংগঠনটি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠন করতে আগ্রহী। এই
সংগঠন পশ্চিম তীর নামক এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। এই সংগঠনের আদর্শ
হামাসের আদর্শের বিপরীত। হামাসের বিপরীতে এই সংস্থাটি জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ এবং
‘অসলো শান্তি চুক্তি’ মেনে নিতে
প্রস্তুত।
ইন্তিফাদা (অভ্যুত্থান)
ইসরাইল ও ফিলিস্তিন
সংঘর্ষের দরুন ইতিমধ্যে দু’টি
ইন্তিফাদা(অভ্যূত্থানের প্রচেষ্টা)সংঘটিত হয়েছে। ইন্তিফাদার
অর্থ হলো বিদ্রোহের দ্বারা অভ্যূত্থান। প্রকৃতার্থে ফিলিস্তিনিদের
দ্বারা সংঘটিত বিদ্রোহকে ইন্তিফাদা নাম দেওয়া হয়েছে। প্রথম
ইন্তিফাদা ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয ইন্তিফাদা ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে।
প্ৰথম ইন্তিফাদা (১৯৮৭-১৯৯৩
খ্ৰিস্টাব্দ)
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি বিদ্রোহীরা প্রথম
ইন্তিফাদা শুরু করেছিল। এর আওতায় গাজা উপত্যকায় উপস্থিত ইহুদি বসতিতে হামলা
চালানো হয়েছিলো এবং সহিংসতার মাধ্যমে তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো। ফলে অনেক ইহুদি তাদের বাড়িঘর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলো।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি
জনগণের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের এই সহিংস হামলার অবসান ঘটেছিলো ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে। এ উপলক্ষে আমেরিকা ও
রাশিয়ার সহযোগে অসলো শান্তি চুক্তি (১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ)সম্পাদন হয়েছিলো।১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত এই ‘অসলো শান্তি চুক্তি’র অধীনে বিভিন্ন
বিধান রাখা হয়েছিল। অসলো শান্তি চুক্তির আওতায় এই এলাকাকে দুই ভাগে ভাগ করে এর একটি অংশ ফিলিস্তিনকে এবং অন্য অংশ ইসরায়েলকে দেওয়ার
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো। অসলো শান্তি চুক্তির এই বিধানটি ইতিহাসে ‘টু স্টেট সলিউশন’ নামে
বিখ্যাত। এই চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ওপর ফিলিস্তিন ও
ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো।
দ্বিতীয়
ইন্তিফাদা (২০০০ থেকে ২০০৫ খ্রীষ্টাব্দ)
ফিলিস্তিনের পক্ষে যুদ্ধরত 'হামাস' কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি
নয়। এমনকি অসলো শান্তি চুক্তির পরেও হামাস একই অবস্থানে ছিলো এবং 'দুই-রাষ্ট্র সমাধানের নীতি' মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল।
হামাসের এই একগুঁয়ে
মনোভাবের কারণে যখন অসলো শান্তি চুক্তির প্রস্তাবিত সমাধান সফল হতে পারেনি, তখন ফিলিস্তিনের জনগণ ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা পরিচালনা করে।এই সহিংস
হামলার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনের জনগণ সহিংসতার মাধ্যমে ইসরাইলি বসতি উচ্ছেদ করতে
থাকে।
এমন সহিংস পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ইসরাইল ফিলিস্তিনি
জনগণের বসতি এবং ইসরায়েলি জনগণের বসতির মধ্যে 'ওয়েস্ট ব্যাংক ব্যারিয়ার' নির্মাণের
পরিকল্পনা করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, ফিলিস্তিনি জনগণ এবং ইসরায়েলি জনগণের
বসতিগুলিকে একে অপরের থেকে আলাদা করা, যাতে ইসরায়েলি জনগণ
ফিলিস্তিনি জনগণ থেকে ভবিষ্যতে যে কোনো রকমের সহিংস আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারে।
দুই পক্ষের সাম্প্রতিক বিবাদ
২০২১
সালে ইসরায়েলি সৈন্যরা পূর্ব জেরুজালেমের 'হারাম আল শরীফ' নামক
স্থানে অবস্থিত 'আল আকসা মসজিদ'-এ
হামলা চালালে দুই দেশ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আবার হিংসাত্মক বিরোধ শুরু
হয়। মুসলিমরা আল আকসা মসজিদকে মক্কা ও মদিনার পর বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান
হিসেবে বিবেচনা করেন।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক এই ঘটনাক্রমের কারণে আবার সহিংস
বিরোধ দেখা দেয় এবং এর জন্য বিভিন্ন দেশ এই বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের কথা
উত্থাপন করে। এই পরিস্থিতিতে ভারতও বলেছিলেন যে, উভয় পক্ষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সহিংসতা বন্ধ করে শান্তিপূর্ণভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত। এদিকে, এটিও উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৬ সালে ইউনেস্কো আল আকসা মসজিদের উপর ইহুদিদের দাবি
সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং বলেছিল যে, আল আকসা মসজিদে ইহুদিদের কোনও ধর্মীয় উপাদান নেই।
ফিলিস্তিনি পক্ষ
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলমান এই
সংঘর্ষের মধ্যে ফিলিস্তিন দাবি করে যে, ফিলিস্তিনের জনগণের ১৯৪৮
খ্রিস্টাব্দের পূর্বের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা হোক এবং
ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তুদের ১৯৬৭ সালের ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে পুনর্বাসিত করা হোক।
দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসা ফিলিস্তিনের দাবি হচ্ছে, গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের পুরো এলাকা
ফিলিস্তিনকে প্রদান করা হোক এবং সেখানে ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসিত শাসন মেনে
নেওয়া হোক।
জেরুজালেম সম্পর্কে ফিলিস্তিনি জনগণ মত ব্যক্ত করে যে, জেরুজালেমকে পশ্চিম ও পূর্ব দুই ভাগে
বিভক্ত করা উচিত। অবশ্যই, পশ্চিম অংশে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ
নিশ্চিত করতে হবে, তবে জেরুজালেমের পুরো পূর্ব অংশ
ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে এবং জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী
হিসেবে মেনে নিতে হবে।
ইসরাইলি পক্ষ
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই ভয়াবহ
দ্বন্দ্বের মাঝে ইসরাইল দাবি করে যে, পুরো জেরুজালেমের ওপর শুধু ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব মেনে
নেওয়া হোক এবং ইসরায়েলের ওপর সম্পূর্ণ সর্বভৌমত্ব প্রদান করা হোক।
উপরন্তু, ইসরায়েলও চায় ইসরায়েলকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বব্যাপী
স্বীকৃতি প্ৰদান করা হোক এবং জেরুজালেমকে সামগ্রিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের
রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
ইসরাইল জেরুজালেমের ওপর তাদের কোন দাবি ছাড়তে প্রস্তুত
নয়। বর্তমানে ইসরায়েলের রাজধানী 'তেল আবিব' হলেও ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদীরা
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের প্রধান রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার
চেষ্টা অব্যাহত রেখেছ।
জেরুজালেম, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেম, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিম এই তিন ধর্মের মানুষের জন্য একটি পবিত্র স্থান। এই
ধর্মীয় কারণটিও ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়।
এই
সংঘর্ষের ফলাফল
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই
সহিংস সংঘর্ষের অনেক গুরুতর পরিণতি প্রমাণিত হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে পশ্চিম
এশিয়ার রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, যার কারণে উভয় দেশের সাধারণ মানুষ নানা সমস্যার সম্মুখীন
হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের কারণে পশ্চিম এশিয়া
অঞ্চলে সহিংস তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক সন্ত্রাসী সংগঠন
গড়ে উঠেছে। এটি শুধু সন্ত্রাসবাদকেই উৎসাহিত করেনি বরং বিশ্বব্যাপী ভয়ের পরিবেশও
সৃষ্টি করে রেখেছে।
এই
দীর্ঘমেয়াদী সহিংস সংঘর্ষের ফলে পশ্চিম এশীয় অঞ্চলেও উদ্বাস্তু সংকট দেখা
দিয়েছে। শুধু এই দুটি দেশই নয়, আশেপাশের
অন্যান্য দেশও এই শরণার্থী সংকটে আক্রান্ত হয়েছে। এই সংঘাত শুধু মানবাধিকার
লঙ্ঘনের দিক দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি সৃষ্টিরও অন্যতম কারক।
আন্তর্জাতিক
পর্যায়ে দৃষ্টিপাত করলে
দেখা যায় যে, দুই পক্ষের মধ্যে চলমান এই সহিংস সংঘর্ষের
কারণে বৈশ্বিক পর্যায়ে দুটি শিবির সৃষ্টি হয়েছে- কিছু দেশ ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে
এবং কিছু দেশ
নিয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষ।
দুই
দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের
মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করলে
দেখা যায়, যে যুক্তরাষ্ট্র
স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে, ইসরায়েলের
আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে এবং তারা যদি আত্মরক্ষার সময় অন্য দেশের বিরুদ্ধে
সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা কোনওভাবেই অনুচিত পদক্ষেপ হতে পারে না।
ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ঘনিষ্ঠতার
পিছনের প্রধান কারণ হল, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিদের জনসংখ্যা ইসরায়েলে বসবাসকারী ইহুদিদের জনসংখ্যার চেয়ে
অনেক বেশি। উপরন্তু, ইহুদিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে মূল্যবান অবদান রেখেছে। বলতে গেলে, আমেরিকার অর্থনীতির ডোর বর্তমান ইহুদিদের হাতে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আরবপতি আমেরিকায় বাস করেন। ফোর্বসের
তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ২৬৬ জন ইহুদি
বিলনিওয়ার আরবপতি আমেরিকায় বাস করেন। এদের নেটওয়ার্ক ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। সফ্টওয়ের কোম্পানী অরেকল
কর্পরেশনের মালিক বিশ্বের চতুর্থ ধনী লরেন্স জোসেফ ইলিসন আমেরিকায় বাস করেন। লরেন্স
জোসেফ এলিসনের নেটওয়ার্ক ১০৭ বিলিয়ন ডলার। ফেসবুক, ইষ্টাগ্রাম তথা মেটার মালিক মার্ক জোকেনবা্র্গ,
গগলের প্রতিষ্ঠাতা লেরী পেইজ ও সার্গে ব্রীন, ডেল টেকনলিজর প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক
মাইকেল ডেল প্ৰভৃতি আমেরিকান ইহুদি।রাষ্ট্রপতি ও উপ রাষ্ট্রপতির
পরেই আমেরিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সেক্রেটারী অফ স্টেট হলেন এণ্টনি
ব্লিংকেন। এণ্টনি
ব্লিংকেন ইহুদি। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে আসছে
যুক্তরাষ্ট্র।
এই দুই দেশের বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের
মতো দেশ প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়েছে এবং ফিলিস্তিনের দাবি বাস্তবায়িত
করার ওপর জোর দিয়ে এসেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আরব দেশ এবং মুসলিমদের আন্তর্জাতিক সংস্থা
ইসলামিক সহযোগিতা সংগঠন (ওআইসি)ও ফিলিস্তিনের দাবিকে বৈধ বলে মেনে নিয়েছে এবং তা
বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন-এর সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান
দুই দেশের এই সংঘাতের সময় ভারত সবসময় ফিলিস্তিনকে সমর্থন
করে আসছে। জাতিসংঘে যখনই এই সংঘাত সম্পর্কিত বিতর্ক উঠেছে, ভারত তখনই ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
এখানে উল্লেখ্যণীয় যে ১৯৯২ সালের আগে পর্যন্ত
ইসরায়েলের সাথে ভারতের কোনরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ১৯৯২ সালে ভারত
প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলমান সংঘাতের
বিষয়ে ভারত সবসময়ই মত প্রকাশ করে আসছে যে, উভয় দেশেরই সহিংসতা ত্যাগ করা উচিত এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার
মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। উভয় দেশেরই সহিংসতার দিকে পা
বাড়ানো উচিত হবে না এবং এই প্রেক্ষাপটে যদি সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করা হয়,
তাহলে তা সমগ্র মানবতার জন্য সবচেয়ে বিড়ম্ববনার কারণ হবে।
সাম্প্রতিককালে ভারত ও ইসরায়েল বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরষ্পরকে
সহযোগিতা করে আসছে। ভারত ইসরায়েল থেকে বিপুল পরিমাণে সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। ভারত
বর্তমানে তার আন্তর্জাতিক সীমানা রক্ষার জন্য যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে,
সেই সম্পর্কে ইসরায়েল ভারতকে প্রচুর সহায়তাও করেছে।
এছাড়াও ভারত ও ইসরায়েল কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতা করে আসছে। ইসরায়েল ভারতকে বিভিন্ন কৃষি প্রযুক্তি প্রদান করছে, যাতে ভারত শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তার
ক্ষেত্রে স্বনির্ভর না হয়ে খাদ্যশস্যের রপ্তানিও বাড়াতে পারে।
সমগ্র বিশ্বে দেশ অনুযায়ী
ইহুদির সংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য অনুসারে
|
ইসরাইল (ইসরাইল দখলকৃত এলেকাসহ) |
৬৯,০৫,০০০ |
|
যুক্তরাষ্ট্র |
৬০,০০,০০০–১,১৫,০০,০০০ |
|
ফ্রান্স |
৪,৪০,০০০–৬,০০,০০০ |
|
কানাডা |
৩,৯৮,০০০–৫,৫০,০০০ |
|
যুক্তরাজ্য |
৩,১২,০০০–৩,৭০,০০০ |
|
আর্জেণ্টিনা |
১৭৫০০০– ৩,১০,০০০ |
|
রাশিয়া |
১,৫০,০০০–৪,৬০,০০০ |
|
জার্মানী |
১,১৮,০০০–২,২৫,০০০ |
|
অষ্ট্রিয়া |
১,১৮,০০০–১,৪৫,০০০ |
|
ব্রজিল- |
৯২,০০০– ১,৫০,০০০ |
|
দক্ষিণ আফ্রিকা- |
৫২,০০০– ৭৫,০০০ |
|
ইউক্রেন- |
৪৩,০০০–১,৪০,০০০ |
|
হাঙ্গেরী- |
৪৭,০০০–১,০০,০০০ |
|
মেস্কিকো- |
৪০,০০০–৫০,০০০ |
|
নেদারল্যাণ্ড- |
৩০০০০–৫৩০০০ |
|
বেলজিয়াম- |
২৯,০০০–৪০,০০০ |
|
ইটালি- |
২৭,০০০–৪১,০০০ |
|
সুইজারল্যাণ্ড- |
১৮,০০০–২৫,০০০ |
|
চিলি- |
১৬,০০০–২৪,০০০] |
|
উরুগুয়ে- |
১৬,০০০–২৪,০০০ |
|
তুর্কি |
১৫,০০০–২,১০০০ |
|
সুইডেন- |
১৫০০০–২৫,০০০ ভারত-৬,০০০ |
বিভিন্ন ধর্মীয় দলের জন্য জেরুজালেমের গুরুত্ব
জেরুজালেম একটি পবিত্র স্থান, যা তিনটি ধর্ম খ্রিস্টান, ইহুদি এবং ইসলামের জন্য অত্যন্ত ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। ‘হিব্রু বাইবেল’ ইহুদি ধর্মের একটি পবিত্র ধর্মীয়
গ্রন্থ। ইহুদি ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ আছে যে,
প্রাচীনকালে রাজা ডেভিড(দাউদ)পূর্ব জেরুজালেমে ইস্রায়েলের রাজধানী স্থাপন
করেছিলেন। জেরুজালেমস্থিত ওয়েস্টার্ন ওয়াল ইহুদিদের জন্য অপরিসীম ধর্মীয়
তাৎপর্য বহন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইহুদিদের দৃষ্টিতে জেরুজালেমের যে শুধু
ঐতিহাসিক গুরুত্বই রয়েছে তা নয়, এর ধর্মীয় গুরুত্বও রয়েছে।
খ্রীস্টান ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলেও দেখা যায় যে, এখানে একটি পবিত্র গির্জা অবস্থিত। এই
অর্থে, জেরুজালেম খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্যও অত্যন্ত
পবিত্র স্থান। এ ছাড়াও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, যীশু
খ্রিস্টকে জেরুজালেমেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তাঁর ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কিত
একটি সমাধিস্থলও জেরুজালেমে অবস্থিত। এই সমস্ত দিকগুলির উপর ভিত্তি করলে, এটা স্পষ্ট হয়, যে জেরুজালেম
খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্যও ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, জেরুজালেমে অবস্থিত আল আকসা মসজিদ মক্কা এবং মদিনার পরে
মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। এ কারণে জেরুজালেমের সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয়
অনুভূতি গভীরভাবে জড়িত।
ইসলাম সম্পর্কিত আরও দুটি প্রধান স্থাপনা জেরুজালেমে
অবস্থিত। এই স্থাপনাগুলির মধ্যে রয়েছে 'ডোম অফ দ্য রক'(‘দ্য ডোম অফ দ্য রক’ (কুব্বাত আল-সাখরা) হল, জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট এলাকার মাঝখানে উঁচু
প্ল্যাটফর্মের একটি অষ্টভুজাকার কাঠামো। এটি বেশিরভাগ মুসলমানদের দ্বারা পবিত্র
স্থান হিসাবে সম্মানিত। কারণ এখান থেকে নবী মুহাম্মদ(সাঃ) স্বর্গে আরোহণ করেছিলেন।
এর নির্মাণের পর থেকে, গম্বুজটি নিছক একটি কাঠামোর চেয়ে, মুসলমানদের জন্য বেশি ধর্মীয় স্থান
হিসেবে বিবেচিত।) এবং 'ডোম অফ দ্য চেইন'(মুক্ত গম্বুজ বিশিষ্ট ইসলামিক ভবন, যা জেরুজালেমের পুরাতন শহরের আল-আকসা
মসজিদ প্রাঙ্গণে ডোম অফ দ্য রকের পূর্বদিকে অবস্থিত।)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলে এটা স্পষ্ট যে, ইসলামের জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও জেরুসালেমের গুরুত্ব
অনেক বেশি।
জেরুজালেমে 'টেম্পল মাউন্ট' নামে একটি জায়গা রয়েছে।
এই টেম্পল মাউন্টটি 'হারাম আল শরীফ' নামেও
পরিচিত। ইহুদি এবং ইসলাম উভয় ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্থানটিকে অত্যন্ত পবিত্র
বলে মনে করা হয়। তাই বলা যায়, ধর্মীয় সমীকরণের দিক থেকে
জেরুজালেমের ওপর খ্রিস্টান, ইহুদি ও ইসলাম এই তিন ধর্মেরই
সমান অধিকার থাকা উচিত।
সমাধানের পথ
এ পর্যন্ত আলোচনায় আমরা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংক্রান্ত
বিরোধকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করেছি। এমতাবস্থায়, উপরোক্ত
বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পারি যে,
জেরুজালেমের উপর কোন একটি ধর্মীয় দলের পূর্ণ দাবি সমর্থন করা সম্ভব নয়, কারণ কোন
একটি পক্ষের সম্পূর্ণ দাবি মেনে নিলে অন্য পক্ষ প্রতারিত বোধ করবে এবং তখন
সহিংসতার রাস্তা বেঁচে নিতে পারে। যা শুধু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যই
হুমকি হবে না, মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকেও এ সিদ্ধান্ত হুমকি
হয়ে দাঁড়াবে।
তদ্ব্যতীত, সংঘর্ষের সাথে জড়িত উভয় পক্ষ ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনকে অবশ্যই 'অসলো শান্তি চুক্তি' দ্বারা নির্ধারিত 'দুই-রাষ্ট্র সমাধানের মূলনীতি' মেনে নিতে হবে। এর
বাইরে, যে কোন সমাধানসূত্র এক পক্ষের জন্য অন্যায় হবে।এটিকে অবশ্যই বাস্তবসন্মত
সমাধান বলা যাবে না এবং এটি অনেক ধরণের সমস্যার সৃষ্টি করবে। তবুও, 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের নীতি' গ্রহণ করা এই সমস্যার
সাথে জড়িত সকল পক্ষের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
এই দুই পক্ষের মধ্যেকার এই বিরোধের অবসান ঘটাতে ভারত
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন,
রাশিয়া প্রভৃতি দেশগুলির মাধ্যমে যদি সমস্যা সমাধানের সূচনা করা
হয়, তবে এই সমস্ত দেশই কোন না কোন প্রকারে কোন এক দেশের পক্ষের সমর্থক। কেউ ইসরাইলের এবং কেউ ফিলিস্তিনের। ফলে এই দেশগুলির প্রতি উভয় দেশেরই সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নেই। পক্ষান্তরে ভারত
এমন একটি দেশ যাকে উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত এই দুই দেশের
মধ্যে সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই এই দুই দেশের মধ্যে চলমান এই দীর্ঘ দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে ভারতের এগিয়ে
যাওয়া উচিত।
উপসংহার
এইভাবে, হিস্টরি বুক ফর ইউপিএসচিতে ইসরাইল ও
ফিলিস্তিন বিরোধ সম্পর্কিত বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি সামগ্রিক আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও এ সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইসরায়েল এবং
ফিলিস্তিনের মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলির মধ্যে
একটি। তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এবং বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিগুলোর উচিত
তাঁদের দায়িত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করে এ সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থবহ পদক্ষেপ
গ্রহণ করা। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধান করতে হলে এর বাইরে বিকল্প নাই।
(উকিপেডিয়া, হিস্টরি বুক ফর ইউপিএসচি, কাসাসুল আম্বিয়া,
ইউটিউব-এর সহায় নিয়ে প্রবন্ধগুলি যুগুত করা হয়েছে।)
সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন