দিগ্বিজয়ী বাবর (ঐতিহাসিক উপন্য়াস) ৪ নং খণ্ড


   দিগ্বিজয়ী বাবর (ঐতিহাসিক উপন্য়াস) ৪ নং খণ্ড

সেটা ছিলো বাদশাহ ওমর শেখের সময়ের কথা সমরকন্দের শাসক সুলতান আহম্মদ আখসি আক্রমণের জন্য কুবাশ্বায় নদীর সেপারে ছাউনি পেতে অবস্থান করতেছিলেন কুবাশ্বায় নদী পার হয়ে তিনি যেকোনো মুহূর্তে আখসির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে চালাবে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, অত্যাচারের তাণ্ডব... ভোগের জন্য বলপূর্বক ধরে নিয়ে যাবে সুন্দরী নারী

কথাটা ভাবতেই তাহিরজান উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো তার চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এক বীভৎস মর্মান্তিক দৃশ্য পাষণ্ডরা যদি রাবিয়াকেও ধরে নিয়ে যায়! তাহলে সে কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? পাষণ্ডরা রাবিয়াকে......

পাষণ্ডরা রাবিয়ার উপরে কীভাবে পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে তার এক কল্পিত চিত্র তাহিরজানের চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো সাথে সাথে সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো না না, সে কোনোমতেই রাবিয়াকে শত্রুর হস্তগত হতে দিবে না যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে সে রাবিয়াকে রক্ষা করতে হবে শত্রুদের সে নদী পার হতে দিবে না শত্রুর হাত থেকে সে আখসি রক্ষা করবে--- রক্ষা করবে তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে.....

কিন্তু কীভাবে?

তাহিরজানের মনে একটি বুদ্ধি উদয় হলো কুবাশ্বায় নদীর উপরে মাত্র একটি পুল সেই পুল দিয়ে নদী পার হয়েই শত্রু এপারে আসতে হবে পুলটা জ্বালিয়ে দিতে পারলেই আখসি নিরাপদ আখসি নিরাপদ হলে রাবিয়াও নিরাপদ তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে তখন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তাই সে রাতের অন্ধকারে পুলটা জ্বালিয়ে দিবে

ভাবামতেই কাজ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সে পুলটা জ্বালিয়ে দিতে বের হলো কেরোসিনের টিন এবং হাতে হাতে কুড়াল নিয়ে তারা পুলের নিকট এলো

সেদিন অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল সাথে বইছিলো ঝড়ো বাতাস প্রথমে তারা পুলে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরানোর চেষ্টা করলো কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বৃষ্টি বাতাসের জন্য তারা পুলে আগুন ধরাতে সক্ষম হল না অবশেষে তারা হতাশ হয়ে আগুন ধরানোর আশা ত্যাগ করলো

আগুন ধরাতে না পারলেও তাহিরজান হতাশ হল না সে বজ্রমুষ্টিতে কুড়াল ধরে পুলের একটি খামে উন্মাদের মতো কুড়াল চালাতে লাগলো প্রচণ্ড শীতের মাঝেও সে ঘেমে নেয়ে উঠলো তার সঙ্গীরাও এই ক্ষেত্রে তাকে পার্যমানে সহায় করতে লাগলোনিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পরেও তারা মাত্র একটি খামের বাহিরে পুলের বিশেষ ক্ষতি সাধন করতে পারল না এদিকে পূর্বদিকে ফর্সা হয়ে গেলো শত্রুর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত তাহিরজান সূর্য উদয়ের আগে আগে সঙ্গীদের নিয়ে গৃহে ফিরে এলো

এদিকে তাহিরজানরা পুলের পাশ থেকে চলে আসার সাথে সাথে শত্রুসেনা আখসি অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো পূবে ফর্সা হওয়ার আগেই সেনা বাহিনীর অগ্রভাগ এসে পুলের পাড়ে উপস্থিত হলো বাড়ন্ত জলের প্রচণ্ড স্রোতে পুলের খামগুলোতে জোরে জোরেধাক্কা মারতে ছিলো সেনা বাহিনীর অগ্রভাগে সেনা সংখ্যা অল্প ছিলো যারজন্য তারা অনায়াসে পুল পার হয়ে এপাড়ে আসতে সক্ষম হলো

সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগ পুলে উঠার সাথে সাথে ঘটলো ঘটনাটা-

সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগে সেনা সংখ্যা অধিক ছিলো তদুপরি মালবাহী গাড়ীগুলোও ছিলো পশ্চাদভাগে

মানুষ এবং মালবাহী গাড়ী একসাথে পুলের উপর উঠার ফলে পুলের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়লো যারজন্য তাহিরজানরা ক্ষতি সাধন করা খামটা মড়মড় করে ভেঙ্গে গেলো খাম ভাঙার সাথে সাথে পুলটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে ধ্বসে যেতে লাগলো সেনা এবং মালবাহী গাড়ীর বোজা বহন করতে অক্ষম হয়ে এক সময় পুলটা মড়মড় করে ভেঙ্গে নদীর জলে পড়ে গেলো ফলে সেনাদের মাঝে হাহাকার লেগে গেলো অনেক সেনা জলে ভেসে গেলো এবং মালবাহী গাড়ীগুলো নদীর জলে তলিয়ে গেলো

তবুও আহম্মদ সুলতান হতাশ হলেন না তিনি পুল মেরামত করার জন্য নির্দেশ দিলেন

কুবা থেকে জুর-জুলুম করে মিস্ত্রী ধরে এনে পুল মেরামত করার জন্য লাগিয়ে দিলেন দুই দিনেই পুল মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ হলো সেনা বাহিনী পুল পার হয়ে এপাড়ে এলো

সেনা বাহিনী এপাড়ে এসেই লুটপাটের তাণ্ডব চালালো পাঁচজন সেনা বারিয়াদের গৃহেও প্রবেশ করলো রাবিয়া তখন গাই দোহন করছিলো কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রথমে সে সেনা আসাটা লক্ষ্যই করেনি সেনা গৃহে প্রবেশ করতে দেখে রাবিয়ার মাতৃ ব্যস্তভাবে দৌড়ে এসে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- তুমি এখনও এখানে রয়েছ? গৃহে সেনা প্রবেশ করেছে যাও, তাড়াতাড়ি পালাও

 রাবিয়া প্রথমে মাতৃর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো- কী হয়েছে, মা?

শত্রু দাঁড়া, বাইরে যাবি না খিড়কি দিয়ে গৃহের ভেতর প্রবেশ করে গরুর জন্য জমিয়ে রাখা ভুসির পুঁজির মাঝে লুকিয়ে থাকগে

রাবিয়া সচকিত হয়ে গাভীর তল থেকে উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে বাগানের ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢোকে আসা সৈনিক একজনের চোখ তার উপরে পড়ল

সৈনিকটি সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললো- সুন্দরীর মতোই যেন লাগছে!

সঙ্গী সৈনিকরা ঘোড়া খুঁজার ধান্দায় ছিলো তারা সৈনিকটির কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বললো- সুন্দরী মেয়ের চেয়ে আমাদের এখন ঘোড়ার বেশি প্রয়োজন

সুন্দরী মেয়ে ঘোড়ার চেয়েও বেশি প্রয়োজন প্রথম সৈনিকটি এভাবে স্বাগতোক্তি করে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- এই মেয়ে, দাঁড়া এভাবে বলেই সৈনিকটি পাশের সৈনিকটিকে উদ্দেশ্য করে বললো- সমরকন্দ নিয়ে গিয়ে ফাজিল বেগের নিকট বিক্রী করলে মূল্য ভালোই পাওয়া যাবে

সৈনিক দুজন দ্রুত রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো রাবিয়া ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে দৌড়ে ভুসি জমিয়ে রাখা গৃহের ভেতর ঢোকে গেলো সৈনিক দুজন ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়ে এসে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো

রাবিয়ার মাতৃ দৌড়ে এসে দরজার সন্মুখে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িযে সৈনিক দুজনকে গৃহের ভেতর প্রবেশ করায় বাধা প্রদান করে বললো- আপনারা যদি মুসলমান হয়ে থাকেন, আমার মেয়ের শরীরে হাত দিবেন না প্রয়োজন হলে আমাকে মারুন, আমার মেয়ের সর্বনাশ করবেন না তার একজন যুবকের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে

প্রথম সৈনিকটি ফোঁস করে উঠলো- মেয়ে! বিয়ে ঠিক হয়ে আছে! সেজন্যেই তো বেশি টাকা পাব সরে যা, আমার সন্মুখ থেকে এভাবে বলেই সৈনিকটি রাবিয়ার মাতৃকে ঠেলে ফেলে দিলো পরে যাওয়ার সময় রাবিয়ার মাতৃর মাথা একটি খুঁটায় লাগলো এবং তিনি সাথে সাথে অচেতন হয়ে পড়লেন

প্রথম সৈনিকটি গৃহের ভেতর প্রবেশ করলো ইতিমধ্যে রাবিয়া ভুসির পুঁজির মাঝে ঢোকে পড়েছিলো সৈনিকটিকে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা দেখে সে ভুসির মাঝ থেকে বেরিয়ে খিড়কির দিকে দৌড়ে গেলো দ্বিতীয় সৈনিকটি টেনিচ বলের মতো লাফিয়ে এসে রাবিয়ার একটি হাতে ধরে ফেললো

ইতিমধ্যে তৃতীয় সৈনিকটি একটি বস্তা নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছেছিলো সে বস্তাটা নিয়ে রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো

রাবিয়া সজাগ হয়ে উঠলো তাকে বস্তার ভেতর ভরাবে ভেবে সে সহাযের জন্য চিৎকার করে ডাকলো- কে কোথায় আছ? আমাকে বাঁচাও

তাহিরজান রাবিয়াদের গৃহের পাশেই একটি গৃহে লুকিয়ে ছিলো সে খিড়কির ফাঁক দিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে তাকিয়ে অসীম ধৈর্য ধরে সৈনিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো রাবিয়ার চিৎকার শুনে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো তার মন থেকে ভয়-শংকা শীতের কুয়াসার মতো উড়ে গেলো লুকিয়ে থাকা গৃহ থেকে সে লাফ মেরে বেরিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে দৌড়ে এলো রাবিয়াদের গৃহে এসে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তার সিরা-উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো

ইতিমধ্যে রাবিয়াকে গৃহের বাইরে বের করে আনা হয়েছিলো এবং রাবিয়া উঠোনে পড়ে ছটফট করছিলো একজন সেনা তার পা দু'টি ধরে রেখেছিলো এবং আরেকজন সেনা তার হাত দুটি পেছন দিকে এনে আঁঠু দিয়ে কোমরে চাপ দিয়ে ধরে রেখেছিলো তৃতীয়জন সেনা তাকে বস্তার ভেতরে ভরানোর জন্য যো-জা করছিলো চতুর্থজন সেনা ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং পঞ্চমজন সেনা ঘোড়ার পিঠে বসে দৃশ্যটা উপভোগ করছিলো ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা সেনাটির হাতে বর্শা ছিলো

দৃশ্য দেখে তাহিরজান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো প্রেমাস্পদের দুর্দশা দেখে সে দুর্নিবীত হয়ে উঠলো পাঁচজন সেনার সাথে সে একলাই মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলো তার মন থেকে ভয়-শংকা দূর হয়ে গেলো তার মনে শুধু একটি চিন্তাই তোলপাড় করতে লাগলো যে, সে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে রাবিয়াকে পাষণ্ডদের কবল থেকে রক্ষা করতেই হবে

তাহিরজান তরবারি কোষমুক্ত করে রাবিয়ার দিকে দৌড়ে এলো তখন বর্শাধারী সেনাটি চিৎকার করে বললো- এই এগিয়ে আসবি না দাঁড়া বলছি, না হলে বর্শায় বিঁধে ফেলব

তাহিরজান বর্শাধারীর সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করলো না সে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে এসে রাবিয়ার পা ধরে থাকা সৈনিকটির উপরে তরবারি দিয়ে আঘাত করলো

সেনাটি আর্তনাদ করে রাবিয়ার পা ছেড়ে দিয়ে রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠোনে ঢলে পড়লো

তাহিরজান পুনরায় তরবারি তুলতেই তার কাঁধে তীব্র বর্শার আঘাত অনুভব করলো সে অবসন্ন হয়ে মৃত সেনাটির উপরে ঢলে পড়লো পরার সময়ে সে রাবিয়ার তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেলো- হায়, তাহির! এই জন্মে হয়তো আমাদের আর সংসার পাতা হবে না পরজন্মে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকব

তাহিরের অনুমান হলো, দূর থেকে কে যেন তাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে

তাহির রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকলো এবং বাকি সেনারা রাবিয়াকে বস্তায় পূরে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিলো তারপরে তারা তাহিরজান এবং মৃত সেনাটিকে সেখানে ফেলে রেখে রাবিয়াকে নিয়ে চলে গেলো

বর্শার আঘাতে তাহিরের কাঁধে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সেই ক্ষত শুকোতে অনেক দিন লেগেছিলো

রাবিয়াকে হারিয়ে তাহির পাগলের মতো হয়ে উঠেছিলো এবং ঘা শুকানোর পরে সে রাবিয়ার উদ্দেশ্যে সমরকন্দ গিয়েছিলো তবে সে সেখানে রাবিয়ার কোনো সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়নি অবশেষে সে হতাশ হয়ে রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে আন্দিজান চলে আসে এবং তখনই মামা ফজিলুদ্দিন তাকে সেনা বাহিনীতে ভর্তি করে দেন

বাবর প্রথমবার সমরকন্দ বিজয়ের সময়ে তাহিরজানও সেই সেনাবাহিনীর সাথে সমরকন্দে গিয়েছিলো তখনও সে রাবিয়াকে ভুলতে পারেনি যারজন্য সমরকন্দ গিয়েই সে রাবিয়াকে খুঁজতে শুরু করেছিলো তখন তার সাক্ষাৎ হয় মমত নামের একজন সৈনিকের সাথে মমত জাতে মুচি ছিলো কয়েকদিনের ভেতরে তাহিরজানের মমতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গঢ়ে উঠে আহম্মদ সুলতান আখসি আক্রমণের সময়ে মমত আহম্মদ সুলতানের সেনা বাহিনীতে কাজ করছিলো অবশেষে মমত তার স্ত্রীর সাহায্যে রাবিয়াকে খুঁজে দেয়ার জন্য শপত খায় কিন্তু রাবিয়াকে খুঁজে থাকা অবস্থায় আহম্মদ তনয়াল আন্দিজানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সেজন্য তাহিরজান রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে বাবরের সংবাদবাহক হিসাবে আন্দিজান যেতে হয়

বাবর দ্বিতীয়বার সমরকন্দ দখলের সময়ে তাহিরজান আবার সমরকন্দ যায় তখন মমতের স্ত্রী রাবিয়ার সন্ধান বের করতে সক্ষম হয় তাহির মমতের সাহায্যে একজন ধনী ব্যবসায়ীর গৃহ থেকে রাবিয়াকে উদ্ধার করে আনে এবং ধর্মীয় বিধান অনুসারে রাবিয়াকে স্ত্রীর মর্যদা প্রদান করে

ঝরে শুকিয়ে যাওয়া ফুল পুনরায় সজীব হয়ে উঠে জীবনের উল্লাস কলরবে ভরে পড়ে তাদের দাম্পত্য জীবন

প্রেমাস্পদকে হারিয়ে তাহিরজান প্রথমে বাবরের সেনা বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে ভর্তি হয়েছিলো অসীম সাহস এবং নিষ্ঠার বলে সে সাধারণ সৈনিক থেকে বেগের মর্যদা লাভ করে এবং বর্তমান তাঁর বাবরের দেহরক্ষীদের সর্দারের পদে পদোন্নতি হয়েছে

বাবরের কাহিনী বলার সময়ে তাহিরের কথা সময়ে সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে অনেক সংকটময় মুহূর্তে তাহিরজান বাবরকে আসন্ন মৃত্যু মুখ থেকে রক্ষা করেছে হয়তো ঘটনাক্রমে তাহিরজান বাবরের জীবনে না এলে বাবরের হিন্দুস্থান বিজয় সম্ভব হতো না এবং এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভা অকালে মহাকালের বুকে হারিয়ে যেতো ইতিহাসের বুকে খোদিত হতো না অসীম সাহসী দৃঢ়চেতা সিংহ পুরুষ বাবরের অনেক শ্বাসরুদ্ধকারী বিস্ময়কর যুদ্ধের কাহিনী

                *   *   *

বাবর কিছু সুস্থ হয়ে উঠার পরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট এলেন

হেকিম ইউসূফ বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন তিনি তদন্তকারী সভাসদকে ইশারায় কাছে ডেকে এনে ফিফিস্ করে বললেন- বেশি বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই দুই একটি কথায় শুধু প্রকৃত ঘটনা বলুন

তদন্তকারী সভাসদ বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে তথ্য উদ্ধার করেছিলো তা বাবরের নিকট ভেঙে বললেন

মূল কথা ছিলো এ রকম- বৈদা সুলতানা নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন বিষপ্রয়োগের পরিকল্পনা তিনি নিজেই করেছিলেন এবং পরিকল্পনাটা সফল করার জন্য লোকও তিনি নিজেই ঠিক করেছিলেন বাবরকে বিষ প্রদান করতে পেরে তিনি সুখীপুত্রের হত্যাকারীর উপরে প্রতিশোধ নিতে পেরে বর্তমান তিনি উৎফুল্লিত এতদিন বুকের মধ্যে প্রজ্বলিত অগ্নি বর্তমান নিবার্পণ হয়েছে বিষাদের জায়গায় উল্লাসে ভরে উঠেছে হৃদয় তদন্তকারী সভাসদ এটাও জানতে চেষ্টা করেছিলেন যে, ষড়যন্ত্রের সাথে রাণা সংগ্রাম সিঙও জড়িত ছিলো নাকি? কিন্তু বৈদা বেগম এই প্রশ্নের উত্তর দিতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন শাস্তি প্রদান করলে অবশ্যে স্বীকার করাতে পারতেন, তবে বৈদা সুলতানার মতো একজন বিশিষ্টা মহিলাকে বাবরের অনুমতি অবিহনে শাস্তি প্রদান করার সাহস তিনি পাননি

তদন্তকারী সভাসদের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন- তিনি জবাব দিতেই হবে....…. সেই বদমাশ খানসামা ...সেও শাস্তি পেতে হবে সবাই শাস্তি পেতে হবে সেই খানসামাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম...সে রন্ধনকৃত আহার্য আমি গ্রহণ করেছি......এবং সেই পাষণ্ড আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে.... কী জঘন্য তার মানসিকতা!

জাহাপনা, সেই জঘন্য বদমাশদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি প্রদান করে হত্যা করা উচিত যাতে অন্যরাও সেই শাস্তি দেখে শিক্ষা পায় তদন্তকারী সভাসদ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- তাদের সাহস দেখে আমি আচরিত হয়েছি, জাহাপনা

হ্যাঁ, তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য তারা তরবারির আঘাতে নরহত্যা করা অপরাধীর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে বললেন- সেই তিনজনকে পরম্পরামতে মৃত্যুদণ্ড দিন ইব্রাহীমের মাতৃর বিচার পরে করা হবে

আপনার আদেশ শিরোধার্য তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন

অসীম মনোবল এবং চিকিৎসার ফলে তিনদিন তিনরাত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বাবর সুস্থ হয়ে উঠলেন বাবর আরোগ্য হয়ে উঠাতে শুভাকাংক্ষীবর্গ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন

বাবর সুস্থ হয়ে উঠার দিনই বেগবর্গ, শুভাকাংক্ষী, পদস্থ সভাসদ এবং বিভিন্ন প্রান্তের রাজপ্রতিনিধিবর্গ বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন বাবর তাঁদের রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন সবাই এসে পদমর্যদা অনুসারে আসন গ্রহণ করলেন বাবর ধীরে ধীরে দরবার কক্ষে এসে সিংহাসনে আরোহণ করলেন সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি বৈদা সুলতানাকে দরবারে হাজির করার জন্য নির্দেশ দিলেন

বৈদা সুলতানাকে দরবার কক্ষে হাজির করা হলো তাঁর ডানে বামে দুজন রক্ষী দাঁড়িয়ে রইলো

বৈদা সুলতানার মাথার চুলগুলো কাপাস তুলোর মতো সাদা বয়সের আঁচড়ে তাঁর দেহ কিছু পরিমাণে কুঞ্চিত যদিও তিনি বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সিংহাসনের সোনালী ঢাচা, রাজমুকুটে খচিত হীরা-মুক্তার চমক, বাবরের পাংশু মলিন চেহেরা, কোটরাগত চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি মাথা নত করলেন পরের মুহূর্তেই তিনি আবার বুক উন্নত করে দাঁড়ালেন

বাবরের নির্দেশে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো তদন্তকারী সভাসদ বৈদা সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন- বাদশাহের হত্যার প্রয়াসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাইরেও আরও কে কে জড়িত ছিলো এই কার্যে?

সেটা হত্যার প্রয়াস ছিল না-- সেটা ছিলো প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থের প্রয়াস বৈদা সুলতানা নির্ভীকভাবে বলতে লাগলেন- সেটা ছিলো আপনাদের বাদশাহ দ্বারা প্রবাহিত রক্তের প্রতিশোধ আমার সাথে সহযোগিতা করা বাহালুল, আহাম্মদ এবং পরিচারিকা সবাই একজন একজন শহীদ তাঁরা বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন এখন আমার পালা পড়েছে মৃত্যুর জন্য আমার লেশমাত্র ভয় নেই পুত্রশোকে জ্বলে জ্বলে আমি ইতিমধ্যেই ছাই হয়ে গেছি আমাকে হত্যা করে আমার ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিন

বৈদা সুলতানা ফার্সি ভাষায় কথা বলার জন্য সবাই তাঁর কথা বুঝতে পারছিলেন তাঁর তেজোদীপ্ত বক্তব্য সবাই মনযোগ সহকারে শুনতেছিলেন যারজন্য দরবার কক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছিলো তিনি যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছেন তাঁর নির্ভীক তেজোদীপ্ত বক্তব্যে সেটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ হচ্ছিলো

বৈদা সুলতানা মৃত্যু ভয় জয় করার কথাটা বাবরের দৃষ্টিতেও প্রকট হয়ে উঠলো বাবর ভাবলেন, মৃত্যু ভয় জয় করার জন্যেই তিনি প্রত্যেকটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণভাবে উচ্চারণ করতে সক্ষম হচ্ছেন তাঁর প্রত্যেকটা শব্দের মাঝে তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকট হয়ে উঠেছে ধূমায়িত হচ্ছে বিদ্বেষ তীরের মতো তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে সহায় সম্বলহীন, পুত্র শোকে আতুর একজন মাতৃকে বাবর জল্লাদ ডেকে কঠোর থেকে কঠোতর শাস্তি প্রদান করে হত্যা করার জন্য আদেশ প্রদান করাটা তিনি মনে-প্রাণে কামনা করছিলেন পরাজয়ের মাধ্যমে তিনি জয়ের কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করতে চাইছেন বাবর ক্রোধোন্মত্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে জয় বৈদা সুলতানারই হবে-- তাঁর নির্ভীকতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে-- ইতিহাসের পাতায় একজন নির্ভীক মহিলা হিসাবে চিরদিন অমর হয়ে থাকবে সবাই তাঁর কথা শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করবে সবাই তাঁর কীর্তি কাহিনী আন্তরিকভাবে স্মরণ করবে এবং বাবর চিরদিন সেই কলঙ্কিত কাহিনীর খলনায়ক হয়ে থাকবে

কথাগুলো ভাবতেই বাবরের ওষ্ঠের কোনায় ঈষৎ হাসির রেখা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠলো না না, বৈদা সুলতানার ঈস্পিত শাস্তি প্রদান করে তাঁকে জয়ী হতে দিবেন না তিনি বৈদা সুলতানার উপরে তিনি নিজেই বিজয় সাব্যস্ত করবেন যেভাবে তিনি বিষের প্রতিক্রিয়ার উপরে ধৈর্য এবং দৃঢ়তা সহকারে বিজয় সাব্যস্ত করেছেন

হৃদয়ে সঞ্চারিত ক্ষোভ, আক্রোশ সংযত করার জন্য বাবর কয়েকটা মুহূর্ত মৌন হয়ে রইলেন

বাবরের মৌনতার সুযোগে মালিক দাদ কারাণী নামক বেগ একজন বৈদা সুলতানার এই মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- নিজেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী শহীদ বলে ভাববেন না, ইব্রাহীম মাতৃ বাদশাহের সাথে বেইমানী করে আপনি নিকৃষ্ট কাজ করেছেন

চুপ কর বিদ্রোহী বৈদা সুলতানা ধমকের সুরে বললেন- আমার পুত্রহন্তার উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি উপযুক্ত কাজই করেছি

আপনি মাতৃজাতির নামে কলঙ্ক লেপন করেছেন জাহাপনা আপনাকে মাতৃ বলে সম্বোধন করে আপনার সন্মান বর্দ্ধন করেছিলেন আপনি সেই সন্মানের মাথায় কুঠারাঘাত করেছেন আপনি সেদিন যে কৃতজ্ঞতার চোখের জল ফেলেছিলেন, সে কথা আপনি ভুলে গেলেন নাকি, ইব্রাহীম মাতৃ?

না না, সেটা কৃতজ্ঞতার চোখের জল ছিল না-- সেটা ছিলো, ঘৃণার চোখের জল যারজন্য আমার ইব্রাহীম অকালে শহীদ হয়েছেন, আমি কখনও তাঁর মাতৃ হতে পারি না- কোনো মাতৃই সেটা হতে পারে না

বাবর তখনও নীরব তিনি আচ্ছন্নের মতো বৈদা সুলতানার প্রগলভতা উপভোগ করছিলেন

মালিক দাদ কারাণী উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন- আপনার পুত্রের নিকট বাবরের চেয়েও দশগুণ অধিক সৈন্য ছিলো আমি ভালভাবে জানি, সে যুদ্ধে জয়ী হলে বাবর বাহিনীর একজন সৈনিকো জীবিত রাখতো না ইব্রাহীমের অত্যাচার-উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়েই হিন্দুস্থানের কিছু সংখ্যক সচেতন লোক বাবরকে ডেকে এনেছেন যুদ্ধ সব সময় যুদ্ধই সেখানে এক পক্ষের জয় হলে অন্যপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত বাদশাহ বাবর খোলা প্রান্তরে তরবারির বিরুদ্ধে তরবারি দিয়ে ন্যায় যুদ্ধই করেছেন আপনার হৃদয়ে তিল পরিমাণ মনুষ্যত্ব থাকলেও আপনি এভাবে হিংস্রতার আশ্রয় নিতে পারতেন না

আমি একজন অবলা নারী আমি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে অক্ষম যারজন্য বিষই আমার তরবারি বিদেশী আক্রমণকারীরা আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে সমগ্র হিন্দুস্থানে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে অনেক মাতৃকে আমার মতো শোকবস্ত্র পরিধান করতে হয়েছে অনেক বিধবাকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে হয়েছে বৈদা সুলতানা কথাগুলো বলার সময় প্রতিটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছিলেন

দীর্ঘ দাড়ির বেগ একজন দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- জাহাপনা, আমরা উন্মাদ বৃদ্ধার প্রলাপ অনেক শুনলাম এখন জল্লাদ ডেকে এর বাগ্মিতা বন্ধ করার আদেশ দিন

হ্যাঁ হ্যাঁ, টুকরা টুকরা করে কাটার আদেশ দিন বৈদা সুলতানা গর্জে উঠলেন- মরতে আমি ভয় করিনা, মরতে আমার একটুও ভয় নেই

সভাসদবর্গ বৈদা সুলতানার প্রাণদণ্ডের দাবি জানাতে লাগলেন- এই উন্মাদ বৃদ্ধাকে হাতীর পা- নিচে ঠেলে দিয়ে পিষে হত্যা করা হোক এভাবে নানান জনে নানান পরামর্শ দিতে লাগলেন

বাবর সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন- আপনারা অনুগ্রহ করে শান্ত হোন আমাকে ভাবতে সময় দিন

বাবরের আহ্বানে সবাই শান্ত হলো

বাবর শান্ত সংযত কণ্ঠে বললেন- এই পুত্র শোকাতুরা জ্ঞানী মাতৃর শুধু একটাই শাস্তি মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক শাস্তি মাননীয় সভাসদবর্গ, আপনারা শুনলেন যে, মহামান্য মাতৃর হৃদয় পুত্রহারা মাতৃ, পতিহারা বিধবা এবং পিতৃ-মাতৃ হারানো সন্তানের জন্য কাঁদতেছেন বাবর এভাবে বলেই কিছুক্ষণ মৌন থেকে কণ্ঠস্বর পাল্টিয়ে বললেন- কিন্তু এসব একেবারে মিথ্যা কথা ইনার স্নেহধন্য পুত্র- বাংলা, গোয়ালিয়র এবং আশেপাশের রাজাদের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছেন সেই সব যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষও নিশ্চিতভাবে মরেছে! বাবর বৈদা সুলতানার দিকে তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- আমাকে একটু বলবেন নাকি মাতৃতখন আপনি কী করছিলেন?

মালিক দাদ কারাণী ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন পানীপত যুদ্ধের পরে বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে বাবরের দরবারের একজন সভাসদ হিসাবে যোগদান করেছেন তিনি তৎক্ষণাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাবরকে সমর্থন করে বললেন- গত তিন বছরে আমাদের দিক থেকেই ষাট হাজার সেনা মরেছে, জাহাপনা

আচ্ছা সভাসদবর্গ, আপনারা এক সময়ের ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ মালিক দাদ কারাণীর মুখে শুনলেন যে, বিগত তিন বছরে কত লোক এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্রের লোভের বলি হয়েছে এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র এই সিংহাসনে- বাবর সিংহাসনে চাপড়ে চাপড়ে বললেন- সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র দশ বছর এই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন হিন্দুস্থান বিশাল জনসংখ্যার দেশ মানুষের অভাব নেই- একজন আরেকজনকে হত্যা করার জন্য আপনারা জানেন, ইব্রাহীম লোডী সর্বদা ভারাটিয়া সেনা নিয়োগ করছিলেন কারণ তাঁর হাতে ধনের অভাব ছিল না কিন্তু সেই ধন-সম্পদ সৌধাদি নির্মাণ বা সাম্রাজ্যের কল্যাণের জন্য খরচ করতেন না তিনি ধন-সম্পদ খরচ করতেন ভারাটিয়া সেনা কিনার জন্য- সৈন্য কিনে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার জন্য হিন্দুস্থানের পবিত্র শ্যামল মাটি রক্তে রঞ্জিত করার জন্য ইব্রাহীম ছিলো একজন অদক্ষ সেনা নায়ক তার প্রমাণ পানীপত যুদ্ধ একজন সেনা নায়কের সাফল্য দক্ষতার পরিমাপ যুদ্ধ জয় দিয়ে করা হয় না দক্ষতা এবং সাফল্য পরিমাপ করা হয় যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে পানীপতের যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি দুই হাজার সৈন্য এবং ইব্রাহীম লোডী হারিয়েছে ত্রিশ হাজার সৈন্য তবুও সে আমার কামান, বন্দুক এবং তরবারির জন্য নয় সেনা হারিয়েছে নিজের অদক্ষতার জন্য তার নিজের বাহিনীর সেনা এবং হাতীর পা- নিচে পড়ে তার অধিক সংখ্যক সেনা মরেছে ইব্রাহীম লোডী নিজেও হয়তো তার নিজের হাতীর শিকার হয়েছে কথা অবশ্যে আমি জানিনা, শুধু অনুমান করছি সন্মানীয়া মাতৃ যদি এতইমানব দরদী- বাবর সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন তাঁর কণ্ঠস্বর গমগমিয়ে উঠলো- মৃত সৈনিকদের মাতৃ, বিধবা পত্নী এবং সন্তানদের প্রতি যদি এতই হৃদয় বিগলিত, তাহলে সন্মানীয়া মাতৃ কেন যুদ্ধে এতো মানুষ মরতে দিচ্ছিলেন--নিজের সুযোগ্য সন্তানকে কেন যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন নি? তাঁকে বৃথা রক্তপাত করা থেকে বিরত করেন নি কেন?

আমি শুধু একজন মাতৃ বাদশাহকে হুকুম দেওয়াটা আমার আয়ত্বের বাইরে ছিলো বৈদা সুলতানা বাবরের যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে এইবার অভিযোগ করার পরিবর্তে শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করলেন

আর আমরা সেই যুদ্ধপিপাসু যোদ্ধার যুদ্ধ পিপাসা নিবারণ করার জন্য দেশে এসেছি আমরা এখানে এসেছি অত্যাচারির অত্যাচার থেকে হিন্দুস্থানের মানুষদের রক্ষা করে সুখী সমৃদ্ধ মঙ্গলকামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যে সংকল্প নিয়ে এসেছি, আমরা সেটা বাস্তবে রূপায়ন করে দেখাব এই কপট প্রবঞ্চক মাতৃর জন্য ভয়াবহ শাস্তি আমি এরঁ বিদ্বেষ আক্রোশ ভরা জলন্ত দৃষ্টির সম্মুখে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা করব সংকল্প নিয়ে আসা কাজ আমরা এই মাতৃকে করে দেখাব

ধন্যবাদ, বাহ্ বা মালিক দাদ কারাণী বাবরের মহানুভবতাকে প্রশংসা করলেন

সবাই অভিভূতের মতো বাবরের দ্বন্দ্বের উপরে বিজয় সাব্যস্ত উপভোগ করতে লাগলেন

বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- এই মাতৃর হৃদয় বিধবা পত্নী, সন্তানহারা মাতৃ এবং পিতৃহারা সন্তানের জন্য বিগলিত সেজন্য আমি হুকুম দিলাম..... বাক্যটা সম্পূর্ণ না করে ডাকলেন- আব্দুল করিম বেগ কারাণী.......

বামদিকের সারি থেকে একজন বলিষ্ঠ সুগঠিত বেগ দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে বললেন- আদেশ করুন, জাহাপনা

আপনি এই মাতৃর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যমুনা নদীর পাড়ে একটা অন্নসত্র নির্মাণ করুন ইনারঁ চাকর-বাকর সকলে সেখানে কাজ করবে এবং প্রতিদিন বিধবা এবং এতিমদের সেখানে খাওয়াবে

আপনার হুকুম শিরোধার্য, জাহাপনা আব্দুল করিম বেগ মাথা নুইয়ে বললো

এবং আপনি আজীবন সেই অন্নসত্র দেখা-শুনা করবেন

জাহাপনা আব্দুল করিম বেগ বৈদা সুলতানার দিকে ইশারা করে বিমূঢ়ের মতো বললো- এর প্রাণদণ্ড হবে না নাকি, জাহাপনা?

আমার যা বলার বলে শেষ করেছি

প্রাণদণ্ড হবে না নাকি? অপেক্ষিত মৃত্যুর ভায়বহ নিষ্ঠুর স্পর্শ তিনি অনুভব করবেন না নাকি? কথাটা ভাবতেই বৈদা সুলতানার হৃদয়ে জীবনের উষ্ম উল্লাস জেগে উঠলো তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠলো

দুই হাত দিয়ে মুখ ডেকে তিনি কেঁদে ফেললেন

সাথে সাথে দরবার কক্ষ নিঝুম হয়ে পড়ে গেলো

                *   *   *

এক মাসের ভেতরে বাবর সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠলেন অসুখ থেকে আরোগ্য হয়ে উঠেই তিনি সাম্রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজে মনোনিবেশ করলেন সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি সৌধাদি নির্মাণ কাব্যচর্চায়ও মনোনিবেশ করলেন মৌলানা খাঁন দমির, শায়ের সিহাব মুয়ম্মী, মুদারিশ ইব্রাহীম প্রভৃতি অনেক বিশিষ্ট কবি এবং বাস্তুশিল্পী ফজিলুদ্দিনকে হিরাত থেকে আমন্ত্রণ করে হিন্দুস্থানে আনালেন কাব্যচর্চা, নানা উন্নয়নমূলক কাজ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি তিনি আত্মজীবনীবাবর নামা লিখে যেতে লাগলেন

পানীপত যুদ্ধের এক বছর পরে বাবর মেবারের রাণা প্রবল প্রতাপী রাণা সাঙ্গার প্রত্যাহ্বানের সন্মুখীন হলেন একই সময়ে বিহার খাঁর নেতৃত্বে পূব দিকে আফগান জায়গিরদারগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে শাহজাদা হুমায়ূন আফগান বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে জৌনপুর, কালপী প্রভৃতি স্থান দখল করেন

এর পরে বাবর এবং রাণা সাঙ্গার সাথে খানুয়া নামক স্থানে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয় উক্ত যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রাণা সাঙ্গা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান এই খানুয়া যুদ্ধ জয়ে মোগলদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে

রাজপূত শক্তিকে পরাভূত করার দুই বছর পরে আফগান সর্দারবর্গ একতাবদ্ধ হয়ে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে চুনার এবং ঘর্ঘরা নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে আফগানরা বাবরের হাতে পরাস্ত হয় ফলে মধ্য এশিয়ার অক্সাচ উপত্যকা থেকে ঘর্ঘরা এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত মোগলদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়

কিছুদিনের মধ্যেই বাবরের সাম্রাজ্য এত বিস্তার হয়ে পড়ে যে, একজন অশ্বারোহী সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তিন মাসেও ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়লো বলখ থেকে কাবুল, কাবুল থেকে লাহোর এবং লাহোর থেকে আগ্রা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূ-ভাগে বাবরের স্বাক্ষরিত আজ্ঞা নির্বিচারে প্রতিপালিত হতে লাগলো

ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য বাবর সাম্রাজ্যের বিক্রী কর হ্রাস করে দিলেন ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করলো উজবেকিস্থান, তাজিকিস্থান এবং ইরান পর্যন্ত ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসারিত হলো কর হ্রাসের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরাও যথেষ্ট লাভবান হলো বাবর সাম্রাজ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করে দিলেন ফলে হত্যা, লুন্ঠন, চুরি, ডাকাতির মতো অনেক অসামাজিক দুর্নীতি হ্রাস পেলো সাম্রাজ্যে শান্তি শৃংখলা বিরাজ করতে লাগলো ইব্রাহীম লোডীর সময়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকা মানুষের জীবনে পুনরায় শান্তি সমৃদ্ধি ফিরে এলো

     শিল্পী ফজিলুদ্দিনের মাধ্যমে সৌধ, বাগান প্রভৃতি নির্মাণ করে আগ্রা সহরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুললেন ফলে আগ্রা সহর নতুন প্রাণ পেয়ে মুখর হয়ে উঠলো

বাবর অসুখ থেকে আরোগ্য হলেও তাঁর স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যেতে লাগলো দিনের অধিক সময় তিনি শায়ের খাঁন দমীরের সাথে কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন মাহিম বেগমসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যবর্গকেও তিনি কাবুল থেকে আগ্রা ডেকে আনালেন

     গ্রীষ্ম ঋতু বাবর সেদিন আত্মজীবনী লেখায় ব্যস্ত ছিলেন এমন সময় তাহির বেগ একটি সোনার থালায় কয়েক থোকা আঙুর এনে বাবরের সন্মুখে রাখলো

     আঙুর দেখে বাবর বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- আঙুর ! এগুলো কোথা থেকে আনলেন

বাগানহস্ত বেহেস্ত থেকে, জাহাপনা আপনি যে সমরকন্দ থেকে আঙুরের কলম এনে রোপন করেছিলেন, আপনার মনে আছে, জাহাপনা?

বাবরের কথাটা মনে পড়ল সমরকন্দের আঙুর গাছের কলম আনিয়ে রোপন করার কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন

বাবর উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- তাই নাকি? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম খুব আনন্দের কথা সেদিন আমি যমুনার পাড়ে রোপন করা আঙুরগুলোও পাকতে শুরু করেছে দেখে এসেছি সমরকন্দ থেকে আনয়ন করা সাদা বেদানা, কিসমিস প্রভৃতিও ডাল ভরে লেগেছে এগুলো মাহিম বেগমকে দেখাতে হবে এগুলো দেখলে তিনি খুব আনন্দ পাবেন চলুন, থাল নিয়ে বেগমের নিকটে চলুন

মাহিম বেগম প্রাসাদের বারান্দায় বসে হুমায়ূনের নিকট পত্র লিখছিলেন বাবরকে দেখে তিনি আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে মাথা নত কলেন

বেগম, দেখুন তো! বাবর তাহিরের হাতের থালার আঙুরের গুচ্ছের দিকে ইশারা করে বললেন- এই আঙুরগুলো দেখতে সমরকন্দের আঙুরের মতোই লাগছে নাকি, বেগম? এই আঙুর সমরকন্দ থেকে আনিয়ে রোপন করা হয়েছিলো

মাহিম বেগম তখন হুমায়ূনের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ছিলেন যারজন্য তাঁর আঙুর খাওয়ার বা দেখার মন মানসিকতা ছিলো না তবুও বাবর দুখ পাবেন ভেবে তিনি তাহির বেগের হাত থেকে থালাটা নিয়ে মেজের উপর নামিয়ে রাখলেন

পতি-পত্নীকে একান্তে ছেড়ে তাহির বেগ বারান্দা থেকে নেমে এলো

মাহিম বেগমের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার জন্য চোখের পাতা ভিজে ছিলো তখন তিনি কোন রকম কথা বলার পরিস্থিতিতে ছিলেন না

মাহিম বেগমের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে বাবর ব্যাকুল হয়ে উঠলেন তিনি সাদরে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হলো বেগম, আপনি কাঁদছেন কেন?

শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, জাহাপনা মাহিম বেগম নিরাসক্ত সংক্ষেপ উত্তর দিলেন

মাহিম বেগমের বয়স অনেকদিন পূর্বেই চল্লিশ পার হয়ে গেছে শরীরে মেদ জমার জন্য তিনি স্থূলও হয়েছিলেন এবং কমনীয়তাও যথেষ্ট কমে গিয়েছিলো ফলে ত্বক শুষ্ক এবং খসখসে হয়ে উঠেছিলো তদুপরি তিনি পাহাড়ীয়া ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন যারজন্য তিনি হিন্দুস্থানের গরম আবহাওয়ায় খুব অস্বস্তি এবং কষ্ট অনুভব করছিলেন এদিকে হুমায়ূনের চিন্তায়ও তিনি অস্থির ছিলেন হুমায়ূন তখন চম্ভলের শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন

প্রথমাবস্থায় আমারও কষ্ট হতো, বেগম বাবর মাহিম বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- কিছুদিন থাকলে আপনিও এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন নিন, আঙুর খান

মাহিম বেগমের আঙুর খাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না তবুও তিনি বাবরের অনুরোধে গোটা দুয়েক আঙুর মুখে দিলেন আঙুরের স্বাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে তিনি বাবরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- ভালোই পেকেছে, খেতেও খুব ভালো লাগছে নিন, আপনিও নিন মাহিম বেগম বাবরের দিকে আঙুর এগিয়ে দিলেন

আপনি পত্র লিখছিলেন নাকি? বাবর আঙুর চিবুতে চিবুতে বললেন

হ্যাঁ, হুমায়ূনের নিকট আসলে আবহাওয়ার জন্য আমার কষ্ট হয়নি--কষ্ট হচ্ছে পুত্র স্নেহের জন্য অবরুদ্ধ জালরাশি যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো তিনি আবেগিক কণ্ঠে জোরে জোরে বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের চিন্তায় আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি, জাহাপনা আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই যেন আপনি জেনে-শুনে হুমায়ূনকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন আমি কাবুল থাকতে, সে ছিলো গঙ্গার দেশে, আমি আগ্রা আসতে তাকে পাঠিয়ে ছিলেন বদবখশায় বর্তমান তাকে পাঠিয়েছেন চম্ভলের সুবেদার করে কোন দূরবর্তী স্থানে বিদ্রোহে দেখা দিলেই আপনি তাকে সেখানে পাঠান এবং আমি পুত্রের আগমন অপেক্ষায় চাতকের মতো ছটফট করতে থাকি আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, জাহাপনা আমি হুমায়ূনের বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছি না

আপনি এতো অস্থির হচ্ছেন কেন, বেগম? হুমায়ূন নিজেই চন্তল যাওয়ার জন্য আমার নিকট আবেদন করেছিলো তা ইচ্ছানুসারেই তাকে চম্ভল পাঠানো হয়েছে

মাহিম বেগম অভিযোগের সুরে বললেন- আপনি অস্থির না হয়ে থাকতে পারছেন, কারণ হুমায়ূনের বাইরেও আপনার অন্য সন্তান রয়েছে হুমায়ূনই আমার একমাত্র সন্তান তিনিজনকে পূর্বেই কবর দিয়েছি ভেবে দেখুন, আমার মাতৃ হৃদয়ের অবস্থা কি হতে পারে?

মাহিম বেগম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন বাবর কিছু বলার আগেই ফুট ফুটে পোশাক পরিধান করে গুলবদন দৌড়ে এসে বাবরকে জড়িয়ে ধরে লাফাতে লাগলেন কিন্তু মাহিম বেগমকে কাঁদতে দেখে সে পরের মুহূর্তে অবাক হয়ে মাটির পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন

বাবর অবশ্যে বলতে পারতেন, হিন্দাল এবং গুলবদন তো আপনারই সন্তান কিন্তু বাবর কথাটা ভাবতেই মাহিম বেগম আবার বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের মতো মির্জা কামরাণও তো আপনারই সন্তান সে তো মাতৃর সাথে লাহোর রয়েছে একমাত্র হুমায়ূনকে কেন আপনি ঢাল করে রেখেছেন?

বাবর এইবার ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না মাহিম বেগমের শ্লেষ মিশ্রিত বাক্যবাণে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়লেন মাহিম বেগমের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি ক্ষোভের সহিত বললেন- হুমায়ূনকে সংকটের ঢাল করে রেখেছি, কারণ সে ভবিষ্যত শাসক আমার মৃত্যুর পরে সে- নিতে হবে সিংহাসনের দায়িত্ব সেজন্য তার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তের খুঁটিনাটি সে জানাটা আবশ্যক সে কষ্ট সংকটের মোকাবিলা করতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাটা জরুরি তা এই বয়সে আমি তা চেয়েও বেশি কষ্ট করতে হয়েছে

কিন্তু আমি একজন মাতৃ হুমায়ূনের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে আমার অন্তর হাহাকার করে উঠে কিন্তু আপনার এতে কী আসে যায়? আমার বাইরেও তো দুজন যুবতী নারী আপনার বিদ্যমান

গুলবদন পিতৃ-মাতৃর এই ধরণের কথাবার্তা প্রথমবারের জন্য শুনছিলো উত্তেজিত পিতৃকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা দেখে তার শিশু মনেও অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেলো আগে একজন আরেকজনকে কত ভালো বাসতেন, ছোট হলেও সে কথা অনুমান করতে তার অসুবিধা হতো না কাবুল থেকে আগ্রা আসার সময়ে রাস্তায় পিতৃর সাথে মিলনের আনন্দে মাতৃর চোখে-মুখে যে ব্যাকুলতার পূর্বাভাস সে প্রত্যক্ষ করেছিলো সেই দৃশ্য আজও তার মনে জ্বাজল্যমান হয়ে রয়েছে মাতৃ মাহিম বেগমের আগমনে পিতৃ যেভাবে আনন্দিত উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন সেকথা ভাবলে আজও সে পুলকিত হয়ে উঠে মাতৃর প্রতি পিতৃর এতো ভালবাসা! বাবরের বাইরে কোন মোগল সম্রাটই নিজের পত্নীর প্রতি এতো সন্মান প্রদর্শন করেনি বলে লোকেরা পরস্পরে বলা-কওয়া করাও সে শুনেছে

এই গুলবদনই পরিণত বয়সেহুমায়ূন নামা লিখেছিলেন ছেলেবেলা থেকেই তিনি তীক্ষ্ণ অনভূতি এবং সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন সেজন্য তিনি পিতৃ-মাতৃর মাঝে সংঘটিত বাক-বিতণ্ডার কারণ খুঁজে চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিলেন

বাবরের অনুভূতিতেও গুলবদনের এই ভাবান্তর ধরা পড়লো যারজন্য তিনি অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেয়ে পরিস্থিতি থেকে গুলবদনকে সরাতে থালা থেকে একগুচ্ছ আঙুর হাতে নিয়ে গুলবদনের দিকে বাড়িয়ে বললেন- যাও, এই আঙুরগুলো বাগানে বসে খাওগে যাও

বিশেষ আপত্তি না করে গুলবদন আঙুরের গুচ্ছ নিয়ে বাগনের দিকে চলে গেলো

উত্তেজনা ক্ষোভে বাবরের চোখ থেকে জল গড়াতে লাগলো বাবরের চোখে জল দেখে মাহিম বেগম বিচলিত হয়ে উঠলেন তিনি সাদরে বাবরের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন- আমার বাদশাহ, আপনি আমার উপরে অসন্তুষ্ট হবেন না আমি একজন অবলা নারী এবং আপনি বাদশাহ আমি আপনার সাথে অভিমান না করে কার সাথে করব? আপনার নিকট থেকে একটু সহানুভূতি পেলেই আমার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠে, জাহাপনা

হ্যাঁ, আমি বাদশাহ বাবর অভিমান ভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন- হ্যাঁ, আমি বাদশাহ সেজন্য সকল বিপদ, সকল অন্যায়ের বোজা আমি- বহন করতে হবে! যুবাবস্থায় আহম্মদ তনয়ালের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে একবার আমার সিংহাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছিলো তখন আমি সিংহাসন হারিয়ে নেপাতোলা মক একটি গ্রামে ছিলাম নেপাতোলার দহকতের পাহাড়ীয়া অঞ্চলের কৃষকের আড়ম্বরহীন সুখী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমি সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে একজন কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলাম তার প্রস্তুতি হিসাবে আমি পাহাড়ীয়া অঞ্চলে খালী পায় কিছু সময় হেঁটেও বেড়িয়ে ছিলাম আমি ক্ষমতার শিকল ছিঁড়ে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারলাম না তখন এমন একজন বান্ধব পেলাম না, যে আমার মাথা থেকে ক্ষমতার বোজা নিজের মাথায় নিয়ে আমাকে মুক্ত করবে বর্তমান আমি ক্ষমতার বোজা বহন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি- ক্ষমতার বোজা বহন করার শক্তি আমি এখন হারিয়ে ফেলেছি সেজন্য আমি ক্ষমতার বোজা হুমায়ূনের মাথায় তুলে দিয়ে মুক্ত হতে চাইছি

বাবর কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, মাহিম বেগম তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করতে পারলেন কিন্তু তিনি নিজের অনুমানের উপর বিশ্বাস করতে কষ্ট পেয়ে বিমূঢ়ের মতো বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন

বাবর আবার বললেন- বেগম, আপনি হুমায়ূনকে পত্র লিখে তাকে আগ্রা ডেকে পাঠানআমি জীবিত থাকতেই সে আমার চোখের সন্মুখে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমি কামনা করিআমাকে মুক্তি দিন

কিন্তু জাহাপনা, আপনি তো নিজেই জানেন, হুমায়ূনের সিংহাসনের প্রতি মোটেই লোভ নেইআপনি বর্তমান থাকতে সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমিও কামনা করি নাআমি শুধু সে আমার চোখের সন্মুখে থাকাটা কামনা করি

আমার ইচ্ছার কথা জানিয়ে পত্র লিখে তাঁকে ডেকে আনুনকিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তের কথা আপনি অন্য কারো নিকটে প্রকাশ করবেন না

আপনি কাবুল ফিরে যেতে চাইছেন নাকি, জাহাপনা?

আমার উপলব্ধি হচ্ছে যে, আমাকে অতিসত্বর চোখ মুদতে হবেতখন আমার মৃতদেহ কাবুল নিয়ে গিয়ে কবর দিবেনজীবিত দিন কয়টা আমি আগ্রাতে কাটাবহয়তো আমি আর বেশিদিন জীবিত থাকব নাআমার অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু শাসনকার্য পরিচালানোর জন্য সময় পাইনাআমার আর সিংহাসনের প্রয়োজন নেই, বেগম

বাবরের অন্তরে দুঃখ দেওয়ার জন্য মাহিম বেগমের অন্তর অনুশোচনায় ভরে উঠলোতিনি ক্ষমা খুঁজার ভংগীতে বললেন- আমাকে ক্ষমা করবেন, জাহাপনাআপনি সিংহাসন থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়ে হুমায়ূনকে আমি পত্র লিখতে পারব না

বাবর দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে বললেন- তাহলে আমাকেই লিখতে হবেএভাবে বলেই বাবর নির্ভিকারভাবে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে চলে গেলেন

বাবরের পত্র যথাসময়ে এসে চম্ভল পৌঁছোল

হুমায়ূন তখন জ্বরে ভূগতেছিলেনপত্র পড়ে তিনি পিতৃর সিদ্ধান্তের সম্ভেদ পেয়ে বিচলিত হয়ে উঠলেন

হিন্দু বেগ তখন হুমায়ূনের সাথে ছিলেনহিন্দু বেগকে ডেকে এনে হুমায়ুন বললেন- হিন্দু বেগ সাহেব, আপনি অতিসত্বর আমাকে আগ্রা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন

হুমায়ূন প্রচণ্ড জ্বরে ভুগে একেবারে কাহিল হয়ে পড়ছিলেনযারজন্য হিন্দু বেগ হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠাতে ভরসা পেলেন নাতিনি হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠানোর পরিবর্তে হুমায়ূনের অসুস্থতার সংবাদ জানিয়ে বাবরের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন এবং দিল্লী থেকে হেকিম ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন

দিল্লী থেকে হেকিম এসে চিকিৎসা শুরু করলেন যদিও চিকিৎসায় কোনো ফল দিলো নাহুমায়ূনের অসুখ ধীরে ধীরে বেশি হতে লাগলোজ্বরে ভুগে হুমায়ূনের শরীর একেবারে কয়লার মতো কালো পড়ে গেলো

হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হিন্দু বেগ বিচলিত হয়ে উঠলেনঅবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি মাহিম বেগমকে ডেকে আনালেন

হুমায়ূনরে অবস্থা দেখে মাহিম বেগমের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলোএকমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁর চোখের ঘুম দূরীভূত হলোদিনরাত তিনি হুমায়ূনের শুশ্রূষা করার সাথে সাথে পুত্রের আশু আরোগ্য কামনা করে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা জানাতে লাগলেনকিন্তু আরোগ্যের কোনো লক্ষণ না দেখে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন

হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হেকিমও চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেনতিনি উন্নত চিকিৎসার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হুমায়ুনকে আগ্রা পাঠানোর পরামর্শ দিলেন- আমার সাধ্যানুসারে চিকিৎসা করলামকিন্তু রোগীর অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছেনাসেজন্য শাহজাদাকে আগ্রা নিয়ে যাওয়াই উচিত হবেসেখানে চিকিৎসাও ভালো হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন হলে রোগের প্রভাবো কমে আসবেআসলে চম্ভলের জলবায়ু শাহজাদার স্বাস্থ্যের প্রতিকূলে ক্রিয়া করতেছে

হুমায়ূন তখন প্রায়ই অচেতন অবস্থায় আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকতেনসেজন্য হুমায়ূনকে কীভাবে আগ্রা নিয়ে যেতে পারে মাহিম বেগম সেই বিষয়ে হিন্দু বেগের পরামর্শ চাইলেন- বেগ সাহেব, হেকিম সাহেব হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু হুমায়ূনের অবস্থা বর্তমান খুবই কাহিলসেজন্য বর্তমান অবস্থায় কীভাবে আগ্রা নিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করুন

মাহিম বেগমের কথা শুনে হিন্দু বেগ চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেনতিনি বললেন- এই অবস্থায় ঘোড়ায় চড়িয়ে আগ্রা নিয়ে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব হবে নাএমনকি পাল্কীতে তুলে নেওয়াও সম্ভব হবে নাসেজন্য বর্তমান আগ্রা নিয়ে যাওয়াটা খুবই কঠিন কাজ হবে

মাহিম বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- তাহলে উপায়?

হিন্দু বেগ পরামর্শ দিলেন- একটি উপায় অবশ্যে আছে, নৌকাযোগে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারেযাত্রাপথ দীর্ঘ কষ্টকর হলেও শাহজাদার কোনো প্রকার অসুবিধা হবে না

অবশেষে নৌকাযোগে আগ্রা নিয়ে আসার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলো শুভ দিনবার দেখে হুমায়ূনকে নৌকায় তুলে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করলেন

দীর্ঘ নৌকাযাত্রার শেষে হুমায়ূনকে নিয়ে আগ্রা পৌঁছোলেন হুমায়ূন তখনও অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন অচেতন অবস্থায়ই তাঁকে পাল্কীতে তুলে আটজন পাল্কী বাহক হুমায়ূনকে জাফরসন বাগ বয়ে আনতে লাগলো

হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে আসার সংবাদ পেয়ে বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে হুমায়ূনকে দেখতে দৌড়ে এলেন

হুমায়ূন অচেতন অবস্থায় পাল্কীতে পড়ে ছিলেন হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় দেখে হৃদয়ের কোন একটা তন্ত্রী ছিঁড়ে যাওয়া যেন অনুমান হলো বাবরের পাল্কী বাহকরা বয়ে আনা পাল্কী মৃতকের শবদেহ বয়ে আনা শবাধারের মতো অনুমান হতে লাগলেন বাবরের মনে মুহ্যমানের মতো তিনি স্তব্ধ হয়ে পড়লেন পুত্রের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে

জাফরসনবাগে আনার পরে হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় অতি সাবধানে এনে বিছানায় শোইয়ে দেওয়া হলো প্রচণ্ড জ্বরের বিকারে হুমায়ূন প্রলাপ বকতে লাগলেন সারারাত সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পার হলো বাবর এবং মাহিম বেগম সারারাত হুমায়ূনের শিতানে বসে কাটালেন পূর্বে ফর্সা হওয়ার সময়ে কিছু সময়ের জন্য হুমায়ূনের চেতনা ফিরে এলো শিতানে অবসন্নভাবে বসে থাকা বাবরকে তিনি চিনতেও পারলেন

হুমায়ূন বিছানায় উঠে বসতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু তিনি উঠতে না পেরে ছট্ফট্ করতে লাগলেনহঠাৎ তাঁর মাথা একদিকে ঝোঁকে গেল এবং তিনি অচেতন হয়ে বিছানায় ঢলে পড়লেন

হুমায়ূনের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠলো তিনি আবার প্রলাপ বকতে লাগলেন- আমি.....আপনার সেবায়....... আপনার অবর্তমানে....না…..না....

হুমায়ূন যেন কিছু একটা স্বপ্ন দেখছিলেন একবার তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- এগিয়ে যাও....... আক্রমণ কর........তাকে হত্যা কর.....না না, চলে গেলো দাঁড়িয়ে পড়.....

দীর্ঘদিন চললো এই সংকটাপন্ন অবস্থা হেকিম রোগ নিরাময়ের জন্য নিয়মিতভাবে ওষুধ প্রয়োগ করে যেতে লাগলেন যদিও রোগ নিরাময়ের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না রোগীর অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যেতে লাগলো

একমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় মাহিম বেগম শোকে ভেঙে পড়লেন বন্যার জলের মতো তাঁর চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরতে লাগলো

বাবরও বিচলিত হয়ে উঠলেন প্রত্যেকটা কঠিন পরিস্থিতিতে সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করায় অভ্যস্ত ছিলো এবারো তার ব্যতিক্রম হল না সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করতে লাগলো তবে, এবার তিনি নিজেই বুদ্ধিহীন স্বয়ং তাঁকেও সান্ত্বনা দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লো

বাবরকে শোকাভিভূত এবং বিচলিত দেখে শেখ-উল-ইসলাম বাবরকে সান্ত্বনা প্রদানের উদ্দেশ্যে বললেন- জাহাপনা আল্লাহর উপরে বিশ্বাস রাখুন ধৈর্য হারাবেন না আল্লাহই শাহজাদাকে নিশ্চয় আরোগ্য করবেন তবে শাহজাদার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ হেকিমও অসফল শেখ-উল-ইসলাম রহস্যময় ভঙ্গীতে বলতে লাগলেন- আমার ধারণা রোগের অন্তরালে নিশ্চয় কোনো অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে হয়তো আল্লাহ আপনার থেকে কোরবাণি খুঁজতেছেন আপনি কোনো মহামূল্যবান জিনিস আল্লাহর নামে দান করুন, জাহাপনা

মহামূল্যবান জিনিস! মাহিম বেগম ইতিমধ্যে অনেক ভেড়া আল্লাহর নামে কোরবাণি করে দুস্থ-গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণ করেছেন গরিবদের সহায় করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন মাহিম বেগম এই কথা ভেবেই হুমায়ূনের আরোগ্য কামনায় মুক্তহস্তে দান-খয়রাত করতেছেন শেখ-উল-ইসলাম আবার কী মহামূল্যবান জিনিস দান করার কথা বলছেন!

বাবর এইসব কথা ভাবা-গুণা করে থাকতেই শেখ-উল-ইসলাম আবার বললেন- জাহাপনা, আপনি সেই বড় হীরাখণ্ড আল্লাহর নামে দান করুন

কোন হীরা? কহিনূর? বাবর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন

হ্যাঁ, জাহাপনা কহিনূর হীরা শেখ-উল-ইসলাম সন্মতিসূচক মাথা নাড়িযে বললেন

বাবর শেখ-উল-ইসলামের কথায় আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠলেন কহিনূর হীরার মূল্য একশত মোন সোনার মূল্যের সমান হীরাখণ্ড হুমায়ূনই তাঁকে এনে দিয়েছিলো হীরাখণ্ড হুমায়ূনের হাতে আসার বিস্ময়কর কাহিনীর কথা বাবরের মনে পড়ে গেলো হুমায়ূনের মুখে হীরাখণ্ডের কাহিনী শুনে বাবর অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠেছিলেন হিন্দু রমণীর ত্যাগের কথা ভেবে

সেটা ছিলো পানীপত যুদ্ধ বিজয়ের পরে প্রথম দিল্লীতে আসা সময়ের কথা

বাবর সেদিন সন্ধ্যেবেলা যমুনা নদীর বুকে দুই মহলার একটি নৌকায় বসে হিন্দু স্বামীর চিতায় উঠে মহিলাদের আত্মদাহের বিস্ময়কর কাহিনীর কথা ভেবে বিচলিত হয়ে কবিতা লিখছিলেন এমন সময় চারটে পাল খাটানো ভব্য সুসজ্জিত একটি নৌকা এসে বাবরের নৌকার নিকটে থেমে গেলো

রক্ষী একজন উচ্চকণ্ঠে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো- কে? কার নৌকা?

সেই নৌকাটা থেকে উত্তর এলো- শাহজাদা হুমায়ূনের নৌকা শাহজাদা জাহাপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন

কথাটা বাবরের কর্ণগোচর হলো বাবর নিজেও হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে রয়েছিলেন যারজন্য রক্ষী সেনাটি কোনো মন্তব্য করার আগেই বাবর রক্ষী সেনাটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শাহজাদাকে আসতে দাও

কিছুক্ষণ পরেই হুমায়ূন বাবরের নিকটে এলেন হুমায়ূন পিতৃর সাথে কুশল সংবাদ বিনিময় করে কোমরবন্দ ঢিলা করে বুকের মধ্যে লুকিয়ে আনা কারুকার্যখচিত ছোট সুদৃশ্য বাক্স একটি পিতৃর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই বাক্সটা খুলে দেখুন, আব্বা হুজুর

বাবর আস্তে আস্তে বাক্সের ঢাকনা খুললেন বাক্সের ভেতরে মখমলের কাপড়ের উপরে সযত্নে রক্ষিত তারার মতো ঝলমলে একখণ্ড পাথর দেখে তাঁর চোখ ছানাবড়া করতে লাগলো এটা কী? আখরোট একটার সমান বড় বাবর জীবনে অনেক হীরা দেখেছেন; কিন্তু এতো বড় হীরা! এতো বড় হীরা দেখেছে বলে তাঁর মনে পড়ছে না হীরা এতো বড় হতে পারে বলে তিনি কোনোদিন কল্পনাও করেন নি

বাবর আশ্চর্যচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- এটা কীরকম পাথর?

এটা হীরা হুমায়ূন গর্বসহকারে বললেন

পাথর থেকে রশ্মি বিকিরণ হচ্ছিল বাবর পাথরখণ্ড হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন- ওজন কত?

সাত-আট মিস্কাল হবে (এক মিস্কাল প্রায় .৬৮ গ্রামের সমান)

এতো বড় হীরা?

আব্বা হুজুর, আমি একজন জহুরিকে হীরাখণ্ড পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছিলাম তাঁর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি, এটা বিখ্যাত কহিনূর হীরা পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় হীরা দ্বিতীয়টি নেই সিন্দুক ভর্তি সোনার চেয়েও এর মূল্য বেশি

আমি শুনেছি, সুলতান আলাউদ্দিনের একখণ্ড বড় হীরা রয়েছে কথিত রয়েছে যে, সেই হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে একটি বিশাল সাম্রাজ্যের লোকের একমাসের আহার্যের খরচ অনায়াসে চালানো যাবে বাবর বললেন

জহুরি বলা মতে, কহিনূর হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর লোকের আড়াই দিনের আহার্যের ব্যবস্থা করা যাবে এভাবে বলেই হুমায়ূন খিল খিল করে হেসে ফেললেন

আপনি হীরাখণ্ড কোথায় পেলেন?

হুমায়ূন আমতা আমতা করে বললেন- গোয়ালিয়রের রাজার তরফ থেকে আমি দানসূত্রে পেয়েছি

দানসূত্রে পেয়েছেন? কিসের বিনিময়ে?

হুমায়ূন কাহিনী শুরু করলেন- আব্বা হুজুর, আপনি হয়তো শুনেছেন, মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধরেরা বিগত একশত বছর গোয়ালিয়রের শাসনকার্য পরিচালনা করছেন দিল্লীর সুলতানদের বিরুদ্ধে তাঁরা অনেকদিন যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধেও তাঁরা যুদ্ধ করেছে ইব্রাহীম লোডীও তাঁদের প্রথমাবস্থায় পরাভূত করতে পারেন নি কিন্তু শেষমুহূর্তে তাঁরা গোয়ালিয়র সহর ছেড়ে শস্মাবাদ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন

হ্যাঁ, বাবর সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, গোয়ালিয়রের মহারাজাদের বীরত্বের অনেক কাহিনী আমি শুনেছি, কিন্তু তার সাথে কহিনূরের সম্পর্ক কী?

হুমায়ূন দানসূত্রে হীরাখণ্ড পাওয়ার যে কাহিনী বলে গেলেন তার সারাংশ এরকম-

পানীপত যুদ্ধে জয়ের পরে বাবরের অশ্বারোহী বাহিনী হুমায়ূনের নেতৃত্বে বাবরের আগেই দিল্লী এসে বিনাযুদ্ধে দিল্লী দখল করার পরে শস্মাবাদ আক্রমণ করে দখল করেছিলেন

শস্মাবাদ দখল করার পর হুমায়ূন সসৈন্যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে এবং দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করার পর মহারাজার বিধবা পত্নী, দুজন যুবতী কন্যা এবং বিশ বছরের একটি পুত্রের সাথে হুমায়ূনের সাক্ষাৎ হয়

মহারাজার বিশ বছরের পুত্র তখন হুমায়ূনকে আশ্বাস দিয়ে বলেন- ইব্রাহীম লোডী শুধু আপনাদেরই শত্রু ছিল না- সে আমাদেরও শত্রু ছিলো সে নিধন হওয়াতে আমরাও আনন্দিত এখন আপনি আমাদের শস্মাবাদ থেকে গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য অনুমতি দিন

হুমায়ূন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন- গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য আপনাদের আমি অনুমতি দিতে পারব না? আপনারা আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত বৈচ বেগ আপনাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে

এভাবে আশ্বাস দিয়ে হুমায়ূন দূর্গের বাইরে তাঁবু খাঁড়া করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাতে হঠাৎ দূর্গের ভেতর চিৎকার হুলস্থূলের শব্দ শুনে হুমায়ূনের ঘুম ভেঙে যায় হুলস্থূলের উৎস খুঁজে তিনি দেহরক্ষী সৈন্য নিয়ে দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করেন

দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে হুমায়ূন রাজপ্রাসাদের দিকে দৌড়ে আসেন কারণ চিৎকারের শব্দ রাজপ্রাসাদ থেকে আসছিলো রাজপ্রাসাদের প্রবেশদ্বারে বৈচ বেগের একজন সৈন্য রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন মৃত সৈনিকটি থেকে অল্পদূরে আঠার বছরের একজন রাজকুমারী সিরির উপরে বসে শাড়ীর আঁচল দিয়ে নিজের অনাবৃত বুক ঢাকতে চেষ্টা করছিলেন এবং কয়েকজন সৈনিক রাজকুমারকে ঘিরে অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলো

ঘটনাটা ছিলো এরকম-

স্বর্গীয় মহারাজার যুবতী কন্যা দুটিকে দেখে বৈচ বেগের হৃদয়ে কামনার অগ্নি জ্বলে উঠেছিলো কামনা চরিতার্থ করার জন্য সে কয়েকজন সৈনিকসহ মৃত সৈনিকটিকে রাজকুমারীকে ধরে আনতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো

মৃত সৈনিকটি রাজকুমারীকে বলপূর্বক ধরে নেওয়ার চেষ্টা করতেই তাঁর ভ্রাতৃ সেখানে এসে উপস্থিত হোন এবং ভগ্নীর ইজ্জত বাঁচাতে তিনি সৈনিকটিকে আক্রমণ করে নিহত করেন

রাজকুমারের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে হুমায়ূন ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন এবং তিনি সৈনিক কয়জনের দিকে রোষায়িত নেত্রে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দেন- রাজকুমারকে ছেড়ে দাও ভগ্রীর ইজ্জত বাঁচাতে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া বীরকে তোমরা সন্মান প্রদর্শন করা উচিত

তবুও সৈনিক কয়জন নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তখন তিনি বাবরের নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন- বাদশাহ বাবর হিন্দুস্থানের লোকদের সাথে শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন সে কথা তোমরা এখনই ভুলে গেলে নাকি? শাহী নির্দেশ অমান্য করে বৈচ বেগ অন্যায় করেছে এভাবে বলে তিনি তাঁর সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, এখনই তাকে বন্দি করে বন্দিশালে ভরিয়ে রাখগে এবং তাকে সহায় করা সৈনিকদের দশ ঘা করে চাবুক মেরে ছেড়ে দাওগে

এভাবে আদেশ দিয়ে হুমায়ূন রাজকুমার এবং রাজকুমারীকে নিয়ে বিধবা রাণীর নিকট এলেন

মহারাণী সভ্রান্ত এবং সুশিক্ষিতা ছিলেন তিনি কয়েকটা ভাষা জানতেন তিনি হুমায়ূনের দিকে সুদৃশ্য একটি বাক্স বাড়িয়ে ধরে ফার্সি ভাষায় বললেন- এই বাক্সের ভেতর আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি রয়েছে কিন্তু আমার জন্য সকল মূল্যবান জিনিসের চেয়ে আমার সন্তানরা বেশি মূল্যবান আপনি আমার কন্যার সন্মান রক্ষা করেছেন- আমার পুত্রের জীবন রক্ষা করেছেন এমন কী আমার জীবনও আপনি রক্ষা করেছেন সেজন্য এই বাক্সের ভেতরে রক্ষিত হীরাখণ্ড কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপে আপনাকে প্রদান করতে আমাকে অনুমতি দিন

এটাই সেই হীরাখণ্ড শেখ-উল-ইসলাম সেই হীরাখণ্ড দান করার জন্য পরামর্শ দিতেছেন কিন্তু হীরাখণ্ড আমি কাকে দান করব? শেখ-উল-ইসলামকে, না অন্য কাউকে? কারণ আল্লাহ নিজেতো কোনো পার্থিব জিনিস হাত পেতে গ্রহণ করেন না সেজন্য আল্লাহর সৃষ্ট মানুষকে দান করতে হবে কিন্তু কে সে? বাবর এভাবে মনে মনে ভেবে শেখ-উল-ইসলাম-এর মনোভাব মাপতে বললেন- কিন্তু আল্লাহর নামে কাকে দান করা যায়?

আল্লাহর নামে কোন জিনিস দান করলে সেই জিনিসটি ইসলাম ধর্মীয় গুরুর প্রাপ্য এবং শেখ-উল-ইসলামই তাঁদের ভেতরে প্রধান শেখ-উল-ইসলাম সমিধান দিলেন

বাবর ভাবলেন, শেখ-উল-ইসলাম সরাসরি নিজের কথা বলতে সাহস না পেয়ে নিশ্চয় এভাবে ঘুরিয়ে পাকিয়ে বলছেন সেজন্য বাবর কিঞ্চিত ক্ষোভের সহিত ভাবলেন, আল্লাহর নামে দান করা হীরাখণ্ড অবশ্যে হজরত মূর্তজার মাজারেও দেওয়া যায়! কিন্তু ভাবী সম্রাট হুমায়ূনের রাজকোষের সবচেয়ে মূল্যবান হীরা কোন মাজারে প্রদান করলে নিশ্চিয় এই লোভী বৃদ্ধের হাতে এসে পড়বে! শেখ-উল-ইসলাম হুমায়ূনের সংকটজনক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে পিতৃ-মাতৃর নিকট থেকে হীরাখণ্ড ছিনিয়ে নিতে চাইছেন কারণ তিনি জানেন, বর্তমান পুত্রের আরোগ্যের জন্য পিতৃ-মাতৃ নিজের জীবন পর্যন্ত দান করতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না

সেজন্য বাবর ভাবলেন, হীরার পরিবর্তে তিনি নিজের জীবন আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন ভাবামতেই তিনি শেখ-উল-ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলেন- মৌলানা সাহেব, আপনি স্পষ্ট করে বলুন, আমার জীবনের চেয়েও হীরাখণ্ডের মূল্য বেশি নাকি?

জাহাপনা, হাজার হাজার কহিনূর হীরা আপনার কনিষ্ঠ আঙুলের সমানও হবে না

আচ্ছা, সেটাই যদি হয়, সবাই যাতে শুনতে পারে এরূপ উচ্চকণ্ঠে বাবর বললেন- আমি হুমায়ূনের জীবনের পরিবর্তে একটা বড় জিনিস কোরবাণি করব আমার সেই কোরবাণি কোন আল্লাহর বান্দা নয়, স্বয়ং আল্লাহ- গ্রহণ করুন

কক্ষে সমবেত সবাই ভয়ার্ত এবং বিস্মিতভাবে বাবরের দিকে তাকালেন বাবর বসা থেকে দাঁড়িয়ে অচেতন হয়ে পড়ে থাকা হুমায়ূনের শিতানে এলেন

বাবর আচ্ছন্নের মতো প্রার্থনার সুরে বলতে লাগলেন- মোর প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনের জন্য আমি প্রার্থনা জানাই যে- হে পরওয়ার দেগার আল্লাহ, আপনি হুমায়ূনকে ভয়ানক কঠিন রোগ থেকে মুক্ত করে আমার শরীরে সেই রোগ বিস্তার করে দিন

বাবরের প্রার্থনা শুনে কক্ষে সমবেত সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন

বাবর প্রার্থনা করে করে হুমায়ূনের বিছানার চতুর্দিকে তিনিবার প্রদক্ষিণ করলেন- হে পরোয়ার দেগার, আমি বাদশাহ জহিরুদ্দিন বাবর আমার নিজের জীবন প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনকে দান করলাম আপনি আমার কোরবাণি কবুল করুন, আল্লাহহুমায়ূনকে আপনি আরোগ্য করে দিন

মাহিম বেগমো স্তম্ভিত তিনি ক্রন্দন করতে ছিলেন ক্রন্দন বন্ধ করে তিনি ভয়ার্ত, আশান্বিত দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন

বৃদ্ধ শেখ-উল-ইসলাম বাবরের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন হুমায়ূন তখনই রোগশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াবেন এবং বাবর সেই রোগশয্যায় পরে যাবেন

কিন্তু তেমন কিছুই হলো না বাবর মুখের ভেতরে কিছু বড়বড়াতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণ মৌন হয়ে থেকে চিন্তাক্লিষ্টভাবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন

এই ঘটনার কিছুদিন পরে হুমায়ূন সত্যিই আরোগ্য হয়ে উঠলেন                                  

              *   *   *

বর্ষা ঋতুর শেষে শরত ঋতু আগমন হলো মেঘশূন্য পরিস্কার রাতের আকাশ নীল আকাশে তারাগুলো মুক্তার মতো ঝলমল করে জ্বলতেছিলো

বাবর নির্মল আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন কয়েকদিন যাবত তিনি অনিদ্রা রোগে ভূগতেছেন জ্বরেও তাঁকে দিগদারি দিতেছে কয়েকদিন ধরে রাতে রাতে জ্বর উঠাটা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়াছে

বাবর তারাপূর্ণ আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন তাঁর অনুমান হলো, যেন আকাশটা কাঁপতেছে এবং তারাগুলো বিচরণ করতেছে শরীরে জ্বর উঠা অবস্থায় বাইরে বেরোলেই যেন তাঁর এরূপ অনুমান হয় আজকাল কথাটা তিনি কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করতেছেন

দিনের বেলা সভাসদ, হিতাকাংক্ষী এবং অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন পূর্বের মতোই বাবরের খোঁজ-খবর নেন- প্রয়োজনীয় শলা-পরামর্শ খুঁজে অবশ্যে সবাই যেন তাঁর সাথে আজকাল কম কথা বলে তাঁর প্রতি সবার ব্যবহার যেন কিছু পরিবর্তন হওয়াটাও তিনি লক্ষ্য করে আসছেন সবার ব্যবহার যেন পূর্বের থেকে কিছু গম্ভীর এবং শিষ্টতাপূর্ণ কী যেন এক দুঃশ্চিন্তার ছাপ সবার চোখে-মুখে সবাই যেন তাঁর সাথে আগের থেকেও অধিক অন্তরঙ্গ হতে চায় অনুকম্পা দেখাতে চায় মৃত্যু পথযাত্রীর সাথে করা আচরণই যেন সবাই করছে তাঁর সাথে বাবর কিন্তু এগুলো লক্ষ্য করে অস্বস্তি অনুভব করেন সবারই একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, পুত্রের প্রাণরক্ষার জন্য পিতৃর দ্বারা করা কোরবাণি আল্লাহ স্বীকার করেছেন বাবরের প্রার্থনা অনুসারেই যেন আল্লাহ হুমায়ূনকে নিশ্চিত মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং সেই মৃত্যুর অদৃশ্য তরবারি যেন যেকোনো মুহূর্তে বাবরের মাথায় আঘাত করার জন্য উদ্যত হয়ে রয়েছে

কোন মৃত্যু পথযাত্রী লোকের প্রতি প্রদর্শন করা সভ্রমপূর্ণ ব্যবহার, অনুকম্পার হাসি, শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার, অভিবাদন সুখপ্রদ হতে পারে না বাবরের ক্ষেত্রেও সেটাই হলো তাঁর প্রতি প্রদর্শন করা অতিরিক্ত আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার দেখে দেখে তাঁরো ধীরে ধীরে অস্বস্তি অনুভব হতে লাগলো সেজন্য তিনি ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে লাগলেন অধিকাংশ সময় তিনি মাহিম বেগমের সান্নিধ্যে এবংখিলাবত গাহে কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন

এদিকে বাবরের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো তাঁর শরীরে কোথাও কোনো ফুট ছিলো না স্পর্শ করলে কোন যন্ত্রণাও তিনি অনুভব করতেন না অথচ তিনি যেন হৃদয়ে কোন কিছু জ্বলে থাকা অনুভব করতে লাগলেন এবং বিষণ্ণ ক্লান্তিতে তাঁর দেহ-মন আলোড়িত হতে লাগলো

হেকিমগণ বাবরের রোগের প্রকার নির্ণয় করতে না পেরে বিচলিত হয়ে উঠলেন তাঁরা দিনরাত নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলেন এবং সেই অনুসারে চালিয়ে যেতে লাগলেন ওষুধপথ্যের আতিশয্য বিষের প্রভাবে রক্তের দোষ হয়েছে বলে অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্তে এলেন এবং প্রচুর পরিমাণে বেদানার রস পান করানোর ব্যবস্থা করলেন

কিন্তু কোন ওষুধেই রোগের উপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না বাবর দিনে দিনে কৃশকায় হয়ে পড়লেন এবং তাঁর জীবনী শক্তিও যেন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসতে লাগলো

বাবরের স্বাস্থ্যের অবনতির সংবাদ পেয়ে হুমায়ূন ম্ভল থেকে আগ্রা এলেন

বিশাল শয়নকক্ষে সাদা বিছনায় কৃশকায় পিতৃকে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকতে দেখে হুমায়ূনের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো বিষাদ বেদনাই তাঁর হৃদয় চেপে ধরলো

হুমায়ূন পিতৃর শিতানে বসে শুকনো অস্থিসার শূন্য মলিন হাতে চুমু খেলেন

খানজাদা বেগম বাবরের শিতানে বসে ময়ূরের পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলেন হুমায়ূনকে বিচলিত দেখে তিনি সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- ধৈর্য ধরুন, শাহজাদা মনে সাহস সঞ্চয় করুন

হুমায়ূন পিসির কথার উত্তর না দিয়ে বাবরকে উদ্দেশ্য করে ব্যথা বিগলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনার কী হয়েছে আব্বা হুজুর? এভাবে জিজ্ঞাসা করেই হুমায়ূন অভিযোগের সুরে বললেন- এটা অন্য কিছুই নয়, এটা আমার জন্য করা কোরবাণির ফল

হুমায়ূনের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে মাহিম বেগমের বুক হাহাকার করে উঠলো কথা বলতে অসমর্থ হয়ে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন

বাবর সতৃষ্ণ নয়নে হুমায়ূনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন; কিন্তু শ্বাসকষ্টের জন্য তিনি কথা বলতে সক্ষম ছিলেন না শ্বাসকষ্ট অল্প কম হওয়াতে তিনি থেমে থেমে ফিসফিস করে বললেন- আমার পুত্র! আমার রোগ এখন রক্তে মিশে গেছে

আব্বা হুজুর আমাকে আদেশ দিন....আপনাকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমি সব করতে প্রস্তুত

আমার রোগ সম্পর্ণরূপে আরোগ্য করাটা সম্ভব নয়, পুত্র যন্ত্রণা শুধু লাঘব করা সম্ভব

কীভাবে? বলুন, আব্বা হুজুর আমি সেটাই করব হুমায়ূন ব্যগ্রভাবে বললেন

উজির--আজমকে ডাকুন.......সাথে পাত্র-মিত্রদেরকেও আসতে বলবেন আমি তাঁদের সন্মুখে আপনার হাতে শাসনভার সমর্পণ করব

কিন্তু আব্বা হুজুর, আপনি বিশ্বাস করুন....আপনার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কহিনূর হীরার চেয়েও অধিক মূল্যবান আমার জন্য

এটা এখন প্রয়োজন, পুত্র আমি যা বললাম তাই করুন বাবর দৃঢ়ভারে হুমায়ূনকে নির্দেশ দিলেন

খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর বিছানা ঠিক করে দিলেন বাবর মাথার তলে আরও একটি বালিশ দিতে বললেন

অর্ধশায়িত হয়ে দুই একটা প্রয়োজনীয় কথা বলে বাবরদেওয়ানী খাসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন

দেওয়ানী খাসে এসে বাবর সবার সম্মুখে হুমায়ূনের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন পিতৃঋণ পরিশোধ করে বাবর প্রাসাদে ফিরে এসে আবার বিছানায় শোয়ে পড়লেন

             *   *   *

বাবর তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো বিছানায় পড়ে ছিলেন বাদশাহ হুমায়ূন, মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগম বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন

     মাহিম বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন- জাহাপনা, হুমায়ূন নিজেকে আপনার বর্তমানে হিন্দুস্থানের মতো বিশাল সাম্রাজ্যের গুরুদায়িত্ব বহন করার যোগ্য বলে বিবেচনা করতে সাহস পাচ্ছে না

হুমায়ূনের হাতে সিংহাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে বাবর কিছু স্বস্তি অনুভব করছিলেন মাহিম বেগমের অভিযোগ শুনে তিনি বললেন- এটা ঋণ, বেগম নিজের সন্তানের হাতে ঋণ ফিরিয়ে দিতে পেরে আজ আমি মুক্ত বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমি তৈমূরের উত্তরপুরুষ তৈমূরের উত্তর পুরুষদের অধিক সংখ্যকই নিজেদের মাঝে মারামারি করে মরেছে পুত্র পিতৃকে হত্যা করেছে, ছোট ভাই বড় ভাইকে নিধন করেছে সবাই লোভ এবং কূট-চক্রান্তের শিকার হয়েছে তাঁদের ভেতরে যারা সৎ ছিলেন, তাঁরা নিজের সজ্জনতার বলি হয়েছেন খানজাদা বেগমের দিকে ইশারা করে বাবর আবেগিক কণ্ঠে বললেন- যেভাবে আপাজান আমাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারাটা জীবন বন্দিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন আপাজান ভ্রাতৃর মঙ্গলের জন্য নিজের সুখ-স্বচ্ছন্দ, কামনা-বাসনা ত্যাগ করে নির্বাসিতা জীবন অতিবাহিত করছেন আপাজানের নিকট থেকে আমি ত্যাগের পাঠ শিখেছি হুমায়ূনও নিজের ভ্রাতৃ, সন্তান-সন্ততিকে আত্মত্যাগ সজ্জনতার পাঠ শিখাতে হবে

বাবর মাথা ঘুরিয়ে শিতানের দিকে টানিয়ে রাখা রেশমি পর্দার দিকে তাকালেন হুমায়ূন দেখলেন শিতানের দিকে মাটির মূর্তির মতো নির্বিকার নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাহির বেগ

     তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বাবর বললেন- তাহির বেগ, আপনি আমার গ্রন্থটি এখানে নিয়ে আসুন

পর্দার পেছনে দেয়ালের সাথে সংলগ্ন একটি রেকের মাঝে সাজিয়ে রাখা ছিলো বিভিন্ন মূল্যবান গ্রন্থ গ্রন্থসমূহের মাঝে পাকাবান্ধা একটি গ্রন্থ একটি চামড়ার থলেতে ভরিয়ে সযত্নে রাখা ছিলো বাবরের নির্দেশ পেয়ে তাহির বেগ রেক থেকে থলেটা বের করে এনে সসম্মানে বাবরের হাতে দিলো বাবর থলেসহ গ্রন্থটি দু'হাতে ধরে হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- মনে পড়ে নাকি পুত্র, একদিন কাবুলের নিকটে একটি পাহাড়ে বসে থাকা অবস্থায় আপনি আমার আত্মজীবনী খুঁজার কথা? বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই যে নিন, আপনি খুঁজা সেই আত্মজীবনী যতদূর সম্ভব আমার কথাগুলো আমি লিখে শেষ করেছি এই গ্রন্থটি লিখতে আমি বার বছর সময় নিয়েছি

সেদিন বাবর বলা কথাটা হুমায়ুনের মনে পড়ে গেলো বাবর সেদিন একটি পাহাড়ের উপরে বসে নিজের আত্মজীবনী লিখছিলেন কৌতূহলবশতঃ হুমায়ূন পাহাড়ের উপরে চড়ে গিয়ে বাবরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- কী করছেন, আব্বা হুজুর?

বাবর কাগজ কলম পাশের একখণ্ড পাথরের উপরে রেখে বলেছিলেন- আমার জীবনের ঘাত-সংঘাত, অভিজ্ঞতা-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয়ের সত্য কাহিনী লিখছি, পুত্র

হুমায়ূন বালকসূলভ কৌতূহল প্রকাশ করে বলেছিলেন- আমি পড়তে পারব নাকি, আব্বা হুজুর?

বাবর তখন নির্বিকারভাবে বলছিলেন- নিশ্চয় পারবেন তবে, এখনই নয় কিতাপটি লিখা সমাপ্ত হলে তখন পড়তে পারবেন একটা কথা জেনে রাখুন, এই কিতাপটি শেষ হওয়া মানে আমার জীবনের অন্তিম সময় উপস্থিত হবে এভাবে বলে বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন

বাবর বাড়িয়ে ধরা গ্রন্থটি হুমায়ূন দু'হাতে ধরে মাথায় স্পর্শ করলেন তারপর গ্রন্থটি মাথা থেকে নামিয়ে চুমা খেলেন চুমা খাওয়ার সময়ে হুমায়ূনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে একফোঁটা জল গ্রন্থের উপরে পড়ল

বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমার অন্তিম ইচ্ছার কথা মনে রাখবেন এই গ্রন্থটি আমার সন্তান-সন্ততিরা পড়া উচিত হবে এই গ্রন্থটি পড়ে আমি করা ভুলগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি করা না হয় সেই শিক্ষা নিতে হবে আমার ভালো কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে এবং খারাপ কাজগুলো পরিত্যাগ করতে হবে এই গ্রন্থটির নকল প্রস্তুত করে সমরকন্দ, তাসকন্দ এবং আন্দিজান পাঠিয়ে দিতে ভুলবেন না কে জানে, এই গ্রন্থটি- হয়তো একদিন হিন্দুস্থান এবং মাউরা উন্নহরের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে!

খানজাদা বেগমের উপলব্ধি হলো, বাবর যেন গ্রন্থটি নয়, জীবনের অন্তিম মুহূর্তেউইল(ইচ্ছাপত্র) একটি ছেড়ে যাচ্ছেন তিনি ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না অশ্রুসজল নয়নে আবেগিক কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন- বাবরজান, আমার প্রাণাধিক ভাই, আমি আপনার বড় বোন আমি আপনার চেয়ে বয়সে পাঁচ বছরের বড় যদি আমাদের দু'জনের মধ্যে একজন এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়, নিয়মমতে আমি আগে যাব আপনি আমার থেকে আগে যেতে পারবেন না, বাবরজান বাবরজান.....আমার ভাই......না না খানজাদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন

খানজাদা বেগমবাবরজান' বলে সম্বোধন করার সাথে সাথে বাবর তাঁর শৈশবে ফিরে গেলেন মনে পড়ে গেলো পিতৃ-মাতৃর কথা তাঁরা এখন নিশ্চিন্তে শোয়ে রছেছেন মাউরা উন্নহরের মাটিতে এবং তিনি.....মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরে গিয়ে সাথে সাথেই আবার বাস্তবে ফিরে এলেন

দরবারের আদব-কায়দা অনুসারে বেগ, চাকর-বাকর, পুত্র, প্রিয়তমা পত্নী দ্বারাজাহাপনা সম্বোধন বাবরের কছে অসহ্যকর হয়ে উঠলো সেজন্য তিনি হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমাকে একবার আব্বা বলে সম্বোধন করুন, পুত্র

আব্বা আব্বাজান হুমায়ূন ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন

সাথে সাথে মহিলারা সমবেত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন

সংযোগবশতঃ বাবর আত্মীয় পরিজনের নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ে হেকিম ইউসূফ বেগ এসে সেখানে উপস্থিত হলেন

বাবর তখন ঘেমে-জেমে উঠেছিলেন শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ায় কষ্ট পাচ্ছিলেন কণ্ঠ থেকে ঘর্ঘর শব্দ বের হচ্ছিলো

জাহাপনা, আপনি এখন বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন হেকিম ইউসূফ বেগ এভাবে বলে মখমলের সাদা কাপড় দিয়ে বাবরের মুখমণ্ডল মুছে দিলেন তারপরে মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগমকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করে বললেন- আপনারা বাইরে যান

উভয়ে নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন

হেকিম হুমায়ূনের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- আপনার মাথায় এখন গুরু দায়িত্বের বোজা আপনিও যান

বাবরের শুকনো আঙুলে চুমা খেয়ে হুমায়ূন নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং হেকিমো তাঁর পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলেন

পরিজনবর্গ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে বাবর আবার চেতনা ফিরে পেলেন চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি শিতানের দিকে দাঁড়িয়ে বাতাস করে থাকা তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি বাস্তুকার ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনুন

তাহির বেগ দরজার কাছে এগিয়ে এসে ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনার জন্য একজন রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন

শিল্পী ফজিলুদ্দিন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে বাবরের চর্মসার দেহ প্রত্যক্ষ করে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন তিনি মরণোন্মুখ বাবরের দিকে না তাকানোর প্রয়াস করে পালেঙের নিকটে বসলেন তিনি কোনমতে ষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, আপনি বিশ্বাস করুন, আপনার সৎকর্ম আপনাকে দীর্ঘজীবী করবে

এখন আমাকেও মৌলানা বলে সম্বোধন করুন, কারণ আমি সিংহাসন হুমায়ূনকে সমর্পণ করেছি

কিন্তু আপনার নিকট শায়েরির সিংহাসন এখনও সুরক্ষিত, জাহাপনা হিরাতে আলীশের নবাইকে সবাই হজরত আলীশের বলে সম্বোধন করতেন আপনি আমাদের মাতৃভাষাকে আরবি এবং ফার্সির সম মর্যদা সম্পন্ন করে তুলেছেন আলীশের নবাই জীবিত অবস্থায় এই স্বপ্ন দেখেছিলেন আপনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে তুলেছেন সেজন্য রাজ সিংহাসন ত্যাগ করলেও শায়েরির সিংহাসন আপনি কোনদিন ত্যাগ করতে পারবেন না, জাহাপনা

ধন্যবাদ মৌলানা আপনি আগ্রা এবং ফতেহপুড় সিক্রিতে আশ্চর্য সৌধ নির্মাণ করেছেন বেহেস্তের মতো বাগানও আপনি নির্মাণ করেছেন আল্লাহ যদি আমার আয়ু আরও বাড়িয়ে দিতেন, তাহলে আমার অনেক দিনের স্বপ্ন.....সমরকন্দেরবিবি খানম মাদ্রাসার মতো একটি সৌধ নির্মাণ করাতাম কী মনোরম সুন্দর সেই মাদ্রাসার সৌধ! আপাজানের নামে সেরকম একটি সৌধ নির্মাণ করা উচিত

খানজাদা বেগমের নাম শুনে ফজিলুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন বয়সের আঁচড়েও ফজিলুদ্দিন এবং খানজাদা বেগমের পবিত্র প্রেমে ফাটল ধরাতে পারেনি এখনও পরস্পরে পরস্পরকে আগের মতোই ভালবাসেন অবসর সময়ে একজন আরেকজনের কথা ভেবে পুলক অনুভব করেন সেজন্য খানজাদা বেগমের নামে নামকরণ করে সৌধ নির্মাণের কথা শুনে তিনি আগ্রহ সহকারে বললেন- আসলে মহিলাদের নামে নামকরণ করে সুন্দর সুন্দর সৌধ নির্মাণ করে মহিলাদের যশ গৌরব বৃদ্ধির পরম্পরা পূর্ব থেকেই চলে আসছে, জাহাপনা সমরকন্দের বিবি খানম মাদ্রাসা বিখ্যাত মাদ্রাসা হিন্দুরাও মহিলাদের খুব সন্মান করেন তাঁরা যেসব দেব-দেবীর আরাধনা করেন তার ভেতর দেবীও রয়েছে--লক্ষ্মী, সরস্বতী, পার্বতী প্রভৃতি

মৌলানা, আমার আপাজান খানজাদা বেগম, আপনি জানেন, নিষ্ঠুর নিয়তি ...…..আপনাদের দু'জনকে সুখী হতে দিলে না আমার জন্যই আপনাদের স্বপ্ন বাস্তাবায়িত হলো না.……...বাবর আবার পূর্বের প্রসংগে ফিরে এলেন- মাদ্রাসা.....যার স্বপ্ন আপনি অনেকদিন থেকে দেখে আসছেন......যদি নির্মাণ করতে পারেন.......সেই মাদ্রাসার নামখানজাদা বেগম রাখবেন

আপনি আমার মনের কথা বলেছেন, জাহাপনা এটা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ফজিলুদ্দিন আবেগিকভাবে সহজ সরল ভাষায় বললেন- যদি সেই সব কাজ সফল করার জন্য আয়ু আমাকে সহায় না করে, তাহলে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সেই দায়িত্ব আমার পুত্রকে দিয়ে যাব সে হিন্দুস্থানী কারিকরের সাথে যুক্ত হয়ে নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করবে

বাবর আবার ঘামে ভিজে উঠলেন রেশমি সাদা কামিজ তাঁর শরীরে লেগে ধরলো

মামাজান, তাহির বেগ শংকিত কণ্ঠে বললো- হেকিমের নির্দেশ জাহাপনাকে যেন বেশি বিরক্ত করা না হয়

ফজিলুদ্দিন সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বাবরের হাতে চুমা খেলেন

ইতিমধ্যে বাবরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিলো যারজন্য তিনি হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে লাগলেন- আপনার নিকট আমার..........আরও একটি অনুরোধ.......কাবুলে একটি বাগান রয়েছে.....সেটা আপনিই নির্মাণ করেছিলেন.......আমার শেষ আরামগাহ........ অনাড়ম্বরভাবে সেখানেই নির্মাণ করবেন

বিষাদ-বেদনায় ফজিলুদ্দিনের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো তিনি মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না শুধু সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে এক প্রকার দৌড়ে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন

তাহির বেগ বিছানার চাদর পরিবর্তন করে নতুন চাদর পেতে দিলো বাবর রোগশয্যায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সকল প্রকার পরিচর্যার কাজ তাহির বেগই সামলাচ্ছিলেন ওষুধ-পথ্য, পিপাসা লাগলে জল, ঘেমে উঠলে ঘাম মুছানো, বাতাস করা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে সহায় করে দেওয়া এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাজগুলো সে আন্তরিকতা দায়িত্ব সহকারে সামলাচ্ছিলেন এইসব কাজের জন্য তাহির বেগ কাউকে পালেঙের নিকট পর্যন্ত আসতে দিত না

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে থাকার জন্য সেদিন যথেষ্ট গরম পড়েছিলো রাতের গভীরতা বেড়ে আসার সাথে সাথে গরমের মাত্রাও বেড়ে আসতে লাগলো অত্যধিক গরমের জন্য বাবর অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন যারজন্য তাহির বেগ কয়েকজন পরিচারকের সহযোগে পালেঙ বারান্দায় নিয়ে এলো

বাইরে আন্দিজানের মতো পাতল ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় বাবর কিছু স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলেন

বিছানায় শোয়ে বাবর আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন

আকাশে তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছিলো বাবর তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে পড়লেন তাঁর অনুমান হলো, তারাগুলো যেন বিচরণ করতেছে একটা তারা যেন আরেকটি তারাকে নির্দয়ভাবে ধাক্কা মারতেছে দৃশ্যটা বাবরের মনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো প্রচণ্ড ভয়ে তিনি তাহির বেগকে ডাকলেন- তাহির বেগ আমার কাছে আসুন

তাহির বেগ অল্পদূরে দাঁড়িয়ে পরিচারকদের সাথে কথা বলতে ছিলো বাবরের ভয়ার্ত কণ্ঠের ডাক শুনে সে দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন- কী হলো, জাহাপনা? কিছু লাগবে নাকি?

বাবর চোখ মুদে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন- আমার শরীর শিথিল হয়ে আসছে, তাহির বেগ

তাহির বেগ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- হেকিম ডেকে আনব নাকি, জাহাপনা?

না হেকিম ডাকতে হবে না আপনি আমার শরীরটা একটু মালিশ করে দিন

আচ্ছা, আপনি শোয়ে থাকুন আমি আপনার হাত-পা মালিশ করে দিচ্ছি

তাহির আস্তে আস্তে বাবরের কান্ধ, হাত-পা মালিশ করে দিতে লাগলো কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে পড়ে থেকে বাবর আবার আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন

বাবরের অনুমান হলো, যেন কালো আকাশের বিশালতায় তারাগুলো স্থির হয়ে আগুনের আংটার মতো গনগন করে জ্বলতেছে এবার তিনি ভয় পেলেন না তারাগুলোর মাঝ থেকে তিনি সপ্তর্ষিমণ্ডল, ধ্রুবতারা এবং পূর্ব আকাশের কৃত্তিকা নক্ষত্র খুঁজতে লাগলেন

তাহির বেগও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো সে হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠলো-ওই যে, ঔই দিকে দেখুন, জাহাপনা ঔই তারকারাজ্যের দিকে তাকান আমাদের কুবা থেকেও তারকারাজ্য এরকমই দেখা যেতো

বাবরের মন আন্দিজান এবং আন্দিজানে ছোটবেলা অতিবাহিত করা ছেলেবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেলো

বাবর ছেলেবেলা শুনছিলেন, যে সপ্তর্ষিমণ্ডল হীরার ঘুড়ি আকাশী বায়ুর সাহায্যে সপ্তর্ষিমণ্ডল মনের আনন্দে হীরার পুচ্ছ নাচিয়ে নাচিয়ে উত্তরোত্তর উপরের দিকে উঠতে থাকে; কিন্তু এক অদৃশ্য সূতো দিয়ে ধ্রুবতারার সাথে বেঁধে রাখার জন্য বেশি দূরে চলে যেতে পারে না

ছেলেবেলা শুনা সেই কাহিনী বাবরের মনে পড়ে গেলো আন্দিজানের আকাশের মতো আগ্রাতেও তারার অবস্থান একই হওয়াতে তাঁর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো ফলে তিনি ছেলেবেলার দিনগুলোতে কিছু সময় বিচরণ করতে মনস্থ করলেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন

তারাগুলো আবার কুমারের চাকের মতো চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো হঠাৎ যেন তারার সেই ঘূর্ণি বাবরের উপর খসে পড়লো পরের মুহূর্তে এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাঁকে সাদরে ধরে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগলো

এক সুগভীর অনুভূতিতে বাবর চোখ মুদলেন.......।।

                                               সমাপ্ত

  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

ভাৰত তথা অসমৰ সাধাৰণ নিৰ্বাচনৰ সাৰাংশ-১৯৫২-২০২৪

শাস্তি (অনুবাদ উপন্যাস)