অকালে বসন্ত (উপন্যাস)
প্রারম্ভিকা
নারী-প্রকৃতি, নারী জননী। নারী নিজ গর্ভ থেকে পুরুষদের
জন্ম দিয়েছেন, নিজের রক্ত পান করিয়ে প্রতিপালন করেছেন।
নারীর শক্তি থেকেই পুরুষের শরীরে পৌরুষশক্তি সঞ্চার হয়েছে। নারী থেকে পৌরুষত্বের
অধিকারী হয়ে পুরুষ নারীকেই আবার বলাৎকার করতেছে। পুরুষ নারীকে কামিনী,রমণী, প্রমদা বলে অপবাদ দিতেও পিছপা হচ্ছেনা। নারীকে
নরকের দ্বার বলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না পুরুষ।
পুঁজিবাদী সমাজ ব্যৱস্থা থেকে উন্নত পশ্চিমীয়া অপসংস্কৃতি আমদানির ফলে নারী
নির্যাতনের ঘটনা অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন। কারণ বৈদিক যুগে আমাদের
দেশে নারীর স্থান যথেষ্ট উঁচুতে ছিলো। ‘যত্র
নায়াস্তু পূজ্জতে রমন্ত তত্র দেৱতা’। অর্থাৎ যেখানে নারীর পূজো করা হয়, সেখানে দেৱতা বাস করে। সেজন্য নারীকে দেবীরূপে পূজো করা হয়
এবং গৃহলক্ষ্মীর মর্যদা প্রদান করা হয়। কিন্তু পূঁজিবাদী সমাজ ব্যৱস্থার প্রতি
আকৃষ্ট হয়ে উন্নত দেশের ভোগবাদী সংস্কৃতি আমদানির ফলে মানুষের মধ্যে বর্তমান
সাত্ত্বিকতা লোপ পেয়েছে। যার জন্য নারী গৃহে, কার্যালয়ে,
এক কথায় বলতে গেলে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র
নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
নারী কয়েক রকমে নির্যাতিতা হয়। যৌতুকজনিত নির্যাতন এবং হত্যা, ধর্ষণ এবং হত্যা, শ্লীলতাহানি, ভ্রূণ হত্যা, অপহরণ, বিয়ের
প্রলোভন দিয়ে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে অনৈতিক কার্য তথা যৌন কার্যে লিপ্ত করা
প্রভৃতি-ই প্রধান। এর মধ্যে ধর্ষণই সব থেকে স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ ধর্ষণে নারীর চরিত্রে
চিরদিনের জন্য কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দেয়। ধর্ষিতা নারী সামাজিকভাবে অৱহেলিতা,
লাঞ্ছিতা এবং নিন্দিতা হয়। ফলে আত্মীয়-স্বজনের জন্য দুঃসহ
যন্ত্রণার নিমিত্ত হয়ে পড়ে। অবিবাহিতা মেয়েদের বিয়ে হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং
বিবাহিতা নারীরা নিজের স্বামী তথা শহুর বাড়ির প্রতিজন সদস্য-সদস্যার দ্বারা
তিরস্কৃত ও নিন্দিত হওয়ার সাথে সাথে সমাজ থেকেও উপেক্ষিতা হয়। কখনও আবার বিবাহ
বিচ্ছেদের মতো নিমিত্তরও কারণ হয়ে পড়ে। যারজন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের
ঘটনা লুকোনোর চেষ্টা করা হয়।
১৯৭১ সালের পর থেকে ৮৭৩.৩ হারে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অপরাধ
অনুসন্ধান ব্যুর'র একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছিলো। ১৯৭১ সালে
২৪৮৭ টি ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বিপরীতে ২০১১ সালে ভারতে নারীর বিরুদ্ধে ২,১৯,০৬২ টা নারীজনিত অপরাধ সংঘটিত হয় বলে এক তথ্যে
প্রকাশ পেয়েছিলো। এই অপরাধের ভেতরে সর্বাধিক ২৪,২০৬ টি-ই
ছিলো ধর্ষণের ঘটনা। ২০১০ সালে এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ২১,৮৮৪
টা। যৌতুকের জন্য নারী হত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ৮,৯৬৮ টি।
মহিলা অপহরণের ঘটনা ৩৫,৫৬৫ টি, অশ্লীল
উৎপীড়নের ঘটনা ৪২,৯৬৮ টি, যৌন
নির্যাতনের ঘটনা ৮৫৭০ টি। সারা বিশ্বে প্রতি মিনিটে এবং ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে
একটি করে ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাৰ এক প্রতিবেদন থেকে
জানা যায়। আসামের ক্ষেত্রেও ধর্ষণের ঘটনা কম উদ্বেগজনক নয়। ২০০৬ সালে ৭,১৬৪ টিধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বিপরীতে ২০১০ সালে ১১,৫৬৩ টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে ২০১১ সালে আসাম বিধানসভার শীতকালীন
অধিবেশনে বনমন্ত্রী রকিবুল হুছেইন প্রকাশ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় অপরাধ অনুন্ধান
ব্যুর'র তথ্য অনুসারে ধর্ষণের ক্ষেত্রে দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিম বংগ, বিহারের
পরেই আসাম পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থকা অন্যায়-অত্যাচার থেকে মহিলাদের মুক্ত করার জন্য
নানা রকম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে
নারীদের পুরুষের সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২৩ এবং ২৪ অনুচ্ছেদ
দ্বারা নারীর বিরুদ্ধে করা শোষণ বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।। সংবিধানের
৩৯ (ক) অনুচ্ছেদে মহিলাদের বিনামূল্যে আইনগত পরামর্শ প্রদানের সুবিধা দেওয়া
হয়েছে। নারীদের রাজনৈতিকভাবে সবল করার জন্য ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৩ এবং ৭৪ তম
সংশোধনী মর্মে পঞ্চায়ত এবং নগর পালিকাসমূহে ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়েছিলো।
বর্তমান এই সংরক্ষণ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সংবিধান প্রদত্ত সুবিধার উপরেও নারীরা যাতে শিক্ষা-দীক্ষার সুবিধা, রাজনৈতিক সুবিধা, কর্মসংস্থানের সুবিধা,
সুরক্ষাকে আদি করে বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারে তারজন্য ১৯৯০ সালে
রাষ্ট্রীয় মহিলা আয়োগ গঠন করা হয়েছে। উক্ত আয়োগের অধীনে প্রতিটি রাজ্যে আবার
রাজ্যিক মহিলা আয়োগ গঠন করা হয়েছে। নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্যাতন রোধের জন্য
ভারতীয় দণ্ডবিধিতেও অনেক কয়েকটা ধারা সন্নিবিষ্ট করে দোষীদের শাস্তি বিধানের
ব্যৱস্থা করা হয়েছে। যেমন- (১) নারীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন রোধের জন্য ভারতীয়
দণ্ডবিধির ৩৭৫ এবং ৩৭৬ ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে।(৩) মহিলাদের বিরক্ত করার অপরাধে
শাস্তি প্রদানের জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে। (৪) ১৮
বছরের তলের মহিলাদের অপহরণের অপরাধে শাস্তি প্রদানের জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৬৩
ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে। (৫) ১৮ বছরের উপরের মহিলাদের অপহরণ করলে শাস্তি প্রদানের
জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৬৬ ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে। (৬) মহিলাদের অনৈতিক কার্যে
নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে বিক্রী অথবা ক্রয় করলে শাস্তি প্রদানের জন্য ভারতীয়
দণ্ডবিধির ৩৭২ এবং ৩৭৩ ধারা প্রণয়ন করা হয়েছে। (৭) মহিলাদের শারীরিক অথবা
মানসিকভাবে নির্যাতন করলে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮ ধারায় শাস্তি প্রদানের ব্যৱস্থা
রয়েছে। (৮) কোনো ব্যক্তি অথবা প্রচার মাধ্যম মহিলাদের অশ্লীল ফটো বা অশ্লীল
মন্তব্য প্রচার করলে, সেরকম অপরাধীদের ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২,
২৯৩, ২৯৪ ধারার অধীনে দুই বছরের কারাদণ্ডের
সমান্তরালভাবে জরিমনা আদায়ের ব্যৱস্থা রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের কথা যে, মহিলাদের সুরক্ষা এবং অধিকার সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আইন এবং সংগঠন থাকা
সত্ত্বেও কোনো আইন বা সংগঠনেই মহিলাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ রোধ করতে সক্ষম
হয়নি; বরং বানের জলের মতো দিনে দিনে অপরাধের মাত্রা বেড়েই
চলছে।
নারীরা দিনের প্রায় বার থেকে চৌদ্দ ঘন্টা গৃহকাজে নিয়োজিত থাকে। তবে তাঁদের অর্থনৈতিক
কাজে অংশগ্রহণ খুবই কম। নারীদের যদি অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত করা যায়, তাহলে এই অপরাধের মাত্রা অনেকটা হ্রাস পাবে বলে আশা করতে
পারি। তাই এই উদ্দেশ্য নিয়েই ‘অকালে বসন্ত’ উপন্যাসটি রচনা হয়েছে। উপন্যাসটিতে হয়তো অনেক ভুল-ত্রুটি রয়ে গেছে।
সদাশয় পাঠক সেই ভুল-ত্রুটিগুলো শোধরে উপন্যাসটি গ্রহণ করলে, আমার পরিশ্ৰম সাৰ্থক হবে এবং আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।
বিনত
-লেখক
এক
কয়েকদিন ধরে আমিনা সেলিম দর্জির দোকানে কাজ শিখতে যাচ্ছে। সেলিম দর্জির দোকান
সহরের একটি মার্কেট-এ। বাবা মা অল্প বয়েসে আমিনাকে বিয়ে দিয়েছিল তাদের বাড়ির
পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে। তখন তার বয়েস বড়জোর চৌদ্দ হবে আর কি! তার অৱশ্যে বিয়ের
পীড়িতে বসবার মোটেই ইচ্ছা ছিল না। ক্লাস এইট থেকে প্রমোশন পেয়ে ক্লাস নাইনে
উঠেছিল মাত্র। কিন্তু বাবার মতের বিরুদ্ধে যাবার সাহস ছিল না তার। তাই সে বাবার
ইচ্ছায় বিয়ের পীড়িতে বসেছিল তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। বাবর ইচ্ছায় বিয়েটা দিলেও সে
বিয়েটা সর্বান্তকরণেই মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু তার স্বামীর স্বভাবের জন্য সে
স্বামীর সংসার ত্যাগ করে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখন থাক সেসব কথা। কীজন্য সে স্বামীর
সংসার ত্যাগ এসেছে সে কথা পরে বলব। সে মাত্র চার বৎসর ছিলো স্বামীর সংসারে। দুটি
সন্তান হওয়ার পরে সে স্বামীর সংসার ত্যাগ করে বাপের সংসারে উঠেছে।
প্রায় চার বৎসর যাবত আমিনা বাপের সংসারে আছে। এমনি শুয়ে-বইয়ে কাটছে। তাই সে
দর্জি কাজ শেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েকদিন ধরে সেলিম দর্জির কাছে কাজ শিখতে
যাচ্ছে। সে মাকে অৱশ্যে কথাটা বলেছে, তবে,
বাবাকে বলেনি। কারণ তার বাবা তারেক মৃদা একটু বদমেজাজি মানুষ।
সাধারণ কথাতে গালাগাল দিতে অভ্যস্ত। একটু পাণ থেকে চুন খসলেই তার মাকে গালগাল তারেক
মৃদা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। দেয়, মারধোর করে।
তারেক মৃদা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।তাই সে শরিয়তের গর-খেলাপ মোটেই পসন্দ করে
না। নামাজ পড়া নিয়ে ছেলে, ছেলের বউদের সাথে সকাল বিকেল চেঁচা-মেচি করে।
পর্দা-পুশিদা নিয়ে ছেলের বউদের সাথে হম্বি-তম্বি করে । সহরে কাজ শিখতে যাওয়ার
কথা শুনলে তো তাকে মেরেই ফেলবে। এই ভয়েই আমিনা ছেলে দু'টির
ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপে-চাপে কাজ শিখতে যাচ্ছে। কাজ শেখা হলে মেসিন কিনে বাড়িতেই
কাজ করবে এ-রকমই মনোভাব তার। সে সকাল নটায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায় এবং চারটের
আগেই বাড়ি ফিরে আসে। এই সময়টুকু তারেক মৃদা মসজিদেই কাটায়।
তারেক মৃদা এমনিতে অশিক্ষিত। ‘ব’র পেটে ‘ক’ লাগাতে জানে না।
তবে, লোকের মুখে শুনে শুনে হাদিশ কোরআনের অনেক কথা সে
শিখেছে। প্রতিটা বিষয়ে হাদিশ কোরআন মাফিক চলার চেষ্টা করে। না-না, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত নামাজ পড়া, হাদিশ কোরআন
নিয়ে মাথা ঘামাত না। এখন বয়েস হয়েছে- মাথায় পরকালের চিন্তা ঢুকেছে। তাই টুপী
পাঞ্জাবী পরে নামাজী হয়েছে। বলতে গেলে তবলীগ আসার পর থেকে। চল্লিশ দিনের ‘চিল্লা’য়ো গিয়াছে কয়েকবার। চিল্লায় গেলে পরের
টাকায় খাওয়া-দাওয়াটা ভালো হয়, নতুন নতুন জায়গা দেখতে
পারে, এ জন্যই বারে বারে যাওয়া আর কি!
নামজী হওয়ার আগে পর্যন্ত গান বাজনা করত। ছুকরী নাচাত। যাত্রাপালার কথা শুনলে
নদী সাঁতরে যাত্রাপালা শুনতে যেত। সহরের কাছেই বাড়ি। সহরে সিনেমা হল আছে। আগে
সপ্তাহই সপ্তাহই সিনেমা বদলাত। তারেক মৃদা একটা সিনেমাও মিস্ করত না। এমন কি একটা
সিনেমা তিন চার বার করেও দেখতো।
নিজে নামাজী হওয়ার পর থেকে ছেলে-মেয়ে-ছেলের বউ সবাইকে নামাজ পড়তে বলে।
সকালে কাঁচা ঘুমের সময় ছেলে-মেয়ে- বৌদের ঘুম থেকে ডেকে উঠায়। এ নিয়ে বাড়ীতে
সর্বদা হৈ-হট্টগোল লেগেই থাকে।
নামাজী হওয়ার আগে জমির সীমা নিয়ে প্রতিবেশির সাথে নিত্য ঝগড়া লেগেই থাকত।
নিজের ভায়ের সাথেও জমির আল নিয়ে বনি-বনা ছিল না। এসব ছোট-খাঁট বিষয় নিয়ে
হৈ-হট্টগোল, ঝগড়া-ঝাঁটি লেগেই থাকতো সর্বদা। সালিশও
বসত মাঝে-মধ্যে। রাস্তার লোকেরাও মৃদা বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঝগড়া ঝাটি,
গালা-গাল প্রায়ই শুনতে পেত। কেউ কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া- ঝাঁটির
কারণ অনুমান করারও চেষ্টা করত। নামাজী হওয়ার পর থেকে, যে
কোনো কারণেই হোক সালিশ কম বসে। জমির আল-টাল নিয়ে তেমন ঝগড়া-ঝাঁটি হয় না। এখন
শুধু নামাজ পড়া নিয়েই ছেলে এবং বউদের সাথে চোট-পাট করে।
সেদিন তারেক মৃদা ভোর বেলা মসজিদে গিয়েছিল ফজরের নামাজ পড়তে। সেখান থেকে
কলেমার দাওয়াত দেওয়ার জন্য কোথাও গিয়েছিল। তাই বিকেল বেলা অন্যান্য দিনের থেকে
একটু আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিলো।
সেদিন সস্তায় পেয়ে আমিনার জন্য একটা বোর্খা কিনে এনেছিলো। রেশমের বোর্খা।
সুন্দর হাতের কাজ আছে বোর্খায়। দেখতে খুবই সুন্দর। পড়তে খুবই আরামদায়ক হবে।
আজমীরের ফেরিয়ালা। তাই সস্তায় পেয়েছে। দোকান থেকে কিনতে হলে অনেক টাকা লাগতো।
বাইরে গেলে পড়ে বেরোতে পারবে এই ভেবে কিনে এনেছে বোর্খাটা। নানা রঙের ছিলো।
আমিনার শরীরের রং ফর্সা। তাই কালো রঙে ভালো মানাবে বলে তার জন্য কালো রঙের টা
এনেছে।
আমিনাকে বোখাটা দিবে বলে তারেক মৃদা ডাকল- মা আমিনা, এদিকে আয় তো, মা। দেখ, তোর জন্য কী এনেছি।
আমিনার সাড়া-শব্দ না পেয়ে স্ত্রী ফুল খাতুনকে ডেকে জিজ্ঞেস করল- গিন্নী, আমিনাকে দেখছি না? কোথায় গেছে? ডাক তাকে।
ফুল খাতুন একটু হেলা-ভোলা টাইপের। বিদ্যা-বুদ্ধি নাই। তাই বড্ড ভয় পায়
স্বামীকে। ভয় পাওয়ার কারণো আছে। একটু এদিক-সেদিক হোলেই তারেক মৃদা গালা-গাল
দেয়- মারধোর করে। তাই সে জড়ো-সঁড়ো হয়ে বলল- আমিনা বাড়ীতে নেই।
কোথায় গেছে?
কাজ শিখতে গেছে।
কি কাজ?
দর্জি কাজ।
দর্জি কাজ! কোথায়?
সহরে। সেলিম দর্জির দোকানে।
তারেক মৃদা বিস্মিত কণ্ঠে বলল- সহরে কাজ শিখতে গেছে, আমায় না জানিয়ে? কত দিন ধরে যাচ্ছে?
হলো কয়েকদিন।
আমাকে এ কথা বলনি কেন?
আমিনা বলতে বারণ করেছে, তাই বলিনি।
জান না স্বামীর পায়ের তলে স্ত্রীর বেহেস্ত। স্বামীর কাছে কথা লুকালে পাপ হয়, জান না?
ফুল খাতুন কিছু বলল না। মাটির দিকে চেয়ে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল।
এইবার তারেক মৃদা রেগে গিয়ে বলল- কথা বলছ না কেন? আমি কী বলছি কানে যাচ্ছে না?
ফুল খাতুন বিরক্ত গলায় বলল- শুনছি। শুনব না কেন?
তবে কথা বলছ না কেন?
কী বলব? আমার বারণ শুনলে তো বলব।
তারেক মৃদা জানে আমিনা একটু জেদি। যা ভাবে, তা করেই
ছাড়ে। তাই গিন্নীর সাথে হম্বি-তম্বি করে লাভ নেই। এইবার তারেক মৃদা একটু নরমস্বরে
বলল-তার দর্জি কাজ শেখার কারণ? কিসের অভাব তার! আমিনা আমার
বাড়ির মেয়ে। তার দর্জি কাজ শেখার কী প্রয়োজন হল? আমি কী
ভাত কাপড় দিই না!
ফুল খাতুন বলল- আমিও নিষেধ করেছিলাম। আমার নিষেধ মানে নাই। বলল, এমনিতে বসে থেকে কি করব। যদি দুই পয়সা আয় করতে পারি আব্বার
সহায় হবে।
আমার সহায়ের জন্যে মেয়ে দর্জি কাজ শিখবে! তাও সহরে গিয়ে! এটা হতে পারেনা।
আমার বাড়ির মেয়ে বেহায়ার মতন সহরে
গিয়ে কাজ শিখবে, এটা মেনে নেওয়া যায়না। আমি নামাজী মানুষ।
সবাই আমায় ‘মুসুল্লি’(নামাজী হওয়ার
পর থেকে পাড়ার সবাই তারেক মৃদাকে ‘মুসুল্লি’ বলে ডাকে) বলে ডাকে। আমার মেয়ে সহরে গিয়ে ভিন পুরুষের কাছে কাজ শিখবে,
আমার সহায়ের জন্যে! লোকে শুনলে কি বলবে?
ফুল খাতুন বলল- আমি কি করব, মেয়ে যদি কথা না
শুনে! আমিত বারণই করেছিলাম।
আসুক বাড়ি। তার দর্জি কাজ শেখার মজা বের করব আজ। লজ্জায় মরে যাচ্ছি। আমার বাড়ির
মেয়ে হয়ে বাইরে কাজ করবে! পর পুরুষের গায় হাত দিয়ে মাফ-জোখ নিবে। পর পরুষের
সাথে ফষ্টি-নষ্টি করবে! ইজ্জত থাকবে কোথায় আমার ! ছিঃ ছিঃ.. তৌবা তৌবা.....
ফুল খাতুন এইবার সাহস করে বলল- বাইরে কাজ করবে কেন? কাজ শেখা হলে ‘মিসিন’ কিনে বাড়িতেই কাজ করব। এ রকমই বলেছে আমিনা।
তারেক মৃদা ভেংচি কেটে বলল- বাড়িতেই কাজ করবে! বাড়ি এলে বলে দিও, কাজ শেখার দর্কার নাই। তার ভাত-কাপড় আমিই দিতে পারব।
ফুল খাতুন কিছু বলার আগেই আমিনা এসে গেল। তাকে দেখে তারেক মৃদা একটু উষ্মস্বরে
জিজ্ঞেস করল- কোথায় গিয়েছিলে?
আমিনা বাপের স্বভাবের কথা জানে। তাই সে কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চুপ করে
রইল।
তাকে চুপ দেখে তারেক মৃদা ফোঁস করে গর্জে উঠল- কি, কথা বলছিস না যে! মুখে কুলুপ আঁটলি না-কি?
কি বলব ! আমিনা এইবার সাহস করে বলল- আম্মার কাছেতো বলেই গেছি। আম্মা বলে নাই?
বলেছে, বলেই তো বলছি। তারেক মৃদা বলল- কথা বাড়াতে
চাই না। তুই কাজ শিখতে গিয়েছিস, আর যেন এই কথা আমি না শুনি।
বাড়িতে বসে থেকে কি করব? আমিনা ভবিষ্যতের কথা
জানাল- তুমি তো আর চিরদিন বেচে থাকবে না। তুমি মরে গেলে ছেলে দুটি নিয়ে আমি কেমনে
বাঁচব!
কেমনে বাঁচবি সে চিন্তা তোর করতে হবে না। সে চিন্তা আমার। তোর নামে জমি লিখে
দিয়ে যাব।
জমি তো মোটে আঠ বিঘা। চার ভাই। ভাগ করলে, ভাগে
পড়বে মাত্র দু’বিঘা করে ! কয় বিঘা জমি দিবা আমাকে?
আরে এক বিঘা জমি হলেই তোর চলে যাবে। ইড়ি ধানের চাষ করলে ভাল ভাবেই চলতে
পারবি। একটা কথা আছেনা, মুখ আল্লাহই দিছে, আহারও
আল্লাহই দিব।
কাজ না করলে আল্লাহই বসাইয়া খাওয়ায় না।
কি বললি? তারেক মৃদা রেগে বলল- আল্লাহই বসাইয়া
খাওয়ায় না! আল্লাহর মহিমার কথা তুই কি জানিস! আল্লাহর হুকুমের বাইরে গাছের
পাতাটিও ঝরেনা। নামাজ-রোজা করবি না, এসব কথা তুই কেমনে
বুঝবি!
শুধু নামাজ-রোজা নিয়ে থাকলেই কি পেটে ভাত যাবে! কাজ না করলে আল্লাহই মুখে ভাত
তুলে দেয় না।
মুখে মুখে তর্ক করা শুরু করলি। তোর এত সাহস?
কোথায় তর্ক করলাম? যা সত্যি তাই তো বলছি।
আর যাবে কোথায়। আরম্ভ হয়ে গেল কুরুক্ষেত্র। মেয়েকে মারার জন্য দাও খুজতে
লাগল তারেক মৃদা- কোথায় দাও, মেয়েকে এবার টুকরো
টুকরো করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিব। সে ফুল খাতুনকে উদ্দেশ্য করে বলল- যাও, দাও নিয়ে এস?
পাশেই আওয়াল মাস্টার সাহেবের বাড়ি। ফুল খাতুন বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার
জন্য আওয়াল মাস্টারের শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবল। কারণ অনেক সময় আওয়াল মাস্টার সাহেবের কাছে যেতে হয় তারেক মৃদাকে। বাড়িতে
কোনো সমস্যা হলে অথবা নিজে লিখা-পড়া না জানার জন্য কোনো দলিল পত্র দেখানোর প্রয়োজন হলেই তারেক
মৃদা মাস্টারের কাছে যায়। তাই তারেক মৃদা আওয়াল মাস্টারকে শ্রদ্ধার সাথে খানিকটা
হলেও ভয় করে। এ কথা ফুল খাতুন জানে।
তাই ফুল খাতুন দাও আনার ছলে সোজা মাস্টার সাহেবের বাড়ি এসে বলল- তারাতারি
আমাদের বাড়ি চলেন। আমাদের ‘মুসুল্লি আজ একেবারে
ক্ষেপে গেছে।
আওয়াল সাহেব বললেন- কেন? কি হয়েছে?
ফুল খাতুন আনুপূর্বিক ঘটনাটা খুলে বলে বলল- তারাতারি চলেন। নইলে সত্যিই কেটে
ফেলবে। জানেন তো তার স্বভাবের কথা!
আওয়াল সাহেব কালবিলম্ব না করে তারেক মৃদার বাড়ি এলেন। তখন তারেক মৃদা দাও
হাতে নিয়ে মেয়েকে খুঁজতেছে। ফুল খাতুনের দাও আনাতে দেরি দেখে তারেক মৃদা নিজেই
দাও আনতে গিয়েছিলো। সেই ফাঁকে আমিনা সেখান থেকে কেটে পড়েছে।
আওয়াল মাস্টারকে দেখে তারেক মৃদা নরমস্বরে বলল- মাস্টার সাহেব, আপনি?
এলাম, তোমার গলার আওয়াজ শুনে। আওয়াল মাস্টার
বললেন-কি হয়েছে, বলতো? এই সন্ধ্যে
বেলা এরকম চেঁচামেচি করছো কেন?
তারেক মৃদা বলল- আর বলবেন না। মেয়ে আমার সন্মান রসাতলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। বিয়ে দিলাম। স্বামীর ঘর করল না। স্বামীর সংসার ত্যাগ করে আমার বাড়িতে উঠেছে। এ নিয়ে আমি কোনোদিন কিছু বলিনি।
এখন সে নাকি সহরে দর্জি কাজ শিখতে যাচ্ছে আমাকে না জানিয়ে।
তারেক মৃদা ঘটনাটা খোলে বলল।
ঘটনা শুনে আওয়াল মাস্টার বলল- কেন? মেয়ে
কি খারাব কাজটা করছে? হাতের কাজ শিখবে, সে তো ভাল কথা। এমনি এমনি বাড়িতে বসে থাকে, দুই
পয়সা উপায় করতে পারলে, মন্দ কি?
মেয়ে হয়ে কাজ করবে, আয় করবে, আমরা কি
মরে গেছি না-কি?
আরে, এখানে আবার বাচা-মরার কথা এলো কোথা থেকে!
আওয়াল মাস্টার বলল- এখন আর সেই যুগ নেই যে মেয়েরা গৃহবন্দি হয়ে থাকবে। এখন
মেযেরা উড়োজাহাজ চালায়। মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছে। কল্পনা চাওলার নাম শুনেছ?
সে আমাদের ভারতীয় বংশোদ্ভব।
কয় বৎসর আগে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশতঃ মহাকাশ থেকে ফিরে আসার
পথে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনা না, বলেন, আল্লাহর গজব
পড়েছে। তারেক মৃদা সাহস করে বলে উঠল- সে সীমা লংঘন করেছে, তাই
আল্লাহ তাকে মৃত্যু দিয়েছে। আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
তোমাদের মতন মূর্খেরা এই কথাই বলবে। আওয়াল মাস্টার বলল- কিছু কিছু হাদীস এখন
বাদ দিতে হবে। যুগ পরিবর্তন হয়েছে। যুগের সাথে চলতে শেখো। কাজ শেখাটা অপরাধ না। আর কাজ শিখলে
জাতও যায় না। কাজের ছোটবড়ও নেই। আজ-কাল দু’- একটি
পরিয়াল বাদ দিলে প্রায় সবাই দেখি মেয়েছেলে নিয়ে ইড়ি খেতে কাজ করে। ইড়ি
ক্ষেতে কাজ করলে যদি জাত না যায়, দর্জি কাজ শিখলে জাত যাবে
কেন! আমিনাকে কাজ শিখতে যেতে নিষেধ কর না। সে হাতের কাজ শিখতে চাইছে, ভবিষ্যত্যের কথা চিন্তা করছে, এটা নিয়ে তুমি তো
গৌরব করা উচিত।
তারেক মৃদা কিছুটা নরম হলো। সে আমতা আমতা করে বলল- তাহলে আপনিও আমিনাকে সমর্থন
করেন?
হ্যাঁ, করি। আওয়াল মাস্টার বলল- কাজ শিখুক,
এটা নিয়ে আপত্তি কর না। কাজই তো শিখবে, অন্য
কিছু তো না! কর্মই মানুষের ধর্ম। কর্ম না করলে মানুষের মূল্য থাকেনা। নজরুলের গান
শুন নি! আমায় নহে গো ভালবাসো মোর গান। মানুষ কর্মকে ভালবাসে, মানুষকে না। কর্মই মানুষকে মূল্যবান করে তোলে- মানুষের গুরুত্ব বাড়ায়।
তোমার ছেলেদের কথাই ধর, ওরা কাজ না করলে তুমি ওদের বসাইয়া
বসাইয়া খাওয়াবে?
ঠিক আছে, আপনার কথাই মানলাম। কিন্তু আমার একটা শর্ত
মানতে হবে।
কি শর্ত?
সন্ধ্যের আগেই কিন্তু বাড়ি ফিরতে হবে।
আওয়াল মাস্টার আমিনাকে ডেকে এনে বাপের শর্তের কথা বুজিয়ে বলল- তুমি নিশ্চয়
শুনলে, তোমার বাপের শর্তের কথা! সন্ধ্যার আগেই কিন্তু বাড়ি ফিরে আসবে। আর এমন
কাজ করো না, যাতে তোমার বাপের মাথা নিচু হয়।
আমি তো বেলা থাকতেই বাড়ি আসি। আমিনা বলল- হঠাৎ কোনো কারণে একটু দেরি হলেও একা
আসি না। আমার সাথে পশ্চিম পাড়ার কাদের চাচার মেয়ে জমিলাও যায়। তার সাথেই আসি।
ওই জন্যেই তো আমার চিন্তা বেশি। তারেক মৃদা বলল- জমিলা মেয়েটা মোটেই ভাল নয়
শুনেছি। শুনেছি, সে সহরে গিয়ে সে গ্রাহকদের সাথে
ফষ্টি-নষ্টি করে।
তুমি কী নিজে দেখেছ তাকে ফষ্টিনষ্টি করতে?
না, লোক মুখে শুনেছি।
লোক মুখে শুনে কাউকে মূল্যায়ন করো না। সে তো ভালো কাজ করছে। স্বামী মরে
যাওয়ার পরে বিয়ে না বসে বাপের সংসারে থেকে বৃদ্ধ বাপ মার দেখাশুনা করছে। তাকে তো
প্রশংসা করা উচিত। আর তুমি কিনা নিন্দা করছ?
আমিনা মাঝখানে বলল- আমি কয়দিন ধরে তার সাথে কাজ শিখতে যাচ্ছি, তার কোনো খারাপ রেকর্ড আমি দেখিনি।
তারেক মৃদা এবার জমিলাকে ছেড়ে তার বাপ-মাকে ধরল- ওর বাপও তো ভাল না। নামাজ
পড়ে না, রোজা রাখে না।
আওয়াল মাস্টার বলল- নামাজ না পড়লে আর রোজা না থাকলেই সে ভাল লোক না এ কথা
তোমাকে কে বলেছে? নামাজ পড়লেই ভাল লোক, আর নামাজ না পড়লেই খারাব লোক এটা বলা ঠিক না। আজ নামাজ পড়ে না, কাল পড়বে। ধর্ম কার নেই। শুধুমাত্র মানুষেরই না, সবারই
ধর্ম আছে। আলো দেওয়াটা সূর্যের ধর্ম, ফল, ছায়া দেওয়াটা গাছের ধর্ম। কৃষক পাথারে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়,
এটা কের ধর্ম। থাক এসব কথা। তুমি এ সব বুঝবে না। এরপর আমিনাকে
উদ্দেশ্য করে বলল- ঠিক আছে, শুনলেই তো তোমার আব্বার কথা!
কাজে যাবে, কিন্তু যতদূর সম্ভব তারাতারি বাড়ি চলে আসবে। যদি
কোনো সমস্যা হয়, আমাকে বলো। যা বলার আমিই বলব। তুমি নিজে
বাপের সাথে তর্ক করো না। বাবা মাকে সন্মান করাটা সন্তানদের অবশ্য কর্তব্যের মাঝে
পড়ে। সে ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক।
দুই
কয়েকদিন পরের কথা।
এখন মাঝে-মধ্যেই তারেক মৃদা আমিনার খোঁজখবর নেয়। সময় মতো বাড়ি ফিরল কিনা
তার খবরদারি করে।
সেদিন তারেক মৃদা মসজিদ থেকে এসে আমিনার খবর নিলো। আমিনার কোনো সাড়াশব্দ না
পেয়ে ফুলখাতুনকে ডেকে বলল- কইগো, আমিনাকে দেখছি না
যে! বাড়ি আসেনি?
ফুল খাতুন ভয়ে ভয়ে বলল- বোধহয় আসেনি।
বোধহয় বলছ কেন? তুমি বাড়ির খবর রাখ না?
রাখি তো। এখন পর্যন্ত মনে হয় আসেনি।
তারেক মৃদা ক্ষেপে গেলো। বলল- এখন পর্যন্ত বাড়ি আসেনি। মানে? শর্তের
কথা মনে নেই তার? আমি বলছিলাম না, কাজ শিখলেও
সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। তোমাকে কিছু বলে গেছে নাকি?
না, কিছু তো বলে যায়নি। ফুল খাতুন বলল- আমি তো
তাকে পইপই করে বলে দিয়েছি সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফিরতে।
আজমত বাড়ি এসেছে নাকি?
হ্যাঁ, এসেছে।
কতক্ষণ আগে এসেছে? তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে নাকি কথাটা?
করেছিলাম। ওর সাথে দেখা হয়নি।
কাল থেকে আমিনার কাজ শেখা বন্ধ। তারেক মৃদা বলল- আমি বলেছি, বলে দিও।
কাজের চাপও তো থাকতে পারে। ফুল খাতুন বলল- সামনেই পূজো। হয়তো কাজের চাপ
বেড়েছে!
কজের চাপ বাড়লেই তার কি! তারেক মৃদা ক্ষেপে উঠল। তারেক মৃদার গলাটা একটু
চড়া। তাই কথা বললে জোরে জোরেই বলে। কোনো লুক-ঢাক নেই। সে চেঁচিয়ে বলে উঠল- তার
কাজ বড়, না আমার মান-ইজ্জত বড়! আমি তো বারণই
করেছিলাম। মাস্টার সাহেবের কথায় কাজ শিখতে অনুমতি দিয়েছি। এখন আর কারও কথা শুনব
না। সে যেন আর কাজে না যায়।
ফুল খাতুন কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখনই আমিনাকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে বলল-ওই যে
আমিনা এসেছে। যা বলার তাকেই বলেন।
আমিনা জড়-সড় হয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। সন্ধ্যের অন্ধকার ঘণীভূত
হয়েছিলো। তাই প্রথমাবস্থায় সে বাবাকে দেখতে পারেনি। বাড়িতে ঢোকার মুখে সে
বাবাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তারেক মৃদা বললো- এত রাত হল কেন? আমি কি
বলেছিলাম মনে নেই?
আমিনা বলল- মনে থাকবে কেন! কোথায় রাত হয়েছে! সবে তো সন্ধ্যে হলো।
এখনও সন্ধ্যে আছে না-কি? তারেক মৃদা বলল-
মগরিবের নামাজ পড়ে কখন বাড়ি ফিরেছি। আর বলছে কিনা, সবে তো
সন্ধ্যে হল! বল, দেরি হল কেন?
আসলে আমিনা আজ সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। তার অবশ্যে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তার সাথেই
দুটি মেয়ে কাজ করে। ফরিদা এবং নবিরন। তাদের আবদার এড়াতে না পেড়েই সে গিয়েছিল
তাদের সাথে।
বিকেল নাগাদ ফরিদা বলেছিলো- চল আমিনা, আজ আমরা
সিনেমা দেখতে যাব। খুবই ভাল বই লাগিয়েছে। শ্বোলে। পুরানো বই। আমরা দেখতে যাব।
তুইও চল আমাদের সাথে।
আমিনা বলেছিল- না, তোমরা যাও। আমার যাওয়া হবে না। সন্ধ্যের
আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। নইলে আব্বা রাগ করবে।
কিছু হবে না। এইবার জমিলা বলল- কাজের চাপ আছে, বলে
দিলেই হলো। বিকেলের শ্বো। বেলা ডুবার আগেই শেষ হবে। তুই না দেখলে আমিও দেখতে পারবো
না। একা একা বাড়ি যেতে অসুবিধা হবে। সিনেমাটা আমার দেখার খুব ইচ্ছে। দুই বছর আগেও
একবার বইটা লাগিয়েছিলো। তখন অসুবিধার জন্য দেখতে পারিনি।
বন্ধুদের আবদার এড়াতে না পেরেই সে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো। তবে, এ কথা বাবাকে বলা যাবে না। বললে, তেলে
বেগুনে জ্বলে উঠবে। তাই সে জমিলার শেখানো মতেই বলল- কাজের চাপ ছিলো। সামনেই পূজো।
তাই কাজের চাপ বেড়েছে। আমি সময় মতোই আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু
সেলিম ভাই আসতে দিল না।
তুই আমার কথা মতো চলবি, না সেলিমের কথা মতো চলবি। তারেক মৃদা
অভিযোগের সুরে বলল।
আমি সেলিম ভাইর কথা মতো চলতে যাব কেন? আমিনা
কৈফিয়তের সুরে বলল- তার সেখানে কাজ করি, তার ভালো-মন্দ তো দেখতেই
হবে। নইলে কাজ শিখব কি করে?
এমন সময় আমিনার ছোট ছেলে ফিরদুস দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল- আম্মা, চকলেট দাও। আমিনা ভেনিটি ব্যাগ থেকে দু’টো
চকলেট বের করে ছেলের হাতে দিয়ে বলল- যা, একটা ভাইকে দিবি,
আর একটা তুই খাবি।
চকলেট পেয়ে ফিরদুস দৌড়ে চলে গেল।
এমন সময় এশ্বার আজান শুনা গেল।
আজানের শব্দ শুনে তারেক মৃদা তড়িগড়ি বলল- আজান দিয়েছে। যা, এখন ভেতরে যা। আজ থেকে আর সেলিমের ভালো-মন্দ দেখতে হবে না।
কাল থেকে তোর কাজ শেখা বন্ধ। নামাজটা পড়ে আসি। পরে কথা হবে।
তারেক মৃদা মসজিদের দিকে রাওণা হয়ে গেল।
আমিনা চুপচাপ বাড়ির ভেতর চলে গেল।
তিন
পরের দিন সকাল বেলা তারেক মৃদা মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার আগেই আমিনা সহরে
যাওয়ার জন্য বেরিয়ে এলো।
ফুল খাতুন বলল- এতো সকালে কোথায় যাবি?
আমিনা বলল- কাজে যাব। অনেক কাজ পড়েছে। পূজোর আগেই ডেলিভারি দিতে হবে। তাই
সেলিম ভাই সকাল সকাল যেতে বলেছে। খাওয়া-দাওয়া হোটেলেই করাবে। কাল বলে দিয়েছে।
ফুল খাতুন বলল-তোর বাপ তোকে কাজ শিখতে যেতে বারণ করেছে। কাল রাতে তুই দেরি করে
আসার জন্য তোর বাবা আমার সাথে যে রকম খমিজমি করেছে! তোর বাপ মসজিদ থেকে আসুক, তার কাছে বলে যাবি।
না, আমি আব্বা আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারব না।
আমিনা বলল- আজ সময় মতো না গেলে কাজ শেখা বন্ধ হয়ে যাবে। সামনেই পূজো এবং ঈদ। দু’টো পর্ব প্রায় এক সাথে পড়েছে। তাই অনেক কাজ পড়েছে।
তোর বাপ আসবেই এখন। ফুল খাতুন বলল- একটু দেরি করে যা। আমাকে বাপের বকা খাওয়াস
না।
আমিনা মার কথায় গুরুত্ব না দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
আমিনা প্রায় চার বছর ধরে স্বামী থাকতেও স্বামীর সোহাগ থেকে বঞ্চিত। দু’টি ছেলে জন্মের পরেই সে সন্তান দু'টিকে
নিয়ে স্বামীর সংসার ত্যাগ করে বাপের সংসারে চলে এসেছে। স্বামীর সংসার সে সাধে
ত্যাগ করে আসেনি। অনেক কাহিনী আছে। যে কাহিনী তার বাইরে অন্য কেউ জানে না।
তাঁর বিয়ে হয়েছিলো শিতুলির আফসের ফকিরের ছেলে তারা মিয়ার সাথে। তখন তার
বিয়ের বয়স হয়নি। সবে ক্লাস নাইনে উঠেছিল। লেখা-পড়ায় সে খুবই ভালো ছিলো।
ক্লাসে সর্বদা প্রথম হতো। লেখা-পড়ার পাশাপাশি সে নৃত্য-গীত, খেলা-ধুলায়ো পাৰ্গত ছিলো। সহপাঠিরা তাকে সন্মান করতো এবং
শিক্ষকরাও তাকে গুরুত্ব দিতো। তার অমতেই তাকে তারেক মৃদা বিয়ে দিয়েছিলো।
আফসের ফকিরের সাথে তারেক মৃদার ছেলেবেলা থেকেই পরিচয় ছিলো। তাদের পরিচয়
হয়েছিলো সিনেমা হলে। দু'জনই সিনেমা পাগল ছিলো। ইন্দ্রপুরীতে যে বই-ই
লাগতো দু’জনেই তিন-চার বার করে দেখতো। সেই সুত্রেই নাপ এবং
আলাপের পরে বন্ধুত্ব।
বয়স হলে মানুষের পরকালের চিন্তা বাঢ়ে। মরার চিন্তা মাথায় ঢোকে। একদিন মরতে
হবে, একাল থেকে সেপাড় অর্থাৎ পরপাড়ে যেতে হবে।
তবে কি নিয়ে যাব পরপাড়ে! এই চিন্তায় মানুষকে অস্থির করে তোলে। তখন মানুষের চোখ
খোলে- ধর্ম-কর্মে মতি আসে।
তবলীগ জামাত অন্যান্য জায়গায় ১৯২৬ সালে শুরু হলেও আসামে এর বিশেষভাবে প্রভাব
পড়তে শুরু করেছে নব্বৈর দশকের গোড়া থেকে। জামাতিরা মসজিদে মসজিদে ঘুরে ইসলাম
প্রচার করে। নামাজ রোজার তরকিব শেখায়। হাদিশ কোরআনের কথা বলে লোকদের ধর্মের প্রতি
আকৃষ্ট করে। আফসের ফকিরদের গ্রামেও একদিন তবলীগ জামাত এসেছিল। জামাতিদের কথায়
উদ্বুদ্ধ হয়ে আফসের ফকির তখনই জামাতের অনুসারি হয়ে পড়েছিলো। লংপেন্ট সার্ট
ছেড়ে পাঞ্জাবী গায় দিয়ে, মাথায় টুপী পরে ইন্দ্রপুরী সিনেমা হল
ছেড়ে মসজিদে ঢোকে ছিলো এবং সে নিজেও জামাতিদের সাথে মিলে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ
করেছিলো।
একদিন আফসের ফকির জামাতিদের সাথে তারেক মৃদাদের মসজিদে এসেছিলো এবং পূর্বের
বন্ধুত্বের সূত্র ধরে কালেমার দাওয়াত দিতে তারেক মৃদার বাড়ি এসেছিলো। তখন সে আমিনাকে
দেখে ছেলের বউ করার কথা ভাবে এবং কয়েকদিন পরে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে।
আমিনা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। বিয়ের কথা শুনে আমিনা ভাত-পানী ছেড়ে দিয়েছিলো।
তখন তারেক মৃদা খুবই অস্বস্তিতে পড়েছিলো। একদিকে মেয়ের আপত্তি এবং অন্যদিকে
বন্ধুর সন্মান! কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক তখন সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন
হয়ে পড়েছিলো তার। মেয়ে যদি বিয়ে তো দিতেই হবে, একদিন আগে
নয় তো একদিন পরে। যা দিনকাল পড়েছে কখন কী অঘটন ঘটে যায় বলা কঠিন। অবশেষে সে
আমিনার আপত্তি সত্ত্বেও বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিলো এবং আফসের ফকিরের ছেলে তারা
মিয়ার সাথে বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়েছিলো।
বিয়ের পরে তারেক মৃদা নিজেও বিয়াইর পরামর্শে সিনেমা হল ছেড়ে নামাজ রোজা
নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।
বিয়ের পরে প্রথম দুই তিন বছর ভালো ভাবেই কেটেছিলো। আমিনার অসন্মতিতে বিয়েটা
হলেও সে তারা মিয়াকে মেনে নিয়েছিলো। তারা মিয়াও ছেলে হিসাবে মন্দ ছিল না। সে
আমিনাকে খুবই ভাল বাসতো। আমিনার প্রতিটা আবদার যথাযথ পালন করবার চেষ্টা করতো। সব
মিলে দু'জনের বৈবাহিক জীবন মোটামুটি ভালোভাবেই
কাটছিলো। বিয়ের দু'বছর পরে তাদের দাম্পত্য প্রেমের চিহ্ন
স্বরূপ আশ্রাবের জন্ম হয়।
আশ্রাবের জন্মের বছরই আফসের ফকিরদের গ্রামে জমির দখল নিয়ে একটি মার্ডার হয়।
মার্ডার করেছিলো আফসের ফকিরের শরিকেরা। আফসের ফকির অবশ্যে সেই মার্ডারের সাথে
জড়িত ছিল না। তবু ভূক্তভোগিরা আফসের ফকিরের নামে কেস দিয়েছিলো।
সেই কেসে পুলিশ আফসের ফকিরকে আটক করে কোর্টে চালান দেয় এবং কোর্ট থেকে হাজতে
চালান দেয়। তিন মাস পরে কোর্ট থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আফসের ফকির আজমীড় যায়
এবং আজমীড় গিয়ে একজন সুফি পীরের কাছে বায়াত পড়ে। সেই সুফি পীর ভাং গাঞ্জা
সেবনে অভ্যস্ত ছিলো। নামাজ রোজার তেমন ধার ধারত না। সেই পীরের প্রভাবে পরে আফসের
ফকিরও ভাং গাঞ্জা খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং নামাজ রোজা ছেড়ে দাঢ়ি চুল রেখে
সুফি সাধক-এর বেশ ধরে।
আফসের ফকির এক বছর ছিলো আজমীড়। এক বছর পরে আজমীড় থেকে এসে নিজেই মুরিদ
দেওয়া শুরু করে এবং এবং সুফি সাধক হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। দুই বছরের মধ্যে তাঁর
ভক্তের সংখ্যা প্রায় হাজারের কোটায় দাঁড়ায়। ভক্ত ছেলে-মেয়েরা বাড়ীতে আসে।
গান-বাজনা হয়। পীরের মজলিশ বসে। ভাং গাঞ্জা খাওয়া থেকে শুরু করে নানা রকমের
শরিয়ত বিরোধী কাজ চলে সেই পীরের মজলিসে। ভক্ত মেয়েরা পীরের হাত-পা এবং ভক্ত
ছেলেরা পীর মার হাত-পা মালিশ করে। মাঝে-মধ্যে আমিনাকেও হাত- পা মালিশ করে দিতে
বলে। শশুড়ের কথা ফেলতে না পেরে সেও কখনও কখনও শশুড়ের শরীর মালিশ করে দেয়।
তারা মিয়া প্রথমে ভাং গাঞ্জা সেবনের বিরোধী ছিলো। আমিনা অন্যের হাত-পা মালিশ
করাটা সে মোটেই পসন্দ করত না। তবে, বাপের
বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস ছিল না তার। কারণ সে বিশেষভাবে শিক্ষিত ছিল না। মাত্র এম,
ই পর্যন্ত পড়েছিলো। চাষআবাদ করতো। চাষ-আবাদের বাইরে অন্য কোনো পেশা
জানা ছিলো না তার। বাবার বিরুদ্ধাচরণ করলে বাবা যদি জমি থেকে বঞ্চিত করে তখন সে কী
করবে? তাই অপসন্দ হলেও জমি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে সে সব
মেনে নিয়েছিলো।
কথায় আছে না, যে যেখানকার হাওয়ায় থাকে তার গায়
সেখানকার হাওয়াই লাগে। আতরের দোকানে বসলে গায় আতরের গন্ধ হয়, শুঁটকি মাছের দোকানে বসলে শুঁটকির গন্ধ হয়। অর্থাৎ যে যেরকম পরিবেশে থাকে,
একটু দেরিতে হলেও সেরকম পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
তারা মিয়াও তার ব্যতিক্রম ছিল না। লোকের দেখাদেখি গাঞ্জার কল্কিতে এক টান, দু'টান দিতে দিতে সেও এক সময় গাঞ্জায় আসক্ত
হয়ে পড়ে। তখন তার নজর পড়ে সালেহা নামের একজন ভক্তবোনের ওপড়ে। সালেহা দেখতে
খুবই সুন্দরি ছিলো। রূপের গরবে গরবিনী ছিলো সে। সে বিবাহিতা ছিলো যদিও স্বামীর
প্রতি তার মোটেই ভালোবাসা ছিলো না। কারণ স্বামীটি দেখতে তেমন সুঠাম সুন্দর ছিলো
না। এদিকে তারা মিয়া দেখতে খুবই সুন্দর সুঠাম ছিলো।
সালেহা ধীরে ধীরে নারীর ষোল কলা দেখিয়ে তারা মিয়াকে প্রেমের জালে জড়িয়ে
ফেলে এবং তারা মিয়াকে নিয়ে গুয়াহাটি পালিয়ে যায়। প্রায় ছ'মাসের মতো তাদের কোনো খবরই ছিল না। ছ'মাস
পরে খবর আসে তারা গুয়াহাটিতে আছে ঘরভাড়া নিয়ে।
তখন আমিনা দুই সন্তানের মা। সন্তান দু'টির
মুখের দিকে চেয়ে সে আফসের ফকিরের সংসারেই থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ছিলও প্রায় এক
বছর। কিন্তু তারা মিয়া বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে খইমুদ্দিন নামের একজন
ভক্তভাই আমিনাকে জ্বালাতন করতে থাকে। একদিন তো সে বলেই ফেলে- তুমি দেখতে খুবই
সুন্দরি। এই উঠন্ত যৌবনে তারা মিয়া তোমাকে ছেড়ে চলে যাওয়াটাকে কোনোমতেই মেনে
নেওয়া যায় না। তারা মিয়ার আশায় থেকে লাভ হবে না। আমি খবর পেয়েছি, সে আর সালেহার খপ্পর থেকে ফিরে আসতে পারবে না। সালেহা যে রকম মেয়ে তা তো
তুমি নিজের চোখেই দেখেছ? তোমার চোখের সামনে থেকে কীভাবে তারা
মিয়াকে নিয়ে পালিয়ে গেল। তুমি কিছুই করতে পারলে না। ওদিকে তারা মিয়া সালেহাকে
নিয়ে মজা করবে আর তুমি এখানে তার ছেলে দু'টিকে নিয়ে যৌবন
মাটি করবে? এটা কী মেনে নেওয়া যায়? চল,
আমরা অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি।
আমিনা ভাবল, কথা মাজলে মোটা হয় এবং দড়ি মাজলে চিকন
হয়। দেখা যাক, জল কোন পর্যন্ত গড়ায়! আমি ঠিক থাকলে তো সবই
ঠিক থাকবে। তারা মিয়া ফিরে আসুক আর না আসুক, তাতে তার কোনো
মাথা ব্যথা নেই। ছেলে দু’টি আছে, ছেলে
দু’টিকে নিয়েই সে স্বামীর সংসারে পড়ে থাকবে। এভাবে ভেবেই
আমিনা কাউকে কিছু না বলে মনে মনে ছিলো।
ওদিকে আমিনা মনে মনে থাকাটাকে সন্মতি বলে ভেবে খইমুদ্দিন একদিন আমিনার আঁচল
ধরে টানে। অশ্লীল ইঙ্গিত করে।
তখন আমিনা ভাবতে বাধ্য হয়, এভাবে মনে মনে থাকলে
আর চলবে না। শশুড়ের কাছে নালিশ দিয়ে একে শাসন করতে হবে। আমিনা শশুড়ের কাছে
নালিশ দিলো। তখন আফসের ফকির বলল- একটু আধটু স্ফূর্তি করছে, করতে
দেও না। হাতের মুঠ শক্ত থাকলে কে কি করতে পারবে? তারা মিয়া
বাড়ি আসুক, সে বাড়ি এলে সবই ঠিক হয়ে যাবে।
শশুড়ের কাছে বিচার না পেয়ে আমিনা খইমুদ্দিনের জ্বালাতন থেকে মুক্তি পেতে
ছেলে দু’টিকে নিয়ে স্বামীগৃহ ত্যাগ করে বাপের বাড়ী
চলে এসেছে। তারেক মৃদার কাছে অবশ্যে সব কথা খোলে বলেনি। শুধু বলেছে- তোমাদের জামাই
বাড়ি নেই। আমি একা একা ছেলে দু'টিকে নিয়ে ও বাড়িতে আর
থাকব না। বাড়িতে প্রত্যেক দিন গাঞ্জার আসর বসে। আমি গাঞ্জার গন্ধ সহ্য করতে
পারিনা। আশ্রাব এখন মোটামুটি বড় হয়েছে। ওদের রক্তে তো গাঞ্জার ধোঁয়া আছেই!
কোনদিন যে গাঞ্জার কল্কিতে টান দিবেনা কে বলতে পারে! তাই ছেলে দু’টির ভবিষ্যতের কথা ভেরে চলে এসেছি। তোমাদের জামাই বাড়ি না আসা পর্যন্ত আর
ও বাড়িতে যাব না।
নামাজ-রোজা করে না, গাঞ্জা খায় বলে তারেক মৃদা বিয়াইর প্রতি
আগে থেকেই অসন্তুষ্ট ছিলো। তাই তারেক মৃদা বিশেষ আপত্তি না করে আমিনাকে বাড়িতে
আশ্রয় দিয়েছে। একমাত্র মেয়ের ভাত কাপড়ের অভাব হবে না তার সংসারে।
আমিনা চলে আসার কয়েক দিন পরে আফসের ফকির এসেছিলো আমিনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
সেদিন তারেক মৃদা বাড়ি ছিল না। আমিনাই তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আপনাদের ছেলে
বাড়ি না আসা পর্যন্ত আমি আর ও বাড়িতে যাব না। আপনাদের ছেলে যদি বাড়ি আসে তখন
বিবেচনা করব।
আফসের ফকির বলেছিলো- যা হবার হয়েছে। তুমি বাড়ি চল। তারা মিয়া বাড়ি এলেই সব
ঠিক হয়ে যাবে। আমি সেদিন গুয়াহাটীতে তারা মিয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি
তাকে খুব বকেছি এবং বাড়ি আসার জন্য বলে এসেছি।
আমিনা বলেছিলো- আগে বাড়ি আসুক। তখন দেখা যাবে।
বাপের বাড়ি চলে আসার এক বছর পরে আমিনা স্বামীর নামে খোরাকি দাবি করে আদালতে
কেস করেছে। এখন কেস চলছে। আমিনা অবশ্যে কেস করার পক্ষে ছিল না। বাপের কথা ফেলতে না
পেড়েই সে কেস করতে বাধ্য হয়েছে।
সেদিন আমিনা কাজে আসল ঠিকই, কিন্তু কাজে মন
বসাতে পারল না। তাকে এখনও সেলাই মেসিনে বসতে হয় না। বোতামের গাঁঠ বান্ধা, এটা-ওটা ফাঁই-ফরমাশ শোনাই তার কাজ। বোতামের গাঁঠ বান্ধতে গিয়ে দু’বার আঙুলে সুচের খোঁচা লাগল। রক্তও বের হল। তার জন্য সেলিমের বকুনিও খেতে
হল- দেখে শুনে কাজ করতে পার না! কাজ করার সময় মন কোথায় থাকে? আঙুলে সুচ ফুটে রক্ত বের হয়েছে। রক্ত যদি কাপড়ে লাগতো, তাহলে জরিমনা কে দিত? গ্রাহক রক্ত মাখা কাপড় নিত?
সেদিন সন্ধ্যেবেলা আমিনা দুরুদুরু বুক নিয়ে বাড়ি ফিরল।
এদিকে তারেক মৃদা থমথমে ভাব নিয়ে আমিনা বাড়ি আসার অপেক্ষায় উঠোনেই বসে
ছিলো। মেয়ে তার কথা উপেক্ষা করে কাজ শিখতে গেছে। এ কথা সে কোনোমতেই মেনে নিতে
পারছিল না।
আমিনাকে দেখে তারেক মৃদা ফোঁসে উঠল- কোথায় গিয়েছিলে?
আমিনা ভয়ে ভয়ে বলল- কাজ শিখতে।
আমিনা জেদি মেয়ে। রাগ করে কাম বাগানো সম্ভব নাও হতে পারে! তাই সে নিজেকে
সামলে নিয়ে অভিযোগের সুরে বলল- আমার নিষেধ সত্ত্বেও তুমি কাজ শিখতে যাওয়াটা কী ঠিক
হয়েছে?
আমিনা কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।।
তারেক মৃদা নরম সুরে বলল- যা হবার হয়েছে। এ নিয়ে আর অযথা অশান্তি করতে চাই
না। যাও, ঘরে যাও।
বাপের এরকম নরম গলার স্বর আমিনা কোনোদিন শুনেনি। সেজন্য আমিনা একটু অবাক হলো।
আজ সূৰ্য্য কী পশ্চিম দিক থেকে উঠছে? বাপের
এরকম নরম স্বরের অন্তরালে নিশ্চয় কিছু রহস্য আছে? নিশ্চয়
ঝঞ্জা আসার আগের থমথমে ভাব। নিশ্চয়ই কিছু একটা হতে চলেছে। যা হবার হবে, এমনই ভাব নিয়ে আমিনা নিজের ঘরে চলে গেল।
আমিনা চলে যাওয়ার পরে তারেক মৃদা ফুল খাতুনকে ডেকে বলল- যাও, তালা-চাবি নিয়ে এস।
ফুল খাতুন বলল- তালা-চাবি? তালা-চাবি দিয়ে কি
করবে?
আনতে বলেছি, আন। তারেক মৃদা বলল- এতো কৈফিয়তের দর্কার
কি?
ফুল খাতুন তালা-চাবি এনে তারেক মৃদার হাতে দিল। তালা হাতে নিয়ে তারেক মৃদা
বলল- আমিনাকে হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বলো।
আমিনা ইতিমধ্যে কল পাড় থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসেছিলো। তাই ফুল খাতুন বলল-
হাত-মুখ ধুয়ে এইমাত্র সে ঘরে ঢুকেছে।
তারেক মৃদা বলল- কাজটা আসলে তোমাকে দিয়েই করাতে চেয়েছিলাম। তবে, ভরসা পাচ্ছি না। তাই আমি নিজেই করব।
ঘরে দুটি রুম। একটিতে তারেক মৃদা ও ফুল খাতুন থাকে এবং একটিতে আমিনা ছেলে
দুটিকে নিয়ে থাকে। তারেক মৃদা আমিনাদের রুমের সামনে গিয়ে দেখল, আমিনা ছেলে দুটি নিয়ে
ব্যস্ত হয়ে রয়েছে।
তারেক মৃদা কালিবলম্ব না করে রুমে তালা লাগিয়ে চাবিটা ফুল খাতুনের হাতে দিয়ে
বলল- আজ থেকে আমিনা ঘরেই থাকবে। একমাত্র খানা এবং পেসাব-পায়খানার জন্য বাইরে
বেরোতে পারবে। কেউ তাকে ঘরের বাইরে বেরোতে সহায় করলে, তাকে কিন্তু আমি ছাড়ব না। মনে থকে যেন কথাটা।
সেদিন আমিনা রাতটা তালাবদ্ধ ঘরেই কাটালো। এমনিতে ছেলে দুটি তার কাছেই শোয়, তবে, সেদিন নিজের কাছে রাখল না, তাদের নানীর কাছে শোতে বলল-যা তোদের নানীর কাছে শো গিয়ে। রুমে তালা
লাগিয়েছে। তোরা তো আবার রাতে দুই বার বের হোস হাগা মুতার জন্য। বারে বারে তোদের
নানীকে ডাকতে পাড়ব না।
মা’র কথা মতো আশ্ৰাব এবং ফিরদুস তাদের নানীর
কাছেই শোইল। রাতে আমিনার চোখে ঘুম এল না। নানানটা দুঃশ্চিন্তা নিয়ে সে রাত পাড়
করলো। সকাল হওয়ার আগে আগে তার মাথায় বুদ্ধি খেলালো, আমি আর
বাপের বাড়িতে বাপের অন্যায় অনুশাসন মেনে থাকব না। নিজের পায়ে দাঁড়াব। যে ভাবেই
হোক, ছেলে দু’টিকে মানুষ করতেই হবে। সে
দেখিয়ে দিবে মেয়েরা অবলা নয়। ইচ্ছে করলে তারাও অনেক কিছু করতে পারে। এখানে
থাকলে ছেলে দু’টি মানুষ হতে পারবে না। খুব বেশি প্রাইমারি
পাস করতে পারবে, তারপরে হালের মুঠি ধরবে, নইলে ঠেলা-রিক্সা চালাবে।
বাপ বেঁচে থাকা পর্যন্ত ভাত-কাপড়ের চিন্তা করতে হবে না অবশ্যে, কিন্তু বাপ মারা গেলে সে ভাইদের কাছে বোজা হয়ে দাঁড়াবে। তার
চার ভাই। চার ভাই-এর মধ্যে সে-ই একমাত্র বোন। ভাইয়েরা তাকে যথেষ্ট স্নেহ করে। তবে,
ভাই-এরা কেউ লেখা-পড়া শেখেনি। সবাই বিয়ে করেছে কম বয়সে। বাপের
চিন্তা, বেশি বয়স হলে, কোনদিন কি অঘটন
করে বসে ঠিক নেই। আজকাল তো বাপের অমতে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে সব জায়গায় হচ্ছে। এ
যেন পরম্পরার মতো হয়ে গেছে। যদি তার ছেলেরাও তেমনই কিছু করে বসে, তখন সে লোক সমাজে মুখ দেখাবে কীভাবে? তাই ষোল সতের
বছর বয়সেই সবাইকে বিয়ে করিয়েছে। তার তিন ভাই খেত-খোলায় কাজ করে এবং একজন
পিলপিলি চালায় পিলপিলি আসার পর থেকে। জমি মোটে আট বিঘা। ভাইদের মাঝে ভাগাভাগি হলে
ভাগে পড়বে মোটে দুই বিঘা করে। তাদের ছেলে-পুলে হলে তখন নিজের ভাতই জোঁটাতে পারবে
না, তাকে দেখা-শুনা করবে কীভাবে?
এভাবে ভেবেই আমিনা মোক্ষম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সে বাড়ি থেকে আজই চলে যাবে।
তার বাবা মসজিদে গেছে। বাবা বাড়ি আসার আগেই সে চলে যাবে। নইলে সারা জীবন এভাবে
তালাবন্ধ হয়েই থাকতে হবে। সহরে গিয়ে সে ঘরভাড়া নিয়ে থাকবে। কয়াকুছির নবিরন
সেলিমের দোকানে দর্জি কাজ করে। আমিনা একদিন নবিরনের সাথে গিয়েছিলো তার রুমে। সে
নবিরনের ওখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। প্ৰভাতে মগরিবের আজান দেওয়ার পরেই তারেক
মৃদা মসজিদে নামাজ পড়তে যাবে। সে সেই সুযোগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।
এ ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে, একটা ব্যাগ যাতে অনায়াসে
ঘরের বাইরে থেকেই রুমের বাইরে বের করে নিতে পারে তার জন্য আমিনা জানলার একটা সিক
খোলে ফেলল। কাঠের সিক। তাই খোলতে তেমন বেগ পেতে হল না। তারপর তার যাবতীয়
কাপড়-চোপড় এবং গহনা-গাঁটি একটি ব্যাগে পুরে জানলার ধারে লুকিয়ে রাখল। আমিনা দু’টি ছাগল পোষে। হাঁস মুরগিও পোষে কয়েকটা। কয়েকদিন আগে একটি ছাগল এবং
কয়েকটা হাঁস মুরগি সর্বমোট তিন হাজার টাকায় বিক্রী করেছে। সেই তিন হাজার টাকা
তার হাতে জমা ছিল। টাকা কয়টা সে তার সেলোয়ার কামিজের কোঁচে লুকিয়ে নিলো।
বাইরে বেরোবার যাবতীয় কাজ সম্পূর্ণ করে আমিনা মাকে ডেকে বলল- মা, দরজা খোল। আমি বাইরে যাব।
ফুল খাতুন দরজা খোলে দিলো। ছেলে দু’টি নানীর
সাথে রুমের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো। তারেক মৃদা বড়ি নেই নামাজ পড়তে মসজিদে গেছে।
ছোট ছেলে ফিরদুস দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। আমিনা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
আমি বাইরে যাব। বাইরে থেকে এসে তোদের সাথে কথা বলব।
আমিনা প্রাতঃকৃত্য সেরে বড় ছেলে আশ্রাবকে কাছে ডেকে এনে ফিসফিস করে বলল- কাল
দেখিস নি, কীভাবে তোর নানা আমাকে ঘরে তালাবন্ধ করে
রেখেছিলো? এখানে থাকলে তোদের মানুষ করতে পারব না। তাই আমি আজ
বাড়ি থেকে চলে গিয়ে সহরে ঘরভাড়া করে থাকব। তোরা চিন্তা করিস না। দু'দিন পরে এসে তোদের নিয়ে যাব। নানীকে দিগদারি দিস না। যা বললাম মনে থাকে যেন।
সময় মতো স্কুলে যাস কিন্তু। আমার জন্য চিন্তা করিস না। মোটে দু’দিনের কথা। থাকতে পারবি না?
আশ্রাবের বয়স সাত বছর। সে সব বুঝতে পারে। মাকে ঘরের ভেতর তালাবন্ধ করে
রাখাটাকে সে মেনে নিতে পারেনি। তাই সে মনে মনে ক্ষুন্ন হয়ে ছিলো। মা সহরে গেলে
ভালই হবে। মাকে আর তালাবন্ধ হয়ে থাকতে হবে না। তাই সে মাথা নেড়ে সন্মতি জানিয়ে বলল-
পারব। তুমি কিন্তু তারাতারি এস।
আমিনা বলল- বললাম তো আসব। তবে, এ কথা
কিন্তু কাউকে বলবি না। তোর নানী কিংবা তোর মামাত ভাই-বোনদেরও নয়।
আশ্রাব মাথা নেড়ে সন্মতি জনাল।
ছোট ছেলে একটু ফাঁকেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আমিনা তার কাছে গিয়ে বলল- ভাইকে
দিগদারি দিবি না। রাস্তায় খেলতে যাবি না। নানীর কাছেই থাকবি। আমি সহরে যাব।
সহর থেকে কখন আসবে? ফিরদুস জিজ্ঞাসা করলো।
ফিরদুস ছোট ছেলে। তার কাছে আসল কথা বলাটা ঠিক হবে না ভেবে আমিনা বললো-আসব।
বিকেলেই আসব। ফিরদুসের বয়স চার বছর। সে অঙ্গনবাদি কেন্দ্রে পড়তে যায়। অঙ্গনবাদি
কেন্দ্র আশ্রাবদের স্কুলের সাথেই। তাই সে বলল- সময় মতে ভাই-এর সাথে পড়তে যাস
কিন্তু। ফিরদুস মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ছেলেদের এ ভাবে পরামর্শ দিয়ে আমিনা ঘরের পেছনে গিয়ে জালনা দিয়ে ব্যাগটা বের
করে এনে বাড়ির পেছন দিয়ে বেরিয়ে ক্ষেতের আল ধরে কিছু দূর আসার পরে বড় রাস্তায়
উঠল।
বাড়ি থেকে সহর মাত্র তিন মাইল। তখন খুবই সকাল। শীতের দিন। তাই অনেকে তখনও
শয্যা ত্যাগ করে নি। সুনসান রাস্তা।
সহরে দুই একজন মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে মাত্র। আমিনা রাস্তা ধরে সোজা নবিরনদের
মেসে চলে এলো।
নবিরন দাঁত মাজছিল। আমিনাকে অত সকালে দেখে সে বলল- আরে, এত সকালে কোত্থেকে এলি?
আমিনা বলল- বাড়ি থেকে।
নবিরন বলল- এত সকালে আসার কারণ কি? বাড়িতে
ঝগড়া-ঝাঁটি হয়েছে নাকি? রাগ করে এসেছিস?
আমিনা বলল- অবশ্যেই রাগ করে। তবে, কোনো
ঝগড়া-ঝাঁটি করে আসিনি। এভাবে বলেই আমিনা গতরাতে বাড়িতে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা ভেঙে
বলে বলল- বল, এখন বাড়িতে থাকাটা কি সম্ভব? বাপ হয়ে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখাটা কি ঠিক হয়েছে? আমি তো কোনো অন্যায় কাজ করিনি। ছেলে দু'টির
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কাজ শিখতে সহরে আসি। এটা কি অন্যায়?
নবিরন বলল- অন্যায় হবে কেন? এখন আর সে যুগ নেই।
এমন একটা যুগ আসবে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ে কাজ না করলে পেটে
ভাতই যাবে না। তোর দুলাভাই মরার পরে আমি যদি কাজ না শিখতাম, তাহলে
এখন লোকের বাড়িতে বাসন মাজতে হতো এবং ছেলে দু’টিকে চায়ের
দোকানে কাজ করতে হতো। আমি দর্জিকাজ শিখছি বলে তাদের স্কুলে পড়াতে পারছি। প্রথম
অবস্থায় আমাকে নিয়েও অনেকে অনেক টিটকারি করেছে। আমার শশুড়ই আমার কাজ শেখার
বিপক্ষে ছিলো। তুই এখন কি করবি বলে ভাবছিস?
আমি আর বাড়ি যাব না। আমিনা বলল- আজ থেকে আমি তোমাদের সাথেই থাকব ভাবছি।
নবিরন বলল- থাকতে অবশ্যে পারবি। তবে, বেশিদিন
থাকলে ভাড়া দিতে হবে। দুই-একদিন থাকলে অবশ্যে আলাদা কথা।
দুই-একদিন নয়। আমিনা বলল-বেশিদিনই থাকব। বলতে পার সারাজীবন। ভাড়া দিতে হয়
দিব। ভাড়ার জন্য চিন্তা করো না।
ছেলে দু’টি কোথায় থাকবে?
আমার সাথেই থাকবে।
নবিরন অসুবিধার কথা জানাল- তাহলে তো তোকে আলাদা রোম নিতে হবে। বাড়ির মালিক এক
সাথে এত লোককে এক রোমে থাকতে দিবে না। প্রস্রাব-পায়খানা, জলের কথা আছে।
আমিনা বলল- আলাদা রোম নিতে হয় নিব। এখন কিছুদিন থাকতে পারলেই হলো।
তবুও ছেলে দু’টিকে নিয়ে থাকা সম্ভব হবে না। নবিরন বলল-
আলাদা রোম নিয়েই ছেলে দু’টিকে আনতে হবে। তবে, এখানে বর্তমান খালি রোম নেই। অন্য কোথাও দেখতে হবে।
আমিনা বলল- আমি তাদের দু'দিন পরেই আনতে যাব
বলে এসেছি। দু’দিনের মধ্যে কি রোম ঠিক করা সম্ভব হবে?
আমি সেদিন রেজিয়াদের ওখানে গিয়েছিলাম। ওদের সেখানে অতিরিক্ত রোম আছে। সেখানে
থাকতে পারবি। শুকুরজানও থাকে সেখানে।
রেজিয়া এবং শুকুরজান চায়ের দোকানে কাজ করে। রেজিয়া আমিনার চাচাতো বোন। তার
থেকে দু’বছরের বড়। শুকুরজানও দূর সম্পর্কের
আত্মীয়। আমিনার বড় ভাই হাকিম মৃদার খালাতো শালী। তার সাথেও পরিচয় আছে। আমিনা তাদের
মেসেও একদিন গিয়েছিলো নবিরনের সাথে। রেজিয়ার সাথে দেখা করতে।
রেজিয়ার সেখানে রোমের কথা শুনে আমিনা খুশি হলো। বলল- তাহলে তো ভালোই হয়।
রেজিয়া আপা আমার চাচাতো বোন। আমার থেকে দু'বছরের
বড়।
নবিরন বলল- ওরা চায়ের দোকানে কাজ করে। তাই একটু অসুবিধা আছে। ওদের তো অনেক
লোকের সাথে পরিচয়! শুনেছি, সকাল সন্ধ্যা অনেক লোক ওদের সাথে দেখা করতে
আসে। চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই এসব আর কি?। এখন থাক সে সব কথা। কয়েক দিন আগে গিয়েছিলাম ওদের ওখানে। তখন দু'টি রোম খালি ছিলো। ভাড়ার জন্য লোক পিল পিল করে। তাই আগে ওদের কাছে
জানতে হবে, ভাড়া দিবার মতো রোম আছে কিনা। এখন ভেতরে চল। সকাল সকাল একটু চা খাওয়ার
অভ্যেস গড়ে উঠেছে। এখন চা বানাব। চা খেয়ে পরে কথা হবে।
চার
এদিকে তারেক মৃদা মসজিদ থেকে বাড়ি এসে আমিনার রোমের দরজা খোলা দেখে ফুল
খাতুনকে ডেকে বলল- ঘরের দরজা খোলা কেন? রোমটা
তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেছিলাম মনে নেই? আমিনা কই?
ফুল খাতুন করে বললো-কেন রুমে নেই?
গিয়ে দেখ রুমে আছে কি না। তারেক মৃদা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- রুমে নেই! রুমে
থাকলে কি আর আমি জিজ্ঞাসা করি! রুমের তালা কে খুলে দিয়েছে?
ফুল খাতুন বললো-বাইরে যাওয়ার কথা বললো, তাই আমি খুলে দিয়েছি।
খুলে দেওয়ার পরে আবার বন্ধ করনি?
না, মনে ছিল না। রান্না ঘরে কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই মনে ছিল না।
মনে ছিল না, তাইনা। আজ দেখাচ্ছি মজা। এমন কাজ করব আর কোনোদিন ভোলে যাবে না।বলেই
তারেক মৃদা ফুল ভানুর দিকে ধেয়ে এলো মারার জন্য।
আশ্ৰাব কাছেই ছিলো। নানীকে মারবে এই ভয়ে সে বললো- নানীকে মের না। আমি বলছি মা
কোথায় গেছে। মা সকালে সহরে গেছে কাজ শিখতে।
আমিনা কাজ শিখতে যাওয়ার কথা শুনে তারেক
মৃদা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো—আমার নিষেধ সত্বেও সে কাজ শিখতে গেছে! আমি এখনই সহরে
গিয়ে তাকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসব। তারপর হাত-পা ভেঙে বসিয়ে বসিয়ে
ভাত খাওয়াব। মান-সন্মান আর রাখল না মেয়েটা!
বড় ছেলের বউ আনোয়ারা উঠোনে ধান শুকোচ্ছিল। তাকে ডেকে বলল- তোমরা কোথায় ছিলে? বাধা দিতে পারলে না।
বড় ছেলের বউ একটু মুখ-ফোড়। উচিত কথা বলতে ভয় পায় না। সে শশুড়কে তেমন
দেখতেও পারে না সকাল বিকেল নামাজ পড়ার জন্য তাগিদা দেওয়ার জন্য। আমিনা বাড়ি
থেকে যাওয়ার জন্য সে মনে মনে একটু খুশিই হলো। মেয়ে বাড়ি থেকে বিদ্রোহ করে
পালিয়ে গেছে, এ কথা ভেবে অন্ততঃ শশুড়ের উপদ্রব দুই
একদিনের জন্য হলেও কিছুটা কমবে। সে বলল- আমি কি জানি, সে এভাবে
বাড়ি ছেড়ে যাবে? আর আমি যেতে দেখিও নি।
ছেলের বউ সত্যি কথাই বলেছে। সে সত্যিই দেখে নি আমিনা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে
গেছে। তারেক মৃদা মগরিবের আজান
দেওয়ার পরেই নামাজ পড়তে গিয়েছিলো। সিদ্ধান্ত মতেই, তারেক মৃদা নামাজ পড়ার জন্য
যাওয়ার পরেই আমিনা বেরিয়ে গিয়েছে। ফুলভানুও জানে না কথাটা।
তারেক মৃদা ভাবল, যে রকম মুখ-ফোড় বৌ! কি বলতে কি বলে ফেলবে
ঠিক নেই। হাতী কাদায় পড়লে চামচিকারাও দুই লাথ মারে। তাই বৌয়ের সাথে তর্ক করে
লাভ নেই ভেবে সে বলল- যাও, ভাত বাড় গিয়ে।
আনোয়ারা বলল- ভাত এখনও হয়নি। সহরে যাবেন, কখন
আসেন ঠিক নেই। গোসল করে যান। গোসল করতে করতেই ভাত হয়ে যাবে।
তারেক মৃদা গোসল করে এসে ভাত খেয়ে সহরের দিকে রওয়ানা হলো। সে সরাসরি সেলিমের
দোকানে এলো।
নবিরন কাপড় সেলাই নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। সে তারেক মৃদাকে চেনে। আমিনার আব্বা
বলেও জানে। ছ'মাস আগে দুই তিনদিন এসেছিলো কাপড় সেলাই
করতে। সে তারেক মৃদার আগমনের কারণও উপলব্ধি করতে পারলো। নিশ্চয় আমিনার খোঁজেই
এসেছে। তাই তারেক মৃদাকে দেখে সে কাজ বন্ধ করে বলল- কাকা, আপনি
কি মনে করে?
তারেক মৃদা নরম সুরে বলল- আর মা, কি আর
বলব। আমিনা সকাল সকাল বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছে। তাকে নিতে আসছি। সে দোকানের দিকে চোখ বুলিয়ে
বলল- সেলিমকে দেখছি না! সে আসে নি?
নবিরন বলল- এসেছে। সে এক জায়গায় অর্ডার আনতে গেছে।
আমিনা কোণের একটি টেবিলে বসে কাজ করছিল। তারেক মৃদা আমিনাকে ডেকে বলল- আমিনা, এদিকে আয় তো। আমিনা কাছে এলে তারেক মৃদা বলল- বাড়ি থেকে এ
ভাবে আসতে হয় না-কি? লোকে কি বলবে? চল,
বাড়ি চল।
আমিনা তলের দিকে মুখ করে দৃঢ়কণ্ঠে বলল- না, বাড়ি
যাব না।
তারেক মৃদা বলল- বাড়ি যাবি না, মানে?
দুই কথা কোন বাড়িতে না হয়? তাই বলে বাড়ি
থেকে চলে আসতে হবে?
আমিনা বলল- আপনি বাড়ি যান। এখানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। বাড়ির কথা অন্য
লোককে শুনাতে এসেছেন কেন?
তারেক মৃদা সংযত স্বরে বলল- বাড়ির মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে এসেছি। এখানে
দোষের কথা কি আছে? চল, বাড়ি চল। ছেলে
দু’টি তোর মুখ চেয়ে বসে আছে।
আমিনা বলল- আমি দু'দিন পরে গিয়ে তাদের নিয়ে আসব।
জমিলাও কাজে এসেছিলো। সে এগিয়ে এসে আমিনাকে উদ্দেশ্য করে উপদেশের সুরে বলল-
চাচা বড় মুখ করে নিতে এসেছে। বাড়ি যা। চাচারও তো সন্মান আছে।
আমিনা বলল- তুমি আমাদের বাড়ির কথা জান না। তাই এ ভাবে বলছ। কাল রাতে বাড়িতে
কি হয়েছে, তা জানলে এভাবে বলতে পারতে না।
রহস্যের গোন্ধ পেয়ে জমিলা বলল- কি হয়েছে কাল রাতে?
তারেক মৃদা দেখল, এখন কেঁচো খোঁড়তে সাপ বেড়িয়ে পড়বে। তাই
রণে ভংগ দেওয়ার জন্য বলল- কিছু হয়নি। হাঁড়ি কলশ থাকলে একটু ঠুকা-ঠুকি হয়েই
থাকে। তুমি শুনে কি করবে? জামিলাকে এ ভাবে বলেই সে আমিনাকে
উদ্দেশ্য করে বলল- ঠিক আছে, তোর যেদিন মন চায়, সেদিন যাস। আশ্রাব এবং ফিরদুসকে
এখানে আনতে হবে না। ওরা ওখানেই থাকবে। ওদের পড়া আমি নষ্ট হতে দিব না।
তারেক মৃদা কাঁচুমাচু মুখ নিয়ে দোকান থেকে বেড়িয়ে এলো।
আমিনা নিজের জায়গায় গিয়ে কাজে মনোনিবেশ করলো।
পাঁচ
অবশেষে রেজিয়াদের ওখানেই রোমের ব্যবস্থা হল। একটি চৌহদ্দিতে দুই দিকে দু'টি টিনের ঘর। তর্জার বেড়া। ঘর দু'টিরমাঝখানে
উঠোনের মতো এক ফালি জায়গা। প্রতিটি ঘরে পাঁচটি করে মোট দশটি রোম। তর্জার বেড়া
দিয়েই রোম বানিয়েছে। আটটি রোমে ভাড়াটে আছে। দু'টি রোম
খালি। রোম দু'টিতে ছেলে মেয়ে নিয়ে দু’টি পরিয়াল ছিলো। তারা কয়েকদিন আগে অন্যত্র উঠে গেছে।
রেজিয়া এবং শুকুরজান পৃথক পৃথক রোমে থাকে। রোম দু'টির মাঝখানে একটি রোম খালি ছিলো। আমিনা সেই রোমটি নিলো। মাসে
আটশ টাকা ভাড়া। পেসাব-পায়খানা-জলের সুব্যবস্থা আছে। তবে, একটি
অসুবিধা আছে। কয়েকদিন পরেই আমিনা উপলব্ধি করতে পারলো, নবিরন
একেবারে মিথ্যে বলেনি। সত্যিই ওদের রোমে লোক আসে। তবে যে বলেছিলো, চাচাতো ভাই, খালাতো ভাইয়ের অভাব নেই, তেমন নয়।
রেজিয়ার রোমে একটি ছেলে আসে। নাম আলতাব। সে প্রেসে কাজ করে। বিবাহিত। বউ, ছেলে-মেয়ে আছে। কয়াকুছির দিকে বাড়ি। ছেলেটি আসলে, আমিনার রোমে উঁকি মেরে যায়। রোমে থাকলে তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়।
তার দৃষ্টির অর্থ আমিনা বুঝতে পারে।
শুকুরজানের রোমে আসে মেসের মালিক। মালিকের বয়েস হয়েছে। ষাট ঊর্দ্ধ। সন্ধ্যের
সময় চোখে চশমা লাগিয়ে লাঠি একটা হাতে নিয়ে খটখট করে আসে সে।
উভয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ
করছে। রক্তের সাদ সবাই পেয়েছে। যৌবন জ্বালা কার না আছে! কেউ সমাজের ডরে চুপ করে
থাকে, কেউ কেউ আবার সমাজের নীতি নিয়ম তোয়াক্কা
না করে নিজের খেয়াল খুশি মতো চলে। রেজিয়া এবং শুকুরজান উভয়েরই সমাজের ভয় নেই।
নিজের খেয়াল খুশি মতো চলে। রাত দুপুর পর্যন্ত গল্প-গুজব করে। ফিসফিস্ করে কথা
বলে। ভাঙা খাটের ক্যারক্যার শব্দ কাণে পড়ে। আমিনা তো আর কচি খুকি নয় ! দুই
সন্তানের মা। তাই সে সব বুঝতে পারে।
আমিনাদের গৃহের বিপরীত দিকের গৃহের রোমে একজন বৃদ্ধ লোক থাকে। সে একটি প্রেসে
কম্পোজের কাজ করে। ডিজিট্যাল প্রিন্টার আসার পর থেকে তার কাজ কমেছে। তাই প্রায়ই
রোমে থাকে। একদিন আমিনা তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো- চাচা, এখানে কতদিন ধরে আছেন?
তা, মা, প্রায় চার বছর
ধরে। বৃদ্ধ লোকটি বললেন- আগে অন্য জায়গায় ছিলাম। আমি কম্পোজার। প্রেসে কম্পোজের
কাজ করি। ডিজিট্যাল মেসিন আসার পর থেকে আমরা অকেঁজো হয়ে গেছি, মা। আমাদের আদর কমে গিয়েছে। সবাই এখন ডিজিট্যাল মেসিনে ছাপা করতে চায়।
তাই মালিক আমাদের মায়না কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ছিলাম সেখানে ভাড়া বেশি
ছিলো। মায়না কমিয়ে দেওয়াতে সেসব রোমের ভাড়া দিতে পারি না। তাই এই সস্তার রোমে
আছি।
এখানে দেখছি অন্য রকমের কিছু কাজ হয়। এখানে থাকতে আপনাদের অসুবিধা হয় না, চাচা?
অসুবিধা হলেই কি করব? বৃদ্ধ বললেন- যার যে রকম মুরোদ সেরকম রোমেই
তো থাকতে হবে।
এখানে যে কাজগুলো হয়, তাতো সমাজ বিরোধি বটেই, দৃষ্টিকটুও বটে। এসব নিয়ে আপনারা মালিকের কাছে অভিযোগ করেন না?
বৃদ্ধ বললেন- তুমি আমার নাতনির বয়সই। তোমাকে আর কি বলব, মা। বেড়ায় যদি খেত খায়, তখন বেড়া
দিয়ে কি লাভ হবে? মালিকের বয়স একটু বেশি। বাড়িতে বউ আছে
যদিও বউ দিয়ে তার সুখ নেই। তার আবদার মেটাতে পারে না। তাই সে মাঝে-মধ্যে এসে
শুকুরজানের সাথে স্ফূতিটুর্তি করে। রেজিয়ার রোমে মাঝে-মধ্যে একটি ছেলে আসে।
ছেলেটি প্রেসে কাজ করে। দেখছ না, এক রোমে তিনজন থাকার অনুমতি
থাকা সত্ত্বেও সবাই আলাদা আলাদা রোম নিয়ে আছে। এর মানে কী? অন্যান্য
ভাড়াটেরাও সব বুঝতে পারে, তবে প্রতিবাদ কেউ করে না। কারণ
প্রতিবাদ করলে এখানে থাকা সম্ভব হবে না। তাই, যে যা করে করুক,
এ ভাবে ভেবে সবাই মুখ বুজে পড়ে থাকে। সবার মনেই ভাব, ভালো কামাই রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারলে অন্যত্র চলে যাবে। কেউ কেউ যায়ও। দু’টি পরিয়াল ছেলেমেয়ে নিয়ে ছিলো। এখানকার
অবস্থা দেখে তারা এক মাস আগে অন্যত্র চলে গেছে। আমিও আর মাত্র দু'দিন আছি। তারপর চলে যাব।
মানে? আমিনার কন্ঠ অস্বাভাবিকরূপে কেঁপে উঠলো।
তার নিজের কানেই যেন বিশ্রী শোনাল কন্ঠস্বর। কারণ বৃদ্ধ লোকটি আছে বলে আমিনা
নিশ্চিন্তে আছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বৃদ্ধের সাথে সে মোটামুটি ভাব জমিয়ে ফেলেছে।
দেখা হলে সেও ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করে, লোকটিও তার খোঁজখবর
নেয়। কত বিপদ আপদ আছে! ছেলে দু'টিকে এখন পর্যন্ত আনা হয়নি।
ছেলে দু'টিকে আনলে বাজার টাজার করতে গেলে বৃদ্ধের কাছে রেখে
যেতে পারবে ভেবেছিলো। লোকটি শারীরিকভাবে সহায় করতে না পারলেও পরামর্শ তো দিতে
পারবে? তাই বৃদ্ধ লোকটি চলে যাওয়ার কথা শুনে সে একটু
নার্ভাস বোধ করছিলো। তাই সম্ভবতঃ তার কন্ঠস্বর কেঁপে উঠছিলো।
মা, বয়স হয়েছে। ছেলেরাও কাজের উপযুক্ত
হয়েছে। এদিকে প্রেসে কাজও তেমন নেই, তাই একেবারে বাড়ি চলে
যাব। তবে সবাই খারাপ নয়। রেজিয়া এবং শুকুরজানের দুর্নাম আছে। তুমি তো আর কচি
খুকি নও, কিছুদিন থাকলে সবই টের পাবে। কিজানি ইতিমধ্যে টের
পেয়েই গেছ।
রেজিয়া এবং শুকুরজানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে রাখি-
আমিনার চাচাতো বোন রেজিয়া। তাকে চৌদ্দ পনের বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলো
মন্দিয়ার চাচরার একটি ছেলের সাথে। ছেলেটি অবশ্যে ভালো ছিলো। সে সবজির ব্যবসা করতো।
একটি ছেলে জন্মের পরে সে একদিন সবজি আনতে গিয়ে মটর এক্সিডেন্টে মারা গেছে। স্বামী
মারা যাওয়ার পরে রেজিয়া ছেলেটিকে নিয়ে কিছুদিন স্বামীগৃহেই ছিলো। ভরযৌবনা
অন্যান্য বিধবাদের ক্ষেত্রে যা হয়, তার
সাথেও তাই হলো। পাড়ারই একটি ছেলের সাথে তার অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক গঢ়ে উঠল।
ছেলেটির সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে সে যৌবন জ্বালা চরিতার্থ করতে লাগল।
চোরের সাতদিন, সাধুর একদিন। একদিন তারা ধরা পড়ল। তখন
গ্রামের লোকেরা সেই ছেলেটির সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিলো। দুই বছর ঘর-সংসার করার পরে
ছেলেটি বাড়ি ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গেছে। অনেক সন্ধান করেও তার কোনো হদিশ মেলেনি।
অনেকে ভাবে, সে দিল্লী অথবা লক্ষ্ণৌতে গিয়ে বিয়ে করে
ঘর-সংসার করছে। তার প্রথম পক্ষের ছেলেটি এখন তার আগের শশুড়ের সংসারে
আছে।
শুকুরজানের ইতিমধ্যে দু'টি বিয়ে হয়েছে। তার
প্রথম বিয়ে হয়েছিলো তাদের পাড়ারই একটি বাউন্ডুলে ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়ে।
দুবছর পরেই ছেলেটি তাকে ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গিয়েছে। বাপ-মায় পসন্দ করে দ্বিতীয়
বিবাহ দিয়েছিলো তাদের পাড়ারই একটি বৃদ্ধের সাথে। বৃদ্ধের আগের পক্ষের ছেলে-মেয়ে
ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে ছেলে-মেয়েদের আপত্তি সত্ত্বেও বৃদ্ধ
শুকুরজানকে বিয়ে করেছিলো। দু’বছর আগে বৃদ্ধ মারা গেছে।
বৃদ্ধ মারা যাওয়ার পরে আগের পক্ষের ছেলেরা শুকুরজানকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে
দিয়েছে। তার কোনো সন্তান নেই।
তিন দিন পরে ছেলে দু’টিকে আনার কথা ছিলো যদিও তারেক মৃদার ভয়ে
আমিনা বাড়ি যেতে সাহস পায়নি। তার বাপের যে স্বভাব, আবারও
গৃহবন্দিও করতে পারে! এক মাস পরে খবর পেল তারেক মৃদা চিল্লায় গেছে। সেই সুযোগে
আমিনা বাড়ি গিয়ে ছেলে দু’টিকে নিয়ে এসেছে।
আশ্রাবকে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দিলো। মাসিক চারশ টাকা করে মায়না
দিতে হবে। ফিরদুসকে আশ্রাবদের স্কুলের পাশেই একটি অঙ্গনবাদি কেন্দ্রে ভর্তি করে
দিলো।
আমিনা বাড়ি থেকে আসার সময় তিন হাজার টাকা নিয়ে এসছিলো। হাঁড়ি-পাতিল এবং
এ-টা ও-টা কিনতে এক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। রাজার গোলা ঝিনুই দিয়ে কেটে খেলেও ফুরিয়ে
যায়। দুই হাজার টাকা দিয়ে সে আর কয়দিন চলতে পারবে!
তাই আমিনা একদিন সেলিমকে বলল- সেলিম ভাই, তোমাকে
তো বলেছি, আমি কীভাবে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। এদিকে আমার কাজও
শেখা শেষ হয়নি। ব্লাউজ, পেটিকোট সেলাতে পারি। তাই আমার বলতে
লজ্জাও করছে। তবে, পেটে ভাত না থাকলে তো আর লজ্জা করলে চলে
না। ঘরভাড়া, ছেলেদের স্কুলের খরচ এবং তিনটি প্রাণীর ভাতের
খরচ। মাসে কমেও চার হাজার টাকা করে খরচ হবে। তুমি যদি মাসিক কিছু টাকা দিতে,
তাহলে খুবই উপকার হতো।
সেলিম বলল- আমি আর তোমাকে কত দিতে পারব। বড়জোর দুই হাজার টাকা করে দিতে পারব।
এর বেশি বর্তমান দেওয়া সম্ভব হবে না। আমার ব্যবসাও বর্তমান ভালো না। বাজারে ঢের
রেডিমেড সার্ট লংপেন্ট উঠেছে। সস্তায় পেয়ে সবাই রেডিমেড সার্ট লংপেন্ট পড়তে
শুরু করছে। মনে হয়, আমাদের মতো দর্জিদের ভাত মারা যাবে!
আমিনা হতাশ কণ্ঠে বলল- দুই হাজার টাকা দিলে আমি চলব কেমনে?
সেলিম বলল- আমি তার কি জানি। আমি যা দিতে পারব তাই বললাম। এখন তোমার কথা তুমি
বুঝবে। একটু তাড়া আছে। এখন এক জায়গায় যেতে হবে। পরে কথা বলব।
সেলিম দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। আমিনা উদাসভাবে সেলিমের
গন্তব্য পথের দিকে চেয়ে রইল।
ছয়
সেদিন দোকান থেকে রুমে ফিরতে আমিনার একটু দেরি হলো। বাজার করার ছিলো। দোকান
থেকে সোজা-সুজি সে মুদির দোকানে গিয়েছিলো। চাল, ডাল,
লবন, মরিচ কেনার জন্য। সে বাড়ি এসে দেখে,
ছেলে দু'টি বারান্দায় খেলছে। তাকে দেখেই ছেলে দু'টি দৌড়ে তার কাছে এলো। সে জিজ্ঞাসা করল- তোদের রেজিয়া মাসি রোমে আসেনি?
বড় ছেলে আশ্রাব বলল- রেজিয়া মাসি এসেছে। শুকুরজান মাসি এখনও আসেনি।
আমিনা ভেনিটি ব্যাগ থেকে দু'টি চকলেট বের করে
ফিরদুসের দিকে এগিয়ে ধরে বলল- ধর, চকলেট নে।
ফিরদুস বলল- এইমাত্র চকলেট খেয়েছি। এখন রেখে দাও, পরে খাবো।
আমিনা একটু বিস্মিত কণ্ঠে বলল- চকলেট খেয়েছিস মানে? কোথায় পেলি?
ফিরদুস আমতা আমতা করে বলল- যে লোকটি মাঝে-মধ্যে রেজিয়া মাসির সাথে দেখা করতে
আসে, সেই দিয়েছে।
আমিনার কপালে একটি ভাঁজ পড়ল। সে বুঝতে পারলো কে দিয়েছে চকলেট! নিশ্চয়ই
আলতাব হবে। আমিনা লক্ষ্য করছে, আলতাব কয়েক দিন ধরে
তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে। রেজিয়ার রোমে ঢুকলেও চোখ-কান থাকে তার রোমের
দিকে। মুখ খোলে এখন পর্যন্ত অবশ্যে কোনো কথা বলেনি। তবে, কিছু
বলতে চায়, এমনি ভাব প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে তার হাব-ভাবে। সে
তেমন গুরুত্ব দেয়নি বলে কোনো কথা বলার সাহস পায়নি। তাই সে হয়তো প্রথমে ছেলেদের
সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে।
আমিনা বলল- কেন, তোকে চকলেট দিলো কেন?
ফিরদুস বলল- কেন দিয়েছে, আমি কি জানি। আমি
নিতে চাইছিলাম না। জোর করে দিয়ে গেল।
আমিনা উপদেশের সুরে বলল- লোকের দেওয়া জিনিষ এ ভাবে আর কোনোদিন নিবি না।
আজ-কাল কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। কে কী মতলব নিয়ে আসে কে জানে! ছেলেধরার কথা
শুনিস নি? ছেলেধরারা আগে চকলেট দিয়েই ভাব জমায়।
তারপরে বস্তায় ভরে নিয়ে যায়।
ছেলেদের এ ভাবে উপদেশ দিয়েই আমিনা রোমে ঢুকে জিনিস পত্রগুলি সাজিয়ে রেখে
রেজিয়ার রোমে ঢুকল। রেজিয়া বিছানায় শুয়ে ছিলো। সে বলল- রেজিয়া আপা, আজ অত সকালে রোমে এসেছ? শরীর খারাপ
না-কি?
রেজিয়া বলল- না, শরীর খারাপ না। কাজের চাপ কম, তাই এসেছি।
আজ আলতাব ভাই এসেছিলো না-কি? আমিনা জিজ্ঞাসা করল।
এসেছিলো। রেজিয়া বলল- ওদের প্রেস আজ সকাল সকাল বন্ধ করেছে। মালিকের ছেলের আজ
জন্মদিন।
আমিনা বলল- আলতাব ছেলেদের চকলেট দিয়েছে। এ ভাবে চকলেট দিলে ওদের স্বভাব খারাপ
হয়ে যাবে। আর যাতে না দেয় বলে দিও।
আদর করে দিয়েছে। তাতে কি হয়েছে?
ওর মতলব আমি বুঝতে পারি, আপা। আসলে ছেলেদের
প্রতি ওর দরদ না-- দরদ আমার প্রতি।
রেজিয়া কথা বাড়াল না। বলল- ঠিক আছে, আমি
তাকে বলে দিব। রেজিয়া কথার প্রসংগ পাল্টিয়ে বলল- আজ তোর মায়নার কথা বলবি,
বলেছিলি। কি হল?
বলেছি। তবে, দুই হাজার টাকার বেশি দিতে পারবে না বলেছে।
আমিনা নিজের অসুবিধার কথা জানালো- দুই হাজার টাকা দিয়ে কেমনে চলব, বল তো?
দুই হাজার টাকা দিয়ে চলাটা খুবই কঠিন হবে। মাসে কমেও পাঁচ হাজার টাকা করে
লাগবে। টেনে-টুনে চললেও চার হাজারের কমে হবে না। অন্য কোনো দোকানে দিয়ে দেখ। বেশি
পেলে পেতেও পারিস।
কাজই শিখিনি। আমিনা বলল- কে আমাকে রাখবে?
রেজিয়া বলল- কয়টা বাজায় তোদের দোকান খোলে?
দশটা বাজায়।
তুই এক কাজ কর। রেজিয়া বলল- আমি যে দোকানে কাজ করি তার সামনে পাণ-তাম্বুলের
দোকান আছে যদিও সে দশটা বাজার আগে আসে না। প্রতিবন্ধিতো! পা দু'টো নুলো। লাঠি নিয়ে চলাফেরা করে। আসতেও হয়
দূর থেকে। তুই সকালে সেখানে পাণ-তাম্বুলের দোকান করে দশটা বাজায় তোর কাজে যেতে পারবি। অবশ্যে কিছু চালান
লাগবে। একটা টেবিল এবং কিছু মালপত্র তুলতে হবে। পাণ-তাম্বুল, সাদা সিগারেট প্রভৃতি আর কি। তোর হাতে বর্তমান কত টাকা আছে।
এই ধর, দেড় হাজারের মতো।
দেড় হাজার লাগবেই না। টেবিল কিছুদিন পরে
কিনলেও হবে। আমি মহাজনকে বলে টেবিলের ব্যবস্থা করে দিব।
কিন্তু আমার রান্না-বান্না, ছেলেদের স্কুল?
সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। রেজিয়া বলল- আমাদের দোকানে ভাতের ব্যবস্থা হয়।
সেখানে তোদের জন্যও চাল ধরে দিব। অবশ্যে এর জন্য কিছু আলাদা টাকা ধরে দিতে হবে। সে
আমি মহাজনের সাথে আলোচনা করে ঠিক করে দিব। তাহলে সকালের খাওয়াটা ওখানেই করতে
পারবি। রাতের রান্না নিজে করলেই হলো।
সকাল আটটায় ছেলে দু'টিকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। কে নিয়ে যাবে?
সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। রশিদ সহরে অটো চালায়। আগে এখানেই ভাড়াঘরে থাকতো। এক
টুকরো জমি কিনে এখন সেখানে একটা ছাপড়া তোলে থাকে। তাকে বললেই সে ওদের স্কুলে
নিয়ে যাবে। রশিদ শিক্ষিত বি, এ পাস। ভালো ছেলে।
তাকে টাকা দিতে হবে না?
অবশ্যেই দিতে হবে।
টাকা কোথায় পাব?
পাণ-তাম্বুলের দোকান করলে মাসে কমেও তিন হাজার টাকার মতো ইনকাম হবে। রশিদকে
মাসে পাঁচশ টাকা দিলেই হবে। কাল সকালে গিয়ে মহাজনের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করব। আজ
অনেক রাত হয়েছে। মহাজন মনে হয়, দোকান বন্ধ করে চলে
গেছে। কাল সকালে বেরোবি আমার সাথে।
সাত
পরের দিন সকালে আমিনা এবং রেজিয়া দোকানে এসে মহাজনের সাথে দেখা করল।
মহাজনের নাম কলিমুদ্দিন। বাড়ি বহরির দিকে কোন একটি চড়ে। আগে অবশ্যে সরজমিনই
ছিলো। আশির দশকে ব্রহ্মপুত্র নদে তাদের ঘর-বাড়ি ভেঙে নিয়েছে। নদী ভাঙার পরে
আশ্রয় হারিয়ে সে পরিয়াল-পরিজন নিয়ে নাগালেন্ড গিয়েছিলো। সেখানে সে আট বছর
ছিলো। এই আট বছরে চড়া পড়ে তাদের জমিগুলো জেগে উঠেছিলো। জমি জেগে উঠার সংবাদ
পেয়ে সে নিজের গ্রামে এসে বাড়ি-ঘর করে হাতে জমানো টাকা দিয়ে সহরে এসে চায়ের
দোকান খোলেছে। দোকান ভালোই চলে। রোজগারও মোটা-মুটি ভালো। সে নিজেও এক সময় পরের
গোলামী করেছে। তাই পরের দুঃখ বুজে। সে কর্মচারিদের সাথে ভালো ব্যবহার করে।
অন্যান্য দোকানীর চেয়ে মায়নাও বেশি দেয়। তাই তার কর্মচারির অভাব হয় না।
কলিমুদ্দিন ক্যাশে বসেছিলো। রেজিয়া দোকানের কারিগর। দোকানের যত খাবার জিনিস
রেজিয়াই প্রস্তুত করে। তাই রেজিয়ার কদর বেশি। অন্যান্য কর্মচারিদের চেয়ে মায়নাও বেশি দেয় এবং সে একটু বেলা করেও আসে।
কারণ রেজিয়া আগের দিন রাতেই দোকানের সব খাবার জিনিস প্রস্তুত করে দিয়ে যায়।
রেজিয়ার চেয়ে কলিমুদ্দিন বয়সে অনেক বড় যদিও রেজিয়াকে আপা বলে ডাকে। তাই
রেজিয়াকে সকাল সকাল আসতে দেখে কলিমুদ্দিন বলল- রেজিয়া আপা, আজ এত সকালে কেন? কোনো অসুবিধা হয়েছে
না-কি?
রেজিয়া ক্যাশের কাছে এসে বলল- না, কোনো
অসুবিধা হয়নি। একটা প্রয়োজনে এলাম।
কলিমুদ্দিন কৌতূহলী হয়ে উঠল। বলল- প্রয়োজন? কি
প্রয়োজন?
রেজিয়া বলল- অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? বলব
বলেই তো এসেছি। চা খেয়েছেন নাকি?
কলিমুদ্দিন বলল- না, এখনও খাইনি। এই খাব আর কি।
রেজিয়া কোনো কথা বলল না। সে ‘কিসেন
রোম’ থেকে একটি ট্রে’তে করে তিন কাপ চা
নিয়ে এলো। এক কাপ আমিনাকে দিয়ে ট্রে’টা ক্যাশ টেবিলের
উপড়ে রাখল। তারপর কলিমুদ্দিনের দিকে এক কাপ বাড়িয়ে দিয়ে নিজে কাপ হাতে নিয়ে চুমুক
দিয়ে বলল- নতুন ছেলেটা চা কিন্তু ভালো বানায়।
কলিমুদ্দিন তার কথায় সায় দিয়ে বলল- মন্দ বানায় না। তার বানানো চাহ খেয়ে
কেউ কোনোদিন আপত্তি করে না। এখন কাজের কথা বল।
রেজিয়া বলল- সিদ্দিক কোনোদিন ন'টার আগে
আসতে পারে না। কোনোদিন দশটাও বেজে যায়।
কী করব, বল। প্রতিবন্ধি লোক। অনেক দিন ধরে আছে। তাই
না-ও করতে পারিনা। আগে সকালে এসেই দোকান খোলত। এখন বয়স হয়েছে। এ-টা ও-টা রোগ
লেগেই থাকে। তাই সকালে আসতে পারে না। সে জন্য খুবই অসুবিধা হয়। সকালের গ্রাহক
অন্য দোকানে গিয়ে বিড়ি সিগারেট খায়। তার জন্য দুই একজন গ্রাহক আপত্তিও করে।
সকালের অনেক গ্রাহক এই অসুবিধার জন্য অন্য দোকানে চা খায়। এর জন্য আমার ব্যবসারও
ক্ষতি হয়।
আমি এর ব্যবস্থা করতে চাইছি।
কলিমুদ্দিন ব্যবসায়ী লোক। ‘ম’ বললেই মকিমপুড় বুঝে ফেলে। নিশ্চয় রেজিয়া লাভের কথাই বলবে। তাই সে
কৌতূহলী হয়ে বলল-ব্যবস্থা, মানে? কি
ভাবে?
আমিনা একটু দূরেই একটি টেবিলে বসে চা খাচ্ছিল। আমিনাকে দেখিয়ে রেজিয়া বলল-
সকালে ও-ই দোকান করবে।
কিন্তু সিদ্দিকের কি হবে? সে প্রতিবন্ধি লোক।
তাকে দোকান থেকে ছাড়িয়ে দিলে তাদের সংস্থার লোক এসে আমার দোকান বন্ধ করে দিবে।
তাকে ছাড়াতে যাবেন কেন। রেজিয়া বলল- সে আগের মতই আগের সময়ে এসে দোকান করবে।
সে না আসা পর্যন্ত ও-ই মেয়েটি দোকান করবে। মেয়েটি আমার চাচাতো বোন। স্বামী
থাকতেও স্বামী ছাড়া। বাবা-মার সংসারে আছে। বাড়িতে নানানটা অসুবিধার জন্য বাড়ি
থেকে চলে এসেছে। আমাদের সাথেই মেসে থাকে। এখানে দর্জি কাজ শিখছে। দু'টি ছেলেও আছে। কাজ শেখা হয়নি বলে
মায়না দেয় না। এখন ছেলে দু’টি নিয়ে চলে কীভাবে বলুন? তাই আমি এই
বুদ্ধি দিয়েছি।
কলিমুদ্দিন বলল- আমি সকালের জন্য এরকমই একজন লোক খোঁজছিলাম। কিন্তু করতে পারবে
কি? অভ্যেস আছো তো দোকান করার?
রেজিয়া বলল- আমার বিশ্বাস করতে পারবে। পুরুষরা যে কাজ এক বছরে শিখে, মেয়েরা সে কাজ দু'দিনেই শিখতে পারে
ইচ্ছে করলে।
কলিমুদ্দিন বলল- নাগাল্যান্ডে তো মেয়েরাই দোকান করে। পুরুষগুলো পা-র ওপড়ে পা
রেখে বসে বসে খায়।
রেজিয়া হাত ইশ্বারায় আমিনাকে ডাকল- আমিনা এ দিকে আয় তো।
আমিনা ক্যাশের কাছে এসে দাঁড়াল। কলিমুদ্দিন বলল- তোমার বিষয়ে রেজিয়া আপা সব
কিছু খোলে বলেছে। তুমি কি দোকান করতে পারবে?
আমিনা বলল- আপনি বুঝিয়ে-সুজিয়ে দিলে নিশ্চয় পারব।
তোমার তো কিছু চালানেরও দর্কার হবে। পাণ-বিড়ি-সিগারেট এবং অন্যান্য কিছু
মালপত্রও রাখতে হবে। একটা টেবিলও কিনতে হবে। চালান আছে কি?
আমিনা বলল- কিছু মালপত্র কেনার মতো টাকা অবশ্যে আছে। কিন্তু টেবিল কিনতে হলে
অসুবিধা হবে।
রেজিয়া বলল-মহাজন, গুদাম ঘরে একটি টেবিল এমনি পড়ে আছে। সেটি যদি দেন...
কলিমুদ্দিন বলল- দেখগে। যদি ব্যবহার করতে পার, আমার কোনো আপত্তি নেই।
আমিনা আমতা আমতা করে বলল- কিন্তু ভাড়া কত করে দিতে হবে। বললে ভালো হয়। লোকে
বলে, আগের ব্যাজারই ভালো, পরের
ব্যাজার ভালো নয়।
কলিমুদ্দিন বলল- তুমি রেজিয়া আপার বোন, মানে
আমারও বোন। বলতে পার, রেজিয়া আপার জন্যই আমার দোকানটা টিকে আছে।
তুমি আগে শুরু কর। যদি টিকতে পার তখন দেখা যাবে। প্রয়োজন হলে আমি কিছু টাকা
দিয়েও তোমাকে সহায় করতে পারব।
কলিমুদ্দিনের সাথে আলোচনার পরে ওরা বাজারে গিয়ে দোকানের জন্য প্রয়োজনীয়
জিনিসপত্র কিনে রোমে ফিরল। রোমে ফেরার পথে রশিদের সাথে দেখা হলো। তার সাথে ছেলে দু’টিকে আনা-নেওয়া করার জন্য ভাড়াও ঠিক করল। মাসে পাঁচশ টাকা করে
দিতে হবে। ছেলে দু’টিকে বাড়ি থেকে সকাল বেলা নিয়ে যাবে এবং
স্কুল ছুটির পরে বাড়িতে দিয়ে যাবে।
আট
আমিনা বাড়ি থেকে চলে যাবার পর থেকে তারেক মৃদা মনে মনে গুম মেরে আছে। ভাব, তার মেয়ে সহরে গিয়ে ঘর ভাড়া করে আছে তার আপত্তি সত্বেও। সে
গুম মেরে থাকার রহস্য এখানেই। আগে নামাজ পড়া নিয়ে ছেলে এবং বউদের সাথে চোট-পাট
করত। এখন সে চোট-পাটও বন্ধ হয়ে গেছে। নিজের মেয়েকেই শাসনে রাখতে পারে না, ছেলে-ছেলের
বউদের কোন মুখে তাগিদা দিবে নামাজ পড়ার জন্যে!
তারেক মৃদার গলাটা একটু চওড়া। তাই কথা বললে জোরে জোরেই বলে। কোনো লুক-ঢাক
নেই। ছেলে-বউদের সাথে প্রয়োজন ছাড়াই আগে চোট-পাট করত। পথচারিরা সেই চোট-পাট
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনত। কিন্তু এই কয়দিন যাবত সেই চওড়া গলার আওয়াজ কেউ শুনতে
পায় নি। তাই অনেকে বলাবলি করে- তারেক মৃদার গলার আওয়াজ শুনতে পাই না। কারণ কি? চিল্লাতে চিল্লাতে গলায় কেন্সার হলো না-কি?
পরচর্চা করাটা আমাদের সমাজের একটা পরম্পরা। কোনো মুখরোচক কথা শুনতে পেলে
তিলটাকে তালটা বানিয়ে ফেলতে সময় লাগে না। যারা এই গুম মেরে কার । জানে, তারা প্রকৃত ঘটনা না জেনেই বলে- কেন্সার হয়নি। মুসুল্লির
মেয়ে সহরে গিয়ে ঘরভাড়া করে আছে। শুনেছি, দেহ ব্যবসা করে।
তাই গলার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে।
এক মাস পরে আবার তারেক মৃদা সক্রিয় হয়ে উঠল। সেদিন ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ
থেকে আসার পথে পশ্চিম পাড়ার হাবু মিয়ার সাথে দেখা। হাবু সহরে রিক্সা চালায়।
হাবু মিয়া একটু চাপা স্বভাবের লোক। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। তারেক মৃদার সাথে
তার পারিবারিক সম্পর্ক আছে। তারেক মৃদার বোনের বিয়ে হয়েছে হাবু মিয়ার শালার
সাথে। অভাবী লোক। টানে আপদে তারেক মৃদার কাছে সহায় চেয়ে আসে। তারেক মৃদা হাতে
টাকা পয়সা থাকলে কোনোদিন না করে না। লেন-দেন ভালো। সময় মতই ধার দেনা পরিশোধ করে।
তাগিদা দিতে হয় না। টাকা পয়সা ধার দিয়েই তো লোক চিনতে হয়। যার লেনদেন ভালো
তাকে ভালো লোক বলা যায়। শুধু লেনদেনের ক্ষেত্রেই নয়, হাবু মিয়া আসলেই ভালো লোক।
হাবু মিয়াকে দেখে তারেক মৃদা বলল- আজ অত সকালে? সহরে
যাচ্ছ নাকি?
হ্যাঁ, সহরেই যাচ্ছি। বাড়িতে কাজ নেই, সকাল বেলা গেলে ভাড়া পাওয়া যায়। পিলপিলি হওয়ার পর থেকে রিক্সার ভাড়া
কমে গেছে। সকালে পিলপিলি থাকে না, তাই সকাল সকাল গেলে ভালোই
ভাড়া পাওয়া যায়।
তা ভালো। চায়ের দোকানে বসে বসে গল্প করার চেয়ে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ভালো।
হাবু মিয়া বলল- তাউই, রিক্সায় ওঠেন। যেতে যেতে কথা বলি।
তারেক মৃদা রিক্সায় ওঠতে গেল। রিক্সায় সদ্য ওপড়ানো মূলা এবং কবি ছিলো।
এইমাত্র মনে হয় পালান থেকে তোলে এনেছে।
তারেক মৃদা রিক্সায় উঠে বলল- টাটকা মূলা কবি দেখছি। তোমার পালানের নাকি?
না, আমার পালানের না। মধু মিয়ার পালান থেকে
এইমাত্র তোলে আনলাম।
মধু মিয়া কিন্তু খুব পরিশ্রমী। সবজির খেত করে ভালোই পয়সা কামাই করতেছে।
পালানে পয়সা আছে তাউই। তবে, খুব পরিশ্রম করতে
হয়। ধান কালাইর চেয়ে সবজিতেই বেশি ইনকাম।
এগুলো তুমি সহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রী কর নাকি? প্রশ্নটা
করেই তারেক মৃদা মন্তব্য করল- বিক্রী করতে পারলে অবশ্যে ভালোই। দু’পয়সা বাড়তি আয় হবে।
আসলে হাবু মিয়া সবজিগুলো বিক্রী করতে আনে নি। সবজি এনেছে আমিনার জন্যে। কিন্তু আমিনার কথা বলতে তার দ্বিধাবোধ হলো। কারণ সে জানে, আমিনার সাথে বর্তমান তারেক মৃদার সম্পর্ক ভালো না। তারেক মৃদা
আমিনার নামই শুনতে পারে না বলে সে শুনেছে। সেজন্য সে আমতা আমতা করে বলল- না তাউই,
বিক্রী করি করতে আনিনি।
বিক্রী করতে আননি। তবে কি জন্য এনেছ?
হাবু মিয়া দেখলো, এখন আর মিথ্যে কথা বলা সম্ভব হবে না। তাই সে
সত্যি কথাই বলল- আমিনার জন্য নিচ্ছি। সহরে টাটকা সবজি পাওয়া যায় না, তাই মাঝে-মধ্যে আমাকে দিয়ে কিনিয়ে নেয়।
আমিনার কথা শুনে তারেক মৃদার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আমিনা বাড়ি থেকে যাওয়ার
প্রায় চার মাস হলো। এই চার মাসের মধ্যে আমিনার কথা সে ভুলেও মুখে আনে নি।
বাড়িতেও কেউ তার সামনে আমিনার কথা আলোচনা করে না। অবশ্যে আমিনার কথা মনে যে পড়ে
না তা নয়। হরদমই মনে পড়ে। মেয়েটা আসলে একটু জেদি। যা মনে করে, তা করতে না পারলে অস্থির হয়ে উঠে। লেখা-পড়ায়ও ভালো ছিলো।
বি, এ, এম,এ পাস
করতে পারত বিয়ে না দিলে। আমিনা বিয়ে বসতে চাইছিল না। তার পড়ারই ইচ্ছা ছিলো। তখন
তার মাথায় কি ভূত চেপেছিলো, আফসের ফকিরের পাল্লায় পড়ে
অল্প বয়সেই মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিলো! আমিনার কথা তো মনে পড়েই, সেই সাথে নাতি দু’টির কথাও মনে পড়ে। ফুটফুটে দু'টি নাতি। তার সাথে খুব ভাব ছিলো নাতি দু’টির। সেজন্য
সে নাতি দু’টিকে বাড়িতেই রাখতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে
বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে আমিনা এসে নাতি দুটিকে নিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে নিয়ে
যাওয়ার পরে নাতি দু’টির সাথে তার দেখা হয়নি। নাতি দু’টির জন্য মনটা কোনো কোনো সময় হাহাকার করে উঠে। সেজন্য সে একটু নিন্মস্বরে বলল- নাতি দু’টির সাথে দেখা হয় না-কি? তাদের স্কুলে
ভর্তি করে দিয়েছে কী?
হাবু মিয়া বললো- হ্যাঁ, দিয়েছে। ভালো স্কুলেই দিয়েছে। সহরের
নামকরা স্কুল। ওদের রুমে গেলে তো দেখা হয়-ই, মাজে-মধ্যে
স্কুলের সামনে দিয়ে যেতেও খেলতে দেখি। খুবই ফিটফাট হয়েছে। একেবারে সহুরে হয়ে
গেছে। আপনি দেখলে চিনতেই পারবেন না।
ভালো করেছে। তারেক মৃদা বলল- তুমি বললে, ভালো
স্কুল ! সেখানে পড়াতে তো অনেক টাকা লাগবে। কাপড় সেলাই করে আর কত টাকা উপার্জন
করে! ঘরভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, এর ওপড়ে
আবার ছেলেদের পড়ার খরচ! এত টাকা পায় কোথায়?
আমিনার বুদ্ধি আছে। সে তো আর আমাদের মতো মূর্খ নয়। সে উপায় সে করে ফেলেছে।
উপায় মানে? তারেক মৃদা সজাগ হয়ে উঠল। সহরে অনেক
মেয়েরা বোলে অনেক রকম ধান্দা করে। আমিনা সে রকম কিছু করছে না তো! সেজন্য উপায়টা
জানার জন্য তারেক মৃদা উদগ্রীব হয়ে উঠল। বলল- কি উপায় করেছে?
হাবু মিয়া বলল- সে সকালে একটি চায়ের দোকানের সামনে পাণ-তাম্বুলের দোকান করে।
ন'টা পর্যন্ত দোকান করে এবং সাড়ে ন'টায় গিয়ে দর্জি কাজ করে।
তাম্বুলের-পাণের দোকানের কথা শুনে তারেক মৃদার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তাম্বুল
পাণের দোকান! সেও আবার চায়ের দোকানের সামনে। কত রকম লোক আসে চায়ের দোকানে।
মেয়েটা তার মান-সন্মান আর রাখল না। দর্জি কাজ তবু ঘরের ভেতর থেকে করে। আব্রু বাঁচিয়ে
করতে পারে। কিন্তু খোলামেলা জায়গায় চায়ের দোকানের সামনে তাম্বুল-পাণের দোকান!
ইতিমধ্যে রিক্সা তারেক মৃদার বাড়ির সামনে এসে গেলো। হাবু মিয়া বলল- তাউই, এসে গেছি। নামেন।
তারেক মৃদা বাড়ি এসে ফুল খাতুনকে ডেকে বলল- শুনেছ, আমিনা কি করছে? সে বোলে তাম্বুল পাণের
দোকান করে চায়ের দোকানের সামনে।
ফুল খাতুন আগে থেকেই জানে দোকান করার কথা। দোকান দেওয়ার পরেই একদিন আমিনা এসে
বলে গেছে কথাটা। মালপত্র তোলার জন্য ফুল খাতুন দুই হাজার টাকাও দিয়েছে আমিনাকে।
বলতে গেলে বাড়ির সবাই জানে দোকানের কথা। তারেক মৃদার মেজো ছেলে আজমত সহরে পিলপিলি
চালায়। তার সাথে আমিনার সব সময়ই দেখা হয়। মাজে-মধ্যে সে আমিনার বাজারও করে দেয়।
ছেলের বউরাও জানে কথাটা। একমাত্র তারেক মৃদাই জানত না কথাটা।
তবুও কিচ্ছু জানে না এমন ভান করে বলল- তাই নাকি? কার
কাছে শুনলে?
হাবু মিয়ার কাছ থেকে শুনলাম। তারেক মৃদা আক্ষেপের সুরে বলল- মান-সন্মান বুজি
আর রইল না আমার।
এখন কি করবে ভেবেছ?
কি আর করব। বেড়ায় যখন খেত খায় তখন আর করার কী থাকে? মেয়েটা একেবারে হাতের বাইরে চলে গেছে। ভাত হলে বাড়, আমি সহরে গিয়ে দেখতে চাই সে কেমন দোকান করছে।
সহরে এসে তারেক মৃদা খোঁজে খোঁজে আমিনা দোকান করা চায়ের দোকানে এলো। আমিনা
তখন দোকানে নেই। দর্জির কাজে চলে গেছে। তারেক মৃদাকে দেখে রেজিয়া এগিয়ে এসে
জিজ্ঞাসা করল- কাক্কু, কি মনে করে?
তারেক মৃদা নিন্মস্বরে বলল- আমিনা কই? সে বোলে
এখানে তাম্বুল পাণের দোকান করে?
রেজিয়া বলল- হ্যাঁ, করে। তবে সেই সকাল থেকে ন'টা এবং সন্ধ্যে ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। সকাল দশটা থেকে দর্জি কাজ করে।
তারেক মৃদা বলল- দর্জি কাজ বাদ দিয়ে আবার পাণ-তাম্বুলের দোকান কেন? এখানে দোকান করলে মান-সন্মান থাকবে কি?
রেজিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল তারেক মৃদার কথা শুনে। বলল- কেন, মান-সন্মান থাকবে না কেন? সে তো কোনো
অন্যায় কাজ করছে না। দোকান করছে। এখানে আবার
মান-সন্মানের কথা এলো কোথা থেকে?
তারেক মৃদা চাপাস্বরে বলল- আরে, আস্তে বল।
লোকে শুনবে। জানই তো আমি নামাজি লোক। লোকে আমাকে মুসুল্লি বলে ডাকে। আমার মেয়ে
দোকান করবে। লোকে কি বলবে?
কাক্কু, এখন দুনিয়াটা অনেক বদলে গেছে। এখন মেয়েরা
ঘোমটা টেনে বসে থাকার যুগ আর নেই। মেয়েরা আজকাল গাড়ি-মটর, উড়ো
জাহাজ চালাচ্ছে। সেনা বাহিনীতে কাজ করছে। আমিনা তো সামান্য দোকান করছে। এতে লোকে
বলার কি আছে? নিজে ভালো হলেই জগত ভালো। আমিনা ঠিকই আছে। তাকে
নিয়ে ভাবতে হবে না। আর আমি তো আছি। কলিমুদ্দিন ভাইও আছে। কলিমুদ্দিন ভাই তো
আমিনাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখে।
তবুও বাপের মন ! তারেক মৃদা বলল- যদি কিছু হয় ! মান-সন্মান তো আর পাঞ্জা
পাঞ্জা থাকে না। লোকে বলে না, জান যাক,
তবুও মান থাক!
দোকান করলে মান-সন্মান যায় না। দোকান করলেই মান-সন্মান যাবে এটা মেয়েদের
গৃহবন্দি করে রাখার জন্য পুরুষদের একটা কৌশল। আপনি সম্পর্কে আমার চাচা, তাই বলতে দ্বিধা হচ্ছে। নিজের হাতের মুঠ শক্ত থাকলে কেউ চোখ
তোলে তাকাতেও সাহস করে না। হাতের মুঠ আলগা হলে পুরুষরা সুযোগ পায়। আগে ঘরের ভেতর
বন্দি ছিলাম। দুনিয়াটা বুঝতে পারিনি। আমরা ঘরে বসে যে দুনিয়ার কথা চিন্তা করি
তার থেকে দুনিয়াটা অনেক আলাদা। নারী পুরুষের সমান অধিকার দিয়েছে আইন। গৃহবন্দি নারীরা সেই আইনের খবর রাখে না বলেই গৃহবন্দি হয়ে বসে বসে পুরুষদের মার খায়। পুরুষরা
স্বার্থপর। পুরুষরা তাদের স্বার্থের জন্য নারীদের ব্যবহার করে। শরিয়ত, বেহেস্ত-দোজখ, মান-সন্মানের ভয় দেখিয়ে
নারীদের গৃহবন্দি করে রাখে।
কলিমুদ্দিন একটু দূরে থাকলেও তাদের সব কথাই শুনছিলো। সে ক্যাশ ছেড়ে এগিয়ে
এসে বলল- রেজিয়া আপা, ইনি কে?
রেজিয়া বলল- আমিনার আব্বা। আমার চাচা।
তাই নাকি? কলিমুদ্দিন বলল- দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা
বলছেন কেন। বসে কথা বলেন।
তারেক মৃদা ভাবলো, বেশি কথা বলতে গেলে বাড়ির কথা উঠতে পারে।
তাই ব্যস্তভাবে বলল- না না, বসার দর্কার নেই। আমার একটু তাঁড়া আছে। এক জায়গায়
যাব।
রেজিয়া বলল- কোথায় যাবেন?
তারেক মৃদা আমতা আমতা করে বলল- নাতি দু’টিকে
দেখতে যাব। বাড়ি থেকে নিয়ে আসার পরে আর দেখা হয়নি।
রেজিয়া বলল- ওদের আজ স্কুল বন্ধ। তাই আজ রোমেই আছে। বসেন। আগে একটু চা খান।
আমরা কোথায় থাকি তা তো আপনি জানেন না। চা খাওয়ার পরে আমিই নিয়ে যাব আপনাকে।
তারেক মৃদা চা খেয়ে রেজিয়ার সাথে রোমে এলো। ছেলে দু'টি রোমেই বসে খেলছিলো। তারেক মৃদাকে দেখে তারা দৌড়ে এল। তারেক
মৃদা জেলেপি নিয়ে গিয়েছিলো। ছোট ছেলেটা জেলেপি খেতে খুব ভালোবাসে। জেলেপি পেয়ে
সে খুব খুশি হলো।
ছেলে দু’টির সাথে কিছু সময় কাটিয়ে চলে আসার সময়
রেজিয়াকে ডেকে বলল- তুমি আছ যদি আমি আর চিন্তা করব না। আগে আল্লাহ, পরে তুমি আছ।
ওদের দেখে শুনে রেখ। তবে একটা কথা, আমি যে তোমাদের এখানে
এসেছিলাম এ কথা আমিনাকে বল না যেন। রেজিয়াকে এ ভাবে বলেই
ছেলে দু’টিকে
উদ্দেশ্য করে বলল- তোরাও বলবি না। যদি বলিস, আমি আর তোদের
সাথে দেখা করতে আসব না।
ছেলে দু’টি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারেক মৃদা
নিশ্চিত হয়ে বাড়ি চলে এলো। বাড়িতে এসে সে কাউকে এ বিষয়ে কোনো কথা বলল না।
নয়
দোকান ভালোই চলছে আমিনার। সকাল বেলার চেয়ে সন্ধ্যের সময় বেচা-কিনা বেশি হয়।
রাত আটটা অবধি তাকে দোকানে থাকতে হয়। সকালের খাবার ছেলে দু'টিকে নিয়ে সে চায়ের দোকানেই খায়। চায়ের দোকানে রাতের রান্না
হয় না। তাই রাতের খাবার আটটার পরে দোকান থেকে এসে নিজে রান্না করে খেতে হয়। কোনো
কোনো দিন রেজিয়াও রান্না করে দেয়। ছেলে দু’টি একা থাকে বলে
সন্ধ্যের সময় টিউশন নিয়ে দিয়েছে। অটোচালক রশিদই টিউশন পড়ায়।
রশিদ বি, এ পাস। বাড়ি ছিলো ব্রহ্মপুত্র নদের কোনো
একটি চড়ে। তাদের গ্রামে দু'টি প্রাইমারি বিদ্যালয় ছিলো
যদিও কোনো এম, ই স্কুল ছিল না। তাই প্রাইমারি পাস করার পরে
যাতায়াতের অসুবিধার জন্য প্রায় সবাই লিখাপড়া ছেড়ে দিতো। এই অসুবিধা দূর করার জন্য
বি,এ পাস করার পরে রশিদ গ্রামে একটি এম, ই স্কুল স্থাপন করে। নব্বৈর দশকে তাদের চড়ে ভাঙন শুরু হয় এবং তাদের জামিজমা
সব নদের বুকে তলিয়ে যায়। বিদ্যালয় গৃহটিও তখন ভাঙনের কবলে পড়ে। তখন তার নিজের
গৃহ স্থাপনেরই জায়গা নেই, বিদ্যালয় গৃহ স্থাপন করে কোথায়? তার বাবা মা আগেই মারা গিয়েছিলো। সে বাবা মার একমাত্র ছেলে সন্তান। দু'টি বোন ছিলো যদিও তাদের বিয়ে দিয়েছিলো। সে নিজেও বিয়ে করেছিলো। তার একটি তিন বছরের সন্তানও ছিলো। সন্তানটি নদী ভাঙনের সময় নিউমোনিয়া হয়ে
মারা যায়। জমিজমা নেই। উপার্জনের কোনো উৎস নেই। কোনো
পিছু টান নেই।
তখন রশিদ সব ছেড়েছুড়ে স্ত্রীকে নিয়ে গুয়াহাটি যায় এবং সেখানে ঘরভাড়া
নিয়ে অটো চালাতে শুরু করে। অটো চালিয়ে মোটামুটি ভালই চলছিলো। তবে, একদিন সন্ধ্যেয় ভাড়াঘরে এসে দেখে তার রোমে তালা। খোঁজ খবর
নিয়ে জানতে পারে তার স্ত্রী কে একজনের সাথে পালিয়ে গেছে। রশিদ খোঁজখবর নিয়ে
জানতে পারে, কে একজন আর কেউ নয়, তারই
চাচাতো ভাই হাফিজ। সেও গুয়াহটিতে অটো চালাতো।
স্ত্রী পালিয়ে যাওয়ার পরে রশিদ এ নিয়ে আর কোনো কথা বলেনি। তবে, গুয়াহাটিতে আর অটো চালায় নি। কোন মুখে সে অটো চালাবে
গুয়াহাটিতে। সাথের অটো চালকেরা বউয়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে কী বলবে সে? তাই মনের দুঃখে গুয়াহাটি থেকে এই সহরে এসে অটো চালাচ্ছে। সকাল বেলা দু’টি টিউশনো করে। আগে রাতে টিউশন পড়াত না। আমিনার অনুরোধ এড়াতে না পেরেই
রাতে টিউশন পড়াচ্ছে। ছেলে দু'টি পড়া-শুনায় ভালো। তাই
টিউশন করে ভালোই লাগছে তার। সে সন্ধ্যে ছটা থকে রাত আটটা পৰ্যন্ত ছেলে দুটিকে
পড়ায়।
আগে সে সহরেই ঘরভাড়া ঘরে থাকত। সংসারে সে একা। তাই অটো চালিয়ে কিছু কিছু
টাকা জমিয়ে সহরের বাইরে এক টুকরো জমি কিনেছে। সেখানেই এখন সে ছাপরা করে থাকে। তাই
এখন আর ঘরভাড়া দিতে হয় না।
আগে সে সকালের খাবার হোটেলে খেত এবং রাতে নিজে রান্না করে খেত। তবে আট পৰ্যন্ত
টিউশন পড়িয়ে রাতে রান্না করে খেতে অসুবিধা হয়।
তাই একদিন আমিনা রোমে আসার পরে রশিদ বলল- আপনি পাড়লে আর একটু সকাল সকাল আসার
চেষ্টা করবেন। রাতে টিউশন পড়িয়ে রোমে গিয়ে রান্না করে খেতে খুবই অসুবিধা হয়।
সকাল সকাল আসতে বলছেন।আমিনা বলল- তবে সকাল সকাল আসাটা কোনোমতেই সম্ভব হবে না।
দোকানের গ্রাহক বেড়েছে। সেজন্য মহাজন আমাকে রাত ন'টা
অবধি থাকার জন্য বলতেছে। ছেলে দু'টির জন্য রান্না করতে হয়
বলে, বলে-কয়ে আটটায় আসতেছি।
রশিদ বলল- তাহলে এক কাজ করি, আমি বিকেল পাঁচটায়
এসে সন্ধ্যে সাতটা অবধি পড়াব।
আমিনা বলল- তাহলে তো ছেলে দু'টিকে সাতটা থেকে রাত
আটটা পৰ্যন্ত পূরা এক ঘণ্টা একা একা থাকতে হবে। যা দিনকাল পড়ছে, রাতে একা থাকতে দিতে ভরসা পাই না। আগে রেজিয়া আপা সন্ধ্যের পরেই রোমে
আসত। ট্রেজারি অফিস হওয়ার পরে দোকানের কিনা-বেচা অনেক বেড়েছে। তাই তাকেও এখন রাত
ন'টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়।
রশিদের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বলল- না, কোনো
উপায় দেখছি না। আমি রাত সাতটার পরে থাকা সম্ভব হবে না। দেখেন, সারাদিন অটো চালাই। সকালে উঠে দু’টি টিউশন পড়াতে
হয়। তাই রাতে একটু সকাল সকাল শোতে পাড়লে ভালো হয়।
রাতে রশিদের ওপড় ভরসা করেই আমিনা রাত আটটা পর্যন্ত দোকান করে। চৌহদ্দিতে আটজন
ভাড়াটিয়া আছে। কিন্তু তাদের ওপড় ভরসা করা সম্ভব না। কারণ তাদের কেউ কেউ চায়ের দোকানে
কাজ করে, কেউ কেউ হাজিরা করে, দুই
চারজন আবার লোকের বাড়িতে বাসনবর্তন ধোয়া কাজ করে। সবাই সকাল বেলা রোমে তালা
দিয়ে কাজে বেড়িয়ে যায়, রাতে এসে তালা খোলে রোমে ঢোকে।
রোমে এসে প্রায় সবাই রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই অন্যের কথা ভাবার
সময় থাকে না তাদের।
আমিনা এ সব কথা মনে মনে ভাবার পরে বলল- একটা কথা বলতে চাই, যদি অনুমতি দেন তো বলার জন্য, তাহলে বলতে পারি।
রশিদ অবাক চোখে আমিনার দিকে তাকাল। অনুমতি! অনুমতি আবার কেন! এমন কি কথা বলতে
চাইছে আমিনা। অন্যায় কিছু বলবে না তা রশিদ জানে। কারণ সে কোনো অন্যায় করেনি। সে
কৌতূহলী হয়ে উঠল আমিনা কি বলতে চায় শুনার জন্য। বলল- অনুমতির আবার প্রয়োজন হলো
কেন? কী বলতে চান, সোজাসুজি
বলে ফেলুন।
আমিনা আমতা আমতা করে বলল- না, কথা তেমন না। আপনার
কাছে একটি প্রস্তাব রাখতে চাই।
প্রস্তাব? কি প্রস্তাব বলুন। সম্ভব হলে আমি আপনার
প্রস্তাবে নিশ্চয় সন্মত হব।
আপনি রাতের খাবারটা যদি আমাদের এখানে খেয়ে যান, তাহলে
অসুবিধা হবে কী?
প্রস্তাবটা খুবই লোভনীয়। না করার মানেই হয় না। তবুও একজন স্বামী পরিত্যক্তা
মেয়ের সাথে খাওয়া দাওয়া করলে লোকে বা কীভাবে নেয় বিষয়টা, তা নিয়ে একটু সংশয় উদয় হলো তার মনে। তাই সে বলল- সে কীভাবে
সম্ভব! লোকে কি ভাববে?
কিচ্ছু ভাববে না। আমিনা দৃঢ়কণ্ঠে বলল- অন্ততঃ এই চৌহদ্দিতে কেউ কিছু বলবে না।
এ কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। কারণ এখানে সবারই একটু আধটু দোষ আছে। আপনাকে
বলতে দ্বিধা হচ্ছে, এখানে রাতে দুই একজন তো পরপুরুষ নিয়েই রাত
কাটায়। আর আপনি তো শুধু আমাদের সাথে খাওয়া দাওয়া করে চলে যাবেন।
কিন্তু আপনি আটটায় এসে রান্না করলে আমার রোমে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে।
আমাদের পাড়াটা তেমন ভালো নয়। নতুন বস্তি। রাস্তা নেই। কাঁচা পথ। একটু আধটু
বৃষ্টি হলেই কাদাজল জমে। আমাদের পাড়ায় বেশির ভাগই রিক্সা, ঠেলা চালক। আর্থিকভাবে দুর্বল। এর মধ্যে ভালো লোক যে নেই,
তা বলব না। ভালো লোক থাকলেও খারাব লোকের সাথে তারা লাগতে চায় না।
বেরাটি গাছের কথা নিশ্চয় জানেন। একটি বেরাটি গাছই সমগ্র অঞ্চল ছেয়ে ফেলে। বড়
বড় গাছগুলোকেও জড়িয়ে ধরে আধ মরা করে ফেলে। দু'চারজন আবার মদ গাঞ্জা খেয়ে রাস্তায়ও আড্ডা
দেয়। আগে লোকের টেম্পো ভাড়ায় চালাতাম। তাই টেম্পো সহরে রেখে হেঁটে যেতে হতো। তখন
তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে বাড়ি যেতে খুবই অস্বস্তি অনুভব করতাম। এখন নিজে টেম্পো
কিনেছি। তাই টেম্পো নিয়ে গেলে তেমন অসুবিধা হয় না। তবে, বৃষ্টি
হলে টেম্পো নিয়ে যেতে অসুবিধা হয়। তখন টেম্পো সহরে রেখে হেঁটে যেতে হয়। অনেকটা
পথ শ্মশানের মাঝ দিয়েও যেতে হয়। আমি যদিও ভূত-প্রেত বিশ্বাস করি না, তবু, রাত বেশি হলে একা একা যেতে গা ছমছম করে।
সেখানে যদি এতই অসুবিধা সহরে ঘরভাড়া নিয়ে থাকলেই তো পারেন। আমিনা পরামৰ্শের
সুরে বললো।
ছাপরাটা দিয়েছি। সেখানে কে থাকবে? রশিদ
অসুবিধার কথা জানালো।
ভাড়া দিয়ে দিন।
খাস জমি। ভাড়া দিলেই সে দখল করে বসবে। জানেন তো লোকের মাথায় কালো চুল।
কথাটা অবশ্যি ঠিক। আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। বিশ্বাসী লোকেরাই ক্ষতি করে
বেশি।
আমিনা এরূপ বলেই বলল- চিন্তা করতে হবে না। আপনি সাড়ে আটটার মধ্যেই যেতে
পারবেন। আমিনা উপায়ের কথা বলল- যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আপনাকে শুধু ভাতটা বসাতে হবে। আমি এসে তরকারি রান্না
করে আপনাকে খাইয়ে বিদেয় দেব। গেছ চৌকা সবই আছে, শুধু চাল
কয়টা ধুয়ে চৌকায় বসালেই হলো। আপনাকে কোনো খরচও দিতে হবে না।
রশিদ বলল- তাহলে সম্ভব হবে না। আপনাকে খরচ নিতে হবে। যদি খরচ নিতে রাজি হোন, তাহলে বিবেচনা করতে পারি।
আমিনা অপমানিত বোধ করলো তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করার জন্যে। কিছু সময়
পীড়াপীড়িও করলো সে তার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্যে। কিন্তু রশিদ কোনোমতেই সন্মত
হল না।
সে বলল- আপনার ওপড়ে বসে খেতে আমার মন কোনোমতেই সায় দিচ্ছে না। আপনি কেন এতো
জোর করছেন?
আমিনা অভিমানের সুরে বললো- ঠিক আছে, আপনার কথা
মতেই হবে। যা খরচ হয় আপনি দিয়ে দিবেন। তবে, হিসাবটা কিন্তু আপনাকে রাখতে হবে।
অসুবিধে নেই। প্ৰয়োজনে বাজারটাও আমিই করে দিব। রশিদ হেসে হেসে বললো।
দশ
দোকান ভালোই চলছে। এদিকে দর্জি কাজো প্রায় শেখা হয়ে গেছে। সার্ট লংপেন্ট
সেলাতে পারে। ব্লাউজ, সার্টের কাপড় কাটতেও পারে। তাই গত মাসে
মায়নাও দু’হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন বলতে গেলে ভাত
কাপড়ের চিন্তা নেই। খাওয়া-দাওয়ার পরেও দু’পয়সা হাতে জমা
হচ্ছে। এর মধ্যে খোরাকি দাবি কেসে মাসিক তিন হাজার টাকা করে ডিক্রি পেয়েছে। বার মাসের টাকা এক সাথে আদায় দিয়েছে। হাতে টাকা রাখাটা নিরাপদ নয় বলে রশিদের পরামর্শ মতো ব্যাংকে
পাসবুকও খুলেছে। সেখানে কিছু টাকা জমাও হয়েছে। রশিদ এখন নিয়মিতভাবেই রাতের
খাবারটা আমিনাদের সাথেই খায়। তবে, হিসেব
করে খরচা আদায় দেয়। আমিনাকে এখন বাজারও করতে হয় না। রশিদই করে দেয়। ছেলে দু’টিও রশিদের খুব ভক্ত হয়েছে। এখন ছেলে দু’টির
চিন্তাও তাকে করতে হয় না।
কলিমুদ্দিনও আমিনাকে খুব বিশ্বাস করে। অনেক সময় ক্যাশে বসিয়ে বাজার করতে
যায়। তবে, গ্রাহকদের মধ্যে দু'চার
গ্রাহক তার দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকায়। হাবভাবে অনেক কিছুই বুঝাতে চায়। আলতাব
তো একদিন তার আঁচলে চুনই মুছে ফেলেছিলো। তখন আমিনা এ নিয়ে আপত্তি করাতে আলতাব
বলেছিলো- এম্নি তামাশা করেছি। কিছু মনে করো না।
এ রকম তামাশা আর কোনোদিন করবেন না। আমি এ রকম তামাশা পসন্দ করি না।
এই কানে ধরে তওবা করলাম, আর কোনোদিন তামাশা
করব না।
সেদিন সন্ধ্যেয় রোমে যাওয়ার পরে রেজিয়া বলেছিলো- শুনলাম, আলতাব তোর আঁচলে চুন মুছেছিলো?
হ্যাঁ, মুছেছিলো। তাকে শাঁসিয়েও দিয়েছি।
সেও অনুতপ্ত। আমিও তাকে বকেছি। আর কোনোদিন এ রকম কাজ করবে না।
না করলেই ভালো। আবার ওলটাপুলটা আচরণ করলে কিন্তু আমি ছাড়ব না।
আমিনা তোকে একটি গোপন কথা বলতে চাই। রেজিয়া রহস্যময় ভঙ্গীতে বলল- তোকে
কিন্তু কথা দিতে হবে আর কাউকে বলবি না।
বল, কী কথা বলতে চাও। তুমি যদি বারণ করছ,
বলব না, কথা দিলাম।
আলতাব প্রায় নিয়মিতভাবেই আমার রোমে আসে। রেজিয়া বলল- আমি বুঝতে পারি, কথাটা তোর পসন্দ নয়।
পসন্দ না হওয়ারই কথা। আমিনা বলল- তুমি আমার বড় বোন। তুমি এসব করলে আমারও তো
লজ্জা করে।
লজ্জা করবার মতো কোনো কাজ আমি করিনি। রেজিয়া একটু থেমে বলল- আসলে আলতাবের
সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। কাজি দিয়ে রেজিষ্ট্রি বিয়ে করেছি। কথাটা আমরা গোপনে
রেখেছি। তার সংসার আছে। ছেলেমেয়ে আছে। তারা জানলে অশান্তি হবে সেজন্যে। তুই যে
আমার বোন এ কথা আলতাব জানে। তাই শালি হিসেবে তোর সাথে তামাশা করেছে। সেও এখন অনুতপ্ত।
আমি তেমনি একটা কিছু আগে থেকেই অনুমান করছিলাম। আমিনা বলল- তবে, বলতে সাহস পাইনি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি আর যাই কর, মান-সম্মান
নিয়ে খেলতে পার না। অন্তত এই বয়েসে।
তাহলে তোকে আরও একটি গোপন কথা বলি? কথাটা
কিন্তু খুবই গোপনীয়।
বল, কী গোপন কথা?
শুকুরজানও মেসের মালিককে বিয়ে করেছে।
তাই নাকি?
কথাটা কিন্তু ভুলেও কাউকে বলবি না। রেজিয়া বলল- মালিকের বউ চিররুগ্না।
মালিকের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই মালিক গোপনে শুকুরজানকে বিয়ে করেছে।
মালিকের দু'টি মেয়ে। ছেলে নেই। মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিতা।
একজন প্রফেসর, একজন উকিল। তারা জানলে অশান্তি হবে বলে বিয়ের
কথাটা গোপন রেখেছে। তুই ভুলেও কিন্তু কথাটা কাউকে বলবি না।
অবশ্যেই না। আমি টোঙরামি পসন্দ করি না।
তারপর থেকে আলতাব আর কোনোদিন আমিনার দিকে বাঁকা চোখে তাকায় নি।
কয়েকদিন একটি ছেলে আমিনাকে দিগদারি করত। ছেলেটি হোমগার্ডে চাকরি করে। একদিন
ছেলেটি বলেই ফেলেছিলো- মাগনা করব না। টাকা দিয়েই করব। যদি যেতে বল, আজ রাতেই যাব।
সবার সাথে মাথা গরম করে কাজ উদ্ধার করা সম্ভব না। তাতে আবার ছেলেটি পুলিশে কাজ
করে। সরাসরি মানা করলে সে না-ও মানতে পারে। দিগদারি করেই থাকবে। তাই আমিনা এখানে
একটা বুদ্ধি খাটাল। সে অনেকদিন আগে শুনেছিলো, এইডস
(এইসআইভি) রোগ হলে তার সাথে ছেলেরা শারীরিক সম্পর্ক করতে ভয় পায়। রোগটা
ছোঁয়াচে। শারীরিক সম্পর্কের ফলে রোগটা একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত
হয়। ছেলেটি যেহেতু হোমগার্ড। তাই ছেলেটি নিশ্চয় এ বিষয়ে অবগত।
এরূপ ভেবেই আমিনা বলল- তুমি নিশ্চয় এইডস রোগের কথা শুনেছ?
ছেলেটি বলল- নিশ্চয় শুনেছি। রোগটা খুবই মারাত্মক। শারীরিক সম্পর্কের মাঝ দিয়ে
রোগটা সংক্রমিত হয়।
তোমাকে একটা কথা বলব।
বল কী বলতে চাও।
আমিনা বলল- আমি এইসআইভি পজিটিভ। আমার অনেকদিন ধরে এইডস হয়েছে।
এইডস-এর কথা শুনে ছেলেটি আর কোনোদিন দোকানের আশে পাশে আসে নি।
আগে আমিনা তারেক মৃদার ভয়ে বাড়ি যেত না। দুই একদিন যাও যেতো লুকিয়ে লুকিয়ে
যেতো তারেক মৃদা বাড়িতে না থাকলে।
একমাত্র মেজো ভাই আজমতের বাইরে অন্য ভাইগুলিও তাকে তেমন গুরুত্ব দিত না।
কিন্তু একদিনের একটি ঘটনার পরে বাড়ির সাথেও সম্পর্ক অনেকটা ভালো হয়েছে।
ঘটনাটা ছিলো এরকম- আমিনার মেজো ভাই আজমতকে পুলিশ ধরে নিয়েছিলো। খবরটা
দিয়েছিলো তাদের পাড়ারই ছলিমমুদ্দিন। সে আজমতের সাথেই পিলপিলি চালায়।
ভাইদের মধ্যে একমাত্ৰ আজমতই আমিনার খবর রাখে। বাজার-টাজার করে দেয়। ভালোমন্দ
খোঁজ-খবর রাখে। আজমত মানুষ হিসাবে গম্ভীর। শান্তিপ্রিয়। কোনো কাইজা পেচালে নেই।
একেবারে সরল সহজ। তাই আজমতকে ধরে আনার কথা শুনে আমিনা বিচলিত হয়ে উঠছিলো। আমিনা
জিজ্ঞাসা করেছিলো কেন? কি করছিলো আজমত ভাই?
আরে আজকাল মানুষের উপকার করতে নেই। এরূপ মন্তব্য করেই ছলিমুদ্দিন বললো- পরের
উপকার করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে।
কী হয়েছিলো? খোলে বলতো।
বলছি। আজমত বলল- গতরাতে আমাদের পাড়ার অমরজ্যোতি ক্লাবের ফাংশন ছিলো। সারা রাত
সেখানে নাচগান হয়েছে। বেলা উঠার কিছু আগে আগে গানবাজনা বন্ধ হয়েছিলো। উত্তর
পাড়ার কফিল মিয়ার ছেলে নবুরুদ্দিনও ফাংশন দেখতে গিয়েছিলো। তার স্বভাব খারাপ।
লোকের এ-টা ও-টা চুরি করার অভ্যেস আছে। ফাংশন থেকে ফেরার সময় সে এক বাড়িতে মুরগি
চুরি করতে ঢুকেছিলো। মুরগি চুরি করে রাস্তায় উঠার সাথে সাথে ফাংশন থেকে আসা একদল
যুবক ছেলে তাকে মুরগি হাতে দেখতে পায়। তারা তাকে ধরে উত্তম মাধ্যম দিয়ে রাস্তায়
ফেলে রেখে চলে যায়। বলতে পার লঘু পাপে গুরু শাস্তি।
তারপর! তারপর কি হলো?
তোদের বাড়ির বৌরাও ফাংশন দেখতে গিয়েছিলো। ফাংশন শেষ হওয়ার আগে আগে আজমত
তাদের পিলপিলি নিয়ে আনতে গিয়েছিলো। ফিরে আসার সময় সে দেখতে পায় একটি ছেলে
রাস্তায় পরে গোঙরাচ্ছে। ঘটনাটি ঘটছিলো তোদের বাড়ির পাশেই। তখন সে বাড়ির বৌদের নামিয়ে
দিয়ে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলো।
পুলিশ কেস। তাই সকাল বেলা পুলিশ গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজমতকে ধরে এনেছে।
খবর শুনে আমি থানায় গিয়েছিলাম।
একটু আগে খবর এসেছে, ছেলেটি মারা গেছে। পুলিশ এখন আজমতকে চালান
দিবে বলতেছে। পুলিশরা বোলে বাতাসের গলায় দড়ি দিতে পারে, আজ
তাই দেখলাম।
আমিনা কলিমুদ্দিনের কাছে গিয়ে ঘটনাটা ভেঙে বলে বলল- আমি এখন থানায় যাইতেছি।
আপনি দোকানটা দেইখেন।
আমিনা থানায় এলো। রেজিয়াও এলো তার সাথে।
থানায় গিয়ে আজমতের সাথে দেখা করে ও'সি
সাহেবের কাছে গেল।
ও’সি সাহেব বললেন- ছেলেটা মারা গেছে। এখন
আজমতকে চালান দেওয়ার বাইরে আমাদের অন্য উপায় নেই।
কিন্তু ও-তো মারামারির সময় ছিল-ই না। আমিনা যুক্তি দর্শাল- এখন কীভাবে ও-কে
চালান দিবেন? ও হাসপাতালে না নিয়ে এলে তো ছেলেটি
রাস্তায়ই মরে পড়ে থাকতো। মানবতা বলে কী কিছুই নেই?
এসব ক্ষেত্রে মানবতা দেখাতে যাওয়াই ভুল। ও’সি
সাহেব বললেন- চালান দিলে তোমরা জামিনে বের করে নিলেই হলো। চার্জশ্বীট যতদূর সম্ভব
হালকা করে দিব।
দোষই করে নাই। কী চার্জশ্বীট দিবেন? তাকে
আমরা জামিনে বের করতে যাব কেন?
আমি তোমাদের সাথে তর্ক করে সময় নষ্ট করতে পারব না। ওসি সাহেব বললেন-এই কেসের
বাইরেও আমাদের অন্য অনেক কাজ আছে। আমাদের আইনের কাজ করতে দাও। আইনের কাজে বাধা
দিলে তোমাদেরও লক-আপে ঢুকাব।
আমরা কী অপরাধ করেছি যে আমাদের লক-আপে ঢোকাবেন?
পুলিশের কাজে বাধা দেওয়াটাও অপরাধ। ও’সি সাহেব
বললেন- তোমরা এখন যাও। আমাদের কাজ করতে দাও।
ও’সি চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল।
একজন হোমগার্ড আমিনাকে চেনে। মাঝে-মধ্যে আমিনার দোকানে পাণ-তাম্বুল খায়। সে
এগিয়ে এসে বলল- জানই তো পুলিশের কথা! কিছু একটা রফাদফা করে নিয়ে যাও। চালান দিলে
মার্ডার কেসে পড়ে যাবে। তখন কি হবে বলা মুস্কিল। তার থেকে কিছু খরচ হলেও থানা
থেকে কেস নিষ্পত্তি করাটা ভলো হবে।তোমরা বললে আমি ও’সি
স্যারের সাথে কথা বলে দেখতে পারি।
আমিনা বলল- ঠিক আছে। আপনি যদি বলছেন, দেখেন
কী রফা করতে পারেন।
হোমগার্ড দশ মিনিট পরে ও’সি সাহেবের কাছ থেকে
এসে বলল- পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলে ছেড়ে দিবে বলেছে ওসি স্যার।
রেজিয়া বলল- এত টাকা? দোষ না করে এত দন্ড নিতে যাবে কেন? এক দুই হাজার হলে কথা ছিলো।
হোমগার্ড বলল- আমার কাছে ও 'সি স্যার যা বলেছে,
আমি তাই বললাম। দেওয়া না দেওয়াটা এখন আপনাদের কথা। চালান দিলে জামিনে
বের করতে হবে। সেখানেও অনেক টাকা খরচ হবে। তারপর কেস চলবে দশ বছর। তখনও মাসে মাসে
উকিলের ফিস দিতে হবে। মানসিক অশান্তি। আর কত কী! হঠাৎ জেলও হয়ে যেতে পারে। সে না
মারুক, কেউ একজন তো মেরেছে।
আজ দেখলাম পুলিশের কাছে মানবতার কোনো মূল্য নেই। আমিনা বলল- এখন মানুষ
রাস্তায় পড়ে মারা গেলেও কেউ ঘুরে তাকিয়ে দেখবে না। ওসি স্যারকে বলেন, আমরা পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারব। এর বেশি দেওয়া সম্ভব হবে
না।
এর পরে দরাদরি চলল। এর মধ্যে খবর পেয়ে তারেক মৃদাও এলো। অবশেষে দশ হাজার টাকা
দিয়ে আজমতকে জামিনে বের করে নিয়ে এলো।
এর পর থেকে বাড়ির সাথে আমিনার সম্পর্ক অনেকটা ভালো হয়েছে। সময় পেলেই ছেলে
দু'টিকে নিয়ে বাড়ি যায়। বাড়ি গেলে তারেক
মৃদা এখন খুশি-ই হয়।
সেদিন আমিনা একটু আগেই দোকান বন্ধ করে রোমে এসেছিলো। রেজিয়া একটু পরে দোকান
থেকে এসে বলল- আমিনা একটা কাজ করতে পারিস। কাজটা করতে পারলে খুবই ভালো হবে।
আমিনা ভ্রূ কুঁচকে বলল- কী কাজ?
মহাজন দোকান বিক্রী করে বাড়ি চলে যাবে। যদি দোকানটা রাখতে পারিস তোর আখের বনে
যাবে।
দোকান রাখতে গেলে তো অনেক টাকা লাগবে। অত টাকা কোথায় পাব? আর আমি কী অত বড় দোকান চালাতে পারব?
আমি তো আছি। দোকানের বিষয় আমার অনেক কথা জানা হয়ে গেছে। কোনো অসুবিধা হবে
না। যদি কাজটা করতে পারিস, তাহলে পুরুষ সমাজকে দেখিয়ে দিতে পারবি,
নারীরাও অনেক কিছু করতে পারে। কাল সকালে গিয়ে মহাজনের সাথে আলোচনা
করে দেখ আগে। পরের কথা পরে হবে।
পরের দিন সকালে আমিনাকে নিয়ে রেজিয়া দোকানে এসে কলিমুদ্দিনের সাথে দেখা করল।
রেজিয়া বলল- কাল বললেন আপনি দোকান ছেড়ে দিবেন। আপনি তো আমাদের অনেক উপকার
করেছেন। যাওয়ার আগে আর একটা উপকার করে যান।
উপকার! মানে? বুঝলাম না তোমার কথা। কলিমুদ্দিন শুষ্ক
কণ্ঠে বলল- বল, কী বলতে চাও ?
কাল আপনি যে বললেন দোকান ছেড়ে দিবেন। রেজিয়া অনুরোধের সুরে বলল- দোকানটা যদি
আমিনাকে দিন তো খুব উপকার হবে।
আমিনার দিকে তাকিয়ে কলিমুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠল। বলল- তাহলে তো ভালোই হয়।
তুমি কি সত্যিই দোকান করবে?
আমিনা বলল- আগে আপনি বলুন, আপনি দোকান ছাড়তে চান কেন? আমি তো আপনার ভরসায়-ই এখানে আছি। আপনি আমাদের অভিভাকের মতো।
আপনি দোকান ছেড়ে গেলে আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ব।
আর মা। কলিমুদ্দিন আমিনাকে মা বলে ডাকে- কি আর বলব। নদী ভাঙনের পরে অনেক কষ্টে
ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি। নাগালেন্ড গিয়ে লোকের জমিতে বেগার খেটেছি। এখন আর
শরীরে কুলায় না। এ-টা ও-টা অসুখ লেগেই থাকে। বাড়ি থেকেও সবাই বলছে বাড়ি
যেতে।বাড়িতে বর্তমান আমার কোনো অভাব নেই। ছেলে, ছেলের
বউ, নাতিপুতি নিয়ে ভরা সংসার। বড় ছেলে প্রফেসর। ছোট ছেলে
দোকান করে। হোলসেল দোকান। বিক্রী বাট্টা ভালো। তারা এখন বাড়ি যাওয়ার জন্য তাগিদা
দিচ্ছে। দুদিন আগে ছোট ছেলে এসেছিলো বাড়ি নিয়ে যেতে।
রেজিয়া বলল- তাহলে দোকানটা আমিনাকে দিয়ে যান। এটাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ।
কলিমুদ্দিন বলল- আমিনাকে দোকানটা দিয়ে যেতে পারলে আমারও ভালোই লাগবে। আমার
বিশ্বাস আমিনা দোকান চালাতেও পারবে। অনেক বয়স হয়েছে। অভিজ্ঞতাও হয়েছে অনেক। কে
কী করতে পারবে মুখ দেখলেই এখন বলে দিতে পারি।
আমিনা বলল- আমি শিখেছি দর্জি কাজ। তাহলে তো দর্জি কাজ বাদ দিতে হবে।
কলিমুদ্দিন বলল- আজকাল দর্জি কাজে ভাত নেই। রেডিমেড জিনিস বের হয়েছে। এখন
কয়জনে আর দর্জি দিয়ে সিলিয়ে কাপড় পড়ে? সার্ট,
লংপেন্ট, পেটিকোট, ব্লাউজ
সব রেডিমেডই কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু চায়ের ব্যবসা কোনোদিন মন্দা হবে না।
ব্যবহার ভালো হলে দিন দিন বেড়েই চলবে। পার যদি দোকানটা দাও। ভবিষ্যত ভালো হবে।
আমিনা আমতা আমতা করে বলল- আপনাকে তো অনেক টাকা দিতে হবে।
হ্যাঁ, অবশ্যে দিতে হবে। কলিমুদ্দিন ভ্রূ কুঁচকে
ভেবে বলল- এর ধর দু'লাখের মতো। আমি অগ্রিম দিয়েছিলাম আশি
হাজার টাকা। টেবিল চিয়ার বাসনবর্তন বাবদ প্রায় ডের লাখের মতো। জিনিষগুলি পুরানা
হয়েছে। তাই এগুলি বাবদ কিছু একটা দিলেই হবে।
অত টাকা তো চাচা আমার হাতে নেই।
যা পার বর্তমান দিলেই হলো। পরে ধীরে সুস্থিরে পরিশোধ করলেই হবে।
ঠিক আছে, চাচা। আমিনা বলল- কাল আপনাকে আমার
সিদ্ধান্তের কথা জানাব।
দোকান থেকে বেরিয়ে এসে আমিনা বলল- দু'লাখ
টাকার কথা বলল। কমেও এক লাখ তো দিতে হবে।
রেজিয়া বলল- তা অবশ্যি দিতে হবে।
আমার হাতে এখন অত টাকা নেই। কুড়িয়ে টুড়িয়ে চল্লিশ হাজারের মতো হতে পারে।
বাড়ি গিয়ে চাচাকে বলগে’। সে যদি কিছু দিতে পারে!
আমিনা সেদিন আর দোকান করল না। ছেলে দু'টিকে
স্কুলে পাঠিয়ে বাড়ি চলে এলো।
তারেক মৃদা কথাটা শুনে শুষ্ক কণ্ঠে বলল- যেভাবে আছ, সেভাবেই থাক। চায়ের দোকান করাটা অত সহজ নয়। আমার কাছে বর্তমান
দেবার মতো টাকা নাই-ও।
আমিনা কথাটা মার কাছে বলল- মা, তোমার
হাতে কত টাকা আছে?
ফুল খাতুন বলল- বেশি নেই। হাস মুরগি বিক্রী করে পাঁচ হাজার টাকা জমিয়েছি।
দর্কার হলে পাঁচ হাজারই দিতে পারব।
আমিনা বলল- ঠিক আছে। পাঁচ হাজারই দাও। আর আমার গহনাগুলি দাও।
ফুল খাতুনের কাছ থেকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং গহনা নিয়ে এলো। গহনা বিক্রী
করে পঁয়ত্রিশ হাজার পেল। মোট টাকা জমা হলো আশি হাজার। আরও বিশ হাজার টাকার
প্রয়োজন। রেজিয়া পাঁচ হাজার টাকা দিতে রাজি হলো। এখন পনের হাজার টাকা বাকি?
সন্ধ্যেয় বাড়ি আসার পরে রশিদ বলল- শুনলাম, আপনি
বোলে চায়ের দোকানটা নিবেন?
কার কাছে শুনলেন?
রেজিয়া আপা বলেছে। আমি চা খেতে গিয়েছিলাম, তখন
বলল ।
কথাটা অবশ্যি ঠিকই শুনেছেন। তবে, এখনও
টাকা যোগার হয়নি।
কত টাকা নাজাই আছে।
এই ধরেন, পনের হাজার।
টাকার জন্য ভাববেন না। কথা দিয়ে ফেলুন।
টাকা যোগার না করে কথা দিই কেমনে?
টাকা যোগার হয়ে যাবে। আমি দিব পনের হাজার টাকা।
আমিনা যেন আগুন থেকে জলে পড়ল। বলল- দিলে তো ভালই হয়। কিন্তু আপনি টাকা দিবেন
কেন?
রশিদ রহস্যময় ভঙ্গীতে বলল- আপনার উপকার হবে বলে। আমি চাই, দোকানটা আপনার হোক।
সেদিনই সন্ধ্যেয় দু’লাখ টাকায় দরদাম রফা হলো। এক লাখ টাকা নগদ
দিতে হবে এবং এক লাখ এক মাস পর পর দুই কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। কলিমুদ্দিন পনের
দিন পরে দোকান ছেড়ে দিবে। তখন আমিনা দোকান নিজে দোকান চালাতে পারবে। এভাবে
সিদ্ধান্ত হওয়ার দু'দিন পরে যাবতীয় চুক্তিপত্র হয়ে গেল
এবং আমিনা এক লাখ টাকা কলিমুদ্দিনকে বুঝিয়ে দিলো।
এগার
চুক্তিপত্র সম্পাদন হওয়ার দিনই সন্ধ্যেয় আমিনা রোমে আসার পরে রশিদ বলল- আজ
আর আপনাকে তরকারি পাক করতে হবে না।
কেন? আমিনা অবাক কণ্ঠে বলল- আজ তরকারি রাঁধতে
হবে না, মানে? আজ সুদা ভাত খাবেন নাকি?
সুদা ভাত খেতে যাব কেন? রশিদ বলল- তরকারি আজ আমি রেঁধেছি।
আসলে তরকারিটা আমিনাই রাঁধে। রশিদ শুধু ভাত কয়টা রেঁধে রাখে। তাই আমিনা বলল-
আপনি আবার আজ তরকারি রাঁধতে গেলেন কেন?
রশিদ রসিকতার সুরে বলল- আজ থেকে বলতে গেলে আপনি মহাজন হয়ে গেলেন কিনা, তাই। সেই খুশিতে আজ আমি নিজেই তরকারি রেঁধেছি। আজ থেকে তো
আপনার ওপড় গধুর দায়িত্ব পড়ল। পনের দিন পর থকে তো আপনি ভাত খাবারই সময় পাবেন না।
তাই আজ আপনাকে একটু রেস্ট দিলাম।
আপনারও যে কথা! আমিনাও রশিকতার সুরে বলল- একদিন রেস্ট দিলে হবে নাকি? আজ থেকে আপনাকেই তরকারি রাঁধতে হবে। কারণ আজ থেকে যে আমি
মহাজন!
রসিকতা করলো ঠিকই, কিন্তু রসিকতাটা যেন কেমন হয়ে গেল।
কিন্তু রশিদ সেদিকে মন দিল না। সেও রশিকতার সুরেই বলল- আপনার অনুমতি থাকলে তাও
করতে পারব। রেঁধে খাওয়ার অভ্যেস আছে।
রসিকতা ছাড়েন। কী রাঁধলেন, তাই বলেন?
মুরগি এনেছিলাম।
সেদিন রেজিয়াকেও আমিনা ভাত খেতে ডাকল।
ভাত খাওয়ার সময় রেজিয়া বলল- আজ মাংসটা কিন্তু দারুন হয়েছে। স্বাদ অনেক দিন
মুখে লেগে থাকবে।
আজ তরকারি রেঁধেছে কে, যে স্বাদ হবে না?
কে রেঁধেছে? রেজিয়া অবশ্যে জানে না তরকারি কে রেঁধেছে।
তবে, আমিনার কথা বলার ধরণ দেখে কিছুটা অনুমান করতে পারল।
রেজিয়া অবাক চোখে রশিদের দিকে তাকাল। বলল-ইনি-ই নিশ্চয়?
তোমার অনুমান একেবারে সত্যি। আমিনা বলল- রাঁধার হাত আছে বলতে হবে।
আশ্রব বলল- খুব ঝাল হয়েছে। আমার চোখ দিয়ে জল বের হচ্ছে।
রেজিয়া ধমকের সুরে বলল-সুদা ভাত খাও, ঝাল কমে
যাবে। মাংসের তরকারিতে একটু আধটু ঝাল না হলে তরকারি স্বাদ হয় না। আগে তো আমাদের
সমাজে একটি প্রবাদই প্রচলিত ছিলো-ঝালে ঝোলে তরকারি, তালে
তোলে সংসারি।
আমিনা বলল- আমি তো শুনেছি, ঝাল কম খেলে আগে
তাকে গৃহস্থ কামলাই নিতো না।
রেজিয়া তাচ্ছিল্যের সুরে বলল- যেমন ঝালও খেত, তেমন
পেটের বিষেও চিল্লাচিল্লি করতো। তখন সেই পেটের বিষকে ‘বেদনা’ বলা হতো। পেটের বিষ শুরু হলে একেবারে পাগলের মতো হয়ে যেত। ছোডা খেয়ে
তখন সেই বেদনা থেকে পরিত্রাণ পেত।
রশিদ বলল- পেটের বিষ সম্পর্কে একটি গল্প বলি শুনুন। আমাদের পাড়ায় মোহন ফকির
নামের একজন লোক ছিলো। সে নানা রকম রোগের চিকিৎসা করত। শুনেছি, তার বোলে কয়েকটা পোষা ভূত ছিলো। বেশির ভাগ চিকিৎসাই সে ভাঁড়
এসে ভূতের দ্বারা করাতো। ভাঁড় আসলে তার সেকি মূর্তি হতো! দেখলে ভয় লাগত। মাথা
এমন ভাবে ঝাঁকাত, যে একটা মাথা কয়েকটার মতো দেখা যেতো। সে
বেদনারও চিকিৎসা করত। একবার তার নিজেরই বেদনা হলো। নিজেই লোকের বেদনার চিকিৎসা করে,
তার চিকিৎসা আর কে করবে! তবুও এর ওর কাছে গিয়ে চিকিৎসা করালো।
কিন্তু কোনো চিকিৎসায় ফল দিল না। তখন এখনকার মতো ঔষধ সূলভ ছিল না। গ্রামাঞ্চলের
বেশির ভাগ লোকই তখন বেদনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ছোডা খেত। সেও ছোডা খাওয়া
শুরু করল। তখন ছোড়ায়ও কাজ দেয় না। অবশেষে সে আলসে পেটে নিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে
থাকতো। পেটের বিষ বেশি হলে তখন বলত- একটা পাদও আসেনারে! একটা পাদ আসলে মনে হয়,
বিষটা একটু কমত।
তখনকার দিনগুলি আসলেই খুব কষ্টের ছিলো। আমিনা মন্তব্য করল-এখন তো একটা কাঁটা
বিঁধলেও লোক ডাক্তরের কাছে যায়।
রশিদ মাঝে বলল- এরূপ গল্প করলে সারারাতই করতে পারবেন। রাত হয়ে গেছে। আমি এখন
যাই। আপনারা গল্প করুন।
রশিদ বসা থেকে উঠে রোম থেকে বেরিয়ে গেল।
রশিদ চলে যাওয়ার পরে রেজিয়া বলল- লোকটা কিন্তু ভালো। দেখ, লোকটিকে যদি বাগাতে পারিস!
আমিনা রেজিয়ার কথার ইংগিত বুঝতে পারল। লজ্জায় তার মুখমন্ডল লাল হয়ে উঠল।
বলল- তুমি কি যে বল, আপা? এম্নিতেই উনি
আমার অনেক উপকার করছেন। তাকে নিয়ে এরূপ কল্পনা আমি কোনোদিনই করিনি।
করিস নি, এখন কর। রেজিয়া বলল- আমি তোর ভালর জন্যেই
বলছি। দোকানটা নিলি, যতই বলিস, মেয়ে
মানুষ একা দোকান সামলানো অসুবিধা হবে। বললাম বলেই তো আর হল না। ভেবে দ্যাখ। আমার মনে
হয়, প্রস্তাবটা দিলে সে অস্বীকার করবে না। সে নিশ্চয়ই তোকে
পসন্দ করে। না হলে নিজের কাজ ফেলে তোর কাজ করত না।
আসলে আপা, আমি বিয়ের কথা কোনোদিন ভাবি-ই নি ছেলে দু'টির কথা চিন্তা করে।
কলা দেখেছিস? রেজিয়া বলল- কলা কিন্তু খুবই পুষ্টিকর এবং
মিস্টি ফল। কিন্তু বাকল না থাকলে কলার পুষ্টি গুণ থাকে না। পুরুষ মানুষ মেয়েদের
আবরণ, মানে বাকলস্বরূপ। পুরুষ মানুষ না থাকলে মেয়েদের ইজ্জত
থাকে না। লোকে মাঝি বিহীন নৌকার মতো ভাবে। সবাই নৌকায় চড়তে চায়। তোর নিজেরই তো
অভিজ্ঞতা আছে এই বিষয়ে। আমি আর কি বলব। ভেবে দ্যাখ। যদি কোনোদিন মনস্থির করতে
পারিস তো বলিস। আমি কথা বলব। রেজিয়া কথার প্রসংগ পালটিয়ে বলল-রাত অনেক হয়ে গেছে।
যাই শুয়ে থাকি গিয়ে।
রেজিয়া চলে গেল।
আমিনার মাথায় শুধু রেজিয়ার কথাগুলি ঘুরপাক খেতে লাগল। রেজিয়া আপা মন্দ বলে
নি। সত্যিই মেয়ে মানুয় একা একা ইজ্জত নিয়ে বেচে থাকাটা খুবই কষ্টকর। নানান জনে
নানান রকম কথা বলে। তারা মিয়া থাকলে কী খইমুদ্দিন, সেই
হোমগার্ড, রেজিয়া আপার বর তাকে খারাপ ইঙ্গিত করতে পারতো?
মনে হয়, না। রেজিয়া আপা মন্দ বলেনি। রশিদ লোক হিসেবে সত্যিই মন্দ
নয়। শিক্ষিত, ভদ্র। অমায়িক। ওজন আছে। মানুষের দরদ বুঝে।
আমিনা বুঝে, রশিদ তাকে পসন্দ করে। বিয়ের কথা বললে মনে হয়,
না করবে না। রশিদকে বিয়ে করলে তার জীবনটা মনে হয় সুখেই কাটবে!
কিন্তু ছেলে দু’টির কি হবে? ছেলে দু'টির জন্য সে নিজের সমস্ত সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে পিছপা হবে না। তার নিজের
সুখের জন্য সে ছেলে দু’টির জীবন ব্যর্থ হতে দিতে পারে না।
কয়দিনের মনুষ্য জীবন! একদিন আসা আর একদিন যাওয়া। এই দু’দিনেরই
তো জীবন। মাঝে যে কয়টা দিন মানুষ বেঁচে থাকে, নানান ঘাত
সংঘাতের মাঝ দিয়েই বাঁচে । সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকে। পরের জন্য ভাবার
সময় থাকে না কারও। মনুষ্যত্ব বলে একটা জিনিস আছে। মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে শুধু
নিজের জন্য বেঁচে থাকার নাম কী জীবন?
তবে রশিদ কী ছেলে দু’টিকে আপন বলে মেনে নিতে পারবে? মনে হয়, না। রক্তের একটা আলাদা টান আছে। ছেলে দু'টির প্রতি রশিদের কী সেই টান থাকবে?
এরূপ আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে আমিনা। ঘুম আসার যত্ন করে।
কিন্তু ঘুম আসে না। বিছানায় শোয়ে ছট্ফট্ করতে থাকে। ঘুম বড় বাচাল। নিজের খেয়াল খুশি মতো চলে। আসতে চাইলে আসেনা, না আসতে চাইলে দু’চোখ জড়িয়ে ঘুম আসে।
ঘুমের থেকে শান্তির জিনিস বুঝি অন্য কিছু নেই। ঘুম আসলে সকল জ্বালা যন্ত্রণা থেকে
লোক মুক্তি পায়।
এরূপ ভাবতে ভাবতে কখন চোখ জড়িয়ে ঘুম এলো আমিনা বুঝতে পারল না। সে নিদ্রার
কোলে ঢলে পড়ল।
পরের দিন সকালে আমিনা দোকানে গিয়ে দোকান খুলে বসল। কিন্তু দোকানে মন বসাতে
পারল না। পনের দিন পরে সে এই দোকানের মালিক হয়ে যাবে। তার অধীনে কর্মচারিরা কাজ করবে।
কিন্তু সে দোকান চালাতে পারবে কী? এমনি দেখতে তো তেমন কঠিন
কাজ নয়। কর্মচারিরা কাজ করবে সে ক্যাশে বসে শুধু পয়সা গোনবে। কাজটা দেখতে যত সহজ,
করতে কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি কঠিন।
কর্মাচরিদের সাথে তার সম্পর্ক ভালো। দোকানে সর্বমোট ছয়জন কর্মচারি। রেজিয়া
আপার বাইরে সবাই ছেলে মানুষ। ছেলেগুলির সবাই তাকে ‘আপা’
বলে ডাকে। প্রয়োজনে তার কাজেও সহায় করে। মফিজ নামের একটি ছেলে
আছে। সে কিছু লেখা-পড়া জানে। এম, ই স্কুল পাস। বাড়ি সহরের
পাশেরই কোনো একটি গ্রামে। লেখা-পড়ায় ভালো ছিলো। দারিদ্রতার জন্য সে লেখা-পড়া
করতে পারেনি। বাপ পঙ্গু। আগে
রাজমিস্ত্রীর যোগালি ছিল। বিল্ডিং থেকে পড়ে একটি পা ভেঙেছে। এখন কাজ করতে পারে
না। চলাফিরা করতে পারে না। লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে
খুঁড়িয়ে চলে। ছেলেটির মা-ই এখন সংসার চালায় লোকের বাড়িতে কাজ করে। মাকে সহায়
করার জন্যই ছেলেটি চায়ের দোকানে কাজ করে। ছেলেটি খুব অমায়িক এবং বিশ্বাসী। হঠাৎ
কোনো কাজে বাইরে গেলে মফিজই তার দোকান দেখা-শুনা করে। প্রয়োজনে বেচা-কেনাও করে।
মফিজ এসে বলল- আপা, দোকানটা বোলে আপনি চালাবেন?
আমিনা বলল- কে বলল তোমাকে?
মফিজ বলল- কে আর বলবে? আমি একাই জেনেছি। শুধু আমিই না। কর্মচারিদের
সবাই জানে কথাটা।
আমিনা বলল- তোমরা খারাপ পেয়েছ নাকি?
না না আপা, কীযে বলেন! মফিজ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-
খারাপ পাব কেন? আমরা সবাই খুশি হয়েছি। আচ্ছা, আপা আমাকে রাখবেন তো? জানেন তো আমার বাড়ির অবস্থা!
রাখব না কেন? তোমরা থাকলে নিশ্চয় রাখব। দোকান তো তোমাদেরই
চালাতে হবে।
কথাটা শুনে মফিজ খুবই খুশি হলো। সে তৎক্ষণাৎ অন্যান্য কর্মচারিদের কথাটা বলে
দিলো- আপা বলল, আমাদেরই দোকান চালাতে হবে। তোরা ভেবেছিলি
আপা আমাদের তাঁড়িয়ে দিয়ে অন্য কর্মচারি রাখবে। না, দিবে
না।
এমন সময় কলিমুদ্দিন এসে বলল- মা, দাও তো
একটা সিগারেট।
কলিমুদ্দিন সচরাচর সিগারেট খায় না। কিন্তু টেনশন হলে সিগারেট টানে। তাই আমিনা
বলল- চাচা, সিগারেট টানবেন?
হ্যাঁ, দাও একটা।
কোনো অসুবিধা হয়েছে কি?
আর, বল না মা। কলিমুদ্দিন আক্ষেপের স্বরে বলল-
দুনিয়াটা বড় স্বার্থপর, মা।
তা তো বটেই! কি হলো, চাচা?
দশ বছর আগে আমার ছোট ভাইয়ের সাথে একসাথে জমি কিনেছিলাম। দুই বিঘা জমি। জমিটা
আসলে আমিই কিনেছিলাম। ভাই বলে তাকে আধা বিঘা জমি দিয়েছিলাম। এখন সে বলছে কিনা, সে এক বিঘা জমিই পাবে। তাকে ঠকানো হয়েছে। বল তো মা। দশ বছর পরে এ রকম দাবি কেন? তখন বললে না কেন? ও তখন আধা বিঘা জমির
দামই দিয়েছিলো। এখন বলছে, তাকে এক বিঘা জমিই দিতে হবে। টাকা হয়েছে। এক ছেলে পুলিশ,
একজন আর্মি। টাকার গরমে বলছে এখন এসব কথা। জমির যা মূল্য হয় দিবে
বলতেছে। বলতো মা, এই অন্যায় দাবি কী মেনে নেওয়া যায়?
কি করবেন, চাচা ! দুনিয়াটা এরকমই। বাড়ি যান। বাড়ি
গিয়ে বিষয়টা রফা করেন। অযথা মাথা গরম করবেন না। বয়েস হয়েছে। বেশি টেনশন করলে
অসুবিধা হবে।
হ্যাঁ, বাড়ি গিয়েই বিষয়টা রফা করতে হবে। ছেলেকে
বলে দিয়েছি, তারা যেন এ বিষয় নিয়ে কোনো কথা না বলে।
কলিমুদ্দিন সিগারেটে সুখ টান দিয়ে ক্যাশ-এ গিয়ে বসল।
আমিনা নিজের দোকান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ন'টায় আমিনা দর্জি দোকানে এলো।
সেলিম কাপড় কাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। আমিনাকে দেখে সে কাপড় কাটা বন্ধ করে
বলল- আমিনা, এসেছ? শুনলাম,
তুমি বোলে চায়ের দোকান করবে?
নিলাম সেলিম ভাই। কথাটা তোমাকে বলব ভেবেছিলাম। তুমি আগেই বলে ফেললে। কার কাছে
শুনলে?
জমিলা বলল। ভাবলাম, আমিনা এত বড় একটা কাজ করলো আমি জানলামই
না।
কিছু মনে করবেন না, সেলিম ভাই। নেওয়া হবে কি হবে না এ নিয়ে
দ্বিধায় ছিলাম। তাই বলতে ভরসা পাইনি। কাল হঠাৎ নিয়ে ফেললাম।
নিয়েছ, ঠিকই করেছ। সেলিম উপদেশের সুরে বলল- তবে,
দোকান নেওয়াটা বড় কথা না, টিকিয়ে রাখাটা
বড় কথা। ব্যবসা না শিখে ব্যবসা করতে গেলে অনেক সময় ‘লস’
খেতে হয়। আমাদের মাঝে একটা প্রবণতা আছে। টাকা হলেই দোকান দিয়ে
বসে। কয়েক মাস পরেই চালান গায়েব হয়ে যায়। টাকা থাকলেই হয় না। একজনের অধীনে
থেকে আগে ব্যবসা শিখতে হয়।
আমিনা হতাশ হলো। বলল- আমি ব্যবসার অ-আ-ও জানিনা। কয়েক মাস ধরে সাদা পাণের
দোকান করছি। সেই অভিজ্ঞতাই আমার মূলধন। পনের দিন পর থেকে দোকান করতে হবে। এই পনের
দিনে কলিমুদ্দিন চাচার কাছ থেকে দোকানের অ-আ শেখার কথা ভাবছি। দু'দিন পরেই এখানে আমার মাস পূরা হবে। মাসটা পূরা হলেই আমি আর
তোমার দোকানে আসব না।
ঠিক আছে। কালই তোমাকে আমি মায়নাটা দিয়ে দিব। পনের দিন সময় পেয়েছ, এই পনের দিনে কাজগুলি বুঝে নাওগে'।
সেদিন সন্ধ্যেয় দোকান খোলার পরে আমিনার মনে পড়ল, ছোট ছেলেটার জ্বর। কয়েক দিন ধরে শুষ্ক কাশ হয়েছে। গতকাল ডাক্তার
দেখিয়ে ঔষধ এনেছে। ফার্মাসিতে একটি ঔষধ ছিল না। আজ ঔষধটি আসবে বলেছে। ঔষধের কথা
মনে পড়াতে সে মফিজকে ডেকে বলল- মফিজ, আমি ফার্মাসিতে যাব।
ঔষধটা পেলে রোমে গিয়ে ফিরদুসকে ঔষধটা খাইয়ে আসব। আমি না আসা পর্যন্ত তুমি
দোকানটা দেখ।
মফিজ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল- যান আপা। চিন্তা করবেন না।
আমিনা ফার্মাসি থেকে ঔষধটা নিয়ে রোমে এসে দেখে রশিদ ছেলেদের পড়াচ্ছে।
আমিনাকে দেখে রশিদ বলল- আজ এত সকাল সকাল এলেন? আজ
দোকান করেন নি?
দোকান অবশ্যে খুলেছি। আমিনা বলল- ফিরদুসের জন্য ঔষধ নিয়ে এসেছি। ঔষধটা খাইয়ে
গিয়ে দোকানে বসব।
আমিনা ফিরদুসের কাছে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলল-না, জ্বর নেই।
আমিনা ফার্মাসি থেকে আনা বোতলের মুখটি খোলে ফিরদুসকে দু’ছিপি ঔষধ খাইয়ে দিয়ে বলল- আপনারা থাকেন। আমাকে এক্ষুনি যেতে
হবে। একটু পরেই যাব বলে মফিজকে দোকানের দায়িত্ব দিয়ে এসেছি।
রশিদ বলল- একটু বসুন। দোকান সম্বন্ধে আপনার সঙ্গে কথা বলব ভেবেছি। রশিদ বলল-
কলিমুদ্দিন চাচা দোকানের নাম রেখেছে, যদিও
কোনো সাইনবোর্ড টানায় নি। আজকাল কাঁচির চেয়ে কাঁচির আছাড়ির কদর বেশি। কাঁচিতে
ধার থাকুক আর না থাকুক, আছাড়ি ভালো হতে হবে। লোকে এখন
জাঁকজমক পসন্দ করে। দোকানের সামনে একটা সাইনবোর্ড টানাতে হবে।
তা তো অবশ্যিই। সাইনবোর্ড টানাতে হলে তো একটা নামও তো হবে। কী নাম রাখলে ভালো
হবে? আপনি ভালো দেখে একটা নাম রাখেন।
যদি রাখতে বলেন নিশ্চয় রাখব। রশিদ বলল- আমি ইতিমধ্যে একটা নামের কথা ভেবেছি।
কী নাম?
চায়ের দোকান। তাই মিস্টিমুখ-এর কথা ভেবেছি। আপনার পসন্দ হলে মিস্টিমুখ রাখতে
পারেন।
নামটা খুবই ভালো হবে। আমিনা উৎসাহিত কণ্ঠে বলল- মিস্টিমুখ-ই রাখেন।
রশিদ বলল- শুধু সাইনবোর্ড টানালেই হবে না। দোকানটা ভালো করে সাজাতে হবে।
দেয়ালে রং করতে হবে। হালকা আকাশী রং ভালো হবে। রোমের ভেতর বসেও যেন মনে হয়, আকাশের তলে বসে আছি। সম্ভব হলে টেবুল চিয়ার আকর্ষণীয় করে
সাজাতে হবে। যেন মনে হয়, আকাশের তলে স্বপ্নপুরিতে বসে আছি।
আমিনা বলল- আপনি দেখছি অনেক কথা ভেবেছেন?
হ্যাঁ, ভেবেছি। আগে না ভাবলে কাজ করা যায় না। আগে
ধারণা পরে কার্যে রূপায়ন। পরিকল্পনা না থাকলে কাজ ঠিক হয় না। পরিকল্পনা করে কাজ
করলে সে কাজ ব্যর্থ হয় না।
আপনি যে পরিকল্পনা করেছেন, তাতে দেখছি অনেক
টাকা লাগবে। অত টাকা পাব কোথায়?
সে হয়ে যাবে। রশিদ মুচকি হেসে বলল- টাকার জন্য কাজ আঁটকে থাকে না। যদি
সদিচ্ছা থাকে।
টাকা হাতে না থাকলে, ইচ্ছা করাটা ঠিক না বলে আমি ভাবি।
ইচ্ছাটাই আগে। রশিদ বলল-ইচ্ছা না থাকলে কোনো কাজ হয় না। এই ধরুন, আপনি দোকানটা দিতে চলেছেন। ইচ্ছা আছে বলেই তো আপনি কাজটা করতে
যাচ্ছেন।
তা অবশ্যি ঠিক। আমিনা একটু থেমে বলল- আগে থেকেই কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিলো
আমার। বাবার জন্য লিখা-পড়াটা করতে পারিনি। কম বয়েসেই বিয়েটা দিয়ে দিলেন। নইলে অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিলো। আমার ক্লাসের দু’টি মেয়ে এখন কলেজে অধ্যাপনা করছে। তারা পড়ায় আমার থেকে
দুর্বলই ছিলো।
আমাদের সমাজের এ একটা ব্যাধি। রশিদ আক্ষেপের সুরে বলল- আমি অনেক চেষ্টা করেছি
বাল্য বিবাহ বন্ধ করার জন্য। কে শুনে কার কথা! ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবে না। সবাই
মান-সন্মানের কথা ভাবে। মেয়ে বড় হলে যদি কিছু একটা করে বসে। তাই যত তারাতারি
সম্ভব বিয়েটা দিয়ে ফেলে। বাল্য বিবাহের প্রবণতা থাকা পর্যন্ত আমাদের সম্প্রদায়
অন্যান্য সম্প্রদায়ের থেকে পিছিয়ে থাকবেই।
প্রায় চার বছর হলো। আমিনা বলল- আমার শশুড় সুফি পীর। অনেক মুরিদান আছে তাঁর।
ধুবড়ির দিকে তাঁর একজন মুরিদান আছে। তার মেয়ে লিখা-পড়ায় ভালো। একদিন সে আমাদের
বাড়িতে এসেছিলো। তখন আমার শশুড় সাহেব তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার মেয়েটাকে বিয়ে দিলে নাকি?
তখন সেই মুরিদান বলল- না, দিইনি। এইবার
ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। দোয়া করবেন, যাতে পাস করতে
পারে।
আমার শশুড় বললেন- ম্যাট্রিক দিয়েছে! তাহলে এইবার বিয়েটা দিয়ে ফেল। মেয়ে
মানুষ বেশি পড়িয়ে লাভ নেই। চৌকা হেঁসেলই তো দেখতে হবে শেষমেষ। ম্যাট্রিক পাস করলে অনেক পড়া হবে।
তখন সেই মুরিদান বলল- বিয়ের প্রস্তাব তো অনেক আসতেছে। পড়ার কথা বলে সবাইকে
ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখতেছি।
ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখে আর কাজ নেই। পারলে বিয়েটা দিয়ে ফেল।
মুরিদান কিছু শিক্ষিত। লিখা-পড়ার মর্যদা বুঝে। সে বলল- মেয়েটা লেখা-পড়ায়
ভালো। এখন বিয়ে বসবে না।
বিয়ে বসবে না? বললেই হলো নাকি? আমার
শশুড় বললেন- বলধের কাছে শুনে নাঙল বাই দিবে নাকি? ভালো
সম্বন্ধ আসলে বিয়েটা দিয়ে ফেলবে।
আমার শশুড়ের কথা মতো অবশ্যি বিয়ে দেয়নি। সে ম্যাট্রিকে এবং হায়ার
সেকেন্ডারিতে সব কয়টা বিষয়ে লেটার মার্ক নিয়ে পাস করার পর নীট দিয়ে ডাক্তারিতে
ছিট পেয়েছিলো। সেই মেয়েটি এখন ডাক্তারি পড়তেছে। এরূপ বলেই আমিনা বলল-বিয়েটা
দিলে কি হতো ভাবেন তো?
কী আর হতো। চৌকা হেঁসেল দেখতো। আর আমাদের সমাজে একজন ডাক্তার কম হতো।
কথায় কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল। আমিনা ব্যস্তভাবে বলল- দোকান খোলা রেখে এসেছি।
আমি এখন উঠব।
আপনি একটা কাজ করতে পারেন।
কী কাজ?
আপনার দেখছি লিখা-পড়ার প্রতি অনেক আগ্রহ। ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা দিয়ে ফেলেন।
যে সব ঝামেলা মাথায় নিতে চলেছি। এখন কী আর সম্ভব হবে?
ঔযে বললাম ইচ্ছে। ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব হয়।
সে পরে দেখা যাবে। আগে দোকানটা তো ঠিক করে নিই।
অবশ্যেই, বললাম বলে আজই যে করতে হবে তেমন তো কথা
নয়। ভাবেন, পাড়লে কাজটা করার জন্য চিন্তা করবেন। শিক্ষা অবিহনে
জীবনটা আধুরে হয়ে থাকে।
ঠিক আছে। আপনার কথা আমি মাথায় রাখব।
বার
বন্দোবস্ত মতেই আমিনা পনের দিন পরে দোকানের দায়িত্ব বুঝে নিলো। পনের দিন
দোকান বন্ধ রেখে রশিদের পরামর্শ মতো দোকানের দেয়াল এবং মেঝেতে রঙের কাজ করালো।
দেয়ালে হালকা আকাশী রঙ এবং মেঝেতে জলরঙ। আগের টেবিল চেয়ার ভাঙাচুরা বেপারির কাছে
বিক্রী করে নতুন করে টেবিল চেয়ার কিনে আনলো মেঝের রঙের সাথে মিলিয়ে জলরঙের। রঙ
করার পরে দেয়াল, আসবাব মিলিয়ে ঘরটা একেবারে ঝকঝকে হয়ে
উঠল।
একদিন রশিদ দোকানের কাজ কেমন চলছে দেখতে এসে দিনের বেলাতে-ই লাইট জ্বালিয়ে
বলল- বাঃ! খুব সুন্দর হয়েছে। এখন গ্রাহকদের মনে হবে নীল আকাশের তলে সাগরের মাঝে
ভেসে ভেসে চা খাচ্ছে। এভাবে মন্তব্য করে একটি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল-
রোমটিতে একটা শান্তি শান্তি, স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব
বিরাজ করছে। ঘরের কাজ বলতে গেলে সম্পূর্ণই হয়েছে। এখন আর শুধু একটি কাজ বাকি আছে।
এতো কাজ করার পরেও আবার কী কাজ বাকি আছে বলে মনে হচ্ছে আপনার? আমিনা বিস্ফারিত চোখে রসিদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো।
রসিদ বলল- অবাক হবেন না। কথাটা বললেই আপনারও মনে হবে কাজটা সত্যিই বাকি আছে।
কী কাজ?
রশিদ গম্ভীর গলায় বলল- অনেকে প্রস্রাব পায়খানা ব্যবহারের জন্যও চা খেতে আসে।
এখানে প্রস্রাবখানার অবস্থা খুবই বিশ্রী। শুধু এ দোকানেই নয়। মুসলিম মানুষের যে
কয়টা চায়ের দোকান আছে, সব কয়টির অবস্থাই প্রায় এক রকম। তাই
প্রস্রাবখানার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। পায়খানার ব্যবস্থা করতে পারলে আরও ভালো
হয়।
রশিদ মন্দ বলেনি, দোকানের পেছনে একটি মাত্র প্রস্রাবখানা।
পুরুষ এবং মহিলা উভয়ে ব্যবহার করে প্রস্রাবখানাটি। তার জন্য অনেক অসুবিধা হয়।
ভদ্রঘরের মহিলারা এই অসুবিধার জন্য দোকানে আসতে চায় না। একদিন তো একটি মহিলা
দোকানে এসে প্রস্রাবখানা থেকে এসে বলেই ফেলছিলেন- না, চা খাব
না। আপনাদের প্রস্রাবখানা দেখে চা খাওয়ার নিশাটা চলে গেছে।
মহিলাটি সেদিন চা না খেয়েই চলে গিয়েছিলো। তার সাথে আরও দু’জন মহিলা ছিলো। তার সাথে তারাও চলে গিয়েছিলো। পায়খানার
ব্যবস্থা নেই। কর্মচারিরা অন্য হোটেলে গিয়ে পায়খানা করে।
কথাটা আমিও যে ভাবিনি তা নয়। আমিনা ইতস্ততঃ করে বলল- তবে, লোকে বলে না অবস্থা গুণে ব্যবস্থা। রং করা, চেয়ার, টেবিল কিনতেই অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল। এখন
হাতে মোটেই টাকা নেই। টাকা হলেই করব ভাবছি।
রশিদ একটু রাগান্বিত সুরেই বলল- যাই করতে বলি শুধু টাকার দোহাই দিয়ে বসেন।
আরে, টাকা তো লাগবেই। পরে করবেন ভেবেছেন। যারা
প্রথমে এসে প্রস্রাবখানার অবস্থা দেখে নাক সিঁটকিয়ে চলে যাবে তারা আবার দোকানে আসবে
ভেবেছেন? প্রথম থেকেই এমন একটা পরিবেশ নিয়ে দোকানটা শুরু
করতে হবে যেন সব দিক থেকেই পারফেক্ট থাকে। এর নাম ব্যবসা বুঝেছেন। সরকারি অফিস নয়
যে চামবাদুড়ের গু থাকলেও লোক আসবে! পাশেই ট্রেজারি অফিস। অনেক ভদ্রলোক আসে অফিসে।
এখানকার দোকানের অবস্থা ভালো নয় বলে তাঁরা অন্যত্র গিয়ে চা খায়। পাশে ভালো
দোকান থাকলে তাঁরা সবাই এখানেই চা খাবে।
দেখি টাকা যদি যোগাড় করতে পারি, করার
চেষ্টা করব।
আমি আপনাকে আগেই বলেছি টাকার চিন্তা করবেন না। ব্যাঙ্কে আমার কিছু টাকা জমা
আছে। এক লাখের মতো দিতে পারবো।
কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক ধার করে ফেলেছি। আর ধার করতে ভরসা পাচ্ছি না।
রশিদ বলল- ভয় করাটা স্বাভাবিক। ভয় করার প্রয়োজনও আছে। ভয়ের বিষয় নিয়ে
একটা গল্প বলি শুনুন। আমাদের রাষ্ট্রপতি এ, পি,
জে আব্দুল কালাম মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকন'লজিতে
এরোনটিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং পড়ার সময় ইনস্টিটিউট-এর প্রফেসর কালাম স্যারকে একটি
প্রজেক্ট প্রস্তুত করতে বলেছিলো। কালাম প্রজেক্টটি প্রস্তুত করে প্রফেসর-এর কাছে
জমা দিলে প্রফেসর লক্ষ্য করলেন, প্রজেক্টটিতে অনেক খুঁটিনাটি
ভুল রয়ে গেছে। তখন প্রফেসর তিনদিনের মধ্যে প্রজেক্টটি পুনরায় প্রস্তুত করে জমা
দিতে বললেন। তখন এখনকার মতো কম্পিউটার ছিল না, তাই কালাম
বলেছিলো- স্যার তিনদিনের মধ্যে প্রজেক্ট সম্পূর্ণ করে জমা দেওয়া সম্ভব হবে না। আরও
কয়েকটা দিন বাড়িয়ে দিন। তখন প্রফেসর বলেছিলেন- তিনদিনের মধ্যে প্রজেক্টটি
সম্পূর্ণ করে জমা দিতে না পাড়লে তোমার স্কলারশিপ বন্ধ করে দেওয়া হবে। তখন কালাম
স্কলারশিপ হারানোর ভয়ে প্রজেক্টটি তিনদিনেই সম্পূর্ণ করে প্রফেসরের কাছে জমা দিয়েছিলো।
কাহিনীটি বলেই রশিদ বলল- আপনি নতুন দোকান করবেন। তাই ভয় করাটা একেবারে
স্বাভাবিক। ভয়ে মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে। একটা কথা মনে রাখবেন, এখানে যত টাকা খরচ করবেন সবই আপনার মূলধন হবে। মূলধন ছাড়া
ব্যবসা হয় না। কথা হলো, আপনি তো আমার কাছে ধার চাননি। আমি
যেচে দিতে চাইছি।
কিন্তু আপনি টাকা দিবেন কেন?
আপনার দোকানটা পারফেক্ট হোক তারজন্যেই দিতে চাইছি। লজ্জা না করে টাকা নিয়ে
কাজগুলি করে ফেলুন। চিন্তা করবেন না। আমি আপনার কাছে টাকা চাইব না। আপনার হাতে টাকা
হলেই আমাকে দিবেন।
তবুও আমি এতো টাকা খরচ করতে ভরসা পাচ্ছি না। আমিনা নিজের দুর্বলতার কথা জানাল-
কোনোদিন ব্যবসা করিনি। প্রথম প্রথম শুরু করতে যাচ্ছি, যদি সফল হতে না পারি, তাহলে একেবারে
লাটে উঠব। মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। বাবার সাথে বিদ্রোহ করে বাড়ি
ছেড়েছি। যদি বিফল হই, বাবার কাছে গিয়েও তখন দাঁড়াতে পারব
না। অনেক ধার করেছি। ধারটার করে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছি। আরও ধার করলে ধার শোধ
করব কীভাবে?
ধার করেছেন, প্রয়োজন হলে আরও করতে হবে। রশিদ নিজের
অভিজ্ঞতার কথা জানাল- বয়স আমার কম হয়নি। পঁয়ত্রিশ বছর পার করেছি। চালান না হলে
কিছুই হয় না। আগে চালান খাটাতে হয়, তারপরে ব্যবসা হয়।
লিখা-পড়া করতে চালান লাগে, মানুষের সাথে খাতির জমাতে হলেও
চালান লাগে। রাজনীতি করবেন, সেখানেও চালান লাগে। চাষ-আবাদ
করবেন, সেখানেও চালান লাগে। চালান ছাড়া কী হয় বলেন? যত বেশি চালান খাটাবেন, তত বেশি লাভ
হবে। আর এতো ব্যবসা। এখানে চালানের কথা চিন্তা করলে চলবে কেন?
রেজিয়া কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সে মনে মনে উভয়ের কথা শুনছিলো। সে বলল- যেচে
দিতে চাইছে, তুই নিতে ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই দোকানে কাজ করছি। এখানে কি আছে আমি জানি। তুই
দোকানটা রশিদ ভাইর কথা মতো দাঁড় করা। ঠিক মতো চালাতে পারলে, একদিন রাজা হতে পারবি। আমরা তো আছি, তোর ভয় করার
কিছুই নেই।
ঠিক আছে, এতো করে যখন বলছ, তোমাদের
কথা মতেই কাজ করে দেখি কী হয়!
রশিদ বলল- আপনাকে প্রস্রাবখানা, পায়খানা
পাক্কা করতে হবে না। টিনের বেড়া দিয়ে মেঝেতে ইঁট বিছিয়ে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করলেই
হবে। দু'টি কেবিনের মতোও করতে হবে। সামনেই একটি প্রাইভেট
কলেজ শুরু করেছে। কলেজের ছেলেমেয়েরা সেখানে বসে চা খাবে। অনেকে নতুন বউকে নিয়ে
সহরে বেড়াতে আসে, তারাও সেখানে বসতে পারবে।
আমিনা রশিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুরুষ এবং মহিলার জন্য দু'টি পৃথক প্রস্রাবখানা নতুন করে বানাল। একটি লেট্রিনও বানাল টিনের
বেড়া দিয়ে। তলে ছোট মতো একটা ট্যাংকি বানাল। টিউবওয়েলের পাড়টা আগে কাঁচা ছিলো।
সব সময় কাঁদা জমে থাকতো। কর্মচারিরা তো বটেই, গ্রাহকদেরও
অনেকে আপত্তি করতো। টিউবওয়েলের পাড়টাও ইঁট বিছিয়ে সিমেন্ট ঢেলে ঢালাই করল।
দোকানটা বলতে গেলে ভদ্রলোকের জন্য যতদূর সম্ভব পারফেক্ট করে তুলল। একদিন রশিদের
সাথে গিয়ে সাইনবোর্ডটা লিখিয়ে এনে দোকানের সামনে টানিয়ে দিলো। ‘মিস্টিমুখ’ এখানে চা মিস্টি দৈ সূলভ মূল্যে পাওয়া
যায়।
তের
সতের দিনের মাথায় দোকানটা ব্যবহারের উপযোগি হয়ে উঠল। দোকান শুরু করার আগের
দিন মসজিদের ইমামকে ডেকে এনে দরুদ শরিফ পাঠ করালেন। পরের দিন থেকে দোকান শুরু
করলেন। সেদিন দোকানের আশপাশের সবাইকে ডেকে ডেকে মিস্টিমুখ করালেন।
দোকানের বেচাকিনা ভালোই হতে লাগল। আগে শিক্ষিত লোকগুলো দোকানে আসতে চাইত না।
দোকানের পরিবেশ দেখে তাঁরাও ধীরে ধীরে আসতে শুরু করলো। একমাসের মধ্যে দোকানের
বেচাকিনা আগের থেকে দু’গুণ বেড়ে গেল। শুকুরজান অন্য দোকানে কাজ
করতো, আমিনা তাকে নিজের দোকানে কাজ করার জন্য নিয়ে এলো। সবার মায়না বাড়িয়ে দিলো। মায়না বেশি পেয়ে কর্মচারিরা দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করতে লাগল।
মফিজ কিছু লিখা-পড়া জানত। সে বিশ্বাসীও। তাই তাকে বাজার করার দায়িত্ব দিলো।
কয়েক মাসের মধ্যে দোকানের কেনাবেচা এমন একটা পর্যায় পেল, যে আমিনা একা দোকান সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল।
একদিন আফসের ফকির দোকানে এলো। আফসের ফকিরকে দেখে আমিনা এগিয়ে এসে বসতে বলল-
আব্বা আপনি? আসুন, বসুন।
‘আব্বা’ ডাকটা আপনা আপনিই আমিনার মুখ থেকে
বেড়িয়ে গেল। তারা মিয়ার সাথে এখনও তার ছাড়াছাড়ি হয়নি। তাই সম্ভবতঃ আব্বা
ডাকটা বেড়িয়ে গিয়েছিলো।
আফসের ফকির গদগদ কণ্ঠে বলল- এখনও তুমি আমাকে আব্বা বলে ডাকছ? তারা মিয়া যে কী রত্ন হারিয়েছে, তা
তার মতো আহম্মক কোনোদিন এ কথা উপলব্ধি করতে পারবে না।
ও-সব কথা থাক এখন, আব্বা। আমিনা বলল- আমাদের তো আর ছাড়াছাড়ি
হয়নি। তাই আব্বা বলে না ডেকে কি বলে ডাকব?
আপনি বসেন। বসে কথা বলেন।
আফসের ফকিরকে একটা চেয়ারে বসিয়ে মফিজকে ডেকে বলল- মফিজ, মিস্টি আর চা নিয়ে আয় তো ভাই।
আফসের ফকির বলল- না না, মা। আমি চা খাব না। চা খাওয়ার তেমন অভ্যেসও নাই। মা, আমি
একটি প্রয়োজনে এসেছি তোমার কাছে।
প্রয়োজন? কি প্রয়োজন?
বলতে ভরসা পাচ্ছি না মা। কোনমুখে বলি তাই ভাবছি।
মফিজ চা মিস্টি নিয়ে এলো। আমিনা মিস্টির প্লেটটা আফসের ফকিরের দিকে এগিয়ে
দিয়ে বলল- আগে চা খান। পরে কথা বলব। বয়েস হয়েছে। এখন চা মিস্টি খেতে খেতে কথা
বললে গলায় আঁটকে যেতে পারে!
আফসের ফকির চা মিস্টি খেয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ পরে আমিনা মফিজকে ক্যাশ-এ
বসিয়ে এসে বলল- কিছু মনে করবেন না। একা দোকান সামলানো খুবই কঠিন। বলেন, কী বলতে চাইছেন?
কী আর বলব, মা। আফসের ফকিরের মুখমন্ডল মেঘলা দিনের
সন্ধ্যের মতো বিষণ্ণ হয়ে উঠল- আমি খুবই বিপদে পড়ে এসেছি তোমার কাছে।
বিপদ, কী বিপদ?
তারা মিয়া তো অনেক দিন ধরে বাড়ি ছাড়া। তার কোনো খবরই নেই আমাদের কাছে।
শুনেছি, সে বোলে লক্ষ্ণৌ কাগজ কুঁড়ানোর কাজ করে।
এমন সময় মফিজ ডাকল- আপা, বাজার আনতে যেতে
হবে। চা'পাত, চিনি নেই।
আমিনা বলল- একটু পরে আনলে হবে না?
না আপা, এক্ষুনি আনতে হবে।
আমিনা কেস থেকে টাকা বের করে মফিজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল- একটু তারাতারি
আসার চেষ্টা করো। আমার শশুড় আব্বা এসেছে। তার সাথে কথা বলতে হবে।
আফসের ফকিরের দিকে অনুসন্ধিৎসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে মফিজ বলল- এ আপনার শশুড়? দাড়ি চুল দিয়ে একেবারে মস্তানের মতো দেখা যাচ্ছে।
গাঞ্জাটাঞ্জা খায় নাকি, আপা?
সে জেনে তোর কী হবে? তুই তারাতারি দোকানে গিয়ে যা আনার নিয়ে
আয়। বেশি পাকামি করবি না।
মফিজ এখন আদর পেয়ে পেয়ে খুবই বাচাল হয়ে উঠেছে। আগে প্রয়োজন না হলে কথাই
বলত না। এখন মুখ দিয়ে কথার খই ফুটে।
মফিজ চলে গেল। আমিনা শশুড়ের কাছে এসে বলল- বলুন আব্বা, কী বলতে চাইছেন। দোকানে এখন খুবই ভিড় ক্যাশ ছেড়ে উঠে আসা
সম্ভব হচ্ছে না। খারাপ পাবেন না।
তোমার দোকানে এত গ্রাহক আসে?
সবই আপনাদের দোয়া, আব্বা। আম্মার কথা জিজ্ঞাসা-ই করা হয়নি।
আম্মা কেমন আছে?
ভালোই আছে। নাতি দু'টির কথা মনে করে অনেক সময় কাঁদে। তোমার
কথাও বলে থাকে। তোমার কোনো দোষ নেই, মা। সবই আমাদের কপালের
দোষ। তারা মিয়ার দোষ। আমাদের মুসলমানের তো দুই বিয়ার বিধান আছেই। সে এভাবে বাড়ি
ছেড়ে পালাল কেন? ছেলে দু’টির কথাও কী
মনে পড়েনা তার। সোনার চাঁদ দু'টি ছেলে!
সে সব কথা এখন অনেক পুরাণা হয়ে গেছে, আব্বা।
এখন সে সব কথা বলে লাভ নেই। আপনি কী জন্য এসেছেন, তাই বলুন।
বলব বলেই তো এসেছি। তবে, কোনমুখে বলব,
তাই ভাবছি।
আমিনা কথাটা কিছু অনুমান করতে পারলো। সম্ভবতঃ কেসের কথা বলতে এসেছে। সে আবার
ত্রিশ হাজার টাকা খোরাকি ডিক্রি পেয়েছে। কোর্ট থেকে তাকে নোটিশ দিয়েছে। নোটিশ
সম্ভবতঃ তার শশুড়ও পেয়েছে। টাকাটা এখন দিতে পারবে না। কয়েকদিন সময় লাগবে তাই
বলতে এসেছে সম্ভবতঃ!
আমিনা বলল- আপনি যা বলতে এসেছেন, দ্বিধাহীনভাবে
বলে ফেলুন। কোনো অসুবিধা নেই।
বলতে এসেছি । বলবোই তো। ফকির আবার কথার প্রসঙ্গ
এড়িয়ে বললেন- নাতি দু’টির সাথে দেখা করতে না, মা।
কেন পারবেন না। আপনাদেরই তো রক্ত। তবে, ওদের
সাথে দেখা করতে হলে কিছুটা সময় বসতে হবে। ওরা এখন স্কুলে আছে। স্কুল ছুটির পরে
রোমে আসলে দেখা করতে পারবেন। স্কুল ছুটি হতে ঘন্টা দু'য়েক
লাগবে।
ঠিক আছে মা। আমার কাছারিতে একটু কাজ আছে। আমি কাজটা সেরে দু'ঘন্টা পরেই আবার আসব।
আফসের ফকির কাছারিতে চলে গেল। কিন্তু আমিনার মন থেকে দ্বিধা দূর হল না।
নাতিদের সাথে দেখা করতে এলে নিশ্চয় বলতে এতো দ্বিধা করতো না। নিশ্চয় সে যা
ভেবেছে কথাটা আসলে তাই-ই হবে। ঠিক আছে, দেখাই
যাক কীজন্য এসেছে! বলতে যখন এসেছে, তখন নিশ্চয় না বলে যাবে
না।
ঘন্টা দু'য়েক পরে আফসের ফকির এলেন।
আমিনা মফিজকে ডেকে বলল- মাফিজ, তুই
দোকানটা দেখিস। আমি একটু রোমে যাব।
শশুড়কে নিয়ে আমিনা রোমে এলো। আশ্রাব এবং ফিরদুস স্কুল
থেকে এসে রোমেই বসেছিলো। মাকে দেখে তারা দৌড়ে এল। কিন্তু সাথের দাঁড়িয়ালা লোকটিকে দেখে তারা থমকে দাঁড়াল।
আফসের ফকিরকে দেখিয়ে আমিনা বলল- দেখ তো কে এসেছে, চিনতে পারিস নাকি?
উভয়ে আফসের ফকিরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আফসের ফকির বলল- চিনবে কী
করে? প্রায় এক বছর আগে দেখা হয়েছিলো। এভাবে
বলেই সে ফিরদুসকে কাছে টানল। কিন্তু ফিরদুস হাত ছাড়িয়ে মার আঁচলের তলে এসে
লুকাল।
আশ্রাব বলল- দাদু নাকি, মা?
এবার আফসের ফকির উৎসাহিত হয়ে উঠল। আশ্রাবকে কাছে টেনে নিয়ে শরীরে মাথায় হাত
বুলিয়ে আদর করে বলল- হ্যাঁ দাদু ভাই, আমি
তোদের দাদু। আফসের ফকির।
আফসের ফকির ব্যাগ থেকে জিলেপি বার করে আশ্রাবের হাত দিলো- খাও দাদু ভাই, তোমাদের জন্যই এনেছি।
রক্তের টান যাবে কোথায়? দাদু বলে পরিচয়
পাওয়ার পরে ফিরদুসও মার আঁচল ছেড়ে আফসের ফকিরের কাছে এলো।
দাদুর আদর পেয়ে উভয়ের জড়তার ভাব কেটে গেল। আশ্রাব বলল- আমাদের দেখতে আস না
কেন, দাদু?
আমিনা চোখ টিপে কিছু বলতে বারন করলো। আফসের ফকির চোখের ইশ্বারা বুঝতে পারল।
তাই বলল- সময় পাই না, দাদু ভাই। বাড়িতে অনেক কাজ ৷ তুই তো জানিস,
তোর বাবা বিদেশে থাকে। তাই আমাকেই সব কাজ করতে হয়।
তবু মাঝে মাঝে আসতে হবে। না আসলে আমি কথাই বলব না।
আসব দাদু ভাই, নিশ্চয় আসব।
যাও তোমরা জিলেপি খাওগে’। মার জন্যও দু’টো রাখতে ভোল না যেন। নাতিদের এভাবে বলেই
আফসের ফকির বলল- মা, আমি খুবই অসুবিধায় পড়ে এসেছি। তারা
মিয়ার তো বলতে গেলে এখন খবরই নাই। আমাদের কোনো খোজঁখবরই রাখে না সে। শুনেছি, সে লক্ষ্ণৌ কাগজ কুঁড়ায়।
তারা মিয়ার কথা বললেই আমিনার মনে অভিমানের সাথে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। তাই সে
একটু উষ্মার সাথেই বলল- কথাটা আগেও একবার বলেছেন, আব্বা।
বৃদ্ধ মানুষ। কখন কী বলি মনে থাকে না। কিছু মনে করো না। আফসের ফকির বলল- এ বার
কাজের কথা বলি। তুমি নিশ্চয় শুনেছ, আবার
ত্রিশ হাজার টাকা ডিক্রি হয়েছে। তারা মিয়া তো বাড়ি নেই। তিনবার নোটিশ গেল। এখন
আমি কী করি, বলতো মা?
এ কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? কেমনে
দিবেন, কি করবেন সে আমি কী জানি? টাকা দেওয়ার দায়িত্ব তো
আপনার না, আপনার ছেলের দায়িত্ব। আপনার ছেলেকে পুলিশ দিয়ে
ধরিয়ে আনেন।
সে পারলে তো আনতামই, মা। আমি বৃদ্ধ মানুষ, কোথায় তাকে তালাশ করতে যাব?
সে আমি কী জানি? আপনি যেমনে পারেন, আনবেন।
মা, দু’বার সময় নিয়েছি।
এবার যদি টাকা আদায় দিতে না পারি, উকিল বলেছে পুলিশ আমাকে
ধরে আনবে। আফসের ফকির উঠে এসে আমিনার হাতে ধরে বলল- আমাকে কয়েকটা মাস সময় দিতে
হবে, মা। আমি নিশ্চয়ই তোমার টাকা পরিশোধ করব।
আপনি আমাকে অপরাধী করবেন না, আব্বা। আপনি মুরব্বি
মানুষ। আপনি আমার হাতে ধরলে আমার পাপ হবে। আপনাদের হাত থাকবে আমাদের মাথায়।
আমিনা হাত ছাড়িয়ে নিলো।
আমি তোমার কাছে অপরাধী, মা।
অপরাধী বলেই তো দন্ড দিতে হচ্ছে।
আমায় নিরাশ করোনা, মা। আফসের ফকির অনুরোধের সুরে বলল- আমি
খুবই আশা করে এসেছি। আমি জানি, তুমি আমাকে নিরাশ করবে না।
কথাটা আমি দোকানেই বলতে চেয়েছিলাম। তবে, অত লোকের সামনে
বলতে সাহসে কুলোয় নি।
এমন সময় রশিদ এলো। বৃদ্ধলোকটিকে দেখে রশিদ সালাম জানাল- আসসালামু আয় কুম, চাচা।
ওয়া আলায়কুম আসসালাম। সালামের জবাব দিয়ে আফসের ফকির বলল- তোমাকো তো চিনলাম
না, বাবা?
আমিনা বলল- ফিরদুসদের টিউশন মাষ্টার মশায়।
অ’, ভালো। তা বাবা, তোমার
বাড়ি কোথায়?
চড়ে ছিলো। এখন সেখানে থাকি না। চড় ভেঙে গেছে। এখানে এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি
বানিয়েছি।
তাই নাকি? খুব ভালো। এভাবে বলেই আফসের ফকির বললেন-
বাবা-মা আছে। ছেলেপুলে?
আগেকার বৃদ্ধ লোকদের এই এক স্বভাব। চেনা নেই, জানা
নেই অপরিচিত লোক দেখলেই চৌধ্যগুষ্টির খবর নিতে শুরু করে!
আমিনা লক্ষ্য করল রশিদ অস্বস্তিতে পড়েছে। বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এ কথা বলতে
নিশ্চয় সে দ্বিধাবোধ করছে। দ্বিধা করাটা স্বাভাবিকও। জোয়ান বয়সে বউ অন্যের সাথে
পালিয়ে গেলে সে কথা বলতে কার না দ্বিধাবোধ হবে? তারা
মিয়া যে তাকে ছেড়ে অন্যের বউ নিয়ে পালিয়ে গেছে এ কথা বলতে তারও তো অস্বস্তিবোধ
হয় !
তাই আমিনা মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল- আপনাদের এই এক দোষ। কাউকে দেখলে, তার চৌধ্যগুষ্টির খবর না নিয়ে ছাড়বেন না।
মা, অভ্যেস হয়ে গেছে। অতদিনের অভ্যেস ছাড়ি
কেমনে বল! অচেনা কাউকে দেখলে তার বিষয়ে জানতে কৌতূহল জাগে। এভাবে বলেই আফসের ফকির
রশিদকে উদ্দেশ্য করে বললেন- বাবা, খারাপ পেয়োনা। বৃদ্ধলোক,
কখন কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় খেয়াল করতে পারি না।
রশিদ বলল- না না, খারাপ পাইনি। আপনারা মুরব্বি মানুষ। অচেনা
লোক দেখলে পরিচয় নিতেই পারেন।
আমিনা দেখল, রশিদও সহজ সরল লোক। নিজের দুর্বলতার কথা
বলেও দিতে পারে। তাই আমিনা বলল-যুগ বদলেছে, আব্বা। এখন
আপনাদেরও স্বভাব বদলাতে হবে। এভাবে মন্তব্য করেই বলল- আমাকে দোকানে যেতে হবে।
আপনিও চলুন আমার সাথে। ফিরদুসদের এখন টিউশনের সময় হচ্ছে। ওরা এখন পড়তে বসবে।
রশিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমিনা শশুড়কে নিয়ে একটি কাপড়ের দোকানে এলো।
শশুড়ের জন্য পাঞ্জাবি-পায়জামার কাপড় এবং শাশুড়ির জন্য একটি শাড়ি কিনে শশুড়ের
হাতে দিয়ে বলল- পাঞ্জাবি-পায়জামা বানিয়ে নিতে হবে। এখানে বানাতে গেলে সময়
লাগবে। শাড়িটা আম্মাজানকে দিবেন। এভাবে বলেই পাঁচশ টাকার একটি নোট বের করে
শশুড়ের হাতে দিয়ে বলল-দর্জি দিয়ে পাঞ্জাবি-পায়জামা বানিয়ে নিবেন। শাশুড়ি
আম্মাকে আমার সালাম জানাবেন।
আফসের ফকির গদ্গদ্ কণ্ঠে বলল- তোমার সাথে আমরা কী করেছি, আর তুমি আমাদের সাথে কী করছ? বেঁচে থাক,
মা। আল্লাহ তোমাকে হায়াত দারাজ করুন। কামাই রুজিতে বরকত দিন।
চৌদ্দ
সেদিনই রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমিনা রেজিয়ার রোমে গিয়ে বলল- আপা, খাওয়া-দাওয়া করেছ?
রেজিয়া পাণ বানাচ্ছিল। সে পাণ মুখে পুরে বলল- হ্যাঁ, করলাম। আজ তোর শশুড়কে দেখলাম। কেন এসেছিলো?
সেই কথা বলতেই তোমার কাছে এসেছি। আমিনা একটু থেমে বলল- আবার ত্রিশ হাজার টাকা
ডিক্রি হয়েছে। টাকার জন্য সময় চাইতে এসেছিলো।
তুই কি বললি?
কিছুই বলিনি। ভাবছি, তোমার সাথে আলোচনা করে বলব।
টাকা-পয়সার বিষয়! এ নিয়ে আমি আর কী বলব? তুই কী
ভেবেছিস, তাই আগে বল?
ভেবে,কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। তাই তো তোমার
সাথে পরামর্শ করতে এলাম। ফিরদুসের আব্বার তো খবরই নেই। বলল, লক্ষ্ণৌ
থাকে। টাকা দিতে হলে শশুড় আব্বাকেই দিতে হবে। এখন বৃদ্ধ মানুষটাকে জ্বালাতন করে
কী হবে? দু’বার নোটিশ গেছে। এইবার
আশ্রাবের আব্বাকে হাজির করতে না পারলে শশুড় আব্বাকেই ধরে আনবে।
দেখ, সে তোর কথা! আমি আর কী বলব? সময় চাইছে যদি দিয়ে দে।
ভাবছি, সময় আর দিব না। কেসটাই তোলে দিব।
কেস তোলে কাজ নেই। রেজিয়া পরামর্শ দিলো- টাকা পেয়েছিস বলে কোর্টে একটা
দরখাস্ত দে। তাই তোর শশুড়ের কাছে আর টাকা চাইবে না।
কাল কোর্টে গিয়ে দেখি উকিল কী বলে! | এভাবে
মন্তব্য করেই আমিনা বলল- আপা, শুনেছ, কাল
গাড়ি মটর, দোকান সব বন্ধ থাকবে? ছাত্রসংস্থার
বন্ধ।
কিছু কিছু বাতাস অবশ্যি পাচ্ছি। তেমন ঘোরতর করে কিছু শুনিনি। ছাত্রসংস্থার
বন্ধ হলে তো সবাই মানবে।
আব্বার শুনেছি কয়েক দিন ধরে পেটের বিষ। ডাক্তার দেখিয়েছে। এক্সরে করে
কিডনিতে পাথর ধরা পড়েছে।
পাথর চুনের পাতা খেলেও বোলে কিডনির পাথর গলে যায়।
আমিও অবশ্যে শুনেছি। সেদিন আজমত ভাইর কাছে
বলেও দিয়েছি পাথর চুন-এর পাতা খেতে।
পাথর চুনের পাতার শুনছি খুব উপকার। রেজিয়া বলল- আমাদের গ্রামের আক্রাম
শিকদারের ছেলে মোতালেবের কিডনিতে পাথর হয়েছিলো। ডাক্তার অপারেশন করার কথা
বলেছিলো। তারা কালনা গিয়ে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। একমাস পরে কালনা
গিয়ে এক্সরে করে দেখে তার কিডনিতে পাথর নেই।
মানে? তারমানে তার পাথর হয়নি?
পাথর হয়েছিলো ঠিকই। রেজিয়া বলল- কালনা যাওয়ার আগে মোতালেবের আম্মা একমাস
সকাল বিকেল পাথর চুনের রস করে খাইয়েছিলো। তার জন্য পাথর নাকি পাথর গলে গিয়েছিলো।
তাই নাকি? তাহলে তো পাথর চুনার পাতার খুব উপকার!
আমিনা প্রসঙ্গ বদলিয়ে বলল-অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয়নি। পরশু যদি দোকান বন্ধ রাখতে
হয়। তাহলে চল, আব্বাকে দেখে আসি।
পরের দিন কোর্টে গিয়ে উকিলের সাথে পরামর্শ করে ডিক্রির টাকার বিষয় রফা করে
এসে বলল- ছ'মাসের মধ্যে আর নোটিশ যাবে না। টাকা বুঝে
পেয়েছি বলে কোর্টে দরখাস্ত দিয়ে এসেছি।
কাল বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে তো।
হ্যাঁ, আছে। সকাল সকালই বেরোব।
এমন সময় জমিলা এলো। জমিলাদের বাড়ি আমিনাদের গ্রামেই। তার পরামর্শ মতোই আমিনা
দর্জিকাজ শিখতে এসেছিলো।
জমিলা এখনও সেলিমের দোকানে দর্জি কাজ করে। সে বাড়ি থেকেই আসা যাওয়া করে।
বয়সে আমিনার থেকে তিন চার বছরের ছোট। মেয়ে হিসেবে জমিলা খুবই ভালো। অন্যান্য
মেয়েদের মতো চঞ্চল নয়। বাড়িতে বৃদ্ধ মা বাবা আছে। ভাইয়েরা আছে যদিও সবাই পৃথক
হয়ে গেছে। দর্জিকাজ করে জমিলাই এখন সংসার চালাচ্ছে। বিয়ে হয়েছিলো পাড়ারই একটি
ছেলের সাথে। কোনো ছেলে-পুলে হওয়ার আগেই ছেলেটি মটর একসিডেন্ট-এ চার বছর আগে মারা
গেছে। বাবা মার কথা চিন্তা করে জমিলা বিয়ের কথা ভাববার অবসরই পায়নি।
জমিলাকে দেখে আমিনা উৎসাহিত হয়ে উঠল। বলল- অনেকদিন পরে দেখলাম তোকে।
তোমার দোকান কেমন চলছে দেখতে এলাম। জমিলা বলল- সেলিম ভাই তোমার দোকানের খুব
প্রশংসা করে।
বোস, চা খা। আমিনা একটি চেয়ার এনে তার কাছেই
বসতে বলে মফিজকে চা মিস্টি নিয়ে আসতে বলল।
জামিলা বসল। বলল- দোকানটা কিন্তু খুবই সুন্দর হয়েছে। সেলিম ভাই এমনিতেই
প্রশংসা করেনি দেখছি। অনেক দিন ধরে আসার কথা ভাবছি। সময়ের অভাবে আসতে পারিনি।
জানই তো সংসারের সব কিছুই আমাকে দেখতে হয়। ভাইয়েরা আছে যদিও তারা বাবা মার খবর
নেওয়ার সময়ই পায় না।
চা এল। জমিলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মফিজের দিকে তাকিয়ে বলল- ছেলেটিকে কোথাও দেখেছি মনে হয়।
দেখতে পারিস। আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামের ছেলে। তোর মতোই দুঃখিত বলতে পারিস।
বাবা পঙ্গু। মার অসুখ লেগেই থাকে। এখন মফিজই সংসার চালায়। ছেলেটা খুব ভালো। কাজে
ফাঁকি নেই। লিখাপড়ায় ভালো ছিলো। অভাবের জন্য লিখাপড়া করতে পারেনি। ছেলে বয়সেই
সংসারের হাল ধরতে হয়েছে।
সংসারটা এ রকমই। দুঃখুও আল্লাহ দেয় এবং
বাঁচার উপায়ও আল্লাহই করে দেয়। জমিলা চাহ শেষ করে বলল- আজ
আর দোকানে যাব না। ছুটি নিয়ে এসেছি। আব্বার জন্য ঔষধ কিনতে হবে। ওষুধ কিনে বাড়ি
যাব।
ভালোই হলো। আমিনা বলল- আমিও আজ বাজার করব। বাজার মানে কাপড় কিনব।
তোর নিজের জন্য নাকি?
আগে বাজারে গিয়ে দেখি কার জন্য কিনতে পারি।
মফিজের ওপড় দোকানের দায়িত্ব দিয়ে জমিলার সাথে আমিনা বাজারে এলো। মা-বাবা, ভাই বউ, ভাইপো ভাইঝিদের জন্য কাপড় কিনে
দোকানে আসতে একেবারে সন্ধ্যে হয়ে গেল।
আমিনা দোকানে এসে মফিজকে ডেকে বলল- দোকানের জন্য বাজার করতে হবে নাকি?
হ্যাঁ আপা, চিনি আটা ময়দা কিছুই নেই। সবজিও আনতে হবে।
ক্যাশ থেকে টাকা বের করে মফিজের হাতে দিয়ে বলল- যাও, যত তারাতারি সম্ভব বাজার করে নিয়ে আসবে। আমি আজ একটু সকাল সকালই
রোমে যাব।
পনের
সকাল বেলা উঠে আমিনা চৌকায় চা বসিয়ে রেজিয়াকে ডেকে বলল- আপা, আজ আর এখানে রান্ধাবাড়া করব না। চা খেয়েই বেরোব। ভাত বাড়ি
গিয়েই খাব। কাল জমিলার কাছে বলে দিয়েছি। কাপড় পিন্ধে রেডি হয়ে নাও। রশিদ ভাইকে
সাতটায় আসার জন্য কালই বলে দিয়েছি। সে যেন এসে অপেক্ষা করতে না হয়। তুমি চা করো
না। আমি তোমার জন্যেও চা বানাচ্ছি।
ছেলে দু’টি কাল রাতেই শুনেছিলো, নানীর বাড়ি যাওয়ার কথা। নানীর বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে তারা খুব খুশি।
সকালবেলা উঠেই তারা কাপড় পড়ে বসে আছে।
চা খেয়ে আমিনারাও কাপড় পড়ে রেডি হলো।
রশিদ সাতটার পাঁচ মিনিট আগেই টেম্পো নিয়ে এলো।
ছেলে দু’টি হই হই করে গিয়ে টেম্পোতে উঠে বসল।
রাস্তা বেশি না। মোটে দু’মাইল রাস্তা। আগে
সবাই হেঁটেই সহরে আসত। ছেলেবেলা আমিনাও বাবার সাথে প্রয়োজনে হেঁটেই আসত সহরে। এখন
তা আর সম্ভব নয়। এখন এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, হেঁটে
আসার কথা কেউ ভাবতেই পারে না। হেঁটে আসতে গেলে নিজেকে কেমন যেন বুর্বকের মতো মনে
হয়। যেন মা মরা ছেলে একা একা হেঁটে যাচ্ছে। সবাই কেমন যেন আঁর চোখে তাকিয়ে থাকে।
চার পাঁচ মাস আগেও এরকম ছিল না। প্রথম যখন আমিনা দর্জি কাজ শিখতে আসত, তখন জমিলার সাথে হেঁটেই আসা যাওয়া করতো। এখন ইচ্ছা থাকলেও আর হেঁটে আসা
সম্ভব হতো না।। পরিবেশটা এরকমই তৈরি
হয়েছে।
তারা পনের মিনিটের মধ্যেই এসে বাড়ি পৌঁছোল। বাড়িতে সবাই তাদের উষ্ম স্বাগত
জানাল। ভাইপো-ভাইঝিরা দৌড়ে এলো।
আশ্রাব এবং ফিরদুস তো খুবই খুশি। প্রায় এঘার মাস পরে এসেছে তারা নানীর বাড়ি।
মামাতো ভাই-বোনেরা তাদের টেনেই বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল।
রশিদ বলল- আমি আর এখানে বসে থেকে কি করব? বাড়িতেও
কিছু কাজ আছে। কখন আসব বলে দিন।
আমিনা বলল- ভাত কয়টা খেয়ে গেলে ভালো হত।
না, বাড়ি গিয়েই খাব। কখন আসব বলেন?
রেজিয়াও পীড়াপীড়ি করতে লাগল ভাত কয়টা খেয়ে যাওয়ার জন্য।
রশিদ বলল- বন্ধের কথা শুনে বাড়িতে কিছু কাজ করব বলে আগে থেকেই প্ল্যান করে
রেখেছি। তাই থাকা সম্ভব হবে না। কখন আসব বলেন?
আমিনা বলল- থাকবেন না যদি কী আর বলব! সন্ধ্যের সময় আসবেন। রাতের ভাত কয়টা
কিন্তু এখানেই খেয়ে যেতে হবে।
রশিদ চলে গেল।
আমিনা এবং রেজিয়া তারেক মৃদার সাথে দেখা করল।
তারেক মৃদা বিছানায় শোয়ে আছে ওপুড় হয়ে।
ফুল খাতুন বলল- সারারাত ভালোই ছিলো। ফজরের নামজও পড়েছে। নামাজ পড়ার পর থেকে
বিষ বেড়েছে।
আমিনা বলল- পাথর চুনের পাতার রস খেতে দাও না?
খেতে দিইনা মানে? ফুল খাতুন বলল- সকাল বিকেল দুই বেলাই
খাওয়াই।
আমিনা ডাকল- আব্বা।
কে আমিনা ? তারেক মৃদা মাথা তোলে আমিনার দিকে চেয়ে
বলল- তুই আসবি কাল জমিলা বলে গেছে। আয়, কাছে এসে বস।বিষের
জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছি, মা।
কি আর করবে! অসুখ হলে তো কষ্ট হবেই। আমিনা সান্ত্বনা দিলো।
রেজিয়া বলল- আমিও এসেছি, কাক্কু।
ভালোই করেছ। তোমার খবরা খবর ভালো তো?
ভালোই আছি। রেজিয়া বলল- আমিনা দোকান দেওয়ার পর থেকে অবশ্যে ব্যস্ততা
বেড়েছে।
কথায় আছে না, কাঙালের থেকে জঞ্জাল ভালো। তারেক মৃদা
বিছানায় উঠে বসে বলল- বেঁচে থাকা পর্যন্ত কাজ ফুরোবে না, মা।
মানুষের আসলে কোনো দাম নেই। দাম হল কাজের। যত ব্যস্ততা বাড়বে মনে কর তোমার
দামও তত বাড়বে।
আমিনা আঙুর এবং বেদানা এনেছিলো। বেদানার রস বের পরে তারেক মৃদার দিকে বাড়িয়ে
বলল- আব্বা, তামার জন্য বেদানা এনেছি। রস বের করেছি।
রসটুকু খেয়ে নাও।
খেতে ইচ্ছে করছে না, মা। বিষটা একটু কমেছে। খেলে যদি আবার বেশি
হয়?
বেদানার রস খেলে কিচ্ছু হবে না। বেদানা তো রোগীরই পথ্য। আল্লাহর নাম নিয়ে
খেয়ে ফেল।
তারেক মৃদা রসের বাটি হাতে নিয়ে এক চুমুকে রস খেয়ে ফেলল।
আমিনা ভাই বউ, ভাইপো ভাইঝিদের ডেকে এনে ব্যাগ থেকে কাপড়
বের করে যার যার হাতে দিলো। ভাই বউদের জন্য সেলোয়ার কামিজ এবং ছোটদের জন্য পেন্ট ফ্রক।
কাপড় পেয়ে সবাই খুশি হলো। সবাই যার যার কাপড় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বড় ভাইয়ের বউ আনোয়ারা বলল- সেলোয়ার কামিজ এনেছ, ঠাকুর ঝি! আব্বা এগুলি পড়তে দিবে তো?
দিবে না কেন? আমিনা বলল- আজকাল সহরে তো সবাই সেলোয়ার
কামিজই পড়ে।
সেটা হলো সহর ! আর এটা হলো গ্রাম।
এখন সহর আর গ্রামের মধ্যে পার্থক্য নেই। শাড়ির থেকে সেলোয়ার কামিজ অনেক
নিরাপদ। শাড়ির আঁচল সময় সময়ে টেনে থাকতে হয়। অনেক সময় অসাবধনতা বশতঃ বুকের
কাপড় সরেও যায়। শোয়ে থাকলেও অনেক সময় কাপড় আঁঠুর ওপড়ে উঠে থাকে। তাই শোয়ার
পরে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকতে হয়। সেলোয়ার কামিজ পড়লে সেসব সমস্যা থাকবে না।
শশুড় আববা আপত্তি না করলে তো ভালোই হবে। আনোয়ারা বলল- আমারও সেলোয়ার কামিজ
পড়ার খুব ইচ্ছে। তোমার ভাইকে অনেক দিন ধরে সেলোয়ার কামিজের কথা বলতেছি। তারও
ইচ্ছে আছে। তবে, আব্বার ডরে আনতে সাহস পায়নি।
সাহস করে শুরু করে দাও। যদি বেশি আপত্তি করে আমার কথা বলো।
পড়তে তো চাই! পড়তে পারবো কী? লজ্জা
করবে না? কেউ পড়ে না আমাদের গ্রামে?
প্রথম প্রথম পড়তে অবশ্যেই লজ্জা করবে। কয়েকদিন পড়লেই লজ্জা চলে যাবে। বড়
ভাইকে দেখছি না? কোথাও গেছে নাকি?
না কোথাও যায়নি। ঘরেই শোয়ে রয়েছে।
এখন পর্যন্ত শোয়ে রয়েছে মানে? অসুখ
টসুখ করছে না-কি?
দু'দিন ধরে জ্বর।
আমিনা ব্যস্তভাবে বলল- কেমন জ্বর? ম্যালেরিয়া
ট্যালেরিয়া হয়নি তো?
না, ম্যালেরিয়া হয়নি। আনোয়ারা রহস্যময়
ভঙ্গীতে বলল- নিজের হাতেই জ্বর বানিয়েছে। সর্বশরীরে বিষ।
নিজের হাতে বানিয়েছে, মানে? আমিনা অবাক
কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল।
আর বলোনা, ঠাকুরঝি। আমাদের পাড়ার মাথায় যে হিজল
গাছটা আছে সেখানে পাড়ার সবাই মিলে মসজিদ বানাবে। মসজিদটা বানাতে গেলে হিজল গাছটা
কাটতে হয়। গাছটায় ভূত আছে বলে সবার বিশ্বাস। তাই গাছটা কাটতে কেউ সাহস পাচ্ছিল
না। আপনার ভাই গোয়ার্তুমি করে সেদিন একাই গাছটা কেটেছে। তারপর থেকেই জ্বর। সবাই
বলছে গাছটা কাটার ফলেই জ্বর হয়েছে।
ও কিচ্ছুনা। আসলে একা একা গাছটা কেটেছে তো, তাই
পরিশ্রমের ফলে জ্বর হয়েছে। বিষের ট্যাবলেট খাওয়ালেই ঠিক হয়ে যাবে। ভুতটূত
কিচ্ছু নেই। সবই মনের ভ্রম।
এদিকে রেজিয়া তারেক মৃদার পাশে বসে গল্প করছে। এ-টা-ও-টা কথার পরে রেজিয়া
বলল- কাক্কু, একটা কথা বলতে চাই। রাগ করবে না তো?
কেন? রাগ করব কেন? কি কথা
আগে বল, শুনি।
আমিনা কী চিরদিন এ ভাবেই থাকবে? তাকে
বিয়ে-থা দিবে না?
আমি তো দেওয়ার জন্য এক পায় খাঁড়া হয়ে আছি। ও যে রকম জেদি, তাই বলতে ভরসা পাচ্ছি না। ছেলে দু'টি
রেখে ও বিয়ে বসতে রাজি হবে কী?
তুমি যদি মত থাক, তাহলে চেষ্টা করে দেখতে পারি।
তোমার জানা-শুনার মধ্যে নওসা আছে নাকি?
অবশ্যি আছে। ফুল খাতুন পাশেই বসেছিলো। ফুল খাতুনকে উদ্দেশ্য করে রেজিয়া বলল-
টেম্পো নিয়ে যে ছেলেটি এসেছিলো, তাকে দেখনি চাচী?
দেখেছি তো?
কেমন দেখলে?
ভালোই তো দেখলাম।
ওই ছেলেটির কথাই ভাবছি। বি, এ পাস ছেলে। বয়েসও
ঠিকই আছে। আমিনার সাথে মানাবেও ভালো।
ছেলেটির সাথে কথা বলেছ নাকি?
না, এখন পর্যন্ত বলা হয়নি। ভাবছি, তোমরা মত
দিলে পরে কথা বলব।
মাঝখানে তারেক মৃদা বলল- আমিনা এ বিষয়ে জানে?
একদিন এমনিতে বলেছিলাম।
ও রাজি আছে?
রাজি, না রাজির বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। তবে,
মনে হয় আমিনার অপসন্দ নয়।
ঠিক আছে। ওদের সাথে কথা বলে দেখ। ওরা যদি রাজি হয়। আমার আপত্তি নেই।
আমিনা ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। আমিনাকে দেখে রেজিয়া বলল- কাপড় পসন্দ হয়েছে
ভাই বউদের?
অবশ্যই হয়েছে। বলেই ব্যাগ থেকে পাঞ্জাবি এবং শাড়ি বের করে মার হাতে দিয়ে
বলল- পাঞ্জাবিটা আব্বার জন্যে আর শাড়িটা তোমার জন্যে।
এগুলো আনার আবার কী দর্কার ছিলো। অনেক টাকা খরছ করেছিস দেখছি।
আমিনা বলল- লোকে কামায় তো করে খরচ করার জন্যেই। আব্বা, এভাবে আর কয়দিন বিষে কষ্ট করবে? কালনা
গিয়ে অপারেশ্বনটা হয়ে এস।
তারেক মৃদা বলল- আমিও তাই ভাবছি। হাতে টাকা হলে কালনাই যাবো।
টাকার জন্যে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। যত টাকা লাগে আমি দিব। তুমি কালনা
গিয়ে অপারেশ্বনটা হয়ে আসগে’। পারলে, দুই চারদিনের মধ্যেই তারিখ করে ফেল। জীবনের চেয়ে টাকা বড় না।
ফুল খাতুন বলল- বাড়িতে এসেছিস যদি আমীনকে একটু দেখে আয় গিয়ে। আমীন মনে হয়
বাঁচবে না। আমি সেদিন দেখতে গিয়েছিলাম। তোর কথা জিজ্ঞাসা করেছিলো। শুকিয়ে
একেবারে কাঠির মতো হয়ে গেছে।
আমীন স্থানীয় হাইস্কুলের হেড মাস্টার সফিক সাহেবের বড় ছেলে। আমীনের হার্টের
অসুখ। লিভারেরও গন্ডগোল আছে। অসুখটা অনেক দিনের। প্রায় ছমাস হলো।
ব্রহ্মপুত্র নদের চড়ে সফিক মাস্টার সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি আছে। অনেক জমি
ছিলো তাঁদের। ষাটের দশকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের ফলে সব জমি নদের বুকে তলিয়ে
গিয়েছিলো।
নদী ভাঙনের পরে তাঁরা এই গ্রামে উঠে এসেছে। সে অনেক বছরের কথা। পঞ্চাশ বছর তো
বটেই। সফিক মাস্টার তখন ছোট। এম, ই স্কুলের ছাত্র
ছিলো। সেই বাড়ির কথা আবছা আবছা মনে আছে সফিক মাস্টারের।
ছেলেমেয়েরা সেই বাড়ির কথা কিছুই বলতে পারবে না। ছেলেরা রূপকথার
গল্পের মতো শুনেছে সফিক মাস্টারের কাছ থেকে।
একদিন বড় ছেলে আমীন এসে বলল-আব্বা, আমাদের
যে জমিগুলো নদীতে ভেঙে নিয়েছিলো সেগুলো চড়া জেগেছে। অনেকে সেই জমি দখল করে চাষ-আবাদ করতেছে।
আমাদের জমিগুলো অন্যেরা ভোগ দখল করে খাচ্ছে। সেদিন ভৈরার পামের কদ্দুস চাচার সাথে
সহরে দেখা হয়েছিলো। সেই বলল কথাটা। কদ্দুস চাচাদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি বোলে এক
গ্রামেই ছিলো।
আমীন ঠিকই শুনেছে। কদ্দুস এবং সফিক মাস্টারের বাড়ি এক গ্রামেই ছিলো। পাড়ার
এ-মাথায়, ও-মাথায়। এম, ই
স্কুলে তাঁরা এক সাথেই লিখা-পড়া শিখেছে। নদী ভাঙনের পরে সফিক মাস্টাররা এ গ্রামে
উঠে এসেছিলো এবং কদ্দুসরা উঠে গিয়েছিলো ভৈরার পাম।
কদ্দুস এখন লাট মন্ডল। তাঁর সাথে আমীনের মাঝেমধ্যেই দেখা হয় সহরে গেলে।
সফিক মাস্টার বলল- অবশ্যে কথাটা আমিও শুনেছি।
আমীন বলল- আমি চড় দেখতে যাব। যদি সম্ভব হয় আমাদের জমি দখল করে আধি দিয়ে
আসব।
চড়ের জমির অনেক ঝামেলা। কার জমি কে দখল করে খাচ্ছে তার হদিশ নেই। জমির দখল
নিয়ে চড়ে মারামারিও হয় মাঝেমধ্যে।
আমাকে কিছুই করতে হবে না। কদ্দুস চাচাই সব ঠিক করে দিবে।
ঠিক আছে। একদিন গিয়ে দেখে এস। দেখ কি করতে পার! পৈত্রিক সম্পত্তি উদ্ধার করতে
পারলে মন্দ হবে না।
আমীন জমি দেখতে চড়ে গিয়েছিলো। চড় থেকে ঘুরে আসার পথে ঘুরন পাকে পড়ে তাদের
নৌকা মাঝ নদীতে ডুবে গিয়েছিলো।
আমীন সাঁতার কাটতে জানত। সে একটি মাচাল ধরে সাঁতরিয়ে মোটামুটি অজ্ঞান
অবস্থায় একটি সুনসান চড়ে উঠেছিলো। জন মানবহীন চড়। ঝিঁঝিঁ পোকাও নেই চড়ে। এমনি
সুনসান। ঘটনাটা ঘটেছিলো সন্ধ্যার আগে আগে। তাই সারারাত সেই সুনসান চড়ে কাটানোর পর
সকাল বেলা একটি জেলে নৌকা তাঁকে উদ্ধার করেছিলো অৰ্ধচেতন অবস্থায়। তারপর থেকেই
আমীনের অসুখ। বুক ধড়ফড় করে। মুখে রুচি নেই। ডাক্তার
বলেছে হার্টের অসুখ। লিভারেরও গন্ডগোল আছে।
সাধারণ লোকে বলে, ভয়ে কইলজা ফেটে গেছে—লিভার পচে গেছে। ডাক্তারি, কবিরাজি, দোয়া কালাম সব রকম চিকিৎসাই করিয়েছে সফিক মাস্টার। কিন্তু রোগ ভালো
হয়নি। অবস্থা ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
ফুল খাতুন আমীনের কথা বলতেই আমিনার হঠাৎ রশিদের কথা মনে পড়ে গেল। তার
এডমিশনের কথা। আমীন ভাইকে দেখতে গেলে এডমিশনের বিষয়টাও আলোচনা করে আসতে পারবে হেড
মাস্টারের সাথে। হেড মাস্টার মশায়ের বাড়ি কাছেই। তাদের বাড়ি থেকে মোটে আধা মাইল
দূরে।
আমিনা আমীনের সাথে দেখা করল। মার কথাই ঠিক। শুকিয়ে একেবারে কাঠির মতো হয়ে গেছে।
সাহেবের মতো চেহেরা ছিলো আমীনের। এখন দেখলে চেনাই যায়
না। শরীরে মাংস নেই। হাড্ডি কয়টা গোনা যায়। পেটটা ফুলে একেবারে ডোলের মতো হয়ে গেছে।
আমীনের ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নেওয়ার পরে আমিনা হেড মাস্টারের কাছে এলো। মাস্টার
সাহেব বারান্দায় বসেছিলো।
আমিনাকে দেখে হেড মাস্টার সফিক সাহেব বলল- ভালো আছ, আমিনা? সেদিন তোমার দোকানে গিয়েছিলাম।
তুমি দোকানে ছিলে না। বাজার করতে গিয়েছিলে। দোকানে বেচাকেনা ভালই দেখলাম। ছেলেরা
যা পারে না, তুমি তাই করেছ দেখছি।
আশীর্বাদ করবেন, স্যার। যাতে সফল হতে পারি।
নিশ্চয় করব। সফিক সাহেব বলল- আমার বিশ্বাস, তুমি
পারবেও। তোমার মতো মেধাবি মেয়েরা ইচ্ছা করলে এবং সুযোগ পেলে সবই করতে পারে।
আমাদের তো খুবই প্রত্যাশা ছিলো তোমাকে নিয়ে। তোমার বিয়ে হওয়াতে আমরাও শ্বকড
হয়েছিলাম। এমন একটি মেধাবি মেয়েকে তারেক মৃদা কম বয়েসে বিয়ে দিয়ে দিলো!
কি করব, স্যার, আব্বার মতের
বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস তখন ছিল না। এভাবে বলেই আমিনা একটু থেমে আমতা আমতা করে বলল-
স্যার, আমি একটা কথা নিয়ে এসেছি আপনার কাছে।
হেড মাস্টার একটু বিস্ময়ের চোখে তাকাল আমিনার দিকে। কি কথা থাকতে পারে
মেয়েটার? মেয়েটা লিখাপড়ায় খুবই ভালো ছিলো।
বিয়েটা না দিলে এর জীবনটা অন্য রকম হয়ে যেত। খুবই আদরের ছাত্রী ছিলো আমিনা।
আমিনাকে নিয়ে শিক্ষকদের প্রত্যাশাও ছিলো অনেক। সবাই ভেবেছিলো নাম করে পাস করবে।
স্কুলের নাম হবে। কিন্তু তাদের আশাহত করে মেয়েটা বিয়ের পিঁড়িতে বসে চলে গেল।
এখন আবার কী কথা থাকতে পারে মেয়টার তার সাথে?
বল, কি কথা বলতে চাচ্ছ?
আমীন সাহেব বললেন।
আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে চাই, স্যার।
ম্যাট্রিক দিতে চাও? সে তো খুবই ভালো কথা। দিলে দিতে পারবে।
লিখাপড়া করার কোনো বয়েস নেই। বিয়ের পরেও অনেকে আইএএস, আইপিএস
হওয়ার নজির আছে। লেখা-পড়ায়ও তুমি ভালোই ছিলে। তবে, লিখাপড়া
ছেড়ে দিয়েছ অনেক বছর আগে। আবার কোর্সও বদলেছে। তাই কষ্ট করতে হবে। তুমি আবার
দোকানও কর। দোকান করে কী পরীক্ষা দিতে পারবে?
চেষ্টা করব, স্যার।
ঠিক আছে, চেষ্টার অসাধ্য কিছুই নেই। আগে এডমিশনটা
নাও। সার্টিফিকেট নিয়েছিলে না-কি?
নিইনি স্যার। প্রয়োজন হয়নি, তাই নেওয়া হয়নি।
তাহলে সার্টিফিকেট আমাদের অফিসেই আছে। সময় করে একদিন স্কুল খোলার দিন এস। আমি ব্যবস্থা করে দিব।
হেড মাস্টারের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে আমিনা বাড়ি চলে এলো।
মাগরিবের নামাজের পরে রশিদ টেম্পো নিয়ে এল। সন্ধ্যেয় খাওয়া-দাওয়া সেরে
তারা মেসে চলে এলো।
দুই দিন পরে স্কুলে গিয়ে আমিনা এডমিশনটা নিয়ে এলো। রশিদই বই যোগার করে দিলো।
দোকানের পাশাপাশি আমিনা লিখা-পড়ায়ো মনোযোগ দিলো।
ষোল্ল
আমিনা দোকান দেওয়ার ডের বছর হলো। দোকান ভালোই চলছে। আয়ও মোটামুটি ভালোই হচ্ছে।
কলিমুদ্দিন চাচার টাকা পরিশোধ করেছে। রশিদের কাছ থেকে যে টাকা ধার নিয়েছিলো সে
ধারও মেরেছে। রশিদ আগের মতোই ছেলেদের টিউশন পড়াচ্ছে।
আশ্রাব ক্লাসে প্রথম হয়েছে। এর মধ্যে আমিনা ম্যাট্রিকও পাস করেছে। ফার্স্ট
ডিভিজনই পেয়েছে সে। দু'টি বিষয়ে লেটার মার্কও আছে।
রশিদের পরামর্শ মতো কলেজে ভর্তিও হয়েছে। দিনের বেলা দোকান এবং রাতে দু'ঘন্টার মতো অধ্যয়ন। এ ভাবে গতানুগতিক ব্যস্ততার মাঝেই সময়
পার হচ্ছে। এর মধ্যে একদিন ঘরের মালিকের বউ মারা গেলো। তার কেন্সার হয়েছিলো।
সেদিন দোকান বন্ধ রেখে মালিকের বউকে দেখতে গিয়েছিলো।
একদিন জমিলা এলো আমিনার সাথে দেখা করতে।
আমিনা বলল- সেলিম ভাই কেমন আছে? খবর নেব,
সময়ই করে উঠতে পারি না।
সেলিম ভাই এখন খুবই ব্যস্ত। জমিলা বলল- পাশে যে দোকানটা আছে, সেখানে মার্কেট বানাবে। সেলিম ভাই সেই মার্কেটে রুম নিবে। সেই
রুমের পেছনেই কয়েকদিন ধরে লেগে আছে। দু'লাখ টাকা এডভান্স দিতে লাগে। সেই টাকা যোগারের জন্য ব্যস্ত
হয়ে আছে। এখনও এডভান্সের টাকা যোগার হয়নি। বর্তমানের দোকানটায় পঞ্চাশ হাজার
টাকা এডভান্স দেওয়া আছে। যদি টাকা যোগার করতে না পারে, তাহলে
বৰ্তমানের দোকানটা ছেড়ে দিবে বলেছে।
কী দোকান করবে?
শুনছি, কাপড়ের হোলসেল দোকান করবে।
রোমটা বানাতে তো অনেক দিন লাগবে!
ছ মাসের মতো লাগবে শুনতেছি।
তুই এই ছ'মাস কী করবি?
কী করব, তাই ভাবছি। দোকান ছেড়ে দিলে, খাওয়া-দাওয়া, আব্বার ঔষধের টাকা কোথা থেকে যোগার
করব সেই চিন্তায় রাতে আমার ঘুম হয় না।
কত টাকা হলে তুই চলতে পারবি?
এই ধর, ছ’হাজারের মতো।
দোকান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত তুই আমার এখানে থাকতে পারবি। আমি তোকে মাসে ছ'হাজার করেই দিব। আমারও লোকের দর্কার আছে। তুই থাকলে ভালোই হবে।
দেখি কবে দোকান ছাড়ে! দোকান ছেড়ে দিলেই তোমার দোকানে এসে কাজ করব।
এক সপ্তাহ পরে জমিলা এলো। কাজে যোগদান করল।
একদিন সেলিম এলো আমিনার দোকানে।
ভলোমন্দ খোঁজ খবর নেওয়ার পরে সেলিম বলল- আমার সাথেই একটি রোম এখনও বুক হয়নি, যদি টাকা আছে নিতে পার।
আমিনা অন্যমনস্ক হয়ে অনেক সময় বাইরের দিকে চেয়ে রইল। পরে সেলিমের দিকে চেয়ে
বলল- তুমি শুনছি, কাপড়ের হোলসেল করবে। রোম নিলে আমি কী
দোকান করব?
তোমার যা খুশি করতে পারবে। হোলসেল করলেও অসুবিধা নেই।
তুমিও কাপড়ের হোলসেল করবে, আমিও কাপড়ের হোলসেল
করব! কথাটা কেমন যেন লাগছে। শেষে তোমার সাথে আমি প্রতিযোগিতা করব?
কোনো অসুবিধা নেই। যত দোকান বেশি হবে, তত
বেচাকেনা বেশি হবে। আমি ভাবছি, আমি শুধু লংপেন্ট সার্ট তুলব।
তুমি সেলোয়ার কামিজ তুলতে পারবে। তখন আর প্রতিযোগিতার কথা উঠবে না।
শুধু এক রকমের কাপড়ে দোকান চলবে?
চলবেনা কেন। ডাক্তারদের দেখনি শুধু দাঁতের চিকিৎসা করে পসার জমিয়ে ফেলে?
তা অবশ্যে ঠিক।
সেলিম বলল- টাকা থাকলে রোম নিয়ে নাও। এরকম সুযোগ সব সময় পাওয়া যায় না।
সেলিম দর্জি চলে গেল। রেজিয়া এসে বলল- সেলিম দর্জি এসেছিলো কেন?
আমিনা আসার কারণ জানিয়ে বলল- রুমটা নিলে কেমন হবে?
দু’টো দোকান তুমি একা সামলাতে পারবে?
কেন? এই দোকানটা তুমি আর মফিজ সামলাবে। আমি
কাপড়ের দোকানটা সামলাব।
আমরা কী দোকান চালাতে পারব?
কেন পারবে না? তোমরাই তো এখন দোকানটা চালাচ্ছ। মফিজ এখন
দোকান সম্বদ্ধে ভালোই সেয়ানা হয়ে উঠেছে।
আমি আর কী বলব! রেজিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল- তুমি যা ভালো বুঝ কর। তবে, ভেবেচিন্তে করো।
তোমরা সাহস দিলেই হলো। আমিনা ঘনিষ্ট হবার জন্য বলল-তোমরাই তো এখন আমার ডান হাত
বাঁও হাত।
প্রশংসা শুনে রেজিয়া গদগদ কন্ঠে বলল- আমরা আর কী করছি? তুমি আছ বলেই তো আমরা দু'মুঠো খেতে
পাচ্ছি।
কে কাকে খাওয়ায়, আপা? আসলে তোমাদের
দয়ায় আমি বেঁচে আছি। তোমরা সহায় না করলে আমি কী দোকানটা চালাতে পারতাম? যা করেছি, তোমাদের সহযোগিতার জন্যই করতে পেরেছি।
তবুও রশিদ ভাইর সাথে আগে আলোচনা করে দেখ। সে মত দিলে আমাদের দ্বিমত করার কোনো
হেতু থাকবে না।
সেদিন সন্ধ্যেয় রোমে এসে দেখে রশিদ ছেলেদের পড়াচ্ছে। রশিদের সাথে দোকানের
বিষয়ে আলোচনা করল। রশিদ কোনো দ্বিধা না করে বলল- যদি টাকা আছে নিয়ে ফেলুন।
কাপড়ের দোকানে টাকা আছে।
রশিদ চলে যাওয়ার পরে শুকুরজান এলো আমিনার রোমে। শুকুরজান সচারচর আমিনার রোমে
আসে না বিশেষ প্রয়োজন না হলে। তাই শুকুরজানকে দেখে আমিনা অবাক হয়ে বলল- আপা, কী মনে করে?
শুকুরজান আমতা আমতা করে বলল- আমার আর তোমার দোকানে থাকা হবে না। তাই অগ্রিম বলতে এসেছি?
থাকা হবে না, মানে?
আমি ঘরের মালিকের গৃহে থাকব।
আমিনা আগেই রেজিয়ার মুখে শুনেছে ঘরের মালিকের সাথে শুকুরজানের বিয়ে হয়েছে।
তাই সে অবাক হল না। বলল- মালিকের ছেলেমেয়েরা তোমাকে কী মেনে নিবে?
মালিকের ছেলে নেই। দু'টি মেয়ে আছে। তারাই বলছে আমাকে গৃহে নিয়ে
যেতে। তারা তাদের আব্বাকে একা থাকতে দিতে ভরসা পাচ্ছে না।
তোমাদের বিয়ে হয়েছে, এ কথা মেয়েরা জানে?
মালিকের স্ত্রী মরার পরে জেনেছে। মালিক নিজেই বলেছে।
তাহলে তো ভালই হয়। আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। কবে যাবে?
কাল সকালেই মালিকের বড় মেয়ে নিতে আসবে।
শুকুরজান চলে যাওয়ার পরে আমিনা রেজিয়ার রোমে ঢুকল।
আমিনা বলল- ভাত খেলে, আপা?
না খাইনি।
শুনেছ আপা, কাল শুকুরজানকে মালিকের বড় মেয়ে নিতে
আসবে।
শুনেছি। শুকুরজানই সন্ধ্যেয় দোকান থেকে আসার সময় বলেছে।
আমাকে বলনি কেন?
ভাবছিলাম, ভাত খাওয়ার পরে গিয়ে ধীরে সুস্থিরে বলব। তুই কার কাছে শুনলি?
এইমাত্র শুকুরজান আপা বলে গেল।
শুকুরজান চলে যাবে, তার একটা গতি হলো, সে
তো খুশির কথা। রেজিয়া অনেক সময় আমিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল- শুকুরজানের
খুশির কথা শুনে, আমার মাথায় একটা কথা সেই তখন থেকে ঘুরপাক
খাচ্ছে। বলতে ভরসা পাচ্ছি না।
আমিনা কিঞ্চিত হলেও কথাটা অনুমান করতে পারল। বিয়ের কথার সময় যখন কথাটা
মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন সম্ভবতঃ বিয়ের কথাই হবে। তারও এখন আর
একা একা থাকেত ভালো লাগে না। কয়দিন আর রাত জেগে কাটাবে। অনেক দিন রাতে ভালো ঘুম
হয় না। সকালে উঠে চোখ জ্বালাপোড়া করে। দেহের খোরাকের মতই যৌবনের খোরাক দর্কার।
আমিনা এখন কথাটা বুঝতে পারছে।
রেজিয়া আপা প্রায় দেড় বছর আগেও বিয়ের কথা বলেছিলো, ছেলে দু’টির ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে তখন
মত দেয়নি। কয়দিন আর এ ভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখবে? তার এখন
বলতে গেলে কিছুরই অভাব নেই। অভাব শুধু একজন সাথীর। রেজিয়া আপা যদি বিয়ের কথা বলে
তাহলে এবার আর না করবে না।
বলে ফেল। কি বলতে চাও?
দেড় বছর আগে যে কথাটা বলেছিলাম তোর মনে আছে?
কী কথা বলেছিলে? খোলে বল। আমিনা বুঝেও না বুঝার ভান করলো।
বিয়ের কথা। এ ভাবে আর একা একা কয়দিন থাকবি?
কে বিয়ে করবে দুই ছেলের মাকে?
সে আমি বুঝব। তুই বললে, আমি কালই রশিদ ভাইর
সাথে কথা বলব।
সে কী বিয়ে করতে রাজি হবে?
নিশ্চয় হবে। রেজিয়া দৃঢ়কণ্ঠে বলল- আমার ধারণা, সে তোকে ভালবাসে। বিয়ের কথা বললে সে এক কথায় রাজি হয়ে
যাবে।
আমার মনে কিন্তু এ বিষয়ে দুর্বলতা আছে। আমিনা অতীত রোমন্থন করে বলল- প্রায়
দেড় বছর ধরে সে আমাদের সাথে আছে। আমার প্রতি তার কোনো দুর্বলতাই দেখতে পাইনি আমি।
ছেঁকা খাওয়া পুরুষ। তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখে। মনে কিছু থাকলেও তা বাইরে
প্রকাশ হতে দেয় না।
ধরলাম সে রাজিই হলো। ছেলে দু'টিকে কী করব?
কী আর করবি? তোর সাথেই থাকবে?
দ্যাখ, ছেলে দু’টিকে যদি
মেনে নেয়, তাহলে কথা বলতে পার। আমি যেখানে থাকব, ছেলে দু’টিও কিন্তু সেখানে থাকতে হবে।
আশ্রাব এবং ফিরদুসকে রশিদ ভাই নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসে। ছেলে দু'টিও রশিদ ভাইর ন্যাওটা হয়ে গেছে। আমার ধারণা, ছেলে দু’টিকে তুমি ছাড়তে চাইলেও রশিদ ভাই ছাড়তে
দিবে না।
পরের দিন সকালে ঘরের মালিকের বড় মেয়ে এসে শুকুরজানকে নিয়ে গেল। একটা
অধ্যায়ের যেন যবনিকা পড়ল।
সতের
দু’দিন পরে রশিদকে নিয়েই আমিনা মার্কেটের রুমের
জন্য টাকা জমা দিলো। এক লাখ টাকা। বাকি এক লাখ দু'মাস পরে
জমা দিতে হবে।
আমিনা বলল- রেজিয়া আপা, তুমি রশিদ ভাইর সাথে
দোকানে যাও। মফিজ একা একা দোকান সামলাচ্ছে। গ্রাহক অনেক বেড়েছে। এখন একা একা
দোকান সামলানো খুবই কঠিন হয়। তুমি থাকলে তার সহায়
হবে।
কেন, তুমি যাবে না?
আমি একটু পরে আসছি। আমিনা বলল- আমি এক জায়গায় যাবো।
কোথায় যাবে?
এসে বলব’খন। তোমরা যাও। এই ধর, টাকা নিয়ে যাও। রশিদ ভাইকে নিয়ে কিছু একটা কিনে খেয়ে রিক্সায় করে যেও।
আমিনা একশ টাকার একটি নোট রেজিয়ার হাতে দিলো।
রেজিয়া কথাটা কিছু অনুমানও করতে পারল। সম্ভবতঃ রশিদের সাথে কথা বিয়ের কথা বলার
সুযোগ করে দিলো আমিনা। রিক্সায় আসার সময় রেজিয়া বলল- রশিদ ভাই, তোমার সাথে আমার কথা আছে, বলতে পারব কী?
অনুমতি নেওয়ার আবার কী প্রয়োজন? কী
বলবেন, বলে ফেলুন?
কথাটা একটু অন্য রকমের। রেজিয়া রহস্যময় ভংগিতে বলল- সব কথা সোজাসুজি বলা
যায় না।
প্রায় দু'বছর ধরে আপনাদের সাথে আমার সম্পর্ক। কোনোদিন
তো আপনি এ ভাবে কথা বলেন নি?
প্রয়োজন হয়নি তাই বলিনি। এবার প্রয়োজন হয়েছে তাই বলতে হচ্ছে।
আর হেঁয়ালি করবেন না। কী বলতে চান, সোজাসুজি
বলে ফেলুন।
রেজিয়া রশিদের গা ঘেঁষে বসে মুখের দিকে চেয়ে বলল- আপনার আমিনাকে কেমন লাগে?
এইবার রশিদ রহস্যের গন্ধ পেল। কথা নিশ্চয় ঘোরতর কিছু হবে। আমিনাকে তার প্রথম
দেখার পর থেকেই ভালো লাগে। আমিনার উদ্যম, কিছু
একটা করার স্পৃহা সবই ভালো লাগে তার। আমিনাকে দেখতেও ভালো লাগে। আমিনার সাথে সময়
কাটালে কোথা দিয়ে সময় পার হয়ে যায় টেরই করতে পারে না সে। আমিনার মুখের দিকে
অনেক সময় লুকিয়ে লুকিয়ে চেয়েও থাকে। আমিনার ছেলে দুটিকেও ভালো লাগে রশিদের। আমিনাকে ভালো লাগার জন্যই হয়তো তার ছেলে দু'টিকে
এতো ভালো লাগে। ছেলে দু'টির মাঝে সে আমিনার উপস্থিতি অনুভব করে।
আমিনাকে দেখলে তার হৃদয় যেন জুড়িয়ে যায়। রজকিনী মন করে উচাটন, দেখিলে পরাণ জুড়ায়, না দেখিলে মন করে উচাটন। এমনি অবস্থা আর কি!
তবুও এক কথায় ভালো লাগে বলতে দ্বিধাবোধ হল তার। তাই বলল- কেন। এ কথা জিজ্ঞাসা
করছেন কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?
বালাই ষাট, আপনি অপরাধ করতে যাবেন কেন? এত দিন ধরে আপনাকে দেখছি। আমার চোখে আপনার কোনো ভুলই ধরা পড়েনি।
যদি বলি ভালোই লাগে। শুধু আমিনা আপাকেই নয়, তার
ছেলে এবং আপনাকেও আমার ভালো লাগে?
রেজিয়া এবার আমতা আমতা করে বলল- কোনোদিন আপনি তাকে নিয়ে কোনো কথা কল্পনা
করেছেন নাকি?
কল্পনা? কী কল্পনা করব?
এই ধরুন, বিয়েটিয়ের কথা?
না, তেমন করে কিছু ভাবিনি। রশিদ নিজের
দুর্বলতার কথা জানাল- বিয়ে করেছিলাম। বউকে ভালোও বেসেছিলাম। কিন্তু সেই বউ অন্যের
সাথে পালিয়ে গেল! তাই আবার যে কখনও বিয়ে করব, আমি কল্পনা-ই
আনতে পারিনি।
আপনার মতো একজন পুরুষকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াটা তার অন্যায় হয়েছে। শুধু আমিই না, যে শুনবে সেই এ কথা বলবে। সে পালিয়ে গেছে
বলেই আপনি চিরদিন সেই কথা মনে করে নিজেকে গুটিয়ে রাখবেন, এটা
কিন্তু অন্যায় হবে।
আমি কিন্তু আমার বউকে কোনো দোষ দিই না। দোষ আমার নিজের-ই। হয়তো আমি বউয়ের
উপযুক্ত হতে পারিনি। সেজন্য বউ পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি কল্পনায়ো কোনোদিন
বিয়ের কথা ভাবার সাহস পাইনি।
এবার থেকে সাহস করার চেষ্টা করুন। এইবার রেজিয়া সরাসরি বলে ফেললো- আপনি
আমিনাকে বিয়ে করুন। আমার বিশ্বাস সুখী হতে পারবেন। এভাবে নিজেকে দোষী ভেবে আর
নিজেকে কষ্ট দিবেন না।
আমিনা আপা এ কথা জানে? সে রাজি হবে কী? আগে
তার মত নিন। আমার মত পরে জানাব।
তাহলে ধরে নিতে পারি, আমিনা রাজি হলে আপানার তরফ থেকে কোনো
আপত্তি নেই?
তার গার্জেনেরও তো কথা আছে। তাঁরা যদি মত না হয়?
আসলে বলতে গেলে, আমি দেড় বছর আগে থেকেই কথাটা ভাবছি।
রেজিয়া অতীত রোমন্থন করে বলল- সেই যে একবার আমিনাদের বাড়ি গিয়েছিলেন, মনে আছে আপনার?
মনে থাকবে না কেন? এই তো সেদিনের কথা।
আমি অনেক আগে থেকেই কথাটা ভাবছি। আমিনার সাথে এই বিষয়ে একবার আলোচনাও
করেছিলাম। তখন সে হা-না কিছুই বলেনি। তাই আমি নিজের থেকে চাচার কাছে আপনাদের
বিয়ের কথা বলেছিলাম। চাচা মতও দিয়েছিলেন। শুধু চাচাই নয়, চাচিরও মত ছিলেন। তবে, আমিনা ছেলে দু’টির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তখন রাজি হয়নি। তাই কথাটা চাপা পড়ে ছিলো।
এখন কী রাজি হবে?
সে দায়িত্ব আমার। আপনি মত থাকলেই হলো। এখনও কী আপনার আপত্তি আছে?
বললাম না, সে আগে রাজি হোক, পরে
আমি আমার মতামত জানাবো।
তাহলে ধরে নিতে পারি, আমিনা রাজি হলে আপনার আপত্তি নেই?
অবশ্যই পারেন।
আঠারো
শুভস্য শীঘ্রম। আমিনা বিয়েতে মত দিলো। তাই রেজিয়া পরের দিনই তারেক মৃদার সাথে
আলোচনা করতে এলো আমিনার অনুমতি নিয়ে। তারেক মৃদা বাড়িতেই
ছিলো।
তাঁর কাছে রেজিয়া কথা পাড়ল- কাক্কু, সেবার
যে কথাটা বলেছিলাম মনে আছে আপনার?
তারেক মৃদা রেজিয়ার কথা ধরতে না পেরে কিছুক্ষণ রেজিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে
থেকে বলল- কী কথা?
আমিনার বিয়ের কথা। রেজিয়া একটু ঘনিষ্ট হয়ে বসে বলল- সেবার আমিনা রাজি হয়নি
বলে কথাটা চাপা পড়ে ছিলো।
হ্যাঁ, মনে পড়ছে। আমার তো অমত ছিল না, তোমার চাচিও মত দিয়েছিলো। তোমার চাচির তো খুবই পসন্দ হয়েছিলো ছেলেটিকে। আজ
আবার সেই পুরানা কথা কেন?
দু'দিন আগে আমি আমিনার সাথে এ বিষয়ে কথা
বলেছি। এবার সে মত দিয়েছে। আপনারা যদি অনুমতি দেন তো আমি এগোতে পারি।
আমার অমত তখনও ছিল না, এখনও নেই। তারেক মৃদা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল-
একমাত্র মেয়ে আমার। কচি বয়সে মেয়েটা স্বামীর সোহাগ পেল না। বিয়েটা দিয়েই ভুল
করেছিলাম। ওর বিয়ে বসার ইচ্ছা ছিল না। আমার মুখের দিকে চেয়েই ও বিয়েতে মত দিয়েছিলো।
এখনও যদি একটা পাড় লাগাতে পাড়, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।
দেখ চেষ্টা করে। অবশ্যে নাতি দু'টির জন্য মায়া হয়। ছেলে
বয়সে বাপের আদর পেল না, মার আদর থেকেও যদি বঞ্চিত হয়!
কোনো অসুবিধা হবে না। রশিদ ভাই খুবই ভালো মানুষ। সে ছেলে দু’টিকে নিশ্চয় মেনে নেবে। ছেলে দু'টি তার
খুবই ভক্ত। সেও ছেলে দু’টিকে খুবই স্নেহ করে।
ফুল খাতুন কাছেই ছিলো। সে বলল- ছেলেটিকে প্রথম দিন দেখেই আমার পসন্দ হয়েছিলো।
খুবই ভালো লেগেছিলো ছেলেটিকে। আমার ধারণা, সে নাতি
দু'টিকে নৈরাশ করবে না।
বিয়ের কথা চললো। বিয়ের দিন বারও ঠিক হলো। পনের দিন পরে বিয়ে। বিয়েটা তারেক
মৃদার বাড়িতে সম্পন্ন হবে। বিয়ের বাজারটাজারও চলল। গহনা গাঁটি বানাতে দিলো।
একদিন আমিনা রেজিয়াকে বলল- আপা, বিয়ের
আগে রুমটা বদলাতে হবে। এই কবুতরের খোপের মতো রুমে বিয়ের পরে কেমন করে থাকব !
আশ্রাব বড় হয়েছে। সে এখন সব বুঝতে পারে। সেজন্য এক রুমে থাকাটা সম্ভব হবে না। তাছাড়া, মনে হয়, আমাদের বিয়েটা
আশ্রবের পসন্দ নয়। বিয়ের কথা শুনার পর থেকে সে কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে। আমার
সাথে ভালভাবে কথা বলছে না।
ছেলে মানুষ। বিয়েটা হয়ে গেলে সে নিশ্চয় মেনে নেবে।
এই ভরসায়ই এগোতে যাচ্ছি। এভাবে মন্তব্য করেই আমিনা অন্য প্রসঙ্গে এলো- আগে রুম
দেখ। বিয়ের আগেই রুমটা পাল্টাতে হবে।
রুমের অভাব হবে না। আমি শুনেছি, করিম
বেপারির ওখানে ভালো রুম আছে। জানই তো করিম বেপারি কীরকম কৃপণ মানুষ! তাই ভাড়া
অবশ্যে কিছু বেশি দিতে।
ভাড়া নিয়ে ভেবো না। রুম ভালো হলে, বেশি
ভাড়া দিতে আমার আপত্তি নেই।
আচ্ছা, তুমি যখন বলছো, আমি
আজ সন্ধ্যেয় গিয়ে রুম দেখে আসব।
সন্ধ্যেয় রেজিয়া রুম দেখে এসে বলল- ভালো পাক্কা রুম। দু'টি পরিয়াল আগে থেকেই আছে। ভদ্র পরিয়াল। উভয়ই উকিল। সংলগ্ন
দু'টি রুম নিলে দু'হাজার টাকা লাগবে।
তা লাগুক। রুম ভালো হলেই হলো। চল, কাল
সকালে গিয়ে আমিও একবার দেখে আসি। পসন্দ হলে কথাই বলে ঠিক করে আসব।
সকালে আমিনা রেজিয়াকে নিয়ে রুম দেখতে গেল। রুম পসন্দও হলো। দু'টি নয়, কথাবার্তা বলে সংলগ্ন তিনটি রুমই
বন্দোবস্ত করল এবং বিয়ের সাতদিন আগে নতুন রুমে উঠে এলো।
খাট-পালেঙ, সোফাসেট প্রভৃতি দিয়ে রুমগুলি মনের মতো
করে সাজিয়ে তুলল আমিনা। রুম সাজানো, চৌহদ্দি পরিস্কার প্রভৃতি কাজে রেজিয়া, জমিলা এবং মফিজ সর্বোর্তোপ্রকারে সহযোগিতা করল।
গহনা-গাঁটি, কাপড়চোপড় সব কেনা হয়ে গেল। আত্মীয়স্বজনদেরও
নিমন্ত্রণ দেওয়া হলো। দ্বিতীয় বিয়ে হলেও লোকে যাতে দ্বিতীয় বিয়ে বলে ভাবতে না
পারে তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা করা হলো।
সিদ্ধান্ত হলো, বিয়ের কয়দিন দোকান বন্ধ থাকবে। বিয়ের দু'দিন আগে জমিলাকে নিয়ে আমিনা বাপের বাড়ি চলে যাবে। রেজিয়া এবং মফিজ নতুন
রুমে রশিদের সাথে থাকবে। তারা নতুন রুম থেকে বরযাত্রী সেজে তারেক মৃদার বাড়িতে
গিয়ে বিয়েটা সম্পন্ন করে আমিনাকে নিয়ে নতুন রুমে চলে আসবে। সব কাজ সম্পূর্ণ,
শুধু বিয়ের জন্য অপেক্ষা।
উন্নিশ
বিয়ের দু'দিন আগে আমিনা সন্ধ্যেয় দোকান থেকে এসে
দেখলো আশ্রব এবং ফিরদুস গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মার জন্য অপেক্ষা করতেছে।কয়দিন ধরে
রশিদ টিউশন পড়াতে আসে না। তাই আমিনা একটু আগেই ফিরে দোকান থেকে।
আমিনা ফিরদুসকে কাছে টেনে এনে বলল- আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছিস? এতই ভালবাসিস মাকে?
আশ্রাব বলল- মা, কে একজন লোক এসেছে। দাড়ি চুলে কেমন যেন
ভম্বলের মতো দেখতে। দেখলে ভয় লাগে।
আমিনা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। বলল- কোথায় আছে লোকটা? তোদের কিছু বলেনি তো?
ফিরদুস বলল- না, কিছু বলেনি। আমাদের জন্য চকলেট নিয়ে
এসেছে। এ-ই অত চকলেট। ফিরদুস হাত মেলে মুদ্রাটা করে দেখাল।
চল তো দেখি কে এসেছে।
আশ্রাব আসতে আসতে বলল- লোকটা এসেই বলল, আমি
তোদের বাবারে! আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছিস কেন? ভয়ের কিছু নেই।
আমি তোদের কিচ্ছু করব না। তোদের মা কখন আসবে?
আমিনার সন্দেহ হলো, বাবা যখন বলেছে, তখন হয়তো তারা মিয়া এসেছে। না হলে কে
বাবা বলে পরিচয় দিবে! তাই সে তারাতারি ছেলেদের নিয়ে রুমের ভেতরে এলো।
লোকটা খাটের ওপড় বসে ছিলো। আমিনাকে দেখে সে নড়েচড়ে বসল।
আমিনা বলল-কে, কে আপনি? বলা নেই, কওয়া নেই,
এ ভাবে কেন খাটের উপড়ে বসে আছেন?
লোকটা নরমস্বরে বলল- আমাকে চিনতে পারনি? আমি
তারা মিয়া। তোমার বর।
আমিনা কন্ঠস্বর শুনে লোকটিকে চিনতে পারল। সে অভিমানের সুরে বলল- অ’ তুমি? কেন এসেছে তুমি এতদিন পরে?
তোমাদের কথা মনে পড়েছে, তাই এসেছি।
মনে পড়েছে, এসেছ? যখন অন্যের
বউকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে তখন মনে পড়েনি বউ ছেলের কথা? এত
বছর পরে কেন আবার জ্বালাতে এসেছ? চলে যাও, যেখান থেকে এসেছ সেখানে।
তারা মিয়া খাট থেকে নামল। আমিনার সামনে হাতজোড় করে বলল- আমি তোমার সাথে, ছেলেদের সাথে যে অন্যায় করেছি, ক্ষমা
চাইবার মতো সাহস আমার নেই। তবে আমি তোমাদের সাথে যে অন্যায় করেছি, তার ফলও আমি ভোগ করছি।
এর পরে তারা মিয়া তার জীবনের কাহিনী বলে গেল- সে পালিয়ে প্রথমে গুয়াহাটি
গিয়েছিলো। সেখানে সে রিক্সা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছিল। তের চৌদ্দ মাস পরে একদিন
তার বাবা আফসের ফকির একটি নোটিশ নিয়ে তার কাছে যায়। খোরাকি দাবির কেসের নোটিশ।
তার বাবা বলে, বাবা, কী আর বলব। এর
আগেও তিনবার নোটিশ গেছে। তোর ঠিকানা জানা নেই বলে তিনবারই আমি পুলিশকে বলে
পাঠিয়েছি। তোর অনুপস্থিতে আমি উকিল ধরে কেস চালাচ্ছি। উকিল বলেছে, এবার হাজিরা না দিলে পুলিশ তোকে ফেরারি আসামি ঘোষণা করবে।
ফেরারি আসামি হওয়ার ভয়ে তারা মিয়া কেসে হাজিরা দেয়। একমাস পরে আবার ত্রিশ
হাজার টাকা খোরাকি ডিক্রি হয়েছে বলে একটি নোটিশ যায়। আফসের ফকির গুয়াহাটি গিয়ে
সে নেটিশ দেয়। তখন তারা মিয়ার হাত খালি। রিক্সা চালিয়ে কোনো রকমে পেটের ভাত
যোগাড় করে। টাকা দিব কোত্থেকে? তাই তখন বউয়ের
বুদ্ধি শুনে সে লক্ষ্ণৌ চলে যায়। সেখানে কাগজ কুঁড়িয়ে কোনোমতে দিন গুজরান
করছিলো। দু'মাস আগে তার বউ অন্য একটি ছেলের সাথে পালিয়ে
গেছে।
আমিনা বলল- বউ পালিয়ে গেছে আমি কী করব? যাও,
খোঁজে বার কর’গে।
বউকে কোথায় তালাশ করতে যাব, বল। তারা মিয়া
আমিনার হাতে ধরে বলল- আমাকে ক্ষমা করে দাও, অন্ততঃ ছেলে দু'টির
মুখের দিকে চেয়ে। আমি শপথ করে বলছি, আর কোনোদিন তোমাদের
ছেড়ে যাব না।
ছেলে দু’টির কথা বলাতে আমিনা একটু নরম হলো। বলল-
তোমাদের মতো লোককে বিশ্বাস করব কীভাবে বল? এখন বলছ, দু’দিন পরে আবার সব ভোলে গিয়ে অন্যের সাথে পালিয়ে
যাবে।
ছেলে দু’টির দিব্যি খেয়ে বলছি, যদি তোমাদের ছেড়ে যাই নবী যেন আমার জন্য হাশরের ময়দানে সাফায়ত না করেন।
রেজিয়া কাছেই ছিলো। সে দোকান থেকে এসে পুরুষ কন্ঠ শুনে রুমের ভেতর এসে
দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বলল- এত করে যখন বলছে, একবার
বিশ্বাস করেই দেখ না। আমার মনে হয়, এবার আর তোদের ছেড়ে
যাবে না।
এদের বিশ্বাস নেই, আপা। এরা স্বার্থের জন্য সবই করতে পারে।
তারা মিয়া বলল- ছেঁকা খেয়ে এসেছি। একবার বিশ্বাস করেই দ্যাখ।
রেজিয়া বলল- বিয়ে একবারই হয়, আমিনা।
প্রথম স্বামী নিয়ে যার সুখ হয় না, তার কোনোদিনই সুখ হয়
না।
ঠিক আছে। এ নিয়ে কাল সকালে কথা বলব। এভাবে বলেই আমিনা তারা মিয়াকে উদ্দেশ্য
করে বলল- গোসল কর কি? কয়দিন গোসল করনি? যাও, বাথরুমে সাবান আছে। সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করে এস। আমি এখন ভাত বসাব।
ভাত হলে, খেয়েধেয়ে শোয়ে পড়বে।
বিশ
পরের দিন সকালে আমিনা রেজিয়ার কাছে গিয়ে বলল- কিন্তু এত সব আয়োজনের পরে
রশিদ ভাইকে কী বলব?
তুই চিন্তা করিস না। রেজিয়া বলল- যা বলার আমিই বলব। তোর কিচ্ছু বলতে হবে না।
রশিদ অবুঝ না, বুঝিয়ে বললে মেনে নিবে কথাটা।
কিন্তু অনেক আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধকে
নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, তাদের কী বলব?
এটা অবশ্যেই ভাববার কথা! কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে বলল- মনে হয়, তাঁরাও কথাটা বুঝতে পারবে।
আমিনা একটু ভেবে বলল- একটা কাজ করলে কেমন হয়, আপা?
কী কাজ?
বিয়েটা যদি আগের মতোই হয়। আমিনা দৃঢ়কণ্ঠে বলল- তাহলে তো কাউকে কিছু বলার
দর্কার হবে না।
মানে? তুই কি বলতে চাইছিস? কার
সাথে কার বিয়ে হবে?
জমিলার সাথে। জমিলার সন্তান নেই। মনে হয়, আমার
থেকে তাকে নিয়েই রশিদ ভাই বেশি সুখী হতে পারবে।
রশিদ রাজি হবে তো?
নিশ্চয় হবে। আমার বিশ্বাস, আমরা বললে, সে না
করবে না। জমিলাও এম, ই পাস। লিখাপড়ায়ো ভালো ছিলো। অল্প
বয়েসে তাকে বিয়ে দিয়েছিলো বলে লিখা-পড়া ছাড়তে হয়েছিলো।
জমিলা রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমিনা বলল- জমিলা ভেতরে আয়।
জমিলা রুমের ভেতর এলো।
আমিনা বলল- আমরা কী আলোচনা করলাম, তুই
বাইরে দাঁড়িয়ে মনে হয় সব শুনেছিস। এখন বল, তোর মতামত কি?
আমিনার অনুমান ঠিক। সে বাইরে দাঁড়িয়ে সবই শুনেছে। শুনে, সে মনে মনে খুশিই হয়েছিলো। একটা বি, এ
পাস ছেলে। একটি মাত্র দোষ, সে বিয়ে করেছিলো। তারও তো বিয়ে হয়েছিলো। তাহলে
আপত্তি করার কী আছে? তবুও বিয়ের কথা বলার সাথে সাথে স্বীকার
করে কীভাবে? তাই সে বলল- আমি আর কী বলব। তোমরা আছ, বাবা মা আছে। তারা মত দিলে আমার তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই।
তুই ভেবেছিস, তোর মা বাবার অনুমতি ছাড়াই তোকে বিয়ে দিব?
না, যা করার তাদের অনুমতি নিয়েই করব। আমি আজই
যাব তোর মা বাবার সাথে আলোচনা করের জন্য। তার আগে রশিদ ভাইর সাথে আলোচনা করতে হবে। রশিদ ভাই অনুমতি দিলে, তবেই আমি আজই চাচা-চাচির সাথে আলোচনা করতে যাব।
এভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমিনা ফিরদুসকে বলল- যা, তোর
গুণধর বাপকে ডেকে নিয়ে আয়।
ফিরদুস তারা মিয়াকে ডেকে আনল। আমিনা বলল- এ বাড়িতে দু’দিন পরে বিয়ে। তোমাকে কূলধরা হতে হবে। চুল দাড়ি কেটে পরিস্কার
এসো।
তারা মিয়া আমতা আমতা করতে লাগল। আমিনা বলল- এ বাড়িতে থাকতে হলে পরিস্কার
পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে হবে এবং আগের স্বভাব ছাড়তে হবে। গাঞ্জাটাঞ্জা খাওয়া চলবে
না এখানে।
দু'মাস ধরে গাঞ্জা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
তবে, আমতা আমতা করছ কেন?
না, মানে আমার হাতে চুল দাড়ি কাটবার মতো টাকা
নেই।
তাই বল, থাকবে কী করে? যা
কামাই করেছ, সবই তো বউর পাছে খরচ করে এসেছ। আমিনা ব্যাগ থেকে টাকা বের করে তারা মিয়ার
হাতে দিয়ে বলল- দু'হাজার আছে। চুল দাড়ি কেটে ভালো সার্ট
লংপেন্ট এবং পায়জামা পাঞ্জাবি কিনে এন। ঠাট্টা করছি না, সত্যিই
কূলধরা হতে হবে।
আশ্রব বলল- মা, আমিও যাব আব্বার সাথে।
আশ্রবকে নিয়ে তারা মিয়া চুল দাড়ি কাটতে গেল। আমিনা রেজিয়াকে নিয়ে রশিদের
বাড়ি গেল।
রশিদকে কথাটা বুঝিয়ে বলার পর আমিনা বলল- জমিলাকে তো আপনি দেখেছেন। মেয়েটা
খারাপ না। আমার থেকে ভালোই হবে। যদি দেখতে চান, দেখতে
পারেন।
রশিদ বলল- দেখার দর্কার হবে না। তাকে তো আমি কয়দিন ধরে রোজই দেখে থাকি আপনার
দোকানে।
রেজিয়া বলল- মেয়েটা খুবই কাজের। স্বামী মরেছে চার 'বছর আগে। বাবা মার কথা চিন্তা করে সে বিয়ে বসেনি।
আমিনা বলল- বিয়েটা আগের মতোই হবে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আগের মতোই নিমন্ত্রণে আসবে। পাত্রও ঠিকই থাকবে,
শুধু কন্যা পরিবর্তন হবে। আমার জায়গায় বিয়ের পীঁড়িতে বসবে
জমিলা।
জমিলার মা বাবার সাথে দেখা করে আমিনা জমিলার বিয়ের কথাটা বললো। জমিলার বাবা
মার আপত্তি করার কোনো হেতু ছিল না। বলার সাথে সাথে তারা মত দিয়ে দিলো। তবে, আপত্তি করলো বিয়ের স্থান নিয়ে। জমিলার বাবা বলল- মা,
জমিলাকে আমাদের বাড়ি থেকে বিদেয় দেওন যায় না?
আমিনা বলল- দেখেন চাচা, বিয়েটা হওয়ার কথা ছিলো আমার সাথে। তাই
সকল আয়োজন আমাদের বাড়িতেই করা হয়েছে। আত্মীয়স্বজনদের আমাদের বাড়ির কথা বলে
নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। এখন স্থান পরিবর্তন করলে কথাটা অন্যরকম হয়ে যাবে। আশ্রবের
বাবা সেদিন হঠাৎ চলে এসেছে। তাই আমার পরিবর্তে জমিলাকে বিয়ের পীড়িতে বসতে হচ্ছে।
বিয়েটা আমাদের বাড়িতে হলেও আপনিই জামিলাকে জামাইর হাতে তুলে দিবেন। এ নিয়ে আর
আপত্তি করবেন না।
জমিলার বাবা কথাটা বুঝে শেষে মত দিয়ে দিলো।
জমিলাকে নিয়ে আমিনা বিয়ের একদিন আগে বাড়ি চলে এলো। অনেক বছর পরে তারা মিয়া
ফিরে আসাতে আমিনার মনেও প্রজাপতির রং লেগেছিলো। জমিলার ক্ষেত্রেও একই কথা। তার যে একদিন রশিদের মতো একজন শিক্ষিত ছেলের সাথে বিয়ে হবে এ কথা কল্পনাতেও ছিলো না তার মনে। ইস্টিকুটুমের আগমনে
বাড়িটা সরগরম হয়ে উঠল। বাড়িতে যেন অকালে বসন্তের আগমন হলো। তারেক মৃদা বিয়েতে
যথেষ্ট সহযোগ করলো। তারা মিয়া কূলধরার দায়িত্ব গুরুত্ব সহকারেই পালন করল এবং
বিয়েটা সময় মতোই সুকলমে সম্পন্ন হলো।
জমিলাকে নিয়ে রশিদ আগের সিদ্ধান্ত মতো বিয়ের দিন আমিনার ভাড়াঘরে বাসর রাত
কাটালো।
রেজিয়াও এসেছিলো তাদের সাথে। পরে দিন সকালে উঠে সে রশিদদের জাগিয়ে বললো- রাত
কেমন কাটলো তোমাদের? কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
রশিদ বলল- না, কী অসুবিধা হবে। আপনি যেখানে আছেন, সেখানে কী অসুবিধা হতে পারে!
রেজিয়া ঠাট্টার সুরে বলল- কী জমিলা, অকালে
বসন্তের আগমন হয়েছে, কোকিলের ডাক কেমন লাগলো?
লজ্জায় জমিলার মুখমন্ডল লাল হয়ে উঠল। বলল- আপা.......
লজ্জা কিসের অ্যা। রেজিয়া বলল- এই দিনটির অপেক্ষায়ই তো মেয়েরা থাকে।
জমিলা এইবার মুখ খুললো- শুধু আমাদেরই নয়, আপা।
আমিনা আপার জীবনেও অকালে বসন্তের আগমন হয়েছে।তার স্ফূর্তি দেখলে তুমি অবাক হয়ে
যেতে।
রশিদ কৌতুকের স্বরে বলল- আপনার জন্যেও ব্যবস্থা করি, আপা?
রেজিয়া বলল-করলে মন্দ হয় না। শুকুরজান গেল, জমিলা
গেল, আমিনার পুরানা গাছে নতুন ফুল ফুটলো। আমি আর বাদ থাকব কেন?
রশিদ রসিকতার স্বরে বলল- তার মানে আপনার পুরানা গাছেও অকালে বসন্তের ফুল ফুটবে?
রেজিয়া বাঁকা চোখে রশিদের দিকে তাকিয়ে বলল- সব জায়গায়ই যখন অকালে বসন্তের
আগমন হয়েছে.....তখন আমার ক্ষেত্রে বাদ পড়বে কেন? তবে,
তোমাদের কষ্ট করতে হবে না। আমি সে ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি।
সমাপ্ত

আপোনাৰ লেখাখিনি পঢ়ি ভাল লাগিছে। দীৰ্ঘায়ু কামনা কৰিলোঁ
উত্তরমুছুনইতি
দেৱান দানেচ আলী
জনীয়া কলেজ