সুরের পসরা(উপন্যাস)
সুরের পসরা(উপন্যাস)
নিবেদন
‘সুরের পসরা’
উপন্যাসটি সঙ্গীতের উপর ভিত্তি করে
রচনা করা হয়েছে।
বর্তমান ইউটিউবের দৌলতে অনেক অখ্যাত সঙ্গীত
শিল্পী গ্রামগঞ্জ থেকে
উঠে এসে সঙ্গীত জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখনও
অনেক প্রতিভাবান
সঙ্গীত শিল্পী গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
রয়েছে, যারা সুযোগের অভাবে এখনও
তাঁদের প্রতিভা বিকাশ করতে সমর্থ হোননি। সেই
অখ্যাত শিল্পীদের উৎসাহিত
করার জন্যই উপন্যাসটি রচনা করা হয়েছে। কারো
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত
করার উদ্দেশ্য নিয়ে উপন্যাসটি রচনা করা হয়নি।
উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে সেটা হবে সম্পূর্ণ
কাকতালীয়। তারজন্য
আমি দুঃখিত। উপন্যাসটিতে হয়তো বা অনেক
ভুলত্রুটি রয়ে গেছে। সেই
ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে পাঠক
উপন্যাসটি সাদরে গ্রহণ করলে
আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।
বিনীত
আবুল হোসেইন
গ্রাম- যতিগাঁও
জেলা- বরপেটা, আসাম।
(এক)
রফিদা স্কুল থেকে দৌড়ে এসেই মা’কে
ডেকে বললো- মা, মা, আজ রাশিদা স্কুলে গান গেয়েছে।
আমিনা বেগম লাউ গাছে পোকা মারছিলো।
কয়েক দিন ধরে এক ধরণের পোকা লেগেছে গাছে। জালি এলেই পোকায় নষ্ট করে ফেলে। এদিকে বাড়ীর নিকটে টাওয়ার বসানোর পর থেকে তেমন ফলনও হয় না।
যা দু’ চারটা যা জালি আসে, তা পোকায় নষ্ট করে ফেলে। তাই আমিনার লক্ষ্য ছিলো পোকার দিকে। সেজন্য তিনি রফিদার কথা
শুনেও গুরুত্ব দেননি।
রফিদা কিছু আহত হলো। তাই সে মা’র
দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল-মা কি করছ?
পোকা মারছি। দেখছিস্স্না জালি আসলেই
নষ্ট করে ফেলে। রাশিদা কোথায়? সে আসেনি?
আসতেছে। আজ রাশিদা গান গেয়েছে। তাই
আসতে দেরি হচ্ছে।
গান গাওয়ার কথা শুনে আমিনা বেগম সজাগ
হয়ে উঠলেন। বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন- গান গেয়েছে মানে? কোথায় গেয়েছে গান?
স্কুলে। খুব সুন্দর গান গেয়েছে। গান
শুনে সবাই হাত তালি দিয়েছে।
স্কুলে আবার গান কেন? রাশিদা
কি গান গাইতে পারে?
পারে না মানে? খুব সুন্দর গান গায়।
স্যারদের সে কি প্রশংসা!
এর মধ্যেই রাশিদাও এসে পৌঁছোল।
রাশিদাকে দেখেই রফিদা বলল- মা’কে
বলে দিয়েছি।
কি বলে দিয়েছিস?
গানের কথা। বলেই রফিদা দৌড়ে বাড়ীর
ভেতর চলে গেল।
আমিনা বলল- স্কুলে গান গেয়েছিস বোলে?
রাশিদা আমতা আমতা করে বলল- হ্যা,
গেয়েছি। স্কুলে ফাংশন হবে। তাই স্যাররা সবাইকে ডেকে ডেকে গান গাইতে
বললেন। অনেকে গেয়েছে। তাই আমিও গেয়েছি।
তুই গান গাইতে পারিস? শিখলি
কোথায়?
মোবাইলে শুনে শুনে শিখেছি।
গান গাওয়ার কথা শুনে আমিনা বেগম একটু
হকচকিয়ে গেলেন। কারণ গান গাওয়াটা রাশিদার জ্যাঠা মানে আমীন সাহেব পছন্দ করেন না। আমিনাও এক সময় গান গাইতেন। গাইতেন মানে অন্য কোথাও নয়, শুধু স্কুলের
ফাংশনে। তাই রশিদ মোল্লার সাথে যখন আমিনার বিয়ের
কথা চলছিলো, তখন গান গাওয়ার জন্য আমীন সাহেব আমিনাকে
বাড়ীর বউ করে আনতে চাইছিলেন না। পরে অবশ্যে রশিদ
মোল্লার তাগিদার চোটে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেই কথা মনে মনে রোমন্থন করে আমিনা
বেগম বললেন- গান গাইবি আমার তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই। তোর বাবাও কিছু বলবে না জানি। কিন্তু সমাজ বলে কথা! আমরা যে সমাজে বাস করি এখানে কেউ
গান গাওয়া পছন্দ করে না। কারণ আমাদের ধর্মে গান
গাওয়া নিষেধ। এদিকে তোর জ্যাঠাতো আবার ঘোর নামাজী। নামাজ রোজা ছাড়া কিছুই বুঝেন
না। নামাজ রোজা নিয়ে বাড়ীতে সব সময় হই
হট্টগোল লেগেই থাকে। তোর জেঠি নামাজ পড়ে না বলে তার হাতের রান্না খাওয়াই বাদ
দিয়েছিলো কিছুদিন। নিজেই রান্না করে
খেয়েছে সেই কয়দিন। তোদের বাবা নাটক করে বলে তাঁকেও খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না।
আমীন সাহেবের সাথে রাস্তাঘাটে দেখা
হলেই শুধু নামাজ রোজার কথা বলে। তাই রাশিদা আমীন সাহেবকে খুব একটা পছন্দ করে না। মুসলমান হলে নাম পড়তে হবে, রাখতে হবে,
এটা কে না জানে! এত বলতে দুই বার বললেই
তো হলো। দেখা হলেই শুধু নামাজ আর রোজা।
নামাজ রোজার বাইরে যেন কিছুই করণীয় নাই মুসলমানদের?
সেজন্য রাশিদা ক্ষোভের সাথে বললো-
জ্যাঠার সাথে দেখা হলেই শুধু নামাজ আর রোজার কথা বলে। কি খেয়েছি, কি
খাইনি কোনোদিন জিজ্ঞাসা করেন না। আর গান গাইব
স্কুলের ফাংশনে। স্কুলে গান গাইলে কি ক্ষতি হবে? আমিতো আর অন্য
কোথাও গিয়ে গাইব না!
আমিনা বেগম বললেন- যা বলবার আমার
সামনেই বললি। বড়দের বিরুদ্ধে এভাবে বলতে নেই। তিনি তোদের ভালোর জন্যই তো বলেন।
রাশিদা কিছু বলল না। দুপদাপ করে বাড়ীর
ভেতর চলে এল।
রফিদা স্কুলের কাপড় ছেড়ে বারান্দায়
এসে দাঁড়িয়েছিলো। রফিদাকে দেখেই রাশিদা বলল- চোগলখোর। এসেই চুকলি করেছিস?
বেশ করেছি। আমি গাইতে চাইলাম, আমাকে
গাইতে দিলে না কেন?
তোর যে গলা! তুই গান গাইলে শিয়াল
কুকুর দৌড়ে পালাবে।
তোর গলা তো আবার লতা মাঙ্গেশকরের মতো।
আব্বাকে বলে তোর গান গাওয়া বন্ধ করে দিব। বলে
দিস। আব্বা কিছুই বলবেন না। আব্বা ভালোই বলবে। আব্বা নাটক করে দেখিস না। তাহলে জ্যাঠাকে বলে দিব।
দ্যাখ্, জ্যাঠাকে কিন্তু
বলবি না। এভাবে বলেই রাশিদা নরম সুরে বলল- কাল তোকেও গান গাইতে দিতে বলব স্যারদের।
বলবিতো। দিব্যি ? তুই বললে আমাকেও
নিশ্চয় গাইতে দিবে।
দিব্যি ! এই চোখ ছুঁয়ে বলছি। রাশিদা
দুহাত দিয়ে চোখ ছাপিয়ে ধরল।
দিব্যি যাই করিস না কেন, কাল
আমাকে গান গাইতে না দিলে কিন্তু ভালো হবে না। জ্যাঠাকে বলে দিবই।
নিশ্চয়ই স্যারদের বলব, কিন্তু
স্যাররা যদি আমার কথা না শুনে, তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবি না।
তুই আগে বলেই দ্যাখ, স্যাররা কি বলে
সেটা পরে দেখা যাবে। আমার মনে হয় তুই বলেল স্যারেরা না করবে না। কারণ তোর গান শুনে
স্যারেরা ইতিমধ্যে তোর ফ্যান হয়ে গেছে।
রাশিদা ভেংচি কেটে বললো- স্যারেরা
ফ্যান হয়ে গেছে! একদিন দুটো গান গাইলাম আর স্যারেরা আমার ফ্যান হয়ে গেলো। আমাকে
কাঁড়ে তুলিছস তাই না? কাঁড়ে তুলতে হবে না। কাল আমি নিশ্চয় বলব, যাতে স্যারেরা
তোকে গাইতে দেয়। এভাবে বলেই রাশিদা কথার প্রসঙ্গ পালটিয়ে রাশিদা বললো- হ্যাঁরে, তোর
লেখা গান আছে নাকি?
আছে।
দেখি কোথায় লিখে রেখেছিস।
না, আমি দেখাব না। আমি নিজে গাইব সে
গান।
দেখলে কি ক্ষতি হবে? দেখি
কেমন গান।
এখন নয়। রাতে দেখাব।
রাতে দুই বোন খুব ঘটা করে গানের
প্রেকটিস করল। ‘বাড়ীর পাশে বেতের আড়া হাল জুইরাছে ছোট দেওরা’
গানটা রফিদা ভালোই গাইল। তবে রফিদার গলার সুর একটু
মোটা এবং তাল মাঝেমধ্যে কেটে যায়।
রাশিদা বলল- তোর কণ্ঠ মোটা-মুটি মন্দ
নয়। তবে, তাল কেটে যায় মাঝে-মধ্যে। তাল-লয় ঠিক করতে হবে।
দু’-চার বার প্রাক্টিস
করলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর গলা ছেড়ে গান না গাইলে সুর তাল ঠিক রাখা যায় না কি?
গলা ছেড়ে গাইলেই ঠিক হয়ে যাবে।
পরের দিন স্কুলে এসে কখন গানের
রিহার্সেল শুরু হবে রফিদা তার অপেক্ষায় রইল।সে ক্লাসে তেমন মন বসাইতে পারল না।
মনে মনে
গানের রিহার্সেল করতে লাগল।
দ্বিতীয় পিরিয়ড-এর পরেই রিহার্সেল
শুরু হল। প্রথমে দুইজন ছাত্রী গান গাওয়ার পরে রাশিদা দু'টি গান গাইল। রাশিদার
গান শুনে সবাই হাততালি দিতে লাগল। খুব সুন্দর কণ্ঠ।
তাল-মান-লয় সবই ঠিক। ছাত্ররা তো বটেই স্যারেরাও প্রশংসা করতে লাগল। গণিতের স্যার জলিল
মল্লিক একটু বেরসিক। গান-বাজনা তেমন পছন্দ করেন না। তাঁর মতে গান-বাজনা মনের খোরাক
ঠিকই, তবে লিখা-পড়ার ক্ষতি হয়। মনের খোরাক যোগাইতে গিয়ে জীবনের
বারটা বাজে। ভালো রিজাল্ট করা সম্ভব হয় না। তাই তিনি গান-বাজনা তেমন পছন্দ করেন
না। তবে রাশিদার গান শুনে জলিল মল্লিকও মুগ্ধ হলো।
তিনি বললেন- অপূর্ব। আমি তেমন মন দিয়ে
কোনোদিন গান শুনি না। আজ শুনলাম। খুব ভালো লাগলো। মেয়েটার ভবিষ্যত আছে।
রাশিদা বলল- দোয়া করবেন স্যার। যেন
ভালো করে গাইতে পারি।
নিশ্চয়ই পারবে। তবে, লিখা-পড়ার
ক্ষতি করে শুধু গান নিয়ে ব্যস্ত থেকো না যেন। সামনেই তো ম্যাট্রিক পরীক্ষা।
রিজাল্ট ভালো করতে হবে। শুধু পাস করলেই হবে না। ফার্স্ট
ডিভিসন পেতে হবে।
ইরেজীর স্যার নুরুল তালুকদার বললেন-
শুধু ফার্স্ট ডিভিসন পেলেই হবে না। দুই একটায় লেটার মার্কও রাখতে হবে।
রাশিদা বলল- চেষ্টা করব স্যার। দোয়া
করবেন।
শুধু দোয়ায় কাজ হবে না। তালুকদার
স্যার বললেন- চেষ্টা করতে হবে। যেমন কর্ম করবে, তেমন ফল পাবে।
মৌলভী রাশেদ মৃদা তেমন রিহার্সেলে
উপস্থিত থাকেন না। রাশিদার গানের সুর শুনে তিনিও হলে এসে বসেছিলেন। তিনি বললেন-ইসলামে
গান-বাজনা নিষেধ। তবুও এরকম গান হলে শুনা যায়। খুবই ভালো কণ্ঠ। তিনি রাশিদাকে
উদ্দেশ্য করে বললেন-খুব ভালো। তবে গান নিয়েই যেন ব্যস্ত থেকো না। আমি
এরাবিক নিতে বলেছিলাম। নিলে না। এডভ্যান্স নিলে। এরাবিক নিলে তুমি নির্ঘাত লেটার
মার্ক পেতে।
জলিল স্যার বললেন- এডভ্যান্সেও লেটার
মার্ক পাবে। চিন্তা করবেন না।
রাশেদ মৃদা বললেন- আমরা মুসলমান। ইসলাম
ধর্মের অনুসারি। এরাবিক পড়াটা মুসলমানের জন্য ফরজ।
সবাই যদি এরাবিক নিয়ে পড়ে, ডাক্তার
ইঞ্জিনিয়ার কে হবে? জলিল স্যার বললেন।
রাশেদ মৃদা বললেন- শুধু
প্রস্রাব-পায়খানার রিসার্চ করলে হবে? দিলের রিসার্সও তো করতে হবে।
নুরুল তালুকদার বললেন- দিলের রিসার্চ
করতে গিয়েই তো আমাদের এই অবস্থা! এখন পর্যন্ত ভালো একজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে
পারে নি। সব ক্ষেত্রেই আমরা পরের মুখাপেক্ষী হয়ে আছি। এভাবে চললে, আমাদের
পরবর্তী জেনেরেশ্বন অন্যান্য সম্প্রদায়ের গোলাম হয়ে বসবাস করতে হবে। এপারেই যদি
গোলাম হয়ে ইতরেতর জীবন কাটাতে হয়, সেপারে গিয়ে যে ভালো জীবন পাব এটা আশা
করা যায় না।
রিহার্সেলের দায়িত্বে ছিলেন বাহার
তালুকদার। তিনি হিন্দী শিক্ষক। বললেন- আপনারা এভাবে তর্ক করলে রিহার্সেল করব কখন? মাত্র
পনের দিন সময় পাব। এর মধ্যে রবিবারও রয়েছে। ঠিক মতো রিহার্সেল করতে না পারলে
শেষে দর্শকের গালাগাল শুনতে হবে।
রাশেদ মৃদা বললেন- ঠিক আছে। আর তর্ক
করব না। কথায় বলে না....(নামটা বললাম না) লেজে ঘি মাখলেও সোজা হয় না। সোজা
হবে ঠিকই তখন আর শুধরানোর উপায় থাকবে না।
এভাবে বলেই রাশেদ মৃদা রুম থেকে
বেরিয়ে গেলেন। রাশেদ মৃদার পেছনে পেছনে জলিল মল্লিক ও নুরুল তালুকদারও চলে গেলেন।
আবার রিহার্সেল
শুরু হলো। কয়েকটা গান গাওয়াও হলো।
বাহার তালুকদার বললেন-সবাই বাড়ীতে
প্রেকটিস করবে। দু'দিন পরে হ্যাণ্ডস্ আসবে। বাদ্যের সাথে তাল
মিলিয়ে গাইতে হবে। গানের তালই হল আসল। শুধু কণ্ঠ ভালো হলেই হবে
না। তাল ঠিক থাকতে হবে। গাইতে তো সবাই পারে কম বেশি। তবে, তাল ঠিক রাখাইটাই
হলো আসল কথা।
বাদ্যযন্ত্রের সাথে তো কোনদিন গাইনি।
গাওয়ার পরে তো বুঝতে পারব, তাল ঠিক রেখে গাইতে পারি কি না। রাশিদা
বলল।
সেই জন্যেই তো বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল
মিলিয়ে গাইতে হয়। সুর হলেই হবে না, তাল না হলে সুরের কোনও মূল্য নেই।
সুর-তাল-লয় মিলিয়েই গান হয়। বাহার তালুকদার বললেন- যে কয়টা গান গাইবে মুখস্থ
করে ফেলবে। গান গাওয়ার সময় যেন ভাবতে না হয়, পরের লাইন কি হবে!
স্যার, রাশিদা বলল-
রফিদার অনেক গান মুখস্থ। ও গান গাওয়ার জন্যও খুব আগ্রহী।
কোথায় রফিদা? বাহার তালুকদার
ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
রফিদা এক কোনায় ঘাপটি মেরে বসেছিলো।
সে দাঁড়িয়ে বলল- আমি এখানে স্যার।
তুমি গান গাবে?
চান্স দিলে চেষ্টা করব, স্যার।
আধুনিক গান গাইতে পার?
দু’ একটা পারি
স্যার।
ভাটিয়ালি, মুর্শিদি সবাই
গাইতে পারে। বাহার তালুকদার বললেন- আধুনিক গান সবাই গাইতে পারে না। তুমি যদি গাইতে
পার, তোমাকে
দিয়েই আধুনিক গান গাওয়াব। ঠিক আছে, একটা গাও দেখি শুনি। কোনটা
গাইব, স্যার।
তোমার যেটা ভালো লাগে, সেটাই
গাও। সামনে এস।
রফিদা সামনে এসে গলা খাপড় দিয়ে
রবীন্দ্র নাথের বিখ্যাত গান ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে
একলা চলরে’ গাইতে লাগলো। গান শেষে সবাই হাততালি দিলো।
বাহার স্যার বললেন- মোটামুটি মন্দ
গাওনি। কণ্ঠও ভালো। মাঝে মধ্যে অবশ্যে তাল কেটেছে। তবে বাদ্যযন্ত্রের সাথে গাইলেই
ঠিক হয়ে
যাবে। উচ্চারণেও সমস্যা আছে। উচ্চারণ ঠিক করতে হবে।
ছাত্রদের ফরমাশে আরও দু'টি
গান গাইল রফিদা। সে দু'টিও ভালোই গাইলো।
বাহার তালুকদার বললেন- তাহলে তুমিই
আধুনিক গান গাইবে। এটাই ঠিক হলো। বাড়ীতে মোবাইল আছে নিশ্চয়। মোবাইলে শুনে
শুনে উচ্চারণ, তাল লয় ঠিক করে নিবে।
এর পর একটি গীতিনাট্যের রিহার্সেল হলো।
ইড়ি ক্ষেত। সেখানেও দুই বোন অংশ গ্রহণ করলো।
এভাবেই পনের দিন রিহার্সেল চললো।
বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে গাইতে না পারার জন্য দু'জন বাদও পড়লো।
তবে রাশিদা
এবং রফিদা উভয়ে খুব সুন্দর ভাবেই তাল-লয়-মান ঠিক করে নিলো। মূল অনুষ্ঠানের দিন
সবাই নিজের নিজের পারফম্যান্স ঠিক মতোই শেষ করলো। রাশিদার খুব প্রশংসা
করলো সবাই। পারার ছেলেদের নয়নের মণি হয়ে উঠলো রাশিদা। দু’ চারজন তাকে লতা মাঙ্গেশকর
বলেও সম্বোধন করতে লাগলো। ফলে রাশিদা খুবই উৎসাহিত হয়ে উঠলো। তার মনে হতে লাগলো,
ফাংশন যদি প্রতিদিনই হতো, তাহলে খুব ভালো
হতো।
(দুই)
রাশিদাদের গ্রামের নাম রসুলপুর।
গ্রামটা অনেক পুরাণা। ব্রিটিশ আমলের। কাছেই মানাস নদী। আগে অবশ্যে গ্রামটা নদী
থেকে অনেকটা
দূরে ছিলো। চার মাইল পূবে। তখন রসুলপুর গ্রামটা নদীর পূব পারে ছিলো। সদরে যেতে হলে
নদী পার হওয়ার প্রয়োজন হতো না। একমাত্র বেকী নদী পার হয়ে যেতে হতো।
মানাস নদী পার হওয়ার প্রয়োজন হতো না। একবার বন্যার সময় গতি পরিবর্তন করে
নদীটা রসুলপুর গ্রামটাকে কায়েম থেকে বিচ্ছিন্ন করে নদীর পশ্চিম ফেলেছে। তা-ও ধরন,
প্রায় ত্রিশ বছর গে। তাই গ্রামে এম, ই স্কুল এবং
হাইস্কুল উভয়ই রয়েছে। কলেজের আগে পর্যন্ত লিখা-পড়ার জন্য কারও গ্রামের বাইরে
যেতে হয় না।
মানাস নদী। খুবই খরস্রোতা নদী। মানাস
নদীর উৎপত্তি স্থল ভূটান পাহাড়। মানাস ভূটানের চারটা নদীর মধ্যে অন্যতম। নদীর দৈর্ঘ
চার শ কিলোমিটার। এই চার শ কিলো মিটারের মধ্যে তিব্বতে ২৪ কিলোমিটার, ভূটানে
২৭২ কিলো মিটার এবং আসামে ১০৪ কিলো মিটার। নদীটা আসামের যোগীঘোপার
নিকটে ব্রহ্মপুত্র নদীর সাথে এসে মিশেছে। মানাসের উপনদী আই নদী। চিরাঙের বাংপারীতে
মানাসের সাথে এসে মিশেছে।
মানাস পাগলা নদী। খরার মরশুমে নদীটা
মরা অজগরের মতো নিশ্চল হয়ে পরে থাকে। কোন কোন জায়গায় হাটু জল, কোথাও কোথাও
আবার মাজা জল। স্রোতও তেমন থাকে না। তখন অনেকেই হেঁটেই নদী এপার-ওপার হয়। তবে
বর্ষায় নদীর রূপ ভিন্ন। নদী ফুলে-ফেঁপে উঠে। প্রচণ্ড স্রোত। হেঁটে
নদী পার হওয়া তো দূরের কথা, নৌকা নিয়েও নদী পার হওয়া দুষ্কর হয়ে
পরে। তখন মানুষগুলোকে
হাত-পা গুটিয়ে বাড়ীতেই বসে থাকতে হয়। প্রয়োজনেও নদী এপার-ওপার হওয়া যায় না।
অসুখ-বিসুখ হলে কবিরাজের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া অন্য উপায় থাকে না।
অৱশ্যে দলং একটা আছে। তবে রসুলপুর গ্রাম থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে। বিশেষ প্রয়োজন
না হলে রসুলপুরের কেউ দলং দিয়ে যায় না। নৌকা যোগে বা হেঁটে নদী পার হৈয়েই
আসা-যাওয়া করে।
কোন কোন বছর আবার নদী উগ্র রূপ ধারণ
করে। পারের মাটি খসিয়ে নেয়। ঘর-বাড়ী উজার করে। ঘরবাড়ী এপারা থেকে ওপারায়
স্থানান্তর করতে হয়। সুখের সংসার দুখে ভরে। অন্ন-বস্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়।
এভাবেই চলে রসুলপুর গ্রামের জন জীবন।
রাশিদাদের অৱস্থা তেমন ভালো নয়। দিন
ভিক্ষা, তনু রক্ষা করে চলে। রাশিদার বাবা রশিদ মোল্লা বি,এ
পাস। একটি ভেন্সার হাইস্কুলের শিক্ষক। বিশ বছর ধরে বিনা বেতনে
শিক্ষকতা করছে। স্কুল সরকারীকরণ হয়নি। এবছর হবে, সামনের বছর হবে
এভাবেই আশায়
বুক বেধে আছে স্কুলের শিক্ষকরাঁ।
রশিদ মোল্লার জমি-জমা নদীর পেটে।
রুজি-রোজগারের তেমন সাধন নেই। রাশিদার মা আমিনা বেগম অঙ্গনবাদী কর্মী। তার রোজগারেই
সংসার চলে। চলে মানে চালিয়ে নেয়। রশিদ মোল্লা একজন অভিনেতা। শীতকাল এলেই
শিক্ষকতার পাশাপাশি শখের নাটক করে বেড়ায়। অভিনেতা হিসেবে খুবই ভালো।
অঞ্চলে নাম-ডাক আছে।
সেদিন সকালে রশিদ মোল্লা বাজারে
যাচ্ছিলেন। নিকটেই বাজার। পোয়া ফার্লঙের মতো হবে। বাজারে যাওয়ার সময় রাস্তায় দেখা
হলো তাঁদের ওপারার হাসমত আলীর সাথে। হাসমতও বাজারে যাচ্ছিছিলো। সে সাইকেলে চড়ে
যাচ্ছিলো। হাসমত আলী রশিদ মোল্লার ছাত্র। তাই রশিদ মোল্লাকে দেখে
সে সাইকেল থেকে নেমে বলল- বাজারে যাচ্ছেন নাকি, স্যার?
হ্যাঁ, বাজারেই যাচ্ছি।
তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আমিও বাজারেই যাব। সেখান থেকে সদরে
যাব।
সদরে কেন?
হাসমতের পিঠে দোতারা বাঁধা ছিলো। সে
একটু পেছন দিকে মাথাটা ঘুরিয়ে দোতারার দিকে তাকিয়ে বলল- দোতারাটার কয়েকটা
তাঁর ছিড়ে গেছে। তাই মেরামত করতে যাব।
হাসমত ভালো বায়েন। বাদ্যযন্ত্রে হাত
আছে। সব রকম বাদ্যযন্ত্রই বাজাতে জানে। বিশেষ করে দোতারায় তার বিশেষ নাম আছে। সে
দোতারায় টোকা মারলে যেন মধু ঝরে। দু’এক জায়গা থেকে দোতারা বাজানোর জন্য
আমন্ত্রণও আসে। দুই তিনজন ছেলে গায়ক নিয়ে সে একটা দল মতো করেছে। বিভিন্ন
জায়গায় দলবল নিয়ে যায় গান গাইতে।
হাসমত আলী বললো- স্যার, আমি
একটা কথা ভাবছি। যদি আপনি মত দেন তো কাজটা করতে পারি।
রশিদ মোল্লা এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন-
কি ভাবছ? খুলে বলো, ভূমিকা রেখে।
রাশিদার কথা বলছি। রাশিদা তো স্যার খুব
ভালো গান গায়। কণ্ঠও ভালো। তাল-লয়ও ঠিক আছে। একটু তালিম দিলে ভালো গায়ক
হয়ে উঠবে।
রাশিদা ভালো গান গায় রশিদ মোল্লাও
জানে। ফাংশনের দিন তিনি রাশিদার গান শুনেছেন। তার মেয়ে যে এত ভালো গান গায় এ ছিলো
তার কল্পনারো অতীত। রাশিদার গান শুনে তিনি অভিভূত। হাসমত সঙ্গীত সম্পর্কে সমঝদার
ব্যক্তি। তাই হাসমতের মুখে রাশিদার প্রশংসা শুনে রশিদ মোল্লার
বুকটা আনন্দে ভরে গেলো। তাই হাসমত রাশিদা সম্পর্কে কি বলতে চাইছে শুনার জন্য তিনি উদগ্রীব
হয়ে উঠলেন। বললেন - সরাসরি বলো, কি বলতে চাও?
আমাদের বায়না আছে একটা স্কুলের
ফাংশনে। আপনি অনুমতি দিলে রাশিদাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি। ওর প্রতিভাও বিকাশ হবে,
সেই সাথে কিছু টাকাও আসবে ঘরে।
হাসমত আলীর আপাদ মস্তক লক্ষ্য করে রশিদ
মোল্লা বললেন- কিন্তু লোকে ঠাট্টা করবে না তো? ও স্কুলের
ফাংশনে ভালই গেয়েছে। আমিও শুনেছি গান। একটু ঘসে-মেজে পালিশ
করলে মনে ভালোই করবে। প্রতিভা থাকলেই হয় না, সুযোগের প্রয়োজন
হয়। লাউ গাছে লাউ লাগে আমরা সবাই জানি। কিন্তু লাউ লাগে মাচানের জোরে। মাচান না
দিলে লাউ গাছে লাউ লাগতে পারে না। শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না। মাচান
মানে সুযোগের প্রয়োজন হয়। সুযোগের অভাবে অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে যায়। এই তোমার
কথাই ধর, তোমার প্রতিভা আছে বিকাশ করতে পারলে না সুযোগের অভাবে।
স্যার, আপনিও তো কম নন।
আপনার যা প্রতিভা, সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পেলে অনেক কিছুই
করতে পারতেন। শুধু শিক্ষক হিসাবে নয়, অভিনেতা হিসাবেও
সবাই আপনাকে ‘গুরু’ বলে মানে।
সবার দ্বারা সব কাজ হয় না হাসমত।
ভাগ্য লাগে। রশিদ মোল্লা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আক্ষেপের সুরে বললেন- আমি ভাগ্য তেমন বিশ্বাস
করি না। কর্মকেই বেশি গুরুত্ব দিই; কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস না করেও
পারি না। আমি ভাবি, হয়তো আমার ভাগ্যেই নেই। এখন যে
রকম ইউটিউব এসেছে, তখন এ রকম সুবিধা থাকলে নিশ্চয় একটা কিছু করতে
পারতাম।
তাহলে ভাবতে পারি, রাশিদাকে
নিয়ে গেলে আপনার আপত্তি নেই?
কিন্তু আমার ভয় হয়, যদি
লোকে বলে, মেয়েকে দিয়ে রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি।
আপনাকে উপদেশ দেবার মতো ধৃষ্টতা আমার
নেই, স্যার। তবুও বলছি, লোকের বদনামের ভয়ে রাশিদার প্রতিভা
গৃহবন্দি করে রাখবেন না।
রশিদ মোল্লার কপালের বলি রেখায়
কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। তিনি চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- রাতের ব্যাপার! যাবে কীভাবে?
আমরা টেম্পো নিয়ে যাওয়ার কথা
ভাবছিলাম। রাশিদা গেলে মারুতি নিয়েই যাব। মারুতি ভাড়াও স্কুল কমিটি থেকেই দিবে। টাকাও
কম দিবে না, স্যার। বিশ হাজার টাকা বন্দবস্ত। রাশিদাকে
নিয়ে গেলে আরও দশ হাজার টাকা বেশি আদায় করতে পারব। রাশিদা গেলে গাড়ী নিয়েই যাব। আপনিও
চলুন না স্যার আমাদের সাথে।
না না, আমি যাব না।
তোমাদের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। তোমরা নিশ্চয় রাশিদার কোনো ক্ষতি হতে দিবে না।
সন্ধ্যায় তুমি আমাদের বাড়ী যেও। রাশিদার সাথে আলোচনা তো করতে
হবে না-কি? সে যদি যেতে চায়, তবেই তো হবে।
তদুপরি রাশিদার মা গান-বাজনা খুব একটা পছন্দ করেন না। তার সাথেও
আলোচনা করা দর্কার।
নিশ্চয় স্যার, তবে আপনি অনুমতি
দিলে ম্যাডাম না করবেন না। ম্যাডাম অঙ্গনবাদী কর্মী। তিনি নিজেও তো ছোট ছোট ছেলে- মেয়েদের
নাচ-গান শেখায়। স্কুলে পড়ার সময় ম্যাডাম নিজেও তো গান গাইতেন। আমরা চোখে না
দেখলেও লোক মুখে শুনেছি।
কাপড়-চোপড়ের কথা আছে। দশজনের সামনে
দাঁড়িয়ে গান গাইতে হবে। ওর তো তেমন ভালো কাপড় নেই।
গুণ থাকলে রূপের দর্কার হয় না,
স্যার। শেলোয়ার কামিজ পড়ে গেলেই হবে। শীতের দিন। তাই শীতের জন্য
একটা সোয়েটার লাগবে।
সোয়েটার আছে। সোয়েটারের চিন্তা করতে
হবে না। স্কুলের ফাংশনের জন্য সেদিন কিনে দিয়েছি।
তাহলে চিন্তা নেই।
তাহলে কথা থাকল, সন্ধ্যায় তুমি
আমাদের বাড়ী যাবে!
নিশ্চয় স্যার।
কথা বলতে বলতে তাঁরা এসে বাজারে
পৌঁছোল। চা খেয়ে হাসমত সদরের দিকে চলে গেলো। রশিদ মোল্লা প্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে
বাড়ী চলে এলেন।
(তিন)
সন্ধ্যাবেলা হাসমত আলী রাশিদাদের বাড়ী
এলো। হাসমত আলী বাংলা ঘরের বাইরে থেকে ডেকে বললো- স্যার, আছেন নাকি?
রশিদ মোল্লা বাংলা ঘরে বসে হাসমতের
জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বললেন- হাসমত নাকি? এস এস, আমি
তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি।
হাসমত আলী গৃহের ভেতর প্রবেশ করে বললো-
একটু তারাতারিই চলে এলাম। আমাদের আবার রিহার্সেল আছে। বড় অনুষ্ঠান। একটু
প্রেকটিস করে না গেলে হয় না। পাছে স্যার, আপনি কথাটা রাশিদার সাথে আলোচনা করেছেন
নাকি?
না, করিনি। ভাবছি,
তুমি এলে এক সাথেই আলোচনা করব।
তাহলে রাশিদাকে ডাকুন।
রাশিদা মনে হয় পাক ঘরে আছে। ওর নানী
এসেছে। নানীর সাথে গল্প করছে হয়তো বা। রশিদ মোল্লা বসা থেকে উঠে দরজার সামনে এসে রাশিদাকে
ডাকলেন- রাশিদা, রাশিদা…...
রাশিদা পাক ঘর থেকে উত্তরে বললো- আব্বা,
আমাকে ডাকছেন?
হ্যাঁ, এখানে একটু এস।
রাশিদা দরজার সামনে এসে বললো- কিছু
লাগবে আব্বা?
না কিছু লাগবে না। হাসমত এসেছে তোমার
সাথে কথা বলতে।
হাসমত আলী একটি চেয়ারে গা এলিয়ে
বসেছিলো। রাশিদা ঘরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে হাসমতকে দেখে একটু অবাক কণ্ঠে বললো-
হাসমত ভাই আপনি?
হ্যাঁ, আমি। তোমার সাথে
দেখা করতে এলাম।
রাশিদা অবাক কণ্ঠে বললো- আমার সাথে
দেখা করতে এসেছেন! আমি কি এমন বিশেষ ব্যক্তি হলাম যে আমার সাথে দেখা করতে
এসেছেন?
হাসমত আলী বললো- আগে ঘরের ভেতরে এস।
তারপর ধীরে সুস্থিরে কথা বলি।
হাসমত আলী তার সাথে দেখা করতে এসেছে!
কথাটা যেন কেমন একটু খাপ ছাড়া লাগলো রাশিদার। হাসমত আলী তার সাথে দেখা
করতে আসবে কেন? সে কি এমন বিশেষ ব্যক্তি হলো যে হাসমত আলীকে
তার সাথে দেখা করতে আসতে হলো? তাই সে হাসমত আলীর কথার মাঝে রহস্যের ইঙ্গিত
পেলো। কথায় বলে না যার মন যেমন, তার মনে তেমন কথাই জেগে উঠে। সে এই কয়দিন
শুধু গানের কথাই ভেবে আসছে। তাই সে ভাবলো, হাসমত ভাই সম্ভবতঃ গানের কথাই বলবে।
স্কুলের ফাংশনে হাসমতই তার সাথে দোতারা বাজিয়েছিলো। তখন হাসমত খুবই প্ৰশংসা করেছে
তার গানের। তাই হাসমতকে দেখে
রাশিদা উৎফুল্লিত হয়ে উঠলো।হাসমত ভাই মনে হয়, গানের কথাই বলবে। হাসমত
ভাই যদি কোনো জায়গায় গান গাওয়ার কথা বলতে এসেছে, তাহলে ভালোই
হবে। না, না, সে কি ভাবছে? মানুষ যা ভাবে,
তা সব সময় হয় না কি? অন্য কথাও তো হতে পারে! তাই সে হাসমত আলীর
আগমনের উদ্দেশ্য জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। সে ঘরের ভেতর প্রবেশ
করে শান্ত স্বরে বললো- আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন? কেন?
রাশিদ মোল্লা বললেন- আরে তোকে কথাটা
বলাই হয়নি। তোকে দিয়ে হাসমত একটি ফাংশনে গান গাওয়াতে চায়। আমাকে সকালে
কথাটা বলেছে। তাই আমি ওকে আসতে বলেছি। তোর এবং তোর মার মতামত ছাড়া আমি কি বলব?
কোথায় গান গাইতে হবে?
একটি স্কুলের ফাংশনে। তিন দিন পর ফাংশন। বড় ফাংশন। অনেক
লোকের সমাগম হবে। হাসমত বললো।
ফাংশনে গানে গাওয়ার কথা শুনে রাশিদা
পুলকিত হয়ে উঠলো। তাদের স্কুলে গান গাওয়ার পর থেকে সে শুধু ভেবেই চলেছে, আবার
কবে গান গাইতে পারবে। স্কুলের ফাংশনে গান গাওয়ার পর থেকে অঞ্চলে তার অনেকটা
গুরুত্বও বেড়েছে। এখন সবাই তাকে সমীহ করে চলে। অনেকে তার নাম দিয়েছে লতা মাঙ্গেশকর। তাকে
দেখলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের অনেকে বলে, ঐ দ্যাখ লতা মাঙ্গেশকর যাচ্ছে।
তখন গর্বে তার বুক ফুলে উঠে। তাই সে গান গাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে আছে। কখন সে আবার
গান গাইতে পারবে এই কল্পনায়ই বলতে গেলে সব সময় তার মন বিভোর হয়ে
থাকে। তবে কল্পনা আর বাস্তব অনেকটা তফাৎ। বাইরে গিয়ে গান গাওয়ার কথা শুনে
তার মনে ভয় সঞ্চার হলো। রাশিদা তার দুর্বলতার কথা জানালো- গাইতে তো ইচ্ছে আমারও
হয়, তবে আমাদের স্কুলে গেয়েছি বলে বাইরে গিয়ে কি গাইতে পারব?
তোদের স্কুলে গেয়েছিস বলেই তো অন্য
জায়গা থেকে আমন্ত্রণ এসেছে। হাসমত বললো- কিচ্ছু না। এখানে যেভাবে গেয়েছিস সেখানেও
সেভাবে গাইলেই হবে। তোর গান সবাই পছন্দ করবে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। যা একটু আধটু দুর্বলতা
আছে দু’দিন রিহার্সেল করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
মা বা আবার কি বলে! জ্যাঠা গান-বাজনা
পছন্দ করেন না বলে স্কুলের ফাংশনেই গান গাইতে মানা করছিলেন মা।
রশিদ মোল্লা এতক্ষণ চুপ মেরেই ছিলেন।
এবার তিনি নীরবতা ভংগ করে বললেন- আমাদের এই এক সমস্যা! কিছু করতে গেলেই ধর্মের
বাধা। আমার নাটক করা নিয়েও কি কম কথা শুনতে হয় আমাকে? আগে তোমার মাকে ডাকো। দেখি সে কি বলে?
রাশিদা তার মাকে ডাকতে গেলো। আমিনা পাক
ঘরে রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। রাশিদা বললো- আম্মা, আব্বা তোমাকে ডাকছেন।
বাংলা ঘরে যেসব কথা হচ্ছিলো আমিনা সে
বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি বললেন- আমায় ডাকছে কেন?
যাও, গিয়েই শুন।
আমিনা কাপড়ের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে
বাংলা ঘরের দরজার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলেন- আমায় ডেকেছেন? কেন?
রশিদ মোল্লা মুচকি হেঁসে বললেন- আমি আর
কি বলব! হাসমতের মুখেই শুন।
হাসমত আলী আমতা আমতা করে বললো- স্যার,
আপনি বললেই তো হয়! আমাকে বলতে বলছেন কেন?
তুমিই বলো। দর্কার হলে আমি পরে বলব’খন।
হেঁয়ালি রেখে বলে ফেল, কি
বলতে চাও? পাক ঘরে রান্না চড়িয়েছি। আমিনা বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন।
হাসমত আলী এবার গলা খাপড় দিয়ে বললো-
ম্যাডাম, রাশিদাকে একটি স্কুলের ফাংশনে গান গাওয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইছি। কাছেই।
খুব একটা দূরে নয়। আমরা আমাদের দল নিয়ে যাব। রাশিদাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব ভাবছি,
যদি আপনি অনুমতি দিন তো..…....
আমার তরফ থেকে ‘না’ই
বলবো। আমিনা একটু উষ্মার স্বরেই বললেন- স্কুলে গান গেয়েছে বলে লোকের কথা শুনতে
হচ্ছে। ওর জ্যাঠা
তো সেদিন ডেকে নিয়ে গিয়ে দুই কথা শুনিয়েই দিয়েছেন। আজ বাদে কাল মেয়েকে বিয়ে
দিতে হবে। সেই মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছি বলে।
লোকের কথা। হাসমত বললো- ভালো কাজ করলেও
লোকে সমালোচনা করবে, মন্দ কাজ করলেও করবে। আমাদের সমাজে প্রচলিত
একটা কথা আছে না, বড় বৌয়ের আগে গেলেও দোষ, পেছনে
গেলেও দোষ। লোকে দোষ ধরবেই। দোষ ধরাটাই তো লোকের কাজ। লোকের ভয়ে শামুকের মতো হাতপা গুটিয়ে বসে
থাকলে ভালো কিছু করা কি সম্ভব হবে?
আমিনা বললেন- হবে না ঠিকই। তবে,
সমাজ. আত্মীয় স্বজন নিয়ে থাকি। তাঁদের কথা তো ভাবতেই হবে।
হাসমত আলী বললো- রাশিদার প্রতিভা আছে।
সুযোগ দিলে সে অনেক কিছু করতে পারবে। মানুষ নামই তো চায়, না-কি? জগতে
এলাম, আর মেসিনের মতো কাজ করে টাকা রোজগার করলাম, আর এক সময় সব
কিছু ছেড়ে চলে গেলাম। একে জীবন বলা যায় না। এমন কিছু করে যেতে হয়, মৃত্যুর
পরেও যেন মানুষ মনে রাখে। মানুষ কর্মকে মূল্য দেয়। নজরুল ইসলাম একটি গানে বলেছেন
না, আমায় নহে গ’ ভালোবাস, শুধু ভালোবাস মোর গান। মানুষ
কর্মকে ভালোবাসে। মানুষটাকে নয়। টাকা রোজগার তো সবাই করে। মুচি, মেতর, নাপিত,
গুণ্ডা, বদমাশ সবাই। কেউ সৎভাবে, কেউ আবার অসৎ
ভাবে। যারা টাকা রোজগার করে তাদের কেউ মনে রাখে না। মনে রাখে, যারা কর্ম করে।
ভালো কর্ম করলে, মানুষ তাঁদের
যুগ যুগ মনে রাখে।
আমাদের মতো গরীবদের একটাই কাজ, সৎভাবে
রোজগার কর, খাও। এর বাইরে আর কি ভালো কাজ করবে? আমিনা
বললেন।
রশিদ মোল্লা বললেন- এটা হলো ছোট
মানসিকতার কথা। গরীবরাও ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারে। শুধু থাকতে হবে সদিচ্ছা।
আমরা সবাই সঙ্গীত জগতের মহম্মদ রফি এবং লতা মাঙ্গেশকরের কথা জানি। মহম্মদ রফির
বাবা লাহোরে একটি নাপিতের দোকানের মালিক ছিলেন। লতা মাঙ্গেশকর
গরীব পরিবারের সদস্য ছিলেন। ভাই-বোনদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন যাপন করতেন। শুনা যায়,
ছোট ভাই-বোনদের কথা ভেবেই তিনি জীবনে বিয়ে করেন নি। কথাটা তাঁর বোন
আশা ভোঁসলে একদিন এক সাক্ষাতকারে বলেছেন। এরাঁ গরীব হয়ে যদি বিশ্বের সেরা হতে পারেন,
রাশিদা পারবে না কেন? সুযোগ দিলে রাশিদাও একদিন হয়তো লতা
মাঙ্গেশকরের মতো হতে পারবে। ওর
সে প্রতিভা আছে, আমরা শুধু সুযোগ করে দিতে হবে।
আমিনা বললেন- আমার মন মানসিকতার কথা তো
আপনি জানেনই। আমিও তো চাই রাশিদা একটা কিছু করুক। ভালোভাবে লিখা-পড়া শিখেও তো তা করা যায়।
সবার প্রতিভা এক রকমের হয় না। রশিদ
মোল্লা বললেন- শচীন তেণ্ডুলকার বিশ্বের সেরা ব্যাটম্যানদের অন্যতম। তিনি কিন্তু লিখা-পড়ায়
ভালো ছিলেন না। তাঁকে যদি ক্রিকেট বাদ দিয়ে লিখা-পড়া করার জন্য জোর দেওয়া হতো
তাহলে কি আমরা এত একজন ভালো ক্রিকেটার পেতাম? সবারই প্রতিভা
আছে, তবে ক্ষেত্র নির্বাচনের জন্য অনেক সময় প্রতিভা বিকাশ হতে পারে না।
মোল্লা নাসির উদ্দিন ইরানের একজন সুফি সাধক ছিলেন। সুফি সাধক
হলেও তিনি কৌতুকপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে একদিন একজন জিজ্ঞাসা করেছিলো- মোল্লা
সাহেব, মানুষ সকাল বেলা উঠে একেক জন একেক দিকে যায় কেন? তখন
নাসিরুদ্দিন বলেছিলেন- সবাই যদি এক দিকে যায়, তাহলে দুনিয়াটা কাত হয়ে যাবে। তাই একেক জন একেক
দিকে যায়। আমাদের সমাজেও ব্যালেন্স রাখার জন্য একেক জনকে একেক বৃত্তি
বেছে নিতে হয়। কেউ প্রফেসর হবে, কেউ ডাক্তার, কেউ
ইঞ্জিনিয়ার। তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য কাউকে গায়ক, কাউকে খেলোয়াড়ও
হতে হবে।
আপনি যা ভালো বুঝবেন, করুন।
আমিনা বললেন- কিন্তু রাশিদার জ্যাঠা যেন আমাকে দোষারূপ না করেন।
সে পরে দেখা যাবে। রশিদ মোল্লা বললেন-
তাহলে হাসমত, রাশিদা যাওয়াটা খাটাং। যাতে দুর্নাম না হয়,
সে দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব কিন্তু তোমার।
আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। হাসমত
বললো- রাশিদা আমার ছোট বোনের মতো। তার ক্ষতি হোক, এমন কোনো কাজ আমি হতে
দিব না।
আমিনা বললেন- ও একা যাবে না। রফিদাকেও
সঙ্গে নিয়ে যেও।
চারদিন পরে রাশিদা ফাংশনে গান গেলো। সবাই
গান পছন্দ করলো। কেউ কেউ ভিডিও করে ইউটিউবেও ছেড়ে দিলো। সাথে সাথেই
ভিডিও ভাইরেল হয়ে গেলো।
এর পরে রাশিদা আরও দু'টি
ফাংশনে গান গেলো। সেখানেও তার খুব নাম-ডাক হলো। এর পরেও কয়েক জায়গা থেকে বায়না এলো;
কিন্তু সামনেই ম্যাট্ৰিক পরীক্ষা। তাই রাশিদা
সে সব বায়না ফিরিয়ে দিলো।
(পাঁচ)
রশিদ মোল্লার সকালে বাজারে যাওয়ার
অভ্যাস। সকালে উঠে হাতমুখ ধুয়ে সটান বাজারের দিকে রওনা দেওয়াটা তাঁর অনেক দিনের
অভ্যাস। একদিন এ নিয়ে আমিনা বেগম রেগে গিয়ে বলেছিলেন- এ কি অভ্যাস আপনার?
সকালে উঠেই বাজারের দিকে যান। বাড়ীতে ছেলেমেয়েদের পড়া-শুনা
দেখিয়ে দিতে পারেন, তা না, সকালে উঠে হাতমুখ ধুয়েই সটান বাজারের
দিকে রওনা দেন। তারপর বাজার থেকে এসেই নাকেমুখে ভাত গোঁজে স্কুল।
বাড়ীতে কি হয়, কি না হয়, তার কোনো খবরই রাখেন না আপনি!।
কি করি বল, সেই ছোট বেলা
থেকেই বাজারে যাওয়ার অভ্যেস। রশিদ মোল্লা তখন কৈফিয়তের সুরে বলেছিলেন- বাজারে
গেলে বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা হয়। একটু
চায়ের অভ্যেসও হয়েছে। চা না খেলে মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে।
কাল থেকে সকালে বাড়ীতেই চা করব। আমিনা
বেগম থমথমে লগায় বলেছিলেন- আজ বাজার থেকে চা-চিনি-বিস্কুট নিয়ে আসবেন।
আমিনার কথা মতোই রশিদ মোল্লা বাজার
থেকে চা-চিনি এনেছিলেন এবং বাড়ীতেই চা খাওয়ার বন্দবস্ত হয়েছিলো, কিন্তু
কয়েক দিন খাওয়ার পরেই চা খাওয়া বাদ দিতে
হয়েছিলো খরচের কথা ভেবে। আয় তাঁদের সীমিত। বলতে গেলে আমিনার মাইনের টাকায় সংসার চলে। সে আর কত টাকা। মাসিক পাঁচ হাজারের মতো। রশিদ মোল্লার আয় রোজগার নেই। ভেন্সার
স্কুলের শিক্ষক। কাজ ঠিকই করতে হয়,
তবে কাজের বিনিময়ে কিছুই পাওয়া যায় না। আজ স্কুল প্রাদেশীকরণ হবে,
কাল হবে করতে করতে বিশ বছরই পার হয়ে গেছে।
তবে সরকার স্কুল প্রাদেশিকরণ করেনি। এদিকে জমিজমা যা ছিলো, সবই নদীর পেটে।
নদী ভাঙনের আগে পর্যন্ত সচ্ছল না হলেও মোটামুটি
ভালোভাবেই সংসার চলত। নদী ভাঙনের পরে সংসারে অভাব দেখা দিয়েছে। নুন আনতে পান্তা
ফুরোয় অবস্থা।
এদিকে সংসারের খরচও বেড়েছে। ছেলেমেয়ে
নিয়ে পাঁচজনের সংসার। দু’টি মেয়ে, একটি ছেলো।
মেয়ে দু'টি বড়, ছেলেটা ছোট। মাত্র
চার বছর বয়স ছেলের। মেয়ে দু'টি পিঠোপিঠি। উভয়ে হাইস্কুলে পড়ে।
একজন ক্লাস টেনে, একজন এইটে। ছেলেটা অঙ্গনবাদী কেন্দ্রে যায় মা’র সাথে। ছেলে মেয়েরা যত বড় হচ্ছে,
ততই সংসারের খরচ বাড়ছে। এখন আমিনার রোজগারের টাকায় সংসার চলতে চায়না। মানে চালিয়ে নিতে হয়। সংসারের অবস্থা দেখে একেক সময় রশিদ
মোল্লা ভাবেন, স্কুল ছেড়েই দিবে; কিন্তু দিতে
পারেন না। স্কুলের প্রতি, ছাত্র-ছাত্রীদের
প্রতি মায়া ধরে গেছে।
মাঝেমধ্যে টিউশন পড়ানোর কথাও ভেবেছেন
রশিদ মোল্লা। কয়েকবার টিউশনি নিয়েছিলেনও, কিন্তু পড়ানোর
বিনিময়ে ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া? এটা
কোনো দিন মেনে নিতে পারেন নি তিনি। ছাত্র পড়ানোর পর মাস শেষে টাকা নেওয়ার সময়
বলেছেন, না, টাকা দিতে হবে না। নিজের ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর
বিনিময়ে কী টাকা নেওয়া যায়?
টাকা না নেওয়ার জন্যই আমিনা একদিন রাগ
করে বলেছিলেন- আপনার টিউশন পড়াতে হবে না। তার থেকে যেমন চলতেন, সেভাবেই
চলেন।
সেদিন বাজারে যাওয়ার মুখে বাড়ী থেকে
বেরিয়েই আমিনার সাথে রশিদ মোল্লার দেখা হলো। আমিনাকে দেখে রশিদ মোল্লা জিজ্ঞাসা করলেন-এই সাত সকালে কোথায় গিয়েছিলে?
আমিনা বেগম সকালে উঠেই আমিন সাহেবের
বাড়ী গিয়েছিলেন। কারণ আমিন সাহেব তাঁর অঙ্গনবাদী কেন্দ্রের সভাপতি। অঙ্গনবাদী কেন্দ্রের প্রয়োজনে একটি সই দর্কার হয়েছিলো।
বড় ভাইদের বাড়ী গিয়েছিলাম একটি সই
আনতে। সকালে না গেলে অনেক সময় বাড়ীতে পাওয়া যায় না। তাই সকালে নামাজ পড়েই গিয়েছিলাম। সইটার দর্কার কয়েক দিন আগেই হয়েছিলো। ভাই সাহেব
সিল্লায় গিয়েছিলেন বলে সইটা করাতে পারেনি। কাল রাতে
বাড়ী ফিরেছে বলে খবর পেয়েছিলাম। তাই সেই সই আনতে গিয়েছিলাম।
বাড়ীতে পেলে?
হ্যাঁ, বাড়ীতেই ছিলেন।
আমিনা বেগম প্রসিডিং খাতাটা দেখিয়ে বললেন- এই যে সইটাও করিয়ে এনেছি।
ভালোই করেছ। বলেই রাশিদ মোল্লা বাজারের
দিকে রওয়ানা হলেন।
আমিনা বেগম বললেন- বড় ভাই আপনাকে দেখা
করতে বলেছেন।
কারণ?
কারণ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কিন্তু
বললেন না। বললেন, দর্কার আছে। আমার সাথে দেখা করলে রশিদকেই বলব।
কি তেমন দর্কার হলো, তোমাকে
বলতে পারলেন না? রশিদ মোল্লার কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়লো।
আমিনা চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- মনে হয়
রাশিদার সম্পর্কেই কিছু বলবে।
রাশিদার সম্পর্কে কি বলবে?
গান গাওয়া সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন
বড় ভাই জানল কেমন করে? কে
বলেছে?
তা আমি কি জানি? কথায় বলে না,
অ-কথা, কু-কথা বাতাসের আগে চলে।
কিন্তু বলবে কে? রশিদ মোল্লার
কপালের বলি রেখা স্ফীত হয়ে উঠলো।
বলার মানুষের অভাব নাকি? রাশিদার
গান ইউটিউবে ভাইরেল হয়েছে। মুন্সি মৌলভীরা ইউটিউব দেখেন না নাকি? তাঁদেরই কেউ
একজন দেখে বলেছে হয়তো। আমিনা পরামর্শের স্বরে বললেন- আগে গিয়েই দেখেন কি বলতে
চাইছে। রাশিদার কথা তো নাও হতে পারে! ক্ষেতে না গিয়েই কৃষাণের
ভাও নেওয়ার কি দর্কার।
বাজারে যাওয়ার পথেই আমিন সাহেবের
বাড়ী। রশিদ মোল্লারা চার ভাই, দুই বোন। ভাইদের মধ্যে আমিন মোল্লা
জ্যেষ্ঠ, মেজো ভাইয়ের নাম কালাম মোল্লা। একেবারে ছোট জনের
নাম ফিরদুস মোল্লা। রশিদ মোল্লা তিন নম্বর। দু'টি বোনই বয়সে
রশিদ মোল্লার চেয়ে বড়। বোনদের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। নদী
ভাঙনের আগে চার ভাই এক জায়গায়ই ছিলেন। নদী ভাঙনের পরে একেক ভাই একেক
জায়গায় বাড়ী করেছে। কালাম মোল্লা গেছে শশুড় বাড়ীর দেশে। ফিরদুস আগে থেকেই
ওয়াহাটীতে সব্জির দোকান করতো। নদী ভাঙনের পরে সে গুয়াহাটীতেই জমি
কিনে বাড়ী করেছে। তাঁর অবস্থা এখন ভালো। ঘরভাড়া পায়। স্কুল প্রাদেশিকরণ হয় না
বলে ফিরদুস
রশিদ মোল্লাকেও গুয়াহাটী যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। গেলে অবশ্যে ভালোই
হতো। এখন ভাত কাপড়ের চিন্তা করতে হতো না। টিউশনি করেই সংসার চালাতে
পারতেন। টিউশনি করে অনেকে গুয়াহাটীতে জমি কিনে বাড়ীঘরও করেছে।
আমিন মোল্লা ১০ সিপারার হাফিজ। মসজিদে
ইমামতি করেন। তবলীগ আসার পর থেকে তবলীগ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তাঁর বাড়ী
একটু দূরেই। একই পারায়, আট দশ বাড়ী পরে। বাজারে যাওয়ার পথে।
বাজার পাওয়ার একটু আগে। আমিন সাহেবের অঞ্চলে সুনামও আছে সৎ এবং পরহেজগার ব্যক্তি
হিসাবে।
আমিন সাহেব বাড়ীতেই ছিলেন। বাড়ীর
ভেতর প্রবেশ করে রশিদ মোল্লা ডাকলেন- বড় ভাই, বাড়ী আছেন?
ঘরের ভেতর থেকে আমিন সাহেব বললেন- আছি।
কে, রশিদ? এস। ঘরের ভেতর এস।
রশিদ মোল্লা ঘরের ভেতর প্রবেশ করে
সালাম জানিয়ে বললেন- আমায় আসতে বলেছিলেন, বড় ভাই?
হ্যাঁ, রাশিদার মা
এসেছিলো, তার কাছেই বলে দিয়েছিলাম। আমিন সাহেব রশিদ মোল্লার আপাদ মস্তক লক্ষ্য
করে বললেন- জরুরি কথা আছে তোমার সাথে। বস।
চেয়ার পাতা ছিলো। রশিদ মোল্লা চিয়ারে
বসে বললেন- কি এমন জরুরি কথা? বলেন। আমি বাজারে যাইতেছি।
কথা অবশ্যে জরুরিই। তবে, তেমন
কিছু না। ভূমিকা সেরে আমিন সাহেব বললেন- রাশিদার বিয়ে সম্পর্কে ডেকেছি। একটা ভালো
পাত্র আছে। শিক্ষক। হাইস্কুলের। খুবই নম্র স্বভাবের। আমার সহপাঠী বন্ধু রফিক
সাহেবের ছেলে। আমরা এক সাথে হাফিজী পড়েছিলাম। আমি তো হাফিজ হতে পারিনি। তবে তিনি
হয়েছেন। তিনিও স্থানীয় হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন।
রশিদ মোল্লা ভেবেছিলেন, হয়তো
রাশিদার গান গাওয়া নিয়ে কিছু বলবে। কিন্তু এতো দেখি গানের চেয়েও ভীষণ প্রস্তাব।
কিন্তু রশিদ
মোল্লা সরাসরি আপত্তি না করে আমতা আমতা করে বললেন- কিন্তু, রাশিদা তো সবে
ক্লাশ টেনে পড়ে। এ বছরই ফাইন্যাল। মার্চ মাসে। বিয়ের বয়েসও হয়নি। সবে ষোল
বছর। এখনই বিয়ে! লোকে কি বলবে? আঠারো বছরের আগে বিয়ে দেওয়াটাও তো অপরাধ।
ছেলের একৈশ এবং মেয়ের আঠারো বছরের আগে বিয়ে দেওয়াটা অবৈধ বলে সরকার আইন পাস
করেছে।
[বললাম বলেই আজই বিয়ে দিবে নাকি?
পরীক্ষাটা দিক। পরীক্ষার পরে শুভ কাজটা সারলেই হলো। ভালো পাত্র সব
সময় পাওয়া যায় না। তাই বলছি। তুমি বলছ, সরকার
আঠারো বছরের আগে বিয়ে দেওয়াটাকে আইন করে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আমাদের ইসলামিক
আইনে পনের বছর হলেই বিয়ে দেওয়া চলে। শরিয়ত মানব, না সরকারের আইন
মানব? আমাদের কাছে শরিয়ত আগে, পরে সরকার।
যে দেশে থাকি সে দেশের আইন মেনে তো
চলতে হবে না-কি? রশিদ মোল্লা যুক্তি দর্শালেন।
সরকারী আইন মানতে গিয়ে শরিয়তের
বিরুদ্ধে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
চৈধ্য শ বছর আগের আইন এখন কোনো কোনো
ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন করাটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে
চলতে হলে সেই পরিবর্তন মেনে নিতেই হবে। না হলে আমরা অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে অনেক
পিছিয়ে পরব।
তুমি শরিয়ত মানবে, না
সরকারের আইন মানবে?
কথায় কথায় বাঢ়ে, মাখনে
উঠে ঘি। রাশিদ মোল্লা ভাবলেন, তর্ক করলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
কথায় কথায় বেড়ে যাবে। তাই বললেন- শরিয়ত মানব না কেন? শরিয়তও
মানতে হবে, আবার সরকারের আইনকেও মানতে হবে। যে আইন
জনসাধারণের মঙ্গলের
জন্য সে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েও শরিয়ত মেনে চলাটা সম্ভব। ঠিক আছে বড় ভাই,
আমি এখন যাই এ বিষয়ে পরে কথা হবে। আগে পরীক্ষাটা দিক, পরে
বিয়ের কথা ভাবা যাবে।
রশিদ মোল্লা উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘরের
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন।
আমীন সাহেব স্বগতোক্তি করলেন- চোরে
শুনে না ধর্মের বাণী। শরিয়ত মেনে না চলার জন্যই এক সময় দেশটা রসাতলে যাবে। শরিয়ত
মেনে না চলার জন্যই দেশে এত দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, সুনামি। কবে যে
মানুষের সুমতি হবে! কথা কয়টা রশিদ মোল্লার কাণেও পৌঁছোল, তবে
কিছু বললেন না। ধীর পদক্ষেপে এসে রাস্তায় উঠলেন।
(ছয়)
রাশিদা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলো। পরীক্ষা
ভালোই হলো। ফাৰ্ষ্ট ডিভিশন পাওয়াটা নিশ্চিত। বাড়ীতে কোনো কাজ নেই। বসে বসেই সময়
কাটায়। মাঝে মধ্যে হাসমত আলী আসে। সঙ্গীত চর্চা করে। সুর-তাল-লয় তো আছেই,
ভাষা নিয়েও চর্চা করে। সুর-লয়-তাল যেমন সংগীতের প্রাণ, ভাষাও
তেমনই সঙ্গীতের ধমনী। ভাষা ঠিক না হলে সঙ্গীতের গভীরতা থাকে না। সঙ্গীত মর্যদা
হারিয়ে ফেলে। উচ্চারণ ঠিক হতে হবে- শব্দ অনুসারে উচ্চারণ হতে
হবে। এই সব নিয়ে চর্চা হয়। সঙ্গীত কত প্রকার তা নিয়ে চর্চা হয়। ঠুমরি, দাদরা, ভজন,
গজল, চাইতি, কাজরি, টপ্পা, নাট্য
সঙ্গীত এবং কাওয়ালী প্রভৃতি। নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত,
লালন গীতি, লোকগীতি, সুগম সঙ্গীত
নিয়েও আলোচনা হয়।
একদিন রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলীর
মধ্যে সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা চলছিলো।
হাসমত আলী বললো- স্যার, আমরা
বলতে গেলে সঙ্গীত সম্পর্কে কিছুই জানি না। আগে রেডিওতে শুনে শুনে শিখতাম, এখন শিখি
ইউটিউবে শুনে শুনে। আমাদের সঙ্গীত সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। লোকগীতি,
বাউল, লালন গীতি এবং দুই চারটা হিন্দী গীতই আমাদের সম্বল। আমরা যেটুকু
জানি, তা আমরা রাশিদাকে শিখিয়েছি। শাস্ত্রীয় সংগীত বা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত,
রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, জ্যোতি সঙ্গীত,
বিষ্ণু রাভার সঙ্গীত, ভূপেন্দ্র সঙ্গীত, পার্বতী
প্রসাদের গীত, আধুনিক গীত. সুগম সঙ্গীত, ভজন,
শ্যামা সঙ্গীত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য।
এগুলো শুধু রেডিও, টিভি, ইউটিউবে শুনে শুনে শিখা যায় না।
ওস্তাদের কাছে শিখতে হয়। রেওয়াজ করতে হয়।
এখন তো রাশিদা বাড়ীতেই বসে বসে সময়
কাটাচ্ছে। রশিদ মোল্লা বললেন- কলেজে এডমিশন নেওয়ার আগ পর্যন্ত তো ঢের সময়। বাড়ীতে বসে বসে এমনিতে অলসভাবে সময় কাটানোর চেয়ে ভালো কোনো
সঙ্গীত অনুষ্ঠানে রাশিদাকে সঙ্গীত শেখালে কেমন হয়?
শেখালে তো ভালই হয়। হাসমত আলী বললো-
আমি অনেক দিন থেকে কথাটা ভাবছি। তবে বলার সাহস পাইনি। আপনি বা আবার
কি ভাবেন?
কি আর ভাববো। রশিদ মোল্লা বললেন- গান
যদি গাইতেই হয়, তাহলে জেনে-শুনে গাওয়াই ভালো হবে। ওস্তাদ
ছাড়া কোনো কাজ
হয় না। যে কাজই কর না কেন, ওস্তাদের প্রয়োজন হয়। ওস্তাদ ছাড়া
বিদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না। আমার ইচ্ছে রাশিদা ভালো কোনো ওস্তাদের কাছে সঙ্গীত শিখুক। তোমার
তেমন কোনো অনুষ্ঠানের কথা জানা আছে নাকি, যেখানে রাশিদাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
শেখানো যায়?
আমার জানার মধ্যে একটা অনুষ্ঠান আছে।
সা-রে-গা-মা সঙ্গীত সেণ্টার। বরপেটায় অবস্থিত। সেণ্টারের কর্ণধার ওস্তাদ খন্দকার মিজানুর
রহমান। ভালো মাপের সঙ্গীতজ্ঞ মিজানুর রহমান। তিনি আন্তর্জাতিক দূরদর্শন এবং
অনাতাঁর শিল্পী। দেশ এবং বিদেশ থেকে তিনি অনেক সন্মান পেয়েছেন। তবে আমাদের
অঞ্চলের খুব কম লোকই তাঁর বিষয়ে জানে।
আমাদের কয়জন লোক সঙ্গীত নিয়ে চর্চা
করে? চর্চা করলে তো
জানবে!
ইসলামে সঙ্গীত চর্চা শরিয়ত-এর
পরিপন্থী। তাই কেউ সঙ্গীত নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। সমাজে যাদের কোনো মূল্য নেই তাদেরই
দুই চারজন শখের সঙ্গীত নিয়ে ভাবে। তাদের কারোর সঙ্গীত বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা
নেই। বিশেষ করে সমালোচনার ভয়ে কেউ সঙ্গীত চর্চা করতে এগিয়ে যায় না। এই আপনার
কথাই ধরুন, আপনি
নাটক করেন বলে আপনার পিঠে পিছে কতজন আপনার সমালোচনা করে, তা আপনি গোনেও শেষ করতে পারবেন না।
সমালোচনার ভয়ে বসে থাকলে চলবে না।
রাশিদ মোল্লা বললেন- আমি রাশিদার ঈশ্বর প্রদত্ত কণ্ঠের সুবিচার করতে চাই। তুমি মিজানুর
রহমানের সাথে আলোচনা করে দেখ, তিনি
শেখাবেন কিনা?
শেখাবে তো নিশ্চয়ই। আমাদের মেয়েরা
সঙ্গীত চর্চা করে না বলে, তিনি
অনেক সময় আক্ষেপ করেন। রাশিদা সঙ্গীত শিখতে গেলে তিনি খুশীই হবেন।
তাহলে তুমি তাঁর সাথে কথা বল।
আমি একা আর কি কথা বলব? আপনিও চলুন। একসাথেই আলোচনা করবো’খন।
তাহলে কোন দিন যাওয়া যায়?
একদিন গেলেই হলো। তিনি বরপেটাতেই
ঘরভাড়া করে থাকেন।
দু'দিন পরেই হাসমত আলী এবং রশিদ মোল্লা বরপেটায় এসে মিজানুর রহমানের
সাথে দেখা করলেন। ছোট একটা রোম। নজরুল, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর,
জ্যোতি প্রসাদ, পার্বতী
প্রসাদ, বিষ্ণু রাভা, ভূপেন হাজরিকার ফটো দিয়ে রোমটা
সাজানো। মিজানূর রহমানের চুলগুলো বড় বড়। ঠিক নজরুল ইসলামের মতো। পরনে পায়জামা
পাঞ্জাবী। সৌম্যদর্শন চেহেরা। শরীরের রংটা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। চোখে
সরু ফ্রেমের চশমা।
কুশল বিনিময় করার পর মিজানুর রহমান
বললেন- তা আপনারা কি মনে করে?
হাসমত আলী রশিদ মোল্লার পরিচয় দিয়ে
বললো- স্যারের মেয়ে রাশিদা ভালো গান গায়। গানের গলাও ভালো। ইতিমধ্যে দুই তিনটা
স্টেজে গান গেয়ে ভালই সুনাম অর্জন করেছে। তার গান ভাইরালও হয়েছে। এবার ম্যাট্রিক
পরীক্ষা দিয়েছে। এখন বাড়ীতেই বসে আছে। আপনার কাছে গান শেখার জন্য আগ্রহী।
মিজানূর রহমান একটু অন্যমনস্কভাবে রশিদ
মোল্লাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুনলাম আপনি শিক্ষক। আপনার মেয়ে গান শিখতে চায়!
সমাজে সমালোচনা হতে পারে। আমাদের সমাজের কথা তো জানেনই। আবার সমালোচনার ভয়ে
পিছিয়ে যাবেন না তো?
রশিদ মোল্লা বললেন-সমালোচনা হয় হোক।
আমি সমালোচনার ভয় করি না।
শুধু সমালোচনাই হবে না। মিজানূর রহমান
বললেন- আপনার মেয়ের বিয়েও না হতে পারে। একটা গল্প বলি, আমার একজন ছাত্রী ছিলো। নাম বলবো না। গান
শেখার জন্য তার এখন পর্যন্ত বিয়ে হয় নি। দেখতে শুনতে ভালো। অনেক সমন্ধ এসেছে, তবে স্টেজে স্টেজে গান করে বলে কেউ
সমাজের ভয়ে বিয়ে করতে সাহস পায় নি। অবশেষে সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সে
কলকাতায় চলে গেছে। শুনেছি, সে
গানের সাথে নাচ শিখে কালকাতায় ভালোই প্রভাব বিস্তার করেছে। তার বিধবা মাকে মাসে
মাসে টাকাও পাঠায় বলে শুনেছি। একটি ভাইয়ের লেখা-পড়ার খরচও সে চালায়। লোকের কথা
কী বলব। আমার কথাই ধরুন, সঙ্গীত
নিয়ে ব্যস্ত থাকি বলে, আমার
আত্মীয়স্বজন আমাকে পছন্দ করেন না। পরিবার, ছেলে-মেয়েরা আমার সাথে থাকে না। সবাই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। প্রায় পনের
বছর যাবত আমি এখানেই ঘরভাড়া করে নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আমার তেমন প্রচারও
নেই। শ্রোতারা সস্তার সঙ্গীত শুনতে অভ্যস্ত। নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত কেউ শুনতে চায় না। এ
সব সঙ্গীত গাইলে শ্রোতারা চা খেতে যায়। লোকে আমার গান শুনে না বলে আমার প্রচারও
তেমন হয় না। আবার অনেকে আমাকে পাগলও ভাবে।
ভালো জিনিষের কদর ক’জনে করে। রশিদ মোল্লা আক্ষেপেরে সুরে
বললেন- আমি নাটক করি বলে আমাকেও অনেকে পাগল ভাবে।
পাগল না হলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।
মিজানূর রহমান বললেন- এই সংসারে কে না পাগল, কেউ পাগল টাকার জন্য,
কেউ পাগল নারীর জন্য। আবার কেউ পাগল নামের জন্য। এই সংসারটা তো
পাগলেরই খেলা।
মানুষের মুখেই জয়, মানুষের মুখেই ক্ষয়। মানুষ যা চায়, তা করলে তবে তো সমাজে গুরুত্ব পাওয়া
যায়। হাসমত আলী বললো।
লোকের গুরুত্ব পাওয়ার জন্য আসল ছেড়ে
নকল নিয়ে ব্যস্ত হবো নাকি? মিজানূর
রহমান ক্ষোভের সাথে বললেন- লোকে পিতলকে সোনা বলবে, আমিও মেনে নেব নাকি?
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বাদ দিয়ে কী সঙ্গীতের কথা ভাবা যায়? যেখান থেকে সঙ্গীতের সৃষ্টি সেটাকেই
আমরা অস্বীকার করছি- অবহেলা করছি। সব মানুষের মন মানসিকতা এক রকম হয় না। কেউ
অন্যায় করে, আবার
কেউ অন্যায় বরদাস্ত করে না। যারা ন্যায়ের পথে চলে, অন্যায়দেখলে তাঁদের মাথা গরম হয়ে উঠে। লোকের গুরুত্ব পাওয়ার জন্য
আমি সঙ্গীতের শেকড় থেকে সরে যেতে পারব না। এত দিনই যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না। মিজানূর রহমান
দীর্ঘশ্বাস টেনে রশিদ মোল্লাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- বাদ দিন এসব। এখন কাজের কথায়
আসি। আপনি সত্যিই কি মেয়েকে গান শেখাতে চান?
চাই বলেই তো এতো দূর আপনার সন্ধানে
এসেছি।
মেয়েকে গান শেখালে আপনার কিন্তু
সমস্যা হতে পারে।
স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে গেলে
সমস্যা তো একটু-আধটু হবেই। রশিদ মোল্লা বললেন- আমি ভেবে-চিন্তেই এসেছি।
হাসমত আলী মোবাইল বের করে বললো-
রাশিদার গান শুনুন, ওস্তাদ।
আপনারও ভালো লাগবে।
হাসমত আলী মোবাইল টিপে দু'টি গান শুনালেন।
মিজানূর রহমান খুব মনযোগ দিয়ে গান
শুনে বললেন- গানের কণ্ঠ মন্দ নয়। তবে রেওয়াজ করে পালিশ করতে হবে। এ সব গান গেয়ে
স্টেজে ঝড় তোলা যায় ঠিকই, তবে
সঙ্গীত শিল্পী হওয়া যায় না। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত না শিখলে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, জ্যোতি সঙ্গীত গাওয়া যায় না।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত রেওয়া করলে কণ্ঠ পালিশ হয়। যেমন ধরুন, । আগে শিরিষ দিয়ে ঘসে করলে দেয়াল
চিকচিক করে। শিরিষ পেপার দিয়ে না ঘষে রং করলে দেয়াল মসৃণ হয় না। কণ্ঠ তো আর
শিরিষ পেপার দিয়ে ঘষা যায় না। তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত দিয়ে কণ্ঠটাকে মসৃণ করতে
হয়।
যা করতে হয় আপনি করবেন। হাসমত আলী
বললো- রাশিদা নিজেও নতুন কিছু শেখার জন্য আগ্রহী।
ঠিক আছে। আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি
নেই। নিয়ে আসবেন। যতদূর সম্ভব আমি শেখানোর চেষ্টা করবো।
কিন্তু সমস্যা হলো, যাওয়া-আসা নিয়ে। তাঁদের গ্রাম থেকে
বরপেটা প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ই-রিস্কা চলে। তবে সঙ্গীত চর্চা
হয় সকালে আর বিকেলে। তাই ই-রিস্কায় সকাল বিকেল আসা-যাওয়া করা সম্ভব নয়। প্রথম
দু’দিন রশিদ মোল্লা
নিজেই নিয়ে
আসলেন রাশিদাকে সা-রে-গা-মা মিউজিক সেন্টারে।
রাশিদার খালার বাড়ী বরপেটার নিকটেই।
তাঁদের বাড়ী থেকে বরপেটা মাত্র দশ মিনিটের রাস্তা। আসা যাওয়ার সমস্যার জন্য পরে খালার
বাড়ীতেই থাকার সিদ্ধান্ত হলো। রাশিদা খালার বাড়ী থেকেই যাওয়া-আসা করে আগ্রহ
সহকারে সঙ্গীত শিখতে লাগলো। সঙ্গীত বিষয়ে সে ভালো উন্নতিও করলো। মিজানুর রহমান নিজেও সন্তুষ্ট
হলেন রাশিদার উন্নতি দেখে।
(ছয়)
একদিন বিকেল বেলা আমীন সাহেব এলেন রশিদ
মোল্লাদের বাড়ী। মসজিদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য তিনি একটা আসতে পারেন না। নিকটে বাড়ী হলেও মাসে
দুই একবার আসেন। তিনি এসেই রশিদ মোল্লাকে ডাকলেন- রশিদ বাড়ী আছ?
রশিদ মোল্লা বাড়ীতে ছিলেন না। আমিনা
বেগম ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সালাম জানিয়ে বললেন- ভাই সাহেব, আপনি? আসেন, বসেন।
আমিন সাহেব বারান্দায় চেয়ারে বসে
বললেন-রশিদ কোথায়? তাকে
দেখছি না তো। বাড়ীতে নাই নাকি?
এতক্ষণ বাড়ীতেই ছিলেন। স্কুল থেকে এসে
কাপড়চোপড় খুলে একটু রাস্তায় বেরিয়ে গেছেন। এক্ষুণি এসে পরবে। আমি রফিদাকে ডাকতে
পাঠাচ্ছি।
রাশিদা কোথায়?
তার খালার বাড়ী গেছে।
কবে?
কয়েক দিন হলো।
কয়েক দিন হলো মানে? ক’দিন হলো?
পনের দিন।
পনের দিন খালার বাড়ী আছে? এ কেমন কথা? বিয়ের বয়সী মেয়ে। আজ বাদে কাল বিয়ে
দিতে হবে। সে কিনা পনের দিন ধরে খালার বাড়ী আছে! লোকে কি বলবে? দিনকাল ভালো নয়। কখন কি হয় বলা যায় না। রাশিদাকে বাড়ী নিয়ে আসতে
বল।
তাকে বাড়ী নিয়ে আসা যে অসুবিধা আছে
অর্থাৎ রাশিদা সঙ্গীত শিখতে গেছে এ কথা বলার সাহস হলো না আমিনার। কারণ
সঙ্গীত শেখার কথা বললে আমিন সাহেব তেলে
বেগুনে জ্বলে উঠবেন। তাই প্রসংগটা সেখানেই শেষ করার জন্য বললেন- রাশিদার আব্বা বাড়ী এলে
বলবো’খন। ভাই সাহেব
একটু চা করি?
কর। বিকেলে কেমন যেন চা খাওয়ার অভ্যেস
হয়ে গেছে। চা না খেলে শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে।
আমিনা চা করে আনলো। চা খেয়ে আমিন
সাহেব বললেন- কই রশিদ আসছে না যে! কত সময় বসবো? হাতের ঘড়ী দেখে বললেন- আধা ঘণ্টা পরেই মাগরিবের নামাজ। বাইর বাড়ী দিয়ে দেখতো, রফিদা খুঁজতে গেছে, না রাস্তায় খেলা করছে?
আমিনা বেগমের বাইর বাড়ী গিয়ে দেখার
প্রয়োজন হলো না। ব্যস্তভাবে রশিদ মোল্লা বাড়ীর ভেতর প্রবেশ করলেন। তিনি আমিন সাহেবকে
বারান্দায় বসে থাকতে দেখে ব্যস্তভাবে বললেন- বড় ভাই, কখন এসেছেন?
হলো একটু সময় । আমিন সাহেব বললেন-
তোমার অপেক্ষায় বসে আছি। ভেবেছিলাম তোমার সাথে দেখা করে কথাটা বলে চলে যাব। তুমি বাড়ী
নেই বলে বসতে হলো। মাগরিবের ওয়াক্তও হয়ে আসছে। তাই ভূমিকা না করে সরাসরি বলি।
তোমাকে যে কথাটা বলেছিলাম
তা নিয়ে কি চিন্তা-ভাবনা করেছ?
কি কথা, বড় ভাই?
সেদিনের কথা আজই ভোলে গেছ? তোমার মনে নেই? রাশিদার বিয়ের কথা। পরীক্ষা তো
কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে। এখন পাত্রপক্ষ দেখতে চাইছে। তাদের কি বলবো? আসতে বলবো?
সরাসরি মানা করলে আমিন সাহেব বিরক্ত
হবে বলে রাশিদ মোল্লা বললেন- কী বলব বলুন তো? সবে তো পরীক্ষা শেষ হলো। একটু ভাববার সময়
দিন, পরে ভেবে-চিন্তে বলবোখন।
এতে অত ভাবার কী আছে? মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে। এই তো সংসারের নিয়ম,
না কি?
বড় ভাই, এখন সময় দ্রুত বদলাচ্ছে। রশিদ মোল্লা বললেন-আগে ছেলে-মেয়ে
অভিভাবকের ওপড় নির্ভরশীল ছিলো। অভিভাবকেরা যা বলতো তাই ছেলে-মেয়েরা নির্বিবাদে
মেনে নিতো। এখন আর নিতে চায় না। ছেলে-মেয়েরা নিজেদের পছন্দ মতো বিয়ে করতে চায়।
আর রাশিদার বিয়ের বয়েস তো তেমন হয়নি। সবে ষোল বছর।
কোনো অসুবিধে নেই। আমিন সাহেব বললেন-
এখন রেজিষ্টার করলেও সার্টিফিকেটটা আঠারো বছর পূরা হলে ইস্যু করবো। কোনো অসুবিধা
হবে না। আমি নিজেই তো কাজী।
বলেছিলেন ছেলে হাইস্কুলের শিক্ষক।
তাহলে তো ছেলে বি,এ
পাস। রশিদ মোল্লা যুক্তি দিলেন- ছেলের বয়স তো রাশিদার চেয়ে অনেক বেশি হবে।
ছেলের বয়স একটু আধটু বেশি হলে অসুবিধা
নেই। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরই তো বাইশ বছর বয়সে নয় বছরের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন।
তোমার ভাবীও তো আমার চেয়ে বার বছরের ছোট।
অবশেষে রশিদ মোল্লা যুক্তি
দর্শালেন-রাশিদা লেখা-পড়ায় ভালো। ফার্স্ট ডিভিসন পাবে। ও বিয়ের জন্য রাজি কি-না
সেটাও তো জানতে হবে। যদি পড়তে চায়, মানা করবো কীভাবে?
মেয়েদের পড়ে কি হবে? শেষ-মেশ তো চুলা-চৌকাই সামলাতে হবে
না-কি?
আপনাদের এই মানসিকতার জন্যই আমাদের
সমাজের এই অবস্থা। মেয়েরা লেখা-পড়ায় পিছিয়ে রয়েছে। ইসলাম ছেলেমেয়ের পার্থক্য
করেন নি। তবে আমরা করি কেন? শুধু
নামাজ-রোজাকেই আমরা ইসলাম বলে জানি। নামাজ-রোজার বাইরেও যে ইসলামের অনেক অবশ্য করণীয়
কর্তব্য রয়েছে, তা
আমরা কখনও বলি না। ইসলামের অবশ্য করণীয়-কর্তব্য-এর মধ্যে শিক্ষাও একটা। আয়সা (রাঃ), রাবিয়া বসরী প্রভৃতিরাঁ বিদুষী মহিলা
ছিলেন। মেয়ে বলে ইসলাম এঁদের তো লেখা-পড়া করতে নিষেধ করেন নি। তবে, আমরা নিষেধ করি কেন? আমাদের সমাজের অর্ধেক নর এবং অর্ধেক
নারী। নারীরা শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানে সমাজকে পিছিয়ে রাখা। অন্যান্য
সম্প্রদায়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই।
লেখা-পড়ার কথা কে নিষেধ করেছে? রাশিদা ম্যাট্রিক দিয়েছে। অনেক
পড়েছে। এর থেকে বেশি কী আর পড়বে?
আমিন সাহেব দেখলেন এভাবে যুক্তি তর্ক করে কুলিয়ে উঠা যাবে না। তাই
তিনি প্রসংগ পালটিয়ে বললেন- ভালো পাত্র সব সময় পাওয়া যায় না। পাত্র ভালো। পাঁচ
ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না। আর হ্যাঁ, রাশিদা বোলে পনের দিন ধরে খালার বাড়ী
আছে? এতদিন কি করছে
সেখানে?
এবার রশিদ মোল্লা থতমত্ খেলেন। কী বলবে? গানের কথা বললে তো লংকা-কাণ্ড বেধে
যাবে। তাই তিনি আমতা আমতা করে বললেন- না, এমনি, পরীক্ষা
দিয়ে বাড়ীতেই বসে ছিলো, তাই
বেড়াতে গেছে।
বেড়াতে গিয়ে পনের দিন! এটা কেমন কথা? বাড়ী নিয়ে এস। দিন-কাল ভালো নয়।
হ্যাঁ, আনতে যাব।
আনতে যাবে মানে ? যাও। নিয়ে এস। আমিন সাহেব ঘড়ী দেখে
বললেন- মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে আসছে। এ বিষয় নিয়ে পরে আলোচনা করবো।
আমিন সাহেব তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন।
রশিদ মোল্লা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
(সাত)
রাশিদার উন্নতি দেখে মিজানূর রহমান
খুবই সন্তুষ্ট। তিনি মন-প্রাণ দিয়ে রাশিদাকে গান শেখাতে লাগলেন। ভারতীয়
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ৮৩ প্রকার রাগের ভেতর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত যশরাজ
ক্লাসিফিকেশন করা ছয়টি রাগ ভৈরবী,
রাগ মালকোশ, রাগ
দীপক, রাগশ্রী, রাগ মেঘমল্লার এবং রাগ হিন্দোল-এর
প্রাথমিক জ্ঞান প্রদানের পরে মিজানুর রহমান রাশিদাকে রাগ ভূপালী, রাগ ইমন, রাগ খামাজ প্রভৃতি তিনটি রাগ শেখাতে লাগলেন।
রাশিদা নিজেও মন-প্রাণ ঢেলে সঙ্গীতের
নতুন নতুন পাঠ শিখতে লাগলো। সঙ্গীতের নতুন দিক উন্মোচিত হতে লাগলো তার কাছে। এক
মাসের মধ্যেই সে উপরোক্ত রাগ সঙ্গীত-এর অনেক কিছুই শিখে ফেললো। রাশিদার চেয়ে অনেক
আগে থেকে যারা সঙ্গীত শিখছে, রাশিদা
তাদের চেয়েও অনেক এগিয়ে গেলো।
রাশিদার উন্নতি দেখে একদিন মিজানূর
রহমান বললেন- রাশিদা, তুমি
অনেক উন্নতি করেছ। এভাবে এগিয়ে গেলে এক বছরের মধ্যেই তুমি পণ্ডিত যশরাজ-এর
নিদ্ধারিত ছ'টি রাগও
মোটা-মুটি আয়ত্ব করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। সঙ্গীত সাধনার জিনিষ। সবাই শিখতে
পারে না। ভারতবর্ষে ক’জন
লোক রাগ সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ? হাতে
গোনা কয়েকজন। পণ্ডিত সয়াই গন্দর্ভ, মুসুরি সুব্রমণিয়া আইয়ার, ওস্তাদ বন্দে গোলাম আলি খান, হীরাবাই বরোডেকার প্রভৃতিরাঁ আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে
সমৃদ্ধ করে গেছেন। হীরাবাই বরোডেকার মহিলাদের সঙ্গীত জগতের পথপ্রদর্শক ছিলেন।
তোমাকেও হীরাবাই বরোডেকার-এর মতো হতে হবে। সঙ্গীত শিখতে গেলে ধৈর্য লাগবে। সস্তার
সঙ্গীত রেডিও, টিভি, মোবাইলে শুনে শুনেই শেখা যায়। রাগ
সঙ্গীত শেখা যায় না। রাগ সঙ্গীত অন্যান্য সঙ্গীতের প্রাণ। রাগ সঙ্গীত থেকেই
বিভিন্ন প্রকার সঙ্গীতের উৎপত্তি। রাগ সঙ্গীত শেখাটা কঠিন, যদিও অসম্ভব নয়।
রাশিদা বললো- আমি চেষ্টা করবো ওস্তাদ।
দোয়া করবেন।
মিজানূর রহমান বললেন- দোয়া তো
নিশ্চয়ই করবো। তবে শুধু দোয়ায় কাজ হবে না। চেষ্টাটাই আসল। আমাদের সবার মাঝেই প্রতিভা
রয়েছে। চেষ্টা এবং সুযোগের অভাবে অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে যাইতেছে।
রাশিদা কিছু বলল না। হাঁ করে মিজানূর
রহমানের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিজানূর রহমান একটু বিরতি নিয়ে বললেন-
তুমি আর একটু উন্নতি করলেই তোমাকে আমি শিলচর রেডিও সেন্টারে অডিশনের জন্য পাঠাব।
অডিশনে পাস করতে পারলেই স্বীকৃত শিল্পী হয়ে যাবে। স্বীকৃত শিল্পী না হলে অনেক
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। মানুষের স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে।
আমি কি পারব ওস্তাদ?
পারা না পারাটা পরের কথা। অংশগ্রহণ
করাটা বড় কথা। ঘঁষে থাকলে পাথরও ক্ষয় হয়।
আমি তো বেশিদিন শিখতে পারব না, ওস্তাদ। রিজাল্ট বেরোলেই কলেজে এডমিশন
নিতে হবে।
অসুবিধে হবে না। পাশ করার পর বরপেটাতে
এডমিশন নিলে লেখা-পড়ার সাথে সাথে সঙ্গীত চর্চাও বজায় রাখতে পারবে।
দু’টো কাজ একসাথে চালাতে পারব বলে আমার বিশ্বাস হয় না, ওস্তাদ। রাশিদা নিজের দুর্বলতার কথা
জানালো।
ঐ যে বললাম চেষ্টা। মিজানূর রহমান
বললেন- চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। চেষ্টা এবং মানসিক প্রস্তুতিই আসল। তোমার প্রতিভা আছে।
চেষ্টা এবং মানসিক প্রস্তুতির জোরে সেই প্রতিভাকে শুধু বিকশিত করতে হবে। মনটাকে
ঠিক মতো প্রস্তুত করতে পারলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। মনের দুর্বলতাই আমাদের
বিকাশের অন্তরায়। তুমি যদি মনে করো, কাজটা পারবে, তাহলে
একবারে না হলেও দ্বিতীয় তৃতীয় বারে নিশ্চয় সফল হবে। আর তুমি যদি মনে কর কাজটা
পারবে না, তাহলে
কোনোদিনই পারবে না। মানুষ অসাধ্যকে সাধন করতে পারে শুধু মানসিক প্রস্তুতির জোরে।
সঙ্গীত চর্চা চললো। একদিন রশিদ মোল্লা
এলেন রাশিদার সাথে দেখা করতে।
রাশিদা বললো- ওস্তাদ আমাকে অডিশনে
পাঠানোর কথা বলছে।
অডিশন? কিসের অডিশন?
গুয়াহাটী, শিলচর, ডিব্রুগড়, আগরতলা
প্রভৃতি রেডিও সেন্টারে সঙ্গীতের অডিশন হয়। সেখানে পাঠাবে।
তুমি পারবে নাকি অডিশন দিতে?
ওস্তাদের তো আমি পারব বলেই ধারণা।
ওস্তাদ যদি বলে নিশ্চয় যাবে। রশিদ
মোল্লা বললেন- কবে যাবে?
দিন এখনও ঠিক করেনি। আপনার সাথে আলোচনা
করে ঠিক করবে বলেছে।
ওস্তাদ আছে নাকি রুমে ? চল, ওস্তাদের কাছে গিয়ে শুনি কীভাবে কখন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মিজানূর রহমানের বাসায় এসে ভালোমন্দ
খোঁজ খবর নিয়ে রশিদ মোল্লা বললেন- ওস্তাদ, আপনি নাকি রাশিদাকে অডিশনে পাঠাতে চান?
মিজানূর রহমান বললেন- হ্যাঁ, কথাটা অবশ্যে ভেবেছি। আপনি অনুমতি দিলে
তবে শিলচর আকাশ বাণীর সাথে যোগাযোগ করব ভেবেছি। রেডিও সেণ্টারে নতুন শিল্পীদের
সুযোগ প্রদানের জন্য সুগম সঙ্গীত,
ভজন, লোকগীতির
অডিশন অনুষ্ঠিত হয়। নিদ্ধারিত ফর্মে এক নির্দ্ধারিত মাসুল দিয়ে আবেদন করতে হয়।
৩০ মিনিটের অডিশনে সফল হলে নতুন শিল্পীদের ‘বি’ গ্রেড
প্রদান করা হয়।
কেন আমাদের গুয়াহাটীতে অডিশনের সুবিধা
নেই?
আছে। তবে, আমি শিলচরের কথা ভাবছি। শিলচরে আমার এক
বন্ধু আছে, তাঁর
বাড়ীতেই থাকার ব্যবস্থা হবে। তখন হোটেল খরচ বেঁচে যাবে। আমি আমার বন্ধুর সাথে
ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছি। সে কোনো অসুবিধা নেই বলেছে। আমি ভাবছি, ‘বি’ গ্রেড প্রাপ্ত হলে তখন সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতা সা-রে-গা-মা অথবা
ইণ্ডিয়ান আইডলে অংশ গ্রহণ করার কথা চিন্তা করবো।
সেগুলো তো অনেক বড় প্রতিযোগিতা। রশিদ
মোল্লা চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- রাশিদা পারবে অত বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে? বামন হয়ে চাঁদ ধরার মতো কথা হবে না?
মিজানূর রহমান বললেন- আমরা অনেক সময়
গাংগের ঢেউ দেখে পারেই নৌকা বুরিয়ে দিই। মনের এই দুর্বলতার জন্যই আমরা অনেক কাজে
সফল হতে পারি না। এসব কাজ তো মানুষেই করে, স্বর্গের
দেবতা এসে তো অংশগ্রহণ করেন না। তাহলে রাশিদা পারবে না কেন? পারা না পারাটা পরের কথা, চেষ্টা করে তো দেখতে হবে।
রশিদ মোল্লা বললেন- ঠিক আছে। আপনি যা
ভাল বুঝুন, করুন।
আমার আপত্তি নেই।
অবশেষে অডিশনের জন্য সময় মতেই ফর্ম
ফিলআপ করা হলো, তবে
রাশিদার অডিশন দেওয়া হলো না। আমিনা বেগমের কিডনিতে পাথর ধরা পরার জন্য আপাতত
অডিশনের চিন্তা বাদ দিতে হলো।
(আট)
যথা সময়ে ম্যাট্রিকের রিজাল্ট বেরোল।
রাশিদা গণিত এবং বিজ্ঞানে লেটার মার্ক নিয়ে উত্তীর্ণ হলো। চললো জল্পনা-কল্পনা। কোথায়
পড়বে, কি সাবজেক্ট
নিয়ে পড়বে! রাশিদার ইচ্ছে সে সায়েন্স নিয়ে পড়বে। সায়েন্স নিয়ে পড়তে গেলে
অনেক টাকার দর্কার। এদিকে সায়েন্স নিয়ে পড়লে ভালো কোনো প্রাইভেট কলেজে পড়তে
হবে। সরকারী কলেজের যা অবস্থা সেখানে পড়লে ভালো রিজাল্ট করা সম্ভব নাও হতে পারে!
আজকাল আবার রিজাল্ট ভালো না হলে পড়ার কোনো অর্থই থাকে না। ভালো কোনো অনুষ্ঠানে পড়ার
সুযোগ পাওয়া যায় না। ডিস্টিংশন বা ভালো রিজাল্ট করলে ভালো কোনো কলেজে ফ্রিতে
পড়ার জন্য চেষ্টা করা যেতো। গণিতে এবং সায়েন্সে লেটার মার্ক পেলেও সামগ্রিক
রিজাল্ট তেমন ভালো নয়। মোটে সেভেন্টি টু পারসেন্ট। আজকাল সেভেন্টি টু পারসেন্টকে
তেমন ভালো রিজাল্ট বলা যায় না। আজকাল দশ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ডিস্টিংশন
নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। তাই কোথাও ফ্রিতে পড়ার সুযোগ নেই।
রশিদ মোল্লা একদিন রাশিদাকে ডেকে
বললেন- তাহলে কি নিয়ে পড়ার কথা ভাবছ?
রাশিদা বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু
করে বললো- আমি তো সায়েন্স নিয়ে পড়ার কথা ভাবছি।
আমারও ইচ্ছে তুই সায়েন্স পড়বি। রশিদ
মোল্লা দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে বললেন- কিন্তু প্রাইভেট কলেজে না পড়লে তো ভালো রিজাল্ট
করা সম্ভব হবে না। তোর মা'র
অপারেশ্বন করাতে হবে। টাকার জন্য অপারেশ্বন করানো সম্ভব হচ্ছে না। পাইভেট কলেজে
এডমিশন নিতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন হবে।
মিজানুর রহমানের কথা মনে পড়ে গেলো রাশিদার। মিজানূর রহমান
একদিন বলেছিলেন, সরকারী
কলেজে এডমিশনের জন্য তেমন টাকা দিতে হয় না। হোস্টেল খরচো খুব কম। লজিং এবং ফুডিং
বাবদ মাসিক মাত্র হাজার টাকা দিলেই হয়। মিজানূর রহমান বরপেটার এমসি কলেজের কথা
বলেছিলেন। এমসি কলেজ মিজানূর রহমানের ভাড়াঘর থেকে একটু দূরে। তাই এমসি কলেজে পড়লে
লেখা-পড়ার পাশাপাশি সে সঙ্গীত চর্চাও করতে পারবে।
তাই রাশিদা বললো-বরপেটার সরকারী কলেজে
এডমিশন নিলে কেমন হয়? সেখানে
এডমিসন নিলে আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি সঙ্গীত চর্চাও করতে পারব। এডমিশনের জন্য টাকাও
খুবই কম লাগে।
কম লাগোক! লাগবে তো? এখন বলতে গেলে আমার হাতে টাকা নেই
বললেই চলে।
তাহলে কি আমার পড়া হবে না, আব্বা?
রশিদ মোল্লা মাথায় হাত ফিরিয়ে বললেন-
দেখি কি করা যায়! উপায় একটা নিশ্চয়ই বের হবে।
উপায় সেই মুহূর্তেই বের হলো। রাশিদা
ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করার জন্য হাসমত এসেছিলো তাকে কংগ্রেসুলেশন জানাতে। সে মিস্টির
প্যাকেট নিয়ে এসেছিলো। মিস্টির প্যাকেট রাশিদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- যাও, ম্যাডামকে দিয়ে এসো।
আমিনা বেগম পাকঘরে রান্নাবান্না নিয়ে
ব্যস্ত ছিলেন। রাশিদা মিস্টির প্যাকেট মা’কে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
হাসমত আলী কৈফিয়তের স্বরে
বললো-রাশিদার রিজাল্টের খবর আমি রিজাল্ট বেরেনোর দিনই শুনেছি। আমি বাড়ী ছিলাম না।
তাই দেখা করতে আসতে পারিনি। দু'টি
বিষয়ে লেটার মার্ক নিয়ে পাস করার কথা শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছি।
খবরটা তো খুশিরই বটে। রশিদ মোল্লা
চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- তবে খুশির মধ্যেই আমি চোখে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি।
অন্ধকার দেখতে পাচ্ছেন, মানে?
রাশিদার ইচ্ছে ও সায়েন্স নিয়ে পড়বে।
এখন টাকা কোথায় পাই বলো?
কত টাকার দর্কার?
এই ধরো দশ বারো হাজার।
ম্যাডামের অপারেশন হয়েছে?
না, টাকার জন্য করাতে পারিনি। রশিদ মোল্লা ব্যথিত কণ্ঠে বললেন- অপারেশ্বন
করাতে গেলে পঁচিশ হাজার লাগবে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার।
চল্লিশ হাজার হলে চলবে, স্যার? আপনাকে টাকার চিন্তা করতে হবে না। টাকার যোগার হয়ে যাবে।
দুঃখের মাঝেও রশিদ মোল্লা ঠাট্টার
স্বরে বললেন- তুমি কোথাও টাকার গাছ পেয়েছো নাকি হাসমত?
ঠাট্টার কথা নয় স্যার। হাসমত আলী
কৌতুকের স্বরে বললো- টাকার গাছ আপনার বাড়ীতেই আছে।
আমার বাড়ীতে টাকার গাছ আছে, মানে?
রাশিদাই সেই টাকার গাছ। হাসমত আলী
এইবার সিরিয়াস ভাবে বললো- আমরা এক জায়গা থেকে গানের আমন্ত্রণ পেয়েছি। রাশিদা
গেলে অনুষ্ঠানের কর্মকর্তারা পঞ্চাশ হাজার দিবে বলেছে। হ্যাণ্ডস্ প্রভৃতির খরচ বাদ
দিয়ে আমাদের চল্লিশ হাজার থাকবে। এবার আমরা কেউ এক টাকাও নেব না। ম্যাডামের
অপারেশ্বন এবং রাশিদার এডমিশনের জন্য খরচ করবো।
রশিদ মোল্লা গম্ভীর মুখে বললেন- তাই
বলে এখন মেয়ের গান গাওয়া টাকা দিয়ে তার মায়ের অপারেশ্বন করাতে হবে? লোকে শুনলে কি বলবে?
কিচ্ছু বলবে না স্যার। মেয়ের
উপার্জনের টাকা দিয়ে মা’র
অপারেশ্বন! এতো গর্বের কথা, স্যার।
ক’জনের ভাগ্যে এমন
মেয়ে মেলে?
আমিনা বেগম মিস্টি দু'টি প্লেটে সাজিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ
করলেন। তিনি কথাটা শুনে বললেন- কার অত প্রশংসা করা হচ্ছে?
হাসমত আলী আমতা আমতা করে বললো- না মানে, রাশিদার কথা বলছি।
রিজাল্ট তো তেমন ভালো হয় নি। এতে
প্রশংসা করার কি আছে? আমার
মনে হয়, গানটান নিয়ে
ব্যস্ত না থাকলে আরও ভালো রিজাল্ট করতে পারতো।
গান গাওয়ার পরে মন্দও তো করেনি। রশিদ
মোল্লা বললেন- একটা টিউশন দিতে পারি নি। আজকাল টিউশন ছাড়া কে ভালো রিজাল্ট করতে
পারে? রাশিদা যা করেছে
নিজের দক্ষতায়ই তো করেছে। গান না গাইলে এর থেকে ভালো রিজাল্ট করতে পারতো, এটা মনের হতাশা ছাড়া আর কিছু নয়।
আসলে ম্যাডাম, মানুষের প্রত্যাশার অন্ত নেই। যত পাবেন
ততই প্রত্যাশা বেড়ে চলবে। আমাদের গাঁওবুড়ার মেয়েকে প্রতিটি সাবজেক্টে টিউশন
দিয়েছিলো। সে দেখছি কোনোমতে
পাস করেছে। সে দিক দিয়ে বিচার করলে, রাশিদা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো রিজাল্ট করেছে।
এবার থেকে রাশিদার গান গাওয়া বন্ধ।
আমিনা বেগম ক্ষোভের সাথে বললেন-রাশিদা গান গাওয়ার জন্য আমি লোকের কাছে মুখ দেখাতে
পারি না। ওর নানা সেদিন এসেছিলেন। তিনিও গান গাওয়া পছন্দ করেন না। গান গেতে বারণ
করে গেছে।
রাশিদা গান গাচ্ছে এ কথা কে তাঁকে
বলেছে? রশিদ মোল্লা
অবাক দৃষ্টিতে আমিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
শুধু গান গাচ্ছে তাই নয়, গান শিখছে একথাও জেনে গেছেন।
কে বলেছে, বলবে তো?
আমিনা বেগম বললেন- কথা ছাপা থাকে না। কথা বাতাসে উড়ে।
কথাটা বড় ভাইও জেনে গেছে। বড়
ভাই সেদিন এসে হম্বিতম্বি করে গেছেন। রাশিদার
বিয়ের কথা বলে গেছেন। পারলে মাসের মধ্যেই বিয়ে সমাধা করবে বলেছেন।
পাত্ৰ কে? পাত্রের বিষয়ে আপনি জানেন নাকি, স্যার? হাসমত বললো।
না, তেমন খোঁজখবর নেওয়া হয় নি। রশিদ মোল্লা বললেন- বিয়েই দিব না।
খোঁজখবর নিয়ে কি হবে?
আমি জানি স্যার পাত্ৰের বিষয়ে। কথাটা আপনাকে
বলা হয়নি। হাসমত আলী বললো- আমি কয়েক দিন আগে বিলাসীপারা গিয়েছিলাম। সেখানে কথা প্রসংগে
আমিন চাচার বিষয়ে কথা উঠেছিলো। সেখানে আমিন চাচার পাত্রের বিষয়ে জেনে এসেছি।
পাত্র দেখেও এসেছি।
কি দেখলে, কি জানলে? রশিদ মোল্লার প্রশ্ন।
পাত্র হাইস্কুলের শিক্ষক। হাসমত বললো-
বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে বলে মনে হলো। আগে বিয়ে করেছিলো। বিয়ের এক বছর পর
পাড়ার অন্য ছেলের সাথে সেই বউ পালিয়ে গেছে। একজন বললো, দোষটা ওর বৌয়ের নয়। দোষ ছেলেটারই। সম্ভবত
নংপুসক। একবার মটর এক্সিডেন্টের শিকার হয়েছিলো। সম্ভবত তখনই সমস্যাটা হয়েছে।
বড় ভাই এমন একটি ছেলের সম্বন্ধ নিয়ে
এসেছিলো রাশিদার জন্যে? আমিনা
বেগম ক্ষোভের সাথে বললেন- বড় ভাই,
এমন কাজ করতে পারলেন?
ভাগ্যিস সম্বন্ধটা হয় নি।
রশিদ মোল্লা আমিনা বেগমকে সান্ত্বনা
প্রদানের জন্য বললেন- হয়তো বড় ভাই এ বিষয়ে জানেনই না। জানলে এ রকম সম্বন্ধ নিশ্চয়ই
আনতেন না। এ বিষয়ে কিন্তু বড় ভাইকে কিচ্ছু বলবে না। বড় ভাই বিয়ের প্রসংগ আনলে
আমার ওজর দিয়ে এড়িয়ে যেও।
আমি না বলে থাকতে পারব না। আমিনা বেগম
বললেন- বড় ভাইকে এত সন্মান করি, আর তিনি কিনা এমন
সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিলেন! দুই কথা না শুনালে আমার মন শান্ত হবে না।
যেটা হয়নি তা নিয়ে অত ভাবার কি আছে।
রশিদ মোল্লা রাগ করে বললেন- যাও,
কি কাজ করছিলে তা করগে'।
ভাইদের দোষ তুমি কোনো দিনই দেখতে চাও
না। তুমি ছাড়লেও আমি কিন্তু ছাড়ব না। বলে রাখলাম। এভাবে বলেই আমিনা বেগম দুপ দুপ
করে চলে গেলেন।
অসুখের পর থেকে আমিনা একটু অন্য রকম
হয়ে গেছে। রশিদ মোল্লা অন্যমনস্কভাবে বললেন- স্বভাব খিটখিটে হয়েছে।
অসুখ হলে অনেকেরই স্বভাব খিটখিটে হয়।
ও কিছু নয় স্যার। অপারেশনটা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে বলে হাসমত আলী প্রসংগ পালটিয়ে
বললে- তাহলে আমি কি পার্টিকে কথা দিব, স্যার?
দিতে পার।
রাশিদা পাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো।
পার্টির কথা শুনে সে সজাগ হয়ে উঠলো। সে ভাবলো, হাসমত ভাই নিশ্চয় গানের পার্টির কথা বলছে। কথাটা স্পষ্ট হওয়ার জন্য
সে হাসমত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললো- কি পার্টির কথা বলছেন, হাসমত ভাই?
এক জায়গায় গান গাইতে যেতে হবে। হাসমত
আলী বললো।
কোনো অনুষ্ঠানে?
হ্যাঁ, অনুষ্ঠানে।
ওস্তাদ কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে মানা
করেছেন।
গান গাইতে মানা করেছেন মানে? হাসমত আলী অবাক বিস্ময় প্রকাশ করে
বললো- গান শিখছো, গাওয়ার
জন্যই তো। গান না গাইলে, গান
শেখার অর্থ কি?
ওস্তাদ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাইরে অন্য
গান গাইতে নিষেধ করেছেন। সস্তার গান গাইলে বোলে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
এ জন্যই এত বড় একজন সঙ্গীতজ্ঞ হয়েও
ওস্তাদ জীবনে কিছুই করতে পারেন নি। হাসমত আলী বললো- শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনার লোক ক’জন আছে? শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে থাকলে তুমিও জীবনে কিছুই করতে পারবে না।
মানুষ যা চায়, আমি
ভাবি, সেটাই করা উচিত।
আমাদের সমাজে শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে থাকলে সমাজে পরিচিতি পাবে না।
তাই বলে কি ওস্তাদের নিষেধ অগ্রাহ্য
করব?
এখন তোমাদের টাকার প্রয়োজন। ম্যাডামের
চিকিৎসার পাশাপাশি তোমার এডমিশনের জন্য টাকা লাগবে। গান গাইলে যদি এই দু’টো সমস্যা সমাধান হয়, সেটা করা কি অনুচিত হবে? তোমার কথা বাদই দিলাম। টাকার জন্য
ম্যাডামের অপারেশন হচ্ছেন না। গান গাইলেই যদি ম্যাডামের চিকিৎসা হয় তাতে অসুবিধা
কি?
কিন্তু ওস্তাদ যদি গান গাওয়ার কথা
শুনে, তাঁকে কি বলব?
তুমি কিছুই বলতে হবে না। হাসমত আলী
বললো- যা বলবার প্ৰয়োজন হলে আমি বলব।
শেষে রাশিদা নির্দ্ধারিত অনুষ্ঠানে
সঙ্গীত পরিবেশন করলো। হাসমত আলী খরচের বাইরে একটি টাকাও নিলো না। সেই টাকা দিয়ে
আমিনা বেগমের ‘কিডনি’ অপারেশন এবং রাশিদার এডমিশন হয়ে গেলো।
(নয়)
পড়াশুনার পাশাপাশি রাশিদার সঙ্গীত
চর্চা চললো। মিজানুর রহমানের পরামর্শ অনুসারে রাশিদা বরপেটার মাধব চৌধুরি
মহাবিদ্যালয়েই এডমিশন নিয়েছিলো। তাই সঙ্গীত চর্চা করতে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছিল
না। তবে, সপ্তাহে মাত্র
দু'দিন সঙ্গীতের
ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছিল। শনিবার এবং রবিবার।
সেদিন ছিলো শনিবার। বিকেল বেলা। আকাশ
গোমা ছিলো। কালো মেঘে ছেয়ে ছিলো আকাশ। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি পড়ছিলো। ছোট ছোট বৃষ্টির
ফোঁটা। অল্পসল্প রাস্তা হলে মাথায় হাত রেখে যাওয়া যাবে। কাপড় ভিজবে না। রাস্তা
দীর্ঘ হলে যাওয়া সম্ভব না। কাপড় ভিজে যাবে।
আজ রাশিদার সঙ্গীতের ক্লাস আছে।
মিজানূর রহমানের ভাড়াঘরেই সঙ্গীতের ক্লাস চলে। ছাত্র খুব বেশি নয়। মোটে পনের জন।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি কারো তেমন আকর্ষণ নেই। সবাই সস্তার সঙ্গীত শিখে
ফাংশনে-টাংশনে গান গেয়ে নাম কামাতে চায়। এদের মধ্যে দুই চার জন ইউটিউবে গান
গেয়ে ভালোই রোজগার করছে। তাই সঙ্গীত শিখতে নয়, আসে ভালো একজন ওস্তাদের কাছে সঙ্গীত শিখছে এই প্রচারের জন্য। তাই এক
দুই মাস শেখার পরেই অনেকে হাওয়া হয়ে যায়। রাশিদা সঙ্গীতের ক্লাসে এডমিশন
নেওয়ার পরে কমেও বিশ জন শিক্ষার্থী গান শিখতে এসেছে। কেউ তিন মাসের বেশি শেখেনি।
যারা এডমিশন নিয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিতভাবে ক্লাসে আসে না। এটা ওটা
অজুহাত দেখিয়ে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে। তাই দৈনিক খুব বেশি সাত আট জন করে
শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। অবশ্যে রাশিদার কথা আলাদা। কোনো অসুবিধা না থাকলে সে
নিয়মিত ভাবেই ক্লাসে উপস্থিত থাকে।
মিজানুর রহমানের ভাড়াঘর হোস্টেল থেকে
হেঁটে গেলে পনের মিনিটের রাস্তা। ই-রিক্সা বা সাইকেল নিয়ে গেলে পাঁচ মিনিটের মতো
লাগে। সঙ্গীতের ক্লাসে যাওয়ার জন্যই রাশিদা হোস্টেলে সাইকেল রেখেছে। সে সাইকেল
নিয়েই আসা-যাওয়া করে। কিন্তু বৃষ্টির জন্য আজ সাইকেল নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
সাইকেল নিয়ে গেলে বৃষ্টির ঝাপটা বেশি লাগবে। তাই সে ভিজে জবুথবু হয়ে যাবে। এদিকে
হেঁটে যাওয়াও সম্ভব না। অনেক সময় লাগবে। তাই ভিজে যাবে। রাশিদা খিড়কি দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে
বৃষ্টির অবস্থা দেখে ভাবলো, সঙ্গীতের ক্লাসে যাওয়া সম্ভব হবে না।
তাই সে সঙ্গীতের ক্লাসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শোয়ে পড়ল।
এর মধ্যেই এক পশলা জোরে বৃষ্টি হয়ে গেলো।
বৃষ্টির জমজম শব্দে রাশিদা গভীর নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লো।
মোবাইলটা তার বালিশের নিচে ছিলো।
মোবাইলের রিংটোন শুনে সে বালিশের তল থেকে মোবাইলটা বের করার আগেই লাইন কেটে গেলো।
মোবাইল হাতে নিয়ে সে দেখলো, ইতিমধ্যে
পরপর তিনটা মিসকল হয়ে গেছে।
কল করেছে ওস্তাদ মিজানুর রহমান।
মিজানূর রহমান বিশেষ প্রয়োজন না হলে ফোন করেন না। যেহেতু পরপর তিনবার মিসকল দিয়েছে, তাই রাশিদা ভাবলো, নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর ব্যাপার আছে। সে
বিছানায় উঠে বসে চোখমুখ রগড়ে ওস্তাদকে ফোন লাগালো।
দুই তিনবার রিং করার পরেই সেপ্রান্ত
থেকে মিজানূর রহমান ফোন রিসিভ করে বললেন- অনেক সময় ধরে ফোন করছি। ফোন তুলছ না কেন?
রাশিদা কৈফিয়তের স্বরে বললো- ঘুমিয়ে
পড়েছিলাম, ওস্তাদ।
ঘুমিয়ে পড়েছিলে মানে? আজ ক্লাসে আসবে না?
না, যাব না ওস্তাদ। রাশিদা থেমে থেমে বললো- বৃষ্টির জন্য আজ ক্লাসে না
যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওস্তাদ, কি এমন দর্কার পড়ল যে আপনি ফোন করলেন।
একটা সমস্যায় পড়েছি। মিজানূর রহমান
বললেন- তোমার আসার অপেক্ষায় থেকে থেকে অবশেষে ফোন করতে বাধ্য হয়েছি।
সমস্যা, কি সমস্যা, ওস্তাদ?
ফোনে বলব না। তুমি এস, তুমি এলেই বলবো। ই-রিক্সায় এসো।
বৃষ্টির অবস্থা ভালো না।
রাশিদার অবশ্যে উদ্দেশ্য জানার জন্য
খুবই কৌতুহল হলো। তবে দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করার সাহস পেলো না। কারণ ওস্তাদ কথা
একটু কম বলে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। অপ্রয়োজনে কথা বললে ওস্তাদ বিরক্ত হয়।
তাই রাশিদা কথা না বাড়িয়ে বিছনা থেকে নেমে শরীরে কাপড় চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
মিজানুর রহমান দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে
ছিলেন। রাশিদাকে দেখেই তিনি ব্যস্তভাবে বললেন- এসেছ? এস। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমি খুব ফাপরে পড়েছি।
ফোটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিলো। তাই ভিজার
ভয়ে রাশিদা তারাতারি রুমের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হলো। মিজানূর রহমান
দরজার পাশ থেকে সরে গিয়ে রাশিদার জন্য রাস্তা করে দিলো। রুমের ভেতর প্রবেশের মুখে
রাশিদা বললো- কি এমন ফাপরে পড়লেন,
ওস্তাদ। বাড়ীতে কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?
বাড়ীর সমস্যা না। অন্য সমস্যা।
মিজানুর রহমান চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- তবে সমস্যা খুবই গুরুতর। বস বলছি।
রাশিদা একটি চেয়ারে বসে বললো- বলুন
ওস্তাদ কি সমস্যা? এমন
সময় আকাশে মেঘ গর্জন করে উঠলো। রুমটা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। মেঘের গর্জন শুনে
রাশিদা বললো- আজ মনে হয় বৃষ্টি জোরেসোরেই আসবে।
আকাশের অবস্থা দেখে তো সেরকমই মনে
হচ্ছে। মিজানুর রহমান চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- মনে হয় বর্ষা শুরু হয়ে গেলো।
মিজানূর রহমান একাই থাকেন গৃহটিতে।।
গৃহটিতে তিনটি কক্ষ। একটি শয়ন কক্ষ,একটি ‘কিসেন’রুম এবং অন্য রুমটি রেওয়াজের জন্য
ব্যবহার করেন। রেওয়াজের জন্য ব্যবহার করা কক্ষটি অনেক প্রশস্ত। বিশ জন লোক
অনায়াসে বসবার মতো প্রশস্ত। নানান বাদ্যযন্ত্রে ভরা। হারমোনিয়াম, তানপুরা, বায়োলিন, তবলা, সুরমণ্ডল, গীটার, দোতারা, সেতাঁর, কীবোর্ড প্রভৃতি। মিজানুর রহমান সব রকম
বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানেন। অনেকে বাদ্যযন্ত্র শিখতেও আসে মিজানুর রহমানের নিকট।
তাই সব রকম বাদ্যযন্ত্রই রয়েছে রুমটিতে।
কিসেন রুমটিতে খুটখাট আওয়াজ হচ্ছিলো।
ওস্তাদ একাই থাকেন গৃহটিতে। ছেলে মেয়ে নিয়ে ওস্তাদের বউ থাকেন গ্রামের বাড়ীতে।
ওস্তাদের বউ শিক্ষিকা। তাই ওস্তাদকে বাড়ীর চিন্তা করতে হয় না। ওস্তাদের বউ
কোনোদিন আসেন না ওস্তাদের সাথে দেখা করতে। প্রায় ছ মাস যাবত রাশিদা ওস্তাদের
সান্নিধ্যে রয়েছে। এই ছ মাসে তো বটেই। রাশিদা প্রায় নিয়মিতই আসে। তবে কোনোদিন ওস্তাদের
বউকে আসতে দেখেনি। ওস্তাদ নিজেই মাঝেমধ্যে যান ছেলে-মেয়ে, বউয়ের সাথে দেখা করতে। রাশিদার অনেক
সময় জানতে ইচ্ছে করে ওস্তাদ ম্যাডাম-এর সাথে থাকেন না কেন? মনে কৌতুহল জাগলেও এই বিষয়ে প্রশ্ন
করতে ভরসা পায় নি রাশিদা। লোক মুখে শুনেছে, বিশেষ কোনো সমস্যা নেই। ম্যাডাম গান-বাজনা খুব একটা পছন্দ করেন না।
কারণ গান-বাজনার জন্যই এক সময় সংসারে অশান্তি ছিলো।
ওস্তাদ একটি ভেন্সার হাইস্কুলের মিউজিক
শিক্ষক। স্কুলটি সরকারীকরণ হয়নি। তাই এক সময় এক বেলা খেলে, আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হতো। এদিকে
ওস্তাদ মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সংসারের কোনো অভাব অভিযোগের প্রতি তেমন
গুরুত্ব দিতেন না। ম্যাডাম টিউশনি করে সংসার চালাতেন। সরকার টেট পরীক্ষার জরিয়তে
শিক্ষক নিযুক্তির ব্যবস্থা করেছিলো। ম্যাডাম ‘টেট’ পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষিকা হিসাবে নিযুক্ত পেয়েছেন দশ বছর আগে। শিক্ষিকা হিসাবে
নিযুক্তি পাওয়ার পর ম্যাডাম ওস্তাদকে সঙ্গীত ছেড়ে অন্য কিছু করার জন্য জোর
দিয়েছিলেন এবং বাড়ীতে সঙ্গীত চর্চা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে ছেলে-মেয়েরা সঙ্গীতের প্রতি
আকৃষ্ট না হয়। ওস্তাদের স্বেচ্ছা নির্বাসনের কারণ এখানেই।
ওস্তাদের বাইরে কিসেন রুম কেউ ব্যবহার
করে না। অন্তত রাশিদা দেখেনি। তাই কিসেন রুমে খুটখাট শব্দ শুনে রাশিদা কিসেন রুমের
দিকে তাকিয়ে বললো- কিসেন রুমে কেউ রয়েছে নাকি, ওস্তাদ?
হ্যাঁ। ওস্তাদ বললেন- কিসেন রুমে ফরিদা
রয়েছে।
রাশিদা শুনেছে, ওস্তাদের তার বয়সী একটি মেয়ে আছে।
তাই রাশিদা ভাবলো, সেই
মেয়েটিই নিশ্চয় এসেছে।
রাশিদা বললো- ফরিদা কে ওস্তাদ? আপনার মেয়ে?
না, আমার ছাত্রী। ওস্তাদ বললেন- আমি কয়েক বছর আগে বরপেটা রোডে একটি
মিউজিক স্কুল খুলেছিলাম। ফরিদা দু’বছর
সেখানে সঙ্গীত শিখতো। কণ্ঠ ভালো। যাদু আছে তোমার মতো। তোমার থেকে দুই তিন বছরের
সিনিয়র হবে। একটি প্রাইভেট কলেজে থেকে এইবার হায়ার সেকেণ্ডারী পাস করেছে। ছাত্রী
হিসাবে ভালো। ও চা করছে।
ফরিদা একটি প্লেটে দু’কাপ চা নিয়ে এলো। প্লেট টেবিলের ওপড় নামিয়ে
রাশিদার দিকে তাকিয়ে বললো- চা খান।
তোমার জন্য আনো নি। ওস্তাদ প্রশ্ন
করলেন।
ফরিদা বললো- আমি পরে খাব। আপনারা খান।
না এখানেই নিয়ে এস। ওস্তাদ বললেন-
চিন্তা করো না। কিছু একটা সুরাহা নিশ্চয় হবে। এভাবে সান্ত্বনা নিয়ে ওস্তাদ রাশিদার
পরিচয় দিলো- এর নাম রাশিদা, আমার
নিকট ছয় মাস যাবত সঙ্গীত শিখছে। ভবিষ্যত আছে।
ফরিদা কিসেন রুম থেকে চা নিয়ে এলো।
চা খেতে খেতে ফরিদা নিজের অসুবিধার কথা
বলে গেলো-
ফরিদা এক সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে।
ফরিদার বাবা জমশের শেখ অর্দ্ধ শিক্ষিত। রাজনীতির সাথে যুক্ত। একবার পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্টও
হয়েছিলেন। মা গৃহিনী। ফরিদা ম্যাট্রিক এবং হায়ার সেকেণ্ডারীতে ফার্স্ট ডিভিসন পেয়েছে। হায়ার
সেকেণ্ডারীর পারণ্টেজো ভালো। এইটটি সিক্স। তার ডাক্তারী পড়ার
ইচ্ছে। তাই নীট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফর্ম ফিলআপও করেছে। দু'মাস পরে পরীক্ষা।
জমশের শেখ ফরিদার আপত্তি সত্ত্বেও তার
বিয়ে ঠিক করেছেন তাঁরই এক বন্ধুর ছেলের সাথে। ছেলেটি গরুর বেপারী। বিদেশে গরু
চালান করে। অনেক টাকা
জমিয়েছে গরুর বেপার করে। টাকা-পয়সার অভাব নেই। তবে দু'টি জিনিসের অভাব রয়েছে। একটি হলো
শিক্ষা এবং অন্যটি হলো চরিত্র। ছেলে ম্যাট্রিক পাস। ছেলের বাবা প্রাইমেরী পাস।
ছেলে গরুর বেপারের সাথে সাথে ড্ৰাগছ ব্যবসার সাথেও জড়িত। বয়সেও ফরিদার চেয়ে
অনেক বড়। ছেলের বয়স ত্রিশ বছর তো হবেই। ফরিদার বয়স মোটে উন্নিশ। ফরিদার
বাবাও কিছুদিন আগে তাঁদের সাথে গরুর
বেপারে জড়িত হয়েছেন। তাই ফারিদাকে বিয়ে দিয়ে সম্পর্কটা ঘনিষ্ট করতে চাইছেন।
ফরিদার পড়ার ইচ্ছে। তাই সে পালিয়ে
এসেছে মিজানুর রহমানের কাছে।
মিজানূর রহমান বললেন- আমি নির্ভেজাল
মানুষ। আমি বুঝে উঠতে পারছিনা কি করবো। এদিকে সন্ধ্যেও হয়ে আসছে। এখন ওকে একা
বাড়ী পাঠাতেও ভরসা পাচ্ছি না। এদিকে আমিও একা মানুষ। সেজন্য আমার কাছে রাখাও
সম্ভব নয়। তিলটাকে তালটা করে ছাড়বে লোকে। তাই তোমোকে স্মরণ করেছি। আজ রাতটা
তোমার কাছে রাখগে'।
রাখতে অবশ্যে আমার আপত্তি নেই। ফরিদা
নিজের অসুবিধার কথা জানালো- তবে হোস্টেলে বাইরের লোকের রাত থাকার পার্মিশন নেই।
অবশ্যে ওয়ার্ডেন ম্যাডাম থাকতে দিলে অসুবিধা হবে না।
ওয়ার্ডেন ম্যাডামকে ফোন করে দেখ কি
বলে। মিজানূর রহমান পরামর্শ দিলেন।
কিছু একটা মনে পড়ার মতো রাশিদা হঠাৎ
বলে উঠলো- হ্যাঁ, খালাদের
বাড়ী অবশ্যে থাকতে অসুবিধা হবে না। অনেক দিন যাওয়াও হয়নি খালাদের বাড়ী।
তুমি হোস্টেলে যাচ্ছ না, এ কথাটা ওয়ার্ডেন ম্যাডামকে হোস্টেলে
ফোন করে জানাতে হবে না? মিজানূর
রহমান বললেন।
অবশ্যেই হবে। এভাবে বলেই রাশিদা
ওয়ার্ডেন ম্যাডামকে ফোন করে জানিয়ে দিলো যে, সে আজ হোষ্টেলে যাবে না। খালাদের বাড়ী মানে শফিক সাহেবের বাড়ী
থাকবে। শফিক সাহেব রাশিদার খালু। লোকেল গর্জেন। তাই ওয়ার্ডেন ম্যাডাম কোনো আপত্তি
করলেন না। রাশিদা শফিক সাহেবের বাড়ী এলো ফারিদাকে নিয়ে। খালার নিকট প্রকৃত ঘটনা
গোপন করে বললো, ফরিদা
তার রুমমেট। কলেজ বন্ধ। তাই বেড়াতে এসেছে বান্ধবীকে নিয়ে।
দশ
পরের দিন সকালে নাস্তা করে রাশিদা এবং
ফরিদা মিজানুর রহমান সাহেবের ভাড়াঘরে এলো।
রাশিদা বললো- এখন কি করব, ওস্তাদ?
মিজানূর রহমান বললেন- এখন এ বিষয়ে কথা
বলব না। আগে রান্নাবান্না করে খেয়ে নাও। পরে কথা হবে। চাল-ডাল, সব্জি সবই রয়েছে কিসেন-এ। তোমাদের
রান্নাবান্নার অভ্যেস আছে তো। যদি নাই, আমি নিজেই রান্না করবো। তোমরা একটু সহায় করলেই হবে।
ফরিদা বললো- আমরা গৃহস্থ ঘরের সন্তান, ওস্তাদ। রাশিদার আছে কি-না জানি না।
তবে আমার আছে।
গ্রামের মেয়েদের আর কিছু থাকুক আর না
থাকুক রান্নার অভিজ্ঞতা অবশ্যেই আছে। মিজানুর রহমান বললেন- আমি গৃহত্যাগী নির্ভেজাল
মানুষ হলেও এটুকু জ্ঞান আমার আছে। তোমাদের মনোভাব জেনে নিলাম, রান্না করতে চাও কি না। যাও আরম্ভ করে
দাও।
রাশিদা এবং ফরিদা কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে
দু'জনে মিলেই
রান্নার কাজে লেগে গেলো। মিজানুর রহমান রেওয়াজ কক্ষে সেতার নিয়ে বসলেন। তিনি রাগ
ভৈরব বাজাতে লাগলেন। আকাশে কিছু কিছু মেঘের আনাগোনা ছিলো। সেই রাগের শব্দের তালে
তালে যেন মেঘগুলো আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে এমন প্রতীত হতে লাগলো।
রান্না হওয়ার পর গোসল করে তিনজনই এক
সাথে খেয়ে নিলো।
খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে মিজানূর রহমান
বললেন- তোমরা রেডি হয়ে নাও। আমরা ফরিদাদের বাড়ী যাব।
ফরিদা আকাশ থেকে পড়ার মতো করে বললো- এ
আপনি কি বলছেন, ওস্তাদ? আমি বাড়ী যাব না। আপনি আমার আব্বার স্বভাবের
কথা জানেন না। জানলে এ কথা মুখে আনতেন না।
আগে চলই দেখি। মিজানূর রহমান
বিশ্বাসভরা কণ্ঠে বললেন- আমরা বুঝালে তোমার বাবা নিশ্চয় কথার গুরুত্ব বুঝতে
পারবেন।
না, বুঝবেন না। আমার বাবা যে কথা ভাবে, করতে না পারলে পাগল হয়ে যায়। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আমার বড়
বোনও পড়তে চেয়েছিলো। তাকে জোর করে সতের বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছে। এখন সে তিন
সন্তানের মা। স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। ওষুধের ওপর বেঁচে আছে। জামাই বাবু আবার একটা
বিয়ে করেছে।
আমাদের সমাজের এই এক সমস্যা। মিজানুর
রহমান বললেন- অল্প বয়সে বিয়ে দিলে এ রকম হবেই। বাল্যবিবাহের জন্যই আমাদের
সমাজে দ্বিতীয় বিবাহের প্রকোপ বেশি। অল্প বয়সে বিবাহ দিলে দুই তিনটি সন্তান
জন্মাবার পর নারীর স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। নারীর স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে
পুরুষরা দ্বিতীয় বিবাহ করার সুযোগ পায়। আচ্ছা, তোমার মা কি বলে? তিনি
নিশ্চয়ই তোমার বেদনা বুঝবে। যত বন্ধু-বান্ধবই থাকুক না কেন, মা’র সমান বন্ধু এই ধরায় নেই। বুঝিয়ে বললে, তোমার মা অন্তত সমস্যাটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ
উপলব্ধি করতে পারবেন।
মা বুঝলে কি হবে? মা’র কথা থাকলে তো। বাবার ইচ্ছের বাইরে মা একটা সিদ্ধান্তও নিতে পারেন
না। বাবা যা বলে, মাকে
তাই নির্বিবাদে মেনে নিতে হয়।
তবুও তোমার মা'র সাথে কথাটা আলোচনা করতে চাই। মিজানূর
রহমান নিজের মনের কথা ব্যক্ত করলেন।
আমার বলার ইচ্ছে ছিল না, তবুও বলছি। মা’র সাথে পরামর্শ করেই আমি বাড়ী থেকে
বেরিয়ে এসেছি।
তাই তো ভাবছি, তুমি এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস
পেলে কোথায়! তাহলে এখন তুমি কি করবে ভেবেছ?
আমি কিছুদিন কোনো এক আশ্রয়ে থেকে আমার
নিজের মতো করে চলতে চাই।
কিন্তু থাকবে কোথায়? তোমার আব্বা তো বসে থাকবেন না। আর
হ্যাঁ,তিনি বসে থাকলেও পাত্রপক্ষ বসে থাকবে না। কেস ডায়েরী নিশ্চয়ই করবে তাঁরা।
আমি গত বছর আঠারো বছর পার করেছি। ফরিদা
দৃঢ় কণ্ঠে বললো- এখন আমার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বয়স হয়েছে। কেস-ডায়েরী
করে কিছুই করতে পারবে না। আইন আমার পক্ষে থাকবে।
কিন্তু ধর, কেস-ডায়েরী হলো। বয়সের জন্য তুমি কেস
থেকে ছাড়া পেলে, পরে
কি করবে? চলবে কীভাবে? লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে হলে খরচ তো
লাগবে না-কি? এমনি
এমনি হাওয়া খেয়ে তো আর বেঁচে থাকতে পারবে না।
আমার নামে ব্যাংকে একাউণ্ট আছে। ফরিদা
সমস্যা সমাধানের উপায় জানালো- স্কলারশিপের টাকা পেয়েছিলাম এক লক্ষ। এমনিতে
হাঁসমুরগি, ছাগল
পোষে সেগুলো বিক্রী করে জমিয়েছি পঞ্চাশ হাজার। এখন আমার একাউন্টে ডের লক্ষ টাকা
রয়েছে। আমি এম, সি
কলেজে এডমিশন নিয়ে লেখা-পড়া চালিয়ে যাব।
কিন্তু তুমি থাকবে কোথায়? মেয়ে মানুষ একা থাকা সম্ভব হবে কি করে?
কেউ কি এমন সদাশয় নেই যে, কয়েকটা দিন আমাকে আশ্রয় দিবে?
রাশিদা এতক্ষণ চুপচাপ দু’জনের কথা শুনছিলো। সে বললো- চল, তোমাকে আমাদের বাড়ী নিয়ে যাব। আব্বা
ভালো লোক। মানুষের দুঃখ বুঝে। তাঁর কাছে কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় চাইলে নিশ্চয়ই
দিবে। বাবা নিজেও নারী স্বাধীনতার পক্ষপাতি। বাল্যবিবাহ পছন্দ করেন না।
রাশিদা সিদ্ধান্ত মতেই ফরিদাকে নিয়ে
তাদের বাড়ী এলো।। ফরিদার মুখে সব কিছু শুনে রশিদ মোল্লা ফোনে ফরিদার
বাবার সাথে আলোচনা করার কথা ভাবলেন। কিন্তু ফোনে আলোচনা করা থেকে বিরত হলেন এই কথা
ভেবে যে, যেহেতু ফরিদার
বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাই
নিশ্চয় সে বাড়ী থেকে পালিয়ে আসার জন্য কেস ডায়েরী হয়েছে। আজকাল প্রযুক্তি এত
উন্নত হয়েছে যে, ফোনে
কথা বললে তাঁদের ঠিকানা ‘ট্রেক’ করে ফরিদার সন্ধান বের করে তাকে ধরে
নিয়ে যেতে পারে! তাই তিনি ফোন করা থেকে বিরত থাকলেন এবং ফরিদাদের বাড়ী গিয়ে সরাসরি
আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত মতেই তিনি পরের দিন সকালে ফরিদাদের বাড়ী
গেলেন।
ফরিদার বাবার নাম জমশের শেখ। বয়স
চল্লিশের কাছাকাছি। দাড়ি গোঁপ কামানো। ফিটফাট বাবু। চোখ দু'টি বড় বড়। নাটা নাটা। যেন ঠিকরে
বেরিয়ে আসবে চক্ষু গহ্বর থেকে। চোখের দিকে তাকালেই বুঝা যায় যে, তিনি কুটিল মনের অধিকারী। তবে কথা
মিষ্ট। হেঁসে হেঁসে কথা বলে। দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথা, কথা বলে হেঁসে, কথা
দিয়ে কথা নিয়ে প্রাণে মারে শেষে। এমন প্রকৃতির লোক বলেই অনুমান হলো রশিদ
মোল্লার। বাড়ী ঘরের অবস্থা দেখে ধনী লোক বলেই মনে হলো। পাকা ঘরদুয়ার। উঠোনটাও
পাকা।
কুশল বার্তা বিনিময়ের পরে রশিদ মোল্লা
বললেন- দেখুন ফরিদার বয়সী আমারও একটি মেয়ে রয়েছে। ফরিদা বর্তমান আমার আশ্রয়ে
রয়েছে। আপনি বিয়ের বিষয়ে মত পরিবর্তন করলে আমি আজ বিকেলেই তাকে নিয়ে আসব তাকে
আপনার কাছে।
জমশের শেখ বললেন- সম্ভব না। মেয়ে আমার
নাক-কান কেটেছে। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তাকে আমার নির্দ্ধারিত পাত্রের সাথে
বিয়ে দিয়ে আমি আমার সন্মান রক্ষা করবো।
আপনি তো মেয়ের বাবা। মেয়ের
ভালোমন্দের কথা তো আপনাকেই ভাবতে হবে। ফরিদা বিয়েতে রাজি নয়। নীট পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তারী
পড়তে চায়। আপনি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দিতে চাইছেন কেন?
ডাক্তারী পড়বে! যে মেয়ে নিজের
বাবা-মা’র মান সন্মানের
ধার ধারে না সে ডাক্তার হয়ে কি করবে? তদুপরি ডাক্তারীতে ছিট পাওয়াটা কি এতই সহজ?
পাওয়া না পাওয়াটা পরের কথা। চেষ্টা তো
করতে হবে। গাংগের ঢেউ দেখে পারেই নাও বুরাতে চান না কি? চেষ্টা করে দেখুক। যদি সফল হতে না পারে,
পরে বিয়ের কথা চিন্তা করবেন।
এখন বিয়ে ভেঙে দিলে আমার অনেক টাকা
জলে পড়বে। জমশের শেখ নিজের অসুবিধার কথা জানালেন- আমি ওদের সাথে নতুন করে ব্যবসা
শুরু করেছি। আমার পাঁচ লক্ষ টাকা রয়েছে তাঁদের কাছে। তাঁরা প্রভাবশালী লোক। বিয়ে
ভেঙে দিলে তাঁরা এক টাকাও ফেরত দিবে না। নানা খরচ দেখিয়ে আমার পাঁচ লক্ষ টাকা
মেরে দিবে।
শুনেছি, আপনি কোটী টাকার মালিক। বাড়ীঘরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হচ্ছে। পাঁচ
লক্ষ টাকার জন্য আপনি মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করবেন না কি?
আরে, মশায়, পাঁচ
লক্ষ টাকা কামাই করতে অনেক মেহনত করতে হয়। অনেক কাঠখড় পোরাতে হয়। পাঁচ লক্ষ
টাকা আমার কাছে অনেক টাকা। এভাবে বলেই জমশের শেখ বললেন- আপনি দয়া করে আপনার
ঠিকানা বলুন। আমি আজই গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব।
রশিদ মোল্লা বললেন- আপনি আপনার মত
পরিবর্তন না করলে আমার ঠিকানা আমি আপনাকে দিব না।
জমশের শেখ চোখ বুজে কিছুক্ষণ মনে মনে কিছু
ভাবলেন। হয়তো বা মনে মনে ভাবলেন,
সিধা আঙুলে ঘি উঠবে না। আঙুল বেঁকা করতে হবে। তাই তিনি কূটিলতার
আশ্রয় নিয়ে বললেন- ঠিক আছে, আপনার
কথাই মানলাম। আমি কালকে আপনাদের বাড়ী গিয়ে ফরিদার সাথে কথা বলবো। সে যদি সত্যিই
বিয়েতে সন্মত না হয়, বিয়ে
দিব না। আপনি আপনার বাড়ীর ঠিকানা দিয়ে যান। আমি আজই যেতাম আপনার সাথে। তবে আজ আমার
একটু অসুবিধা আছে।তাই কাল গিয়ে কথা বলবো।
এত সহজে হার মানার জন্য রশিদ মোল্লার
মনে সন্দেহ ঘনীভূত হলো যে, জমশের
শেখ সম্ভবত মুখে এক কথা বলছেন এবং মনে মনে অন্য কথা চিন্তা করছেন। কিন্তু বাবা
হয়ে যদি মেয়ের মঙ্গল না চান, তাঁর
করার কি আছে! তিনি ফরিদার ভালোর জন্যই তো এত দূর এসেছেন তাঁর সাথে আলোচনা করতে।
যদি জমশের শেখ নিজের মেয়ের ভালোমন্দের কথা না ভেবে বেইমানী করেন, তাঁর করার কি আছে? যা হয় হবে, পরে দেখা যাবে। ফরিদা সন্মত না হলে
ধনবল জনবল যতই থাকুক কেন জমশের শেখ কিছুই করতে পারবেন না। কারণ ফরিদা সাবালিকা।
সাবালিকা মেয়ে পিতা-মাতার সিদ্ধান্ত মেনে না নিলে কিছুই করতে পারবেন না। এভাবে
ভেবে, রশিদ মোল্লা
নিজের বাড়ীর ঠিকানা দিয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলেন।
রশিদ মোল্লা বাড়ী এসে দেখলেন, কয়েক জন লোক জড়ো হয়ে রয়েছে তাঁদের
বাড়ীর সন্মুখে। লোকজন দেখে রশিদ মোল্লা অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেয়ে দ্রুত এগিয়ে
এসে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হয়েছে?
এত লোক জড়ো হয়েছে কেন?
আমিনা বেগম ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে
বললেন- পুলিশ এসে রাশিদা এবং ফরিদাকে ধরে নিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে।
রশিদ মোল্লা ভাবলেন, তিনি ভাবামতেই জমশের শেখ তাঁর সাথে
বেইমানী করেছে। জমশের শেখ সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে ফোন করে পুলিশ
পাঠিয়ে দিয়েছিলো।
রশিদ মোল্লা জিজ্ঞাসা করলেন- কোন
থানায় নিয়ে গেছে?
আমিনা বেগম বললেন-বরপেটা রোড থানায়
নিয়ে গেছে। আপনাকে থানায় যেতে বলেছে। এসআই সাহেব ভালো লোক। তিনি আমাকে সাথে
নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। আমি নিজে না গিয়ে হাসমতকে ফোন করে এনে তাঁদের সাথে
পাঠিয়ে দিয়েছি।
রশিদ মোল্লা একটি টেম্পো ভাড়া করে
সাথে দুজন লোক নিয়ে থানায় এলেন।
রশিদ মোল্লা থানায় এসে দেখলেন, জমশের শেখ এবং পাত্রপক্ষের লোক দলবল নিয়ে
জড়ো হয়ে রয়েছে থানার সন্মুখে। পাত্র নিজেও উপস্থিত রয়েছে।
এসআই সাহেব সত্যিই ভালো লোক। তিনি দুই
পক্ষের কথা শুনে বললেন- ফরিদা সাবালিকা। আপনারা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে
বিয়ে দিতে পরেন না। যদি আপনারা ঝামেলা করেন, তাহলে আমি আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হ’ব।
পুলিশের ভয়ে কেউ ঝামেলা করার সাহস পেল
না। পাত্রপক্ষের লোক একে একে সরে পড়তে লাগলো।
এসআই সাহেব ফরিদাকে উদ্দেশ্য করে
বললেন- তুমি এখন মুক্ত। তুমি যেখানে ইচ্ছা যেতে পার। এরা যদি কোনো ঝামেলা করে আমাকে
ফোন করে জানাবে। আমি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিব। যাও, এখন তোমার বাবার সাথে বাড়ী যাও।
না, আমি বাড়ী যাব না।
কোথায় যাবে? এসআই সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন।
ইঙ্গিতে রশিদ মোল্লাকে দেখিয়ে ফরিদা
বললো- আমি এই চাচার সাথে যাব।
এসআই সাহেব রশিদ মোল্লাকে উদ্দেশ্য করে
বললেন- আপনার কি মত? এ
তো আপনার সাথে যেতে চাইছে।
রশিদ মোল্লা বলেন-আমার আপত্তি নেই।
ফরিদা যদি বাড়ী যেতে না চায়, জোর
করে পাঠানো ঠিক হবে না। আজ আমি নিয়ে যাই, পরে আমি বুঝিয়েসুঝিয়ে বাড়ী পাঠিয়ে দিব। এখন চলুক আমার সাথে। ওর
কাপড়চোপড়ও তো রয়েছে আমাদের বাড়ী।
রশিদ মোল্লা রাশিদা এবং ফরিদাকে নিয়ে
বাড়ী ফিরে এলেন।
দুদিন পর ফরিদা এমসি কলেজে এডমিশন
নিলো। হোস্টেলেই তার থাকার ব্যবস্থা হলো। সে কলেজে পড়ার পাশাপাশি নীট পরীক্ষার
জন্য প্রস্তুত হতে লাগলো। সময়মতে নীট পরীক্ষায় অবতীর্ণও হলো।
(এঘার)
তিন মাস পর ফরিদার নীট পরীক্ষার
রিজাল্ট বের হলো। তবে ফরিদা কৃতকার্য হতে পারলো না।
রাশিদা সান্ত্বনার স্বরে বললো- মন
খারাপ কর না। শুনেছি, প্রথম
প্রয়াসে মাত্র দশ শতাংশ লোক কৃতকার্য হয়।
না, মন খারাপ করার কি আছে?
ফরিদা বললো- আমি নিজেও তেমন নিশ্চিত ছিলাম না কৃতকার্য হব বলে। কোসিং
ছাড়া কৃতকার্য হওয়াটা খুবই মুশকিল। তার মাঝে বাড়ীর সাথে সম্পর্ক নেই। সেজন্যও
মন খারাপ ছিলো। মন খারাপ থাকলে কাজে ঠিকমতো মন বসানো যায় না।
ফরিদা কথাটা মিথ্যা বলেনি। চার মাস
যাবত সে বাড়ীর সাথে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। বাবার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। মা'র সাথে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। ছুটীতে
রাশিদাদের বাড়ী যায়। রাশিদার বাবা মাঝেমধ্যে হোস্টেলে খোঁজখবর নিতে আসে। বাড়ী
যাওয়ার জন্য তাগিদা দেয়। কিন্তু ফরিদা শপত নিয়েছে, জীবনে কিছু একটা করতে না পারলে সে
বাড়ী যাবে না। বিশেষ কিছু একটা তাকে করতেই হবে। তবে কোন ক্ষেত্রে সফল হবে সে ঠিক
করে উঠতে পারছে না। তাই সে নীট পরীক্ষার পরে সঙ্গীত শেখা শুরু করেছে। শনিবার এবং
রবিবার ওস্তাদের কাছে নিয়মিতভাবে সঙ্গীত শিখতে যায়। সে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অনেক
উন্নতিও করেছে।
আসলে মনের সাথে আমাদের অনেক কিছু জড়িত
হয়ে থাকে। রাশিদা বিজ্ঞের মতো বললো- মনের জোরই আসল। মনের জোর না থাকলে কোনো কাজে
সফল হওয়া যায় না। কোটী কোটী মানুষের মাঝে নিজেকে বিশেষ ভাবে তুলে ধরতে হলে মনের
জোর লাগবেই। মনের জোরই মানুষকে বিশেষ কিছু করার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
ফরিদা চোখ মুদে রাশিদার কথা শুনছিলো।
সে হঠাৎ বলে উঠলো-মনে হয় আমি মনের জোরই হারিয়ে ফেলেছি। মনের জোর ফিরিয়ে পেতে
চাইলে আমাকে কোসিং ক্লাসে ভর্তি হতে হবে। আমার মনে হয় কোসিং ছাড়া নীট পরীক্ষায়
সফল হওয়া সম্ভব হবে না।
কোসিং সম্পর্কে রাশিদা অসুবিধার কথা
জানালো- কিন্তু কোসিং করতে হলে তো অনেক টাকার দর্কার। এত টাকা কোথায় পাবে? এদিকে কলেজে পড়ার পাশাপাশি কোসিং
ক্লাস করা কি সম্ভব হবে? বরপেটায়
কোসিং সেণ্টার থাকলে অবশ্যে চেষ্টা করতে পারতে। কিন্তু আমাদের বরপেটায় তো তেমন
কোসিং সেন্টার নেইও। অন্যত্র গিয়ে কোসিং করতে হলে তো কলেজের পড়া ছেড়ে দিতে হবে।
আপাতত আমি কলেজে পড়েই নীট পরীক্ষার
জন্য প্রস্তুত হবো। ফরিদা বললো- টাকা যোগার হলে পরে কোসিং নেব।
টাকা যোগার করবে কীভাবে? বাড়ী থেকে কি টাকা দিবে?
দিলেও নিব না। ফরিদা দৃঢ় কণ্ঠে বললো-
বাড়ীর টাকা দিয়ে আমি কোসিং করব না।
তাহলে তোমার কোসিং ক্লাসো করা হবে না।
তুই বললি না মনের জোর থাকলে অনেক কিছু
করা যায়।
হ্যাঁ, বলেছি। তবে শুধু শুধু মনের জোর থাকলেই কি টাকা যোগার করা যায়? টাকা যোগার করতে হলে কাজ করতে হয়।
আমি কাজই করতে চাই।
কি কাজ করবে?
ইউটিউব চ্যানেল খুলে টাকা যোগার করব।
কীভাবে?
গান গেয়ে। আমরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে
গান রেকর্ড করে ছেড়ে দিব। ভাগ্য প্রসন্ন হলে অনেক কিছু হতে পারে।
ইউটিউব চ্যানেল খুলতে গেলে টাকা লাগবে।
তদুপরি ইউটিউবে কোয়ালিফাই করতে হলে এক হাজার সাব্সক্রাইবার দর্কার এবং বার মাসের
মধ্যে কমেও ৪০০০ ঘণ্টা লোকে দেখতে লাগবে।
আমার মনে হয় এক হাজার সাব্সক্রাইবার
অল্প দিনেই হয়ে যাবে। ফরিদা বললো- তোর গানে অনেক ভিইও হয় দেখেছি।
তবে, আমি তো ইউটিউবে গান গাইতে পারব
না। ওস্তাদ পার্মিশন দিবে না। তদুপরি শুধু মুখে গান গাইলে তো হবে না। হ্যাণ্ডস্ লাগবে।
ভালো ভালো গান লাগবে। সঙ্গীত ডিরেক্টর লাগবে, এডিটর লাগবে।
এডিটর আমার জানা আছে। হঠাৎ মনে পড়ার
মতো ফরিদা বলে উঠলো- আচ্ছা, তুই
যাদের সাথে প্রোগ্রাম করিস, তাঁরা
আমাদের সহায় করবে না না কি? তাঁদেরও
তো লাভ হবে। আমরা এম্নি এম্নি তাঁদের খাটাব না। পারিশ্রমিক দিব।
হাসমত ভাইকে বললে অবশ্যে না করবে না।
কিন্তু সমস্যা হবে ওস্তাদকে নিয়েই। আমার বিশ্বাস, ওস্তাদ ইউটিউবে সস্তার গান গাইতে দিবেন না।
চল, আগে ওস্তাদের সাথে আলোচনা করে দেখি। ফরিদা দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আমার
বিশ্বাস, ওস্তাদ আমাদের
কথা ফেলতে পারবে না। শুধু শিল্পী বড় হলেই তো হবে না। পেশা থেকে উপার্জন হতে হবে।
উপার্জন না হলে সে পেশার প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকে না। ওস্তাদ ভালো গান গায়, কিন্তু বর্তমান ভালো গান শুনার লোক
নেই। মানুষ চায় স্ফূর্তি। যে গানে দেহে শিহরণ জাগে, তেমন গান শুনতে চায় মানুষ। ওস্তাদ যেসব গান গায়, সেগুলি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। ভব্য সমাজের
সঙ্গীত। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত মানুষকে ভাবায়, মানুষের মনে স্বর্গীয় অনুভূতি জাগায়। তবে, মানুষের মনে শিহরণ জাগাতে পারে না।
আমার বিশ্বাস কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারলে, ওস্তাদ না করবে না। আর যদি না করেও, হ্যাঁ করানোর জন্য আমার ওষুধ জানা আছে।
কি ওষুধ?
ওষুধের কথা পরে বলবো, যদি দর্কার হয়। এখন চল। ওস্তাদের কাছে
যাই।
ওস্তাদকে আমি গানের বিষয়ে কিন্তু
কিছুই বলতে পারব না। যা বলার তোমাকেই বলতে হবে।
চল, যা বলার আমিই বলবো। তুই শুধু আমার সাথে থাকবি। ফরিদা এভাবে বলেই
খানিকটা বিরতি নিয়ে পরে বললো- ওস্তাদের কথা মতো চললে, সঙ্গীত শিখতে পারব ঠিকই, তবে কোনোদিন সফল হতে পারব না। যে
পেশায় টাকা রোজগার হয়, তেমন
পেশা না হলে আজকাল সেই পেশায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমরা যে সমাজে বাস করছি এখানে
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনার লোক নেই। এদিকে সস্তার সঙ্গীত শুনা লোকের অভাব নেই। রংপুর
গিয়ে দেখি রঙের খেলা, কপাট
গুচিয়ে দেখি দুধ আর কল,। বিনা পয়সায় মজা
মারলো দক্ষিণা ছোকরা.….....বাড়ীর পেছন বেতের আড়া, হাল জুইরাছে ছোট দেওরা, এত বেলা হয় ভাবীজান পান্তা নেই মোর
খেতেরে... বরশির ছিপ ঢুকিয়ে ঘরে,
বন্ধু খোঁচা মারলো আমার গায়, কোনদিন যেন বন্ধু আমার ধরা পইড়া পিটন খায় ...এসব গান শুনার লোকের
অভাব নেই। নেট দুনিয়া বর্তমান যে সুযোগ এনে দিয়েছে, সে সুযোগ গ্রহণ না করাটা মূর্খামির
বাইরে আর কিছু নয়। চল, আজ
বিকেলেই আমরা ওস্তাদের সাথে কথা বলবো।
বিকেলে কেন? রাশিদা বললো- এখন তো কোনো কাজ নেই।
এখনই চল। বিকেলে গেলে
ওস্তাদ সঙ্গীত নিয়ে বসবে। তখন আলোচনা করা
সম্ভব না-ও হতে পারে।
তখনই রাশিদা এবং ফরিদা মিজানুর রহমানের
ভাড়াঘরে এলো। মিজানুর রহমান রুমেই ছিলেন।
রাশিদাদের ক্লাস আছে বিকেলে। তখন বাজে
মোটে একটা। তাই মিজানূর রহমান বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- এই অসময়ে! এখন তো
সঙ্গীত চর্চার সময় নয়। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। এখন সঙ্গীত নিয়ে বসলে লোকে
পাগল ভাববে। সঙ্গীতের বাইরে কোনো বিশেষ কথা আছে নাকি?
হ্যাঁ ওস্তাদ, আমরা আপনার কাছে বিশেষ একটা কথার জন্যই
এসেছি। ফরিদা বললো।
কি কথা? বলো।
ফরিদা ভূমিকা না করে সরাসরি বললো- আমরা
একটা ইউটিউব চ্যানেল খোলার কথা ভাবছি। তাই আপনার অনুমতি নিতে এসেছি।
মিজানূর রহমান কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে
বললেন- ইউটিউব চ্যানেল খোলে কি করতে চাও?
আমরা গান রেকর্ড করে ইউটিউবে ছেড়ে
দিব। ফরিদা উদ্দেশ্য জানালো।
তার মানে তোমরা গান নিয়ে ব্যবসা করতে
চাও?
হ্যাঁ ওস্তাদ, আমরা ব্যবসা করতে চাই। ফরিদা লুকঢাক
করলো না।
মিজানূর রহমান অসুবিধার কথা ব্যক্ত
করলেন- নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র
সঙ্গীত বা যেকোনো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত রেকর্ড করলে তোমরা ব্যবসা করতে পারবে না।
মুর্শিদী, ভাটিয়ালী
এসব গীত রেকর্ড করতে হবে।
যেসব গান সাধারণ লোকে শুনে তেমন গীতই
আমরা রেকর্ড করবো। ফরিদা বললো।
শুন, সঙ্গীত নিয়ে ব্যবসা হয় না। সঙ্গীত ব্যবসার জিনিস নয়। আর আমি
সস্তার সঙ্গীতের পক্ষপাতি নয়।
আপনি যেগুলোকে সম্ভার সঙ্গীত বলেন, সাধারণ লোক তো সেগুলোই শুনতে চায়। গান
গেয়ে যদি টাকা রোজগার করা যায়, সেগুলো
গাইলে ক্ষতি কি ওস্তাদ? ফরিদা
যুক্তি দৰ্শালো।
টাকা রোজগারের জন্য যারা সঙ্গীত চর্চা
করে আমি তাদের সাথে নেই। বিশ বছর ধরে আমি সঙ্গীত চর্চা করছি। সঙ্গীত নিয়ে ব্যবসা করবো, এমন কথা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
সঙ্গীত সাধনার জিনিস। মনের শান্তির জন্য আমি সঙ্গীত চর্চা করি। টাকা রোজগারের জন্য
নয়। সস্তার সঙ্গীত গেয়ে আমি সঙ্গীতের অপমান করতে পারবো না।
যার জন্য অত বড় সঙ্গীতজ্ঞ হয়েও আপনি
ঘরবাড়ী ছেড়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। ফরিদা বলে গেলো- আপনি সঙ্গীত সাধনার
পাশাপাশি যদি টাকা রোজগারের কথাও ভাবতেন, তাহলে আপনাকে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হতো না। ধৃষ্টতা নিবেন না ওস্তাদ, কোনো ফাংশনে, আপনার মতে যেগুলো সস্তার
সঙ্গীত, সেগুলো গেয়ে যখন মঞ্চে ঝড় তোলে, সেখানে আপনি গান গাইতে দাঁড়ালে মঞ্চ স্তিমিত হয়ে পড়ে, লোক আসন ছেড়ে চা খেতে যায়। এটা কি
আপনার সঙ্গীতের অপমান নয়? উচ্চাঙ্গ
সঙ্গীতের পাশাপাশি যদি আপনি কিছু সাধারণ সঙ্গীত নিয়েও চর্চা করতেন, তাহলে আপনাকে এই অপমান সহ্য করতে হতো
না।
লোকের অপমানের ভয়ে আমি আমার আদর্শ
থেকে বিচ্যুত হতে পারব না। মিজানূর রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
আদর্শে মন ভরে ওস্তাদ, পেট ভরে না। খালি পেটে কোনো সাধনা হয়
না। লোকে বলে না, পেটের
ক্ষিদায় কুত্তা পাগল। ফরিদা বললো।
রাশিদা এতক্ষণ মনে মনে ছিলো। এইবার সে মুখ
খুললো- আমরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছাড়ব না, ওস্তাদ। আপনি এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন। তবে, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের
পাশাপাশি আমরা লোকে যা চায় তা নিয়েও চর্চা করতে চাই।
আমি তো ভাবি ওস্তাদ, সঙ্গীত মানে সঙ্গীতই। সঙ্গীতকে ছোট বড়
করে দেখা উচিত নয়। ফরিদা নিজের অভিমত ব্যক্ত করলো।
মিজানূর রহমান ভাবলেন, ফরিদাকে তিনি যত নিরীহ ভেবেছিলেন, আসলে ততটা নীরিহ নয়। মেয়েটি জেদি।
জেদি না হলে বিয়ে ভেঙ্গে বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসতে পারত না। এ মেয়ে পোষ মানার
মেয়ে নয়। সাহসী মেয়ে। যা ভাববে তা করবেই। হয় মন্ত্রের সাধন, না হলে শরীর পতন। এমন ইস্পাতে গঢ়া
মেয়ে ফরিদা। তিনি ‘না’বললেও ওরা যা ভেবেছে তা করবেই। এদের
থামানো সম্ভব হবে না। তাই নিজের সন্মান রাখতে হলে এদের কথায় হ্যাঁ মেলানোই উচিত
হবে।
এভাবে ভেবে মিজানুর রহমান রণে ভঙ্গ
দিয়ে বললেন- ঠিক আছে। তোমরা যা ভেবেছ, কর। কিন্তু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা ছেড়ো না।
না ওস্তাদ। ফরিদা বললো- আমরা সঙ্গীত
চর্চা ছাড়বো না। আগের মতই আমরা সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রাখবো। এভাবে বলেই ফরিদা মিজানূর
রহমানের পা ছুঁয়ে সালাম করে বললো- আপনার সাথে তর্ক করার জন্য আমি দুঃখিত, ওস্তাদ। আমাকে মাফ করবেন।
না না, তুমি কোনো অন্যায় কথা বলনি। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ।মিজানূর রহমান
আবেগিক হয়ে উঠলেন।বললেন- সারা জীবন সঙ্গীত চর্চা করে আমি কি পেলাম? কিছুই না। না পেলাম মানুষের ভালোবাসা, না পেলাম পরিয়ালের কাছ থেকে সমর্থন।
সঙ্গীত নিয়েই পরিয়ালের সাথে আমার মতান্তর। তোমাদের ম্যাডাম তো খুবই ভালো মানুষ।
আসলে আমিই ভালো না। যে পেশায় টাকা নেই, সে পেশায় সন্মানো নেই। তোমরা যা ভেবেছ, কর। দেখ, যদি সফল হতে পার। আমি জানি, নেট দুনিয়া আমাদের সন্মুখে প্রতিভা বিকাশের অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে। সে সুযোগ গ্রহণ করাটাই
বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি কোনো বিষয়ে প্রয়োজন মনে কর, বলো, আমিও থাকবো তোমাদের সাথে।
ফরিদা রুম থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে
বললো- দেখলি তো কীভাবে ওস্তাদকে রাজি করালাম।
আমি তো ভয়ই পেয়েছিলাম। রাশিদা বললো-
ওস্তাদ রাজি হবে বলে আমার কিন্তু বিশ্বাস ছিলো না।
ভয় আমিও করেছিলাম। তবে আমার
আত্মবিশ্বাস ছিলো, যে
ওস্তাদকে আমি রাজি করাতে পারবো। এই আত্মবিশ্বাসেই আমাকে সাহসী করে তুলেছিলো। তাই
পেরেছি।
তুমি এতো কথা জানো আমার কিন্তু
বিশ্বাসই হচ্ছে না।
কথা ঠোকর খেয়ে খেয়ে শিখতে হয়, বুঝলি। সমাজ আমাদের অনেক
কথাই শেখায়। আমরা সেসবে গুরুত্ব দিই না বলে শিখতে পারি না। বাড়ী থেকে বেরিয়ে
আসার পরে আমি ছোটখাট কথার প্রতিও গুরুত্ব দিই। সব মানুষেরই কিছু না কিছু একটা
দুর্বল দিক থাকে। তাই আমি ওস্তাদের দুর্বল দিকটায় আঘাত করার সিদ্ধান্ত
নিয়েছিলাম। এই বিষয়ে মহাভারতের একটা গল্প বলি শুন্-
মহাভারতের সিরিয়াল অনেক দিন দেখেছি।
বলতে পারিস, প্রায়
সব কয়টা এপিসোডই দেখেছি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে যখন দুর্যোধন
দেখলেন, বীর বলতে তাঁর শিবিরে আর কেউ নেই। তখন তিনি বিদূরকে স্মরণ করেছিলেন।
কিন্তু বিদূর ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান।
তখন দুর্যোধন নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে
অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয়ে পড়ে।
দুর্যোধনের মাতৃ গান্ধারী আজীবন চোখ
কাপড় দিয়ে আবৃত করে রাখতেন। তিনি শিবের কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন যে, তিনি চোখের বন্ধন মোচন করে প্রথমে যার
দিকে তাকাবে তাঁর শরীর বজ্রের মতো কঠিন হয়ে যাবে। তখন কোনো অস্ত্র তাঁকে ভেদ করতে
পারবে না। পুত্রের অসহায় অবস্থা দেখে তাঁর শরীর বজ্রের মতো কঠিন করার জন্য তিনি
চোখ বন্ধন মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং দুর্যোধনকে গঙ্গা থেকে স্নান করে উলঙ্গ
অবস্থায় তাঁর সামনে হাজির হতে নির্দেশ দিলেন। দুর্যোধন মাতৃ আজ্ঞা পালন করে
গংগায় স্নান করে উলঙ্গ অবস্থায় মাতৃর কাছে আসছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে
শ্রীকৃষ্ণ নিজে যুদ্ধ না করলেও সমগ্র যুদ্ধ পরিচালিত করেছিলেন তিনি নিজেই।
শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন, কথা ভীষণ! যদি দুর্যোধন উলঙ্গ অবস্থায় মাতৃর নিকট হাজির হয়, তাহলে দুর্যোধনকে পরাজয় করা সম্ভব হবে
না। তাই তিনি ছলনার আশ্রয় নিয়ে দুর্যোধনের সন্মুখে দাঁড়িয়ে বললেন- দুর্যোধন
এভাবে উলঙ্গ হয়ে মাতৃর নিকট যেতে তোমার লজ্জা করবে না। অন্তত তুমি উরু পর্যন্ত
আবৃত করে যাও। তখন অন্তত তুমি চরম লজ্জার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে।
তখন শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ অনুসারে
দুর্যোধন গাছের পাতা দিয়ে উরু পর্যন্ত আবৃত করে মাতৃর সামনে হাজির হোন। গান্ধারী
চোখের বন্ধন খুলে দুর্যোধনের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, কিন্তু উরু পাতা দিয়ে আবৃত থাকার ফলে উরুতে তাঁর দৃষ্টি পড়ে না।
তাই সমগ্র শরীর বজ্রের মতো কঠিন হলেও উরু সাধারণ মানব শরীরের মতো থেকে যায়। ভীম
আর দুয়োধনের সাথে যুদ্ধের সময় শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম দুর্যোধনের উরুতে আঘাত
করে উরু ভেঙ্গে ফেলেছিলো।
ফরিদা মহাভারতের গল্পটা শেষ করে বললো-
ওস্তাদের দুর্বলতা হলো গানের শ্রোতার অভাব এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটা।
ওস্তাদকে শায়েস্তা করার জন্যই আমি স্টেজ এবং পরিবারের প্রসংগ উত্থাপন করেছিলাম।
ওস্তাদ বড় শিল্পী হলেও তাঁর সঙ্গীত শুনার মতো লোক যে আমাদের সমাজে নেই, এ কথা বুঝতে পেরেই তিনি রাজি হয়ে
গেলেন। সঠিক সময়ে সঠিক কথা, সঠিকভাবে
উপস্থাপন করতে পারলে সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই পৰ্যন্ত বলে ফরিদা প্রসংগ
পালটিয়ে বললো- ছাড় এখন এসব। হাসমত ভাইকে ফোন দে। তাঁর সাথে আজই চ্যানেল সম্পর্কে
আলোচনা করবো।
ফোনে সব কথা আলোচনা করা সম্ভব হবে না।
এখন হোস্টেলে চল। কাল রবিবার। কলেজ বন্ধ। তাই আজই আমরা বাড়ী যাব। বাড়ী গিয়ে
রাতে হাসমত ভাইকে ফোন দিয়ে ডেকে এনে চ্যানেল খোলার বিষয়ে আলোচনা করবো।
(বার)
রাশিদা এবং ফরিদা সন্ধ্যায় বাড়ী এলো।
রাতে রশিদ মোল্লার সাথে আলোচনা করে হাসমত আলীকে ফোন দিয়ে ডেকে আনলো।
গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।
ঝিম মেরে ছিলো চারদিক। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ছে না। থমথমে ভাব। যথেষ্ট গরম
পড়ছিলো। বাড়ীর
পেছনে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের মাথায় জোনাকি পোকাগুলো আলো জ্বেলে এদিক সেদিক ঘুরে
বেড়াচ্ছিলো তল ওপর করে।
বছর খানেক হলো রাশিদাদের গ্রামে বিজুলি
এসেছে। বিজুলি আসার পরে মানুষ অনেক আশা করছিলো যে, তাঁদের অনেক সুবিধা হবে। টিভি দেখতে পারবে, কারেণ্টের আলোতে লেখা-পড়া করতে পারবে-
হইহুল্লোড় করে সময় কাটাতে পারবে রাত দশটা বারটা অবধি। কিন্তু গ্রামের মানুষের সে
গুড়ে বালি। নামে ইলেকট্রিসিটি আছে,
তবে কাজে নেই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ ঘণ্টাও কারেণ্ট থাকে না।
সন্ধ্যের আজানের সাথে সাথে দপ্ করে কারেন্ট চলে যায়, আসে রাত একটায়। বৃষ্টির ভাব থাকলে বা
একটু জোরে বাতাস বইলে সেদিন সারারাতও কারেণ্টের দেখা মেলে না। সেজন্য লাইটের বাল্ব
জ্বলে না। লেমের আলোই ভরসা করে চলতে হয়। লোকদের সাধের টিভি দেখা হয় না। ফ্যান
রয়েছে ঠিকই, তবে
ফ্যানের বাতাস খাওয়া যায় না। হাত পাখা দিয়েই গরমের সাথে যুদ্ধ করতে হয়।
সেদিনও কারণ্ট ছিল না। তাই গরম থেকে
পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রাশিদা এবং ফরিদা চেয়ার পেতে দাওয়ায় বসে হাসমত আলীর জন্য
অপেক্ষা করছিলো। রশিদ মোল্লা ঘরের ভেতর একমাত্র ছেলের সাথে বসে লেখা-পড়ার তত্ত্ব
নিচ্ছিলেন।
হাসমত আলী আসার পর রাশিদা বললো-সাদা
মুখে আলোচনা ভালো লাগবে না। হাসমত ভাই, আপনি ফরিদার সাথে গল্প করুন, আমি পাকঘর থেকে আসছি।
রাশিদা পাক ঘরের উদ্দেশ্যে চলে গেলো।
এই রাতে এরকম জোর তলব করে ডেকে আনলে
কেন? হাসমত আলী জিজ্ঞাসা
করলো।
দর্কার আছে বলেই তো ডেকে এনেছি। ফরিদা
বললো- একটু ধৈর্য ধরে বসুন। রাশিদা আসুক। এক সাথে আলোচনা করবো।
আকাশের অবস্থা তো দেখতে পাচ্ছ। কখন ঝম্ঝমিয়ে
নেমে পড়ে ঠিক নেই। কয়দিন বৃষ্টি হওয়ার জন্য রাস্তা-ঘাটও কাদাময়। বাইক চালাতে
অসুবিধা হয়।
রাশিদা একটা টি টেবুল এনে হাসমত আলীর
সন্মুখে রেখে আবার পাকঘরে চলে গেলো। একটু পরেই একটি প্লেটে দুই কাপ চা এনে টেবিলের
ওপর রাখলো।
হাসমত আলী বললো- দুই কাপ কেন? তুমি খাবে না?
খাব। আব্বাকে চা দেওয়া হয়নি। আব্বাকে
চা দিয়ে আমি তোমাদের সাথে বসে একসাথে চা খাব। এভাবে বলেই রাশিদা আবার পাকঘরের
উদ্দেশ্যে চলে গেলো।
ফরিদা বললো- চা খান। বসে আছেন কেন?
রাশিদা আসুক একসাথেই খাব।
রাশিদা এক হাতে একটি চায়ের কাপ এবং
অন্য হাতে একটি চেয়ার এনে ফরিদার পাশে বসলো।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসমত আলী
বললো- বল, চা
খেতে খেতে কথা শেষ করো।
ফরিদা বললো- আপনাকে অনেক সময় অপেক্ষা
করিয়েছি। আর অপেক্ষা করাবো না। সরাসরিই বলি। আমরা একটা ইউটিউব চ্যানেল খোলার কথা
ভাবছি। আজকাল পাগলা-পাগলি, রিক্সাওয়ালা, টেম্পোওয়ালা অনেকেই তো গান গেয়ে
ভাইরাল হচ্ছে। আমরাও যদি পারি।
ইউটিউব চ্যানেল খোলাটা তো বড় কথা নয়!
হাসমত আলী থেমে থেমে বললো- তবে,
অনেক ঝামেলা। মোবাইলে রেকর্ড করলে হবে না। এর জন্য ভালো কেমেরা
লাগবে। মাইক্রফোন লাগবে। গান রেকর্ড করার জন্য স্টুডিও লাগবে। অনেক কিছুর দর্কার হবে।
তদুপরি ভালো গায়ক লাগবে। তোমরা দুজনে গান গাইলেই তো আর হবে না।
কেমেরা, মাইক্রফোনের যোগার আমি করবো। ফরিদা বললো- গায়কের কথা বললেন, আপনার দলেই তো গায়ক আছে।
হ্যাঁ আছে। কিন্তু তারা গান গাইবে
কি-না এটা তো জানতে হবে। হাসমত আলী বললো- ওরা নিজেরাই ইউটিউব চ্যানেল খোলার কথা
ভাবছে। তোমাদের সাথে গান
গাইতে রাজি হবে কি-না সন্দেহ আছে।
আপনি বললে নিশ্চয় রাজি হবে। ফরিদা
দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আর আমরা শুধু তাদের ওপরেই নির্ভর করে থাকবো না। আমাদের সমাজে অনেক
ভালো ভালো গায়ক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সুযোগের অভাবে তারা উঠে আসতে পারছে না। আমরা খোঁজে খোঁজে তাদের
আমাদের চ্যানেলে গান গাওয়ার সুযোগ দেব।
এই খোঁজার কাজ করতে হলেও সময় এবং
টাকার প্রয়োজন হবে। টাকা কে দিবে?
টাকা আমি দিব। টাকার চিন্তা করবেন না।
ফরিদা দৃঢ়কণ্ঠে বললো।
তোমরা পড়াশুনার পাশাপাশি এই সব ঝামেলা
করতে পারবে কি?
আমরা দৈনিক তো আর এ কাজ করব না। রাশিদা
বললো- ছুটির দিনগুলোতে এ সব কাজ করবো। অবশ্যে কষ্ট হবে। হাসমত ভাই, কষ্ট না করলে তো আর কেষ্ট মেলে না, এ কথা তো আপনি জানেনই।
তোমাদের কথা ভেবেই বলছি কথাটা। হাসমত
আলী অন্যমনস্কভাবে বললো- আমার কি?
আমার তো ঢের সময়। যখন খুশি তখনই এখানে সেখানে যেতে পারি।
সেজন্যই তো আপনার শরণাপন্ন হচ্ছি।
ফরিদা বললো- আমরা না হলেও আপনার চলবে, কিন্তু আপনি না হলে আমাদের চলবে না।
হাসমত আলী গৃহের দিকে লক্ষ্য করে বললো-
স্যারের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেছ?
হ্যাঁ করেছি। অনুমতিও দিয়েছেন। ফরিদা
বললো- এখন শুধু আপনার অনুমতির প্রয়োজন।
হাসমত আলী এইবার আসল কথায় এলো-
তোমাদের এসব ঝামেলা করার কি প্রয়োজন? আমরা চ্যানেল খুলি সেখানে তোমরাও গান গাও।
না, আমরা নিজেরা চ্যানেল খুলে গান গাইব। ফরিদার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
আমি আমার দলের সাথে আলোচনা না করে
তোমাদের কথা দিতে পারব না। হাসমত আলী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলো- আমরা আগে থেকেই
চ্যানেল খোলার কথা ভাবছি। এ বিষয়ে আমরা অনেকদুর এগিয়েও গিয়েছি। তাই এখন হঠাৎ
করে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। আজ উঠি। কাল আমাদের দলের সাথে আলোচনা করে তোমাদের
কথাটা জানাবো। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। বৃষ্টি পড়বে মনে হয়।
হাসমত আলী বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে
গেলো।
ফরিদা রাশিদাকে উদ্দেশ্য করে বললো- কি
বুঝলি হাসমত ভাইয়ের কথায়? সে
আমাদের সাথে থাকবে?
রাশিদা বললো- মনে হয় থাকবে না। সে
আমাদের ব্যবহার করতে চাইছে। আমাদের হয়ে কাজ করতে রাজি নয় বলে মনে হলো। তবে, হাসমত
ভাইকে যে কোনো উপায়ে রাজি করাতেই হবে।
আমরা চাইলেও সে রাজি হবে বলে মনে হয়
না। ফরিদা বললো- হাসমত ভাইয়ের দলে ক’জন মেয়ে আছে?
একজনও না। রফিদা এবং আমি ওদের দলের
হয়ে গান গাই।
ফরিদা কিছুক্ষণ ভেবে বললো- তাহলে
চিন্তা নেই। আমাদের মেয়ে শিল্পী আছে, ওদের আছে ছেলে শিল্পী। গানবাজনার ক্ষেত্রে মেয়ের কদর সব সময় বেশি।
কারণ এরা সংখ্যায় কম। হাসমত ভাই সহযোগিতা না করলেও আমরা চ্যানেল খুলব। ছেলে
শিল্পী নিশ্চয় আমরা পেয়ে যাব।
হ্যাণ্ডস্ কোথায় পাবি?
ওস্তাদ আছে না। ওস্তাদ নিশ্চয় যোগার
করে দিতে পারবে। তারও তো অনেক চেলাপেলা রয়েছে। তদুপরি ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয়
না।
তাহলে তুমি চ্যানেল খুলবেই?
হ্যাঁ, খুলব এবং আমরা সফলও হবো।
হাসমত ভাই কিন্তু খুব খারাপ পাবে।
খারাপ পেলেও উপায় নাই। আমরা তো তার
সাথে আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। সে যদি আমাদের কথা না রাখে, আমাদের করার কি আছে?
তবু আব্বা অনুমতি না দিলে আমি তোমার
সাথে থাকতে পারব না। রাশিদা নিজের অসুবিধার কথা জানালো- হাসমত ভাইয়ের জন্যই আমি
পরিচিতি পেয়েছি। এখন তাকে ছেড়ে যাওয়া মানে তার সাথে বেইমানী করা হবে।
বেইমানী তুই করিস নি, বেইমানী করছে হাসমত ভাই। ফরিদা বললো-
সে তোর স্বার্থে তোকে জনসমক্ষে তুলে ধরে নি। সে নিজের স্বার্থে তুলে ধরেছে। তোর
জন্যই তার দল পরিচিতি লাভ করেছে। এখন স্বার্থে ব্যাঘাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে সরে যেতে চাইছে।
আব্বার সাথে আলোচনা করো। আব্বা কি বলে
আগে জেনে নাও।
ঠিক আছে। তিনি অনুমতি দিলে তো থাকবি?
হ্যাঁ থাকবো।
ফরিদা উঠে গিয়ে রশিদ মোল্লাকে ডেকে
আনলো।
রশিদ মোল্লা বললেন- হাসমত চলে গেছে
নাকি?
হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আগেই গেছে। রাশিদা বললো।
আমাকে না জানিয়েই এভাবে চলে গেলো? কেন?
হাসমত আলীর ব্যবহারে ফরিদা খুবই রুষ্ট
হয়েছিলো। তাই লুকোচুরি না করে সে সরাসরি বলে ফেললো- স্বার্থে ব্যাঘাত হওয়ার
সম্ভবনা দেখে।
স্বার্থে ব্যাঘাত? কি বলতে চাইছ তুমি?
হ্যাঁ স্বার্থে ব্যাঘাত। ফরিদা কথাটা
স্পষ্ট করে দিলো- সে আমাদের চ্যানেল খোলার পক্ষপাতি নয়। তার চ্যানেলে আমাদের গান গাইতে
বলছে।
আরে, দেশে চ্যানেল একটা না-কি? শত শত চ্যানেল রয়েছে। তারাও খুলক। তোমরাও খোল।
আমরা চ্যানেল খুললে সে আমাদের সাথে
থাকবে না।
জীবজন্তু, পশু-পক্ষী যাদের আমরা ইতর প্রাণী ভাবি, একমাত্র তারাই স্বার্থ ছাড়া কাজ করে
নিজে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। মানুষ স্বার্থ ছাড়া
কোনো কাজ করে না। কাজ করার আগে স্বার্থ দেখে। যেখানে স্বার্থ নেই, সেখানে মানুষ নিষ্ক্রিয়। এভাবে ভেবে রাশিদ
মোল্লা প্রকাশ্যে বললেন- আমাদের সমাজে
এই এক সমস্যা। সবাই নিজের মতে স্বাধীনভাবে চলতে চায়। কেউ অন্যের অধীনে চলতে চায়
না। ভালো কাজ হলেও না। নিজের মতে চলতে গিয়েই ছেলে বাপের শত্রু হয়ে পড়ে। ভাই
হয়ে ভাইয়ের বুকে ছুরি বসায়। একজনের ভালা। আরেকজন দেখতে পারে না। বলতে পারো ঈর্ষা। ঈৰ্ষায়
ভোগে। হাসমতও স্বার্থ দেখছে। তাই সে তোমাদের সাথে সহযোগিতা করতে চাইছে না। তেব
হ্যাঁ, হাসমত সহযোগিতা না করলে তো তোমাদের চ্যানেল খোলা স্থগিত রাখতে হবে!
কেন কাকু? ফরিদার প্রশ্ন।
তোমরা মেয়ে হয়ে এত বড়ো দায়িত্ব
সামলাতে পারবে না।
কেন পারব না কাকু ? মেয়েরা বর্তমান এরোপ্লেন চালাচ্ছে, মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছে, আর আমরা সাধারণ চ্যানেল চালাতে পারব না? আর আপনি আমাদের একা ভাবছেন কেন? আপনি আছেন, ওস্তাদ থাকবে আমাদের পাশে। দৈহিক
শক্তির কাজে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে কিছু পিছিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু মানসিক কাজে মেয়েরা বর্তমান
ছেলেদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। ফরিদা দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আপনি অনুমতি দিলে আমরা চ্যানেল
খুলব এবং সফলও হবো।
কিন্তু পারবে কীভাবে। বাদ্য ছাড়া
সঙ্গীত হয় না। বাদ্যযন্ত্রকে সঙ্গীতের প্রাণ বলতে পার।
বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থা ওস্তাদকে দিয়ে
করাবো।
এডিটর, ক্যামেরা ম্যান?
সব ব্যবস্থা হবে। ফরিদা বললো- আপনি
অনুমতি দিলে আমরা চ্যানেল খুলব এবং এক অভিনব পদ্ধতিতে চ্যানেল চালাব। আমরা শুধু
সঙ্গীতই পরিবেশন করবো না। সঙ্গীতের সাথে নাটকও থাকবে।
কি রকম?
আমরা বন্ধের দিনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে
নতুন নতুন শিল্পীর সন্ধান করবো। নাটকের জরিয়তে নতুন শিল্পীদের গান গাওয়াব। গানের
কলি দিয়ে গানের প্রতিযোগিতা করাব,
সঙ্গীতের সুর বাজবে,
সঙ্গীতের সুর শুনে শিল্পীরা গান গাইবে। লটারিতে শব্দ নির্বাচন করে শিল্পীদের
দ্বারা গান পরিবেশন করাবো। এই সবের জন্য বিজয়ী শিল্পীদের পুরস্কৃতও করবো।
কিন্তু নাটক লিখবে কে? রশিদ মোল্লা বললেন-নাটক লেখা তো আর
মুখের কথা নয়!
কেন আপনি লিখতে পারবেন না? ফরিদা বললো- ছোট ছোট নাটক। বড় কিছু
না। নতুন শিল্পীর সন্ধানে গেলাম। তার পরিচয় নিলাম। পরে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ
করলাম। এই রকম নাটক আর কি।
ছোট নয়, ইচ্ছে করলে বড় নাটকও লিখতে পারবো। রশিদ মোল্লা নাটক লেখা সম্পর্কে
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন- আগে অনেক একাংকিকা লিখে পরিবেশন করিয়েছি। তবে, এখন আর লেখা হয় না। কারণ এখন একাংকিকা
কেউ মঞ্চস্থ করতে চায় না। হ্যাঁ,
সঙ্গীতালেখ্য লিখে পরিবেশন করতে পারলেও মন্দ হবে না। আমার একটি সঙ্গীতালেখ্য
রচনা করা আছে। সঙ্গীতালেখ্যটি অনেক স্কুল- কলেজে পরিবেশিতও হয়েছে। দর্শকের সমাদরও
পেয়েছে প্রচুর। আমরা গানের সাথে সাথে দুই চারটা সঙ্গীতালেখ্য লিখেও পরিবেশন করাতে
পারবো।
তাহলে তো আর ভালো হয়। ফরিদা উৎসাহের
সাথে রশিদ মোল্লাকে সমর্থন করলো।
তাহলে চ্যানেলটা খুলে ফেল। কোনো সহায়
লাগলে আমাকে বলো, আমি
পার্যমানে সহায় করবো।
রাশিদার মনে এতক্ষণ হাসমত আলীর কথা
ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কারণ হাসমত আলীর জন্যই সে পরিচিতি পেয়েছে। রাশিদার শেষ ভরসা
ছিলো তার আব্বা। ভেবেছিলো, আব্বা
হাসমত আলীকে বাদ দিয়ে ইউটিউব চ্যানেল খুলতে দিবে না। কিন্তু রশিদ মোল্লা যখন
ফরিদার কথা শুনে চ্যানেল খোলার অনুমতি দিলেন তখন রাশিদা বললো- কিন্তু আব্বা হাসমত
ভাইকে বাদ দিয়ে চ্যানেল খোলাটা কি উচিত হবে?
রশিদ মোল্লা কিছুক্ষণ মনে মনে ভেবে
চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- হাসমতকে বাদ দিয়ে চ্যানেল খোলাটা আমারও ভালো লাগছে না। তবে তোমরা
চিন্তা করো না। আমি হাসমত আলীর সাথে আলোচনা করবো। সে নিশ্চয় আমার কথা ফেলবে না।
পরের দিন সকাল বেলা হাসমত আলীকে ডেকে
এনে রশিদ মোল্লা কথাটা বুঝিয়ে বললেন- চ্যানেল তোমরাও খোল এবং ফরিদাদের সাথেও
সহযোগিতা কর। একটা কথা বিশ্বাস রেখো দোকান যত বেশি হয়, কেনা-বেচাও তত বেশি হয়। দোকান বেশি
হলে সেটা তখন বাজারে পরিণত হয়। সেরকমই চ্যানেল যত বেশি হবে তত শ্রোতার সংখ্যা
বাড়বে। একটা আলোড়ন সৃষ্টি হবে। তুমি নিজেও চ্যানেল খোল। ফরিদারাও খুলুক। তোমাদের
চ্যানেলে ফরিদারা গীত পরিবেশন করবে এবং তোমরা ফরিদাদের চ্যানেলে বাদ্য বাজাবে। একে
একে তখন দুই হয়ে যাবে।
হাসমত আলী কথাটা বুঝতে পারলো। হাসমত
আলীর অসুবিধাও ছিলো। কারণ তাদের দলে মেয়ে শিল্পী ছিলো না। মেয়ে শিল্পী ছাড়া গান
মজে না। তার ধারণা হলো, মেয়ে
শিল্পীর অভাবে তাদের চ্যানেল ফ্লপও হতে পারে। এই ভয়ে হাসমত আলী রশিদ মোল্লার কথায়
শর্ত সাপেক্ষে সম্মত হলো- কিন্তু স্যার, রাশিদারাও আমাদের চ্যানেলে গীত পরিবেশন করবে বলে নিশ্চিতি দিতে হবে।
ফরিদা বললো- নিশ্চয় গীত পরিবেশন করবো।
তবে আমারও শর্ত আছে।
শর্ত? রাশিদ মোল্লা অবাক দৃষ্টিতে ফরিদার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন-
তোমাদের আবার কি শর্ত?
আমরা ততদিনই হাসমত ভাইয়ের চ্যানেলে
গীত পরিবেশন করবো, যতদিন
হাসমত ভাই আমাদের সাথে বাদ্য বাজাবে।
রশিদ মোল্লা মুচকি হেঁসে বললেন- তুমি
আসলে একটা জিনিয়াস। তোমার বাবা তোমাকে চিনতে ভুল করেছে। তোমার ভবিষ্যত উজ্জ্বল।
আমি গ্যারান্টি দিতে পারি। তোমাকে আমি যতটা সহজ ভেবেছিলাম, তুমি আসলে ততটা সহজ নও।
ফরিদা হেঁসে হেঁসে বললেন- সহজ হলে
এতদিনে আমার বিয়ে হয়ে যেত কাকু। এ কথা তো আপনি নিজের চোখেই দেখেছেন। আমার স্বপ্ন
আছে। স্বপ্ন পূরণ না করা পর্যন্ত আমি সংগ্রাম চালিয়ে যাব। আমি ডাক্তার হয়ে সমাজের
সেবা করতে চাই। তাও আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে।
তোমার আশা পূরণ হোক, আমি এই আশীর্বাদ করি। রশিদ মোল্লা
এভাবে বলে হাসমত আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি কি বলো?
আমার আপত্তি নেই। হাসমত আলীও সম্মতি
প্রকাশ করে বললো- এরা যতদিন আমাদের পাশে থাকবে, আমরাও ততদিন এদের পাশে থাকবো। আপনি যে বললেন, একে একে দুই, তাই হবে।
(তের)
এরপর চললো ইউটিউব চ্যানেল খোলার
প্রস্তুতি। ফরিদা এবং রাশিদা একদিন সময় করে বরপেটা রোড এলো। বরপেটা রোডের সাহেদ আলী
সফ্টওয়ের ইঞ্জিনিয়ার। আগে বাঙ্গালোরে কোনো একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করতো।
বেতন কম বলে সেই চাকরি
ছেড়ে দিয়ে বরপেটা রোডে দোকান খুলে বসেছে। সাহেদ আলীর সাথে ফরিদাদের পারিবারিক
সম্পর্ক রয়েছে। তাই আগে
থেকেই ফারিদার সাথে সাহেদ আলীর পরিচয় চিলো।
ফরিদাকে দেখেই সাহেদ আলা বললো- ফরিদা
তুমি? ভালো আছ? কি মনে করে?
ফরিদা কুশল বার্তা বিনিময় করে ইউটিউব
চ্যানেল খোলার কথা জানাল।
সাহেদ আলী বললো-ইউটিউবে কি আপলোড দিবে?
গান। ফরিদা বললো- আমরা বিশেষভাবে গান
আপলোড দিবো। ছোটখাট নাটকও থাকবে তার সাথে।
অসুবিধা নেই। গান এবং নাটক উভয়ই আপলোড
দিতে পারবে। চ্যানেলের একটি নাম এবং পরিচালক মানে ‘এডমিন’ থাকতে
হবে। এডমিন ছাড়া কেউ গান অথবা নাটক আপলোড দিতে পারবে না। কি নাম দিবে ইউটিউব
চ্যানেলের? কিছু
ভেবেছ?
না ভাবিনি। ফরিদা বললো- এখন আলোচানা
করে নামটা ঠিক করে দিচ্ছি।
হ্যাঁ নাম ঠিক কর। চ্যানেল খুলতে গেলে
আগে নামই লাগবে।
ফরিদা এবং রাশিদা আলোচনা করে নাম ঠিক
করলো ‘তরী' অর্থাৎ নৌকা।
তরী নাম রাখার অর্থ হলো, তরীতে চড়ে তারা সঙ্গীত সাগরে ভেসে
বেড়াবে এবং সঙ্গীতের স্বাদ গ্রহণ করবে, তাই তরী নামটিই তাদের নিকট বেশি মনোগ্রাহী হবে বলে ধারণা হলো। সাহেদ
আলীও নামটা সমর্থন করলো।
রাশিদা বললো- একবার আব্বাকে ফোন করে
জেনে নাও তরী নামটি কেমন হবে?
কথাটা মন্দ বলিস নি। রাশিদাকে সমর্থন
করে ফরিদা বললো- কাকুর অনেক অভিজ্ঞতা আছে এই ক্ষেত্রে। ফোন লাগা। রশিদ মোল্লাকে
ফোন দিয়ে নাম সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলো। রশিদ মোল্লাও নামটি সমর্থন করলেন। তাই
তরী নামটিই অবশেষে ফাইন্যাল করলো।
সাহেদ আলী বললো- একটি ‘ই-মেইল আইডি’ খুলতে হবে। এখানে মোবাইল নম্বর দিতে
হবে। কার মোবাইল নম্বর দিবে?
ফরিদা কোনো রকম না ভেবেই বললো- রাশিদা
তোর মোবাইল নম্বর বল। আমার মুখস্থ নেই তোর মোবাইল নম্বর।
রাশিদা বললো- আমার মোবাইল নম্বর কেন? তোমারটা বল।
না, আমার মোবাইল নম্বর না,
তোরটা দে।
কেন? আমারটা কেন? সবকিছু
করেছ তুমি। মোবাইল নম্বর আমার দিবে কেন?
আমি তোর থেকে বয়সে বড় না?
হ্যাঁ বড়।
বড়র কথা মানতে হয়, এ কথা কি জানিস না! নম্বর বল। না হলে
আমিই মোবাইল দেখে বলে দিব।
ফরিদার উদ্দেশ্য কি রাশিদা বুঝতে পারল
না। তাই সে বললো- আমার মোবাইল নম্বর দিতে হবে, কারণ কি?
কারণ পরে বলবো। মোবাইল নম্বর দিতে বলছি, নম্বর বল।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাশিদা নিজের মোবাইল
নম্বর বললো।
আলী যাবতীয় কাজ শেষ করে ললো- ‘লগো' কি দিবে?
ফরিদা বললো- ইউটিউবের নাম তরী। তাই
একটি নৌকার ফটো দিন।
সাহেদ আলী বললো- 'কনটেন্টে’র প্রয়োজন হবে। মানে কি রকম ভিডিও
আপলোড দিবে এই আর কি?
ফরিদা বললো- সাহেদ ভাই, কনটেণ্ট বলার আগে আমি একটি গল্প বলে
নিই। যদি শুন তাহলে বলব।
সাহেদ আলী এবং রাশিদা গল্পটা শুনার
জন্য উৎসুক্য হয়ে নড়েচড়ে বসলো।
ফরিদা গল্পটা বলে গেলো। গল্পটা এরকম-
পদ্মলোচন নামের একজন লোক ছিলো। নাম
পদ্মলোচন হলেও সে ছিলো জন্মান্ধ। অন্ধ হলেও সে লাঠির সহায়ে অনায়াসে চলা-ফেরা
করতে পরতো। প্রয়োজনে সে লাঠির সহায়ে ভীরের মাঝেও যাওয়া আসা করতে পারতো। শুধু
তাই নয়, সে সহরে-নগরে গাড়ী-মটর
থেকে শরীর বাঁচিয়ে অলি-গলি ঘুরে বেড়াতে পারতো। একবার সে ভিক্ষা মাগতে যাওয়ার
সময় হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি শিবলিঙ্গ-এর ওপড়ে সাষ্টাংগে ওপুড়
হয়ে পড়ে গেলো। ঠিক প্রণিপাত করার মতো।
শিবলিংগটা ছিলো একটি জঙ্গলাকীর্ণ
স্থানে। ফলে ভক্তের তত সমাগম ছিল না। বিশেষ উৎসৱ-পাৰ্বণ না হলে স্থানটিতে মানুষ
যায় না বললেই চলে। সেজন্য ভোলানাথ সর্বক্ষণ প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে থাকে। সেদিনও
ভোলানাথ ধ্যানস্থ ছিলেন। সেজন্য পদ্মলোচন সেভাবে সাষ্টাংগে ওপুড় হয়ে পরাতে তিনি
ভক্তের প্রতি প্রসন্ন হয়ে ভক্তটিকে বর প্রদানের কথা ভাবলেন। তিনি চক্ষু উন্মীলন
না করেই বললেন- বৎস, আমার
প্রতি তোমার অটল ভক্তি দেখে আমি খুবই প্রসন্ন হয়েছি। তোমাকে আমি বর দিতে চাই। এখন
বল, কি বর চাও তুমি? কিন্তু সাবধান, মাত্র একটা বর পাবে। একবারে আমার একটার
বাহিরে দু’টি
বর দেওয়ার নিয়ম নাই।
ভোলানাথ বর দেওয়ার কথা শুনে পদ্মলোচন হাতে
স্বর্গ পেলো। কিন্তু বর মাত্র একটা। সেজন্য সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। তার অনেক কিছুর
প্রয়োজন। তার ভেতরে মুখ্য হলো দৃষ্টি শক্তি এবং ধন-সম্পত্তি। এই দুইটার ভেতরে
আবার দৃষ্টিশক্তি বেশি দর্কার। দৃষ্টি শক্তি না থাকলে দিনেই সব অন্ধকার। পৃথিবীর
রূপ-রস-গন্ধ তার জন্য অর্থহীন। যার দৃষ্টিশক্তি নাই সে-ই বুজে দৃষ্টিশক্তির মর্ম। দৃষ্টিশক্তি
না থাকলে শুধু বেঁচে থাকার বাইরে আর কিছু নয়। তা-ও লোকের গলগ্রহ হয়ে। সেজন্য সে
চোখ দু’টো ভাল করে
দেওয়ার জন্য বর চাওয়ার কথা ভাবলো। কিন্তু আবার ভাবলো, তার জমি-জমা, ধন-সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই।
দৃষ্টিশক্তি নাই বলে সে ভিক্ষা করে কোনোমতে খেয়ে-ধেয়ে বেঁচে রয়েছে। দৃষ্টিশক্তি
না থাকার জন্য মানুষ অনুকম্পা করে তাকে ভিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে
পেলে লোকেরা তাকে ভিক্ষা দিবে কি?
এসব কথা মনে মনে ভেবে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পাওয়ার চেয়ে অন্ধ
হয়ে থাকাটাকে উত্তম বলে ভাবলো। সেজন্য সে ধন-সম্পত্তি চাওয়ার কথা ভাবলো।
ধন-সম্পত্তি থাকলে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও সে ভালোভাবে খেয়ে-ধেয়ে বেঁচে থাকতে
পারবে। আবার ভাবলো, চোখের
দৃষ্টি না থাকলে সে ধন-সম্পত্তি দিয়ে কি করবে? দৃষ্টিশক্তি না থাকলে বিলাস ব্যসন তার কাছে অর্থহীন। সেজন্য সে একটা
বরের জরিয়তে সব জিনিস পাওয়ার কথা ভাবলো। যার দ্বারা একদিকে সে দৃষ্টিশক্তিও
ফিরিয়ে পাবে এবং অন্যদিকে ধন-সম্পত্তিও লাভ হবে। কিন্তু কীভাবে খুঁজে সেই বর?
এ ভাবে মনে মনে চিন্তা-ভাবনা করে থাকতে
ভোলানাথ অধৈর্য হয়ে উঠলেন-বৎস,
মনে মনে আছ কেন? বর
চাও। যা খুঁজবে তাই পাবে। যা মন যায় তাই চাও।
পদ্মলোচনের মনে হঠাৎ একটি বুদ্ধি
খেলালো। একটি শর দিয়ে সে দু'টি
শিকার করার কথা ভাবলো। ভাবামতেই সে আবার সাষ্টাংগে প্রণিপাত করে বললো- প্রভু, বর মাত্র একটা। সেজন্য তুমি আমাকে এমন
একটা বর দাও, যাতে
আমি সোনার সিংহাসনে বসে, দুই
চোখ দিয়ে দেখে, সোনার
থালায় রূপার চামুচ দিয়ে খেতে পারি।
ভোলানাথ বুঝতেই পারলেন না যে, পদ্মলোচন একটা বরের দ্বারা সংসারের সব
জিনিস খুঁজেছে। সেজন্য তিনি দুই হাত উত্তোলন করে প্রসন্নচিত্তে বললেন- তথাস্তু।
ভোলানাথের বর অথলে যায় না। আখরে আখরে
ফলে। পদ্মলোচনকে দেওয়া বরও আখরে আখরে ফললো। সাথে সাথে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে
পেলো। চোখে দেখার সাথে সাথে সে পূর্বের পদ্মলোচন থেকে নতুন মানুষ হয়ে পড়ল।
ভোলানাথকে দেখেই সে চিৎকার করে বললো- ছিঃ ছিঃ, ভোলানাথ এত নোংরা! সাপটা কণ্ঠে ধারণ করে ভাং খেয়ে কি রকম ভয়ংকর রূপ
ধারণ করে রয়েছে.........।
গল্পটা বলেই ফরিদা বললো- আমাদেরও
প্রত্যাশা অনেক। কনটেণ্টে যে কয়টা সম্ভব দিয়ে দাও। তবে হ্যাঁ, যদি সফল হতে পারি তাহলে অন্ধ ভিক্ষুকের
মতো বলব না, ইউটিউব
চ্যানেল নোংরা!
গল্পটা শুনে হাসমত এবং ফরিদা হেঁসে
ফেললো।
সাহেদ আলী বললো- তুমিও কম না। অন্ধ
ভিক্ষুকের মতো একটাতেই সবকিছু পেতে চাইছ। তবে, সব কিছু দেওয়া সম্ভব হবে না। এক
ধরণের কনটেণ্টই থাকতে হবে। তাতে লাভ তোমাদেরই হবে। তোমাদের গান এবং নাটক তো? দু'টোই আপলোড দিতে পারবে। এ ভাবে বলে সাহেদ আলী ইউটিউব চ্যানেলের
যাবতীয় কাজ শেষ করে বললো-ইউটিউব চ্যানেল খোলা হয়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টা পরে ভিডিও
আপলোড দিতে পারবে।
আচ্ছা সাহেদ ভাই, ভিডিওর জন্য ক্যামেরা কোনটা ভলো হবে? ফরিদা জিজ্ঞাসা করলো।
ভিডিওর জন্য ইওএস সি২০০ ক্যামেরা ভালো।
কিন্তু তোমাদের সেটা কেনা সম্ভব হবে না। এই ক্যামেরার মূল্য প্রায় সারে চার হাজার
ইউএস ডলার। ক্যানন ইওস ১৫০০ডি কিনতে পার। মূল্য প্রায় ৩৭,০০০ টাকার মতো পড়বে। ভিডিওর জন্য
কেমেরার কোয়ালিটি ভালো হওয়া প্রয়োজন।
যত গুড় তত মিঠা। আমাদের অত টাকা নেই।
পরেরটা কিনব। তবে পাব কোথায়? ফরিদা
বললো।
আমাজনে অর্ডার দিলে চার পাঁচ দিনের
মধ্যেই পেয়ে যাবে।
তাহলে অর্ডার করে দিন।
ভালো কোয়ালিটির ভিডিওর জন্য মোবাইল
অথবা লেপটপ কেমেরার মাইক্রফোন ঠিক হবে না। সাহেদ আলী বললো- ভালো মাইক্রফোন লাগবে।
আমাজনে ৭০/৮০ টাকার মধ্যে মাইক্রফোন পাবে। বললে একসাথে অর্ডার করে দিই?
দিন। সাতটা মাইক্রফোন অর্ডার করুন।
আমাদের অনেক সময় দলগতভাবে গান গাইতে হবে।
সাহেদ আলী কেমেরা এবং মাইক্রফোনের জন্য
‘ফোন পে’তে অর্ডার করলো। টাকা দিলো ফরিদার
একাউন্ট থেকে।
ফরিদা বললো- ভিডিও কিন্তু আপনাকেই এডিট
করে দিতে হবে।
সমস্যা নাই। সাহেদ আলী বললো- আমি তো এর
জন্যই দোকান খুলে বসে আছি।
কেমেরা ম্যান হিসাবেও কিন্তু আপনাকেই
কাজ করতে হবে।
দৈনিক তো আর করতে হবে না। মাসে তিন
চারবার তো! তা করে দিবো।
(চৌদ্দ)
প্রথমটি ভিডিওর জন্য উৎসাহের সাথে
রাশিদারে বাড়ীতে রিহার্সেল চললো। সকাল বিকেল চললো রিহার্সেল। ক্যামেরা এলেই ভিডিও
করবে।
হাসমত আলী দলবল নিয়ে নিয়মিত
রিহার্সেলে উপস্থিত থাকে। হাসমত আলীর দলের অন্যতম গায়ক রফিকূল। কিন্তু রফিকুল রিহার্সেলের
মধ্যে কিছু কিছু গড়বড় করতে লাগলো। রফিকূল ভালো গায়ক। গায়ক হিসাবে তার যথেষ্ট
সুনামও আছে। সে মাঝেমধ্যে নানা অজুহাতে রিহার্সেলে অনুপস্থিত থাকতে লাগলো। গা
ছাড়া মনোভাব। যেন গান গাওয়ার ইচ্ছে নেই। সে হাবভাবে এমনটাই বুঝাতে লাগলো।
একদিন হাসমত আলী রফিকূলকে ডেকে
নিরিবিলিতে নিয়ে গিয়ে বললো- রফিকূল তুই এমন করছিস কেন? কেমেরা আসলেই গীত রেকর্ড করবো। এভাবে
রিহার্সেল করলে কি সম্ভব হবে?
আমাদের চ্যানেল আগে খুলেছি। রফিকুল তার
মনের কথা বললো- তাই আমরা আগে গান রেকর্ড করবো। নইলে আমি গানই গাইব না।
এরকম করাটা ঠিক হবে না। হাসমত আলী
কথাটা বুঝিয়ে বললো- আমি ওদের কথা দিয়েছি স্যারের সামনে। এখন ঝামেলা করাটা কি ঠিক
হবে? এটা বেইমানীর
বাইরে অন্য কিছু নয়।
কথা দিয়েছ তুমি। আমাদের সাথে আলোচনা
করে তো দাওনি। তুমি কথা দিয়েছ,
তুমি গান গাও। আমাদের গান আগে রেকর্ড না করলে আমি গান গাইব না। খাটাং
কথা বলে দিলাম। বলেই রফিকুল রিহার্সেল ছেড়ে চলে গেলো।
হাসমত আলী নিজে গান গায় না। দলের নেতা
সে যদিও দলের যে কয়জন গায়ক আছে,
তারা রফিকূলের কথায় উঠবস করে। তাই হাসমত ফাপরে পড়লো।
রফিকুল চলে যাওয়ার পরে হাসমত আলী রশিদ
মোল্লার পাশে এসে বসলো।
রফিকুলকে রিহার্সেল ছেড়ে চলে যেতে
দেখে রশিদ মোল্লা বললেন- রফিকূল চলে গেলো না কি?
হ্যাঁ চলে গেলো।
কেন? কি অসুবিধা হয়েছে তার?
রফিকুলের ব্যবহারে হাসমত আলী ক্ষুণ্ন
হয়েছিলো। তদুপরি রশিদ মোল্লা হলো তার শিক্ষক। সমাজে রশিদ মোল্লার সন্মান আছে। সবাই
মানে। সে-ও
মানে। তাই রশিদ মোল্লার কাছে প্রকৃত ঘটনাটা প্রকাশ করতে হাসমত আলীর প্রবৃত্তি হলো
না। সেজন্য সে আসল কথাটা লুকিয়ে গা ছাড়া মনোভাব নিয়ে বললো- জানি না, রফিকূল এমনটা করছে কেন?
রশিদ মোল্লা বললেন- আমার কিন্তু
রফিকূলের আচরণ ভালো লাগছে না। ভেবেছিলাম, কেমেরা এলেই গান রেকর্ড করবো। কিন্তু রফিকূলের হাবভাব দেখে মনে
হচ্ছে। ক্যামেরা এলেই রেকর্ড করতে পারবো। আসল কথাটা কি বলতো? সে এমনটা করার কারণ কি? সত্যি কথা বলো। আমার কাছে কোনোকিছু
লুকিও না।
রশিদ মোল্লার পীড়াপীড়ির জন্য হাসমত
আলী আসল কথাটা খুলে বললো- রফিকুল ইতিমধ্যে চ্যানেল খুলে ফেলেছে। আমরা তার সাথে
সহযোগ থাকলেও বলতে গেলে চ্যানেলটা রফিকূলই খুলেছে। চ্যানেলের যাবতীয় খরচ সে-ই বহন
করেছে। ইতিমধ্যে কয়েকটা মাইক্রফোনও কিনেছে। তাই তার ইচ্ছে আমাদের চ্যানেলে আগে
গান ছাড়বে। সে ভাবতেছে, রাশিদাদের
চ্যানেলে আগে ছাড়লে তার চ্যানেলটা আদৌ চলবে না। বুঝতে পারছি না, এখন আমি কি করবো। আপনাকে মুখ দেখাতেই
লজ্জা হচ্ছে। আমাদের দলের মধ্যে সে-ই ভালো গায়ক। তদুপরি সে গান না গাইলে অন্য কেউ
গাইবে না। গায়ক শিল্পী কয়জন সে নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বৈত কণ্ঠের কয়েকটা গীত আছে।
রফিকূল গান না গাইলে সেগুলো বাদ দিতে হবে। এখন হঠাৎ করে শিল্পী যোগার করা সম্ভব
হবে না।
কথাটা তাহলে এরকম। রশিদ মোল্লা বললেন-
শুভ কাজে শয়তান বাদী হবেই। এটা সৃষ্টির নিয়ম। শিল্পীদের এই এক সমস্যা। একজনের
ভালো আরেকজন দেখতে পারে না। আমরা নাটক করি, এরকম সমস্যা আমাদেরও হয় নাটকের রোল নিয়ে। সবাই ভালো রোল করতে চায়।
ভালো রোল না পেলে কয়েকদিন রিহার্সেল করে নানান অজুহাত দেখিয়ে রিহার্সেলে আসবে
না। এমন অভিনেতা অনেক পেয়েছি আমার নাটক জীবনে। রোল নিয়ে সমস্যা হয়ে কয়েকটা
নাটক রিহার্সেল করার পরেও মঞ্চস্থ করা সম্ভব হয়নি। এক কাজ কর। রফিকুল গান না
গাইলে তো আর জোর করে গান গাওয়ানো যাবে না! তাই দ্বৈতকণ্ঠের গান কয়টা বাদ দিয়ে
দাও।
কয়েকদিন ধরে রফিকূল নেশা করা শুরু
করেছে। হাসমত আলী বললো- আগে গাঁজা সেবন করতো। এখন শুনছি, লুকিয়ে লুকিয়ে মদও খায়।
শিল্পীদের এই এক সমস্যা। রশিদ মোল্লা
বললেন- শিল্পী হলেই যেন মদ খেতে হবে! মদ না খেলে শিল্পীদের মন খুলে না। শিল্পীরা ব্যভিচারী
হতে হবে। এমনই এক ধারণা আছে সাধারণ মানুষের মনে। তাই সাধারণ মানুষ শিল্পীদের
সন্দেহের চোখে দেখে। অনেক বড় বড় শিল্পীর এরকম দুর্নাম রয়েছে। অবশ্যে সব শিল্পীর
নয়। মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পীর জন্য সমগ্র শিল্পী সমাজের দুর্নাম হয়। আমিতো সেই
ছেলেবেলা থেকে অভিনয় করে আসছি। কোনোদিন নেশা করার কথা মনেও আসেনি। আমি কি অভিনয়
করিনি?
সফিকুল হাসমত আলীর দলে দোতারা বাজায়।
তার বয়স কম। কথা কম বলে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলার অভ্যেস নাই তার। পরচর্চাও সে
পছন্দ করে না। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলীর কথা-বার্তা
শুনছিলো। সে এগিয়ে এসে বললো- শুধু মদই খায় না রফিকূল। সে মেয়েদের সাথে খারাপ
ব্যবহারও করে। সেদিন মদ খেয়ে ফরিদা আপুকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলো। ফরিদা আপু
ইস্পাতের মতো শক্ত মেয়ে। তাই সে রাগ না করে শুধু বলে দিয়েছে, এ রকম কথা আর কোনোদিন বলবে না। আমরা এখানে
প্রেম করতে আসিনি, গান
গাইতে এসেছি। তোমার মুখে যদি আর কোনোদিন এ রকম কথা শুনি, তাহলে তোমার বিরুদ্ধে অনুশাসনমূলক
ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তোমাকে দল থেকেও বাদ দেওয়া হতে পারে। আজ থেকে
সাবধান হয়ে যাও। ফরিদা আপু এভাবে বলে রফিকুলকে ধমকিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। মনে হয়
রফিকূল এর জন্যই গান গাইতে চাইছে না।
আসল কথা তাহলে এখানে! রশিদ মোল্লা
বললো- রাশিদার মাও একদিন আমাকে বলেছিলো, রফিকুল ছেলেটার চাল-চলন ভালো বলে মনে হয় না। মেয়েরা কাজ করবে ওর
সাথে। তার প্রতি নজর রেখো। পুরুষের থেকে মেয়েরাই ভালো বুঝে পরুষের চরিত্র। যাক
গে, কোনো অঘটন ঘটার
আগেই যে রফিকূলের চরিত্র প্রকাশ হয়েছে, এটা আমাদের ভালোর জন্যই হয়েছে। এ দিকে ফরিদাও খুব ভালো কাজ করেছে।
সাপও যাতে মরে, লাঠিও
যাতে না ভাঙে এমন কাজই করেছে ফরিদা। হাসমত, এক কাজ কর। রফিকূলকে বাদ দিয়েই গান রেকর্ড করার ব্যবস্থা কর। রফিকূল
গান গাইলেও তাকে দিয়ে গান গাওয়ানো হবে না। নজর রেখো সে যেন রিহার্সেলে আসতে না
পারে। আসলেই আমাকে বলে দিবে। তোমরা কিছু বলো না। যদি প্রয়োজন হয়, যা বলার আমিই বলবো।
অবশেষে রফিকূলকে বাদ দিয়েই রিহার্সেল
চললো। পাঁচদিন পরে ক্যামেরা, মাইক্রফোন
এলো। প্রথমটি রেকর্ডের
জন্য রশিদ মোল্লা একটি নাটকও লিখে ফেললেন। নাটকের বিষয়
বস্তু এরকম- কয়েক জন শিল্পী এক জায়গায় মিলিত হবে। তখন রশিদ মোল্লা সেখানে গিয়ে
বলবে- এখানে তোমরা কি করছ?
তখন হাসমত আলী বলবে- স্যার, আমরা গান রেকর্ড করার কথা ভাবছি।
তাহলে দেরি কেন? রেকর্ড করে ফেল।
শিল্পীরা সবাই এসেছে। বাদ্যযন্ত্রীর
মধ্যে কয়েকজন এখন পর্যন্ত এসে পৌঁছোয় নি। আসতেছে। তারা আসলেই শুরু করবো।
কে কেন গান গাবে?
শিল্পী তো অনেক আছে। হাসমত আলী বললো-
আজ আমরা রাশিদা, ফরিদা
এবং রফিদার গান রেকর্ড করব ভেবেছি।
কেন, তোমোদর সাথে কোনো ছেলে শিল্পী নেই?
আছে। তবে, আজ আমরা শুধু এই মেয়ে তিনজনের গানই
রেকর্ড করবো ভেবেছি।
বাদ্যযন্ত্রীদের ফোন করে তারাতারি আসতে
বলো। রাশিদ মোল্লা বললেন- এসেই যখন পড়েছি শুনেই যাই তোমাদের গান।
বাদ্যযন্ত্রীদের ফোন দিলো। একটু পরে
তারা সেখানে উপস্থিত হলো। মানুষের সমাগম দেখে স্থানীয় কয়েকজন লোক সেখানে জড়ো
হয়েছিলো। তাদের দেখিয়ে রশিদ মোল্লা বললেন- দেখ, তোমাদের গান শুনার জন্য কত লোক জড়ো হয়েছে। শুরু করে দাও।
এ রকম নাটকের মাধ্যমে পূর্বে সিদ্ধান্ত
অনুযায়ী মিজানূর রহমানের আঙ্গিনায় প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে গান শুরু হলো এবং
গান রেকর্ড হতে লাগলো। ফরিদা, রাশিদা
এবং রফিদা পর পর দু'টি
করে গান গাইল। গান মোটা-মুটি ভালোই হলো। গান শুনে উপস্থিত দর্শকরা হাততালি দিলো।
গান রেকর্ড করছিলো সাহেদ আলী।
রশিদ মোল্লা বললেন- কেমন রেকর্ড করলে? ভালো হবে তো?
সাহেদ আলী বললো- ভালোই হয়েছে স্যার।
মনে হয় লোকের মাঝে সাড়া পড়বে।
কয়দিন পরে নেটে ছাড়বে?
এডিট করে দু'দিন পরেই নেটে ছাড়বো ভেবেছি।
দুদিন পর গান নেটে ছাড়লো। সাতদিনের
মধ্যে এক হাজার সাবসক্রাইবার হয়ে গেলো। “ভিইও’ হলো
দশ হাজার। টাকা উপার্জনের জন্য প্রতিটি বিডিওর জন্য এক হাজার থেকে দুই হাজার ভিইও
এবং বার মাসের মধ্যে চার হাজার ঘণ্টা দেখার প্রয়োজন। পনের দিনের মধ্যেই তাদের
চ্যানেল ইউটিউবের নিৰ্দ্ধারিত সব কয়টি শর্ত পূরণ করে ফেললো। সবার মুখে মুখে ফরিদা, রাশিদা এবং রফিদার সাথে সাথে তরী
ইউটিউব চ্যানেলের নাম উচ্চারিত হতে লাগলো।
পনের দিন পর তারা আরও কয়েকটি গান
রেকর্ড করে নেটে ছেড়ে দিলো। এক মাসের মধ্যে তাদের টাকা আসতে শুরু হলো।
প্রথম রেকর্ডটিতে দুই মাসের মধ্যে পনের
লাখ ভিইও হলো এবং তাদের একাউন্টে টাকা জমা হতে শুরু করলো।
(পনের)
রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলী গ্রামে
গ্রামে ঘুরে নতুন নতুন শিল্পীর সন্ধান করতে লাগলো। এক সময় ‘তরী’ ইউটিউব চ্যানেলের জনপ্রিয়তা এত বৃদ্ধি পেলো যে, তাঁদের আর ঘুরে ঘুরে শিল্পীর সন্ধান
করার প্রয়োজন থাকলো না। নতুন নতুন শিল্পীরা নিজে যেচে এসেই তাঁদের সাথে যোগাযোগ
করতে লাগলো। একদিন একটি মেয়ে এলো। মেয়েটির নাম রাবিয়া। গরীব ঘরের মেয়ে। স্বামী
পরিত্যক্তা। মেয়েটির বাবা গাঁজাখোর। তাস খেলে। জমিজমা ভালোই ছিলো। তবে তাস খেলে
বাবা সব জমি বিক্রী করে দিয়েছে। কাজ-কাম করে না। গাঁজা খেয়ে বুঁদ হয়ে পড়ে
থাকে। মা এবাড়ী ওবাড়ী কাজ করে সংসার চালায়।
মেয়েটির বিয়ে হয়েছিলো পারারই এক
ছেলের সাথে মোটে পনের বছর বয়সে। মেয়েটির বয়স এখন বিশ। দুই সন্তানের জননী। দু’টিই মেয়ে। ছেলে সন্তানের অজুহাতে
রাবিয়ার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছে পাড়ারই একটি মেয়েকে। জমিজমা তেমন নাই। তাই রাবিয়ার
স্বামী বিয়ে করে বউকে নিয়ে এখন গুয়াহাটীতে হাজিরা করে। রাবিয়াকে ভাত-কাপড়
দেয় না। এমন কি মেয়ে দু'টিরও
খোঁজ-খবর নেয় না। তাই রাবিয়া এখন বাবা-মার সংসারে রয়েছে মেয়ে দু'টিকে নিয়ে বাবা মা'র গলগ্রহ হয়ে।
রাবিয়া মা’র সাথে লোকের বাড়ী কাজ করে। মেয়ে দু’টিকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। কিন্তু
সব সময় কাজ পাওয়া যায় না। তাই মেয়ে দু’টিকে নিয়ে মাঝেমধ্যে না খেয়ে দিন গুজরান করতে হয়। তাই সে এসেছে
গান গাইতে। মেয়েটি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত লেখা-পড়া করেছে। স্কুলের ফাংশনে সে গান
গাইতো। ভালোই গাইতো। তার গান শুনে লোকে প্রশংসা করতো। সেই সাহসেই সে এসেছে তরী ইউটিউব
চ্যানেলে গান গাইতে। যদি বাড়তি দু’পয়সা
উপার্জন করা যায় এই আশায় !
বর্তমান চ্যানেলের সবকিছু দেখা শুনা
করে রশিদ মোল্লা নিজে। ফরিদা এবং রাশিদা হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। তাদের লেখা-পড়া
যাতে খতি না হয় এজন্যই রশিদ মোল্লা চ্যানেলের দায়িত্ব নিজে নিয়েছে। শিল্পী
নির্বাচন, গান
নির্বাচন রশিদ মোল্লা নিজে করে হাসমত আলীর সাথে পরামর্শ করে।
মেয়েটির মুখে তার অভাব অভিযোগের কথা
শুনে রশিদ মোল্লা যথাসম্ভব গম্ভীর গলায় বললেন- আমাদের এখানে এসে ভালোই করেছ। আমরা
নতুন নতুন শিল্পীর সন্ধান করে তাদের দিয়ে গান গাওয়াই। নতুন শিল্পীদের সাধ্যমত
আর্থিক সাহায্যও প্রদান করি। অনেকে আমাদের চ্যানেলে গান গেয়ে ভালোই উপার্জন
করতেছে। তুমি যদি গান গাইতে চাও আমরা নিশ্চয় সুযোগ দিব। তুমি একটি গান গেয়ে
শুনাও। যদি গান ভালো হয় নিশ্চয়ই তোমার গান রেকর্ড করে ইউডিউবে ছাড়বো। গান
কিন্তু ভালো হতে হবে। লাখ লাখ মানুষ শুনবে। তাই গান ভালো না হলে রেকর্ড করা যাবে
না। গান গাও তো দেখি।
রাবিয়া বললো- চেষ্টা করে দেখি আপনাদের
মনোমত হয় কি না। সেই স্কুলের ফাংশনে গাইতাম। তখন লোকে ভালোই বলতো। বিয়ে হওয়ার
পর কোনোদিন গলা ছেড়ে গান গাইনি। তাই কেমন হবে বলতে পারছি না। আল্লাহ জানেন কেমন
হবে?
রশিদ মোল্লা সাহস দিয়ে বললেন- লজ্জা
করোনা। আমি তো তোমার বাপের বয়সী। লজ্জা করার কোনো কারণ নাই। ভালো করে দমটা টেনে
নাও। পরে গাও। আগে গেয়েছ, অভ্যেস।
ছো তো। চিন্তা নেই। আশা করি ভালোই হবে। গাও শুনি।
রাবিয়া পর পর তিনটি গান গাইলো। রাশিদ
মোল্লা গান কয়টি রেকর্ড করলো।
গান গাওয়া শেষ করে রাবিয়া বললো- কেমন
হলো, স্যার?
রশিদ মোল্লা বললেন-অনেক দিন গলা ছেড়ে
গাওনি তো তাই একটু জড়তা আছে। দুই চার বার প্রেক্টিস করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
আমার গান রেকর্ড করবেন, স্যার?
আমি একা গান নির্বাচন করি না। আমরা
একটি টীম হিসাবে কাজ করি। গান এবং শিল্পী নির্বাচন আমি হাসমতের সাথে আলোচনা করে
করি। আমি তার সাথে আলোচনা করে তোমাকে পরে জানাব। তোমার মোবাইল নম্বর দিয়ে যাও।
রাবিয়া মোবাইল নম্বর দিয়ে চলে গেলো।
রশিদ মোল্লা হাসমতকে ডেকে এনে গান শুনালো। গান শুনে হাসমত আলী বললো- ভালোই তো
গায়। রেকর্ড করলে মনে হয় লোকে শুনবে। কোনদিন যাবেন রাবিয়াকে জানিয়ে দিন।
হাসমতের সাথে আলোচনা করে দিন বার এবং
সময় ঠিক করে ফোন করে রশিদ মোল্লা রাবিয়াকে জানালো- আমরা আলোচনা করে তোমার গান
রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা রবিবারে বিকেল বেলা গিয়ে তোমার গান রেকর্ড
করবো। তুমি তিনটি গান ভালোভাবে প্রেকটিস করে রেখো।
রবিবার দিন সময় মতো দলবল নিয়ে রশিদ মোল্লা
রাবিয়াদের বাড়ী গেলেন। বাড়ীতে তিনটি খড়ের ঘর। ছোট ছোট। গৃহ বলা চলে না।
কুঁড়েঘর। কাশবনের বেড়া। বেড়াগুলো মাটি দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে লেপা।
কুড়ে ঘর হলেও গৃহ তিনটি গৃহস্থের সুরুচির পরিচয় বহন করছিলো।
রাবিয়ার বাবা বারান্দায় শোয়ে ছিলেন।
রশিদ মোল্লাদের দেখে সে উঠে বসলো। জরাজীর্ণ চেহেরা। গাঁজা এবং মদে শুধু সংসারটাকেই খায়নি, মানুষটাকেও খেয়ে ফেলেছে। কেন যে মানুষ
গাঁজা মদ খায় ! যৌবনে সঙ্গ দোষে মানুষ শখের গাঁজা মদ খায় এবং তা ধীরে ধীরে অভ্যাসে
পরিণত হয়। একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তখন ইচ্ছা করলেও আর ছাড়া যায় না। নিজে তো
ডুবেই, পরিয়াল পরিজনকে
নিয়ে ডুবে।
রশিদ মোল্লা বললেন- রাবিয়া আছে না কি? আমরা রাশিদার সাথে দেখা করতে এলাম।
রাবিয়ার বাবা গৃহের দিকে তাকিয়ে
বললো- আছে। ঘরের ভিতরে।
রাবিয়া সত্যিই গৃহের ভেতরে ছিলো। সে
গৃহ থেকে বেরিয়ে এসে বললো- আসেন স্যার। আমি আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করতেছি। ঘরের
ভেতরে আসেন।
রশিদ মোল্লা ঘরের দিকে পর্যক্ষেণের
দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- আমরা ছয় জন এসেছি। মনে হয় গৃহের ভেতর বসতে অসুবিধা হবে।
বাইরেই বসার ব্যবস্থা কর।
ভেতরে আসেন স্যার। রাবিয়া অনুনয়ের
স্বরে বললো- আপনাদের জন্য একটু চা জলের ব্যবস্থা করেছি।
চা জল আবার কেন? রশিদ মোল্লা আপত্তির স্বরে বললেন- আমরা
এসেছি তোমার গান রেকর্ড করার জন্য। চা জল খেতে তো আসেনি।
তেমনভাবে বলবেন না স্যার। চা জল তেমন
কিছু নয়। একটু চা এবং বিস্কুট। আমরা গরীব। তাই আপনাদের খাওয়ানোর মতো ক্ষমতা আমাদের
নেই স্যার। একটু চা খেলে আমার খুব ভালো লাগবে।
ধনীরা লোকেদের ভোজন করায় নিজের
ঐশ্বর্য বিভূতি প্রদর্শনের জন্য(অবশ্যে সবার ক্ষেত্রে নয়)। দশ পনেরটা গরু মেরে
বাবা- মা, দাদা-দাদীর
নামে খরচ করে। তাতে আন্তরিকতা তেমন থাকে না। তবে গরীবদের কথা আলাদা। তারা যা করে আন্তরিকতা
নিয়েই করে। অগত্যা রশিদ মোল্লাকে গৃহের ভেতর প্রবেশ করতেই হলো। তাঁর সাথে হাসমত
আলীও গৃহের ভেতর প্রবেশ করলো। বাকী কয়জন বাইরেই চেয়ার পেতে বসলো।
ঘরের ভেতরের বেড়াগুলোও মাটি দিয়ে
লেপা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মেঝেগুলো ঝঝকে। জিনিসপত্রগুলো সুবিন্যস্তভাবে সাজানো। শিক্ষিত
এবং শিল্পীপ্রাণের ছুঁয়া লেগে ছিলো প্রতিটি কাজে।
বাড়ীতে পাশাপাশি দু’টি কাঁঠাল গাছ ছিলো। চা জল খাওয়ার পরে
কাঁঠাল গাছের নিচে বসে প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনটি গান রেকর্ড করলো।
গান রেকর্ড করার পর সবাই হাততালি দিয়ে
রাবিয়াকে উৎসাহিত করলো। সাহেদ আলী বললো- খুব ভালো হয়েছে স্যার। আমি বাড়ীতে
প্রবেশ করা থেকে শুরু করে প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ড করেছি। এগুলো দিয়ে দিলে মনে হয়
গান কয়টি খুবই হিট হবে। দিব না কি, স্যার?
নিশ্চয় দিবে। রশিদ মোল্লা বললেন-
মানুষের প্রতি মানুষের দরদ আচার আচরণ থেকেই তো আসে। এদের বাড়ীর যে অবস্থা, এগুলো দেখলে লোকে নিশ্চয় গ্রহণ করবে।
গান কয়টি ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়া হলো।
ভালোই ভিইও হলো। একদিন রাবিয়াকে ডেকে এনে রশিদ মোল্লা দশ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন।
ফলে রাবিয়া খুবই উৎসাহিত হলো।
রাবিয়া বললো- সবাই আজকাল টিনের ঘরে
থাকে। মেয়ে দু'টি
আমাকে টিনের ঘরের কথা বলে। এই টাকাগুলো দিয়ে টিন কিনে এনে ছাপরা দিবো, স্যার।
গান গেয়ে যাও। শুধু ছাপরা না, ভাগ্যে থাকলে, একদিন টিনের ঘরই দিতে পারবে।
(ষোল)
একদিন রাশিদা ফোন দিলো রশিদ মোল্লাকে।
রশিদ মোল্লা ফোন রিসিভ করে বললেন- কেমন আছিস মা? ফোন দিলি কেন? ভালো
আছিস তো?
ভালো আছি, আব্বা। রাশিদা বললো- ফোন দিয়েছি বিশেষ
একটা কারণে।
কি বিশেষ কারণ? টাকা পয়সা লাগবে না কি?
না আব্বা, টাকা লাগবে না। একজন অন্ধ শিল্পীর
সন্ধান পেয়েছি। তাই ফোন দিয়েছি।
কোথায় সন্ধান পেলি?
আমার রুমমেট আকতারা পারবীনের বাড়ীর
কাছেই একজন অন্ধ ভিক্ষারী আছে। খুব ভালো গান গায়। আকতারা মোবাইলে তার গান রেকর্ড
করে এনেছে। আমি গান শুনেছি। খুব ভালো লেগেছে। আপনার মোবাইলেও পাঠিয়ে দিয়েছি।
শুনে দেখুন। মনে হয় আপনারও ভালো লাগবে।
ফরিদা গুয়াহাটীতে একটি কোসিং সেন্টারে
এডমিশন নিয়েছে। তিন মাস যাবত সে গুয়াহাটীতে আছে। সে নীট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
ফরিদা গুয়াহাটীতে থাকলেও রশিদ মোল্লা তার সাথে আলোচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন
না। তাই রশিদ মোল্লা বললেন- ফরিদা শুনেছে গান?
হ্যাঁ, শুনেছে। ফরিদার মোবাইলেও গান পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ওর কাছেও ভালো
লেগেছে। তাই তো পাঠিয়ে দিয়েছি আপনার মোবাইলে।
ফরিদার পরীক্ষা এলো না কি?
হ্যাঁ। চারদিন পরেই পরীক্ষা।
ঠিক আছে। আমি এখনই শুনে বলছি গান রেকর্ড করা যাবে কি না।
দু’টি গান। দু'টিই
বাউল গান।
প্রথম গানটি এরকম-
বিধি তোমার বিচার বুঝি নাই
তুমি কারও দেখি সুখে হাঁসাও
কারও দেখি সাড়া জীবন ভরে
নয়ন জলে ভাসাও।
দ্বিতীয় গানটি
এরকম-
বিশ্ব বিজ্ঞান কোরান পেয়ে
দেশে দেশে ভিক্ষা করে
মানুষ স্বভাব দোষে মরে.....
গান দু'টি শুনে ভালো লাগলো রশিদ মোল্লার। অন্ধের কণ্ঠে এত সুন্দর গান। এ
ছিলো রাশিদ মোল্লার কল্পনারও অগোচর। গান দু'টি শুনেই তিনি হাসমত আলীর মোবাইলে পাঠিয়ে দিয়ে ফোন দিলেন- হাসমত দু’টি গান পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখ তো কেমন
লাগে?
হাসমত আলী গান দু’টি শুনে ফোন দিয়ে বললো- ভালোই তো।
শুধু ভালোই নয়, খুব
ভালো। শিল্পীর বাড়ী কোথায়?
বাড়ীর কথা জানি না। অন্ধ শিল্পী।
ভিক্ষা করে খায়। গান দু'টি
রাশিদা আমার মোবাইলে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। আমি শুনেছি। আমারও ভালো লেগেছে। তোমার কি
মনে হয়, রেকর্ড করলে
লোকে শুনবে তো?
শুনবে না মানে? নিশ্চয় শুনবে। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া থালা
বাজিয়ে গান গেয়েছে। তাই শ্রুতিমধুর লাগছে। বাদ্য বাজিয়ে গান গাইলে আরও
শ্রুতিমধুর হবে। খবর করেন বাড়ী কোথায়। তারপর একদিন চলুন দলবল নিয়ে।
রশিদ মোল্লা রাশিদাকে ফোন দিয়ে বললো-
রাশিদা, গান ভালোই
হয়েছে। হাসমত আলীকেও শুনালাম। সেও ভালোই বললো। রেকর্ড করা যাবে। শিল্পীর বাড়ী
কোথায়?
বাড়ী ময়নবরির কাছের একটি গ্রামে।
গ্রামের নাম খাজারটারী।
ঠিকানা জেনে নাও। কোনদিন গেলে তাঁকে পাওয়া
যাবে জেনে আমাকে জানিও। আমরা তাঁর গান রেকর্ড করতে যাব।
জ্বি আব্বা। আকতারার সাথে কথা বলে
কোনদিন যাওয়া যায় এখনই আপনাকে জানাইতেছি।
অন্ধ শিল্পীর নাম মমরেজ শিকদার। বাড়ী
খাজারটারী গ্রামে। আগে বাড়ী ছিলো দেউলদি নামের একটি গ্রামে। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের
ফলে খাজারটারী গ্রামে স্থানান্তর হয়েছে দশ বছর আগে। আগে মমরেজ শিকদার অন্ধ ছিলেন
না। পাঁচ বছর আগে সন্নিপাত জ্বর হয়ে অন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসা করলে ভালো হওয়ার
সম্ভবনা আছে। তবে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। জমাজমি নেই। ফলে জীবন
নির্বাহের কোনো সাধন নেই। তাই এখন বৌয়ের হাত ধরে ভিক্ষা করে বেড়ায়। মমরেজ
শিকদারের তিনটি সন্তান। দু’টি
মেয়ে, একটি ছেলে।
ছেলেটি ছোট। মেয়ে দু’টি
বড়। মেয়ে দু’টির
বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটি হাইস্কুলে পড়ে।
রশিদ মোল্লা দলবল নিয়ে খাজারটারী
এলেন। মমরেজ শিকাদরের বাড়ী একটি খালের ধারে। জীর্ণশীর্ণ ঘরদুয়ার। একটি মাত্র টিনের
ছাপরা। রান্না-বান্না, থাকা-খাওয়া-শোয়া
সবই হয় সেই ছাপরা ঘরে।
মমরেজ শিকদার বাড়ীতেই ছিলো। ছাপরার
সামনেই একটা আম গাছ। রশিদ মোল্লারা সেই আম গাছের নিচে বসলো।
রশিদ মোল্লা যেখানে বসেছিলো সেখান থেকে
ছাপরার ভেতরের একটা অংশ চোখে পড়ে। রশিদ মোল্লা লক্ষ্য করলো, একটি ছেলে উপুড় হয়ে শোয়ে একটি
খাতায় কিছু একটা লিখছে।
রশিদ মোল্লা বললেন-ঘরে ছেলেটি কে?
মমরেজ শিকদার বললেন-আমার ছেলে হাফিজুর।
হাইস্কুলে পড়ে। ক্লাস নাইনে। ছাত্র হিসাবে ভালো। মাস্টার মশায়রাঁ সবাই ওর লেখা-পড়ার
প্রশংসা করে। তবে মনে হয় পড়াতে পারব না। পেটই চলে না, তাদের আবার লেখাপড়া!
আরে ভাই, আপনি হতাশ হচ্ছেন কেন?
রশিদ মোল্লা মমরেজ শিকদারকে উৎসাহিত করার জন্য বললেন- লেখা-পড়ায় ভালো, কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় হয়ে যাবে।
সেই আশায়ই বুক বেঁধে আছি। মমরেজ
শিকদার আক্ষেপের স্বরে বললেন- কেউ সারা জীবন সুখে হাঁসে, কেউ আবার সাড়াটি জীবন দুঃখের সাগরে
ভাঁসে। খোদার এ রকম অবিচার কেন?
খোদার দোষ দিচ্ছেন কেন? রশিদ মোল্লা বললেন- দোষ খোদার না। দোষ
মানুষের। মানুষের যতটুকু প্রয়োজন,
খোদা ততটুকুই দিয়েছেন। আমরা মানুষেরা লোভে পড়ে, মানুষ ঠকিয়ে, সেই সম্পদ ব্যাংকে জমা করছি। যারজন্য
একাংশ মানুষ দারিদ্রতায় ভুগছে। ধরুন, চারজনের খাবার আছে,
সেই খাদ্য একজনে খেয়ে যদি বাকী খাদ্য ফ্রিজে লুকিয়ে রাখে তাহলে, বাকী তিনজন তো না খেয়ে থাকতে হবে না
কি? একটা কম্বলের
নিচে দু’জন বুঝাবুঝির
মাধ্যমে ভাগাভাগি করে শোইলে আরামে শোয়া যায়। যদি একজন কম্বলটি পেঁচিয়ে শোয়
তাহলে আরেকজনের তো কম পরবেই না কি?
সেই আরেকজনকে তখন শীতে কষ্ট করেত হবে।কথা ঠিক এই রকম আর কি।
আমরা অতসব বুঝি না, যা চোখে দেখি, শুনি তাই বলি।
রশিদ মোল্লা ছেলেটিকে কাছে ডাকলেন- এই
ছেলে। এখানে এস।
ছেলেটি এলো। রশিদ মোল্লা বললেন- ঐ রকম
শোয়ে শোয়ে কি করছিলে?
অংক কষছিলাম, স্যার।
শোয়ে শোয়ে কেন? শোয়ে শোয়ে পড়লে বুকে ব্যথা হবে।
তোমার টেবিল নাই?
নাই স্যার।
রশিদ মোল্লা হাসমতের দিকে তাকিয়ে
বললেন- একটা টেবিলের দাম কত হবে?
এই ধরুন, ডের দুই হাজার। হাসমত আলী বললো।
রশিদ মোল্লা পকেট থেকে দুই হাজার টাকার
একটি নোট বের করে ছেলেটির দিকে বাড়িয়ে বললেন- টাকা কয়টা নাও। একটি টেবিল কিনে
নিও। তোমাদের বাজারে টেবিল পাওয়া যায় না?
যায় স্যার। ছেলেটি নোটটা হাতে নিয়ে
বললো।
কালই কিনে নিবে। টেবিলে বসে লিখলে
তোমার হাতের আখরও ভালো হবে। এভাবে বলেই মমরেজ শিকদারকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
ছেলেটিকে দুই হাজার টাকা দিলাম। কালই টেবিল কিনে দিবেন। আপনি সাথে যাবেন। না হলে
মিস্ত্রীরা ঠকাতে পারে।আজকাল মানুষের বুকপিঠ নেই। মানুষ মা'র নাকের সোনা চুরি করে, এতিমের হকও মেরে খায়।
তা ঠিক। মমরেজ শিকদার মাথা নেড়ে রশিদ
মোল্লার কথা সমর্থন করে বললেন-আমাদের চর উঠেছে। আমি অন্ধ বলে ভাইয়েরা আমাকে
ঠকাচ্ছে। আমাদের ভাগে জমি কম দিয়েছে, আমি তাদের সাথে চরে যাইনি বলে। আপন পেটের ভাই, তাই এসব কথাবলতেও লজ্জা লাগে।
দুনিয়াটা এ রকমই। সবাই স্বার্থ আগে
দেখে। স্বার্থ ছাড়া কেউ কারো হয়ে কাজ করে না। এ ভাবে মন্তব্য করে রশিদ মোল্লা
বললেন- আপনি গান শিখেছেন কার কাছে?
না, তেমন করে কারও কাছে শিখিনি। শুনে শুনে শিখেছি।
বাদ্যযন্ত্রের সাথে গান গাওয়ার অভ্যেস
আছে তো। অনেকে আবার ব্যদ্যযন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে গাইতে পারে না।
মনে হয় পারব। মমরেজ শিকদার বললেন- আগে
আমাদের পারায় একটি যাত্রা দল ছিলো। সেই দলে আমি বিবেকের পার্ট করতাম।
তাহলে আপনি পারবেন। রশিদ মোল্লা বললেন-
আপনি তো চোখে দেখতে পান না। খাতা দেখে তো গাইতে পারবেন না। মুখস্থ গাইতে হবে। ক’টি গান মুখস্থ আছে আপনার?
অনেক। তা পঞ্চাশ ষাটটা তো হবেই।
আমরা আপনার গান রেকর্ড করবো।
শ্রোতাদর্শকেরা গ্রহণ করলে আপনার ভাগ্য খুলে যাবে। আজ আমরা তিনটি গান রেকর্ড করবো।
ভালো হলে পর্যায়ক্রমে আপনার সব গানই রেকর্ড করার চেষ্টা করবো।
মমরেজ শিকদার তিনটি গান গাইলো। গান
কয়টি ভালোই রেকর্ড হলো। চারদিন পর গান কয়টি নেটে ছেড়ে দিলো। ভালোই ভিইও হলো। এক
মাসের মধ্যে এক মিলিয়ন।
মমরেজ শিকদারের কপাল খোলে গেলো।
ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে তিনি গানকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করলেন।
(সতের)
সেদিন আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন ছিলো।
মাঝেমধ্যে ছিটা ছিটা বৃষ্টি পড়ছিলো। দমকা বাতাসও বইছিলো। মনে হয় বৃষ্টি জোরেই
আসবে। রশিদ মোল্লাদের এক জায়গায় যাওয়ার কথা। শিল্পীর সন্ধান পাওয়া গেছে। শিল্পী পাগলী।
সাথে জ্বীন আছে। নাম সাজিদা। এমনিতে ভালোই। চুপচাপ থাকে।
শান্তশিষ্ট। তবে মাঝেমধ্যে পাগলামি করে জ্বীন ভর করলে। রশিদ মোল্লাদের গ্রাম থেকে
বাড়ীটা অনেকটা দূরে। হাসমতের সাথে যাওয়ার কথা বাইকে করে। বৃষ্টির অবস্থা দেখে
রশিদ মোল্লা হাসমতকে ফোন দিলেন।
সেপ্রান্ত থেকে হাসমত ফোন রিসিভ করে
বললো- বলেন স্যার। বৃষ্টির অবস্থা ভালো মনে হচ্ছেনা। আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে রয়েছে।
বৃষ্টির অবস্থা দেখেই ফোন দিয়েছি।
রশিদ মোল্লা বললেন- মনে হয় বৃষ্টি জোরেই আসবে। এই বৃষ্টির মধ্যে যাওয়া অসুবিধা হবে। তাই
তোমাকে ফোন দিয়েছি। আজ না গেলে হয় না?
কথা দিয়েছি। তাঁরা আমাদের জন্য
অপেক্ষা করে থাকবে। কথাটা কেমন হবে! আপনিই তো বলেন কথা দিলে কথা রাখতে হয়।
অবশ্যেই। না হলে বাঘ আর রাখালের গল্পের
মতো হয়। বিশ্বাস বা আস্থা এমন এক জিনিস যা একবার ভেঙে গেলে পুনরায় জোড়া লাগানো
যায় না। তাই সব সময় কথা দিয়ে কথা রাখতে হয়। কথা দিয়ে কথা না রাখলে তার প্রতি মানুষের
আস্থা কমে যায়। তখন তার কথার মূল্য থাকে না।
তাহলে কি করবেন?
বৃষ্টির অবস্থা দেখে যেতে মনে সায়
দিচ্ছে না। রশিদ মোল্লা বললেন- এখন বয়েস হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজলে নানা উপসর্গ দেখা
দেয়। আমাদের এখানে বৃষ্টি। আমরা যেখানে যাব, সেখানেও নিশ্চয় একই অবস্থা।
ওদের বাড়ী এখান থেকে চল্লিশ মাইল দূরে,
স্যার। হাসমত আলী বললো-
ওদের সেখানে বৃষ্টির ভাব নাও থাকতে পারে! কথায় বলে, চান্দ উঠলে সব জায়গায়ই উঠে। আষাঢ় মাইসা বৃষ্টির ক্ষেত্রে এ কথা
খাটে না, স্যার। নায়ের
আগা গলুই ভিজলে, পাছা
গলুই ভিজে না।
আগে ফোন করে ওদের সেখানের আবহাওয়ার
খবর নাও। যদি ওদের সেখানে আকাশের অবস্থা ভালো থাকে, তাহলে যেতেই হবে কষ্ট হলেও। এভাবে বলেই রশিদ মোল্লা বললেন- তোমাদের
ম্যাডাম আজ মুড়ি ভাজতেছে। এস মুড়ি খাবে। মাশ কলাইর ডাল আছে। বৃষ্টির দিনে মাশ
কলাইর ডাল দিয়ে গরম গরম মুড়ি ভালোই লাগবে। আগেই তাঁদের ফোন দিয়ো না। তুমি
আমাদের এখানে আস। এখান থেকেই ফোন দিবে। প্রয়োজন হলে আমিও কথা বলব তাঁদের সাথে।
দেরি করো না। যত তারাতারি সম্ভব আস।
না দেরি করবো না। হাসমত আলী বললো- এখনই
আসব, স্যার। আমি
কাপড়চোপড় পরেই বসে আছি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে।
দশ মিনিট পরেই হাসমত আলী এলো। আমিনা
বেগম দুই থালায় মুড়ি দিয়ে গেলো।
মুড়ি খেতে খেতে রশিদ মোল্লা বললেন-
ফোন লাগাও।
হাসমত আলী সাজিদাকে ফোন দিলো। ফোন ধরলো
সাজিদার স্বামী।
হাসমত আলী বললো- আজ আপনাদের ওখানে
যাওয়ার কথা। বৃষ্টির অবস্থা কেমন?
আমাদের এখানে তো ছিটা ছিটা বৃষ্টি পড়ছে।
সাজিদার স্বামী বললো- আমাদের খানে ছিটা
ছিটা না, জোরেই বৃষ্টি
পড়ছে।
তাহলে কি করবো? প্রোগ্রাম কেনসেল করবো?
বৃষ্টির অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে
প্রোগ্রাম কেনসেলই করতে হবে। আপনারা তো প্রাকৃতিক পরিবেশে গান রেকর্ড করেন। বৃষ্টি
থাকলে কেমনে করবেন?
তাহলে প্রোগ্রাম কেনসেল করি?
তাই করুন। আপনাদেরও আসতে অসুবিধা হবে
এবং এখানে গান রেকর্ড করাও অসুবিধা হবে। দুই একদিন পরে ভালো আবহাওয়া দেখে তারিখ
করলেই হলো।
অগত্যা প্রোগ্রাম কেনসেল করা হলো।
রশিদ মোল্লা বললেন- আমরা মিছামিছি মাথা
ঘামাচ্ছিলাম। আগে ফোন দিলে এত মাথা ঘামাতে হতো না।
এমন সময় রশিদ মোল্লার মোবাইল বেজে
উঠলো। ফোন দিয়েছে ফরিদা। রশিদ মোল্লা ফোন রিসিভ করে বললো- বল ফরিদা। ভালো আছ তুমি?
ভালোই আছি কাকু। আপনারা কেমন আছেন? ফরিদা সেপ্রান্ত থেকে বললো।
আমরাও ভালো আছি। কিছুক্ষণ আগে রাশিদার
সাথে তোমার বিষয়ে কথা হয়েছে। চারদিন পর বোলে তোমার পরীক্ষা!
হ্যাঁ কাকু, চারদিন পরে পরীক্ষা।
পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন চলছে?
ভালোই কাকু। এইবার বিড়ালের ভাগ্যে
সিকা ছিঁড়তে পারে!
মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরীক্ষা দিও। আমারও
মন বলছে,এইবার তুমি কৃতকার্য
হতে পারবে। রশিদ মোল্লা এভাবে মন্তব্য করে বললেন-ফোন দিলে কেন, বলো?
কিছুদিন আগে যে অন্ধ শিল্পীর গান
রেকর্ড করেছিলেন। সেখানে রফিকুল একটি মন্তব্য করেছে।
কি মন্তব্য করেছে? খারাপ কিছু?
আমি ফোনে আর কি বলবো। আপনি নিজেই নেট
অন করে আমাদের চ্যানেল খুলে দেখুন। চ্যানেল খুললেই আপনি নিজেই দেখতে পারবেন।
রফিকুলের নাম শুনে রশিদ মোল্লা ভাবলেন, নিশ্চয় রফিকূল খারাপ কিছু মন্তব্যই
করেছে। কারণ রফিকূল সেই প্রথম থেকেই তরী চ্যানেলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে
আসছে। সে কয়েকবার চেষ্টা করেছে তরী চ্যানেলে গান গাওয়ার জন্য। তবে সুযোগ দেওয়া
হয়নি তার স্বভাবের জন্য। রফিকুল নিজের চ্যানেল প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছিলো।
তবে, সেই চ্যানেল
লোকে গ্রহণ করেনি। হতাশ হয়ে সে ইতিমধ্যে ভালো রকম নেশাসক্ত হয়ে পড়েছে। শুনা
যায়, সে ড্রাগসও সেবন
করে। নিজেই ড্রাগ্স ব্যবসার সাথে জড়িত বলে পুলিশ একবার তাকে ধরেও নিয়ে
গিয়েছিলো। একমাস হাজোত বাস করে কয়েক দিন আগে জামিনে ছাড়া পেয়েছে।
রশিদ মোল্লা চ্যানেল খুলে দেখলো, ফরিদা সত্যি কথাই বলেছে। সে লিখেছে-
তরী চ্যানেলের খুব নামডাক। তবে লোকের গান দিয়ে পোদ্দারী করতেছে। মোবাইলে শুনে
শুনে গান মুখস্থ করে সেগুলো গেয়ে নিজেদের চ্যানেলে ছাড়ে। এখন পর্যন্ত নিজেরা
একটি গান লিখে সুর করে চ্যানেলে ছাড়তে পারেনি। এদের গান তো অন্যান্য চ্যানেলেও
শুনা যায়। তাহলে তরী চ্যানেলের এত নামডাক কেন?
রফিকুলের মন্তব্যটি হাসমত আলীও দেখলেন।
হাসমত আলী বললেন- রফিকুল আমাদের
চ্যানেলের পাছে সেই প্রথম থেকেই লেগে আছে। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি বলে এখন
এভাবে মন্তব্য করছে।
রশিদ মোল্লা মন্তব্যটি পড়ে মর্মাহত
হলেন, তবে ভেঙে পড়লেন
না। কারণ সোনা পুরলে তবে তো খাঁটি হয়। সমালোচনা না হলে শুদ্ধ হওয়া যায় না।
সমালোচনা মানুষকে শুদ্ধ দিক নির্দেশনা করে। ভুলত্রুটিগুলো শুধরানোর সুযোগ করে
দেয়। তাই সমালোচনাকে কখনো ঋণাত্মকভাবে নিতে নেই। রশিদ মোল্লা মনে মনে এভাবে ভেবে
মুখ ফুটিয়ে বললেন- রফিকুল খারাপ কিছু লেখেনি। সত্যি কথাই তো লিখেছে। এতদিন আমরা
অন্যের গান গেয়ে এসেছি। কথাটা নির্ঘাত সত্য। তবে হ্যাঁ, রফিকুল ঈর্ষাতুর হয়েই মন্তব্যটি করেছে।
হাসমত আলী বললো- এরকম তো সবাই করে।
কয়জন গীতিকার আছে আমাদের মাঝে?
অনেক গীতিকারের নাম পর্যন্ত জানা যায় না। লোকগীতি বলে চালিয়ে
দেওয়া হয়। রফিকূল নিজের চ্যানেলে যে গান ছেড়েছে, সেগুলোও তো অন্যান্য চ্যানেলে পরিবেশন করা।
রশিদ মোল্লা বললেন- কিছু কিছু খারাপের মাঝে
কিছু কিছু ভালো দিকও থাকে। একটা গল্প বলি শুন। গল্পটা আমি পড়েছিলাম একটি দৈনিক
খবরের কাগজে। গল্পটা এই রকম-
গুয়াহটীর একজন ভদ্রলোক তাঁর ছেলের
এডমিশনের জন্য দিল্লী গিয়েছিলেন। দিল্লীতে গিয়ে জানতে পারলেন এডমিশনের দিন পিছিয়ে
দিয়েছে। এক সপ্তাহ পরে এডমিশন হবে। আসা-যাওয়া করতে অনেক খরচ, তাই ভদ্রলোক নিরুপায় হয়ে এক সপ্তাহের
জন্য হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এডমিশনের দিন ভদ্রলোক দেখলেন, হোটেল খরচ দিয়ে তাঁর কাছে যে কয়টি
টাকা থাকবে সেই টাকায় ছেলের এডমিশন হবে না। কিছু কম পড়বে।
তখন ভদ্রলোকের মনে পড়লো তাঁর এক
বন্ধুর কথা। বন্ধু দিল্লীতে কোনো এক কোম্পানীতে চাকরি করেন। তিনি দিল্লীতে ঘরভাড়া
করে থাকেন। ভদ্রলোক বন্ধুটিরবাড়ীও চেনেন। দু'বছর আগে দিল্লী এসে গিয়েছিলেন বন্ধুর সেই ভাড়াঘরে। তাই ভদ্রলোক বাকী
টাকা কয়টির জন্য বন্ধুর শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবামতেই বন্ধুর
ভাড়াঘরে গেলেন। কিন্তু দেখলেন বন্ধু ভাড়াঘরে নেই। অন্যান্য ভাড়াটিয়ার কাছে খবর
নিয়ে জানতে পারলেন বন্ধু পরিয়াল নিয়ে আজই গুয়াহাটী গেছেন। তখন পর্যন্ত
মোবাইলের প্রচলন হয়নি। তাই নিরুপায় হয়ে ভদ্রলোক হোটেলে আসার জন্য অটোতে উঠে
বসলেন।
কিছুদূর আসার পর পানের দোকান দেখে
ভদ্রলোকের পান খাওয়ার ইচ্ছে হলো। অটো থামিয়ে একটি পান কিনে মুখে পূরলেন। আমাদের
আসামে তো যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলার অভ্যেস। তাই ভদ্রলোক অটোতে বসেই রাস্তার
মাঝে পানের পিক ফেললেন। একটু দূরেই ট্র্যাকিক পুলিশ ডিউটি করছিলেন। রাস্তার মাঝে
পিক ফেলতে দেখে পুলিশ অটো থামিয়ে ভদ্রলোককে অটো থেকে নামতে বললেন।
ভদ্রলোক অটো থেকে নামার পরে পুলিশ
কর্মীটি বললেন- একশ টাকা জরিমনা দিন।
ভদ্রলোক বললেন- কেন, আমি কি অপরাধ করেছি?
রাস্তার মাঝে পানের পিক ফেলেছেন। এটাই
আপনার অপরাধ।
তখন ভদ্রলোক ছেলের এডমিশন এবং টাকা কম
পরার কথা জানিয়ে অনুনয় বিনয় করে বললেন- দেখুন, হোটেল খরচ দেওয়ার পরে আমার ছেলের এডমিশনের জন্য টাকা কম পরেছে। তাই
বন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম টাকা ধার করতে। কিন্তু বন্ধু বাড়ী নেই। এডমিশনের জন্যই
আমার টাকা কম পরবে। এখন যদি জরিমনা দিতে হয় আমার মহা সমস্যা হবে।
পুলিশ কর্মীটি বললেন- এখানে আমার কিছুই
করার নেই। আপনি ভুল করেছেন। ভুলের মাশুল আপনাকে গোনতেই হবে।
এভাবে কথা কাটাকাটি চলে থাকতেই
ভদ্রলোকটির বন্ধু সেখানে এসে বললেন- আরে তুই এখানে?
তখন ভদ্রলোক নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে
বললেন- তুই বোলে গুয়াহাটী গিয়েছিস।
হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। তবে আমাদের ফ্লাইট আজ কেনসেল হয়েছে। কাল যেতে হবে।
পানের পিক ফেলে পুলিশের হাতে ধরা না
খেলে ভদ্রলোক রাস্তায় দেরি করতেন না এবং তাঁর বন্ধুর সাথে দেখাও হতো না। বন্ধুর সাথে
দেখা না হলে হয়তো তাঁর ছেলের এডমিশন নেওয়াই হতো না। তাই তো বলি, কিছু কিছু খারাপ কাজের মাঝে কিছু ভালো দিকও নিহিত হয়ে থাকে।
এই গল্পের মতো আমাদের জন্য কী এমন ভালো
কাজ নিহিত হয়ে আছে?
কথাটা বুঝতে পারছ না। রশিদ মোল্লা
কথাটা বুঝিয়ে বললেন- আমরা এত দিন শুধু নতুন শিল্পী সন্ধান করেছি। আজ থেকে নতুন গীতিকার
সন্ধান করবো। রফিকুল আমাদের কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আপনার জানার মধ্যে কোনো গীতিকার আছে
নাকি, স্যার?
আছে। আমি একজনের কথা জানি। পুতলারটারীর
ফয়েজুর রহমান। ভালো গীত লিখে। তিনি দৈনিক খবরের কাগজেও অনেক গল্প কবিতা লিখেছে।
তিনি লেখা গীত স্কুল কলেজে পরিবেশন হয়। রশিদ মোল্লা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন- বৃষ্টির
ভাব মনে
হয় কেটে গেছে। চল, আমরা পুতলারটারী যাই। খুব একটা দূরও
হবে না। এক ঘণ্টার রাস্তা।
আপনি তাঁকে চেনেন, স্যার?
হ্যাঁ চিনি। আমিও এক সময় খবরের কাগজে
গল্প লেখার চেষ্টা করতাম। তখনই পরিচয় হয়েছিলো। আমি দু’বার গিয়েওছি তাঁদের বাড়ী। খুবই ভালো
লোক।
রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলী ফয়েজুর
রহমান সাহেবের বাড়ী এলেন। গেটের সামনে দেখা হলো ফয়েজুর রহমানের সহধর্মিনীর সাথে।
যেহেতু আগে দুইবার এসেছিলেন তাই ফয়েজুর রহমানের স্ত্রীকে রশিদ মোল্লা চিনতে
পারলেন।
রশিদ মোল্লা বললেন- ভালো আছেন, ম্যাডাম? আমাকে চিনতে পারছেন?
তেমন মনে পরছে না। ফয়েজুর রহমান
সাহেবের স্ত্রী বললেন- তবে, মনে
হয় আপনাকে কোথাও দেখেছি।
আমি দুইবার আপনাদের বাড়ী এসেছিলাম
পাঁচ বছর আগে।
হ্যাঁ, মনে পরেছে। আপনিও তো খবরের কাগজে লিখতেন। এখন লিখেন না না কি?
না, লিখি না। ভেন্সার স্কুলে শিক্ষকতা করে এখন মনের জোর হারিয়ে ফেলেছি।
পেটে ভাত না থাকলে মাথার চিন্তা খুলে না। তাই এখন আর লেখা হয় না। স্যার বাড়ী
আছেন না কি?
আছে। তবে তিনি এখন মানুষের সাথে খুব
একটা মেলামেশা করেন না।
মেলামেশা করেন না মানে?
মেলামেশা না করার কারণ বলে গেলো
ফয়েজুর রহমান সাহেবের স্ত্রী- মেজো ছেলে নিজে পাত্রী দেখে বিয়ে করেছিলো। আমাদের
না জানিয়ে বিয়ে করার জন্য প্রথম প্রথম আমরা বিয়েটা মেনে না নিলেও পরে সবাই মেনে
নিয়েছিলাম। সোনার টুকরো একটি নাতিও হয়েছে। সেই নাতিকে রেখে বউমা অন্যের সাথে
পালিয়ে গেছে বছর খানেক আগে। সেই থেকে স্যার লজ্জায় কোথাও যায় না, কারো সাথে তেমন কথা বলে না। বাড়ীতে
চুপচাপ বসে থাকে।
কথাটা শুনে রশিদ মোল্লা খুবই মর্মাহত
হলেন। বললেন- এমন একজন সরবরাহি ব্যক্তি লজ্জা পাওয়ারই কথা। কথাটা শুনে আমারই যেন
কেমন লাগতেছে। এভাবে দুঃখ প্রকাশ করে রশিদ মোল্লা বললেন- আমরা অনেক আশা করে এসেছি
স্যারের সাথে দেখা করবো বলে। তাহলে কি দেখা করতে পারব না?
দেখা করতে পারবেন। অসুবিধা নেই।
ফয়েজুর রহমান সাহেব রোমের ভেতর বসে
ছিলেন। রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলী রুমের ভেতরে প্রবেশ করার পর তাঁদের দেখে বললেন-
আপনি রসুলপুরের রশিদ মোল্লা না?
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আমি রশিদ মোল্লা।
তা কি মনে করে এতদিন পরে?
স্যার আপনি তো আগে গান লিখতেন। রশিদ
মোল্লা আগমনের উদ্দেশ্য জানালেন- আমরা একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি। স্বাসবক্রাইবারও
অনেক হয়েছে।
তা আমি আপনাদের জন্য আমি কি করতে পারি?
আপনি কয়েকটা গান দিলে আমাদের
শিল্পীদের দ্বারা গাওয়াতে চাই।
ও আচ্ছা। আপনারা ভালো কথাই চিন্তা
করেছেন। ফয়েজুর রহমান বললেন- আগে গান লিখতাম। দুই চারটা গান স্কুল কলেজে পরিবেশনও
হতো। কিন্তু নতুন গান কেউ গাইতে চায় না। সবাই রেডিমেড গান গাইতে চায়। তাই এখন আর
গান লেখি না।
যদি লেখা গান আছে। আমাদের দিন। আমাদের
শিল্পীদের দিয়ে নিশ্চিতভাবে গাওয়াব।
গান কয়েকটা লিখা আছে। ফয়েজুর রহমান
বললেন- কিন্তু আমি তো সুর করতে পারি না।
আমরা সুর করে গাওয়াব।
কে সুর করবে? আপনি?
না, আমি করব না। মিজানুর রহমান সুর করবে। আপনি বোধহয় চেনেন মিজানূর
রহমান সাহেবকে।
নজরুল গীতের চর্চা করে যে মিজানূর
রহমান। আপনি তাঁর কথা বলছেন না কি?
তার সাথে এক সময় আমি ভালোই যোগাযোগ রাখতাম।
হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছি।
এর পরে মিজানুর রহমান সম্বন্ধে কিছু
আলোচনা হলো। এত বড় সঙ্গীতজ্ঞ হয়েও লোক সমাজে তেমন পরিচিতি না পাওয়ার জন্য ফয়েজুর
রহমান সাহেব আফসোসও করলেন। আলোচনার পরে তিনি কয়েকটা গান এনে রশিদ মোল্লার হাতে
দিয়ে বললেন-প্রয়োজন হলে আরও লেখার চেষ্টা করবো। সুর করার জন্য আমার প্রয়োজন বোধ
করলে আমাকে বলবেন। আমি যতখানি পারি আপনাদের সহায় করার চেষ্টা করবো। এভাবে বলে
হাসমত আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন- এঁকে তো চিনতে পারলাম না।
রশিদ মোল্লা হাসমত আলীর পরিচয় দিয়ে
বললেন- হাসমত আলী আমারই ছাত্র এবং বলতে পারেন, সে আমাদের চ্যানেলের মাথা। হাসমত না থাকলে আমাদের চ্যানেল এত সফলতা
লাভ করতে পারত না। হাসমত আলী সব রকম বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানে।
ভালো। আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে
সঙ্গীত চর্চা খুব কমই হয়। ফয়েজুর রহমান মন্তব্য করলেন- যারা এগিয়ে আসে, তাদেরও ধর্মের দোহাই দিয়ে নানা
প্রকারে বাধা প্রদান করা হয়।
সেই বাধাই আমরা ডিঙাতে চেষ্টা করছি, স্যার। গানের দ্বারাও যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তা আমরা করে দেখাতে চাই।
চেষ্টা করেন। যদি সফল হতে পারেন।
অনেকখানি সফলতা পেয়েছি। আশা করছি, আরও হতে পারবো।
আমিও চাই আপনারা অনেক এগিয়ে যান।
ফয়েজুর রহমান বললেন-সঙ্গীত মানুষের অন্তরে মানবিকবোধ জাগিয়ে তোলে। শিশু, ফুল এবং নারীকে যারা ভাল না বাসে
তাঁদের মানবিক গুণ থাকে না। সুর এমন এক জিনিস যা সবাইকে আকর্ষণ করে। শুধু মানুষকেই
নয়, পশুপক্ষীদেরও
আকর্ষণ করে। পণ্ডিত যশরাজ একটি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করার সময় সঙ্গীতের সুরে
আকর্ষিত হয়ে একটি হরিণ স্টেজের অনেক কাছে এস পৌঁছেছিলো। কথিত আছে, আকবরের রাজসভার নবরত্নের অন্যতম তানসেন
দীপক রাগের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত এবং মেঘমল্লার রাগের দ্বারা বৃষ্টি বর্ষাতে
পারতেন।
এভাবে অনেক সময় সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা
চললো। পরে চা জলপান খেয়ে রশিদ মোল্লা গীত কয়টি নিয়ে বাড়ী চলে এলেন এবং মিজানূর
রহমানকে দিয়ে সুর করিয়ে কয়েকটা গান রেকর্ডও করালেন। লোকে পছন্দও করলো।
(আঠারো)
নীট পরীক্ষার রিজাল্ট বের হলো। পাঁচ শ
আশী নম্বর পেয়ে ফরিদা নীট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। সে ছিট পেলো হায়দ্রাবাদের কোনো
একটি মেডিক্যাল কলেজে। ফরিদা মেডিক্যালে ছিট পাওয়ার কথা শুনে তার বাবাও পূর্বের
রাগ গোসা ভোলে তাকে বাড়ী নিয়ে গেলেন আদর সাদর করে। ফরিদা নিজেও রাগ গোসা ভোলে
বাবার সাথে গিয়েই মেডিক্যাল কলেজে এডমিশন নিলো।
হায়দ্রাবাদ যাওয়ার আগে ফরিদা রাশিদার
সাথে দেখা করে বিদায় নিতে এলো। বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় ফরিদা বললো- চ্যানেলটা
খোলার সময় তোর মোবাইল নম্বর কেন দিয়েছিলাম এখন বুঝতে পারলি তো। আসলে আমার ছোট বেলা
থেকেই ডাক্তারী পড়ার ইচ্ছা। ডাক্তারীতে ছিট পাব বলে আমি খুবই আশাবাদী ছিলাম এবং
মানসিকভাবেও প্রস্তুত ছিলাম। আসলে মানুষ ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই করতে পারে। তবে
ধৈর্য ধরে এগোতে হয়। তোর নামে চ্যানেল খোলার উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, আমি ভবিষ্যতে ডাক্তারীতে ছিট পেলে তুইই
চ্যানেলটা চালাতে হবে। তাই তোর নামে চ্যানেলটা খুলেছিলাম। বাবা মা'র সাপোর্ট ছাড়া গান গেয়েও যে ডাক্তারীতে
ছিট পাওয়া সম্ভব এই কথা আমি প্রমাণ করে দেখালাম। মন দিয়ে লেখা-পড়া করিস। আমি
আশাবাদী তুইও ডাক্তারীতে ছিট পাবি। আর হ্যাঁ, চ্যানেল থেকে আমি যে কয়টি টাকা পাব সেগুলি গরীব-দুঃখীদের মাঝে
বিলিয়ে দিস। আমার পড়ার খরচ আব্বাই বহন করবে।
ফরিদা চলে যাওয়ার পরে রাশিদা এক দিকে
আনন্দিত হলেও অন্য দিকে ফরিদার অনুপস্থিতিতে খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েছিলো এবং
ফরিদার শেষের কথা কয়টি মনে করে সে গান গাওয়া ছেড়ে লেখা-পড়ায় মনোনিবেশ
করেছিলো। গান গাওয়ার এখন অনেক শিল্পী হয়েছে। নতুন নতুন অনেক শিল্পী আসছে তরী
চ্যানেলে গান গাওয়ার জন্য। তার জায়গা এখন পূরণ করেছে রফিদা। মানুষ বলে, বাজাতে বাজাতে বায়েন এবং গাইতে গাইতে
গায়েন। রফিদাও এখন ভুলত্রুটি শোধরে গানের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করেছে। সবাই তার গান
পছন্দ করে। রাশিদার চেয়ে
রফিদাই এখন বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রফিদার কাছে এখন অনেকে তরী চ্যানেলে গান
গাওয়ার জন্য বায়না ধরে। একদিন তার ক্লাসেরই মেয়ে
নূরজাহান এলো চ্যানেলে গান গাবে বলে। নূর জাহানের কণ্ঠ ভালো। রফিদার সাথে একই
স্কুলে, একই ক্লাসে
পড়ে। স্কুলের ফাংশনে গান গেয়ে ভালোই নাম করেছে।
নূরজাহানের বাবার নাম মিয়াচান মোল্লা।
দুই বছর আগে হজ্ব করে এসেছে। হজ্ব করে আসার পরে মিয়াচান মোল্লা অঞ্চলটিতে মিয়াচান
হাজী নামে পরিচিত হয়ে পড়েছে। ষাটোর্দ্ধ লোক। সহজ সরল। কোনো এলে মেলে নেই। খুব
পরহেজগার। তাই রফিদা ভরসা পাচ্ছে না নূরজাহানকে দিয়ে গান গাওয়াতে। বলে রেখেছে, রাশিদা বাড়ী এলে তার সাথে আলোচনা করে
কিছু একটা ব্যবস্থা করবে।
রাশিদা হায়ার সেকেণ্ডারী প্রথম বর্ষের
ছাত্রী। তার বাৎসরিক পরীক্ষা দুইদিন আগে শেষ হয়েছে। তাই আজ সে বিকেলে বাড়ী এসেছে।
আমিনা বেগম পাক ঘরে রান্নাবান্নার কাজে
ব্যস্ত ছিলেন। রাশিদা অনেকদিন পরে বাড়ী আসার জন্য রশিদ মোল্লা বড় একটি কাতলা মাছ
এনেছে। আমিনা বেগম মাছটি কুটছিলেন। রাশিদা মা’র পাশে বসে মাছ কোটা দেখছিলো এবং হোস্টেলের খাবারদাবার, বান্ধবীদের রুচি অভিরুচি নিয়ে গল্প
করছিলো। চৌকায় ভাত বসানো ছিলো। টগবগ করে ভাত ফুটছিলো।
এমন সময় নূরজাহান এলো তার ছোট বোনকে
নিয়ে। রাশিদা বাড়ী আসার পরে নূরজাহানকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে, রফিদাই তাকে ফোনে আসার জন্য বলেছে।
নূরজাহানকে দেখে রাশিদা বললো- নূরজাহান
তুই এত বড় হয়েছিস?
রাশিদার কথায় নূরজাহান লজ্জা পেলো। সে
ঈষৎ লজ্জিত কণ্ঠে বললো- আপার যে কথা! কোথায় বড় হয়েছি? এই বছর ক্লাস টেনে উঠলাম।
বয়স না বাড়লেও গায়ে বেড়ে উঠেছিস।
তাই বললাম আর কি! এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? শুনলাম তুই ভালো গান করিস। স্কুলের ফাংশনে বোলে এই বছর গান অনেক প্ৰশংসা
কুড়িয়েছিস। তোদের ফাংশন দেখার খুব আসার ইচ্ছে ছিলো। পরীক্ষার জন্য আসতে পারিনি।
রফিদা তোর খুব প্রশংসা করেছে।
রফিদা পাশেই ছিলো। সে বললো- নূরজাহান
আমাদের চ্যানেলে গান গাইতে চায়। আমাকে কয়েকদিন ধরে বলতেছে আব্বাকে বলতে। আমি তোর
আসার জন্য অপেক্ষা করতে বলেছি।
আমার জন্য অপেক্ষা করার কী প্রয়োজন।
আব্বাকে বললেই হলো। আব্বা মানা করবে না। তিনি তো নতুন শিল্পীদের উৎসাহের সাথেই
সুযোগ দেন।
আব্বা সুযোগ দিবে জানি। রফিদা বললো-
সমস্যা হবে ওর আব্বাকে নিয়ে। নূরজাহানের আব্বা হাজী মানুষ। গত বছর হজ্ব করে এসেছে।
আমাদের ধর্মে তো গান গাওয়া নিষেধ। যদি গাইতে না দেয়!
আমাদের এই এক সমস্যা। রাশিদা থেমে থেমে
বললো- আমাকেও জ্যাঠা গান গাইতে নিষেধ করেছিলো। তবে আমি গাইতে পেরেছি আব্বা আমার
সাপোর্টে ছিলো বলে। মোল্লা মৌলভীদের ভয়ে অনেকে গান গাইতে সাহস করে না।
অভিভাবকেরাও গান গাইতে দিতে চায় না। সবার মনে এক ভ্রান্ত ধারণা আছে, গান গাওয়া মেয়েরা খারাপ হয়। রং ঢং
করে ঘুরে বেড়ায়। তাই গান গাওয়া মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। অনেকে
বিয়ে করতে চায় না। ছেলেরা চাইলেও ছেলের বাবা মায়েরা বাড়ীর বউ করে নিতে চায় না।
এই ভয়েও অনেক প্রতিভা বিকশিত হতে পারে না।
তাহলে আমি কি গান গাইতে পারব না, আপা? নূরজাহান মর্মাহত কণ্ঠে বললো।
কেমনে পারবি? রাশিদা একটু ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- তোর
আব্বা যদি মানা করে, গাইবি
কীভাবে? সরিষা দিয়ে ভূত
তাড়াবি, সরিষাই যদি ভূত
হয়, ভূত তাড়ানো
সম্ভব হবে?
বেশি না। একটি দু'টি গান গাইব।
একটি দু’টি গাইলেও যে কথা একশটা গাইলেও সেই একই কথা। তোর আব্বা যদি আমাদের
নামে সালিশ বসায় তখন কি করবি? তুই
কি বাধা দিতে পারবি?
তা অবশ্যে পারব না। অতখানি সাহস আমার
হবে না।
তাহলে তোর গান গাওয়াও হবে না। রাশিদা
বললো- যদি সাহস করতে পারিস, তোর
আব্বা সালিশ ডাকলে সেখানে যদি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারিস, গান আমি গেয়েছি, এতে চ্যানেল বা অন্যের কোনো দোষ নেই।
কেউ আমাকে দিয়ে জোর করে বা প্রলোভন দিয়ে গান গাওয়ায় নি, তাহলে সম্ভব হতে পারে।
নূরজাহানের গান গাওয়ার খুবই ইচ্ছা
দিলো। অনেকের গান গেয়ে ভাইরাল হচ্ছে, তারও ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা। তাই সে বললো- দোষ তোমাদের হবে না। গান
গাওয়ার জন্য আব্বা যদি সালিশ ডাকেই তখন আমি সব দোষ নিজের ঘাড়ে নেব।
রাশিদা কথাটা তার আব্বা রশিদ মোল্লাকে
বললো। নূরজাহানের আগ্রহ দেখে হাসমতের সাথে আলোচনা করে নূরজাহানের দু’টি গান রেকর্ড করে চ্যানেলে ছেড়ে
দিলো। কয়েকদিনের মধ্যে গান ভাইরেল হয়ে গেলো। রশিদ মোল্লা দুই হাজার টাকাও দিলেন নূরজাহানকে।
(উন্নিশ)
নুরজাহানের গান ভাইরেল হওয়ার পরে
রফিকূলের কাছে তরী চ্যানেলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এলো। সে জানে, মিয়াচান হাজী পরহেজগার লোক। তিনি
কোনোদিন নূরজাহানের গান গাওয়াটাকে সমর্থন করবেন না। নূরজাহানকে দিয়ে গান
গাওয়ানোর কথা শুনলে রশিদ মোল্লার নামে তিনি সালিশ বসানোটা একবারে নিশ্চিত।
যেচে গিয়ে কথাটা বললে, নূরজাহানের দুর্নাম করার জন্য বলেছে
বলে মিয়াচান হাজী কথাটায় তেমন গুরুত্ব নাও দিতে পারে! তাই রফিকূল সুযোগের
সন্ধানে ছিলো। সেদিন রফিকূল বাজারে যাচ্ছিলো। পথে মিয়াচান হাজীর সাথে দেখা হলো।
সে বললো- আচ্ছালামু আলাইকুম, চাচা।
ভালো আছেন চাচা? আমাকে
চিনতে পারছেন?
মিয়াচান হাজীর বয়স হয়েছে। সত্তরের
কাছাকাছি। লাঠিতে ভর দিয়ে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পরনে আলখাল্লা।
মিয়াচান হাজী কপালে ডান হাত স্থাপন
করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভালো করে লক্ষ্য করে সালামের জবাব দিয়ে বললেন- হ্যাঁ চিনতে
পেরেছি। তুমি পশ্চিম পারার নাজির শেখের ছেলে না? তোমার আব্বার সাথে ছেলেবেলা কত খেলা খেলেছি। তোমার আব্বা ভালো ফুটবল
খেলতেন। আমিও ফুটবল খেলতাম। সেই ছেলেবেলা থেকেই তোমার আব্বার সাথে আমার পরিচয়।
তোমার আব্বা ভালো আছেন?
হ্যাঁ আছেন। তবে খুব একটা চলাফেরা করেন
না। বাড়ীতেই বসে থাকেন।
বয়েস হলে কিছুই থাকে না, বাবা। দেহে শক্তি থাকে না। শক্তি না
থাকলে আমোদ আহ্লাদও থাকে না। তা বাবা, তুমি কি কেসে যেন জেল খেটে এসেছ?
জেল না চাচা। হাজোত খেটে জামিনে এসেছি।
মিথ্যা মামলা। আমি কোনো দোষ করিনি চাচা। আমাকে ফাঁসিয়েছে।
এমন কাজ কে করলো, বাবা?
কে করেছে জানি। তবে প্রমাণের অভাবে
কিছু বলতে পারছি না।
তা বাবা কি মনে করে? কোনো দর্কার আছে আমার সাথে?
নূরজাহানের গানের বিষয়ে কূটনামী করার
জন্য মিয়াচান হাজির সাথে দেখা করলেও রফিকূল প্যাঁচ মেরে বললো- না চাচা, কোনো দর্কার নেই। এখান দিয়ে
যাচ্ছিলাম। আপনাকে দেখে সালাম দিলাম।
বেশ বাবা, ভালো থাকো। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।
সৎ বুদ্ধি প্রদান করুন।
সরাসরি কথাটা বললে হাজী সাহেব কথাটা
অন্য রকম ভাবতে পারে, তাই
সে একটু এগিয়ে গিয়ে ফিরে এসে বললো- আপনাদের নূরজাহান কিন্তু খুব ভালো গান গায়
চাচা। তার গান ইউটিউবে খুব ভাইরেল হয়েছে।
ভাইরাল হয়েছে মানে? ভাইরাল কি জিনিস, বাবা?
ভাইরাল মানে জানাজানি হওয়া। লক্ষ লক্ষ
মানুষ একটি বিষয়ে জ্ঞাত হওয়া। লক্ষ লক্ষ মানুষ নূরজাহানের গান শুনে প্রশংসা করছে।
তবে চাচা, দুই
একজনে বদনামো যে করেনি তা নয়। হাজি সাহেবের মেয়ে হয়ে গান! অনেকে মেনে নিতে
পারছে না। গান-বাজনা করাটা তো আমাদের ধর্মের পরিপন্থী, তাই না চাচা?
তা তো বটেই! ইসলামে গান গাওয়া নিষেধ।
তবুও মেয়ে হয়ে গান গাওয়া? এটা খুব অন্যায় হচ্ছে চাচা। তবুও
আপনার মেয়ে। হাজী সাহেবের মেয়ে। শুনে আমারও খুব খারাপ লাগছে।
শুনে তো আমারও খারাপ লাগছে। মিয়াচান
হাজী আহত কণ্ঠে বললেন- ঠিক আছে। আমি বাড়ী গিয়ে আগে শুনি, কি কথা, কি বার্তা।
নূরজাহানের কাছে শুনতে হবে না চাচা।
কোথায় গান গেয়েছে, কে
গাইয়েছে আমি সব জানি।
কে গাইয়েছে?
রশিদ মাস্টার গান গাওয়ার জন্য একটা
চ্যানেল খুলেছে। সেখানে গান গেয়েছে। রশিদ মাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলেই সব জানতে পারবেন।
চাচা, আমার সাথে
স্যারের সম্পর্ক খুব একটা ভালো না। তাই কথাটা আমি যে আপনাকে বললাম, এই কথা বলবেন না যেন।
মিয়াচান হাজি ভাবলেন সরাসরি রশিদ
মোল্লার কাছে যাওয়ার থেকে আমীন সাহেবের কাছে গেলেই ভালো হবে। আমীন সাহেবের ছোট
ভাই রশিদ মোল্লা। আমীন সাহেব নিজেও পরহেজগার মানুষ। তিনি নিশ্চয় সূক্ষ্ম বিচার
করবেন।
মিয়াচান হাজি সরাসরি আমীন সাহেবের
নিকটে এসে কথাটা খুলে বললেন- আমি এর সূক্ষ্ম বিচার চাই মৌলভী সাহেব। আজ আমার
মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছে, কাল
অন্যের মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়াবে। তখন শরিয়ত কোথায় থাকবে? এই অধর্ম বন্ধ করতে হবে, মৌলভী সাহেব।
আমীন সাহেব সব শুনে বলেলন- রশিদের
বিরুদ্ধে গান গাওয়া নিয়ে আগেও অভিযোগ এসেছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি এখনই এর বিহিত
ব্যবস্থা করবো। আপনি একটু বসুন। আমি ফোন দিয়ে রশিদকে ডেকে আনতেছি।
আমীন সাহেব ফোন দিয়ে রশিদ মোল্লাকে
ডেকে আনলেন। আমীন সাহেবের কাছে মিয়াচান হাজিকে বসে থাকতে দেখে তিনি ডেকে আনার
কারণ অনুমানও করতে পারলেন।
রশিদ মোল্লা সালাম জানিয়ে বললেন-
আমাকে ডেকেছেন কেন, বড়
ভাই?
আমীন সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রশিদ
মোল্লার দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না? এগুলো কি শুনছি? নিজের মেয়ে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছ।
নিষেধ করেছিলাম মাননি। আমি তারপর কিছু বলিনি। এখন পরের মেয়ে দিয়েও গান গাওয়াচ্ছ, এটা কি রকম কথা হলো? নিজে দোজখে যাবে, যাও, অন্যকে টানতেছ কেন?
রশিদ মোল্লা কথাটা বুঝেও না বুঝার ভান
করে বললেন- কাকে দিয়ে গান গাওয়ালাম, বড় ভাই? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
বুঝতে পেরেছ ঠিকই, তবে না বুঝার ভান করতেছ। আমীন সাহেব
রুক্ষ স্বরে বললেন- তুমি হাজী সাহেবের মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়াও নি?
রশিদ মোল্লা এইবার লুকডাক না করে
বললেন- আমি গাওয়াতে যাব কেন? নূরজাহান
নিজে যেচে এসে গেয়েছে। তাতে আমার কি দোষ হতে পারে? সে না গাইলে তো আর আমি জোর করে গাওয়াতে পারতাম না। সে গেয়েছে বলেই
গাওয়াতে পেরেছি। শুধু সে-ই না,
অনেকেই গান গায় আমাদের চ্যানেলে।
ও তো এখনও শিশু। ওর কি ভালোমন্দ বুঝার
বয়েস হয়েছে? ধর্মকর্মের
বিষয়ে সে কি জানে? আপনারা
জ্ঞানী মানুষ। শিক্ষক। ছাত্র বুঝিয়ে খান। সমাজে আপনাদের সন্মান আছে। আপনারা
ইসলামের পরিপন্থী কাজ করলে, সেই
সন্মান থাকবে কি?
ইসলামের পরিপন্থী কি কাজ করলাম?
গান গাওয়াটা কি ইসলামের পরিপন্থী কাজ
নয়? আমীন সাহেব
ক্ষোভের সাথে বললেন- তুমি আমার ভাই হয়ে এসব কাজ করতেছ, সমাজে মুখ দেখাব কী করে?
তাহলে কি বলতে চান ইসলামে সঙ্গীত
নিষিদ্ধ?
নিষিদ্ধ তো বটেই! আমীন সাহেব বললেন-
হাদিশে আছে, কোরানে
আছে সঙ্গীত নিষিদ্ধ। তুমি কি বলতে চাও ইসলামে সঙ্গীত নিষিদ্ধ নয়?
না, তা বলতে চাই না। রশিদ মোল্লা বললেন- ইসলামে সঙ্গীত নিষিদ্ধ আমিও
জানি। তবে সব সঙ্গীত নয়।শেখ আল আজহার মহম্মদ সালটুট, শেখ ইউসূফ কারাডাবি এবং ইরানের
রুহুল্লাহ আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্রভৃতি সমসাময়িক ইসলামিক পণ্ডিতরাঁ বলেছেন, যেসব সঙ্গীত ইসলামের আদর্শের কোনো
ক্ষতি করে না তেমন সঙ্গীত অবৈধ নয়,
তবে যেসব সঙ্গীত ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী সেগুলোকে বর্জন করার
আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা ইসলামের পরিপন্থী কোনো গান রেকর্ড করি না। আপনারা আমাদের
চ্যানেল খুলে দেখতে পারেন।
আমরা অত সব বুঝি না। আমরা হাদিস
মোতাবেক কাজ করব। কোন ইসলামিক পণ্ডিত কি বলেছে, সেটা আমরা শুনতে চাই না। হাদিশে কি বলেছে সেটা আমরা মেনে চলবো।
মিয়াচান হাজী বললেন।
যে কাজ ইসলামের পরিপন্থী নয় এবং টাকা
রোজগার হয় তেমন কাজ করাটা কি অপরাধ?
টাকা তো হাতের ময়লা। টাকা উপার্জনের
জন্য ইসলামের নিষিদ্ধ কাজ করবো না কি? কক্ষনও না। মরে গেলেও না।
মিয়াচান হাজি বললেন- যা করবার করেছেন।
আর যেন এসব কাজ না করেন। নূরজাহান গান গাইতে এলে তাড়িয়ে দিবেন।
ঠিক আছে। রশিদ মোল্লা বললেন- আপনার যদি
আপত্তি তাহলে গাইতে চাইলেও গাইতে দিব না।
কথাটা এভাবেই রফা হলো।
রশিদ মোল্লা চলে গেলেন।
রশিদ মোল্লা চলে যাওয়ার পর আমীন সাহেব
মিয়াচান হাজীর একটু কাছে এসে নিবিড় হয়ে বসে বললেন- এদের কথায় বিশ্বাস করবেন
না। আজ বলে গেলো, কাল
এসব কথা মনে নাও থাকতে পারে! কারণ গান গাইলেই টাকা রোজগার হয়। ওরা টাকাটাকেই চিনে, পরকালের চিন্তা ওদের নেই। এক কাজ করুন, পারলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিন।
তাই করতে হবে। মেয়ের জন্য পরকাল নষ্ট
করতে পারব না। মিয়াচান হাজী এভাবে বলে চিন্তাক্লিষ্টভাবে চলে গেলেন।
দুদিন পর একটি ঘটনা ঘটলো।
আমীন সাহেবের বড় মেয়ে হালিমার বিয়ে
হয়েছে দুবছর পূর্বে। একটি পুত্র সন্তানো হয়েছে তার। বিয়ের সময় জামাইকে বাইক দেওয়ার
কথা ছিলো। তবে আমীন সাহেব টাকার অভাবে দিতে পারেন নি। বিয়ের পর থেকেই জামাই
বাইকের জন্য তাগিদা দিয়ে আসছে। কাল চরম সতর্কবাণী শুনিয়ে হামিদাকে আমীন সাহেবের
বাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছে। বাইক না দিলে জামাই হামিদাকে তালাক দিবে বলে পাঠিয়েছে। এখন বাড়ীতে
কান্নাকাটি লেগেছে। আমীন সাহেব টাকার জন্য হন্যে হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে
ঘুরতেছে।
কাল বিকেলে আমিনা বেগম আমীন সাহেবের
বাড়ী গিয়েছিলেন। সেখানেই কথাটা শুনে এসেছে। বাইক না দেওয়ার জন্য জামাই হালিমাকে
বোলে মারধরো করে।
আমিনা বেগম রাতে কথাটা রশিদ মোল্লাকে বললেন।
তখন অনেক রাত হয়েছিলো। তাই রশিদ
মোল্লা রাতে না এসে সকালে আমীন সাহেবের বাড়ী এলেন। দেখলেন আমীন সাহেব মাথায় হাত
দিয়ে বারান্দায় বসে রয়েছেন।
রশিদ মোল্লা বললেন- বড় ভাই কি হয়েছে?
আমীন সাহেব দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললেন-
জামাইকে বাইক দেওন লাগে। বাইকো যেই সেই নয়, ‘বুলেট’। বাইক না দিলে
জামাই হামিদাকে তালাক দিবে বলে চরম সতর্ক বাণী
শুনিয়ে পাঠিয়েছে।
কি করবেন? বাইক দিবেন?
দিতে তো হবেই, তবে টাকা যোগার করতে পারছি না। যার
কাছে যাই, সেই
বলে টাকা নাই। এখন কি করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। নদীর পারে বাড়ী। ভিটে জমি বিক্রী করলেও অত টাকা যোগার করা সম্ভব হবে
না। এখন গলায় দড়ি দিয়ে মরার বাহিরে উপায় নাই।
মরবে আপনার শত্রু। আপনি চিন্তা করবেন
না। বাইকের জন্য যত টাকা লাগে আমি দিব। রশিদ মোল্লা দৃঢ়কণ্ঠে বললেন।
তুমি অত টাকা কোথায় পাবে? আমীন সাহেব সন্দিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন
করলেন।
আমীন সাহেব যে রকম শরিয়ত মেনে চলা
লোক! গান গাওয়া টাকার কথা বললে তিনি না-ও নিতে পারেন। তাই তিনি বললেন-রাশিদা
কয়েকদিন আগে স্কলারশিপের টাকা পেয়েছে। সেই টাকাগুলো আমার একাউন্টে জমা আছে। সেই
টাকা দিয়ে বাইক কিনে দিব।
তুমি আমায় বাঁচালে ভাই। তোমার এই
উপকার আমি জীবনেও ভুলব না।
সেই দিনই রশিদ মোল্লা জামাইকে খবর
দিয়ে এনে বাইক কিনে দিলেন। বাইক পেয়ে জামাই খুশী হয়ে পরের দিন সকালে হালিমাকে
নিয়ে বাড়ী চলে গেলো।
জামাই বাইক নিয়ে চলে যাওয়ার পর আমীন
সাহেব ভাবলেন, টাকাকে
আমরা হাতের ময়লা বলি, সত্যিই
কি টাকা হাতের ময়লা? টাকা
ছাড়া তো সংসার অচল। তাহলে টাকা হাতের ময়লা হতে যাবে কেন? যার টাকা নেই তার সংসারে মান-মর্যদা
কিছুই নেই। বিপদের সময় টাকাই তো বিপদ থেকে উদ্ধার করে! যেমন তাঁকে উদ্ধার করলো।
তবে টাকা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উপার্জন করতে নেই। অতিরিক্ত টাকা মানুষকে অহংকারী
করে তোলে।
(বিশ)
রাশিদা সেদিন হোস্টেলে ছিলো। হঠাৎ করে
সন্ধ্যেবেলা নূরজাহান হোস্টেলে উপস্থিত। নূরজাহানের চোখেমুখে উদ্বিগ্নতার ভাব বিরাজমান।
চেহেরা বিধ্বস্ত। চোখেমুখে কালি পড়েছে। ঠিকমত হাঁটতে পারছিল না। শুষ্ক মুখ। মনে
হলো, কয়েকদিনের
উপোসি। নূরজাহান এসেই বিছানায় এলিয়ে পড়ল। নূরজাহানের অবস্থা দেখে রাশিদা
বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো-নূরজাহান তুই? এই অসময়ে? কোত্থেকে
এলি?
প্রশ্ন কয়টি করে রাশিদা উদ্বিগ্ন চোখে
নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইলো।
বাড়ী থেকে এসেছি। নূরজাহান চমু উত্তর
দিয়ে বললো- আমাকে কিছু খেতে দাও। নইলে আমি মরে যাব। আমি দুই দিন যাবত কিছুই
খাইনি।
দুইদিন যাবত খাসনি মানে?
সেকথা পরে বলবো। তোমার কাছে কিছু থাকলে
খেতে দাও। না থাকলে বাজার থেকে নিয়ে এস। বিস্কুট, পাঁউরুটি কিছু একটা হলেই হবে।
রাশিদা কিছু বলল না। তার কাছে
বিস্কুটের প্যাকেট ছিলো। সে বিস্কুটের প্যাকেট বের করে টেবিলের উপরে রেখে বললো-
আগে জল খেয়ে নে। ধীরে সুস্থিরে খা। তাড়াহুড়ো করিস না। গলায় আটকে যাবে।
নূরজাহান গোগ্রাসে বিস্কুট গিলতে
লাগলো। মাঝেমধ্যে রাশিদা জল খাওয়ার জন্য তাগিদা দিতে লাগলো।
বিস্কুট খাওয়া শেষ করে নূরজাহান ঢক ঢক
করে জল পান করে বিছানায় নেতিয়ে পড়লো।
রাশিদার মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো কি হতে
পারে নূরজাহানের? রাশিদা
শুনেছে, গান গাওয়ার
জন্য নূরজাহানের আব্বা নূরজাহানকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র খুঁজতেছে। তাই বিয়েরই কোনো
ব্যাপারই হবে হয়তো বা। কিন্তু নূরজাহানের তো বিয়ের বয়েস হয়নি।
সবে ক্লাস টেনে পড়ে। পূর্বে আঠার উন্নিশ বছরের আগে কেউ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিত না।
লোকের কথা কি বলবে! রাশিদার বাবাই বোলে একৈশ বছর বয়সে ম্যাট্রিক দিয়েছিলো।
নাইনের বছর দাড়ি গোঁফ গজেছিলো। কারণ আগে আট নয় বছরের আগে কেউ স্কুলেই যেত না।
এখন দিনকাল বদলেছে। তিন চার বছর হলেই শিশুরা স্কুলে যেতে শুরু করে। চৌদ্দ বছরেই
অনেকে ক্লাস টেনে উঠে। সেই হিসাবে হিসেব করলে নূরজাহানের বয়স বড়জোর
ষোল্লা বছর হবে।
এই বাল্য বিবাহই মুসলিম সমাজটাকে ধ্বংস
করছে। তের চৌদ্দ বছর বয়স হলেই বিয়ে দিবে। ফলে বই খাতা কাঁড়ে উঠে। সতের আঠারো
বছর বয়সে দুই তিনটি সন্তানের মা হয়। স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। সন্তানগুলোও হয় মাইজ
মরা। আরে বাবা, চামচিকার
পেটে কি হাতীর বাচ্চা হবে! যেমন মা,
তেমন সন্তান। এই নিয়ম না বদলালে মুসলিম সমাজ এক সময় ধ্বংস হয়ে
যাবে। অন্য সম্প্রদায়ের গোলাম হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
নূরজাহান হঠাৎ করে বিছানায় উঠে বসে
বললো- আমায় বাঁচাও রশিদা আপা। না হলে আমি মরে যাব। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে।
আরে বাবা, কি হয়েছে বলবি তো! রাশিদা নূরজাহানের
গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বললো- এরকম অস্থির হচ্ছিস কেন? আমি আছি তো! তোর কিচ্ছু হবে না। হতে
দিব না। কি হয়েছে বল?
গাওয়াটাই কাল হয়েছে। নূরজাহান বলে
গেলো- তোমাদের চ্যানেলে গান গাওয়ার শুনে আব আমার বিয়ের জন্য পাগল হয়ে উঠেছে।
আমার জন্য পাত্র দেখতেছে। রফিকুল পাত্রের সন্ধান এনেছে। তিন দিন আগে কয়েকজন লোক
আমাকে দেখতে এসেছিলো। তাঁদের সন্মুখে যাব না বলে আমি সবার চোখ এড়িয়ে খালাদের
বাড়ী পালিয়ে গিয়েছিলাম। যারা আমাকে দেখতে এসেছিলো, তাঁরা বলে গিয়েছে, পাত্রী দেখতে হবে না। পাত্রী আমরা আগেই
দেখেছি। পাত্রী আমাদের পছন্দ। পাত্রী খুঁজে আনুন কোথায় গেছে। কোথায় আর যাবে!
আশেপাশেই কোথাও গেছে হয়তো বা। পাত্রীকে বাড়ী আনার পর আমাদের ফোন দিয়ে জানাবেন। আমরা
ফোনেই বিয়ের দিন বার ধার্য করবো।
তারপর? রাশিদা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো।
নূরজাহান বললো- তারপর আমাকে খালাদের
বাড়ী থেকে ধরে এনে একটি রুমের মাঝে আবদ্ধ করে রেখেছিলো। আমি রুমের ভেতর থেকেই
আলোচনা শুনেছি, মঙ্গল
বারে বিয়ে। বরযাত্রীরা পাত্র নিয়ে আসবে, তারপর বিয়ে পড়িয়ে আমাকে নিয়ে চলে যাবে। দুই দিন, দুই রাত আমি রুমের মধ্যে আবদ্ধ ছিলাম।
না খেয়ে আছিস যে! তোকে খেতে দেয় নি?
খেতে দিয়েছে, কিন্তু আমি খাইনি। এত টেনশনের মধ্যে কি
গলা দিয়ে ভাত নামে আপা!
না খেয়ে শরীরের বারটা বাজিয়েছিস।
এখানে এলি কীভাবে?
আমাদের ঘরটা পাকা, তা তো তুমি জানই আপা। নূরজাহান বললো-
আমার রুমে একটি লোহা কাটা করাত ছিলো। সেই করাত দিয়ে খিড়কির একটি শিক কেটে সেখান
দিয়ে বের হয়ে বাড়ীর পেছন দিয়ে পালিয়ে এসেছি।
এখন কি করবি? আজ না হলেও কাল তোকে ওরা খুঁজে বের
করবেই।
খুঁজে বের করলেও আমি যাব না।
তোর বয়স কত?
পনের পার হয়ে ষোল্লতে পড়েছে।
তাহলে চিন্তা নেই। জোর করে বিয়ে দিতে
চাইলে ওরা ফেঁসে যাবে।
আমি বিয়ে বসবো না। আমি পড়তে চাই আপা।
আমি ডাক্তর হতে চাই। ছোট বেলা থেকেই আমার স্বপ্ন, আমি ডাক্তার হবো।
চিন্তা নেই। হতে পারবি। সে ব্যবস্থা
আমি করবো। তোর আগেও ফরিদা আপা বাড়ী থেকে পালিয়ে এসে ডাক্তারীতে ছিট পেয়েছে।
ভালো করে লেখাপড়া কর। তুইও ডাক্তার হতে পারবি।
কিন্তু আব্বা এসে যদি আমাকে ধরে নিয়ে
যায়?
তুই না গেলে নিতে পারবে না। দেশে আইন
আছো তো!
রাশিদা রাতেই রশিদ মোল্লাকে ফোন দিয়ে
সমস্যার কথা অবগত করলো। রশিদ মোল্লা বললেন- হ্যাঁ, কথাটা আমি জানি। গ্রামে সোরগোল পড়ে গেছে। আমাদের বাড়ীতে থাকতে পারে
বলে ওরা আমাদের বাড়ীও এসেছিলো। না পেয়ে চলে গেছে। তোর ওখানে যেতে পারে বলে
সন্দেহ করে ওরা হোস্টেলেও যেতে পারে। রফিকুল আছে মিয়াচান হাজীর পেছনে। রফিকুলই
মিয়াচান হাজীকে বিয়ের জন্য প্ররোচিত করেছে। পাত্রের সন্ধানো এনেছে রফিকূল।
সন্ধান নিয়ে জানতে পারলাম, পাত্রের
চরিত্র ভালো নয়। রফিকূলেরই সাথী। রফিকূলের মতোই মদ, গাঁজায় অভ্যস্ত। ড্রাগস্ ব্যবসার সাথে জড়িত। রফিকূল এবং সে একসাথেই
হাজোত খেটেছে।
তাহলে মিয়াচান মুন্সীকে পাত্রের
চরিত্র সম্পর্কে বললেই তো লেঠা চুকে যায়।
চুকবে না। রশিদ মোল্লা বললেন- রফিকুল
মিয়াচান হাজীকে এমন মন্ত্র পড়িয়েছে যে, মিয়াচান হাজী কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়। তাঁর কথা যৌবনকালে অনেকেরই
অনেক দোষ থাকে, বিয়ের
পরে সব শুধরে যায়। মেয়ের কপাল বান্দীর কপাল। আল্লাহ যার কপালে যেমন জোড়া লিখে
দিয়েছে, তেমনই হবে। এই
ক্ষেত্রে মানুষের করার কিছু নেই। গান গেয়ে বেহায়াপনা করে বেড়ানোর চেয়ে অন্তত
ভালো হবে। এভাবে বিশদ বর্ণনা দিয়ে রশিদ মোল্লা বললেন- ফোনে আর কত কথা বলবো। তোরা
এক কাজ কর। আমি সাইল্ড কেয়ারের নম্বর দিচ্ছি তোরা তাঁদের সাথে ফোনে যোগাযোগ কর।
রাতেই যোগাযোগ করবি।
রাতেই রাশিদা সাইল্ড কেয়ারের কর্মকর্তাদের
সাথে কথা বললো। তাঁরা সকাল নয়টায় তাঁদের অফিসে গিয়ে দেখা করতে বললেন।
শুধু শুধু দুজন নাবালক মেয়ে অফিসে
যাওয়টা ঠিক হবে না ভেবে রশিদা মিজানুর রহমান সাহেবকে ফোন দিয়ে এনে নূরজাহানকে নিয়ে
নটার আগেই সাইল্ড কেয়ার অফিসে পৌঁছোলো।
সঞ্চালক মহাশয় অফিসে বসে ছিলো। তাঁরা
সঞ্চালক মহাশয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনা ভেঙে বললো। সঞ্চালক মহাশয় তাঁদের কাছ
থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে মিয়াচান হাজীকে ফোন দিলেন।
এদিকে রাশিদা ফোন দিলো রশিদ মোল্লাকে।
দুই তিন ঘণ্টা পর মিয়াচন হাজী সাইল্ড
কেয়ার অফিসে পৌঁছোলেন। মিয়াচান হাজী অফিসে পৌঁছোনোর একটু পরেই রশিদ মোল্লা হাসমত
আলীকে নিয়ে অফিসে পৌঁছোলেন।
সঞ্চালক মহাশয় মিয়াচন হাজীকে বললেন-
দেখুন আপনার মেয়ে নাবালক। আঠারো বছরের আগে একে আপনি বিয়ে দিতে পারবেন না। বিয়ে
দিলে আপনি আইনত দণ্ডনীয় হবেন। শুধু আপনিই না, আপনার সাথে যারা সহযোগিতা করবে তাঁরাও একই অপরাধে অপরাধী হবে। আমি
আপনাদের পুলিশ ডেকে এরেষ্ট করাতে পারি। আপনি বয়োবৃদ্ধ মানুষ। তাই আমি এত বড়
পদক্ষেপ নিতে চাই না। মেয়ে পড়তে চায়। মেয়েকে পড়ান। শুনলাম, মেয়ে ছাত্রী হিসাবেও ভালো।
পুলিশের কথা শুনে মিয়াচান হাজীর ‘লক ডাউনে’র সময়ের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো।
সারা দেশে তখন লক ডাউন চলছে। জনজীবন বিধ্বস্ত। সবাই গৃহবন্দি। দোকানপাট বন্ধ।
গাড়ী মটর, রেল, বিমান সেবা বন্ধ। কালকারখানা বন্ধ।
সবাই কর্মহীন। রাস্তাঘাটে জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নাই। মন্দিরে আরতি বন্ধ। মসজিদে
আজান, নামাজ বন্ধ।
রাস্তায় বেরোলেই পুলিশের লাঠিচার্জ। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ।
এর মধ্যে একদিন স্থানীয় মসজিদের ইমাম
বললেন- এভাবে আর কতদিন মসজিদে নামাজ বন্ধ রাখব? এভাবে নামাজ বন্ধ রাখলে আল্লাহ নারাজ হবে। চলুন, আজ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ি। আমরা তো
আর চুরি ডাকাতি করতে যাব না। নামাজ পড়তে যাব। পুলিশ কিচ্ছু বলবে না।
ইমাম সাহেবের কথা শুনে কয়েকজন মুসল্লি
মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেন। সেই দলে মিয়াচান হাজীও ছিলেন। কোথা থেকে খবর পেয়ে
পুলিশ এসে সবাইকে গরু পিটন দিয়েছিলো। মিয়াচান হাজী প্রায় পনের দিন বিছানায়
পড়ে ছিলেন। ইমাম সাহেবকেই বেশি মেরেছিলো। তাঁকে হাস্পাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলো।
সেদিন থেকে মিয়াচান হাজী পুলিশকে যমের মতন ভয় করে।
তাই পুলিশের কথা শুনে মিয়াচান হাজী
পেছন দিকে ফিরে তাকালো। তাঁর পেছনে রফিকুলহ পাত্রপক্ষের কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে
ছিলো। মিয়াচান হাজী পেছেন দিকে চেয়ে দেখেন পেছনে কেউ নেই। অর্থাৎ পুলিশের কথা
শুনে রফিকূলসহ পাত্রপক্ষের লোক একে একে সরে পড়েছে। একমাত্র তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে
রয়েছে রশিদ মোল্লা এবং হাসমত আলী। রশিদ মোল্লাকে দেখে মিয়াচান হাজীর মুখ ভাদ্র
মাসের বর্ষণমূখর আকাশের মতো কালো পড়ে গেলো।
তাই মিয়াচান হাজী নিজের সন্মান বাঁচানোর
জন্য বিতর্কে না গিয়ে সন্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন- হবে স্যার, মেয়েকে আমি পড়তে দিব। আঠারো বছর না
হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দিব না।
আঠারো বছর বয়স হলেও আপনি বিয়ে দিতে
পারবেন না। সঞ্চালক মহাশয়
আইনের কথা বুঝিয়ে বললেন- আঠারো বছর হলে মেয়ে সাবালক হবে। তখন আপনি
মেয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারবেন না।
করবো না স্যার।
এখানে বলছেন। বাড়ী গিয়ে বোল পাল্টালে
আমি নিজে পুলিশ নিয়ে গিয়ে আপনাকে ধরে আনবো। মনে থাকে যেন। আইন কিন্তু হাজী বৃদ্ধ
মানে না । সঞ্চালক মহাশয় এভাবে মিয়াচান হাজীকে সতর্ক করে দিয়ে নূরজাহানকে
উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও মা। তোমার বাবা তোমাকে পড়াবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে
ফোন দিও।
স্যার, আমি গান ভালোবাসি। নূরজাহান বললো- আমি গান গাইতে চাই। কিন্তু আব্বা
আমাকে গান গাইতে দিতে চায় না। আমি কি গান গাইতে পারবো স্যার?
নিশ্চয় পারবে। গান গাওয়া তো অপরাধ
নয়। সঞ্চালক মহাশয় বললেন- গান সবাই ভালোবাসে। অবসর সময়ে সবাই গান শুনে মনটাকে
হালকা করে। তুমি গান গাবে। কেউ বাধা দিলে আমাকে বলো।
মিয়াচান হাজী সঞ্চালক মহাশয়ের
কথাগুলো শুনলেন যদিও শরিয়তের দোহাই দিয়ে না করতে পারলেন না।
রশিদ মোল্লা আসলে সহজ সরল লোক। কূটনীতি
পছন্দ করেন না। যা বলেন সরাসরিই বলেন। কিন্তু এখানে তিনি কূটনীতির আশ্রয় নিতে
বাধ্য হলেন। কারণ তিনি জানেন, মিয়াচান
হাজী সঞ্চালকের ভয়ে নূরজাহানের গান গাওয়া সমর্থন করলেও বাড়ী গিয়ে বোল পাল্টাতে
পারেন। তাই তিনি কথাটা অধিক স্পষ্ট করার জন্য কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে বললেন- গান
গাওয়া নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিলো, স্যার। হাজী সাহেব যদি গান গাইতে নিষেধ করেন, না গাওয়াটাই ভালো হবে না কি স্যার?
মিয়াচান হাজী তখন অফিস থেকে বেরোনোর
জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। তাই তিনি অফিস থেকে তারাতারি বেরোনোর জন্য ছটফট করছিলেন।
কথায় কথা বাড়তে পারে ভেবে মিয়াচন হাজী বললেন- গাইলে গাইবে। আমি আপত্তি করব না।
নূরজাহান ভালো গান গায়, স্যার। রশিদ মোল্লা বললেন- ওর গানে
অনেক ভিইও হয়। ওকে গান গাইতে দিলে আমিই ওর পড়ার খরচ বহন করবো। হাজী সাহেবকে এক
টাকাও দিতে হবে না। আমি কথা দিলাম।
এ তো অনেক ভালো কথা হবে। সঞ্চালক
মহাশয় বললেন- মেয়ে যদি গান গেয়ে নিজের পড়ার খরছ নিজে চালাতে পারে এর থেকে আর
কি ভালো কথা হতে পারে? হাজী
সাহেব, আপনার মেয়ে
জিনিয়াস। এ যতদিন গান গাইতে চায়,
গাইতে দিবেন। বারণ করবেন না। আর গান গাওয়াটা তো মন্দ কাজ নয়।
পড়াশুনা ক্ষতি না করে যদি গান গাইতে পারে ক্ষতি কি? আজকাল গান গেয়েও তো অনেকে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা উপার্জন
করছে। উপার্জনের ক্ষেত্রে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারকেও অনেকে পেছনে ফেলছে। মহম্মদ রফীর
নাম শুনেন নি? তিনি
মুসলমান হয়ে গান গাইতে পারলে আপনার মেয়ে পারবে না কেন?
মিয়াচান হাজী কিছু বললেন না। মাথা
নিচু করে, পরেছি
বিধির ফেরে মন্দ হলেও আটকাবো কি করে?’ এই মনোভাব নিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রশিদ মোল্লা বললেন- চলুন হাজী সাহেব।
বাড়ী যাই। অনেকে আপনার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে।
শেষে উপায়ান্তর হয়ে মিয়াচান হাজী নূরজাহানকে
নিয়ে বাড়ী চলে এলেন।
উপসংসার
এর পরের ঘটনা গতানুগতিক। নূরজাহান
ফার্স্ট ডিভিসনে ম্যাট্রিক পাশ করলো। সে একটি প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হলো। লেখাপড়ার
পাশাপাশি সে গান গাওয়াও চালিয়ে যেতে লাগলো। মিয়াচন হাজী গান মনে মেনে না নিলেও
মুখ ফুটিয়ে কিছু বললেন না। যার যেমন কপাল। তার তেমন হবে! আমার কি? আমি ভালো চিন্তা করলে কি হবে? দোজখে গেলে ও যাবে। আমি তো আর যাব না? আমার যা কর্তব্য আমি করেছি। না মানলে আমি কি
করবো ! আমি বাঁচবোই বা আর কয়দিন! এভাবে ভেবে তিনি মনকে সান্ত্বনা দিলেন।
রফিদাও ফার্স্ট ডিভিসনে ম্যাট্রিক পাস
করে নূরজাহানের সাথে একই কলেজে ভর্তি হলো।
রাশিদা হায়ার সেকেণ্ডারী ফার্স্ট
ডিভিসনে পাস করে দুই বার নীট পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে বিফল হলো। পরে সে বিএসসি
পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গান গাওয়া চালিয়ে গেলো। গান গেয়ে সে ভালোই সুনাম অর্জন
করলো।
রশিদ মোল্লা আগের মতোই গ্রামে গ্রামে
ঘুরে নতুন নতুন শিল্পী সন্ধান করে গান গাওয়াতে লাগলেন। তরী চ্যানেল সঙ্গীতের ক্ষেত্রে
নতুন জোয়ার আনলো এবং সুরের পসরা সাজিয়ে সেই জোয়ারে ভেসে বেড়াতে লাগলো। তরী
চ্যানেলে গান গেয়ে অনেকে প্রতিষ্ঠিতও হলো।
এদিকে গানের পাশাপাশি রশিদ মোল্লা
শিক্ষকতাও চালিয়ে যেতে লাগলেন। একদিন তাঁরই সহকর্মী শিক্ষক একজন তাঁকে জিজ্ঞাসা
করলেন- চ্যানেল থেকে তো আপনি ভালোই রোজগার করছেন। তবে কেন বিনে পয়সার চাকরি করছেন?
রশিদ মোল্লা গম্ভীরভাবে বললেন- চ্যানেল
চালাই, আর যাই করি না
কেন, আমি তো মূলত
শিক্ষক। শিকড় ছাড়া কী কেউ বাঁচতে পারে?
সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন