ফিরে দেখা(আত্মকথন)
ফিরে দেখা(আত্মকথন)
বালিকুরি পাথার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক
বৎসর
আমাদের সময়ে কলেজের প্রথম ধাপটা ছিল প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় শ্ৰেণী। এক বৎসরের কোর্স। ম্যাট্রিক পাস করার পর বরপেটার মাধব চৌধুরি মহাবিদ্যালয়ে প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণীতে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়েছিলাম। ভর্তির ছ'মাস পরেই টেষ্ট
পরীক্ষা দিলাম। টেষ্ট পরীক্ষায় ৫৫
শতাংশ নম্বর পেয়েছিলাম। টেষ্ট পরীক্ষার পর ফাইনেল পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। তবে আমার পরীক্ষা তেমন ভালো হল না। পাস করব জানতাম, তবে প্রথম বিভাগ যে পাব না এটা নিশ্চিত হয়েছিলাম। এদিকে ম্যাট্ৰিক পরীক্ষায় প্ৰথম বিভাগ অৰ্জনে ব্যৰ্থ হযে আমার
ওপড় প্ৰথম বিভাগের ভূত চেপে বসেছিলো।পাস যদি করতেই হয় প্রথম বিভাগেই করব, দ্বিতীয়
বিভাগে নয়। তাই পরের বছর আবার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে, দুটো বিষয়ে
প্রেক্টিক্যাল দেওয়ার পর বাকী সাবজেক্টের প্রেক্টিক্যাল না দিয়ে বইপত্ৰ নিয়ে বাড়ী চলে এলাম।যথা সময়ে
পরীক্ষার রিজাল্ট বের হলো। সাথে সাথে ঘোষণা করা হলো, প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয়
শ্রেণী সেই বারই শেষ। এর পর থেকে দু’বছরের কোর্স হবে। সাথে এটাও ঘোষণা করা হলো যে, যারা উত্তীৰ্ণ হতে পারেনি, তাদের আবার একবারের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া
হবে। আমার ওপড় মনে হয় সরস্বতী প্রসন্ন
ছিলেন না। পারিবারিক অসুবিধার জন্য আমি সেই
পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারলাম না।পরে দুই বছরের কোর্স পড়ারই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি বাড়ীতেই বসে ছিলাম। এমন সময় আমাদের স্থানীয় বিধায়ক জালালুদ্দিন সাহেবের তৎপরতায় আমার চাকরি হয়ে যায়।চাকরিটা হয়েছিলো, ‘উঠ ছেরি তোর বিয়ে’ এমনই ভাবে হঠাৎ।
আমাদের গ্রামের একেবারে লাগোয়া
গ্রাম বাঘবর পাথার। সেই বাঘবর পথারের জালালুদ্দিন
সাহেব তখন বাঘবর বিধানসভা সমষ্টির বিধায়ক। আমাদের খুবই চেনাজানা লোক। বলতে গেলে
একই সমাজের। জালালুদ্দিন সাহেবের বাবা ছবিল উদ্দিন ডাক্তারের সাথে আমাদের বাবার সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে
জালালুদ্দিন সাহেবের সাথেও বাবার সম্পর্ক ভালো ছিল। জালালুদ্দিন সাহেব একদিন
বাবাকে খবর পাঠালেন, তাঁর সাথে দেখা করার জন্য।
বাবা জালালুদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা
করতে গেলেন। তখন তিনি বাবাকে বললেন- শুনেছি, আবুল তো এমনিতে বাড়িতেই
বসে রয়েছে!এক কাজ করেন, পাঁচশ টাকা যোগার করেন, ওর চাকরি করে
দিই।
পাঁচশ টাকা তখন অনেক। পাঁচশ টাকা হলে
আমাদের অঞ্চলে তখন পাঁচ বিঘা জমি
কেনা যেত। তাই বাবা বললেন- অত টাকা তো এখন আমি দিতে পারব না। আমার হাতে এখন অত টাকা নেই।
জালালুদ্দিন সাহেব বললেন- বাড়ি যান। চেষ্টা করে দেখেন। অন্যলোক আমাকে হাজার টাকা
দিতেও এক পায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আপনারা আমার নিজের লোক। তাই কম করে
বলেছি। বাড়ি যান, যা পারেন যোগার করে নিয়ে আসেন। মায়না বর্তমান দু’শ টাকা। কয়দিনের মধ্যেই আড়াইশো টাকা হয়ে যাবে। আবুল শুনেছি, ছাত্র হিসেবে ভাল।প্ৰাইমারীর চাকরি। তাই ইচ্ছে করলে, চাকরি করেও পড়া চালিয়ে য়েতে পারবে।সুযোগ সব সময় পাওয়া যায়
না। আমি থাকতে চাকরিটা করে নেন।
বাবা বাড়ি এলেন। আমাকে কথাটা বললেন। কথাটা শুনে আমি একটু রোমাঞ্চিতও হলাম। আমি শিক্ষক হব! তখন আমার আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার
কথা মনে পড়ে গেল। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি বেশির ভাগ সময় আলীগাঁয় মামাদের বাড়িতে কাটিয়েছিলাম। তখন আমি মাঝেমধ্যে আলীগাঁও নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শখের শিক্ষকতা করতাম। কিন্তু টাকার
কথা শুনে আমি দমে গেলাম। বললাম-অত টাকা দিয়ে এলপি স্কুলের চাকরির দর্কার নেই। পড়া চালিয়ে গেলে আমি পরে নিশ্চয় এর থেকে ভালো কিছু একটা করতে পারব।
তখন কামলার দাম এক টাকা, দেড় টাকা করে। মাসিক পনের বিশ টাকা করে রাখাল রাখা যায়। তাই বাবা বললেন- এলপির চাকরি হলে কি হবে। দুশ টাকা মায়না! আমাদের জন্য দুশ টাকা তো কম টাকা নয়। আমি আলীরপাম যাই। যদি টাকা যোগার করতে পারি! এমেলে(এম,এল,এ) বলেছেন, চাকরি করেও
বোলে পড়া চালিয়ে যেতে পারবি।এদিকে নদীও প্ৰায় বাড়ির কাছে এসে পড়েছে। কখন কি হয় বলা যায় না!
বাবা আলীগাঁও গেলেন। তখন নদী ভাঙনের ফলে মামাদের অৱস্থা খুব একটা ভালো
ছিল না। টিনের ঘর ছিল। সেগুলো বিক্রী করে দিয়েছে সংসার খরচের জন্য। তাই মামাদের কাছে না
গিয়ে বাবা দানেশ মুন্সীর কাছে গেলেন। দানেশ মুন্সী আমাদের কাকার শশুড়। অবস্থা ভালো। দানেশ মুন্সীর কাছ থেকে একশ টাকা কর্জ করে নিয়ে এলেন। আর বাবার নিজের কাছে ছিলো একশ টাকা। দু'শ টাকা জালালুদ্দিন সাহেবকে দিয়ে এলেন।শুধু টাকাই নিলেন। সাৰ্টিফিকেট, মাৰ্কশিট
কিছুই নিলেন না। পরের দিন আমি বাড়ী ছিলাম না{
কোথাও গিয়েছিলাম{ আমার অনুপস্থিতে জালালুদ্দিন সাহেব নিজে আমাদের বাড়ি এসে আমার সার্টিফিকেট, মার্কশিট নিয়ে গেলেন। পনের দিন পর জালালুদ্দিন সাহেবের ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেন মাস্টর সাহেব আমাদের বাড়ি এসে নিয়োগপত্ৰ দিয়ে গেলেন। পশ্চিম বালিকুরি পাঠার প্ৰাথমিক বিদ্যালয়ে আমার নিযুক্তি হল কোরবান আলী আহমেদের খালী পদে। কোরবান আলী
বেসিক প্রশিক্ষণে গিয়েছিলেন।
আমি ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসের ২৭
তারিখে স্কুলে যোগদান করলাম। স্কুলটা আমাদের বাড়ি থেকে তিন চার কিলোমিটার দূরে
ছিল। কিন্তু দূরত্ব তিন চার কিলোমিটার হলেও মাঝখানে বেকী নদী থাকায় যাতায়াতের
অসুবিধা ছিল। বেকি নদী পাড় হয়ে স্কুলে যেতে হত। খড়ার মরশুমে নদী পাড় হয়েই আমি স্কুলে যাতায়াত করলাম। বৰ্ষার মরশুমে মফিজ মুন্সির বাড়িতে জায়গীর থাকার ব্যবস্থা করলাম।
মফিজ মুন্সি খুবই সহজ-সরল লোক ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমি তাঁকে চাচা বলে ডাকতাম।
মফিজ মুন্সির পরিবার খুবই স্নেহশীলা এবং কিছু শিক্ষিতা ছিলেন। তিনি আমার খুব খেয়াল রাখতেন। তিনি সকাল বেলা গ্রামের মেয়েদের আরবি পড়াতেন।
তাই আলিফ, বে, তে শব্দে সকাল বেলা
বাড়িটা মুখর হয়ে থাকত।
মফিজ উদ্দিন চাচার দুই ছেলে এবং এক
মেয়ে। বড় ছেলের নাম খোসবর রহমান এবং ছোট ছেলের নাম গাজিবর রহমান। মেয়ের নাম আয়মনা খাতুন। গাজিবর এবং আয়মনা
আমার স্কুলেই পড়ত। খোসবর তখন এম, ই স্কুলের ছাত্র।
মফিজ উদ্দিন চাচার পূর্বপুরুষরা পূর্ববংগের পাবনা জেলার লোক ছিলেন। মফিজ উদ্দিন চাচার জন্ম আসামে। মফিজ উদ্দিন চাচা আমার খুবই খেয়াল রাখতেন। কিন্তু তাঁদের রান্না খেতে আমার কিছুটা অসুবিধে হত। কারণ তাঁদের রান্নাবান্না আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিল। তাঁরা পিঠা বানাতে জানত না। চিতি পিঠা দুই দিকে উল্টিয়ে ভাজতো। দুধের পিঠা, ভাপা পিঠা বানানো তো দূরের কথা! তবে তাঁরা পাচৈ খেত।
একদিন মফিজ চাচা বললেন- মাষ্টর বেটা, তুমি পাচৈ
খেয়েছ না-কি?
পাচৈ খেয়েছি মানে আমি পাচৈর নামই সেদিন প্রথম শুনেছিলাম। তাই আমি বললাম- না, খাইনি। এই প্রথম নাম শুনলাম।
ঠিক আছে, তোমাকে একদিন পাচৈ খাওয়াব।
দু’দিন পর সত্যিই পাচৈ রাঁধল। পাচৈ ধান পচিয়ে রাঁধে। মনে হয়, পাচন শব্দ থেকেই পাচৈ শব্দটা এসেছে। দুই তিন দিন আগে থেকে ধান জলে ডুবিয়ে
রাখা হয়। ধান পচন ধরলে সেই ধান ঢেঁকিতে ভানা হয়। ঢেঁকিতে ভানার পর যে রস বের হয়,
সেই রস ভাতের মাঝে দেওয়া হয়। হয়ে গেল পাচৈ। ভাত আগে থেকেই রেঁধে
রাখা হয়। মফিজ চাচা তো খুবই মজা করেই খেলেন সেই পাচৈ; কিন্তু বলতে দ্বিধা
লাগলেও বলতে হয়, আমি তেমন স্বাদ পেলাম না।
একদিন বিকেল বেলা আমি বেকি নদীর পাড়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, খড়া জাল পেতে জেলেরা বড় বড় পিয়ালি মাছ ধরছে। মাছ দেখে খুবই পছন্দ হল। দুই টাকার মাছ কিনে নিয়ে
বাড়ি এলাম। মাছ চাচীকে দিলাম।
রাতে সেই পিয়ালি মাছের তরকারি
দিয়ে ভাত খেতে দিলেন। মাছ দিয়ে ভাত মাখিয়ে মুখে দিতে গেছি, অমনি এক
ধরণের বিশ্রী গন্ধ নাকে লাগল। ‘মাংস ধুলে রুঠা এবং মাছ ধুলে
মিঠা।' মনে হল, মাছ ভালো করে ধোয়া
হয়নি। চাচীর রান্নাও তেমন হতে পারে কিংবা কাজের চাপে তারাতারি করতে গিয়েও তেমন
হতে পারে! কারণ বাড়িতে তিনি ছাড়া আর অন্য কাজের লোক ছিল না। কি করি তখন! আমার
পক্ষে সেই মাছ খাওয়া কোনোমতেই সম্ভব
নয়। হঠাৎ বুদ্ধি করে বললাম-চাচী, আপনাকে বলতে ভুলে
গেছি, আমার মাছ খাওয়া নিষেধ আছে। একটা ঔষধ খাইতেছি। আমি মাছ
খাব না। অন্য কিছু থাকলে দিন। সেদিন চাচী ডাউলও রান্না করেছিলেন।
তাই সেদিন মাছের তরকারীর পরিবর্তে ডাউল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। তারপরে যে কয়দিন তাঁদের বাড়ি
ছিলাম, আমি মাছ খাইনি। ডাউল কিন্তু খুব ভালো রাঁধতে পারতেন চাচী। ডাউলের মাঝে ডিম দিয়ে রাঁধলে সেই ডাউল খুবই সুস্বাদ লাগত। গরুর গোস্তে চালের গুঁড়ি ব্যবহার করতেন। তাই তাঁদের রান্না গরুর মাংসও আমি খেতাম না, কিন্তু একদিন গুঁড়ি দিয়ে রান্না করা গরুর গোস্ত খেয়ে
খুবই মজা পেয়েছিলাম। তাঁরা বৎসরে একবার করে সমাজে কিছু একটা সিন্নি করতেন। ঝাল সিন্নি। পাড়াটা বেকি নদীর পাড়ে পুবা-পশ্চিমাভাবে অবস্থিত ছিলো। পাড়ার পুব মাথার প্রথম বাড়িটা জামাল গাঁওবুড়াদের ছিলো।
জামাল গাঁওবুড়া গ্রামের ধনী এবং
প্রভাবশালী লোক। তাই সিন্নিটা জামাল গাওঁবুড়ার বাড়িতে রান্না করা হতো। খুবই বড় সিন্নি। দুই তিনটা গরু জবাই করতো। সমাজের
সব লোক একত্রিত হয়ে সেদিন এক সাথে বসে খেতেন। মনে হয়, সেটা ওদের সামাজিক বন্ধনের একটা অংশ ছিল।
মফিজ চাচার বাড়ি জামাল গাঁওবুড়াদের বাড়ির চার পাঁচ বাড়ি পশ্চিমে ছিল। একদিন মফিজ চাচা বললেন- মাষ্টর বেটা, অমুক দিন
আমাদের সমাজে একটা বড় সিন্নি হবে। যেখানেই থাক না কেন, সেদিন
কিন্তু এখানে থাকতে হবে। এবার তিনটি গরু জবাই করা হবে। গরু কেনা হয়ে গেছে।
গরুর মাংসের কথা শুনে আমি দমে
গেলাম। এঁরা মাংসে চালের গুঁড়ি ব্যবহার করবে, যা আমার
পক্ষে খাওয়া সম্ভব হবে না। তাই বললাম- আপনারা মাংসে চালের গুঁড়ি ব্যবহার করেন। আমি গুঁড়ি
দিয়ে রান্না করা মাংস খেতে পারি না। আমরা মাংসে গুঁড়ি ব্যবহার করি না। থেকে কি
করব?
মফিজ চাচা বললেন- তোমার জন্য গুঁড়ি ছাড়াই রান্না করব। তবুও তোমাকে থাকতে
হবে।
ঈস্পিত দিন এল। মফিজ চাচা তাঁর কথা
রেখেছিলেন। আমার জন্য কিছুটা মাংস গুঁড়ি ছাড়া রান্না করেছিলেন। সবার সাথে আমিও খেতে বসলাম। আমাকে গুঁড়ি ছাড়া মাংস দিল। অন্যদের দিলো গুঁড়ি দিয়ে রান্না করা মাংস। ওদের মাংসের মাঝে গুঁড়ির বাইরেও রসুন দিয়েছিল। গোটা গোটা রসুন। দেখছি, সবাই রসুন চেয়ে চেয়ে নিয়ে খাচ্ছে- ‘আমায় আরও একটা রসুন দাও। কেউ বলেছে, ওর পাতে এত
দিলে, আমাকে আরও দুটো দিয়ে যাও।' এরকমই
চেয়ে চেয়ে নিয়ে খাচ্ছে আর কি!
আমি ভাবলাম, কী স্বাদ আছে রসুনে যে চেয়ে চেয়ে নিয়ে খাচ্ছে! একটু খেয়ে
দেখি। এভাবে ভেবেই বললাম- আমাকে একটা রসুন দিয়ে যান। খেয়ে দেখি কেমন লাগে।
আমাকে রসুন দিল। ওরা রসুনের মুখটা
দাঁত দিয়ে একটু ভেঙে চোষে চোষে খাচ্ছিল। আমিও রসুনের মুখটা ভেঙে ওদের মত চোষন
দিলাম। অন্য রকম ভালো স্বাদ ছিল রসুনের। আরও দুটো চেয়ে নিয়ে খেলাম। পরে গুড়ি
দিয়ে রান্না করা মাংসও একটু চেয়ে নিয়ে খেলাম। ভালোই লাগল। সেদিন প্রথম রসুন এবং
গুঁড়ি দিয়ে রান্না করা মাংস খেয়েছিলাম এবং পরে গুঁড়ি দিয়ে রান্না করা মাংস খেতে তেমন দ্বিধাবোধ করতাম না।
পাড়াটায় কিছু দস্যু প্রকৃতির লোকে
ছিল। যেমন আহের বক্স, আব্দুল আজিজ প্রভৃতিরা। এরা নরহত্যা,
ডাকাতির সাথেও জড়িত ছিল। আব্দুল আজিজের বড় ভায়ের নাম ছিল মেহের
শনি। মেহের শনি দুর্দান্ত লোক ছিল। সে ঘোঁড়া নিয়ে চলা-ফেরা করত। তাকে সবাই সমীহ
করে চলত। শুনেছি, সে নাকি নারীলোভী ছিল! মেহের শনির ভায়েরাই গ্রামের লোকের সাথে মিলে তাঁকে
হত্যা করেছিল। একদিন একজন লোক আমাকে তার পিঠ দেখিয়ে বলেছিল-‘এই দেখেন মেহের “শনির চাবুকের দাগ। তাকে
হত্যা করার সময় এভাবে আমাদের চাবুক মেরেছিল।'লোকটি হত্যার
সাথে জড়িত ছিলো।
মেহের শনির হত্যার খবর আমরাও
শুনেছিলাম। মেহের শনির হত্যাই খুবই আলোড়ন তোলেছিল আমাদের অঞ্চলে।
মফিজ চাচার বাড়িতে চারটে ঘর ছিল। সব কয়টিই খড়ের। বড় ঘরটা ছিল বাড়ির দক্ষিণ দিকে। গোয়াল ঘর পুব
দিকে। রান্না ঘর পশ্চিম দিকে এবং আমি থাকা ঘরটা ছিল ভেতর বাড়ি। বাড়ির উত্তর
পাশে। ঘরের দুয়ারটা ছিল পাটখড়ি দিয়ে বানানো। সাধারণ দুয়ার। দুয়ার বাইরে থেকেও
খোলা যেতো। আমি একদিন রাতে আমার বিছানায় শুয়ে ছিলাম। গভীর রাত। হঠাৎ কে যেন দুয়ার ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢোকে টর্চ লাইট জ্বালাল।আমি হতচকিত
হয়ে বিছনায় উঠে বসে জিজ্ঞাসা করলাম- কে, কে আপনি?
আগন্তুক বলল- আমি আজিজ। বেশি সোরগোল
করবেন না। আমি রাতটা আপনার এখানে ঘুমাব।
আমি আজিজকে জানতাম। আজিজ মানে
আব্দুল আজিজ। মেহের শনির ছোট ভাই। মফিজ চাচার বাড়ি থেকে দুই বাড়ি পশ্চিমেই তার
বাড়ি। তাই আমি লেমটা জ্বালিয়ে বললাম- এত রাতে? আমি তো রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বুক ধড়ফড় করছে। তা, এত রাতে এলেন?কি মনে করে?
আব্দুল আজিজ বলল- অমুক(জায়গার নাম মনে নেই।) জাগায় ডাকাতি হয়েছে। আমার নামে কেস দিয়েছে। পুলিস
আমাদের খোঁজতেছে। বাড়িতে শুয়ে ঘুম
আসছিল না। তাই আপনার এখানে ঘুমাতে এলাম। এই বলেই সে সার্টটা খোলে বিছানায় বসল। দস্যু লোক। তাই আমার ভালো লাগছিল
না। তবু ‘না’ বলার সাহস হল না।
রাতটা আমার বিছানায় শুয়ে ঘুমাল। আমি পাশে শোয়ে থাকলাম ঠিকই; কিন্তু আমার ঘুম এল না। জেগে জেগে উসখুস করে রাতটা কাটালাম। আমি উঠার আগেই
আজিজ উঠে চলে গেল। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এর তিন চারদিন পরের ঘটনা। সেদিন আমি
স্কুল থেকে এসে কাপড়-চোপড় খোলে গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার সামনে দিয়েই ছয় সাত জন পুলিস গেল সাইকেলে চেপে। একটু পরেই দৌড়াদৌড়ি
হুড়াহুড়ির শব্দ। দুপদাপ বাড়ির শব্দ। একটু পরেই আব্দুল আজিজ আমার পেছন দিক থেকে এসে পুব দিকে দৌড়ে পালাল।।
সম্ভবতঃ পুলিসের তাড়া খেয়ে বাড়ির পেছন দিয়ে বেড়িয়ে মফিজ চাচার বাড়ির ওপড়
দিয়ে এসে সেভাবে পালিয়েছিল। আমি হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একটু পরেই দু’জন পুলিস পশ্চিম দিক থেকে দৌড়ে এল। তারা আমার পাশ দিয়েই পুব
দিকে দৌড়ে গেল। সম্ভবতঃ আজিজকেই ধাওয়া করে গেল তারা। আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করল না। আমি হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একটু পরেই বাঘবর থানার অসি আব্দুল আজিজের বাড়ি থেকে রাস্তায় বেড়িয়ে এলেন। আমি অসি সাহেবকে চিনি। যেহেতু থানার কাছেই আমাদের বাড়ি। থানার সামনে
দিয়ে যাওয়া-আসা করতে দেখেছি। অবশ্যে কোনোদিন কোনো কথা হয়নি। আমরা অসি সাহেবকে সিলুটে অসি বলতাম। কারণ তিনি আসামের সিলেট জেলার লোক ছিলেন। সিলুটে ভাষায় কথা বলতেন।তাই সবাই সিলুটে অসি বলত। তিনি রাস্তায় এসে আমাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত ইশ্বারায় আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁর ডাকে সাড়া
দিয়ে সেখানে গেলাম। আব্দুল আজিজের বাইর বাড়িতে অবাক কাণ্ড! কয়েকজন লোক ধরা পড়েছে। সব ক’টিই ডাকাত। কয়েকজনকে আমি চিনি।তবে এখন তাদের নাম মনে নেই।সবার নাম আমি জানতামও না। দুই তিনজন পুলিসকেও চিনতে পাড়লাম। তাঁরা নাটকের মতো বচন (ডায়লগ) গেয়ে ডাকাতদের বেতের লাঠি দিয়ে ইচ্ছেমত পিটাচ্ছে। পিঠ পাথালি বাড়ি। ডাকাতরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
অনেক জিনিষপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসি সাহেবের সামনে। কাপড়-চোপড়, রেডিও, ডেগার, ছুরি প্রভৃতি। একজন পুলিস মালের তালিকা করতেছে।
অসি সাহেব আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন- আপনি তো আমাদের বাঘবরেরই লোক তাই না!এখানে কি করছেন?
আমি বললাম- আমি এখানকার স্কুলের
শিক্ষক। এখানে লজিং থাকি।
তিন চারটে চেযার পাতা ছিলো। কাঠের চেয়ার। তখন এখনকার মতো প্লাষ্টিকের চেয়ার ছিল না। অসি সাহেব আমাকে একটি চেয়ারে বসতে বললেন। আমি চেয়ারে বসার পর অসি সাহেব বললেন- আমরা কিছু জিনিষপত্র
‘চিইজ্’ করে নিব। কী
কী জিনিষপত্র নিলাম আপনি তার সাক্ষী থাকবেন।
আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। ভাবলাম,
এরা যে রকম দস্যু লোক। যদি আমাকে কিছু বলে!
অসি সাহেব আমার মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- কোনো অসুবিধে নেই। আমরা তো আছি। আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করব না। শুধু মালের তালিকার কাগজে চহী করবেন।
একটু পরেই পুব দিকে দৌড়ে যাওয়া
পুলিস দু’জন ফিরে এসে বলল- পেলাম না, স্যার। সম্ভবতঃ নদীর কাছাড় দিয়ে পালিয়েছে।
অসি বললsv- পালাবে কোথায়? আজ
না হলেও কাল ধরা দিতেই হবে।
আমি সই করলাম। চিইজ করা কিছু জিনিসপত্র এবং আসামিদের নিয়ে পুলিস
চলে গেল।
আসলে যারা ধরা পড়েছিল তারা আব্দুল আজিজের ঘরের কাঁড়ে লুকিয়ে ছিল। আব্দুল আজিজ ভেতর বাড়ি নিজের ঘরে শোয়েছিল। সে পুলিসের উপস্থিতি
টের পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির ভেতর দিয়ে গিয়ে মফিজ চাচার বাড়ির ওপড় দিয়ে
দৌড়ে পালিয়েছিল। জামাল গাঁওবুড়াদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে তিন চারটি ফাঁকা বাড়ি ছিল। তারই একটি বাড়িতে গিয়ে আব্দুল আজিজ মেয়েলোকের কাপড়
পিন্ধে কলশি কাঁখে নিয়ে কয়েকজন মেয়েলোকের সাথে নদীর পাড়ে গিয়েছিল এবং নদীর কাছাড় ধরে পালিয়েছিল। কথাগুলি আমি পরে
শুনেছিলাম লোক মুখে।
আব্দুল আজিজ এবং আহের বক্স অনেক দিন
পরে মানুষের হাতে খুন হয়েছিল। মন্দের শেষটা সব সময় মন্দই হয়!এটাই প্রকৃতির বিধান।
গ্রামের নাম ছিল বালিকুরি পাথার।
লোকগুলো খুব একটা শিক্ষিত ছিল না। সেখানে একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন শমসের আলি।
তিনি পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ছিলেন। আহের বক্সের বাবার নাম ছিল খয়বর আলী। আহের
বক্সরা চার ভাই ছিল। আহের বক্স, শুকুর আলী, আকবর আলী এবং বাক্কার আলী।
বাক্কার আমার ছাত্র ছিল। লেখা-পড়ায় তার মোটেই মনোযোগ ছিল না। দুষ্টুমি করে বেড়াত।
শুকুর আলী মফিজ চাচার মেয়ের জামাই ছিলো।আকবর আলী আমার সমবয়সী ছিল। সে আমার সাথে খাতির জমানোর
চেষ্টা করত।
আকবর আলির পাল্লায় পরে আমি একদিন
ফ্লাশ(তাস) খেলে বিশ টাকা
হেরেছিলাম।
বর্ষাকাল। বর্ষাকালে বালিকুরি পাথার
থেকে ময়নবড়ি বাজার পর্যন্ত তখন গয়নার নৌকা চলত। বালিকুরি পাথারের উত্তর দিকে একটি খাল ছিল। লোকমুখে শুনামতে, খালটা বোলে এক সময় চাউলখোয়া নদী ছিলো। নদী মরে গিয়ে খালটা সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই খাল ময়নবড়ি বাজার
পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনিতে লোকেরা
হেঁটেই ময়নবড়ি বাজারে যাওয়া-আসা করত। বর্ষার মরশুমে গয়নার নৌকা চললে তখন অনেকে সেই নৌকোয় চড়ে ময়নবড়ি বাজারে যেত। বিশেষ করে বেচাকেনার জন্য জিনিসপত্ৰ থাকলে। নৌকাও
শুধু ময়নবড়ির হাটবারেই চলত। আমি সাধারণতঃ সাইকেল নিয়েই ময়নবড়ি যাওয়া-আসা
করতাম। কিন্তু আমার আঁঠুর গাঁটে এক প্রকার বিষ হয়েছিল। সাইকেল চালালে আঁঠুতে বেদনা করত। তাই আমি সাইকেল খুব
কম চালাতাম।ময়নবড়ি সপ্তাহে দুইদিন হাট বসত। সমবার ও বৃহ্সপতিবার।শিক্ষকদের জন্য শিক্ষক কেন্দ্ৰসভা নামক একটি সংগঠন ছিলো। প্ৰত্যেক মাসের শেষে সেই কেন্দ্ৰসভা অনুষ্ঠিত হত। শিক্ষক কেন্দ্ৰসভার কেন্দ্র ছিলো ময়নবড়ি। তাই কেন্দ্রসভা বিশেষ করে ময়নবড়িতেই অনুষ্ঠিত হত। শিক্ষকদের সুবিধার জন্য
কেন্দ্রসভা বিশেষ করে ময়নবড়ির হাটবারেই অনুষ্ঠিত হত। আমার মনে হয়, সেদিন আমাদের শিক্ষক কেন্দ্র সভা ছিল। তাই আমি সেদিন লজিং বাড়ি থেকে গয়নার নৌকায় চড়ে ময়নবড়ি গিয়েছিলাম।
সন্ধ্যেয় আবার গয়নার নৌকায় চড়েই
বাড়ি ফিরছিলাম। সেদিন আকবরও গয়নার নৌকায় চড়ে হাটে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার পথে আকবর, হরিদাস
এবং অন্যান্য চার পাঁচজন নৌকায় চড়েই তাস খেলতে শুরু করছিলো। ফ্লাশ। তিন তাসের খেলা। আমি আকবরের কাছে বসে খেলা দেখছিলাম। আমি তখন মেরিজ (টুয়েণ্টি নাইন)
খেলা শিখেছিলাম। তাই আমি খুব মনোযোগ সহকারে সেই খেলা উপভোগ করছিলাম।
আকবর খেলায় তেমন পটু ছিল না। তাই
সে অনেক টাকা হারল। তার হাতে আর টাকা নেই। সে আমাকে বলল- মাস্টর, টাকা থাকলে বিশটি টাকা ধারে দিন।
আমি ভাবলাম, আকবর খেলায় তেমন পটু না। ভালোভাবে খেলতে জানে না। তাই টাকা দিলে সে আবারও হারবে। জোয়া’র জন্য টাকা ধারে দিলে সেই টাকা আর ফেরতও পাব না। ইতিমধ্যে আকবরদের খেলা দেখে দেখে আমি খেলা কিছুটা আয়ত্ব করে ফেলেছিলাম।
ভাবলাম, টাকা যখন ফেরত পাবই না, তখন নিজে খেলেই হারি। নিজে খেলে হারলে তখন অন্তত আফসোস থাকবে না। তাই আমি বললাম- টাকা দিলে আপনি আবারও হারবেন। আপনি আমার পাশে বসুন। আমি
খেলি।
আকবর বলল- আপনি খেলতে জানেন নাকি?
আমি বললাম- না, জানিনা। আপনাদের খেলা দেখে দেখে কিছুটা শিখে ফেলেছি। মনে হয়, আপনার
থেকে অবশ্যেই ভালো খেলব।
আমি খেলতে শুরু করলাম। হরিদাস
খেলায় খুবই ওস্তাদ ছিল। সে সব টাকা জিতে নিল। ঘাটে আসতে আসতে আমি বিশ টাকা
হারলাম।তখনকার বিশ টাকা এখনকার কমেও দুই হাজার তো বটেই।
তাই সেদিন থেকে আকবরকে আমি তেমন
পাত্তা দিতাম না। ভাবলাম, কুসংগে থেকে স্বর্গবাসের চেয়ে সৎ সংগে
থেকে নরক বাসও অনেক ভালো।
শুকুর আলী মফিজ চাচার মেয়ের জামাই
ছিল। সে চুরি ডাকাতি করত না। লোক হিসাবে ভালো ছিল বলে তাঁর সুনাম ছিল। সে আমার
সাথে খুব ভালো ব্যবহার করত। খয়বর আলী লোকটা ব্যক্তি হিসাবে কেমন ছিল জানি না। তবে
বাড়িতে গেলে খুবই খাতির করত। ভাত খাওয়ার সময়ে গেলে ভাত না খেয়ে আসতেই দিত না।
জামাল গাঁওবুড়ারাঁ তিন ভাই ছিলেন। জামাল গাঁওবুড়া, আলিমুদ্দিন এবং হামিদ মুন্সী। আলিমুদ্দিনের
সাথে আমার খাতির হয়েছিল। তাঁরা শান্ত-শিষ্ট লোক ছিলেন। কোনো খারাপ সংগ ছিল না তাঁদের। তাঁদের ছেলেপিলে আমার ছাত্র ছিল।
তখন আমি বালিকুরি পাথার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে
পেয়েছিলাম-হানিফ আলী, আব্দুস সাত্তার, গাজিবর
রহমান, ওসমান গণি, মকবুল হোসেন,
আলতাব হোসেন, আব্দুর রেজ্জাক, হাবেজ উদ্দিন, ফজর আলী, হজরত
আলী, কালু মিঞা, আমজাদ হোসেন, আবু বাক্কার এবং আরও অন্যান্যদেরকে। অন্যান্য আরও যারা ছিল তাদের নাম
এখন মনে নেই। এদের মধ্যে মকবুল হোসেন ছিলো জামাল গাঁওবুড়ার ছেলে। সে এখন গাঁওবুড়া। হানিফ আলী প্রাইমারির
শিক্ষক। হাবেজ উদ্দিন শিমুলিতলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।
আমাদের শিক্ষক কেন্দ্রসভার সম্পাদক ছিলেন আমির হোসেন খান সাহেব। আমি সেখানে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলাম-
ক্ষিতীশ সাহা, নরেশ ঘোষ, মতিয়ার
রহমান, বৈদ্যনাথ বায়ন, তোফাজ্জল হোসেন
এবং অন্যান্যদের। বৈদ্যনাথ বায়ন আমাদের কাদং হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি আমার থেকে তিন বছরের সিনিয়র ছিলেন। তিনি আমাকে শিক্ষক
হিসাবে করণীয় সম্পর্কে অনেক উপদেশ দিতেন। বৈদ্যনাথ বায়নের পরামর্শ মতোই আমার প্রথম বিলটা বানিয়ে
দিয়েছিলেন নরেশ ঘোষ। নরেশ ঘোষ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন যদিও তিনি স্নাতক ছিলেন। তাঁর হাতের আখর খুব সুন্দর ছিল। আখরগুলো গোটা গোটা করে লিখতেন।তিনি আমার থেকে বয়সে অনেকটা বড় ছিলেন।বৈদ্যনাথ বায়ন জনীয়ার লোক ছিলেন। তিনি অনেকদিন আগে অকালে মারা গেছেন। আমি জানা মতে, তিনিই জনীয়ার প্রথম যাত্ৰীবাহী বাসের মালিক ছিলেন। ক্ষিতীশ সাহাও
স্নাতক ছিলেন। তিনি কয়েক বছর বরপেটা মহকুমা প্রাথমিক শিক্ষক সন্মিলনীর সভাপতি ছিলেন। তোফাজ্জল হোসেন এবং আমি পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। তোফাজ্জল হোসেনের
বাড়ি ছিল পালহাজি।তিনি বাঙালি হিন্দু বাড়িতে লজিং থাকতেন। আমরা বিকেল বেলা প্রায়ই এক সাথে গল্প-স্বল্প করে সময় কাটাতাম।
একদিন বিকেল বেলা তোফাজ্জল হোসেন
আমার লজিং বাড়ি এসে খবর দিলেন- ফিক্সড মায়নায় সরকার ‘স্টাইপেণ্ডারি’(বৃত্তিধারি)শিক্ষক নিয়োগ
করবে। মাসিক একশ টাকা মায়না। কিছুদিনের মধ্যেই চাকরি স্থায়ী
হবে। তখন পূর্ণ মায়না পাওয়া যাবে।অনেকে দরখাস্ত করতেছে। তিনি বরপেটা থেকে কথাটা শুনে এসেছেন। সামনে মাত্র একদিন সময় আছে।
আমি ছুটির পোষ্টে কাজ করতেছি।
ডিসেম্বর মাসেই আমার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। দরখাস্ত না করলে অসুবিধা হতে পারে! তাই
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন বেলা দু’টো বাজে। সাইকেল হলে অবশ্যে বালিকুরি পাথার থেকে সাইকেলে চেপে বরপেটা যাওয়া যেতো। কিন্তু তখন ছিলো বর্ষা মাস।মনে হয়, সেপ্তেম্বর মাস ছিলো। বৰ্ষা মাসে নৌকায় চড়েই যাতায়াত করতাম।তাই সাইকেল ছিলো বাড়িতে। এদিকে চারদিকে জল থই থই করছে।নৌকা ছাড়া বাড়ি যাওয়া
কোনমতেই সম্ভব নয়। কী করা যায় এখন!
তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে একজন লোক এসেছিলেন। লোকটির নাম এখন মনে নেই। লোকটি বাঙ্গালি হিন্দু এবং বয়সে আমার চেয়ে অনেকটা বড় ছিলেন। তিনি বললেন- একটা উপায় আছে। আপনি অভয়াপুরি হয়ে আজ বঙ্গাইগাঁও গিয়ে থাকুনগে’। কাল সকালে সেখান থেকে বরপেটা
গিয়ে দরখাস্ত করতে পারবেন। তিনি আরও বললেন- আমার ছোট ভাই আজ
বঙ্গাইগাঁও যাবে, সেখান থেকে কাল ভোরে কোচবিহার যাবে। আপনি চাইলে তার সাথে যেতে পারবেন।
তখন বেলা বেশি নেই। ইতিমধ্যে আড়াইটা বেজে গেছে। কাপড়-চোপড় পড়ে তোফাজ্জল হোসেনের সাথে সেই লোকটির বাড়ি এলাম। দেখলাম, লোকটি
যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে। লোকটি বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা ছোট ছিলো। তোফাজ্জল হোসেন আমাকে দেখিয়ে লোকটিকে বললেন- এওঁ যাবে তোমার সাথে।
কথাটা শুনে লোকটি খুশী হল। বলল-
ভালোই হল। এক সাথে যেতে পারব। একা একা আমারও ভালো লাগছিল না। দু’জন এক সাথে গেলে কথাবার্তা পেতে যেতে পারব। কালবিলম্ব না করে দু’জনে
হেঁটে অভয়াপুরি অভিমুখে রওয়ানা হলাম। ময়নবড়ি পর্যন্ত হেঁটে ও ময়নবড়ি থেকে গয়নার নৌকায় চড়ে লেংটিসিঙা এলাম। লেংটিলিঙা থেকে আবার হেঁটে সন্ধ্যেয় এসে অভয়াপুরি পেলাম। অভয়াপুরি থেকে বাসে করে বঙ্গাইগাঁও এলাম।রাতটা আমরা বঙ্গাইগাঁও রেল ষ্টেসনে কাটালাম। পরের দিন ভোরে আমার সাথের লোকটি রেলে চেপে কোচবিহার চলে গেলো। আমি সকালে বাসে চেপে বরপেটা এলাম। বরপেটা এসে দরখাস্ত দিয়ে সেদিনই বাড়ি চলে এলাম।
তখন আমার বেতন ছিল মাত্র ১৮৯.৫০
টাকা। আমি প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্তি পেয়েছিলাম। তাই প্রধান শিক্ষকের
দায়িত্ব বানস পাঁচ টাকা ধরে আমার প্রথম বিলে ১৯৪.৫০ টাকা উঠেছিল।
তখন নবেম্বর মাসে বাৎসরিক পরীক্ষা
শুরু হয়ে ডিসেম্বরের পাঁচ সাত তারিখে পরীক্ষা শেষ হতো। আমি পরীক্ষা নিয়ে বাড়ি এলাম।
সাথে ছাত্রদের মূল্যায়ন বহী নিয়ে এলাম মূল্যায়নের জন্য। বহী মূল্যায়ন করে
ডিসেম্বরের আঠাইশ কিংবা ঊনত্রিশ তারিখে রেজাল্ট দিলাম। তারপর সবার কাছ থেকে বিদায়
নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর
মাসের ৩১ তারিখে আমার প্ৰথম চাকরি জীবনের ৩৩৯ দিন পূৰ্ণ হয়েছিল।
মাণিকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী পদে নিযুক্তি
১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাস। আমার তখন
চাকরি নেই। দু'দিন আগেই শিক্ষক ছিলাম। এখন আমি বেকার। ইতিমধ্যে
শিক্ষকতার প্ৰতি আমার মায়া জন্মে গেছে। অর্থাৎ আমি তখন পূরামাত্রাই শিক্ষক হয়ে গেছি। ছাত্রদের ভালোবাসা, অভিভাবকের আদর স্নেহের আলাদা এক মাদকতা আছে। আমি সেই
মাদকতার নেশায় পড়ে গিয়েছিলাম ইতিমধ্যে। স্কুল ছাড়া থাকতে হচ্ছে
এ কথা ভাবতেও আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি জানতাম আবার আমার অচিরেই নিযুক্তি হবে। তবে কবে হবে, তা আমি জানতাম না। তাই একদিন বরপেটা এলাম আবার কখন নিযুক্তি দিবে সেই কথা জানার জন্য। ১৯৭৪ সাল। জানুয়ারি
মাসের ৩ তারিখ। বারটা মনে হয় বৃহস্পতি বার ছিল। ডি,আই
অফিসে এলাম। সেখানে দেখা হল, আমার স্কুল জীবনের সহপাঠি বন্ধু আব্দুল জব্বারের সাথে। সেও আমার মতোই
প্রশিক্ষণের খালি পদে নিযুক্তি
পেয়েছিল। জব্বার আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল- তোর এপয়ণ্টমেণ্ট
লেটার নিয়েছিস না-কি?
আমি বললাম- কিসের এপয়ন্টমেন্ট
লেটার?
‘কেন
জানিস না? জব্বার বলল- তুই নিযুক্তি পেয়েছিস। আমিও পেয়েছি।
আমাদের নাম একটা অর্ডারেই আছে।' এভাবে বলেই সে তার নিযুক্তিপত্র বের করল। সত্যিই আমার নাম আছে সেই নিযুক্তিপত্রে।
নিযুক্তিপত্রে পাঁচজনের নাম ছিল। আব্দুল জব্বারের নাম ছিল পাঁচ নম্বরে এবং আমার
নাম ছিল তিন নম্বরে। আমাকে ৭৯৬ নম্বর মাণিকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী পদে
নিযুক্তি দিয়েছে।
নিযুক্তি পত্রে সেদিনই অর্থাৎ ৩
তারিখেই সই করেছিল। জব্বারকে সাথে নিয়ে
বড়বাবুর কাছে গিয়ে আমি নিযুক্তিপত্র নিলাম। তখন বড়বাবু কে ছিল এখন নাম মনে নেই। ডি,আই ছিলেন
দ্বীপ হালৈ। নিযুক্তিপত্রে দ্বীপ হালৈর দস্তখত ছিল।
নিযুক্তিপত্র নিয়ে বাড়ি এলাম।
পরের দিন আমি মাণিকপুর গেলাম।
৭৯৬ নং মাণিকপুর নিন্ম প্রাথমিক
বিদ্যালয় মাণিকপুর অঞ্চলের বিখ্যাত পরিয়াল ওমর আলী দেওয়ানী সাহেবের বাড়িতে অবস্থিত
ছিল। বাড়ির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ছিল বিদ্যালয় গৃহটা। তখন হেড মাষ্টার ছিলেন আব্দুল বারেক সাহেব। আমার ছাত্র জীবনের প্রথম
শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমি প্রথমে পূব দেউলদি নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ মাস
ক্লাস করেছিলাম। সেখানে তাঁকে আমি শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলাম।
আমি ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৪
তারিখে মণিকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী পদে যোগদান করলাম। বিদ্যালয় এলাকার
প্রায় সবাই আমার পরিচিত। গড়লা-চাচরা এম, ই
মাদ্রাসায় অধ্যয়ন কালে অনেকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। ওমর আলী দেওয়ানী
সাহেবের সাথেও আমার পরিচয় ছিল। সবাই তখন আমাকে ধনাই হাজির নাতি হিসাবে জানত। ওমর আলী দেওয়ানীর ছেলে
জমির আলী এবং আমির আলীকেও আমি আগে থেকেই জানতাম। তাই স্কুলে যোগদান করে আমি খুশীই
হলাম। আমার জীবনের আর এক অধ্যায় শুরু হল। সেখানে আমি ছাত্র হিসাবে পেলাম সামসুল হক এবং
আয়েন আলীকে। সামসুল হক ওমর আলী দেওয়ানীর ছেলে এবং আয়েন আলী গণি সরকারের নাতি।
আরও অনেকে ছিল যদিও তাদের নাম এখন মনে নেই।
আমি বাড়ি থেকে অনুমান পাঁচ ছয় কিলোমিটার রাস্তা সাইকেল নিয়ে স্কুলে
যাওয়া-আসা করতাম। আলীগাঁও বাজারের ওপড় দিয়ে যাওয়া-আসা করতে হত। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমি আলীগাঁও বাজারে এসে গল্প-স্বল্প করে সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরতাম। আলীগাঁও বাজারে
তখন তাস খেলার খুবই পয়োভর ছিল। আলীগাঁও বাজারের মাঝখানে একটি বৃহৎ গৃহ ছিল। বাজার
কমিটির তরফ থেকে গৃহটি দাগু সাধু নির্মাণ করেছিল।গৃহটির সাথেই ছিলো পঞ্চায়েত অফিস। পঞ্চায়েত অফিসে তখন তেমন কাজকাম ছিল না। তাই সব সময় বন্ধই থাকত। দাগু সাধু নির্মিত বাজারের গৃহ এবং পঞ্চায়েত অফিসের বারান্দায় তখন পূরাদমে তাস খেলা চলত।
ফিস, রামি, ফ্লাশ, ব্রীজ প্রভৃতি।বয়েস ও মর্যদা অনুসারে
একেক জনে একেক রকম খেলা খেলত। কেউ খেলত টাকা ছাড়া বিনোদনের জন্য, আবার কেউ খেলত টাকা করে টাকা রোজগারের জন্য। টাকা ছাড়া যারা খেলত, তারা খেলত বিকেল বেলা সময় কাটানোর
জন্য, আর যারা টাকা করে খেলত তাদের পেশাই ছিলো তাস খেলা। তাদের মনে হয়, অন্য কোন কাজকৰ্ম ছিল না। বাজারে এসে চা খেয়ে খেলতে বসে যেত। টাকা করে যারা খেলত, তারা মাঝেমধ্যে বাজারের উত্তর
প্রান্তে অবস্থিত লাউ জাংলার নিচে বসেও তাস খেলত। আমার বাল্যকালের বন্ধু
চান্দুও ছিলো সেই টাকা করে তাস খেলার দলে। আমি নিজে খেলতাম না, তবে চান্দুর পেছনে বসে খেলা উপভোগ করতাম। তাই কোন কোনদিন বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যেত। একদিন তো
রাতই কাটিয়ে দিয়েছিলাম একটি জাংলার নিচে বসে তাসখেলা দেখে। সেদিন বিস্কুট এবং পাউরুটি খেয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছিলাম। পরের দিন মামাদের
বাড়িতে ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম।
মাণিকপুর স্কুলে যোগদানের কিছুদিন
পরেই পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওমর আলী দেওয়ানী এবং হাবেজ উদ্দিন সেই নির্বাচনে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ওমর আলী দেওয়ানী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সভাপতি পদে এবং হাবেজ উদ্দিন আঞ্চলিক সদস্য (কাউন্সিলার) পদে। উভয়ে জয়ী হয়েছিলেন উক্ত নির্বাচনে। আমি সেই নির্বাচনে পালার পাম প্ৰাথমিক
বিদ্যালয়ে পোলিং অফিসার হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছিলাম। পোলিং অফিসার হিসেবে সেটাই ছিল আমার প্রথম নিযুক্তি।
এভাবে ছয় মাস স্কুলে আসা-যাওয়া
করলাম। ভালোভাবেই দিন কাটছিল। যন্মাষিক পরীক্ষার পর গ্রীষ্মের বন্ধ পড়ল। গ্রীষ্মের
বন্ধের মাঝে একদিন বরপেটা ডি, আই অফিসে গেছি।
সেখানে দেখা হলো দংরার মোলায়েম খানের সাথে। সে আমার হাতে বদলির লেটার দিয়ে বলল-
ভালোই হলো আপনার সাথে দেখা হয়ে। আপনাকে সুখচর প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে বদলি করেছে।
লেটার খোলে দেখলাম, সত্যিই আমাকে সুখচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করেছে। বদলি
লেটার দেখে আমি হতাশ হলাম। আমি অফিসের ভেতরে গেলাম। সেখানে আমার সাথে দেখা হলো তদানীন্তন স্কুল এস, আই ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে। তাঁর সাথে আমার মোটামুটি পরিচয় ছিল।আমাকেও তিনি জানতেন। আমি বললাম- স্যার, আমাকে এভাবে হঠাৎ কেন বদলি করা হলো?
সবে তো ছ'মাস হয়েছে নিযুক্তি পাওয়ার?
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- আমি তো এ বিষয়ে
কিছুই জানি না। তবে আপনার নতুন চাকরি। বদলি করতেই পারে। জইন করুন, পরে বদলি হয়ে এলেই
হলো।
তখন স্কুল পরিদৰ্শকদের খুব ক্ষমতা
ছিলো। বিশেষ করে বদলির ক্ষেত্ৰে তাঁদের পরামৰ্শ
গ্ৰহণ করা হতো। তাই আমি বললাম- স্যার, কাজটা কিন্তু আপনাকেই করে দিতে হবে।
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- নিশ্চয়ই
করব। ডি, আই স্যার নেই। না হলে আজকেই আলোচনা করতে পারতাম। কয়েকদিন পরে আসুন, আমি
আলোচনা করে রাখব।
বদলির লেটার নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। তখন বর্ষাকাল। সব
জায়গায় জল। নৌকা ছাড়া যাতায়াত করা যায় না। ময়নবড়ি সোমবার এবং বৃহস্পতি বারে
হাট বসে। আমাদের উত্তরপাড়ার বগুড়া লোকগুলির অনেকে ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁরা বর্ষার মরশুমে হাটে হাটে গিয়ে পাট কেনাবেচা করতেন। মানে পাট হাটে কিনে পাঁইট করে সেই হাটেই বিক্রী করে দিতেন। তাঁরা নৌকা নিয়ে ময়নবড়ি হাটে যেতেন। আমি এক সপ্তাহ পরে, মনে হয়, ১৮ তারিখে,
আমি তাঁদের সাথে ময়নবড়ি
গেলাম। তখন সুখচর নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন রিয়াজ পণ্ডিত।
ময়নবড়ি শিক্ষক কেন্দ্র সভার অধীনে শিক্ষকতা করার সময় তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি হাটে গিয়ে রিয়াজ পণ্ডিতের সাথে সাক্ষাৎ করলাম।
রিয়াজ পণ্ডিত বললেন- এখন তো
গ্রীষ্মের বন্ধ চলছে। আগামী ২৯ তারিখে আমাদের কেন্দ্রসভা আছে। কেন্দ্রসভায় আসুন। সেদিন
জইন করে নেব এবং বিলও করে দিব।
বাড়ি ফিরে ফিরে এলাম। তার পর আবার ২৯ তারিখে ময়নবড়ি গেলাম। সেদিন মনে হয়, সোমবার ছিল। ময়নবড়ির হাট বার। কেন্দ্রসভায় গেলাম। তখন
কেন্দ্রসভার সম্পাদক ছিলেন আমির হোসেন। পশ্চিম বালিকুরি পাঠারে শিক্ষকতা করার সময়
আমি ময়নবড়ি কেন্দ্রেই ছিলাম। তাই আমির হোসেনের সাথে আমার পরিচয় ছিল। তাঁর সাথে
দেখা করলাম। রিয়াজ পণ্ডিতের সাথেও দেখা হলো। কেন্দ্র সভায় শিক্ষকদের মাসিক মায়নার বিল জমা নিত।
রিয়াজ পণ্ডিত বললেন- আপনার জইন আমি ১৮ তারিখ থেকে ধরব। কারণ ১৮ তারিখে আপনি
আমার সাথে দেখা করেছেন।
আমি বললাম- গ্রীষ্মের বন্ধ চলছে।
এদিকে বর্ষা মাস। নৌকা ছাড়া আসা যায় না। তাই আসতে দেরি হয়েছে। আপনি সম্পূর্ণ মাসের
বিল করে দিন।কারণ মাণিকপুর স্কুলে আমার বিল করবে
না।
রিয়াজ পণ্ডিত বললেন- অসুবিধা আছে।
আমাকেও তো জবাবদিহি করতে হয়। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি আছে।
আমি তাঁর সাথে তর্ক না করে কথাটা
আমাদের সম্পাদক আমির হোসেনকে জানালাম। সম্পাদক রিয়াজ পণ্ডিতকে ডেকে বলেনল- এর
সম্পূর্ণ মাসের বিল করছেন না কেন। ভেঙে বিল করলে অসুবিধা হবে। চাকরির লিংক ব্রেক
হবে। সম্পূর্ণ মাসের বিল করে দিন।
রিয়াজ পণ্ডিত বললেন- অসুবিধা আছে।
এ আমার সাথে ১৮ তারিখে দেখা করেছে। তাই ১৮ তারিখ থেকে বিল করতে বলেছে। আমি কি করব? আমি তো তাঁদের অধীনে কাজ করি।
আমির হোসেন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন- কে বলেছে?
তখন মেনেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন ময়নবড়ি
অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই সভাপিতর নাম জানতাম।এখনও মনে আছে। তবে সন্মানের খাতিরে এখানে উল্লেখ করলাম না।
রিয়াজ পণ্ডিত বললেন- ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি।
আমির হোসেন আমাকে দেখিয়ে রিয়াজ পণ্ডিতকে উদ্দেশ্য করে বললেন- এ-কে নিয়ে সভাপতির
কাছে যান। অসুবিধার কথাটা তাঁকে বুঝিয়ে
বলুন।
সভাপতি সাহেব হাটেই ছিলেন। আমি রিয়াজ পণ্ডিতের
সাথে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করলাম। রিয়াজ পণ্ডিত ভাঙা মাসের বিল করলে কি ধরণের অসুবিধা হতে পারে সভাপতিকে কথাটা বুঝিয়ে বললেন।
সভাপতি বললেন- তাহলে সতেরো দিনের আধা
দরমহা আমাদের ম্যানেজিং কমিটিকে দিতে হবে।
আমি যুক্তি দিলাম- এখন তো গ্রীষ্মের
বন্ধ চলছে। কেউ স্কুল করছে না। আপনি কেন অন্যায় কথা বলছেন।
সভাপতি সাহেব বললেন- যদি পূর্ণ মাসের বিল
করতে হয়, তাহলে আধা দরমহা দিতেই হবে। নাহলে, যে তারিখে হেড পণ্ডিতের সাথে দেখা
করেছেন সেই তারিখ থেকে বিল করতে হবে।আমি বেশি দেরি করতে পারব না। আমার অন্য কাজ আছে।
এভাবে বলে সভাপতি সাহেব চলে গেলেন। রিযাজ পণ্ডিত বললেন- দেখলেন তো কেন বিল করতে পারছি না। এখন ১৮
তারিখ থেকেই বিল করে দিই। পরে দেখা যাবে।
আমার আপত্তি টিকল না এবং রিয়াজ পণ্ডিত চৌদ্দ দিনের বিল করে সম্পাদকের নিকট জমা দিলেন।
আমি সম্পাদক সাহেবকে বললাম- আপনি আমার বিল অফিসে জমা দিবেন না। যদি কোনদিন পূর্ণ মাসের বিল করতে পারি তখন জমা নিবেন। প্রয়োজন হলে আমি এক মাসের মায়না নেবই না। তাই বলে আমি আধা মাসের মায়না নেব না। আমার দৃঢ়তা দেখে, সম্পাদক সাহেব রিয়াজ পণ্ডিতকে বিল ফিরিয়ে দিলেন। এভাবে সেদিন আমার বিল জমা দেওয়া হল না।
আগষ্টের এক তারিখে আমি সুখচর
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জইন করলাম। সেদিন ছিলো বৃহস্পতি বার। সেদিন আমি বগুড়া পাড়ার বেপারিদের নৌকায় চড়ে ময়নবড়ি গিয়েছিলাম। নৌকা স্কুলের পাশ দিয়েই যায়।
আগের তিক্ততার কথা মনে করে আমি হাটে না গিয়ে নৌকা থেকে নেমে স্কুলে জইন করলাম।
স্কুলের পাশেই দোয়াত আলি নামের একজন লোকের বাড়িতে আমাকে নিয়ে গিয়ে রিয়াজ পণ্ডিত
লজিং ঠিক করে দিলেন। আমি বেডিংপত্র নিয়ে
গিয়েছিলাম। স্কুল ছুটির পর আমি বেডিং নিয়ে দোয়াত আলি চাচার বাড়িতে উঠলাম।
বাড়িটা স্কুল থেকে একটু উত্তর দিকে ছিল।
দোয়াত আলী চাচার বাড়িতে ওসমান
নামের একজন ছাত্র আগে থেকেই লজিং ছিল। সে ‘খারেজি’
মাদ্রাসায় পড়ত। আমরা দু’জন এক সাথেই সেই
বাড়িতে থাকতে লাগলাম। প্রথম রাতটা ভালো ভাবেই কাটল। পরের দিন রাতে শোয়ার সময়
ওসমান বলল- স্যার, আপনি যেখানে শোয়েছেন ঠিক তার নিচেই একটি
কবর আছে। ভয় করার কিছুই নেই। অনেক দিনের পুরানো কবর। কালই বলা উচিত ছিল। কিন্তু
মনে ছিল না। তাই বলা হয়নি।
অনেক দিনের পুরাণা কবরের কথা শুনে
আমি কথাটায় তেমন গুরুত্ব দিলাম না। কিন্তু হ্যারিকেন নিভিয়ে শোয়ার পর আমার ভয়
ভয় করতে লাগল। আমি যেখানে শোয়ে আছি, ঠিক তার
নিচেই কবর! তার মানে আমি একটা মৃত লাশের ওপড় শোয়ে আছি! এ-রকম দুঃশ্চিন্তায় রাতে আমার ঠিকমত ঘুম হলো না। দুই তিন দিন পরেই অবশ্যে অভ্যস্ত
হয়ে পড়েছিলাম। পরে আর কবরের কথা মনেই হতো না।
দোয়াত আলীকে আমি চাচা বলে ডাকতাম। তিনি লোক হিসাবে মন্দ ছিলেন না। আমি চাচা বলে ডাকলেও তিনি আমার সাথে ছোট ভায়ের
মতো ব্যবহার করতেন। আমি সুখচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেককে ছাত্র হিসাবে পেয়েছিলাম
যদিও শুধু একজন ছাত্রের নাম এখন মনে আছে। আব্দুস সামাদ।
আব্দুস
সামাদ ময়নবড়ি অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তি এসাহাক মুন্সী সাহেবের ছেলে ছিলো। সে তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ত। ছাত্র হিসাবে সে খুবই ভালো ছিল। সে এখন ঐতিহ্যমণ্ডিত বরপেটা
মাধব চৌধুরি মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। ছোট থাকতে দেখেছিলাম। তাই নাম
এবং চেহেরা মনে ছিল না। একজন ভদ্ৰ এবং মার্জিত স্বভাবের ছাত্র হিসাবে সামাদের কথাটা
অবশ্যেই আমার মনে ছিল।কয়েক বৎসর আগে আব্দুস সামাদের সাথে আমার বরপেটায় সাক্ষাৎ হয়েছিলো। সে আমাকে দেখে বলেছিলো- স্যার, আমাকে চিন্তে পারছেন?
আমি বললাম- নাতো! কে তুমি?
সামাদ বলল- আমার নাম আব্দুস সামাদ। সুখচরের এসহাক মুন্সির ছেলে। সুখচর স্কুলে আপনি আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে কয়েক মাস
পড়িয়েছিলেন।
কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। আমি উৎসাহিত হয়ে উঠলাম- অ’ তুমি? তুমিই তাহলে সেই ছোট্ট ভদ্র ছেলেটা! তোমার কথা আমার অবশ্যেই মনে আছে; কিন্তু
চেহেরা মনে ছিল না। তুমি পরিচয় না দিলে আমি চিনতে পারতাম না।
সামাদকে একজন অধ্যাপক হিসাবে দেখে
আমি খুবই গর্ববোধ করেছিলাম সেদিন। তবে সে যে পদে রয়েছে, কয়েক দিন পড়িয়েছিলাম বলে, তাকে আমি তুমি বলে সম্বোধন
করতে দ্বিধাবোধ করি। এদিকে ছাত্র হিসাবে আপনি বলে সম্বোধন করতেও মন চায় না। তাই দেখা হলেও খুব একটা কথা বলি না।সামাদ যদি আমার এই লেখা পড়ে থাকে, তাহলে সে-ই আমাকে সমিধান দিলে ভালো হয়, তাকে আমি কি বলে সম্বোধন করব!তুমি, না আপনি!
আমার আরও একজন ছাত্রের কথা মনে পড়ে
গেল। তাকে আমি পূব বালিকুরি পাঠার প্ৰাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করাকালীন
পড়িয়েছিলাম। নাম ওসমান। সে একদিন বাঘবর বাজারে আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল- স্যার, ভালো আছেন।
স্যার বলে সম্বোধন করাতে লোকটি যে
এক সময় আমার ছাত্র ছিল অবশ্যেই বুঝতে পারলাম। কিন্তু চিনতে পারলাম না। কালো।
দাড়ি গোঁফ দিয়ে এক রকম মস্তান টাইপের চেহেরা।
আমি বললাম- তোমাকে তো চিনতে পারলাম
না?
লোকটি বলল- আমি ওসমান। বালিকুরি
পাথার এলপিতে আমাকে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়িয়েছিলেন।
নাম বলার সাথে সাথে ওসমানকে আমি
চিনতে পাড়লাম। কালো নাদুসনুদুস স্বাস্থ্যবান একটি ছেলের কথা মনে পড়ে গেল আমার।
বললাম- হ্যাঁ, মনে পড়েছে।অনেকদিন পর দেখা
হয়েছে তো, তাই চিনতে পারিনি।তুমি এখন কি করছ? বাড়ির খবর বল।
ওসমান প্রাইমারি পাস করার পরেই পড়া
ছেড়ে দিয়েছিল। তার বাবা মা কয়েক বৎসর আগে এন্তেকাল করেছে। সে বিয়ে করেছে। তখন সে দুই সন্তানের পিতৃ
ছিলো।
গড়লা বালক প্রাথমিক বিদ্যালয়
আমি বিদ্যালয় পরিদৰ্শক ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে যোগাযোগ রেখেই চলছিলাম।আমার জুলাই মাসের মাসিক মায়নার বিল জমা না করার জন্য তিনি খুবই তৎপর হয়েছিলেন
আমার বদলির জন্য। তাঁর তৎপরতার জন্যই খুব কম সময়ের ব্যবধানে সেপ্তেম্বর মাসের ২৮ তারিখে আমার বদিলি (ট্রেন্সফার) হলো গড়লা বালক নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে আরও একটি বালিকা বিদ্যালয়
ছিল। তাই একটির নাম বালক এবং অপরটির নাম বালিকা বিদ্যালয় রেখেছিল। বালিকা
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মেসের আলি স্যার। আমি অক্টোবরের ১ তারিখে গড়লা
বালক নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করলাম। সেখানে প্রধান শিক্ষক ছিলেন ওমর আলী
মোল্লাহ। সহকারি শিক্ষক হিসাবে ছিলেন সুফিয়া বেগম। সুফিয়া বেগম আমার থেকে
সিনিয়র ছিলেন। তাই আমি তৃতীয় সহকারি শিক্ষক হিসাবে যোগদান করলাম।আমি চাকরি জীবনে সাক্ষাৎ পাওয়া ভালো মানুষের
তালিকায় আমি ধর্মেশ্বর শর্মার নামটা সব সময় উপড়ে রাখি।কারণ তাঁর তৎপরতার জন্যই আমি খুব তারাতারি বদলি হতে পেরেছিলাম। এমনকী বদলির জন্য তিনি আমার কাছ
থেকে একটি টাকাও নেননি। এটা বলতে গেলে, এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার!ধর্মেশ্বর শর্মার বদান্যতার জন্যই আমি বেসিক ট্রেইনিঙে যেতে
সক্ষম হয়েছিলাম। সে আমি কথা পরে বলতেছি।
গড়লা আমার পরিচিত জায়গা। তাই আমার
ভাল না লাগার কোনও হেতু ছিল না। গড়লা চাচরা এম, ই
মাদ্রাসার স্যারদের সাথেও আবার দেখা হলো। দুই চারজন চেনাজানা সহপাঠীর সাথেও দেখা
হলো। ওমর আলী মোল্লাহ স্যারের সাথেও আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর আলীগাঁও নিন্ম প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে ওমর আলী স্যারের সাথে অনেক দিন শখের ক্লাস করেছিলাম। তাই তিনি আমাকে ভালো ভাবেই জানতেন। ছাত্ররাও আমাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করল। সুখচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির পর যে ছন্দ হারিয়েছিলাম গড়লা বালক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
যোগদান করার পর সেই ছন্দ আবার ফিরে পেলাম। নতুন উদ্যমে আবার শিক্ষকতা শুরু করলাম।
সেদিন লেহি নিন্ম প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে শিক্ষক কেন্দ্রসভা ছিল। শিক্ষক কেন্দ্রসভায় তখন শিক্ষকরা পাঠদান করতেন। সেদিন যার পাঠদান করার কথা ছিল, তিনি অনুপস্থিত
থাকায়, ওমর আলী স্যার আমাকে পাঠদান করতে বললেন। আমি তখনও কোন প্রশিক্ষণ নেইনি। তাই কেন্দ্র সভার সম্পাদক রবিউল্যা সাহেব বললেন-ইনি প্রশিক্ষণ নিয়েছে নাকি?
ওমর আলী স্যার বললেন- নেয়নি। তবুও
অসুবিধা নেই। দিতে পারবে।
পাঠদান দিলাম। পাঠদানের পরে পাঠের
ওপড় সমালোচনা হয়। সবাই ভালো সমালোচনা করলেন। কোন রকমের প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভাল পাঠদান দিয়েছি বলে সবাই প্রশংসা করলেন। আমি উৎসাহিত
হলাম।
বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। রেজাল্টও দেওয়া হলো। এর মধ্যে খবর পেলাম শিক্ষকদের বেসিক ট্রেংনিঙে পাঠাবে।
খবর দিলেন আমাদের কেন্দ্র সম্পাদক
রবিউল্যা স্যার। আমি বরপেটা গিয়ে ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি
বললেন- আপনার নামও আমি লিষ্টে দিয়েছি। দেখা যাক কি হয়!
আমি বললাম- স্যার, যেভাবেই হোক, আমাকে প্রশিক্ষণে পাঠাতে হবে।
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- নিশ্চিন্ত
থাকুন। প্রশিক্ষণে যেতে পারবেন।
একদিন খবর পেলাম প্রশিক্ষণের তালিকা
বের হয়েছে। খবর নেওয়ার জন্য বরপেটা এলাম।
বরপেটা এসে দেখি তালিকা (লিস্ট) বেড়িয়েছে ঠিকই, তবে সেই তালিকায আমার নাম নেই।
আমি ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে সাক্ষাৎ
করে বললাম- লিষ্টে আমার নাম নেই, স্যার।
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- হ্যাঁ, লিষ্ট আমিও দেখেছি। আমিতো নাম দিয়েছিলাম। ডি, আই স্য়াৰ সম্ভবতঃ নাম কেটে দিযেছে।
আমি বললাম- এখন কি হবে, স্যার?
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- সামনের বছর পাঠিয়ে দিব। চিন্তা করবেন না।
আমি বললাম- এই বৎসরই পাঠাতে হবে, স্যার।
লিষ্ট বেড়িয়ে গেছে। ধর্মেশ্বর
শর্মা বললেন- এখন আর উপায় নেই।
আমি খুব পীড়াপীড়ি করতে লাগলাম।
তখন ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- আচ্ছা, চলুন,
এডিশ্বনাল ডি, আই স্যারের কাছে গিয়ে দেখি কিছু করতে পারি কি-না।
এডিশ্বনাল ডি, আইর কাছে গিয়ে কথাটা বলাতে তিনি বললেন- লিষ্ট বেড়িয়ে গেছে।
এখন কি করে সম্ভব?
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- দেখুন কিছু
করা যায় কিনা। আমাকে খুব জোর দিয়ে ধরেছে।
এটা ওটা অনেক কথার পর এডিশ্বনাল ডি, আই কেরানিকে প্রশিক্ষণের তালিকা নিয়ে আসতে বললেন। কেরানি
প্রশিক্ষণের তালিকা নিয়ে এল। তখন ছেঙা, হাউলি, রঙিয়া, কোকরাঝার প্রভৃতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বরপেটা
মহকুমার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হত। একটা অর্ডারেই সবার নাম থাকত। এডিশ্বনাল ডি, আই
রঙিয়া বেসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাদের নাম পাঠিয়ে ছিল তাদের একেবারে তলে আমার
নাম হাতে লিখে দিয়ে কেরানিকে বললেন- যান, লেটু করে কপি বের
করে নিয়ে আসুন। এক্ষুণি আনবেন।(বিঃ দ্ৰঃ-আমার কাছে এখনও সেই অর্ডারের কপি আছে।
সেখানে আমার নামটা হাত দিয়ে লেখা রয়েছ।)
তখন এখনকার মতো ফটোষ্টেট অথবা
ডিটিপির সুবিধা ছিল না। তাই কোনো অর্ডার প্রথমে টাইপ করা হতো এবং সেই টাইপ করা
অর্ডারে অফিসারের দস্তখত হওয়ার পরে ‘লেটু’
করে প্রয়োজনীয় কপি বের করা হতো।
কেরানি তৎক্ষণাৎ লেটু করে কপি বের
করে এনে ডি, আই স্যারের হাতে দিল। ডি, আই স্যার একটা কপি আমার হাতে দিয়ে বললেন- যান, ফেব্রুয়ারির এক তারিখে রঙিয়া গিয়ে জইন করবেন।
রঙিয়া বেসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দশ মাস
(রঙিয়া বেসিক ট্রেইনিং সেণ্টার)
এডিআইর কথা মতোই আমি ফেব্রুয়ারির
এক তারিখে রঙিয়া বেসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছোলাম। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পৌঁছোতে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো। সেদিন আমরা মাত্র চারজন পৌঁছেছিলাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেদিন শনিবার ছিল। তাই সম্ভবতঃ অনেকে
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসেনি। এডিআই স্যার আমাকে ফেব্রুয়ারির এক তারিখে
যোগদান করতে বলেছিলেন। তাই আমি এক তারিখেই পৌঁছেছিলাম। আমার মতো আরও তিনজন এসেছিলেন। টঙ্কেশ্বর বরা, হিলারিউস এক্কা এবং মিনারাম পাটর। তিন জনই
নগাঁও জেলার লোক ছিলেন। টঙ্কেশ্বর বরা (চাপানালা), হিলারিউস এক্কা (হাতীগাঁও চাহ বাগান, মিচা) এবং মিনারাম পাটর ১ নম্বর কাকীর লোক ছিলেন।
তিন জনই বয়েসে আমার থেকে বড় এবং
খোলামেলা ও সৎ স্বভাবের ছিলেন। হিলারিউচ এক্কা খুবই শান্তশিষ্ট স্বভাবের ছিলেন এবং প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। চুপচাপ অন্যের কথা শুনতেন। মিনারাম পাটরও খুবই অমায়িক এবং ভদ্র ছিলেন। রঙিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভেতরে একমাত্র সে-ই চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আমরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে
দশ মাস ছিলাম। এই দশ মাসই টঙ্কেশ্বর বরা এবং হিলারিউস এক্কা আমার
রোমমেট ছিলেন। পরবর্তীতে পালহাজির
আব্দুল কদ্দুস আমাদের রোমমেট হয়েছিলেন।
টঙ্কেশ্বর বরা লোক হিসাবে মন্দ ছিলেন না। মাঝেমধ্যে অবশ্যে মদ খেতো। কিন্তু মদ খেয়ে মাতলামি
করতেন না। চুপচাপ শোয়ে থাকতেন। নিজের দোষ কখনও পরের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করতেন না। একদিন তার প্রমাণও পেয়েছিলাম আমি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগদান করার দু'মাস পরে একদিন আমার একটু পেটের সমস্যা হয়েছিল। দুপুর রাতে আমি
‘লেট্রিনে’ যাচ্ছি। লেট্রিনটা মূল
আবাসগৃহ থেকে একটু দূরে ছিল। তাই টঙ্কেশ্বর বরা আমার সাথে গিয়েছিলেন।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনেক নারকেল গাছ
ছিল। সেই নারকেল গাছের তল দিয়ে লেট্রিনে যেতে হতো। আমার লেট্রিন লেগেছে। তাই আমি
একটু দ্রুত চলে গেলাম। লেট্রিন থেকে ফিরে এসে দেখি টঙ্কেশ্বর বরা দুটি নারকেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
টঙ্কেশ্বর বরার হাতে নারকেল দেখে
আমি জিজ্ঞেস করলাম- নারকেল কোথায়
পেলেন?
তিনি বলল- গাছের নিচে পড়ে ছিল। তাই
কুড়িয়েছি।
এখন এগুলো কি করবেন?
কি আর করব! রোমে নিয়ে যাব।তিনি বললেন।
আমি বললাম- ঠিক আছে। কাল সকালে চৌকিদারকে দিয়ে দিলেই হবে।
আমরা নারকেল নিয়ে রোমে এলাম। সেই নারকেল আর চৌকিদারকে দেওয়া হয়নি। আমরা নিজেরাই
সেই নারকেল খেয়ে ছিলাম।
পরে আরও কয়েকদিন নারকেল খাওয়ার পর
কথাটা অন্যান্য রোমের প্রশিক্ষার্থীরাও টের পেয়ে গেল এবং অনেকেই নারকেল খাওয়া
শুরু করে দিলো।
কথায় আছে না, পাপ ছাড়ে না বাপকে। পাপ
কক্ষনও লুকানো থাকে না। নারকেল খাওয়া কথাটা প্রিন্সিপালের কানে গেল। প্ৰশিক্ষণ
কেন্দ্ৰে একটি মন্ত্ৰী সভা ছিলো। প্ৰত্যেক মাসে মাসে মন্ত্ৰী সভা গঠন করা হতো। সেই মন্ত্রীসভায় বিভিন্ন বিভাগের মন্ত্রী ছিলো। যেমন, প্ৰধান মন্ত্ৰী, গৃহমন্ত্রী, সাফাই মন্ত্ৰী, যোগান মন্ত্ৰী, স্বাস্থ্যমন্ত্ৰী, প্ৰাৰ্থনা মন্ত্ৰী প্ৰভৃতি।
একদিন প্রিন্সিপাল স্যার হোস্টেলে এসে কে কে নারকেল খেয়েছে প্ৰধান মন্ত্ৰীকে তার তালিকা করে দিতে বললেন। সেবার প্ৰধান মন্ত্ৰী ছিলেন
শালবারীর পানপারার ইসাহাক আলী আহমেদ। প্রধান মন্ত্রী
আবার প্রতিটি রোমের একজনকে নাম লিখে দেওয়ার দায়িত্ব দিলেন। আমাদের রোমের নাম লিখার দায়িত্ব
দেওয়া হলো টঙ্কেশ্বর বরাকে। আমরা রোমের সবাই নারকেল খেয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন
টঙ্কেশ্বর বরা আমাদের রোমের অন্য কারও নাম লিখে দেন নি। শুধু নিজের নামই লেখে
দিয়েছিলেন। তখন এই বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করাতে তিনি বলেছিলেন- দোষটা আমারই। আমি
নারকেল কুড়িয়ে না আনলে আপনারা নিশ্চয়ই খেতেন না। তাই আমি আপনাদের নাম দিইনি। শাস্তি
যদি পেতে হয়, আমি একাই পাব। আমার দোষের ভাগী আপনারা কেন হবেন?
অবশ্যে প্রিন্সিপাল স্যার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। শাসিয়েই সেবারের মতো সবাইকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে কেউ আর নারকেল খায়নি। আমরাও খাইনি।
আমরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছেনোর পর আমাদের দেখে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কেরাণি সৈয়দ
হাসিমুদ্দিন সাহেব একটি রোমের দরজা খোলে দিয়ে
বললেন- আপনারা আজ এখানে
থাকুন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আপনারা নিজেরাই করতে হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কোন রাঁধুনি নেই। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের
নিয়ম অনুসারে প্রশিক্ষার্থীরাই রেঁধে-বেড়ে খেতে হয়। চাল-ডাল অবশ্যে কেন্দ্রই
দিবে। আপনারা শুধু দল করে রেঁধে-বেড়ে খেতে
হবে। কিন্তু আজ চালের ব্যবস্থাও আপনারাই করতে হবে। কাল আমি চালের ব্যবস্থা করে
দিব।
আমরা বললাম- হাঁড়ি-পাতিল কোথায়
পাব?
হাসিমুদ্দিন সাহেব বললেন- আসুন আমার সাথে।
আমরা তাঁর সাথে গেলাম। তিনি ষ্টোররোম থেকে হাঁড়ি-পাতিল বের করে দিলেন। আমরা বাজারে গিয়ে বাজার করে এনে আলো সিদ্ধ দিয়ে ভাত রাঁধলাম। সুহাগমণি চালের ভাত আলু ভর্তা দিয়ে সেদিন খুবই
মজা করে খেয়েছিলাম। কথায় বলেনা, ক্ষিদেয় চিনে না
সুদা! তাই হয়েছিল হয়তো সেদিন। এখনও সেই ভাতের স্বাদ মুখে লেগে আছে। পরের দিন অর্থাৎ রবিবারে অবশ্যে কেরানিই
চাল-ডালের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন এবং ভাত রাঁধার সময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ কামেশ্বর
কলিতা এবং প্রশিক্ষক (ইন্সট্রাক্টর) নগেন ভট্ট আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন। তাঁরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আবাসগৃহে(কোয়ার্টার)ই থাকতেন।
পরের দিন ছিল রবিবার। রবিবারেও কিছু
প্রশিক্ষার্থী পৌঁছোল। তাঁদের মাঝে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু আব্দুল জব্বারও ছিল। সোমবারে প্রশিক্ষণ
কেন্দ্র একেবারে সরগরম হয়ে উঠল।
সোমবারেই একটু দেরি করে প্ৰশিক্ষণ
কেন্দ্ৰের একটি হলঘরে আমরা সমবেত হলাম। সেখানে অধ্যক্ষ কামেশ্বর কলিতা, ইন্সট্রাক্টর নগেন ভট্ট, শচীন ভট্ট এবং
অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরিচয় পর্বের পর
মন্ত্রীসভা গঠন করে দিলেন। প্রধান মন্ত্রী হলেন উমা বৈশ্য (পচরীয়া, দাদরা), যোগান মন্ত্রী এসাহাক আলী আহমেদ(পানপারা), জ্যোতিষ দাস, প্রার্থনামন্ত্রী(বামুন্দি) এবং আমাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
দায়িত্ব দিলেন।আমি দেখতে একটু রোগা ছিলাম। তাই কামেশ্বর কলিতা ঠাট্টা করে বলেছিলেন-
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে কিন্তু রোগামন্ত্রীর মতো দেখাচ্ছে।
আমাদের বরপেটার প্রশিক্ষার্থীদেরই কে এক জন বলেছিলেন- মরিচ ছোট হলে কি হবে! জ্বাল আছে, স্যার।
উমা বৈশ্য পচরীয়ার লোক ছিল। দেখতে
প্রায় গোপীনাথ বরদলুইর মতো ছিলেন। তাই অনেকে ঠাট্টা করে তাঁকে বরদলুই বলত।
এসাহাক আলী শালবাড়ির পানপাড়ার লোক
ছিল। একটু বেঁটে ছিলেন; তবে স্বাস্থ্যবান ছিলেন। জ্যোতিষ দাস গুয়াহাটী বোর্ডের শিলগুরি বামূন্দির লোক ছিলেন। তিনি শিল্পী স্বভাবের ছিলেন। দাড়িগোঁফ কামানো, ফিটফাট বাবু হয়ে
থাকতেন। তিনি গান গাইতে জানতেন। কণ্ঠস্বরও মধুর ছিলো। তাই তাঁকে প্রার্থনা মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অন্যান্য আরও মন্ত্রী ছিল। যেমন, খাদ্যমন্ত্রী,
শ্রেণীকক্ষ মন্ত্রী, সাফাই মন্ত্রী প্রভৃতি। সেই মন্ত্রীদের সবার নাম এখন মনে নেই।
আমি রোজ সকালে রোগীর তালিকা করতাম
এবং অধ্যক্ষ-এর সঁই নিয়ে রঙিয়া
পিএইসসিতে ওষুধ আনতে যেতাম। সেখান থেকে ঔষধ
এনে বিলি করে দিতাম। আমি পর পর দুই মাস স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলাম। দৈনিক সঁই নেওয়ার
দরুন অধ্যক্ষ কামেশ্বর কলিতার সাথে
আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চৌহদ্দিতে একটি
প্রার্থনা হল ছিল। আমরা সন্ধ্যেয় প্রার্থনা হলে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করতাম।
প্রার্থনা শেষে কোনো নতুন খবর থাকলে যোগাযোগ মন্ত্রী আমাদের পড়ে শুনাতেন।যোগাযোগ মন্ত্রী মনে হয়, গুয়াহাটী
বোর্ডের লোছের গর্গেশ্বর পাটোয়ারী ছিলেন। সব শেষে ভিজানো বুট পরিবেশন করা হতো। আমরা মুসলিম প্রশিক্ষার্থীরা ভিজানো বুট
খেতে পারতাম না। তাই সেখানে না খেয়ে পরে সিদ্ধ করে খেতাম। অসমিয়া হিন্দুরা
ভিজানো বুট খুবই মজা করে খেতেন।
আমরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পঁচাশীজন
প্রশিক্ষার্থী ছিলাম। বরপেটা জেলার ছিলাম পঁচিশ জন। আমরা সকাল বেলা উঠে
প্রাতঃকৃত্য সমাপন করে চা সহয়োগে জলয়োগ করতাম। চা খাওয়ার পর সাফাই এবং সাফাইর পরে স্নান-গোসল করে খেয়েধেয়ে ক্লাসে
যেতাম। রান্নাবান্নার জন্য এক সপ্তাহের জন্য ছয়জনের দল করে দেওয়া হত। তাঁরাই রান্না-বান্না করতেন। পরিবেশনের জন্য ছয়জন প্রশিক্ষার্থী
নির্ধারিত থাকত। তাঁরা খাদ্য পরিবেশন করতেন। এসব কাজ ‘রোটেশ্বন’ করে করা হতো। আমি রান্নার দায়িত্বে থাকলে ডাল রান্নার দায়িত্ব আমার ওপড় পড়ত। আমার ডাল রান্না ভালো হতো বলে
সবাই প্রশংসা করতেন।
আসলে রান্নার বিষয়ে আমার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও ছিল না।রান্না তো দূরের কথা বাড়িতে ভাত বেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতাও
আমার ছিল না। প্রয়োজনের তাগিদে অন্যদের দেখে দেখে রান্নার কাজ কিছুটা শিখে নিয়েছিলাম। ডাল রান্নাতো নয়, প্রথমে
জল ও প্রয়োজন মতো নুন দিয়ে ডাল সিদ্ধ
করতাম। ডাল সিদ্ধ হলে একটি হাড়িতে তেল ঢেলে জিরা, আদা,
পেয়াজ, হলদি প্রভৃতি দিয়ে জ্বাল দিতাম এবং ফেনা মরার পর দুই তিন মগ সিদ্ধ ডাল
এনে সেখানে ঢেলে দিয়ে একটু নেড়েচেড়ে সেই ডাল সিদ্ধ ডালের হাঁড়িতে ঢেলে দিতাম।
হয়ে গেল ডাল রান্না ! সবাই এভাবেই রাঁধতেন। কিন্তু আমার ডাল রান্না বোলে ভালো হতো। আসলে ডাল রাঁধতে হলে প্রয়োজন মতো জ্বালের প্রয়োজন হয়। জলও একবারেই প্রয়োজন মতো দিয়ে দিতে হয়। জল গরম হওয়ার পরে আবার ঠাণ্ডা জল দিলে ডাল সুস্বাদ হয় না।
জ্বালের দিকে আমি খুবই লক্ষ্য রাখতাম। জ্বাল ঠিকমত হওয়ার জন্যই হয়তো আমার রান্না
ডাল ভালো লাগত।
অধ্যক্ষ এবং প্রশিক্ষকরাঁ আমাদের সাথে ছাত্রের মতো নয়, বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। দুই তিন মাস পড়ানোর পরে আমারদের স্কুলে স্কুলে গিয়ে ক্লাস নিতে হতো। যাকে বলা হতো আদর্শ পাঠদান। আদর্শ পাঠদানের জন্য
রঙিয়া সহর এলেকার কয়েকটা স্কুল নির্ধারিত ছিল। তাই আমরা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে পাঠদান করতাম। যে স্কুলে পাঠদান করতাম সেই স্কুলের স্যারদের সাথে
খাতির রাখতে হতো। না হলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রদের লেলিয়ে দিতেন। তখন ছাত্ররা আমাদের কথা মানত না। গণ্ডগোল করত।
প্রশিক্ষকরাঁ আমাদের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করতেন। পাঠদানের সামগ্রিক দিক বিবেচনা
করে এ, বি, চি গ্রেড দিতেন। ছাত্রেরা গণ্ডগোল করলে
গ্রেড ভালো দিতেন না। তাই আমরা সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষকদের চাহ খাইয়ে খাতির জমাতাম। স্কুল এবং
পাঠদানের শ্রেণী প্রশিক্ষকরাঁ নির্ধারণ করে দিতেন। পাঠ
আমরা নিজেদের ইচ্ছে মতো নির্বাচন করতে পারতাম।
চূড়ান্ত (ফাইন্যাল) পাঠদানের দিন আমি খুবই হতাশ হয়েছিলাম। সেদিন বাইরে থেকে
পর্যবেক্ষক এসেছিলেন। আমি সেদিন পাঠদানের বিষয় নির্বাচন করেছিলাম বসন্ত (Small Pox)। কারণ তখন দেশে খুবই
বসন্তের প্রকোপ ছিল।শত শত লোকের মৃত্যু হতো তখন কলেরা ও বসন্ত রোগে। তাই তখন কলেরা ও বসন্তের ভেকসিন দেওয়া হতো মাঝেমধ্যে। আমি নিজেও কয়েকবার ভেকসিন নিয়েছিলাম রোগ প্রতিষেধক হিসাবে। আমি দেখা মতে, ১৯৬৭ সাল থেকে এই রোগের প্ৰাদুৰ্ভাব বেড়েছিলো।আমাদের নিজের কয়েকজন আত্মীয়রও মৃত্যু হয়েছিলো বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে। ১৯৭৪ সালে সমগ্ৰ ভারতে ১,৮৮,০০০ লোক বসন্ত রোগে আক্ৰান্ত হয়েছিলো বলে খবরও বেড়িয়েছিলো। তাই সজাগতার জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন। টীকাকরণ করা হতো। সাথে সাথে বসন্ত রোগ নির্মূলের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন। জায়গায় জায়গায় দেয়াল লিখন, হর্ডি,বেনার, পোস্টারও টানিয়ে দিতেন সরকার। পাঠ্যপুস্তকেও পাঠ ছিলো বসন্ত রোগের
ওপড়ে।তৃতীয় শ্রেণীর সমাজ অধ্যয়নে বসন্তের ওপড় ভিত্তি করে ‘বসন্ত’ নামের একটি পাঠ ছিল। আমি সেই
বসন্ত নামক পাঠটি নির্বাচন করেছিলাম পাঠদানের জন্য। পাঠদানের মূল চারটি ভাগ ছিলো। পূৰ্বজ্ঞান
পরীক্ষা, প্ৰয়োগ,মূল্যায়ন ও গৃহকাম।সব ঠিকঠাকই চলছিল। তবে পাঠ প্রয়োগের সময় বিশৃংখলা দেখা
দিল।
পাঠ বুঝিয়ে আমি প্রশ্নোত্তর বোর্ডে লিখে দিচ্ছি। ছাত্ররা বোর্ডে দেখে নিজের খাতায় লিখে নিচ্ছে। সমস্যা হলো, বোর্ডের লিখা নিয়ে। কেউ কেউ বুঝতে পারছে না বোৰ্ডের লিখা। তাই জিজ্ঞেস করছে, ও-টা কি লিখেছেন,
স্যার? সে-টা কি স্যার? যতদূর
সম্ভব আমি স্পষ্টভাবেই লেখেছি। তবু না বুঝাটা বড় কথা নয়। তাই আমি বলছি, কোনটা? ছাত্রটি বলছে সেটা, স্যার।
আমি বলছি, সেটা, কোনটা? তখন ছাত্রটি জায়গা থেকে উঠে বোর্ডে এসে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ‘এইটে স্যার।’ সময়ের সাথে সাথে না বুঝা ছাত্রের সংখ্যা বেড়ে চলল ক্রমাগতভাবে। ফলে শ্রেণীকক্ষে এক বিশৃংখল পরিস্থিতি
সৃষ্টি হয়ে গেল। পাঠদানের সময় কোনো ছাত্রকে ধমকানো অথবা তিরস্কার করা যাবে না।
তাই আমি অসহায়ভাবে শুধু বুঝানোর চেষ্টা করে চলেছি। কিন্তু কোনো মতেই শ্ৰেণীকোঠা
নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।
এক সময় আমি ঘেমে নেয়ে উঠলাম। আজ
বুঝি সন্মান আর থাকবে না। ফেল করব আদর্শ পাঠদানে। কথায় আছে না, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো। সেই বিশৃংখল পরিস্থিতির
মাঝে পর্যবেক্ষক এলেন। তিনি এসে ক্লাসের বিশৃংখল পরিবেশ দেখতে
পেলেন। তিনি কিছুক্ষণ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ছাত্রদের বললেন- অতো গণ্ডগোল
করছ কেন? কি বুঝতে পারছ না। লিখাতো স্পষ্টই আছে?
শান্তভাবে বসে লিখ। ছাত্রদের এভাবে বলেই পর্যবেক্ষক আমার দিকে
তাকিয়ে বললেন- শ্রেণীকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করুন।
পর্যবেক্ষক চলে গেলেন। পাঠদানের আগে আদর্শ পাঠদানের টোকা লিখে নিতে হয়। আমিও লেখে নিয়েছিলাম।
পর্যবেক্ষক চলে যাওয়ার পর আমি সেই টোকা শ্রেণীকক্ষে
রেখেই ক্লাস থেকে বেড়িয়ে এলাম। আমার অবস্থা তখন দেখার মতো! মলিন চিন্তাক্লিষ্ট মুখমণ্ডল
। আমি মাটিতে, না
শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছি বলতে পারছি না। তখন প্রশিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্লাস থেকে
বেড়িয়ে এসেছে।
সবার হাতে হাতে পাঠটোকা। আমি তখন
একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম- কেন, পর্যবেক্ষক পাঠটোকা
নিয়ে যায়নি?
না, নেয়নি।
সে বলল- অফিসে গিয়ে নিজেরাই জমা দিতে হবে।
আসলে আমি ভেবেছিলাম পর্যবেক্ষকই
পাঠটোকা নিয়ে যাবে। আমি শ্রেণীকক্ষ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছি বলেই হয়তো তিনি
আমার পাঠটোকা নিয়ে যায়নি। পর্যবেক্ষক পাঠটোকা না নিয়ে যাওটাই ছিল আমার হতাশার
অন্যতম কারণ। আমি তখনই শ্রেণীকক্ষ থেকে পাঠটোকা এনে অফিসে জমা দিলাম।
ফেল করিনি, পাসই করেছিলাম। নম্বরও ঠিকই পেয়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরেছিলাম।
আসলে আমার পাঠ প্রদানে কোনো ত্রুটি ছিল না। বোর্ডের লেখাও ঠিকই ছিল। বোর্ডে লিখলে
সে রকম পরিস্থিতি হওয়াটাও স্বাভাবিক। তাই পর্যবেক্ষক আমাকে পাস নম্বর দিয়েছিলেন। আসলে আদর্শ পাঠদানের জন্য আমার পাঠ নির্বাচনই ভুল ছিল। আমার পাঠের বিষয়বস্তু
আসলেই জটিল ছিল। ফাইন্যাল পাঠদানের দিন জটিল পাঠ নির্বাচন করাটা আমার জন্য মোটেই ঠিক হয়নি।
‘লেগে
থাকলে রেড়ি গাছেও সার হয়।’এই কথার প্রমাণ আমি প্রশিক্ষণে থাকাকালীনই
পেয়েছিলাম। আমরা পঁচাশীজন প্রশিক্ষার্থী ছিলাম। দৈনিক প্রায় আধা কুইণ্টল চালের প্রয়োজন হতো। আমরা এক মারোয়ারির দোকান
থেকে চাল আনতাম। মাঝেমাঝেই মারোয়ারি খারাব চাল দিত। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা আর মারোয়ারির দোকান থেকে চাল আনব না। হাট থেকে চাল কিনে
আনব।
একদিন আমরা কয়েকজন প্রশিক্ষার্থী সকাল নয়টা নাগাদ কুমারিকটা গেলাম চাল কিনতে। চালের বাজার তখনও ভালোভাবে শুরু হয়নি। তাই আমরা ঘুরে ঘুরে বাজার দেখছি। আমরা ঘুরতে ঘুরতে সবজি
বাজারে এলাম। তখনই একজন সত্তরোর্ধ মুসলমান বৃদ্ধ বাঁখারিতে করে দুই ছড়ি বিচে কলা এনে সবজি বাজারে নামালেন৷ তখন মনে হয়, গ্ৰীষ্মকাল চলছিলো। কলার ছড়ি দু’টিও বড় বড় ছিলো। তাই বৃদ্ধ লোকটি খুবই পরিশ্রান্ত হয়েছিলেন এবং ঘেমে নেয়ে উঠেছিলেন। আমি বৃদ্ধের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- চাচা, কলা বাড়ির নাকি?
না। বৃদ্ধ বললেন- আমি কলার বেপার
করি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে কলা সংগ্রহ করে বাজারে এনে বিক্রী করি।
শুধু বিচে কলাই দেখছি। আমি বললাম-
অন্য কলা নেই?
না, আমি
শুধু বিচে কলার বেপারই করি।
শুধু বিচে কলার বেপার করার কথা শুনে
আমি একটু আচরিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- কেন,অন্য কলার বেপার করেন না কেন?
না, অন্য
কলার বেপার করি না। বৃদ্ধ বললেন- প্রায় ত্রিশ বৎসর যাবত বিচে কলারই ব্যবসা করে আসছি।
এতে আপনার সংসার চলে?
ত্রিশ বৎসর তো চলে আসছি।
এখন দেখুন তো, লেগে থাকলে রেড়ি গাছেও যে সার হয়, কথাটা ঠিক কিনা?
একদিন লেইজারের সময় রোমে এসে দেখি হিলারিউস এক্কা দুধ
খাচ্ছেন। দুদিন পর দেখি টঙ্কেশ্বর
বরাও খাচ্ছেন। তখন আমি জিজ্ঞেসা করলাম- দুধ কোথায় পেলেন?
টঙ্কেশ্বর বরা বললেন- আমাদের প্রার্থনাগৃহের সাথে যে বাড়িটা আছে সেই বাড়ি
থেকে আনিয়েছি।
তাঁদের দুধ খাওয়া দেখে আমারও দুধ
খাওয়ার সাধ হলো। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম- আরও পাওয়া যাবে কি?
টঙ্কেশ্বর বরা বললেন- যেতে পারে!জিজ্ঞেস করে জানতে হবে।
তাহলে সম্ভব হলে আজই জানার চেষ্টা করবেন।আমি বললাম।
পরের দিন দেখি হিলারিউস এক্কা আমার
জন্যও দুধ রেখেছেন। সেদিন থেকে আমিও দুধ খাওয়া শুরু করলাম। আমাদের দুধ খাওয়া দেখে আমাদের রোমমেট কদ্দুসও দুধ খাওয়া শুরু করলেন। কিছুদিন পরে দেখি প্রশিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই দুধ খাচ্ছেন।
একটি ছোট ছেলে দুধ দিয়ে যেত। একদিন
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- তোমাদের গাই কয়টা?
ছেলেটি বলল- একটা।
আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম- একটা গাই? কত সের
দুধ দেয়?
ছেলেটা বলল- চার সের।
গাই একটা! চার সের দুধ দেয়। এদিকে আমাদের প্রশিক্ষার্থীদের প্রায়
সবাই দুধ খায়! ব্যাপার কি?
চার সের দুধ দেয়। আমি বললাম- তুমি
আমাদের এখানে কত সের দুধ দাও।
দশ সের মতো দিই।
তোমাদের গাই দুধ দেয় চার সের, আর
তুমি আমাদের দুধ দাও দশ সের। বাকি দুধ কোথায় পাও?
ছোট ছেলে! প্রতাড়ণা কি বুঝেনা। তাই
সে আসল কথা বলে ফেলল- মা দুধ বানায়।
দুধ বানায়! কি দিয়ে?
পাউডার দিয়ে।
তারপর থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কেউ
আর সেই মহিলার কাছ থেকে দুধ নিতেন না।
আমাদের বড় ছেলে সোহরাব আলী আহমেদের
জন্ম ১৯৭৫ সালের ৯ ই আগস্ট আমি প্রশিক্ষণে থাকাকালীন। তার জন্মের খবর পেয়ে আমি ১৬ ই আগস্ট প্রশিক্ষার্থীদের
মিষ্টিমুখ করিয়েছিলাম। মিস্টান্ন বিতরণ করার সময় আমরা সবাই একটি হলে সমবেত হয়েছিলাম।মিস্টিমুখ করার
পর অধ্যক্ষ কামেশ্বর কলিতা আশীর্বাদ
স্বরূপ বলেছিলেন- কাল রাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান গেলেন এবং আবুল সাহেবের ঘরে আরেকজন মুজিবর রহমান এলেন। আবুল সাহেবের ছেলে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠুক, আমি এই আশীর্বাদ করছি।এভাবে বলার পর কিভাবে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড সংঘিটত হয়েছিলো তিনি সে বিষয়ে মোটামুটি বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেছিলেন।
সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান এবং দশ বছরের ছেলেসহ তাঁর পরিয়ালের ১৯ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন আততায়ীদের হাতে। খুবই নৃশংস ছিলো সেই হত্যাকাণ্ড। তখন
সময়ের খবর সময়ে জানার জন্য একমাত্র মাধ্যম ছিলো রেডিও। আমাদের প্ৰশিক্ষণ কেন্দ্ৰে রেডিও ছিল না। তাই শেখ
মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর খবরটা আমরা একটু দেরিতে অধ্যক্ষ কামেশ্বর কলিতার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। খবরটা আগে জানতে পারলে নিশ্চয়ই আমি সেদিন অন্তত মিস্টিমুখ করাতাম না।দুই চারদিন পরে
করাতাম।সঠিক মনে নেই, তবে মনে হয়, সেদিন শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে শোকসভা অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো।
আমাদের ফাইন্যাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত
হওয়ার কয়েকদিন আগে একটি মারাত্মক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনার খলনায়ক ছিল নগাঁও
শিক্ষা বোৰ্ডের প্রশিক্ষার্থী পুতুল গোস্বামী। সে প্রায় নিয়মিতই মদ খেত এবং মদ খেলেই মাতলামি করত। আমাদের ইন্সট্রাক্টর নগেন ভট্টের দু’টি যুবতী কন্যা ছিল। একজন কলেজে এবং একজন হাইস্কুলে পড়ত।
একদিন রাতে মদ খেয়ে পুতুল গোস্বামী তাদের রোমের সন্মুখে গিয়ে উদ্ভণ্ডালি করেছিল।
পরের দিন সকালে অধ্যক্ষ কামেশ্বর কলিতা প্রশিক্ষার্থীদের আবাসগৃহে এসে প্রশিক্ষার্থীদের সবাইকে ডেকে আবাসগৃহের পৰ্টিকোর সামনে জড়ো করে বললেন- পুতুল গোস্বামী কাল
রাতে এক অভাবনীয় কাণ্ড করেছে। একজন শিক্ষকের জন্য সেরকম কাণ্ড ক্ষমাহীন অপরাধ।তাই
আমি অনেক ভেবেচিন্তে পুতুল গোস্বামীকে প্রশিক্ষণ থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ সকালেই সে
প্ৰশিক্ষণ কেন্দ্ৰ থেকে চলে যেতে হবে।
প্ৰশিক্ষাৰ্থীদের আবাসগৃহটা এ্যাল প্যাটাৰ্ণ ছিলো। মূল গৃহটা লম্বায় উত্তরদক্ষিণে ও তার সাথে সংলগ্ন এ্যালটুকু
লম্বায় পূবাপশ্চিমা হিসেবে বিস্তৃত ছিলো। আবাসগৃহে অনুমান
চব্বিশ পঁচিশটা রোম ছিলো। প্ৰতিটি রোম চার পাঁচজন করে প্ৰশিক্ষাৰ্থী স্বচ্ছন্দে থাকার মতো প্রশস্ত ছিলো। মূল গৃহের উত্তরপ্রান্তে থাকা কয়েকটা রোম প্রশিক্ষকদের আবাসগৃহের কাছাকাছি
ছিলো। তাই প্ৰশিক্ষকদের কাছাকাছি থাকা রোমের অনেকেই ঘটনাটা রাতেই অবগত হয়েছিলো। আমরা ছিলাম এ্যাল
প্যাটার্ণ গৃহটির একেবারে পূবপ্রান্তে। তাই আমরা রাতে ঘটনাটা জানতে পারিনি। শুধু আমরা কেন আমাদের মতো অনেকেই জানতে পারেনি। উপরন্তু ঘটনাটা সংঘটিত হয়েছিলো অনেক রাতে। প্রশিক্ষার্থীরা শোয়ার পরে। তাই টঙ্কেশ্বর বড়া জিজ্ঞেস করলেন-স্যার, অপরাধ
নিবেন না। ঘটনাটা কি জানতে পারি কি?
তখন কামেশ্বর কলিতা ঘটনাটা খোলে বলেছিলেন। প্রশিক্ষার্থীদের অনুরোধ ও পুতুল গোস্বামী অধ্যক্ষ এবং নগেন ভট্টের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রা
রক্ষা পেয়েছিল।
আমি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দশ মাস
ছিলাম। দশ মাসেও আমি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দিক নির্ণয় করতে পারিনি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি রঙিয়া ভূটান রোডের পূব পাশে
ছিল। আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি রাস্তার উত্তর পাশে অবস্থিত। প্রার্থনাগৃহটি আমাদের আবাসগৃহের দক্ষিণ পাশে ছিলো। আমার কিন্তু প্রার্থনাগৃহটি আমাদের আবাসগৃহের পূব পাশে বলে মনে হতো। আমি দশ মাস চেষ্টা করেও সঠিক দিক ঠিক করতে পারিনি।
আমাদের প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল দশ
মাস। দশ মাস সুকলমে প্রশিক্ষণ শেষ করে ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে বাড়ি এসে আবার
গড়লা বালক নিন্মপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলাম।
আমি গড়লা বালক নিন্মপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করার কিছুদিন পরে
সিদ্দিকুর রহমান উক্ত বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন। সিদ্দিকুর রহমান কয়াকুছির লোক ছিল। সে নর্মাল পাস ছিল।
আমি তখন বাড়ি থেকে স্কুলে
যাওয়া-আসা করতাম। সেবার নদীর ঢালা পরে বাঘবর থানার দক্ষিণ পাশে অবস্থিত রাস্তায় বালি পড়েছিল। সাইকেল নিয়ে সেই বালি ঠেলে স্কুলে যাওয়া আসা করার
দরুন আমার হাঁটুতে বিষ হয়েছিল। ফলে আমার সাইকেল চালানো খুবই অসুবিধা হতো। সেই বিষে আমি অনেক বৎসর ভুগেছি।
গড়লা বালক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি ছ'মাস
ক্লাস করেছিলাম। আমি সেখানে অনেককে ছাত্র হিসাবে পেয়েছিলাম যদিও এখন মাত্র
তিনজনের নাম আমার মনে আছে। ওহাব আলী, আবুল কাশেম এবং সামেজ উদ্দিন। ওহাব আলি এখন
ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত। আবুল কাশেম পঞ্চায়েত সেক্রেটারি এবং সামেজ উদ্দিন
সৈনিক বিভাগের অভিযন্তা। ওহাব আলীর সাথে সব সময় দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার দরুন তার
সাথে আমার পরিচয় ছিল যদিও সামেজ উদ্দিন এবং আবুল কাশেমের সাথে আমার পরিচয় ছিল
না। সামেজ উদ্দিনের সাথে পরিচয় হয়েছিলো হাউলি এক বিয়ে বাড়িতে। আবুল কাশেমের সাথে পরিচয় হয়েছে বরপেটায়।আবুল কাশেম এবং সামেজ
উদ্দিন দু'জনই নিজেরা যেচে এসে পরিচয় দিয়েছিল। তারা যেচে এসে পরিচয় না দিলে, আমি তাদের চিনার উপায় ছিল না।
সাতমুখি প্রাথমিক বিদ্যালয়
১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসের ২৯
তারিখে আমাকে ১২৮৯ নম্বর সাতমুখি নিন্মপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। স্কুলের নাম
সাতমুখি ছিল যদিও স্কুলটার অবস্থিতি ছিল বালাজান গ্রামে। জায়গাটা বেকি এবং ভেলেঙ্গী নদীর সংগমস্থলে ছিল। তাই হয়তো এক সময় গ্রামটার নাম সাতমুখি রাখা হয়েছিলো। পরে রাজস্ব (রেভিনিউ) গ্রাম হিসেবে বালাজান রাখা হয়। বালাজান গ্রামের দক্ষিণে
বিখ্যাত বালাজান খাল অবস্থিত। এই খালের নাম অনুসারেই হয়তো গ্ৰামটার নাম বালাজান রাখা হযেছে। বালাজান খাল এক সময় মাছের জন্য খুবই বিখ্যাত ছিলো। ব্ৰহ্মপুত্ৰ নদের ভাঙনের
ফলে এখন বালাজান খালের অস্তিত্ব শুধু নামেই রযে গেছে। খালের সেই সুনাম এখন আর তেমন নেই। বালাজান খালে কি রকম মাছ পাওয়া যেত সে কথায় আমি পরে আসছি। যাইহোক, গ্রামের
নাম পরিবর্তন হলেও স্কুলের নামটা পরিবর্তন করা হয়নি। সাতমুখিই রয়ে গেছে।
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে
আমি সাতমুখি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করি। স্কুলটি আমাদের বাড়ি থেকে তিন মাইল
উত্তরে ছিল। হাঁটুতে বিষ হওয়ার দরুন আমি তিন মাইল রাস্তা হেঁটেই যাওয়া-আসা করতাম। বর্ষাকালে প্রায় পাঁচ মাস জল থাকত। তাই
বর্ষায় নৌকা নিয়ে যাতায়াত করতাম। সাতমুখির প্রায় সব লোকই আমার পরিচিত ছিল। আমাদের ইশ্বা
কাকাদের বাড়ি স্কুলের পাশেই ছিল। আমার মামাত বোন জিন্নতমালাদের বাড়িও কাছেই ছিল। কোরবান আলী মুন্সী সাহেব সেই অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনিও আমাদের আত্মীয় ছিলেন। আমি কোরবান আলী মুন্সীকে নানা বলে ডাকতাম। কোরবান আলী মুন্সির বাড়ির পাসেই ছিল স্কুলটা। তিনি স্কুলের
সভাপতি ছিলেন। তাই তিনি প্রায়ই স্কুলে এসে খোঁজ-খবর নিতেন। স্কুলের বেশির ভাগ
ছাত্র-ছাত্রীই আমার আত্মীয় ছিল। আমার সাথে তখন সহকারি শিক্ষক হিসাবে ছিল জিন্নত
আলী। আমার ছেলেবেলার কেরম খেলার সাথী।
জিন্নত আলীর সাথে কাদং হাইস্কুলে আমি একই ক্লাসে পড়তাম। ১৯৭৮ সালে এক বৎসর আমার প্রাইমারির
সহপাঠী সাকায়েত হোসেন জিন্নত আলীর খালি পোষ্টে শিক্ষকতা করেছিল। জিন্নত আলী বেসিক
প্রশিক্ষণে গিয়েছিল। সাকায়েত হোসেন আমাদের বাড়িতেই লজিং ছিল। আমরা একসাথে
স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। ১৯৮০ সালে জিন্নত আলী বদলি হয়ে অন্য স্কুলে চলে যায়। তখন জিন্নত আলীর খালি পদে মোখতার আলী আহমেদ যোগদান করে। মোখতার আলী আহমেদ কাদং হাইস্কুলের ছাত্র ছিল। সে আমার থেকে দুই শ্রেণী ওপড়ে পড়ত।
আমি সাতমুখি প্রাইমারি বিদ্যালয়ে
তখন ছাত্র হিসাবে পেয়েছিলাম সামেজ উদ্দিন, জমির
হোসেন, নরেশ পাল, ব্রজনাথ পাল, হরিবলা পাল, গোপাল মণিদাশ, শুকচান
পাল, আবু বাক্কার, জীবন আলী, হুরমূজ আলী, জহুরা খাতুন, সুফিয়া
খাতুন, সবুরি নেসা প্রভৃতিকে। সামেজ উদ্দিন এখন সমাজকর্মী,
আবু বাক্কার ফার্মাসিষ্ট, জমির হোসেন এম,
এ পাস করে প্রাইমারির শিক্ষক(এখন কলগাছিয়া শিক্ষাখণ্ডের বিআরপি),
শুকচান পাল এম, ই স্কুলের শিক্ষক।
১৯৭৮ সালে প্রাইমারি বিদ্যালয়ের সাথেই আলাবক্স এম, ই
মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। এম,ই মাদ্রাসার প্রধান
শিক্ষক ছিলেন বিল্লাল হোসেন, সহকারী শিক্ষক ছিলেন কোরবান আলী মুন্সির ছেলে আমজাদ
হোসেন, আমজাদ হোসেন (মন্দিয়া), হিন্দী শিক্ষক ছিলেন আব্দুল মান্নাফ(বালাজান)। প্রথমাবস্থায় বিজ্ঞান শিক্ষক না থাকার দরুন আমি কয়েকদিন এম,ই মাদ্রাসার ছাত্রদের গণিত শিখিয়েছিলাম। খুবই আনন্দময় ছিল সেই সব দিন।
আমার খেলাধূলার প্রতি আগে থেকেই
কিছু রাপ ছিল। তাই আমি লেখাপড়ার সাথে সাথে
ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন খেলাধূলায় অংশ গ্রহণ করার জন্যে উৎসাহিত করতাম। সেখানে
হাইস্কুল এবং কলেজে অধ্যয়নরত কিছু ছাত্র ছিল। কলেজের ছাত্রের মাঝে ছিলো ময়সের আলী এবং সেকান্দার আলী। ময়সের আলী এখন আলাবক্স এম,ই
মাদ্ৰাসার বিজ্ঞান শিক্ষক। সেকান্দার আলী তাজ
উদ্দিন হাইস্কুলের কেরানি। হাইস্কুলের ছাত্ৰদের মাঝে ছিলো সামেজ উদ্দিন। সে কাদং হাইস্কুলে পড়ত।
এই সব ছাত্ৰ এবং এম,ই স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে আমি
ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করতাম। ক্রিকেট খেলার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছিল কাদং
হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে প্রমোশন পাওয়ার পর থেকে। তখন আমাদের বিদ্যালয়ে ‘নতুন অসমিয়া’ নামের
দৈনিক খবর কাগজ রাখতেন। সেখানে ক্রিকেট খেলার খবর থাকত। সুনিল গাভাস্কারের বিষয়ে তখন খুবই প্রশংসা করে লেখা হত খবরের কাগজে। খবরের কাগজে ক্ৰিকেট খেলার বিবরণের সাথে স্কোর বোৰ্ডও লেখা থাকত। আমি তখন ক্রিকেট খেলার বিষয়ে খুবই অনভিজ্ঞ ছিলাম। তাই স্কোরবোর্ড দেখে কিছুই বুঝতাম না যদিও বুঝার চেষ্টা করতাম।
তখন থেকেই আমি ক্রিকেটের প্রতি কিছু
আকর্ষিত হয়েছিলাম। বরপেটা গেলে মিউনিসিপাল ফিল্ডে ক্রিকেট খেলা হলে আমি খুব
মনোযোগ দিয়ে দেখতাম এবং খেলাটা বুঝার চেষ্টা করতাম। তখন এখনকার মতো ক্রিকেট খেলার
জনপ্রিয়তা ছিল না। তাই ক্রিকেট খেলা কি অনেকে বুঝতই না। টিভি আসার পর থেকে
ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এখন ছোট্ট শিশুও ক্রিকেট খেলা বুঝে।
আমি বাড়ি থেকে চেলা কাঠ দিয়ে
ব্যাট এবং গাছের ডাল গোল করে কেটে ক্রিকেট বল বানিয়ে নিয়ে যেতাম এবং ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করতাম। আমজাদ হোসেন, বিল্লাল হোসেন, ময়সের আলী, আব্দুল মান্নাফ, সেকান্দার আলী, জীবন আলী, সামেজ উদ্দিন এবং অন্যান্য কয়েকজন
আমার সাথে খেলায় অংশ গ্রহণ করত। কোনো প্যাড নেই, এদিকে কাঠের বল! তাই বল লেগে অনেকেই আহত হতাম।
তবুও খেলা ছাড়তাম না। স্কুল ছুটির পরে খেলা শুরু করতাম এবং বেলা ডুবার পর খেলা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। তাই বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যেতো। ক্রিকেট খেলার সাথী না থাকলে তখন গল্প করে সময় পার করতাম। আমি সিনেমার কাহিনী গুছিয়ে বলতাম
এবং সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনত সেই কাহিনী। কোন কোনদিন হাইজাম্প এবং দৌড় খেলারও প্রতিযোগিতা করতাম। মারাথন
দৌড় প্রতিযোগিতার কিটিপ নিয়ে আলোচনা করতাম। আসলে পায়ের গোঁড়ালি মাটির সাথে
স্পর্শ না করে দৌড়োলে মানুষ সহজে হাঁফিয়ে উঠে না। এই হল মারাথন দৌড়ের কৌশল। তাই দুই পায়ের আঙুলের ওপড় ভর করে লাফিয়ে লাফিয়ে আমরা মারাথন দৌড়ের প্রেকটিস করতাম।
বিদ্যালয়ের সাথেই পূব পাশে ছোট একটি বাজার ছিলো। দু’টি গেলামালের দোকান। দু’টি চায়ের দোকান এবং সকাল বেলা দুধ ও তরি-তরকারি বিক্ৰী হতো। প্রকৃতার্থে
দুধের জন্যই বিখ্যাত ছিল বাজারটি। বাজার ভাঙার পর আলীগাঁয়ের মতোই চায়ের দোকানে তাস খেলা হতো।বিশেষ করে ফিস খেলা। স্কুল ছুটির পর গল্প করার অথবা ক্রিকেট খেলার সাথী
না পেলে আমি সেই তাস খেলা দেখতাম। আস্তে
আস্তে আমিও তাস খেলা খেলতে শুরু করলাম। কোনোদিন লাভ হতো আবার কোনো কোনোদিন আবার ক্ষতিও যেতো। বলতে দ্বিধা হলেও বলতে হয়, পরবর্তী সময়ে তাস
খেলাটা আমার নেশা হয়ে গেয়েছিল। ছুটির দিনেও কখনও কখনও আমি একমাত্র তাসের নেশায় বালাজান বাজারে যেতাম। এই তাস খেলার নেশার জন্যই একদিন বাচ্চু নামের একজন পাগলার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল।
কথাটা তাহলে একটু বুঝিয়ে বলি।
শীতের দিনে আমাদের বাড়িতে রান্না ঘরের বাইরে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্নাবান্না
করত।
একদিন সন্ধ্যেবেলা বাইরে
রান্নাবান্না চলছিল। কাছেই একটি বদনা ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে একটি পনের
ষোল বছরের বালক এসে সেই বদনা নিয়ে চলে যাচ্ছিল। তখন যারা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিল তারা ‘কে, কে? কে,
বদনা নিয়ে যায়?’ এভাবে চেঁচামেচি করে উঠায়
আমরা ‘কি হলো’ বলে সেদিকে গেলাম।
আমাদের বাড়িতে তখন একটি গৃহের কাজ চলছিল। তাই বাড়িতে মিস্ত্রী, রাখালসহ অনেক লোক ছিল। কমেও চৌধ্য পনের জন। একজন দৌঁড়ে গিয়ে ছেলেটিকে
ধরে আনল। চোর ভেবে দু’একটি চড় থাপ্পড়ও মারল। আমি তখন মারতে
বারণ করে বললাম- ছেলে মানুষ, আগে এর পরিচয় নিই। পরে দেখব কি
করা যায়!
ছেলেটিকে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করায়
সে বলল, যে সে কয়াকুছি অঞ্চলের সখিরভিটার লোক। তার বাবা শিক্ষক।
সে কেন একা একা বাড়ি থেকে এসেছে? জিজ্ঞাসা করায় সে আবুলতাবুল বলতে লাগল। তখন বুঝতে পাড়লাম, তার মাথার গণ্ডগোল আছে। অৰ্থাৎ সে মানসিক রোগী। তাকে আর মারতে দিলাম না
এবং খাইয়ে-দাইয়ে রাখালদের সাথে শুতে দিলাম। সকাল বেলা সে কাউকে না বলেই চলে
গিয়েছিল।
তিন চার তিন পর ছেলেটির বাবা এসে
আমার সাথে দেখা করে বলল- শুনেছি, আপনাদের বাড়িতে আমাদের ছেলেটা এসেছিল। সে রাতটাও বোলে আপনাদের বাড়িতেই ছিল। তার
মাথার গণ্ডগোল আছে। মাঝে মাঝেই কাউকে না বলে বাড়ি থেকে চলে আসে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে বাড়ি নিয়ে যেতে হয়। এইবার এক সপ্তাহ আগে বাড়ি থেকে চলে এসেছে। আমাদের
ওখানে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। পরে খবর পেলাম যে, সে আপনাদের এখানে এসেছিল। যদি ছেলেটিকে আবার দেখতে পান তো যেভাবেই হোক, ধরে
রেখে আমাকে খবর দিবেন, না হলে কাউকে দিয়ে আমাদের বাড়ি
পাঠিয়ে দিবেন। যা খরচা হয় আমি দিয়ে দিব।
মানবতার খাতিরেই সেদিন থেকে আমি
যেখানেই যাই কেউ কোন পাগল দেখেছে কিনা
জিজ্ঞাসা করি।
সেদিন তাসের নেশায় ছুটির দিনে
হেঁটে বালাজান বাজারে যাচ্ছিলাম। বালাজান যেতে
হলে বেকি নদীর পার দিয়ে যেতে হয়। সামনে কে পড়েছিল মনে নেই। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কোন পাগল দেখেছে কি-না?
তখন লোকটি বলল- বালাজান খালের পাড়ে
একজন পাগল আমি এইমাত্র দেখে এলাম।
পাগল আর কয়জন হবে! নিশ্চয় সেই
ছেলেটাই হবে! এভাবে ভেবে আমি খুব উৎসাহের সাথে হাঁটতে লাগলাম। বালাজান বাজারে যেতে হলে বালাজান খাল পাড় হয়ে যেতে হয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি বালাজান খালের ধারে পৌঁছে গেলাম। আমি খালের এপাড় থেকে লক্ষ্য করলাম, চুলদাড়িতে ভম্বলের মতো একজন লোক খালের অপর পাড়ে বসে রয়েছে। লোকটির থেকে একটু দূরেই কয়েকজন লোক বসে তার তামাশা দেখছে। আমি বুঝতে পারলাম, আমি যাকে খুঁজছি, এ সে পাগল নয়!
আমি খাল পাড় হয়ে পাগলের কাছে
গেলাম এবং সেখানে যারা বসেছিল তাদের জিজ্ঞাসা করলাম- ইনি কে?
একজন বলল- বলতে পারব না। কাল
সন্ধ্যে থেকে এখানে বসে রযেছে।
আমি লক্ষ্য করলাম, লোকটির শরীরে কাপড়ের লেশমাত্র
নেই। পরনে শুধু একটি গামছা। তখন প্রচণ্ড শীতের দিন। তাতে আবার বেকি নদীর পাড়? বেকির পাড়ে এমনিতেই শীত একটু বেশি। তাই ভাবলাম, এই শীতের মাঝে কেমন করে এখানে রাত কাটাল লোকটি!
আমি লোকটার কাছে গিয়ে পরিচয়
জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি যা বললেন তার সারাংশ এ রকম- তিনি ছনপুরার লোক। নাম বাচ্চু। বউ আছে। ছেলেমেয়ে আছে। সংসারে রুচি নেই। ভবঘুরে। ঘুরে বেড়ায়। লোকে তাকে বাচ্চু পাগলা বলে।
আমার মনে একটা প্রশ্নই বারে বারে
উঁকি দিতে লাগল- লোকটা এই শীতের মাঝে বেকি নদীর পাড়ে খালী গায় রাত কাটাল কিভাবে? এভাবে ভেবে মনে মনে ভাবলাম, আজ যদি তাস খেলে লাভ করতে পারি তাহলে একে এক পেক বিড়ি এবং
একটা ম্যাচ কিনে দিয়ে যাব।
বালাজান বাজারে এসে ফিশ খেলা শুরু
করলাম। সেদিন আমরা সাত বাজি ফিশ খেলে ছিলাম। সাতটা বাজির মধ্যে আমি একাই ছ'টা বাজি জিতলাম। পূর্বে ভাবা মতোই, আসার সময় আমি এক পেক বিড়ি এবং একটা ম্যাচ কিনে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। খালের পাড়ে এসে দেখি বাচ্চু পাগলা তেমনই বসে রয়েছে এবং তার থেকে একটু দূরে আগের মতোই কয়েকজন লোক জটলা বেঁধে বসে রয়েছে। আমি বাচ্চু পাগলাকে বিড়ি এবং ম্যাচ দিলাম। তিনি বিড়িম্যাচ পেয়ে খুশি হলেন এবং আমাকে বসতে বললেন।
তখন বেলা বেশি নেই। বেলা ডিমের কুসুমের মতো লাল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই অস্ত যাবে। তাই আমি বসলাম না। লোকটিকে দেখার পর থেকেই
আমার মনে একটা কথা ঘূরপাঁক খাচ্ছিল যে, লোকটি এই শীতের দিনে বেকি নদীর পাড়ে খালি
গায় কীভাবে রাত কাটাল? তাই আমি আমার কৌতুহল নিরসনের জন্য জিজ্ঞেস করলাম- আপনি এই শীতের মাঝে এখানে রাত কাটালেন কীভাবে?
বাচ্চু পাগলা বলল- গাঁজা খাই।
গাঁজার নেশাতেই কাটিয়েছি। গাঁজা খেলে দিন রাতের হুঁশ থাকে না।
জটলা বেঁধে বসে থাকা লোকগুলির মাঝ থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ লোক আমাকে একটু ফাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি পাগলাকে বিড়ি ম্যাচ দিলেন কেন?
আমি বললাম- এই শীতের মাঝে বেকি নদীর
পাড়ে কোনো কাপড়-চোপড় ছাড়াই পড়ে রয়েছে। আপনি, আমি তো থাকা সম্ভব নয়। এঁর মাঝে নিশ্চয় কিছু আছে। তাই দিলাম আর কি!
বেকি নদীর জল সত্তরের দশকে কি রকম
ঠাণ্ডা ছিল সেই সম্পর্কে আমি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। বালিকুরি গ্ৰামে কেসরব খাঁ নামের
একজন সুফি সাধক ছিলেন। বাড়ি ছিলো বালিকুরি বাজার থেকে কিছু দক্ষিণে অবস্থিত পাড়াটায়। আমাদের পাড়ায় কেসরব খাঁর অনেক শিষ্য ছিল। তাঁর বাড়িতে আশ্বিন মাসের শেষের দিন অর্থাৎ গার্সির রাতে উরস হতো। সেই উরসে কয়েকটা দল
হয়ে মুর্শিদি (মরমী লোকগীত) গাওয়া হতো। আমাদের পাড়ার অনেকে সেই উরসে
অংশ গ্রহণ করত।
১৯৬৮ সাল। আমি তখন কাদং হাইস্কুলে
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। পূজার ছুটিতে আমি বাড়ি
এসেছিলাম। ছুটী শেষ। তাই আমি কাদং যাওয়ার জন্য
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছি। এমন সময় দেখি আমাদের পাড়ার অনেকে কেসরব খাঁর উরসে
যাওয়ার জন্য বেড়িয়েছে।বালিকুরি হয়েও কাদং যাওয়া যায়। তাই আমি বালিকুরি হয়ে কাদং যাওয়ার জন্য তাঁদের সাথে হেঁটে বালিকুরি এলাম। বালিকুরি এসে দেখি কেসরবখাঁর বাড়িতে বিরাট আয়োজন।
সামিয়ানা টানিয়েছে। অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। এদিকে বেলাও বেশি ছিল না। তাই আমি
পরের দিন সকালে কাদং যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উরস দেখার জন্য সেখানে থেকে গেলাম।
সারা রাত জেগে গান-বাজনা শুনলাম। কাছেই বেকি নদীর সুঁতি। সুঁতিটা
এখনও আছে, তবে, এখন দেখতে মরা খালের মতো। তখন সুঁতিটা দেখতে ছোট নদীর মতো ছিলো এবং যথেষ্ট স্ৰোতও ছিলো। সকালে সেই সুঁতিতে গেলাম হাত-মুখ ধোয়ার জন্য। সুঁতির পারে গিয়ে দেখলাম, আমার আগেই অনেকে সুঁতির পারে এসে জড়ো হয়েছে।কেউ কেউ হাতমুখ ধুচ্ছে, কেউ কেউ আবার একটি বড় নৌকাকে কেন্দ্ৰ করে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নৌকাটা খুবই বড়। শুধু বড় বললে ভুল হবে, বলতে হয় মস্ত বড়। কাছগুলি এতই উঁচা ও খাঁড়া যে, আমার পক্ষে নৌকার ভেতরের দিকটা দেখা সম্ভব হল না।অত বড় নৌকা! তাই আমার নৌকাটার
বিষয়ে জানার জন্য কৌতুহল হলো। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, যে নৌকাটা হোসন সরকারের। হোসেন সরকার
বালিকুরি অঞ্চলের একজন গন্যমান্য লোক ছিলেন। লোকমুখে শুনামতে, তিনি সেই নৌকায় করে সেই বছরই পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন। পরিয়ালসহ পাকিস্তান যাওয়ার জন্যই বোলে তিনি নোকাটা নির্মাণ
করিয়েছিলেন।
সে যাই হোক, এখন আসল কথায় আসি। বালু
দিয়ে দাঁত ঘঁসে মুখ ধোয়ার পর ভাবলাম, লজিং বাড়ি যাওয়ার সময় স্কুলের সামনে দিয়েই যেতে হবে। তাই সম্ভব হলে ক্লাস করেই লজিং বাড়ি যাব। রাত জেগেছি, তাই গোসলটা সেরে যাই।
সেদিন পূর্ব দিক থেকে বাতাস বইছিল
এবং ছিটা ছিটা বৃষ্টিও পড়ছিল। গোসল করার উদ্দেশ্যে আমি সূঁতির জলে নেমে দুই ডুব দেওয়ার পরে তৃতীয়
ডুব দেওয়ার সময় মাথা জলের নিচে নিতে পারলাম না। ঠাণ্ডায় একেবারে জমে গেলাম। তাই দুই ডুব দিয়েই কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে পাড়ে উঠলাম।
সেদিন এমনিতেও ঠাণ্ডা বেশি পড়েছিল। তাই অনেকে আগুন জ্বেলে পুহাচ্ছিল। আমি সেই আগুন
পুহিয়ে চাঙ্গা হয়েছিলাম। এখন অবশ্যে বেকির জলের সেই ঠাণ্ডা নেই।
এতক্ষণ মূল প্ৰসঙ্গ ছেডে় অনেক আবুলতাবুল বললাম। এখন আসি মূল কথায়। লোকটি বাঙালি
হিন্দু। হিন্দুদের পাগল সন্নাসীতে এমনিতেই একটু বিশ্বাস বেশি। তাতে আবার বৃদ্ধ! তিনি তখনই সেখান থেকে চলে গেলেন
এবং একটু পরেই এক বাটি দুধ নিয়ে এসে বাচ্চু পাগলাকে দিলেন। পাগলা দুধ পান করলেন। আমি সেখান থেকে চলে এলাম। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখি পাগলা সেই আগের জায়গাই বসে রয়েছে এবং আগের দিনের মতোই কয়েকজন লোক জটলা করে বসে আছে তাঁর পাশে।
সেদিনও মনে মনে ভাবলাম, আজ খেলায় লাভ হলে পাগলাকে বিড়ি ম্যাচ কিনে দিয়ে যাব।
সংযোগবশতঃ সেদিনও লাভ হলো। বিড়ি ম্যাচ দিয়ে এলাম। এইভাবে চার দিন লাভ হলো এবং
চার দিনই বিড়ি ম্যাচ কিনে দিয়ে এলাম। ফলে পাগলার সাথে আমার ভাব জমে গেলো। একদিন তাঁর পাশ ঘেঁসে বসে শীতের মাঝে খালি শরীরে থাকার প্রকৃত রহস্য
জানতে চাইলাম। তখন সে যা বলছিলো, তার সারাংশ এই রকম, তিনি শরীরে ছাই মাখেন। ছাই মাখলে শীত লাগে না। যখনই শীত করে তখনই শরীরে ছাই মেখে শরীর গরম করেন।
এদিকে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলল। বাতাসা, সন্দেশ, রসগোল্লা, দুধ, বিড়িম্যাচ কী দেয়নি লোকে! পাঁচদিনের মাথায়
বাচ্চু পাগলা আমাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসালেন। সেদিন অনেকক্ষণ বসেছিলাম তাঁর পাশে। আমি তখন পায়জামা পাঞ্জাবী
পরিধান করতাম। বাড়ি আসার সময় বাচ্চু পাগলা আমার পাঞ্জাবীর পকেটে এক পেক বিড়ি
এবং একটি সন্দেশের টোপলা পুরে দিল। আমি বাড়ি এলাম। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখি
কে একজন একটি খড়ের ছাপড়া তোলে দিয়েছে এবং লোকের সংখ্যা আগের থেকেও অনেক
বেড়েছে। দৈ-মিষ্টি, বাতাশা, মুরি,
চায়ের দোকানও বসেছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই জায়গাটা লোকে
লোকারণ্য হয়ে উঠল। নানান জন নানান রোগের চিকিৎসার জন্য আসতে শুরু করল।একমাসের মধ্যে দূর-দুরান্ত থেকেও লোক আসতে শুরু করল নানান আর্জি নিয়ে। মনে হয়, বিশ্বাসে মিলিবে হরি, তর্কে বহুদূর, এই বিশ্বাসে।
আমি স্কুলে যাওয়ার সময় বাচ্চু
পাগলার পাশে বসতে পারি না। কারণ স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে। তাই তাঁকে শুধু হাত তোলে ইংগিত দিয়ে স্কুলে চলে যাই। বাড়ি
ফেরার সময় নিয়মিতভাবে বাচ্চু পাগলার পাশে বসি এবং আমি বাড়ি আসার সময় বাচ্চু
পাগলা আমার পকেটে বিড়ি ম্যাচ, বাতাসা পুরে দেয়। এভাবে প্রায় দু'মাস চলল।
একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় বাচ্চু পাগলা বললেন- এখানে বোলে চড়ক পূজা হবে। পূজার জন্য চাঁদা হিসেবে আমার কাছে দু’হাজার টাকা দাবি করেছে। আমি অত টাকা দিব কোত্থেকে?
জায়গাটা হিন্দু বসতির কাছে ছিল।
সেখানকার অনেক ছাত্র আমার স্কুলে পড়তে যায়। তাই সেখানকার অনেক লোকের সাথে আমার
পরিচয়। তাই আমি বললাম- কে টাকা দাবি করেছে? লোকগুলো
বয়স্থ, না কম বয়েসের?
বাচ্চু পাগলা বলল-বয়স্থ না, কম বয়েসের।
ঠিক আছে, দেখি কি করতে পারি? আমি বললাম- পরশু এসে
এদের সাথে আমি আলোচনা করব।
বাচ্চু পাগলা বলল- পরশু নয়। কালই
আসুন আপনি।
আমি তখন আমাদের বাঘবর শিক্ষক
কেন্দ্রসভার সম্পাদক। আমি সাতমুখি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করার কিছুদিন পরেই আমাকে
সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব ভার অর্পণ করেছিল। আগে সম্পাদক ছিলেন দিলোয়ার হোসেন
সাহেব। জালাল উদ্দিন এম,এল,এ সাহেবের ছোট ভাই। সাইকেল নিয়ে
বরপেটা যাওয়া আসা করতে হয়। তাঁর বয়েস হয়েছে। তাই সাইকেল চালাতে অসুবিধা হয়। সেজন্যেই
আমাকে দায়িত্বটা দিয়েছিল।
প্রত্যেক মাসে বিলের জন্য আমাকে বরপেটা
যেতে হয়। তবুও একদিন গেলে হয় না। কোনো কোনো মাসে চার পাঁচ বার করেও যেতে হয়।
একদিন গিয়ে সহকারি পরিদর্শকের(স্কুল এছ, আই)দ্বারা
কাঁচা বিল পাস করাতে হয়। পরে গভর্ণমেণ্ট বিলে বিল করে সেই বিল কেরানির নিকট জমা
দিতে হয়।
১৯৭৬ সাল। তখন সবেমাত্র প্রথম
সরকারি বিল ফর্মের প্রচলন হয়েছে। বিল ফর্ম যোগান ধরত অফিস
থেকেই। কিন্তু কোনো কোনো মাসে অফিসে বিল থাকত না। তাই বিভিন্ন জায়গা থেকে বিল সংগ্রহ করতে হত। আমরা তখন
বিশেষ করে ‘ই এণ্ড ডি’ এবং ডিচি
অফিস থেকে দুই টাকা করে বিল কিনতাম এবং বিল করে কেরানির কাছে জমা দিতাম। কেরানি
ডিআইর সঁই নিয়ে রাখত এবং আমরা কেরানির নিকট থেকে সেই বিল সংগ্রহ করে ট্রেজারিতে
জমা দিতাম। তখন আজকালকের মতো ছিল না। এখন ট্রেজারিতে বিল জমা দিলে সাত আঠদিনের আগে
টাকা আশা করা যায় না। কিন্তু তখন পরিবেশ ভিন্ন ছিল। ট্রেজারিতে বিল জমা দিলে
সেদিনই বিল ব্যাংকে পাঠিয়ে দিত এবং ব্যাংক থেকে সেদিনই টকা সংগ্রহ করে বাড়ি এসে
শিক্ষকদের টাকা বিলিয়ে দিতে পারতাম। আমাদের বাঘবর কেন্দ্রের বিলের তারিখ ছিল
প্রত্যেক মাসের ছয় তারিখ। পরের দিনই ছয় তারিখ ছিল।তারিখ মতো না গেলে অসুবিধা। তাই
আমি বললাম- আমি কাল আসতে পারব না। কাল বরপেটা যেতে হবে। জরুরি প্রয়োজন আছে। আমি
পরশু এসে এই বিষয়ে আলোচনা করব।
অগত্যা বাচ্চু পাগলা মানতে বাধ্য
হলো।
আমি পরের দিন ভোরে উঠে সাইকেল নিয়ে বরপেটা
এলাম।
তখন আমাদের বিল কেরানি ছিল দ্বিজেন
চৌধুরি। দ্বিজেন চৌধুরি লোক হিসাবে কিন্তু খুবই ভালো ছিল। আমি অফিসে গিয়ে দ্বিজেন
চৌধুবিরর সাথে দেখা করলাম। আমাকে দেখে দ্বিজেন চৌধুরি বলল- তোর বিল তো সঁই হয়নি।
আমি বললাম- কেন, কি হয়েছে? অব্জেক্শ্বন হয়েছে না-কি?
দ্বিজেন চৌধুরি বলল- স্যারের কাছে
গিয়ে দ্যাখ্, কি হয়েছে।
তখন ডিআই ছিলেন ধুবুড়ির শ্বহিদ
বক্স।
আমি ডিআইর কাছে গেলাম। বিলের কথা
বললাম।
তখন ডি,আই সাহেব বললেন- আপনাদের বিল
সঁই করলে আমার কি লাভ হবে?
কি লাভ হবে মানে? আমি কথাটা বুঝলাম না। ভাবলাম, ডিআই কি
বলতে চাইছে! এদেঁর তো সরকার আমাদের বিল সঁই করার জন্যই রেখেছে! ডি আই এভাবে কথা বলছেন
কেন! কিন্তু আমি কিছুই বললাম না। কারণ তখন ডিআইদের খুবই ক্ষমতা ছিল। নিয়োগপত্রে তখন
ডিআইরাই সঁই করতেন। কোনো শিক্ষকের প্রতি
অসন্তুষ্ট হলে শাস্তিমূলক বদলিও করতে পারতেন। তাই আমি ডিআইকে কিছু না বলে দ্বিজেন চৌধুরির কাছে এসে কথাটা বললাম।
তখন দ্বিজেন চৌধুরি বলল- কথাটা তুই
বুজিস নি। ডিআইর টাকা লাগে। বিল সঁই বাবদ প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ টাকা করে নিচ্ছে। টাকা দিয়ে বিল সঁই করিয়ে আন।
এর আগের ডি, আই তো বিল সঁই করতে টাকা নেয়নি। তাহলে বিল সঁই করার জন্য কেন টাকা দিব? আমি বললাম।
দ্বিজেন চৌধুরি বলল- সেটা তোর কথা!
এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।
আমি টাকা দিলাম না। ভাবলাম, দেখি কি হয়! কাল আবার আসব। এইভাবে ভেবে সেদিন আমি বাড়ি এলাম না। ভেড়ারপাম শশুড় বাড়ি গেলাম।পরের দিন অফিসে গিয়ে দেখি ডি আই স্যার বিল সঁই করেনি।
আমি ডিআইর নিকট গিয়ে বিল সঁই করার কথা বলায় তিনি আমার মুখের দিকে চেয়ে
বিল সঁই করলেন। ট্রেজারিতে বিল জমা দিয়ে সেদিনই ব্যাংক থেকে টাকা সংগ্রহ করে বাড়ি এলাম।
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখি
বাচ্চু পাগলা নেই। আমি একজনকে বাচ্চু পাগলার বিষয়ে
জিজ্ঞেস করলাম। তখন লোকটি বলল, সে আজ রাতে চলে গেছে। ছেলেগুলো এসে টাকার জন্য খুব জোর দিয়ে
ধরেছিল। ছেলেগুলো যাওয়ার পর কাউকে না জানিয়ে রাতেই চেলে গেছে।
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাচ্চু
পাগলা আর এল না। কোথায় গেছে তা-ও কেউ বলতে পারল না। জায়গাটা আবার ফাঁকা হয়ে
পড়ল। চাঁদের হাট ভেঙে গিয়ে জায়গাটায় আবার শূন্যতার হাট বসল। আমি সেদিক দিয়েই
স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। জায়গাটা দেখলেই কিছুদিন আমার বুকের ভেতর হাহাকার করে
উঠত।
এখানে বালাজান খাল সম্পর্কে পাঠকের
জ্ঞাতার্থে কিছু কথা বলে রাখি। বালাজান বাঘবর অঞ্চলের একটি বিখাত খাল। মাছের জন্য
খুবই বিখ্যাত ছিল খালটা। খালটি বেকি নদীর সাথে
সংলগ্ন ছিল। আশ্বিন কার্তিক মাসের শেষে বালাজান খাল দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জল গড়িয়ে বেকি নদীতে পরত। সেই জলের সাথে মাছ নামত। আশ্বিন
মাসে খালের মুখে ইজারদাররা বানা দিয়ে বান্ধ দিয়ে মাছ ধরত। আমি বর্ষায় নৌকা
নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতাম। জল কমলে তখন নৌকা চলত না। কাপড় বাঁচিয়ে খাল পাড়
হতে হতো।
খালের মুখে যেখানে বানা দিত সেখানে অনেক
জল থাকত। অবশ্যে খালের উজান দিকে জল কম থাকত। তাই খালের প্রায় এক ফার্লং উজান
দিয়ে খাল পাড় হতে হতো। খালের মুখে বান্ধ দিলে কোন কোন বৎসর এত মাছ নামতো যে, মাছ
আর জল প্রায় সমান হয়ে যেতো। তখন জলের মাঝে মাছ বিলি দিয়ে পা ফেলে খাল পাড় হতে হতো। এক বৎসর এত মাছ নেমেছিল
যে, মাছের চাপে বান্ধ ভেঙ্গে গিয়েছিল। সেবার চিতলগুলো
বান্ধের মুখে জলের ওপড় উঠে কেলি করে দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য সৃষ্টি করেছিল।
বালাজান খালে আষাঢ় মাসে
দূর-দূরান্ত থেকে লোক এসে হালি দিয়ে আষাঢ়ে বোয়াল শিকার করতো।পাঁচ, দশ, বিশ কেজি ওজনের বোয়াল।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পরার পরেও বালাজান খালের কিছু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে
যদিও এখন বালাজান খালের সেই মাছ আর নেই!ফলে খালের সেই
সুনামও নেই।
বাড়ির কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ
আলীগাঁও, সারগাঁও, সুতির পার, পালারপাম, দলাগাঁও, রামাপাড়া
প্রভৃতি গ্রাম ভাঙার পর ব্রহ্মপুত্র নদ ১৯৭২ সালে আমাদের গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত
জাহানা বিলে এসে পড়েছিল। জাহানা বিলে পড়ার পর কিছুদিন সেভাবেই ছিল। ১৯৭৬ সালে
আবার হঠাৎ ভাঙন শুরু হয় এবং ১৯৭৮ সাল নাগাদ নদী ভেঙে এসে আমাদের বাড়ির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছায়। ফলে আমাদের বাড়ি একেবারে নদীর পাড়ে পরে যায়। বাড়ি থেকে নদীর দূরত্ব ছিলো মাত্র
তিন চার রশি।
ব্রহ্মপুত্র নদীতে তখন প্রচুর মাছ
ছিল। জাল অথবা বরশি নিয়ে গেলেই মাছ পাওয়া যেতো। তাই আমি মাছের নেশায় পরে গেলাম। তাস খেলার নেশা বাদ পরে গেল। মাছের নেশায় মেতে
উঠলাম। সকাল বেলা জাকি জাল দিয়ে, স্কুল বন্ধের দিনে দুপুরে হাতিয়ে মাছ ধরতাম এবং ভাটিবেলা বরশী দিয়ে। স্কুল ছুটি
দিয়েই বলতে গেলে দৌড়ে বাড়ি আসতাম এবং বাড়ি এসেই
কাপড় খোলে নাকেমুখে কিছু একটা খাবার গোঁজে বরশী নিয়ে বেড়িয়ে পরতাম। টানা বরশী। আগে থেকেই পুঠি মাছ, পিয়ালি মাছ সংগ্রহ করে মাটির তলে পোঁতে রাখতাম। মাছ সংগ্রহ
করতে না পারলে ফাঁদ পেতে এন্দুর ধরার পর পোড়ে সেই পোড়া এন্দুর দিয়ে বরশী
ফেলতাম। মাছ অবশ্যে তেমন ধরতে পারতাম না। তবুও বরশী ফেলে বসে থাকতাম। অন্য লোকের
বরশীতে মাছ ধরত; কিন্তু আমার বরশীতে তেমন মাছ ধরত না।
আমার সাথে তখন বরশী ফেলতেন হাবেজ
ফকির নামের একজন লোক। লোকটি সুফি সাধক ছিলেন। সমাজেও তাঁর সন্মান ছিলো।তিনি আমার
সম্পৰ্কিত বেয়াই। আমার খালাতো বোনের জামাই রূপাকুছির আব্দুল ভাইর বেয়াই। সেই
সুবাদে আমারও বেয়াই। কাদং হাইস্কুলে পড়ার সময়
আমি আব্দুল ভাইদের বাড়িতে জাইগির ছিলাম। এ কথা আমার ছেলেবেলা বইটিতে বিতং বলা হয়েছে।
হাবেজ ফকিরের বরশীতেও আমার মতো তেমন
মাছ ধরত না। দু’জন এক জায়গায় বসেই বরশী ফেলতাম। একদিন
হাবেজ ফকির তামাশার সুরে বললেন- মাস্টর বেয়াই, আপনার এবং আমার বরশীতে মাছ ধরে না কেন
জানেন?
আমি বললাম-না, জানিনা তো। তবে আমার মনে হয়,আমাদের হয়তো মাছের রাশ নেই। আমাদের
নাড়ি হয়তো বটি দিয়ে কাটেনি, ব্লেড দিয়ে কেটেছিল। তাই মাছ ধরে না।
হাবেজ ফকির বললেন- আসলে কথা তা নয়। আসলে ভালো লোকের বরশীতে
মাছ ধরে না।
সে কি রকম? আমি বললাম- আমরা যে ভালো লোক তার কি প্রমাণ আছে?
বরশীতে মাছ না ধরাটাই আমাদের ভালো
লোকের প্রমাণ। হাবেজ ফকির বললেন- ভালো লোকের সাথে শয়তানের আড়ি। কথাটা আপনি নিশ্চয় শুনেছেন?
হ্যাঁ, তা অবশ্যে শুনেছি। আমি বললাম- তা, মাছ ধরা বা না ধরার সাথে তার কি
সম্পৰ্ক?
হাবেজ ফকির বললেন- হ্যাঁ, সম্পর্ক
আছে। শয়তানের সাথে আমাদের আড়ি তো! সেজন্য আমরা বরশী ফেললে শয়তান এসে আমাদের বরশী আড়াল করে বসে
থাকে। তাই মাছেদের আমাদের বরশী চোখে পড়ে না। তাই মাছ ধরে না।
কথাটা বলেছিল আজ থেকে প্রায় চল্লিশ
বিয়াল্লিশ বৎসর আগে। কথাগুলো এখনও আমার হুবহু মনে আছে। শয়তান বরশী আড়াল
করে বসে থাকার জন্য আমাদের বরশীতে মাছ ধরা বা না ধরাটা কতদূর সত্য. তা জানিনা।তবে
হ্যাঁ, এটা অবশ্যে ঠিক যে, ভালো লোক সব সময় প্রতাড়িত হয়।
অবশ্যে আমার একেবারে যে মাছ ধরত না, তা নয়। দুই একটা মাছ ধরত। একবার চৌধ্য কেজি ওজনের একটা বাগাড় মাছ ধরেছিল আমার বরশীতে। সেদিন ব্রহ্মপুত্র এবং বেকির সংগমস্থলে বেকির ঠোঁটায় বরশী
ফেলেছিলাম কুঁচিয়ার টোপ দিয়ে।
বরশী ফেলে বসে আছি। হঠাৎ বরশীর
সুতায় টান পড়ল। সর সর করে সূতা টেনে নিতে লাগল। আমি সূতা টেনে ধরলাম।
বরশীতে মাছ আটকা পড়ল। মাছ টেনে ডাঙায় তুলতে পারছি না। টেনে পাড়ে আনলেই আবার জলে ডুব মারে।
ধারেকাছে কেউ নেই, যে তার সহায় নেব। অনেক কসরৎ করার পর মাছের ল্যাজায় থাবা মেরে ধরে এক সময় মাছটা ডাঙায় তুললাম। ডাঙায় তোলার পর মাথায়
করে বাড়ি এলাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ বড় মাছ শিকার।
আষাঢ় মাসে আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছের জিনি এসে হালি দিয়ে আষাঢ়ে বোয়াল শিকার করত। পাঁচ, দশ, বিশ কেজি বোয়াল। তাঁদের মাছ শিকার দেখে আমি একটি যুতি যোগার করে খালে খালে অনেক
পহরা দিতাম আষাঢ়ে বোয়াল শিকার করার জন্য। মাছও অনেক দেখতাম, কিন্তু অভ্যেস না থাকার দরুন মাছ মারতে পারতাম না। অবশ্যে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে এবং নদীর কাছাড়ে
হাতড়িয়ে অনেক মাছ ধরেছি আমার জীবনে। বেলে এবং বাইম মাছই ধরতাম বেশি। একদিন ছোট বড় ছাব্বিশটা
বাইম মাছ ধরেছিলাম। আমি চিনা-কাওণ ভেজে নদীর হাওরে ছিটিয়ে দিয়ে জাকি জাল দিয়ে মাঝমধ্যে চিংড়ি মাছও মেরেছি।একদিন এক খেওনে প্রায় তিন কেজির মতো গলদা চিংড়ি উঠেছিলো। এভাবে মাছ শিকারকে বলা হতো ডেপা দিয়ে মাছ শিকার।আমি ইলিশ ধরা জাল দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভাটা দিয়ে দুই তিনদিন ইলিশ মাছও শিকার করেছিলাম।
একবার এক রাতে সতেরটা চিতল মাছ হানা
দিয়ে শিকার করেছিলাম।
তখনকার দিনে আমোদ-প্রমোদের তেমন কোন সাধন ছিল না। সন্ধ্যেয় ভাত খেয়েই প্রায় সবাই শোয়ে পড়ত। অনেকে আবার সন্ধ্যেয় ভাত খেয়ে
পাড়া বেড়াতে যেত। আমিও মাঝে মাঝে পাড়া বেড়াতে যেতাম। সেদিন আমি সন্ধ্যের পর ভাত খেয়ে ফুফুদের বাড়ি বেড়াতে
গিয়েছিলাম। আমাদের নিজা ফুফু (পিসি)ছিল না। বাবাদের চাচাত বোন ছিলেন। তাঁকেই আমরা নিজা ফুফু বলে জানতাম এবং ফুফুর মতোই ডাকা-খোঁজা করতাম। সেই ফুফুও আমাদের নিজা ভাই-পোর মতোই আদর যত্ন করতন। বাড়িতে গেলে না খেয়ে আসতে দিতেন না। যা ঘরে থাকতো তাই
সামনে এনে দিতেন। তাই আমরা ফুফুর অভাব কোনোদিন অনুভব করিনি। আমাদের ফুফার নাম ছিল পণ্ডিত আলী এবং ফুফুর নাম হালিমন
নেসা। ফুফা খুব সহজ-সরল লোক ছিলেন। নিজা ফুফার মতোই আমাদের আদর যত্ন করতেন। আরেকজনকে আমরা ফুফু বলে ডাকতাম। সেও বাবাদের দূর সম্পর্কীয় বোন ছিলেন। তাঁর নাকে একটি বড় মাপের তিল ছিল, তাই তাঁকে সবাই তিল্লুকি বলে ডাকত। আমরা তিল্লুকি ফুফু বলে ডাকতাম। তিল্লুকী ফুফু দিনে রোজা রাখতেন না, রাতে রোজা রাখতেন। বলতেন, রাতও আল্লাহর,
দিনও আল্লাহর। তাই এক সময় রাখলেই হলো। আল্লাহ মেনে নিবেন। তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। সাহেদ আলী নামের
একটি ছেলেকে শিশু অবস্থাতেই তাঁরা দত্তক নিয়েছিলেন।
আমাদের পাড়ার সামনে দিয়ে একটি
হাঁটা পথ ছিল। নদী ভেঙে পাড়ার কাছে আসার পর চকের জল নেমে আমাদের যদু জেঠার ছেলে
সিরাজ ভাইদের বাড়ির পশ্চিম দিকে
একটি খালের মতো সৃষ্টি হয়েছিল। খরা
মরশুমে সেই খালে জল থাকত না। তবে বর্ষায় জলে ভরে যেত। জল বেশি থাকলে হেঁটে
খাল পার হওয়া সম্ভব হত না। সিরাজ ভাইদের বাড়ির পেছনে একটু ডাঙার মতো ছিলো। তাই অন্যান্য জায়গায় জল বেশি থাকলেও সেখানে জল কম
থাকত। তাই জল কমলে ভাটির দিকে জল বেশি
থাকলেও সিরাজ ভাইদের বাড়ির পেছন দিয়ে কাপড় বাঁচিয়ে যাতায়াত করা যেত।
তখন ছিল আশ্বিন মাস। জল শুকানোর
সময়। তবে তখনও খাল দিয়ে কিছু কিছু জল গড়াচ্ছিল। সিরাজ ভাইর বাড়ির পেছনের রাস্তায় সামান্যই জল ছিল। পাতাজল। সন্ধ্যায় ফুফুদের বাড়ি গিয়েছিলাম।গল্পগজবে একটু রাত
হয়ে গিয়েছিলো।
ফুফুদের বাড়ি থেকে আসার সময় দেখি
সেখান দিয়ে চিতল মাছ যাচ্ছে। জ্যোৎস্না রাত ছিল। চিতল চেপটা সাইজের মাছ। পাথালি বেশি। তাই খাড়া হয়ে যেতে পাড়ছে না। পাথালি হয়ে কাতরিয়ে কাতরিয়ে যাচ্ছে এবং স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাছ দেখে
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। চার পাঁচ মিনিটের মধ্যে দু'টি
মাছ পার হয়ে গেল।
আমি বাড়ি গিয়ে হানা এনে মূড়া পেতে
বসে একরাতে সেখান থেকে সোতরটা চিতল মাছ শিকার করেছিলাম। সেটাই ছিল হানা দিয়ে আমার
জীবনে সর্বাধিক মাছ শিকার।
আমাদের পাড়াটা নদীর ভাঙনের কবলে
পড়ায় অন্য এক বিড়ম্বনাই দেখা দিল। ১৯৭৭ সালের নুতন ভোট লেখার সময় জাহানার পারের
মাঝে শুধু মাত্র আমাদের পাড়াটাই অবশিষ্ট ছিল। বিশ পঁচিশটা পরিয়াল। ইনুমারেটর’ ভোট লেখার জন্য বাঘবর পর্যন্ত এসেছিল। কে একজন বলে দিয়েছিল যে, জাহানারপারে কোনো লোক নেই। নদী ভাঙনের ফলে সবাই বিভিন্ন
জায়গায় উঠে গেছে। লোক না থাকলে সেখানে ভোট লেখার প্রশ্নই উঠে না। তাই
ইনুমারেটর চলে গিয়েছিল।
কথাটা আমাদের হিকমত তাউই বাঘবর থেকে
শুনে এসে আমাকে বললেন- তাউই, খবর পেয়েছেন কি?
ভোট লেখার জন্য ইনুমারেটর এসেছিল। কে একজন বলে দিয়েছে জাহানারপারে
লোক নেই। তাই সে চলে গিয়াছে। এখন কি করা যায়?
১৯৫২, ১৯৫৭,
১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৭০ সালের
ধারাবাহিকভাবে ভোট আছে জাহানারপার গ্রামের লোকের। মাঝখান থেকে যদি ভোট না হয়
তাহলে কেমন হবে! তাই আমি বললাম- ঠিক আছে, কালই বরপেটা চলুন।
ইলেকশ্বন অফিসে গিয়ে ইনুমারেটরকে খোঁজে বার করে ভোট লেখিয়ে দিই’গে।
আগের ভোটার লিষ্ট
যোগার এবং একুশ বৎসর বয়েসের সব লোকের তালিকা করে দুই দিন পরে হিকমত তাউই সহ চার পাঁচজন
বরপেটা এলাম। নির্বাচনী বিষয়ার সাথে সাক্ষাৎ
করে আমাদের অসুবিধার কথা ভেঙে বললাম।
তখন নির্বাচনী বিষয়া বললেন- আপনারা ইনুমারেটরের সাথে সাক্ষাৎ করে ভোট লেখানোর
ব্যবস্থা করুন। যদি ইনুমারেটর যেতে অসন্মত হয় আমাকে বলবেন।
ইনুমারেটর কে খোঁজতে লাগলাম। কিন্তু ইনুমারেটর সেদিন অফিসে আসেনি। একজন বাড়ির ঠিকানা বলে দিল। ইছাপুর
হাটি।
ইনুমারেটরের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখলাম কয়েকজন কিশোর একটি দেওয়ালের ওপড় বসে রয়েছে। তাদেরকে ইনুমারেটরের বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করলাম।
তখন সেই ছেলেদের মাঝ থেকে অপেক্ষাকৃত একজন বড় ছেলে বলে উঠল- আপনারা বাংলাদেশী না-কি?
এর আগে কখনও বাংলাদেশী শব্দটা
শুনিনি। তাই বললাম- বাংলাদেশী! কে বাংলাদেশী?
ছেলেটা বলল- কিছুদিনের মধ্যেই জানতে
পারবেন, কে বাংলাদেশী!
ছেলেটা আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিল। সেই
রাস্তা ধরে আমরা ইনুমারেটরের বাড়ি এলাম।
রাস্তায় ছেলেরা যে বাংলাদেশী
বলেছিল সেই কথাটা আমার মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ছেলেগুলো একথা বলল কেন? আগেপাছে তো এমন কথা কখনও কেউ বলেনি! রাত বারটায়ও বরপেটায় অসমিয়া বস্তি দিয়ে যাতায়াত করেছি। আমি কাদং হাইস্কুলে পড়ার সময় বরপেটা থেকে অনেক লোক নৌকা
নিয়ে কাদং অঞ্চলে খরি কাটতে যেত। তারা আমাদের বন্ধু সখি বলে সম্বোধন করত। তারা
আমাদের একদিন নিমন্ত্রণও করেছিল। নিমন্ত্ৰণ রক্ষা করতে বরপেটা এলাম।তখন সিনেমা দেখার খুব নেশা। বরপেটা এসেছি, সিনেমা
দেখব না, এটা কেমন কথা হবে! তাই বরপেটার ইন্দ্রপুরি সিনেমা
হলে সিনেমা দেখে সেই সখির বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে দ্বিধাহীনভাবে রাত বারটায়
বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
শোধনাগর আন্দোলনের সময় আমি বাড়ি
থেকে সাইকেল নিয়ে গজিয়া হয়ে বরপেটা যাচ্ছিলাম। আমি তখন বরপেটায় নুরুদ্দিন
মাস্টার সাহেবের মেসে থাকতাম। নুরুদ্দিন সাহেব সুন্দরিদিয়া এম, ই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।
সেদিন কারফিউ চলছিল। কথাটা আমি
জানতাম না। আমি গজিয়ার মেইন রাস্তায় উঠতে যাব এমন সময় পুলিসের গাড়ির শব্দ শুনতে
পেলাম। তখন একজন লোক আমাকে ডেকে বলল- কে তুমি? কারফিউ চলছে জান না নাকি? আর্মি আসছে। এস, আমাদের বাড়ি এস। পুলিস গেলে চলে যাবে।
এমনি ভাল সম্পর্ক ছিলো তখন অসমিয়া
হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের। হিন্দু-মুসলমানের কোন বাচ-বিচারও তখন ছিল না। হঠাৎ আজ ছেলেটি একথা বলল কেন?
ইনুমারেটর বাড়িতেই ছিলো। তার নাম এখন আমার মনে নেই। পঁচিশ ছাব্বিশ
বছরের যুবক। মাক্সৰ্বাদে বিশ্বাসী। খুব ভালো ছেলে। সে বিনা বাক্যব্যয়ে ভোট লিখে
নিলো। ভোট লেখানোর পরে আমি ইনুমারেটরকে
বললাম- আপনাদের এখানকার ছেলেগুলো বদমাস টাইপের।
ইনুমারেটর বলল- কেন, কি হয়েছে?
তখন আমি ঘটনাটা খুলে বললাম।
ইনুমারেটর আমার কথা শুনে বলল- এরকম
একটা কিছু হবে। আমাদের মাঝে আলোচনা চলছে। আমি এসএফআই করি। আমরা সেটা সমর্থন করি না।
এর কিছুদিন পর থেকেই বাংলাদেশী
শব্দটা আসামের মুখ্য শব্দ হয়ে গিয়েছিলো। তার ফলশ্রুতিতে আসাম আন্দোলন সংঘটিত হল। হাজার হাজার
লোক মরল। ঘর-বাড়ি জ্বলল।
আমি ভাবি, আমিই বোধহয় প্রথম বাংলাদেশী শব্দটা শুনেছিলাম। বলাবাহুল্য, ভোট লিখিয়ে দিয়ে সেদিনই আমরা বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
গতানুগতিক জীবন। স্কুলে যাই, ছাত্র পড়াই। সময় পেলে মাছ ধরি। বরশী নিয়ে ঘুরি। ১৯৭৬ সালে
রেডিও কিনেছিলাম। সেই রেডিওতে গান শুনি। নিজেও গান লেখার চেষ্টা করি। ঐ সময়েই আমি
একটি উপন্যাস লেখে ফেলি। অসমিয়া ভাষায়। ‘জীবন নৈর সুঁতি’। উপন্যাসটা ২০১৮ সালে কয়াকুছির সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠীর সৌজন্য প্ৰকাশ করেছি।
রেডিওতে কলকাতার ফুটবল লীগ এবং
ক্রিকেট খেলার ধারা বিবরণী শুনি। কলকাতা রেডিও সেন্টারের ধারা বিবরণী রেডিওতে ভালো
শুনা যায় না। তাই রেডিও খুলে ভলিয়ূম বাড়ানোর চেষ্টা করি।
কিছুদিন কবিগান শেখারও চেষ্টা
করেছিলাম। আমাদের দক্ষিণের পাড়াটা ছিলো হিন্দু বাঙালিদের পাড়া। একেবারে লাগোয়া পাড়া। লাগোয়া হওয়ার কারণ আছে। জমিগুলি আগে আমাদেরই ছিল। ১৯৬১
সালে পাকিস্থান থেকে অনেক বাঙালি হিন্দু এদেশে প্রব্রজন করে আসে। তখন বাঙালি
হিন্দুদের আমরা রিফুজি(রিফিউজি) বলতাম। আমাদের জমিগুলি তখনও খাস ছিল। সেই খাস জমিতে
এলটমেন্ট দিয়ে সরকার সেই প্ৰব্ৰজিত বাঙালি হিন্দুদের বসিয়ে ছিল। আমাদের বার বিঘা
জমি এভাবে বাঙালি হিন্দুদেরকে এলটমেন্ট দিয়েছিল।
আমাদের বাড়ি থেকে একটু দক্ষিণে একটি কালি মন্দির ছিল। সেখানে একবার
কবিগান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সুনিল সরকার
এবং মাচিম সরকার সেদিন সেই কবিগানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুনিল সরকারের বাড়ি
আমাদের বাড়ির সামনে কালি মন্দির থেকে একটু পশ্চিম দিকে ছিল। সেদিন সুনিল সরকারের গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাই আমিও কবিগান শেখার কথা ভেবেছিলাম। একদিন সুনিল সরকারকে বাড়ি গিযে তাঁকে কথাটা
বললাম। তিনি আমার কথা শুনে খুশি হলেন এবং গান শেখানোর জন্য রাজি হয়ে গেলেন। কয়েকদিন গান শিখতে গেলাম। তিনি আমাকে সূর্য বন্দনা, লক্ষ্মী বন্দনা প্রভৃতি মুখস্থ করতে বললেন। মুখস্থ করলামও।বলা বাহুল্য, কিছুদিন যাওয়ার পরেই আমার গান শেখার নেশা
কেটে গিয়েছিল।
বাড়ি ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে
ব্ৰহ্মপুত্ৰ নদ দক্ষিণ দিক থেকে
ভেঙে এসে ১৯৭২ সালে জাহানা বিলে পরার পরে নদী ধীরে ধীরে ভেঙে এসে আমাদের বাড়ি
থেকে চার পাঁচ রশি দক্ষিণে প্রায় পাঁচ ছয় বৎসর অবস্থান করছিল। ১৯৮০ সালে নদী
আবার উগ্ররূপ ধারণ করে এবং আমাদের বাড়ি নদের ভাঙনের কবলে পড়ে। ১৯৮০ সালের ২৩ জুন
সকাল বেলা সঞ্জয় গান্ধী তাঁর নিজস্ব বিমান উড়ানোর সময় সফদরজং বিমানঘাটির কাছে
দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে মারা যান।
সেদিন রাতেই আমাদের বাড়িতে ডাকাত
পড়ে। সেদিন ছিল সোমবার। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে শোয়ে রয়েছি। রাত বারটায় হঠাৎ সমবেত কণ্ঠের চিৎকারের শব্দ শুনে জেগে
উঠলাম। তারপর কে যেন দুই তিনবার ‘চুপ চুপ’ বলল এবং সব নীরব হয়ে গেল।
‘কি হলো’
এই ভেবে আমি দরজা খোলে বাইরে বের হতে যাচ্ছি, তখনই
দেখি আমার দরজার সামনে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার। তাই লোকটিকে
ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। লোকটিকে আমি পুলিসের লোক বলে ভাবলাম। কারণ তখন আসাম
আন্দোলন চলছিল। হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছিল সমগ্র আসামে। চলছিল লুটপাট। যে
যেভাবে পারে হিংসা ছড়াচ্ছিল। আমাদের গোবিন্দপুর রিজার্ভে তখন মহিষ-গরুর বাথান
ছিল। দু'দিন আগে কারা যেন সেই বাথান থেকে গরু লুট করে
নিয়েছিল। তাই মরাভাজ, বালাজান অঞ্চলের অনেক লোককে পুলিস
গ্রেপ্তার করেছিল। আমি তখন সাতমুখি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাই নিয়মিতভাবে
বালাজান যাই। ভাবলাম, আমার নামেও হয়তো কেউ কেস দিয়েছে।
খুবই অন্ধকার ছিলো সেদিন।আকাশ মেঘে
মেঘে ছেয়ে ছিলো। আকাশে বৃষ্টি টোপ টোপ করছিলো।অন্ধকারের
মাঝে আমি তাই লোকটাকে পুলিসের লোক ভেবে বললাম- কে আপনি?
লোকটি বলল- চুপ, চুপ থাক। সোরগোল করলে গুলী করব।
পুলিস গুলী করবে! কেন? আমি কি অপরাধ করেছি। আমি তো গরু লুটপাটের ঘটনায় জড়িত নেই!
আমি বললাম- আমি কি অপরাধ করেছি।
গুলী করবেন কেন?
লোকটি আমাকে ধাক্কা মেরে ঘরের ভেতরে ঠেলে দিয়ে বলল- ‘দে, যা যা আছে। ঘড়ীটা দে।” বলেই আমার ঠ্যাঙে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারল।
তখন আমি বুঝতে পারলাম, পুলিস নয়, ডাকাত। কারণ তখন ডাকাতের খুব
প্রকোপ ছিল। চার দিন আগে আমাদের কাকার শশুড় বাড়ি অর্থাৎ দানেশ মুন্সির বাড়িতেও
ডাকাতি হয়েছে। আমি পরশু দানেশ মুন্সির বাড়ি গিয়েছিলাম তাঁদের খোঁজ-খবর নিতে। কিভাবে ডাকাতি সংঘটিত করেছিল তখন তাদের মুখ
থেকে শুনেছিলাম। ডাকাতদের চলাফেরা এবং ডাকাতির ধরণ দেখে বুঝতে পারলাম সেই দলই
আমাদের বাড়িতে ডাকাতি করতে এসেছে। তখন বর্ষামাসে নৌকা নিয়ে নদীর পাড়ে পাড়ে
নিরালা চড়ের একদল ডাকাত ডাকাতি করে বেড়াতো। রাতে ডাকাতি করত এবং দিনের বেলা কোন বসতিহীন চড়ে কাইশাবনে লুকিয়ে
থাকত।
আমার ঘড়ীটা টেবিলের ওপড়ে ছিল। সে
টর্চ জ্বালিয়ে দেখে সেখান থেকে ঘড়ীটা নিল। তারপর এদিক ওদিক টর্চ মেরে দেখে ঘরের বাইরে গিয়ে দরজায় শিকল তুলে দিল। আমি ঘরের
ভেতর আটকা পড়ে গেলাম। এমন সময় প্রবল বৃষ্টি
শুরু হলো। কোথায় কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। এভাবে
প্রায় পনের মিনিট সময় কেটে গেল।
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর বড় ঘর থেকে
বাবার গলা শুনতে পেলাম-ডাকাতেরা সব নিয়ে গেল। কিছুই রেখে যায়নি। মার হাতের কলশীটাও
নিয়ে গেছে।
কে একজন এসে আমার ঘরের শিকল খুলে
দিল। আমি ঘরের বাইরে বেড়িয়ে বড় ঘরে
গিয়ে দেখি সব জিনিষপত্র লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে।
তখন কি ভাবে কি হচ্ছিল সব জানতে
পারলাম। ডাকাতরা সবাই পকেটে করে রশি নিয়ে এসেছিল। দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকেই সেই রশি
দিয়ে সবার হাত পিঠমোড়া করে বেঁধেছিল। ডাকাত ছিল এঘার জন এবং সেদিন আমরা রাখাল-চাকর নিয়ে বাড়িতে পুরুষ লোক ছিলাম
বারজন। বারজন লোককে এগারজন লোক টেক্কা দিয়ে চলে গিয়েছিলো।কারণ তারা প্ৰস্তুত হয়ে
এসেছিলো। আমরা প্ৰস্তুত ছিলাম না।
পরের দিন থানায় গিয়ে এজাহার
দিলাম। পুলিস তদন্ত করে গেল। তারপর আর কিছুই করেনি। এমন কি পুলিশ ডাকাত ধরার কোনো
উদ্যোগই নেয়নি! তিন চার মাস পড়ে আশ্বিন মাসে আমি নিজেই সেই ডাকাত ধরেছিলাম আলীগাঁয় মামাদের বাড়ি গিয়ে।
সেদিন আমি মামাদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম।
মামাদের বাড়ি তখন মথাউরির ওপড়ে একেবারে নদীর পাড়ে। মামাদের বাড়ির পশ্চিম পাশেই
ছিল আমার সম্পর্কীয় মামা নুরুল ইসলামদের বাড়ি।নুরুল ইসলাম আলীগাঁও প্ৰাথমিক
বিদ্যালয়ের প্ৰথম স্নাতক। নুরুল ইসলাম ২০২১ সালের দুই জানুয়ারি এন্তেকাল করেছে।আমি আলীগাঁও গেলে রাতে প্রায়ই নুরুল ইসলাম মামার পাশেই
শোইতাম। সেদিন রাতেও আমি তাঁর সাথেই শোয়েছিলাম। ভোরে নদীতে মানুষের সোরগোলের শব্দ শুনতে পেলাম।
আমি নুরুল ইসলাম মামাকে ডেকে তোলে
নদীর পাড়ে গেলাম। তখনও ফর্সা হয়নি। আবছা অন্ধকার। শব্দ শুনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কিছু দেখা যাচ্ছেনা। অনুমান হল,
কারা যেন একটি নৌকা নিয়ে ভাটির দিকে যাচ্ছে এবং অন্য একটি নৌকা
তাদের পেছনে তাড়া করে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই একটু ফর্সা হয়ে উঠল এবং আমরা নৌকা দেখতে পেলাম। দু’টি নৌকা।
একটি নৌকা আগে আগে যাচ্ছে এবং মনে হল, অন্য একটি নৌকা তাদের
তাড়া করে যাচ্ছে।
আমাদের বাড়ি ডাকাতি হওয়ার পর থেকে
আমার মনে সর্বদায় ডাকাতের চিন্তাই লেগে থাকত। ফলে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। আগে আগে যাওয়া নৌকাটা ডাকাতের এবং পেছনের নৌকাটা
গেরস্তের বলে আমার মনে জানান দিল। আমি নুরুল ইসলাম মামাকে বললাম- নিশ্চয় ডাকাত হবে!
নুরুল ইসলাম আমার কথা সমর্থন করে
বলল- আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলো, ভাটির দিকে গিয়ে
দেখি। ডাকাতরা পাড়ে নৌকা ভিড়াতেও পারে!
আমরা ভাটির দিকে যেতে লাগলাম। সামনেই একটি কাঁচি চর ছিল। চরে কাইশা বনও ছিল। নৌকা
দু’টি সেই চরের আড়াল হয়ে গেল। একটু দূরেই
বাঘবর থানা।
তাই আমি বললাম- ডাকাতরা মনে হয়
থানায় আত্মসমর্পণ করবে।
নুরুল ইসলাম বলল- আমারও তাই মনে
হয়। পাব্লিকের হাতে ধরা খাওয়ার চেয়ে থানায় ধরা দিলে ওরা বাঁচবে। তাই হয়তো ওরা থানায় আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে।
আমরা নিরাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পরেই দেখি একটি নৌকা এসে আমাদের থেকে পোয়া ফার্লং দূরে ভিড়ল।
নুরুল ইসলাম বলল- ডাকাতের নৌকা হবে!
আমরা দু’জন এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা যাওয়ার আগেই ডাকাতরা নৌকা থেকে
নেমে দৌড়ে পালাতে লাগল ।
আমরা চিৎকার করে বলতে লাগলাম- ডাকাত
যাচ্ছে। ধর।
আমাদের চিৎকার শুনে লোকজন বেড়িয়ে
এসে ডাকাতদের ধরে ফেলল। সেদিন এঘার জন ডাকাত ধরা পড়েছিল। গণ ধুলাইতে একজন ডাকাত মারা
গিয়েছিল। সেই ডাকাতদেরই একজন আমাদের বাড়িতে ডাকাতি করেছিল বলে স্বীকার করেছিল।
কিন্তু একটা কথা ঠিক, ডাকাতের মৃত্যু আমি সহজভাবে মেনে নিতে
পারিনি। ডাকাতরাও মানুষ। মানুষ মানুষকে শাসন করার অধিকার থাকলেও, মানুষ হয়ে মানুষকে খুন করার অধিকার নেই।
তখন বাবার একটি কথা মনে পড়েছিল।
আমাদের বাড়ি ডাকাতি হয়ে যাওয়ার পর বাবা একদিন বলেছিল- দেখবি, একদিন ডাকাত ধরা পড়বেই! আমাদের হকের জিনিষ। হকের জিনিষ কেউ কোনোদিন
হজম করতে পারে না।আমরা না পেলেও ওদের হাত থেকে জিনিষগুলি একদিন নিশ্চয় বেড়িয়ে
যাবে।
আমি এখনও ভাবি, আমাদের বাড়ি ডাকাতি করার জন্যই হয়তো সেদিন ডাকাত ধরা
পড়েছিল। ডাকাত ধরার কিছুদিন পরেই দাদির হাতের কলশিটা পেয়েছিলাম গাংগ খাইলা (গাংগ খাইলা দেখতে কাইশার মতো, কিন্তু কাইশার চেয়ে বড় এবং মোটা এক জাতের
বন) বনের মাঝে। আগেই বলেছি, আমাদের বাড়ি একেবারে নদীর পাড়ে পড়েছিল। তাই বর্ষা মাসে
নদীতে জোয়ার এলে নদীর পাড় ডুবে জল সর জমিনে উঠে আসত। তখন প্রচণ্ড স্রোত পড়ত। সেই স্রোত বাধা দেওয়ার
জন্য আমাদের বাড়ির সামনে গাংগ খাইলা বুনেছিল। ডাকাতরা দৌড়ে যাওয়ার সময় হয়তো
সেই গাংগ খাইলাই বাধা পেয়ে কলশিটা পড়ে গিয়েছিল।
হকের মাল গংগাও মারে না। এর প্রমাণ
আমি একদিন নিজেও পেয়েছিলাম। সেদিন ছিটা ছিটা বৃষ্টি পড়ছিল। আমি ছাতা নিয়ে নদীর
পাড়ে সিরাজ ভাইর বাড়ির পাশে থাকা খালের মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আশ্বিন মাস। জল
শুকানোর সময়। খাল দিয়ে তখন প্রচণ্ড বেগে চকের জল নেমে আসছিল। আমি খালের মুখে
দাঁড়িয়ে সেই জলের তামাশা দেখছিলাম। হঠাৎ ঝাপটা বাতাস এসে আমার ছাতাটা উড়িয়ে নিয়ে নদীর জলে ফেলল।
নদীতে তখন তেমন স্রোত ছিল না। তাই খালের জলের স্রোত নদীতে পরে দক্ষিণ দিকে নদী
পাথালি অনেক দূর পর্যন্ত যাচ্ছিল। ছাতাটা ফুলানো অবস্থায় ছিল এবং পরার সময় চিত হয়ে পড়েছিল। তাই খালের জলের স্রোতে আমার ছাতাটা নদীর মাঝ বরাবর ভাসিয়ে নিতে লাগল। আমি নিরাশ হয়ে ছাতাটার দিকে চেয়ে রইলাম। চোখে দেখছি, কিন্তু করার কিছুই নেই। আকাশের চন্দ্রের মতো। চন্দ্র দেখা যায়, কিন্তু
হাত দিয়ে ধরা যায় না। চন্দ্রের মতোই ছাতাটা আমি দেখছি ঠিকই, কিন্তু হাত দিয়ে ধরতে পারছি না! দেখতে দেখতে ছাতাটা অনেক দূর চলে গেল। শেষে ছাতাটা একটা ফুটবলের মতো দেখা যেতে লাগল। ছাতাটা গেল। কি আর করা
যাবে! আমি হতাশ হয়ে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস বইতে
লাগল এবং ছাতাটা ধীরে ধীরে পাড়ের দিকে আসতে লাগল। ছাতাটা লক্ষ্য করে আমি নদীর পাড়ে পাড়ে ভাটির দিকে যেতে লাগলাম। অল্প পরেই ছাতাটা খানিকটা
ভাটির দিকে পাড়ে এসে ভিড়ল। আমি পাড় থেকেই ছাতার ডাণ্ডি ধরে পাড়ে তোলে মাথায়
দিয়ে বাড়ি চলে এলাম।
সেদিন থেকে আমার মনে একটা ধারণা
গড়ে উঠেছে, যে কেউ কারও জিনিষ হজম করতে পারে না, যদি
হকের জিনিষ হয়। দু’দিন পরে অন্যভাবে হলেও ফিরিয়ে পাওয়া
যায়।
ডাকাতি সংঘটিত হওয়ার কিছুদনি পরেই
আমরা বাড়ি স্থানান্তর করে বাঘবর পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত বাঘবর পাথারে উঠে
এসেছিলাম। আমাদের পাড়ার প্রায়
সবাই সেখানে উঠে এসেছিলো। পাড়াটা চড় পাড়া নামে খ্যাত হয়েছিল। পাহাড় থেকে মোটে
ছয় সাত রশি দূরে ছিলো আমাদের
নতুন পাড়াটা।
আমি তখন বাঘবর থেকে হেঁটে সাতমুখি
স্কুলে যাতায়াত করতাম। আগে আমাদের পাড়ার বাড়িগুলি ফাঁক ফাঁক ছিল। নতুন পাড়ায় উঠে আসার পর আমাদের ঘেষাবাড়ি হলো। এবাড়ি থেকে ও বাড়ির দূরত্ব মোটে একটি করে গৃহের ব্যবধান। ব্রহ্মপুত্র নদের বালু পড়ে জায়গাটা টান(উঁচা) হয়েছিল। তাই বর্ষার
মরশুমেও চলাফেরা করায় অসুবিধা হতো না। বাঘবর হাটও একেবারে কাছে
হলো। তাই মন্দ লাগছিল না নতুন পাড়ায়।
অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ
১৯৮০ সাল। বাঘবর পাথারে উঠে আসার পর
একদিন আলীগাঁও এলাম। সেখানে এসে দেখি নাটকের রিহার্সেল চলছে।
সোহরাব-রুস্তম, বাঙালির শেষ নামাজ, দাতাকর্ণ এই তিনটি
নাটকের রিহার্সেল চলছিল। আলীগাঁও অঞ্চলে তখন অনেক প্রতিভাবান অভিনেতা ছিল। ফয়জল
হক, অখিল সূত্রধর, নারায়ন ঘোষ,
বাহারুল ইসলাম, সামচুল হক, ইদ্রিস আলী, বাবুল বসাক প্রভৃতি।
ফয়জল হকতো প্রথম শ্রেণির অভিনেতা
ছিলেন। সুযোগ পেলে সিনেমায়ো অভিনয় করতে পারতেন।
তাঁরা পেশাদার দল খুলবে। মিলন
থিয়েটার।
আমি বললাম- তাহলে বালাজান থেকেই
প্রথম শুরু করুন।
তাঁরা রাজি হয়ে গেল। আমি বালাজান
এসে কয়েকজনের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করাতে সবাই রাজি হয়ে গেল এবং একটি কমিটি গঠন করে আলীগাঁও এসে দল বায়না করলাম। দল বায়না করার পরে আমরা
বালাজান এসে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি চালালাম।
সাতদিন পরেই গান হবে। আমাদের
প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। প্রচারও ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সিজন টিকট বিক্রী শুরু
হয়েছে। অনেকে টিকট কিনছেও।
এর মধ্যে একদিন আলীগাঁও থেকে আমাকে
খবর পাঠাল। আমি আলীগাঁও যেতে হয়। জরুরি কথা আছে। খবর
পেয়ে আমি আলীগাঁও এলাম। সেখানে এসে জানতে পারলাম, গান হবে না। অভিনেত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আসামে বিদেশী বিতাড়ন
আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের জন্য আসামের পরিবেশ থমথমে। বরপেটা রোড থেকে অভিনেত্রী
আসার কথা ছিল। আসাম আন্দোলেনের জন্য তারা আসবে না।
আমি বললাম- এখন কি হবে? প্যাণ্ডেল, প্রচার প্রভৃতির জন্য আমরা ইতিমধ্যে অনেক খরচ করে ফেলেছি। সিজন টিকটও বিক্রী করেছি। এখন নাটক না
হলে আপনাদের ক্ষতি পূরণ দিতে হবে।
নারায়ন ঘোষ বলল- একটা উপায় অবশ্যে
আছে। কোচবিহার থেকে অভিনেত্রী আনতে হবে। তাই তোমরা আমাদের কিছু টাকা অগ্রিম দিতে হবে।
আমি বললাম- ঠিক আছে। কত টাকা লাগবে?
এই ধর, চার পাঁচশোর মতো। নারায়ন ঘোষ বলল।
কোনদিন যাবেন?
সময় নেই। এক সপ্তাহ পরেই নাটক।
নারায়ন ঘোষ বলল- কালই যেতে হবে। তোমাকেও যেতে হবে আমাদের সাথে। টাকা কিছু বেশি
করেই নিও। প্রয়োজন হলে অভিনেত্রীদের বায়না হিসেবে অগ্রিম দিতে হবে।
পরের দিন নারায়ন ঘোষ, বিমল শীল এবং আমি কোচবিহার অভিমুখে যাত্রা করলাম। হেঁটে
লেংটিসিঙা এসে বাসে করে বঙ্গাইগাঁও গিয়ে রে’লে চড়ে পরের
দিন দিনের দশটা নাগাদ কোচবিহার পৌঁছোলাম।
সেখানে স্টেসনের পাশেই সুভাষ গাংগুলীর ড্রেসের দোকান ছিল। সে ড্রেস
ভাড়া দিত। তাঁর সাথে নারায়ন ঘোষের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। সুভাষ গাংগুলীর সাথে
অভিনেত্রী সম্পর্কে আলোচনা করার পর সে বলল- মেয়ে অবশ্যে আছে। তবে টাকা বেশি লাগবে।
প্রতি নাইট পাঁচশ করে। যাতায়াত, থাকা খাওয়ার খরচ
আপনাদের।
নারায়ন ঘোষ বলল- আমরা রোডের
মেয়েদের তিনিশ করে দিই। পাঁচশ হলে বেশি হবে।
সুভাষ গাংগুলী বলল- এখন যাত্রার
সিজন। এখানেই অনেক বায়না আছে। আসাম গেলে, পাঁচশর
কমে কেউ যাবে বলে মনে হয় না।
ইতিমধ্যে নরেশ ঘোষ এবং একটি মেয়ে
এল। সুভাষ গাংগুলী তাদের ডেকে বলল- মালতী, এই দিকে
আয়। আসাম থেকে বায়না এসেছে। যাবি? গেলে বন্দবস্ত করে দিই।
মেয়েটি কাছে এসে বলল- যেতে পারি।
আসাম গেলে টাকা বেশি লাগবে। ছশ করে দিতে হবে।
সুভাষ গাংগুলী বলল- আমি পাঁচশ করে
বলেছি।
মেয়েটি বলল- পাঁচশ হলে কম হবে। যাক, আপনি যখন বলেছেন। হবে। কোনদিন যেতে হবে?
নারায়ন ঘোষ বলল- কালই যেতে হবে।
মেয়েটি বলল- হবে। অসুবিধে নেই।
সুভাষ গাংগুলী নরেশ ঘোষকে বলল-
লক্ষ্মী কোথায়? সে যেতে পারবে না-কি?
নিশ্চয় পারবে। নরেশ ঘোষ বলল- সে এক
জায়াগায় বায়নায় গেছে। কাল সকালে ফিরবে।
সুভাষ গাংগুলী নরেশ ঘোষকে দেখিয়ে আমাদের বলল- লক্ষ্মী এর মেয়ে। বয়েস
কম। তাই রোল করে না। নাচে। ছোট-খাট রোল হলে করতে পারবে।
নারায়ন ঘোষ বলল- আমাদের একটি মেয়ে
হলে তো হবে না। আরও দু’জন লাগবে।
সুভাষ গাংগুলী বলল- মালতী, তুই যোগার করতে পারবি?
মালতী বলল- মারোগঞ্জে শেফালি আছে।
তাকে বললে যাবে। আর তো কাউকে দেখছি না।
নারায়ন ঘোষ বলল- দু’জন হলেও চালাতে পারব।
এভাবে মোটা-মুটি মেয়ে বন্দবস্ত
হলো।
মালতী বলল- এখনতো বন্দবস্ত হলোই।
মিষ্টিমুখ করান।
একটি চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেলাম।
মালতীর কোলে একটি তিন চার বৎসরের
ছেলে ছিল।
চা খাওয়ার পর মালতী ছেলেটিকে
দেখিয়ে বিমল শীলকে বলল- দাদা, এর জন্য একটি
সোয়েটার কিনে দিন। সোয়েটার নেই। আসাম গেলে সোয়েটার ছাড়া যাওয়া যাবে না।
আমরা সোয়েটার কিনে দিলাম। মালতী
চলে গেল।
শীতের দিন। তাই এটা ওটা করতে করতে
সন্ধ্যে হয়ে গেল। নরেশ ঘোষ বলল- চলুন আমাদের বাসায়। পাশেই বাসা। গরিবখানা দেখে
আসবেন।
আমরা নরেশ ঘোষের বাড়ি গেলাম।
স্টেশনের পেছনেই একটি টিনের ছাপড়া। আমরা গিয়ে নরেশ ঘোষের স্ত্রীর পাশে বসলাম।
সে বাইরে একটি টিনের চৌকায় রুটি
সেক্ছিল। বিমল শীল রুটি সেকতে লাগল।
নরেশ ঘোষ লক্ষ্মীর মাকে বলল- এরাঁ লক্ষ্মীকে আসাম নিতে
চাইছে।
লক্ষ্মীর মা বলল- ও তো এখন ছোট। মোটে বার বছর। রোল করতে পারবে না। নাচতে পারে।
নারায়ন ঘোষ বলল-
চলবে। যদি সম্ভব হয় ছোট-খাটো রোল করাব।
ইতিমধ্যে আমার পায়খানা লাগল। কারেন্ট নেই। তাই কুপা নিয়ে পায়খানায় গেলাম। পায়খানা করে আসার পর লক্ষ্মীর
মা বলল- কুপিটাকে স্নান করিয়ে নিয়ে
আসুন।
আমি কুপায় জল ঢেলে স্নান করিয়ে
চৌকার পাশে এসে বসলাম।
লক্ষ্মীর মা বিহারি। বাবা বাঙালি।
লক্ষ্মীর বাবা যাত্রাদলে হারমণিয়াম বাজায়। লক্ষ্মী নাচে। এই লক্ষ্মীই পরে আসাম
এসে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আসাম এসে সে নানা যাত্রাদলে অভিনয় করেছে। শেষে সে ভেড়ারভিটার
এক যাত্রাদলের মেনেজারকে বিয়ে করে আসামই থেকে গেছে।
তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। তাই আমরা
রাতে একটি হোটেলে আশ্ৰয় নিলাম। পরের দিন আমরা মারুগঞ্জ
গেলাম শেফালির সাথে কথা বলতে। শেফালি বাড়ি নেই। কোথাও বায়নায় গেছে।
শেফালির মা বলল- শেফালি তিন চার দিনের আগে যেতে পারবে
না।
আমরা নিরাশ হয়ে কোচবিহার এসে কথাটা
সুভাষ গাংগুলীকে বললাম। নরেশ ঘোষও সেখানে উপস্থিত ছিল। নরেশ ঘোষ বলল- কলা বাগান
চলুন। সেখানে ভালো অভিনেত্রী আছে। তাদের সাথে কথা বলে দেখুন।
কলাবাগান। নিষিদ্ধ পল্লী। কলাবাগান গিয়ে আমরা ভারতী এবং লিলিকে ঠিক করলাম। লিলি খুবই উঁচো
পর্যায়ের অভিনেত্রী ছিল। তার অভিনয় দেখে সবাই মুগ্ধ হয়েছিল। লিলি অভিনয়ে তেমন
ভালো ছিল না। চালিয়ে নিতে পারত।তবে দেখতে খুবই সুন্দরি
ছিলো।
লক্ষী এক জায়গায় বায়নায় গিয়েছিলো। সে একদিন পরে আসবে। তাই দুদিন পর আসাম আসতে হবে। অর্থাৎ আরও দু’দিন
কোচবিহার থাকতে হবে। এদিকে আমার স্কুল আছে। তাই আমি নারায়ণ ঘোষ এবং বিমলকে রেখে সেদিন দুপুরেই বাসে করে আসাম রওয়ানা হলাম। সন্ধ্যের আগে আগে এসে আমি গৌরিপুর পেলাম। কিন্তু
গৌরিপুর এসে দেখি বরপেটার বাস নেই। তাই আমি নিরুপায় হয়ে ছেলেবেলা ও কর্মজীবনের বন্ধু আব্দুল জব্বারের বড় ভাই শরিফ ভাইর ভাড়াঘরে রাত কাটিয়ে পরের দিন বিকেলে বাড়ি এলাম। শরিফ ভাই গৌরিপুরে মার্কেটিং
সোসাইটিতে চাকরি করতেন।এর আগেও একবার আব্দুল জব্বারের সাথে গিয়ে শরিফ ভাইর ভাড়াঘরে দু’দিন থেকে
এসেছিলাম। তাই শরিফ ভাইর ভাড়াঘর খুঁজতে আমার অসুবিধা হয়নি। এদিকে দুইদিন পর নয়, সেদিন রাতেই ভারতী, লিলি এবং লক্ষ্মীকে নিয়ে ট্রেনে চেপে নারায়ণ
ঘোষ এবং বিমল আসাম রওয়ানা হয়েছিলো এবং পরের দিন আমার আগেই আলীগাঁও এসে পৌঁছেছিলো। কারণ লক্ষী একদিন পর
নয়, আমি আসাম রওয়ানা হয়ে আসার পরই বাড়ি এসে পৌঁছেছিলো। তখন মোবাইলের প্রচলন
ছিল না বলে সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া কারও সাথে যোগাযোগ
করা সম্ভব ছিল না।
রিহার্সেলের পর বালাজান নিৰ্দ্ধারিত সময়েই নাটক অভিনীত হলো৷ মোটা-মুটি ভালোই অভিনয় করেছিল।
এর পরে মিলন সংঘ নগরবেড়ার টুপামারি, কাদং
অঞ্চলে অভিনয় করে বিশেষ নাম করেছিল। তারপরে অবশ্যে দল আর চলেনি। মানে অর্থের অভাবে চালাতে পারেনি।
অভিনয়ে হাতেখড়ি
বালাজান এম,ই মাদ্রাসার বার্ষিক অধিবেশনে নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। নাটক নির্বাচন করা হল ‘গরিবের মেয়ে’। বাংলার নবাব শুজাউদ্দিনের সময়ের ঘটনা। নাটকের
রিহার্সেল শুরু হলো। কিন্তু কে কোন রোল করবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ কারও নাটক করার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। সবাই নতুন। আমারও নাটকে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা নেই। আমি নাটক পড়তাম। গান-বাজনা ভালো বাসতাম, কিন্তু
নাটকে রোল করার তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। কাদং হাইস্কুলের বার্ষিক অধিবেশনে নাটক অভিনীত হতো। নাইনের বৎসর একটি নাটকে
একজন বান্দার চরিত্রে কয়েকদিন রিহার্সেল করেছিলাম। ভালোই অভিনয় করেছিলাম। আমাকে
রোলটা দিয়েই দিয়েছিলেন সামেজ উদ্দিন স্যার। সামেজ উদ্দিন স্যার নাটকের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।
কাশেম স্যারও নাটকে অভিনয় করতেন। তিনি ভালোই অভিনয় করতেন। প্রথম কয়েকদিন তিনি রিহার্সেলে উপস্থিত ছিলেন না। কোথাও গিয়েছিলেন। এই সময়েই আমাকে রোলটা দিয়েছিলেন সামেজ উদ্দিন স্যার। একদিন আবুল কাশেম স্যার রিহার্সেলে এসে আমাকে বান্দার রোল করতে দেখে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন- তুমি রিহার্সেল করছ? অভিনয়
করবে না-কি?
আমি কিছু বললাম না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন সামেজ উদ্দিন
স্যার বললেন- হ্যাঁ, ওকে দিয়েই বান্দার রোলটা করাব ভেবেছি। ভালোই করছে।
কাশেম স্যার বললেন- না, ওকে দিয়ে রোল করানো
যাবে না। অন্য কাউকে রোলটা দিন। এভাবে বলেই তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, বাড়ি যাও। তোমার
জন্য অভিনয় নয়। বাড়ি গিয়ে বই পড়গে’। ভালো রিজাল্ট করতে হবে। অভিনয় এক নেশা। নেশা ধরে গেলে এড়ানো কঠিন। এখন লেখা-পড়া কর, পরে অভিনয় করার ঢের সময় পাবে।
আমি তখনই চলে এসেছিলাম এবং অভিনয়
করার শখ সেখানেই ইতি পড়েছিল।
একদিন একটি একাংকিকায় অভিনয় করেছিলাম রঙিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে
প্রশিক্ষণে থাকার সময়। সেদিন আমি একজন ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। নাটকের নাম ছিল ‘চাকর'। লেখক কে ছিলেন এবং চরিত্রের নাম কি ছিল এখন মনে নেই। ঘটনাটা ছিল গতানুগতিক। গৃহস্থ তার দীর্ঘদিনের পুরানা বৃদ্ধ চাকরকে চুরির অভিযোগে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে
দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আসলে চাকরের কোনো দোষ ছিল না। অন্য কেউ
চুরি করেছিল এবং সেই দোষ চাকরের ওপড় চাপিয়েছিল। তখন আমি তার বিরোধিতা করে চাকরের পক্ষ নিয়ে বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। শেষে বাবা তার
সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেদিন সেই একাংকিকায় বাবার রোল করেছিলেন এসাহাক আলি আহমেদ এবং চাকরের রোল করেছিলেন সেকান্দার আলি। উভয়ে আমার মতোই প্ৰশিক্ষাৰ্থী ছিলেন। সেদিন মনে হয়, আমরা ভালোই অভিনয় করেছিলাম। আমাদের
গোস্বামী উপাধির একজন বয়োবৃদ্ধ প্রশিক্ষক (ইন্সট্রাক্টর) ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আবার
যদি নাটক করি, তাহলে যেন তাঁকে আমাদের নাটকে রোল দেওয়া হয়। এই মন্তব্যের পর আমরা
স্বাভাবিকতই উৎসাহিত হয়েছিলাম।
তারপর আর কোনদিন অভিনয় করিনি।
যেহেতু কাদং হাইস্কুলে পড়াকালীন আমি দু’দিন
বান্দার চরিত্রে রিহার্সেল করেছিলাম, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে
আমি বান্দার রোল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রিহার্সেল শুরু করলাম। আমি বান্দা, ওয়ারেশ মাষ্টার সাহেব সুজা-উদ-দ্দৌলা, আব্দুল হালিম কংকন এবং আমজাদ তাপস। সরফরাসের চরিত্রে রিহার্সেল
করছিল কিতাব আলী। আব্দুল হালিম মরাভাজ প্রাইমারি স্কুলের এবং আমজাদ হোসেন বালাজান
এম, ই মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। ওয়ারেশ আলী
সাতমুখি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাপক শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাগত অর্হতার জন্য
স্কুল সরকারিকরণ করার সময় তিনি বাদ পড়েছিলেন। কিতাব আলী স্থানীয় পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার ছিলেন।সেই নাটকে ময়সের আলী,
সাইফুল ইসলাম, ময়নুল হক প্ৰভৃতিরা অভিনয় করেছিলো। এরা সবাই এখন শিক্ষক। তখন ছাত্ৰ
ছিলো।
একদিন কিতাব আলী রিহার্সেলে উপস্থিত
ছিলেন না। তাই আমি সরফরাসের
চরিত্রে প্রক্সি দিচ্ছিলাম। তখন ওয়ারেশ মাষ্টার বললেন-আপনাকেই সরফরাসের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। ভালো অভিনয়
করছেন। এরকম চরিত্রই আপনি ভালো করবেন।
সেবার সরফরাসের চরিত্রে অভিনয় করে
ভালোই প্রশংসতি হয়েছিলাম। এর পর থেকে নাটক করলে মুখ্য চরিত্রই আমাকে দেওয়া হতো।
এর পরে বিদায় সেলাম, কহিনূর, নিহত গোলাম,
সোরাব-রুস্তম, আলমগীর, পাণিপথ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেছি। কহিনূর নাটকে গোলাম কাদের, নিহত গোলাম নাটকে ইব্রাহিম খাঁ, পাণিপথ
নাটকে বাবর, সোরাব-রুস্তম নাটকে কায়কাউস, আলমগীর নাটকে ঔরঙ্গজেব, বিদায় সেলাম নাটকে রেজা খাঁ
প্রভৃতি চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমাদের দ্বারা অভিনীত গরিবের মেয়ে নাটকটি খুবই
জনপ্রিয় হয়েছিল। নাটকটি আমরা একাধিকবার বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করেছি। তখন আমাদের
সাথে অভিনয় করতো বিল্লাল হোসেন, ময়সের আলী, আমজাদ হোসেন (এরা বালাজান এম, ই মাদ্রাসার শিক্ষক),
ইউসুফ আলী, আব্বাছ দর্জি, ময়নুল হক, সাইফুল ইসলাম প্রভৃতিরা। আরও অনেকে
ছিল যদিও তাদের নাম এখন মনে নেই।
অভিনয়, শিক্ষকতা, গীত রচনা, সাহিত্য চর্চা, তাস খেলা, মাছ শিকার প্রভৃতি নিয়ে ভালোভাবেই দিন কাটছিল। এর মাঝেই বিড়ম্বনা দেখা দিল। আমাদের পাড়ায়
মেলেরিয়ার প্রকোপ শুরু হলো। প্রায় সব বাড়িতেই মেলেরিয়া রোগী। কেঁপে কেঁপে জ্বর
আসে। ঘাম দিয়ে ছাড়ে। সেই জ্বরে কয়েকজন মারাও গেল। আমার ছোট ভাই জহুরুল হকও সেই
জ্বরে মারা গিয়েছিলো। আমরা পাঁচ ভাই, দু’বোন ছিলাম। ভায়ের মাঝে আমি জ্যেষ্ঠ। হোসেন আলী দ্বিতীয়।
তারপরে জহুরুল হক, সামচুল হক এবং ওমর ফারুক কিব্রিয়া। বোনের
মাঝে খোদেজা খাতুন এবং জেলেকা খাতুন। আমরা সবাই বেঁচে আছি। একমাত্র জহুরুল হকই ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিচেম্বরে মেলেরিয়া
জ্বর হয়ে মারা গেছে।
জহুরুল খুবই কর্মঠ এবং শক্তিশালী
ছিল। একদিনের একটি ঘটনা বলি।বাঘবর হাট তখন আমাদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একদিন আমি হাটে ধান কিনে জহুরুলকে সাইকেলে করে বাড়ি নিয়ে যেতে বললাম।
জহুরুল বলল- সাইকেল লাগবে না। আমার
মাথায় তোলে দাও।
আমি বললাম- দু’মোন ধান, মাথায় করে নিতে পারবি না।
সাইকেলে করে নিয়ে যা।
জহুরুল বলল- মাথায় করেই নিতে পারব। সাইকেল লাগবে না।
অগত্যা দু’জনে ধরে তার মাথায় ধানের বস্তা তোলে দিলাম। ও অনায়াসে বাড়ি নিয়ে এল।
জহুরুল ভালো হা-ডু-ডু খেলতে পারত। হাডুডু খেলার জন্য অনেকে তাকে চিনত। আমাদের নিষেধ সত্ত্বেও সে ভাড়ায় (হায়ারে) হা-ডু-ডু খেলতে যেত। জহুরুল তখন হাইস্কুলের ছাত্র। ক্লাস এইটে পড়ত।
মরার আগের দিন জহুরুল আমাদের
আত্মীয়-স্বজন প্রায় সবাইকে দুধের পিঠা খাওয়াবে বলে দাওয়াত করে এনেছিলো। বালাজান বাজারে গিয়ে
দুধ কিনে আনার সময় দুই একজন ঠাট্টা করে
বলেছিল- কিরে, এতো দুধ কিনছিস, আমাদেরও
নিমন্ত্রণ দিবি না-কি?
তখন জহুরুল বলেছিল- বাড়িতে মাইক
বাজলে যেও।
জহুরুল মরার পর কে একজন এসে আমাদের
এই কথা বলে আক্ষেপ করেছিল।
সেদিন দুধের পিঠা বানিয়েছিল।
জহুরুল রাতে দুধের পিঠা খেয়েও ছিল। পরের দিন সকালে পিঠা খেতে আসার সময় ঘরের বারান্দায় উঠতে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে
গিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ নৌকাযোগে গোয়ালপাড়া সিভিল হস্পিটালে নিয়ে গিয়ে ভর্ত্তি
করিয়েছিলাম এবং হস্পিটালেই রাত একটায় মারা গিয়েছিল।
জহুরুলের মৃত্যুতে শুধু আমরাই নই, আমাদের পাড়ার সবাই মর্মাহত হয়ে গিয়েছিল।
কেন জহুরুল আমাদের বলা-কওয়া ছাড়াই
আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে এনেছিল এবং মাইক বাজলে যেও বলেছিল সে কথা ভাবলে
এখনও মর্মাহত হয়ে পড়ি। মৃত্যুর আগে হয়তো
মানুষের মনে জানান দেয় এবং তখন সে এমন আচরণ করে, যে
আচরণ চিরদিনের জন্য মনে দাগ কেটে থাকে!
জহুরুল মারা যাওয়ার চার মাস পরে
আমাদের একমাত্র কাকা ভেলু মিঞাও একদিন হঠাৎ মারা যান। দাদী বাহারজান নেসা মারা গিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। দাদী মারা যাওয়ার প্রায় এক দশক পরে ১৯৮৩ সালে পর পর দু'টি মৃত্যু আমাদের কাছে প্রচণ্ডভাবে মর্মান্তিক ছিলো।
চিকিৎসার সাথে জড়িত
জহুরুল হকের মৃত্যুর পরেও
মেলেরিয়ার তাণ্ডব অব্যাহত ছিল। তখন ডাক্তারের স্বল্পতার জন্য চিকিৎিসা ঠিক মতো
হচ্ছিল না।
তখন বাঘবর অঞ্চলে একমাত্র ডাক্তার
ছিলেন মোকসেদ আলী। গরেমারি
পাথারের লোক। এমবিবিএস নয়। এলএমপি পাস ডাক্তার। অনেকে তখন ডাক্তারি বিষয়ে
অধ্যয়ন না করেই কোন একজন ডাক্তারের অধীনে কিছুদিন প্রেকটিস করে কলকাতা থেকে সার্টিফিকেট কিনে এনেও ডাক্তারি করতেন।ডাক্তারের স্বল্পতার জন্য সরকার তাঁদেরকে গ্রাম্যাঞ্চলের হসপিটালে নিয়োগ করতো। তবে মোকসেদ আলী সত্যিকারেই এলএমপি পাস ছিলেন। তিনি প্রতিটি মেলেরিয়া ইনজেকশ্বনের
জন্য দশ টাকা করে নিতেন। আমাদের পাড়ার সবাই তখন নদীর ভাঙনের কবলে পতিত
লোক। জমি-জমা নদীর পেটে। আয়ের কোনো উৎস নেই। তাই দশ টাকা করে দেওয়াটাই তাদের পক্ষে কঠিন ছিলো। টাকার জন্য অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারত না।
বাঘবর সপ্তাহে দুদিন হাট বসত। বুধবার
এবং রোববার। বাঘবর বাজারে তখন মজিদভিটার আব্বাছ আলী নামের একজন লোক হাট বারে ঔষধ বিক্রী করতেন। আমি প্রায়ই তাঁর দোকানে বসে থাকতাম। কথায় বলে, খাতির
রেখ ওষুধের দোকানী(ফার্মাসিষ্ট) এবং আতরের বেপারির সাথে। কারণ ঘ্রানেন অর্ধ ভোজনং। আমি অবশ্যে সে জন্য নয়, সময় কাটানোর জন্যই তাঁর দোকানে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমি হাটের দিন সময় কাটানোর জন্য আলীগাঁও বাজারের নিরোদ সাহার দোকানেও বসে থাকতাম মাঝেমধ্যে। নিরোদ সাহা কাপড়ের দোকানী ছিলেন। নিরোদ সাহাকে আমি মামা বলে ডাকতাম। তাঁর
দোকানটা খুবই ছোট ছিল। কয়েকটা লুংগী, শাড়ী
এবং গামছা নিয়ে বসে থাকতেন। তাঁকে আমি একদিন এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলেছিলেন- কাপড় অবশ্যে বেশি করে তুলতে পারি, কিন্তু
অসুবিধা আছে। কাপড় বেশি থাকলে গ্ৰাহকেরা বাকি নিবে। আমার চালান কম। তাই বাকি দিলে আমার দোকান লাটে উঠবে। একটি কথা মনে রেখ, লাখ টাকা চালান নিয়ে দোকান দিলে সেই দোকান আদৌ টিকে না। যে
কম টাকা চালান নিয়ে দোকান শুরু করে, তাঁর দোকানই শেষ
পর্যন্ত টিকে থাকে।
তিনি অবশ্যে কথাটা মিথ্যা বলেনি। আমি পাণ-তাম্বুলের দোকানী থেকে বড় গেলামালের দোকানী হতে দেখেছি।
প্রথমেই বেশি চালান নিয়ে দোকান শুরু করা বড় বড় দোকানীকে লাটে উঠতে দেখেছি। শুধু টাকা থাকলেই ব্যবসায়ী হওয়া যায় না।
ব্যবসা শিখে তবে ব্যবসা করতে হয়।
এখন কাজের কথায় আসি। সেদিন আমি
আব্বাস আলীর দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ মেলেরিয়ার চিকিৎসার কথা উঠল।তখন আব্বাস আলী
বললেন- না, মেলেরিয়ার ঔষধের দাম তেমন বেশি না। পনের
টাকা হলে ত্রিশ এম্পলের একটা ক্লুর’কুইনের শিশি পাওয়া যায়। দুই এম্পল করে ইনজেকশন দিতে হয়। তাই একটা ইনজেক্শ্বন মাত্র এক টাকা করে পরে। আপনি এক কাজ
করুন। ইনজেক্শ্বন দেওয়া শিখুন। আমি শিখিয়ে দেব। আগামী হাটে আমি সিরিঞ্জ নিয়ে
আসব।
তখন এখনকার মতো ‘ওয়ান টাইম’ সিরিঞ্জ ছিল না। কাঁচের
সিরিঞ্জ ছিল। একটা সিরিঞ্জ এবং সুঁই দিয়ে শত শত রোগীকে ইনজেক্শ্বন দেওয়া যেত।
আব্বাস আলী পরের হাটেই সিরিঞ্জ ও সুঁই নিয়ে এলেন। আমি পনের টাকা দিয়ে একটি ক্লুর’কুইনের শিশি নিয়ে এলাম। পরের দিন থেকে মরণে শরণ দিয়ে ইনজেক্শ্বন দেওয়া শুরু করলাম। ভাবটা ছিল, ইনজেকশন দেওয়ার দরুন, আমাকে যদি বিপদে পড়তে হয়, পড়ব, তবুও যেন বিনা চিকিৎসায় মেলেরিয়া রোগী মারা না যায়।
সকাল বেলা রোগীর ভিড় লাগত। বিনা
পয়সায় ইনজেশ্বন দিতাম। রোগীও ভালো হতো।
এখনও আমি ভেবে ঠিক করতে পারি না, রোগীর জীবন নিয়ে এভাবে খেলা করাটা কি ঠিক হয়েছিল? অবশ্যে আমার হাতে কোনো রোগী মরেনি। বলতে গেলে, একশ
শতাংশ রোগীই ভালো হতো।
রোগীর কথাই যখন উঠেছে তখন চিকিৎসা সম্পর্কিত দু’টি
ঘটনা বলি। প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৩ সালে। আমার শশুড় আব্বার চোখের অসুখ ছিল।
তাঁকে নিয়ে একদিন আমি কোচবিহার গিয়েছিলাম। শীতের দিন। শশুড় বাড়ি অর্থাৎ
ভেড়ারপাম থেকে বিকেল তিনটেয় কোচবিহারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। বরপেটারোড থেকে বিকেল সারে পাঁচটার রেলে চড়লাম।
মিটারগজ রেল। গরুর গাড়ীর মতো চলে। বাসের মতো রাস্তায় রেল থামিয়েও লোক উঠা-নামা
করে। সকাল ছয়টায় কোচবিহার পেলাম। স্টেশনের পাশের একটি চায়ের দোকানে চা খেয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম।
সকাল দশটায় ডাক্তার এলেন। রোগীর ভিড় লেগে ছিল। তাই ডাক্তার দেখিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেড়োতে বারটা পার হয়ে গেল। একটি ফার্মাসিতে
গিয়ে ওষুধও কিনলাম।
আমার তখন খুবই ক্ষিদে পেয়েছে। আগের
দিন বিকেল তিনটেয় ভাত খেয়েছি। এর মাঝে রেলে শুধু তিন চারটে কমলা এবং কোচবিহার
নেমে একবার চা খেয়েছি। আমি আমার শশুড় আব্বাকে বললাম- আব্বা, ক্ষিদে পেয়েছে। চলুন ভাত খেয়ে নিই।
শশুড় আব্বা বললেন- চল, আমারও ক্ষিদে
পেয়েছে। ভাত খেয়ে নিলে ভালো লাগবে।
একটি হোটেলে গেলাম। হিন্দু হোটেল।
শশুড় আব্বা হিন্দু হোটেলের কথা শুনেই বললেন- যদি কোথাও মুসলিম হোটেল আছে, সেখানে
চল। আমি হিন্দু হোটেলে ভাত খাব না। যদি মুসলিম হোটেল পাওয়া না যায়, অসুবিধা নেই। তুমি
খেয়ে নাও। আমি না খেলেও অসুবিধা হবে না।চা-টা খেয়ে নিব।
একজনকে মুসলিম হোটেলের কথা জিজ্ঞাসা
করলাম। সে বলল- কাছে কোথায় মুসলিম হোটেল নেই। মুসলিম হোটেল অনেকটা দূরে। রিক্সা
নিয়ে যেতে হবে।
দূরের কথা শুনে হতাশ হলাম। ভাত না
খেয়েই স্টেশনে এলাম। টিকট কাটতে গিয়ে দেখি আমার পকেটে টাকা নেই। আমি পাগলের মতো
এ-পকেট ও-পকেটে টাকা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু সব বৃথা! কোথাও টাকা নেই। শীতের দিনেও
আমি ঘেমে নেয়ে উঠলাম। শশুড় আব্বাকে কথাটা বলতেও লজ্জাবোধ হলো। শশুড় আব্বা কি
ভাববে? কেমন জামাই! সামন্য কয়টা টাকাও সামলাতে
পারে না! এরকম দুঃশ্চিন্তা আর কি!
এক সময় আমার অবস্থা দেখে শশুড়
আব্বা জিজ্ঞাসা করলেন- কি হয়েছে? পাগলের মতো কি খুঁজতেছ?
তখন আমি নিরুপায় হয়ে বললাম- টাকা পাচ্ছি না।
শশুড় আব্বা বললেন- টাকা পাচ্ছ না, মানে?
ভালো করে খুঁজে দেখ।
আমি বললাম- ভালো করেই খুঁজেছি।
কোথাও নেই।
শশুড় আব্বা বললেন- তাহলে এখন কি হবে? টিকেট
ছাড়া যাব কেমনে?
আমি বললাম- দেখি কি করতে পারি!
আমি স্টেশন মাষ্টারের কাছে গিয়ে
টাকা হারানোর কথা বললাম। স্টেশন মাষ্টার লোকটা ভালো ছিলেন। তিনি আমার মুখের দিকে চেয়ে বললেন- যান, বসে থাকুনগে’। ট্রেইন এলে ট্রেইনে চড়ে যাবেন। আমি টি,টি,ইকে বলে দেব।
টিকেটের সুরাহা হওয়ার পরে আমি ঠাণ্ডা মাথায় টাকা খুঁজতে লাগলাম।
তখন টাকা পেয়ে গেলাম। আমি টাকা রেখেছিলাম আণ্ডার প্যান্টের পকেটে। তখন এখনকার মতো
জাঙ্গিয়া ছিল না। সুতির কাপড় দিয়ে ঢোলা করে আণ্ডারপ্যান্ট বানিয়ে পড়তে হতো। ঢোলা আণ্ডারপ্যন্টের পকেটটা আমার পেছনে দিকে গিয়েছিল।
তাই টাকা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পেছনে হাত
দিতেই টাকা পেয়ে গিয়েছিলাম এবং দস্তুর মতো টিকেট কেটে বরপেটা রোড এসেছিলাম।
রাস্তায় টিটিই(ট্রেভেলিং টিকেট এক্সজামিনার) অবশ্যে আমাদের টিকেট চেক্ করেনি।
সেখান থেকে আমার একটা শিক্ষা
হয়েছিল, টাকা কোনোদিন এক জায়গায় রাখতে নেই, ভাগ ভাগ করে দুই তিনটি জায়গায় রাখা দর্কার।
আমার জীবনে আমি সাতজন লোকের উকিল
হয়েছি। হায়েত আলী নামের একজন লোকেরই আমি চার বার উকিল হয়েছি। প্রথম বউ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এবং দ্বিতীয় বউ মেলেরিয়া হয়ে মারা গিয়েছিল। তৃতীয় বউয়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তালাক দিয়েছিলেন। এখন চতুর্থ বউ নিয়ে ঘর-সংসার করছে।
বয়েসে ছোট হলেও উকিল শশুড় হিসাবে
হায়েত আলী আমাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ছেলেমেয়েরাও আমায় আপন নানার মতোই শ্রদ্ধা-ভক্তি এবং ডাকা-খোঁজা করে। আমিও তাদের আপন নাতি-নাতনির
মতোই স্নেহ করি।হায়েত আলী ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে এন্তকাল করেছেন।
হায়েত আলীর কানের রোগ হয়েছিল।
অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে এক সময় তিনি আমার পরামর্শ ছাড়া কিছুই করতেন না। তাই তাঁর কানের চিকিৎসার জন্য কয়েকবার তাঁকে নিয়ে
বরপেটা, গুয়াহাটীতে গিয়েছি। কিন্তু অসুখ ভালো হচ্ছে
না। তাই তিনি চিকিৎসার জন্য কোচবিহার
যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
১৯৭৬ সাল। তখন এখনকার মতো ভাবলাম, আর চলে গেলাম এরকম সুবিধা ছিল না। বাঘবর থেকে বরপেটা
আসতে হলেই চার পাঁচ দিন আগে থেকে ভাবতে হতো। আর
কোথায় কোচবিহার! পনের দিন আগে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অমুক দিন কোচবিহার যাব। আমরা
কোচবিহার যাওয়ার কথা শুনে পাড়ার আরও দশজন আমাদের সাথে কোচবিহার যাওয়ার
সিদ্ধান্ত নিল। জানি, এতগুলো লোক নিয়ে গেলে আমার অসুবিধা হবে।
কারণ কেউ লেখা-পড়া জানে না। রাস্তায় চলাফেরা করারও জ্ঞান নেই। তবুও মানা করতে
পারলাম না। অগত্যা নির্দ্ধারিত দিনে আমরা কোচবিহার রওয়ানা হলাম।
বরপেটা এসে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু
আব্দুল জব্বারের সাক্ষাৎ হলো। বলে কইয়ে তাকেও আমাদের সংগী করলাম। বরপেটা রোড গিয়ে রেলে চড়লাম। রেলে যাত্রীর ভিড়। তেরজন লোকের সবাই বসার
জায়গা পেলাম না। চার পাঁচজন দাঁড়িয়েই থাকতে হলো। ডাবাটায় কয়েকজন মিলিটারি ছিলেন। আমাদের সাথে হায়েত আলীর ছোট ভাই পলান আলী ছিল। তার পাশেই একজন বৃদ্ধগোছের মিলিটারি শোয়ে ছিলেন। পলান তাঁর শরীরে ধাক্কা দিয়ে বলল- উঠেন, জায়গা দিন। আপনারা শোয়ে যাবেন, আর আমরা দাঁড়িয়ে যাব নাকি?
আমিতো থ মেরে গেলাম। মিলিটারির
শরীরে ধাক্কা! কি যে হয়! কিন্তু মেলিটারি লোকটি কিছু বললেন না। তিনি শোয়া থেকে উঠে পলানকে বসতে দিলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
সকাল আটটায় কোচবিহার পৌঁছোলাম। সরকারি হাসপাতালে গেলাম। তখনও ডাক্তার আসেনি। এতোগুলো লোক! কিভাবে ডাক্তারকে
দেখাব এ নিয়ে ভাবা-গোনা করতেছি। এমন সময় একজন পঞ্চাশোর্দ্ধ বাবরি চুলের বেঁটে
লোক এসে বলল- আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?
আমি বললাম- আমরা আসাম থেকে এসেছি।
লোকটি আমাদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল- কয়জন রোগী আছে?
এঘার জন। আমি বললাম।
এতগুলো রোগীকে হাসপাতালে দেখাতে
গেলে অসুবিধা হবে। লোকটি বলল- সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাও তেমন ভালো হবে না।
প্রাইভেট ডাক্তার দেখালে ভালো হবে।
অবশেষে আমরা লোকটির কথা মতো
প্রাইভেট ডাক্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। লোকটি আমাদের ডাক্তার সুভাষ সাহার
চেম্বারে নিয়ে গেল। সুভাষ সাহা তখন খুবই নামকরা ডাক্তার। আসাম থেকে রোগী গেলে
প্রথমে তাঁর কাছেই যেতো। সুভাষ সাহা ছয়জন রোগী দেখলেন। তারপর লোকটি আরেকজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। সেই
ডাক্তারের নাম এখন মনে নেই। তিনি দেখলেন চারজন রোগী।
একটি ফার্মাসিতে গিয়ে ওষুধও কিনলাম। শেয়ে রয়ে গেল একজন রোগী। হায়েত আলীর বোন হামেলা খাতুন। সে জন্মান্ধ
ছিল। তখন বেলা গড়িয়ে গেছে। আমি লোকটিকে বললাম- আমাদের ক্ষিদে পেয়েছে। এখন
আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে চলুন।
লোকটি আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে এল। সেখানে আমরা ভাত খেতে বসলাম। লোকটিকেও ভাত খেতে বললাম।
তখন লোকটি বলল- আমার বাড়ি কাছেই। আমি আপনাদের বিদেয় দিয়ে বাড়ি গিয়ে ভাত খাব।
ভাত খাওয়ার পর আমি লোকটিকে বললাম-
আপনি আমাদের জন্য অনেক সময় দিয়েছেন। এখন শুধু একজন রোগী আছে। আমরাই দেখাতে পারব।
লোকটি আমার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে
রিক্সা ডেকে আনল। অগত্যা আমরা রিক্সায় চেপে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম।
ডাক্তার দেখালাম।আমার মনে তখন
লোকটিকে নিয়ে অন্য এক চিন্তা চেপে বসল। সারাদিন আমাদের সাথে ঘুরল। শেষে যে কত টাকা দাবি করবে! তাই আমি বললাম- সব কয়জন রোগী দেখানো হলো। এখন আমরা বাড়ি যাব।
লোকটি বলল- চলুন, আপনাদের রেলে উঠিয়ে দিয়ে আমি
আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেব।
রেল স্টেশনে এসে টিকেট কাটলাম।
টিকেট কাটার পর আমি লোকটিকে বললাম- আপনি আমাদের জন্য অনেক করেছেন। বলুন, আপনাকে কত টাকা দিতে হবে?
তখন লোকটি বলল- আমাকে এক টাকাও দিতে
হবে না। যা দেবার ডাক্তাররাঁই দিবে। আমি এরকম সেবা প্রায় বিশ বছর যাবত করে আসছি। টাকার কথা আমি কমই ভাবি। লোকের উপকারের কথা মাথায়
রেখেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা
আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন বেঁচে থাকা দিন কয়টা আমি লোকের সেবা করে যেতে পারি।
লোকটির সেই সেবার কথা মনে হলে এখনও বুকটা গর্বে ফুলে উঠে। লোকটি সম্ভবতঃ এখন
বেঁচে নেই। তিনি মুসলমান ছিলেন। আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেস্তে স্থান দেন!
আলীগাঁও গ্রামে বাড়ি স্থানান্তর
১৯৮৪ সালের আষাঢ় মাসে আবার আমরা ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে পরি।
বাড়ির পেছনে স্বল্প জমি ছিল। সেখানে আমরা বাড়ি স্থানান্তর করলাম। কিন্তু সেখানে জায়গা কম এবং একেবারে নদীর পাড়ে পরাতে নিরাপত্তাজনিত কারণে আমি উঠে গিয়ে আলীগাঁও বাজারে সিরাজ মামার বাড়িতে বাড়ি
বানালাম। মামাদের মথাউড়ির বাড়ি
ভাঙনের কবলে পতিত হওয়ায় সিরাজ মামা তখন আলীগাঁও বাজারে বাড়ি বানিয়ে ছিলেন। সেই বাড়িতেই আমি একটি থাকার ঘর এবং একটি রান্না ঘর তোলে
বাড়ি বানিয়ে ছিলাম। আলীগাঁও বাড়ি বানানোর পরেও আমি কিছুদিন আলীগাঁও থেকেই সাতমুখি স্কুলে যাওয়া আসা
করতাম। তিন মাস পরে আমি আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি। আলীগাঁও
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি ১৯৮৫ সালের জানুয়ারির ১ তারিখে যোগদান করি।
আলীগাঁও স্কুলে যোগদান করার কিছুদিন
পর রাণীরপাম গ্রামে জমি কিনে পরিয়ালের সবাইকে নিয়ে সেখানে উঠে আসি।
এর মধ্যেই আমি অটা গ্রামের সয়ফর
আলীর কন্যা তারা ভানুকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করি। দ্বিতীয় বিয়ে করার দু’টি কারণ ছিল। প্রথম কারণ, আমার প্রথম
পক্ষের স্ত্রী সফুরা খাতুনের হাত পা-র আঙুলের গাঁটে গাঁটে বিষ হয়েছিলো। হাত-পার আঙুলের সন্ধিতে হঠাৎ বিষ হয়ে ফুলে উঠত। তখন কোনো কাজ-কাম করতে পারত না। হঠাৎ বিষ হতো এবং সে বিষ অনেক দিন
স্থায়ী হতো। অনেক চিকিৎসার পরেও সে রোগ নিরাময় হচ্ছিল না। দ্বিতীয় কারণ ছিল, আমি নিজে পসন্দ করে বিয়ে করার জন্য আমাদের বাবা আমার প্রথমা স্ত্রীকে কোনদিন মেনে নেন নি। আমার
প্রথম পক্ষের শশুড় বাড়ি আমাদের বাবা কোনদিনই যাননি। তাই বাবাকে সন্তুষ্ট করার জন্যও বিয়েটা করেছিলাম।কথাটা আমি সাফাই হিসেবে লিখিনি। যা সত্যি তাই লিখেছি। দ্বিতীয় বিয়ে করার পর যদিও তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি, তবুও আমি স্বীকার করি এটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
আলীগাঁয়ের জীবন
আলীগাঁও আমার জন্মস্থান ছিল এবং আমার শৈশব আলীগাঁয়েই
কেটেছিল। এক সময় আলীগাঁয়েও আমাদের বাড়ি ছিলো। একটি জমি বিক্ৰী দলিল অনুযায়ী ১৯৫৬ সালের সেপ্তেম্বর মাসের ১৫ তারিখে জমি বিক্রী করে
বাবা জাহানারপাড় উঠে এসেছিলেন। আমি প্রাইমারি এবং এম,ই স্কুল আলীগাঁয় মামাদের বাড়িতে
থেকেই লেখা-পড়া শিখেছিলাম। তাই আলীগাঁওই ছিল আমার প্রিয়স্থান। আলীগাঁও এসে
আবার শৈশবের বন্ধুদের ফিরে পেলাম। আমার নুতন জীবন শুরু হলো। গতানুগতিক জীবন। সকাল বেলা
বাজার। বাজারে এসে তোতার চা’র দোকানে চটে বসে চা
খাওয়া। তারপর ব্রহ্মপুত্র নদে গোসল করে বাড়ি গিয়ে কয়েকটা খেয়ে স্কুল। স্কুল
থেকে এসে বাজারে কেরম খেলা এবং বিকেল বেলা নুরুল ইসলাম, হীরু
শীল, জাহের আলী(গারো), নারায়ন বসাক,
চান্দুদের সাথে ব্রীজ খেলা। সুযোগ পেলে কোন কোনদিন ফিশ, রামীও খেলতাম।
খেলার সাথী না পেলে ভজনলাল বসাকের
দোকানে বসে পুরাণা খবরের কাগজ পড়তাম। দোকানীরা জিনিষপত্র বেঁধে দেওয়ার জন্য পুরানা খবরের কাগজ কিনে আনত। সেই খবরের
কাগজ পড়ে আমি সময় পার করতাম। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়িয়ে
দেখিবে তাই। এই মনোভাব নিয়ে রাস্তায় দিয়ে হেঁটে যেতে কোন কাগজ পেলেও
সেটা কুড়িয়ে পড়ার অভ্যেস ছিল আমার।
১৯৭০ সালে বরপেটা মহকুমা লাইব্রেরী
স্থাপন করা হয়। লাইব্রেরীর দ্বার উদ্ঘাটন করেছিলেন তদানীন্তন আসামের মুখ্যমন্ত্রী মহেন্দ্র মোহন চৌধুরি। আমি
সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম এবং তখনই লাইব্রেরীর সদস্য হয়েছিলাম। কিন্তু অনেক
দিন বই আদান-প্রদান না করার ফলে কার্ডটি হারিয়ে গিয়েছিল। তাই ১৯৯৩ সালে আব্দুল
মোন্নাফের সহযোগিতায় আবার বরপেটা জেলা পুথি ভড়ালের সদস্য হই। তখন বরপেটা থেকে বই এনে সারা রাত জেগে পড়তাম।নানান রকম বই। ছোটগল্প, উপন্যাস,
প্রবন্ধের বই।
বই পড়ার প্রতি আমার কেমন আকর্ষণ
ছিল, সে বিষয়ে একদিনের একটি ঘটনা বলি। আমার বোন খোদেজার বিয়ে হয়েছে আগ মন্দিয়ার ওয়াজ আলীর সাথে। একদিন আমি বোনের বাড়ি বেড়াতে
গিয়েছিলাম। আমার তেমন কুটুম্ব বাড়ি যাওয়ার অভ্যেস ছিল না। এখনও নেই। তাই ভাবটা
ছিল, আমি দেখা করেই চলে আসব। আসতামও। কিন্তু এমন
সময় হঠাৎ দেখা হলো আমার ভগ্নীপতির জেঠাত ভাই সাহেদ মল্লিকের সাথে। সাহেদ মল্লিকের
সাথে এমনিতেও আমার বন্দুত্বের সম্পর্ক ছিল। সে আমাকে তাদের বাড়ি নিয়ে গেল। দেখি,
তার টেবিলের ওপড় কয়েকটা উপন্যাস পরে আছে।সব কয়টিই হিন্দী উপন্যাস।
একটা উপন্যাস হাতে নিয়ে চোখ ফিরাতে
শুরু করলাম। নেশা ধরে গেল। তিন দিন থেকে তার যে কয়টি উপন্যাস ছিল, সব কয়টি পড়ার পরে বাড়ি ফিরেছিলাম।
তখন আমোদ-প্রমোদের তেমন কোন সাধন ছিল না। তাই আমরা মাঝে মাঝে বরপেটা থেকে ভিডিও নিয়ে গিয়ে দেখতাম। সেই ভিডিও দেখে তিন চার
দিন আমোদ-স্ফূর্তি করে পার করতাম।
১৯৮৮ সালে আলীগাঁও প্রাথমিক
বিদ্যালয় নদীর ভাঙনের কবলে পতিত হয়। তখন বিদ্যালয়গৃহ স্থানান্তর করে একটু উত্তর
দিকে ওয়াজ উদ্দিন তাউই দান করা জমিতে স্থাপন করা হয়। ওয়াজ উদ্দিন আমার ছোট ভাই হোসেন আলীর চাচা শশুড় ছিলেন। আগে আমি একাই আলীগাঁও
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম। স্কুল স্থানান্তরের
কিছুদিন পরে পালহাজির আব্দুর রেজ্জাক স্কুলে যোগদান করে। আব্দুল রেজ্জাক শিক্ষক
হিসাবে খুব ভালো ছিলো। আব্দুর রেজ্জাক এবং আমার প্রচেষ্টায় জালাল উদ্দিন এবং
আব্দুল বাসেদ বৃত্তিও পেয়েছিল। জালাল উদ্দিন বর্তমান চিডিপিও। আব্দুল বাসেদ অকালে
মারা গিয়েছে। ছাত্র হিসাবে খুবই ভালো ছিল আব্দুল বাসেদ। তার হস্তাক্ষর দেখার মতো
ছিল। কলেজের ছাত্ররাও তার হস্তাক্ষর দেখে লজ্জা পেত। বেঁচে থাকলে অঞ্চলের নাম করতে পারত। কিছুদিন আমার সাথে
অনিল বিশ্বাসও শিক্ষকতা করেছিল।পরে জাহিদুল ইসলাম যোগদান করে।
আমাদের বিদ্যালয় স্থানান্তরের এক
বৎসর পর আলীগাঁও বাজারও ভাঙনের কবলে পড়ে। তখন বাজার স্থানান্তর করে আমার স্কুল
থেকে একটু উত্তরে হোসেন আলী সাহেব দান করা জমিতে স্থাপন করা হয়। নতুন করে স্থাপন
করা বিদ্যালয়ের সামনে একটু মাঠের মতো ছিল। ঠিক মাঠ বলা চলে না, বলা চলে খালি জমি ছিল। খরা মরশুমে আমরা সেখানে ভলিবল এবং
ক্রিকেট খেলতাম। জায়গাটা সমতল ছিল না।
উবড়-থাবড় ছিল। তাই একদিন দৌড়ে ক্রিকেট বল ধরতে গিয়ে আমার
বাম পায়ের সরু গাঁঠ উল্টে গিয়েছিল। নারায়ন ঘোষ সাথে সাথে
টান মেরে গাঁঠটা ঠিক করে দিয়েছিল। তবুও প্রায় তিন মাস
যাবত লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয়েছিল। এখনও সেই জায়গাটায় একটু হলেও
শূন্যতা অনুভব করি। নারায়ন ঘোষ, মোবারক আলি, নুরুল ইসলাম, বাহারুল ইসলাম, জাকির
হোসেন(জোনাব আলি) প্রভৃতিরা তখন আমার ভলিবল এবং ক্রিকেট খেলার সাথী ছিল।
১৯৮৮ সালে আমার উদ্যোগে নিউ মিলন
ক্লাব (সংঘ) এণ্ড লাইব্রেরি গঠন করা হয়। সভাপতি আব্দুর রহমান এবং সেক্রেটারি
মোবারক আলী। আমি উপদেষ্টা হিসাবে ছিলাম। ১৯৮৯ সালে ক্লাব রেজিষ্টার করা হয়। ১৯৯১ সালে আসাম বিধান সভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত
হয়। উক্ত নির্বাচনে আমরা ক্লাবের পক্ষ থেকে কংগ্রেস দলকে সমর্থন করেছিলাম। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী দিলদার রেজ্জা বিজয়ী
হয়েছিলেন। তিনি ৪৩৪ টা ভোটে ইউএমএফ প্ৰাৰ্থী আব্দুল হামিদ সাহেবকে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আমরা
ক্লাবের পক্ষ থেকে সদস্য হিসাবে গোপাল সাহাকে প্রক্ষেপ করেছিলাম এবং উক্ত
নির্বাচনে গোপাল সাহা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলো।গোপাল সাহার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন
নুরুল ইসলাম মামার বড় ভাই ফালু মিয়া।
লাইব্রেরির উদ্যোগে আমরা কয়েকটা
নাটকও মঞ্চস্থ করেছিলাম। সোরাব-রুস্তম, বাঙালির শেষ নামাজ, দেবিদাস,
দোজখের জল্লাদ প্রভৃতি। সোরাব-রুস্তম নাটকে- কায়কাউস, বাঙালির শেষ নামাজে- মুনিম খাঁ, দেবিদাস নাটকে-
ইসমাইল খাঁ, দোজখের জল্লাদ নাটকে- নকিব আলির চরিত্রে অভিনয়
করেছিলাম। এই সব নাটকে ফয়জল হক, নারায়ন ঘোষ, মোবারক দর্জি, গোপাল সাহা, বাহারুল ইসলাম, বাবুল
বসাক, রজব আলী প্রভৃতিরা অভিনয় করেছিলেন। এরাঁ ভালো মাপের অভিনেতা ছিলেন। নাটকে সহযোগিতা করতেন নুরুল ইসলাম (প্রমোট মাষ্টার), আব্দুর রহমান, গোপাল সাহা, হরেন্দ্র নাথ দাস, ইউনুস দর্জি, নারায়ন মণ্ডল(নারু মণ্ডল) প্রভৃতিরা।
আমাদের মাঝে একটি আপ্তবাক্য প্রচলিত
আছে, ভেড়াও বেসাত না, হটাও
মানুষ না। কিন্তু আমি বলি, ভেড়াই বেসাত, হটারাই মানুষ। কারণ হঠাৎ কোন বিপদ-আপদে হলে তখন লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি থাকলেও সেগুলো কাজে আসে না।
ধরুন, আপনার গরু-মহিষ, মাটি-সম্পত্তি
আছে, সেগুলো বিক্রী করতে সময় লাগবে, কিন্তু
ভেড়া বিক্রী করতে সময় লাগবে না। শুধু বললেই হলো, আমি ভেড়া
বিক্রী করব। দেখবেন, সাথে সাথে অনেক কেনার লোক এসে ভিড়
করবে। আপনি সাথে সাথে বিক্রী করে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবেন। কারও কোনো বিপদ
হয়েছে। এক জায়গায় খবর পাঠানো অথবা কাউকে ডেকে আনা প্রয়োজন। তখন কোনো জ্ঞানী-গুণীলোক কাজে আসবে না। যারা সমাজে
হটা বলে পরিচিত, তখন তারাই কাজে আসে। তাই বলি, ভেড়াই
বেসাত হটরাই মানুষ। তেমনই একজন যুবক ছিল সরুমুদ্দিন। সরুমুদ্দিন তেমন কোনো
প্রতিষ্ঠিত লোক ছিল না। বিহঙ্গম দৃষ্টিতে সমাজে তার কোনো মূল্যই ছিল না। কিন্তু
সরুমুদ্দিনকে ছাড়া আমাদের পক্ষে অনেক কাজ করা সম্ভব হতো না। সরুমুদ্দিন নাটকে কোনো রোল করত না ঠিকই, কিন্তু হ্যাজাক লাইট, সামিয়ানা যোগার,
প্রচার প্রভৃতি কাজে সরুমুদ্দিন সবার আগে থাকত।
তখন আমি একাংকিকা নাটক লেখা শুরু
করি। নাটকগুলি হাতে লেখে দিতাম। কোনো কপি রাখতাম না। তাই এখন নাটকগুলির নাম মনে নেই। স্কুলের
বার্ষিক অধিবেশনের সময় হলে অনেকে আমার কাছে নাটক লেখার ফরমাশ নিয়ে আসত। সেই
নাটকগুলির মধ্যে একমাত্র হেঙার নামের নাটকটি আমার সংগ্রহে ছিল। সেটা আমি ২০০২ সালে
ছাপা আকারে প্রকাশ করেছি।
আলীগাঁও অঞ্চলে অনেকের নাটকের প্রতি
আকর্ষণ ছিল যদিও তারা নাটকে রোল করার সুযোগ পেত না। তাই আমরা তাদের সুযোগ দেওয়ার
জন্য নিউ মিলন ক্লাব এণ্ড লাইব্রেরির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে যাত্রাপালা অভিনয়ের
সূচনা করি।
আগে আমরা ড্রেস ভাড়া করে আনতাম।
যাত্রাপালা গঠন করার পর আমরা কিছু ড্রেসও কিনেছিলাম। লতিফ মাষ্টার ছিলেন সেই
যাত্রাপালার ‘প্রমোট মাষ্টার’ এবং
আমির আলী ছিলেন ম্যানেজার। আমির আলী ম্যানেজার থাকার দরুন অনেকে ঠাট্টা করে সেই যাত্রাদলকে আমির যাত্রাও বলত। সেখানে অভিনয় করত
মোবারক দর্জি, গোপাল সাহা, জাকির
হোসেন(জোনাব আলি), হোসেন আলি(আমার ছোট ভাই), হামেদ আলি, আব্দুর রহমান, রজব
আলি প্রভৃতিরা। তারা রহিম-রূপভান, সাগর ভাসা, কমলার বনবাস প্রভৃতি যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করত। আমি কমলার বনবাস নাটকে শখ
করে একদিন বলিরাজার চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।
অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়
১৯৯১ সালে আমি এক অপ্রত্যাশিত
বিপর্যয়ের সন্মুখীন হই। আমার শশুড় বাড়ি ভেড়ার পাম। আমার শশুড়ের নাম আব্দুল
হাকিম। আমার শশুড়ের চার ছেলে, তিন মেয়ে ছিল। আমার শালী জরিনা খাতুন ১৯৭৫ সালে এবং বড়
সমুন্দি হাতেম আলী ১৯৮০ সালে মারা গেছেন। এখন বেঁচে আছে আমার ছোট সমুন্দি জাহিদ হোসেন, শালা হাসমত আলী এবং হাসর আলী। হাসর আলী তাঁদের পড়শি একটি
মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল এবং ধরা পড়ে সেই মেয়েটিকে বিয়ে করতে
বাধ্য হয়েছিল। হাসর আলী তখন কলেজের ছাত্র। বিয়ে করার পর তার বৌ শশুড় বাডি রেখে সে নিজে মেসে থেকে অধ্যয়ন
অব্যাহত রেখেছিল।
আমার শশুড় বাড়ির প্রায় সবাই এবং হাসর আলী নিজে
সেই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। তাই সে একদিন তার বৌকে
মেসে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে দঙ্গরকুছি একটি পরিত্যক্ত ফাঁকা ভিটেয় পোতে রেখেছিলো। অবশ্যে ঘটনাটা সংঘটিত করতে কেউ দেখেনি। এদিকে জলজ্যান্ত একটা মানুষ হাওয়া হয়ে গেছে। নিশ্চয় বড় রকমের কিছু একটা হয়েছে! তখন মেয়েটির পরিয়ালের পক্ষ থেকে নানান জায়গায় খুঁজাখুঁজি শুরু করে। সাম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজাখুঁজির পরেও মেয়েটিকে না পেয়ে হাসর আলী এবং তার পরিয়ালের
পক্ষ থেকেই কিছু একটা করেছে বলে মেয়েটির পরিয়ালের সন্দেহ হয় এবং মেয়েটির পরিয়ালের
পক্ষ থেকে সন্দেহমূলকভাবে হাসর আলী এবং তাঁর পরিয়ালের বিরুদ্ধে কেস দায়ের করে। সেই বিয়েতে আমার কোনো রকম অমত ছিল না এবং হাসর আলী তার বউকে কি করেছে সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না যদিও সেই কেসে আমাকেও জড়িত করে। কেস দায়ের করার তিন মাস পর হাসর আলীকে কাস্টডিতে নিয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সেই লাশ উদ্ধার হয় এবং হাসর আলীকে
সেই কেসে দোষী পেয়ে কোর্টে চালান দেয়। তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য না পেয়ে
পুলিস সার্জশ্বিট থেকে আমার নাম কেটে দেয়। সেই কেসে হাসর আলীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
হয়। অবশ্যে পরে হাইকোর্টে আপীল করে সে মুক্তি পেয়েছে।
এখন সে ফার্মাসি করে।
হাসর আলী তার স্ত্রীকে কেমনে
মেরেছিল, কে কে তার সাথে ছিল, আমি
এখনও এই বিষয়ে কিছুই জানিনা এবং পরে জানার জন্য চেষ্টা করেও বিফল
হয়েছি। কারণ হাসর আলী বা তার পরিয়ালের কেউ আমাকে সত্য কথা বলেনি। পরে অবশ্যে আমি জানার আশা ছেড়ে দিয়েছি।
এখনও আমি ভাবি, কেন আমাকে কেসে জড়িত করেছিল! যেহেতু আমি
বিয়ের বিপক্ষে ছিলাম না। যারা ভাবে, আমি নিশ্চয় সেই হত্যার
বিষয়ে জানি, তাদের আমি বলতে চাই, আসলে
আমি হত্যার বিষয়ে কিছুই জানি না। আপনারা ভুল ধারণা ত্যাগ করুন। কেউ না জানলেও,
হাসর আলী নিশ্চয় জানে, যে আমি সেই হত্যার সাথে কোনো রকম জড়িত ছিলাম না। আমি এখনও একটি
আদর্শ নিয়ে চলি, আমি কারও উপকার করতে না পারলেও যেন ক্ষতি
না করি। আমি অন্যায়কে কোনোদিন প্রশ্রয় দিইনি এবং বেঁচে থাকা পর্যন্ত দেওয়ারও
আশা নেই।
সেই কেসের সময় ওমর আলী দেওয়ানী, ইসমাইল হোসেন (ডাক্তার), মজিবর
রহমান এবং অনেকে আমাকে বিশেষভাবে সহায় করেছিলেন। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ এই জন্যেই যে, আমি হত্যার সাথে জড়িত থাকতে পারি না বলে তাঁরা মনেপ্রাণে
বিশ্বাস করেছিলেন। শুধু তাঁরাই নয়, আমাকে যারা ভালোভাবে জানত তাঁদের কেউই
বিশ্বাস করেনি যে, আমি হত্যার সাথে জড়িত ছিলাম। ইসমাইল হোসেন আমার স্কুল
জীবনের বন্ধু। তাঁকে আমি বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করি।
আলীগাঁও বাজারে লুটপাট
১৯৯২ সালের ৬ ডিচেম্বরে কর সেবকেরা
অযোধ্যার বাবরি মসজিদের গম্বুজ ভেঙে ফেলে। তখন সমগ্র ভারত তথা
বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই আলোড়নের ঢেউয়ে
আলীগাঁওকেও স্পর্শ করে। সেই ঢেউয়ে স্বয়ং আমাকেও স্পর্শ করেছিল।
তখন আমাদের অঞ্চলে টিভির প্রচলন
হয়নি। রেডিওতে খবর শুনতাম। বাবরি মসজিদ ভাঙার কথা শুনে সেদিন সন্ধ্যায় মনিরুদ্দিনদের
বাড়ি গেলাম। মনিরুদ্দিনের ডাক নাম ছিল মনু মেকার। সে রেডিওর মেকার ছিল। বাড়িতেই টুকটাক রেডিও মেরামত করত। আমাদের অঞ্চলে তখন কারেন্টও ছিল না। তাই সে
বেটারিতে ছোট টিভি চালাত।
সেদিন সন্ধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার
দৃশ্য টিভিতে প্রত্যক্ষ করলাম। একদল অন্ধবিশ্বাসীর সে কি উল্লাস! একদিক থেকে সিআরপিএফ
জোয়ানেরা তাড়া করছে আর অন্যদিক দিয়ে গিয়ে একদল উন্মত্ত জনতা মসজিদের চুড়ায়
উঠে গম্বুজ ভাঙছে। ছোট কালোসাধা টিভি, তাই ভালোভাবে দেখা যায় না। তাতেই যা দেখলাম
মনটা তিক্ততায় ভরে গেল। কি হলো দেশে? মানুষের
এই ধর্মান্ধতা কখন ঘুচবে? মানুষ, মানুষ
হিসাবে বাঁচার পরিবর্তে কেন ধার্মিক হয়ে বাঁচতে চায়? শান্তিপূর্ণ
সমাজের জন্য মানুষ ধর্ম সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই ধর্মই আজ অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই কথা মানুষ কখন বুজবে?
ফয়জল মামাদের মাথাউড়ির বাড়ি ভাঙার পর আলীগাঁও বাজারে বাড়ি বানিয়েছিলেন। আলীগাঁও বাজার নদী ভাঙনের কবলে পতিত হওয়ার পর ফয়জল মামা আমাদের বাড়ির সামনে একফালি জমিতে বাড়ি বানিয়েছিলেন। আমি এবং ফয়জল মামা সকাল বেলা হাত-মুখ ধুয়েই একসাথে আলীগাঁও বাজারে গিয়ে চা
খেতাম। এটা আমাদের দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে ছিল। অনেকে ঠাট্টা করে বলত- আপনারা
হয়তো বাজারে আসার জন্যই সকালে জাগেন, নইলে
হয়তো জাগতেনই না।
বাবরি মসজিদের গম্বুজ ভাঙার পরের দিন সকালে রুটিন মতোই আমরা বাজারে গেলাম। সর্বত্র মসজিদ ভাঙার আলোচনা। আমরা বাজারে
গিয়ে তোতার দোকানে চটে বসে চা খেলাম। তোতার চা খুব নামকরা ছিল। তাঁর দোকানে
ডেক্স-বেঞ্চ ছিল না। চট বিছিয়ে দিত। সেই চটে বসে আমরা চা খেতাম।
আমি চা খেয়ে বেড়িয়েছি, এমন সময় বরলি গ্রামের গোসাই খাঁ নামের একটি লোক আমাকে ডেকে একটু ফাঁকায় নিয়ে গিয়ে বলল- হিন্দুরা আমাদের
মসজিদ ভেঙেছে, আমরা আজ রাতে বাজারের কালিমণ্ডপ পুড়িয়ে
দিব।
কথাটা বলামাত্রই আমি প্রতিবাদ করে
উঠলাম- এ রকম কাজ কখনও করবেন না। কালি মণ্ডপ আমাদের পুড়াতে হবে না। আমরা বললে ওরা
নিজেরাই পুড়াবে। আমরা এখানে কোনো অশান্তি চাইনা। কোথায় মসজিদ ভেঙেছে তার জন্য
আমরা আমাদের এতো দিনের সম্প্রতি নষ্ট করা উচিত হবে না।
গোসাই খাঁকে এভাবে বলেই আমি ফয়জল
মামা, মোন্তাজ দেওয়ানী, মজিবর
রহমান, সরবেশ আলী গাঁওবুড়া, আব্দুর
রহমান প্রভৃতির সাথে কথাটা আলোচনা করলাম। তারপর আমরা গোসাই খাঁকে সামেজ দর্জির
বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম যে, বাজারে
যেন কোনোরূপ গণ্ডগোল তথা অশান্তি করা না হয়।
গোসাই খাঁ আমাদের কথা মেনে চলে গেল
এবং কোনো রকম গণ্ডগোল করবে না বলে কথাও দিয়ে গেল। তবুও গোসাই খাঁ চলে যাওয়ার পর
আমরা সতর্কতার জন্য বাজারের লোকদের ডেকে এনে কথাটা বুঝিয়ে বলে সতর্ক করে দিলাম
এবং সন্ধ্যেয় এসে পহরার ব্যবস্থা করার কথা বললাম।
সন্ধ্যেয় ফয়জল হক, মজিবর, আব্দুর রহমান,
বাহারুল ইসলাম, আশক আলী মণ্ডল(মাষ্টর),
আব্দুর রহমান প্রভৃতিদের ডেকে এনে বাজারে পহরার ব্যবস্থা করলাম। রাত
ভর জেগে পহরা দিবে তাই ভজনলাল বসাক, ছানা সাহা প্রভৃতিরা
পহরাদারদের চাহ এবং মুড়ি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করল।
দু’দিন
এভাবেই কেটে গেল। ৮ ডিসেম্বর সকালে গোপাল সাহার ছোট ভাই রবি সাহা দোকানের মালপত্র
আনার জন্য বরপেটা রোড যাওয়ার সময় তাকে সত্রকনরা বাজার থেকে কিছু পুবে
দুস্কৃতিকারীরা রাস্তায় আগলে ধরে তার টাকা পয়সা সাইকেল ছিনিয়ে নিল।
গোপাল সাহা আমাদের কথাটা বলায় আমি আব্দুর
রহমান, মজিবর রহমানসহ কয়েকজনকে নিয়ে সত্রকনরা গিয়ে নুরু গাঁওবুড়াদের
সহযোগিতায় সাইকেলটা উদ্ধার করলাম এবং টাকা কয়টা পরে দিবে বলে নুরু গাঁওবুড়ারা
আমাদের কথা দিল।
সত্রকনরা বাজারে খগেন কর্মকার নামের
একজন ব্যবসায়ী ছিল। তার বাড়িতে ঐ দিন
রাতেই লুটপাট হয়েছিল। আমরা নুরু গাঁওবুড়ার বাড়ি থেকে ঘুরে আসার সময় দেখি
সেখানে পুলিস এসেছে তদন্তের জন্য। তখন গোপাল সাহা আমাকে বলল- সেদিন গোসাই খাঁ যে
বাজারে লুটপাটের কথা বলেছিল কথাটা পুলিসকে বলে দিই।
আমি বললাম- সে বলেছিল, তাকে আমরা সাবধানও করে দিয়েছি। এখন কথাটা পুলিসের কাছে বলাটা
মনে হয় তেমন ঠিক হবে না। আমার মতে, না বলাটাই ভালো হবে। মিছেমিছি শত্রু বাড়িয়ে লাভ নেই।
গোপাল সাহা আমার কথা মানল। সে পুলিসকে
কথাটা বলল না। আমরা বাড়ি এলাম। সেদিন সন্ধ্যেয় আবার বাজারে গিয়ে কে কে পহরা
দিবে ঠিক করে দিয়ে বাড়ি এসে শোয়েছি মাত্র অমনি দুপদাপ শব্দ শুনতে পেলাম। কি হল? এরকম দুপদাপ শব্দ শুনা যাচ্ছে কেন?
ফয়জল মামার বাড়ি আমাদের বাড়ির
দক্ষিণ পাশে লাগোয়া ছিল। আমি তৎক্ষণাৎ ফয়জল মামাকে কথাটা বলার জন্য গেলাম।
দেখি ফয়জল মামা গৃহের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে দেখেই বললেন- মনে হয়, বাজারে কিছু একটা হচ্ছে! চল, দেখি কি হচ্ছে।
বাজারে কিছু একটা হওয়ার কথা বলাতে আমার
কলিজাটা ছ্যাৎ করে উঠল। গোপাল সাহা যে গোসাই খাঁর কথাটা সত্রকনরা বাজারে পুলিসকে
বলতে চেয়েছিল, আমি মানা করেছি। বাজারে কিছু একটা হলে এই কথাটাই আগে উঠবে!তখন নিশ্চয় পুলিস আমাকে ছেড়ে কথা বলবে না।
আমরা তৎক্ষণাৎ বাজারের দিকে রওয়ানা
হলাম। বাজার পাওয়ার আগেই দেখতে পেলাম, একদল
লোক একজনের পেছনে একজন করে সারি বেঁধে উত্তর দিকে এগিয়ে আসছে। পরে শুনেছিলাম সেই
দলে ৭২ জন লোক ছিলো।বাজারটা আমাদের বাড়ি থেকে এক ফার্লঙের মতো দক্ষিণ দিকে ছিল।
সেই দলটা আমাদের সামনে পড়ল। একেবারে সামনে পড়ল বললে ভুল হবে। পায়ে হাঁটা পথ।
আমাদের পথের সমান্তরালভাবে পশ্চিম দিকেও একটা পথ ছিল। দুস্কৃতিকারীরা সেই পথ দিয়ে
যাচ্ছিল।
মামা এবং আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের তামাশা দেখতে লাগলাম এবং মনে মনে
ভাবতে লাগলাম, এরাই নিশ্চয় লুটপাট করেছে। এদের অন্তত
একজনকে যদি ধরে রাখতে পারতাম, তাহলে আমরা বাঁচতে পারতাম। ধরে
রাখতে না পারলে, পুলিস এসে প্রথমেই আমাদের এই অঞ্চলের লোকদের
সন্দেহ করবে এবং একজন একজন করে ধরে নিয়ে গিয়ে লকআপে ঢোকাবে।
এমন সময় হঠাৎ একটা কুকুর ডেকে উঠল।
সাথে সাথে একজন লোক বাজারের উত্তরপূর্ব কোনার দিকে দৌঁড়ে যেতে দেখলাম।
মজিবরের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম-
ডাকাত যাচ্ছে, কে আছ? ধর।
আমরা সোরগোল করে সেই লোকটির দিকে দৌড়োতে
লাগলাম। সামনেই দানেশ মুন্সির শণ (ঘাটি) ক্ষেত ছিল। লোকটি সেই শণ ক্ষেতের মাঝে
লুকোল। ইতিমধ্যে অনেক লোক জুটেছিল। তারা লোকটিকে ধরে ঘাটি ক্ষেত থেকে বের করে আনল।
সবাই প্রহার করার জন্য উদ্যত হলো। আমি ভাবলাম, এভাবে
মারলে লোকটি মরেও যেতে পারে! লোকটি মরে গেলে তখন সত্য কথা বের করা সম্ভব হবে না। তাই আমি লোকটিকে আমার কাছে টেনে এনে
বললাম- একে কেউ মারবে না। এর কাছ থেকে সত্য কথা বের করতে হবে। তদুপরি মরে গেলে
আমরা সবাই আসামি হব। একে এখন গাঁওবুড়ার বাড়ি নিয়ে চল।
আমরা লোকটিকে নিয়ে গাঁওবুড়ার
বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। রাস্তায় আমি জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, লোকটির বাড়ি কৈমারি। নাম সাদুল্যা। লুটপাট করতে এসেছিল।
লোকটিকে গাঁওবুড়ার বাড়ি নিয়ে
গেলাম। গাঁওবুড়াকে বললাম- একে আপনি ঘরের ভেতর নিয়ে যান। না হলে লোকে একে পিটিয়ে
মেরে ফেলবে।
গাঁওবুড়া লোকটিকে ঘরের ভেতর
ঢুকিয়ে বাইরে শিকল তোলে দিলেন।
আমি বললাম- তারাতারি থানায় খবর দিন। পুলিস এসে একে নিয়ে যাক।
গাঁওবুড়া থানায় লোক পাঠালেন। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে পুলিস এসে লোকটিকে নিয়ে গেল।
কথায় আছে, রাখে হরি মারে কে, এবং
মারে হরি বাঁচায় কে! লোকটিকে এভাবে ধরার জন্য আমিতো বেঁচে গেলামই, সাথে সাথে অঞ্চলের লোকও বেঁচে গেল। না হলে পুলিস এসে অঞ্চলের লোকদের হেনস্থা করত।
পরে অবশ্যে কৈমারির লোকেরা মজিবর, বাহারুল এবং আমাকে অনেক ভয় দেখিয়েছে প্রতিশোধ নিবে বলে।
ভয়ে আমরা অনেকে রাতে অনেক দিন বাড়িতে শোইনি। অন্যত্র রাত্রিযাপন করেছি। মা এবং বাবা তখন বেঁচে ছিলেন। তাঁরাই বাড়িতে থাকতে দিতেন না।
দস্যুলোক! বলাতো যায় না! যদি সত্যিই কিছু করে ফেলে! অবশ্যে কিছুই করেনি।
১৯৯৩ সালে আলীগাঁও বাজার আবার
ভাঙনের কবলে পড়ে। আলীগাঁও বাজার থেকে আধা মাইল উত্তর দিকে মাথাউরি ছিল। তখন বাজার
মাথাউরির উত্তর পাশে স্থানান্তর করা হয়। সেই জমি ছিলো টগা মিয়ার। তাই বাজারটার নাম টগা বাজার হিসেবে জনাজাত যায়। টগা বাজারে অবশ্যে একমাত্র
গোপাল সাহার বাহিরে অন্য হিন্দু ব্যবসায়ীরা কেউ আসেনি। তারা আগের অভিজ্ঞতার কথা
চিন্তা করে বরপেটা রোড, হাউলি প্রভৃতি জায়গায় উঠে গিয়েছিল।
গোপাল সাহাও সেখানে মাত্র কয়েক দিন ছিল। পরে বরপেটা রোডে উঠে যায়।
বাজারের সাথে আলীগাঁও প্রাথমিক
বিদ্যালয় গৃহটাও স্থানান্তর করা হয়। বিদ্যালয় গৃহটা বাজার থেকে পোয়া মাইল পূবে
শিলুশি পাথারে মাথাউরির ওপড়ে স্থাপন করা হয়। এই স্কুল স্থাপনের ক্ষেত্রে আলী
বেপারি এবং মনা দেওয়ানীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। আলী বেপারির বাড়ি মাথাউরির দক্ষিণ
পাশে রাণিরপাম এবং মনা দেওয়ানীর বাড়ি মাথাউরির উত্তর পাশে শিলুশি গ্রামে ছিলো। বিদ্যালয় গৃহটা মনা দেওয়ানীর বড় ছেলে আলাল উদ্দিনের বাড়ির সাথে স্থাপন করা হয়েছিল। আলাল উদ্দিন আমার এম,ই স্কুলের সহপাঠি ছিল।জানিনা কি কারণে, আলাল উদ্দিন লগায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো।
বাজার ভাঙার পরের বৎসর আমাদের
বাড়িও ভাঙনের কবলে পতিত হয়। টগা বাজার থেকে আধা মাইল
পূর্ব দিকে মাথাউরির উত্তর পাশে চার বিঘা জমি কিনে আমরা সেখানে উঠে আসি। গ্রামটার নাম ছিলো শিলুশি। ফয়জল মামা এবং আমার ছোট ভাই হোসেন আলীও আমাদের সাথে সেখানে উঠে আসে। আমরা একসাথেই বাড়ি নির্মাণ করি।
সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল। নিয়মিত স্কুলে
যাই, বাজারে যাই, কিন্তু
হিন্দু দোকানিরা চলে যাওয়ার দরুন বাজারের আগের সে মাদকতা আর রইল না।
বাজারের পূর্বের ছন্দ ফিরিয়ে আনার
জন্য নিউ মিলন ক্লাব এণ্ড লাইব্রেরির উদ্যোগে আমরা বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত করলাম।
সেই অধিবেশনে আমরা আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরৎ চন্দ্র সিংহকে মুখ্য অতিথি
হিসাবে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলাম। প্রাক্তন হোক, তবুও
মুখ্যমন্ত্রী!তাই সবাই প্ৰশংসা করেছিলো আমাদের এই কাজের। সেদিন মুসলমানের পবিত্র উৎসব সবেবরাত ছিলো। তাই বাড়ি বাড়ি সেদিন রুটি পিঠা বানিয়েছিলো। শরত সিংহ মোবারক দৰ্জির বাড়িতে হালুয়া দিয়ে রুটি পিঠা খেয়ে
পিঠার খুব প্ৰশংসা করেছিলেন।
সেবার সেই অধিবেশনে আমরা ‘মানুষ কেন কাঁদে’ নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ
করেছিলাম। সেই নাটক অনুষ্ঠিত করার
ক্ষেত্রে শিলুশি গ্ৰামের মোসলেম উদ্দিনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। মোসলেম উদ্দিন সেই
নাটকে সগিরুদ্দিনের রোল করেছিল। সেই নাটকে আমি একজন বৃদ্ধ মন্ত্রীর অভিনয়
করেছিলাম। চরিত্রের নাম মনে নেই।ফয়জল হক, মোবারক
আলি, বাহারুল ইসলাম প্রভৃতিরা সেই নাটকে অভিনয় করেছিল।
তখন শহীদ কারবালা যাত্রাপালার খুব সমাদর ছিল। তবে মানুষের মনে
আধুনিকতার স্পর্শ লাগায় অনেকের শহীদ কারবালা যাত্রাপালার প্রতি আকর্ষণ কমে গিয়েছিল। কারণ শহীদ কারবালা যাত্ৰাপালা সারারাত জেগে শুনতে হতো। কোনও কোনও দিন সূৰ্য উঠার পরেও যাত্ৰাপালা শেষ হত না। এদিকে
তখন মানুষের সারারাত জেগে যাত্ৰাপালা শুনার মানসিকতা ছিল না। তাই আমি শহীদ কারবালা
যাত্রাপালা নাটকের রূপ দিই এবং টগা বাজারে মঞ্চস্থ করি। নাটকটি ভালোই জনপ্রিয়তা
লাভ করেছিল। বাহারুল ইসলাম, মোবারক আলি(দর্জি) প্রভৃতি এবং আমি সেই
নাটকে অভিনয় করেছিলাম। আমি অভিনয় করেছিলাম জিয়াদের চরিত্ৰে এবং বাহারুল ইসলাম এজিদের চরিত্ৰে।অন্যান্যরা কে কোন চরিত্ৰে অভিনয় করেছিলো এখন সে কথা মনে নেই।
ইউনাইটেড হাইস্কুল
স্থাপন
ইউনাইটেড হাইস্কুল, শিলোটি
প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালে আমরা বাজারে গিয়েছি। রতনের চায়ের দোকানে চা খেয়ে
গল্প-গুজব করতেছি। এমন সময় দারোগালী গাঁওবুড়া বাজারে এসে চায়ের অর্ডার দিলেন আমাদের সবার জন্য। দারোগালী গাঁওবুড়া তখন অঞ্চলের
প্রখ্যাত ধনীলোক। বাড়িতে দুই দু’টি দোতালা গৃহ। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। সবাই তাঁকে সমীহ করে চলে। আমরাও চলি। আমাদের মামা ফয়জল হকের সাথে তাঁর
খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই আমি তাঁকে
মামা বলে ডাকতাম।
চা খাওয়ার পর দারোগালী গাঁওবুড়া
বললেন- আপনারা তো এখানে
প্রায় সবাই আছেন, এখানে একটা হাইস্কুল করলে কেমন হয়?
আমি বললাম- এটাতো খুবই ভালো কথা
হবে। আলীগাঁয় কয়েক বার হাইস্কুল স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সফল হতে পারেনি।
আপনি যদি বলছেন তাহলে করুন। আমরা সাথে আছি।
দারোগালী গাঁওবুড়া বললেন- শুভস্য শীঘ্রম্। বাজারে তো প্রায় সবাই আছে। তাহলে আজই কমিটিটা গঠন করে ফেলি।
মুন্তাজ দেওয়ানী অঞ্চলের গণ্যমান্য
মুরব্বী। ভালো বিচারক। সবাই তাঁকে সন্মান করে। আমরাও করি। তাই আমি চা দোকানী রতনকে
উদ্দেশ্য করে বললাম- রতন, দেখ তো মুন্তাজ দেওয়ানী কোথায় আছে। তাঁকে
ডেকে নিয়ে এস। বলবে, গাঁওবুড়া ডেকেছে।
রতন সাথে সাথে মুন্তাজ দেওয়ানীসহ
কয়েকজনকে ডেকে আনল এবং সাথে সাথে কমিটি গঠন করা হলো।
দারোগালী গাঁওবুড়া সভাপতি, আশ্বক আলী মণ্ডল সম্পাদক। আমাকে সহকারি সম্পাদকের দায়িত্ব
দিলো। রহিম বাদশাহ, আলী বেপারি, আব্দুর রহমান, নারায়ন ঘোষ প্রভৃতিকে নিয়ে একৈশ জনের একটি কমিটি গঠন করা হলো। মুন্তাজ দেওয়ানীকে উপদেষ্টা হিসাবে রাখা হলো।
সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, পাঁচদিন পর কমিটি বসে স্কুলের স্থান এবং শিক্ষক নিয়োগের জন্য
জাননী জারি করা হবে।
সেদিন মনে হয়, ১৯৯৫ সালের ৪ জানুয়ারি ছিলো এবং বারটা ছিলো বৃহস্পতি বার।
কারণ আমাদের বাবা মিঠু মিয়া ৪ জানুয়ারিতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সাত জানুয়ারি মারা
গিয়েছিলেন।
কমিটি গঠনের পর সবাই সেদিনের মতো বাড়ি ফিরলাম।
বাড়ি এসে দেখি বাবার মরণপণ অবস্থা। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে জবান বন্ধ। আমি বাবার চিকিৎসার
জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাই কয়েকদিন বাজারে যাওয়া হলো না। কিন্তু বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না। সাত জানুয়ারি রাত একটায় বাবা এন্তেকাল করলেন। সেই দিনটা
ছিলো সোমবার। সেই বৎসরই ফয়জল মামা হঠাৎ এন্তেকাল করেছিলেন। বাবা
এন্তেকাল করলেন বাংলা বৎসরের পৌষ মাসে এবং মামা এন্তেকাল করেছিলেন একই বৎসরের
জ্যেষ্ঠ মাসে। একই বৎসর দু’জন মুরব্বীর মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত হয়ে
পড়েছিলাম। ফয়জল মামা একজন ভালো অভিনেতা ছিলেন। সবাই তাঁকে হকসাব বলে সম্বোধন
করতেন।সংযোগবশতঃ বাবার এন্তেকালের দিনই আমার উকিল শশুড় জুরান আলী
বেপারিও এন্তকাল করেছিলেন। তাই আমি তাঁর জানাযায় শরিক হতে পারিনি।
আমি আঠ জানুয়ারি সকালে বাজারে এসে
শুনলাম, রবিবারে স্কুল কমিটির মিটিং হয়েছে এবং
শিক্ষক নিয়োগ করেছে। তৎক্ষণাৎ আমি কথাটার প্রতিবাদ করলাম- তেমন তো কথা ছিল না।
রবিবারে আমরা শিক্ষকের জন্য জাননী জারি করার কথা ছিল। শিক্ষক নিয়োগের কথা তো ছিল না।
এভাবে বলেই আমি জিজ্ঞাসা করলাম- কাকে কাকে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হযেছে?
যাদের য়াদের নাম বলল, একজনও আমার মনোমত
হলো না। কারণ শিক্ষক নিযুক্তির সময় স্বজনপ্রীতি দেখিয়েছে এবং শিক্ষক হিসাবেও
তারা ভালো হবে না। কিন্তু তখন কিছুই বললাম না। বাড়িতে এসে রহিম বাদশাহ এবং আব্দুল
মান্নাফ মাষ্টারের সাথে কথাটা আলোচনা করলাম। ফাইজুদ্দিন এবং সামেজ উদ্দিন(পাঞ্জু
মৌলবী)ও আলোচনার সময় উপস্থিত হলো। ফাইজুদ্দিনকে আমরা সহকারি শিক্ষক হিসাবে
নিযুক্তি দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কারণ তাঁর একাডেমিক
ফলাফল খুবই ভালো ছিল।
ফাইজুদ্দিন বলল- এভাবে স্কুল করলে
আমরা নেই।
পাঞ্জু মৌলবী (সামেজ উদ্দিন) বলল- আপনারা নতুন
কমিটি করে স্কুল করুন। আমি আমাদের টিনের ঘরটা স্কুলের জন্য দান করব।
রহিম বাদশাহর চাচা রুকন উদ্দিন
সেখানে উপস্থিত ছিলো। সে বলল- তাহলে স্কুল করার জন্য যত জমি লাগে আমি দেব।
কিন্তু স্কুল স্থাপন করব কোথায়? আমি বললাম- আপনার জমিতো নদীর পেটে?
আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে মাথাউড়িতে রহিম বাদশাহর বাড়ি। তার বাড়ির সাথেই তাঁর ভেঞ্চার এম, ই স্কুল ছিল। সে বলল- আমার স্কুলেই অগত্যা ক্লাসের সুবিধা করে
দেব।
আামি বললাম- জমি ও বিদ্যালয় গৃহের সংস্থান হলো যদিও, আজ আমরা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নিব ন। আগামী কাল সকালে বাজারে গিয়ে আমরা এ বিষয়ে দুই চারজনের সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নেব। আমরা এই কয়েকজনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না।
সবাই আমার কথায় সহমত প্রকাশ করল এবং সেদিনের মতো
আলোচনা সেখানেই সমাপ্ত করলাম।
পরের দিন সকালে বাজারে গিয়ে আব্দুর রহমান, আলী
বেপারিদের সাথে কথাটা আলোচনা করলাম। দেখা গেল, কেউ শিক্ষক নিয়োগ
নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। আমরা তখন কথাটা জাকির হোসেনের সাথে আলোচনা করলাম। জাকির হোসেন
স্নাতক ছিল এবং তখন সে বাজারে গেলামালের দোকান করত। নীতিগতভাবে সে অনেক ভালো ছিল। তাঁর বড় ভাই জহুরুল হক রেঞ্জার। টাকার অভাবও ছিল না তাঁদের। কারণ স্কুল করতে হলে টাকার প্রয়োজন হবে। খালি হাতে বাঘ
দৌড়ানো সম্ভব হবে না। তাই আমরা জাকির হোসেনকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদানের আশ্বাস দিলাম এবং
তাঁর ভ্ৰাতৃ জহুরুল হককে যেভাবেই হোক মিটিঙে উপস্থিত রাখার জন্য জাকির হোসেনকে
দায়িত্ব দিলাম।
দু’দিন
পরে কমিটি গঠন করার জন্য রাণিরপাম এম, ই স্কুলে মিটিং বসলাম।
সেই মিটিঙে আব্দুর রহমানকে সভাপতি এবং জহুরুল হককে সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
সবাই আমাকে সম্পাদকের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল। তখন আমি বললাম- আমি কোনো দায়িত্বে
থাকব না। যদি সম্পাদক হই, তাহলে
সবাই ভাববে, ওরা আমাকে সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়নি বলে আমি নতুন স্কুল করতেছি। আসলে কোনো পদের জন্য আমি আগের কমিটির বিরোধিতা করিনি।
বিরোধিতা করেছিলাম, শুধু নীতির জন্য।
তবুও সবাই আমাকে সহকারি সম্পাদকের দায়িত্ব দিল। আগের কমিটিতেও আমি সহকারি
সম্পাদকের দায়িত্বেই ছিলাম।
স্কুলের নামকরণ করা হলো, ইউনাটেড হাইস্কুল, শিলোশি। নামটা দিয়েছিলেন স্কুলের সম্পাদক রেঞ্জার জহুরুল হক।
আমাদের কমিটি করার কথা শুনে আগের
কমিটি হাইস্কুলের জন্য কারও পুরানা আবাসগৃহ ভেঙে এনে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পালারপাম এম,ই স্কুলের ভিটায় তুললো। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে দুই তিন বিঘা ফাঁকা জমি ছিল। কার জমি ছিল এখন মনে করতে পারছি না। জমির মালিকের অনুমতি নিয়ে দারোগালী
গাঁওবুড়ারাঁ হাইস্কুলের গৃহ স্থাপনের এক সপ্তাহ পরে আমরাও পাঞ্জু মৌলবীদের
আবাসগৃহ ভেঙে এনে সেই ফাঁকা জমিতে তুললাম।
সাথে সাথে সর্বত্র চর্চা শুরু হয়ে গেল দারোগালী
গাওঁবুড়া বনাম আবুল মাষ্টারের স্কুল। কার স্কুল টিকবে? দারোগালী গাঁওবুড়া তখন অঞ্চলের সব
থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর সাথে পাল্লা করে স্কুল? কে জিতবে এই লড়াইয়ে?
শেষে আমরাই জিতেছিলাম। আমাদের স্কুলে এঘার জন ছাত্র-ছাত্রী নাম ভর্তি করল।
দারোগালী গাঁওবুড়ার স্কুলে কেউ নাম ভর্তি করল না। এমন কি, যে পালারপাম এম, ই স্কুলের ভিটায়
হাইস্কুল নির্মাণ করেছিলো, সেই এম, ই
স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও ইউনাটেড হাইস্কুলে নাম ভর্তি করল। আমার মেয়ে আবিদাকেও ইউনাইটেড হাইস্কুলে নাম
ভর্তি করে দিয়েছিলাম। আবিদাই ছিল ইউনাইটেড হাইস্কুলের প্রথম মেট্রিক পাস। আলীগাঁয়ের গাঁওবুড়া সরবেশ আলী গাঁওবুড়া সাহেবের দুই মেয়ে সাহেরা বিমলা ও সাহেরা
খাতুন প্রথম বছর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো। তবে, দুৰ্ভাগ্যের বিষয় ক্লাস টেনে উঠার পর উভয়রই বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। সামেজ দৰ্জির মেয়ে শেহেরি খাতুন, জালাল উদ্দিনের ভাইঝি ঝরনা এবং মানিকপুরের দু’টি ছেলে শহিদুল ইসলাম ও আজাহার আলীও প্ৰথম বছর স্কুলে ভৰ্তি হয়েছিলো। প্রথম বছর সর্বমোট এগারোজন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছিলো। তাদের সবার নাম এখন মনে নেই।
আবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ার ফলে আমরা ১৯৯৮ সালে যতিগাঁয় বাড়ি
স্থানান্তর করেছি। শিলুশি থেকে যতিগাঁও উঠে আসার পর থেকে স্কুলের
সাথে আমার তেমন যোগাযোগ নেই। ২০১৩ সালে ইউনাইটেড হাইস্কুল সরকারিকরণ হয়েছে। আমার মনে
হয়, আমরা যে স্কুলটা করেছিলাম তা বোধহয় এখন
স্কুলের শিক্ষকরা ভোলে গিয়াছে। অবশ্যে এ নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কারণ পাল্লা করে
স্কুল করেছিলাম এবং সেই স্কুল সরকারি হয়েছে, এটাই আমার কাছে
অনেক।
দারোগালী গাঁওবুড়ার সাথে আমার
ব্যক্তিগত কোন শত্রুতা ছিল না। তাঁকে
লড়াইয়ে হারাব এমন কোনো মনোভাবও আমার ছিলনা। তাঁকে আমি শ্রদ্ধাই করতাম। তখন আমি নীতির জন্য তাঁর সাথে লড়াই করেছিলাম।
হাইস্কুল স্থাপন করার কিছুদনি পরে আরও একটি
পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়ে হয়েছিলাম। আমরা তখন সত্রকনরা শিক্ষক কেন্দ্রসভার শিক্ষক ছিলাম। তখন এখনকার মতো মোবাইলের প্রচলন ছিল না।
তাই আমরা অফিসের অনেক প্রয়োজনীয় খবর সময় মতো পেতাম না। সেজন্য আমরা সত্রকনরা কেন্দ্রসভা ভাগ করে মাণিকপুর শিক্ষক কেন্দ্রসভা গঠন করি।
আমি মাণিকপুর শিক্ষক কেন্দ্রসভার প্রথম সম্পাদক ছিলাম।
সামাজিক শালিসে অংশ গ্রহণ
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সামাজিক
ন্যায় ব্যবস্থা সমাজের একটা অতি প্রয়োজনীয় অংগ। সমাজে সংঘটিত অনেক ভুল বুঝাবুঝি
এবং ছোট-বড় অপরাধজনিত ঘটনা সামাজিক ন্যায় ব্যবস্থার দ্বারা সমাধান করা হয়। এই সামাজিক ন্যায়
ব্যবস্থাকে অনেকে সরকারি ন্যায় ব্যবস্থার
চেয়েও অধিক ত্রুটিমুক্ত বলে স্বীকৃতি দিতে চায়। কিন্তু এই সামাজিক ন্যায়
ব্যবস্থায় অনেক সময় টাকার বিনিময়ে ন্যায় কেনা-বেচা হতে দেখা যায়। পূর্বে একজন
জ্ঞানীলোকই এই সামাজিক ন্যায় ব্যবস্থায় বিচারকের আসন অলংকৃত করতেন। ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গুণের চেয়ে ধনের প্রতি মানুষ
অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। অর্থাৎ যার ধন আছে, তার
মান আছে, সামাজিক ন্যায় ব্যবস্থায় এই প্রবণতা বৃদ্ধি
পেয়েছে। যার জন্যে সামাজিক ন্যায় ব্যবস্থা সম্প্রতি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
আমিও সমাজের একজন হিসাবে
অনিচ্ছকৃতভাবেই অনেক সময় এই সামাজিক ন্যায় ব্যবস্থার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছি; যদিও এই ব্যবস্থার প্রতি আমি তেমন আকৰ্ষিত ছিলাম না। তবুও
মারামারি, জমি নিয়ে ঝগড়া, পরকীয়া
প্রেমজনিত সমস্যা প্রভৃতি অনেক ছোটবড় শালিসে আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে অংশ গ্ৰহণ করতে বাধ্য হয়েছি। তার মধ্যে দু’ একটি শালিসের কথা এখানে বলার চেষ্টা করব-
প্রথমে যে ঘটনাটা বলতে যাচ্ছি সেই
ঘটনাটা ছিল এই রকম- একটি অবিবাহিত মেয়ে এবং অবিবাহিত ছেলের সাথে অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক গঢ়ে উঠেছিল। দু’জনেরই বাড়ি পাশাপাশি। মেয়েটি এক সময় অন্তঃসত্ত্বা হয়। তখন
মেয়েটির পরিয়ালের লোকে কথাটা জানতে পেরে মান-সন্মানের ভয়ে সন্তানটি নষ্ট করে
ফেলে এবং নষ্ট করা সন্তানটি একটি মাটির
পাত্রে ভরে বাড়িতেই পুতে রাখে। পাপ কখনও লুকানো থাকেনা। এই ক্ষেত্রেও তাই হলো।
কথাটা জানাজানি হয়ে গেল এবং সামাজিক শালিস বসল।
আসামি পক্ষ ক্ষমতাশালী ছিল। তাঁরা
বিচারক হিসাবে বিখ্যাত কয়েকজন বিচারক আনলো। তাঁর মধ্যে মাণিকপুরের
ওমর আলী দেওয়ানী, নিরালার
ফখরুদ্দিন এবং গোবিন্দপুরের মোসলেম সরকার ছিলেন। যেহেতু ফৈরাদির পক্ষ থেকে সন্তান
নষ্ট করে ফেলেছিল তাই দুই পক্ষের জবানবন্দি
শুনার পর সবাই মতপোষণ করল- যেহেতু কোনো সাক্ষী নেই এবং যে সন্তানের কথা বলা হচ্ছে সেটাও নষ্ট
করে ফেলেছে, এখন আমরা কি নিয়ে বিচার করব?
সন্তানটি নষ্ট করে ফেললেও একটি
মাটির পাত্রে ভরে পুতে রেখেছে বলে ফরিয়াদির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। তাই সেটা পরীক্ষা
করার ব্যবস্থা করা হোক, বলে জনতার পক্ষ থেকে দাবি উঠল।
তখন বিচারকদের পক্ষ থেকে বলা হলো, আমরা কেউ এখানে ডাক্তার নই যে, পনের দিন
আগে হত্যা করে মাটির নিচে পুতে রাখা বস্তু একটা পরীক্ষা করে, সেটা
কি জিনিস আমরা তার সমিধান দেব! সেটা অন্য কিছুও তো হতে পারে। এরূপ আলোচনার পরে
বিচার ডিসমিস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
মোন্তাজ আলী দেওয়ানী অঞ্চলের একজন
প্রখ্যাত বিচারক। ন্যায় বিচারক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। আমি তাঁর পাশেই বসেছিলাম।
তিনি আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন- ঘটনাটা কেমন হলো? এরাঁ এখন সত্যিকেও মিথ্যে প্রতিপন্ন করে ফেলল। দেখতো, কিছু করা যায় কিনা?
মোন্তাজ আলী দেওয়ানীর কথায় ভরসা পেয়ে আমি দাঁড়িয়ে বললাম- আপনারা যে সিন্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, সেটাকে আমি সন্মান জানিয়েই বলছি, আমাদের
মাঝে একটি আপ্তবাক্য প্রচলিত আছে, বিনা বাতাসে নদীতে ঢেউ উঠে
না। ঘটনাটা কি আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি। তাই আমার মতে, ফরিয়াদির ভুলের জন্য এখন মেয়েটিকে
শাস্তি দেওয়াটা নিশ্চয় ঠিক হবে না। তদুপরি একটা পচা আলু যদি বস্তায় থাকে তাহলে
বস্তার সমস্ত আলু নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই মেয়েটিকে যদি আমরা ন্যায় দিতে
না পারি, তাহলে মেয়েটি পচা আলুতে পরিণত হবে। তখন আমাদের
অন্য ছেলে-মেয়েরাও এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে! যেহেতু আমরা জানি ঘটনাটা কি? শুধু প্রমাণের অভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছিনা। তাই আমি প্রস্তাব রাখি, ছেলেটির
সাথে মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হোক এবং কিছুদিন পরে তালাকের ব্যবস্থা করা হোক। তখন অন্ততঃ বলা যাবে, মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল, স্বামী তালাক দিয়েছে। তখন অন্য কেউ মেয়েটিকে বিয়ে করতে দ্বিধাবোধ করবে
না। আর যদি তা না করা হয়, মেয়েটির পরিয়াল নিশ্চয় বসে
থাকবে না। আইন আদালতের শরণাপন্নও হতে পারে! তখন আমরা এখানে যতগুলি লোক উপস্থিত আছি সবাই কোর্টে
গিয়ে সাক্ষী দিতে হবে। পুলিসের ধমকি, হুমকি ও গালাগালের সন্মুখীন হওয়াটাও খুব বড় কথা নয়।
পুলিসের কথা শুনে সবাই নরম হলো এবং মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। সেখানে শর্ত থাকল, মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার পর একমাস স্বামীর সাথে
ঘর-সংসার করবে এবং একমাস পরে তালাক দিবে। তালাক দেওয়ার সময় ভরণপোষণের জন্য মেয়েটিকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে।কিন্তু
এই এক মাসের মধ্যে যদি ছেলেটির সাথে মেয়েটির বনিবনা হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নাই।
মেয়েটিকে সেদিনই ছেলেটির সাথে
বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু তাদের বনিবনা হলো না। একমাস
পরে মেয়েটিকে তালাক দিল এবং শর্ত অনুযায়ী তালাক দেওয়ার সময় পাঁচ হাজার টাকা
মেয়েটিকে দিয়ে দেওয়া হলো। কিছুদিন পরেই সেই টাকা দিয়ে পরিয়ালের লোকে মেয়েটিকে একটি বউ মরা লোকের সাথে
বিয়ে দিয়ে দিল।
এখন সেই দম্পতি ছেলে-পিলে নিয়ে সুখ-শান্তিতে ঘর-সংসার করতেছে।
আরেকটি শালিসের কথা বলি। সেটা ছিল পরকীয়া প্রেমজনিত শালিশ। শালিসটি অনুষ্ঠিত হয়ে ছিলো ভেড়া গাঁয। সেই শালিশে আমি
সভাপতি ছিলাম।
ঘটনাটা এ রকম- বন্ধুর স্ত্রীর সাথে
আসামির পরকীয়া প্রেম ছিল। দীর্ঘদিনের পরকীয়া। প্রায় পঁচিশ বছরের। বন্ধুর ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পরেও সেই প্রেম অব্যাহত ছিল। তখন সেটা নিয়ে শালিস বসে। জবানবন্দিতে আসামি
পরকীয়া প্রেমের কথা স্বীকার করে। তখন বিচারকেরা জুরিতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু আসামি একজন নেতৃস্থানীয় লোক হয়ে সমাজে অনাচার
চালিয়ে যাচ্ছে এবং এর দ্বারা সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তাই
আসামি লোক সন্মুখে কানে ধরে উঠবস দিবে এবং আসামির বড় ভাই আসামিকে একশ জোতা মারবে।
জুরির ফয়সলা শুনানোর সময়
ফরিয়াদির পক্ষ থেকে আসামিকে হঠাৎ একটি কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করে এবং আসামি ঘটনাস্থলে
ঢলে পরে। আসামিকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার জন্য হসপিটালে পাঠানো হয় এবং বিচার স্থগিত
রাখা হয়। সেদিন যদি আসামি মারা যেত তাহলে সভাপতি হিসাবে আমিই এক নম্বর আসামি
হতাম। কথাটা ভাবলে এখনও আমি শিউরে উঠি। অবশ্যে তারপর সেই পরকীয়া বন্ধ হয়েছিল।
আর একটি শালিসের কথা বলি। সেটাও ছিল
পরকীয়া প্রেমজনিত ঘটনা। সেই শালিসে আমি সভাপতি না থাকলেও শালিসের সাথে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ঘটনাটা ছিল এরকম- একজন বিবাহিত লোক আর একজন বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে
পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়েছিল। স্ত্রীটি তখন তিন
সন্তানের জননী। কোলে একটি তিন চার
বৎসরের শিশুও ছিল।
ঘটনাটা ঈৰ্ষাবশত আসামির স্ত্রীই
প্রকাশ করেছিল। মেয়েটির স্বামী বাইরে থেকে কাজ করে। সে ঘটনাটা শুনে বাড়ি
এসে সামাজিক শালিস বসায়। কিন্তু শালিসের দিন আসামির
স্ত্রী স্বামীর পরকীয়া থাকার কথাটা
অস্বীকার করে। এদিকে মেয়েটি পরকীয়া প্রেম থাকা বলে স্বীকার করে। মেয়েটির স্বামী
তখন বলল, আমি এমন কুলটা স্ত্রীকে নিয়ে ঘর-সংসার করব
না।
তখন বিচারকরা বললেন, সাক্ষী যদি না থাকে তাহলে আমরা কি নিয়ে বিচার করব? ফরিয়াদি পক্ষের স্ত্রীলোকটি তো নিজের স্বার্থের জন্যেও কথাটা স্বীকার
করতে পারে! আসলে হয়তো ঘটনাটা ঘটেইনি!
ঘটনাটা জটিল রূপ ধারণ করলো। স্ত্রীলোকটির স্বামী নিজের স্ত্রীকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। এদিকে স্ত্রীলোকটির
কোলে শিশু সন্তানও আছে। সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আমি বললাম- আমি সাক্ষী(আসামির
স্ত্ৰী)কে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই, সে আগে কথাটা বলে একজনের সংসারে আগুন লাগিয়ে এখন কেন
অস্বীকার করতেছে। যদি ঘটনা ঘটেই নি, তাহলে সে একথা বলল কেন?
হয়তো কথাটা সত্য। তবে সে জনসন্মুখে কথাটা বলতে লজ্জাবোধ করতেছে।
সাক্ষীকে আড়ালে ডেকে নিয়ে এলাম।
আমার সাথে তিন চার জন লোক নিলাম সাক্ষী হিসাবে। আড়ালে নিয়ে বললাম- আমি জানি, আপনার পরিয়ালের পক্ষ থেকে আপনাকে কথাটা বলতে মানা করেছে। তাই
আজ অস্বীকার করছেন। কিন্তু আমাদের চোখ অন্ধ হতে পারে; কিন্তু
আল্লাহর চোখ তো অন্ধ নয়। তিনি সবকিছুই দেখতেছেন এবং শুনতে পাচ্ছেন। আপনি যে একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর সংসারে আগুন লাগাইতেছেন, এর বিচার আল্লাহ একদিন নিশ্চয় করবে। তবে আপনি যে মিথ্যা কথা
বলে একজনের সংসার ভাঙতে চাইছেন এর বিচার আজ আমরাই এই শালিসেই করব। সত্যি কথা বললে
অবশ্যে ক্ষমাও পেতে পারেন। গতিকে পরকাল তো বটেই ইহকালের কথা চিন্তা করে সত্যি ঘটনা কি খুলে বলুন।
তখন মহিলাটি সত্য ঘটনা প্রকাশ করল।
সে যা বলেছে, তা সত্যি। সে নিজেই দেখেছে ঘটনাগুলো। তারা
ইড়ি খেত করেছে। সেই ইড়ি খেতের পাশেই স্ত্রীলোকটির বাড়ি। স্ত্রীলোকটির স্বামী বাড়িতে থাকে না। গুয়াহাটী থেকে রিক্সা চালায়। সেই সুযোগ নিয়েই ইড়ি খেতে
পানী দিতে গিয়ে তার স্বামী ঘটনাটা ঘটিয়েছে।সে নিজচোখে কয়েকদিন ঘটনাটা দেখেছে। সত্যি কথা বললে সতিনের
সংসার করতে হবে বলে সে এখন কথাটা অস্বীকার করছে।
কথাটা আমরা মজলিশে এসে বললাম। তখন
সবাই একবাক্যে বলল- যদি ঘটনা সত্যি, তাহলে
আসামিকে স্ত্রীলোকটিকে গ্রহণ করতেই হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, স্ত্রীলোকটির তিনটি নাবালক সন্তান রয়েছে। তাই ফরিয়াদি পুরুষটিকে
বলা হলো- মানুষ বিষ খেয়েও বিষ হজম করে। আপনি সন্তানগুলোর দিকে
চেয়ে আপনার স্ত্রীকে গ্রহণ করুন।
কিন্তু ফরিয়াদি কোনো মতেই নিজের
স্ত্রীকে গ্রহণ করতে রাজি হলো না। তবুও বুঝার জন্য ফরিয়াদিকে একমাস সময় দেওয়া
হলো। এক মাস পরেও যদি ফরিয়াদি স্ত্রীলোকটিকে গ্রহণ করতে রাজি না হয়, তাহলে আসামির সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হোল শেষে।
একমাস পরেও ফরিয়াদি নিজের স্ত্রীকে
গ্রহণ করতে রাজি হলো না। তাই পূর্বের সিদ্ধান্ত মতো স্ত্রীলোকটিকে আসামির সাথে বিয়ে
দিয়ে দেওয়া হলো। এখন তারা সুখে শান্তিতেই ঘর-সংসার করতেছে।
আরেকটি পরকীয়া প্রেমজনিত ঘটনার
সামাজিক শালিসে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। একদিন রাতে শোয়ে আছি। তখন একজন লোক এসে আমাকে ডেকে তুলে বলল- আমাদের
অমুককে অমুক লোকেরা ধরে মারপিট করতেছে।আপনি তারাতারি চলুন, নাহলে তারা ছেলেটিকে মেরে ফেলবে।
আমি এখানে ছেলেটি এবং ছেলেটিকে যারা মেরেছিলো তাদের নাম উল্লেখ করলাম না।
অমুক মানে লোকটির ছেলে, যে আমাকে
ডাকতে এসেছিলো। আমি ছেলেটিকে ভালোভাবেই জানি। ছেলেটি কলেজে পড়ে।
মারতেছে মানে? কি করেছে আপনার ছেলে? আমি জিজ্ঞাসা
করলাম।
অমুকের বউয়ের ঘরে ঢুকেছিল। তারাই
ধরে মারতেছে। লোকটি বলল।
আমি ঘড়ী দেখলাম। রাত এঘারটা বাজে। অগত্যা উপায় না পেয়ে
ঘটনাস্থলে এলাম। দেখলাম, ছেলেটিকে এক জায়গায় বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং একদল লোক
তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাত হলেও টর্চ লাইটের আলোকে দেখতে পেলাম ছেলেটিকে
মারপিট করতেছে। তার চুল উস্কোখুস্কো। শরীরে ধূলি-কাদা লেগে আছে।
তখন আমি জামিন হয়ে ছেলেটিকে তাদের
কাছ থেকে উদ্ধার করলাম এবং পরের দিন বিকেলে শালিস বসার কথা বললাম।
সিদ্ধান্ত মতোই পরের দিন বিকেলে
শালিস বসা হলো। কিন্তু অসুবিধে হলো, ফৈরাদিরা
জবানবন্দি দিতে রাজি নয়। ফৈরাদি পক্ষ আসামি পক্ষের চেয়ে সবল। একটু গোয়ার প্ৰকৃতিরও। তাদের মতে, তারা
ধরেছে। ঘটনাটা সত্য। তাই আর জবানবন্দির প্রশ্নই উঠে না। তারা সিদ্ধান্তও দিয়ে
দিল। ছেলেটির মাথা নেড়া করে চূণ মাখিয়ে গলায় জোতার মালা পড়িয়ে পাড়ায় ঘুরাতে হবে।
কিন্তু আমরা বিচারকরা জবানবন্দি না
শুনে শালিস করতে পারব না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম। অগত্যা ফরিয়াদিরা জবানবন্দি দিতে
বাধ্য হলো এবং জুরির সিদ্ধান্ত মর্মে ছেলেটিকে কানে ধরে উঠবস দেওয়া হলো এবং তার
বাবা তাকে বিশটা জোতার বাড়ি মারল। বিচার হয়ে গেল।
এরকম আরও অনেক শালিসে অংশ গ্রহণ
করেছি। তখন একটা কথা লক্ষ্য করেছি- সবাই সবলের মুখের দিকে চেয়ে কথা বলে। বেশির ভাগ শালিসেই দুর্বল হেরে যায়। এ ব্যবস্থা পরিবর্তন হওয়া উচিত। কারণ গরিবরাও মানুষ। তারাও
ন্যায় পাওয়া উচিত।
যতিগাঁও গ্রামে বসতি স্থাপন
১৯৯৭ সালে আবার ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভাঙন শুরু হলো। ফলে আমাদের বাড়ি আবার ব্ৰহ্মুপুত্ৰ নদের পাড়ে পরে গেলো। তখন নিরুপায় হয়ে আমার শ্যালক হাসমত আলীর উদ্যোগে
যতিগাঁও গ্রামে এক বিঘা জমি কিনে ১৯৯৮ সালে আমরা যতিগাঁও
উঠে আসি। যতিগাঁও উঠে আসার পরে আমি দুই বৎসর সাইকেল নিয়ে আলীগাঁও স্কুলে যাতায়াত
করেছি।তখন আমার স্কুল মানে আলীগাওঁ স্কুল শিলোচি গ্রামে অবস্থিত। যতিগাঁও থেকে শিলুচি গ্ৰামের দূরত্ব অনুমান পনের ষোল কিলোমিটার।
সকাল ছ'টায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতাম এবং
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। এভাবে দুই বৎসর যাতায়াতের পর সাকায়েত হোসেনের উদ্যোগে
আমি গরেমারি পাথারের ১২৩৯ নম্বর গরেমারি পথার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি।
এর মধ্যে একদিন ভেরাগাঁয়ের উদ্যমী যুবক জয়নাল আব্দিনের উদ্যোগে আমরা ১৯৯৯ সালে ভেরাগাঁও
হাইস্কুল স্থাপন করি। ভেরাগাঁও হাইস্কুলের আমি প্রতিষ্ঠাপক সভাপতি ছিলাম। প্রধান
শিক্ষক ছিল জয়নাল আব্দিন। উক্ত হাইস্কুল থেকে ১৯ জন ছাত্র-ছাত্রী ম্যাট্রিক পাস
করার পর জনতার অসহযোগিতার জন্য স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুলটা থাকলে ইউনাটেড
হাইস্কুলের সাথেই সরকারিকরণ হতো। এটা আমার জীবনের একটা বড় ট্র্যাজেডি।
যতিগাঁও উঠে আসার পরে আমি আরও একটি
ট্রেজেডির সন্মুখীন হয়েছি।
ভেড়াগাঁও, যতিগাঁও, রাঙাপানীর অধিকাংশ কৃষকই কিছুদিন আগে
পর্যন্ত বরপেটার ভূ-স্বামীদের অধঃস্তন রায়ত ছিল। তাঁরা বরপেটার মহাজনের জমি আধি-ঠিকা
নিয়ে চাষ-আবাদ করে পরিয়াল ভরণ-পোষণ করত। মহাজনদের জমি বিক্রীর প্রয়োজন হলে যারা
জমি চাষ-আবাদ করত তাদের কাছেই বিক্রী করত। তখন যে যেভাবে পারে দখলকারী চাষীরা সেই
জমি কিস্তিতে কিনে নিত। কিন্তু
বরপেটার ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ ম্যাডিকেল কলেজ স্থাপন হওয়ার পর জমির মূ্ল্য দালালদের দৌলতে হু হু করে বেড়ে যায় এবং দালালি সিষ্টেম চালু
হয়। পনের ষোল্ল হাজার টাকা বিঘার জমি বিশ পঁচিশ লাখ হয়ে যায়। ফলে পঞ্চাশ ষাঠ
বৎসর যাবত ভোগ-দখল করে আসা চাষীরা জমি থেকে বঞ্চিত হয়। আমরা এই দালালি সিষ্টেম বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ
নিয়েছিলাম, কিন্তু এই কাজে সফল হতে পারিনি।এখনও দালালির
তাণ্ডব চলছে ভেড়া এবং জতিগাঁয়। প্ৰশাসন উদ্যোগ নিয়ে এই সিস্টেম বন্ধ করা উচিত।
আগেই বলেছি জয়নাল আব্দিন সংগীতের সাথে জড়িত ছিল। সে নিজে তবলা বাজাত এবং গীত-বাদ্য ভালোবাসত।আমি
প্রতিদিন সন্ধ্যেয় জয়নাল আব্দিনদের বাড়ি যেতাম এবং গীত-বাদ্যের চর্চা করতাম। জয়নাম আবদিন ভালো তবলা বাদক। তাই সুর সম্পৰ্কে তার ভালো জ্ঞান ছিলো। সে সুর বলে দিয়ে সেই সুরে গান লিখে দিতে বলতো।আমি তখন তার দেওয়া সুরে গীত
রচনা করার চেষ্টা করতাম। এই সময়েই আমি বাংলা এবং অসমিয়ায় অনেক গীত রচনা করে ফেলেছিলাম। অবশ্যে রেডিওতে
শুনে শুনে আমি আগেও অসমিয়া ভাষায় অনেক গীত রচনা করেছিলাম।
হাইস্কুল স্থাপন করার পর বিদ্যালয়ের প্রথম
বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো। স্কুলের অধিবেশনে গীত পরিবেশনের জন্যও জয়নাল আব্দিন আমাকে কিছু সুর দিয়েছিলো এবং আমি জয়নাল আব্দিন দেওয়া সুরে গীত রচনা করে দিয়েছিলাম। বিদ্যালয়ের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে আমি রচনা করা গীত দিয়ে
স্কুল সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো। এই সময়ে আমার পরিচয় হয় গরেমারির সাংবাদিক বুলবুল হোসেনের সাথে। আমার গীতগুলি দেখে সে প্রভাবিত হয়ে একদিন জিজ্ঞেস করলো- আপনি অসমিয়ায় রচনা করা কতগুলি গীত আছে?
আমি বললাম- অনেকগুলি গীত আছে। ষাট
সত্তরটা তো হবেই।
ঠিক আছে। বুলবুল হোসেন বললো- আমি
একদিন আপনাদের বাড়ি গিয়ে গীতগুলো দেখতে চাই।দেখতে পারব কি?
আমি বললাম-নিশ্চয় পারবেন। কোনো
অসুবিধা নাই।
একদিন বুলবুল হোসেন আমাদের বাড়ি
এলো এবং সে নিজে উদ্যোগ নিয়ে গীতগুলি গুয়াহাটী বেতাঁর কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিল। একমাস পরে গুয়াহাটী বেতাঁর কেন্দ্র থেকে
আমন্ত্রণ এল। আমি গুয়াহাটী গিয়ে প্রখ্যাত গীতিকার কৃতিকমল ভূঞার সাথে প্রায়
আড়াই ঘণ্টা সেই গীত নিয়ে আলোচনা করার পরে কিছু কিছু শব্দ সংযোজন ও বিয়োজন করা হলো। তারপর কৃতিকমল ভূঞা বললেন- গীতগুলি কাটাকাটি করা
হলো। আপনি গীতগুলি ‘ফ্রেস’ করে লিখে
আমাদের কেন্দ্রে জমা দিবেন। আমার সাথে যোগাযোগ না করলেও হবে। গীতগুলি আপনি রাজীব বড়ুয়ার হাতে জমা দিলেই হবে।
আমি গীতগুলি ফ্রেস করে লিখে এক
সপ্তাহ পরে বেতাঁর কেন্দ্রে গিয়ে রাজীব বড়ুয়ার হাতে জমা দিলাম। তখন রাজীব
বড়ুয়া আমাকে পার্টি দেওয়ার কথা বললেন। আমি পার্টি দিইনি এবং আমার গীতগুলিও অনুমোদন হয়নি। কারণ
আমি টাকা দিয়ে সন্মান কেনার পক্ষপাতি আগেও ছিলাম না- এখনও না।
টাকা না দেওয়ার জন্যই আমি রাজ্যিক
শিক্ষকের পুরস্কার পাইনি। তখন আমি সবেমাত্র খবরের কাগজে লেখা শুরু করেছি। আমার
প্রথম লেখা অগ্রদূত খবরের কাগজে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ২০০১ সালের ১৩ সেপ্তেম্বরে।
এই লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রেও বুলবুল হোসেনের ভূমিকা ছিল। তাঁর কথা মতোই আমি খবরের
কাগজে লেখা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। প্রথম লেখা প্রকাশ হওয়ার পরে আমি নিয়মিতভাবে লেখা
শুরু করি এবং লেখা প্রকাশ হতে থাকে। ২০০২ সালে সাহিত্য সভার মধ্যকালীন কালগাছিয়া অধিবেশনে আমি অসমিয়া ভাষায় লেখা আমার প্রথম
গল্প সংকলন ‘এটি অভিশাপর মৃত্যু’ প্রকাশ
করি।
২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বরে আমি
ধানবান্ধা মণ্ডল সমল কেন্দ্রের সমন্বয়ক হিসাবে যোগদান করি। সমন্বয়ক হিসাবে
যোগাদন করার পরে আমি ‘মুখ বাগরা মুকুতা’ নামের
প্রচলিত গল্প সংকলন প্রকাশ করি। গল্প সংকলনের আগ কথা লেখে দিয়েছিলেন স্বনামধন্য
সাহিত্যিক অক্ষয় মিশ্র স্যার। ২০০৭ সালে আমি ‘দিগ্বিজয়ী বাবর’ নামক
ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রকাশ করি। তারপরে ‘এদিনর সংবাদ’,
‘অগ্রদূত’ প্রভৃতি দৈনিক খবরের কাগজে আমার
গল্প এবং প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে। তাই তখন দুই চারজনে আমাকে লেখক হিসাবে জানতে শুরু করে।
২০১১ সালে ভবানীপুর প্রাথমিক
শিক্ষাখণ্ডের তদানীন্তন শিক্ষা বিষয়া জয়রাম দেবনাথ স্যার একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন-
আপনাকে রাজ্যিক শিক্ষক পুরস্কারের জন্য পাঠাব ভেবেছি। কলিতার কাছে ফর্ম আছে। ফর্ম ফিলআপ করে জমা দিন।
কলিতা মানে প্রকাশ কলিতা। আমাদের
অফিসের ‘ষ্ট্যাটেটিক্স’। দুই তিনদিন পরে ফর্ম ফিলআপ করে জমা দিলাম। সেখান থেকে ডিআই অফিসে পাঠিয়ে দিলো। ডিআই অফিস থেকে পাঠিয়ে
দিলো ডিরেক্টর অফিসে। দুই তিন মাস পরে একদিন
সন্ধ্যে সাতটায় ফোন এলো ডিরেক্টর অফিস থেকে, আমার বয়েসের প্রমাণপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্ভব হলে কালই বয়েসের প্রমাণপত্র জমা দিলে ভালো হয়। ফোন করেছিলেন ডিপিআই অফিসের এসিটেণ্ট ডিরেক্টর রাজীব বরা।
আমি একদিন পরে সার্টিফিকেট নিয়ে
ডিরেক্টর অফিসে গেলাম। সেদিন আমার সাথে গিয়েছিল জাহোরপামের বাহার উদ্দিন তালুকদার। ডিরেক্টরের সাথে দেখা করলাম।
ডিরেক্টর বললেন- কিছু পেতে হলে তো কিছু দিতেও হয়। আমরা নয় জন সদস্য আছি। মানে বুঝতেই তো পারছেন.....
কথাটা আমি বুঝতে পারলাম। তখন আমার গুয়াহাটী বেতাঁর কেন্দ্রের কথা মনে পড়ে গেল।
তাই আমি বললাম- আপানার কথা আমি
বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমার দ্বারা এটা সম্ভব হবে না। আমার ‘পারফরম্যান্সে’ যদি আমি পাই দিবেন। টাকা
দিয়ে পুরস্কার কেনার মতো টাকা আমার নাই।
বলা বাহুল্য, পুরস্কার আমি পাইনি। একই রাজীব। পার্থক্য শুধু ছিল উপাধিতে। আগের জন বড়ুয়া এবং পরের জন বরা।
কয়েকদিন আগেও আমাকে একজন ফোন করে
বলেছিল- স্যার, আপনার নাম কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে
পুরস্কারের জন্য পাঠাব।
কি পুরস্কারের জন্য? আমি বললাম।
আপনার সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি
হিসাবে আমরা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছি। লোকটা বলল।
আমি বললাম- আমি কি পুরস্কারের
উপযুক্ত হয়েছি?
লোকটা বলল- সাগরে তো আর নিজের গভীরতা মাপে না। মাফে অন্যে। আপনি পুরুস্কারের উপযুক্ত
বলেই তো আমরা আপনার কথা ভেবেছি।
আমি বললাম- সেটা আপনাদের ইচ্ছা। আমি
আর কি বলব!
তখন লোকটা বলল- স্যার, কিছু খরচ দিতে হবে।
খরচের কথা শুনে আমি বললাম- খরচ
দিয়ে আমি পুরস্কার নেব না। এমনিতে যদি কেউ আমার কর্ম দেখে দেয়, তাহলে সেটা আলাদা কথা।
পুরস্কার অবশ্যে আমি পাইনি, তবে সম্বর্ধনা পেয়েছি। ২০০২ সালে প্রথম সম্বর্ধনা জানিয়েছিলো জনীয়ার দাপোণ সাহিত্য গোষ্ঠীর তরফ থেকে। এই সম্বর্ধনার
ক্ষেত্রে জনীয়ার নুরুল ইসলাম তালুকদারের বিশেষ অবদান ছিলো। ২০১৪ সালে কয়াকুছির প্রেসগীল্ড, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী,
কয়াকুছি, প্ৰগতিশীল সাহিত্য প্ৰকাশন,
কালগাছিয়া, দেওয়ান আব্দুল কাদির সাহিত্য পুরস্কার, হাউলি এবং পাবলিক সংবাদ-এর তরফ থেকে আমাকে সম্বর্ধনা জানিয়েছে। যারা আমাকে সম্বর্ধনা জানিয়েছে তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
আমার মতো একজন নগণ্য ব্যক্তিকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্য আমি খুবই গর্বিত। সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠীর তরফ থেকে আমার কয়েকটি পুস্তকও প্রকাশ করেছে। তার জন্যও আমি বিষয়ববীয়াদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সমন্বয়
সাহিত্য গোষ্ঠীর সম্পাদক সাহেদ আলী আহমেদ আমার হিতাকাংক্ষী। তাঁকেও আমি শুভেচ্ছা
জানাচ্ছি।
আমি
২০০২ সালে একটি অতি বড় সম্বৰ্ধনা পেয়েছিলাম। সেটাই ছিলো আমার লেখক জীবনের প্ৰথম সম্বৰ্ধনা এবং সেই সম্বৰ্ধনাটিকে আমি জীবনের সবচেয়ে
মূল্যবান সম্বৰ্ধনা বলে মনে করি। ২০০২ সালের কথা। আমি ২০০২ সালে আমার প্রথম গল্পের
বই ‘এটি অভিশাপর মৃত্যু’
প্রকাশ করেছিলাম। বইটি
প্ৰকাশের ক্ষেত্ৰে বরপেটা ডি,আই অফিসের
উচ্চবৰ্গ সহায়ক ইলিমুদ্দিন ভাই আমাকে উৎসাহিত করার সাথে সাথে একটি টোকাও লিখে
দিয়েছিলেন।
একদিন ইলিমুদ্দিন আমাকে বললেন-
আবুল ভাই,
আপনি একদিন আমাদের বাড়ি যেতে হবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম-কেন?
ইলিম ভাই বললেন- মা, আপনাকে দেখতে চেয়েছেন।
আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- আমাকে দেখতে চেয়েছেন মানে! কারণ কি?
ইলিম ভাই বললেন- গেলেই বুঝতে পারবেন।
আমি নিজেও জানিনা কেন যেতে বলেছেন।
একদিন সময় করে
ইলিম ভাইর সাথে তাঁদের বাড়ি গেলাম।
আমাকে
ড্রয়িং রুম বসতে দিলেন। একটু পর একটি মেয়ে চা মিস্টি নিয়ে এলো। চা খাওয়ার পর ইলিম ভাইর মাতৃ একটি শরাই(আসামের একটি অতি মূল্যবান সামগ্ৰী)তে করে
একটি গামছা(গামছাও আসামের একটি
গুরুত্বপূৰ্ণ সামগ্ৰী) এনে আমার গলায়
পড়িয়ে দিয়ে বললেন- আমি অসমিয়া ভাষী যদিও অসমিয়ার পাশাপাশি অনেক বাংলা গল্পের বইও পড়েছি। সেজন্য
গল্পের প্ৰতি আমি বিশেষ আকৰ্ষণ অনুভব করি। আমি আপনার ‘এটি অভিশাপর মৃত্যু’ গল্পের বইটি পড়েছি। বইটিতে একটি গল্প পড়ে আমি খুবই
অভিভূত হয়েছি। গল্পটি হলো বেকীর বান। গল্পটি বাস্তব পটভূমিতে লিখা নাকি?
আমি বললাম- বাস্তব এবং কল্পনা দিয়েই তো গল্প, উপন্যাস রচনা করা
হয়। বেকীর বান গল্পটিও তেমনই ভাবে লিখা। গল্পটির মধ্যে বাস্তবতা ও কল্পনা উভয়ই রয়েছে।
ইলিম ভাইর মাতৃ
বললেন- গল্পটি আমার খুবই
ভালো লেগেছে। গল্পটি পড়ে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। আমি আগেই বলেছি, আমি অসমিয়া এবং বাংলা অনেক গল্পের বই পড়েছি। সেসব গল্পের চেয়ে
আপনার গল্পটি কোন গুণে কম নয়।
এখন আপনারাই
বলুন, এর চেয়ে কি আরও বড় কোন সম্বর্ধনা থাকতে পারে?
থানেশ্বর
মালাকার দেব আমাদের বরপেটায় কয়েক বৎসর উপায়ুক্ত হিসাবে কার্যনির্বাহ
করে গেছেন। উপায়ুক্ত হিসাবে তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে। তিনি সকল শ্রেণীর লোকের সাথে সমন্বয় রক্ষা করে চলতেন।
বিশেষ করে লেখামেলার সাথে জড়িত ব্যক্তির সাথে তিনি সুসম্পর্ক
রক্ষা করে চলতেন। তিনি নিজেও সুলেখক। তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল একটি লেখার
মাধ্যমে। জনীয়া গ্রন্থমেলার স্মৃতিগ্রন্থে তিনি একটা প্রবন্ধ লেখেছিলেন।
প্রবন্ধটা পড়ে আমার ভালো লেগেছিল তাই ফোন করে আমি তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিলাম।
পরে তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল কয়াকুছি প্রেসগীল্ডের একটি অনুষ্ঠানে। তিনি বরপেটা
থেকে পদোন্নতি হয়ে যাওয়ার চার পাঁচদিন আগে আমি এক বিশেষ প্রয়োজনে তাঁর সাথে
দেখা করেছিলাম এবং আমার লেখা কয়েকটা পুস্তক উপহার দিয়েছিলাম।
বরপেটা জেলার তরফ থেকে প্রত্যেক
বৎসর বিশেষ ব্যক্তিদের সম্বর্ধনা জানানো হয়। পদোন্নতি হয়ে যাওয়ার পরে তিনি আমাকে
একদিন ফোন করে বলেছিলেন- আপনার নাম আমি সম্বর্ধনার জন্য লিখে দিয়ে এসেছি। যদি
ডাকে তাহলে যাবেন।
ডাকে নি, তাই যাওয়া হয়নি।
আমি খবর কাগজে লেখা পাঠিয়ে কোনোদিন
তোষামোদ করিনি। সম্পাদকের ইচ্ছে হলে ছাপা করেছে, না
করলেও কোনো ক্ষেদ ছিল না।। অবশ্যে দুই একটির বাইরে বেশির ভাগ লেখাই প্রকাশ হয়েছে। সেগুলি আমি নিজে ডিটিপি করে পুস্তক আকারে প্রকাশ করেছি।
অবশ্যে তেমন বিক্রী হয়নি। লাইব্রেরির মাগনা পুস্তক পড়ারই লোক নেই, আমার পুস্তক টাকা দিয়ে কিনে কে পড়বে! তবে মনের তাগিদে
লিখে চলেছি।
লেখালেখির মাধ্যমে আমার অনেক
স্বনামধন্য ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়েছে। তাঁর মধ্যে একজন ছিলেন জামুগুরিহাটের
মহেন্দ্ৰ বড়ুয়া। তাঁর মৃত্যু তিথিতে তাঁর সুযোগ্য সন্তানেরা ২০১১ সালে একটি
স্মৃতিগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়েছিলন। তাঁদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখনও বাড়ির তাঁদের সবাই আমার সাথে যোগাযোগ
রেখে চলছে। সেই অনুষ্ঠানে আমার সাথে গিয়েছিল জাহোরপামের বাহার উদ্দিন তালুকদার।
সেও মুগ্ধ হয়েছিল তাঁদের আতিথেয়তায়।
ডিব্রুগড়ের বৌথন গগৈর সাথেও
লেখামেলার মাধ্যমেই আমার পরিচয় হয়েছিল। লোকটি আমার থেকে বয়সে বড় ছিলেন। তিনি
ফোন করলে বিশ মিনিটের কম কোনোদিনই কথা বলতেন না। প্রফুল্ল কুমার গোস্বামীর সাথেও
আমার লেখামেলার মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল। তাঁর সাথেও আমি অনেকদিন ফোনালাপ করেছি।
একদিন আমাকে ফোন করেছিল গুয়াহাটী থেকে একজন পাঠক। তিনি আমার সম্পূর্ণ
পরিচয় নেওয়ার পরে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম- আপনি কে? আপনি তো আমার সব পরিচয় নিলেন, আপনার পরিচয় তো পেলাম না।
তখন তিনি বললেন- আমি পুলিসের লোক।
এসপি। গুয়াহাটী এলে আমাকে ফোন করবেন।
গুয়াহাটী গিয়েছি যদিও তাঁকে কোনদিন
ফোন করিনি। পুলিসের লোক, কি ভেবে
ফোন করেছিল কে জানে! এখন নিশ্চয় মনে নেই, এই ভেবেই ফোন করা
হয়নি।
একদিন ফোন করেছিলেন দীননাথ দাস
নামের একজন লোক। পরিচয়ের পরে জানতে পেরেছিলাম, তিনি
তখন নগরবেড়া সার্কেলের উপপ্রতি সমাহর্তা(এস,ডি,সি)। আলোচনার শেষে তিনি
বলেছিলেন- নগরবেড়া যদি আপনার কোন লোক আছে, আমার কাছে পাঠিয়ে দিবেন, সম্ভব হলে আমি তাঁদের কাজ করে দেব।
নগরবেড়া তেমন পরিচিত লোক না থাকায়
কাউকে কথাটা বলা হয়নি।
লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখানার
ত্রৈলোক্য শইকীয়া আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করতেন এবং লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ
করতেন। সে কিছু ‘টপিকো’ দিতেন লেখার
জন্য।
লেখা প্রকাশ হলে অনেকেই আমাকে ফোন
করেছে। সকলের কথা লেখা এখন সম্ভব নয়। তাই লেখলাম না।
একদিনেব কথা না বললেই নয়। সেদিন
নিয়মীয়া বার্তায় ‘মুছলমানসকলে আত্মপক্ষ সমর্থনর নীতি ত্যাগ
করিবর হ’ল’ শীর্ষক অসমিয়া ভাষায় একটি
লেখা প্রকাশ হয়েছিল। সেদিন সাড়াদিনে বাইশটা ফোন এবং চারটে মেসেজ পেয়েছিলাম।
২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিলে গণ অধিকার
খবরের কাগজে বিবাহ এবং যৌতুক শীর্ষক অসমিয়া ভাষায় একটি লেখা প্রকাশ হয়েছিল। তখন দরং
থেকে একজন যুবক ফোন করে বলেছিল- স্যার, আপনার
লেখা পড়ে আমার চোখ খোলে গেছে। আমি অবিবাহিত। আপনাকে কথা দিচ্ছি বিবাহে আমি যৌতুক নেব না।
কিছুদিন আগে ৫২৩ নং তেমূৰা প্ৰাথমিক বিদ্যালয়ের স্মৃতিগ্রন্থে বিশ্ববন্ধু দেৱান(সফিকুল ইছলাম)নামক একজন কৃতি শিক্ষক, লেখক আমার সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন। লেখকের প্রতি আমার
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল।
কবির প্রতি আমার অশেষ ভালোবাসা রইল।
এমন অনেক স্মৃতি আছে লেখামেলা
সম্পর্কে। সব কথা এখন লেখা সম্ভব নয়। অবশ্যে মনেও নেই সব
কথা।
সিআরসিসি (মণ্ডল সমল কেন্দ্র সমন্বয়ক) হিসাবে এঘার বৎসর
আমার সিআরসিসি হওয়ার নেপথ্যের
ব্যক্তিজন ছিলেন আব্দুল মোতালেব। তখন তিনি বাঁহমূরা পঞ্চায়েতের সভাপতি। একদিন তিনি
আমাদের বাড়ি এসে বললেন- আপনি সিআরসিসিতে আবেদন করুন। আমি বিইওর সাথে আলোচনা
করেছি। বর্তমান যে সিআরসি আছে তাঁকে লোকে চায় না। তাই আমি বিইওর কাছে আপনার কথা
বলে এসেছি।
সিআরসিসি নেবে এই কথা অবশ্যে আমি
জানি, কিন্তু সিআরসিসি হবো, একথা কোনদিনই ভাবিনি। তাঁর তাগিদা মতোই আমি সিআরসিসির জন্য আবেদন করলাম
এবং ইন্টারভিউ দিয়ে সিআরসিসি হয়ে গেলাম।
২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বরে আমি ভবানীপুর
শিক্ষাখণ্ডে সিআরসিসি হিসাবে যোগদান করি এবং ২০১৪ সালে মোটা-মুটি এঘার বৎসর পরে
আমি আবার স্কুলে যোগাদন করি। শিক্ষক এবং সিআরসিসি থাকা অবস্থায় আমি কয়েকজন ডিআই, বিইও, সহ পরিদর্শক এবং কেরানি পেয়েছি।
অফিসার থেকে কেরাণি পর্যন্ত সবাই
যেন বিনা বেতনে চাকরি করেন। শিক্ষকরাঁ টাকা না দিলে যেন তাঁদের সংসার অচল। যারা ভালো, তাঁদের কেউ চালে উঠে,
কেউ আবার গাছে উঠে প্রস্রাব করে। পার্থক্য এই টুকুই আর কি! এই ‘সিষ্টেম’ বদলানো প্রয়োজন।
অবশ্যে দুই একজন যে ভালো ছিলেন না তা নয়। ভালো লোকদের মধ্যে ডিআই অফিসের কেরাণি সুশীল রঞ্জন চৌধুরি, উৎপল
দাস এবং ভবানীপুর শিক্ষাখণ্ডের সর্বশিক্ষা অভিযান মিসনের কেরানি কুশল দাশের নাম না
লেখলে অন্যায় হবে। সুশীল রঞ্জন একজন কবি এবং উৎপল দাস একজন শিল্পী মানুষ। কুশল
দাস এমনিতেই ভালো লোক ছিলেন। বলতে পারেন চক্ষুলজ্জা ছিল। এদেঁর আমি একটু ব্যতিক্রম দেখেছি। এদেরকে ভালো লোক বলে চিহ্নিত করা যেতে
পারে।
বিইওদেঁর মধ্যে গৌরিপুরের সোহরাব
আলি আহমেদের নাম না লেখলে অন্যায় হবে। তিনি খুবই অমায়িক এবং ভদ্র ছিলেন। কারও
কাছ থেকে টাকাতো কোনদিন নেয়ইনি, কেউ চা খাওয়াতেও
পারেনি। চা খাওয়ার কথা বললে, বলতেন, কি
কাজ আছে দিন। কাজটা করে দিয়ে বলতেন, যান এখন চা খেয়ে বাড়ি
যান। আমি চাহ খাব না। একটু আগেই খেয়েছি।
চা খাওয়া সম্পর্কেই একদিনের একটি
ঘটনা বলি। সোহরাব আলি আহমেদ তখন বদলি হয়ে নতুন করে ভবানীপুর শিক্ষাখণ্ডে যোগদান করেছেন। বরপেটার বিষয়ে তিনি তেমন অবগত নন। হঠাৎ একদিন তাঁর সাথে আমার বরপেটায় দেখা হয়ে গেল। তখন প্রায় বারটা বাজে। সেদিন শুক্রবার ছিল।
আমাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেসা করলেন- ভাই, মসজিদ কোথায়?
আমি তাঁকে মসজিদে নিয়ে গেলাম।
তারপর নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেড়িয়ে তিনি বললেন- একটু চা খেতে পারলে ভালো হতো। চলেন একটু চা খাই।
আমি তাঁকে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে
গেলাম। নিমকি, মিষ্টি দিয়ে চা খেলাম। আমি চায়ের দাম
দিতে গেছি। তখন তিনি বললেন- আপনি চায়ের দাম দিয়েন না। আমি দেব চায়ের দাম।
আমাদের বাড়ি বরপেটা টাউনের কাছে।
তাই আমি বললাম- না স্যার, আমাদের টাউনে এসেছেন, চায়ের দাম আমি দেব।
সোহরাব আহমেদ বললেন- চায়ের কথা আগে
আমি বলেছি। তাই চায়ের দাম আমি দেব।
শেষে চায়ের দাম তিনিই দিয়েছিলেন।
সহকারি পরিদর্শকদের মাঝে ধর্মেশ্বর
শর্মাকে ভালো লোক বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তিনি আমার বদলি, প্রশিক্ষণে পাঠানো নিয়ে কয়েকটা কাজ করে
দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনোদিন আমার কাছ থেকে টাকা নেয়নি। অবশ্যে চা খাইয়েছি।
আমাদের ভবানীপুর শিক্ষাখণ্ডে আমরা
ষোলজন সিআরসিসি (মণ্ডল সমল কেন্দ্র সমন্বয়ক) ও ছয়জন আরটি(সমল শিক্ষক) ছিলাম। তার
মাঝে খান্দারপারের ইন্তাজ আলী আহমেদ, বেতবারির
মজিবর রহমান, বন্তিপুরের সিদ্দিক আলী আহমেদ, ঝারাবাড়ির ফয়েজুর রহমান (সমল শিক্ষক), কয়াকুছির
সিদ্দিকুর রহমান (এই সিদ্দিকুর রহমানরে সাথে আমি গড়লা বালক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলাম) এবং জাকির হোসেনের সাথে আমি বিশেষভাবে সম্পর্ক রেখে
চলেছি।
ইন্তাজ আলীর সাথে আমার আত্মিক
সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে সবসময় আমার সাথে সম্পর্ক রেখে চলত। একটি সাধারণ
একসিডেন্টের পর ইন্তাজ আলীর কেন্সার হয়ে অকাল মৃত্যু হয়েছে।
আমরা কয়েকজন সিআরসিসি শিক্ষকদের
মাসিক মায়নার বিল করতাম। তাঁর মধ্যে
ইন্তাজ আলীও ছিল। একদিন বিল সংক্রান্ত কাজে ইন্তাজ আলী বরপেটা আসার সময় একটি
সাধারণ দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেদিন সে একটি ট্রেকারে করে আসছিল। ট্রেকারটি উল্টিয়ে
গিয়ে সাধারণ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো এবং সেই দুর্ঘটনার ফলে সে মাথায় সামান্য আঘাত পেয়েছিলো। সেখান থেকে তাঁর ব্রেইন টিউমার হয় এবং যথাযথ চিকিৎসার পরেও সে মৃত্যু বরণ করে। ইন্তাজ আলীর মৃত্যুতে
আমি আপনজনের মৃত্যুর মতোই কষ্ট পেয়েছিলাম। এখনও তাঁর কথা মনে হলে কষ্ট হয়।বুকটা
হাহাকার করে উঠে।
ইন্তাজ আলীর মৃত্যু থেকে আমি একটি
শিক্ষা পেয়েছি, মাথায় আঘাত পেলে সেটা লঘূভাবে নয়, গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত।
সিদ্দিক আলী আহমেদ এই পুস্তক
প্রণয়নের সময়ে ২০২০ সালের ১ সেপ্তেম্বরে করোনায় আক্ৰান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সিদ্দিক আলী আহমেদের
মৃত্যুতেও আমি আপনজনের মৃত্যুর মতোই কষ্ট পেয়েছি। মৃত্যুর দু’দিন আগে সে ফোনযোগে আমাকে তাঁর অসুখের খবর দিয়েছিল। আমিও তখন সর্দি জ্বরে ভূগছিলাম। তাই তাঁর সাথে দেখা করতে পারিনি। এই আফসোস্ চিরদিন
থেকে যাবে।অবশ্যে তাঁর জানাজায় সামিল হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো।
আর একজন সিআরসিসি ছিল হাউলির অজিত
শর্মা। অজিত শর্মার একটি কথাই আমার দায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। একদিন সে
একটি বানানের প্রসংগ নিয়ে বলেছিল- আবুল স্যার, আমরা
কিন্তু আপনার অনেক কথা অনুসরণ করি। আপনি যা লেখেন আমরা তা শুদ্ধ বলে ভাবি।
আমি সবসময় যথাসম্ভব শুদ্ধ বাক্য
এবং বানান লেখার চেষ্টা করতাম। অজিত শর্মার এই মন্তব্যের পরে আমি আরও অধিক সজাগ
হয়েছিলাম। যা লেখতাম খুব ভেবে-চিন্তে লিখতাম।
ভ্রমণ
ইলেফাণ্টা যাওয়ার পথে আরব সাগরের বুকে
সারা জীবন চাকরি করেছি এবং মায়না
যা পেয়েছি সবই ছেলে-মেয়ে এবং ভাইদের লেখা পড়ায় খরচ করেছি। তাই ইচ্ছা থাকা
সত্ত্বেও বিদেশে তো দূরের কথা নিজেদের দেশেও কোথাও ভ্রমণে যেতে পারিনি। অবসর
গ্রহণের পর আমি তিনটি জায়গায় বেড়াতে গিয়েছি। প্রথমটা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ, ২০১৮ সালে মায়া নগরী মুম্বাই এবং ২০২৩ সালে চেন্নাই।
২০১৭ সালে আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম
দু’টি উদ্দশ্য নিয়ে। প্রথম উদ্দেশ্য ছিল,
আমি নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা নামের একটি উপন্যাস অনুবাদ
করেছিলাম। তাই উপন্যাসটির ছাপানোর অনুমতির জন্য এবং দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল
পিতৃপুরুষের ভিটা দৰ্শন। আমি মজিবর রহমানের সাথে ২০১৭ সালের ১৮ অক্টোবরে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। সকাল চারটেয় বাড়ি থেকে রওনা হয়ে পাঁচটা তিরিশে বরপেটা রোড থেকে পুনম বাসে চড়ে পোনে এঘারটায় কোচবিহার
পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে বাসে চড়ে দু’টো
বাজায় মাথাভাঙ্গা এবং মাথাভাঙা থেকে ট্রেকারে চড়ে বিকেল তিনটে বাজায়
চেংরাবান্ধা পৌঁছাই। চেংরাবান্ধা কাষ্টম অফিসে পাসপোর্ট জমা দিয়ে যাবতীয় অনুমতি
নেওয়ার পর বিকেল চারটেয় বর্ডার পার হয়ে বুড়ীমারি পৌঁছাই। এপাড় ওপাড় উভয়
পাড়ে পাসপোর্টের যাবতীয় কাজ দালালরাই করে দিয়েছিল। এ কাজের বিনিময়ে তারা দুশ করে টাকা নিয়েছিল।
বুড়ীমারি থেকে বরকত নামের বাসে
চড়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করি বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। লালমণির হাট, রংপুর, বগুড়া হয়ে সকাল সাতটা নাগাদ গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার
অন্তর্গত চান্দরা পৌঁছাই। আমাদের গন্তব্যস্থান
ছিলো হরিণহাটি। কারণ মজিবর রহমান হরিণহাটিতে ভাড়া বাসায় থেকে সেখানে ব্যবসা করে। চান্দরা
থেকে আমরা ট্রেকারে করে হরিণহাটি
পৌঁছাই অনুমান সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। চান্দারা থেকে হারিণহাটি মোটে পনের
মিনিটের রাস্তা। আমারা চান্দারায় বাস থেকে নামার পর সেদিন প্রচুর বৃষ্টি
শুরু হয়েছিলো। তাই আমাদের হরিণহাটি পৌঁছোতে প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরি
হয়েছিলো।
সেদিন গার্সির রাত ছিলো। তাই মনে হয়, সেদিন বাংলাদেশ সারারাত জেগে ছিলো। বাসে করে আসার সময় আমরা রাস্তার দুই পাশের দোকানগুলো রাত দু’টোতেও খুলে বসে থাকতে দেখেছিলাম। দোকানগুলিতে লোকের পাতলা সমাগমও ছিলো। অবশ্যে রাস্তায় তেমন লোকের সমাগম ছিল না। শেষ রাতের দিকে বগুড়ার সিরাজগঞ্জে বাস রেখে আমাদের বাথরুম করার সুযোগ দিয়েছিলো।সেই শেষরাতেও প্ৰচুর বাসের সমাগম ছিলো সিরাজগঞ্জে।অনুমান বিশ পঁচিশটার মতো তো হবেই। সিরাজগঞ্জের মিস্টি, দৈ এবং সন্দেশ খুবই নামকরা। মজিবর রহমান এক কেজি সন্দেশ কিনেছিলো সিরাজগঞ্জ থেকে। কত দিয়ে কিনেছিলো তা
এখন মনে নেই। থাকলে ভালো হতো।
সেদিন এবং তার পরের দিন সারাদিন প্ৰচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। তাই বৃষ্টির জন্য দু’দিন মজিবরদের ভাড়াবাসাতেই শোয়েবসে কাটাতে হয়েছিলো। ২৪ অক্টোবর আমি মজিবর রহমানের সুযোগ্য ছেলে রাসেল মিলনকে নিয়ে
পিতৃপুরুষের ভিটার সন্ধানে বের হই। দাদী এবং বাবার মুখে শুনামতে, তাঁদের বাড়ি ছিল ধামরাইর কাছে নরসিংহপুরে এবং দাদীর
পিতৃপুরুষদের বাড়ি ছিল সাটুরিয়া এবং বালিয়াটির মাঝখানে অবস্থিত পূর্বকুষ্টিয়ায়। নবীনগর থেকে বাসে চড়ে প্রথমে সাটুরিয়া যাই এবং সাটুরিয়া থেকে ট্রেকারে করে বালিয়াটি। দাদীর ভাইপোর নাম ছিল কটাই মল্লিক। দেখলাম,
বালিয়াটির অনেকেই কটাই মল্লিকের নাম জানে। বাড়ির খবরও জানে। বালিয়াটি থেকে কটাই
মল্লিকের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে পূর্ব কুষ্টিয়ায় কটাই মল্লিকের বাড়ি এলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, কটাই
মল্লিক ১৯৭২ সালে মারা গিয়েছেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা আছে। কিন্তু কেউ দাদীর বিষয়ে বলতে পাড়ল না। মনে হলো, জেনেও
না জানার অভিনয় করল। কারণ সম্ভবতঃ তাঁরা ভেবেছিল,আমি দাদীর সম্পত্তির
সন্ধানে গিয়েছি। আসলে আমার মনে তেমন কোনো কল্পনাই ছিল না। মানুষকে মুখে বলা যায়,
বুক ছিঁড়েতো আর দেখানো
যায় না। দাদী বলতেন, তাঁদের হাঁটা পাড়া ছিল। তাঁদের বাড়ির
সামনে দিয়ে কোনো রাস্তা ছিল না। তাঁরা বাড়ির ওপড় দিয়ে চালাফেরা করতেন। যাকে বলা হতো হাঁটা বাড়ি। ঠিক সেরকমই দেখলাম। এদিকে কটাই মল্লিক দাদীর বড়
ভাই-এর ছেলে ছিলেন। সবই মিলে গেলো, শুধু দাদীর কথা কেউ বলতে পাড়ল না। তাই মনটা একটু খারাপ হলো যদিও মনে একটা সান্ত্বনা নিয়ে এলাম, যে অন্ততঃ দাদী ছোটবেলা যেখানে
মানুষ হয়েছে, চলাফেরা করেছে, সে জায়গাটা তো দেখলাম!
সেখান থেকে বিদায় নিয়ে বালিয়াটির
জমিদার বাড়ি দর্শন করলাম এবং দর্শনের পরে নরসিংহপুর অভিমুখে রওনা হলাম।
নরসিংপুর প্রায় সবাই চেনে। কারণ
নরসিংহপুরের আসর উদ্দিন সরকারের ছেলে এম, এ মালেক
তখন ধামরাই উপজেলার সাংসদ। আসর উদ্দিন সরকার ছিলেন বাবার খালাতো ভাই। দাদী এবং বাবা সব সময় আসর উদ্দিন সরকারের কথা বলতেন।
আমরা আসর উদ্দিন সরকারের কথা বলাতে
সবাই চিনতে পড়ল এবং বলল- আসর উদ্দিন সরকার বর্তমান জীবিত নেই। অনেকদিন আগে মারা গেছেন। তাঁর ছেলে এম, এ, মালেক এখন
সাংসদ।এভাবে এভাবে গেলেই তাঁদের বাড়ি পেয়ে যাবেন।
আমরা ই-রিক্সায় চড়ে নরসিংহপুর গেলাম এবং এম, এ, মালেকের বাড়িও পেয়ে গেলাম ঠিকঠাক মতো। এম, এ মালেকের ছেলে কয়েকজন লোক নিয়ে বাহির বাড়িতে
বসে ছিল। আমি তাঁকে আমার পরিচয় দিলাম- আমি আসাম থেকে এসেছি। আমার নাম অমুক এবং বাবার নাম অমুক।
তখন সে বলল- আমি তো কাউকে চিনি না।
বাবা চিনতে পারে! ঠিক আছে। বসুন। একটু নাস্তা করুন। তারপর খবর নিয়ে দেখি, কেউ চেনে কি-না!
আমাদের মিষ্টিমুখ করাল। তারপর এম, এ, মালেককে ফোন লাগিয়ে দিল। এম,
এ মালেকও বাবাকে চিনতে পারলেন না। তবে আমাদের জমি আছে কিনা এম, এ মালেক জিজ্ঞেস করলেন।
আমি বললাম- সম্ভবতঃ ছিল না। কারণ
বাবা এবং দাদী কেউ কোনদিন জমির কথা বলেননি। শুধু আপনার বাবার কথা বলেছেন। আপনার বাবা আমাদের বাবার খালাতো ভাই ছিলেন বলে বলেছেন।
সে যাই হোক, তিনি সম্ভবতঃ আমার কথা
বিশ্বাস করলেন না। আমি জমির সন্ধানে গিয়েছি এটাই হয়তো
ভাবলেন।
ইতিমধ্যে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা দেরি না করে পরে কোন একদিন দিনের বেলা
যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।
বাংলাদেশ গিয়ে আমি একটা কথা বুঝতে
পারলাম, আসাম থেকে কোন লোক গেলে তাঁরা জমি দখল করতে
গিয়েছে বলে ভাবে! তাই রক্তের সম্পৰ্কিত কোন লোকের সাথে দেখা করতে গেলে এবং তাঁদের সাথে বিশেষভাবে পরিচয় না থাকলে আসামের লোকদের বাংলাদেশীরাঁ খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না। স্পষ্টভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন।অবশ্যে যাদের সাথে কোন রকম রক্তের সম্পর্ক নেই, তাঁরা ভালোই
গুরুত্ব দেন সমাদর করেন। যেচে এসে ভাব বিনিময়ও করেন।
২৫ অক্টোবরে মজিবর রহমান আমাকে সফিপুরের
দু'টি স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলো। তাঁরা ভালোই সন্মান জানালেন। একটি স্কুলে আমাকে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে পুরস্কার পর্যন্ত বিতরণ করালেন। একটি স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীরা আমার কাছ থেকে ইণ্ডিয়ার বিষয়ে জানতে চাইল। আমি ইণ্ডিয়া এবং আসামের
বিষয়ে প্রায় দশ মিনিট বললাম। ছাত্র-ছাত্রীদের সম্ভবতঃ ভালোই লেগেছিল। কারণ তারা
খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল আমার কথা।
২৮ অক্টোবরে আমি মজিবর রহমানের সাথে
সকাল সারে ছটায় বাসে চড়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হলাম। হরিণহাটি থেকে ঢাকা ৬০
কিলোমিটার। বাস থেকে দেখলাম অসংখ্য লোক রাস্তার দুই পাশ দিয়ে তড়িঘড়ি করে যাচ্ছে। কেউ যাচ্ছে ঢাকার দিকে, কেউ
আবার যাচ্ছে ঢাকার বিপরীত দিকে।
মজিবর রহমান বলল, এরা সবাই কারখানায় চাকরি করে। এখন সবাই কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে দুই কোটি লোক গারমেণ্ট ফেক্ট’রিতে কর্মরত।তাই এতো কর্মব্যস্ততা।
কোন কোন ফেক্টরিতে পঁচিশ হাজারের ওপড়েও লোক আছে। মজিবর রহমান বলা মতে, যাদের মেয়ে
আছে তাঁরাই বাংলাদেশে বর্তমান ধনীলোক৷কারণ মেয়েরাই বিশেষভাবে গারমেণ্ট ফেক্টরিতে
চাকরি করে।
বাংলাদেশে গারমেণ্ট ফেক্টরির সমান্তরালভাবে আছে ঘরভাড়ার ব্যবসা। কোনমতে এক কাঠা জমি কিনে একটা একতালা বিল্ডিং খাড়া করতে
পাড়লেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পাঁচ ছয় তালা বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারে। এমনও লোক আছে, যাঁরা
মাসে পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত রোজগার করে ঘরভাড়া থেকে। কথাগুলো শুনে ভালো লাগলো। কর্মসংস্থান থাকলে রোজগার থাকবে এবং রোজগার থাকলে তবেই তো দেশের জিডিপি
বাড়বে।
সাড়ে নয়টা বাজতে আমরা ধানমণ্ডিস্থিত নজরুল ইনষ্টিটিউটে গেলাম।
ইনষ্টিটিউটটি একটি আবাসিক এলেকায় অবস্থিত। শান্ত সমাহিত পরিবেশ। ইনষ্টিটিটে গিয়ে
ডেপুটি সেক্রেটারি আব্দুর রহিম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করে আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা
বললাম। কথাটা বলার পর তিনি ভালোই গুরুত্ব দিলেন এবং নজরুল ইসলামের বই ছাপানোর জন্য
কোন অনুমতির দর্কার নেই বললেন।কারণ বইগুলো প্ৰকাশ হওয়ার পর ইতিমধ্যে প্ৰায় একশ বছর
পার হতে চলেছে। তিনি আমাদের চা-ও খাওয়ালেন।
তারপর আমরা ইনষ্টিটিউটের পরিচালক
মতিয়ূর রহমান সাহেবের সাথে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করে সহকারি সঞ্চালক রেজাউদ্দিন
স্টালিনের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। রেজাউদ্দিন স্টালিন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত
কবি। তিনি আমাকে তাঁর ‘রেজাউদ্দিন স্টালিনের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ শীর্ষক একটি কবিতা পুথি দিয়ে উপহার দিয়ে সম্ভব হলে সেগুলো অনুবাদ করার জন্য বললেন। ‘রেজাউদ্দিন স্টালিনের শ্রেষ্ঠ কবিতা' নাম
দিয়ে আমি তাঁর ৭২ টা কবিতা অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করে ২০১৯ সালে গ্রন্থাকারে
প্রকাশ করেছি। সেই সাথে নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ নামক উপন্যাস এবং তাঁর ৩৭ টা কবিতা অনুবাদ করে প্ৰকাশ করেছি।
২০১৮ সালের ১ অক্টোবর
মাজু ছেলে সোলেমান কবির এবং ছোট বোনের জামাই বাহারুল ইসলামের সাথে মুম্বাই
গিয়েছিলাম। আমরা বিকেল তিনটেয় গুয়াহাটীর গোপীনাথ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে
ইণ্ডিগ’ বিমানে চড়ে মুম্বাই অভিমুখে যাত্রারম্ভ করেছিলাম।
বিকেল তিনটে পঞ্চলিশে
আমরা কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাই। সেখানে
চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর আমরা পুনরায় বিমানযোগে মুম্বাই অভিমুখে যাত্রা শুরু করি
এবং সন্ধ্যে পোনে সাতটায় মুম্বাই পৌঁছাই। বিমান বন্দর থেকে আমরা মুম্বাইর কোলাবার
জনতা হোটেলে যাই এবং সেখানে মশারির ছাড়াই রাত্রি যাপন করি। হোটেলে আমাদের রোমটা ছিল তিন তালায় এবং একেবারে রাস্তার ধারে। আমার বিছানাটা ছিল একেবারে খিরকির
পাশে। আমার ধারণা হলো মুম্বাই যেন সারারাত জেগে থাকে। সারারাতই গাড়ী চলাচলের শব্দ
শুনতে পেলাম। সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগে খিড়কি খোলে উত্তর দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম কুয়াশাচ্ছন্ন খোলা ময়দানের মতো। আমি বাহারুল ইসলামকে ডেকে দৃশ্যটা দেখাতে সে বলল- মনে হয় সাগর হবে!
হাতমুখ ধুয়ে আমরা সকালের সেই
দৃশ্যটা দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা। বাহারুলের কথাই ঠিক, সত্যিই সাগর। আরব সাগর। একেবারে সাগরের গা ঘেষে রাস্তা। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে সাগরের দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম। সাগরে তখন জোয়ার নেই। তাই তেমন ঢেউ ছিল না। ছোট ছোট ঢেউ এসে পাড়ে আছড়ে
পড়ছে। সেই ঢেউয়ের সাথে কিছু কিছু আবর্জনা এসেও আছড়ে পড়ছে। সাগরে আবর্জনা! দেখে মনটা একটু খারাপ লাগল।
উত্তর দিকে তাকাতেই আধা কিলোমিটার
দূরে গেটের মতো একটা কিছু চোখে পড়ল। দেখলাম, সেখানে সকাল বেলাতেই অনেক লোক ভিড় করে
আছে। জিনিসটা কি তখন অনুমান করতে পাড়লাম না। হোটেলে ফিরে এসে চা খেয়ে সেই জিনিসটা
দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। তখন সোলেমান কবির বলল- ওটা ‘গেট
ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া।'
গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া।'
গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া প্ৰথমে পঞ্চম
জর্জ এবং রাণি মেরির স্বাগতের জন্য ১৯১১ সালে কার্ডবোর্ড দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯১৪ সালের ৩১ মার্সে গেট ওয়ে অফ
ইণ্ডিয়ার আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯২৪ সালের ৪ ডিচেম্বরে নির্মাণ
কাজ শেষ হয়। গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া ২৬ মিটার (৮৫ ফুট) উঁচা এবং ব্যাস ১৫ মিটার (৪৯ ফুট।) বেসাল্ট পাথর দিয়ে নির্মিত।আমরা গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া যাওয়ার সময় রাস্তায় ঐতিহাসিক তাজ মহল হোটেল দেখতে পেলাম। তাজ
মহল হোটেল জামসেদজি টাটা ১৯০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বরে শুভারম্ভ করেছিলেন। ৬ তালা বিশিষ্ট পঞ্চ তারকা
তাজমহল হোটেলে ৫৬০ টি রোম আছে এবং ১৬০০ জন কর্মচারি কর্মে নিয়োজিত। তাজ মহল
হোটেলের অন্য শাখাটি হচ্ছে তাজ মহল প্যালেস। তাজ মহল প্যালেস ২০ তালা বিশিষ্ট।তাজ মহল হোটেলের পাশেই অবস্থিত।
গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া দর্শনের পরে
আমরা ‘মুম্বাই দর্শন’ বাসে
চড়ে মেরিন ড্রাইভ, হেংগিং গার্ডেন, নেহরু
সায়েন্স সেন্টার, জহু বীস, মেহবুব
ষ্টুডিও, শ্বাহরুখ খানের বাড়ি, লীলাবতী
হস্পিটাল, বান্দ্রা ওর্লি সী লিংক (সরকারিভাবে রাজীব গান্ধী
সী লিংক। সী লিংকের দৈর্ঘ ৫.৬ কিলোমিটার এবং চওড়া ৬৬ ফুট। নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে ২০০৯ সালের ৩০ জুন
এবং জনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ২০১০ সালের ২৪ মার্চ। ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে প্রতিদিন ৩২.৩১২ টি যানবাহন যাতায়াত করে সী লিংকটি দিয়ে।) প্রভৃতি দর্শন করি।
৩ অক্টাবর ‘গেট ওয়ে অফ ইণ্ডিয়া’ থেকে আমরা লঞ্চে
চড়ে আরব সাগরের বুক দিয়ে ১ ঘণ্টা ভ্রমণ করে মুম্বাইর মূল ভূখণ্ড থেকে ১২
কিলোমিটার(৭ মাইল) দূরে অবস্থিত এলফাণ্টা দ্বীপে গিয়েছিলাম। এলফাণ্টা দ্বীপ
প্রকৃতার্থে একটি পাহাড়। পাহাড়টি তিনটি গ্রামের সমষ্টি। পাহাড়টিতে ১৩০ টি গুহা
আছে। নটরাজন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবের মূর্তি আছে। পাহাড়টিতে একটি বৃহৎ আকারের হাতীর মূর্তি আছে।সেই হাতীর মূৰ্তির জন্যই জায়গাটার নাম এলফাণ্টা হয়েছে। ১২০ ধাপ সিড়ি ডিঙিয়ে পাহাড়ে চড়ে যেতে হয়। ডুলি চেয়ারে চড়ে যাওয়ারও ব্যবস্থা আছে। লঞ্চ থেকে নেমে হেঁটেও যাওয়া
যায় এবং মিনি রেলেরও ব্যবস্থা আছে।
৪ অক্টোবর হাজি আলি দরগাহ দর্শন
করি। হাজি আলি দরগাহ সুফি পীর হাজি আলি শ্বাহ বুখারির মাজার। দরগাহটি ওৰ্লিতে মূল
ভূখণ্ড থেকে ৪৫৭.২ মিটার দূরে আরব সাগরের বুকে একটি ছোট দ্বীপে অবস্থিত। দরগাহয় বৃহস্পতি এবং শুক্রবারে অগনন
দর্শনার্থীর ভিড় হয়। দৈনিক প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার দর্শনার্থী দরগাহ দর্শন করে বলে জানা যায়। দরগাহ রাজস্থানের মাকরানার মার্বল পাথর দিয়ে নির্মিত। দরগাহটি ৪,৫০০
বর্গমিটার ভূমিতে বিস্তৃত।
৫ অক্টোবরে আন্ধেরির ‘ইনফিনিটি শ্বপিং মল’ দর্শন করে বিকেল
বেলাটা মেরিন ড্রাইভে কাটাই। মেরিন ড্রাইভ দক্ষিণ মুম্বাইতে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র
রোডের পাশে অবস্থিত। দৈর্ঘ্য ৩.৯ কিলোমিটার। মেরিন ড্রাইভকে রাণীর হার (মালা)
অর্থাৎ কুইন্স নেকলেচও বলা হয়। ‘ওলা’ ড্রাইভারের
মুখে শুনা মতে মেরিন ড্রাইভে সারা রাত লোক জমায়েত থাকে।
দিল্লী শিক্ষা নগরী হিসেবে বিখ্যাত
এবং মুম্বাই শিল্প নগরী হিসেবে বিখ্যাত। মুম্বাই বৃহৎ শিল্পপতি এবং সিনেমা শিল্পের
সাথে জড়িত অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীদের বাসস্থান।
মুম্বাইর বৈশিষ্ট হলো, মুম্বাইতে আমাদের এখানকার মতো
ধূলা-বালি নেই। রাস্তা-ঘাট পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। তাই কাপড় কম ময়লা হয়। গরম পড়ে,
শরীরও ঘামে, কিন্তু একটু সময় ছায়ায়
দাঁড়ালেই ঘাম শুকিয়ে যায়। আমরা হোটেলের দ্বিতীয় তালায় পাঁচ রাত ছিলাম। কোনদিন
মশারি টানাতে হয়নি। কোনো মশার শব্দও শুনিনি। সেই জন্যেই হয়তো মুম্বাই ‘মায়া নগরী’ হিসেবে পরিচিত।
৬ তারিখ বিকেল পাঁচটায় বিমানযোগে
গৃহাভিমুখে রওয়ানা হই। ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট বিমান ভ্রমণের পর সন্ধ্যে আটটায় গুয়াহাটির গোপীনাথ বরদলুই
বিমান বন্দরে অবতরণ করি। আমার ভাগনে রঞ্জিত আলী একজন এম্বুলেন্স চালক। সেদিন সে রোগী
নিয়ে গুয়াহাটী গিয়েছিল। ঘুরে আসার সময় তার এম্বুলেন্সে কোন রোগী ছিল না। তাই আমরা তার এম্বুলেন্সে চড়ে গুয়াহাটী থেকে রাত এঘারটায় বাড়ি
আসি।
২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমি এয়ার
এশিয়ার বিমানে চড়ে চেন্নাই গিয়েছিলাম।আমি রাত দশটায় চেন্নাই পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে প্ৰিপেইড টেম্পোতে চড়ে নিউ এপেলো গেস্ট হাউসে যাই।গেস্ট হাউসে আগে থেকেই জামাই আব্দুর রেজ্জাক এবং
সোলেমান কবীর অবস্থান করছিলো। গেস্ট হাউসে পৌঁছানোর পরে আমি খাওয়া-দাওয়া করে রাত্ৰি
যাপন করি। আমাদের আসামে ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিকতই শীত থাকে। কিন্তু চেন্নাইতে গরম।
রাত্ৰে আমি এক সময় ঘেমে নেয়ে উঠেছিলাম।
চেন্নাই যাওয়াটা আমার জন্য কোন প্ৰমোদ ভ্ৰবণ ছিল না। বড় মেয়ের জামাই আব্দুর রেজ্জাকের
কেন্সার হয়েছিলো। তার চিকিৎসার জন্য তাঁকে চেন্নাই নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। তাঁকে
প্ৰথমে আমার মাজু ছেলে সোলেমান কবীর চেন্নাই নিয়ে গিয়েছিলো। আমি চেন্নাই পৌঁছানোর
পরের দিন সকালে সোলেমান কবীর অস্ট্ৰেলিয়া চলে যায়। কারণ তার ১৫ ডিসেম্বর
অস্ট্ৰেলিয়া যাওয়ার ফ্লাইট ছিলো। তাই রোগী একলা থাকবে বলে আমাকে চেন্নাই যেতে হয়েছিলো। জামাইকে চেন্নাই
এপলো হসপিটালে কেমো দিয়ে ২০ ডিসেম্বর রাত বারটায় বাড়ি নিয়ে আসি। বাড়ি আসার পর বরপেটার টাটা মেমোরিয়াল কেন্সার হসপিটালে আরও চারটে কেমো দেওয়ার পর জামাই
২০২৩ সালের ২৮ মে এন্তেকাল করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।
উপসংসার
শিক্ষকতা জীবনে আমি সাতটা স্কুলে
শিক্ষকতা করেছি। একমাত্র সুখচর প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া কোথাও তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়নি।
আলীগাঁও, সাতমুখি আমাদের নিজেদের এলাকা ছিল। গড়লা,
মাণিকপুর নিজেদের এলাকা না হলেও আগে থেকেই পরিচিত লোক ছিল। বালিকুরি
পাঠার, গরেমারি পাথার এবং জাহোরপাম আগে থেকে পরিচিত লোক না
থাকলেও কোন অসুবিধা হয়নি। পরে পরিচিত হয়েছে এবং অনেক বন্ধুও জুটেছে। গরেমারি পাথার বিদ্যালয় এলাকা আমার একেবারে অপরিচিত
ছিল। কোথায় স্কুল, যাওয়ার রাস্তা, সেখানকার
পরিবেশ এবং সেখানকার লোকের সাথে আমার কোন পরিচয় ছিল না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সকলের সাথে
পরিচয় হয়েছে এবং তাঁদের কাছ থেকে খুবই ভালো সহযোগিতা ও সমাদর পেয়েছি।
গরেমারি পথার স্কুলটা ছিল আব্দুল আওয়াল
মাষ্টার সাহেবের বাড়ি সংলগ্ন ছিলো। আব্দুল আওয়াল সাহেব নিজেও শিক্ষক ছিলেন এবং তাঁর ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূরাও শিক্ষিত। আব্দুল আওয়াল মাষ্টার সাহেরের বড় ছেলে
নুরুল হক হাই মাদ্রাসার অধীক্ষক এবং তাঁর সহধৰ্মিনীও উক্ত হাই মাদ্রসার
শিক্ষয়িত্রী ছিলেন।এখন উভয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন।
নুরুল হকের ছোট ভাই নজরুল ইসলাম
প্রাইমারির শিক্ষক এবং তাঁর সহধৰ্মিনীও স্নাতক। পরে নজরুল ইসলামের ভায়রা কোরবান
খানের ছেলে জেহেরুল খানের সাথে আমি আমার মেয়ে সাহিদা পারবীনকে বিয়ে দিয়ে
বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছি। তাঁদের সাথে এখন আমার সুসম্পর্ক বিদ্যমান।
আমি গরেমারি পাথার প্রাইমারী স্কুলে
শিক্ষক হিসাবে যোগদান করার সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন জগদীশ মণ্ডল। জগদীশ
মণ্ডলের সাথে আমার সম্পর্ক মধুর ছিল। তাঁর বাড়ি স্কুলের পাশেই ছিল। অনুমান আধা
ফার্ল। তাই স্কুলের জিরনি(ইন্টারভেলের)র সময় প্রায়ই আমি তাঁর বাড়িতে গিয়ে চা
খেতাম। মাষ্টারের পরিবার রাধারাণি মণ্ডল খুবই মিশুক প্রকৃতির ছিলেন এবং তিনি আমাদের খুব যত্ন সহকারে চা বানিয়ে খাওয়াতেন।
স্কুলের সাথেই রাস্তার অপর পাশে ছিল
জে, বি, হাই মাদ্রাসা এবং
এম, ই মাদ্রাসা। জে, বি, হাই মাদ্রাসার অধীক্ষক ছিলেন নুরুল হক এবং এম, ই
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোলায়েম খাঁন। উভয়ের সাথে আমার সুসম্পর্ক ছিল।
তাঁরা আমাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে
ছিল আনোয়ার হোসেন, ওমর আলী আহমেদ, শমসের
আলী, খলিলুর রহমান, নুরুল হক(বিএসসি) আব্দুর
রহিম, শামসুন নাহার প্রভৃতিরাঁ। এঁদের সাথেও আমার সুসম্পর্ক
ছিল। উভয় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও আমাকে
খুব সন্মান করতো।
২০০১ সালে আমি ১২৫৮ নম্বর পূব
জাহোরপাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি। ২০০১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬
সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আমি পূব জাহোরপাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। পূব
জাহোরপাম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই আমি ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই অবসর গ্রহণ করেছি। পূব
জাহোরপাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাকালীন আমি অঞ্চলের জনগণের ভালোই সমাদর
পেয়েছি। বাহার উদ্দিন তালুকদার, রহিজ উদ্দিন
তালুকদার, আতোয়ার রহমান, নবাব খান, হামিদ খান, আকমল খান,পইলান
খান, আব্দুল গফুর খান, ইদ্রিস খান,
মোসলেম খান, আলাল উদ্দিন, ছলিম উদ্দিন, ফটিক আলী, দিলোয়ার
হোসেন এবং তাঁদের পরিয়ালের কাছ থেকে ভালোই সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি। বাহার
উদ্দিন তালুকদারের মা আনোয়ারা বেগম, আলাল উদ্দিনের স্ত্রী
এবং ছলিমুদ্দিনের স্ত্রীর স্নেহ-ভালোবাসাৰ কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। আমার
জাহোরপাম বিদ্যালয়ের ছাত্রী নূর নাহার এম, টেক পাস করেছে।
এঘার বৎসর সি,আর,সি,সি হিসাবে
কার্যনির্বাহ করেছি। শিক্ষকদের সাথে আমার কোনদিন মনোমলিন্য হয়নি। সাকায়েত হোসেন,
প্রদীপ বায়ন, মনোমতী তালুকদার, ওমর আলী আহমেদ, এলিজা দাস, গোপেশ
দাস, রোশেনারা খান প্রভৃতি শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীরাঁ আমার সাথে
খুবই সহযোগিতা করেছে। আমি শিক্ষকদের একটা কথাই
বলছি, আপনারা সবাই শিক্ষিত। আপনাদের মতো আমিও
একজন শিক্ষক। তাই আপনাদের বুঝাবার মতো ক্ষমতা আমার নেই। আপনারা যদি পরের
ছেলেমেয়েদের ভাল বাসেন- তাদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিন, তো
আপনাদের ছেলেমেয়ে মানুষ হবে এটা নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারেন। যদি আপনারা পরের
ছেলেমেয়েদের অবহেলা করেন, তাহলে আপনাদের ছেলেমেয়েও অবহেলিত
হবে এটাও নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারেন। তাই আপনারা নিজের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা
চিন্তা করে হলেও নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবেন।
আমার এই কথার সুফলও আমি পেয়েছি।
আমার সিআরসিসি এলাকার শিক্ষকরাঁ তাঁদের দায়িত্ব যথাযথই পালন করেছেন, একথা আমি হলফ করে বলতে পারি।
আমি শিক্ষক জীবনে একটা কথা লক্ষ্য
করেছি, সাধারণ কোনো বন্ধ হরতাল দিলে, অথবা বৃষ্টি হলে ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসবে না বলে শিক্ষকরাঁ স্কুলে যায়
না। আসলে বন্ধ-হরতাল অথবা বৃষ্টি হলে ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে যায় না, শিক্ষক স্কুলে আসবে না বলে। এই যে সংযোগ বিভ্রাট এর জন্যে ছাত্র-ছাত্রীদের
অনেক অমূল্য সময় অপচয় হয়। আসলে শিক্ষকরাঁ স্কুলে যায় না বলেই ছাত্র-ছাত্রীরা
স্কুলে যায় না, অপ্রিয় হলেও এটাই হলো প্রকৃত সত্য। যখন
ছাত্র-ছাত্রীরা জানবে, ছোট-খাট বন্ধ অথবা বৃষ্টি হলে স্যার
স্কুলে আসবেই তখন ছাত্র-ছাত্রীরা ক্ষতি করবে না, এটা নির্ঘাত
সত্য।(যদি কোনো সর্বজন গ্রহণযোগ্য হরতাল অথবা প্রচণ্ড রকমের ঝড়-বৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যে না মেনে উপায় নেই।)
ছোটখাট বন্ধ হলে অথবা বৃষ্টি হলে আমি স্কুলে গিয়েছি এবং ছাত্র-ছাত্রীও উপস্থিত পেয়েছি।
আমি শিক্ষকদের এ কথা সব সময় বলেছি।
শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেছি
বলেই হয়তো এখনও শিক্ষকদের কোন অনুষ্ঠান হলে সেখানে আমাকে ডাকেন। আমাকে গুরত্ব দেন।
আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমি পরের ছেলেমেয়েকে ভালো বেসেছি বলেই হয়তো আমার ছেলেমেয়ে
সবাই মানুষ হয়েছে -কেউ অমানুষ হয়নি।
আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রী ছফুরা খাতুনের দুই ছেলে এবং চার মেয়ে।
বড় ছেলে সোহরাব আলী আহমেদ
বিএসসি(বিজ্ঞানের স্নাতক)এবং সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক এবং আমার মতোই সিআরসিসির
দায়িত্ব পালন করে চলছে। সে বর্তমান ধুবুরী জেলার বিলাসীপাড়া শিক্ষাখণ্ডের অধীনে সিআরসিসি হিসাবে কার্যনির্বাহ
করতেছে। সে বিয়ে করেছে কয়াকুছির কারাগড়ির ইউনুস মাস্টার সাহেবের মেয়ে সামসুন নাহারকে।
সে এখন দুই সন্তানের পিতৃ। নাতি ছাকলীন আহমেদ এবং নাতিনী সুহানা আহমেদ। সামসুন
নাহারও স্নাতক।
বড় মেয়ে আমিনা খাতুন বিএসসি এবং
সে এম, ই, স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষয়িত্রী।
তাঁর বিয়ে হয়েছিলো কুজারপীঠের মরহুম আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রেজ্জাক আহমেদের সাথে। আমিনা এখন দুই সন্তানের মাতৃ। ছেলে বিনামীন আহমেদ এবং নাতিনী রুবিনা আহমেদ। তবে দুঃখের বিষয়, জামাতা আব্দুর রেজ্জাক কেন্সার আক্রান্ত হয়ে ২০২৩ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেছে। বলাবাহুল্য, তাঁর
মৃত্যুতে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। এখনও মেয়ের মুখের দিকে তাকালে আমার অন্তর হাহাকার করে উঠে।
মাজু মেয়ে আবিদা খাতুন এএনএম
নার্স। সে শিঙিমারিতে একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে নার্স হিসাবে কর্মরত ছিলো। এখন বাড়ির নিকটে পাতলিকুছিতে বদলি
হয়ে এসেছে। তার বিয়ে হয়েছে তাজুদ্দিনের সাথে। তাজুদ্দিন ইটালীতে কৰ্মরত।
মাজু ছেলে সোলেমান কবীর বিএইসএমসিটি(হোটেল
মেনেজমেণ্ট) এবং সে গ্ৰেটব্ৰিটেনের একটি ক্ৰুইস কোম্পানীতে কৰ্মরত ছিলো। এখন সে অষ্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ‘স্কুইস’ হিসাবে কর্মরত।বলতে গেলে সে বিশ্বের প্ৰায় সব জায়গায়ই ভ্ৰমণ করেছে।সে বিয়ে
করেছে বরপেটার গাগলমারীর সমসের মৌলানার মেয়ে নুরজাহানেক।নূরজাহান স্নাতক। তাঁদের এখন পর্যন্ত কোনো সন্তানসন্ততি হয়নি।
সেজ মেয়ে সাহিদা পারবীন অংগনবাদী
কেন্দ্রের পারিচালিকা। তার বিয়ে হয়েছে কয়াকুছির শখিরভিঠার কোরবান খানের ছেলে জেহেরুল
ইসলাম খানের সাথে। জামাই টিভি ম্যাকানিক্স। সে দুই সন্তানের মাতৃ। ছেলে শাফিউর রহমান
খান এবং মেয়ে জেরিফা শাহমিন।
ছোট মেয়ে খালিদা পারবীন বিএসসি নার্স। সে বর্তমান ধুবুড়িতে নাৰ্স হিসাবে কর্মরত।
জামাই ধুবুরী কোৰ্টের উকিল। সে এখন একটি মেয়ের মাতৃ। মেয়ের নাম তাছফিয়া আহমেদ।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী তারা ভানুর দুই ছেলে।সাহজাহান আলী আহমেদ এবং রাহুল আমীন।
দ্বিতীয় পক্ষের বড় ছেলে সাহজাহান আলী আহমেদ এম,কম। সে চেন্নাইর আমাজান কোম্পানীতে কর্মরত ছিল। এখন সে হাউলী ন্যাশনাল সায়েন্স কলেজে
একাউণ্টটেণ্ট হিসাবে কৰ্মরত। সে জিএসটি ও ইনকাম ট্যাক্সের কাজও করে। সে বিয়ে করেছে
জতিগাঁয়ের রহমত আলীর মেয়ে লাকী আহমেদকে। লাকী আহমেদ একটি নাৰ্সিং হোমে কৰ্মরত। তাঁদেরও
কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি।
ছোট ছেলে রাহুল আমীন বি, ফার্ম উত্তীৰ্ণ।সে টরেণ্ট ফাৰ্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে ম্যানেজিং বিষয়া হিসাবে কৰ্মরত। সে বিয়ে করেছে ভক্তেরডোবার
মমরেজ মাস্টার সাহেবের মেয়ে মঞ্জিলা আহমেদকে। মঞ্জিলা আহমেদ বিএসসি পড়তেছে।তাকে এখন পর্যন্ত বাড়ি আনা হয়নি।বিএসসি পাস করার পর বাড়ি আনার কথা।
২০১৬ সালের ৩১ জুলাই আমি চাকরি জীবন
থেকে অবসর নিয়েছি। চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরে অনেকেই আমাকে ধর্মীয় এবং
সামাজিক কাজ-কামের সাথে যুক্ত হতে উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমি ধর্মীয় এবং সামাজিক কাজে যুক্ত
হওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন খবরের কাগজে আমার যে লেখাগুলো প্রকাশ হয়েছিল সেগুলো
পুস্তক আকারে প্রকাশের জন্য প্রবৃত্ত হয়েছি।
এখন পৰ্যন্ত আমি অসমিয়া আৰু বাংলায় ৬৯ টি বই প্ৰকাশ করেছি। বইয়ের নাম নিম্নে দেওয়া হলো-
লেখকৰ প্ৰকাশিত গ্রন্থ
অসমীয়া গ্ৰন্থ
(১) এটি অভিশাপৰ মৃত্যু (চুটি গল্প সংকলন) প্রকাশ, ২০০২, ২০২০) প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২) দিগ্বিজয়ী বাবৰ
(ঐতিহাসিক উপন্যাস) ২০০৭ চন) পৰিৱেশক - লাকী বুক স্টল, বৰপেটা
(৩) জাহানাবাৰ আত্মকাহিনী - ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৪) এখন অখ্যাত গাঁৱৰ উপকথা (উপন্যাস) ২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৫) ছোহৰাব-ৰুস্তম (পৌৰাণিক
উপন্যাস) ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৬) প্ৰাগজ্যোতিষপুৰীয়া ধৰ্মান্তৰিত মুসলমানৰ ইতিবৃত্ত। (২০১৫) সমন্বয়
সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৭) মুখ বাগৰা মুকুতা-১ (২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৮) মুখ বাগৰা মুকুতা-২ (২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৯) বাহুল এবং সিহঁত দুজন-(২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(১০) মার্কস এবং হেগেলৰ দৰ্শন।(২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(১১) শাক্তি (উড়িয়া অনুবাদ উপন্যাস) (২০১৫) সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(১২) উড়িয়া অনুবাদ গল্প সংকলন- ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(১৩) বিচাৰক (গল্প সংকলন), ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(১৪) বিশ্ব ঐতিহ্য- ২০১৭, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(১৫) শূন্যৰ পৰা শিখৰলৈ ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য
গোষ্ঠী, কয়াকুছি))
(১৬) ইছলামিক আদর্শ- (প্রথম খণ্ড) - ২০১৭, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(১৭) ইছলামিক আদর্শ- (দ্বিতীয় খণ্ড)-২০১৭, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(১৮) অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কাৰ আৰু ডাইনী হত্যা (প্রবন্ধ সংকলন)। ২০১৫ সমন্বয়
সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(১৯) ঐক্যৰ সন্ধানত
(প্রবন্ধ সংকলন) ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য
গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(২০) ৰাম জন্মভূমি বাবৰি মসজিদ (প্রবন্ধ সংকলন) ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য
গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(২১) নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আৰু জাতীয় সংহতি (প্রবন্ধ সংকলন), ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য
গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(২২) বিবিধ প্রবন্ধ (প্রবন্ধ সংকলন) ২০১৮ প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২৩) বাংলা গল্প সংকলন-১ (২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(২৪) বাংলা গল্প সংকলন-২ (২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(২৫) নজৰুল ইছলামৰ মৃত্যুক্ষুধা (অনুবাদ উপন্যাস)- ২০১৮, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২৬) মহৎ ব্যক্তি আৰু উৎসৱ- (২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(২৭) নজৰুল ইছলামৰ
কবিতা- ২০১৮, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২৮) ৰেজাউদ্দিন স্টালিনৰ
শ্ৰেষ্ঠ কবিতা- ২০১৮, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২৯) বিদেশী কালজয়ী
অনুবাদ গল্প, ২০১৮, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩০) সেন্দুৰ উজলে কপালত
(উপন্যাস) (২০১৮) প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩১) যেনে কুকুৰ
তেনে টাঙোন (গল্প সংকলন) - ২০১৮, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩২) ভাৰতীয় কালজয়ী অনুবাদ গল্প- ২০১৮, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৩) জীবন নদীৰ সুঁতি (উপন্যাস) ২০২৩, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৪) কালজয়ী
লেখকৰ জীৱনী, ২০১৮, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৫) ইদেশ-সিদেশ (সংগীতালেখ্য) ২০১৭, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৬) স্বীকাৰোক্তি (উপন্যাস) ২০২০, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি)
(৩৭) বিশ্বভ্ৰাস কৰ'ণা ( কবিতা পুথি) ২০১৯ প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৮) ভাৰত তথা বংগ বিভাজনৰ খুটি-নাটি। ২০২৩, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩৯) এমুঠি গীত। ২০২৩, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৪০) মহানবী(ছাঃ)ৰ দাম্পত্য জীৱন ২০২৪, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম (২০২৪, ডিজিটেল প্রকাশ)
(৪১) কেইগৰাকীমান মুছলমান স্বাধীনতা সংগ্ৰামীৰ সংক্ষিপ্ত জীৱনী ( ২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(৪২) কেন্সাৰ দুৰাৰোগ্য
ব্যাধি নহয় (ডিজিটেল প্রকাশ)
একাংকিকা
(৪৩)প্রায়শ্চিত্ত- একাংকিকা ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৪৪) হেঙাৰ- ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য
গোষ্ঠী, কয়াকুছি
(৪৫)ভূত- ২০১৫, সমন্বয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কয়াকুছি ২০২৫ ডিজিটেল প্রকাশ
(৪৬) ড্রাগছ-
বাংলা গ্রন্থ
(১) আমার ছেলেবেলা (আত্মকথন) (২০২০) প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(২) ফিরে দেখা (আত্মকথন) (২০২০) প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৩) মুসলমান নোবেল বিজয়ীর সংক্ষিপ্ত জীবনী ২০২১, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৪) কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা- ২০২১, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৫) ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় - ২০২১, প্রগতিশীল
সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৬) অকালে বসন্ত
(উপন্যাস) ২০২২, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৭) দিগ্বিজয়ী বাবর(ঐতিহাসিক উপন্যাস) ২০২২, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৮) মোগল সম্রাট - ২০২২ প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(৯) সুরের পসরা (উপন্যাস)। ২০২৩, প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(১০) ডানপিটে (উপন্যাস) ২০২৩ প্রগতিশীল সাহিত্য পৰিষদ, অসম
(১১) মোল্লা নাসিরুদ্দিনের রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক কাহিনী (২০২৩, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১২) মুখে মুখে ফেরা মুক্তা-১ (২০২৩, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৩) মুখে মুখে ফেরা মুক্তা-২(২০২৩, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৪) রক্তাক্ত
ফিলিস্তিন (২০২৩, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৫) বুরকিনা ফাসোর জাতীয় নায়ক থমাস সানকারা
(২০২৩, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৬) সাহসী যুবতী আহেদ তামিমী(২০২৩,
ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৭) কেন্সার দুরারোগ্য ব্যাধি নয়।(২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৮) পাখির চোখে
আসাম এবং আসামের জেলাসমূহ (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(১৯) ভারতের দুর্গ (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(২০) ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ (প্রথম খণ্ড) (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(২১)ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ (দ্বিতীয় খণ্ড) (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(২২) চীনের ঐতিহাসিক মছজিদ (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
(২৩) জীবনের গল্প (২০২৫, ডিজিটেল প্রকাশ)
২০১৬ সালের ৩১ জুলাই অবসর গ্ৰহণের
পর আমি ফেসবুক একাউণ্ট খুলেছি। ফেসবুকে অনেক উন্নত মানের কবিতা এবং অন্যান্য লেখা প্রকাশ হয়। সেই লেখাগুলোতে
একটু হাত ফেরালেই উন্নত মানের লেখা হয়ে উঠতে পারে। তাই আমি উদ্যোগ নিয়ে ২০১৬
সালের ২ জানুয়ারি প্রগতিশীল সাহিত্য পরিষদ, অসম
নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গঠন করেছি। আমাদের পরিষদের তরফ থেকে এ পর্যন্ত দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রগতি এবং
প্রয়াস, একটি জাবনীমূলক গ্রন্থ পূর্বসূরী এবং
গল্পের বই ‘প্রত্যুষ’ প্রকাশ করেছি।
প্রগতি এবং প্রয়াস সম্পাদনা করেছে সাহেদ আলী আহমেদ, পূর্বসূরী
এবং প্রত্যুষ সম্পাদনা করেছে নূর হোসেইন।
কিন্তু লেখামেলার প্রতি লোকের আগ্রহ
না থাকার দরুন সাহিত্য পরিষদ এখনও চালু পর্যায়েই রয়েছে। আশা করি, একদিন লোকের চোখ খুলবে এবং অনুষ্ঠানটির প্রতি গুরুত্ব প্রদান
করবে। কারণ সাহিত্য অবিহনে কোনো জাতি তথা সম্প্রদায় উন্নতির শিখরে আরোহন করতে পারে
না।
আমি কাদং হাইস্কুলের ছাত্র ছিলাম।
২০১৪ সালে কাদং হাইস্কুলের সোণালী জয়ন্তী উদযাপিত হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানের সাথে
সংগতি রেখে একটি স্মৃতিগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। আমাকে উক্ত স্মৃতিগ্রন্থের সম্পাদনার
দায়িত্ব দিয়েছিল। যতদূর সম্ভব নিষ্ঠা সহকারে আমি সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য
চেষ্টা করেছি। কতদূর সফল হয়েছি তার বিচার পাঠক সমাজ করবে।
অনেক কথা বললাম।
সবশেষে তথ্য বিভ্রাট ও ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আত্মকথনের ইতিরেখা টানছি।
সমাপ্ত
বাঘবর পাহাড়









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন