ডানপিটে (উপন্যাস)
ডানপিটে
এক
সরকার কয়েকদিন ধরে ড্রাগসের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে তুলেছে। কিছুদিন আগে
অতিরিক্ত ড্রাগস সেবনের ফলে একজন মেধাবী ছাত্রের অকাল মৃত্যু হয়েছে। ছাত্রটি খুবই মেধাবী ছিলো। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সারা আসামের মধ্যে তার ভালো পজিশন ছিলো। ছাত্রটি আসামের একটি নামকরা শিক্ষানুষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছিলো। সেই অনুষ্ঠানের সুপার ফরটিতে দ্বিতীয় স্থান
দখল করে সে সেই অনুষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলো। সেই ছাত্রটির অকাল মৃত্যুতে
অঞ্চল ব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রশাসন ড্রাগসের বিরুদ্ধে সর্বত্র অভিযান জোরদার করে তুলেছে। ছাত্রটির ঘর ছিলো সুন্দরপুর-এ। তাই সুন্দরপুর থেকেই ড্রাগস বিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে।
সুন্দরপুর গ্রামটি সহরের একেবারে নিকটে।সহর থেকে দুই তিন কিলো মিটার দূরে অবস্থিত।সুন্দর পুর একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সুন্দরপুর গ্রামে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপন হয়েছে পাঁচ বছরপূর্বে। বড় মাপের সিমেন্ট ফ্যাক্টরী। সিমেন্ট ফ্যক্টরী স্থাপন হওয়ার পর থেকে সুন্দরপুরের গুরুত্ব বেড়েছে। অন্যান্য এলেকা থেকে লোক উঠে এসে সুন্দরপুরে বসতি স্থাপন করতেছে। তাই জমির
মূল্য বেড়েছে বন্যার জলের মতো। দালালের দৌলতে লাখ টাকার জমির মূল্য হয়েছে কোটী টাকা। উকিল, মুহুরি, শিক্ষক থেকে শুরু করে নানা বৃত্তির লোক জমি কিনে বসতি স্থাপন করছে সুন্দরপুরে। পূর্বে যেখানে দিনের বেলা শৃগাল ডাকতো, টিনের ছাপরা ছিল না, সেখানে দালান
উঠতেছে। এক তালা, দুই তালা নয় বহু তলাতল বিশিষ্ট দালান।
সুন্দরপুরে যে শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, তাই নয়। নাগাল্যাণ্ড, লক্ষ্ণৌ, বাঙ্গালোর, কেরেলা, দিল্লী, গুজরাট প্রভৃতি স্থানে কর্মরত অনেকেই জমি কিনে বসতি স্থাপন করেছে সুন্দরপুরে।কেউ কেউ আবার সুন্দরতর স্বচ্ছন্দময় জীবনের আশায় নিজের ভিটেজমি বিক্রী করে অন্যান্য জায়গা থেকে উঠে এসেও বসতি স্থাপন করেছে। তাই শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত
লোকের মিশ্রণে সুন্দরপুর এক বিশেষ রকমের সংস্কৃতি সম্পন্ন গ্রামে পরিণত হয়েছে।
আগে যেখানে একটি মসজিদে আজান দেয়ার মতো লোক ছিল না, সেখানে
তিন চারটি পাকা মসজিদ গড়ে উঠেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত আজান হয়, জামাত চলে। অনেকে আবার নামাজ রোজার ধার ধারে
না। নিজের খেয়াল খুশি মতো চলে।
সুন্দরপুরে
এখন কাজের অভাব নেই। কাজ যেখানে আছে, সেখানে
টাকাও আছে। মোদির দোকানের কথা বাদই দিলাম, পান, বিড়ি, চা দোকান, ছোটখাট কাপড়ের দোকান দিলেই সারাদিনের হাজিরা
উঠে। মানুষ যেখানে বেশি, সেখানে
রোগব্যাধির প্রকোপও তো বেশি হবেই। ফলে একটি সরকারী হাসপাতালও স্থাপন
হয়েছে। সরকারী হাসপাতালের সমান্তরালভাবে অনেক ফার্মাসিও স্থাপন
হয়েছে। ফার্মাসির বেশির ভাগই ভাড়ার লাইসেন্স। অনেকে আবার বেশি লাভের আশায় ড্রাগস ব্যবসার সাথেও জড়িত বলেও শুনা
যায়। তবে এটা শুনা কথা। নাও হতে পারে!
জমির
দালালিতে টাকা আছে বলে সুন্দরপুরের অনেকে জমির দালালি করে। যার বাড়ীতে পূর্বে একটি খড়ের ঘর ছিল না, তাদের
অনেকে দালালি করে টাকা জমিয়ে দালান দিতেছে। ই-রিক্সা আসার পর থেকে পূর্বে যারা ঠেলা, রিক্সা চালাতো তারা এখন ফিটফাট বাবু হয়ে
ই-রিক্সা চালায়। তবে এখনও শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে
সুন্দরপুর গ্রাম। ফলে অনেক কুসংস্কার, বাল্য বিবাহের প্রকোপ রয়েছে সুন্দরপুর গ্রামে।
হিষ্ট্রিয়া হলে কবিরাজ ডাকে।ঘরে ঘরে
বাল্য বিবাহ। সতের আঠারো বছরে ছেলের বিয়ে এবং পনের ষোল বছর হলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দুর্নামের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করে।
ফলে ওঠ টিপলে দুধ বেড়োবে তারাও ছেলেমেয়ের
মা বাপ হয়ে পড়ে।সেজন্য যখন
স্কুলে যাওয়ার বয়স তখন উপার্জনের জন্য বেড়িয়ে পড়ে।উপার্জন কম হলে ঝগড়াঝাঁটি
লেগেই থাকে সব সময় এটা ওটা নিয়ে মা বাপ ভায়ের সাথে।উপার্জন বেশি হলেও
ঝগড়াঝাঁটি লাগে। এক সময় চুলা-চৌকাও আলাদা হয়ে পড়ে।সুন্দরপুর গ্রামের সামান্য
পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম।এখন সুন্দরপুরের একটি পরিবারে কথায় আসি। কারণ সব কয়টি পরিবারের আলোচনা
হবে না একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থে।
গৃহস্থের নাম ছলিমুদ্দিন।
ছলিমুদ্দিন সুন্দরপুরের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। অন্যান্য অনেক পরিবারের মতো উঠে এসেছে অন্যত্র থেকে নদী ভাঙনের ফলে।
ছলিমুদ্দিনরা তিন ভাই। কেউ শিক্ষত নয়। কেউ ঠেলা চালায়, কেউ দিন
হাজিরা করে। ছলিমুদ্দিন খুব কর্মী লোক। শক্তি সামর্থ্য। হাতে যাদু আছে। কামকাজ খুব পরিপাটি। কাজ দেখলেই বুঝা
যায় ছলিমুদ্দিনের কাজ। ছলিমুদ্দিন লোকটা মাঝারি পাতলা গঠনের। শরীরের রং কালো। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মৃদু
ভাষী। শান্তিপ্রিয়।ঝগড়াঝাটি পছন্দ করেন না। ছলিমুদ্দিনের পরিবার আদুরী নেসা একটু
ছোটখাট বেঁটে ধরণের।
শ্যামবর্ণা। ছলিমুদ্দিনের মতোই
কর্মী। গৃহিনী। তবে প্রয়োজনে দিন হাজিরাও করে। কাজেকামে ভালো। ফাঁকিফুকা নাই। মন দিয়ে কাজ করে। কোনোদিন
বসে থাকে না। অন্যেরা কাজ না পেলেও
ছলিমুদ্দিন এবং আদুরি নেসার বসে থাকতে হয় না। নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গান, ‘আমায়
নোহে গ’, ভালোবাস, শুধু ভালোবাস মোর গান।' সেই রকম আর কি! গুণের জন্যই ছলিমুদ্দিনের পরিয়াল অন্যান্য ভাইদের চেয়ে
ভালো চলে। দু’ভায়ের এক ভাই থাকে লক্ষ্ণৌ এবং অন্যজন থাকে গুয়াহাটী। লক্ষ্ণৌয়ে থাকা জন
টোকাইর কাজ করে এবং গুয়াহাটীতে থাকা জন সবজির ব্যবসা করে।
ছলিমুদ্দিনের
দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে বড়। ছেলে দু’টি ছোট। মেয়ের নাম সালেহা। সালেহার বিয়ে হয়ে গেছে চার বছর আগে ষোল বছর
বয়সে। মেয়ে এখন দুই সন্তানের মা।একজনের বয়স চার এবং একজনের ডের বছর।
ছলিমুদ্দিন
ছেলে দু’টিকে স্কুলে দিয়েছে। বড় ছেলের নাম ফজরুল
এবং ছোট ছেলের নাম নজরুল।
উভয়ে লেখাপড়ায় ভালো। তবে মন দিয়ে লেখাপড়া করে না। বড় ছেলে ফজরুল স্কুলের নাম করে বাড়ী থেকে বেড়িয়ে গিয়ে
অন্যত্র খেলাধূলা করে। সঙ্গদোষে পড়ে এটা ওটা চুরিও করে। ছোট ছেলে নজরুল চুরি করে না ঠিকই।
তবে গাছে চড়ায় ওস্তাদ। আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল
গাছে চড়াটা তার কাছে জল খাওয়ার মতো। নজরুল অনেক সময় বাড়ী থেকে স্কুলের নাম করে বেড়িয়ে সহরে যায় এবং সহরে
গিয়ে টাকার বিনিময়ে লোকের বাড়ীর নারকেল সুপারি পেড়ে দেয়। অবশ্যে ফজরুলও সুপারি নারকেল পাড়ে হাতে পয়সা
না থাকলে। পয়সার
স্বাদ পেলে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া
হয় না। কামাই রোজগারের ধান্দায় নেমে পড়ে। ফলে লেখাপড়া চুলোয় উঠে। মা বাবার আশায় ঠাণ্ডা জল পড়ে।
ফজরুল এবং নজরুলের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে তেমন কিছু হলে বিচিত্র কিছুই নয়।
দুই
ছলিমুদ্দিনের
বাড়ীর পাশেই উকিল সাহেবের বাড়ী। নাম আব্দুর রহমান। তবে নাম অনেকেই জানে না। উকিল সাহেব বলেই সবাই জানে। লোকটা সাধাসিধে। অনাড়ম্বর।
নিরহংকারী। লোকের দুঃখ বুঝে। সবার সাথে মিলেমিশে
থাকার চেষ্টা করে। দুই বছর পূর্বে অন্যত্র থেকে উঠে এসেছে। উকিল সাহেব মানুষ হিসাবে ভালো। শিক্ষার প্রতি খুব গুরুত্ব। স্কুলের সময়ে
ছেলেমেয়েদের রাস্তায় খেলা করতে দেখলে পাশে গিয়ে খোঁজখবর
নেয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য তাগিদা দেয়। স্কুলে পড়লে কি কি লাভ
হয় বুঝিয়ে বলে।
সেদিন
উকিল সাহেব একটু দেরিতে কোর্টে যাচ্ছিলেন। দেখেন, ফজরুল তার সম বয়সী একটি ছেলের সাথে সহরের দশরথ
দাশের বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দশরথ দাস একজন স্কুল
শিক্ষক। উকিল সাহেবের সাথে চেনা পরিচয় আছে। উকিল সাহেব বাইকে চড়ে যাচ্ছিলেন। ফজরুলকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বাইক ব্রেক করে রেখে দেখলেন ফজরুল নেই। হাওয়া গেছে। অর্থাৎ উকিল সাহেবকে দেখে ফজরুল কেটে পড়েছে।
উকিল
সাহেব কিছুক্ষণ থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। এইমাত্র দেখলাম, ছেলেটা গেলো কোথায়? ভুল দেখলাম না কি? তিনিও
শেষে বুঝতে পারলেন, তাঁকে
দেখেই সম্ভবত ফজরুল কেটে পড়েছে।
সেদিন
কোর্ট থেকে এসে উকিল সাহেব সন্ধ্যায় ফজরুলদের বাড়ী এলেন। উকিল সাহেবের আপন খালুর নাম ছলিমুদ্দিন। তাই উকিল সাহেব ছলিমুদ্দিনকে খালু এবং
ছলিমুদ্দিনের গৃহিণী আদুরি নেসাকে খালা বলে ডাকেন। ছলিমুদ্দিন তখন
কাজ থেকে এসে গোসল করে বারান্দায় বসে পায়ের তলায় সরষের তেল
মাখছিলেন। আজ এক জায়গায় ঢালাইর কাজ করেছে।তাই পায়ের
তলাটা ছন ছন করছে। আদুরি নেসাও কাজে গিয়েছিলো। কাজ থেকে এসে সে গোসল করছিলো।
ছলিমুদ্দিন
উকিল সাহেবকে জামাই বলে ডাকেন। তাই উকিল সাহেবকে দেখে ছলিমুদ্দিন বললেন- কি গো জামাই, ভালো
আছেন? কোর্ট থেকে কখন এলেন ? বসেন।
বারান্দায় চেয়ার পাতা ছিলো।
উকিল সাহেব চেয়ারে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন-একটু আগেই এসেছি। এসে হাতমুখ
ধুয়ে চা খেয়ে এলাম আপনাদের সাথে দেখা করতে। খালাকে দেখছি না
! খালা কোথায়?
মনে হয়
গোসল করতেছে। ছলিমুদ্দিন বললেন- কাজে গিয়েছিলো। কাজ থেকে এসে গোসল করছে। কোনো কথা আছে না-কি?
উকিল
সাহেব স্বাভাবিক লগায় বললেন- ফজরুলকে দেখছি না। ফজরুলকে আজ আপনাদের কোনো কাজে পাঠিয়েছিলেন না কি?
না তো।
তাকে কি কাজে পাঠাব?
আজ
স্কুলে গিয়েছিলো না-কি?
ছলিমুদ্দিন
বললেন- আমরা তো স্কুলে গিয়েছিলো বলেই জানি। আমরা সকালে বেড়িয়ে যাই ওদের স্কুলে যাওয়ার আগেই। তাই স্কুলে যাওয়া না যাওয়াটা তেমন বলতে
পরব না। আমরা তো জানি স্কুলে গিয়েছিলো। কথা কি?
কথা তেমন
কিছু না। উকিল সাহেব শান্ত গলায় বললেন- আগে খালা আসুক গোসল করে। পরে বলছি। ফজরুল কোথায়?
আজ বাড়ী
এসে ফজরুলকে দেখিনি। নজরুল আছে ঘরের ভেতরে। এভাবে বলেই ছলিমুদ্দিন নজরুলকে ডেকে বললেন- নজরুল, ফজরুলকে দেখছি না।ফজরুল বাড়ী আসে নি?
নজরুল
ঘরের ভেতর বইখাতা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। সে ঘরের ভেতর থেকে বললো- ভাইকে সন্ধ্যার আগে দেখেছিলাম। এখন কোথায় গেছে জানি না।
ছেলেটা
খুবই বদমাশ হয়েছে। ছলিমুদ্দিন আক্ষেপের স্বরে বললেন- আমরা সকালে কাজে বেড়িয়ে যাই। কাজ থেকে এসে কোনোদিন বাড়ীতে পাই না। সারাদিন কি যে
করে ছেলেটা? নজরুল, দেখ তো, ও কোথায় আছে?
নজরুল
বললো- আমি দেখতে পারব না। অংক করতেছি। কাল অংকের পরীক্ষা আছে।
বাইরে
গিয়ে একটু দেখে আসবি, তাতে তোর কতটা
ক্ষতি হবে? ছলিমুদ্দিন একটু উষ্মা সহকারেই বললেন- এই ছেলে দু’টো কোনো
কথাই শোনতে চায় না। কোনো ফরমাশ দিলে খালী পড়ার ছুতা
দেয়। যা, কোথায় গেছে ডেকে নিয়ে আয়। ফজরুলের পরীক্ষা
নেই?
আমি কি
জানি? নজরুল বললো- ও স্কুলেই যায় না।
স্কুলে
যায় না মানে? কি করে? ছলিমুদ্দিন
অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
আমি জানি
না। নজরুল ঘরের ভেতর থেকে বেড়িয়ে দুপ দুপ করে চলে গেলো ফজরুলকে খোঁজার উদ্দেশ্যে।
আমি তো
ফজরুলকে কোনোদিন বইখাতা নিয়ে বসতেই দেখি না। পড়ার কথা বললেই বলে,আমার পড়া হয়ে গেছে। যে পড়া! স্কুলে পড়লেই
হয়ে যায়। আমার পড়া আমি স্কুলেই মুখস্থ করে আসি। এভাবে বলে ছলিমুদ্দিন
উপহাসের সুরে বললেন- সব পড়া বোলে ওর মুখস্থ! ইতিমধ্যে
আদুরি নেসা গোসল করে এলো। আদুরি নেসাকে দেখে ছলিমুদ্দিন উপহাসের স্বরেই বললেন- তোমার গেদা কোথায়?
এভাবে উপহাস করে গেদা বলার অর্থ
হলো, আদুরি নেসা ছেলেদের গেদা বলে ডাকে।বিশেষভাবে
ফজরুলকে।
আদুরি
নেসা তাঁরের উপর কাপড় মেলে দিয়ে বললো- আপনি আর আমি তো একসাথেই কাজ থোকে এলাম। আমি কেমন করে জানবো ফজরুল কোথায়?
এমন সময়
নজরুল এসে বললো- ভাই রাস্তায় কয়েকজন ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।আমি আসতে
বললাম। আমাকে ধমকিয়ে খেদিয়ে দিলে।
উকিল
সাহেব এতক্ষণ চুপচাপ বসে সবার কথাবার্তা শুনছিলেন। এইবার উকিল সাহেব
বললেন-ফজরুলকেই আমার দর্কার। তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আছে আমার।
ফজরুলের
বিরুদ্ধে অভিযোগ? আদুরি নেসা বিরক্তির সুরে জিজ্ঞাসা করলেন- কি
অভিযোগ?
আগে ডেকে
আনুন। ওর সামনেই বলবো। উকিল সাহেব শান্ত স্বরে বললেন।
ফজরুলের
বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা শুনে আদুরি নেসা আহত হলো। মনে হলো, ফজরুলের বিরুদ্ধে
অভিযোগ আনার জন্য যেন সে উকিল সাহেবের প্রতি একটু ক্ষুণ্নও হলো। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা রাস্তায় বেড়িয়ে এলো। রাস্তায় এসেই সে
ফজরুলকে দুইজন ছেলের সাথে আড্ডা মেরে থাকতে দেখলো। সে কোনো কথা না
বলে সোজা গিয়ে ফজরুলের চুলের মুঠিতে ধরে গালের মাঝে চড়
কষিয়ে বললো- ডাকতেছে শুনতে পারছিস না ? তোর
বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে লোক আসে? চল, আজ বাড়ী। আজ তোর মজা চাকাব। মেরে হাড়গোড়
ভেঙে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াব। লোকের কথা শুনার জন্য তোকে ভাতকাপড় দিয়ে
পোষতেছি না কি?
এভাবে বলতে বলতে টেনে
হিঁচড়ে ফজরুলকে বাড়ী নিয়ে এসে গালের মাঝে দু'টি চড় মেরে বললো- বল, কি করেছিস? জামাই
ব্যাটা তোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে কেন? ভাতকাপড়
দিয়ে লালন করছি লোকের অভিযোগ শুনার জন্য নাকি?
আদুরি
নেসার ব্যবহারে উকিল সাহেব মর্মান্তিক ভাবে আহত হলেন। ফজরুলকে যেন মারছে না, অভিযোগ
আনার জন্য যেন মারছে তাঁকেই। তবুও তিনি কথাটায় তেমন গুরুত্ব দিলেন না। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই মেজাজ একটু গরম হয়ে থাকাটা
স্বাভাবিক। এদিকে লেখাপড়াও নেই। কার সাথে কেমন ব্যবহার করতে
হয়, তা ভালোভাবে জানেও না। শিক্ষা না থাকলে মানুষ সহনশীল হয় না। শিক্ষায় মানুষকে
সহনশীল করে। সেই শিক্ষাই এদের নেই। এভাবে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে
উকিল সাহেব বললেন- খালা, রাগ
করছেন কেন? আগে কথাটা শুনে নিন, কি কথা, কি
বার্তা।
আদুরি
নেসা আবার ফজরুলে গালের একটি চড় মেরে বললো- বল, কি করেছিস?
ফজরুল
বললো- কি করব? কিছুই করিনি।
উকিল
সাহেব বললেন- ফজরুল, আজ তুমি
স্কুলে গিয়েছিলে?
ফজরুল
নীরব। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মাটির পুতুলের মতো।
উকিল
সাহেব বললেন- কথা বলছ না কেন? আমি
জিজ্ঞাসা করেছি, আজ স্কুলে গিয়েছিলে কি যাও নি?
আবারও
ফজরুল নীরব। ছলিমুদ্দিন ধমক দিয়ে বললেন- উকিল ব্যাটা, কি জিজ্ঞাসা করছে, উত্তর দিচ্ছিস না কেন?
কি উত্তর
দিব। ফজরুল এইবার মুখ খুলল- গিয়েছিলাম।
উকিল
সাহেব বললেন-তাহলে তুমি স্কুলের টাইমে দশরথ দাশের বাড়ীর সামনে কি করছিলে ?
আবার
ফজরুল নীরব। তখন আদুরি নেসা মারতে তেড়ে এলো। উকিল সাহেব বাধা দিয়ে বললেন- ওকে এখন কিছুই বলবেন না। আমি বলছি কথাটা কি। আমি আজ কোর্টে
একটু দেরিতে যাচ্ছিলাম। তখন ফজরুলকে দশরথ দাশের বাড়ীর
সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তখন এগারটা বাজে। তখন তো স্কুলের সময়। তাই
জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম।
ছলিমুদ্দিন
উঠে এসে ফজরুলের গালে প্রচণ্ড জোরে চড় কষিয়ে বললেন- বল, কি করছিলি দশরথ
দাসের বাড়ীর সামনে? না বললে
আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। নজরুল যা তো লাঠি নিয়ে আয়। বল, আজ স্কুলে গিয়েছিলি?
লাঠির
ভয়ে এইবার ফজরুল মুখ খুলল। বলল- না যাইনি।
কেন
যাসনি?
মা’র কাছে পয়সা খুঁজলাম। মা দেয়নি। তাই নারকেল
পাড়তে গিয়েছিলাম স্কুলে না গিয়ে।
আদুরি
নেসা বললো- দৈনিক দশ টাকা করে দিই। কোনো কোনোদিন বিশ টাকাও দিই। আজ হাতে পয়সা ছিল না বলে দিইনি। তাই তুই পয়সার জন্য স্কুল ক্ষতি করে
লোকের নারকেল পাড়তে যাবি?
যাব না
কি করব? ফজরুল বললো- সবাই টিফিনের সময় এটা ওটা কিনে
খায়। আমার খেতে মন যায় না নাকি?
উকিল
সাহেব বললেন- যা হবার হয়েছে। এমন কাজ আর করবে না। এভাবে বলে পরামর্শের সুরে ফজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- টাকা পয়সা সব সময় হাতে থাকে না।
তাই দেয়নি। তার জন্য তোমার স্কুল ক্ষতি করাটা ঠিক হয়নি।
স্কুলে না গেলে তোমার বাবা মা’র ক্ষতি
হবে না। ক্ষতি হবে তোমার নিজের। এমন একটা সময় আসবে তখন
লেখাপড়া না জানলে ঠেলা রিক্সাও চালাতে
পারবে না। সরকার লাইসেন্স দিবে না। এভাবে বলে আদুরি নেসাকে
উদ্দেশ্য করে বললেন- খালা, ওর সাথে আর রাগারাগি করবেন না। আজ থেকে ও ভালো হয়ে যাবে।
সেদিনের মতো কথাটা এভাবেই ইতি
পড়ল।
তিন
সুন্দরপুর
গ্রামটা নতুন নতুন মানুষ এসে ভরে পড়ছে। একটি পরিবার এসেছে বাঘবর থেকে।পরিবারটি
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের মুখে পরে সর্বস্বান্ত হয়েছে। তারা এখন নাগাল্যাণ্ডে
ঠিকাদারী করে। ঠিকাদারী করে ভালোই টাকাপয়সা রোজগার করেছে। সেই টাকায়
সুন্দরপুরে পোয়া বিঘা জমি কিনে বাড়ী করেছে। দালান বাড়ী। বাড়ীটি
এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি। তাই তারা এখনও বাড়ীতে আসেনি। নাগাল্যাণ্ডেই
রয়েছে। তাই বাড়ীটি নির্মীয়মান অবস্থায় আছে। ফলে ঘরের ভেতর
কাজের সময় কাটছাট করা ছোটখাট অনেক লোহার রড রয়েছে।
গৃহের
মালিকের নাম ওসমান।
একদিন
ওসমান নাগাল্যাণ্ড থেকে বাড়ীতে এসে দেখে ছোটখাট রডের টুকরা
একটিও নেই। সে এ বাড়ী ও বাড়ী এসে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে
অনেকে বললো- ফজরুল এবং পশ্চিম পারার একটি ছেলেকে ঘরের কাছে ঘুরাঘুরি
করতে দেখেছি। ছেলে মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে ওরাও নিতে
পারে!
একজন
বললো- নিতে পারে মানে আমার সন্দেহ ওরাই নিয়েছে। ওদের স্বভাব খুব একটা ভালো নয়। ছোটখাট জিনিস চুরি করে। আমারই মোবাইলের মেমোরি চুরি
করেছিলো। ওরা মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়ী আসে এবং আমার ঘরে বসে
মোবাইলে গান শুনে। তাই আমার সন্দেহ
হয়েছিলো, ওদের দু’জন ছাড়া কেউ আমার মেমরি চুরি করেনি। আমি ওদের ডেকে এনে ডাবি ধমকি দেওয়ার পরে ওরা মেম’রি বের
করে দিয়েছিলো।
একজন
বললো- আমার বালিশের তল থেকে একশ টাকা এবং একটি রূপোর আংটি চুরি করেছিলো। আমি প্রমাণ সহিত ফজরুলের মা'র কাছে বলার পর আংটিটি ফেরত দিয়েছিলো।তবে টাকা কয়টি ফেরত দেয়নি।
ওর মা বলেছিলো, ছেলে মানুষ টাকা কয়টি ভেঙ্গে খেয়ে ফেলছে। দিবে কোত্থেকে। একশ টাকা। তাই আমি বিশেষ জোর দিইনি।
এরকম
অনেক প্রমাণ পাওয়ার পর ওসমান এসে ফজরুলের বাবার কাছে রড চুরি সম্পর্কে নালিশ দিলো।
ফজরুল বাড়ীতেই ছিলো ঘরের ভেতরে। স্কুলে
যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল। ছলিমুদ্দিন ফজরুলকে
ডাকলেন- ফজরুল, এখানে এস।
ফজরুল
ঘরের ভেতর থেকেই বললো- ডাকতেছ কেন? আমি
স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হইতেছি। এখন যেতে পারব না।
আরে আমি
বলছি, বাইরে এস। ছলিমুদ্দিন রাগের সাথে বললো- এখনও
স্কুলের বেলা তেমন হয়নি। শুনে যাও। কথা আছে। শুনেও স্কুলে যেতে
পারবে।
ফজরুল
খুবই চতুর। সে ওসমানকে আসতে দেখেছে এবং সে বুঝতেই পেরেছে তার বাবা কি জন্য ডাকতেছে। তাই সে বাইরে না আসার জন্য ছুতা বের করে বললো- বললাম
না, আমার স্কুলের বেলা হচ্ছে। এখন যেতে
পারব না। কি বলবে, বল। আমি
এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি।
তোকে
বাইরে আসতে বলছি, বাইরে আয়। ছলিমুদ্দিন ক্ষোভের সাথে বললেন-
আজ স্কুলে যেতে হবে না। আসতে বলছি, বাইরে
আয়। না হলে আমি ঘরের ভেতর গেলে কিন্তু কথা খারাপ হবে।
অগত্যা
ফজরুল গৃহের ভেতর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলো। সে বললো- বল, কি জন্য ডেকেছ?
ওসমানের
দিকে ইঙ্গিত করে ছলিমুদ্দিন বললেন- একে চিনতে পারছিস?
হ্যাঁ, পারছি। নতুন বাড়ীর লোক।
এ যা বলছে? কথা কি
সত্যি?
কি বলছে
আমি কি জানি? সত্যিমিথ্যা কেমন করে বলবো?
তুই
জানিস। বল, কথা সত্যি কিনা?
আমি
কিছুই জানি না। কি বলবো?
রড
কোথায় বিক্রী করেছিস?
কিসের রড? আমি কোনো রড বিক্রী করিনি।
বুঝেছি, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। ছলিমুদ্দিন ক্ষোভের
সাথে নজরুলকে ডেকে বললেন-নজরুল, দড়ি
নিয়ে আয়। আজ একে বেঁধে পিটাতে হবে। না হলে সত্যি কথা বলবে না।
নজরুল
দড়ির জন্য মা’র কাছে গিয়ে বললো- মা, আব্বা দড়ি খুঁজতেছে। দড়ি কোথায় ?
আদুরি
নেসা রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলো। সে চোপা করে উঠলো- এখন দড়ি দিয়ে কি করবে?
ভাইকে
বাঁধবে বলতেছে।
কেন ? বাঁধবে কেন? কি করেছে সে? আদুরি নেসা রন্ধন গৃহ থেকে
বেড়িয়ে এসে বললো- ফজরুলকে বাঁধবে কেন? কি করেছে ফজরুল?
কি করেনি
তাই বল? ওসমানকে দেখিয়ে ছলিমুদ্দিন বললো- তোমার
গুণধর গেদা এর রড চুরি করেছে। স্বীকার করছে না। তাই দড়ি দিয়ে
বেঁধে স্বীকার করাব।
আদুরি
নেসা সাফাইর স্বরে বললো- আমি কোনোদিনও এ কথা মানব না যে ফজরুল রড চুরি করেছে। আগে একটু আধটু লোকের জিনিস এদিক সেদিক করতো ঠিক। উকিল ব্যাটা
এসে বুঝানোর পরে ভালো হয়ে গেছে। এখন সেরকম বাড়ী থেকে বেড়োই না। একটু
আধটু খেলতে যায় বিকেল বেলা। তারপর সব সময় পড়া নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকে।
তোমার
ছেলের গুণগান করতে হবে না। ছলিমুদ্দিন উষ্মার সাথে বললেন- তোমার ছেলে কি তা আমি ভালো করেই জানি। আমার কাছে ছেলের বাখান করতে হবে না। জিজ্ঞাসা
কর, রড কোথায় বিক্রী করেছে। ও একাই
ছিল, না ওর সাথে আর কেউ ছিলো?
ফজরুল
অধোমুখ হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে ছিলো। ফজরুলের কাছে গিয়ে আদুরি নেসা বললো- কি বলছে? তুই বোলে
রড় চুরি করেছিস?
আমি
করিনি। পশ্চিম পারার হাকিমুদ্দিন চুরি করেছে।
ওসমান
বললো- হাকিমুদ্দিন যে চুরি করেছে তুমি জানলে কি করে?
সে আমাকে
বলেছে।
বুঝেছি।তুইও
ছিলি হাকিমুদ্দিনের সাথে। ছলিমুদ্দিন বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বললেন-তুই না বললে, আমি
অন্তত মানব না।
না করেও
লাভ হবে না। ওসমান বললো- অনেক লোক সাক্ষী আছে, ওরা যে সন্ধ্যে বেলা আমার বাড়ীর সামনে ঘুরাঘুরি
করেছে।
আদুরি
নেসা বললো- আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না। গেদা কোনদিন এ রকম কাজ করতে পারে না।
তোমার
বিশ্বাসে যায় আসে না। এ ভাবে বলেই ফজরুলকে উদ্দেশ্য করে ছলিমুদ্দিন বললেন-কত
টাকায় বিক্রী করেছিস। সব টাকা ভেঙ্গে খেয়েছিস নাকি?
না
খাইনি। ফজরুল বললো- মা'র কাছে
জমা আছে।
আদুরি
নেসা বললো- আরে
বাপরে, কোনদিন আমার কাছে টাকা জমা দিয়েছিস?
পনের দিন
আগে যে পাঁচ শ টাকা দিলাম। ফজরুল বললো- রড এক হাজার টাকা বিক্রী করেছিলাম। পাঁচশ টাকা হাকিমুদ্দিন নিয়েছে। আমাকে পাঁচশ টাকা
দিয়েছিলো।
সে টাকা
বোলে আংটি বেচা টাকা। আদুরি নেসা সাফাই দেওয়ার জন্য বললো- ও একদিন আমার কাছে পাঁচ শ টাকা জমা দেওয়াটা
সত্য। তবে ও বলেছিলো, সহরে
একটি আংটি কুঁড়িয়ে পেয়েছিলো। সেই আংটি বিক্রী করা টাকা।
যা
বিক্রী করাই হোক। টাকা দেওয়াটা সত্যি তো। আসলে ঐ টাকা রড বিক্রী করা টাকাই। এভাবে বেল ওসমান বললো-
আমি একটা গল্প বলি শুনুন,‘এক জায়গায় এক বিধবার একটি সন্তান ছিলো।
একমাত্র সন্তান। তাই খুব আদরের। জমিতে রাখলে পিঁপড়ায় কামরায়
এবং মাথায় নিলে উকুনে কামরায়। এ রকম
আদরের আর কি! ছেলেটা সঙ্গ দোষে
চুরি করতে শুরু করেছিলো। অবশ্যে তেমন চোর না।এর গাছের আমটা, ওর গাছের শসাটা চুরি করে এনে মায়ের হাতে
দিতো। মা কিছু বলত না। মার কাছে আশকারা পেয়ে এ রকম ছোটখাট
চুরি করতে করতে বড় মাপের চুরি করাও শুরু করেছিলো। এমন কি সুযোগ পেলে ডাকাতিও করত।
একবার একটি ডাকাতি কেসে পুলিশ তাকে বাড়ীতে এসে গ্রেপ্তার
করলো। তখন সেই চোর ছেলেটা মা'র কাছে
গিয়ে বললো- মা, তোমার জিব্বাটা বের কর তো।
তখন মা বললো- জিব্বা বের করব
কেন?
আরে দর্কার আছে। ছেলেটা বললো-
দর্কার আছে বলেই তো বের করতে বলছি।
মা
জিব্বা বের করলো। ছেলেটার হাতে একটা ব্লেড ছিলো। সে সেই ব্লেড দিয়ে মা’র জিব্বা কেটে
বললো- মা, তুমি খারাপ পেয়োনা। তোমার জিব্বার জন্যই
আমাকে আজ জেলে যেতে হচ্ছে। যখন আমি লোকের গাছের এটা ওটা চুরি করে
এনে তোমার হাতে দিতাম, তখন যদি সেগুলো না খেয়ে আমাকে শাসন করতে তাহলে আজ আমাকে জেলে যেতে হত না।'
ওসমান গল্পটা বলে বললো-
তাই আমি বলি। ফজরুল আমার কয়েকটা রড চুরি করেছে। আমার খুব একটা ক্ষতি হয়নি।
সেগুলো কিজানি আমি এক সময় ফেলেই দিতাম। কিন্তু ক্ষতি হবে আপনাদের, যদি এখন শাসন না করেন। এখন শাসন না করলে পরবর্তীতে বড়
মাপের ডাকাতও হতে পারে। ছোট থেকেই বড় জিনিসের জন্ম হয়।
গল্পের মাঝে আর একটা গল্প বলি। একবার আমাদের পারায় কয়েকজন ছেলে তাস খেলত। তারা আমার থেকে বয়সে ছোট। তাই আমি একদিন তাদের কাছ দিয়ে যাওয়ার
সময় একজন ছেলে লজ্জা পেয়ে সাফাই স্বরূপ বললো- এমনি বিড়ি বাজি রেখেখেলতেছি, টাকা দিয়ে নয়।
তখন আমি
বলেছিলাম, আজ বিড়ি করে খেলছ, কোনোদিন টাকা বাজি ধরেও খেলবে। বিড়িই হোক বা গাছের পাতা বাজি রেখেই হোক, না খেলাটাই বেশি ভালো।
পরে দেখছি, সেই ছেলেগুলোর কয়েকজন ঘোর জুয়ারী হয়েছে।
জুয়া খেলে সংসারের বারটা বাজিয়েছে। আমি এখন যাই।
আপনাদের মঙ্গলের জন্যই বলছি, ফজরুলকে
শাসন করুন। বাঁশ কোমল থাকতে যেমন ইচ্ছা তেমন বাঁকানো যায়।
পাকলে কিন্তু যায় না। সময় থাকতে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
ওসমানকে
উদ্দেশ্য করে ফৈজুদ্দিন নরম গলায় বললেন- দ্যাখ, তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট। তাই তুমি করেই বলছি। ছেলের
কাজের জন্য আমি খুবই লজ্জিত। ও বললো, হাজার
টাকা বিক্রী করেছে। টাকা হাতে এলেই টাকা কয়টা তোমাকে আমি দিয়ে দিব।
না না, টাকা দিতে হবে না। ওসমান বললো- আমার ছোট ভাই
থাকলে সে যদি বিক্রী করে দিত। তার কাছ থেকে কি আমি টকা নিতে পারতাম।
পারতাম না। তাই টাকা কয়টা দিতে হবে না।ছোট ভাই হিসাবে আমি টাকা কয়টা ছেড়ে
দিলাম। ছেলেকে শাসন করুন। বড় মাপের কোন
কিছু করার আগে।
চার
কিছুদিন
যাবত সুন্দরপুরে দিনদুপুরে খুব ছাগল চুরি যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে
ছাগল পেলেই চোর মারুতিতে করে তুলে
নিয়ে যায়। মারতি নিয়ে চুরি করে, তাই লোকে
এই চোরের নাম দিযেছে ভিআইপি চোর। প্রত্যন্ত
অঞ্চলে ভিআইপি চোরের ছাগল চুরির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। ভিআইপি চোরের উপদ্রব এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছোল যে সবাই ছাগল রাস্তায় ছাড়ার সাহস
হারিয়ে ফেললো। ফলে ছাগল খেতে খোলায় গোচর দিয়ে রাখতে শুরু করল।
কিন্তু এক সময় খেতে খোলা থেকেও
ছাগল চুরি যেতে লাগলো। তাই সবাই
ছাগল বাড়ীতেই বেঁধে রাখতে লাগলো।
সবাই
ভাবতে লাগলো, ভিআইপি চোর মারুতি নিয়ে আসে। তারা কাছের কেউ
হবে না এটা প্রায় নিশ্চিত। তারা অবশ্যেই অন্য জায়গা থেকে এসে ছাগল চুরি করে
নিয়ে যায়। তারা খেতে খোলা থেকে ছাগল চুরি করে না। কারণ মারুতি
নিয়ে এসে খেতখোলা থেকে ছাগল চুরি করা সম্ভব না। তাহলে খেতখোলা থেকে
দিন দুপুরে কারা ছাগল চুরি করছে? এই
প্রশ্ন সবার মনে। নিশ্চয় অন্য কোনো ছাগল চোরের দল বের হয়েছে।
তাই ছাগল চুরি হলে দু'চারজন
কসাইর দোকান বা হাটে হাটে গিয়ে ছাগল সন্ধান করতে লাগলো।
একদিন
ফজরুলের খালার একটি ছাগল চুরি হলো। ফজরুলের খালুর নাম ফৈজুদ্দিন।ছলিমুদ্দিনের
ভায়ড়া। ছলিমুদ্দিনের চেয়ে বয়সে বড়। তিনি চালাক চতুর এবং সচেতন লোক।ছাগল চুরি
যাওয়ার কথা শুনে তিনি এদিক ওদিক কোথাও খুঁজতে গেলেন না। সোজা সহরে গিয়ে কসাইর দোকানের ওপড় নজর রাখতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, কসাইর দোকানের এক কোনাচে
কয়েকটি ছাগল বাঁধা রয়েছে। তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁদের চুরি
যাওয়া ছাগলটিও বাঁধা আছে সেই ছাগল
কয়টির মধ্যে। তাঁদের ছাগলটি বড় জাতের। তাই তাঁদের ছাগলটি অন্যান্য ছাগল কয়টির মধ্যে সন্ধ্যা তারার মতো উজ্জ্বল হয়ে ছিলো।
সহর
বন্দরের কথা! একলা গিয়ে সরাসরি ছাগল দাবি করলে কসাই ছাগলটা হাওয়াও করে দিতে পারে। তাই ফৈজুদ্দিন সরাসরি কসাইর দোকানে না গিয়ে সহরেরই তাঁর
একজন বন্ধুকে নিয়ে কসাইর দোকানে এলেন।
তিনি
কসাইকে জিজ্ঞাসা করলেন- ভাই, ঔই যে
কোনাচে ছাগলটি বাঁধা রয়েছে, আপনি
বিক্রী করবেন নাকি?
কসাই
কাজে ব্যস্ত ছিলো। তাই সে ফৈজুদ্দিনের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজ করে যেতে লাগলো।
ফৈজুদ্দিন
বললো- ভাই, আমার কথায় একটু কান দেন।
কসাইটি
চোপা করে উঠলো- কাজ করতেছি দেখতেছন না। আর কোনদিন শুনেছেন, কসাইরা ছাগল
বিক্রী করে?
আরে ভাই
রাগ করছেন কেন? ফৈজুদ্দিন নরম স্বরে বললেন- আমি িকছুিদন যাবত একটি ভালো জাতের ছাগল
খুঁজতেছি। আপনার এই ছাগলটার জাত ভালো। তাই ছাগলটা আমার খুব পছন্দ
হয়েছে। সেজন্য কিনতে চাইছি।
আপনি তো মাংস হিসেবে বিক্রীই করবেন। আমি উচিত মূল্য দিয়েই ছাগলটা কিনব। চিন্তা করবেন না।
কসাই
বললো- ছাগলের দাম কত দিতে পারবেন?
আপনি যা
দিয়ে কিনেছেন আমি তার থেকে অধিক দামই দিব। যাতে আপনার লোকসান না হয়।
কসাই
দেখলো ভালো হাত মারা যাবে। ব্যাটার যখন ছাগলটা পছন্দ হয়েছে, তখন যা দাম চাইব তাই
দিবে। কসাই বললো- আট হাজার দিয়ে কিনেছি। কেটে মাংস হিসাবে বিক্রী করলে আমার দুই হাজার টাকা লাভ হবে। যদি দশ হাজার টাকা দেন তো ছাগলটা আপনি
নিতে পারবেন।
ফৈজুদ্দিন
বললেন- ভাই, ছাগলটা একটু দেখতে পারি?
হ্যাঁ
দেখেন। টাকা দিয়ে জিনিস নিবেন দেখেই তো নিবেন।
ফৈজুদ্দিন
ছাগলটার কাছে গিয়ে দড়ি ছাড়িয়ে দোকানের বাইরে নিয়ে এলেন। ছাগলটা তাঁকে চিনতেও পাড়লো। তাঁর গা চাটতে লাগলো। মানুষ বেইমানী করতে
পারে। কিন্তু বোবা জানোয়ার কোনদিন মানুষের সাথে বেইমানী
করে না। গৃহস্তকে হঠাৎ ভোলেও
যায় না। ছাগলটার মাথায় হাত
বুলিয়ে আদর করে ফৈজুদ্দিন ছাগলটা দুই একজনকে দেখিয়ে বললেন- ছাগলটা আমি কিনতে চাইছি। কসাই দশ হাজার টাকা দাবি করছে। দেখেন তো কেমন হবে?
একজন
বললো- ছাগলটার জাত ভালো। কাশ্মিরী ছাগল। তবুও দশ হাজার টাকা বেশি হবে।আপনি তো
পোষতে নিবেন। তাই সাত হাজারে দিলে নিতে পারেন।
আরও
কয়েকজনে সাত হাজার টাকার কথাই বললো।
ফৈজুদ্দিন
কসাইর কাছে গিয়ে বললেন- দশ হাজার টাকা বেশি হবে। সবাই সাত হাজার টাকার কথা বলতেছে।যান ভাই, আপনি ছাগলটা
দিলে আমি আট হাজার টাকাই দিব। মন নরম করে দিয়ে দেন।
কসাই
বললো- দশ হাজারে নিলে নেন। না হলে চলে যান। দশ হাজারের কমে আমি ছাগল বিক্রী করব না।
ফৈজুদ্দিন
বললেন- ছাগলটা কোথা থেকে কিনেছেন, ভাই?
যা দিয়েই কিনি না কেন, আপনার কি দর্কার? কসাই রুক্ষ স্বরে বললো-ছাগল নিলে নেন। না হলে
চলে যান।
কাছেই
দুজন পুলিশ ঘুরাঘুরি করতে ছিলো।ফৈজুদ্দিন পুলিশের দিকে ইঙ্গিত করে বললো- বলেন, কোথা থেকে কিনেছেন ? না হলে
আমি পুলিশ ডাকব।
পুলিশ
ডাকবেন মানে? আপনি কি ভেবেছেন আমি ছাগল চুরি করে এনেছি?
ফৈজুদ্দিন রুক্ষ স্বরে বললেন-তুমি চুরি করে আন নি এটা ঠিক। তবে চুরির মাল
কিনেছ। আসলে ছাগলটা আমার। কাল সন্ধ্যেয় চুরি হয়েছিলো। আজ
তোমার দোকানে পেয়েছি। ছাগলটা কার কাছ থেকে
কিনেছ, বল?
কসাই
দেখলো কথা গুরুতর। চুরির মাল বলে জানলে পুলিশ তার বারটা বাজিয়ে ছাড়বে। এর আগেও সে চুরির মাল কিনে অনেক টাকা জরিমনা দিয়েছে। তাই ঝামেলা
এড়াতে সে বললো-দেখেন ভাই, আমরা
কসাই। দৈনিক পনের বিশটা করে ছাগল কাটি। কোনো কোনোদিন হাটে গিয়েও
ছাগল কিনি। কখনও আবার অনেকে আমাদের কাছে ছাগল বিক্রী করতেও আনে। তাদের কাছ থেকেও কিনি। সবাই এসে বাড়ীর জিনিস বলে। আমরা বাড়ীর জিনিস
হিসেবেই কিনি। কে চুরি করে এনে বিক্রী করছে আমাদের যাচাই করার
সময় নেই। দেখতেই তো পাচ্ছেন। দোকানে কত ভির।
অবশ্যেই
দেখতে পাচ্ছি। ফৈজুদ্দিন বললেন- কার কাছ থেকে কিনেছ, বল?
কসাইবললো-দুজন
ছেলে ছাগলটা নিয়ে এসেছিলো। ছোটজনের বয়স বার তের এবং বড়জনের ষোল সতের হবে। তাদের আমি চিনি না।
বাড়ীর
কথা জিজ্ঞাসা করনি?
করেছিলাম।
কসাই বললো- কাছেরই কোনো গ্রামের কথা বলেছে। এখন মনে নেই। আসলে আমরা লোকের নাম ধাম মনে রাখি না। মানে, মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। তবে মুখটা মনে রাখি।
দেখলে
চিনতে পারবে?
নিশ্চয়
পারব।
দেখতে
কেমন?
ছোটজন
দেখতে একটু কালো এবং বেটে ধরণের। বড়জনের শরীরের রং ফর্সা এবং শরীর হালকা।
নাবালাক
দু'টি ছেলের কাছ থেকে ছাগল কিনাটা কি ঠিক হয়েছে? ফৈজুদ্দিনের সাথে যে লোকটি
এসেছিলেন তিনি বললেন।
না ঠিক
হয়নি। কসাই বললো-ছেলে দু’টি বললো, তাদের বাবার অসুখ হাসপাতালে আছে। টাকার দর্কার তাই বিক্রী করতে এনেছে। অসুখের কথা শুনে আমি একটু
সেণ্টিমেণ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। তাই খুব একটা দামাদামি করিনি।
ছাগলটা সত্যিই সাত হাজার টাকায় কিনেছি।
আমি এখন
কেস মামলা অনেক কিছুই করতে পারি। ফৈজুদ্দিন বললেন- তা আমি করতে চাইনা। তোমার ক্ষতি হোক তা-ও আমি চাই না। তুমি নাবালকের
কাছ থেকে ছাগলটা কিনে অন্যায় করেছ। তাই তোমারও কিছু ক্ষতি হোক এবং
আমারও কিছু ক্ষতি হোক। আমি তোমাকে চার হাজার টাকা দিব। তুমি
ছাগলটা আমাকে দিয়ে দাও।
কসাই
মাথা চুলকিয়ে বললো- চার হাজার টাকা দিলে আমার তিন হাজার টাকা লোকসান হবে।
পুলিশে
ধরিয়ে দিলে আরও অনেক বেশি লোকসান হবে। মামলায় যাবে, না আমি
যা বলছি তাতেই রফা করবে? ফৈজুদ্দিন
ধমকির স্বরে বললেন।
অগত্যা
কসাই পুলিশের ভয়ে চার হাজার টাকা নিয়েই ফৈজুদ্দিনকে ছাগলটা দিয়ে দিলো।ছাগলটা
নিয়ে আসার সময় রাস্তায় ভেবে ভেবে আসতে লাগালো, কে ছাগলটা চুরি করতে পারে? এক সময় তাঁর চোখের সামনে ফজরুলের মুখের
প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। কারণ কসাই ছেলে দু’টির যা বর্ণনা দিয়েছে তাতে ফজরুল এবং পশ্চিম
পারার হাকিমুদ্দিনের সাথে একেবারে মিলে যায়। দু’জনের মধ্যে খুবই মিল এবং উভয়ের এটা ওটা চুরি করার অভ্যাস আছে। একজনকে
ছাড়া আরেকজনকে খুব একটা দেখা যায় না। বলতে পারেন মাণিক জোড়।
তাহলে
হাকিমুদ্দিন এবং ফজরুলই ছাগল চুরি করেছে নাকি? ফজরুল এবং হাকিমুদ্দিনের এটা ওটা চুরি করার অভ্যাস আছে
বলে ফৈজুদ্দিন জানে। একবার তারা রড় চুরি করে ধরাও পড়েছিলো।
কথাটা পারার সবাই জানে। একবার ফৈজুদ্দিনদের বাড়ীর একটি মুরগি চুরি করে ফজরুল তার নানীর বাড়ী নিয়ে গিয়েছিলো। কথাটা পরে
প্রকাশ পেয়েছিলো যদিও ফৈজুদ্দিন কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ছেলে মানুষ স্ফূৰ্তিবশত করেছে আর নিয়েও
দিয়েছে তার নানীর বাড়ী।
মানে ফৈজুদ্দিনের শশুড় বাড়ী।
ছোটবেলা তো অনেকেই হাঁস মুরগি চুরি বালিভাত খায়। এটা তত ধর্তব্যের
বিষয় নয়। কিন্তু এবার মুরগি নয়, আস্ত
ছাগল চুরি করেছে। তাই শাসন করা
প্রায়োজন। না হলে কবে গরু চুরি করে বসবে!
কিন্তু ফজরুলের মা প্রমাণ ছাড়া কথাটা বিশ্বাস করবে কি? ছেলের যে রকম বাখান করে আদুরি নেসা। আমাদের গেদা এ রকম, আমাদের ছেলে ও রকম। সহরের
বড় বড় লোকের সাথে গেদার চেনাজানা। সবাই আদর করে। ডেকে নিয়ে গিয়ে চা পরঠা
খাওয়ায়। আদর করে কখনও কখনও
টাকাপয়সাও দেয়। লেখাপড়ায় ভালো। সব সময় পড়া নিয়ে
ব্যস্ত থাকে। আদুরি নেসা এ রকম অনেক কিছু বলে বেড়ায় লোকের কাছে।
কেউ যদি
বলে, শুনি, ফজরুল
চুরিটুরি করে। কথাটা কতদূর সত্যি?
তখন
আদুরি নেসা বলে- ছেলে মানুষ। বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু
বড় হওয়ার সাথে সাথে আমটা, শসাটা
থেকে ছাগলে ধরেছে। কবে যেন শুনব, ফজরুল মহিষ, হাতী
চুরি করেছে!
এভাবে
ভাবতে ভাবতে ফৈজুদ্দিন ছাগলটা নিয়ে বাড়ীতে এসে বললেন- ছাগল পোষা ছাড়। যে রকম চোরের উপদ্রব বেড়েছে, শান্তিতে
কোনো জিনিস পোষতে পারবে না। আজ ভাগ্যগুণে পেয়েছ। সব সময়
যে পাবে এটা আশা করা যায় না।
এর পর থেকে হাকিমুদ্দিন এবং জরুলের ওপর ফৈজুদ্দিন নজর
রাখতে লাগলেন। বাড়ীতে ফজরুলের বিষয়ে কোন কথা বললেন না।
কোনোদিন হাতেনাতে ধরতে পারলে তখন দেখা যাবে। চোরের দশদিন
হলেও সাধুর একদিন হলেও তো আছে!
পাঁচ
ফৈজুদ্দিনকে
বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না।
ফৈজুদ্দিন
সেদিন সহরে যাচ্ছিলেন। তখন দিনের প্রায় বারটা। খুব রৌদ্রের প্রকোপ ছিল। সূর্যের উত্তাপ এত বেশি ছিলো, যেন পৃথিবীটাকে
ভস্ম করে ফেলবে। দুই চারজন পথচারীর বাহিরে রাস্তায় লোকজনের তেমন
চলাচল ছিল না । ফৈজুদ্দিন সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলেন। ঘামে তিনি নেয়ে উঠছিলেন। কাছে একটি বটবৃক্ষ ছিলো।
রৌদ্রের উত্তাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি বটবৃক্ষের নিচে বিশ্রাম
নিতে বসলেন।
বটবৃক্ষের
অনতিদূরে একটি ছোট শেওড়া গাছ ছিলো। তিনি লক্ষ্য করলেন গাছটির নিচে দু’টি ছেলে বসে রয়েছে। একজনের বয়স তের চৌদ্দ এবং অন্যজনের ষোল সতের।
তাদের নিকটে একটি
খাসি ছাগল। ছোট ছেলেটি খাসির দড়ি ধরে বসেছিলো। বড় ছেলেটি তাঁর দিকে তাকিয়ে ছোট
ছেলেটিকে কিছু একটা বলে সেখান থেকে হঠাৎ উঠে চলে
গেলো। তখন ছোট ছেলেটিও ফৈজুদ্দিনের
দিকে তাকিয়ে ছাগলের দড়ি ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগলো। ফৈজুদ্দিন ছেলেটিকে চিনতে পারলেন। ছেলেটি আর কেউ নয়, ফজরুল। তিনি বুঝতে পাড়লেন, নিশ্চয় ছেলে দু’টি খাসিটি চুরি করার মতলবে ছিলো।
ফজরুলকে
চলে যেতে দেখে ফৈজুদ্দিন উঁচু স্বরে ডাকলেন- ফজরুল, এখানে কি করছিলে ?
ফজরুল
কোনো উত্তর না দিয়ে পালাতে লাগলো। তখন ফৈজুদ্দিন তারাতারি পা চালিয়ে ফজরুলের দিকে যেতে লাগলেন এবং ধমকের সুরে বললেন- দাঁড়াও। পালাচ্ছ
কেন? তোমাকে আমি
চিনতে পেরেছি। এখন পালালেও রক্ষা পাবে না।
বাড়ী গিয়ে তোমাদের কুকাণ্ডের কথা আমি সবাইকে
বলে দিব। সালিশ বসলে তখন বুঝতে পারবে কত ধানে কত চাল।
সালিশের
কথা শুনে মনে হয় ফজরুল ভয় পেল। সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ফজরুলের
নিকটে এসে ফৈজুদ্দিন বললেন- এখন কটা বাজে? আজ স্কুলে যাওনি?
ফজরুল
কৈফিয়তের সুরে বললো- গিয়েছিলাম। স্কুল ছুটী হয়েছে।
এখন এই
বারটার সময় স্কুল ছুটী হয়েছে বললেই আমি বিশ্বাস করব ভেবেছ! সত্যি কথা বল। আজ স্কুলে যাওনি কেন?
গিয়েছিলাম
তো। স্কুল ছুটী হয়েছে।
আমি
কিন্তু সহরেই যাইতেছি। স্কুলে গিয়ে খবর করব স্কুল ছুটী হয়েছে কি না। যদি স্কুল
ছুটী না হয়ে থাকে তাহলে তোমার মা’র কাছে
বলে দিব তুমি স্কুলে না গিয়ে বকাটে ছেলের সাথে আড্ডা মারছিলে।
মা’র কথা শুনে ফজরুল কিছুটা ঘাবড়ালো। কারণ
বাড়ীতে তার মা'ই একমাত্র সাপোর্টার। নটখট করে
বলে তার বাবা তাকে দু’চোখে
দেখতে পারেন না। স্কুল ক্ষতি করার জন্য মা’র কাছেও যদি খারাপ হতে হয়, তাহলে সে
আশ্রয় পাবে কার কাছে! সে যতই খারাপ কাজ করুক না কেন, মা সব সময় তাকে সমর্থন করে। তাই মা'র কাছে খারাপ হওয়ার ভয়ে সে বললো- মা'র কাছে বলবেন না, খালু। মা আমাকে মারবে। আমি আর কোনদিন স্কুল
ক্ষতি করব না।
ফৈজুদ্দিন
বললেন- ঠিক আছে, বলব না। তোমার সাথে যে ছেলেটি ছিলো সে কে?
পশ্চিম
পারার হাকিমুদ্দিন।
কটাই
চোরের ছেলে না কি?
ফজরুল
সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো- হ্যাঁ।
তোমরা
এখানে কি করছিলে?
ফজরুল
নিরুত্তর।
কথা বলছ
না, কেন? ফৈজুদ্দিন
ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য বললেন- আমি তোমার খালু না? সত্যি কথা বল। আমি তোমার কোনও ক্ষতি হতে দিব না।
কিন্তু সত্যি কথা না বললে তোমার মা'র কাছে বলে দিব, যে তুমি
স্কুল ক্ষতি করে বখাটে ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে। বল, কি করছিলে? লোকের
খাসি চুরি করতে এসেছিলে?
ফজরুল
আবার নিরুত্তর।
বল, কি করছিলে? আমি কিন্তু
আজ সত্যি কথা বের করে ছাড়ব। খাসিটা কার?
জানি না।
তাহলে
তুমি।সির দড়ি ধরে বসে ছিলো কেন?
এভাবে
প্রশ্নের পর প্রশ্ন করার পর ফজরুল বললো- হাকিমুদ্দিন খাসি চুরি করতে চাইছিলো। আমি মানা করছিলাম।
হাকিমুদ্দিন
খাসি চুরি করলেও তুমি তার সাথে ছিলে, সেজন্য তুমিও সমান দোষী। ধরা
পড়লে হাকিমুদ্দিনের সাথে তোমাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যেত। এটা কি জান?
ফজরুল
মাথা নেড়ে বলল- জানি।
তাহলে এ
রকম কাজ করছিলে কেন? ফৈজুদ্দিন
এইবার আরও ঘনিষ্ট হয়ে বললেন-তুমি তো আমাদের আপন লোক। তোমার দুর্নাম
হলে আমাদেরও দুর্নাম। না কি বল?
হ্যাঁ।
ফজরুল সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো।
আচ্ছা
ফজরুল, আমাদের ছাগলটা কে চুরি করেছিলো? ফৈজুদ্দিন বললেন- আবার যেন বল না, তোমরা চুরি করনি। আমি কসাইর মুখে সব জেনেছি। তোমার দুর্নাম হবে বলে
আমি কাউকে বলিনি। আমি সব জানি, শুধু
তোমার মুখে শুনতে চাই। আচ্ছা ফজরুল, আমি জানি
তুমি আমাদের ছাগল চুরি করবে না। ছাগলটা আসলে হাকিমুদ্দিন
চুরি করেছিলো তাই না?
ফৈজুদ্দিন
ফজরুলকে ছাগল চুরি থেকে দায়মুক্ত করার জন্য ফজরুল খানিকটা প্রকৃতিস্থ হলো ৷ সে বললো- আমি চুরি করতে বারণ করেছিলাম। ও মানল না।
ও মানে
কে?
হাকিমুদ্দিন।
কীভাবে
চুরি করেছিলে?
ফজরুল বলে গেলো কীভাবে কখন
ছাগলটা চুরি করেছিলো। কত টাকা বিক্রী করেছিলো।কত টাকা সে পেয়েছিলো সব কথাই বলে
গেল।
ফৈজুদ্দিন
দেখলেন, ফজরুল ছেলে মানুষ। সংগ দোষে এসব কাজ করেছে। এর বিরুদ্ধে কড়া কোন
ব্যবস্থা নিলে বিগড়েও যেতে পারে। জল কখনও মুষ্ঠি মেরে ধরে পান করা যায় না, চইল পেতে ধরে পান করতে হয়। বেশি
শাসন করলে ছেলে মেয়েও বিগড়ে যায়। বুঝিয়েসুঝিয়ে বাগে আনতে হয়। এদিকে ওপড় মুখে থুতু ফেললে নিজের গায়েই পড়ে। তাই
ফৈজুদ্দিন ভাবলেন, একবারের জন্য দেখা যাক ফজরুল কি
করে ! এর পরেও যদি স্বভাব পরিবর্তন না হয়, তখন দেখা যাবে। মনে মনে এভাবে ভেবে ফৈজুদ্দিন বললেন- আজ আমি কাউকে এ কথা বলব
না। কিন্তু ভবিষ্যতে এ রকম কাজ কর না। আজ থেকে সাবধান হয়ে যাও। আবার কোনও জায়গায় ছাগল চুরি গেলে আমি তোমাদের কথাই
পুলিশকে বলে দিব। আর হ্যাঁ,
কোনওদিন যেন তোমাকে হাকিমুদ্দিনের সাথে না দেখি। হাকিমুদ্দিন একটা বখাটে ছেলে। লেখাপড়া
ছেড়ে দিয়ে চুরি ছ্যাঁচড়ামি করে ঘুরে বেড়ায়। ওর সাথে থাকলে
তুমিও একদিন ফেঁসে যাবে। তার সাথে কোনদিন মিশবে না। যদি হাকিমুদ্দিনের সাথে তোমাকে মিশতে দেখি
তাহলে আমি তোমার মা'র কাছে
বলে দিব, তুমি স্কুল ক্ষতি করে কি
কর। হাকিমুদ্দিন স্কুলে যায় নাকি?
ফজরুল
বললো- মাঝেমধ্যে যায়।
মাঝেমধ্যে
যায় মানে, না যাওয়ারই সামিল। ফৈজুদ্দিন বললেন- আমি যে
কথাগুলো বললাম তোমার মনে থাকবে তো, না এখান
থেকে যাওয়ার পরে সব ভুলে যাবে? আমার কথা
মতো চললে তোমারই ভালো হবে। আর যদি আমার কথাগুলো ভুলে যাও, তাহলে ক্ষতি আমার হবে না, ক্ষতি হবে তোমার। পুলিশের
পিটুনির কথা জান তো? একবার
পুলিশের হাতে পড়লে হাড়গোঁড় ভেঙ্গে দিবে। আজ
থেকে সাবধান হয়ে যাও।
এ ভাবে
অনেক ভয় ডর দেখিয়ে ফৈজুদ্দিন ফজরুলকে যেতে দিলেন।
ফজরুল
চলে যাওয়ার পর ফৈজুদ্দিন ভাবতে লাগলেন, হাকিমুদ্দিনকেও
শাসন করা দর্কার।কিন্তু শাসন করবে কীভাবে? হাকিমুদ্দিনের
বাবা কি তাঁর কথা বিশ্বাস করবে? মনে হয়
করবে না।কারণ হাকিমুদ্দিনের বাবার নাম কটাই মিয়া। কটাই মিয়ার স্বভাব ভালো নয়।
কটাই মিয়া এক সময় বিখ্যাত চোর ছিলো। দাগী চোর। তাই
অঞ্চলের সবাই তাকে কটাই চোর বলে জানে। কটাই চোর বললে সবাই তাকে চেনে। তাকে নিয়ে অঞ্চলটিতে দু'টি মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে।
প্রথম
গল্পটি হলো, একবার সে এক বাড়ীর দোতালায় চুরি করতে
উঠেছিলো। গৃহস্থ ঘোর নামাজী। তাহাজ্জুদের নামাজ কোনোদিন কাজা করেন
না। কটাই চোর দোতালায় থাকা অবস্থায়ই গৃহস্ত জাগ্রত হয়ে নামাজ পড়া
শুরু করেছিলেন। তাই কটাই চোর দোতালা থেকে বেরোতে পারছিলো
না। সেদিন সারাদিন দোতালায় একটি কেতার পুঁটলির আড়ালে লুকিয়ে ছিলো। পরের দিন রাতে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলো।
দ্বিতীয়
গল্পটি হলো, কটাই চোরের দলে কয়েকজন চোর ছিলো। কটাই ছিলো
দলের সর্দার।কোনো জায়গায় চুরি
করলে তাকে দ্বিগুণ ভাগ দিতে হতো। তার দলেরই একজন একদিন বললো-চুরি করি আমরা সবাই কষ্ট
করে। বোঝাও বেশি টানি আমরা। কটাই মিয়াকে দুই ভাগ
দিতে হবে কেন? আজ থেকে আমরা যা নিব তাকেও তাই
দিব। ভাগ বরাবর হবে।
কটাই চোর
বললো- ঠিক আছে। তাই দিও। তবে আজ থেকে তোমাদের দায়িত্বে তোমরা চুরি করবে, আমি
কিন্তু দলের দায়িত্ব নিব না। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে বা মারা গেলে আমার কোনো দায় দায়িত্ব থাকবে না।
ঠিক আছে।
কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে না। সেই চোরটি বললো।
এভাবে
রফা হওয়ার পর তারা এক জায়গায় চুরি করতে গেলো। সিঁদ কাটাও হলো। যখন সিঁদ দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকতে যাবে, তখন কটাই চোর তাকে টেনে ধরে
ফিসফিস করে বললো- আমার মনে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, কোনো অঘটন ঘটবে বলে। যাও, একটি ছোট মতো কলাগাছ
কেটে নিয়ে এস। তার কথামতো একজন একটি ছোট কলাগাছ কেটে নিয়ে এলো। তখন কটাই চোর ইঙ্গিতে সেই কলাগাছটি সিঁদের ভেতর ঢুকাতে বললো। তার
নির্দেশ মতোই কলাগাছটি সিঁদের ভেতর ঢুকিয়ে দিলো। সাথে সাথে গৃহস্ত
ঘরের ভেতর থেকে একটি বল্লম দিয়ে কলাগাছটি গেঁথে ফেললো।
সাথে
সাথে চোরেরা দৌড়ে পালালো। রাস্তায় আসার সময় কটাই চোর বললো- আমি কেন দুই ভাগ নিই, আজ বুঝতে
পারলে তো ?
তখন সেই
চোরটি বললো- হ্যাঁ, ওস্তাদ।
আজ থেকে আপনাকে আমি ওস্তাদ মানলাম।
চুরির
ক্ষেত্রে এমনি পার্গত ছিলো কটাই চোর। তবে সে এখন অবশ্যে চুরি করে না। মানে, চুরি করার বয়স নেই। তাই পাঞ্জাবী পড়ে টুপী
মাথায় দিয়ে মসজিদে ঢুকেছে। কারণ মসজিদে ঢুকলে আগে যতই
চুরি ডাকাতি করুক না কেন সব দোষ ঢাকা পড়ে যায়। ভালো মানুষ বলে লোকে সার্টিফিকেট দেয়। কটাই চোরের ক্ষেত্রেও এখন তাই হয়েছে। তবে শুনা
যায়, কটাই চোর এখন মাংস না
খেলেও মাংসের জোল খায়। অর্থাৎ চুরি না করলেও চোরের থৈলতদারি করে। তাই
তার কাছে ছেলের চুরির কথা বললে
সে বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না!
ফৈজুদ্দিনের
গোপাল ভাঁড়ের একটা গল্প মনে পড়ল। গল্পটা এ রকম-
আঠার শ শতকে
নদীয়ায় কৃষ্ণচন্দ্র নামক একজন রাজা ছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার নবরত্নের মধ্যে গোপাল ভাঁড় অন্যতম ছিলেন। গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে অনেক
মজার মজার গল্প রয়েছে।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্ত্রী
একবার হরিসত্তরের মেলায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছিলেন। হরিসত্তের মেলা হলো, গরীব
কৃষক প্রজাদের মেলা। সেখানে রাণী গেলে কথাটা অশোভন হবে বলে রাজা রাণীকে মেলায় না যাওয়ার জন্য বারণ করছিলেন। কিন্তু রাজা কোনোমতে রাণীকে বুঝাতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। তাই রাজা গোপাল ভাঁড়ের
শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবলেন। মেলার আগের দিন রাজা
গোপাল ভাঁড়কে ডেকে এনে বললেন- গোপাল, রাণী
হরিসত্তেরের মেলায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছে। হরিসত্তরের মেলা হলো
গরীব কৃষক প্রজাদের মেলা। সেখানে রাণী গেলে লোকে কি বলবে? আমি অনেক বুঝিয়েছি মেলায় না যাওয়ার জন্য।
কিন্তু রাণী আমার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তুমি কোন বুদ্ধি
বের করে রাণীকে মেলায় যাওয়া থেকে বিরত করো। যদি রাণীকে মেলায়
যাওয়া থেকে বিরত করতে পার, তাহলে তোমাকে আমি পুরস্কৃত করব।
গোপাল
ভাঁড় বললেন- মহারাজ আপনি চিন্তা করবেন না। রাণী মেলায় যাবেন না। রাজাকে এভাবে আশ্বাস দিয়ে গোপাল ভাঁড় রাণীর নিকটে এসে বললেন- রাণী
মা, আপনি বোলে মেলায় যাবেন। আপনাকে
মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মহারাজ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। কাল
সকালে এসে আমি আপনাকে মেলায় নিয়ে যাব। আপনি প্রস্তুত হয়ে থাকবেন।
কথাটা
শুনে রাণী খুশি হয়ে বললেন- তুমি সময় মতো এসো। আমি প্রস্তুত হয়ে থাকব। তুমি চিন্তা কর না।
পরের দিন
সকাল বেলা গোপাল ভাঁড় কোমরের চারদিকে খেজুরের কাঁটা ঝুলিয়ে বেঁধে এসে রাণীকে বললেন- রাণী মা। চলেন।
রাণী
বললেন- হ্যাঁ চল। আমি প্রস্তুত হয়েই আছি।
হ্যাঁ
চলুন।
রাণী
গোপাল ভাঁড়ের কোমরে খেজুর কাঁটা ঝুলানো দেখে বললেন- গোপাল, তুমি একি মূর্তি ধরে এসেছ? তোমার কোমরে খেজুর কাঁটা বাঁধা কেন?
গোপাল
ভাঁড় বললেন- কেন রাণী মা, আপনি
খেজুরের কাঁটা বাঁধেন নি। হরিসত্তেরের মেলা গরীব কৃষকদের মেলা। সেখানে ভালো
লোকের সাথে অনেক বদমাশ লোকও আসে। খেজুরের কাঁটা না বেঁধে গেলে মাজা নিয়ে
আসা সম্ভব হবে না। রাণী মা, আমার মতো
আপনিও খেজুর কাঁটা বেঁধে নিন।
খেজুর
কাঁটা বাঁধার কথা শুনে রাণী মা ভয় পেয়ে বললেন- না গোপাল, এ রকমই যদি হয়, তাহলে আমি মেলায় যাব না।
রাণীকে
এভাবে মেলায় যাওয়া থেকে বিরত করে গোপাল ভাঁড় পুরস্কার নিয়ে বাড়ী ফিরলেন।
ফৈজুদ্দিন
ভাবলেন, গোপাল ভাঁড়ের মতো খেজুরের কাঁটা বেঁধে
নিজেরা আগে সাবধান হয়ে নিই। মানে ফজরুলকে শাসন করে নিই,পরে অন্যের কথা ভাবা যাবে।
এভাবে ভেবে ফৈজুদ্দিন সেদিনর মতো সহরে চলে গেলেন।
ছয়
প্রত্যেক বছর পৌষ মাসের সংক্রান্তির
দিন সুন্দরপুরে মেলা বসে। মেলা খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় ভাষায় এই অনুষ্ঠানকে পুযূরা বলে। মেলা পাঁচ দিন
ব্যাপী চলে। মেলায় ষাড় লড়াই, ঘোড়া দৌড়, লাকড়ী বাড়ীর সাথে
সাথে নাগর দোলা, সার্কাস, ম্যাজিক,
ব্রেক ড্যান্স প্রভৃতি বিনোদনমূলক খেলা অনুষ্ঠিত
হয়। মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো শহিদ কারবালা যাত্রানুষ্ঠান।
ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতীরা যায় মেলার বিভিন্ন আকর্ষণীয়
অনুষ্ঠান দেখার জন্য আর বৃদ্ধরাঁ যায় শহিদ কারবালা যাত্রা পালা উপভোগ
করার জন্য। এই মেলা প্রায় শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
মেলার
সময় অঞ্চলটিতে উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাইরেও মেলায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক এসে ভির করে।
মেলার
প্রায় এক মাস আগে থেকেই ছেলেমেয়েদের প্রস্তুতি শুরু হয়। মানে পয়সা সংগ্রহ শুরু হয়। কে মেলায় গিয়ে কিনবে, কি কি
দেখবে এ নিয়ে শুরু হয় জল্পনাকল্পনা।
আসামে
বছরে তিনটি বিহু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বহাগ বিহু, কাতি বিহু এবং মাঘ বিহু। অসমীয়ার আয়ুস
রেখা স্বরূপ এই তিনটি বিহুর সময়ে সরকারী বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পুযূরা মাঘ বিহুর সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য স্কুল কলেজ, অফিস আদালত বন্ধ থাকে। ফলে ফজরুল এবং নজরুল প্রত্যেক বছর মেলার কয়দিন খুব স্ফূর্তি করে কাটায়। তার মা'র কাছে তারা খুব একটা পয়সা
দাবি করে না। ফজরুল হাকিমুদ্দিনের সাথে মিলে এটা ওটা হাত সাফাই করে এবং নজরুল নারকেল সুপারি পেড়ে পয়সা সংগ্রহ করে।
এই বছর
ফজরুলের হাতে পয়সা নেই। কারণ খাসি চুরির ঘটনার পর থেকে ফৈজুদ্দিনের শাসনের ফলে সে হাত সাফাই, চুরি
চামারি করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই সে আদুরি নেসার শরণাপন্ন
হলো টাকার জন্য- মা, টাকা দাও, মেলা দেখতে যাব।
আদুরি
নেসা জানে মেলা এসেছে, তাই কমবেশি
পয়সা দিতেই হবে। প্রত্যেক বছর একশ টাকা করেই দেয়। তাই আদুরি নেসা
বাক্যব্যয় না করে শাড়ির আঁচলের গাঁট থেকে একশ টাকার একটি নোট বের করে ফজরুলের হাতে দিলো।
একশ টাকা
দেখে ফজরুলের মন উঠল না। সে বললো- মোটে একশ টাকা? একশ টাকা দিয়ে কি করব? একশ টাকা আমার চা জল খরচই তো হবে না। ভেবেছি
এইবার মেলায় একটা রাইফল কিনব। একটা রাইফলের দামই তো দুশ টাকা। দোলায়
উঠব, সাকার্স, ম্যাজিক, ব্রেক
ড্যান্স দেখব। এ সবের জন্য তো কমপক্ষে পাঁচশ টাকা লাগবে।
নাগর
দোলায় উঠবি, ম্যাজিক দেখবি সেটা তো বুঝলাম। রাইফল দিয়ে
কি করবি? আজ কিনে আনবি, কালই তো নষ্ট হয়ে যাবে। এ সব বেহুদা পয়সা খরচ করে কি লাভ?
স্ফূর্তি
করব। ফজরুল বললো।
স্ফূর্তি
করার জন্য আমার কাছে টাকা নেই। প্রত্যেক বছর তো একশ টাকা করেই দিই। আদুরি নেসা বললো- এবছরও একশ টাকাই তো দিয়েছি।
এই কয়
বছর তো আমি এটা ওটা কাজ করে পয়সা জমা করেছি। এইবার আমি এক টাকাও
জমাতে পারিনি।
জমা
করলেই পারতিস। কে তোকে পয়সা জমা করার জন্য মানা করেছিলো?
সুপারি, নারকেল পেড়েই তো আগে পয়সা জমা করেছি। এসব
করলে তুমিই তো আবার বকাবকি কর।
করবই তো।
স্কুল ক্ষতি করলে কে বকাবকি না করবে? আচ্ছা, বল তো মেলায় গেলে কি হয় ? কিছুই না। সারাদিন ঘুরে এটা ওটা দেখে বেড়াবি। বিকেল বেলা মুখ কালো
করে বাড়ী ফিরবি। মাঝখান থেকে কতেকটি টাকা পকেট থেকে চলে যাবে।
মেলার জন্য আমাদের অঞ্চলের কত টাকা লোকসান হয়, কখনও ভেবে দেখেছিস? অনেক টাকা আমাদের অঞ্চল থেকে অন্যত্র চলে যায়। আর মেলা দেখলে কি পেট ভরবে?
পেট ভরার
জন্যই কি লোকে সব কাজ করে? আমোদ
স্ফূর্তিরও তো কথা আছে। বছরের তিন চারটা দিন লোকে হইহুল্লোড় করে
কাটায়। অনেক লোকে এই মেলার কামাইই সারা বছর খায়।
অনেকের
আবার সব জমা পূঞ্জি শেষ হয়ে যায়। আদুরি নেসা বললো- আমার কাজ আছে। তোর সাথে অযথা তর্ক করতে পারব না। একশ টাকা দিয়েছি, নিলে নে, আর না হলে মেলায় যাওয়া
বাদ দে। বই নিয়ে বস।
ঠিক আছে।
টাকা দিলে না তো। মনে রেখ। এভাবে বলেই ফজরুল একশ টাকা নিয়েই মেলায় চলে গেলো।
নজরুল
সন্ধ্যার পড়েই মেলা থেকে বাড়ী ফিরে এলো। আদুরি নেসা তাকে জিজ্ঞাসা করলো- কিরে, তুই একা
বাড়ী এলি যে! ফজরুল কোথায়?
আদুরি
নেসা নজরুলকেও একশ টাকাই দিয়েছিলো। সেই একশ টাকা এবং তার কাছে সুপারি নারকেল পাড়া জমানো কিছু টাকা ছিলো। সেই টকা দিয়ে সে বেলুন কিনে
মেলায় ঘুরে ঘুরে বিক্রী করেছে। তাই সে বললো- আমি কি জানি? আমি তো বেলুন বিক্রী নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম।
বেলুন
বিক্রী নিয়ে ব্যস্ত ছিলি মানে? আদুরি
নেসা অবাক চোখে নজরুলের দিকে তাকিয়ে বললো- বেলুন কোথায় পেলি?
টাকা
দিয়ে কিনেছি। নজরুল বললো- তুমি একশ টাকা দিয়েছিলে। আর আমার কাছেও কিছু জমানো টাকা ছিলো। সেই টাকা দিয়ে বেলুন কিনেছিলাম। বেলুন বিক্রী করে
আমার পঞ্চাশ টাকা লাভ হয়েছে। কাল আবার বেলুন কিনে বিক্রী করব। আরে বলিস কি তুই? আদুরি
নেসা হাসি হাসি মুখে বললো- এখনই ব্যবসা করা শিখে গেছিস?
শিখেছি
তো। সামনের বছর আরও বেশি করে বেলুন কিনব। তখন অনেক টাকা লাভ হবে।
যা
করেছিস, করেছিস। আবার মেলায় যা। ফজরুলকে খোঁজে নিয়ে
আয়।
খুব
ক্ষিদে পেয়েছে। ভাত দাও। ভাত খেয়ে যাত্রা দেখতে যাব।
ফজরুল
যাত্রা দেখবে না?
মনে হয়, দেখবে। যার জন্য মনে হয় আসেনি।
ওর খেতে
হবে না। আদুরি নেসা বললো- বাড়ীতে এসে খেয়ে গিয়েই তো যাত্রা দেখতে পারতো। যাত্রা শুরু হবে সেই রাত দশটা থেকে।
নজরুল
বললো- ভাত দাও তো তারাতারি।
আয় ভাত
বেড়ে দিচ্ছি। ভাত খেয়ে গিয়ে ফজরুলকে খোঁজে বাড়ী পাঠিয়ে দিবি।
আদুরি নেসা নজরুলকে ভাত বেড়ে
দিলো। ভাত খেয়ে নজরুল মেলায় চলে গেলো। সে যাত্রা দেখে
প্রভাতে বাড়ী ফিরে এলো।
নজরুলের
আসার শব্দ পেয়ে আদুরি নেসা বিছানায় শোয়ে শোয়েই বললো- কিরে ফজরুল এসেছে?
নজরুল
বললো- না আসেনি। ওর সাথে আমার দেখাই হয়নি।
কেন, ফজরুল যাত্রা দেখেনি? আদুরি নেসা বিছানায় উঠে বসে বললো।
আমি বলব
কেমন করে? ভাইর সাথে আমার দেখাই হয়নি।
কি বলিস? ফজরুলের সাথে দেখা হয়নি মানে? ও কি যাত্রা দেখেনি?
দেখেছে হয়তো। শত শত লোক যাত্রা দেখছে। কে কোথায় বসে যাত্রা দেখছে আমি কি
করে বলব, বল ?
আরে ফজরুল তোর ভাই না? তুই তার খোঁজ নিবি না?
খুঁজেছি তো। পাইনি। এত লোকের
মাঝে কি মানুষ খোঁজে পাওয়া যায়। এখন দিগদারি করো না তো।
আমি এখন ঘুমাব।
ছলিমুদ্দিন
ধমক দিয়ে বললেন- এখন চুপ থাক তো। যাত্রা দেখে হয়তো প্যাণ্ডেলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু বেলা হলে নিশ্চয় চলে আসবে। চিন্তা কর না। বেলা উঠতে
এখনও অনেক দেরি। তুমিও ঘুমিয়ে পড়। আজ আবার ঢালাইর কাজ আছে।
সকাল সকালই কাজে যেতে হবে।
নজরুল
ঘুমিয়ে পড়ল। আদুরি নেসা ফজরুলের পথ চেয়ে বসে রইলো। কিন্তু ফজরুল বাড়ী এল না।
সকাল
বেলা আদুরি নেসা উকিল সাহেবের বাড়ী গেলো।
আদুরি
নেসাকে দেখে উকিল সাহেব বললেন- খালা, এই সাত
সকালে? কি মনে করে?
ফজরুল
কাল মেলা দেখতে গেছে। আদুরি নেসা চিন্তিত কণ্ঠে বললো- এখনও বাড়ী আসেনি।
তাহলে তো
চিন্তারই কথা। উকিল সাহেব বললেন-তবে চিন্তা করবেন না। যাবে আর কোথায় ?
কোথাও
ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। ঘুম ভাঙলে নিশ্চয় বাড়ী ফিরে আসবে।
আপনিও তো
মেলায় গিয়েছিলেন? ফজরুলের সাথে আপনার
দেখা হয়েছিলো?
হয়েছিল
তো। ফজরুলই তো আমাদের বাবুকে নাগর দোলায় তুলে ঘূরিয়েছে। বাবু নাগর দোলায় উঠবে। আমি কেমন করে নাগর দোলায় উঠি বলুন! লোকে
কি বলবে? তাই ফজরুলকে খোঁজে
তার সাথে নাগর দোলায় তুলে দিয়েছিলাম। ফজরুল ছোট মতো একটা পিস্তুলও কিনে দিয়েছে আমাদের বাবুকে।
উকিল
সাহেবের বাড়ী নিকটেই। ডেকে কথা বলা যায়। ফৈজুদ্দিন এবং আদুরি নেসার আজ ঢালাইর কাজ আছে। ঢালাইর কাজ থাকলে সেদিন কাজে না গেলে চলে না। সেদিন
একটু সকাল সকালই যেতে হয়। আদুরি নেসাকে না দেখে ফৈজুদ্দিন ডেকে বললেন- কই গো, কোথায় গেলে? আজ ঢালাইর কাজ আছে না। সকাল সকালই বেড়োতে
হবে।
আদুরি
নেসার কাজে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো না। ফজরুলকে খুঁজতে যাওয়ার কথা ভাবছিলো। কিন্তু ঢালাইর কাজ। তাই না
গেলেও হয় না। তাই সকালে খেয়ে ধেয়ে আদুরি নেসা ফৈজুদ্দিনের সাথে কাজে গেলো। যাওয়ার সময় আদুরি নেসা নজরুলকে
ডেকে বলে গেলো- ঘুম থেকে উঠার পর ফজরুল যদি না আসে তাহলে তাকে
খোঁজতে যাবি। ভাত বেড়ে রেখেছি। ফজরুল এলে খেতে দিস।
কিন্তু
ফজরুল বাড়ী এল না। নজরুল মেলায় গিয়ে খুঁজেও ফজরুলকে পেল না। সন্ধ্যেয় আদুরি নেসা বাড়ী এসে দেখলো, নজরুল
মেলায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আদুরি নেসা জিজ্ঞাসা করলো- কিরে ফজরুল
বাড়ী আসেনি ?
নজরুল বললো- না, আমি
মেলায় গিয়েও খুঁজেছি সেখানেও ভাইকে পাইনি।
কথাটা শুনে আদুরি নেসার মাথায় যেন আকাশ
ভেঙ্গে পড়লো। সে থ মেরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললো- খুঁজে পাসনি মানে? কি হলো ফজরুলের? আমার মনে হয় তুই ভালো করে খুঁজিসই নি?
নজরুল বললো- ভালো করেই খুঁজেছি। তবে কেউ ভাইর কথা বলতে পারল না। আমি কি করব?
আদুরি নেসা পাগলের মতো হয়ে গেলো। সে
ছলিমুদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বললো- হ্যাঁ গো শুনছ? ফজরুলকে বোলে মেলায় খুঁজে পায়নি। ও যা বলে
গেছে, তাই করলো শেষে!
ছলিমুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন- কি বলে গেছে?
আমার কাছে পাঁচশ টাকা চেয়েছিলো। আদুরি নেসা
বললো- আমি একশ টাকা দিয়েছি। তাই যাওয়ার সময় বলে গেছে. টাকা
দিলে নাতো, কথাটা মনে রেখ। আমি তখন কথাটায় গুরুত্ব দিইনি। শেষমেষ ও যা বলে গেছে তাই করলো। আমি আগে জানলে কি আর টাকা না
দিয়ে থাকি? আমার
কপাল! কেন আমি ওর কথার ইঙ্গিত বুঝতে পাড়লাম না ! এভাবে বলেই আদুরি নেসা কপাল চাপড়াতে লাগলো।
ছলিমুদ্দিন ফজরুলকে নিয়ে তেমন মাথা
ঘামায়নি। ডানপিটে ছেলে। নিশ্চয় কোথাও আছে। যখন শুনল, যাওয়ার সময় রাগ করে গেছে এবং নজরুলও তাকে
খুঁজে পায়নি, তখন তিনিও চিন্তিত
হয়ে পড়লেন। কোথায় যেতে পারে ছেলেটা? এভাবে
নানান কথা ভেবে ভেবে তিনি গোসল শেষ করে এসে
নজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কোথায় কোথায় খুঁজেছিস?
নজরুল বললো- সব জায়গায়ই খুঁজেছি। কোথাও বাকী রাখেনি।
ছলিমুদ্দিন পাঞ্জাবীটা গায়ে চাপিয়ে
বললেন-নজরুল চলতো মেলায়। দেখি ফজরুলের সন্ধান পাই কিনা?
নজরুলকে নিয়ে ছলিমুদ্দিন মেলায় এলো।
সাম্ভাব্য সব জায়গায় তালাশ করার পর একটি চায়ের দোকানে এসে ফজরুলের কথা
জিজ্ঞাসা করলো। তখন একটি ছেলে বললো- কাল রাতে আমি
ফজরুলকে সার্কাস-এর ওখানে দেখেছি। ও জোকার সেজে জোকারদের
সাথে ঢং করছিলো। মনে হয় ও সার্কাসের দলের
সাথেই আছে। আমি ওকে একবার নাম ধরে ডেকেও ছিলাম। আমার ডাক
শুনেও ছিলো। তবে, কোনো উত্তর দেয়নি। আমার দিকে তাকিয়েই চলে
গিয়েছিলো।
ছলিমুদ্দিন বললো- নজরুল চল তো। সার্কাসের
ওখানে গিয়ে দেখি।
চায়ের দোকানী বললো- সার্কাসের প্যাণ্ডেলের
ওখানে গিয়ে লাভ হবে না। প্যাণ্ডেলটা আছে ঠিকই। তবে, সার্কাসের দল আজ সন্ধ্যায় অন্যত্র চলে
গিয়েছে। ওদের দু’টি তাঁবু
থাকে। একটি তাঁবুতে সাকাস দেখায় এবং অন্য তাঁবুটি অন্য জায়গায় রেডি করে
রাখে।
ফৈজুদ্দিন জিজ্ঞাসা কলেন-কোথায় গেছে সার্কাসের দল?
চায়ের দোকানী বললো-তা তো জানি না। তবে উজানের দিকে কোথাও
গিয়েছে। এখন শুধু প্যাণ্ডেল রয়েছে। লোকজন কেউ নেই?
ছলিমুদ্দিন চোখে সরর্ষের ফুল দেখতে লাগলেন।
কি করে এখন সে?
একজন পরামর্শ দিলো- মেলা কমিটির নিকট গিয়ে
জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। তারা অবশ্যেই বলতে পারবে সার্কাসের
দল কোথায় গেছে।
কমিটির কাছে গিয়ে খবর করে জানতে পাড়লেন
সার্কাস-এর দল গুয়াহাটীর নিকটে এক জায়গায় গেছে। আজ রাতে সেখানেই সার্কাস দেখাবে।
কমিটির সভাপতি বললেন- সেখানে গেলে সন্ধান
পেতে পারেন। সার্কাসের ম্যানেজার লোকটা ভালো। তাই কোনো অসুবিধা নেই। গেলেই আপনার ছেলেকে নিয়ে আসতে
পাড়বেন। চিন্তা করবেন না। ছেলের কোনো ক্ষতি হবে
না। দর্কার হলে আমি একটি চিঠি লিখে দিব। চিঠিটা দিলেই
আপনার ছেলেকে আসতে দিবে।
সভাপতির কাছ থেকে চিঠি নিয়ে ছলিমুদ্দিন
বাড়ী চলে এলেন। সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিলো। তাই পরের দিন সকালে গুয়াহাটী যাওয়ার
সিদ্ধান্ত নিয়ে না
ঘুমিয়েই রাত কাটিয়ে দিলেন।
সকালে আদুরি নেসা বললো- আপনি একা একা যাবেন
নাকি? উকিল ব্যাটাকে বলে দেখেন। তিনি যদি সাথে যায় ভালো হবে।
ছলিমুদ্দিন উকিল সাহেবের কাছে এসে গুয়াহাটী
যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে বললেন-জামাই, আপনি চলুন আমার সাথে। আমি মুখ্যু মানুষ, কাকে কি বলবো। আবার হিতে বিপরীতও হতে পারে।
উকিল সাহেব বললেন- ঠিক আছে। আপনার বিপদ মানে
আমারও তো বিপদ। তবে, একটু দেরি করতে হবে। আমার আজ দু’টা কেসের
হাজিরা আছে। আমি আমার পরিবর্তে একজন উকিল ঠিক করে যেতে হবে। না হলে
অসুবিধা হবে। আর এত সকালে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। ভাতপানী
খেয়ে তবে চলুন।
গুয়াহাটী যাওয়ার প্রয়োজন হল না। সকাল ন'টা নাগাদ ফজরুল বাড়ী ফিরে এলো।
তার পেছনে পেছনে সার্কাসের দলের ম্যানেজারও চলে এলেন।
ফজরুল সার্কাসের দলের সাথে যাওয়াটা সত্যি। তবে সে সকালে দু’টো মোবাইল চুরি করে নিয়ে
এসেছে। তাই ম্যানেজার তার পেছনে পেছনে ধাওয়া করে এসেছে।
মোবাইল চুরি সম্পর্কে ফজরুল বললো-আমি দুইদিন সার্কাসের দলে জোকারি
করেছি। আমাকে একটা টাকাও দেয়নি। তাই মোবাইল চুরি করে এনেছি।
ম্যানেজার বললেন- আসলে এভাবে কেউ জোকারি করলে আমরা স্বাভাবিকত কোনো
টাকা পয়সা দিইনা। খাওয়াদাওয়া এবং শুধু হাত খরচটা দিই। ও আমাদের কাছে
কোনো টাকা দাবি করেও নি। তাই হয়তো দেওয়া হয়নি। এভাবে বলেই
ম্যানেজার ফজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- তা তুমি কত টাকা পাবে?
দুইদিনে দু’শ টাকা
দিতে হবে।
ম্যানেজার পকেট থেকে একশ টাকার দু’টি নোট বের করে ফজরুলের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন- ঠিক আছে। ধরো, তোমার
দুশ টাকা নাও আর মোবাইল দু’টি
ফিরিয়ে দাও।
ফজরুল টাকা নিয়ে মোবাইল ফেরত দিলো।
ছলিমুদ্দিন বললেন- আমি খুবই লজ্জিত এভাবে
মোবাইল চুরি করে আনার জন্য।
আদুরি নেসা বললো- এটাকে চুরি বলছ কেন? টাকা দেয়নি তাই এনেছে।
ছলিমুদ্দিন ধমকের সুরে বললেন- আরে এর মধ্যে তুমি আবার কথা বলছ কেন? এটা চুরি নয়তো কি? লোকের জিনিস না বলে আনা মানেই চুরি।
ছলিমুদ্দিন ম্যানেজারের হাতে ধরে অনুরোধের সুরে বললেন- আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আমার ছেলের হয়ে
আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।
ম্যানেজার বললেন- আরে না না, ক্ষমা
চাইতে হবে না। ফজরুল ছেলে হিসাবে মন্দ না। তবে একটু
ডানপিটে স্বভাবের। ডানপিটে ছেলেগুলো একটু অন্য রকম স্বভাবের হয়। ওর দিকে নজর রাখবেন। হাতের বাইরে যেতে দিবেন না। মোবাইলের বিষয়টাকে আমি তেমন
গুরুত্বসহকারে নিইনি। ছেলে মানুষ বুঝতে পারেনি। তাই এ কাজ
করেছে।
ছলিমুদ্দিন ধমকের সুরে ফজরুলকে উদ্দেশ্য করে
বললেন- যা, ম্যানেজার সাহেবের পা ধরে ক্ষমা চোয়ে নে।
ফজরুল ম্যানেজারের পা ধরে বললো- আমাকে মাফ
করে দিন।
ম্যানেজার বললেন- যাও, মাফ করেছি। এ রকম কাজ আর কর না। ছোট হোক বড় জিনিস হোক কোনোদিন কিছু চুরি কবে না।চুরি করা মহাপাপ। এ কথা সব সময়
মনে রাখবে। যাও, তোমার বাবা মায়ের কাছেও ক্ষমা চাও। তোমার ডানপিটে স্বভাবের কাজের
জন্য বাবা মা-ও অনেক মানসিক কষ্ট পেয়েছে। বাবা মা’র মনে কোনোদিন কষ্ট দিও না। বাব মা’র মনে কষ্ট দিলে জীবনে
কখনও সুখী হতে পারবে না।
ফজরুল ছলিমুদ্দিন ও আদুরি নেসার পা ধরে ক্ষমা
চেয়ে নিল এবং এভাবেই দু’দিনের
শ্বাসরুদ্ধকর নাটকের
যবনিকা পড়লো।
সাত
প্রায় দু’মাস যাবত ছলিমুদ্দিনের জ্বর। গলার কাছে টনসিলের মতো ফুলে উঠেছে।
কাশও আছে। গলায় শ্লেষ্মা জমা হলেই কাশ উঠে। তখন খুবই কষ্ট হয়। এক
নাগারে কাশতে থাকে।
ডাক্তার দেখায় নি। ডাক্তার না দেখিয়েই
ফামার্সি থেকে ওষুধ এনে খাচ্ছে। টেবলেট খেলেই জ্বর কমে যায়। অভাবের সংসার,কাজ না
করলে চলে না। তাই কোন কোন দিন জ্বর নিয়েও কাজে যায়।
এভাবেই তিন মাস চলছে জ্বর এবং কাশ নিয়ে। আগে জ্বরের প্রকোপ কম ছিলো। সপ্তাহ পনের দিনে জ্বর আসত এবং টেবলেট খেলে জ্বর কমে
যেত। এখন জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে।মাঝে মধ্যেই জ্বর উঠে। তাই অনেক সময় কাজে যেতে পারেন না। সেদিন জ্বর উঠার জন্য বিছানায়
শোয়ে ছিলেন। উকিল সাহেব
সকাল বেলা এলেন ছলিমুদ্দিনের খোঁজ নিতে। অবশ্যে জ্বরের খোঁজ নিতে নয়।উকিল সাহেবের বাড়ীতে একটু কাজের দর্কার হয়েছে।
বাড়ীর চারপাশ জঙ্গলে ভরে গেছে। যদি ছলিমুদ্দিন জঙ্গলগুলো সাফ করতে পারে! তাই খোঁজ নিতে
এসেছেন, ছলিমুদ্দিন কাজ করতে পারবেন কি না।
উকিল সাহেব ডাকলেন- খালু বাড়ী আছেন ? খালু......
ছলিমুদ্দিন ঘরের ভেতর থেকে বললেন- জামাই নাকি? আছি। আসেন। ভেতরে আসেন। উকিল সাহেব ঘরের ভেতরে এলেন।ছলিমুদ্দিন
বিছানায় উঠে বসে বললেন- বসেন। আজ কোর্টে যাবেন না?
না, আজ কোর্ট
বন্ধ। উকিল সাহেব চেয়ারে বসে বললেন। তা কি মনে করে?
বাড়ীর চারপাশ জঙ্গলে ভরে গেছে। তাই ভাবছি, জঙ্গলগুলো সাফ করে দিই। খুবই মশা মাছির প্রকোপ বেড়েছে। জঙ্গল সাফ করলে মনে হয়, মশা মাছির প্রকোপ কিছুটা হলেও কমবে।
তা তো
বটেই! ঝোপ জঙ্গলের মাঝেই তো ওরা বাস করে।
খালু, কাজ করতে
পারবেন? মানে জঙ্গলগুলো সাফ করতে পারবেন? আমার তো কয়েকদিন যাবত জ্বর। প্রায় দু’মাস যাবত জ্বরে ভুগছি। পরশু থেকে জ্বরের
প্রকোপ বেড়েছে।তাই বিছানায় শোয়ে রয়েছি।
ডাক্তার
দেখান নি?
না, দেখাই
নি। ফার্মাসি থেকে
ওষুধ এনে খাচ্ছি।
ডাক্তার দেখান। উকিল সাহেব উপদেশের স্বরে
বললেন- আজকাল ছোট রোগ থেকেই বড় রোগ হয়। আপনারই মতো আমাদের একজন উকিলেরও টনসিল হয়েছিলো। পরীক্ষা
করার পর তাঁর কেন্সার ধরা পড়েছিলো। চেন্নাই, মুম্বাই গিয়ে চিকিৎসা করার পরও তিনি একমাস
আগে মারা গেছেন। আজকাল সারের জিনিস খেয়ে মানুষের
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। তাই ছোটখাট রোগও অনেক সময় প্রবল
হয়ে দেখা দেয়। আজই ডাক্তারের কাছে যান। আমার চেনাজানা ডাক্তার
আছে। আমি তাঁকে ফোন করে বলে দিব।
কিন্তু! ছলিমুদ্দিন আমতা আমতা করতে লাগলেন।
উকিল সাহেব আমতা আমতার কারণ কিছু হলেও অনুমান
করতে পারলেন। হয়তো বা টাকা নেই।
তারজন্য আমতা আমতা করছেন। তাই তিনি বললেন- টাকা নেই না কি? টাকা আমি দিব। তবুও ডাক্তারের কাছে যান। পরীক্ষা করতে বললে
পরীক্ষা করান।
ছলিমুদ্দিন ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার
টিপেটাপে দেখে কয়েকটা টেবলেট লিখে দিয়ে বললেন- কাশ যাতে না উঠে তার
জন্য কয়েকটা টেবলেট লিখে দিলাম। সাথে একটি পরীক্ষা করার জন্য লিখে দিয়েছি। পারলে আজই পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট আমাকে
দেখাবেন।
পরীক্ষা করানোর পর ছলিমুদদ্দিন রিপোর্ট এনে ডাক্তারকে দেখালেন। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বললেন- আমার মনে সন্দেহ হচ্ছে, আপনার রোগটা আমার সাধ্যের বাইরে। আপনি পারলে
গুয়াহাটী গিয়ে কেন্সার হাসপাতালের ডাক্তার দেখান।
আদুরি নেসাকে নিয়ে ছলিমুদ্দিন গুয়াহাটীর
কেন্সার হাস্পতালে এলেন। পরীক্ষা করার পর কেন্সার ধরা পড়ল। ডাক্তার বললেন- কিছুদিন আগে এলে অপারেশন করে
টিউমারটা কেটে ফেলা যেত।এখন ‘কেমো’র বাইরে
অন্য চিকিৎসা নেই।
কেমো আবার কি, স্যার?
কেমো এক ধরণের সেলাইন। ডাক্তার
সাহেব বললেন- তবে সেলাইনের চেয়ে অনেক দামি। আপনাদের পঁচিশ হাজার টাকা করে ছয়টা কেমো
নিতে হবে।
এত টাকা তো আমাদের নাই, স্যার। ছলিমুদ্দিন বললেন- ধারধোর করে মোটে
সাত আট হাজার
টাকা নিয়ে গুয়াহাটী এসেছি। কম দামের কেমো নেই, স্যার?
যে রোগের জন্য যা প্রযোজ্য তাই তো দিতে হবে
না-কি? ডাক্তার বললেন- আপনাদের তো ভাগ্য ভালো যে, মাত্র
পঁচিশ হাজার টাকার কেমো দিয়েছি। সাত আট লাখ টাকার কেমোও আছে। ডাক্তার বললেন- যদি আয়ুষ্মান
কার্ড আছে তাহলে কেমো কয়টা ফ্রিতে পাবেন। প্রয়োজনে কিছু
ওষুধ বাইরে থেকেও কিনতে হতে পারে।
ছলিমুদ্দিনকে হাসপাতালে ভর্তি করে কেমো
ফ্রিতে দিলেন। তবে অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরছ বাবদ প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ
হয়ে গেলো।
কেমো দেওয়ার পর ডাক্তার বললেন- আমরা একটা
কেমো দিলাম। একুশ দিন পর পর আরও পাঁচটা কেমো নিতে হবে।
আপনারা যেখানে ইচ্ছে সেখানে কেমো পাঁচটা নিতে পারবেন।
সুন্দরপুরে ইতিমধ্যে টাটা মেমোরিয়াল কেন্সার
হাস্পতাল নির্মাণ হয়েছিলো এবং চিকিৎসাও শুরু হয়েছিলো। তাই আদুরি নেসা
বললো- আমাদের সুন্দরপুরে কেন্সার হাসপাতাল হয়েছে।সেখানে কেমো কয়টা নিতে পারব কি?
হ্যাঁ পারবেন। ডাক্তার বললেন- আমি লিখে
দিচ্ছি, বাকী কেমো কয়টা সেখানেই নিতে পারবেন।
বাকী পাঁচটা কেমো সুন্দরপুরেই নিলেন। আয়ুষ্মান কার্ডের জন্য পাঁচটা কেমো ফ্রিতে পেলেন যদিও এটা ওটা ওষুধ
কেনা বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়ে গেলো। ফলে পরিবারটা একেবারে
নিঃস্ব হয়ে পড়লো। ফজরুল এবং নজরুলের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম
হলো। এমনকি ভাতকাপড়ের সমস্যাও দেখা দিলো।
সুন্দরপুর সেন্টারে মজিদ মিয়া নামক একজন লোক, গেলামালের দোকান করে। মজিদ মিয়া আদুরি নেসার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মজিদ মিয়া আদুরি নেসাকে ফুফু
বলে ডাকে। মজিদ মিয়ার
দোকান থেকেই আদুরি নেসা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে। আদুরি নেসা একদিন মজিদ মিয়ার দোকানে জিনিস কিনতে এলে মজিদ
মিয়া জিজ্ঞাসা করলো- ফুফার অসুখ কেমন? শোনলাম কেমো দিতেছে।
ইতিমধ্যে ছয়টা দিয়েছে। আদুরি নেসা বলল- আরও
দিবে বলেছে। এখন টাকা কোথায় পাই!সব বেচা শেষ। এখন উপায় দেখতেছি না।
কেন, কেমো
বোলে মাগনা দেয়?
কেমো
মাগনা দিলে কি হবে? কেমোর
বাইরেও অনেক ওষুধ নগদ টাকা দিয়ে কিনতে হয়।
তাই না কি? মজিদ মিয়া বলল- আমি ভাবছি মাগনা চিকিৎসা হচ্ছে।
আদুরি
নেসা উপহাসের সুরে বললো- মাগনাই। তবে ধকল আছে। কেমোর বাইরে সব ওষুধই কিনতে হয়। তাও আবার ওদেরই
ফামার্সি থেকে। অন্য জায়গায় ওষুধ পাওয়া যায় না। সরকার ঢেকী দেখিয়ে নাইল মারতাছে। আসলে মাগনা চিকিৎসার
নামে ওষুধ বিক্রী করতেছে। অবশ্যে ছিট ভাড়াটাও লাগে না
আয়ুষ্মান কার্ড থাকার জন্য।
আসলে সব জায়গাই ব্যবসা। মজিদ মিয়া বলল- লাভ
না থাকলে কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকায় না। ফজরুল কি করে? ও স্কুলে যায়?
কয়দিন ধরে যায় না। আমার সাথে এখানে ওখানে
যেতে হয়।
ওর পড়া নষ্ট কইরেন না, ফুফু। ও লেখাপড়ায় ভালো। আজকাল লেখাপড়া না
জানলে তার সন্মান নেই।
পড়াই কি করে বল! হাতে যা দুই চার টাকা ছিলো, সব শেষ। এখন দিন ভিক্ষা তনু রক্ষা করে চলতেছি। পেটের ভাত জোটানোই মশকিল হয়ে পড়েছে। পড়াই কেমন করে।
স্কুলে গেলে দৈনিক দশ বিশ টাকা করে হাত খরছ দিতে হয়।
টাকা দিতে পারি না বলে স্কুলে যায় না। এদিকে রোগীর সাথে থাকতে হয় বলে আমিও ঠিকমতো হাজিরা করতে যেতে পারি না।
মজিদ মিয়া বলল- আমার লোকের দর্কার। ফজরুল
যদি আমার দোকানে থাকে তাহলে আমি তার লেখাপড়ার সমস্ত খরচ বহন
করার সাথে সাথে মাসিক কিছু টাকাও দেব।
দেখি ফজরুলের কাছে শুনে। ও যদি থাকে আমার
আপত্তি নেই।
বাড়ীতে এসে কথাটা ফজরুলকে বলাতে ফজরুল রাজি
হয়ে গেলো।
অবশেষে ফজরুল মজিদ মিয়ার দোকানে থাকার
সিদ্ধান্ত হলো।
আদুরি নেসা মাঝেমধ্যে হাজিরা করে সংসার
চালায়। ফজরুল সকালে স্কুলে যায়। বিকেলে এসে মজিদ মিয়ার দোকানে কাজ
করে। এভাবে খুব অনাটনের মাঝে সংসার চলতে লাগলো।
তার মধ্যে একদিন ফজরুল তার মা'র কাছে বায়না ধরলো- মা, আমাকে মোবাইল কিনে দাও। আমার
বয়সের সবাই মোবাইল চালায়, শুধু
আমার মোবাইল নাই।
আদুরি নেসা বলল- তুই মোবাইল দিয়ে কি করবি? সকালে স্কুলে যাস এবং বিকেলে এসে দোকানে কাজ করিস। তুই মোবাইল চালাবি কখন? আর হ্যাঁ, মোবাইল কিনতে অনেক টাকা লাগবে, অত টাকা আমি পাব কোথায়?
আমি জানিনা কোথায় টাকা পাবে। মোবাইল দিলে
দিবে, না হলে আমি স্কুলে যাব না।
দ্যাখ গেদা, তোর বাপের কেন্সার। চিকিৎসা বাবদ কত টাকা খরচ হইতেছে। আমি মোবাইল কিনে দিব কোত্থেকে?
আমি জানি না কোথা থেকে দিবে। মোবাইল না দিলে
আমি বাড়ী থেকে চলে যাব।
কোথায় যাবি?
জানি না কোথায় যাব। কেরালা যাব। কত লোক তো
কেরালা গিয়ে কত টাকা কামাই করতেছে।
তারা বড় হয়েছে। তোর বয়স কত? খুব বেশি হলে পনের বছর। যে বছর বড় বন্যা
হয়েছিলো সেই বছর তোর জন্ম। তাই এখন তোর বড়জোর পনের বছরের অধিক নয়। আঠারো
বছর না হলে তোকে কেউ কাজে রাখবে না।
আমি মানুষের ভাত রান্না করব।
আদুরি নেসা বলল- দ্যাখ, তুই চলে গেলে তোর বাবাকে নিয়ে আমি একা একা
কি করব? অনেক সময় তোকে বাড়ীতে রেখে তোর বাবাকে কেমো দিতে নিয়ে যাই। নজরুল
অনেক ছোট। তুই না থাকলে নজরুল একা বাড়ীতে থাকবে কেমনে?
যাই বল না কেন, মোবাইল কিনে না দিলে আমি চলে যাবই। তখন আমাকে দোষ দিতে পারবে না। এভাবে বলেই ফজরুল বাড়ী থেকে বেড়িয়ে গেলো।
আদুরি নেসা ভাবলো, ফজরুল একটু অন্য রকম ধাঁচে গড়া। ডানপিটে
স্বভাবের। ওকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। বাড়ী ছেড়ে চলেও যেতে পারে।
তাই সে মজিদ মিয়ার কাছে এসে বলল- ফজরুল কোথায? ফজরুল দোকানে ?
না তো। দুই দিন ধরে সে দোকানে
আসে না। মজিদ মিয়া বলল-বাড়ীতে বোলে কি কাজ আছে।
বাড়ীতে কোনও কাজ
নেই। আদুরি নেসা বলল-তাহলে তো মনে হয় স্কুলেও যায় না। মোবাইলের জন্যই মনে হয় দোকান এবং স্কুল বাদ দিয়েছে।
মোবাইল, কি
মোবাইল? আপনার কথা তো বুঝতে পারছি না। মজিদ মিয়া
চিন্তিত কণ্ঠে বললো।
ওর সাথের সব ছেলেরই বোলে মোবাইল আছে। তাই ওরও
মোবাইল লাগে। চালডাল কিনবার টাকা নেই। আমি এখন মোবাইল দেই
কি করে বলুন তো?
এই বয়সে ও মোবাইল দিয়ে কি করবে? এখন তো ওর পড়ার সময়। মোবাইল দেখবে, না বই পড়বে?
জানি না। আদুরি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নেসা
বলল- ওর কোন কথাই আমি বুঝতে পারি না।ও যে কি হবে? লোকে ওর নামে অনেক বদনাম করে। আমি পাত্তা দিই না। আমি মনে হয় ভুল করতেছি। মোবাইল কিনে না দিলে বোলে ও কেরালা যাবে।
তাই নাকি? তাহলে তো কথা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন কি করবেন ভাবছেন?
ও যে রকম একগেঁয়ে
স্বভাবের মোবাইল না দিলে সত্যিই কেরালা চলে যাবে।
তাই বলে এখনই মোবাইল কিনে দিবেন? মোবাইল কিনে দিলে ওর পড়া লাটে উঠবে না?
না দিলে যে কেরালা চলে যাবে! আদুরি নেসা
অসহায়ভাবে মাজিদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো-এখন আমি কি করি বলুন তো?
আমার মতে মোবাইল না দেওয়াই ভালো হবে।
এভাবে অনেক যুক্তিতর্কের পর অবশেষে মোবাইল
কিনে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত হলো। পড়া লাটে উঠুক বাড়ীতে তো থাকবে।
পরের দিনই মোবাইল কিনে দেওয়া হলো। মোবাইলের
অর্ধেক টাকা মজিদ মিয়া দিলো।
মোবাইল কিনে দেওয়ার পর ফজরুল উৎসাহ সহকারেই
স্কুলে যেতে লাগলো এবং দোকানেও খুব মনযোগ দিয়ে কাজ করতে
লাগলো।
এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে গেলো। হাকিমুদ্দিন
মার্ডার কেসে জড়িয়ে পড়লো। হাকিমুদ্দিন পারারই একটি সাত বছরের ছেলেকে
মার্ডার করে ফেললো সামান্য পাঁচ হাজার টাকার জন্য। অবশ্যে
হাকিমুদ্দিনের স্বীকারোক্তি মতে জানা গেলো,, মার্ডার
করার মতলব নিয়ে সে মার্ডার করেনি। ছেলেটিকে কিডন্যাপ
করেছিলো টাকা দাবি করবে বলে। কান্নাকাটি করার জন্য সে ছেলেটিকে অচেতন করার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করেছিলো। তবে ওষুধের মাত্রা বেশি হওয়ার
জন্য ছেলেটি মারা গিয়াছে।
পুলিশ হাকিমুদ্দিনকে আটক করে নিয়ে গেছে।
বয়স কম হওয়ার জন্য হাজোতে না পাঠিয়ে তাকে চাইল্ড কেয়ার হোমে
পাঠিয়ে দিয়েছে।
অনেকে বলাবলি করতে লাগলো, ফজরুল দোকানে না থাকলে সেও এই কেসে জড়িয়ে পড়তো। ফজরুল নিজেও উপলব্ধি করতে পারলো, দোকানে না থাকলে তাকেও সম্ভবত
হাকিমুদ্দিনের সাথে চাইল্ড কেয়ার হোমেই যেতে হতো। কারণ
হাকিমুদ্দিনই ছিলো তার কুকর্মের গুরু। তাই হাকিমুদ্দিনের গ্রেপ্তারের পরে
সে লেখাপড়ার সাথে সাথে দোকানের কাজে অধিক মনযোগ দিলো।
আট
গুহার যুগ থেকে মানুষ ডিজিটেল দুনিয়ায়
পদার্পণ করেছে। আগে যেখানে হাতে গোনা: কয়েকজন
ধনীলোকের বাড়ীতে সাইকেল ছিলো, এখন বলতে
গেলে বাড়ী বাড়ী মটর সাইকেল, মারুতি।
যেখানে রাস্তা ছিল না, সেখানে
পাকা রাস্তা হয়েছে। খড়ের কুঁড়ে ঘর থেকে পাকা দালান বাড়ী হয়েছে। পূর্বে যেখানে আমাদের
পূর্বপুরুষেরা ত্রিশ চল্লিশ মাইল রাস্তা হেঁটে যাওয়া আসা করতো সেখানে এখন এক ফার্লং রাস্তা যেতেও বাইক
লাগে। আগে হাতে গোনা কয়েক জন লোকের
বাড়ীতে রেডিও ছিলো, এখন
বাড়ী বাড়ী টিভি। টিভির স্থান এখন আবার দখল করেছে মোবাইল-এ। সিনেমা হলকে কয়েক বছর আগেও ধারণা করা হতো, এর মতো ব্যবসা হয় না।লোকে মারামারি করে টাকা
দিয়ে টিকেট কাটতো, এখন
সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে মোবাইলের
দৌলতে। টর্স লাইটও খেয়েছে মোবাইলে।
আগে সহরে গেলে একটু আধটু জায়গা যাওয়ার জন্য
তিন চাকা বিশিষ্ট রিক্সাই ছিলো একমাত্র ভরসা। এখন রিক্সার স্থান দখল
করেছে ই-রিক্সা। এখন প্রায় ঘরে ঘরে ই-রিক্সা। যারা পূর্বে রিক্সা চালাত তারা বন্ধন ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে ই-রিক্সা কিনতেছে।
ই-রিক্সার প্রচলনে গ্রামাঞ্চলেরযাতায়ত ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।
গান শুনলে, গায়ক হওয়ার ইচ্ছা হয়; অভিনয়
দেখলে অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা জাগে। কাউকে কাঁদতে দেখলে নিজেরও কাঁদতে
ইচ্ছা হয়। ই-রিক্সা দেখে দেখে ফজরুলেরও ই-রিক্সা চালানোর ইচ্ছা
হলো। একদিন সে মা’কে বলল-
মা, আমি আর দোকানে থাকব না। আমাকে
পিলপিলি(স্থানীয় লোকেরা ই-রিক্সাকে পিলপিলি বলে। নামটা অবশ্যে
মন্দ দেয়নি স্থানীয় লোকেরা।) কিনে দাও।
আদুরি নেসা অবাক দৃষ্টিতে ফজরুলের দিকে
তাকিয়ে বললো- কি বলিস! তুই পিলপিলি চালাতে পারবি?
পারব। ফজরুল দৃঢ় কণ্ঠে বললো- আমার থেকে অনেক
ছোটরাও এখন পিলপিলি চালায়।আমি পারব না কেন? পিলপিলি
চালালে অনেক টাকা। খরচ বাদেও দিনে হাজার টাকা তো ঘরে আসবেই।
তখন তোমাকে আর হাজিরা করতে হবে না। আব্বার চিকিৎসার খরচ নিয়েও ভাবতে হবে না।
কিন্তু টাকা কোথায় পাব। এক ডের লাখ টাকার
ব্যাপার। আদুরি নেসা অসুবিধার কথা জানালো।
বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নাও।
কীভাবে ঋণ নিব? আদুরি নেসা বললো- আমি তো কোনো গ্রুপে নাই। বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হলে বোলে ছয় সাতজনের গ্রুপ লাগে।
খালাও কোনো গ্রুপে নাই। খালার সাথে মিলে
গ্রুপ খোল।
তোর খালা কি গ্রুপ খুলবে?
বলেই দেখ না। আমার মনে হয় খুলবে।
কিন্তু তোর স্কুল কী হবে?
আমি সকালে স্কুলে যাব। স্কুল থেকে এসে বিকেলে
পিলপিলি চালাব। বিকেল বেলাই ভাড়া বেশি হয়।
তোর বাপ বা আবার কি বলে?
আব্বা কিছুই বলবে না। আমরা তো টাকা ভেঙ্গে
খাব না। পিলপিলি কিনব।
ছলিমুদ্দিনের কাছে কথাটা বলার পর তিনি দীর্ঘ
নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন-আমি আর কি বলবো !নিজে কাজ করতে পারি না। তোমাদের বোঝা হয়ে
বেঁচে আছি। তোমরা যা ভালো বুঝ, তাই কর।
দু’জনে মিলে
ফৈজুদ্দিনদের বাড়ী এলো।
সকাল সকাল ফৈজুদ্দিন তাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা
কেমন আছ? ছলিম ভাইর অসুখের খবর কি? নানান অসুবিধার জন্য অনেকদিন খবর নিতে যেতে
পারিনি। রোগ ভালো হবে তো?
না, কই আর
ভালো হবে। ডাক্তাররাঁ ছয় মাসের টাইম দিয়েছে। ছয় মাস পরে কি হবে ভাবতেও ভয় লাগে। বলেই আদুরি নেসা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।
ছলিম ভাইর অবস্থা দেখলে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু
কি করবে? রোগ তো আর বলে কয়ে হয় না।যতদিন বেঁচে আছে
চিকিৎসা তো করতেই হবে। কেন্সার হলে নিজে তো মরেই, পরিবারকেও মেরে যায়। তা আজ সাত সকালে কি মনে করে?
আদুরি নেসা ফজরুলকে দেখিয়ে বললো- ফজরুল
পিলপিলি কিনার কথা বলতেছে। কিন্তু হাতে তো এক টাকাও নেই। তাই এলাম
আপনাদের কাছে।
আমার হাতও তো
শূন্য। যা কাজ কর্ম করি সব খরচ হয়ে যায়। এক টাকাও জমা হয় না।
না, ভাইসাব, টাকার জন্য আসিনি। আদুরি নেসা বললো- আপাকে
নিয়ে বন্ধন ব্যাংকের একটা গ্রুপ খোলার জন্য এসেছি। গ্রুপ
খোলার পর বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পিলপিলি কিনার কথা ভাবছি।
তাই নাকি? ফৈজুদ্দিন উৎসাহের সাথে বললেন- তাহলে তো ভালই হয়। যদি খোলতে পার, খোল। আমারও টাকার দর্কার। ছোট গেদাও অনেক দিন ধরে পিলপিলি কিনার কথা
বলতেছে।টাকার জন্য কিনে দিতে পারতেছি না।
তাহলে যতদূর সম্ভব তারাতারি গ্রুপটা খুলে
ফেলি, না কি বলেন? আদুরি নেসা বললো।
কমপক্ষে সাতজনের গ্রুপ লাগে বলে শুনেছি।
তোমরা দুজন হলে। আর পাঁচজন কোথায় পাবে?
ফজরুল বললো- বাকী পাঁচজন আমি যোগার করব। যদি আপনি মত দেন তো আজই তাদের সাথে আলোচনা করব।
ফৈজুদ্দিন বললেন- তুমি কি যোগার করতে পারবে?
পারব। ফজরুল বললো- আমি পশ্চিম পারার কয়েকজনের
সাথে আলোচনা করেছি। তারাও বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে
পিলপিলি কিনবে।
ফৈজুদ্দিন বললেন-যদি পার আলোচনা কর। আমার তরপ
থেকে কোন আপত্তি নেই।এভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আদুরি নেসা ফজরুলকে নিয়ে বাড়ীর দিকে
রওয়ানা হলো।
রাস্তায় উকিল
সাহেবের সাথে দেখা হলো। উকিল সাহেব বললেন- খালা, কোথায় গিয়েছিলেন?
ফৈজুদ্দিন ভাই সাহেবের বাড়ী গিয়েছিলাম।
আদুরি নেসা জবাবে বললো।
কেন?
ফজরুল উৎসাহের সাথে বললো- আমরা বন্ধন
ব্যাংকের একটা গ্রুপ খুলব। তারজন্য।
বন্ধন ব্যাংকের গ্রুপ খুলে কি করবে?
আদুরি নেসা বন্ধন ব্যাংকের গ্রুপ খোলার কারণ
বললো।
ফজরুল তো এখনও অনেক ছোট। উকিল সাহেব বললেন- ও
চাইল্ড অ্যাংক্টের আওতায় পরবে। পুলিশ ওকে ই-রিক্সা
চালাতে দেবে কি?
ফজরুল বললো- আমার থেকে ছোটরাও অনেকে
চালাচ্ছে। তাদের তো কিছুই বলে না।
বলে না ঠিকই। উকিল সাহেব বললেন- বাঘে ছুলে
আঠারো ঘা। বললে তখন কি বলবে?
ফজরুল বললো- বলব, আমার বাবার কেন্সার। সংসারে উপার্জনের কেউ
নেই। তাই দুঃখে পড়ে চালাতে হচ্ছে।
ধরলাম পুলিশ চালাতে দিলো। কিন্তু তোমার
লেখাপড়া?
সকালে স্কুলে যাব। বিকেলে রিক্সা চালাব।
ফজরুল বললো।
কথায় আছে না, এক হাতে দুই শোল ধরা যায় না। উকিল সাহেব বললেন- টাকাও ইনকাম করবে আবার পড়াও চালিয়ে যাবে! এটা সম্ভব হবে কি করে? লেখাপড়া করাটা কি এতই সহজ? তদুপরি পয়সা কামাইর রাস্তায় গেলে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া হয় না।
আদুরি নেসা বললো- কি করব এখন? ওর আব্বার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার
দর্কার।আমি একা হাজিরা করে কুলিয়ে উঠতে পারতেছি না। তাও দৈনিক হাজিরাও করতে পারি না।আপনার
ভাইকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।
বাড়ীতেও সেবা শুশ্রূযা করতে হয়। মাঝেমধ্যে যা কামাই করি, তা দিয়ে
চাল-ডাল-নুনই কিনব, না
চিকিৎসার খরচই যোগাব। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কিন্তু বন্ধন ব্যাংকের ঋণ নিয়ে রিক্সা কিনা!
ঋণ নেওয়ার পরের মাস থেকেই ব্যাংকের কিস্তি দেওয়া শুরু করতে হয়। তদুপরি
ঋণটিন করা তো ভালো কথা নয়। অন্তত বন্ধন ব্যাংক থেকে।বন্ধন ব্যাংকের মালিক হলো
চন্দ্র শেখর ঘোষ। তাঁর বাবার নাম ছিলেন হরিপদ ঘোষ। বন্ধন ব্যাংকের
মালিকের বাবা হালুই ছিলেন। চন্দ্র শেখর ঘোষ ২০০১ সালে মাত্র দুই লাখ টাকা নিয়ে এনজিওর জরিয়তে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন তিনি হাজার হাজার কোটি
টাকার মালিক।অত টাকা করেছে পাব্লিকের টাকা নিয়েই তো।
গরীবদেরও তো উপকার হচ্ছে। আদুরি নেসা বললো- আমরা পিলপিলি কিনার সাহস
পাচ্ছি বন্ধন ব্যাংক থাকার জন্যই তো। যত পিলপিলিই দেখছেন প্রায় সবাই বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েই কিনছে। আমি তো গেদাকে না-ই করছিলাম। ও
মানছে না। এখন কি করব? আমি হাজিরাই করব, না ওদের
বাপের তদবিরই নেব। কোনও কোনও দিন সারারাত যন্ত্রণায় ছট্ফট্
করে। সারারাত জেগে হাত পা টিপে দিতে হয়। আমার শরীরে আর কুলায় না।
উকিল সাহেব বললেন- কি আর করবেন? যতদিন বেঁচে আছে, চিকিৎসাও করাতে হবে, সেবাও করতে হবে। ঠিক আছে কিনুন। তবে, কিস্তি
মাসে মাসে শোধ করবেন। কিস্তি যেন বাকী না পড়ে। জানেন তো, সুদের টাকা বানের জলের মতো বাঢ়ে।
আমি মাসের কিস্তি মাসেই পরিশোধ করব। ফজরুল
বললো- প্রত্যেক দিন দু’শ করে
টকা কিস্তির নামে জমা রাখব। প্রয়োজনে রাতেও পিলপিলি চালাব।
রাতে চালাতে হবে না। উকিল সাহেব উপদেশের
স্বরে বললেন- দিনকাল ভালো না। কে কাকে মেরে খায় ঠিক নেই। তুমি
ছেলে মানুষ কেউ জোর করে রিক্সা নিয়েও যেতে পারে। যেটুকু পার
দিনেই চালাবে। বেশি লোভ করা ভালো নয়।
যা চালাবে, ঠিকঠাক মতো মনযোগ দিয়ে চালালেই
হলো। আগে যেভাবে চলেছ, এখন
সেভাবে চললে হবে না। তোমার বাবার অসুখ, এ কথা
সর্বদা মনে রেখে চলতে হবে। টাকা পয়সা যা কামাই করবে খরচ বাদে সব মা’র হাতে এনে জমা
দিবে। তাহলেই চলবে। হ্যাঁ, একটা কথা
মনে রেখো। তোমার বাবার অসুখ।
অসুখও এমন
অসুখ, যা ভালো হবার আশা নেই। সেজন্য বড় ছেলে
হিসাবে তোমার ওপড় এখন অনেক দায়িত্ব। তাই আগের মতো চললে হবে না।
লেখাপড়া চালিয়ে যতটুকু সম্ভব ঠিক ততটুকুই চালাবে।
নয়
বন্ধন ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এক মাস পরে
আদুরি নেসা ফজরুলকে
ই-রিক্সা কিনে দিলো। কামাই মোটামুটি মন্দ হয়
না। খরচ বাদে দৈনিক প্রায় পাঁচ ছয় শ টাকা করে হাজিরা থাকে। রিক্সা কিনার পরে সংসারের অনাটন কিছুটা হলেও হ্রাস পেল। আদুরি নেসা ছলিমুদ্দিনের জন্য
সময় দেওয়ার সুবিধা হলো।
একদিন ফজরুল অনেক রাতে বাড়ী ফিরল। রিক্সা আসার শব্দ পেয়ে আদুরি নেসা এগিয়ে এসে বললো- গেদা, আজ এত রাত করছিস কেন? কতবার ফোন দিয়েছি। ফোনও তুলছিস
ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম। ফজরুল কৈফিয়তের
স্বরে বললো- তাই শুনতে পাইনি।
এত রাত করলি কেন? তোকে বলছি না সকাল সকাল বাড়ী ফিরবি।
সময় মতোই বাড়ীই ফিরছিলাম। তখনই একজন এসে বললো, ভাড়া
আছে। যাবে?
আমি বললাম- কোথায়?
এই কাছেই। বেশি দূরে নয়। গেলে এক শ টাকা দিব। পেসেঞ্জার বললো।
একশ টাকার কথা শুনে আমি লোভ সামলাতে পারলাম
না। তাই গিয়েছিলাম। যাওয়া আসাতে মাত্র আধা ঘণ্টা। একশ টাকার উপরে আমাকে চা-ও খাইয়েছে।
তবুও রাতে কোন জায়গায় যাবি না। টাকা বড়
নয়রে বাপ, জান বড়। দিনকাল ভালো না। কে কোন মতলবে কী করে তুই বুঝবি না।
ঠিক আছে। তুমি বলছ যখন, আর যাব
না। এভাবে বলে করকরে একশ টাকার নোট মা'র হাতে গোঁজে দিয়ে বললো- এই এক শ টাকা রাখ। আব্বার ওষুধ কিনতে পারবে। আর
কাল তুমি বলছিলে না, আব্বার
লেট্রিনে যেতে অসুবিধা হয়। তাই লেট্রিন বানানোর জন্য পেপারও কিনে এনেছি।
আবার পেপার কেন? আদুরি
নেসা বললো- আমি লেট্রিনের কথা কখন বললাম?
কোন, কাল রাতে
বলেছিলে। আমি শুনেছি।
ফজরুল মিথ্যে বলেনি। ফজরুলদের লেট্রিনটা
শোবার ঘর থেকে একটু দূরে। সরকারী লেট্রিন।দু’বছর আগে
পেয়েছে। ফজরুলদের বাড়ীটা একেবারে মেইন রাস্তার ধারে। তাই বাড়ীটা ভবিষ্যতে পিছিয়ে বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেজন্য ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে
লেট্রিনটা শোবার ঘর থেকে একটু দূরে বানিয়েছে। ছলিমুদ্দিনের শরীর খুব দুর্বল। তাই রাত বিরেতে লেট্রিনে যেতে
অসুবিধা হয়। সেজন্য কাল রাতে ছলিমুদ্দিন বলেছিলো, লেট্রিনটা কাছে হলে সুবিধা হতো। এতদূরে যেতে
আমার খুব কষ্ট হয়।
তখন আদুরি নেসা বলেছিলো- হাতে বর্তমান টাকা নেই।
টাকা জমা হলেই পেপার এনে কাছেই লেট্রিন বানিয়ে দেব। কয়েকটা
দিন একটু কষ্ট করে যেতে হবে।
ভালোই করেছিস। আদুরি নেসা বললো- আমাদের গেদা
দেখছি আজকাল আমাদের কথাও ভাবে! এভাবে বলে ফজরুলের গালে চুমু খেয়ে
বললো- কামলা ডেকে কালই লেট্রিনটা বানিয়ে দিব।
পরের দিন খুব ভোরে ফজরুল ঘুম থেকে উঠে
নজরুলকে চুপি চুপি ডেকে বললো- নজরুল, উঠ।
এত সকালে ডাকছিস কেন? নজরুল বললো।
দর্কার আছে।
উঠ। কাজ করতে হবে।
কি কাজ?
আগে উঠ। পরে বলছি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নজরুল বিছানায় উঠে বসল।
খন্তিটা কোথায়?
খন্তি দিয়ে কি করবে?
আরে কাজ আছে বলেই তো বলছি। খন্তি কোথায় বল?
রান্না ঘরে দেখেছি।
ফজরুল বললো- তুই বাইরে আয়। আমি খন্তিটা
দেখছি।
ফজরুল রান্না ঘর থেকে খন্তি নিয়ে উঠোনে এসে
দেখল, নজরুল বাইরে এসে চোখ রগড়েতেছে। ফজরুল নজরুলের কাছে এসে চুপি চুপি বললো- আব্বার জন্য লেট্রিন বানাব। মা ঘুম থেকে
উঠেই যেন লেট্রিনটা দেখতে পায়। চুপচাপ চল। মা যেন জানতে না পারে। সারপ্রাইজ
দেওয়ার জন্য মা ঘুম থেকে উঠার আগেই লেট্রিনটা বানিয়ে ফেলব।
ফজরুলের ছোটখাট অস্থায়ী লেট্রিন বানানোর
অভিজ্ঞতা আগে থেকেই ছিলো। তাদের স্কুলের ফিল্ডে একবার বড় রকমের সভা
হয়েছিলো। সেখানে অস্থায়ী প্রস্রাব খানা এবং লেট্রিন বানিয়েছিলো।ফজরুল সেই
কামলাদের সাথে থেকে লেট্রিন বানিয়েছিলো। ইউটিউবেও সে অস্থায়ী লেট্রিন বানানো দেখেছে। ফজরুল সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে লেট্রিন বানানোর
কথা ভাবছে।
বাঁশ বাড়ীতেই ছিলো। হেক্স’ ব্লেড দিয়ে বাঁশ কেটে তাদের শোবার ঘর থেকে
একটু দূরে একটি গর্ত খুঁড়ল। তারপর গর্তের চার কোনাচে চারটি খুটি পোঁতে পেপার
দিয়ে বেড়া দিলো।
বাড়ীতেই একটি তক্তার মতন গাছের বাকল ছিলো।
বসার জন্য সেই বাকলটা পেতে দিলো। সূর্য উঠার আগেই তাদের লেট্রিন বানানো
সম্পূর্ণ হলো।
লেট্রিনটা শেষ করে দুই ভাই ঘরে এসে যার যার
বিছানায় শোয়ে পড়ল।
আদুরি নেসার কাজের শরীর। তদুপরি রাতে
ছালিমুদ্দিনের ফাই-ফরমাশ শুনতে হয় । ছলিমুদ্দিনের যন্ত্রণা
রাতে বেশি হলেও প্রাতঃকালে যন্ত্রণা একটু হলেও কমে। তাই তখন ছলিমুদ্দিন চোখ বুজে। সেই অবসরে আদুরি নেসাও একটু ঘুমিয়ে নেয়।
দুই ভাই বিছানায় শোয়ে পড়ল ঠিকই, তবে ঘুম এল না। কখন মা ঘুম থেকে উঠবে, কখন বাবা লেট্রিনে
যাওয়ার কথা বলবেন, এই
চিন্তায় তারা বিভোর হয়ে রইল।
এক সময় অপেক্ষার অবসান হলো। আদুরি নেসা ঘুম
থেকে উঠলো। ছলিমুদ্দিনও জেগে উঠলেন।
ফজরুল ঘুম থেকে উঠার ভান করে বললো- মা, আব্বা লেট্রিনে যাবে না?
আদুরি নেসা বললো- এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন।
পায়খানার তলব হলে তো যাবে। কেন বলছিস?
না এমনি।
ঠিক তখনই ছলিমুদ্দিন আদুরি নেসাকে ডেকে
বললেন- কই গো, কোথায় গেলে? এস। লেট্রিনে যাব।
ফজরুল বললো- মা, যাও। আব্বা লেট্রিনে যাবে। ডাকতেছে।
ফৈজুদ্দিনের কাছে গিয়ে আদুরি নেসা বললো-
লেট্রিনে যাবে?
হ্যাঁ, ধরো।
লেট্রিনে নিয়ে চল। ফৈজুদ্দিন আফসোসের সুরে বললেন- একা একা কবে যে হাঁটতে পারব! এভাবে তোমাদের গলগ্রহ হয়ে আর বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
হ্যাঁ গো, ডাক্তার কি বললেন? আমি কবে সেরে
উঠব?
আরও দু’টো কেমো
দিবে। আদুরি নেসা বললো- তারপরও যদি না কমে, তাহলে
রেডিয়েশ্বন দিবে।
রেডিশ্বন আবার কি?
আমিও জানি না। ডাক্তার বলেছে তাই বললাম।
ধর, লেট্রিনে
নিয়ে চল।
ছলিমুদ্দিনকে ধরে আদুরি নেসা লেট্রিনের দিকে
নিয়ে যেতে লাগলো। ফজরুল এগিয়ে এসে বললো- ও দিকে নিয়ে যাচ্ছ কেন? এদিকে নিয়ে চল।
ফজরুল ছলিমুদ্দিনকে ধরে নতুন তৈয়ারী
লেট্রিনের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো।
আদুরি নেসা বাধা দিয়ে বললো- ও দিকে নিয়ে
যাচ্ছিস কেন? লেট্রিন কি ওই দিকে?
ফজরুল বললো- আগে চলোই না।
আদুরি নেসা কিছু বললো না। ভাবলো, দেখি কি করে ছেলেটা!
ফজরুল তার আব্বাকে নবনির্মিত লেট্রিনের কাছে
নিয়ে গিয়ে বললো- আব্বা, আজ থেকে এখানে লেট্রিন করবেন। আজ থেকে আপনার আর আগের লেট্রিনে যেতে হবে না।
লেট্রিন দেখে আদুরি নেসা অবাক। সে বড় বড়
চোখে ফজরুলের দিকে তাকিয়ে বললো-আরে গেদা, কখন করলি
এমন কাজ?
নজরুল কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো-প্রভাতে
করেছি ভাই আর আমি মিলে।
ছলিমুদ্দিন লেট্রিন করতে গেলেন।
আদুরি নেসা বললো- দেখলাম, তোরা সাবালক না হয়েই এখন সাবালক হয়েছিস।
আমার আর চিন্তা নেই।
দশ
ছলিমুদ্দিনের অসুখ দিনে দিনে বেশি হতে লাগল।
আগে ডাক্তার ছয়টা কেমোর কথা বলেছিলো। ছয়টা কেমো দেওয়ার পরে আরও চারটে কেমো দিলো। দশটা কেমো দেওয়ার
পরেও অসুখ কমার কোনো
লক্ষণ দেখা গেল না। তাই রেডিয়েশ্বন দিতে লাগল। আগে কমবেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করতে পারতেন। রেডিয়েশ্বন
দেওয়ার পরে খাদ্য খাওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিলো। পেটে ক্ষিদে, কিন্তু খাদ্য গলা দিয়ে নামে না। এমনিতে অসুখের যন্ত্রণা তার ওপড়
ক্ষিদার যন্ত্রণা।
ছলিমুদ্দিন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসতে লাগল।
একদিন ছলিমুদ্দিন আদুরি নেসাকে ডেকে বললেন-
আমার মনে হয়, আর বেশিদিন বাঁচব না। সালেহাকে খুব দেখার
ইচ্ছে হচ্ছে। ফজরুলকে পাঠিয়ে
দাও। সালেহাকে নিয়ে আসুক।
পনের দিন আগেই তো এসে গেল। আদুরি নেসা বলল-
একার সংসার। জামাই গুয়াহাটীতে হাজিরা
করে। বাড়ীতে একাই থাকে ছেলে দু’টি
নিয়ে। বাড়ীতে হাঁস মুরগি, ছাগল
আছে। একটি গাভীও
পোষে। সে কি আসতে পারবে সেগুলো রেখে?
আমি পই পই করে পৃথক না হওয়ার জন্য বলেছিলাম।
ছলিমুদ্দিন বলল- তখন আমার কথা শুনল না।
শুনলে, এই অন্তিম সময়ে তার এবং নাতি দু'টির মুখ অন্তত দেখে যেতে পারতাম। মানুষ একান্নবর্তী
পরিবারে থাকতে অসুবিধা মনে করে। একান্নবর্তী পরিবারে থাকাটা যে কত আরামের যারা পৃথক হয়ে যায়, শুধু
তারাই উপলব্ধি করতে পারে।
সালেহা তো থাকতেই চেয়েছিলো। আদুরি নেসা একটু
ক্ষোভের সাথেই বলল- দুই দুইটা বড় বউ থাকতে সালেহাকে একাই সব কাজ
করতে হতো। তাই জামাই রাগ করে পৃথক হয়ে গেছে।এতে সালেহার কোন দোষ নেই।
কাজ করলে শরীর ক্ষয় হয় না। ছলিমুদ্দিন
বললেন- কাজ করলে শরীর সুস্থ থাকে। আজকাল মানুষের এত অসুখবিসুখ কেন? কাজ না করার জন্যই তো। আরামের শরীরে অসুখ
বাসা বাঁধে।আজকাল দেখ, সিজারিন
ছাড়া সন্তান হয় না। এর কারণও কাজ। আগে
মেয়েরা মরিচ বাটত, ঢেকিতে ধান বানত। তাই সিজারিন
করতে হত না। মরিচ বাটা গেছে, ঢেকি
গেছে, তাই সিজারিন করতে
হচ্ছে। একদিকে আরাম হলে, অন্য
দিকে তো ব্যারাম হবেই। বাদ দাও এসব। দোষ যারই হোক না
কেন, পৃথক হওয়াটা আদৌ ঠিক হয়নি। পাড়লে জামাইকেও খবর পাঠাও। আমার শরীরের যা অবস্থা মনে হয় আর বেশিদিন বাঁচব না।
আদুরি নেসা জানে অসুখ ভালো হবে না। ডাক্তর
ছয় মাস সময় দিয়েছেন। তার দু’মাস তো গেলোই। আর সামনে আছে মাত্র চার মাস। তবুও আদুরি নেসা মনের বেদনা মনে
ধমিয়ে রেখে বললো-
ষাট বালাই! মরবে আপনার শত্রু। আপনি মনে দুর্বলতা আনবেন না। শীঘ্রই ভালো হয়ে যাবেন। রেডিয়েশ্বন কয়টা শেষ হলেই আপনি ভালো
হয়ে যাবেন বলে ডাক্তর বলেছেন। মনে জোর রাখতে হবে। মনের জোর না
থাকলে শুধু শুধু ওষুধে কাজ হয় না।
মনের জোর, দেহের শক্তি থেকেই তো আসে। ছলিমুদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-
দেহেই আমার শক্তি নেই। মনের জোর আসবে কোথা থেকে?
সন্তান দু’টি এবং আমার দিকে চেয়েই মনে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আদুরি নেসা
শান্ত গলায় বললো- আপনার অবিহনে আমরা কেমন করে বাঁচব
সেটাও তো আপনাকে ভাবতে হবে!
সেটা ভেবেই তো এতদিন বেঁচে আছি, গিন্নী। ছলিমুদ্দিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে
বললেন- ফজরুল আজকাল আগের স্বভাব ছেড়ে অনেক ভালো হয়ে
গেছে। সে নিজের দায়িত্ব বুঝেছে। এতেই আমি মনে অনেক শক্তি পেয়েছি।
সেদিন দুই ভাইয়ে মিলে যেভাবে লেট্রিনটা বানিয়ে দিলো, আমি তো অবাক হয়েছি। এখন আমি মরেও
শান্তি পাব। জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য। এটাই তো চিরসত্য কথা। দুই
দিন আগে আর দুইদিন পরে। ফজরুলের সেদিনের কাজ দেখে মনে শক্তি পেয়েছি এই ভেবে যে, আমি মরার
পরে তোমাদের লোকের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মাগতে হবে না। সন্তানই তো মানুষের শক্তি। ফজরুল বাড়ী নেই?
আছে। গোসল করতেছে। স্কুলে যাবে।
স্কুল থেকে এসেই যেন সে সালেহাকে
আনতে যায়।
ঠিক আছে। সে স্কুল থেকে এলেই আমি পাঠিয়ে
দেব।
দুপুরে ফজরুল স্কুল থেকে আসার পরে আদুরি নেসা
বললো- গেদা, যা সালেহাকে নিয় আয়গে’। তোর বাপ সালেহাকে আনতে বলেছেন।
সালেহা বুবুদের বাড়ী থেকে আসতে তো রাত হয়ে
যাবে। ফজরুল বললো- সন্ধ্যেয় আমার ভাড়া
ঠিক করা আছে।
আজ যেতে পারবি না বলে দে। সে অন্য পিলপিলি
নিয়ে চলে যাবে।
ফজরুল সপ্তাহে দুই দিন একটা ভাড়া
মারে সন্ধ্যের সময়। ভাড়া নিয়ে গেলেই করকরে একশ
টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দেয়। এমন একটা ভাড়া হাতছাড়া করলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিলেও সে ভাড়াটা হাতিয়ে নিতে পারে! তাই
ফজরুল বললো- ভাড়া নিয়ে গেলেই এক শ টাকা পাওয়া যায়।
সময় বিশেষ লাগে না। মাত্র এক ঘণ্টা লাগে। তাই এত সহজ
ভাড়া হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
আজকের জন্য অন্য কাউকে পাঠিয়ে দে। আদুরি নেসা উপায় বললো।
না, সম্ভব
না। ফজরুল বললো- সহজ ভাড়া সে হাতিয়ে নিতে পারে!
কথাটা অবশ্যে ফজরুল মিথ্যে বলেনি। আজকাল কে
কার ভালো দেখতে পারে! ফজরুলকে একশ টাকা দেয়। সে যদি পঞ্চাশ
টাকা নেয়, তাহলে ভাড়াটা তাকেই দিযে দিতে পারে।
আদুরি নেসা বললো- একটু তারাতারি কর। এখন গেলে
সন্ধ্যের আগেই বাড়ী ফিরে আসতে পারবি।
বুবুকে ফোন করে জানিয়ে দাও রেডি হয়ে থাকতে।
আমি গিয়ে যেন দেরি করতে না হয়।
ঠিক আছে আমি জানিয়ে দেব’খন। ভাত বাঢ়া আছে। খেয়ে চলে যা তারাতারি।
ফজরুল নাকেমুখে ভাত গোঁজে সালেহাদের বাড়ী
চলে এলো। তারাতারি করার জন্য ফজরুল সালেহাকে তাগিদা দিলো- বুবু, তারাতারি চল। সন্ধ্যেয় আমার
একটা ভাড়া আছে। ভাড়াটা না মারলে অসুবিধা হবে।
সালেহা বললো- মা আমাকে ফোন দিয়েছিলো
তারাতারি যাওয়ার জন্য। তাই আমি আগে থেকেই রেডি হয়ে বসে আছি। আমি
বাড়ীতে একা থাকি। তোর দুলাভাই থাকে গুয়াহাটী। একটি গরু এবং
কয়েকটা ছাগল আছে। হাঁস মুরগিও রয়েছে। সেগুলোকে এমনি এমনি রেখে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। তাই দেখাশুনা করার জন্য একজন লোকের প্রয়োজন।
পারারই একজনকে আসতে বলেছি। বিধবা মানুষ। আমি খালা বলে ডাকি।
খালা আসলেই চলে যাব।
ফজরুল সেই বিধবাটি আসার
অপেক্ষায় ছট্ফট্ করে সময় পার করতে লাগলো। এর মধ্যেই
যার ভাড়া মারে সে দুই বার ফোন দিলো। সন্ধ্যে গড়িয়ে যাওয়ার পর সেই
বিধবা খালা লোকটি এল। ফজরুল যতদূর তারাতারি সম্ভব সালেহাদের
নিয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো।
সহর পাওয়ার সাথে সাথে যার ভাড়া মারে সেই
লোকটি ফোন দিয়ে বললো- ফজরুল তুমি কোথায়?
এইমাত্র সহর পেয়েছি। ফজরুল বললো- একটু
অপেক্ষা করেন। বুবুকে নামিয়ে দিয়েই আমি এক্ষুনি চলে আসব।
ঠিক আছে। আমি রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করছি।
তুমি আমার সাথে দেখা করে যেও। ভারাটিয়া লোকটি বললো।
ফজরুল কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ভারাটিয়া
লোকটির কাছে এসে পৌঁছোল। ভারাটিয়া লোকটি একটি ছোট ব্যাগ ফজরুলকে দিয়ে
বললো- এই ব্যাগটা নিয়ে যাও। তোমার বুবুকে নামিয়ে দিয়েই প্রত্যেক
দিন আমাকে যেখানে নামিয়ে দাও সেখানে যেও। সেখান থেকে ব্যাগটা একজন লোক নিয়ে যাবে। আমি তাকে ফোন করে বলে
দিয়েছি। তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে না। সে রাস্তায়ই তোমার
অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে।
কেন আপনি যাবেন না? ফজরুল জিজ্ঞাসা করলো।
না, আমি আজ
যাব না। তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ। আমার অন্য এক জায়গায় যেতে হবে। অসুবিধা নেই। তুমি একাই নিয়ে যাও। তোমার বুবুকে নামিয়ে দিয়েই কিন্তু ব্যাগটা জায়গা মতো পৌঁছে দিও।
ফজরুল তারাতারি রিক্সা চালিয়ে এসে সালেহাকে
নামিয়ে দিয়েই যথাস্থানে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলো। গন্তব্যস্থানে পৌঁছোনোর সাথে সাথে একদল পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে
রিক্সায় খানাতল্লাশি চালালো। ভারাটিয়া লোকটি দিয়ে যাওয়া
ব্যাগটি একজন পুলিশের হাতে পড়ার সাথে সাথে পুলিশকর্মীটি বলে উঠলো- পেয়েছি, স্যার।
ব্যাগটির মধ্যে পঞ্চাশ পূরিয়া ড্রাগস্ ছিলো।
পুলিশ ফজরুলকে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর
আটক করলো। তারপর ফজরুলের মুখে ব্যাগ দেওয়া লোকটির বৃত্তান্ত শুনে মোবাইল ‘ট্র্যেক’ করে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ প্রেরণ করলো।পুলিশ ফজরুলকে জুভেনাইল জাস্টিসের কাছে ফরওয়ার্ড করে থানায় বসিয়ে রেখে আদরি
নেসাকে ফোন দিলো।
আদুরি নেসা থানায় আসার পর পুলিশের তরপ থেকে
জানিয়ে দিলো- তোমার ছেলেকে ড্রাগস
সরবরাহের কেসে আটক করা হয়েছে। ওকে ‘জুবিনেল
জাস্টিস বোর্ডে’ ফরওয়ার্ড করে দিয়েছি। উপযুক্ত জামিনদার দিয়ে সেখান থেকে তোমার ছেলেকে জামিনে
নিতে পারবে।তোমাদের ই-রিক্সাটি থানায় জমা
রয়েছে। তুমি ইচ্ছা করলে রিক্সাটি নিয়ে যেতে পারবেন।
বাড়ীর অবস্থার কথা জানিয়ে আদুরি নেসা বললো-
স্যার, ওর বাবার কেন্সার কখন মরে যায় ঠিক নেই। নাবালক ছেলে। স্কুলে পড়ে। ওকে ছেড়েদিন স্যার।
নাবালক ছেলে হয়ে রিক্সা চালাচ্ছে। এটাও তো
অপরাধ। ও ছোটখাট অপরাধী নয়। ড্রাগস্ সরবরাহকারী। ওকে ছেড়ে দেওয়া
সম্ভব নয়। বাড়ী যাও। বাড়ী গিয়ে উকিল ধরে জামিনের ব্যবস্থা
করগে'।
ফজরুল নিজে তো ব্যবসা করে না। আদুরি নেসা
বললো- ভাড়া মারছে। ভাড়া মারা কি অপরাধ?
ড্রাগসের ভাড়া মারা মারাত্মক অপরাধ। ও নিজে যে এই ব্যবসার সাথে
জড়িত নয় তুমি কি হলফ করে বলতে পারবে? পারবে না। যাও জামিনের
ব্যবস্থা করগে’।
স্যার, নাবালক ছেলে, না
জেনে অপরাধ করে ফেলেছ। ওকে এইবারের জন্য
োছেড় দিন, স্যার।আমি কথা দিচ্ছি, ও এ
রকম কাজ আর করবে না। আদুরি নেসা এভাবে অনেক অনুনয় বিনয় করলো যদিও পুলিশ তার
অনুনয় বিনয়ে কর্ণপাত
করলেন না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে আদুরি নেসা ই-রিক্সা নিয়ে বাড়ী
চলে এল।
পরের দিন উকিল আব্দুর রহমান সাহেবকে নিয়ে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে গিয়ে জামিনের ব্যবস্থা করে ফজরুলকে বাড়ী নিয়ে এলো।
এগার
জামিনে আসার পর ফজরুল রিক্সা চালানো ছেড়ে
নিয়মিতভাবে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে লাগলো। ই-রিক্সাটা অন্য একজনকে
ভাড়ায় চালাতে দিলো।
এর মধ্যেই সমগ্র বিশ্ব জুড়ে কভিড-এর তাণ্ডব
শুরু হলো। সারা দেশে তখন লক ডাউন চলছে। জনজীবন বিধ্বস্ত। সবাই
গৃহবন্দি। দোকানপাট বন্ধ। গাড়ী মটর, রেল, বিমান সেবা বন্ধ। কালকারখানা
বন্ধ। স্কুল কলেজ বন্ধ।মন্দিরে আরতি বন্ধ। মসজিদে আজান, নামাজ বন্ধ।সবাই কর্মহীন। রাস্তাঘাটে
জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নাই। রাস্তায় বেরোলেই পুলিশের লাঠিচার্জ। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ।
আদুরি নেসার কাজ বন্ধ হয়ে গেলো। রাজার গোলা
চেটে খেলেও এক সময় শেষ হয়ে যায়। ফজরুলদের হাতে যা টাকা পয়সা
ছিলো লক ডাউনের ফলে সব শেষ হয়ে গেলো। এমন এক পরিস্থিতি
উদ্ভব হলো, যে এক বেলা আধাপেট খেয়ে এবং এক বেলা না খেয়ে দিন পার করতে
লাগলো।লক ডাউনের মধ্যেই একদিন ছলিমুদ্দিন মৃত্যুবরণ করলেন। ছলিমুদ্দিনের মৃত্যুর
পর আদুরি নেসা শোক-তাপ ভোলে ছেলে দু’টিকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করলো।
একদিন ফজরুল বললো- মা, এ রকম না খেয়ে আর কত দিন কাটাব।ক্ষিদের জ্বালা আমার
সহ্য হয না, মা।
তোরা আধাপেটে, না খেয়ে
থাকিস, আমারও কি ভালো লাগে। কিন্তু
কি করব, বল।উপায় নাই।যতদিন কাজে যেতে না পারি, ততদিন এভাবেই কাটাতে হবে। এভাবে বলে আদুরি নেসা ফজরুলকে সান্ত্বনা দিলো।
উকিল ভাইর তো অনেক টাকা। উকিল ভাইকে বলে কিছু
টাকা কর্জ নাও না। ফজরুল বললো- লক ডাউন ফুরালেই আমি কাজ করে সব
টাকা শোধ করে দেব।
গেদা, আরবে
চাঁদ উঠলে, সব জায়গায়ই চাঁদ দেখা যায়। উকিলদেরও কামাই
নাই কোর্ট বন্ধ থাকার জন্য। সেদিন খালা (উকিল সাহেবের বউকে
আদুরি নেসা খালা বলে ডাকে) বললো-হাতে টাকা নেই। তাই উকিল সাহেব জমি বিক্রী করার
জন্য গ্রামের বাড়ী গিয়েছিলেন।
তাহলে তো উকিল ভাইর কাছে জমি বিক্রী করা অনেক
টাকা আছে।
জমি বিক্রী করলে তো টাকা থাকবে। গ্রাহক
পায়নি বলে জমি বিক্রী করতে পারেনি। এই লক ডাউনের বাজারে কার কাছে টাকা
আছে বল। সবার একই অবস্থা। নোট বন্দির ফলে যে রকম রাজা, প্রজার
অবস্থা এক হয়েছিলো, লক
ডাউনের ফলেও সবার অবস্থা সেই একই রকম হয়েছে।
ফজরুল হঠাৎ বলে উঠলো- এই লক ডাউনের বাজারে
সবারই ব্যঞ্জনের অভাব। কেউ বাজার করতে পারছে না। ব্যঞ্জনের অভাবে
অনেকে নুন ভাত খেয়ে দিন গুজরান করতেছে। আমি কাল সন্ধ্যায় পশ্চিম পারা গিয়েছিলাম। শশা, ঝিঙা, টমাটো পেকে পেকে ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আমি যদি সেগুলো সস্তায় কিনে এনে বাড়ী বাড়ী গিয়ে ফেরি করে বিক্রী করেত পারি, তাহলে
মনে হয় ভালোই লাভ হবে।
ইউটিউবে ভিডিও দেখছিস না। আদুরি নেসা বললো-
রাস্তায় বেরোলেই পুলিশ কি রকম গরু পেটা করছে? পুলিশের পিটুনি খেয়ে মরার চেয়ে না খেয়ে
মরাই ভালো, বাপ। তদুপরি তোর দুর্নাম
আছে। তুই ড্রাগসের কেসে একবার পুলিশের হাতে ধরা পরেছিলি। কোনওদিন কোনও খারাপ কাজ করবি না বলে লেখা দিয়ে তোকে জামিনে
এনেছি।পুলিশের হাতে ধরা পড়লে
পুলিশ যদি তোকে আবার ধরে নিয়ে যায় তখন কি করবি ?
পুলিশ তো আর সব সময়
থাকে না। ফজরুল বললো- সন্ধ্যার সময় পুলিশ থাকে না। আর পুলিশ আসে মেইন
রাস্তা দিয়ে। আমি সন্ধ্যের সময় ক্ষেতের আইল ধরে গিয়ে ব্যঞ্জন নিয়ে আসব এবং খুব সকালে গিয়ে ফেরি করে বিক্রী করব। মানুষেরও উপকার হবে, আর আমরাও
দু’পয়সা উপার্জন করতে
পারব।
সন্ধ্যের সময় ক্ষেতের আইল দিয়ে যাবি? তোর ভয় করবে না?
না, করবে না।
আমি ভূতপ্রেত বিশ্বাস করি না। ভূতপ্রেত হলো মনের ভ্রম। বিজ্ঞানের স্যার একদিন কথাটা আমাদের বুঝিয়ে বলেছে।
ওনারা তো সহরে থাকেন, সারারাত লোকজন চলাফেরা করে। ওনারা ভূত দেখবেন
কোত্থেকে?
তুমি যদি এতই ভয় করছ, তাহলে নজরুলকে সাথে নিয়ে যাব। নজরুল তো ভূত
দেখে ভয় করে না।
না গেদা। আদুরি নেসা বললো- কয়দিন আগে তোদের
বাপ মরেছে। সেই শোকই কাটিয়ে উঠতে পারতেছিনা। এর মধ্যে যদি
তোদের কিছু হয়ে যায়, আমি
একেবারে মরে যাব।
নজরুল কাছেই বসে ছিলো। সে বললো-না খেয়ে মরার
চেয়ে পুলিশের পিটুনি খেয়েই মরব।তবু না খেয়ে শুকিয়ে মরব না। আর পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পুলিশ আমাদের মারবে
না। থানার সব পুলিশই আমাকে চেনে।
পুলিশ চেনে, মানে? আদুরি
নেসা অবাক বিস্ময়ে বললো- পুলিশ তোকে কীভাবে চেনে?
আমি থানার নারকেল গাছের নারকল পেড়ে দিই।
সুপারি, আম, কাঁঠাল
পেড়ে দিই। নজরুল বললো- পুলিশের বাড়ীতে আমাকে ভাতও খেতে দেয়।
তার মানে তুই স্কুল ক্ষতি করে থানার গাছের
নারকেল পেড়ে দিস? আদুরি
নেসা প্রশ্ন করলো।
স্কুল ক্ষতি করে পেড়ে দিব কেন? নজরুল বললো- ছুটীর দিনে পেড়ে দিই। শুধু
থানারই না।অনেক লোকের বাড়ীতে গিয়েও নারকেল, সুপারি
পেড়ে দিই। সহরের বড় বড় অনেক লোকের সাথে আমার পরিচয়। মাগনা তো
পাড়ি না। দস্তুর মতো টাকা নিই। আমি স্কুলে যাওয়ার সময় কয় টাকা দাও
তুমি?
কেন তোকে যে বিশ টাকা করে দিই সেই টাকা কি
করিস?
বিশ টাকা পিলপিলিতে আসা যাওয়াতেই লাগে।
লেজারের সময় সবাই এটা ওটা কিনে খায়। আমার কি খেতে মন চায় না! আমি কি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব?
হেঁটে গেলেই তো বিশ টাকা বেঁচে যায়!
দুই তিন মাইল রাস্তা হেঁটে যাওয়া যায় নাকি?
আরে দুই তিন মাইল রাস্তা আবার রাস্তা হলো না
কি? আদুরি নেসা অতীত রোমন্থন করে বললো- আমি এল, পি পাস
করার পর কয়েকদিন এম, ই স্কুলে
গিয়েছিলাম। এম, ই স্কুল আমাদের বাড়ী
থেকে চার মাইল দূরে ছিলো। আমাদের গ্রামের পাকু বেপারী পঁচিশ মাইল রাস্তা হেঁটে আঠিয়া বাড়ী(বর্তমান বরপেটা রোড) যাওয়া আসা করত।
তখনকার কথা আর এখনকার কথার মধ্যে অনেক তফাৎ।
আগে তো তোমরা খড়ের ঘরে থাকতে। এখন টিনের ছাপরায় থাক কেন? খড়ের ঘরে থাকলেই পার।নজরুল বললো।
টিনের ছাপরার চেয়ে খড়ের ঘরে থাকাটাই অনেক
সুখের ছিলো। গ্রীষ্মের দিনে ঘর ঠাণ্ডা থাকত। গরমে হাপিত্যাশ করতে হত
না। আমরা মাটির হাড়িতে রান্না করা ভাত, তরকারি খেতাম। তাই গেসট্রিক
হত না। মাটির কলশের জল খেতাম। ফ্রিজের চেয়েও ঠাণ্ডা থাকত সেই জল। খেলে আত্তাটা জুড়িয়ে যেত। লক ডাউন খুললে হেঁটেই স্কুলে যাবি। স্বাস্থ্য
ভালো থাকবে। পরিশ্রম করলে রক্ত চলাচল বেশি হয়। তাই স্বাস্থ্য
ভালো থাকে।
আমি হেঁটে স্কুলে যেতে পারব না। নজরুল
ক্ষোভের সাথে বললো- কতদিন একটা সাইকেল কিনে দিতে বলেছি। দিয়েছ সাইকেল কিনে?
টাকা থাকলে তো দিব। তোর বাপের চিকিৎসায় কত
টাকা খরচ হয়ে গেছে, তার খবর
রাখিস? টাকা থাকলে কি আর তোদের আবদার আমি পূরণ না করে থাকি?
তাহলে আমি এটা ওটা পেড়ে দু’পয়সা উপায় করলে তুমি খারাপ পাও কেন?
আরে বাপ, তোরা তা বুঝবি না। যখন ছেলে মেয়ের বাপ হবি তখন বুঝতে পারবি আমি কেন মানা করছি। গাছ থেকে পড়ে গেলে তখন কি হবে?
পড়ব কেন? নজরুল বললো- দস্তুরমতো পায়ে
রশি জড়িয়ে নিই। তারপর গাছে উঠি।
দ্যাখ, যা
করেছিস, করেছিস। আর কোনোদিন গাছে উঠবি না। তোর নানা
গাছ থেকে পড়েই মারা গিয়েছিলো।
ঠিক আছে গাছে উঠব না। নজরুল বললো- স্কুলে
যাওয়ার সময় দৈনিক পঞ্চাশ টাকা করে দিতে হবে। দিতে পারবে?
স্কুল খোলা হোক তখন দেখা যাবে। আদুরি নেসা
বললো- তাই বলে তোকে লোকের গাছে চড়ে নারকেল পারতে হবে না। আর একটা কথাও বলবি না। রাত অনেক
হেয়ছে। এখন শোয়ে পড়।
সেদিন রাতে ফজরুলের কানের কাছে মুখ এনে নজরুল
ফিসফিস করে বললো-দ্যাখ ভাই, মা যাই বলুক না কেন। আমরা সবজির ব্যবসা করবই। এভাবে না খেয়ে থাকতে
পারব না।
মা, মানা
করতেছে। কীভাবে করবি?
মা জানতেই পারবে না। চুপিচুপি মাকে না
জানিয়ে আমরা যেভাবে লেট্রিনটা বানিয়েছিলাম।সেভাবে সন্ধ্যায় চুপিচুপি গিয়ে সবজি
কিনে আনব এবং সকালে গিয়ে সেই সবজি বিক্রী করব।
দ্যাখ মা’র অনুমতি ছাড়া আমি যাব না। ফজরুল দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আর তুইও যাবি না।
মা’র কথা
মতো চললে না খেয়ে মরতে হবে। নজরুল বললো- আমি না খেয়ে মরব না।
কি করবি?
সবজির ব্যবসা করব।
ফজরুল ভাবলো, তর্ক করে থাকলে সারারাতেও তর্ক শেষ হবে না। এখন মুখে বললেও নজরুল নিশ্চয়ই মা’র কথা
ফেলবে না। তাই সে বললো- রাত অনেক হয়েছে। এখন ঘুমো। যা করার কাল
সকালে করিস। এখন একটাও কথা বলবি না। আমার ঘুম পাচ্ছে।
ফজরুল ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু নজরুলের চোখে ঘুম নেই। কীভাবে সবজির
ব্যবসা শুরু করবে এই চিন্তায় সে বিভোর হয়ে রইল। এক সময় সেও নিদ্রার
কোলে ঢলে পড়লো।
বার
পরের দিন খুব ভোরে সালেহা এলো তার সন্তানদের
নিয়ে। সালেহার বয়স একৈশ বছর। তবে দেখাচ্ছে একেবারে বুড়ীর মতো।
যেন অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে তার শরীরের ওপড় দিয়ে। চেহেরা
বিধ্বস্ত। চোখ দু’টি
কোটরাগত। চুলগুলো বিশৃংখল এলোমেলো। দেহে যেন রক্ত মাংস নেই। মরা
বোয়ালের মতো রক্তশূন্য। কাপড়চোপড় নোংরা। শতছিন্ন। চলার শক্তি নেই। যেকোনো মুহূর্তে মূৰ্চ্ছা যেতে পারে এমন দৈন্য অবস্থা।
ছেলে দু’টির মুখও শুকনো। শরীরে হাড় কয়টির বাহিরে কিছুই নেই। চামড়া কুঁচকে
গেছে। পেট ঢোলের মতো ফুলে উঠেছে।
সালেহা এসেই ছেলে দু’টি নিয়ে বারান্দায় ধপ করে বসে পড়ল।
নজরুল তার রাতের সিদ্ধান্ত মতো সবজি কিনতে
যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। কারণ সে রাতে অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত
নিয়েছে, ভোর হলেই সে কাউকে না জানিয়ে তার জমানো টাকা নিয়ে সবজি কিনতে যাবে। কারণ ইতিমধ্যেই সে প্রায়
দু’শ টাকা জমিয়েছে লোকের গাছের নারকেল এবং সুপারি পেড়ে।
তখনও ফর্সা হয়নি। ভূতের ভয় নেই বলে রাতে
নজরুল যে দম্ভ করেছিলো সালেহাকে দেখে তা উবে গেলো। সালেহাকে দেখে ভয়
পেয়ে সে দৌড়ে ঘরের ভেতর গিয়ে ফজরুলকে ডাকলো- ভাই. উঠ।
কে যেন বারান্দায় দু'টি ছোট
ছেলে নিয়ে এসে বসে রয়েছে। মানুষ না। মনে হয় ভূতটুতই
হবে।
ফজরুল জেগেই ছিলো। সে বললো- ভূত? এই সাত সকালে কোথা থেকে ভূত আসবে? চল তো দেখি কোথায় ভূত?
নজরুল এবং ফজরুল উভয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো।
তাদের দেখে সালেহা নাকি স্বরে বললো- ভয় পাসনে। আমি। তোদের বোন। সালেহা।
ফজরুল একদিন শুনেছিলো, ভূতেরা
নাকি স্বরে কথা বলে। কথাটা বলেছিলেন তার জেঠা।
তখন নদীতে প্রচুর মাছ ছিলো।হ্যাজাকের আলোতে সেই মাছ ধরার প্রচলন ছিলো। বন্যার জলে মাছ
ক্ষেতখোলা, নালা, খাল বিলে
উঠে আসত। হ্যাজাক নিয়ে গেলে নায়ের খোল ভর্তি করে মাছ পেত।
সেদিন তার জেঠা হ্যাজাক নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। নায়ের খোল
ভর্তি মাছও পেয়েছিলেন।
এমন সময় একটু আবছা অন্ধকারের মতো কিছু একটা
এসে একটু দূর থেকে নাকি স্বরে বললো- এই কলিমুদ্দিন,(জেঠার নাম কলিমুদ্দিন ছিলো)তুই
দেখছি আজ অনেক মাছ পেয়েছিস দেখছি। এত মাছ একা একা
খেলে হজম হবে না বুঝলি। আমাকে বড় কাতলটা দিয়ে যা।
তখন জেঠা সাহস করে বলছিলেন- বড়
কাতলাটা দেব না। আমরা খাব।মাছ ধরেছি আমি, আর কাতলাটা খাবি তুই? তা হবে না। এভাবে
বলে ছোট একটা মাছ ডিল ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন- যা, এটাই নিয়ে যা। খালে বিলে থাকিস। মাছ ধরে
খেতে
পারিস না। মাছ ধরতে এলেই শুধু শুধু দিগদারি করিস।
আমি মাছ ধরবো কীভাবে? ভূত বলেছিলো- আমি যে
নুলো ভূত রে। ছেলেবেলা গাছ থেকে পড়ে গিয়ে হাত দু’টো ভেঙ্গে গিয়েছিলো।
এভাবে বলেই ভূতটা মাছ নিয়ে চলে গিয়েছিলো।
তাই নাকি স্বরের কথা শুনে ফজরুল অধিক ভয়
পেয়ে আতস্বরে বললো-ওরে বাবারে!ভূত।বলেই সে দৌড়ে ঘরের ভেতর গিয়ে মাকে ডাকলো- মা, উঠ। বারান্দায় ভূত বসে রয়েছে।
আদুরি নেসা অবাক কণ্ঠে বললো- কোথায় ভূত? ধান্দা দেখেছিস মনে হয়। এই সাত সকালে কোথা থেকে ভূত আসবে?
নজরুল বললো- সত্যিই ভূত। নাকি স্বরে কথা বলছে। জেঠা একবার বলছিলো না, ভূত নাকি স্বরে
কথা বলে।
বাদ দে তোর জেঠার কথা। আদুরি নেসা বললো- তোর
জেঠা অনেক সময় সাজিয়ে সাজিয়ে কথা বলতো। তাঁর অনেক কথার মধ্যে
কোনই সত্যতাই ছিল না।
নজরুল ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে মা’র শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো- তুমি আগে গিয়েই দ্যাখ না। আমরা মিথ্যা বলছি না।
চল দেখি কোথায় ভূত।
আদুরি নেসা বাইরে বেরিয়ে এল। তার পাছে পাছ
ফজরুল এবং নজরুলও বেরিয়ে এল।
ইতিমধ্যে অনেক ফর্সা হয়ে উঠেছে। আদুরি নেসা
দেখলো, কে একজন দু’পা মেলে বারান্দায় বসে আছে। তার পাশে দু’টি ছেলে।
আদুরি নেসা জিজ্ঞাসা করলো- কে তুমি? এই সাত সকালে কোথা থেকে এসে এভাবে বসে আছ?
সালেহা থেমে থেমে বললো- মা, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি সালেহা।
আদুরি নেসা সালেহাকে চিনতে পারল। বললো-
সালেহা? তুই? তুই এই
সাত সকালে কোথা থেকে এলি?
বাড়ী থেকে এসেছি মা।
বাড়ী থেকে এসছিস মানে? কখন রওয়ানা হয়েছিলি?
সন্ধ্যে গড়িয়ে যাওয়ার পর বাড়ী থেকে
বেরিয়েছিলাম। জিরাইতে জিরাইতে এসে এইমাত্র এসে পৌঁছেছি।
এভাবে রাতে আসার কারণ? বাড়ীতে কি কোন অঘটন ঘটেছে? জামাই জানে তুই এভাবে এসেছিস? আদুরি নেসা অবাক কণ্ঠে
প্রশ্ন কয়টি করলো।
তোমাদের জামাই বাড়ী নেই। দিনে তো লোকজনকে
চলতেই দেয় না। সালেহা মিন মিনে স্বরে বললো- রাস্তায় বেরোলেই
পুলিশ মারে। তাই রাতেই এসেছি।
রাতে আসতে তোর ভয় করল না?
পেটে ক্ষিদা থাকলে ভয় ডর থাকে না, মা। আজ দুইদিন যাবত পেটে জলের বাহিরে দানা বলতে কিছুই পরেনি। সালেহা বলে গেলো তার দুঃখের কাহিনী- লক ডাউনের
ফলে তোমাদের জামাইর কাজ বন্ধ। লক ডাউনের জন্য বাড়ীতেও
আসতে পারছে না।গাড়ি মটর
নেই। আসবে কেমনে ? এদিকে কাজও নেই। তাই টাকাও পাঠাতে পারেনি। বাড়ীতে যা থালাঘটি ছিলো তাই বিক্রীকরে পনের দিন
চলেছি। তোমাদের দেওয়া সাধের রুপোর মালাটাও বিক্রী করে
খেয়েছি। দুইদিন কর্জ করে খেয়েছি পারারই এক খালার
কাছ থেকে। এখন কেউ কর্জও দেয় না। দিবেই বা কোথা থেকে? থাকলে তো দিবে? দুইদিন
কচু খেয়েও কাটিয়েছি। এখন কচুও পাওয়া যায় না। সবাই এখন কচু খাচ্ছে। থাকবে কোথা থেকে! তাই দু’দিন না
খেয়ে থেকে মরণে শরণ দিয়ে সন্ধ্যে গড়িয়ে যাওয়ার পর বাড়ী থেকে
বেরিয়েছি। তোমাদের ঘরে খাবার থাকলে ছেলে দু’টিকে
খেতে দাও। ওরাও কাল থেকে জলের বাহিরে কিছুই খায়নি।
আমাদেরও তোদের মতই অবস্থা মা। আদুরি নেসা
দীর্ঘনিঃশ্বাস টেনে বললো- আমরাও এক বেলা আধাপেট খেয়ে আর এক বেলা
না খেয়ে দিন গুজরান করছি। ঘরে আয়। কিছু একটা ব্যবস্থা
করতেছি। এভাবে বলেই সে ছোট ছেলেটিকে কোলে নিয়ে আদর করে বললো- আমার দাদুভাই একেবারে শুকিয়ে গেছে। চিন্তা করো না। আমি এক্ষুনি কিছু
একটা ব্যবস্থা করতেছি।
ফজরুল বললো- কাল না বললে ঘরে চাল নেই। এখন
চাল পাবে কোথায়?
সংসার করতে গেলে সব সময় বিপদের সম্বল রাখতে
হয়, বাপ। এক কেজি চাল বাক্সে ভরে রেখেছি। তাই রান্না করে দিব।
মা, আমি কাল
এক প্যাকেট বিস্কুট এনে রেখেছি খুব খিদে পেলে খাব বলে। নজরুল বললো-সেই বিস্কুট
ভাগনে দু’টোর জন্য এনে দিচ্ছি।
নজরুল বিস্কুটের প্যাকেট এনে সালেহার হাতে
দিলো। সালেহা প্যাকেট খুলে ছেলে দু’টিকে খেতে দিলো।
ফজরুল বললো- মা, আমি উকিল ভাইদের বাড়ী গিয়ে দেখি খাবার আছে
কিনা।
আদুরি নেসা বললো- যা, থাকতেও পারে। থাকলে এক্ষুনি নিয়ে আসবি।
ফজরুল উকিল সাহেবের বাড়ী চলে গেলো। আদুরি
নেসা বাক্স থেকে চাল বের করে ধোয়ার জন্য কলের পারে নিয়ে গেলো।
একটু পরেই ফজরুল উকিল সাহেবের বাড়ী থেকে এক
থালা ভাত নিয়ে এলো।
সালেহা ভাত খেয়ে মাটিতেই আঁচল বিছিয়ে শোয়ে
পড়ল। একটু পরেই তার নাক ডাকতে লাগলো।
ফজরুল মা’র কাছে
এসে বললো- এখন কি করবে? আমাদেরই
খাবার জোটে না। এর মধ্যে আবার বুবু এসে পড়লো।
কি করব, আমি কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। আদুরি নেসা চিন্তাক্লিষ্ট
কণ্ঠে বললো- মুখ আল্লাহই দিয়েছেন যদি উপায়ও তিনিই বের করবেন।
আল্লাহ নিজে তো কিছু করে না, মা। যা করার সব মানুষকে দিয়েই করায়।
মানুষের বুদ্ধি আল্লাহ যোগায় বলেই তো মানুষ
উপায় বের করতে পারে। আদুরি নেসা এভাবে বলে ফজরুলকে সান্ত্বনা দিলো।
নজরুল কাছেই ছিলো। সে বললো- আল্লাহই আমার
মাথায় একটা বুদ্ধি খেলিয়েছে, মা।
কি বুদ্ধি? আদুরি নেসা আশান্বিত চোখে নজরুলের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য কণ্ঠে বললো-
কি বুদ্ধি বল না?
আল্লাহ আমাকে বললেন, যদি বাঁচতে চাস তো সবজির ব্যবসা কর।
তাই কর, বাপ। আদুরি নেসা বললো- দেখে
শুনে যাস কিন্তু। পুলিশের হাতে মার খাস না যেন।
দেখে শুনেই যাব। ফজরুল বললো- তুমি চিন্তা কর
না। নজরুল বেরো। এত সকালে পুলিশ আসবে না। এক্ষুনি পশ্চিম পারা গিয়ে সবজি কিনে আনব।
দুই ভাই দু’টি বস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সবজির উদ্দেশ্যে। পশ্চিম পারা গিয়ে
শশা এবং টমাটো একেবারে সস্তায় কিনে এনে ফেরি করে বিক্রী করতে লাগলো।
সবারই সবজির দর্কার। তাই চরা দাম দিয়েই লোকে
তাদের কাছ থেকে সবজি কিনতে লাগলো ।
নাস্তার বেলার আগেই তাদের সবজি বিক্রী হয়ে
গেলো। তাদের লাভ হলো মোট একশ আশি টাকা। তিন কেজি চাল এবং নুন তেল
কিনার পরেও তাদের হাতে চল্লিশ টাকা থাকল। বিশ টাকা দিয়ে
ভাগনেদের জন্য দুই প্যাকেট বিস্কুট এবং তাদের জন্য দশ টাকার চানাচুর কিনে বাড়ী ফিরলো। দশ টাকা এনে আদুরি নেসার হাতে দিলো।
তের
সবজির ব্যবসা করে ভালোভাবেই দিন কাটতে লাগলো।
দৈনিক সন্ধ্যেবেলা নানান স্থান থেকে সবজি কিনে এনে সকালে বাড়ী
বাড়ী গিয়ে ফেরি করে বিক্রী করে। উদ্ধৃত না হলেও চাল, ডাল, নুনের পয়সা জোটে। অঞ্চলের সবাই
সকাল বেলা ফজরুল এবং নজরুলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কখন
তারা আসবে এবং সবজি কিনবে তার জন্য।
এখানে একটা গল্প বলি। গল্পটা ফজরুল এবং
নজরুলের সবজির ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রাসংগিক হবে কি না, সে বিচার পাঠকের ওপড় ছেড়ে দিলাম।
বহুকাল আগের কথা। একদিন একজন রাজা রাজ-দরবারে
বসে মন্ত্রী পরিষদদের সাথে হাস্য-কৌতুক করছিলেন।। হাস্য-কৌতুকের মাঝে মন্ত্রী হঠাৎ
বলে উঠলেন- মানুষগুলো ঠিক ভেড়ার পালের মতো। ভেড়াগুলোর একটা
কোনো দিকে দৌড়োলে বাকীগুলোও কোনও বাচ-বিচার না করেই তার পিছনে পিছনে দৌড়োতে শুরু করে।কেউ কোন গুজব রটনা করলে মানুষগুলোও সেই রকম কথাটার সত্যমিথ্যা বিচার না করেই সেই গুজবে ভেসে
বেড়ায়।
কথাটা শুনে রাজার কপালের বলি রেখা কুঞ্চিত
হয়ে উঠলো। কারণ তিনিও তো মানুষ!তাহলে তিনিও ভেড়ার মতো না কি? রাজার আত্মসন্মানে আঘাত লাগলো। তিনি
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন- ঠিক আছে, মানুষগুলো যে ভেড়ার পালের মতো কথাটা আপনি প্রমাণ করে দেখাতে হবে। আপনাকে আমি একমাস সময় দিলাম। এই
একমাসের মধ্যে যদি আপনি কথাটা প্রমাণ করে দেখাতে না পারেন, তাহলে মাস পরে আপনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
রাজার কথা শুনে মন্ত্রী অস্থির হয়ে উঠলেন।
তিনি বলা কথাটা একশ ভাগ সত্য যদিও প্রমাণ করে দেখায় কীভাবে?
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মন্ত্রী বাড়ী ফিরলেন।
কথাটা তিনি কীভাবে প্রমাণ করে দেখাতে পারেন সেদিন থেকে সেই চিন্তায় মগ্ন
হয়ে পড়লেন। তিনি রাজ-দরবারে যাওয়া এবং ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলেন। মন্ত্রীর এ রকম আচরণ দেখে বাড়ীর
লোকগুলো চিন্তান্বিত হয়ে পড়লো।
মন্ত্রীর একটি কন্যা ছিলো। তিনি খুবই
বুদ্ধিমতী ছিলেন। পিতার অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- বাবা, কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করতেছি আপনি রাজ-দরবারেও যান না এবং ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করেন না। কারও সাথে তেমন কথাবার্তাও
বলেন না। আপনার কোনও অসুখ হয়েছে নাকি, বাবা?
মেয়ের কথা শুনে মন্ত্রী বললেন-না মা, কোন অসুখ-বিসুখ হয়নি। তবে আমার মরণের সময় পাশ চেপে এসেছে।
মন্ত্রী-কন্যা বললেন- অসুখ-বিসুখ হয় নাই যদি
মৃত্যুর প্রশ্ন এলো কোথা থেকে বাবা?
মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী রাজ-দরবারের
কথাগুলো ভেঙ্গে বললেন। মন্ত্রীর কথা শুনে মন্ত্রী-কন্যা কিছু সময় চিন্তা করে
বললেন- মানুষগুলো যে ভেড়ার পালের মতো কথাটা আমি প্রমাণ করে
দেখাব, বাবা। আপনি এই বিষয়ে কোন চিন্তা করার
প্রয়োজন নেই। আপনি এক মাসের ছুটী নিয়ে বাড়ীতে আরাম করে
শোয়েবসে কাটান।
পরের দিন সকালে মন্ত্রী-কন্যা রাজদরবারে এসে
রাজার সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন- মহারাজ, মানুষগুলো যে ভেড়ার পালের মতো
পিতা একমাসের মধ্যে প্রমাণ করে দেখাবে বলে আমার কাছে বলে
পাঠিয়েছে। সেজন্য কয়েকজন শ্রমিক এবং কিছু টাকার প্রয়োজন এবং পিতাকে এক মাসের ছুটী দিতে হবে।
রাজা বললেন- একমাস কেন, আমি দু’মাসের
ছুটী দিতেও প্রস্তুত আছি। টাকা-পয়সা এবং শ্রমিক আমি আজই পাঠিয়ে দিব।
রাজার নিকট থেকে আশ্বাস পেয়ে মন্ত্রী-কন্যা
বাড়ী এসে কথাটা মন্ত্রীকে অবগত করলেন এবং তিনি কি করতে চাইছেন, তা আনুপূর্বিক ভেঙে-পেতে বললেন। মেয়ের কথা
শুনে মন্ত্রীর মুখে হাসির রেখা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।
বিকেলে রাজ-দরবার থেকে টাকা এবং শ্রমিক এলো।
মন্ত্রী-কন্যা শ্রমিক এবং টাকা নিয়ে পরের দিন সকালে এক গভীর অরণ্যের
ভেতরে প্রবেশ করে তাঁবু টানালেন। তাঁবু টানানোর পরে কয়েকজন শ্রমিক সহরে পাঠিয়ে পাকা দু’তালা দালান নির্মাণের উপযোগী উপকরণ আনালেন।
পরের দিন থেকে দালান নির্মাণের কাজ শুরু হলো।
একমাসের ভেতরে দালান নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হলো। দালান নির্মাণের
কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর মন্ত্রী-কন্যা শ্রমিকদের নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। অরণ্যে নির্মাণ করা দালানের কথা গোপনে রাখার জন্য শপত খাইয়ে তিনি শ্রমিকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক এবং বকশিশ দিয়ে যার যার বাড়ী পাঠিয়ে দিলেন।
পরের দিন মন্ত্রী কন্যা একা অরণ্যে গিয়ে
দালানের সন্মুখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দিলেন এবং
বাড়ী এসে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে দিলেন যে, অমুক
অরণ্যে মাটি চিড়ে একটি দু’তালা বিশিষ্ট দালান উঠেছে। দালানের দু’তালায় চড়ে ওপরের দিকে তাকালে স্বয়ং
ভগবানকে সিংহাসনে বসে থাকতে দেখা যায়।
কথা বললে বাতাস। অরণ্যের আগুনের মতো কথাটা
রাজ্যময় ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ কৌতুহলপ্রিয়। না জানা কথা জানার জন্য সবার প্রবল
আগ্রহ। ফলে খবরটা প্রচার হওয়ার সাথে সাথে ভগবানকে স্বচক্ষে দর্শন করার
জন্য লোক দলে দলে অরণ্যের দিকে ধাবিত হলো।
দালানের সন্মুখে টানিয়ে রাখা সাইনবোর্ডে
লিখা ছিলো- ‘যান, ভগবানকে
স্বচক্ষে দর্শন করে ধন্য হোন। তবে, একমাত্র সতী মায়ের সন্তানই ভগবানকে স্বচক্ষে দর্শন করে ধন্য হতে
পারবে। অসতী মায়ের সন্তান ভগবানের দর্শন পাবে না। আর এক সময়ে মাত্র একজন লোকই প্রবেশ করতে পারবে। প্রবেশ মূল্য মাত্র পাঁচ টাকা।’
সাইনবোর্ড পড়ে মানুষগুলোর কৌতুহল দু’গুণ বেড়ে গেলো। দর্শনার্থী লোকগুলো পাঁচ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে একজন একজন করে ভগবান দর্শনের জন্য দালানের
ভেতর প্রবেশ করতে লাগলো। সবাই দালানের ভেতর থেকে বের হয়ে
এসে ভগবানের দর্শন পেয়েছে বলে গর্বের সাথে বলতে লাগলো। ফলে
বন্যার জলের মতো দর্শনার্থীর ভির অরণ্যের মাঝে উপচে পড়ল।
এক সময় কথাটা রাজার কর্ণগোচর হলো। রাজা
মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। রাজার আহ্বানক্রমে মন্ত্রী রাজার সাথে সাক্ষাৎ
করতে এলেন। রাজা বললেন- মন্ত্রী, আপনি
শুনছেন নাকি, অমুক অরণ্যে নাকি রাতের ভেতরে মাটি চিড়ে একটি দালান উঠেছে, সেই দালানের দু’তালা থেকে ওপরের
দিকে তাকালে নাকি ভগবানের দর্শন পাওয়া যায়?
মন্ত্রী বললেন- হ্যাঁ মহারাজ, কথাটা আমিও শুনেছি। তবে, আমি নিজে
এখন পর্যন্ত যাইনি।
রাজা বললেন- আমার রাজ্যে এরকম অলৌকিক কাণ্ড
ঘটেছে, আর আমি এখন পর্যন্ত দেখিনি। এটা কেমন কথা হবে? এটা তো
আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের কথা, কি বলেন
মন্ত্রী?
নিশ্চয় মহারাজ। মন্ত্রী বললেন-আপনার
রাজ্যে এরকম অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। আর আপনি ভগবান দর্শন করতে না গেলে
প্রজারা আপনাকে বুর্বক বলে ভাবাটা খুবই স্বাভাবিক।
রাজা বললেন—আমি আজই ভগবান দর্শন করতে যাব। আপনিও চলুন আমার সাথে।
রাজা এবং মন্ত্রী ভগবান দর্শনের উদ্দেশ্যে
রওয়ানা হলেন। তাঁরা অরণ্যের ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, অগনন লোক! মানুষের পায়ের চাপে
বন-জংঘল একেবারে মাটির সাথে মিশে গেছে। দালানের চারদিকে
অগনন লোক ভগবান দর্শনের জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করতেছে। রাজাকে দেখে সবাই রাস্তা বের করে দিলো। দালানের সন্মুখে এসে
রাজা মনযোগ সহকারে সাইনবোর্ডটা পড়লেন।
মন্ত্রী বললেন- যান মহারাজ, আপনি আগে দর্শন করে আসুন।
ইষ্টনাম স্মরণ করে রাজা দালানের ভেতর প্রবেশ
করে দু’তালায় উঠে গেলেন। দু’তালায় উঠে তিনি
আকাশের দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি কোথাও ভগবানের নাম গন্ধ
দেখতে পেলেন না।
রাজা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাঁর মাথা
কুমারের চাকের মতো চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো। সবাই ভগবান দর্শন করে ধন্য
হচ্ছে, একমাত্র তিনিই ভগবান দর্শন থেকে বঞ্চিত হলেন!
তিনি নিশ্চয় সতী মায়ের সন্তান নন। কিন্তু এই কথা তিনি লোকের নিকটে
প্রকাশ করেন কীভাবে? এ কথা শুনলে প্রজারা তাঁকে কি বলে ভাববে? প্রজারা নিশ্চয় তাঁকে রাজা বলেই মানতে চাইবে
না।পাত্র-মিত্ররাঁ শুনলেও হাসবে। সজন্য তিনি নিজের না হলেও, মায়ের সন্মান রক্ষার জন্য ভগবানের দর্শন পেয়েছে বলে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাজা চেষ্টাকৃত হাসির রেখা মুখে ফুটিয়ে
দালান থেকে বেরিয়ে এলেন।
রাজাকে দেখে মন্ত্রী প্রশ্ন করলেন- ভগবানের
দর্শন পেলেন নাকি, মহারাজ?
রাজা হাসিমুখে বললেন- হ্যাঁ মন্ত্রী। ভগবানের
দর্শন পেয়ছি। আপনিও যান দর্শন করে ধন্য হয়ে আসুন।
রাজার আদেশ পেয়ে মন্ত্রী দু'তালার ওপড়ে উঠে গেলেন। মন্ত্রীর মুখে
বিজয়ের হাসি। ভগবানের দর্শন যে পাবেন না তিনি ভালভাবেই জানেন। কারণ এটা হলো তাঁর মেয়ের কারসাজি। সেজন্য তিনি দালানের ওপরে কিছুক্ষণ থেকেই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিচে নেমে এলেন।
রাজা হাসিমুখে মন্ত্রীকে স্বাগতম জানিয়ে
প্রশ্ন করলেন- আসুন, আসুন
মন্ত্রী। আপনি নিশ্চয় ভগবানের দর্শন লাভ করে ধন্য হয়ে এলেন?
মন্ত্রী রাজাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে
বললেন- আমি ভগবানের দর্শন পাইনি, মহারাজ!
মন্ত্রীর কথা শুনে রাজার ভারাক্রান্ত মন একটু
হালকা হলো। ভাবলেন, একমাত্র তিনিই অসতী মায়ের সন্তান নন, মন্ত্রীও। সমব্যাথীর নিকটে মনের গোপন কথা
প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই ভেবে রাজা বললেন- দুঃখ করো না, মন্ত্রী।! আমিও আসলে ভগবানের দর্শন পাইনি।
নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য দর্শন পাওয়ার কথা বলেছিলাম।
রাজা এবং মন্ত্রী ভগবানের দর্শন পায়নি, কথাটা অল্প সময়ের ভেতরে রাজ্যময় প্রচার
হয়ে গেলো। মানুষগুলো ভাবতে লাগলো, রাজাই
যখন অসতী মায়ের সন্তান, আমরা
আবার কোন কূটা? এভাবে
ভেবে সবাই বলতে লাগলো, ‘আমিও
ভগবানের দর্শন পাইনি’।
এভাবে কেউ যে ভগবানের দর্শন লাভ করেনি কথাটো রাজ্যময়
প্রচার হয়ে গেলো।
আসলে কেউ ভগবানের দর্শন লাভ করেনি, একমাত্র অসতী মায়ের সন্তান বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পেয়েই ভগবান দর্শন লাভ করা বলে প্রচার করেছিলো।
রাজপ্রাসাদে ফিরে আসার সময় রাজাকে উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বললেন-দুঃখ করবেন না, মহারাজ।আসলে কেউ ভগবানের দর্শন লাভ করেনি। নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য ভগবানের দর্শন লাভ করার কথা প্রচার করেছিল। আসলে দর্শন লাভ
করাটা সম্ভবও ছিল না। কারণ সেখানে কোনও ভগবান ছিলেনই না। দালান এবং ভগবান দর্শন লাভের প্রচার
ছিলো আমার মেয়ের কারসাজি মাত্র। আপনার কাছ থেকে টাকা এবং শ্রমিক
নিয়ে আমার মেয়েই দালানটা নির্মাণ করিয়েছিলো।
এভাবে ভগবান দর্শনের প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করে মন্ত্রী বললেন- মানুষ
যে ভেড়ার পালের মতো, এখন এই
কথার প্রমাণ পেলেন তো, মহারাজ?
রাজা বললেন-নিশ্চয় পেয়েছি। তবে, আমার একটা অনুরোধ রাখতে হবে, মন্ত্রী। আপনার মেয়েকে আমার
পুত্রবধূ বানাতে চাই। নিশ্চয় আপনার কোন দ্বিমত নেই?
মন্ত্রী হাসিমুখে রাজার প্রস্তাব সমর্থন করে
বললেন- দ্বিমতের প্রশ্নই উঠে না, মহারাজ।
আপনার সাথে আত্মীয়তা করলে আমার মেয়ের সাথে সাথে আমাদের জীবনও ধন্য হবে।
এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হলো, আমাদের মাঝে এক ধরণের প্রবণতা প্রচলিত রয়েছে, কেউ কোনও কাজ করে
লাভবান হলে সবাই সেই কাজের পরিণতি বাচ-বিচার না করেই সেই কাজে জাঁপিয়ে পড়ে। যেমন আমাদের মাঝে এখন ই-রিক্সার প্রচলন হয়েছে। এখন
সবাই ই-রিক্সার পেছনে ক্ষেপেছে। ই-রিক্সা বেশি হওয়ার জন্য
এখন অনেকে ভাড়া পাচ্ছে না। ফলে অনেকে কম মূল্যে
ই-রিক্সা বিক্রী করে দিতেছে।
ফজরুলদের ব্যবসার ক্ষেত্রেও সেটাই হলো। তাদের
লাভ দেখে অনেকে সবজির ব্যবসায় জাঁপিয়ে পড়ল। বেপারী বেশি
হওয়ার ফলে ফজরুলদের লাভ কমে গেলো। কোনও কোনও দিন লোকসানও যেতে লাগলো। একদিন সবজি বিক্রীই করতেই পারলো
না। ফলে অনেক লোকসানের সন্মুখীন হলো।
নজরুলকে উদ্দেশ্য করে ফজরুল বললো- আজ কি করবি? আজ বলতে গেলে চালান গায়েব। কাল সবজি কিনব কি দিয়ে?
আমি কি বলব? নজরুল হতাশ কণ্ঠে বললো- আমাদের লাভ দেখে লোকের সহ্য হল না। সবাই এখন সবজির ব্যবসায় নেমে পড়েছে। আমাদের এখন অন্য কাজ করতে
হবে।
কি কাজ করবি?
আমরা নারকেল সুপারি পাড়ার কাজ করব। নজরুল
বললো- লক ডাউনের ফলে অনেকে নারকেল সুপারি পাড়তে পারছে না।
চল, কাল সকালেই আমরা নারকেল পাড়তে যাব।
চৌদ্দ
পরের দিন সকালে দুই ভাই গ্রামে গ্রামে ঘুরে
কয়েকটা গাছের নারকেল পেড়ে দিয়ে দু’শ টাকা রোজগার করলো। এভাবে চার পাঁচদিন নারকেল পাড়ার পরে গাছের নারকেলও
ফুরিয়ে গেলো।
একদিন নারকেল পাড়তে গিয়ে একটা গাছেরও
নারকেল পাড়তে পারল না।
সন্ধ্যের সময় দুই ভাই মর্মাহত হয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো।
রাস্তায় দেখা হলো হাকিমুদ্দিনের সাথে। হাকিমুদ্দিন কয়েকদিন আগে
হাজোত থেকে ছাড়া পেয়েছে। সে একটি নতুন পালছার বাইকে
চড়ে এসেছিলো।
ফজরুলকে দেখে হাকিমুদ্দিন বললো- কিরে ফজরুল, আজকাল দেখছি তোর দেখাই মেলে না। কোথায় থাকিস তুই? অনেক দিন ধরে লক্ষ্য করছি,তুই আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করিস। আমি কি তোর
সাথে কোন অন্যায় করেছি?
সত্যি কথা বলতে গেলে, ফৈজুদ্দিনের শাসনের পর থেকে ফজরুল
হাকিমুদ্দিনকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে আসছে। হাকিমুদ্দিনের সাথে
হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে পার্যমানে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দেখেও না
দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যায়। ফৈজুদ্দিন খালু যদি সত্যি সত্যি মা’র নিকটে তার ছাগল চুরির কথা বলে দেয়, তাহলে তাকে মা’র হাতের পিটুনি খেতে হবে। এই ভয় তার মনে গভীরভাবে
রেখাপাত করছিলো। সেজন্য সে হাকিমুদ্দিনকে দেখলেই নানান
ছুতা করে এড়িয়ে চলত। এর মধ্যে হাকিমুদ্দিন হত্যার মামলায় জড়িয়ে পরার পরে সে হাকিমুদ্দিনের সঙ্গ একেবারে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। হঠাৎ করে হাকিমুদ্দিনের সন্মুখে পড়ে যাওয়ার ফলে সে আমতা আমতা করে বললো- না না, অন্যায় করবে কেন? স্কুলে না গেলে মা
বকাবকি করে। তাই নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছিলাম। তারপর কয়েকদিন একজনের দোকানে ছিলাম। সেজন্য তোমার সাথে মেশার সুযোগ পাইনি। এর মধ্যে লক ডাউন দিলো। লক
ডাউনের মধ্যে আব্বা মারা গেলেন। এই সব নানা কারণে তোমার
সাথে সম্পর্ক রাখতে পারিনি।
আমি হাজোত থেকেই তোর বাবার মৃত্যুর খবর
পেয়েছিলাম। হাকিমুদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মর্মাহত কণ্ঠে বললো- তোর বাবার
মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি খুবই দুঃখ পেয়েছি। কি করবি, সংসারটা
তো এই রকমই। আসা যাওয়ার খেলা।
নজরুল বললো- তুমি দেখছি নতুন বাইক কিনেছ? কোথায় পেলে এত টাকা?
টাকা বাতাসে উড়ে বুঝলি। হাকিমুদ্দিন যথা
সম্ভব গম্ভীর গলায় বললো- ধরতে জানতে হয়। হাজোতে গিয়ে আমার লাভই হয়েছে। টাকা রোজগারের অনেক রাস্তা পেয়েছি। আমি বর্তমান একজনের সাথে ভাগে কয়লার ব্যবসা করছি। কয়লার
ব্যবসায় অনেক টাকা। তবে, সাহস
লাগে। চোর, গুণ্ডা বদমাশদের সাথে টেক্কা দিয়ে চলতে
হয়। কয়লার ব্যবসার লাভের টাকা দিয়েই বাইক কিনেছি।
হাজোত থেকে একেবারে ছাড়া পেয়ে এসেছ নাকি? ফজরুল বললো।
না না, একেবারে
ছাড়া পেয়ে আসিনি। জামিনে এসেছি। হাকিমুদ্দিন গা ছাড়া মনোভাবে বললো- এখন সাত আট বছর কেস চলবে। তারপর প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে
যাব। কেউ তো আমাকে হত্যা করতে দেখেনি। আর আমি নিজ হাতে
হত্যাও করিনি। কিডন্যাপ করে অচেতন করার জন্য
ওষুধ শুঙ্গিয়েছিলাম। মাত্রা বেশি হয়েছিলো। তাই মরে গেছে।
পুলিশ তোমাকে মারেনি? নজরুল প্রশ্ন করলো।
না, মারে নি।
হাকিমুদ্দিন বললো- মারার আগেই আমি স্বীকার করেছিলাম হত্যা করেছি বলে। পুলিশরাঁ তো আর এমনি এমনি মারে না। মারে সত্য বের করার জন্য।
আমি সত্যি কথা বলে দিয়েছি তাই মারার সুযোগ পায় নি।
তুমি এখন বাইক নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? ফজরুল প্রশ্ন করলো।
আসলে হাকিমুদ্দিন যাচ্ছে তার হাজোতের বন্ধু
সালাম খাঁ এবং জুলমতের সাথে দেখা করতে। তারা দুজন সহরেরই একটি ঘরে
ভাড়া থাকে। তবে নিজের মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য সে মিথা কথা বললো- থানায়
যাচ্ছি।
এখন তো লক ডাউন চলছে। নজরুল বললো- পুলিশ
তোমাকে মারবে না?
এখন অনেক পুলিশ আমার বন্ধু। তাই তাদের সাথে দেখা
করতে যাচ্ছি। মারবে কেন? এভাবে বলেই হাকিমুদ্দিন কথা ঘুরাবার জন্য বললো- তোরা এই লক ডাউনের বাজারে
চলছিস কীভাবে? এখন তো কাজকাম বন্ধ।
কীভাবে আর চলব? ফজরুল বললো- এতদিন সবজির ব্যবসা করছিলাম। এখন সবজির ব্যবসায় অনেক লোক নেমে পড়েছে। তাই কয়দিন ধরে লোকের গাছের নারকেল
পেড়ে দিলাম। কিন্তু এখন গাছের নারকেলও ফুরিয়ে গেছে। আজ নারকেল
পাড়তেই গিয়েছিলাম। কিন্তু কারও গাছে নারকেল নেই। তাই শুধু হাতে
বাড়ী ফিরছি। আজ মনে হয় না খেয়ে থাকতে হবে।
ভাববিছ কেন? আমি আছি না। তুই আমাকে ভোলে গেলেও আমি তোকে ভুলিনি। তোকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। বল, কত টাকা লাগবে?
তুমি টাকা দিবে? ফজরুল প্রশ্ন করলো।
হ্যাঁ দিব। হাকিমুদ্দিন বললো- বিপদে, বন্ধুই বন্ধুর কাজে লাগে। আমি থাকতে তোদের
চিন্তা নেই। এভাবে বলে পকেট থেকে পাঁচ শ টাকার একটি নোট বের করে ফজরুলের
দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো- নে, আজ পাঁচ শ টাকা নিয়ে যা। দর্কার হলে আরও দেব।
তুমি আগের মতো.....ফজরুল আমতা আমতা করে বললো।
আরে না, এখন আর
চুরিটুরি করি না। চুরি করে ছোটলোক বদমাশরা। ছাগল চুরি আরও নিকৃষ্ট
কাজ। বললাম না। এখন আমি রীতিমত কয়লার ব্যবসা করি। ধর, নে। লজ্জা করিস না।কর্জ দিচ্ছি। হাতে টাকা এলে শোধ করে দিস।
কিন্তু এখন তো শোধ দিতে পারব না। লক ডাউন
খুললে কাজ করে তবে শোধ দিতে পারব।
তাই দিস। নে, ধর।
নজরুল বললো- আজ বাড়ী থেকে আসার সময় মা চাল
ডাল নিতে বলেছেন। চাল না নিলে ভাগনে দু’টি না খেয়ে থাকবে।
নেব? ফজরুল
ইতস্তত করতে লাগলো।
নে। পরে শোধ দিলেই হবে। নজরুল বললো।
হাকিমুদ্দিন যাই বলুক না কেন, ফজরুলের মনে সন্দেহ যে, সে এখনও
চুরি করে। না হলে নতুন বাইক, পকেট
ভর্তি টাকা কোথায় পেল! হয়তো চুরি করা টাকাই সে দিতে চাইছে। না হলে সে এত সহজে টাকা দিতে চাইবে কেন? সহজে
পাওয়া টাকার প্রতি মানুষের দরদ কম থাকে। যাচ্ছেতাই খরচ করা যায়। পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করলে সেই টাকা যাচ্ছেতাই খরচ করা
যায় না। হাকিমুদ্দিন তিন মাস হাজোত খেটে এসেছে। আর এসেই ব্যবসা
শুরু করেছে? ফজরুলের মনে কেমন যেন খটকা
লাগলো। ব্যবসা করা কি এতই সহজ? সে
নিশ্চয় কোন অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জন করেছে।এদিকে হাকিমুদ্দিন হলো
খুনের আসামি। টাকা নিলেই সে তার সাথে
অন্যরকম বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। তখন
হাকিমুদ্দিনকে এড়িয়ে চলা সম্ভব না-ও হতে। কোনওদিন
হাকিমুদ্দিনের প্ররোচনায় তার সাথে কোন অসৎ কাজে জড়িয়েও
পড়তে পারে! এদিকে বাড়ীতেও খাবার নেই। চাল না নিয়ে গেলে না খেয়ে
থাকতে হবে! সে স্থির করতে পারছিল না কি করবে।
হাকিমুদ্দিন বললো- এত কি ভাবছিস? নে।
ফজরুল কিছু বলার আগেই হঠাৎ করে একদল পুলিশ
এসে সেখানে উপস্থিত হলো। পুলিশ গাড়ী থেকে নেমে তাদের ঘিরে
ধরল।
একজন পুলিশ হাকিমুদ্দিনের পিঠে লাঠি দিয়ে সটান বাড়ি মেরে বললেন-
এই তোরা জানিস না লক ডাউন চলছে? এভাবে বলেই পুলিশ কর্মীটি নতুন বাইকের দিকে
লক্ষ্য করে বললো- একেবারে দেখছি নতুন আনকোরা বাইক। কোথায় হাত
মেরেছিস?
আমি ব্যবসা করি স্যার। হাকিমুদ্দিন বললো।
ব্যবসা? কিসের
ব্যবসা করিস এই লক ডাউনের সময়ে? লক ডাউন
চলছে জানিস না? লক ডাউনের সময়ে কেন বাইরে বের
হয়েছিস?
হাকিমুদ্দিন বললো- আমাদের বাড়ী পাশেই। মা’র অসুখ। ওষুধের জন্য যাচ্ছি।
নজরুলকে উদ্দেশ্য করে পুলিশ কর্মীটি বললো-
তুই কি জন্য বাইরে বেরিয়েছিস? বাড়ী কোথায়?
নজরুল বললো- বাড়ী পূব পাড়া, স্যার।
তুই কি জন্য বাইরে বের হয়েছিস? গাড়ীতে বসে থাকা পুলিশ অফিসারটি জিজ্ঞাসা
করলেন।
আমি সবজির ব্যবসা করি স্যার।
অন্য একজন পুলিশ কর্মী এগিয়ে এসে বললো- এ
সত্যি বলেছে, স্যার। আমি ওর কাছ থেকে দুইদিন
সবজি কিনেছি। ও আমাদের থানার নারকেল গাছের নারকেলও পেড়ে দেয়।
তাই নাকি? এভাবে বলেই পুলিশ অফিসারটি হাকিমুদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা
করলেন- তুই-ই তো মার্ডার করেছিলি, তাই না? কোনদিন জামিনে বেরিয়েছিস?
হাকিমুদ্দিন বললো- লক ডাউনের আগে আগে স্যার।
হুঁ, যা।
অফিসারটি ধমকের সুরে বললেন- আর কোনওদিন এভাবে বেরোবি না। ওষুধ নিয়ে সোজা বাড়ী চলে যাবি।
হাকিমুদ্দিন গাড়ী স্টার্ট দিয়ে নজরুলকে
উদ্দেশ্য করে বললো- উঠ। তোকে তোদের বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিয়ে যাব।
বাইকে চড়ে কিছুদূর আসার পর নজরুল বললো-
ভাইকে দেখছি না। ভাই কোথায় গেলো?
সুযোগ বুঝে পুলিশের
চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়ে কোনো
বাড়ীতে গিয়ে লুকিয়ে রয়েছে হয়তো। হাকিমুদ্দিন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললো- চিন্তা করিস না। ও ঠিকই চলে আসবে।
তোমার বোলে পুলিশের সাথে খাতির। তাহলে মারলো
কেন?
চিনতে না পেরে মেরেছে। হাকিমুদ্দিন ঈষৎ
লজ্জিত কণ্ঠে বললো- পুলিশটা নতুন। তাই আমাকে চিনতে পারেনি। আর পুলিশের হাতে মার খাওয়াটা তেমন বড় কথা না। জানিস
না পুলিশের পিটুনি দেয়ার লাইসেন্স আছে? চল, এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।
পনের
প্রায় আট দশজন পুলিশ ফজরুলদের ঘিরে ধরেছিলো।
ফলে রীতিমত জটলা সৃষ্টি হয়েছিলো।সেই জটলার সুযোগ নিয়ে ফজরুল পুলিশের চোখ এড়িয়ে সরে পড়েছিলো এবং সে
পাশেরই একটি বাড়ীতে গিয়ে লুকিয়ে ছিলো। পুলিশ চলে
যাওয়ার পর সে ক্ষেতের আইলে আইলে এসে বাড়ী পৌঁছোল।
সে এসেই জিজ্ঞাসা করলো- মা, নজরুল কোথায়? সে বাড়ী আসেনি?
আদুরি নেসা বললো- না তো, ওকে কোথায় রেখে এলি?
ফজরুল পুলিশের সন্মুখে পড়ার কথা বলে বললো-
আমি পুলিশের চোখ এড়িয়ে পাশেরই একটি বাড়ীতে গিয়ে লুকিয়ে
ছিলাম। পুলিশ চলে যাওয়ার পর সেখান থেকে চলে এসেছি।
পুলিশ যদি তোকে ধরে ফেলত! আদুরি নেসা বড় বড়
চোখ করে ফজরুলের দিকে তাকিয়ে বললো- তখন কি করতিস? এভাবে পালানোটা ঠিক
হয়নি।
আমি তো আর কোনো
দাগী আসামি না। ফজরুল যুক্তি দর্শাল- তাই পুলিশ আমাকে পিছু ধাওয়া করে ধরবে না আমি জানতাম। পুলিশ তো লোকজনকে ধরার জন্য আসেন না। তাঁরা
আসে, লোকজন যাতে রাস্তায় চলাফেরা না করে সেই বিষয়ে সতর্ক করার জন্য।
পরে কি হলো?
আমি তো বাড়ীর ভেতরে লুকিয়ে ছিলাম। তাই বলতে
পারব না পরে কি হয়েছে।
সালেহা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো- পুলিশ
নজরুলকে ধরে নিয়ে যায় নি তো?
আমি কি করে বলব? ফজরুল শান্ত স্বরে বললো- তবে আমার মনে হয় পুলিশ ধরে নিয়ে যায় নি।নজরুল
হাকিমুদ্দিনের সাথে গেছে হয়তো!
আদুরি নেসা বললো- হাকিমুদ্দিনের সাথে গেলে তো
ভালই হয়েছে। তবু তুই একটু খবর নিয়ে দ্যাখ, নজরুল কোথায় আছে।
আমি এখন কোথায় খবর নিতে যাব? ফজরুল একটু রুক্ষ লগায় বললো- রাস্তায়
বেরোলে যদি পুলিশের সাথে দেখা হয়, এবার
কিন্তু ছাড়বে না।
তাই পুলিশের ভয়ে ভাইয়ের তত্ত্ব নিবি না? আদুরি নেসা বললো- যদি পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে থাকে, তাকে
ছাড়িয়ে আনতে হবে না?
ফজরুল এইবার একটু বিমূঢ়ে পড়ল। সে মাথা
চুলকাতে লাগলো। মা কথাটা মিথ্যে বলেনি। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো তো
ছাড়িয়ে আনতে হবেই। কিন্তু এই লক ডাউনের সময়ে থানায় যাওয়া কি সম্ভব হবে? রাস্তায়
বেরোলে যদি তাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়!
এখন থানায় গিয়ে খবর নেওয়া কি সম্ভব হবে? ফজরুল চিন্তিত কণ্ঠে বললো।
থানায় যেতে হবে না। সালেহা বললো- তুই
হাকিমুদ্দিনদের বাড়ী যা। হাকিমুদ্দিনের কাছেই খবর পাবি
নজরুল কোথায় আছে।
এখন হাকিমুদ্দিনদের বাড়ী গেলেও ক্ষেতের আইলে
আইলে যেতে হবে। ফজরুল বললো- এখন সন্ধ্যা হয়েছে।আমি একা একা কি যেতে পারব? আমার ভয় করবে না?
চল, আমিও যাব তোর সাথে। সালেহা বললো।
আদুরি নেসা বললো- আসার পথে বাজার নিয়ে আসিস।
ঘরে চাল ডাল কিছুই নেই।
কোথা থেকে চাল ডাল আনব? ফজরুল বললো- আজ এক টাকাও কামাই হয় নি। কারও গাছে নারকেল নেই।
তাহলে আজ উপায়? আদুরি নেসা চিন্তিত গলায় বললো- তাহলে কি আজ
উপোস দিতে হবে?
সে আমি কি জানি? ফজরুল গা ছাড়া মনোভাব নিয়ে বললো।
এক কাজ কর। আদুরি নেসা পরামর্শের স্বরে বললো-
হাকিমুদ্দিনদের বাড়ী থেকে আসার সময় জলিল সাহেবের বাড়ী হয়ে আসবি। তাকে কিছু টাকা কর্জ দিতে
বলবি। টাকা না থাকলে কিছু চালই চেয়ে নিয়ে আসবি। ওরা অনেক ধান
পায়। ওদের চালের অভাব নেই।
জলিল ছলিমুদ্দিনের ফুফাতো ভাই।
ছলিমুদ্দিনের থেকে বয়সে অনেক ছোট। অবস্থা ভালো। প্রায়
পনের বিশ বিঘা জমির মালিক। ইড়ি ক্ষেত করে। বছরে অনেক ধান গোলায় তুলে।
ছলিমুদ্দিনের সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিলো জলিলের।
ছলিমুদ্দিন রোগশয্যায় থাকার সময় মঝেমধ্যেই খবর নিতে
আসত। প্রয়োজনে টাকাপয়সা দিয়েও সহায় করত। লক ডাউনের জন্য ছলিমুদ্দিনের জানাজা প্রায় অনিশিচয়তার মধ্যে পড়েছিলো। পুলিশের ভয়ে কেউ জানাজার জন্য
এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি। একমাত্র জলিলই সাহস করে ছয় সাতজন
লোক নিয়ে এসে জানাজার নামাজ সম্পন্ন: করেছিলো। কিন্তু জলিলের ছেলে মোকসেদের সাথে ফজরুলের সম্পর্ক ভালো না।
একবার মোকসেদের সাথে ফজরুল থিয়েটার দেখতে গিয়েছিলো।
সেখানে মোকসেদ ফজরুলের ওপর পাঁচ শ টাকা চুরির অভিযোগ
এনেছিলো। আসলে মোকসেদ জুয়া খেলে টাকা হেরেছিলো। বাবা মা’র বকা থেকে বাঁচার জন্যই সে ফজরুলের ওপর টাকা
চুরির অভিযোগ এনেছিলো। তারজন্য বাবা মা ফজরুলকে খুব বকেছিলো।
সেদিন থেকে ফজরুল জলিলদের বাড়ী যায় না।আর জীবনে কোনদিন যাবে না বলেও সে মনে মনে
প্রতিজ্ঞা করেছে।
তাই ফজরুল রুক্ষ স্বরে বললো- আমি জলিল
জ্যাঠাদের বাড়ী যেতে পারব না।
ফজরুল যে জলিল জেঠাদের বাড়ী যায় না এ কথা
সালেহাও জানে। তাই সে বললো- তোকে যেতে হবে না। আমি যাব। তুই
বাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস।
হাকিমুদ্দিনদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এসে
দুই ভাইবোন রাস্তায় এলো। এমন সময় একটু দূরে একটা বাইক দেখা গেলো।
তখন আবছা অন্ধকার। একটু দূরের মানুষ ভালোভাবে
ঠাওর করা যায়। তখন চারদিকে পুলিশের আতঙ্ক। বেনা গাছ দেখলেও পুলিশ বলে
মনে হয়। তাই পুলিশ মনে করে ফজরুল বললো- বুবু পুলিশ ! বাড়ীর
ভেতরে চল।
সালেহারও পুলিশ বলেই ধারণা হলো। কারণ এই
সময়ে পুলিশের বাহিরে কে বাড়ীর বাইরে বোরোতে সাহস পাবে! তাই সালেহাও
বললো- চল। বাড়ীর পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।
তারা বাড়ীর ভেতর এসে পুলিশ চলে যাওয়ার জন্য
অপেক্ষা করতে লাগলো। বাইক এসে তাদের বাড়ীর সামনে থেমে গেলো।
দুই ভাইবোন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে একটু পিছিয়ে
এসে মাকে ডেকে বলল-মা, পুলিশ।
মনে হয়, নজরুলের কোনো খবর নিয়ে এসেছে।
সন্তান বাড়ীর বাইরে
থাকলে বাবা-মায়ের মন সব সময সন্তানের অমংগল আশঙ্কায় উন্মুখ হয়ে থাকে। সেজন্য পুলিশের
কথা শুনে আদুরি নেসা শংকিত হয়ে উঠলো। পুলিশ নিশ্চয় নজরুলের কোন দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। তাই সে অশুভ সংবাদ শুনার
আশঙ্কায় দুরু দুরু বুক নিয়ে কম্পিত পদে ঘরের
বাইরে বেরিয়ে এসে বললো- কোথায়?
কেউ কোনো উত্তর
প্রদানের আগেই কে একজন বাড়ীর ভেতর প্রবেশ করল। কিন্তু পুলিশ নয়। অন্য কেউ। ঠিক নজরুলের মতো ছোট।
নজরুলই এসেছিলো।সে হাকিমুদ্দিনের সাথে সালাম
খাঁদের ভাড়াঘরে গিয়েছিলো। সেখানে চা জল খেয়ে বাড়ী ফিরেছে।
হাকিমুদ্দিন তাকে এইমাত্র বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিয়ে বাড়ী চলে গেছে।
নজরুল সবাইকে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে
বললো- তোমরা সবাই উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন?
নজরুলের কণ্ঠ শুনে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
আদুরি নেসা এগিয়ে এসে নজরুলের গালে চড় মেরে
বললো- দাঁড়িয়ে আছি কেন বুঝতে পারছিস না? কোথায় গিয়েছিলি? আমার তো দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার
উপক্রম হয়েছিলো।
হাকিমুদ্দিন ভাইর সাথে সহরে সালাম খাঁদের
ভাড়াঘরে গিয়েছিলাম। নজরুল বললো।
সালাম খাঁ আবার কে? আদুরি নেসা উৎকণ্ঠিত লগায় প্রশ্ন করলো।
সালাম খাঁ হাকিমুদ্দিন ভাইর বন্ধু। সহরে একটি
ঘরে ভাড়ায় থাকে। তার সাথে জুলমত নামক একটি লোকও থাকে।
তাহলে পুলিশ তোকে ধরে নিয়ে যায় নি? সালেহা প্রশ্ন করলো।
না, হাকিমুদ্দিন
ভাই তার মায়ের ওষুধের কথা বলাতে পুলিশ আমাদের ছেড়ে দিয়েছিলো।
আর কোনদিন এ রকম কাজ করবি না। হাকিমুদ্দিনের
সাথে কোথাও যাবি না। হাকিমুদ্দিন ভালো লোক না। সে খুনের আসামি। কোনদিন
তোকে কোনখানে ফাঁসিয়ে দিবে তুই টেরও পাবি না। আদুরি নেসা এভাবে বলেই
সালেহাকে উদ্দেশ্য করে বললো- যা, তোরা
জলিল ভাইসাবের বাড়ী যা। যা কিছু দেয়, যত তারাতারি সম্ভব নিয়ে চলে আসবি। ঘরে
কিন্তু দানা বলতে কিছুই নেই।
ফজরুল বললো- বুবু, তুমি নজরুলকে নিয়ে যাও।
নজরুল বললো- কোথায়?
জলিল জ্যাঠাদের বাড়ী। সালেহা বললো- চল, চাল আনতে যাব। ঘরে খাবার নেই।
নজরুল ক্ষোভের সাথে বললো- আমাদের টাকা নেই
বলে হাকিমুদ্দিন ভাই পাঁচ শ টাকা যেচে দিয়েছিলো। ভাই নিল না। আমি
যেতে পারব না।
যেচে দিয়েছিলো মানে? আদুরি নেসা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে নজরুলের দিকে
তাকাল।
আমাদের খাবার নাই শোনে হাকিমুদ্দিন ভাই না
চাইতেই যেচে পাঁচ শ টাকা দিয়েছিলো। ভাই নিল না। তাই ভাই যাক, আমি যাব না। নজরুল ক্ষোভ মিশ্রিত সুরে বললো।
যা না ভাই। ফজরুল আদুরে স্বরে বললো- আমার ছোট
ভাই। যা, না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। তুই
তো জানিস আমি জলিল জ্যাঠাদের বাড়ী যাই না। মোকসেদ ভাইর সাথে আমার আঁড়ি।
কোথাও যেতে হবে না। নজরুল দৃঢ় কণ্ঠে বললো।
তাহলে কি আজ না খেয়ে থাকব? ফজরুল বললো।
না খেয়েও থাকব না। এভাবে বলেই নজরুল বললো-
মা, দা দাও।
দা দিয়ে কি করবি? আদুরি নেসা বললো- আমাদের কাটবি? কেটেই ফেল। মরে জ্বালা যন্ত্রণা থেকে বাঁচি।
না, কাটব না।
কাউকে মরতেও হবে না। এভাবে বলে নজরুল ঘরের ভেতর
গিয়ে নিজেই দা বের করে এনে একটা
বাঁশের থামে কোপাতে লাগলো। সবাই অবাক দৃষ্টিতে তার কাণ্ডকারখানা নিরীক্ষণ করতে লাগলো। থাম কাটা শেষ হওযার পর থাম থেকে টাকা বেড়িয়ে পড়লো। টাকাগুলো আদুরি নেসার দিকে ঠেলে দিয়ে নজরুল বললো- গোনে দেখত কত টাকা আছে। টাকাগুলো আমি নারকেল পেড়ে পেড়ে এই থামটাতে জমা করেছিলাম লংপেণ্ট কিনব বলে।
সবাই খুশি হয়ে টাকা গোনতে লাগলো। গোনার পর দেখা গেলো থামটাতে তিন শ বিশ টাকা ছিলো।
নজরুল বললো- যাও, এই টাকা দিয়ে চাল ডাল কিনে নিয়ে এস।
ষোল্ল
লক ডাউনের ফলে সবার অবস্থা বেহাল। সেদিন সালেহার কোলের ছেলেটি সেই সকাল থেকে কাঁদছিলো। কাঁদবেই না বা কেন? পেটে
ক্ষিদে। কয়দিন ধরে কচুগেচু খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। কাল রাতে আধা
কেজি চালের ভাত চারজনে মিলে খেয়েছে। তাই সালেহার বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে।দেড়
বছরের দুধের শিশু। দুধ না পেলে তো কাঁদবেই। ছেলেটি সকাল থেকে ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে আর সালেহা শান্ত করানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক সময়
অসহ্য হয়ে সালেহা ছেলেটিকে মাটিতে ধড়াস করে নামিয়ে দিয়ে
বললো-কাঁদ। কাঁদতে কাঁদতে মর। মরিস
না কেন? খালি ক্যা ক্যা, গ্যা
গ্যা, খাই খাই! বুকে দুধ থাকলে তো খেতে দিব। পেটে
ভাত না থাকলে বুকে দুধ হবে কোথা থেকে? তোর বাপকে ফোন দে। টাকা নিয়ে আসতে বল। ফোনই
বা দিবি কেমনে? মোবাইল একটা ছিলো। শুনেছি, লক ডাউনের বাজারে মোবাইলটা
বেচে খেয়েছে। এই মরার লক ডাউন কবে যে শেষ হবে?
এভাবে সালেহা ছেলেটিকে ক্রমাগতভাবে বকাবকির সাথে সাথে কান্নাকাটি করছিলো।
ফজরুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোনের
বকাবকি এবং কান্নাকাটি শুনছিলো। এক সময় ফজরুলের বোনের কান্না সহ্য অসহ্য হয়ে উঠলো। আদুরি নেসার মানা সত্ত্বেও সে রাস্তায় বেরিয়ে এল। যদি ভাগনে দু’টির জন্য বিস্কুট অথবা পাউরুটির ব্যবস্থা করা যায় এই ভেবে!
গেলামালের দোকানগুলো খোলা। সে আগে
যে দোকানে কাজ করত, মজিদ
মিয়ার সেই দোকানটিও এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা
থাকে। সে ভয়ে ভয়ে সেণ্টারের দিকে রওয়ানা হলো। কোন রকম বাধা ছাড়াই সে সেণ্টারে পৌঁছোল।
দোকান খোলা ছিলো। তাকে দেখে দোকানী মজিদ
মিয়া বললো- কিরে ফজরুল? কি মনে করে? এই লক
ডাউনের বাজারে চলছিস কেমনে?
কেমনে আর চলব? ফজরুল নিজেদের দৈন্য দশা প্রকাশ করে বললো- এই কয়দিন কচুগেচু খেয়ে কাটিয়েছি। এখন কচুগেচুও পাওয়া যায় না। বলতে গেলে দুইদিন
যাবত না খেয়ে আছি।তাই এসেছি আপনার কাছে।
মজিদ মিয়া বললো-আমারও অবস্থা ভালো নয়রে।
কোনোমতে পেটে ভাতে খেয়ে চলতেছি। সব জিনিসের দাম চড়া। কারও হাতে
টাকা নেই। তাই চড়া দাম দিয়ে কেউ মাল কিনতে চায় না।মাল আনতেও অনেক খরচা পড়ে
যায়। দোকান বন্ধ করতে একটু দেরি হলে, সেদিন
পুলিশ এলে তাঁদেরও কিছু দিতে হয়। এখন যে কি করি?
যাই বলুন না ভাই। ফজরুল অনুরোধের সুরে বললো-
আপনি আমাকে দোকানে রাখেন। আপনার যা মনে চায় দিবেন। কোনো
দাবি নাই। ছোট ছোট দু'টি ভাগনে
না খেয়ে আছে। তাদের অবস্থা দেখলে বুকটা ফেটে যায়। তাদের জন্য
যদি বিস্কুট পাউরুটি দেন তো তাতেই চলবে।
মজিদ মিয়া লোক হিসাবে মন্দ নয়। আগের দিনের
পি, উ, পাস।
চাকরি বাকরি পায়নি বলে গেলামালের দোকান খুলে বসেছে। মানবতা আছে।
মানুষের দুঃখ বুঝে। তদুপরি ফজরুল অনেকদিন তাঁর দোকানে কাজ করেছে। লোকে
যাই বলুক না কেন, মজিদ মিয়া কোনোদিন ফজরুলের কোন খারাপ ব্যবহার দেখেনি। কয়েকদিন আগে ফজরুলদের বাপ মরেছে। এদিকে
ভাগনে দু'টিও বোলে না খেয়ে আছে। তাই দয়া পরবশ হয়ে মজিদ মিয়া বললো-ঠিক আছে। যা হয় হবে। তুই আজ থেকে আটটার
সময় দোকানে আসবি।
সেদিন বিকেলে এক কেজি চাল, আধপোয়া ডাল, নুন এবং ভাগনেদের জন্য পাউরুটি নিয়ে ফজরুল
বাড়ী ফিরল। কয়েকদিন পরে সবাই সেদিন পেট পূরে আহার গ্রহণ করলো।
এভাবেই কষ্টেমষ্টে দিন পার হতে লাগলো।
সেদিন নজরুল গিয়েছিলো নারকেল পাড়ার
উদ্দেশ্যে। সে চারটি গাছের নারকেল পেড়ে দিয়ে আশী টাকা পেয়েছিলো।
বাড়ী ফেরার পথে রাস্তায় তার হাকিমুদ্দিনের
সাথে দেখা হলো।
কিরে নজরুল, কোথায় গিয়েছিলি? হাকিমুদ্দিন
জিজ্ঞাসা করলো।
নারকেল পাড়তে গিয়েছিলাম।
নারকেল পাড়তে গিয়েছিলি? কত টাকা পেলি?
আশী টাকা পেয়েছি।
ভালোই পেয়েছিস। হাকিমুদ্দিন ঠাণ্ডা গলায়
বললো-দৈনিক এক শ টাকা আমার সিগারেট খরচ। তোদের তো আবার অহংকার।
টাকা দিলেও তো নিস না। আমার সাথে থাকলে তোকে আমি
ডেইলি পঞ্চাশ টাকা করে দিব।
তোমার সাথে থেকে কি করতে হবে?
কিচ্ছু করতে হবে না। হাকিমুদ্দিন বললো- একা
একা ভালো লাগে না। তুই খালি আমার সাথে থাকবি। ঘুরবি। খাবি। তোর আর
কোনো কাজ নেই।
তুমি এত টাকা পাও কোথায়?
সেদিন বললাম না কয়লার ব্যবসা করি।
তুমি তো দেখি বাড়ীতেই থাক। কয়লার ব্যবসা কর
কেমনে?
আরে, এই
ডিজিটেল যুগে কোথাও যেতে হয় না। মোবাইলের সাহায্যেই ব্যবসা করা যায়।মোবাইলে
অর্ডার দিই। ফোন পে’তে টাকা
পাঠিয়ে দিই। যেখানে মাল পাঠাতে বলি সেখানে পাঠিয়ে দেয়। তারাও আবার ফোন
পে’তেই টাকা পাঠিয়ে দেয়। খুব আরামের ব্যবসা।
শরীরের পশমও নড়ে না। যাবি আমার সাথে?
কোথায় যাবে?
সেদিন যে রুমে গিয়েছিলাম। সেখানেই যাব। বেশি দেরি করব না। চা জল খেয়ে আড্ডা মেরে চলে আসব। গেলে চল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করলে
পুলিশ আসতে পারে।
সালাম খাঁকে দেখে আমার খুব ভয় লাগে। নজরুল
বললো- এই বড় বড় চোখ। বাঁকানো গোঁফ। দেখতে একেবারে ডাকাতের
মতো।
তোর কাছে লুকাব না। ওরা আসলে ডাকাতই। হাজোতে ওদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। হাকিমুদ্দিন অভয় দিয়ে বললো- ভয়ের কিছুই
নেই। ওরা ডাকাত হলেও লোক হিসাবে খুবই ভালো। ডাকাতদেরও ধর্ম আছে, বুঝলি। তারা এমনি এমনি মানুষের সাথে খারাপ
ব্যবহার করে না। সেদিন যে গিয়েছিলি তোর সাথে কোনো খারাপ
ব্যবহার করেছে?
না, তা
অবশ্যে করেনি। নজরুল
গর্বের সাথে বললো।
করবেও না।ওদের
সাথে খাতির রেখে চললে তোর সাত খুন মাফ। বুক ফুলিয়ে চলতে পারবি।ওদের সাথেই আমি কয়লার ব্যবসা করি। সালাম খাঁ আমাদের বস। আমার কথা মতো
যদি চলিস, তাহলে বলে কয়ে তোকেও একটা ভাগ দেওয়ানোর চেষ্টা করব। তখন আর টাকার
জন্য হাপিত্যেস করতে হবে না।
তোমার সাথে গেলে সত্যিই টাকা দিবে?
বললাম তো যেদিন আমার সাথে যাবি সেদিনই পঞ্চাশ
টাকা করে পাবি।
নজরুল ভাবলো, বাইকের পেছনে চড়ে ঘুরলেই যদি পঞ্চাশ টাকা পাওয়া যায় মন্দ
কি!গিয়েই দেখি টাকা দেয় কিনা। চুকা আম তো একদিনই বেচা যায় ! টাকা দিলে প্রত্যেক
দিনই ঘুরব, আর না দিলে ঘূরব না। এভাবে ভেবে নজরুল বললো- সত্যিই দিবে তো?
আরে তোর বিশ্বাস হচ্ছে না তো। হাকিমুদ্দিন
পকেট থেকে টাকা বের করে দেখিয়ে বললো-তোর যদি বিশ্বাস না হয়, ধর অগ্রিমই দিয়ে দিচ্ছি।
না অগ্রিম দিতে হবে না। পরে দিলেই হবে। এভাবে বলেই নজরুল হাকিমুদ্দিনের বাইকের পেছনে উঠে বসল।
সালাম খাঁ এবং জুলমত আলী বসে গাঞ্জা খাচ্ছিল।
দু’জনই দাগী আসামি। কয়েকবার হাজোত খেটেছে।
সালাম খাঁ ড্রাগস ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তার
বাড়ীর অবস্থা ভালো। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ার পরে পড়া ছেড়ে দিয়ে সে
কিছুদিন নাগাল্যাণ্ডে ছিলো তার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে। সেখান থেকেই সে
ড্রাগ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। সে নিজে ড্রাগস
খায় এবং বিক্রীও করে।
জুলমত আলীর বাবা চায়ের দোকান করত। তার বাবার
চা খুব নামকরা ছিলো। জুলমতের বাবার অনেক দিন আগেই মৃত্যু
হয়েছে। তবু অনেকে এখনও তার চায়ের প্রশংসা করে। জুলমত আলী ছোট
বেলা খুবই নির্জু স্বভাবের ছিলো। হঠাৎ একদিন সে একাই একটা মার্ডার করে ফেলে। দশ ইঞ্চি ছোরা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো মৃতকের পেটের মধ্যে। তারপর থেকে সে
অপরাধ জগতের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। হাজোতেই
হাকিমুদ্দিনের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। জুলমত আলীও এখন ড্রাগস ব্যবসায়ের সাথে জড়িত।
সালাম খাঁ এবং জুলমত সহরেরই একটি পরিত্যক্ত
মতো রুম ভাড়া করে থাকে।
রুমটিতে তারা দুজনেই থাকে। রুমটি প্রশস্ত।
তবে যত্নের অভাবে অপরিচ্ছন্ন। মনে হয় অনেকদিন ঝাট দেওয়া হয়নি।
রুমটির আশেপাশে কোনো বাড়ী নেই। বাড়ী আছে তবে একটু দূরে।
রুমটিতে দু’টি ছোট ছোট খাট পাতা। বিছানার চাদরগুলো অপরিচ্ছন্ন। নজরুল হাকিমুদ্দিনের সাথেই আগে একদিন এসেছিলো যদিও সেদিন কারেন্ট
না থাকার জন্য মোমবাতির আলোতে রুমটি ভালো করে লক্ষ্য করা
হয়নি। রুমটির পরিবেশ দেখে নজরুলের গা গুলিয়ে উঠলো।
হাকিমুদ্দিনকে দেখে সালাম খাঁ বলে উঠলো- এত
দেরি করলি কেন?
রাস্তায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসতে হয়। এভাবে বলে হাকিমুদ্দিন নজরুলকে দেখিয়ে বললো- রাস্তায় এর সাথে দেখা হলো। তাই একটু দেরি হয়েছে।
ছেলেটা কে? জুলমত আলী জিজ্ঞাসা করলো।
কয়েকদিন আগে যে নিয়ে এসেছিলাম সেই ছেলেটি।
আমাদের পারারই। নজরুল।
অ’ মনে
পড়েছে। সেদিন মমবাতির আলোতে দেখেছিলাম তো, তাই
চিনতে পারিনি। জুলমত আলী কৈফিয়তের সুরে বললো।
হাকিমুদ্দিন বললো- স্কুলে পড়ে। খুব সাহসী
ছেলে। তবে খুবই অভাবী। কয়েকদিন আগে ওর বাবা মরেছে কেন্সার হয়ে। লক
ডাউনের বাজারে খুব কষ্টে দিন কাটছে।
সালাম খাঁ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজরুলের দিকে
তাকালো।
মনে হয় কাজের হবে! এভাবে স্বগতোক্তি করে সে
নজরুলকে উদ্দেশ্য করে বলল- কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস সেভেনে। নজরুল বললো।
ভালো। সালাম খাঁ বললো- আমরা তো গাঞ্জা সেবন
করছি। তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?
না, হয়নি।
হাকিমুদ্দিন বললো- এক টান দিবি?
না, আমি এসব
খাই না।
এক টান দিয়ে দ্যাখ। মজা পাবি। লজ্জা করিস না। আজকাল ছাত্রদের অনেকেই গাঞ্জা খায়।মনে কর, আমরা তোর বন্ধু। জুলমত আলী বললো।
তুই সিগারেট টানিস না? হাকিমুদ্দিন বললো- সিগারেটের চেয়ে ভালো।
সিগারেট কড়া। এগুলো মিঠা মিঠা লাগবে। খাওয়ার পরে মজা
পাবি।
নজরুল মাঝেমধ্যে অবশ্যে শখের সিগারেট টানে।
তাদের স্কুলের অনেকেই লেইজারের সময় সিগারেট টানে। নজরুল তাদের দেখে
দেখে শিখেছে।
নজরুলকে মনে মনে থাকতে
দেখে হাকিমুদ্দিন হাসি হাসি মুখে আবার বললো- আমি
জানি তুই সিগারেট টানিস। ঠোঁট দেখলেই বুঝতে পারি কে সিগারেট খায়? সিগারেট খেলে তার ওঠ এবং হাতের আঙুল কালো পড়ে যায়।তোর ওঠ এবং আঙুলও কালো পড়েছে। যদি খেতে চাস তো খেতে পারিস। ইচ্ছা না থাকলে জোর করব না।
নজরুল ভাবলো, সিগারেটের
কথা যদি জেনেই ফেলেছে লজ্জা করে লাভ নেই। নতুন জিনিস, খেয়েই দেখি এই মনোভাব নিয়ে নজরুল লজ্জিত কণ্ঠে বললো- বাড়ীতে বলে
দিবে না তো?
পাগল হয়েছিস। হাকিমুদ্দিন বললো- আমি তোদের
বাড়ীতে বলে তোর মা’র বকা
খাব ভেবেছিস।। টান দে। কাউকে কিচ্ছু বলব না।
নজরুল গাঞ্জার কল্কি হাতে নিয়ে দুই টান
দিয়ে বললো- আর খাব না। নেশা হয়ে যাবে। এগুলোতে তো নেশা হয় তাই না?
একটু আধটু হয় বইকি। হাকিমুদ্দিন বললো-
অভ্যস্ত হয়ে গেলে, পরে তেমন
নেশা হয় না।
বাড়ী আসার সময় নজরুলকে বাড়ী থেকে একটু
দূরে থাকতেই নামিয়ে দিয়ে হাকিমুদ্দিন বললো- এটুকু হেঁটে যা। আমার
বাইকে দেখলে ফজরুল সন্দেহ করতে পারে। ফজরুল খুব চালাক।
এভাবে বলেই পঞ্চাশ টাকার একটি নোট নজরুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো- আমি দিয়েছি বলবি না। নারকেল পেড়ে পেয়েছিস বলবি। তোর মোবাইল আছে তো? আমি যেদিন আসব তোকে
ফোন দিয়ে আসব। তখন তুই সেন্টারে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবি। আমি কিন্তু তোকে বাড়ী থেকে উঠিয়ে আনব না। সেণ্টার থেকে উঠিয়ে নেব।
এর পর থেকে হাকিমুদ্দিন মাঝেমধ্যে নজরুলকে নিয়ে সালাম খাঁদের আড্ডায় যায় এবং সন্ধ্যার সময় বাড়ী থেকে একটু দূরে নামিয়ে দিয়ে পঞ্চাশ টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দেয়।
এভাবে কিছুদিন চলার পর হাকিমুদ্দিন একদিন
সালাম খাঁদের রুম থেকে বেড়িয়ে নজরুলের হাতে ছোট মতো একটি পুঁটলি দিয়ে
বললো- এই পুঁটলিটা পকেটে করে নিয়ে হেঁটে যা। আমি এক
জায়গায় যাব। সেণ্টার থেকে তোকে উঠিয়ে নিয়ে যাব।
পুঁটলির মধ্যে কি আছে? নজরুল জিজ্ঞাসা করলো।
বিশেষ কিছু না। কয়েক সিলিম গাঞ্জা আছে।
পকেটে পুরে নিয়ে যা। বাড়ীতে খাওয়ার জন্য নিচ্ছি।
পুলিশ ধরবে না তো?
জানলে তো ধরবে। হাকিমুদ্দিন অভয় দিয়ে বললো-
তুই ছেলে মানুষ। পুলিশ তোকে সন্দেহ করবে না। আমি তো গাঞ্জাখোর
পুলিশ কথাটা জেনে গিয়েছে। তাই তোর কাছে দিচ্ছি। ভয় করিস না।
আমি আছি তো ! লক ডাউন খুললেই তোকে আমি সার্ট লংপেণ্ট বানিয়ে দেব।
আসলে হাকিমুদ্দিন কয়লার ব্যবসা করে না।
হাজোত থেকে বেরিয়ে এসে সে সালাম খাঁদের সাথে ড্রাগসের ব্যবসা শুরু
করেছে। তারা অভাবী ছেলেদের বিশেষ করে ছাত্রদের ড্রাগসের সাথে জড়িত
করে ব্যবসা প্রসার করতেছে। নজরুলকেও তারা ব্যবসার সাথে জড়িত করার চেষ্টা করতেছে। নজরুল ছেলে মানুষ তাই সে হাকিমুদ্দিনের চাল বুঝতে পারল না।
কথা মতোই হাকিমুদ্দিন নজরুলকে সেন্টারে এসে
বাইকে তুলে নিলো। রাস্তায় আসার সময় হাকিমুদ্দিন বললো-আমি
পুঁটলিটা আজ বাড়ীতে নেব না। তোর কাছেই রাখতে হবে। আমাদের বাড়ীতে অসুবিধা
আছে।
ভাই যদি জানতে পারে?
তুই না বললে জানবে কি করে?
গাঞ্জার যে রকম গন্ধ বেরোয়!
আমি কাঁচা কাজ করি না। রীতিমত সিলভার পেপার
দিয়ে জড়িয়ে দিয়েছি। গন্ধ বেরোবে না।
বাড়ীতে রাখব কোথায় ?
তোর টেবিল নাই? টেবিলে রাখিস। কাল আমি তোকে ফোন দিব। তখন সেন্টারে নিয়ে যাস। আজ তোকে আমি তিন শ টাকাই দিব।
তিন শ টাকা কেন?
এতদিন টাকা দিয়েছি আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য।
আজ আমার কাজ করে দিলি যে! এভাবে কাজ করে দিলে ভবিষ্যতে অনেক
টাকা পাবি। তুই কল্পনাই করতে পারবি না কত টাকা পাবি।
হাকিমুদ্দিন তিন শ টাকা বের করে নজরুলের হাতে
ধরিয়ে দিলো। টাকা পেয়ে নজরুল খুবই খুশি হলো। এগার বার বছরের ছেলে
সে বুঝবে কি করে সে ড্রাগস ব্যবসায়ের সাথে তার অজান্তেই জড়িয়ে
পড়ছে!
এক তথ্য অনুসারে ভারতবর্ষে ২০ বছরের তলের
প্রায় ১৩.১ শতাংশ ছেলেমেয়ে ড্রাগস
ছেলেমেয়ে ড্রাগস আসক্ত। এক এনজিও’র তথ্য
অনুসারে ৬৩.৬ শতাংশ ড্রাগস আসক্ত রোগী পনের বছরের তলের।
এর পর থেকে নজরুল মাঝেমধ্যেই নারকেল
পাড়ার ছুতা দিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যায় এবং বিকেলে এসে মা’র হাতে এক শ দু’শ টাকা তুলে দেয়। নারকেল পাড়ার কথা বলাতে
আদুরি নেসা বুঝতে পারে না তার ছেলে মারাত্মক ড্রাগস্ ব্যবসার
সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে।
সতের
এক সময় অভিশপ্ত লক ডাউন অন্ত হলো। সবাই ধীরে
ধীরে আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হতে লাগলো। ফজরুলও
ই-রিক্সা নিয়ে বের হলো। আদুরি নেসাও কাজে যেতে লাগলো। দোকান-মল, স্কুল কলেজ খুলল। ফলে নজরুলও আগের মতো স্কুলে
যেতে লাগলো। সালেহাও তার ছেলেদের নিয়ে বাড়ী চলে গেলো। মানুষ
আগুন থেকে যেন জলে পড়ল।
স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার পর আদুরি
নেসা ভাবলো, লক ডাউনের জন্য মুন্সি খাওয়ানো তো দূরের কথা ছলিমুদ্দিন মরার পর মিসকিন পর্যন্ত খাওয়াতে পারেনি।
তাই সে একদিন রাতে ফজরুলকে বললো- গেদা, আমাদের সমাজে কোন ব্যক্তি মরার পর তাঁর নামে
মিসকিন এবং মুন্সি ডেকে এনে খাওয়ানোর নিয়ম। কিন্তু লক ডাউনের
জন্য তোর বাপ মরার পর কিছুই করতে পারিনি। আমি ভাবছি, কয়েকজন মানুষ ডেকে এনে তোর বাপের নামে দোয়া
করে দিই। তুই কি বলিস?
ফজরুল বললো- আমি কি জানি? যা করতে হয় কর।
বেশি লোক ডাকব না। আদুরি নেসা বললো- এই ধর, যারা জানাজায় সামিল হয়েছিলো তাঁদের এবং তিন জন মিসকিন ডেকে এনে দোয়া করে দিব। লক ডাউনের জন্য জানাজায়
বেশি লোক হয়নি শুনেছি। গেদা, তুই তো জানাজায় ছিলি, কয়জন
লোকে জানাজা পড়েছে?
জলিল চাচা, ফৈজুদ্দিন খালু, উকিল ভাই, নজরুল, আমি এবং
আরও সাত জন লোক ছিলো। তাঁদের সবার নাম আমি জানি না।
অসুবিধা নেই। তোর খালু নিশ্চয় চেনে তাঁদের।
চল, কাল সকালে গিয়ে তোর খালুর সাথে এ বিষয়ে শলা-পরামর্শ করব।
পরের দিন সকালে আদুরি নেসা এবং ফজরুল ফৈজুদ্দিনের সাথে েদখা করতে
এলো। আদুরি নেসাকে সকাল সকাল আসতে দেখে ফৈজুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলো- এত সকালে? কি মনে করে? কোন অসুবিধা হয়েছে?
না, কোনো
অসুবিধা হয় নি। আদুরি নেসা বললো-লক ডাউন খোলার পরে আল্লাহ ভালোভাবেই চালাইতেছে।
ফৈজুদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-কি যে দিন
গেল, বোন!লক ডাউনে মানুষজনকে একেবারে নাজেহাল করে গেছে। অনেকের ভিটেবাড়ী পর্যন্ত বিক্রী হয়ে গেছে। লোকের
কথা কি বলব। আমি নিজেই এক বিঘা জমি বিক্রী করে দিয়েছি।
জানই যদি না থাকে জমি দিয়ে কি করব? বিপদের সময় তোমাদের কোন সহায় করতে পারি নি।
তারজন্য আমি খুবই দুঃখিত।
কথায় বলে না, চাচা, যার যার
জান বাঁচা। আদুরি নেসা বললো- থাকলে কি আর না দিয়ে থাকতেন।
সবারই এক রকম দিন ভিক্ষা তনু রক্ষা অবস্থা হয়েছিলো। অন্যের কথা কি বলব? উকিল ব্যাটাকেও জমি বিক্রী করে খেতে হয়েছে।
লক ডাউনের কথা মানুষের অনেক দিন মনে থাকবে।
ফৈজুদ্দিন ফজরুলের দিকে তাকিয়ে বললো-এরা
তো নাতি-পুতিদের কাছে লক ডাউনের সময়ের গল্প জমিয়ে করতে পারবে। আমাদের অবশ্যে সে ভাগ্য হবে না! ক’দিনই বা আর বাঁচব! ছলিমুদ্দিন ভাই চলে গেলো।
তার কি এখনই মরার
বয়স হয়েছিলো ? না, হচ্ছিল
না। ছলিমুদ্দিন ভাই আমার থেকে দশ বছরের ছোট। মানুষটাকে এমন রোগে ধরল, যে রোগের ওষুধ নেই। কেন্সার! লোকে বলে না, কেন্সার হলে পাম্পসার হয়। আজকাল কেন্সার রোগীর সংখ্যা খুবই বৃদ্ধি
পেয়েছে। সেদিন খবর পেলাম আমার শালার শশুড়েরও কেন্সার হয়েছে। দেখতে যেতে হবে।
সার দেওয়া শাক-সবজি খাওয়ার জন্যই কেন্সার
রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আদুরি নেসা বললো- আজকাল যেগুলি শাক-সবজি খাই, বলতে
পারেন শাক-সবজি খাই না, বিষ খাই।
যত বুদ্ধি বাড়ছে, তত লক্ষ্মী ছাড়ছে। ফৈজুদ্দিন বললো- শুধু
বকেই যাচ্ছি। তা কি মনে করে এসেছ
শুনাই হয়নি।
আপনার ভাই মরার প্রায় আড়াই মাসই হলো। আদুরি
নেসা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো- লক ডাউনের
জন্য মিস্কিন পর্যন্ত খাওয়াতে পারি নি। তাই মিস্কিন খাওয়ানোর কথা ভাবছি।
এটা তো ভালো কথা। আগেই খাওয়ানো উচিত ছিলো।
লক ডাউনের জন্য পার নি যদি এখন খাইয়ে
দাও।
আদুরি নেসা আমতা আমতা করে বললো- শুনেছি, ফজরুলের বাপের জানাজায় লক ডাউনের জন্য বেশি লোক সামিল হতে পারেনি। ভাবছি, জানাজায় সামিল হওয়া লোক কয়জনকেও যদি খাওয়াতে পারি!
শরিয়তের কথা! ফৈজুদ্দিন বললো- মুন্সি
সাহেবের সাথে আলাচনা ছাড়া আমি এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারব না। আজকাল তো মুন্সিরা মায়েতের বাড়ীতে খায় না
শুনেছি।
অনেক দিন তো হয়ে গেলো, এখনও কি খাবে না?
মুন্সি সাহেবের কাছে যাও। তিনি যদি খাওয়াতে
বলেন, তবে খাওয়াও। দানা খরচ করবে।দানা খরচ করতে
গিয়ে শুধু শুধু বিতর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। পারলে এখনই যাও। সকাল বেলা। এখন মুন্সি সাহেবকে বাড়ীতেই পাবে।
ভাই সাব, আপনিও চলুন না আমাদের সাথে। আদুরি নেসা বললো- আমি
মেয়ে মানুষ। কি বলতে কি বলব। মুন্সি সাহেব আবার
খারাপ পাবে।
মুন্সির বাড়ীতে এসে ফৈজুদ্দিন বললো- মুন্সি
সাহেব, ছলিমুদ্দিন ভাই মরার প্রায় আড়াই মাসের ওপর হলো। এখন দাওয়াত খাওয়ানোর কথা বলছে। খাওয়ানো কি জায়েজ
হবে?
মুন্সি সাহেব নড়েচড়ে বসে বললো- দেখেন আমরা
মুন্সি মানুষ। ছিপারা পড়ে কোরান পড়া শিখেছি। কালেমা ছুরা মুখস্থ করে
মসজিদে ইমামতি করছি। হাদিশ কোরানের কথা অত আমরা জানি না।
আগে তিন দিনে মিস্কিন, সাতদিনে
মুন্সি ডেকে এনে দোয়া করা হতো। চল্লিশ দিনে চাল্লিশা
মানে জানাজার লোকদের ডেকে এনে দোয়া করা হতো। আমরা নিজেরাই করেছি। কিন্তু এখন মৌলবীরাঁ মাইয়েতের নামে লোক ডেকে এনে খাওয়ানো জায়েজ নয় বলে।
লক্ষ্য করে দেখেন, আগে আমরা
সবেবরাতের দিন বাড়ী বাড়ী গিয়ে রুটি বিলাতাম। মৌলবীরাঁ এখন সেগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে। এগুলোকে এখন শিরক
অথবা বেদাআত বলে।কেউ কেউ আবার খাওয়ানো যায়েজও আছে বলে। কোনটা ঠিক, কোনটা
বেঠিক, এ কথা মৌলবীরাঁ বলতে পারবে। ছলিমুদ্দিন ভাই মরার অনেকদিন হয়ে গেলো। তাই মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, এমনি বাড়ীর মঙ্গলের জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে খাওয়ালে মনে হয় ভুল হবে না।
আদুরি নেসা বললো- খুব বেশি না। যে কয়জন লোক
জানাজায় সামিল হয়েছিলো মনের শান্তির জন্য শুধু তাদের
দাওয়াত করব। আপনাকেও থাকতে হবে।
তা কোনদিন দাওয়াত করবে ভেবেছ? মুন্সি সাহেব প্রশ্ন করলেন।
কালই খাওয়াব ভেবেছি। আপনি কি থাকতে পারবেন?
আমার কোনো অসুবিধা নেই।
তাহলে মুন্সি সাহেব আপনার দাওয়াত রইল। কাল
মাগরিবের নামাজের পরে যাবেন। ফৈজুদ্দিন বললেন।
ঠিক আছে। আমি মাগরিবের নামাজ পড়েই যাব।
আদুরি নেসা বড়ীতে না এসে সেখান থেকেই সোজা
জলিল সাহেবের বাড়ী চলে গেলো।
জলিল সাহেবকে দাওয়াত দিয়ে আদুরি নেসা বললো-
ভাই সাহেব, আপনাকে তো থাকতেই হবে।
সাথে যে কয়জন লোক জানাজায় সামিল হয়েছিলো তাঁদের সবাইকে আপনিই দাওয়াত দিতে হবে। তাঁদের সবাইকে আমিও চিনি না, গেদাও চিনে না। তাই একটু কষ্ট হলেও আপনাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমি মেয়ে মানুষ। আমাদের কথায় তাঁরা গুরুত্ব
না-ও দিতে পারে।
অসুবিধা নেই। জলিল সাহেব বললেন- আপনি
নিশ্চিন্ত থাকেন । আমিই তাঁদের নিমন্ত্রণও
দিব এবং সাথে করে নিয়েও
যাব। আপনি চিন্তা করবেন না মিসকিনদেরকে নিমন্ত্রণ
দিয়েছেন নাকি?
এখনও দেওয়া হয়নি। আদুরি নেসা বললো- গেদা, হাটে গিয়ে তাঁদের নিমন্ত্রণ দিয়ে আসবে।
আজকাল কিন্তু মিস্কিনদেরও দাম বেড়েছে। জলিল
সাহেব বললো- হাজিরার টাকা না দিলে নিমন্ত্রণে আসে না। এভাবে বলে
ফজরুলকে উদ্দশ্যে করে বললো- তুমি দাওয়াত দিয়ে বলবে, আপনারা কাজ ক্ষতি করে কষ্ট করে যাবেন। যেতে যাতায়াত খরচও আছে।
যাতায়াত খরচের জন্য ভাববেন না। আমরা যথাসম্ভব আপনাদের
যাতায়াত খরচ দিব। আর হ্যাঁ, মিস্কিনদের সবাইকে তুমি দাওয়াত দিতে হবে না। মিস্কিনদেরও মুরব্বী আছে। সেই
মুরব্বীর নিকটে নিমন্ত্রণ দিলেই হবে। বাকীদেরকে সেই
মুরব্বীই নিমন্ত্রণ দিবে।
ফজরুল মাথা নেড়ে সন্মতি জানিয়ে বললো-আচ্ছা, আপনি যেভাবে বললেন
আমি সেভাবেই বলব।
আদুরি নেসা বাড়ীতে ফিরে এসে উকিল সাহেবকেও
দাওয়াত দিলো।
আঠারো
দাওয়াত খেয়ে সবাই বাড়ী ফিরবে এমন সময় নজরুল দু’জন ছেলে নিয়ে বাড়ীতে এলেন।
সবার পরনে আফগানী কালো পোশাক। ছেলে দু’জন পাড়ারই। নজরুলের সম বয়সী। ছেলে দু’জনের
মধ্যে এমনি চোখে পড়ার মতো বিশেষ কিছু নেই। তবে, কালো পোশাকের জন্য সবার চোখ তাদের ওপর পড়ল।
ফৈজুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন- নজরুল কোথা থেকে
এলে। এরা কারা?
নজরুল বললো- মসজিদে গিয়েছিলাম। এরা আমার
বন্ধু।
উকিল সাহেব ঠাট্টার স্বরে বললেন- এখনই এত
বন্ধু জুটিয়ে ফেলেছ? এরা কি
তোমার সাথে স্কুলে পড়ে?
একজন পড়ে, আরেকজন পড়ে না। নজরুল বললো।
যে পড়ে না, সে কি করে?
সেন্টারে চায়ের দোকানে কাজ করে।
ভালো। উকিল সাহেব বললেন- খালা, এদের খেতে দিন। এভাবে বলেই উকিল সাহেব বললেন- আপনারা যেতে চাইছেন নাকি। বসুন গল্প করি। লক ডাউনের পরে
এভাবে কোনদিন বসাই হয়নি। বলুন, লক ডাউনের সময়ের আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা
বলুন। এভাবে বলেই নজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- নজরুল যাও, তোমার বন্ধুদেরকে নিয়ে খেতে বস।
বন্ধুদের নিয়ে নজরুল খেতে বসল।
উকিল সাহেব লক ডাউনের সময়ের নানা অভিজ্ঞতা
নিয়ে গল্প করতে লাগলো।ছেলেগুলো খাওয়া দাওয়া করে চলে যাওয়ার পর উকিল সাহেব
নজরুলকে বললো-ছেলে দু’টি চলে
গেলো না কি?
নজরুল সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো- হ্যাঁ।
চলে গেছে।
আদুরি নেসাকে উদ্দেশ্য করে উকিল সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- খালা, নজরুল কি স্কুলে যায়?
বাড়ী থেকে তো স্কুলের কথা বলেই যায়। আদুরি
নেসা বললো- রাস্তায় গিয়ে কি করে তা তো বলতে পারব না।
ফৈজুদ্দিন বললেন- আমি তো সব সময় ওকে খেলা
নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখি। স্কুলে যায় কখন? নজরুল, পরশু কি স্কুল
খোলা ছিলো?
নজরুল নীরব।
আদুরি নেসা বললো- ভাই সাব, কি বলছে উত্তর দিচ্ছিস না কেন?
নজরুল আবারও নীরব। মাটির দিকে তাকিয়ে মাটির
পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
আদুরি নেসা রাগের সাথে বললো- কথা বলছিস না
কেন? স্কুল কি খোলা ছিলো?
ফৈজুদ্দিন বললো-স্কুল খোলাই ছিলো। তবে নজরুল
স্কুলে যায় নি। সে কয়টা বকাটে ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলছিলো। আমি
কথাটা জানতাম না। ক্রিকেট বল নিয়ে এক বাড়ীর সাথে ঝগড়া
বেঁধেছিলো। তাই আমি জানতে পেরেছি, যে নজরুল
সেদিন স্কুলে যায় নি।
উকিল সাহেব বললেন- কি কথা, কি বার্তা, খুলে বলুন শুনি।
ফৈজুদ্দিন যা বললেন তা এ রকম-
সপ্তাহখানেক আগের কথা। সেদিন ফৈজুদ্দিন সহরে
যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি ফিল্ডের পাশের এক বাড়ীর সামনে জটলা দেখতে
পান। জটলা দেখে তিনি এগিয়ে দেখেন, সেই জটলার মাঝে নজরুলও রয়েছে। তিনি তত্ত্ব নিয়ে জানতে পারলেন, ক্রিকেট বল লেগে পাশের বাড়ীর খিড়কির গ্লাস ভেঙেছে। অন্যান্য ছেলেদের সাক্ষ্য মতে বলটা মেরেছিলো নজরুলই।
গৃহস্তের বউ এগিয়ে এসে বলটা নিয়ে বাড়ীর ভেতর চলে গিয়েছিলো।
তখন নজরুল তার সাথে অশালীন ব্যবহার করেছে। বাড়ীর গৃহস্ত বাড়ী
নেই। তাই গৃহস্তের বউ বলেছে, গৃহস্ত
বাড়ী না আসা পর্যন্ত বলটা দিবে না।
জটলার কারণ জানতে পেড়ে ফৈজুদিন বলেছিলেন-
ছেলেপিলের কথা! বাদ দিন। বলটা দিয়ে দিন।
গৃহস্তের বউ বললো- এগুলো ছেলে না। সব কটা
বদমাশ। ছেলেগুলো প্রায় দৈনিকই ক্রিকেট খেলে স্কুল ক্ষতি করে।
মাঝেমধ্যে খিড়কির গ্লাসও ভাঙে। লক্ষ্য করে দেখেন একটা গ্লাসও আস্ত নেই। তবুও আমরা তেমন কিছু বলি না। আজ গ্লাস ভাঙাতে আমি বলেছি, তোমরা এই স্কুলের সময়ে
ক্রিকেট খেলো, তোমাদের স্কুল নেই? তখন এই ছেলেটি (নজরুলের দিকে ইঙ্গিত করে) বললো, আমরা
স্কুল ক্ষতি করে ক্রিকেট খেলি তাতে তোমাদের কি?
আরে, আমাদের
কি মানে? গৃহস্তের বউ বলেছে- তোমাদের দেখে আমাদের
ছেলেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে না? আর যেন
স্কুলের সময়ে খেলতে না দেখি।
তখন নজরুল বলেছে- তোমরা আমাদের ভাত-কাপড় দাও
নাকি? তোমরা আমাদের বলবার কে?
গৃহস্তের বউ আক্ষেপের স্বরে বললো- দেখেন তো
চাচা, ছেলেটার ব্যবহার! ওদের জন্য আমাদের ছেলেগুলো নষ্ট হবে না?
ফৈজুদ্দিন তখন গৃহস্তের বউকে সমর্থন করে
বলেছিলেন- তা তো বটেই। একজনকে দেখেই তো আরেকজন শিখে। এটাই তো নিয়ম।
ফৈজুদ্দিনকে দেখে নজরুল মাথা হেঁট করে
দাঁড়িয়ে ছিলো। তিনি তখন তার গালে একটা চড় মেরে
বলেছিলো, আর কোনদিন বড়দের সাথে এ রকম খারাপ ব্যবহার
করবে না। যাও, মাফ চাও।
নজরুল কোন আপত্তি না করে গৃহস্তের বউয়ের পা
ধরে মাফ চেয়ে এসেছে।
উকিল সাহেব বললেন- লক ডাউনের পর থেকে নজরুলের
চালচলন অন্য রকম হয়েছে। আমিও সেদিন নজরুলকে সেন্টারে সিগারেট টানতে
দেখেছি। আমি একটু দূরে ছিলাম। লজ্জা পাবে বলে আমি কাছে
যাইনি।
আদুরি নেসা নজরুলের কাছে গিয়ে গালে কষে চড়
মেরে বললো- সত্যিই সিগারেট খেয়েছিস?
আমি খাইনি। মনে হয় আমার মতোই কেউ একজন
খেয়েছে। স্কুলের অনেকেই খায়। নজরুল সাফাই স্বরূপ বললো।
আদুরি নেসা ধমকের সুরে বললো- তোর মতোই আরেকজন
খেয়েছে। বললেই হলো। উকিল ব্যাটা তোকে চেনেন না, তাই না?
উকিল সাহেব বললেন- থাক, আজকে আর কিছু না বলাই ভালো। ছেলে মানুষ
সঙ্গদোষে খেয়েছে। আজ থেকে আর খাবে না। কি বল নজরুল?
খাব না।
কানে ধরে তওবা কর। আদুরি নেসা বললো।
ফৈজুদ্দিন বললেন- মুন্সি সাহেব আছেই। তওবাটা পড়ালেই হলো।
আদুরি নেসা মুন্সি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে
বললো- মুন্সি সাব, তাহলে
আপনি তওবাটা পড়িয়ে দিন।
মুন্সি সাহেব নজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললো-
তোমার ওজু আছে?
নজরুল মাথা নেড়ে নরম গলায় বললো- আছে।
মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে এসেছি।
তাহলে তো ঠিকই আছে। উকিল সাহেব বললেন- নামাজ
পড়। তাহলে এই ছাই পাশ খাও কেন? আগের দিনে প্রায় সবাই তামাক খেত। তামাক
খাওয়ার কারণও ছিলো। তারা ঝড়বৃষ্টিতে কাজ করত, তাই খেত। এদিকে শিক্ষা-দীক্ষাও ছিল না। তাই তারা তামাকের অপকারিতা সম্পর্কে অবগত ছিল না। আমি অনেক দিন আগে একটা ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম। একটি
বিড়ির মধ্যে যে পরিমাণ নিক’টিন থাকে, যদি পাঁচ
টা বিড়ির নিক’টিন এক সাথে মিশিয়ে একটি লোকের শরীরে ইনজেক্ট করা হয়, তাহলে
লোকটি সাথে সাথে মারা যাবে।
ফৈজুদ্দিন বললো- আমি না জেনে আগে খেতাম।
বিড়ি তামাকের অপকারিতা সম্পর্কে জানার পরে এখন আর খাই না। একদিন
একটি সভায় একজন বক্তা শ্রোতাদের প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা
কি নিজেদের ভালো বাসেন?
নিজেকে ভালোবাসে না এমন লোকও আছে নাকি? সভায় গুঞ্জনের মতো উঠেছিলো- এ ব্যাটা কয় কি? কে
নিজেকে ভালো না বাসে?
একজন দর্শক দাঁড়িয়ে প্রশ্নই করে ফেলেছিলেন-
নিজেকে ভালো না বাসে এমন লোকও আছে কি?
তখন বক্তা ব্যক্তিটি প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি বিড়ি সিগারেট খান?
লোকটি আমতা আমতা করে বলেছিলো- তা অবশ্যে খাই।
বিড়ি সিগারেট খেলে যে কেন্সার হয় এ কথা
আপনি নিশ্চয় শুনেছেন?
হ্যাঁ, অবশ্যেই
শুনেছি। লোকটি বললো- সিগারেটের প্যাকেটে এ বিষয়ে সতর্কবাণীও লেখা থাকে- ধূম্র পান করলে কেন্সার হয়।
তাহলে আপনি নিজেকে ভালোবাসলেন কীভাবে? বিড়ি, সিগারেট, তামাক খেলে কেন্সার হয়, যক্ষ্মা হয়, আপনি এ কথা জেনেও সেগুলো খাচ্ছেন। তাহলে আপনি নিজেকে ভালোবাসেন বলে দাবি করলে সেই দাবি আদৌ টিকবে কি? টিকবে না। আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করে যান আর বিড়ি
সিগারেট খাবেন না। এ ভাবে বলে ফৈজুদ্দিন বললেন-সেই সভা থেকে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, আর বিড়ি, তামাক খাব না। তারপর আর বিড়ি তামাক মুখে
নিইনি।
আজকাল দশ থেকে পনের বছরের অনেক ছেলে শুধু
বিড়ি সিগারেটই টানে না, গাঞ্জাও
খায়। উকিল সাহেব বললো- বিড়ি সিগারেট থেকেই প্রথমে
আরম্ভ করে, পরে মারাত্মক মদ, গাঞ্জা, কোকেইন, মারিজুয়েনায়ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে
১১ বছর বয়সের ৯ শতাংশ এবং ১৫ বছরের ৩৮ শতাংশ শিশু ড্রাগস
আসক্ত। সেজন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের শুধু স্কুলে পাঠিয়ে
দায়িত্ব সারলেই হবে না। তারা কি করছে তার প্রতিও নজর রাখতে হবে।
মুন্সি সাহেব বললেন- তাহলে তওবাটা পড়িয়ে দিই?
উকিল সাহেব বললেন-হ্যাঁ পড়ান। এ ভাবে বলেই
ফজরুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ফজরুল, তুমিও তওবা পড়।
মুন্সি সাহেব বললেন- শুধু ফজরুলই পড়বে কেন? আপনারা সবাই পড়ুন। তওবা পড়াটা তো খারাপ নয়।
সবাই তওবা পড়লো। তওবা পড়ার পড় মুন্সি
সাহেব বললেন- দ্যাখ নজরুল, তোমার
বাবা নেই। তোমার মা দিন হাজিরা
করে কত কষ্ট করে তোমাদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। মন দিয়ে লেখাপড়া কর। আজকাল লেখাপড়া না জানলে কোথাও সন্মান পাওয়া যায় না।
উকিল সাহেব বললেন-এমন এক সময় আসবে, লেখাপড়া না জানলে সরকার তাদের লাইসেন্স পর্যন্ত দিবে না। সেই দিন মনে হয়, দূরে নেই। একটি নিয়ম তো সরকার ইতিমধ্যে করেই ফেলেছে।
ম্যাট্রিক পাস না হলে সে পঞ্চায়েত ইলেকশ্বনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে পারবে না। আরও অনেক কিছু হবে, যা আমরা
এখন কল্পনাই করতে পারছি না।
ফৈজুদ্দিন বললেন- আমরা তো সুযোগের অভাবে
লেখাপড়া শিখতে পারিনি। আমাদের ছেলেপিলেগুলো যাতে লেখাপড়া
শিখতে পারে তারজন্য সবাই সচেতন হতে হবে। স্কুলের সময় ছেলেপিলেদের
রাস্তায় খেলতে দেখলে সবাই তাদের শাসন করা উচিত। আমার বিশ্বাস আজ থেকে নজরুল নিয়মিতভাবে স্কুলে যাবে।
মুন্সি সাহেব বললেন- নিজের চিন্তা নিজে করতে
হবে। এক সময় বাবা মা থাকবেন না। তখন সকল দায়িত্ব নিজের কাঁধে পড়বে, তখন বুঝতে পারবে লেখাপড়ার গুরুত্ব। আমাদের
সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে না, ‘আজ বুঝবি
না, বুঝবি কাল পাছা থাপড়িয়ে পারবি গাল।' লেখাপড়া না শিখে
শেষ বয়সে যাতে পাছা থাপড়াতে না হয়। আর মনে রেখ, তওবা সস্তার জিনিস নয়। তওবা করে তওবা ভঙ্গ করলে বড়
গোনাহ হয়। সে গোনাহ আল্লাহ মাফ করেন না। আর স্কুলের ছেলেমেয়েদের
হাতে মোবাইল দিবেন না। মোবাইলেও অনেক ছেলেমেয়ে নষ্ট করছে। পোশাক আশাকের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। আজ নজরুল যে পোশাক পরেছে, এগুলো তো আমাদের দেশের
পোশাক না। আফগানী পোশাক। এমনি আমাদের কত দুর্ণাম। হুজি, জেহাদি বলে নানান অপবাদ
দেয়। এসব পোশাক পরলে কোনোদিন জেহাদি বলেও জেলে পাঠাতে পারে। তাই সবাই ছেলেমেয়েদের পোশাকের প্রতিও নজর রাখবেন।
এ ভাবে নানাজনে নানান উপদেশ বাক্য শুনিয়ে
সবাই যার যার বাড়ী চলে গেলেন।
উন্নিশ
নজরুল এক সময় হাকিমুদ্দিনের ফাঁদে ভালোভাবেই
ফেঁসে গিয়েছিলো। সে নামমাত্র স্কুলে যেতো এবং হাকিমুদ্দিনের নির্দেশ মতো স্কুলের
ব্যাগে করে গাঞ্জা পাচার করত। সে নিজও ড্রাগস আসক্ত
হয়ে পড়েছিলো। তবে, তওবা
পড়ার পর থেকে সে গোনাহের ভয়ে সব ধান্দা ছেড়ে দিয়ে নিয়মিতভাবে স্কুলে যেতে লাগলো। ফজরুলও ই-রিক্সার সাথে সাথে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে
লাগলো। আদুরি নেসাও আগের মতোই নিয়মিতভাবে হাজিরা করতে
লাগলো। এভাবে এক গতানুগতিক স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লো সবাই।
একদিন নজরুল স্কুলে যাওয়ার পথে
হাকিমুদ্দিনের সাথে দেখা হলো। হাকিমুদ্দিন বাইক চড়ে যাচ্ছিলো। সে নজরুলের সামনে বাইক থামিয়ে বললো- কিরে, আজকাল
দেখছি ফোন দিলেও ফোন ধরিস না। ব্যাপার কি? বড় লোক হয়ে গেলি নাকি? টাকা
পয়সার দর্কার নেই? নেশা করার
জন্য তোর মন উসখুস করে না?
অনেকদিন আগে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক একটি
বৃত্তের দ্বারা ভগবান এবং ভগবানের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভয় সম্পর্কে
সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ
যখন ভগবানের নিকটে থাকে তখন মানুষের ভগবানের প্রতি অধিক আস্থা ও ভয় থাকে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বৃত্তের পরিধি ধরে ভগবান
থেকে দূরে সরে আসতে থাকে ফলে মানুষের ভগবানের প্রতি আস্থা ও ভয় কমতে
থাকে। যৌবন কালে মানুষ ভগবান থেকে একেবারে বিপরীত বিন্দুতে
অবস্থান করে, ফলে মানুষের ভগবানের প্রতি আস্থা ও ভয়
একেবারে কমে যায়। মানুষ যখন বিপরীত বিন্দু থেকে আবার বৃত্তের পরিধি
ধরে ধীরে ধীরে ভগবানের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন আবার ভগবানের প্রতি আস্থা ও ভয় বাড়তে
থাকে। তাই শিশুকালে ও বৃদ্ধ অবস্থায় মানুষের ভগবানের প্রতি ভয় ও
আস্থা বেশি থাকে।
নজরুল শিশু। তাই তওবা পড়ার পর থেকে তার মনে
আল্লাহর ভয় ক্রিয়া করছিলো এবং তওবা ভংগ করলে গোনাহ হবে বলে
তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিলো।
সেজন্য হাকিমুদ্দিনের প্রশ্নের উত্তরে নজরুল
বললো- করবে না কেন? করে। তবে, আমি আর নেশা করব না। মুন্সি তওবা
পড়িয়েছে।
হাকিমুদ্দিন হেসে বললো- তওবা পড়িয়েছে। তুই
আমাকে হাসালি। তওবা পড়েছিস তো কি হয়েছে? তওবা পড়লে কিছু হয় না। দর্কার হলে আবারও
পড়বি। মুন্সির তো আর অভাব নেই।
মুন্সি বলেছেন, তওবা পড়ে আবার সেই কাজ করলে বড় গোনাহ হয়। সে
গোনাহ মাফ হয় না। নজরুল বললো।
তুই একটা মস্ত বুদ্ধু ৷ হাকিমুদ্দিন বললো-
নেশা করলে পাপ হয় না বুর্বক। এটা হলো কথার কথা। বড় বড় লোকেরা সবাই নেশা
করে। তাদের পাপ হয় না? যদি পাপই
হতো, তাহলে তাঁরা কি নেশা
করতো? নিশ্চয় করত না। তাই না?
তাঁরা বড়লোক। নজরুল বললো- বড় লোকেরা যাই
করুক না কেন, তাঁদের শোভা পায়।আমরা গরীব। আমাদের ও সব কাজ
শোভা পায় না।
তুই বড় লোক হতে চাস না?
চাইলেই কি বড় লোক হওয়া যায়?
ইচ্ছে থাকলে সবই হওয়া যায়। হাকিমুদ্দিন
বললো- আমার কি ছিলো। কিছুই না। গুটকা খাওয়ার জন্য ছাগল চুরি করতাম। ফজরুলও আমার
সঙ্গী ছিলো। এখন আমি বাইকে চড়ে ঘুরছি, আর ফজরুল
পিলপিলি চালাচ্ছে। আমার সাথে থাকলে সে-ও বাইক নিয়ে ঘুরতে পারতো। ফজরুল গোল্লায় গেছে যাকগে’। ওকে সারা জীবন পিলপিলিই চালাতে হবে। তুইও কি পিলপিলি চালাতে চাস? নিশ্চয় চাস না। বাইকে উঠ।
না, আমি
স্কুলে যাইতেছি।
আরে বুর্বক। চল, আমি তোকে স্কুলেই নামিয়ে দিব।
না, নামিয়ে
দিতে হবে না। নজরুল স্কুলের দিকে তাকিয়ে বললো- ওই তো স্কুল। এইটুকু রাস্তা হেঁটেই যেতে পারব।
নজরুল হাকিমুদ্দিনদের তুরুপের তাস। বয়স কম।
এদিকে ছাত্র। তাই তার দ্বারা ড্রাগস সরবরাহ করা খুবই সহজ। ছাত্র বলে কেউ
তাকে ড্রাগস সরবরাহকারী বলে সন্দেহ করে না। তার দ্বারা যেখানে
ইচ্ছা সেখানে ড্রাগস সরবরাহ করা যায়। স্কুলের ব্যাগে ড্রাগস ভরে দিলেই হলো।
ইতিমধ্যে তার দ্বারা নানান জায়গায় অনেক ড্রাগস সরববরাহ করিয়েছেও। স্কুলের
ছাত্রদের মাঝেও তার দ্বারা ইতিমধ্যে
অনেক ড্রাগস সরবরাহ করিয়েছে। স্কুলের অনেক ছাত্র ইতিমধ্যে নজরুলের দ্বারা ড্রাগস আসক্ত হয়ে পড়েছে। নজরুলের
দ্বারা অন্য দুজন ছেলেকেও ড্রাগস সরবরাহে জড়িত করেছে।
হাকিমুদ্দিন উপলব্ধি করল, তওবা পড়ে ডানপিটে নজরুল সত্যিই ভেড়া বনে
গেছে। মনে গোনাহের ভয় ডানা বেঁধেছে। এভাবে চললে এক সময় নজরুল তাদের হাত
ছাড়া হয়ে যাবে।কিন্তু কোনোমতেই তাকে হাত ছাড়া করা যাবে না। তাকে যেকোনো মূল্যের
বিনিময়ে বাগে আনতেই হবে। তাই হাকিমুদ্দিন নজরুলকে টোপ
দেওয়ার কথা ভাবলো।
হাকিমুদ্দিন বললো- নজরুল, তোর বয়েস কত?
নজরুল বললো- বয়স দিয়ে কি করবে?
দর্কার আছে বলেই তো জিজ্ঞাসা করছি।
কি দর্কার?
আরে দর্কারের কথা পরে বলবো।
নজরুল বললো- বার বছর।
বার বছর হলে তো হবে না। আঠারো বছর না হলে
সম্ভব হবে না।
আঠারো বছর হলে কি করতে?
বাইক কিনে দিতাম। হাকিমুদ্দিন বললো- তোকে বাইক কিনে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। বয়স হয় নাই যদি বাইক কিনে দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে সমস্যা নাই। তুই তো
সাইকেল চালাতে জানিস তাই না?
জানি?
তাহলে তোকে সাইকেলই কিনে দিব। আমি সালাম খাঁর
সাথে আলোচনা করে তোকে বাইক কিনে দেওয়ার
কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আঠারো বছর না হলে বাইকের লাইসেন্স দিবে না। তাই সাইকেল কিনে দিব। আরে, আজকাল
অনেক দামি দামি সাইকেল আছে। চৌদ্দ পনের হাজার টাকা মূল্যের। তোকে
চৌদ্দ পনের হাজারের মধ্যে একটা সাইকেল কিনে দিব।
নজরুল অনেকদনি ধরে তার মা'র কাছে একটা সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য আবদার
করতেছে।সাইকেল কিনে না দেওয়ার জন্য সে দুই দিন না খেয়েও ছিলো। তাই সাইকেলের কথা
শুনে সে উৎসাহিত হয়ে উঠলো। বললো- সত্যিই সাইকেল কিনে
দিবে?
না দিলে এমনি এমনি বলছি নাকি? সত্যিই কিনে দিব। হাকিমুদ্দিন দৃঢ়কণ্ঠে
বললো।
লোভ এমন এক জিনিস যার হাতছানি অনেক বড় বড়
লোকও উপেক্ষা করতে পারে না।টাকার লোভ, ক্ষমতার
লোভ, নারীর লোভ খুবই মারাত্মক জিনিস। টাকা এবং
ক্ষমতার লোভে পড়ে অনেক সৎ ব্যক্তিও অসৎ হয়ে যায়, নারীর লোভে পড়ে অনেক রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে।
ট্রয় নগরী তার জলন্ত প্রমাণ। ট্রয় নগরী ধ্বংসের মূলেই ছিলো নারী। সে এক
অন্য কাহিনী। পরে কোনদিন বলার চেষ্টা করব।
নজরুল ছেলে মানুষ। সাইকেলের কথা শুনে সে লোভে
পড়ে তওবার কথা ভোলে গেলো।
মানুষ কোনো অনুচিত কর্ম করার আগে অজুহাত
খুঁজে। তওবা ভঙ্গ করার জন্য সেও অজুহাত খুঁজতে লাগলো। তার মা'ই তো তওবা করে সেদিন রাতেই দোক্তা দিয়ে পান
খেয়ে তওবা ভঙ্গ করেছেন। ফজরুলও দেখছি সিগারেট খায়। সেদিন
স্কুল থেকে আসার সময় সে দেখেছে ফজরুল পিলপিলিতে বসে মজা করে সিগারেট
টানছে। উকিল ভাইও দেখছি তওবা করার পরেও সিগারেট খায়।
তাঁদের যদি গোনা না হয়, শুধু
শুধু তার গোনাহ হবে কেন? এভাবে
ভেবে নজরুল উৎসাহিত হয়ে উঠলো।
সে বললো- সত্যিই সাইকেল কিনে দিবে?
না দিলে এমনি এমনি বলছি নাকি? সত্যি সত্যি সত্যি। তিনবার সত্যি বলেছি। এখনও
তোর মনে সন্দেহ আছে নাকি? আর কি কি
করতে হবে বল। আমি তাই তাই করব।
না, আমি
বিশ্বাস করেছি। আর কিছু করতে হবে না।
এমন সময় সালাম খাঁ সেখানে এসে পৌঁছোল। সালাম
খাঁকে দেখে হাকিমুদ্দিন চোখ টিপে বললো- সালাম ভাই, সেদিন আমরা নজরুলকে বাইক কিনে দেওয়ার কথা
আলোচনা করিনি?
অবশ্যেই বাইক কিনে দেওয়ার কথা আলোচনা করা
হয়নি। সালাম খাঁ চালাক মানুষ। সে হাকিমুদ্দিনের কথার ইঙ্গিত
বুঝতে পেড়ে বললো- হ্যাঁ, করেছি
তো। তাতে কি হয়েছে?
হাকিমুদ্দিন বললো- নজরুলের আঠারো বছর হয়নি।
আঠারো বছর না হলে তো লাইসেন্স দিবে না। তাই সাইকেল কিনে
দেওয়ার ভাবছি।
তা এখন সাইকেলই দাও। সালাম খাঁ বললো- আঠারো
বছর হলে তখন বাইক কিনে দিলেই হলো। এটা আর কি বড় কথা ! এভাবে
বলে সালাম খাঁ প্ৰসংগ পালটিয়ে বললো-নজরুল, অনেকদিন হলো, তোর
ছায়াই দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের ভোলে গেলি না কি?
হাকিমুদ্দিন বললো-না ভোলেনি। বাড়ীর সমস্যার
জন্য কয়দিন আসতে পারেনি। আজ থেকেই ও আবার কাজ শুরু করবে। এ ভাবে
বলেই হাকিমুদ্দিন পেণ্টের পকেট থেকে গাঞ্জার পুঁটলি বের করে
নজরুলের ব্যাগে রেখে বললো- আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে শিব মন্দিরের পাশে যে দোকানটা আছে না, পুঁটলিটা
সেখানে দিয়ে যাবি। তুই টাকা নিতে হবে না। আমি গিয়ে টাকা নিয়ে নেব। আর হ্যাঁ, স্কুলের ছেলেদের
গাঞ্জা খাওয়ানোর চেষ্টা করবি। সিগারেটের ভেতরে ভরে নিবি। কেউ টের
পাবে না। নতুন নতুন গ্রাহক যোগার করার চেষ্টা করবি। যত বিক্রী করবি, আজ থেকে
তুই বিক্রী মূল্যের উপরে কমিশন পাবি।
নজরুল অনেকদিন ধরে লেইজারের সময় ছাত্রদের
মাঝে গাঞ্জা বিক্রী করে আসছে। অনেকে গাঞ্জা সেবনে অভ্যস্তও হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকেই তার কাছে গাঞ্জা খুঁজে। নতুন দুই চারজনও আসে তাদের সাথে। কিন্তু তওবা পড়ার জন্য ব্যবসা করবে না বলে
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে সে তাদের এই কয়দিন গাঞ্জা দিতে
পারেনি।
তাই নজরুল বললো- আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।
আমার কাছে অনেকেই গাঞ্জা খুঁজে। থাকলে এক প্যাকেট সিগারেটও দাও।
হাকিমুদ্দিন পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট
বের করে নজরুলের ব্যাগে পূরে দিল।লোভের বশে তওবার কথা ভোলে ফজরুল আবার গাঞ্জার
সাথে জড়িত হয়ে পড়লো।
বিশ
আদুরি নেসা কাজ থেকে এসে গোসল করে কাপড়
শুকোতে দিচ্ছিলো। এমন সময় ফজরুল রিক্সা নিয়ে বাড়ী এলো।
ফজরুলকে দেখেই আদুরি নেসা জিজ্ঞাসা করলো- কিরে আজ এত তারাতারি
বাড়ী ফিরলি যে! শরীর খারাপ নাকি?
না।সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ফজরুল ঘরের ভেতর
প্রবেশ করলো। আদুরি নেসা ফজরুলের পেছনে পেছেন ঘরের ভেতর প্রবেশ
করে বললো- কিরে, শরীর খারাপ নাকি?
ফজরুল সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো-না।
আদুরি নেসা ব্যক্তভাবে বললো- তয় এত সকাল
সকাল বাড়ী ফিরলি কেন? পেসেঞ্জার
নাই নাকি?
পেসেঞ্জার থাকবে কোথা থেকে! ফজরুল বিরক্তি
ভরা গলায় বললো- এখন পেসেঞ্জারের থেকে পিলপিলিই বেশি হয়েছে। যে
কাজই করতে যাব, সেখানেই লোক এসে ঠেসে ধরবে। লক ডাউনের সময়ে সবজির ব্যবসা করতে গেলাম। কয়দিন ব্যবসা করার পর বানের জলের মতো লোক এসে উপচে পড়লো। এখন পিলপিলি চালাতে যাচ্ছি সেখানেও লোক এসে ভির
করেছে। এখন পেসেঞ্জার পাওয়াই মশকিল। সারাদিন বসে থেকে মাত্র বিশ টাকার ভাড়া
মেরেছি।
৩য় কি করবি? আদুরি নেসা আদুরে স্বরে বললো- সবারই টাকার দর্কার। পেট আছে না!পেট
হলো আগুন। খাইতে দিলে নিভে থাকে, আর খাইতে
না দিলেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে।
আমি আর পিলপিলি চালাব না। ফজরুল গম্ভীর গলায়
বললো- হাজিরা করতে যাব।
হাজিরা করতে যাবি, তোর পড়া কে পড়বে?
আমি আর পড়ব না। এক হাতে দুই শইল ধরা যায়
না।
হ্যাঁরে, আজ না তোদের ফল শুনানোর কথা! তুই পাস করেছিস?
না ফেল করেছি। একটা সাবজেক্টেও পাস নম্বর পাই
নি। ফজরুল বলে গেলো-লক ডাউনের পরে পড়ার সুযোগ না দিয়েই
পরীক্ষা। পাস করব কেমনে? তাই আমি
আর পড়ব না। পড়া ছেড়ে দিয়ে হাজিরা করব।
দ্যাখ গেদা, পড়া ছাড়িস না। কষ্ট হলেও পড়ে যা। পাস ফেল তো মানুষেই করে। সামনের বছর ভালো করে পড়ে পরীক্ষা দিলেই পাস করতে পারবি। তোদের বাপের বড় সাধ ছিলো তোরা পড়ে বড় লোক হবি। বড় লোকের বাপ বলে গর্ব করবে। তোদের বাপ মরে
গেলেও বেহেস্ত থেকে তোদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তোদের বাপের
সেই আশায় তোরা মাটি দিস না, বাপ।
বিরক্তিতে ফজরুলের মুখ কুঁচকে উঠলো। সে
বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বললো- আমাকে বিরক্ত কর না তো। এখন বাইরে যাও। আমি
কাপড় পালটাবো।
কেন আমি থাকলে তোর কাপড় পালটাতে অসুবিধা হবে?
হবেই তো। এখন আমি বড় হচ্ছি না।
আরে তুই যে বড় হয়েছিস সে কথা তো আমার মনেই
ছিল না। আদুরি নেসা হাসি হাসি মুখে বললো- দ্যাখ গেদা, বাপ মা’র কাছে
সন্তান কখনও বড় হয় না। আমার কাছে তুই সেই কচি খোকাই
আছিস।এভাবে বলেই আদুরি নেসা ঘরের বাইরে চলে এলো।
কাপড় পালটিয়ে একটু পরেই ফজরুল বাইরে এসে বললো- নজরুল আসেনি মা?
নাতো।
এখনও বাড়ী আসেনি। তার মানে ও-ও ফেল করেছে।
ফেল করেছে, মানে? তাহলে
দুজনেই কি ফেল করলি? আমি
লোকের সামনে যাব কেমনে?
এখনও যদি বাড়ী আসেনি তাহলে ও নিশ্চয়ই ফেল
করেছে।
গেদা, এ রকম
কুকথা বলিস না তো। আদুরি নেসা চিন্তিত কণ্ঠে বললো- ও নিশ্চয় পাস করেছে। পাস করার আনন্দে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে হয়তো।
ওর পড়ার যা অবস্থা! ফজরুল বললো- ওকে তো আমি
স্কুলেই যেতেই দেখি না। খালি হাকিমুদ্দিনের বাইকের পেছনে
চড়ে ঘুরতে দেখি।
আরে গেদা বলিস কি? হাকিমুদ্দিন যে ধুরন্ধর লোক। ইতিমধ্যে একটা
মার্ডারও করে ফেলেছে। নজরুল, ওর সাথে ঘূরে আমাকে এ কথা এতদিন বলিস নি কেন?
বললে কি করতে?
বুঝাতাম। হাকিমুদ্দিনের সাথে না ঘুরার কথা
বলতাম। তবুও যদি ঘুরত, তাহলে
ধরে বেঁধে পিটাতাম।
পিটাতে পারবে? ফজরুল শান্তস্বরে বললো- নজরুল এখন আমাদের আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে, মা। ওর
এখন অনেক সঙ্গী সাথী। হাকিমুদ্দিন তো আছেই, মুন্সি
খাওয়ানোর দিন যে দু’টি ছেলে এসেছিলো তারা তো আছেই, বাঘবর
অঞ্চলের দু’জন ডাকাতও এখন ওর
সাথী। তারা সবাই গাঞ্জা খায়। সবাই গাঞ্জার ব্যবসার সাথে জড়িত।
গেদা, বলিস কি
তুই ! আদুরি নেসা বড় বড় চোখে ফজরুলের দিকে তাকিয়ে বললো- নজরুলও কি গাঞ্জা খায়?
হ্যাঁ, নজরুলও
গাঞ্জা খায়। গাঞ্জার ব্যবসাও করে।
গাঞ্জা খায়। গাঞ্জার ব্যবসা করে! এ কথা
আমাকে আগে বলিস নি কেন তুই? ও যে গাঞ্জা খায়, তুই দেখলি কোথায় ?
সেদিন বাড়ীতেই গাঞ্জা নিয়ে এসেছিলো।
গাঞ্জার বোলে গন্ধ বেরোয়। গন্ধ তো পেলাম না।
সিগারেটের ভেতরে ভরে এনেছিলো। ফজরুল যথা
সম্ভব গম্ভীর ও নিন্ম স্বরে বললো- গন্ধ পাবে কোথা থেকে? সিগারেটের ভেতরে ভরে এনে স্কুলে নিয়ে গিয়ে
ছাত্রদের কাছে বিক্রী করে।
আদুরি নেসা অবাক কণ্ঠে বললো- ছাত্ররাও গাঞ্জা
খায়? এত কাণ্ড করছে।
আমাকে আগে বলবি তো?
বলতে চেয়েছিলাম। ফজরুল বললো- ‘ও আমার মুখ চেপে ধরল। বললো, ভাই মাকে বলিস না। আর
কোনদিন বাড়ীতে আনবো না। আমি গাঞ্জা খাবও না। এই চোখ ছুঁয়ে দিব্যি করছি।' তাই বলিনি। এদিকে বেশি
জানাজানি হলে বাড়ীতে পুলিশও আসতে পারে। তাই ওকে শাসিয়ে ছেড়ে দিয়েছি।
ও আজ আসুক বাড়ী। আজ ওর একদিন কি আমার একদিন।
এমন সময় হনহন করে এসে নজরুল বাড়ীর ভেতর
প্রবেশ করলো। ফজরুল চুপি চুপি বললো- আমি বলেছি, বল না যেন। আগে ওর পরীক্ষার রিজাল্ট কেমন
হয়েছে জিজ্ঞাসা কর। আগেই বকাবকি কর না। তাহলে আসল কথা বের করতে
পারবে না।
নজরুল ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো।
ফজরুলের পরামর্শ মতেই আদুরি নেসা যথাসম্ভব
নরম গলায় বললো- গেদা, এত দেরি
করে এলি যে? তোর
পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে নাকি?
নজরুল সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো- বেরিয়েছে।
পাস করেছিস?
না।
না মানে?
লক ডাউন খোলার পরেই পরীক্ষা হলো। পড়ার সুযোগ
পাইনি। পাস দিব কেমন করে?
যা, কাপড়
খুলে হাতমুখ ধুয়ে আয়। আদুরি নেসা যথাসম্ভব সংযত স্বরে বললো।
নজরুল কাপড় খোলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ফজরুল নজরুলের পকেট হাতড়াতে লাগলো। পকেট
থেকে দু’পেকেট সিগারেট বেরিয়ে এলো।
ফজরুল সিগারেটের প্যাকেট মা’র হাতে
দিয়ে বললো- বলছিলাম না। এখন প্রমাণ দেখ।
আদুরি নেসা সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে
শুঁকে দেখলো। বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে পেকেট থেকে। সে প্যাকেট দু’টি কুঁচে গুঁজে বললো- আগেই কিছু বলবি না।
দেখি সিগারেটের প্যাকেট না পেয়ে কি করে।
রাতে ভাত খাওয়ার পর নজরুল প্যাকেট খুঁজতে
লাগলো। আদুরি নেসা এগিয়ে এসে বললো-কি খুঁজছিস?
না, কিছু না? নজরুল স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো।
আমি জানি তুই কি খুঁজছিস। এভাবে বলে কুঁচ
থেকে প্যাকেট দু’টি বের করে বললো- এই প্যাকেট
খুঁজছিস না?
তুমি কোথায় পেলে?
তোর পকেটে পেয়েছি। আদুরি নেসা তীক্ষ্ণ লগায়
বললো- বল, আর কোন দিন এরকম কাজ করবি? উকিল ব্যাটাকে ডাকি?
নজরুল আদুরি নেসার হাত থেকে প্যাকেট কাড়ার
চেষ্টা করে বললো- না, উকিল
ভাইকে বলো না। আর কোনদিন এ রকম কাজ করব না।
করবি না তো? দেখিস। আবার যদি তোর কাছে সিগারেটের প্যাকেট পাই তাহলে উকিল ব্যাটাকে নয়, একেবারে
পুলিশ ডেকে এনে ধরিয়ে দেব।
বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। ওপর মুখে থুতু ফেললে
নিজের গায়েই পড়ে। জানাজানি হলে ক্ষতি তাদেরই হবে। এই ভেবে শাসন করে
নজরুলকে সেদিনের মতো ছেড়ে দিলো এবং আদুরি
নেসা সিগারেটের প্যাকেট দু’টি আগুনে
পুড়িয়ে ফেললো।
একৈশ
সেদিন সন্ধ্যায় ফজরুল ফৈজুদ্দিনদের বাড়ী এসে বললো-খালু, আমি পিলপিলি বিক্রী করব। কিন্তু মা সন্মত হচ্ছেন না। আপনি মা’কে বলে পিলপিলিটা বিক্রীর ব্যবস্থা করে দিন।
ফৈজুদ্দিন অবাক দৃষ্টিতে ফজরুলের দিকে
তাকিয়ে বললেন- পিলপিলি বেচবে? কেন?
পিলপিলি অনকে হয়েছে। ফজরুল অসুবিধার কথা
জানালো- তাই ভাড়া হয় না। কোনো কোনো দিন বিশ ত্রিশ টাকাও ভাড়া
হয়। ব্যাটারিও দুর্বল হয়ে
গেছে। তিন চার ঘণ্টার বেশি চার্জ থাকে না। বদলাতে হবে। ব্যাটারি বদলাতে হলে চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে।
ভাড়াই হয় না, চল্লিশ হাজার টাকা খরছ করে ব্যাটারি বদলিয়ে কি হবে? তাই বেচতে চাইছি। মা রাজি হচ্ছেন না।
পিলপিলি বেচার পরে কি করবে? কিছু একটা তো করতে হবে! বসে খেতে তো আর পারবে না। ফৈজুদ্দিন চিন্তিত কণ্ঠে বললেন।
গুয়াহাটী গিয়ে পাইপ কোম্পানীতে হাজিরা করব।
তোমার বয়েস মোটে ষোল বছর। তোমাকে কি হাজিরা
নিবে?
নিবে। আমাদের পারার অনেকেই পাইপ কোম্পানীতে
কাজ করে। তারা বলেছে, খুব পরিশ্রমের কাজ না।
তাই নিবে।
তোমার লেখাপড়া?
আমি পড়া ছেড়ে দিয়েছি। ফজরুল বললো- এই বছর
স্কুলে ভর্তিই হইনি। নজরুল যদি পড়ে, ওকেই পড়াব ভেবেছি।
চিন্তা তো ভালোই করেছ! ফৈজুদ্দিন কিছুক্ষণ
মনে মনে থেকে বললেন- ঠিক আছে। আমি তোমার মা'র সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে দেখি সে কি বলে!
পরের দিন সকালে ফৈজুদ্দিন ফজরুলদের বাড়ী এসে
আদুরি নেসাকে বললেন- কাল সন্ধ্যায় ফজরুল আমার কাছে গিয়েছিলো। ও
বোলে পিলপিলি বেচতে চায়। তুমি বেচতে দিতেছ না?
পিলপিলি বেচে ও করবেটা কি? আদুরি নেসা বললো- আমি বলছি, যা ভাড়া হয় তাই হলেই চলবে। আজ
ভাড়া হচ্ছে না। কাল হয়তো বা হবে। না হয় যদি না-ই হবে। আমি হাজিরা করেই ওদের খাওয়াব। ও আমার কথা মানছে না। পিলপিলি বেচবেই। আমার সাথে পেরে
না উঠে, এইবার আপনার কাছে গেছে। আমি বলি, ওরা পড়ুক। কষ্ট হয় আমার হবে।
স্কুলে ভর্তিই বোলে হয়নি। পড়বে কেমনে?
ভর্তির সময় এখনও আছে। আদুরি নেসা বললো- আমি
পরশু স্কুলে গিয়েছিলাম। হেড মাস্টার সাহেব বললেন, ভর্তি হতে পারবে।
ফজরুল একটু দূরেই বসে ছিলো। সে বললো- আমি আর
পড়ব না। এইবার পরীক্ষায় ফেল করেছি। আমার ক্লাসের ছাত্ররা
ওপরের ক্লাসে পড়বে। আর আমি তাদের তলের ক্লাসে পড়ব? তা আমি পড়তে পারব না।
ফৈজুদ্দিন পরামর্শের স্বরে বললেন- পাস ফেল তো
মানুষেই করে। ফেল করেছ বলেই পড়বে না
এটা কেমন কথা? পিলপিলির ভাড়া যখন হচ্ছে না। আবার বলছ, ব্যাটারিও
বদলাতে হবে। তাহলে পিলপিলিটা বিক্রী করে দিয়ে
স্কুলে ভর্তি হও।
না আমি আর পড়ব না। ফজরুল উপহাসের স্বরে
বললো- গরীবের আবার পড়া!
কেন গরীব
মানুষ কি পড়ে না? ফৈজুদ্দিন
বললো- আব্দুল কালাম স্যারের কথাই ধর।তিনি তো গরীবেরই সন্তান ছিলেন। তিনি কেমন করে এত
বড় বৈজ্ঞানিক হলেন? আসলে ধনী
গরীবে পায় না। পড়ার ইচ্ছা থাকলে গরীবের সন্তানেও
অনেক কিছু করতে পারে।
ফজরুল বললো- আমার পরিবর্তে নজরুল পড়ুক। ও
যতদিন পড়বে, আমি দিব ওর পড়ার খরচ।
আদুরি নেসা আহত কণ্ঠে বললো- ও-ও তো ফেল
করেছে। ও কি পড়বে?
পড়বে। আমার কাছে বলেছে।ফজরুল বললো।
ফৈজুদ্দিন উষ্মার সাথে বললেন- হাউসে বিদ্যে, কৃপণের ধন। ফজরুল যদি পড়তে চাইছে না, জোর করে
লাভ নেই। কিলাইয়ে কাঁঠাল পাকালে সে কাঁঠালের স্বাদ থাকে না। ও যদি পিলপিলি বেচতে চাইছে, বেচতে দাও। তারপর ও যা করতে চায় করতে দাও। আজ বুঝবে না, বুঝবে কাল,পাছা থাপড়িয়ে পারবে গাল। তখন কিন্তু লাভ হবে না। দাঁত থাকতে কেউ
দাঁতের মর্ম বুঝে না।
এত বুঝানোর পরেও যদি বুঝতে চাইছে না, তখন আর কি করার আছে? পিলপিলিই বিক্রী করে
দিন। আদুরি নেসা বললো।
সে তোমাদের মর্জি। ফৈজুদ্দিন বললেন- এর মাঝে আমার কিছুই বলার
নেই।
অবশেষে পিলপিলি বেচার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত
হলো। ফজরুল পিলপিলি বিক্রী করে গুয়াহাটী চলে গেলো।
নজরুল আগের মতোই স্কুলে যেতে লাগলো। আদুরি নেসার
ভয়ে সে কিছুদিন গাঞ্জা সেবন থেকেও
বিরত থাকলো। কিন্তু নজরুল ইতিমধ্যে পুরোপুরি ড্রাগস আসক্ত
হয় পড়েছিলো। ড্রাগস এমন এক মারাত্মক জিনিস, একবার আসক্ত হয়ে পড়লে কাঁঠালের আঠার মতো
লেগে ধরে। হাজার চেষ্টা করলেও উপযুক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা ছাড়া তার হাত থেকে
পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হয় না । ড্রাগস না খেলে ড্রাগস
আসক্তদের রাতে ঘুম হয় না। ছটফট করে। আচরণ বন্য হয়ে উঠে।ভালোমন্দ বিবেচনা করার
জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নজরুলের ক্ষেত্রেও তাই হলো। মা’র ভয়ে গাঞ্জা সেবন থেকে কিছুদিন বিরত থাকলেও কয়েকদিন পরেই সে বুঝতে পারল, গাঞ্জা
না খেলে সে বাঁচবে না। পাগল হয়ে যাবে। এদিকে হাকিমুদ্দিনও
ফোনের পর ফোন দিয়ে তাকে বিরক্ত করতে লাগলো। একদিন তার অবস্থা চরমে পৌঁছোল। তার ধারণা হলো, গাঞ্জা না খেলে হয়তো সে মরেই যাবে।
তাই নজরুল হাকিমুদ্দিনের কাছে এসে বললো- ভাই, আমাকে গাঞ্জা দাও। নইলে আমি পাগল হয়ে যাব।
গাঞ্জা খাবি, খা। কে তোকে মানা করছে? হাকিমুদ্দিন
নজরুলের মন বুঝার জন্য বললো- তুই বোলে গাঞ্জা খাবি না বলে মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিস। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে তোর
পাপ হবে না?
প্রতিজ্ঞা রাখা সম্ভব হবে না। দাও, সিগারেট দাও। আগে খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে নিই।
হাকিমুদ্দিন বললো- চল, রুমে যাই। সেখানে গিয়ে যত ইচ্ছা খাবি।
রুম মানে সালাম খাঁদের ভাড়াঘর। তারা রুমে
এলো। হাকিমুদ্দিন নজরুলকে একটা সিগারেট দিলো।
সিগারেটে টান দিয়ে নাকমুখ দিয়ে ধুয়া ছেড়ে
ফজরুল বললো- আঃ! শান্তি পেলাম। আজ গাঞ্জা না খেলে আমি মরেই যেতাম।
প্রতিজ্ঞা যখন ভঙ্গ করলিই, তাহলে ব্যবসাটাও শুরু করে দে। তুই না থাকার
জন্য এই কয়দিনে ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হয়েছে।
ব্যবসা করব ঠিকই। তবে বাড়ীতে গাঞ্জা নিয়ে
গিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বাড়ীতে যাওয়ার সাথে সাথে মা আমার সমস্ত কাপড় ‘চেক’ করে।
হাকিমুদ্দিন বললো- তাহলে আমাদের ব্যবসার কি
হবে? স্কুলের ছাত্রদের কে গাঞ্জা যোগান ধরবে?
নজরুল বললো- যাই বল না কেন হাকিমুদ্দিন ভাই।
এখন আর বাড়ীতে গাঞ্জা রাখা সম্ভব হবে না। আমাদের বাড়ীর পাশেই উকিল
ভাইর বাড়ী। মা কথাটা জানতে পারলে অমনি তাঁকে বলে দিবে।
কিন্তু ছাত্রদের গাঞ্জা যোগান না ধরলে আমাদের
অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে যে! এভাবে বলেই হাকিমুদ্দিন বললো- যাক, গাঞ্জা নিতে হবে না। আজকাল নেশা করার জন্য
অনেক জিনিস বের হয়েছে। এক রকমের আঠা আছে।(সতর্কতার জন্য নাম
বলা হল না) দেখতে ঠিক কলগেটের মতো। তবে, রংটা কলগেটের মতো না। ঈষৎ গোলাপী। সেই আঠা
কাগজে বা কাপড়ে নিয়ে পোড়ে ধুয়া টানলেই নেশা হয়ে যায়। তেমন
গন্ধও নেই। ছাত্রদের জন্য খুবই ভালো হবে। আঠা বাজারে
কিনতে পাওয়া যায়। সেই আঠা কিনে দিলে আমাদের গোমর ফাঁক
হয়ে যাবে। তখন ব্যবসার অনেক ক্ষতি
হবে। আমি বাজার থেকে আঠা কিনে এনে ছোট ছোট শিশিতে ভরে তোকে দিব।কাল থেকে তুই
সেগুলিই বিক্রী করবি। বিকেলে আসিস। আমি শিশি রেডি করে রাখব।
নজরুল বিকেলে গিয়ে হাকিমুদ্দিনের কাছ থেকে
আঠার শিশি নিয়ে এলো। বাড়ীতে এসে সে সেই আঠা আগুনে পুড়িয়ে তার ধুয়া নিতে
লাগলো। সে লক্ষ্য করলো, সেই আঠার
নেশা গাঞ্জার নেশার চেয়ে আমোদদায়ক। বেশি নেশা হয়।
শুঁকলে স্বর্গ সুখ অনুভব হয়। সেজন্য সে আদুরি নেসার
ভয়ে গাঞ্জার পরিবর্তে সেই আঠা ব্যবহার করতে লাগলো।
ইতিমধ্যে নজরুলদের স্কুলের অনেক ছাত্র গাঞ্জাসক্ত হয়ে পড়েছিলো। নজরুল স্কুলে গেলেই
সবাই তাঁকে ছেকে ধরে। নজরুল গাঞ্জার পরিবর্তে তাদের সেই আঠা যোগান ধরতে লাগলো। আঠার কোনো
গন্ধ নেই। পড়ার টেবিলে বসে কাগজে পুরিয়ে ধুয়া নিলেই নেশা হয়ে যায়। তাই
কিছুদিনের মধ্যে সেই আঠা ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো।
বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্রও ইতিমধ্যে ড্রাগস সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। ড্রাগস
সেবনের ফলে একদিন একজন মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু হলো। ফলে প্রশাসন
সক্রিয় হয়ে উঠলো। জায়গায় জায়গায় রেইড করে পুলিশ ড্রাগস
ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করতে লাগলো। তাদের কাছ থেকে জব্দকৃত অনেক
ড্রাগস পুড়িয়ে ফেলা হলো। হাকিমুদ্দিনসহ কয়েকজন ড্রাগস ব্যসায়ীকে আটকও হলো।
হাকিমুদ্দিনদের
স্বীকারোক্তি মতে একদিন নজরুলদের বাড়ীতেও পুলিশ
এলো।
নজরুলের কাছে অনেক আঠার শিশি পেলো। পুলিশ
তাকে রাত বারটার সময় গ্রেপ্তার করে নিয়ে
গেলো।
নজরুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে
পরের দিন সকালে ফৈজুদ্দিনসহ কয়েকজন আদুরি নেসার খোঁজ-খবর নিতে এলেন।
ফৈজুদ্দিন বললেন- আমরা জানতাম, ফজরুল একটু ডানপিটে স্বভাবের! কিন্তু নজরুল
যে তলে তলে এত সেয়ানা হয়ে উঠেছে, আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।
উকিল আব্দুর রহমান সাহেব বললেন- নজরুল ছিলো
অন্তঃসলিলা স্রোতের মতো। তাই কারও চোখে পড়েনি। ওর চালচলন সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিলো, তবে
এতদূর এগিয়েছে বলে কোনোদিন মনে সন্দেহ হযনি।
আমার মনে হয় ছলিমুদ্দিন ভাই বেঁচে থাকলে
এমনটা হত না। তিনি ঠিকই শাসন করতেন ছেলেদের।
ফৈজুদ্দিন বললেন- ছলিমুদ্দিন ভাই মরার পরে বেশি স্বাধীনতা পেয়ে ছেলে দু’টি এমন হয়েছে।
কথাটা আপনি সত্য বলেছেন। উকিল সাহেব বললেন- তিনি ছেলেদের কোন অন্যায় কাজ সমর্থন করতেন না। আমি নিজেই একদিন তার প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু খালা
তেমন শাসন করেন নি। সব সময় দোষ ডাকার চেষ্টা করেছে।খালা, মাত্রাধিক
আদর করেছে ছেলে দু’টিকে।
ফৈজুদদিন আদুরি নেসাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা রলেন- তলে তলে এত সেয়ানা হয়ে উঠেছে, তোমরা টের পাওনি নাকি?
টের পেয়েছিলাম। আদুরি নেসা বললো- ফজরুল
বলেছিলো। শাসনও করেছিলাম।
ওসমানও এসেছিলো খবর
নিতে। সে বললো-
তবে মনে হয়, কুকুর আন্দাজ মুগুর হয়নি। ঠিকমতো পিটুনির
দর্কার ছিলো।সম্ভবত পিটুনি ঠিকমতো হয়নি। এভাবে বলে ওসমান খোঁচা মেরে বললো- আমি
যেদিন রড চুরির নালিশ নিয়ে এসেছিলাম, সেদিন
একটা গল্প বলেছিলাম। শেষে দেখছি সেই কথাই ফললো ।
আদুরি নেসা নরম গলায় বললো- বুঝতে পারিনি
এমনটা হবে। না হলে কি শাসন না করে থাকি? এভাবে বলে উকিল সাহেবের হাতে ধরে বললো- জামাই
ব্যাটা, আপনাদের বাহিরে আমার আর
কে আছে? এখন যা করতে হয় আপনাকেই করতে হবে।
উকিল সাহেব বললেন- আমাদের সমাজে প্রবাদ
প্রচলিত আছে, নারী নষ্ট ঘাটে এবং পুরুষ নষ্ট
হাটে। কথাটা এভাবেও বলতে পারি, বউ নষ্ট
বাজারে, ছেলে নষ্ট আদরে। অতি আদরের জন্যই
আপনার ছেলে দু’টি
উছন্নে গেছে। ছেলেমেয়েদের আদর করতে হবে ঠিকই,
তবে
একমাত্র খাওয়ার
সময়। অন্য সময় শাসনে রাখতে হবে। প্রয়োজনে চোখও রাঙাতে হবে। খালা, আপনি যদি ছেলেদের আদর করে গেদা বলে না ডাকতেন, তাহলে মনে হয় আপনাকে এ রকম দিন দেখতে হত
না। মনে করবেন, একজন সৎ
সন্তান বাবা মায়ের গর্ব এবং একজন অসৎ সন্তান বাবা মায়ের জন্য আগুনের গোলার মতো। কখন বিস্ফোরণ হয়,
বলা যায়
না।
আদুরি
নেসা উকিল সাহেবের পায়ের কাছে বসে বললো- দেখেন জামাই ব্যাটা, যা ভুল হবার তা তো হয়েই গেছে। আর এ রকম ভুল করব না।
একবার জামিনে বের করতে পারলে ওদের আমি কড়া
শাসনে রাখব। আপনি দয়া করে নজরুলের জামিনের ব্যবস্থা করুন।
উকিল
সাহেব বললেন- এ আপনি কি করছেন খালা?
এভাবে
বলে আদুরি নেসাকে টেনে তুলে
চেয়ারে বসিয়ে বললেন- আপনি আমার গুরুজন। আপনি এভাবে আমার পায়ের কাছে বসলে আমার পাপ হবে। খালা, একটা কথা মনে রাখবেন, আগুন মানুষের জন্য উপকারী। আগুন ছাড়া মানুষ বাঁচা সম্ভব নয়। তবে সেই আগুন
আয়ত্বের বাইরে চলে গেলে, বাগে আনা
খুবই কঠিন হয়।
সন্তানের ক্ষেত্রেও ঠিক সে রকমই। সন্তান বাবা মা’র ভবিষ্যত। কিন্তু সেই সন্তান আয়ত্বের বাইরে চলে গেলে, তখন বাগে আনাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ছোট
থাকতেই শাসনে রেখে তাদের
বড় করতে হয়। এভাবে উপদেশ দিয়ে উকিল সাহেব সান্ত্বনার স্বরে বললেন- যা হোক, চিন্তা
করবেন না। আমি আজই কোর্টে গিয়ে জামিনের জন্য আর্জি জানাব। তবে ড্রাগ্সের কেস। খুবই কঠিন কেস! মালসহ ধরা পড়েছে। দেখি কি করতে পারি!
-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন