দিগ্বিজয়ী বাবর (তৃতীয় খণ্ড) ঐতিহাসিক উপন্যাস
কুন্দুজ!
কুন্দুজ চারদিকে পাহাড় ঘেরা হিন্দুকোশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এক দুর্গম নিচু জলাশয় অঞ্চল। নিরাপত্তার খাতিরেই বাবর দুর্গম স্থানে ছাউনি পেতে হিসার আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলাকালীন বাবর অন্য এক বিপর্যয়ের সন্মুখীন হলেন।
শৈবানি খাঁ নিহত হওয়ার পরে তাঁর একাংশ সেনা ইসমাইলের রোষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। সেই সেনাদলের একাংশ সেনা বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কথাটা প্রথমে কাশিম বেগমের কানে পড়ল। বিদ্রোহী সেনাদের দলপতি ছিলো কবচ খাঁ নামক একজন বেগ। তাঁর অধীনে বিশ হাজার সেনা ছিলো। সেনাগুলো সুক্ষিশিত এবং যুদ্ধ পাগল ছিলো। ভাড়াটিয়া সেনা হিসাবে যুদ্ধ করাই ছিলো তাদের জীবন নির্বাহের একমাত্র উপায়। যে পক্ষ থেকে টাকা পেতো সেই পক্ষের হয়েই তারা যুদ্ধ করতো। যে পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করে লুটপাট করে অধিক ধন-সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখত সেই পক্ষের হয়ে তারা যুদ্ধ করতে অধিক আগ্রহী ছিলো। বাবরের জয়ের পূর্বাভাষ পেয়েই তারা বাবরের দলে যোগদান করেছিলো। সেই সেনাদলে শৈবানি খাঁর সাথে সুসম্পর্ক থাকা সেনা সংখ্যাই অধিক ছিলো।
এদিকে কবচ খাঁর সাথে বাবরের ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিলো। কাবুলে থাকাকালীন কবচ খাঁর একজন ভ্রাতৃ গত বছর বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। কথাটা অবগত হয়ে বাবর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। সেটাই ছিলো বাবরের প্রতি কবচ খাঁর শত্রুতার প্রকৃত কারণ। ফলে বাবরের উপরে ভ্রাতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে এখান ওখান থেকে সেনা সংগ্রহ করে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তবে, রাজবংশোদ্ভব লোকের অভাবেই সে তার প্রতিশোধ স্পৃহা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। কারণ বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হলে একজন রাজবংশোদ্ভব লোকের প্রয়োজন হবে এবং তাঁর অধীনে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে অন্যান্য শাসকেরা গর্জে উঠে বাবরের পক্ষ নেবেন।
বাবরের চাচা আলাসা খাঁর সতের বছরের পুত্র সৈয়দ খাঁ বাবরের সেনা বাহিনীর একজন সদস্য ছিলো। সৈয়দ খাঁর উপরে কবচ খাঁর চোখ যায় এবং সে তার অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে সৈয়দ খাঁকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। সে সাম্রাজ্যের লোভ দেখিয়ে সৈয়দ খাঁকে নিজের জালে ফেলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সৈয়দ খাঁ ছিলো বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান। সেজন্য সৈয়দ খাঁ সরাসরিভাবে প্রস্তাবটা প্রত্যাখান না করে তার মতামত পরে ভেবেচিন্তে জানাবে বলে সময় নিয়ে গোপনে কাশিম বেগকে কথাটা অবগত করে।
কাশিম বেগ অতি গোপনে কথাটা বাবরকে অবগত করেন। কথাটা শুনে বাবর গর্জে উঠলেন- শঠ প্রবঞ্চক! তোরা আমার পিঠে আর কতদিন ছুরিকাঘাত করবি। এভাবে বলেই কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আহম্মদ তনয়ালের কথা আপনার নিশ্চয় মনে আছে, বেগ সাহেব? আহম্মদ তনয়ালও একজন মোগল ছিলো। তাকে বিশ্বাস করে ক্ষমা করেছিলাম এবং এই উদারতার জন্য সে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার সুযোগ পেয়েছিলো। আমি অনেক সহ্য করেছি। আর সহ্য করব না। আপনি ষড়যন্ত্রকারীদের বন্দি করে কেটে টুকরো টুকরো করে শিয়াল-কুকুরকে বিলিয়ে দিন।
তাঁরা গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই একটি পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছিলেন। বাবরের রাগ দেখে কাশিম বেগ সচকিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার তাঁবু খাড়া করা ছিলো। তাঁবুগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিনি শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের অধীনে বিশ হাজারের অধিক সেনা রয়েছে।
সবগুলো মোগলই এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত নাকি?
সম্ভবতঃ সবগুলো নয়! সৈয়দ খাঁ তো মোগলই, সে দেখছি আমাদের প্রতি বিশ্বস্ততাই প্রদর্শন করছে। হয়তো বেশি সংখ্যক মোগলেরই আমাদের প্রতি ভালো মনোভাব রয়েছে।
তাহলে একমাত্র কবচ খাঁকে বন্দি করুন।
চিন্তার গাম্ভীর্যে কাশিম বেগের ভ্রূযুগল কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি হতাশা মিশ্রিত সুরে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কবচ খাঁর প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। অনেক বেগ তাঁর আত্মীয়ও। আমরা তার উপরে প্রতিশোধ নিতে গেলে বাকি বেগগুলো গর্জে উঠতে পারে এবং এর প্রভাব হিসারের উপরেও পড়তে পারে।
কাশিম বেগের ধারণা অমূলক ছিল না। বিশ হাজার সেনার মাঝে কে স্বপক্ষে এবং কে বিপক্ষে সঠিকভাবে বলা কঠিন। তদুপরি শত্রু-মিত্র খুঁজে বের করতে হলেও যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। এদিকে যতদূর সম্ভব সত্বর হিসার আক্রমণ করা প্রয়োজন। কিছুদিন পরেই বর্ষাঋতু শুরু হবে। বর্ষাঋতু শুরু হলে সব রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট বন্ধ হলে তখন হিসার আক্রমণ করা সম্ভব হবে না।
সেজন্য বাবর কাশিম বেগের যুক্তির সপক্ষে এবং বিপক্ষে নিজের মনে বিবেচনা করে দেখতে যত্নপর হলেন। তবে বিপক্ষ যুক্তিই তাঁর মনে অধিক প্রভাব ফেললেন। যুক্তিতে হেরে অবশেষে রাগই অসন্তোষের রূপ নিলো। নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- বিদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক! কবচ খাঁ বিদ্রোহীদের একত্রিত করে আমার উপরে আঘাত হানার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে! যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তাকে আমি এরূপ শাস্তি দিব যে, তার পরিনামের কথা ভেবে কেউ যেন ভবিষ্যতে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস না করে।
আপনি ঠিকই ভেবেছেন, জাহাপনা। প্রবঞ্চকের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে যুদ্ধ করা অবশ্যেই উচিত নয়। তবে, এই ক্ষেত্রে আমি অন্য রকমে এগোনোর কথা ভাবছি।
অন্য রকমে! কেমনে?
সৈয়দ খাঁ আপনার বিশ্বস্ত। ষড়যন্ত্রকারীরা সৈয়দ খাঁকে তাদের নায়ক নির্বাচিত করার কথা ভাবছে। সেজন্য আপনি তাদের মতামতকে সমর্থন করে সৈয়দ খাঁকে তাদের সাথে আন্দিজান পাঠিয়ে দিন। আন্দিজান বর্তমান আমাদের অধীনে। সৈয়দ খাঁ সেখানে গিয়ে আন্দিজানের শাসনভার নিজে সামলাকগে’। আমরা বর্তমান এভাবেই কবচ খাঁর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু পরে অন্যান্য বেগবর্গও যদি এর সুযোগ নিতে চায়?
অবশ্যে তেমন হতে পারে! কাশিম বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- আমি তারও ব্যবস্থা করব। আমি অন্যান্য বিদ্রোহী বেগদের বুঝিয়ে বলব যে, তারা একমাত্র আমার জন্যই আপনার রোষ থেকে রেহাই পেয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ এরকম আচরণ করলে আমি তাদের রক্ষা করতে পারব না। তদুপরি আমরা তাদের উপরে সর্বদা চোখ রাখতে হবে। যদি কখনো তাদের কোনো সন্দেহজনক আচরণ চোখে পড়ে তাহলে সাথে সাথেই তাদের বন্দি করতে হবে।
সৈয়দ খাঁকে বিদ্রোহীদের সাথে আন্দিজান পাঠানোর মানে সৈয়দ খাঁকে বলি দেওয়ার মতোই ধারণা হলো বাবরের। সেজন্য কাশিম বেগের আত্মঘাতী পরামর্শ বাবরের পসন্দ হলো না। কিন্তু তিনি বিকল্প কোনো উপায়ও ভেবে পেলেন না। সেজন্য তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাশিম বেগের সাথে সহযোগ করতে বাধ্য হলেন এবং কাশিম বেগের যোজনা অনুসারে কবচ খাঁর সাথে সৈয়দ খাঁকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিলেন।
গ্রীষ্ম ঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাবর সেনাবাহিনী নিয়ে পঞ্জ নদী পার হয়ে বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইল একদল কিজিলবাশ্বী(ইসমাইল ইরানের কিজিলবাশ্ব নামক স্থানের বাসিন্দা ছিলেন। সেজন্য ইরানের একাংশ সেনাকে কিজিলবাশ্বী বলা হত।) সেনা বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপে বাবরের সহায়ের জন্য প্রেরণ করছিলেন। তারা তরমেজের নিকটে ছাউনি পেতে বাবরের আগমন অপেক্ষায় আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন।
বাবর বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা শুনে শৈবানি খাঁর পুত্র তৈমূর সুলতান বিচলিত হয়ে উঠলো। সে জানতো যে, বাবর তরমেজের দিক দিয়ে এসে বুদুস ঘাটিতে ইসমাইলের সেনার সাথে মিলিত হলে তার পরাজয় নিশ্চিত। সেজন্য সে নিজের বাহিনীর
একটা অংশ উবেদুল্যা সুলতানের নেতৃত্বে কর্শি ও সমরকন্দে রেখে মূল বাহিনী নিয়ে হিসার এসে আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য যোজনা প্রস্তুত করতে বাধ্য হলো। বাবর সেনা হিসার পৌঁছানোর আগেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।
সিদ্ধান্ত মর্মে তৈমূর সুলতান জানি বেগ, হামজাহ সুলতান এবং মেহেদি সুলতানের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে স্তেপীর দিকে অগ্রসর হলো। তারা দ্রুত এসে স্তেপী পৌঁছোলেন।
স্তেপীতে বহস নদীর পাড়ে একটি পাহাড় ছিলো। বাবর সেনা বহস নদী পার হয়ে সেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে অবস্থান নিতে পারে বলে অনুমান করে বাবর সেনা বহস নদী পার হওয়ার পূর্বেই তাদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈমুর সুলতান পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের দিকে উঠে আসতে লাগলো। কিন্তু পাহাড়ে উঠার মুখে তারা বাধার সম্মুখীন হলো।
তৈমূর সুলতানের সেনা বাধার সম্মুখীন হওয়ার কারণ ছিলো বাবরের প্রত্যুৎপন্নমতিতা। প্রত্যুৎপন্নমতিতার দৌড়ে বাবর তৈমুর সুলতানের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তৈমূর সুলতান ডালে ডালে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাবর পাতায় পাতায় হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ বাবর তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে জানছিলেন, প্রতিপক্ষ সেনা তাঁদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের উপরে উঠে অবস্থান নেওয়া সম্ভব। যদি তাই হয়, তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করা অসম্ভব হবে। সেজন্য প্রতিপক্ষ সেনা এসে পৌঁছোনের আগেই বাবর সেনা সংগীন নামক স্থানে বহস নদী পার হয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এসেছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের দিকে উঠার সময়ে বাবর সেনা পাহাড়ের উপরে উঠে এসে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামছিলো। বাবর সেনার এক বৃহৎ অংশ ইতিমধ্যেই পাহাড় থেকে উপত্যকার দিকে নেমে যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে অবস্থান নিয়ে মালভূমির উপরে চোখ রাখছিলো। প্রতিপক্ষ সেনারা উপত্যকার দিকে নেমে যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে বাবরদের প্রত্যক্ষ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং তারা পাহাড়ে আরোহণ করা থেকে বিরত হয়ে কীভাবে উদ্ভব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে সে বিষয়ে দলের মাঝে আলোচনায় মিলিত হলো।
বাবর পাহাড়ের উপর থেকে প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি নিরীক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনাদের বেগবর্গ পরস্পরের সাথে শলা-পরামর্শ করে বিভিন্ন দিকে চলে গেলো। অল্পপরেই দশ হাজার সেনা নিয়ে সমতলের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তার দিকে তৈমুর সুলতানকে অগ্রসর হতে দেখলেন। প্রতিপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য করে বাবর সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা তিনি দখল করে থাকা উঁচু স্থানটি সম্পূর্ণরূপে ঘেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েই সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
বাবরের মস্তিষ্ক ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করে তিনি বেগবর্গের সাথে পরামর্শ করে মির্জা খাঁ নামক একজন বেগের নেতৃত্বে একদল সেনা প্রতিপক্ষ সেনা বিশেষ করে তৈমূর সুলতানের নেতৃত্বে আসা সেনাদেরকে বাধা প্রদান করার জন্য প্রেরণ করলেন।
তৈমূর সুলতানের অধীনে আসা সেনা সরাসরি পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে অসুবিধা হওয়ার জন্য বৃত্তাকারে ঘুরে উঠে আসতে বাধ্য হলো। এই সুযোগে মির্জা খাঁ প্রতিপক্ষ সেনার আগেই গন্তব্য স্থানে এসে পৌঁছোলো এবং সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে প্রতিপক্ষ সেনার আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
তৈমূর সুলতান গন্তব্য স্থানে পৌঁছে বাবর সেনাদের সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে অবস্থান নেওয়া প্রত্যক্ষ করে একটি সংকীর্ণ পথ বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে লাগলো। মির্জা খাঁ প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে সংকীর্ণ পথের মুখে একদল সেনা প্রেরণ করলো। ফলে দুই পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ লাগলো। তৈমূর সুলতান অসীম বীরত্বের সাথে যুঁজেও অগ্রসর হতে ব্যর্থ হলো। বাবর সেনা পাহাড়ের উপর থেকে তীর, পাথর প্রভৃতি নিক্ষেপ করে তৈমূর সুলতানের সমগ্র প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো। তৈমূর সুলতানের সেনা প্রকৃতার্থে খোলা প্রান্তরে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত ছিলো। সেজন্য পাহাড়ের ঢালু স্থানে দক্ষতা অনুসারে যুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো।
বাবর সংবাদ নিয়ে জানতে পারলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা অবস্থান গ্রহণ করা স্থান থেকে জল অনেক দূরে। সমতল অভিমুখে নেমে যাওয়া রাস্তা থেকে জল কমেও এক মাইল দূরে। এদিকে গরমও পড়েছিলো যথেষ্ট। সেজন্য বাবর অনুমান করলেন যে, প্রতিপক্ষ
সেনা অতি সত্বর জলের সন্ধান করতে বাধ্য হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিপক্ষকে জল আহরণে বাধা প্রদানের জন্য একদল সেনা প্রেরণ করলেন।
তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে আসছিলো। সূর্য অস্ত যাওয়ার মুখে। বাবর কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে এক হাজার অশ্বারোহী সেনাও ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে লঘু পদক্ষেপে ছাউনির দিকে অগ্রসর হলো।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রতিপক্ষ সেনা বাবর সেনার গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাবর সেনাদের ছাউনির দিকে অগ্রসর হওয়া দেখে সেদিনের জন্য যুদ্ধ স্থগিত হলো বলে প্রতিপক্ষ সেনারা ভেবে নিলেন। কিন্তু একদল বাবর সেনা তাদের উপরে চরম আঘাত হানার জন্য উপত্যকার সংকীর্ণ পথের দিকে অগ্রসর হওয়াটা তারা লক্ষ্য করলো না। ফলে সুলতানবর্গ নিজের নিজের সেনাদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য দুর্ভাগ্যজনক আদেশ দিলেন। আদেশ পেয়ে সেনাগুলো বিশ্রামের জন্য নিজের নিজের তাঁবুতে গেলো। কিছু সংখ্যক সেনা বের হলো জলের সন্ধানে। ফলে সমগ্র বাহিনী বিশৃংখল হয়ে পড়ল।
বাবর যে সুযোগের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলেন প্রকৃতপক্ষে সেটাই হলো। প্রতিপক্ষ সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে সেই সুযোগ এলো। প্রতিপক্ষ সেনাদের বিশৃংখল অবস্থায় দেখেই তিনি নিজের বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন- শত্রুসেনা বিশৃংখল হয়ে পরেছে। যাও, আক্রমণ কর। তাদের ধর এবং মেরে কেটে খতম করে দাও।
বাবরের আদেশ পেয়ে উপত্যকার সংকীর্ণ পথে ইতিমধ্যে গোপনে সমবেত হওয়া বার হাজার অশ্বারোহী বানের জলের মতো প্রচণ্ড গতিতে বেরিয়ে এলো। পাহাড়ের উপর থেকে তিন হাজার পদাতিক সেনা তাদের সহায় করার জন্য নিচের দিকে নেমে আসতে লাগলো। কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে বাবর নিজেও পদাতিক সেনাদের আগে আগে নেমে আসতে লাগলেন।
প্রতিপক্ষের অপ্রস্তুত সেনা বাবর সেনার অতর্কিত আক্রমণের ফলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। প্রতি আক্রমণের অবসর না পেয়ে তারা যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগলো। ফলে অল্প সময়ের ভেতরে তারা বিশৃংখল হয়ে পড়লো। তৈমূর সুলতান নিজে শত্রুসেনার ব্যূহের মধ্যে পড়ার ভয়ে দূরের একটি উপত্যকার দিকে প্রাণ নিয়ে পালালো। মহম্মদ দুলহায় নামক বাবর সেনার বেগ একজন অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষের অনেক সেনা মেরে কেটে হামজাহ সুলতানকে বন্দি করলো। খাজা কালার নেতৃত্বে যাওয়া একদল সেনা দুপর রাতে মেহেদি সুলতানকে জীবন্তে বন্দি করে আনলো।
উভয় সুলতান আন্দিজান এবং কারাকোলে সাধারণ জনতাকে নির্বিচারে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলো। বাবর উভয়কে মৃতুদণ্ডের আদেশ দিলেন।
যুদ্ধে বাবর জয়ী হলেন। দুর্ভাগের কালো মেঘ বিদীর্ণ করে আবার সৌভাগ্য রবি উদয় হলো। অবশেষে তিনি হিসার জয় করে স্বপ্নের সহর সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হলেন।
* * *
শরতের নির্মল আকাশ। জোৎস্না রাত। নানান রঙের অনেক ফুল ফুটেছিলো বাগানে। ডালিম, নাশপতি, আতা প্রভৃতি নানান রকমের ফল পেকে গাছে গাছে দুলছিলো। সংগীতের মূর্ছনার মতো ফলের কোমল স্নিগ্ধ সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছিলো বাতাসে।
মহান সমরকন্দ সহরের সমগ্র দরজা উন্মুক্ত।সহরের ভেতর প্রবেশের সবার ছিলো অবাধ স্বাধীনতা।
বিগত দশদিন সহরে কোনো শাসক বা সৈন্য নেই। বহসের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শৈবানি খাঁর সমর্থকরা বাবরের ভয়ে সমরকন্দ ফিরে আসেনি। তারা বাবরের সাথে আবার সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য কর্শি এবং গুজারের আশেপাশে অবস্থান নিয়ে সেনা বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য ব্যস্ত ছিলো এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য সহরের পহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। কিন্তু তারা যখন শুনলো, ইরানের শাসক ইসমাইল প্রেরিত ত্রিশ হাজার কিজিলবাসী সেনা বাবরের সহায়ের জন্য সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে, তখন তারা ভয়ে কুর্শি, বুখারা এবং সমরকন্দ অরক্ষিত অবস্থায় রেখে সোনা-রুপো, পশুর পাল, খাদ্যসামগ্রী নিয়ে স্তেপী পালিয়ে গেছে। ফলে তখন থেকে দূর্গদ্বার উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
মাউরা উন্নহরের কৃষক এবং সহরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন সংঘটিত যুদ্ধের ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলো। বারে বারে শাসক পরিবর্তন হওয়ার ফলে তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে অন্যায়-অত্যাচার ও লুটপাটের তাণ্ডব। ফলে তাদের জীবন হয়ে পরছে বিপর্যস্ত- বিধ্বস্ত। তারা প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছিলো। সেজন্য তারা অঘরী সুলতান এবং বেগদের প্রতি হয়ে উঠেছিলো অতিষ্ঠ--বীতশ্রদ্ধ। তারা কামনা করছিলো একজন স্থায়ী শাসক। সেজন্য বাবরের আগমনের কথা শুনে তারা উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলো। শৈবানি খাঁর সমর্থকরা সহর ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারা দূর্গদ্বারসমূহ খোলে বাবরের আগমন অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা
করতেছিলো।
বাবর মিত্র বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে কর্শি এবং বুখারা বিনাযুদ্ধে অধিকার করে উত্তর পশ্চিম দিক থেকে সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বাবর সেনা সহর থেকে কিছু দূরে থাকতেই সহরের বাসিন্দারা তাঁদের উষ্ম অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিলো। বাবরের সন্মানে সহরটা অতি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। বাবর দূর্গের নিকট পৌঁছানোর সাথে সাথে বিশজন বিশিষ্ট নাগরিক দূর্গের চাবি ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে বাবরকে অভ্যর্থনা জানাতে দূর্গদ্বারে সমবেত হলেন।
চারবাহা দরজার দিকে প্রসারিত রাস্তার দুই পাশে অগণন জনতা বাবরের অপেক্ষায় সারি বেধে দাঁড়িয়ে ছিলো। আনন্দ প্রকাশের প্রতীক হিসাবে এবং বাবরের সন্মানার্থে সুন্দরভাবে সাজানো সহরের সর্বত্র আনন্দ উল্লাস বিরাজ করছিলো। দালানের ছাদ এবং দরজায় দরজায় ধ্বনিত হচ্ছিল বাঁশির কোমল স্নিগ্ধ সুর। হিসার বিজয়ের জন্য বাবরের গুণকীর্তন করে এবং সমরকন্দে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রশংসা করে গজল লেখা হয়েছিলো। সেইসমূহ গজল লিখে স্থানে স্থানে টানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং অনেকে মুখে মুখে গাইতে ছিলো।
উষ্ম অভ্যর্থনা দেখে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। যে সহর থেকে তিনি এক সময় সহরবাসীদের ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন, সে সহরে যে তিনি এতো উষ্ম সম্বর্ধনা পাবেন এটা ছিলো বাবরের কল্পনার অগোচর।
দোকান-পাট সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যসামগ্রীতে ভরে ছিলো হালুইকরের দোকান। খাদ্যসামগ্রীর মিঠা স্নিগ্ধ সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো। সমগ্র সহরে বিরাজ করছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ। এইসব আয়োজন করা হয়েছিলো বাবর এবং কিজিসবাসী সেনাদের অভ্যর্থনার জন্য।
দীর্ঘ সাত বছরের মাথায় বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বাবর সমরকন্দ সহরে প্রবেশ করলেন এবং হর্ষ-উল্লাসের মাঝে বাবর পুনরায় সমরকন্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি শৈবানি খাঁর সমর্থকদের দখলে থাকা স্থানসমূহ হস্তগত করার জন্য মনোনিবেশ করলেন।
বাবর কিজিলবাসী সেনার সাথে মিলিত হয়ে একটার পর একটা বিজয় সাব্যস্ত করতে লাগলেন। তাসকন্দ, সৈরাম, উজগন্ত এবং উশের শাসকবর্গ বশ্যতা স্বীকার করে বাবরকে বাদশাহ বলে স্বীকৃতি দিলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইলকে সন্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে বাবর শ্বাহ ইসমাইলের ফটো সম্বলিত কয়েক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রস্তুত করে কিজিলবাসী সেনার মাঝে বিতরণ করলেন।
বাবরের নিকট থেকে প্রভূত সন্মান এবং আনুগত্য পেয়ে কিজিলবাসী সেনা এক সময় উগ্র ও উদণ্ড হয়ে উঠলো। তাদের লুটপাট এবং উচ্ছৃংখল ব্যবহারের জন্য সমরকন্দবাসী জর্জরিত হয়ে পড়লেন। কিজিলবাসী সেনার লুটপাট, অন্যায়-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমরকন্দবাসী তাদের বিরুদ্ধে বাবরের নিকট অভিযোগ জানালেন।
‘সাপও যাতে মরে এবং লাঠিও যাতে নাভাঙে’ এই নীতি অনুসরণ করে বাবর কিজিলবাসী প্রভাবশালী বেগদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তেজী ঘোড়া, সোনা-রুপোর বাসন-বর্তনের সাথে নানাবিধ উপহার দিয়ে তাদের মাউরা উন্নহর থেকে ইরান পাঠিয়ে দিলেন। তেমনভাবে সৈন্য-সামন্ত পাঠিয়ে দেওয়াতে শাহ ইসমাইল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পেটে পেটে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুদিন পরে তাঁর সেই ক্ষুণ্নতার প্রমাণও পাওয়া গেলো।
স্তেপীতে তখনও শৈবানি খাঁর সমর্থক উবেদুল্যাহ সুলতান শাসনকার্য চালাচ্ছিলেন। তিনি তলেতলে সৈন্য সংগ্রহ করে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
কথাটা বাবরের কানে পড়ল। এদিকে অনেকদিন শোয়ে-বসে থেকে বেগ এবং সেনাদের তরবারিতে মামরে ধরার উপক্রম হয়েছিলো। সেজন্য বেগবর্গ উবেদুল্যাহ সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য আগে থেকেই বাবরকে প্ররোচিত করতে ছিলো। খবর পেয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানের উপরে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন এবং স্তেপী আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। ত্রিশ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। বাবরের যুদ্ধযাত্রার খবর পেয়ে উবেদুল্যাহ সুলতান স্তেপী ত্যাগ করে রেগিস্থানের দিকে পালিয়ে গেলেন।
উবেদুল্যাহ সুলতান পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ বাবরের কানেও পৌঁছলো। সেজন্য তিনি ঘোড়ার দানা-পানী এবং সেনাদের খাদ্যসামগ্ৰী সহজে সংগ্রহ করতে পারবে তেমন এক স্থানে ছাউনি পেতে উবেদুল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু অনেকদিন অপেক্ষা করার পরেও উবেদুল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে এলো না। এদিকে অনেকদিন অপেক্ষা করে করে সেনারাও অধৈর্য হয়ে উঠলো। বাবরের নিজেরও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটলো। সেজন্য তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে রেগিস্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাবরের একাংশ সেনা পাহাড়ের অধিবাসী ছিলো। তারা পাহাড়ীয়া স্থানে চলা-চলে অভ্যস্ত ছিলো। সেজন্য তারা রেগিস্থানের বালু ও কাদাময় স্থানে চলা-চল করতে অসুবিধা অনুভব করতে লাগলো। এদিকে রেগিস্থান নদীর পাড়ে অবস্থিত ছিলো। স্থানে স্থানে নদীর চোরাবালির মরণফান্দ ছিলো। কোন কারণে চোরাবালিতে পা দিলে ঘোড়াসহ মানুষ চোরাবালির মাঝে ঢোকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। এদিকে পাহাড়ীয়া সেনার জন্য আগে থেকে চোরাবালি চিনাক্ত করাও অসুবিধা হচ্ছিলো। সেজন্য তাঁরা ঘোড়া নিয়ে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে বাধ্য হলেন।
এদিকে বারূদ-তোপ বয়ে নেওয়া গাড়ীর চাকাও বালির মাঝে ঢোকে যেতে লাগলো। সেগুলো টেনে তুলতে গিয়ে অযথা অনেক সময় নষ্ট হতে লাগলো। ফলে চোরাবালির মরণফান্দ এড়িয়ে চলতে গিয়ে এক সময় সেনাবাহিনী একটি দীঘল সারিতে পরিণত হলো এবং সেনাবাহিনী বিশৃংখল হয়ে পরলো। বিশৃংখল সেনাবাহিনীর মাঝে এক সময় অসন্তোষে দেখা দিলো। এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে একদল সেনা বাবরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তারা বাবরের সংগ ত্যাগ করে দশ হাজার সেনা নিয়ে উবেদুল্যাহ সুলতানের সাথে যোগদান করতে চলে গেলো।
প্রকৃতার্থে উবেদুল্যাহ সুলতান কৌশলগতভাবেই রেগিস্থানে ছাউনি পেতে অবস্থান করছিলেন। রেগিস্থানের প্রতি ইঞ্চি স্থানের বিষয়ে তিনি ভালোভাবে অবগত ছিলেন। সেজন্য তিনি বাবরকে বেকায়দায় ফেলার জন্য রেগিস্থানের মতো বিপজ্জনক স্থান বেচে নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি প্রতিমুহূর্তে নিরীক্ষণ করছিলেন এবং বাবর সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে তিনি খেরাবাদ, কোলে মলিক হ্রদ এবং কারাকোলের নিকটে বাবর সেনার উপরে আক্রমণ চালালেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
দীর্ঘ সারিতে পরিণত হওয়ার জন্য বাবর এক সময় নিজের সেনার উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধে উবেদুল্যাহ সুলতান জয় লাভ করলেন। উক্ত খণ্ডযুদ্ধে বাবরের অনেক সেনা হতাহত হলো। ফলে বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে বুখারা হয়ে সমরকন্দের দিকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলেন।
সমরকন্দ এসে বাবর পুনরায় সেনা সংগ্রহ করতে লাগলেন। সেনা সংগ্রহ করে তিনি আবার যুদ্ধযাত্রা করলেন। তবে এইবার বুখারার দিক দিয়ে না গিয়ে হিসারের দিক দিয়ে স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। ইতিমধ্যে শাহ ইসমাইল বাবরের সহায়ের জন্য ষাট হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করছিলেন। উক্ত বাহিনী হিসার এসে বাবরের সাথে মিলিত হলো।
শাহ ইসমাইল দেখা-দেখি বাবরের সহায়ের জন্য সেনা প্রেরণ করেছিলেন যদিও তাঁর অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য ছিলো অন্য রকম। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো বাবরকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে নিজের অনুগত ও বিশ্বাসী অন্য কোন শাসককে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা। কারণ আগের বার সমরকন্দ থেকে কিজিলবাসী সেনা তারাতারি পাঠিয়ে দেওয়াতে তিনি মনে মনে বাবরের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তদুপরি তিনি গুপ্তচরের মুখ থেকে অবগত হয়েছিলেন যে, বাবর সমগ্র মাউরা উন্নহর দখলের জন্য চেষ্টা করতেছে। এইসব কারণে শাহ ইসমাইল বাবরের প্রতি উপরে উপরে বন্ধুত্বের অভিনয় করলেও মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তলে তলে মাউরা উন্নহরে ইরানের আধিপত্য বিস্তারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
ইরানী সেনা নায়ক নজমে সানির সাথে হওয়া প্রথম সাক্ষাতেই শাহ ইসমাইলের এই আগ্রাসী মনোভাবের ইংগিত পেয়ে বাবর সতর্ক হয়ে উঠলেন।
ঘটনাটা ঘটেছিলো এরকম- বাবরের সাথে পরামর্শ না করেই শাহ ইসমাইলের সেনাপতি নজমে সানি শৈবানি খাঁর বংশধরদের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করে।নিজ দুয়ান নামক স্থানে ইরানী সেনা এবং শৈবানি খাঁর বংশধরদের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয় এবং সেই যুদ্ধে ইরানী সেনাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাবরের সাথে পরামর্শ না করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়াতে ইরানী সেনার সাথে সহযোগিতা না করে বাবর হিসারের দিকে চলে আসেন। উক্ত যুদ্ধে অধিকাংশ ইরানী সেনা নিহত হয় এবং নজমে সানি নিজেও মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অমু দরিয়া পার হতে গিয়েও অনেক ইরানী সেনা জলে ডুবে মারা যায়।
বাবর বায়সানের মধ্য দিয়ে হিসারের কারাতান আসেন। তিনি পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে কারাতানে ছাউনি পেতে রইলেন। কিন্তু এক রাতে একদল বিদ্রোহী সেনা বাবরের তাঁবু আক্রমণ করে। বাবরের দেহরক্ষীরা গণ্ডগোলের শব্দে জাগ্রত হয়ে বিদ্রোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
খানজাদা বেগমের পুত্র খুরমের বয়স তখন এগার বছর। বাবরের শৌর্য-বীর্যের প্রতি খুরম খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলো। মামাকে সে খুব ভালও বাসতো। বাবরও তাকে খুব স্নেহ করতেন। খুরম অবসর সময়ে বাবরের সাথে হাসি তামাশা করে সময় অতিবাহিত করতো। সেজন্য বাবরের উপর আক্রমণ সংঘটিত হওয়া দেখে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। বাবরকে বাঁচাতে সে তীর-ধনু নিয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলো।
খানজাদা বেগম খুরমকে বাধা দিয়ে বললেন-আরে আরে, কোথায় যাচ্ছ? বাইরে যেওনা। যুদ্ধ চলতেছে।
খুরম অসহিষ্ণুভাবে বললো- আমাকে বাধা দিবেন না। আমাকে যেতে দিন। মামার উপরে হামলা হচ্ছে। আমি মামাকে সহায় করতে চাই।
এমন সময় দুটি ঘোড়া নিয়ে তাহিরজান সেখানে পৌঁছোলো। সে খানজাদা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো- আপনারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পালান। এটা জাহাপনার আদেশ।
মহিলারা ঘোড়ায় চড়ে কাশিম বেগের নেতৃত্বে নিরাপদ স্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাইরে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ চলছিলো। যুদ্ধের অবস্থা দেখে খুরম আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। মামার উপরে আক্রমণ সংঘটিত করা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ জেগে উঠলো তার হৃদয়ে। মামাকে সহায় করার জন্য তার হৃদয়ে তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠলো। একদল সেনা তাদের দিকে অগ্রসর হতে দেখে সে তীর-ধনু নিয়ে প্রস্তুত হলো। সে একটার পর একটা করে তিনটা শর নিক্ষেপ করলো। এমন সময়ে একটি শর এসে তার বুকে বিদ্ধ হলো। তীব্র আর্তনাদ করে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো। খুরমকে ঘোড়ার পিঠ থেকে পতিত হতে দেখে খানজাদা বেগম ‘খুরম’ বলে চিৎকার করে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝাঁপ মেরে নেমে এসে খুরমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিদ্রোহীরা পালিয়ে গেলো। তাহিরজান অচেতন অবস্থায় খুরমকে তাঁবুতে নিয়ে এলো। হেকিম সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করলেন। তবে, যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও খুরমের জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন না হেকিম। মৃত্যুর সাথে যুঁজে যুঁজে এক সময় শৈবানি খাঁর বংশধর, খানজাদা বেগমের কলিজার টুকরো খুরম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
খুরমের মৃত্যুতে বাবর মর্মান্তিক আঘাত পেলেন। শৈবানি খাঁর বংশধর বলে প্রথমাবস্থায় বাবর খুরমকে ঘৃণা করতেন যদিও পরে তার অমায়িক ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন। খুরমও মামাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করতো। সেজন্য খুরমের অকালবিয়োগে বাবর শোকে ভেঙে পড়লেন এবং স্তেপী জয়ের আশা ত্যাগ করে আবার কাবুল ফিরে এলেন।
কাবুল এসে বাবর কাবুলের শাসনভার গ্রহণ করলেন। শাসনভার গ্রহণ করার পরে তিনি সেনা সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মনোনিবেশ করলেন। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার পরে তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করলেন। একটার পর একটা দেশ জয় করে দশ বছরের ভেতরে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে উঠলেন। কুন্দুস থেকে কান্দাহার এবং বক্সার থেকে হিন্দুকোশ পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো। অবশেষে তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন।
হিন্দুস্থান আক্রমণের আয়োজন চলে থাকতে একদিন রাতে প্রধানা বেগম মহিম বেগম বাবরকে বললেন- আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী, জাহাপনা?
অনুরোধ! কী অনুরোধ করতে চাইছেন, বেগম? সহরের বাইরে নতুন উদ্যান নির্মাণের জন্য অনুরোধ করবেন, না কোনো মূল্যবান সামগ্রী কেনার জন্য টাকা খুঁজবেন!
বাবর এভাবে নিজের মনে প্রশ্ন কয়টা ভেবে প্রকাশ্যে বললেন- আমার সামর্থের ভেতরে হলে নিশ্চয় রাখব। বলুন, কী বলতে চাইছেন?
মাহিম বেগম ভাবছিলেন অন্য কথা। বাবরের তিনজন বেগম। মাহিম বেগম, গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আলাসা বেগম। বেগম কয়জনের মধ্যে মাহিম বেগমই জ্যেষ্ঠা। মাহিম বেগমকে হিরাতে থাকতে বিয়ে করিয়েছিলেন এবং বাকি দুইজনকে বিয়ে করিয়েছেন কাবুল আসার পরে।
তিনজন বেগমের গর্ভে মোট পাঁচজন সন্তান। চারজন পুত্র এবং একজন কন্যা। মাহিম বেগমের গর্ভে একমাত্র সন্তান মির্জা হুমায়ূন।
গুলরুখ বেগমের গর্ভে দুই পুত্র সন্তান। মির্জা কামরান এবং মির্জা আকসারা। দিলদার আলাসা বেগমের গর্ভে পুত্র হিন্দাল এবং কন্যা গুলবদন।(এই গুলবদনই প্রাপ্ত বয়সে হুমায়ূন নামা রচনা করেছিলেন।)
পুত্র কয়জনের মধ্যে হুমায়ূন জ্যেষ্ঠ। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাবর তাঁকে কাবুল থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বদবখসায় সুবেদার হিসাবে পাঠিয়েছেন। বদবখসা চারদিকে পাহাড় ঘেরা অতি বিপজ্জনক স্থান। সুমালি বিদ্রোহীদের ঘাটি ছিলো বদবখসাতে। সেজন্য মাহিম বেগম একমাত্র পুত্রের অমংগল আশংকায় দুঃশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করতেছিলেন এবং হুমায়ূনকে বদবখসা থেকে ফিরিয়ে এনে নিজের সাথে রাখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
বাবরের নিকট থেকে অনুমতি পেয়ে মাহিম বেগম কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে অনুরোধের সুরে বললেন- আপনি হুমায়ূনকে কাবুল ডেকে পাঠান।
বাবর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। মাহিম বেগমের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন- কিন্তু কী বলে ডেকে পাঠাব? চিরদিনের জন্য, না আপনার সাথে দেখা করে যাওয়ার জন্য?
মাহিম বেগম দুঃশ্চিন্তা প্রকট করে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন- সে আজ দুই বছর যাবত সোমালি বিদ্রোহীদের মাঝে রয়েছে। তার অমংগল আশংকায় আমার চোখে ঘুম নেই। হুমায়ূনের পরিবর্তে আপনি সেখানে অন্য কাউকে পাঠান।
কিন্তু কাকে পাঠাব? বাবর কিঞ্চিত বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন।
মির্জা কামরানকে পাঠান। সে হুমায়ূনের থেকে মাত্র দু’বছরেরই তো ছোট। সে নিশ্চয় শাসন কার্য চালাতে পারবে। মির্জা কামরান নওজোয়ান হয়ে উঠেছে বলে গুলরুখ বেগমও দেখছি গৌরব করেন। সেজন্য হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে সেখানে সুবেদার করে পাঠান। তখন গুলরুখ বেগমেও নিশ্চয় কথাটায় আপত্তি করবেন না।
মাহিম বেগমের কথা শুনে বাবরের মুখমণ্ডল উদাস ও গম্ভীর হয়ে উঠলো। সন্তান কয়জন বড় হয়ে উঠার সাথে সাথে যেন বেগমদের মাঝে বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। সাধারণ কথা নিয়েই যেন বেগমদের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে। সেজন্য বাবর অনেকদিন যাবত অশান্তিতে ভূগতেছেন। বেগমদের মাঝে কখনও কখনও প্রকাশ্য শত্রুতার ভাবও প্রকট হয়ে উঠা তিনি লক্ষ্য করতেছেন। হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে সুবেদার করে পাঠানোর মূলেও যে সেই বিদ্বেষের বিষবাষ্প প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে এ কথা অনুমান করতে বাবরের অসুবিধা হল না। তিনজন বেগমই নিজের নিজের সন্তানের মংগল চিন্তায় ব্যস্ত। ভবিষ্যতের জন্য এই মনোভাব খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে! বাবরের ভবিষ্যত যোজনার উপরেও যে এই আপনসর্বস্ব মনোভাবে প্রভাব ফেলবে এটা নিশ্চিত। সেজন্য বাবর মাহিম বেগমের প্রস্তাবের বিপক্ষে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- বেগম, আপনি গুলরুখ বেগমের কথায় কর্ণপাত করবেন না। বয়স দিয়ে মানুষের জ্ঞানের পরিধি মাপা যায় না। কামরান হুমায়ূনের সম বয়স্ক হলেও
তার জ্ঞান এখনও হুমায়ূনের মতো পরিপক্ক হয়নি। হুমায়ূনের মতো কামরান এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখন আমি একমাত্র হুমায়ূনকেই নিয়োগ করতে পারি, কামরানকে এখনও গুরু দায়িত্ব অর্পণ করার সময় হয়নি।
হুমায়ূনের প্রশংসা শুনে মাহিম বেগমের মন কিছু পাতল হলো যদিও নিজের ভাগ্যকে দোষারূপ করে বললেন- আমার ভাগ্যই মন্দ। আমার চেয়ে গুলরুখ বেগমই সুখী। তাঁর দুই পুত্র। দু'জনকেই নিজের কাছে রেখে আমোদ-আহ্লাদ করে নিশ্চিন্ত মনে খেয়েধেয়ে আছেন। আমার একমাত্র পুত্র হুমায়ূন। তাকে দূরদেশে বিদ্রোহীদের মাঝে রেখে আমাকে দুঃশ্চিন্তায় সময় কাটাতে হচ্ছে। এক বছর যাবত তার মুখখানাও আমি দেখতে পারিনি। দূরদেশে থাকার জন্য সময় মতো তার খবরও নিতে পারি না। ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও দু’সপ্তাহের পথ। তদুপরি তার চারদিকে শৈবানি খাঁর ছেলেরা বাচ্চা হারানো বাঘিনীর মতো গর্জে-গুমরে রয়েছে। কখন কী বিপদ হয়, বলা যায় না! হুমায়ূনের কথা মনে পড়লে আমার বুকটা হাহাকার করে উঠে।
আপনি অনর্থক উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, বেগম। তিন হাজার সুপ্রশিক্ষিত সেনা রয়েছে হুমায়ূনের সাথে। তদুপরি শৈবানি খাঁর পুত্ররাও পরস্পরের সাথে কাজিয়া করে বর্তমান হীনবল হয়ে পড়েছে। তাদের তরপ থেকে বর্তমান কোনো ভয় নেই। তবুও যদি হুমায়ূনকে দেখতে আপনার আকাঙ্খা হয়েছে, তিন চার সপ্তাহের মধ্যে আপনি হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
কোথায়? মাহিম বেগম ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- কাবুলে?
না, আদিলপুরে।
মাহিম বেগম শুনছিলেন যে আদিলপুর কাবুল থেকে দক্ষিণ দিকে হিন্দুস্থানের নিকট অবস্থিত। বাবর বর্তমান আদিলপুরের দিকে সেনা প্রেরণ করে থাকার কথাও তিনি এর-ওর মুখে শুনেছেন। হিন্দুস্থান অভিযানের উদ্দেশ্যেই যে এই সেনা সমাবেশ এ বিষয়ে বাবর কিছু না বললেও লোকমুখে শুনেই তিনি কথাটা উপলব্ধি করতে পারছেন।
সেজন্য মাহিম বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- আদিলপুরে? তারমানে আপনি হুমায়ূনকেও হিন্দুস্থান নিয়ে যেতে চাইছেন নাকি?
বাবর হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাইতে ছিলেন এবং কথাটা তিনি গোপনেই রাখতে চাইছিলেন। সেজন্য তিনি মাহিম বেগমের মুখে হিন্দুস্থান অভিযানের কথা শুনে সচকিত হয়ে উঠলেন। আশেপাশে কেউ আছে নাকি তার সন্ধান নিতে তিনি কান খাড়া করলেন। আগুনে পোরা গরু রাঙা মেঘ দেখেও আতঙ্কিত হয়ে উঠে। বাবরও বর্তমান হিন্দুস্থান আক্রমণ সম্পর্কে তেমনই আতঙ্কিত। জীবনে তিনি অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছেন। সেজন্য তিনি হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাচ্ছেন। বর্তমান তিনি মাউরা উন্নহর বিজয়ের আশা ত্যাগ করেছেন। বর্তমান তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হিন্দুস্থান। গত বছর তিনি হিন্দুস্থানে গুপ্তচর পাঠিয়েছেন। ভারতের শুভচিন্তক অনেকে বর্তমান তাঁর সাথে যোগাযোগও করতেছে। বর্তমান তাঁরও অনেক শুভচিন্তক রয়েছে হিন্দুস্থানে। তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই রয়েছে। হিন্দুস্থান থেকে মুসলমান শাসক এবং হিন্দু রাজার দূত ইতিমধ্যে ছয় বার কাবুল এসেছে। তাঁরা দিল্লীর সুলতান ইব্রাহীম-এর উপর অসন্তুষ্ট। তাঁদের মতে ইব্রাহীম লোডী একজন অদূরদর্শী এবং স্বেচ্ছাচারি শাসক। লোডীর শোষণ শাসনে জনসাধারণ সর্বস্বান্ত। দেশের উন্নতির জন্য ইব্রাহীম লোডীর বর্তমান কোনো যোজনাই নেই। একটার পরে একটা গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। গৃহযুদ্ধের ফলে দেশের শান্তি বিঘ্নিত। দেশ টুকরো টুকরো বিধ্বস্ত। বর্তমান দেশটিকে সুসংহত এবং পুনর্গঠন করে শান্তি স্থাপনের জন্য এক সুসংগঠিত শক্তির আবশ্যক। তাঁদের ধারণা, একমাত্র মির্জা জহিরুদ্দিন বাবরই সেই শক্তির অধিকারী।
মাহিম বেগমের উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে বাবর যোজনার কথা মোটামুটি প্ৰকাশ করলেন- বেগম, আমার উপরে বিশ্বাস রাখুন। আমি সেখানে নিজ ইচ্ছায় যেতে চাচ্ছিনা না। হিন্দুস্থানের লোকের আমন্ত্রণ মর্মে সেখানে যেতে চাইছি। তদুপরি আমি সেখানে লুটপাটের জন্যও যাব না— আমি যেতে চাইছি এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য। হিন্দুস্থান আক্রমণ করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে পঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ তাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁকে আমার নিকট প্রেরণ করেছিলেন। হিন্দু রাজা সংগ্রাম সিঙও আমার সাহায্য প্রার্থনা করে দূত
প্রেরণ করেছিলেন। সেজন্য হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অন্যায়-অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সবাই মিলিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারজন্য অভিযান নিয়ে ভয়ের কোনো হেতু নেই।
মাহিম বেগম বাবরের কথা মনযোগ সহকারে শুনে সংশয় প্রকাশ করে বললেন- যুদ্ধ জয় এবং পাপের দ্বারা অর্জন করা ফলাফলের মধ্যে সর্বদা গভীর খাদ থাকে, জাহাপনা। সেই খাদের তল অতল, সেখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তায় ভরা মৃত্যুর বিভীষিকা।
বাবর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- আমরা সততা দিয়ে সেই খাদ পার হয়ে নিশ্চয় মৃত্যুর বিভীষিকা অতিক্রম করতে সক্ষম হবো, বেগম। কারণ আমাদের সাথে থাকবে নিপীড়িত জনসাধারণের শুভাশীষ।
কত এতিম এবং বিধবার চোখের জল বয়ে যাবে, কত পুত্রহারা, মাতৃহারার হা-হুতাশে আকাশ বাতাস বিষাক্ত করে তুলবে সেটা একবার ভেবে দেখছেন, জাহাপনা?
গৃহযুদ্ধের জন্য এখনও তো হিন্দুস্থানে অনেক লোক মারা যাচ্ছে। অনেক লোক মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সহায়ের জন্য এখানে আসতেছে। অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর অধীনে কাজ করা হিন্দুবেগ হিন্দুস্থান থেকে পালিয়ে এসে আমাদের এখানে চাকরি করতেছেন। সেজন্য আমরা নিপীড়িতদের সহায়ের জন্য হিন্দুস্থান যাচ্ছি বলে ভেবে নেন না কেন, বেগম।
জাহাপনা, আপনি আমার একটা প্রার্থনা রাখুন। আপনি হুমায়ূনকে কাবুল রেখে হিনুস্থান যান। আপনার অনুপস্থিতে সে কাবুলের শাসনভার সামলাতে পারবে।
আপনি নিজে শাসনকার্য চালাতে চান নাকি, বেগম?
আমি! আমি তো মেয়ে মানুষ। এ ক্ষেত্রে একজন পত্নীর চেয়ে একজন পুত্রের দাবি অনেক বেশি। হুমায়ূন আপনার সাথে গেলেও মির্জা কামরান ও আক্সারি তো এখানেই থাকবে। আইনতঃ শাসনকার্য চালোনোর জন্য আমার চেয়ে তারাই বেশি যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
মাহিম বেগমের কথা শুনে বাবর তৎক্ষণাৎ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত মর্মে তিনি বললেন- আপনি যাতে নির্বিঘ্নে শাসনকার্য চালাতে পারেন তার ব্যবস্থা আমি করে যাব। মির্জা কামরানকে আমি কান্দাহারের শাসনকর্তা নিযোজিত করে যাব এবং মির্জা আক্সারিকে আমার সাথে নিয়ে যাব। আপনার সহায়ের জন্য কাশিম বেগকে এখানে রেখে যাব। এখন হবে তো, বেগম?
আপনার সিদ্ধান্তে আমি সত্যিই অভিভূত, জাহাপনা। আমার অনুমান হচ্ছে, আপনার সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমি যেন আকাশের সীমা স্পর্শ করছি। তবে, জাহাপনা, আমি শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নই।
যে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নয়, আসলে তাঁকেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত, বেগম। আপনি মির্জা হিন্দালের নামে শুধু হুকুম জারি করবেন এবং কাশিম বেগ সব দেখা-শুনা করবেন। তখন সবই আইনসংগতভাবে চলে থাকবে।
মির্জা হিন্দাল দিদার আলাসার গর্ভজাত যদিও তাকে লালন-পালন করেন মাহিম বেগম। হিন্দালও মাহিম বেগমের খুব ভক্ত। জন্মধাত্রী মাতৃর চেয়ে হিন্দাল মাহিম বেগমের বেশি অনুরক্ত। মাহিম বেগমকেই সে মাতৃ বলে জানে। সেজন্য বাবর হিন্দালের কথা বলে মাহিম বেগমকে অপ্রস্তুত করতে চাইলেন। কিন্তু মাহিম বেগম বাবরের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মতে অটল হয়ে বললেন- হুমায়ূন কাবুল থাকলে কী ক্ষতি হবে?
শাহী খানদানের পরম্পরা অনুসারে বাদশাহ যুদ্ধে নিহত হলে, তখন তাঁর উত্তরাধিকারী সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া নিয়ম। তা নাহলে বেগবৃন্দ সিংহাসনের অন্যান্য সাম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর পক্ষ নিয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বাবর কথাটা অধিক স্পষ্ট করার জন্য বললেন- যুদ্ধ মানে অনিশ্চয়তার খেলা। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার মৃত্যু হলে, তখন জ্যেষ্ঠ হিসাবে হুমায়ূনই আমার স্থান নিতে হবে। সেজন্য আমি হুমায়ূনকে সঙ্গে নিতে চাচ্ছি।
মাহিম বেগম বাবরের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারলেন এবং উপলব্ধি করতে পারার জন্যই তাঁর জন্য বিষয়টা অধিক উদ্বেগজনক ও পীড়াদায়ক হয়ে উঠলো। তাঁর ধারণায় হিন্দুস্থান এমন একটি দেশের মতো অনুমান হতে লাগলো, যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসতে পারে না। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন- ইয়া আল্লাহ, পৃথিবীটা কেমন নির্দয়!
বাবর কোনো রকম মন্তব্য না করে মনে মনে রইলেন। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো-নদী-নালা, পর্বত-পাহাড়ে ভরা, নিত্য সাগর চরণ ধৌত করা হিন্দুস্থানের অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিচ্ছবি।
* * *
বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্থান অভিমুখে যাত্রা করার পর কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। তাঁরা এসে এসে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে হিন্দুস্থানের সীমায় পদার্পণ করলেন।
চতর্দিকে দিগন্ত বিস্তৃত গভীর ঘন অরণ্য। অরণ্যের মাঝ দিয়ে বন-জঙ্গলে আবৃত সরু পথ। কোন কোন স্থানে পথের কোনো চিন-ছাপ নেই। সেরকম স্থানে তাঁরা বন-জঙ্গল কেটে পথ বের করে অগ্রসর হতে লাগলেন। যতই এগোতে লাগলেন, বন- জঙ্গল ততই ঘন হতে লাগলো।
গভীর অরণ্যের মাঝে মাঝে বিশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো উঁচু উঁচু বৃহৎ গাছ-বৃক্ষ। বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষের কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে শিকড় বেরিয়ে মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে বের হওয়া শিকড় মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়াতে একটি গাছই এক বিস্তীর্ণ এলেকা জুড়ে ব্যাপ্ত ছিলো। কাণ্ডের মাঝে জড়িয়ে ছিলো অজস্র কাঁটাযুক্ত গুল্মলতা। লতাগুলি একটি গাছ থেকে অন্য একটি গাছে বেয়ে গিয়ে অভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছিলো। তৃণ, বন-জঙ্গলের জন্য পা-র তলের মাটি পর্যন্ত দেখার উপায় ছিল না।
বাতাস ছিলো আর্দ্র এবং সিক্ত। সবারই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কষ্টদায়ক শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে সবার মাথা চক্কর কাটতে লাগলো। ফলে সবাই শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
বাবর রেশমের পাতল জামা পরেছিলেন। কষ্টকর পথশ্রম এবং প্রচণ্ড গরমের জন্য তিনি ঘামে ভিজে উঠেছিলেন। অসহ্য ক্লান্তিতে তিনি বাতাসের অবস্থিতি জানার জন্য একটি উঁচু গাছের উপরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। গাছটি হেলে-দুলে থাকা তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। অর্থাৎ গাছের উপর দিয়ে বাতাস বইতেছে। অথচ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বাতাসটুকুও গাছের শাখা-প্রশাখার প্রাচীর ভেদ করে নিচের দিকে বয়ে আসতে পারছে না। কাথাটা ভাবতেই বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো।
কোথাও হঠাৎ একটা বান্দরের চিৎকার শুনা গেলো। সময় এগোনোর সাথে সাথে নানান বন্য জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীর কোলাহলমুখর শব্দ বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সময়ে সময়ে ভেসে আসতে লাগলো ময়ূরের শ্রবণকটু কোলাহলমুখর কলরব। চারদিকে যেন বিরাজ করছে এক ভয়ঙ্কর ভয়াল পরিবেশ।
লতা-পাতার প্রাচীর ভেদ করে একটি উট পার করে নিয়ে যাওয়া অবস্থায় হঠাৎ একজন সৈনিক চিৎকার করে উঠলো। ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। তার পাশে অবস্থানরত সৈনিক একজন ব্যগ্রভাবে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলো- কি হলো? এরূপ চিৎকার করছ কেন?
সৈনিকটি আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- সাপ! আমাকে সাপে কামড়েছে।
সাপের কথা শুনে সে আশেপাশে থাকা সবাইকে সাবধান করে দিলো- ভাইসব, সাপ, সাবধান। এভাবে সাবধান করে দিয়েই সে লাফ মেরে সাপে কামড়ানো সৈনিকটির নিকটে এসে জিজ্ঞাসা করলো- কোথায় কামড়েছে?
সর্পদংশিত সৈনিকটি দংশিত স্থান দেখিয়ে বললো- এই যে, এইখানে।
ডান পা-র আঁঠুর তলে কামড়েছিলো। সাপে কামড়ানো স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। বিষ যাতে উজাতে না পারে তারজন্য সৈনিকটি সর্পদংশিত স্থানের কিছু উপরে একটি রশি দিয়ে কষে বাঁধলেন। ইতিমধ্যে আশ-পাশের কয়েকজন সৈনিক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। তোপবাহী একটি গাড়ীতে তুলে সর্পদংশিত সৈনিকটিকে অপেক্ষাকৃত এক টুকরো খোলা স্থানে নিয়ে আসা হলো।
মানুষ, হাতি, ঘোড়া, উট প্রভৃতির জন্য ঘন কাঁটাযুক্ত লতা-পাতার মধ্য দিয়ে হাঁটাটা খুবই কষ্টকর হচ্ছিল। তার উপরে ভূতের উপরে দানব পড়ার মতো কোন কেন স্থানে মাটিও কাদাযুক্ত ছিলো। ভারি তোপবাহী গাড়ীর চাকা স্থানে স্থানে কাদার মধ্যে ঢোকে যেতে লাগলো। সেগুলো কাদা থেকে টেনে তুলতে সৈনিকগুলো শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে যাত্রাপথ বিরক্তিজনকভাবে দীর্ঘ হতে লাগলো।
একবার এক স্থানে গাড়ীর চাকা গভীরভাবে কাদায় ঢোকে গেলো। সৈনিকরা যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও গাড়ীর চাকা কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হলো না।
কাদায় লুটোপুটি হয়ে আলীকুলি খাঁ নামক একজন সর্দার বাবরের নিকট এসে বললো-জাহাপনা, এই ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে তোপবাহী গাড়ী নিয়ে যাওয়াটা আমাদের সাধ্যের বাইরে। চারদিকে শুধু কাদা। সব কয়টা গাড়ী কাদার জন্য অচল হয়ে পরেছে। একটি গাড়ী তো কাদার মধ্যে ঢোকেই গিয়েছে। অনেক সময় চেষ্টা করেও গাড়ীটা কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হইনি। লোকগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
বাবর তাঁর পেছনে পেছনে আসা তাহির বেগের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন- তাহির বেগ সাহেব, আপনি যান। পথপ্রদর্শক লোকটিকে এখানে ডেকে আনুনগে'।
পথপ্রদর্শক লোকটি হিন্দুস্থানী। নাম লালচান্দ। সবার আগে আগে সে হাতীতে চড়ে যাচ্ছিলো। তাহির বেগ এগিয়ে এসে লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে বললো- লালচান্দ সাহেব, জাহাপনা আপনাকে স্মরণ করেছেন।
স্বয়ং বাবর স্মরণ করার কথা শুনে লালচান্দ তৎক্ষণাৎ হাতীর পিঠে চড়ে বাবরের নিকট এলো।
হাতী দেখে বাবরের ঘোড়াটি চিঁহিহি চিৎকার করে ছটফট করতে লাগলো। লালচান্দ বিশালকায় হাতীটি বাবরের কাছ থেকে কিছু দূরে থামিয়ে হাতীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কিছু বললো। হাতীটা শুঁড় তুললো। লালচান্দ শুঁড় বেয়ে হাতীর পিঠ থেকে নেমে বাবরের নিকট এসে হাতজোড় করে অভিবাদন জানালো।
লালচান্দ ফার্সি ভাষা জানতো। সেজন্য বাবর লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে ফার্সি ভাষায় বললেন- লালচান্দ সাহেব, পথ খুব খারাপ। মানুষ চলাচলের জন্য একেবারে অনুপযুক্ত। আপনি অন্য পথের সন্ধান করুন।
লালচান্দ বিনীতভাবে বললো- জাহাপনা, আমরা এখন পাঞ্জাব এসে পৌঁছেছি। পাঞ্জাব পঞ্চ নদীর দেশ। নদীগুলোতে বর্তমান বান এসেছে। দুই কূল ছাপিয়ে জল ক্ষেত-খোলায় ঢুকে পড়েছে। রাস্তা-ঘাট, ক্ষেত-খোলা বর্তমান জলের তলে। সেজন্য অসুবিধা হলেও আমরা এখান দিয়েই যেতে হবে, জাহাপনা।
আমি জানি পাঞ্জাবে রাস্তা-ঘাটের অভাব নেই। বর্ষায় চলাচলের জন্য উঁচু উঁচু অনেক রাস্তা রয়েছে বলে আমি শুনেছি। গাড়ী নিয়ে যাওয়ার জন্য বোলে ভালো ভালো রাস্তা রয়েছে। আমাদের গাড়ীগুলো কাদার জন্য এগোতে পারছে না। চাকাগুলো মাটিতে ঢোকে যাচ্ছে। বাবর সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন- আমরা ভুল রাস্তায় আসিনি তো?
না না, জাহাপনা, আমরা সঠিক রাস্তায়ই এসেছি। গাড়ীর চাকা কোথায় ঢুকে গেছে? আমায় আদেশ দিন, আমার হাতী সেগুলো কাদা থেকে টেনে বের করে দিবে। আমরা এখন দ্রুত এগিয়ে যাওয়া উচিত। অপেক্ষা করে থাকলে আমাদের অসুবিধা আরও বেশি হবে, জাহাপনা।
আচ্ছা, আপনি হাতী নিয়ে গিয়ে গাড়ীগুলো কাদা থেকে বের করে দিনগে’। বাবর লালচন্দকে গাড়ী তোলার জন্য অনুমতি দিলেন।
আলীকূলি খাঁ নিকটেই ছিলো। সে বাবরের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে লালচান্দের দিকে তাকিয়ে বললো- আচ্ছা, চলুন আপনার হাতী নিয়ে।
লালচান্দের শরীরে মাংসের লেশমাত্র নেই। চর্মসার শরীর। তার শরীর দেখতে একটি কংকালের মতো। আলিকুলির আহ্বান মর্মে সে হাতী নিয়ে আলীকুলির পেছনে পেছনে অগ্রসর হলো।
গন্তব্যস্থানে পৌঁছে হাতীটিকে কাদা থেকে গাড়ীটি টেনে তুলতে নির্দেশ দিলো। নির্দেশ পেয়ে হাতীটি অনায়াসে কাদা থেকে গাড়ীটি টেনে তুললো। হাতীর বিক্রম প্রত্যক্ষ করে সেখানে উপস্থিত সৈনিকগুলো অবাক হয়ে গেলো।
সর্পদংশিত সৈনিকটি গাড়ীর উপরে শোয়ে যন্ত্রণায় উঁআঁ করতে ছিলো। তার মুখমণ্ডল পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিলো। বিষক্রিয়া নষ্ট করার জন্য সাপ কামড়ানো ক্ষতস্থানে লতা-পাতা ছেঁচে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তবে, ঔষুধের ক্রিয়ার থেকে বিষের ক্রিয়া প্রবল হওয়াতে সৈনিকটির বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিলো। শরীরের রং এক সময় নীল পড়ে গেলো। একজন সৈনিক তার শিতানে বসে পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলো।
গাড়ী আবার এগোতে লাগলো। বিকেল বেলা তাঁরা এসে রাবী নদীর পাড়ে উপস্থিত হলো। একশত জন সৈনিক নিয়ে হিন্দু বেগ এসে রাবী নদীর পাড়ে বাবরের সাথে মিলিত হলেন।
হিন্দু বেগ দিল্লীর একজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। তিনি বর্তমান বাবরের দরবারের একজন সভাসদ। সাত বছর পূর্বে তিনি ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন। কিন্তু তিনি ইব্রাহীম লোডীর স্বেচ্ছাচারিতা পসন্দ করতেন না। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীর সাথে তাঁর মনোমালিন্য হয় এবং লোডীর রোষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি কাবুল পালিয়ে গিয়ে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
হিন্দু বেগ সুশিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। তুর্কি এবং ফার্সি ভাষায় তাঁর যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিলো। বাবর গুণীর গুণের মূল্য বুঝতেন। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি হিন্দু বেগের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে নিজের দরবারের একজন কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন এবং কর্মদক্ষতার বলে অল্পদিনের ভেতরে তিনি বাবরের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন।
ইব্রাহীম লোডী একজন স্বেচ্ছাচারি ও নিষ্ঠুর শাসক। তাঁর অন্যায় অত্যাচার এবং শাসন শোষণে হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। হিন্দুস্থান থেকে ইব্রাহীম লোডীর শাসন উপরে ফেলে শোষণমুক্ত সমৃদ্ধিশালী হিন্দুস্থান গঢ়াই ছিলো হিন্দু বেগের প্রধান লক্ষ্য। বাবরের দরবারে কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ হয়েই তিনি এই বিষয়ে বাবরের সাথে আলোচনা শুরু করেন এবং হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য বাবরকে উৎসাহিত করতে থাকেন।
বাবর আগে থেকেই হিন্দুস্থানের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করছিলেন। হিন্দু বেগের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে বাবরের সেই আকর্ষণ অনেক গুণে বৃদ্ধি পায় এবং তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য ইতিবাচক সন্মতি প্রকাশ করেন। বাবরের নিকট থেকে সন্মতি পেয়ে ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট হিন্দুস্থানী রাজন্যবর্গ, শাসক এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে হিন্দু বেগ বাবরের হিন্দুস্থান আক্রমণ সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন।
হিন্দু বেগ বিনাযুদ্ধে হিন্দুস্থান দখলের পক্ষপাতি ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তার জন্যই গত বছর বাবর ঝীলাম নদীর পাড়ে অবস্থিত ভীরা সহর দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে হিন্দু বেগের প্রতি বাবরের আস্থা অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট শাসক এবং নাগরিকদের সাথে আলোচনার জন্য হিন্দু বেগকে ভীরা সহরের সুবেদার নিযুক্ত করে রেখে গিয়েছিলেন।
কিছুদিন আগে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁ হিন্দু বেগের নির্দেশ মর্মে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে কাবুল গিয়েছিলেন। দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করে সহমতে উপনীত হয়ে গতবারের মতো এইবারও বাবর বিনাযুদ্ধে লাহোর অধিকার করার উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগকে লাহোরের শাসক দৌলত খাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। হিন্দু বেগ বাবরের নির্দেশ মর্মেই দৌলত খাঁর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে ইতিবাচক অগ্রগতি লাভ করে বাবরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। হিন্দু বেগের আহ্বান মর্মেই বর্তমান বাবরের এই অভিযান।
হিন্দু বেগ বাবরের নিকট এসেই অভিবাদন জানিয়ে কোনো রকমের ভূমিকা না করে সরাসরি বললেন- জাহাপনা, দৌলত খাঁর অভিপ্রায় ভালো নয়, তিনি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কোনমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি, জাহাপনা।
বাবর প্রথমে হিন্দু বেগের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না যদিও হিন্দু বেগের বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত চেহেরা এবং উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে কথাটা উপলব্ধি করতে তাঁর অসুবিধা হল না। তিনি উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- কী বললেন? দৌলত খাঁ.....
উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় বাবর বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না।
হ্যাঁ জাহাপনা, দৌলত খাঁ আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। হিন্দু বেগ বিপর্যস্ত স্খলিত কণ্ঠে বললেন।
তাঁর মনোভাব হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ কি? হিন্দু বেগের কথায় বাবরের হৃদযে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছিলো যদিও নিজেকে সংযত করে শান্ত কণ্ঠে বলার যত্ন করে বললেন- দৌলত খাঁ কয়েক মাস আগে তাঁর পুত্রকে আমার নিকট আলোচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আমি দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার সিদ্ধান্তে সেও সহমত প্রকাশ করে এসেছে। দৌলত খাঁর সাথে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনিও আমার নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন। দৌলত খাঁ একজন প্রবীণ ব্যক্তি। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে আমি তাঁর প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে এসেছি। এখন তাঁর এ রকম হঠকারিতার কারণ কি?
কিছুদিন আগেও সব ঠিকই ছিলো। কিন্তু এখন দৌলত খাঁ সেসব কথা ভুলে গেছেন। বর্তমান তিনি কটিদেশে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর এই আচরণের উদ্দেশ্যও তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেছেন। তরবারি দু'টির একটি আপনার জন্য এবং অন্যটি ইব্রাহীম লোডীর জন্য। সময় সুযোগ পেলেই তিনি তরবারি দু’টির সদ্ব্যবহার করার জন্য বদ্ধপরিকর।
দিলোয়ার খাঁও আমাদের সাথে শত্রুতা করবে নাকি?
না না, দিলোয়ার খাঁ আমাদের পক্ষেই রয়েছে। আমাদের সাথে বুঝাপড়ার কথা সে ভুলেও যায়নি। সে বিনাযুদ্ধে লাহোর আমাদের হাতে সঁপে দিতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তার জন্যই আমি আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি,জাহাপনা। সে তাঁর পিতৃর চক্রান্তের কথা আমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলো। না হলে আমি দৌলত খাঁর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হতাম না। অবশ্যে দৌলত খাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র গাজী খাঁ পিতৃর স্বপক্ষে।
এবং আলম খাঁ ?
আলম খাঁ বর্তমান কিংকর্তবিমূঢ় হয়ে পরেছেন। সে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে ইব্রাহীম লোডীর কাছ থেকে সে শিক্ষা পেয়েছে। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীকে সে বর্তমান যমের মতো ভয় করে। আমার ধারণা, আপনি লাহোর গেলেই সে মনে বল পাবে এবং আপনার বশ্যতা স্বীকার করবে। বর্তমান আমাদের সবচেয়ে প্রধান বাধা হলো গাজী খাঁ। সেনা বাহিনীর উপরে দৌলত খাঁর চেয়ে গাজী খাঁর প্রভাব বেশি। গাজী খাঁকে হারাতে পারলেই যে তাঁর সেনাবাহিনী আমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। হিন্দু বেগ কিছুক্ষণের জন্য থেমে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, আপনি এই দুর্গম পথ দিয়ে আসছেন কেন?
আমরা তো পথ প্রদর্শকের নির্দেশিত পথ দিয়েই আসতেছি। সে আমাদের ভুল পথে এনেছে নাকি?
কোথায় সেই পথ প্রদর্শক? আপনি আমাকে তার সাথে কথা বলতে অনুমতি দিন। বাবরের নির্দেশে তাহিরজান লালচান্দকে ডেকে আনলো।
লালচান্দ হাতীর পিঠে চড়ে বাবরের নিকট এলো। বাবর এবং হিন্দু বেগ ঘোড়ার পিঠে বসে কথা বলছিলেন। সেজন্য লালচান্দ হাতীর পিঠে বসেই বাবরকে অভিবাদন এবং হিন্দু বেগকে নমস্কার জানালো। হিন্দু বেগ হিন্দু প্রথামতে প্রতি নমস্কার জানিয়ে ঘোড়ার পিঠে নড়েচড়ে বসে হিন্দুস্থানী ভাষায় জিঞ্জাসা করলেন- তুমি কোন জায়গার লোক?
আগ্রার হুজুর। লালচান্দ বিনম্রভাবে বললো।
পাঞ্জাব কেন এসেছ?
কাজের সন্ধানে, হুজুর। ক্ষুধা নিবারণ করতে তো কিছু একটা করতেই হয়।
হাতী তোমার নিজের নাকি?
হ্যাঁ হুজুর, নিজের......
এ রকম হাতী থাকতে ইব্রাহীম লোডীর সেখানে কাজ করলে না কেন?
তিনি খুব কৃপণ লোক, হুজুর। সোনা-দানা তিনি শুধু সিন্দুকে জমা করতেছেন। সেগুলো তিনি খরচ করতে চান না।
তুমি একেবারে সত্যি কথা বলেছ। হিন্দু বেগ লালচান্দের মনের খবর নিতে তার সাথে সহমত প্রকাশ করে বললেন- আমি নিজেও ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর সংগ ত্যাগ করে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। ইব্রাহীম লোডীর পিতৃ সিকন্দর লোডী আমার পিতৃর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা অভিযোগ এনে হাতীর পা-র নিচে ফেলে দিয়েছিলেন এবং হাতী আমার পিতৃকে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করেছিলো। আমিও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি নিজের চোখেই সেই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি এখন পর্যন্ত সেই দৃশ্য ভুলতে পারিনি। এখনও আমার চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই ভয়াবহ দৃশ্য।
হিন্দু বেগ আশা করা মতেই লালচান্দের চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ প্রকট হয়ে উঠলো। সে জিজ্ঞাসা করলো- আপনি ক্ষত্রিয় নাকি?
হ্যাঁ আমি ক্ষত্রিয়। আমার প্রকৃত নাম ইন্দার সিং। হিন্দু বেগ ইশারায় বাবরকে দেখিয়ে বললেন- জাহাপনা আমাকে হিন্দু বেগ বলে সম্বোধন করেন। বর্তমান সবাই আমাকে এই নামেই সম্বোধন করতে পসন্দ করে। হিন্দু বেগ এভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে লালচান্দের নাম জানতে চাইলেন- আচ্ছা, তোমার নাম কি?
লালচান্দ। লালচান্দ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো।
আচ্ছা লালচান্দ, ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে বর্তমান কে আমাদের রক্ষা করতে পারবে?
লালচান্দ চিন্তাভাবনা না করেই ফট করে উত্তর দিলো- ভগবান।
ভগবান তো নিজে কিছুই করেন না। তিনি মানুষের দ্বারা কাজ করান। তোমার মতে সেই মানুষ কে হতে পারে?
লালচান্দ চিন্তামগ্ন হলো। সে হিন্দু বেগের প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না।
লালচান্দকে চিন্তামগ্ন দেখে হিন্দু বেগ তার মনের ভাব জানার জন্য টোপ ফেললেন- দৌলত খাঁ এ রকম কাজ করতে পারবে নাকি?
লালচান্দ টোপ গিললো। সে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে বললো- দৌলত খাঁ একজন দয়ালু শাসক, কিন্তু গাজী খাঁ দৌলত খার চেয়েও ভালো।
হিন্দু বেগ ঘণিষ্ট হওয়ার জন্য নিম্নস্বরে বললেন- সত্যি কথা বল, তুমি বাবরকে এই দুর্গম পথে এনেছ কেন?
গাজী খাঁর এ রকমই নির্দেশ ছিলো। লালচান্দ গর্বিত কণ্ঠে বললো।
হিন্দু বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু গাজী খাঁ এই দুর্গম পথ দিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়ার কারণ কি?
লালচান্দ বাবরের দিকে লক্ষ্য করেই পুনরায় হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বললো- এদের জন্য এটাই উত্তম পথ।
এরা তোমার কি ক্ষতি করেছে?
আমাদের জন্য ইব্রাহীম লোডীই যথেষ্ট। এখন আরও একজন অত্যাচারি আসতেছে। সেও একজন বিদেশী।
গাজী খাঁ তোমার সাথে ছলনা করেছে। হিন্দু বেগ নিজের ধারণা ব্যক্ত করলেন।
লালচান্দ সচকিত হয়ে উঠলো। হিন্দু বেগের কথায় সে হিন্দু বেগকে বাবরের সমর্থক বলে বুঝতে পারল। সে হঠাৎ তার হাতীটিকে লতা-পাতার মাঝে ঠেলে নিয়ে বললো- এরা বিদেশী- আক্রমণকারী। এরা জল্লাদ। এরা গতবছর আমাদের তিন হাজার সেনা হত্যা করেছে। সহর, গ্রাম লুটপাট করে লোকদের সর্বস্বান্ত করে গেছে। এরা আমাদের দেশের শত্রু—এরা হত্যাকারী জল্লাদ।
এভাবে বলেই লালচান্দ হাতী গভীর অরণ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগলো।
বাবর কিছু দূরে ছিলেন। লালচান্দ পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করা দেখে হিন্দু বেগ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, লালচান্দকে বন্দি করার আদেশ দিন। এ আমাদের শত্রু। গাজী খাঁর নির্দেশে এ আপনাদের ভুল এবং দুর্গম পথে এনেছেন, জাহাপনা।
বাবরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ক্ষোভ আক্রোশে তাঁর সিরা-উপসিরাগুলো স্ফীত হয়ে উঠলো। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে আদেশ দিলেন- ধর, এই বিশ্বাসঘাতককে ধরে ফেল। সে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী সেনা লালচান্দের পেছনে পেছনে ধেয়ে গেলো। তিনজন অশ্বারোহী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাতীটাকে ঘিরে ধরলো।
লালচান্দ হাতীর কানের কাছে মুখ এনে অশ্বারোহী সেনাদের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে কিছু বললো। সাথে সাথে হাতীটিকে ঘিরে দাঁড়ানো অশ্বারোহীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতী তিনজনের দুজনকে শুঁড় দিয়ে প্রহার করে মাটিতে ফেলে দিলো। তাদের দুজনের অবস্থা দেখে পেছনে পেছনে ধেয়ে আসা বাকি অশ্বারোহীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে থাকা অন্যজন অশ্বারোহী ভয়বিহ্বল হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অরণ্যের মাঝে অদৃশ্য হয়ে পড়লো।
অন্যান্য অশ্বারোহী সেনারা নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে ‘ধর ধর, মার মার’ বলে চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো। সমবেত কণ্ঠের চিল্লাচিল্লিতে হাতীটা ক্রমে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। হাতীটা গগন ফাটানো নিনাদ করে গাছের শাখা-প্রশাখা, ডাল-পাতা ভেঙ্গে, পা দিয়ে মাড়িয়ে অরণ্যের গভীরে ঢোকে গেলো।
তীরন্দাজ সেনারা ডাল-পাতা ভাঙার শব্দ লক্ষ্য করে অবিরাম তীর বর্ষণ করতে লাগলো। কিন্তু ঘন অরণ্য, ডাল-পাতার প্রাচীর ভেদ করে মাত্র দু’টি শর হাতীর শরীরে আঘাত করতে সক্ষম হলো। বাকিগুলি শর গাছ-লতায় লেগে হাতী পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রয়ে গেলো। দু’চারটে শরে হাতীর কোনোরূপ ক্ষয়ক্ষতি করতে পারল না।
ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি তোপধারী সেনাদের তোপ দাগতে নির্দেশ দিলেন। পাথরে ঘষে আগুন জ্বালিয়ে তোপের শলতেয় আগুন ধরাতে ধরাতে হাতী তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যেতে সক্ষম হলো।
বাবর ক্ষোভে জ্বলে উঠলেন। আহত সিংহের মতো নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি গর্জে উঠলেন- আহত সেনা দুজনকে গাড়ীতে তুলে নাও এবং আহত ঘোড়া দু'টিকে মেরে ফেল। এভাবে আদেশ দিয়েই তিনি দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করে বললেন- সেই বদমাশ তার বেইমানীর শাস্তি পেতেই হবে। পুনরায় তিনি সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেন- যাও, বন-জংঘল ঘিরে ফেল। সে যাতে কোনোমতেই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ অনুসারে একদল অশ্বারোহী লালচান্দকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু লতা-পতা, কাদার জন্য তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা লালচান্দের সন্ধান বের করতে সক্ষম হল না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তারা নিজের দলের সন্ধানে ফিরে এলো।
সন্ধ্যের আগে আগে হিন্দু বেগ সেনাসহ বাবরকে একটি শ্যামল প্রান্তরে নিয়ে এলেন। পথশ্রমে শ্রান্ত ক্লান্ত সৈনিকেরা তাঁবু খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে লালচান্দকে খুঁজতে যাওয়া অশ্বারোহীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
অশ্বারোহী কয়জন সন্ধ্যের পর পরই তাঁবুতে ফিরে এলো। তাদের জামা-কাপড় ফেটে-ছিঁড়ে গিয়েছিলো এবং ঘোড়াগুলো কাদায় লুটোপুটি হয়ে পরেছিলো। ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে তারা কোনোমতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলো।
সকাল বেলা দৌলত খাঁ লোডী এবং দিলোয়ার খাঁ লোডী পঞ্চাশজনের একটি ছোট সেনাদল নিয়ে বাবরের ছাউনিতে উপস্থিত হলেন। বাবরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পহরারত সৈনিকেরা তাঁদের ছাউনির ভেতর প্রবেশের অনুমতি দিলো। দৌলত খাঁ এবং দিলোয়ার খাঁ সেনাসহ ছাউনির ভেতর প্রবেশ করলেন। বাবর শুধু দিলোয়ার খাঁকে তাঁর তাঁবুতে ডেকে পাঠালেন। দৌলত খাঁ তাঁর সেনার সাথে তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দিলোয়ার খাঁকে বেগদের মাঝে বসিয়ে বাবর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসার পরে সরাসরি অভিযোগের সুরে বললেন- জ্বনাব, আপনার পিতৃকে আমি নিজের পিতৃর মতো সন্মান করি; অথচ তিনি সন্ধির শর্ত ভংগ করে আমার সাথে বেইমানী করলেন কেন? কি কারণে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে চাইছেন? এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা না বলে কী বলব?
বাবরের কর্কশ প্রশ্নে দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো। পিতৃকে দোষমুক্ত করার জন্য তিনি আমতা আমতা করে বললেন- জাহাপনা, পিতার অবশ্যে তেমন দোষ নেই। ভ্রাতৃ গাজী খাঁ পিতাকে ভুল পথে পরিচালনা করতেছেন। লাহোরে অন্য কোনো শাসক এলে লাহোরের ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে চলে যাবে বলে তিনি পিতৃকে ভয় দেখাচ্ছেন। ইব্রাহীম লোডীর মতো আপনিও যে আমাদের একজন শত্রু এই কথা প্রতিপন্ন করার জন্য তিনি অহরহ চেষ্টা করতেছে। ফলে পিতা বর্তমান মনের স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছেন। কোনটা ভালো এবং কোনটা মন্দ এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পেরে তিনি বর্তমান উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছেন।
এবং উন্মাদপ্রায় হয়ে প্রবীণ ব্যক্তি দৌলত খাঁ আমাদের ভুল পথে নিয়ে আসার জন্য একজন মিথ্যুক পথপ্রদর্শক আমাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন, আমরা যাতে গভীর অরণ্যের ফাঁদে বন্দি হয়ে মরে থাকি তারজন্যই নাকি?
না না জাহাপনা, পিতৃ এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এ নিশ্চয় গাজী খাঁর চক্রান্ত! পিতৃ স্বয়ং এ রকম চক্রান্ত করলে নিশ্চয় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন না। জাহাপনা, আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পিতা তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পিতার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তিনি এখন মোটেই রক্তপাত পছন্দ করেন না। আপনি বিশ্বাস করুন জাহাপনা, আপনি লাহোর যাওয়াটা পিতা মনে-প্রাণে কামনা করেন। দিলোয়ার খাঁ অনুনয় বিনয় করে বললেন- আপনি পিতাকে দয়া করুন, জাহাপনা।
বাবরের মুখমণ্ডল কঠোর হয়ে উঠলো। তিনি দিলোয়ার খাঁর দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- দয়ার যোগ্য শুধু আপনি, জ্বনাব দিলোয়ার খাঁ; আপনার পিতা নয়। আপনার পিতৃ সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। শত্রুকে শাস্তি এবং মিত্রকে সহায় করার জন্য হজরত মহম্মদ(ছাঃ) আমাদের উপদেশ দিয়ে গেছেন। এটা নিশ্চয় আপনি অবগত। বাবর নিজের দেহরক্ষী সর্দারকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুনেছি দৌলত খাঁ কয়েক দিন যাবত কোমড়ে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! আমি দৃশ্যটা একটু দেখতে চাই। আপনি যান, তাঁর পছন্দের জায়গায় তরবারি ঝুলিয়ে এখানে নিয়ে আসুন।
আদেশ প্রতিপালিত হলো। দু’জন মজবুত সেনা দৌলত খাঁর দুই বাহুতে ধরে তাঁবুর ভেতর নিয়ে এলো। দৌলত খাঁ সেনা দু’জনের হাতের মুঠো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করছিলেন। ফলে তাঁর গলায় ঝুলানো তরবারি দু’টি পরস্পরের সাথে ঠেকা খেয়ে ধাতব শব্দ করতেছিলো। দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করে উপস্থিত বেগবর্গ একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগলেন।
দৌলত খাঁ বাবরের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সাথে চিৎকার করে বলতে লাগলেন- আমাকে এখানে কেউ বন্দি করে আনেনি। আমি নিজ ইচ্ছায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। আপনি আমার সাথে বেইমানী এবং দুর্ব্যবহার করছেন।
বেইমানী কে করছে? আমি, না আপনি? বাবর গর্জে উঠলেন- হিন্দু বেগ যখন আমার আজ্ঞা নিয়ে আপনার নিকট গিয়েছিলেন, তখন আপনি তাঁকে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং গাজী খাঁ আমাদের মারতে কাদাময় গভীর অরণ্যের মাঝে ঠেলে দিয়েছিলো। গাজী খাঁ আপনার পুত্র। সে কার নির্দেশে এরকম কাজ করেছে? সেই পরামর্শ দাতা আপনার বাহিরে অন্য কেউ নয়। আপনি আমাদের সাথে বেইমানী করেছেন। বেইমানের সাথে আমরা বেইমানী-ই করি। বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে নিজের উজির-এ-আজম দুলহায়কে উদ্দেশ্য করে বললেন- জ্বনাব, আপনি একেঁ এর বংশধরসহ বন্দি করে ভীরা পাঠিয়ে দিন এবং মিলবত দূর্গে বন্দি করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠান। এদেঁর অনুপস্থিতিতেও আমরা যুদ্ধের কাজ চালাতে পারব।
আশ্চর্যচকিত দৌলত খাঁর হাত-পা শিথিল হয়ে এলো। তাঁর পা দু'টি নিজের দেহের ভার বহন করতে অসমর্থ হলো। তিনি মাটিতে লেপটে বসে পড়লেন।
দু’জন সেনা দৌলত খাঁকে টেনে-হিঁচড়ে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলো।
অন্য দু'জন সেনা দিলোয়ার খাঁর পেছনে এমনভাবে এসে দাঁড়ালো যেন তারা মাটি ফুটে বেরিয়ে এলো।
দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডলও পাংশুবর্ণ ধারণ করলো।
এর পরে কয়েকদিনের কষ্টকর যাত্রার পর বাবর সসৈন্যে পাঞ্জাব এসে পৌঁছোলেন। পাঞ্জাব অধিকার করে গাজী খাঁকে বন্দি করে পাঞ্জাবের শাসনভার তিনি নিজের হাতে আনলেন।
পাঞ্জাব অধিকার করার কয়েকদিন পরে বাবর দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবরের এই মনোভাবের সংবাদ পেয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য দাউদ খাঁ এবং হামিদ খাঁর নেতৃত্বে বিপুল সেনা পঞ্জাব অভিমুখে পাঠালেন। বাবর অতি সহজেই লোডী বাহিনীকে পরাজিত করে রূপার, আম্বালা প্রভৃতি স্থান দখল করতে সক্ষম হলেন।
কিন্তু পথশ্রমের ক্লান্তি এবং উপর্যুপরি যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার জন্য বাবর সেনা ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে বাবর সেনাবহিনীকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য দিল্লী অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখলেন। দিল্লী অভিযান স্থগিত রেখে তিনি সেনাবাহিনী সুবিন্যস্ত করার জন্য মনোনিবেশ করলেন।
* * *
শীতের শেষে বসন্তের আগমন হলো। বসন্তের আগমনের সাথে সাথে গাছ-লতায় নতুন পল্লব অঙ্কুরিত হলো। প্রকৃতি হিন্দুস্থানের বিশাল বিস্তৃত প্রান্তরে বিছিয়ে দিলো সবুজ শ্যামল চাদর। শ্যামল রূপ ধারণ করলো সর্বত্র। প্রকৃতি হয়ে উঠলো উদ্ভিন্ন যৌবনা। দিকে দিকে ফুটে উঠলো নানান রঙের ফুল। ভোমোরার গুঞ্জন, পক্ষীর কলরবে মুখর হয়ে উঠলো ধরণী।
ঠিক এমনি একটি সময়ে বাবর সসৈন্যে ভীরা থেকে পানীপত অভিমুখে যাত্রা করলেন।
বাবর অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন।
অবশেষে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা এসে এসে দিল্লী থেকে পঞ্চান্ন মাইল উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত পানীপত নামক স্থানে এসে পৌঁছোলেন। বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছাউনি পেতে আসন্ন নির্ণায়ক যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
সেদিকে আগ্রা থেকে এক লক্ষ সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য পানীপত অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন।
ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে অসংখ্য যোদ্ধা হাতী ছিলো এবং তাঁর মনোবলো ছিলো যথেষ্ট উন্নত। কারণ গত বছর আলম খাঁ, দিলোয়ার খাঁ এবং অন্যান্য দেশীয় রাজার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দিল্লী সীমান্তে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে সন্মিলিত বাহিনীর চল্লিশ হাজার সেনার বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর জয় হয়েছিলো।
বর্তমান ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে এক লক্ষ সেনা। বিপরীত পক্ষে বাবরের বাহিনীতে মাত্র বার হাজার সেনা। সেনার দিক থেকে ইব্রাহীম লোডী যথেষ্ট উপরে। তদুপরি বাবরের বাহিনীতে না থাকা অগণন যোদ্ধা হাতী ছিলো ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে।
ইব্রাহীম লোডীর বিশাল সেনা বাহিনী এবং যোদ্ধা হাতীর কথা শুনে বাবরের অনেক সেনা ভয়বিহ্বল হয়ে পড়লো। তারা পরস্পরের মাঝে আলোচনা করতে লাগলো- আমরা আসন্ন যুদ্ধে পরাজিত হলে হিন্দুস্থানের এই বিশাল ভূ-খণ্ড থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেও লাভ হবে না। কারণ লুকিয়ে লুকিয়ে গেলেও শত্রুসেনার হাতে ধরা পড়তে হবে। সেজন্য আমরা প্রাণপণে যুদ্ধ করে শত্রুসেনাদের পরাজিত করার বাহিরে অন্য কোনো উপায় নেই।
কিছুসংখ্যক সেনার বাহিরে অধিকাংশ সেনার বাবরের যুদ্ধের অনুভব এবং রণকৌশলের উপরে অগাধ আস্থা ছিলো। ওস্তাদ আলীকুলির তোপ এবং বন্দুকের উপরেও প্রগাঢ় ভরসা ছিলো অধিকাংশ সেনার। ইব্রাহীম লোড়ীর হাতী থাকলেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তদুপরি ইব্রাহীম লোডীর সেনার চেয়ে বাবর বাহিনীর আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং পারদর্শিতা অনেক গুণে বেশি ছিলো।
হাতীর প্রতি অবশ্যে বাবর সেনার ভয়ভাব ছিলো। কারণ দৈহিক বল এবং তরবারি দিয়ে সেই অতিকায় প্রাণীর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনমতেই সম্ভব হবে না বলে সবাই অবগত ছিলো। কিন্তু সেনাদের আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, তোপ এবং বন্দুক দিয়ে
অতিকায় প্রাণীটাকে ঘায়েল করতে সক্ষম না হলেও ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব হবে। সাধারণতঃ তখন হিন্দুস্থানের যুদ্ধের পরিণাম হাতীর উপরে নির্ভরশীল ছিলো। তোপ এবং বন্দুক দিয়ে হাতী তাড়িয়ে পাঠাতে পারলে যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা অসম্ভব হবে না বলে বাবর সেনার ধারণা ছিলো।
বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী একখণ্ড স্থান যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করলেন। কারণ স্থানটুকু ছিলো প্রশস্ত এবং উন্মুক্ত। তোপ এবং গুলি বর্ষণের জন্য প্রশস্ত উন্মুক্ত স্থান বেশি সুবিধাজনক।
পর্যাপ্ত সময় থাকতেই বাবর যুদ্ধের সকল প্রকার আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুললেন। যুদ্ধ কৌশল, সেনা পরিচালনা এবং আত্মরক্ষার প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি দিক তন্ন তন্ন করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে বাবর সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেন। শত্রুসেনার ইচ্ছানুসারে যাতে যুদ্ধ করতে না হয় তারও তিনি ব্যবস্থা করলেন।
সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে বাবর যুদ্ধের অনুশীলন করতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুসারে সেনারা নিজের নিজের কৌশল অনুশীলন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তোপ এবং বন্দুকধারীরা তোপ এবং বন্দুক পরিচালনা, তীরন্দাজসকলে তীর পরিচানার অভ্যাস করতে লাগলো। বাবর পদাতিক সেনাদের জন্য এক অভিনব যুদ্ধ কৌশল উদ্ভাবন করলেন। সেনাদের সেই অভিনব কৌশল অনুশীলন করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বাবরের বাহিনীতে সাতশ গাড়ী ছিলো। গাড়ীগুলো টিলার উপরে তুলে এনে গরুর চামড়ার মজবুত রশি দিয়ে একটার পর একটা বেঁধে অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে স্থাপন করা হলো। গাড়ীগুলো যাতে গড়িয়ে যেতে না পারে তারজন্য চাকার নিচে গাছের ডালের গোঁজ গুঁজে দেওয়া হলো। গাড়ীর সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে অনেক খালী জায়গা ছিলো। তীর যাতে ভেদ করে আসতে না পারে তারজন্য সেই সব খালী জায়গায় লোহার অভেদ্য ঢাল খাঁড়া করে দেওয়া হলো।
অভিনব সেই যুদ্ধ কৌশল সম্পূর্ণ হয়ে উঠলো। এখন বাকি রইল শুধু একটি কাজ। যুদ্ধ সঞ্চালন করা নায়কের নির্দেশে গাড়ীর চাকার নিচের গোঁজগুলো একসাথে সরিয়ে নিতে হবে এবং গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে সাতশ গাড়ী একসাথে উপর থেকে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে যাবে।
গাড়ীগুলো একসাথে গড়িয়ে দেওয়ার জন্য সংকেতের ব্যবস্থা করা হলো। সেনানায়ক আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে হাত ইশারা করবে এবং তাহিরজান সারির শেষপ্রান্তে গিয়ে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য উচ্চ কণ্ঠে নির্দেশ দিবে।
সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহির বেগ ঘোড়া ছুটিয়ে গাড়ীর সারির একেবারে শেষপ্রান্তে এসে সেনানায়ক আলীকুলি খাঁর সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এদিকে সেনাগুলোও তাহিরজানের ঘোষণার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রইলো। আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো ।
সবার দৃষ্টি আলীকুলীর উপরে নিবদ্ধ হলো। এক সময় আলীকুলি খাঁ হাত ইশারা করলো। সাথে সাথে তাহির বেগ উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো- গোঁজগুলো সরিয়ে নাও।
নির্দেশানুসারে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়া হলো। সাথে সাথে গাড়ীগুলো নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু আশা করা মতে গাড়ীগুলো সমানে সমানে গড়িয়ে গেলো না। কিছু সংখ্যক গাড়ী বেশি এগিয়ে গেলো এবং কিছু সংখ্যক পিছিয়ে পড়লো। কয়েকটা গাড়ী আবার রশি ছিঁড়ে পংক্তিচ্যুত হলো। কয়েকটার আবার গাড়ীর সাথে বাঁধা ঢালগুলো উলটে গেলো।
বাবর পেছনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন প্রত্যক্ষ করছিলেন। গাড়ীগুলো বিশৃংখল হয়ে পড়া দেখে তিনি আদেশ দিলেন- ওস্তাদ আলীকুলি, রশিগুলি না ছিঁড়া পর্যন্ত এবং গাড়ীগুলি উলটে না যাওয়া পর্যন্ত অনুশীলন অব্যাহত রাখুন।
সেনারা ঘেমে-জেমে আবার গাড়ীগুলি আগের জায়গায় আনলো।
কয়েকজন সেনা পরিশ্রমের ফলে একেবারে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। তারা এই পরিশ্রম থেকে শরীর বাঁচিয়ে চলার জন্য চেষ্টা চালালো। সর্দাররা তাদের গালাগাল দিতে লাগলো। আলসে কয়েকজন সেনাকে মারধোর পর্যন্ত করা হলো।
বাবর সেনাদের অমনোযোগিতা প্রত্যক্ষ করে নির্মমভাবে আদেশ দিলেন- অনুশীলনের সময়ে কাউকে অনুগ্রহ করা হবে না। কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।
এভাবে নির্মম আদেশ দিয়েই তিনি পরিখার কাজের অগ্রগতি নিরীক্ষণ করতে চলে গেলেন।
তিনবার অনুশীলন করার পরে গাড়ীগুলো ঠিক-ঠাক মতো গড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো।
কিছুসংখ্যক সেনা নদীর পাড়ে পরিখা খনন করছিলো। একটি হাতী অনায়াসে যাতে ঢোকে যেতে পারে তেমন প্রশস্ত এবং গভীরভাবে খনন করা হয়েছিলো পরিখা গুলি। পরিখা খননের পরে উপরে ডাল-পাতা বিছিয়ে দেওয়া হলো। পরিখার চিন-ছাপ লুকোনোর জন্য ডাল-পাতার উপরে মাটি চাপা দেওয়া হলো।
তাহির বেগ দেহরক্ষীর সর্দার হওয়ার জন্য সব সময় সে বাবরের সাথেই থাকতো। ডাল-পাতা এবং মাটি চেপে পরিখা ঢেকে দেওয়ার পরে তাহির বেগ পরিখার দিকে তাকিয়ে ভাবলো- শত্রু যদি এদিক দিয়ে আক্রমণ করতে আসে খুব মজা হবে! তবে এদিক দিয়ে না এসে যদি অন্য দিক দিয়ে আসে, তাহলে সব পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বাবর কিন্তু সকল বিষয়ের উপরে সমানে দৃষ্টি রাখছিলেন। গুপ্তচরদের মুখ থেকে তিনি অবগত হয়েছিলেন যে, পানীপতের দুই দিকে গভীর অরণ্য এবং কাদাময়। ডানদিকে যমুনা নদী। একদিকে ঘন বসতিপূর্ণ পানীপত সহর। সহরের শত শত অলি-গলি। অলি-গলিগুলিতে প্রতিনিয়ত অগণন লোক চালাচল করে। সেজন্য শত্রুসেনা সহরের মধ্য দিয়ে আসা সম্ভব হবে না। একমাত্র সন্মুখ দিক দিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ পরিখা পার হয়ে আসতে হবে। এই সব দিক ভেবেচিন্তেই বাবর পরিখা খননের কথা ভেবেছিলেন।
অবশেষে প্রতীক্ষিত দিন এলো। উভয় পক্ষের সেনা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলো। সেটা ছিলো পনের শ ছাব্বিশ সালের একুশ এপ্রিল। উক্ত দিনটি ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত পানীপত যুদ্ধ নামে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সেদিন সূর্যটা যমুনা নদীর বামপাড়ে উদয় হয়ে ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা প্লাবিত করে তীরবেগে নিজের শীর্ষবিন্দুর দিকে এগিয়ে আসছিলো। সূর্যের সাথে সাথে পিঁপড়ার জাঙ্গালের মতো এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। দূর থেকে দেখে অনুমান হচ্ছিলো যে, চলন্ত সাগর একটি যেন বাবরের বার হাজার সেনাকে বানের মুখে ধৌত করে নিতে এগিয়ে আসছে। অগণন সেনার জন্য মাটি পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে পড়েছিলো এবং চলন্ত হাতী শুধু জাহাজের মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।
বাবর একটি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে হিন্দুস্থানী সেনার গতিবিধি মনযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে ছিলেন। টিলার উপর থেকে শত্ৰুসেনার আকার-প্রকার বাবরের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। সেজন্য তাঁর অনুমান হলো, চলন্ত প্রান্তর একটি যেন তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে।
ইব্রাহীম লোডী সেনার আধিক্য দেখে বাবরের মতো সিংহ পুরুষের অন্তরেও ভয় সঞ্চার হলো। উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।
বাবর ভাবতে লাগলেন- ওই হাতীগুলোর কোনো একটিতে আরোহণ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বিশাল হাতীটির পিঠে বসেই হয়তো সে সমগ্র রণভূমি নিরীক্ষণ করতেছে। হয়তো সে বাবর সেনার সংখ্যালঘুত্ব প্রত্যক্ষ করে হাতীর পিঠে বসেই পৈচাশিক উল্লাসে নৃত্য করছে।
শত্রু সেনা ধীরে ধীরে নিকটে চেপে এলো। কিন্তু বাবর আগের মতোই শান্ত ও সংযতভাবে টিলার উপরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
গাড়ী এবং ঢালের মজবুত দেয়াল নির্দেশের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলো। বাবরের অন্যান্য সেনাও নিজ নিজ দায়িত্ব দক্ষতা সহকারে সম্পন্ন করার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো। সবার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিলো। সিরা-উপসিরাগুলো টনটন করতেছিলো। নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে শত্রুসেনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সবাই ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করছিলো।
বাবর সেনার ডান দিকের নায়ক ছিলেন শাহজাদা হুমায়ূন। পিতৃর মতোই হুমায়ূন বুদ্ধিমান ও সাহসী। তাঁর সাথে ছিলো, কালা বেগ, হিন্দু বেগ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত সেনা নায়কগণ।
সেনাগুলো অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলো। সারির মাঝভাগে ছিলো তোপধারী, বন্দুকধারী, তীরন্দাজ ও মজবুত অভিজ্ঞ পদাতিক সেনা। সারির দুই দিকে তুফানি হামলার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো অশ্বারোহী সেনা।
সন্মুখের দিক থেকে ধীর মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। সেনাদলের অগ্রে অগ্রে আসছিলো বিশালাকায় যোদ্ধা হাতীর ঝাঁক। হাতীর ঝাঁকের অগ্রে অগ্রে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর বিশালাকায় হাতী। ইব্রাহীম লোডীর পেছনে পেছনে আসছিলো প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পদাতিক সেনা। কম পরিসরে অধিক সেনা একসাথে আসার জন্য তারা ঠেলাঠেলি করে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফলে তাদের গতি মন্থর হয়ে পড়ছিলো।
তাহির বেগ কয়েকজন দেহরক্ষীর সাথে বাবরের পরিজনবর্গ থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
বাবরের থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো বাবর এবং সেনার সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী সংবাদবাহক সেনা। বাবর তাদের প্রয়োজন সাপেক্ষে নির্দেশ দিয়ে চলছিলেন। তাঁর নির্দেশের সুর ছিলো আত্মবিশ্বাসপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট।
শত্রুসেনার দিকে তাকিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা এক সময় বাবরের জন্য অসহ্যকর হয়ে উঠলো। বেগবর্গও শত্রুসেনাদের বাধা প্রদানের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলো। কিন্তু বাবর অধৈর্য বেগবর্গ এবং সেনাদের শান্তশিষ্ট গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সাবধান করতে লাগলেন- ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন, কেউ এগিয়ে যাবেন না।
ইব্রাহীম লোডী লক্ষ্য করলেন, বাবর সেনা গাড়ী এবং ঢালের দেয়ালের পেছনে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ এগিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছে না। বাবর সেনার নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যক্ষ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনাদের থামতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পেয়ে চলন্ত জনসমূদ্র নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনা নায়কদের সাথে পরামর্শ করে সেনাদের ডান দিকে ঘুরতে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ এই কারণেই দিলেন যাতে মূল আক্রমণ মধ্যভাগে না করে প্রতিপক্ষের ডান দিকে করতে পারে। ডান দিক ভেদ করে সহরের দিক থেকে বেরিয়ে এসে যাতে প্রতিপক্ষ সেনারা গাড়ী নিয়ে অবস্থানরত টিলাটি ঘিরে ফেলতে পারে।
কিন্তু এক লক্ষ সেনা শৃংখলাবদ্ধভাবে পরিচালনা করাটা সহজ কাজ ছিল না। নির্দেশ জারি করে থাকতেই কিছু সেনা বাবর সেনার ডান দিক লক্ষ্য করে ঘুরলো যদিও অধিক সংখ্যক সেনা ঘুরলো সহরের দিকে। ফলে সেনা বাহিনীতে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হলো। বিশৃংখল সেনা শৃংখলাবদ্ধ করতে ইব্রাহীম লোডীর অনেক সময় অপব্যয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর সেনা বিশৃংখল হওয়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। প্রতি আক্রমণের জন্য দুই হাজার অশ্বারোহী প্রতিপক্ষ সেনার বাম দিকে পাঠিয়ে দিলেন।
অশারোহী সেনা তীব্র গতিতে এগিয়ে এসে কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থানরত ইব্রাহীম লোডীর পদাতিক সেনা এবং হাতীর পেছন দিকে এলো।
অন্যদিকে হুমায়ূনের অশ্বারোহী বাহিনী প্রতিপক্ষকে ঘিরে ধরে তাদের পুনর্গঠনে বাধা প্রদানের জন্য এগিয়ে এলো।
বাবর পূর্বের যুদ্ধের জয় এবং পরাজয়ের সব অভিজ্ঞতা পানীপতের যুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো, প্রতিপক্ষকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত যোজনা ভেঙে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বাস্তবেও বাবর সেটাই করলেন। ঘিরে ধরা সেনার থেকে ঘিরে ফেলা সেনার সংখ্যা অনেক বেশি ছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা ঘিরে ধরা সেনার বেষ্টনি ভেঙে কখনও ডান দিকে, কখনও আবার বাম দিকে বের হয়ে আসতে লাগলো।
এর মধ্যেই বাবর একটি কৌশল করলেন। তিনি নিজের বাহিনীর কেন্দ্রভাগ খালী করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন দিকে সংকটজনক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করলেই তাদের সহায়ের জন্য কেন্দ্রস্থিত সেনা থেকে ডানে-বামে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেনা প্রেরণ করতে লাগলেন।
বাবর জেনেশুনেই এই কাজ করছিলেন। কেন্দ্র থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো দুটি। প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রস্থিত সেনার পেছন দিকেই গড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষারত গাড়ী এবং ঢালের দেয়াল ছিলো। সেনা সরিয়ে না নিলে গাড়ী গড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রভাগ দুর্বল করে শত্রুসেনাদের প্রলোভিত করে গাড়ীর সন্মুখে টেনে আনা।
কৌশল কাজে এলো। কেন্দ্রভাগ দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে ইব্রাহীম লোডী নিজের বাহিনীকে টিলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কারণ টিলার উপরেই বাবর দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবরকে আক্রমণ করার জন্য ইব্রাহীম লোডী এই নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে ডানে-বামে এবং পেছন দিকে সংঘটিত আক্রমণ উপেক্ষা করে প্রতিপক্ষ সেনার মুখ্য শক্তি যোদ্ধা হাতী নিয়ে টিলার দিকে অগ্রসর হলো।
প্রতিপক্ষ সেনা টিলার ঢাল বেয়ে কিছু উপরে উঠার পরে বাবর নির্দেশ দিলেন- গাড়ীর চাকার তলের গোঁজগুলি সরিয়ে ফেল।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে পরিকল্পনা অনুসারে একসাথে সাত শ গাড়ীর চাকার তলের গোঁজ সরিয়ে ফেলা হলো। সাথে সাথে একটি সারিতে সাত শ গাড়ী শত্রুসেনার দিকে কালান্তক যমের মতো গড়িয়ে যেতে লাগলো। ঠিক তখনই গর্জে উঠলো, আলীকুলি খাঁর কামান এবং বন্দুকধারীর বন্দুক।
ইব্রাহীম লোড়ীর হাতী এবং পদাতিক বাহিনীর উপরে অবিরাম গুলী বর্ষণ চলতে লাগলো। কামানের শব্দ কানে তালা মেরে ধরলো। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে ফেললো। শত্রুসেনা চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। এদিকে সাত শ গাড়ী ভয়ানক দৈত্যের মতো গড়িয়ে এসে শত্রুসেনার উপরে আঘাত করলো। শত্রুসেনার গগনভেদি আর্তনাদে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুললো। সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেলো ঈস্পিত দৌড়াদৌড়ি— বিশৃংখল পরিস্থিতি।
এই অভিনব আকস্মিক আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না শত্রুসেনা। কামান এবং বন্দুকের কানে তালা মারা শব্দে সেনার পাশাপাশি হাতীগুলিও আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। আহত সেনা এবং আতঙ্কিত হাতীর চিৎকারে যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করতে লাগলো। আহত এবং আতঙ্কিত হাতীগুলো আকাশ-বাতাস কম্পিত করে প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করে ছট্ফট্ করতে লাগলো। মাউত বলপূর্বকভাবে হাতীগুলি এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করাতে হাতীগুলি অধিক উগ্র হয়ে উঠলো। শুরু হয়ে গেলো হাতীর তাণ্ডব। হাতীর পা-র তলে পড়ে ইব্রাহীম লোড়ীর অনেক সেনা চেপটা হতে লাগলো।
কামান এবং বন্দুকের গুলীবর্ষণ অবিরামভাবে চলতে থাকলো। কামানের আঘাতে অনেক হাতী মরলো এবং আহত হলো। টিলার ঢালে অনেক মৃত এবং আহত হাতী পড়ে রইল। এদিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বানের জলের মতো শত্রুসেনা এগিয়ে এসে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে লাগলো।
অবশেষে কামান এবং বন্দুকের গুলীর সন্মুখে শত্রুসেনা তিষ্ঠাতে না পেরে উপায়বিহীন হয়ে বাবর সেনার দিকে পিঠ দিয়ে পতঙ্গের মতো ছিটকে পালাতে লাগলো। দৌড়াদৌড়ি এতো ক্ষিপ্রগতিতে চলছিলো যে, পলাতক সেনার ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গিয়েও ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা আহত ও নিহত হলো। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়েও উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে পালাল।
শত্রুসেনাদের ঘিরে ধরা বাবর সেনা সংখ্যায় অল্প হওয়ার জন্য প্রতিপক্ষের পলাতক সেনাকে বাধা দিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়লো। প্রথমে হাতী ঠেলে-ঠেসে রাস্তা বের করে যেতে লাগলো এবং হাতীর পেছনে পেছনে পালাতে লাগলো পদাতিক সেনা। বাবর টিলার উপরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতেছিলেন। শত্রুসেনাদের পালিয়ে যেতে দেখে তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন- শত্রুসেনা পালিয়ে গিয়ে দিল্লীর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। বাধা দাও। তাদের পালিয়ে যেতে দিও না। ধরে ফেলো।
বাবর এভাবে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়েই সম্পর্ক রক্ষাকারী সৈনিকদের দিকে তাকালো। তিনি দেখলেন সবাই যুদ্ধে ব্যস্ত। তাঁর কথা শুনার জন্য ধারে-কাছে কেউ নেই। সেজন্য তিনি দ্রুত অল্পদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তাহির বেগের নিকটে এলেন।
বাবর তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন-তাহির বেগ, আমি জানতে চাই-- ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, না এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে? যদি সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, তাহলে তার পশ্চাদধাবন করতে সেনা পাঠান। তাকে ধরে আনুন।
তাহির আচ্ছন্নের মতো যুদ্ধের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করতেছিলো। বাবরের আহ্বানে সে সম্বিত ফিরে পেয়ে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র মরণোন্মুখ প্রচণ্ড আর্তনাদ এবং দৌড়াদৌড়িমুখর। শ্বাসরুদ্ধকারী ধোঁয়ার আচ্ছাদনে চারদিক ছেয়ে ধরেছে। সামগ্রিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র তার উপলব্ধিতে নরক সদৃশ অনুমান হলো। দৃশ্য দেখে সে আতঙ্কে শিহরে উঠলো। নিজের দুর্বলতা লুকোতে সে কম্পিত কণ্ঠে আচ্ছন্নের মতো বললো- আপনার আদেশ শিরোধার্য, জাহাপনা।
তাহির বেগের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে একজন সংবাদবাহক ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের নিকটে এসে উল্লসিত কণ্ঠে বললো- জাহাপনা, যুদ্ধে আমাদের জয় হয়েছে। শত্রুসেনা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে যাইতেছে।
ইব্রাহীম লোডীও পালিয়েছে নাকি? সংশয়াহত কণ্ঠে বাবর জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ জাহাপনা, পলাতক হাতীর মাঝে তাঁর কালো কাপড়ের ঝালর পরানো হাতীটাও দেখেছি। সম্ভবতঃ সেও পালিয়েছে।
তাহির বেগ, কাশিমতায় মির্জা কোথায়?
চল্লিশ বছরের কাশিমতায় মির্জা এগিয়ে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালো।
বাবর কাশিমতায় মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ইব্রাহীম লোডী পালিয়ে গিয়ে যদি আগ্রার দূর্গে আশ্রয় নিতে সমর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। আমি বিনাযুদ্ধে আগ্রা দখল করতে চাই। আপনি ইমদাদী সেনা এবং তাহির বেগের অধীনস্থ সেনা নিয়ে শীঘ্ৰে ইব্রাহীম লোডীর পশ্চাদ্ধাবন করুন। প্রয়োজন হলে দিল্লী বা আগ্রা গিয়ে হলেও দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বেই তাঁকে বন্দি অথবা হত্যা করতে হবে। যান, দেরি করবেন না।
কাশিমতায় মাথা নুইয়ে বললো- আমার জীবন বিপন্ন করে হলেও আমি আপনার আদেশ পালন করব, জাহাপনা।
কাশিমতায়, বাবা সোহরা এবং তাহির বেগ ইব্রাহীম লোডীকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু তাঁরা অনেক সময় খুঁজেও ইব্রাহীম লোডীর সঠিক খবর সংগ্রহ করতে সক্ষম হল না। তারা বাবরের নিকটে এসে বললো- ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধে নিহত হয়েছে, না বেঁচে আছে কেউ তার সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। কিন্তু এটা ঠিক যে, সে পলাতক সেনার মাঝে নেই।
ইব্রাহীম লোডীর সঠিক সন্ধান বের করতে না পারলেও যুদ্ধে বাবরের জয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা পালিয়ে গেলো এবং অনেকে বাবর সেনার হাতে বন্দি হলো।
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হয়ে বাবর সদলবলে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। যাত্রার আগমুহুর্তে তিনি সেনাদের সতর্ক করে দিলেন- কেউ যেন কোনো নাগরিকের উপরে জোর-জবরদস্তি না করে।
* * *
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হুমায়ূন একদল সেনা নিয়ে সবার আগে দিল্লী এসে পৌঁছোলেন।
হুমায়ূন দিল্লী এসেই বিনাযুদ্ধে সহর এবং দূর্গের উপরে বিজয় সাব্যস্ত করলেন। ইব্রাহীম লোডীর দিল্লীস্থিত কোষাগারো তিনি দখল করলেন। তার পরে তিনি তিন শ সেনা এবং হিন্দু বেগকে পথপ্রদর্শক হিসাবে নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হলেন।
বিশাল অসীম দেশ এবং বিশাল তার সহর।
দিল্লী সহর ছোট ছোট টিলা দিয়ে ভরা। তবুও অপেক্ষাকৃত সমতল। চারদিকে শ্যামলের সমাহার। অগণন ঘর-বাড়ি।
রাস্তা প্রায় জনশূন্য। দুই চারজন লোক রাস্তায় চলাচল করতে দেখা গেলো। পানীপত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর পরাজয়ের সংবাদ ইতিমধ্যে সহরে প্রচার হয়ে গিয়েছিলো। ফলে জনতা সম্ভবত বিদেশী আক্রমণকারীর ভয়ে গৃহের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে দুয়ার-খিড়কির ফাঁক দিয়ে সহরের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে ছিলো।
পবিত্র যমুনা নদীর পাড়ে একদল মানুষ দেখা গেলো। তাঁরা মৃতকের দাহ-সৎকার করতে ছিলেন। তাঁদের পাশে লেলিহান শিখা মেলে আগুন(চিতা) জ্বলতেছিলো। লোকগুলি দাহ-সৎকারে ব্যস্ত। ইহলোকের প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ ছিল না। বিদেশী সেনার প্রতি লক্ষ্য করার মানসিকতা বা অবসর কোনটাই যেন ছিল না তাদের।
হুমায়ূন কৌতূহলী দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকালেন।
হুমায়ূনের মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে হিন্দু বেগ কথাটা বুঝিয়ে বললেন- হিন্দু প্রথামতে মৃতককে চিতার উপরে শোইয়ে ঘৃতাদি ঢেলে অগ্নি প্রজ্বলন করা হয়। অগ্নির দহনে নশ্বর দেহ পোরে ছাই হয়ে যায় এবং আত্মা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। ছাইগুলি প্রবাহিত নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
হুমায়ূন এসে এসে একটি বাজারে উপস্থিত হলেন। কয়েকজন মহিলা এবং ছেলে-মেয়েদের ফুল নিয়ে খেলে থাকা প্রত্যক্ষ করলেন। তাদের পা-গুলো খালী। পাকা চুল এবং দাড়িবিশিষ্ট কয়েকজন লোকও ফুল হাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের পা-গুলোও খালী। হুমায়ূনের জন্য সেটা ছিলো এক অভিনব দৃশ্য। তিনি আবার কৌতূহলী হয়ে হিন্দু বেগের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন।
হুমায়ূনের পেছনে পেছনে আসা হিন্দু বেগ হুমায়ূনের দৃষ্টির অর্থ উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- শাহজাদা, আমরা সহরের একটি বড় বাজারে এসেছি।
আজ ঈদ নাকি? এতো ফুল নিয়ে লোকগুলো কোথায় যাচ্ছে? হুমায়ূন জিজ্ঞাসা করলেন।
না শাহজাদা, আজ ঈদ নয়। ফুল নিয়ে লোকগুলো পূজা করতে মন্দিরে যাচ্ছেন। এরাঁ নিজেদের আরাধ্য দেব-দেবীর নিকট মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা জানাবেন। হিন্দুস্থানে প্রতি মাসেই এরকম উৎসব পালিত হয়, শাহজাদা।
আচরিত দেশ এই হিন্দুস্থান! হুমায়ূন স্বগতোক্তি করলেন।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পুরানা বিশাল একটি ভবনের ছাদের উপরে দীর্ঘ হাত-পা, দীর্ঘ লেজ এবং কালো মুখবিশিষ্ট কয়েকটা বানর দৌড় লাফ পেরে থাকা দেখা গেলো। তাদের বাচ্চা কয়েকটা ছাদের উপরে দৌড়াদৌড়ি ও লাফালাফি করছিলো এবং কয়েকটা বান্দর একটি ডাল থেকে আরেকটি ডালে দ্রুত গতিতে লাফ মেরে মেরে খেলছিলো। দু'চারটে বান্দর রাস্তায়ও নেমে আসছিলো। কিন্তু পথচারিদের তাদের উপরে একটুও গুরুত্ব দেওয়া দেখা গেল না।
সহজ শিকার সন্মুখে দেখে একজন সৈনিক শরধনু প্রস্তুত করলো। হিন্দু বেগ ব্যস্তভাবে বাধা দিয়ে বললেন- বানর হত্যা মহাপাপ। হত্যাকারীর বিপদ হওয়াটাও বিচিত্র নয়।
হিন্দু বেগের ডান দিক দিয়ে আসা কালা বেগ হেসে হেসে ঠাট্টার সুরে বললো- আমরা গরুগুলোকেও রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত, না কি বলেন আপনি?
প্রতিটা কষ্টলব্ধ বস্তুকে আমরা রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত। হিন্দু বেগ গম্ভীরভাবে বললেন- হিন্দুস্থান গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লোকগুলো কৃষির উপর নির্ভরশীল। গরু কৃষিকর্মের জন্য অতি প্রয়োজনীয় প্রাণী। সেজন্য হিন্দুস্থানে গরুকে লোকে পূজা করে। তদুপরি গরু থেকে উৎপন্ন পাঁচবিধ বস্তুকে লোকে সন্মান করে। সেজন্য হিন্দুলোকে গো হত্যাকে মহাপাপ বলে গণ্য করে।
হুমায়ূন আলোচনা সমাপ্ত করার জন্য শান্ত কণ্ঠে বললেন- আমরা বাদশাহের নির্দেশ ভুলে গেলে চলবে না। তিনি হিন্দুস্থানের প্রতিটা রীতি-নীতি এবং পরম্পরাকে সন্মান প্রদর্শন করার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্মান হানি বা মনে আঘাত পেতে পারে তেমন সকল আচরণ থেকে আমরা বিরত থাকতে হবে।
খাজা কালা বেগ বুকে হাত স্থাপন করে বললো- জাহাপনার হুকুম শিরোধার্য। আমি আসলে হিন্দু বেগ সাহেবের সাথে তামাশা করছিলাম।
দূরে গাছ-বৃক্ষের উপর দিয়ে রোদের আলোতে দীপ্তিমান একটি গম্বুজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
হুমায়ূন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- ওই যে দীপ্তিমান ওই গম্বুজটা কী?
হিন্দু বেগ বললেন- ওইটা কুতুব মিনার। ওইটা দাসবংশের সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবাক নির্মাণ করিয়েছিলেন। ওইটা প্রায় দুশ বছরের পুরানা, শাহজাদা।
চলুন, বস্তুটা আমরা নিকট থেকে দেখে আসিগে'।
তাঁরা কুতুব মিনারের নিকটে এলেন। কুতুব মিনারের উচ্চতা দেখে সবাই অভিভূত হয়ে পড়লেন।
হুমায়ূন প্রশ্ন করেই ফেললেন- এতো উঁচু ! এটার উচ্চতা কত, বেগ সাহেব?
হিন্দু বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- দুইশত পঞ্চাশ ফুট, শাহজাদা।
উপরে উঠার সুবিধা রয়েছে নাকি?
নিশ্চয় রয়েছে। একেবারে উপরের মহলায় উঠে যেতে পারি। উপর মহলা থেকে সমগ্র দিল্লী সহর ভালোভাবে চোখে পড়ে।
হুমায়ূন ঘোড়া থেকে নেমে সেনাদের নিয়ে কুতুব মিনারের উপরের মহলায় উঠে এলেন।
কুতুব মিনারের উপর থেকে হুমায়ূন চতুর্দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। মিনার থেকে কিছু দূরে কালো স্তম্ভ একটির দিকে হুমায়ূনরে দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। স্তম্ভটির চতুর্দিকে অনেক লোক ভির করে থাকা হুমায়ূনের চোখে পড়লো। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- চতুর্দিকে লোক ভির করে থাকা ওই কালো বস্তুটা কী?
ওইটা লোহা দিয়ে নির্মিত স্তম্ভ। (স্তম্ভটার উচ্চতা ২৩ ফুট ৮ ইঞ্চি(৭.২১ মিটার। ব্যাস ১৬ ইঞ্চি(৪১ ছেণ্টিমিটার।) স্তম্ভটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-২ (৩৭৫-৪১৫) খ্রীষ্টপূর্বে নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্তম্ভটি কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে মেহরুলিতে অবস্থিত)। )শুনামতে ছয় শত বছরের পুরানা। কথিত রয়েছে, স্তম্ভটায় পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করতে পারলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।
হুমায়ূন মনযোগ সহকারে হিন্দু বেগের কথা শুনে যুবকসূলভ উৎসাহ প্রদর্শন করে বললেন- তাহলে চলুন, আমরাও নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখিগে’।
তাঁরা কুতুব মিনার থেকে নেমে কালো স্তম্ভের নিকটে এলেন। অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত সেনা দেখে ভির করে থাকা লোকগুলো রাস্তা ছেড়ে দিলো।
হুমায়ূন হিন্দু বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি একটু দেখিয়ে দিন তো কীভাবে হাতের আঙুল স্পর্শ করতে হয়?
স্তম্ভটার উপর এবং তলের অংশ কালো। অসংখ্য হাত এবং পিঠের ঘর্ষণের জন্য মাঝের অংশের রঙ উঠে গিয়ে তরবারির ফলকের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেখানে সূর্যের রশ্মি পড়ে ঝিকমিক করতে ছিলো।
হিন্দু বেগ স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে হাত প্রসারিত করে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাম হাতের আঙুল স্পর্শ করার জন্য চেষ্টা করে বিফল হলেন। তাঁর ব্যর্থতায় উপস্থিত সেনাগুলো হেসে ফেললো।
হুমায়ূন নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে হেসে হেসেই স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে পিছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে আঙুল স্পর্শ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনিও বিফল হলেন। তাঁর পরে অন্যান্য সেনারাও চেষ্টা করে কাজটা করতে বিফল হলো। অবশেষে দীর্ঘহাতের সমরকন্দী সেনা একজনে কাজটা করতে সক্ষম হলো। হুমায়ূন সাথে সাথে সেনাটিকে একমুষ্টি রুপোর মুদ্রা উপহার দিলেন।
হুমায়ূনের সাথে অন্যান্য সেনা নায়কদের অনেক ছোট ছোট দল নিজেদের অধীনস্থ সেনা নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হয়েছিলেন। তেমন একটি দলের সেনানায়ক ছিলো ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন লোভী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলো। সহর পরিভ্রমণ
করার চেয়ে সে লুটপাটের প্রতে বেশি আগ্রহী ছিলো। হিন্দু মন্দিরে অনেক সোনা-দানা। দেব-দেবীগুলো অনেক মূল্যবান রত্ন দিয়ে সজ্জিত। সেজন্য লোভ সামলাতে না পেরে লুটপাটের উদ্দেশ্যে সে একটি মন্দিরের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য অগ্রসর হলো।
মন্দিরের দেয়ালে সাদা মার্বল পাথর লাগানো ছিলো। সূর্যের রশ্মি পড়ে সাদা দেয়ালগুলো ঝিকমিক করতেছিলো। মন্দিরের বহির্ভাগের চাক্চিক্য মন্দিরের অভ্যন্তরের ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা ঘোষণা করতে ছিলো।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো।
মন্দিরের বেদীতে স্থাপন করা ছিলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশাল মূর্তি। মূর্তির সন্মুখে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ পুরোহিত। তাঁর হাত দু'টি জোড়হাত করা ছিলো এবং চোখে ছিলো জল। অগণন স্ত্ৰী-পুৰুষ, বৃদ্ধ-যুবা এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নৈস্বর্গিক আনন্দে মগ্ন হয়ে মূর্তির সন্মুখে নতমস্তকে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।বাহ্যিক জগতের প্রতি যেন কারো একটুও ভ্রূক্ষেপ নেই। সবাই ধ্যানস্থ ছিলেন।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই সঙ্গী সেনাদের নির্মম আদেশ দিলো- লণ্ডভণ্ড করে দাও এই ভূত পূজারীদের।
আদেশ দিয়েই ইয়ার হোসেন ভক্তদের ঠেলে ফেলে দিয়ে মূর্তির দিকে এগিয়ে গেলো। সে মূর্তির গা থেকে রত্নালংকার খুলতে হাত বাড়াতেই দুয়ারমুখ থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বললেন- মহামান্য বাদশাহর নামে আদেশ দিচ্ছি, সাবধান মূর্তির গায় হাত দিবে না। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসো।
মন্দিরের অস্পষ্ট আলোয় ইয়ার হোসেন আগন্তুককে চিনতে না পেরে অবজ্ঞার সুরে বললো- কে চিৎকার করছ? কেন, তুইও ভূত পূজারি নাকি? এভাবে বলেই সে সঙ্গীদের আদেশ দিলো- মণি-মুক্তা, সোনা-দানা মূর্তির গা থেকে খুলে নাও।
ইয়ার হোসেনের নির্দেশে একজন সেনা মূর্তির গা থেকে অলংকার খোলার জন্য হাত বাড়ালো। সাথে সাথে আগন্তুক সৈনিকটির হাত লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলো। শর সৈনিকটির হাতে বিদ্ধ হলো। সৈনিকটি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো।
ইয়ার হোসেন কালবিলম্ব না করে তরবারি কোষমুক্ত করে বললো- কে তুই বেকুব? এভাবে বলেই সে দ্রুত আগন্তুকের দিকে অগ্রসর হলো।
হিন্দু বেগ দ্রুত তরবারি কোষমুক্ত করে ইয়ার হোসেনকে বাধা দিতে এগিয়ে এলেন- সাবধান ইয়ার হোসেন, তোমার সন্মুখে স্বয়ং শাহজাদা হুমায়ূন দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ইয়ার হোসেন হতচকিত হয়ে দরজার দিকে তাকালো। দরজার সন্মুখে হুমায়ূনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- ক্ষমা করবেন শাহজাদা। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। ইয়ার হোসেন কৈফিয়তের সুরে কথাটা বলেই দু পা পিছিয়ে এলো।
তরবারিটি আমাকে দিন। হুমায়ূন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিলেন।
শাহজাদা, আমি আপনার পিতার বিশ্বাসী খেদমতগার।
কিন্তু আপনি সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। আপনি লুটপাট এবং মন্দিরের পবিত্রতা ভঙ্গ করবেন না বলে বাদশাহের সন্মুখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আপনি বাদশাহের সন্মুখে করা সেই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে পবিত্র গৃহে তরবারি কোষমুক্ত করে মহাপাপ করেছেন। এমন কী, আপনি পবিত্র উপাসনা গৃহেও লুটপাটের তাণ্ডব চালাতে ভয় করেন নি। আপনি এতো লোভী কেন, বেগ? এইসকল মানুষ...…....হুমায়ূন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে ইশারা করে বললেন- এরাঁ আমাদের শত্রু নয়। বর্তমান এরাঁ আমাদের আপন লোক। এরাঁ এদের ইষ্ট দেবতার ইবাদত(উপাসনা) করছিলেন এবং আপনি এদেঁর উপরে জুর-জুলুম করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমরা হিন্দুস্থানে লুটপাট করার জন্য আসিনি। আমরা এখানে এসেছি সাম্রাজ্য বিস্তার করে ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে এই শোষিত, বঞ্চিত লোকদের রক্ষা করার জন্য। ইব্রাহীম লোডীর মতো একজন লোভী, অত্যাচারী শাসকও হিন্দু দেব-দেবীর গা থেকে সোনা-দানা, হীরা, মুক্তা খুলে
নিতে সাহস করেননি; কিন্তু আপনি সেটাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এটা আমাদের জন্য অতি পরিতাপের কথা। হিন্দুর পবিত্র মন্দিরে প্রবেশ করে— শান্তি ভঙ্গ করে আপনি বাদশাহের সুনাম নষ্ট করেছেন। এর সমুচিত শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে। এভাবে বলেই দেহরক্ষী সেনাদের দিকে তাকিয়ে কঠোর নির্দেশ দিলেন- এর হাত থেকে তরবারি কেড়ে নাও। একে এর সঙ্গীসহ কাল-কঠুরিতে বন্দি করে রাখুন। এদের দেখে আমাদের অন্যান্য সেনারাও শিক্ষা নিক।
আদেশ ঘোষণার সাথে সাথে একদল সেনা ইয়ার হোসেন এবং তার সঙ্গীদের হাত থেকে তরবারি কেড়ে নিয়ে মন্দির থেকে বের করে নিয়ে গেলো।
হুমায়ূন দো-ভাষীর দ্বারা পূজারী এবং উপস্থিত ভক্তদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন- মহামান্য বাদশাহর হয়ে আমি আপনাদের অবগত করতে চাইছি যে, আমরা আপনাদের শত্রু নয়। আমাদের ধর্ম ভিন্ন হলেও মানুষ হিসাবে আপনাদের এবং আমাদের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আমরা সবাইকে একজন স্রষ্টার সৃষ্টি বলে ভাবি। আমাদের মসজিদ এবং আপনাদের মন্দির। আমরা নামাজ পড়ি - আপনারা পূজা করেন। উপাসনার রীতি-নীতি ভিন্ন হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই- সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ এবং মানুষের মঙ্গল কামনা। সেজন্য আমরা সবাই আপনাদের দেব-দেবী এবং উপাসনা গৃহকে সন্মান করি। আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দুস্থান এসেছি। আপনাদের সাথে মিলিত হয়ে আমরা মহান ভারত গড়তে চাই। মহান ভারতে আমরা বইয়ে দিতে চাই শান্তি এবং আনন্দের লহর। আপনাদের সহযোগিতা পেলে তবেই তো সেই উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব হবে। আমরা নিজের ইচ্ছায় হিন্দুস্থানে আসিনি। ইব্রাহীম লোডীর শোষণ শাসনে জর্জরিত হয়ে একাংশ লোক আমাদের আমন্ত্রণ করে এনেছে। আমাদের হয়ে অস্ত্রধারণ করা হিন্দু বেগ সাহেব এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হুমায়ূন শেষের কথাগুলো হিন্দু বেগের দিকে ইশারা করে বললেন।
হিন্দু বেগের দ্বারা অনুবাদ করে শুনানো কথাগুলো উপস্থিত জনতা গভীর মনযোগ সহকারে শুনে মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলেন।
ভাষণ সমাপ্ত করে হুমায়ূন দলবল নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
হুমায়ূন বেরিয়ে আসার পরে পূজারি আবার মূর্তির সন্মুখে হাতজোড় করে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য দেবতার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে এসে তাঁর বুক স্পর্শ করলো
* * *
হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফার বুঝানোর পর মৃত সম্রাট ইব্রাহীম লোড়ীর মাতৃ বৈদা সুলতানা অবশেষে আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সন্মত হলেন। বাবর দিল্লীর সিংহাসন দখল করার পরেও তিনি আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সম্মত হচ্ছিলেন না। নাছোড়বান্দার মতো তিনি অনেকদিন আগ্রার প্রাসাদে বসে ছিলেন। মাতৃস্থানীয় বলে বাবর তাঁকে জুর-জুলুম করে প্রাসাদ থেকে সরিয়ে আনতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেজন্য বুঝিয়ে সুঝিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে আসার জন্য সন্মত করানোর উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফাকে নিয়োগ করেছিলেন।
পানীপতের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুতে বৈদা সুলতানা শোকবস্ত্র পরিধান করে ছিলেন। শোকবস্ত্র পরিধান করেই তিনি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন।
বৈদা সুলতানাকে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হলো। তিনি আগ্রা দূর্গের চাবির গুচ্ছ বাবরের দিকে এগিয়ে দিলেন। চাবির গুচ্ছ নেওয়ার সময়ে বাবর তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করলেন। বৈদা সুলতানার প্রশস্ত উঁচু ললাটে জোড়া ভ্রূ দেখে বাবর চমকে উঠলেন। বাবরের অনুমান হলো, এরকম উঁচু ললাট এবং জোড়া ভ্রূ যেন তিনি কোথাও দেখেছেন!
বাবর স্মরণ করতে চেষ্টা করতে লাগলেন, তেমন জোড়া ভ্রূ তিনি কোথায় দেখেছেন! হঠাৎ তাঁর পানীপত যুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেলো।
বাবরের নির্দেশে হাজার হাজার মৃতদেহের মধ্য থেকে ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে বের করা হয়েছিলো। পরম্পরা অনুসারে ইব্রাহীম লোডীর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্শায় বিদ্ধ করে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হয়েছিলো। সেই বর্শাবিদ্ধ উন্নত ছিন্নমস্তকের
ললাটেও এ রকম জোড় ভ্রূ ছিলো। বৈদা সুলতানার জোড়া ভ্রূ দেখে বাবরের এরকম অনুমান হলো, যেন ইব্রাহীম লোডী মাতৃর রূপে পুনরায় বিজেতার সন্মুখে উপস্থিত হয়েছে।
গর্বিতা এবং উদ্ধত মহিলার দিকে তাকিয়ে বাবর শ্রদ্ধা মিশ্রিত ব্যাকুলতা অনুভব করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি ধীর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- সন্মানীয়া মাতৃ, আপনার কোনো কথা বলার ইচ্ছা আছে নাকি?
বৈদা সুলতানা বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন- আমাকে যেন আরও কষ্ট দেওয়া না হয়।
বাবর নিজের সভাসদবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনারা এই মাতৃস্থানীয়া ভদ্র মহিলাকে নিজের মাতৃর মতো সন্মান প্রদর্শন করবেন।
সভাসদবর্গ বাবরের এই নির্দেশের প্রতি সন্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।
বৈদা সুলতানা নিজেও কৃতজ্ঞতায় বাবরের প্রতি মাথা নুয়ালেন। তাঁর চোখের জলে সিক্ত চোখে ঘৃণার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো যদিও বাবর এবং সভাসদবর্গের চোখে পড়ার আগেই সেটা বিলীন হয়ে গেলো।
বাবর বৈদা সুলতানাকে রাজপ্রাসাদ থেকে একটু দূরে একটি প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। বৈদা সুলতানা বাবরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
পানীপত যুদ্ধের নির্মম পরাজয় এবং ইব্রাহীম লোডীর মৃত্যু সংবাদ শুনে হঠাৎ আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতোই বৈদা সুলতানার অনুভব হয়েছিলো। মৃত পুত্ৰকে দু’চোখে দেখে নিজ হাতে কবর দিয়ে তাঁর সমাধির উপরে শোকাশ্রু ফেলে মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাঁর প্রবল ইচ্ছে হয়েছিলো। তবে, তাঁর সেই ইচ্ছে সফল করা সম্ভব ছিল না। কারণ প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও আগ্রা থেকে পানীপত তিন দিনের পথ। সেজন্য তিনি ইব্রাহীম লোডীর সন্ধানে পানীপতে প্রেরণ করা বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গ যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিলো। তখন কিছু কিছু মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছিলো এবং কিছু কিছু মৃতদেহ শিয়াল শকুনের আহার হয়েছিলো। বৈদা সুলতানা প্রেরণ করা ব্যক্তিগণ ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরে ইব্রাহীম লোডীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার পরে বর্শায় বিদ্ধ করে ছিন্নমস্তকটা বাবরকে দেখানো হয়েছিলো বলে তারা লোকমুখে শুনে এসে সংবাদটা বৈদা সুলতানাকে জানিয়েছিলো। পুত্রের মৃতদেহের দুর্গতির কথা শুনে বৈদা সুলতানার হৃদয় প্রচণ্ড শোকে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলো। হাজার হাজার ছুরির খোঁচায় যেন তাঁর হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলছিলো। তিনি মনে মনে আক্ষেপ করে বলছিলেন- হায় ইব্রাহীম! এই পৃথিবীতে তোর একটা সমাধি চিহ্নও রইল না। তোর প্রাণহীন দেহও ওরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেন- হে আল্লাহ, বাবররেও যেন আমার পুত্রের মতো মৃত্যু হয়। যে আমার বাছাকে হত্যা করেছে তার যেন আমার পুত্রের চেয়েও হাজার গুণ ভয়ানক মৃত্যু হয়।
বৈদা সুলতানার পরিচারিকা, চাকরাণী এবং আত্মীয়স্বজনরা সহরে শুনে আসা কিছু উড়ো সংবাদ শুনিয়ে শোক সন্তপ্ত বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলো-
ঘাসের অভাবে বাবরের অশ্বারোহী সেনারা ক্ষেত-খোলার শস্যাদি ঘোড়াকে খাওয়ানোর জন্য কৃষকরা বিদ্রোহ করে কুড়োল এবং দা দিয়ে কেটে অনেক বিদেশী সেনা হত্যা করেছে। এমনও প্রচার হচ্ছিল যে, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত সেনা এবং ঘোড়া অসহ্য গরম সহ্য করতে না পেরে দলে দলে মরতেছে। এ রকম উড়ো সংবাদ প্রতিদিন প্রচার হচ্ছিলো এবং বৈদা সুলতানার হিতাকাংক্ষীরা সেই সব সংবাদ বলে বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো। বৈদা সুলতানাও সেই সব উড়ো সংবাদ বিশ্বাস করে আত্মসন্তুষ্টি লাভ করছিলেন।
এই সব উড়ো সংবাদের সত্যাসত্যতা নিরূপণের জন্য বৈদা সুলতানা সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবরের দরবারে কর্মরত মৃত ইব্রাহীমের পুত্র বাহাদুর সুলতানকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এমনিতে আসতে দিবে না বলে তিনি তাঁর অসুখ হয়েছে বলে পত্র লিখে পাঠালেন।
সপ্তদশ বর্ষীয় বাহাদুর সুলতান ফার্সি এবং সংস্কৃত ভাষা ভালোভাবে জ্ঞাত ছিলেন। সেজন্য বাবর তাঁকে অত্যাবশ্যকীয় দলিল অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বাবরের অন্য অনুবাদকো ছিলো। তাই তাঁকে বেশি কাজের বোজা দেয়নি। ফলে তাঁর যথেষ্ট অবসর সময় ছিলো। তবে তাঁর সেই অবসর সময় ইচ্ছামতে উপভোগ করার স্বাধীনতা ছিলো না। কয়েকদিন পূর্বের শত্রুর সন্তান হওয়ার জন্য কেউ
অপমান করতে পারে ভেবে তাঁর উপরে সবসময় নজর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাঁর ইচ্ছামতে প্রাসাদের বাহিরে যাওয়ারও অনুমতি ছিল না।
বৈদা সুলতানার পত্র সরাসরি বাহাদুরের হাতে না দিয়ে উজির-এ-আজম দুলহায় পড়ে দেখলেন। বৈদা সুলতানার অসুখের কথা জেনে দুলহায় বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। বাহাদুরের সাথে সবসময় দু’জন দেহরক্ষী সৈনিক থাকতো। সেই দেহরক্ষী সৈনিক দু’জনের সাথে বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পাঠিয়ে দিলেন এবং সেদিনই প্রাসাদে ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন।
অসুখের ভান করে বিছানায় শোয়ে থাকা বৈদা সুলতানা বাহাদুরকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠালেন। বাহাদুর কক্ষে প্রবেশ করে শোকাভিভূতা মাতামহীকে নিশ্চল হয়ে বিছানায় শোয়ে থাকতে দেখলেন।
বাহাদুরকে দেখে বৈদা সুলতানা বালিশে হেলান দিয়ে উঠে বসলেন এবং বাহাদুরকেও বিছানায় বসার জন্য ইশারা করলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের ঘর্মাসিক্ত মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন- বিদেশিরা আমাদের এখানকার গরম সহ্য করতে পারছে না বলে শুনছি, কথাটা সত্য নাকি? শুনতেছি, গরমে বোলে তাদের অনেক লোক মরতেছে?
হ্যাঁ, কিছু লোক অবশ্যে মরেছে। বাহাদুর ভীত সন্ত্রস্ত সুরে বললেন।
তাদের অনেকেই বোলে বলতেছে, তারা আর হিন্দুস্থানে থাকবে না, নিজেদের ঠাণ্ডা দেশে চলে যাবে?
তাদের বাদশাহে তাদের কখনও তেমন কাজ করতে দিবেন না। অধিক সংখ্যক বিদেশি-ই বাদশাহের কথা মেনে চলে। তিনি নিজের যুক্তি সিদ্ধ করতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর মন ভুলানো মিষ্টি কথারও তুলনা নেই। হিন্দুস্থান থেকে যেসব বিদেশী চলে যেতে চেয়েছিলো তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে বাদশাহ উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশ প্ৰদানের পর সবাই চোপ মেরে রয়েছে। বাহাদুর ভয়ে ভয়ে কথাগুলো বললেন।
তুমি তোমার পিতৃহন্তার প্রশংসা করছ?
বাহাদুর দরজার দিকে ভয়বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা এবার ফিসফিস করে বললেন- তোমার উপর নজর রাখে নাকি?
হ্যাঁ। বাহাদুর মাতামহীর মতোই ফিসফিস করে বললেন- আমি কারো সাথে একলা থাকতে বা কথা বলতে পারি না। পহরাদার সৈনিকরা সব সময় আমাকে ঘিরে থাকে এবং কথাগুলোও চোপে-চাপে শুনে থাকে। আমি কোনো আপত্তিজনক কাজ করলে তারা বাদশাহকে অবগত করবে।
চিন্তা করো না। এখানে তোমার আমার বাহিরে কেউ নেই। পূর্বে আমাদের সেবায় নিযুক্ত কোনো বিশ্বাসী লোক বর্তমান বিদেশীর প্রাসাদে রয়েছে নাকি?
হ্যাঁ রয়েছে। মালিক দাদ কারাণী এবং আমাদের লাইব্রেরীর দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সাহেব আছেন। বাদশাহ বাবর পূর্বে আমাদের দরবারে কর্মরত লোকদের নিজের পক্ষে নিতে অহরহ চেষ্টা করতেছেন। হিন্দু-মুসলমানের অন্তর জয় করার জন্যও অহরহ চেষ্টা করতেছেন। আমাদের খানসামা চারজনকে বাদশাহ নিজের খানসামা পদে নিযুক্ত করেছেন।
আচ্ছা আচ্ছা, ভালো, খুব ভালো। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে উঠলেন- তারা রন্ধন করা আহার্য বাদশাহ ভোজন করে নাকি?
ভোজন করেন বলে শুনেছি। তিনি বোলে হিন্দুস্থানী খানসামাদের খুব প্রশংসাও করেন।
ভালো কথা। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে পালেঙ থেকে নামলেন। তাঁর হৃদয়ে প্রতিশোধ স্পৃহা প্রবল হয়ে উঠলো এবং কীভাবে প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করবেন তাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। কথাটা ভাবতেই যেন তাঁর দেহে নতুন উদ্যম ও শক্তি সঞ্চার
হলো। যদি বাবরকে একেবারে শেষ করা যায়....তাহলে নিশ্চয় বাবরের অনুগত লোকগুলো এখান থেকে চলে যাবে! অন্তত একজন খানসামাকে হাত করতে পারলেই অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবেন বলে তিনি মনে মনে ভাবলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন-তুমি খানসামাদের নিজেই দেখেছ নাকি?
হ্যাঁ দেখেছি। বাহাদুর স্বীকৃতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন।
তাদের মাঝে আহাম্মদ রয়েছে নাকি?
বাহাদুর মাতামহীর কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে বললেন- নেই। সে আগ্রা চলে গেছে। কিন্তু আহাম্মদকে দিয়ে কী করবেন?
এভাবে বলেই বাহাদুর ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা মুচকি হাসি হেসে মনে মনে ভাবলেন- আমার নাতিটি নির্বোধ! তদুপরি এর উপরে সবাই নজর রাখে। হঠাৎ যদি এঁ এই গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করে ফেলে, তাহলে এঁ তো মরবেই সাথে আমার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যাবে। কোন পরিস্থিতিতেই এঁকে এই বিপদসংকুল পরিকল্পনার কথা অবগত করানোটা উচিত হবে না।
বৈদা সুলতানা পুনরায় অসুখের ভান করে উঁ-আঁ ধ্বনি করে বলতে লাগলেন- এই পৃথিবীটা কী বিচিত্র! যেসকল লোক একদিন আমাদের আজ্ঞাধীন ছিলো, বর্তমান তারাই শত্রুর সেবায় নিয়োজিত। মালিক দাদ কারাণী, খানসামা এবং অন্যান্য লোক আমাদের দুর্ভাগ্য দেখে শত্রুর নিকট চলে গেছে। আমার অন্তর শোকে বিহ্বল....দেহ শোকে বিকল.......কিন্তু তুমি....যাও, তুমি শত্রুর সেবা করগে’.....তবে, পিতৃর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর কথা কখনো ভুলে যেও না।
বাহাদুর মাতামহীর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে কক্ষের বাহিরে বেরিয়ে এলেন।
বাহাদুর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর বৈদা সুলতানার চোখে-মুখে জেগে উঠলো পৈচাশিক উল্লাস..... বুকে জ্বলে উঠলো প্রতিহিংসার অগ্নি। উন্মত্ত অধীর হয়ে উঠলো তাঁর ভাবনার গতি। একজন বিশ্বাসী এবং সাহসী খানসামা তাঁর প্রয়োজন। কিন্তু কে হতে পারে সেই খানসামা? যে অর্থের বিনিময়ে আহার্যে বিষ মেশাতে সন্মত হবে? মালিক দাদ কারাণী? আহাম্মদ? তারা সন্মত হবে তো তাঁর প্রস্তাবে?
অবশ্যে বিজেতাদের পসন্দ করার মতো লোকের পাশাপাশি ঘৃণা করা লোকের সংখ্যাও অনেক ছিলো বাবরের বশ্যতা স্বীকার করা লোকেদের মধ্যে।
বাবর সেনা কিছুসংখ্যকের ভ্রাতৃ, কিছুসংখ্যকের পিতৃ, আবার কিছুসংখ্যকের পুত্রকে হত্যা করেছিলো। অনেকের ভালো আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সুযোগ পেলে তারা অবশ্যেই বাবরের বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে কুণ্ঠিত হবে না.…..বরঞ্চ খুশিই হবে।
সেদিন থেকে বৈদা সুলতানা গোপনে বাবরের শত্রুর সন্ধান করতে লাগলেন।
বৈদা সুলতানা খবর নিয়ে জানতে পারলেন, যে বাহালুল নামের একজন খানসামা রয়েছে বাবরের রন্ধনশালায়। পানীপতের যুদ্ধে তার চাচার পুত্রকে হত্যা করা হয়েছিলো। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। বৈদা সুলতানা তাঁর যোজনার জন্য বাহালুলকেই উপযুক্ত ব্যক্তি বলে চিনাক্ত করলেন; তবে সরাসরিভাবে বাহালুলের সাথে আলোচনা করাটা নিরাপদ হবে না ভেবে তিনি একজন বিশ্বাসী লোক পাঠিয়ে আগ্রা থেকে আহাম্মদকে ডেকে আনালেন।
আগ্রাস্থিত ঘর-বাড়ি, সা-সম্পত্তি থেকে বাবর আহাম্মদকে বঞ্চিত করেছিলেন। যারজন্য বাবরের প্রতি আহাম্মদের যথেষ্ট বিদ্বেষ ভাব ছিলো। বৈদা সুলতানা বাবরের অনুমতি নিয়ে আহাম্মদকে নিজের সেবার জন্য নিযুক্ত করলেন। একদিন সুযোগ বুঝে বৈদা সুলতানা আহাম্মদের নিকট নিজের পরিকল্পনার বিষয়ে বললেন। কথাটা শুনে আহাম্মদ আতঙ্কে শিহরে উঠলো। কিন্তু বৈদা সুলতানা তাকে অভয়
দিয়ে বললেন যে, তার ভয়ের কোন কারণ নেই। কারণ সে নিজে কিছুই করতে হবে না। সে শুধু খানসামা একজনের সাথে কথাটা আলোচনা করলেই হবে।
বৈদা সুলতানার তরফ থেকে অভয় পেয়ে আহাম্মদ কাজটা করতে সম্মত হলো।
বৈদা সুলতানা একদিন বাহাদুর সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার ছলনায় আহম্মদের মাথায় একটি ভারি টোপলা দিয়ে বাবরের প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। বৈদা সুলতানা বাহাদুরের সাথে বাক্যালাপ করার সময়ে আহাম্মদ পুরানা সঙ্গীদের সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করতে এলো।
আহম্মদ সুযোগ বুঝে বাহালুলের নিকট বৈদা সুলতানার পরিকল্পনার বিষয়ে বললো।
কথাটা শুনে বাহালুল প্রথমে আহাম্মদের মতোই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলো যদিও শেষে অর্থের টোপ পেয়ে কাজটা করতে সম্মত হলো।
* * *
অবশেষে সকল প্রস্তুতি যোজনা অনুসারে প্রস্তুত হয়ে উঠলো এবং কাজটা অতি শীঘ্র সামাধা করার প্রয়োজন হয়ে পড়লো। কারণ বর্ষা ঋতুর শেষে রাণা সংগ্রাম সিঙের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য বাবর প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। যারজন্য তিনি যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বেই বৈদা সুলতানা কাজটা সমাধা করার কথা ভাবলেন। যুদ্ধে গেলে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তার ঠিক নেই। এদিকে দেরি হলে কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়ারো ভয় ছিলো। যারজন্য বাবর যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বেই বৈদা সুলতানা কাজটা সমাধা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরিকল্পনা অনুসারে বৈদা সুলতানা একজন বিশ্বাসী পরিচারিকার হাতে বাহালুলের নিকট বিষ পাঠিয়ে দিলেন। অতি সামান্য বিষ। এক চিমটির চেয়েও কম। তবে, অতি মারাত্মক। পেটে পড়লে বেঁচে থাকার আশা নেই। বাহালুল বিষটুকু এক টুকরো সাদা কাগজে মুড়িয়ে অতি সাবধানে কুর্তার পকেটে ভরে রাখলো।
আহার্যে বিষ মেশানোটা সহজ কাজ ছিল না। বাবরের একজন বিশ্বস্ত খানসামা বাবরের জন্য নির্ধারিত আহার্যের উপর সব সময় নজর রাখতো। যারজন্যে সেই খানসামার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আহার্যে বিষ মেশানোটা কষ্টসাধ্য কাজ ছিলো। তদুপরি ধরা পড়লে তো কথাই নেই, একেবারে অবধারিত মৃত্যু।
তবু বাহালুল প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে জীবন পণ সিদ্ধান্ত নিলো। তদুপরি আহাম্মদের থেকে আশ্বাস পেয়ে সে দুর্বিনীত এবং সাহসীও হয়ে উঠেছিলো। আহাম্মদ আশ্বাস দিয়েছিলো যে, বাবরের মৃত্যু হলে বিদেশী সেনা নিজ দেশে চলে যেতে বাধ্য হবে। তখন পরবর্তী শাসক হবে বাহাদুর সুলতান। তখন তার এই উপকারের কথা স্মরণ করে বাহাদুর সুলতান তাকে নিশ্চয় কোনো উচ্চপদে নিয়োগ করবেন। দুঃসাহসের অন্তরালে বাহালুলের মনে এই আশাও প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো।
সেদিন বৃষ্টির আবহাওয়া ছিলো। সন্ধ্যা থেকে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিলো। যারজন্য অন্যদিনের চেয়ে ঠাণ্ডাও পড়েছিলো যথেষ্ট বেশি। শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে লোকগুলো কাজ-কর্ম ফেলে গৃহের ভেতর আশ্রয় নিয়ে সময় পার করার জন্য ব্যস্ত ছিলো। কেউ কেউ আবার অলসভাবে বিছানায় গা এলিয়ে বৃষ্টির আমেজ উপভোগ করছিলো। অনেকেই আবার হাসি তামাশা, গল্প-গুজব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সময়গুলো সরস করে তোলার চেষ্টা করছিলো।
বাবরের রাজকীয় রন্ধনশালায় রাতের জন্য আহার্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। সেদিন রান্ধা-বাড়ার দায়িত্বে ছিলো বাহালুল। বৃষ্টির আমেজে পুলকিত হয়ে একমাত্র বাহালুলের বাহিরে সব খানসামা মাত্রাধিক্য মদ্য পান করে মাতাল হয়ে উঠেছিলো।
বাহালুলের সেদিন মদ্যপান করার মন বা মানসিকতা কোনোটাই ছিল না। সে দুরু দুরু বুক নিয়ে শুধু সুযোগের অপেক্ষা করছিলো। তার সহযোগী খানসামা কয়জন মদ্যপান করে মাতাল হয়ে রন্ধনশালা সংলগ্ন একটি কক্ষে হাসি-তামাশা, গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।
রন্ধনশালায় সেদিন একটি ডেগে বাবরের প্রিয় ব্যঞ্জন খরগোশের মাংস রন্ধন হচ্ছিলো। মাংসের সুবাসে রন্ধনশালার বাতাস মলমল করতেছিলো। বাহালুলের কিন্তু হাসি-তামাশা, গান-বাজনা বা মাংসের সুবাস উপভোগ করার মন বা মানসিকতা কোনোটাই তখন
ছিল না। কুর্তার পকেটে সযত্নে রক্ষিত বিষটুকু কখন সে ডেগের মাংসে মেশাতে পারবে সেই চিন্তাই তার মনে তোলপাড় করতে ছিলো। তার দেহের সিরা-উপসিরা উৎকণ্ঠা, শংকা, আতঙ্কে টনটন করতেছিলো।
অপেক্ষা করে করে এক সময় বাহালুল অধৈর্য হয়ে উঠলো। কুর্তার পকেটে রক্ষিত বিষের পুরিয়া সে হাত দিয়ে টিপে দেখে দরজার নিকটে এসে বাহিরের দিকে উঁকি মেরে দেখলো।
না, বাইরে কেউ নেই। আস্তে আস্তে সে গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা খানসামা দের কক্ষের দরজার নিকট এলো। সে দরজায় কান লাগিয়ে অনুমান করলো, সবাই আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। কম্পিত পা-য় বাহালুল মাংসের ডেগের নিকটে এসে কুর্তার পকেট থেকে বিষের পুরিয়া বের করলো। পুরিয়াটা ডেগের মাঝে ফেলে দিতে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ালো। না না, ডেগের মাংসে বিষ মেশানো সম্ভব নয়। কারণ অল্প পরেই খানসামারা এসে মাংস খেতে শুরু করবে। এটা তাদের চিরদিনের অভ্যাস। মাংস রান্ধা হওয়ার পরে ডেগ থেকে মাংস বের করে খাওয়াটা তাদের চিরদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাহলে উপায়? বিষ কোথায় মেশাবে?
বাহালুলের হঠাৎ রুটির দিকে চোখ গেলো। সে রুটির পাত্রের নিকটে এসে কম্পিত হাতে একটি রুটির উপরে বিষটুকু ছিটিয়ে দিলো। তারপর সে বিষ মেশানো রুটিটা পাত্র থেকে বের করে এনে চিনির পাত্রের মাঝে রেখে দিলো।
হঠাৎ ঝাঁপটা বাতাস এসে দরজার পাল্লা দু’টি বন্ধ করে দিলো। খট করে শব্দ হলো। বাহালুল ভয়ে পাল্লা দু’টি বন্ধ করে পুরিয়ায় থাকা অবশিষ্ট বিষ চৌকার আগুনের মাঝে ফেলে দিলো।
বাহালুল দরজা খোলে আবার বাইরের দিকে ফুকচি মেরে দেখলো। না, বাইরে কেউ নেই। সে আবার চিনির পাত্রের নিকটে এসে রুটিটার উপরে মাখন লেপে দিয়ে সামান্য ঘি ঢেলে দিলো।
কিছুক্ষণ পরে পরিচারক এলো। বাহালুল অন্যান্য খাদ্যবস্তুর সাথে চিনির পাত্রে রক্ষিত রুটিটা বাবরের আহারের জন্য সাজিয়ে দিলো। পরিচারক বাবরের আহারের জন্য খাদ্যবস্তু নিয়ে গেলো। বাহালুল দুরু দুরু বুক নিয়ে পরবর্তী ঘটনার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলো।
হঠাৎ রক্ষী সেনাদের মাঝে হুলস্থুল লেগে গেলো। কেউ একজন ‘হেকিম হেকিম’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে গেলো।
এতক্ষণ গান-বাজনা, হাসি-তামাশা নিয়ে ব্যস্ত থাকা খানসামা কয়জন ঘটনার গতিপ্রকৃতি টের না পেয়ে একজন আরেকজনকে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। হুলস্থূল এবং দৌড়াদৌড়ির মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সমগ্র প্রাসাদে যেন ভূমিকম্পের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেলো।
মুহূর্তের ভেতরে বাবরের ভোজনালয়ের সন্মুখে ভির জমে গেলো। তাহির বেগ উৎকণ্ঠিতভাবে ভোজনালয়ে দৌড়ে এলো।
বাবর বমি করতেছিলো। ঝরাপাতার মতো তাঁর সমগ্র মুখমণ্ডল মলিন হয়ে গিয়েছিলেন। জবাই করা মোরগের মতো তিনি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতেছিলেন। তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি পাগলের মতো দরজার দিকে দৌড়ে এলেন। কিন্তু কয়েক পা আসার পরেই তাঁর পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। তাহির বেগ তৎক্ষণাৎ তাঁকে ঝাঁপটে ধরলো।
তখনই ব্যস্তভাবে হেকিম ইউসূফ সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি এসেই পরিচারক কয়েকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, শীঘ্র বিছানা পেতে দাও।
মানুষের হুলস্থূল এবং কক্ষের চার দেয়ালের মাঝে বাবর অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। যারজন্য তিনি হেকিমের কথায় আপত্তি করে বললেন- না না, উঠোনেই বিছানা পেতে দাও।
ঘর্ঘর শব্দ করে হাঁস-ফাঁস করে কথা কয়টা বলেই তিনি আবার বমি করতে লাগলেন।
বমি করার পরে একটু সুস্থ হয়ে উঠার পর হেকিম বললেন- জাহাপনা, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায়ই ভালো হবে।
হেকিমের পরামর্শ অনুসারে বারান্দায় বিছানা পাতা হলো। তাহির বেগ এবং অন্যান্য পরিচারকরা বাবরের দুই বগলের তল দিয়ে হাত ঢুকিয়ে শূন্যে তুলে বারান্দায় পাতা বিছানায় এনে শোইয়ে দিলো।
হেকিম বাবরের নাড়ি টিপে নাড়ির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ বের করলেন। অধিক মদ্যপান করে দুর্বল হলে শোঁকতে দেওয়া ওষুধ বাবরকে শোঁকতে দিলেন।
বাবর আপত্তি করে বললেন- 'না না, আমি সিরাজি পান করিনি। আহারের সাথে কোন অখাদ্য খেয়েছি। এভাবে বলে তিনি কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে আদেশ দিলেন- খানসামাদের গ্রেপ্তার করা হোক।' বলেই বাবর পুনরায় বমি করার জন্য চিলিমচির দিকে এগিয়ে এলেন।
আদেশ ঘোষণার সাথে সাথে একদল সৈনিক রন্ধনশালার দিকে দৌড়ে এলো। সেনা এসে পৌঁছোনোর আগেই অন্যান্য খানসামা এবং পরিচারকরা বাহালুলকে আটক করে রেখেছিলো। সেনা এসে পৌঁছোনোর সাথে সাথে তারা বাহালুলকে সেনাদের হাতে সমঝে দিলো।
জল্লাদ অল্প সময়েই বাহালুলের মুখ থেকে প্রকৃত সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হলো। তার স্বীকারোক্তি অনুসারে আহাম্মদ, বৈদা সুলতানা এবং বাহালুলকে বিষ যোগান ধরা পরিচারিকাকে গ্রেপ্তার করার জন্য একদল সেনা বৈদা সুলতানার প্রাসাদে দৌড়ে গেলো।
হেকিমের চিকিৎসার ফলে বাবরের অবস্থার কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। সেদিন সারারাত সংকটজনক অবস্থায় পার হলো। বমির সাথে সাথে বাবরের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর এলো। বাবরের অবস্থা দেখে সবাই শংকিত হয়ে উঠলো। সবাই বাবরের জীবন নাশের আশংকা করতে লাগলো। একমাত্র হেকিম প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে একটার পরে একটা ওষুধ খাইয়ে যেতে লাগলেন। তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলতে লাগলেন- ধৈর্য ধরুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।
এদিকে বাবরের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো। তাঁর অনুমান হলো, কেউ যেন ধারালো ছোরা দিয়ে তাঁর হৃদপিণ্ড টুকরা টুকরা করে কাটতেছে। কলিজা, শ্বাসযন্ত্র, নাড়ি-ভুঁড়ি যেন বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য বিদ্রোহ করতেছে। তাঁর চোখের সন্মুখে রঙ বিরঙের দৃশ্য ভেসে বেড়াতে লাগলো। কখনো বৈদা সুলতানা, কখনো হুমায়ূন এবং কখনো মাহিম বেগমের মুখ তার চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াতে লাগলো।
বাবরের পাকস্থলীতে যেন আগুন জ্বলতেছে। সেই আগুনের দহন জ্বালা তাঁর সর্বশরীরে ছড়িয়ে পড়লো। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি আর্তনাদ করতে ছিলেন এবং সময়ে সময়ে প্রলাপ বকতে ছিলেন- হুমায়ূনকে আমি কাবুল পাঠালাম কেন? কাবুল থেকে সে বদবখশা যাবে। সোমালী সীমান্তে বিশৃংখল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির বতর শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সোমালী সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হবে। রক্তের নদী বয়ে যাবে.....
বাবরের চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, কহিনূর হীরাখচিত কালো রাজমুকুট পরে থাকা আমির তৈমূরের প্রতিচ্ছবি। তাঁর চোখে যেন আগুন জ্বলতেছে— চোখে-মুখে উদ্ভাসিত হচ্ছে পৈচাশিক উল্লাস। বাবর ভয়ে চোখ মুদে ফেললেন। হুমায়ূনের অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁর সর্বশরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো। মাত্রাধিক অস্থিরতার জন্য এক সময় তিনি চেতনা হারিয়ে ফেললেন।
হেকিম চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালালেন। কিছুক্ষণ পরে বাবরের চেতনা ফিরে এলো। তিনি আবার আচ্ছন্নের মতো বলতে লাগলেন-......যদি আমি এই সংকট থেকে মুক্ত হতে না পারি...... আমার মৃত্যুর সময়ে হুমায়ূন, মাহিম বেগম কেউ পাশে উপস্থিত থাকবে না......আমার এই সংকটের সংবাদ লিখে আজ এই মুহূর্তে পত্রবাহক প্রেরণ করলেও সে কাবুল পৌঁছে আবার ফিরে আসতে কমেও তিন মাস সময় লাগবে। অথচ আমি এক সপ্তাহের ভেতরেই.......না না…...আজকে..........না না, এই মুহূর্তেই মরতে পারি।
উত্তেজিত হয়ে উঠার জন্য বাবরের মুখ থেকে শেষের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে বের হলো। তাহির বেগ পাশেই বসে ছিলো। বাবরকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য সে মিনতি ভরা কণ্ঠে বললো- মন শক্ত করুন, জাহাপনা। সাহস হারাবেন না। আপনি এবং আমি কতবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি। আজও আপনি মন শক্ত করে মৃত্যুকে জয় করতে হবে।
কিন্তু এরকম আমার কখনো হয়নি, তাহির বেগ। তখন শত্রু আমাদের সন্মুখ দিক থেকে আক্রমণ করেছিলো, কিন্তু আজ আক্রমণ করেছে পেছন দিক থেকে। পেছন দিক থেকে আক্রমণ করা শত্রুর মোকাবিলা করাটা খুবই কঠিন কাজ, তাহির বেগ। বাবর
কথাগুলো বলার সময়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তিনি অতিকষ্টে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে থেমে থেমে বলতে লাগলেন- তাহির বেগ, তুমি আমার কাছে এস। তুমি আমার কাছে থাকলে আমি মনে সাহস পাব। তুমিই তো আমার বিপদের বন্ধু।
তাহির বেগ কাছ চেপে বসার সাথে সাথে বাবর চিলিমচির দিকে মুখ বাড়ালো। তাহির বেগ বাবরকে সযত্নে ধরে বমি করতে সহায় করলো।
বমি করার জন্য কষ্ট হওয়াতে বাবর ঘেমে উঠলেন। তাহির বেগ কাপড় দিয়ে সযত্নে মাতৃর মমতায় বাবরের দেহের ঘাম মুছে দিলো।
অসহ্য যন্ত্রণা থেকে আরাম পাওয়ার জন্য বাবর সময়ে সময়ে কিছু সময় নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে লাগলেন এবং তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
বাবরের চোখে জল দেখে তাহির বেগের হৃদয় বেদনায় ভরে পড়লো। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো, যদি বাবরের যন্ত্রণার কিছু অংশ সে নিজে ভোগ করে তাঁকে একটু আরাম দিতে পারতো! কখনও কখনও তার এরকম উপলব্ধি হতে লাগলো— সে নিজেই যেন বিষ পান করেছে। বাবরের প্রতি সহানুভূতিতে তাহির বেগের হৃদয় বিগলিত হয়ে উঠলো। তার মানসপটে ভেসে উঠলো অতীতের স্মৃতি বিজড়িত অনেক স্মৃতি-
তাহিরজান.......তাহির বেগ।
তাহিরজান ছিলো কুবার একজন কৃষকের সন্তান। সে ভালোবাসতো তার গ্রামেরই মেয়ে রাবিয়াকে। উভয়ে স্বপ্ন দেখছিলো, দাম্পত্য প্রেমে ভরা একটি সুখী সংসারের। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ো বাতাস এলো--তছনছ করে দিলো তাদের স্বপ্ন। তৃণ-কুটার মতো দু’জন দুই দিকে উড়ে গেলো সেই ঝড়ো বাতাসের তাণ্ডবে।
সেটা ছিলো বাদশাহ ওমর শেখের সময়ের কথা। সমরকন্দের শাসক সুলতান আহম্মদ আখসি আক্রমণের জন্য কুবাশ্বায় নদীর সেপারে ছাউনি পেতে অবস্থান করতেছিলেন। কুবাশ্বায় নদী পার হয়ে তিনি যেকোনো মুহূর্তে আখসির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। চালাবে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, অত্যাচারের তাণ্ডব... ভোগের জন্য বলপূর্বক ধরে নিয়ে যাবে সুন্দরী নারী।
কথাটা ভাবতেই তাহিরজান উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। তার চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এক বীভৎস মর্মান্তিক দৃশ্য। পাষণ্ডরা যদি রাবিয়াকেও ধরে নিয়ে যায়! তাহলে সে কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? পাষণ্ডরা রাবিয়াকে......
পাষণ্ডরা রাবিয়ার উপরে কীভাবে পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে তার এক কল্পিত চিত্র তাহিরজানের চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। সাথে সাথে সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো। না না, সে কোনোমতেই রাবিয়াকে শত্রুর হস্তগত হতে দিবে না। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে সে রাবিয়াকে রক্ষা করতে হবে। শত্রুদের সে নদী পার হতে দিবে না। শত্রুর হাত থেকে সে আখসি রক্ষা করবে--- রক্ষা করবে তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে.....
কিন্তু কীভাবে?
তাহিরজানের মনে একটি বুদ্ধি উদয় হলো। কুবাশ্বায় নদীর উপরে মাত্র একটি পুল। সেই পুল দিয়ে নদী পার হয়েই শত্রু এপারে আসতে হবে। পুলটা জ্বালিয়ে দিতে পারলেই আখসি নিরাপদ। আখসি নিরাপদ হলে রাবিয়াও নিরাপদ। তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে তখন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাই সে রাতের অন্ধকারে পুলটা জ্বালিয়ে দিবে।
ভাবামতেই কাজ। কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সে পুলটা জ্বালিয়ে দিতে বের হলো। কেরোসিনের টিন এবং হাতে হাতে কুড়াল নিয়ে তারা পুলের নিকট এলো।
সেদিন অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। সাথে বইছিলো ঝড়ো বাতাস। প্রথমে তারা পুলে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বৃষ্টি বাতাসের জন্য তারা পুলে আগুন ধরাতে সক্ষম হল না। অবশেষে তারা হতাশ হয়ে আগুন ধরানোর আশা ত্যাগ করলো।
আগুন ধরাতে না পারলেও তাহিরজান হতাশ হল না। সে বজ্রমুষ্টিতে কুড়াল ধরে পুলের একটি খামে উন্মাদের মতো কুড়াল চালাতে লাগলো। প্রচণ্ড শীতের মাঝেও সে ঘেমে নেয়ে উঠলো। তার সঙ্গীরাও এই ক্ষেত্রে তাকে পার্যমানে সহায় করতে লাগলো।নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পরেও তারা মাত্র একটি খামের বাহিরে পুলের বিশেষ ক্ষতি সাধন করতে পারল না। এদিকে পূর্বদিকে ফর্সা হয়ে গেলো। শত্রুর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত তাহিরজান সূর্য উদয়ের আগে আগে সঙ্গীদের নিয়ে গৃহে ফিরে এলো।
এদিকে তাহিরজানরা পুলের পাশ থেকে চলে আসার সাথে সাথে শত্রুসেনা আখসি অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো। পূবে ফর্সা হওয়ার আগেই সেনা বাহিনীর অগ্রভাগ এসে পুলের পাড়ে উপস্থিত হলো। বাড়ন্ত জলের প্রচণ্ড স্রোতে পুলের খামগুলোতে জোরে জোরেধাক্কা মারতে ছিলো। সেনা বাহিনীর অগ্রভাগে সেনা সংখ্যা অল্প ছিলো। যারজন্য তারা অনায়াসে পুল পার হয়ে এপাড়ে আসতে সক্ষম হলো।
সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগ পুলে উঠার সাথে সাথে ঘটলো ঘটনাটা-
সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগে সেনা সংখ্যা অধিক ছিলো। তদুপরি মালবাহী গাড়ীগুলোও ছিলো পশ্চাদভাগে।
মানুষ এবং মালবাহী গাড়ী একসাথে পুলের উপর উঠার ফলে পুলের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়লো। যারজন্য তাহিরজানরা ক্ষতি সাধন করা খামটা মড়মড় করে ভেঙ্গে গেলো। খাম ভাঙার সাথে সাথে পুলটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে ধ্বসে যেতে লাগলো। সেনা এবং মালবাহী গাড়ীর বোজা বহন করতে অক্ষম হয়ে এক সময় পুলটা মড়মড় করে ভেঙ্গে নদীর জলে পড়ে গেলো। ফলে সেনাদের মাঝে হাহাকার লেগে গেলো। অনেক সেনা জলে ভেসে গেলো এবং মালবাহী গাড়ীগুলো নদীর জলে তলিয়ে গেলো।
তবুও আহম্মদ সুলতান হতাশ হলেন না। তিনি পুল মেরামত করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
কুবা থেকে জুর-জুলুম করে মিস্ত্রী ধরে এনে পুল মেরামত করার জন্য লাগিয়ে দিলেন। দুই দিনেই পুল মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ হলো। সেনা বাহিনী পুল পার হয়ে এপাড়ে এলো।
সেনা বাহিনী এপাড়ে এসেই লুটপাটের তাণ্ডব চালালো। পাঁচজন সেনা বারিয়াদের গৃহেও প্রবেশ করলো। রাবিয়া তখন গাই দোহন করছিলো। কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রথমে সে সেনা আসাটা লক্ষ্যই করেনি। সেনা গৃহে প্রবেশ করতে দেখে রাবিয়ার মাতৃ ব্যস্তভাবে দৌড়ে এসে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- তুমি এখনও এখানে রয়েছ? গৃহে সেনা প্রবেশ করেছে। যাও, তাড়াতাড়ি পালাও।
রাবিয়া প্রথমে মাতৃর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো- কী হয়েছে, মা?
শত্রু। দাঁড়া, বাইরে যাবি না। খিড়কি দিয়ে গৃহের ভেতর প্রবেশ করে গরুর জন্য জমিয়ে রাখা ভুসির পুঁজির মাঝে লুকিয়ে থাকগে’।
রাবিয়া সচকিত হয়ে গাভীর তল থেকে উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে বাগানের ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢোকে আসা সৈনিক একজনের চোখ তার উপরে পড়ল।
সৈনিকটি সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললো- সুন্দরীর মতোই যেন লাগছে!
সঙ্গী সৈনিকরা ঘোড়া খুঁজার ধান্দায় ছিলো। তারা সৈনিকটির কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বললো- সুন্দরী মেয়ের চেয়ে আমাদের এখন ঘোড়ার বেশি প্রয়োজন।
সুন্দরী মেয়ে ঘোড়ার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। প্রথম সৈনিকটি এভাবে স্বাগতোক্তি করে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- এই মেয়ে, দাঁড়া। এভাবে বলেই সৈনিকটি পাশের সৈনিকটিকে উদ্দেশ্য করে বললো- সমরকন্দ নিয়ে গিয়ে ফাজিল বেগের নিকট বিক্রী করলে মূল্য ভালোই পাওয়া যাবে।
সৈনিক দু’জন দ্রুত রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো। রাবিয়া ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে দৌড়ে ভুসি জমিয়ে রাখা গৃহের ভেতর ঢোকে গেলো। সৈনিক দু’জন ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়ে এসে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো।
রাবিয়ার মাতৃ দৌড়ে এসে দরজার সন্মুখে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িযে সৈনিক দু’জনকে গৃহের ভেতর প্রবেশ করায় বাধা প্রদান করে বললো- আপনারা যদি মুসলমান হয়ে থাকেন, আমার মেয়ের শরীরে হাত দিবেন না। প্রয়োজন হলে আমাকে মারুন, আমার মেয়ের সর্বনাশ করবেন না। তার একজন যুবকের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।
প্রথম সৈনিকটি ফোঁস করে উঠলো- মেয়ে! বিয়ে ঠিক হয়ে আছে! সেজন্যেই তো বেশি টাকা পাব। সরে যা, আমার সন্মুখ থেকে। এভাবে বলেই সৈনিকটি রাবিয়ার মাতৃকে ঠেলে ফেলে দিলো। পরে যাওয়ার সময় রাবিয়ার মাতৃর মাথা একটি খুঁটায় লাগলো এবং তিনি সাথে সাথে অচেতন হয়ে পড়লেন।
প্রথম সৈনিকটি গৃহের ভেতর প্রবেশ করলো। ইতিমধ্যে রাবিয়া ভুসির পুঁজির মাঝে ঢোকে পড়েছিলো। সৈনিকটিকে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা দেখে সে ভুসির মাঝ থেকে বেরিয়ে খিড়কির দিকে দৌড়ে গেলো। দ্বিতীয় সৈনিকটি টেনিচ বলের মতো লাফিয়ে এসে রাবিয়ার একটি হাতে ধরে ফেললো।
ইতিমধ্যে তৃতীয় সৈনিকটি একটি বস্তা নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছেছিলো। সে বস্তাটা নিয়ে রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো।
রাবিয়া সজাগ হয়ে উঠলো। তাকে বস্তার ভেতর ভরাবে ভেবে সে সহাযের জন্য চিৎকার করে ডাকলো- কে কোথায় আছ? আমাকে বাঁচাও।
তাহিরজান রাবিয়াদের গৃহের পাশেই একটি গৃহে লুকিয়ে ছিলো। সে খিড়কির ফাঁক দিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে তাকিয়ে অসীম ধৈর্য ধরে সৈনিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। রাবিয়ার চিৎকার শুনে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো। তার মন থেকে ভয়-শংকা শীতের কুয়াসার মতো উড়ে গেলো। লুকিয়ে থাকা গৃহ থেকে সে লাফ মেরে বেরিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে দৌড়ে এলো। রাবিয়াদের গৃহে এসে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তার সিরা-উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে রাবিয়াকে গৃহের বাইরে বের করে আনা হয়েছিলো এবং রাবিয়া উঠোনে পড়ে ছটফট করছিলো। একজন সেনা তার পা দু'টি ধরে রেখেছিলো এবং আরেকজন সেনা তার হাত দু’টি পেছন দিকে এনে আঁঠু দিয়ে কোমরে চাপ দিয়ে ধরে রেখেছিলো। তৃতীয়জন সেনা তাকে বস্তার ভেতরে ভরানোর জন্য যো-জা করছিলো। চতুর্থজন সেনা ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং পঞ্চমজন সেনা ঘোড়ার পিঠে বসে দৃশ্যটা উপভোগ করছিলো। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা সেনাটির হাতে বর্শা ছিলো।
দৃশ্য দেখে তাহিরজান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। প্রেমাস্পদের দুর্দশা দেখে সে দুর্নিবীত হয়ে উঠলো। পাঁচজন সেনার সাথে সে একলাই মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলো। তার মন থেকে ভয়-শংকা দূর হয়ে গেলো। তার মনে শুধু একটি চিন্তাই তোলপাড় করতে লাগলো যে, সে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে রাবিয়াকে পাষণ্ডদের কবল থেকে রক্ষা করতেই হবে।
তাহিরজান তরবারি কোষমুক্ত করে রাবিয়ার দিকে দৌড়ে এলো। তখন বর্শাধারী সেনাটি চিৎকার করে বললো- এই এগিয়ে আসবি না। দাঁড়া বলছি, না হলে বর্শায় বিঁধে ফেলব।
তাহিরজান বর্শাধারীর সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করলো না। সে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে এসে রাবিয়ার পা ধরে থাকা সৈনিকটির উপরে তরবারি দিয়ে আঘাত করলো।
সেনাটি আর্তনাদ করে রাবিয়ার পা ছেড়ে দিয়ে রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠোনে ঢলে পড়লো।
তাহিরজান পুনরায় তরবারি তুলতেই তার কাঁধে তীব্র বর্শার আঘাত অনুভব করলো। সে অবসন্ন হয়ে মৃত সেনাটির উপরে ঢলে পড়লো। পরার সময়ে সে রাবিয়ার তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেলো- হায়, তাহির! এই জন্মে হয়তো আমাদের আর সংসার পাতা হবে না। পরজন্মে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকব।
তাহিরের অনুমান হলো, দূর থেকে কে যেন তাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে।
তাহির রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকলো এবং বাকি সেনারা রাবিয়াকে বস্তায় পূরে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিলো। তারপরে তারা তাহিরজান এবং মৃত সেনাটিকে সেখানে ফেলে রেখে রাবিয়াকে নিয়ে চলে গেলো।
বর্শার আঘাতে তাহিরের কাঁধে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সেই ক্ষত শুকোতে অনেক দিন লেগেছিলো।
রাবিয়াকে হারিয়ে তাহির পাগলের মতো হয়ে উঠেছিলো এবং ঘাও শুকানোর পরে সে রাবিয়ার উদ্দেশ্যে সমরকন্দ গিয়েছিলো। তবে সে সেখানে রাবিয়ার কোনো সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে সে হতাশ হয়ে রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে আন্দিজান চলে আসে এবং তখনই মামা ফজিলুদ্দিন তাকে সেনা বাহিনীতে ভর্তি করে দেন।
বাবর প্রথমবার সমরকন্দ বিজয়ের সময়ে তাহিরজানও সেই সেনাবাহিনীর সাথে সমরকন্দে গিয়েছিলো। তখনও সে রাবিয়াকে ভুলতে পারেনি। যারজন্য সমরকন্দ গিয়েই সে রাবিয়াকে খুঁজতে শুরু করেছিলো। তখন তার সাক্ষাৎ হয় মমত নামের একজন সৈনিকের সাথে। মমত জাতে মুচি ছিলো। কয়েকদিনের ভেতরে তাহিরজানের মমতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গঢ়ে উঠে। আহম্মদ সুলতান আখসি আক্রমণের সময়ে মমত আহম্মদ সুলতানের সেনা বাহিনীতে কাজ করছিলো। অবশেষে মমত তার স্ত্রীর সাহায্যে রাবিয়াকে খুঁজে দেয়ার জন্য শপত খায়। কিন্তু রাবিয়াকে খুঁজে থাকা অবস্থায় আহম্মদ তনয়াল আন্দিজানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেজন্য তাহিরজান রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে বাবরের সংবাদবাহক হিসাবে আন্দিজান যেতে হয়।
বাবর দ্বিতীয়বার সমরকন্দ দখলের সময়ে তাহিরজান আবার সমরকন্দ যায়। তখন মমতের স্ত্রী রাবিয়ার সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়। তাহির মমতের সাহায্যে একজন ধনী ব্যবসায়ীর গৃহ থেকে রাবিয়াকে উদ্ধার করে আনে এবং ধর্মীয় বিধান অনুসারে রাবিয়াকে স্ত্রীর মর্যদা প্রদান করে।
ঝরে শুকিয়ে যাওয়া ফুল পুনরায় সজীব হয়ে উঠে। জীবনের উল্লাস কলরবে ভরে পড়ে তাদের দাম্পত্য জীবন।
প্রেমাস্পদকে হারিয়ে তাহিরজান প্রথমে বাবরের সেনা বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে ভর্তি হয়েছিলো। অসীম সাহস এবং নিষ্ঠার বলে সে সাধারণ সৈনিক থেকে বেগের মর্যদা লাভ করে এবং বর্তমান তাঁর বাবরের দেহরক্ষীদের সর্দারের পদে পদোন্নতি হয়েছে।
বাবরের কাহিনী বলার সময়ে তাহিরের কথা সময়ে সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সংকটময় মুহূর্তে তাহিরজান বাবরকে আসন্ন মৃত্যু মুখ থেকে রক্ষা করেছে। হয়তো ঘটনাক্রমে তাহিরজান বাবরের জীবনে না এলে বাবরের হিন্দুস্থান বিজয় সম্ভব হতো না এবং এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভা অকালে মহাকালের বুকে হারিয়ে যেতো। ইতিহাসের বুকে খোদিত হতো না অসীম সাহসী দৃঢ়চেতা সিংহ পুরুষ বাবরের অনেক শ্বাসরুদ্ধকারী বিস্ময়কর যুদ্ধের কাহিনী।
* * *
বাবর কিছু সুস্থ হয়ে উঠার পরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট এলেন।
হেকিম ইউসূফ বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন। তিনি তদন্তকারী সভাসদকে ইশারায় কাছে ডেকে এনে ফিসফিস্ করে বললেন- বেশি বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই একটি কথায় শুধু প্রকৃত ঘটনা বলুন।
তদন্তকারী সভাসদ বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে তথ্য উদ্ধার করেছিলো তা বাবরের নিকট ভেঙে বললেন।
মূল কথা ছিলো এ রকম- বৈদা সুলতানা নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। বিষপ্রয়োগের পরিকল্পনা তিনি নিজেই করেছিলেন এবং পরিকল্পনাটা সফল করার জন্য লোকও তিনি নিজেই ঠিক করেছিলেন। বাবরকে বিষ প্রদান করতে পেরে তিনি সুখী।পুত্রের হত্যাকারীর উপরে প্রতিশোধ নিতে পেরে বর্তমান তিনি উৎফুল্লিত। এতদিন বুকের মধ্যে প্রজ্বলিত অগ্নি বর্তমান নিবার্পণ হয়েছে। বিষাদের জায়গায় উল্লাসে ভরে উঠেছে হৃদয়। তদন্তকারী সভাসদ এটাও জানতে চেষ্টা করেছিলেন যে, ষড়যন্ত্রের সাথে রাণা সংগ্রাম সিঙও জড়িত ছিলো নাকি? কিন্তু বৈদা বেগম এই প্রশ্নের উত্তর দিতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। শাস্তি প্রদান করলে অবশ্যে স্বীকার করাতে পারতেন, তবে বৈদা সুলতানার মতো একজন বিশিষ্টা মহিলাকে বাবরের অনুমতি অবিহনে শাস্তি প্রদান করার সাহস তিনি পাননি।
তদন্তকারী সভাসদের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন- তিনি জবাব দিতেই হবে....….। সেই বদমাশ খানসামা ...সেও শাস্তি পেতে হবে। সবাই শাস্তি পেতে হবে। সেই খানসামাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম...সে রন্ধনকৃত আহার্য আমি গ্রহণ করেছি......এবং সেই পাষণ্ড আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে.... কী জঘন্য তার মানসিকতা!
জাহাপনা, সেই জঘন্য বদমাশদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি প্রদান করে হত্যা করা উচিত। যাতে অন্যরাও সেই শাস্তি দেখে শিক্ষা পায়। তদন্তকারী সভাসদ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- তাদের সাহস দেখে আমি আচরিত হয়েছি, জাহাপনা।
হ্যাঁ, তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য। তারা তরবারির আঘাতে নরহত্যা করা অপরাধীর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে বললেন- সেই তিনজনকে পরম্পরামতে মৃত্যুদণ্ড দিন। ইব্রাহীমের মাতৃর বিচার পরে করা হবে।
আপনার আদেশ শিরোধার্য। তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অসীম মনোবল এবং চিকিৎসার ফলে তিনদিন তিনরাত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বাবর সুস্থ হয়ে উঠলেন। বাবর আরোগ্য হয়ে উঠাতে শুভাকাংক্ষীবর্গ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
বাবর সুস্থ হয়ে উঠার দিনই বেগবর্গ, শুভাকাংক্ষী, পদস্থ সভাসদ এবং বিভিন্ন প্রান্তের রাজপ্রতিনিধিবর্গ বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। বাবর তাঁদের রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। সবাই এসে পদমর্যদা অনুসারে আসন গ্রহণ করলেন। বাবর ধীরে ধীরে দরবার কক্ষে এসে সিংহাসনে আরোহণ করলেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি বৈদা সুলতানাকে দরবারে হাজির করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বৈদা সুলতানাকে দরবার কক্ষে হাজির করা হলো। তাঁর ডানে বামে দু’জন রক্ষী দাঁড়িয়ে রইলো।
বৈদা সুলতানার মাথার চুলগুলো কাপাস তুলোর মতো সাদা। বয়সের আঁচড়ে তাঁর দেহ কিছু পরিমাণে কুঞ্চিত যদিও তিনি বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সিংহাসনের সোনালী ঢাচা, রাজমুকুটে খচিত হীরা-মুক্তার চমক, বাবরের পাংশু মলিন চেহেরা, কোটরাগত চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি মাথা নত করলেন। পরের মুহূর্তেই তিনি আবার বুক উন্নত করে দাঁড়ালেন।
বাবরের নির্দেশে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। তদন্তকারী সভাসদ বৈদা সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন- বাদশাহের হত্যার প্রয়াসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাইরেও আরও কে কে জড়িত ছিলো এই কার্যে?
সেটা হত্যার প্রয়াস ছিল না-- সেটা ছিলো প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থের প্রয়াস। বৈদা সুলতানা নির্ভীকভাবে বলতে লাগলেন- সেটা ছিলো আপনাদের বাদশাহ দ্বারা প্রবাহিত রক্তের প্রতিশোধ। আমার সাথে সহযোগিতা করা বাহালুল, আহাম্মদ এবং পরিচারিকা সবাই একজন একজন শহীদ। তাঁরা বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন। এখন আমার পালা পড়েছে। মৃত্যুর জন্য আমার লেশমাত্র ভয় নেই। পুত্রশোকে জ্বলে জ্বলে আমি ইতিমধ্যেই ছাই হয়ে গেছি। আমাকে হত্যা করে আমার ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিন।
বৈদা সুলতানা ফার্সি ভাষায় কথা বলার জন্য সবাই তাঁর কথা বুঝতে পারছিলেন। তাঁর তেজোদীপ্ত বক্তব্য সবাই মনযোগ সহকারে শুনতেছিলেন। যারজন্য দরবার কক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছিলো। তিনি যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছেন তাঁর নির্ভীক ও তেজোদীপ্ত বক্তব্যে সেটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ হচ্ছিলো।
বৈদা সুলতানা মৃত্যু ভয় জয় করার কথাটা বাবরের দৃষ্টিতেও প্রকট হয়ে উঠলো। বাবর ভাবলেন, মৃত্যু ভয় জয় করার জন্যেই তিনি প্রত্যেকটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণভাবে উচ্চারণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। তাঁর প্রত্যেকটা শব্দের মাঝে তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকট হয়ে উঠেছে। ধূমায়িত হচ্ছে বিদ্বেষ। তীরের মতো তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে সহায় সম্বলহীন, পুত্র শোকে আতুর একজন মাতৃকে বাবর জল্লাদ ডেকে কঠোর থেকে কঠোতর শাস্তি প্রদান করে হত্যা করার জন্য আদেশ প্রদান করাটা তিনি মনে-প্রাণে কামনা করছিলেন। পরাজয়ের মাধ্যমে তিনি জয়ের কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করতে চাইছেন। বাবর ক্রোধোন্মত্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে জয় বৈদা সুলতানারই হবে-- তাঁর নির্ভীকতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে-- ইতিহাসের পাতায় একজন নির্ভীক মহিলা হিসাবে চিরদিন অমর হয়ে থাকবে। সবাই তাঁর কথা শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করবে। সবাই তাঁর কীর্তি কাহিনী আন্তরিকভাবে স্মরণ করবে এবং বাবর চিরদিন সেই কলঙ্কিত কাহিনীর খলনায়ক হয়ে থাকবে।
কথাগুলো ভাবতেই বাবরের ওষ্ঠের কোনায় ঈষৎ হাসির রেখা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠলো। না না, বৈদা সুলতানার ঈস্পিত শাস্তি প্রদান করে তাঁকে জয়ী হতে দিবেন না তিনি। বৈদা সুলতানার উপরে তিনি নিজেই বিজয় সাব্যস্ত করবেন। যেভাবে তিনি বিষের প্রতিক্রিয়ার উপরে ধৈর্য এবং দৃঢ়তা সহকারে বিজয় সাব্যস্ত করেছেন।
হৃদয়ে সঞ্চারিত ক্ষোভ, আক্রোশ সংযত করার জন্য বাবর কয়েকটা মুহূর্ত মৌন হয়ে রইলেন।
বাবরের মৌনতার সুযোগে মালিক দাদ কারাণী নামক বেগ একজন বৈদা সুলতানার এই মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- নিজেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী শহীদ বলে ভাববেন না, ইব্রাহীম মাতৃ। বাদশাহের সাথে বেইমানী করে আপনি নিকৃষ্ট কাজ করেছেন।
চুপ কর বিদ্রোহী। বৈদা সুলতানা ধমকের সুরে বললেন- আমার পুত্রহন্তার উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি উপযুক্ত কাজই করেছি।
আপনি মাতৃজাতির নামে কলঙ্ক লেপন করেছেন। জাহাপনা আপনাকে মাতৃ বলে সম্বোধন করে আপনার সন্মান বর্দ্ধন করেছিলেন। আপনি সেই সন্মানের মাথায় কুঠারাঘাত করেছেন। আপনি সেদিন যে কৃতজ্ঞতার চোখের জল ফেলেছিলেন, সে কথা আপনি ভুলে গেলেন নাকি, ইব্রাহীম মাতৃ?
না না, সেটা কৃতজ্ঞতার চোখের জল ছিল না-- সেটা ছিলো, ঘৃণার চোখের জল। যারজন্য আমার ইব্রাহীম অকালে শহীদ হয়েছেন, আমি কখনও তাঁর মাতৃ হতে পারি না- কোনো মাতৃই সেটা হতে পারে না।
বাবর তখনও নীরব। তিনি আচ্ছন্নের মতো বৈদা সুলতানার প্রগলভতা উপভোগ করছিলেন।
মালিক দাদ কারাণী উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন- আপনার পুত্রের নিকট বাবরের চেয়েও দশগুণ অধিক সৈন্য ছিলো। আমি ভালভাবে জানি, সে যুদ্ধে জয়ী হলে বাবর বাহিনীর একজন সৈনিকো জীবিত রাখতো না। ইব্রাহীমের অত্যাচার-উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়েই হিন্দুস্থানের কিছু সংখ্যক সচেতন লোক বাবরকে ডেকে এনেছেন। যুদ্ধ সব সময় যুদ্ধই। সেখানে এক পক্ষের জয় হলে অন্যপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত। বাদশাহ বাবর খোলা প্রান্তরে তরবারির বিরুদ্ধে তরবারি দিয়ে ন্যায় যুদ্ধই করেছেন। আপনার হৃদয়ে তিল পরিমাণ মনুষ্যত্ব থাকলেও আপনি এভাবে হিংস্রতার আশ্রয় নিতে পারতেন না।
আমি একজন অবলা নারী। আমি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে অক্ষম। যারজন্য বিষই আমার তরবারি। বিদেশী আক্রমণকারীরা আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। সমগ্র হিন্দুস্থানে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। অনেক মাতৃকে আমার মতো শোকবস্ত্র পরিধান করতে হয়েছে। অনেক বিধবাকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে হয়েছে। বৈদা সুলতানা কথাগুলো বলার সময় প্রতিটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণ ও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছিলেন।
দীর্ঘ দাড়ির বেগ একজন দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- জাহাপনা, আমরা উন্মাদ বৃদ্ধার প্রলাপ অনেক শুনলাম। এখন জল্লাদ ডেকে এর বাগ্মিতা বন্ধ করার আদেশ দিন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, টুকরা টুকরা করে কাটার আদেশ দিন। বৈদা সুলতানা গর্জে উঠলেন- মরতে আমি ভয় করিনা, মরতে আমার একটুও ভয় নেই।
সভাসদবর্গ বৈদা সুলতানার প্রাণদণ্ডের দাবি জানাতে লাগলেন- এই উন্মাদ বৃদ্ধাকে হাতীর পা-র নিচে ঠেলে দিয়ে পিষে হত্যা করা হোক। এভাবে নানান জনে নানান পরামর্শ দিতে লাগলেন।
বাবর সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন- আপনারা অনুগ্রহ করে শান্ত হোন। আমাকে ভাবতে সময় দিন।
বাবরের আহ্বানে সবাই শান্ত হলো।
বাবর শান্ত সংযত কণ্ঠে বললেন- এই পুত্র শোকাতুরা জ্ঞানী মাতৃর শুধু একটাই শাস্তি— মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক শাস্তি। মাননীয় সভাসদবর্গ, আপনারা শুনলেন যে, মহামান্য মাতৃর হৃদয়— পুত্রহারা মাতৃ, পতিহারা বিধবা এবং পিতৃ-মাতৃ হারানো সন্তানের জন্য কাঁদতেছেন। বাবর এভাবে বলেই কিছুক্ষণ মৌন থেকে কণ্ঠস্বর পাল্টিয়ে বললেন- কিন্তু এসব একেবারে মিথ্যা কথা। ইনার স্নেহধন্য পুত্র-ই বাংলা, গোয়ালিয়র এবং আশেপাশের রাজাদের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছেন। সেই সব যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষও নিশ্চিতভাবে মরেছে! বাবর বৈদা সুলতানার দিকে তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- আমাকে একটু বলবেন নাকি মাতৃ—তখন আপনি কী করছিলেন?
মালিক দাদ কারাণী ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন। পানীপত যুদ্ধের পরে বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে বাবরের দরবারের একজন সভাসদ হিসাবে যোগদান করেছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাবরকে সমর্থন করে বললেন- গত তিন বছরে আমাদের দিক থেকেই ষাট হাজার সেনা মরেছে, জাহাপনা।
আচ্ছা সভাসদবর্গ, আপনারা এক সময়ের ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ মালিক দাদ কারাণীর মুখে শুনলেন যে, বিগত তিন বছরে কত লোক এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্রের লোভের বলি হয়েছে। এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র এই সিংহাসনে- বাবর সিংহাসনে চাপড়ে চাপড়ে বললেন- সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র দশ বছর এই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হিন্দুস্থান বিশাল জনসংখ্যার দেশ। মানুষের অভাব নেই- একজন আরেকজনকে হত্যা করার জন্য। আপনারা জানেন, ইব্রাহীম লোডী সর্বদা ভারাটিয়া সেনা নিয়োগ করছিলেন। কারণ তাঁর হাতে ধনের অভাব ছিল না। কিন্তু সেই ধন-সম্পদ সৌধাদি নির্মাণ বা সাম্রাজ্যের কল্যাণের জন্য খরচ করতেন না। তিনি ধন-সম্পদ খরচ করতেন ভারাটিয়া সেনা কিনার জন্য- সৈন্য কিনে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার জন্য— হিন্দুস্থানের পবিত্র শ্যামল মাটি রক্তে রঞ্জিত করার জন্য। ইব্রাহীম ছিলো একজন অদক্ষ সেনা নায়ক। তার প্রমাণ পানীপত যুদ্ধ। একজন সেনা নায়কের সাফল্য ও দক্ষতার পরিমাপ যুদ্ধ জয় দিয়ে করা হয় না— দক্ষতা এবং সাফল্য পরিমাপ করা হয় যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে। পানীপতের যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি দুই হাজার সৈন্য এবং ইব্রাহীম লোডী হারিয়েছে ত্রিশ হাজার সৈন্য। তবুও সে আমার কামান, বন্দুক এবং তরবারির জন্য নয়— সেনা হারিয়েছে নিজের অদক্ষতার জন্য। তার নিজের বাহিনীর সেনা এবং হাতীর পা-র নিচে পড়ে তার অধিক সংখ্যক সেনা মরেছে। ইব্রাহীম লোডী নিজেও হয়তো তার নিজের হাতীর শিকার হয়েছে। এ কথা অবশ্যে আমি জানিনা, শুধু অনুমান করছি। সন্মানীয়া মাতৃ যদি এতই —মানব দরদী- বাবর সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর গমগমিয়ে উঠলো- মৃত সৈনিকদের মাতৃ, বিধবা পত্নী এবং সন্তানদের প্রতি যদি এতই হৃদয় বিগলিত, তাহলে সন্মানীয়া মাতৃ কেন যুদ্ধে এতো মানুষ মরতে দিচ্ছিলেন--নিজের সুযোগ্য সন্তানকে কেন যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন নি? তাঁকে বৃথা রক্তপাত করা থেকে বিরত করেন নি কেন?
আমি শুধু একজন মাতৃ। বাদশাহকে হুকুম দেওয়াটা আমার আয়ত্বের বাইরে ছিলো। বৈদা সুলতানা বাবরের যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে এইবার অভিযোগ করার পরিবর্তে শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করলেন।
আর আমরা সেই যুদ্ধপিপাসু যোদ্ধার যুদ্ধ পিপাসা নিবারণ করার জন্য এ দেশে এসেছি। আমরা এখানে এসেছি– অত্যাচারির অত্যাচার থেকে হিন্দুস্থানের মানুষদের রক্ষা করে সুখী সমৃদ্ধ মঙ্গলকামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য। আমরা যে সংকল্প নিয়ে এসেছি, আমরা সেটা বাস্তবে রূপায়ন করে দেখাব। এই কপট প্রবঞ্চক মাতৃর জন্য ভয়াবহ শাস্তি— আমি এরঁ বিদ্বেষ আক্রোশ ভরা জলন্ত দৃষ্টির সম্মুখে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা করব। সংকল্প নিয়ে আসা কাজ আমরা এই মাতৃকে করে দেখাব।
ধন্যবাদ, বাহ্ বা। মালিক দাদ কারাণী বাবরের মহানুভবতাকে প্রশংসা করলেন।
সবাই অভিভূতের মতো বাবরের দ্বন্দ্বের উপরে বিজয় সাব্যস্ত উপভোগ করতে লাগলেন।
বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- এই মাতৃর হৃদয় বিধবা পত্নী, সন্তানহারা মাতৃ এবং পিতৃহারা সন্তানের জন্য বিগলিত। সেজন্য আমি হুকুম দিলাম..... বাক্যটা সম্পূর্ণ না করে ডাকলেন- আব্দুল করিম বেগ কারাণী.......
বামদিকের সারি থেকে একজন বলিষ্ঠ সুগঠিত বেগ দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে বললেন- আদেশ করুন, জাহাপনা।
আপনি এই মাতৃর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যমুনা নদীর পাড়ে একটা অন্নসত্র নির্মাণ করুন। ইনারঁ চাকর-বাকর সকলে সেখানে কাজ করবে এবং প্রতিদিন বিধবা এবং এতিমদের সেখানে খাওয়াবে।
আপনার হুকুম শিরোধার্য, জাহাপনা। আব্দুল করিম বেগ মাথা নুইয়ে বললো।
এবং আপনি আজীবন সেই অন্নসত্র দেখা-শুনা করবেন।
জাহাপনা। আব্দুল করিম বেগ বৈদা সুলতানার দিকে ইশারা করে বিমূঢ়ের মতো বললো- এর প্রাণদণ্ড হবে না নাকি, জাহাপনা?
আমার যা বলার বলে শেষ করেছি।
প্রাণদণ্ড হবে না নাকি? অপেক্ষিত মৃত্যুর ভায়বহ নিষ্ঠুর স্পর্শ তিনি অনুভব করবেন না নাকি? কথাটা ভাবতেই বৈদা সুলতানার হৃদয়ে জীবনের উষ্ম উল্লাস জেগে উঠলো। তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠলো।
দুই হাত দিয়ে মুখ ডেকে তিনি কেঁদে ফেললেন।
সাথে সাথে দরবার কক্ষ নিঝুম হয়ে পড়ে গেলো।
* * *
এক মাসের ভেতরে বাবর সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠলেন। অসুখ থেকে আরোগ্য হয়ে উঠেই তিনি সাম্রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজে মনোনিবেশ করলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি সৌধাদি নির্মাণ ও কাব্যচর্চায়ও মনোনিবেশ করলেন। মৌলানা খাঁন দমির, শায়ের সিহাব মুয়ম্মী, মুদারিশ ইব্রাহীম প্রভৃতি অনেক বিশিষ্ট কবি এবং বাস্তুশিল্পী ফজিলুদ্দিনকে হিরাত থেকে আমন্ত্রণ করে হিন্দুস্থানে আনালেন। কাব্যচর্চা, নানা উন্নয়নমূলক কাজ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি তিনি আত্মজীবনী ‘বাবর নামা’ও লিখে যেতে লাগলেন।
পানীপত যুদ্ধের এক বছর পরে বাবর মেবারের রাণা প্রবল প্রতাপী রাণা সাঙ্গার প্রত্যাহ্বানের সন্মুখীন হলেন। একই সময়ে বিহার খাঁর নেতৃত্বে পূব দিকে আফগান জায়গিরদারগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শাহজাদা হুমায়ূন আফগান বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে জৌনপুর, কালপী প্রভৃতি স্থান দখল করেন।
এর পরে বাবর এবং রাণা সাঙ্গার সাথে খানুয়া নামক স্থানে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রাণা সাঙ্গা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। এই খানুয়া যুদ্ধ জয়ে মোগলদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।
রাজপূত শক্তিকে পরাভূত করার দুই বছর পরে আফগান সর্দারবর্গ একতাবদ্ধ হয়ে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। চুনার এবং ঘর্ঘরা নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে আফগানরা বাবরের হাতে পরাস্ত হয়। ফলে মধ্য এশিয়ার অক্সাচ উপত্যকা থেকে ঘর্ঘরা এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত মোগলদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিছুদিনের মধ্যেই বাবরের সাম্রাজ্য এত বিস্তার হয়ে পড়ে যে, একজন অশ্বারোহী সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তিন মাসেও ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়লো। বলখ থেকে কাবুল, কাবুল থেকে লাহোর এবং লাহোর থেকে আগ্রা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূ-ভাগে বাবরের স্বাক্ষরিত আজ্ঞা নির্বিচারে প্রতিপালিত হতে লাগলো।
ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য বাবর সাম্রাজ্যের বিক্রী কর হ্রাস করে দিলেন। ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করলো। উজবেকিস্থান, তাজিকিস্থান এবং ইরান পর্যন্ত ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসারিত হলো। কর হ্রাসের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরাও যথেষ্ট লাভবান হলো। বাবর সাম্রাজ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করে দিলেন। ফলে হত্যা, লুন্ঠন, চুরি, ডাকাতির মতো অনেক অসামাজিক দুর্নীতি হ্রাস পেলো। সাম্রাজ্যে শান্তি শৃংখলা বিরাজ করতে লাগলো। ইব্রাহীম লোডীর সময়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকা মানুষের জীবনে পুনরায় শান্তি সমৃদ্ধি ফিরে এলো।
শিল্পী ফজিলুদ্দিনের মাধ্যমে সৌধ, বাগান প্রভৃতি নির্মাণ করে আগ্রা সহরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুললেন। ফলে আগ্রা সহর নতুন প্রাণ পেয়ে মুখর হয়ে উঠলো।
বাবর অসুখ থেকে আরোগ্য হলেও তাঁর স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যেতে লাগলো। দিনের অধিক সময় তিনি শায়ের খাঁন দমীরের সাথে কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন। মাহিম বেগমসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যবর্গকেও তিনি কাবুল থেকে আগ্রা ডেকে আনালেন।
গ্রীষ্ম ঋতু। বাবর সেদিন আত্মজীবনী লেখায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় তাহির বেগ একটি সোনার থালায় কয়েক থোকা আঙুর এনে বাবরের সন্মুখে রাখলো।
আঙুর দেখে বাবর বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- আঙুর ! এগুলো কোথা থেকে আনলেন।
বাগান ‘হস্ত বেহেস্ত’ থেকে, জাহাপনা। আপনি যে সমরকন্দ থেকে আঙুরের কলম এনে রোপন করেছিলেন, আপনার মনে আছে, জাহাপনা?
বাবরের কথাটা মনে পড়ল। সমরকন্দের আঙুর গাছের কলম আনিয়ে রোপন করার কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।
বাবর উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- তাই নাকি? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। খুব আনন্দের কথা। সেদিন আমি যমুনার পাড়ে রোপন করা আঙুরগুলোও পাকতে শুরু করেছে দেখে এসেছি। সমরকন্দ থেকে আনয়ন করা সাদা বেদানা, কিসমিস প্রভৃতিও ডাল ভরে লেগেছে। এগুলো মাহিম বেগমকে দেখাতে হবে। এগুলো দেখলে তিনি খুব আনন্দ পাবেন। চলুন, থাল নিয়ে বেগমের নিকটে চলুন।
মাহিম বেগম প্রাসাদের বারান্দায় বসে হুমায়ূনের নিকট পত্র লিখছিলেন। বাবরকে দেখে তিনি আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে মাথা নত করলেন।
বেগম, দেখুন তো! বাবর তাহিরের হাতের থালার আঙুরের গুচ্ছের দিকে ইশারা করে বললেন- এই আঙুরগুলো দেখতে সমরকন্দের আঙুরের মতোই লাগছে নাকি, বেগম? এই আঙুর সমরকন্দ থেকে আনিয়ে রোপন করা হয়েছিলো।
মাহিম বেগম তখন হুমায়ূনের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। যারজন্য তাঁর আঙুর খাওয়ার বা দেখার মন মানসিকতা ছিলো না। তবুও বাবর দুখ পাবেন ভেবে তিনি তাহির বেগের হাত থেকে থালাটা নিয়ে মেজের উপর নামিয়ে রাখলেন।
পতি-পত্নীকে একান্তে ছেড়ে তাহির বেগ বারান্দা থেকে নেমে এলো।
মাহিম বেগমের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার জন্য চোখের পাতা ভিজে ছিলো। তখন তিনি কোন রকম কথা বলার পরিস্থিতিতে ছিলেন না।
মাহিম বেগমের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে বাবর ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি সাদরে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হলো বেগম, আপনি কাঁদছেন কেন?
শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, জাহাপনা। মাহিম বেগম নিরাসক্ত সংক্ষেপ উত্তর দিলেন।
মাহিম বেগমের বয়স অনেকদিন পূর্বেই চল্লিশ পার হয়ে গেছে। শরীরে মেদ জমার জন্য তিনি স্থূলও হয়েছিলেন এবং কমনীয়তাও যথেষ্ট কমে গিয়েছিলো। ফলে ত্বক শুষ্ক এবং খসখসে হয়ে উঠেছিলো। তদুপরি তিনি পাহাড়ীয়া ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। যারজন্য তিনি হিন্দুস্থানের গরম আবহাওয়ায় খুব অস্বস্তি এবং কষ্ট অনুভব করছিলেন। এদিকে হুমায়ূনের চিন্তায়ও তিনি অস্থির ছিলেন। হুমায়ূন তখন চম্ভলের শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন।
প্রথমাবস্থায় আমারও কষ্ট হতো, বেগম। বাবর মাহিম বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- কিছুদিন থাকলে আপনিও এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। নিন, আঙুর খান।
মাহিম বেগমের আঙুর খাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। তবুও তিনি বাবরের অনুরোধে গোটা দুয়েক আঙুর মুখে দিলেন। আঙুরের স্বাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে তিনি বাবরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- ভালোই পেকেছে, খেতেও খুব ভালো লাগছে। নিন, আপনিও নিন। মাহিম বেগম বাবরের দিকে আঙুর এগিয়ে দিলেন।
আপনি পত্র লিখছিলেন নাকি? বাবর আঙুর চিবুতে চিবুতে বললেন।
হ্যাঁ, হুমায়ূনের নিকট। আসলে আবহাওয়ার জন্য আমার কষ্ট হয়নি--কষ্ট হচ্ছে পুত্র স্নেহের জন্য। অবরুদ্ধ জালরাশি যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। তিনি আবেগিক কণ্ঠে জোরে জোরে বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের চিন্তায় আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি, জাহাপনা। আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই যেন আপনি জেনে-শুনে হুমায়ূনকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। আমি কাবুল থাকতে, সে ছিলো গঙ্গার দেশে, আমি আগ্রা আসতে তাকে পাঠিয়ে ছিলেন বদবখশায়। বর্তমান তাকে পাঠিয়েছেন চম্ভলের সুবেদার করে। কোন
দূরবর্তী স্থানে বিদ্রোহে দেখা দিলেই আপনি তাকে সেখানে পাঠান এবং আমি পুত্রের আগমন অপেক্ষায় চাতকের মতো ছটফট করতে থাকি। আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, জাহাপনা। আমি হুমায়ূনের বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছি না।
আপনি এতো অস্থির হচ্ছেন কেন, বেগম? হুমায়ূন নিজেই চন্তল যাওয়ার জন্য আমার নিকট আবেদন করেছিলো। তাঁর ইচ্ছানুসারেই তাঁকে চম্ভল পাঠানো হয়েছে।
মাহিম বেগম অভিযোগের সুরে বললেন- আপনি অস্থির না হয়ে থাকতে পারছেন, কারণ হুমায়ূনের বাইরেও আপনার অন্য সন্তান রয়েছে। হুমায়ূনই আমার একমাত্র সন্তান। তিনিজনকে পূর্বেই কবর দিয়েছি। ভেবে দেখুন, আমার মাতৃ হৃদয়ের অবস্থা কি হতে পারে?
মাহিম বেগম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। বাবর কিছু বলার আগেই ফুট ফুটে পোশাক পরিধান করে গুলবদন দৌড়ে এসে বাবরকে জড়িয়ে ধরে লাফাতে লাগলেন। কিন্তু মাহিম বেগমকে কাঁদতে দেখে সে পরের মুহূর্তে অবাক হয়ে মাটির পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
বাবর অবশ্যে বলতে পারতেন, হিন্দাল এবং গুলবদন তো আপনারই সন্তান। কিন্তু বাবর কথাটা ভাবতেই মাহিম বেগম আবার বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের মতো মির্জা কামরাণও তো আপনারই সন্তান। সে তো মাতৃর সাথে লাহোর রয়েছে। একমাত্র হুমায়ূনকে কেন আপনি ঢাল করে রেখেছেন?
বাবর এইবার ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না। মাহিম বেগমের শ্লেষ মিশ্রিত বাক্যবাণে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়লেন। মাহিম বেগমের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি ক্ষোভের সহিত বললেন- হুমায়ূনকে সংকটের ঢাল করে রেখেছি, কারণ সে ভবিষ্যত শাসক। আমার মৃত্যুর পরে সে-ই নিতে হবে সিংহাসনের দায়িত্ব। সেজন্য তার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তের খুঁটিনাটি সে জানাটা আবশ্যক। সে কষ্ট ও সংকটের মোকাবিলা করতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাটা জরুরি। তাঁর এই বয়সে আমি তাঁর চেয়েও বেশি কষ্ট করতে হয়েছে।
কিন্তু আমি একজন মাতৃ। হুমায়ূনের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে আমার অন্তর হাহাকার করে উঠে। কিন্তু আপনার এতে কী আসে যায়? আমার বাইরেও তো দু’জন যুবতী নারী আপনার বিদ্যমান।
গুলবদন পিতৃ-মাতৃর এই ধরণের কথাবার্তা প্রথমবারের জন্য শুনছিলো। উত্তেজিত পিতৃকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা দেখে তার শিশু মনেও অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেলো। আগে একজন আরেকজনকে কত ভালো বাসতেন, ছোট হলেও সে কথা অনুমান করতে তার অসুবিধা হতো না। কাবুল থেকে আগ্রা আসার সময়ে রাস্তায় পিতৃর সাথে মিলনের আনন্দে মাতৃর চোখে-মুখে যে ব্যাকুলতার পূর্বাভাস সে প্রত্যক্ষ করেছিলো সেই দৃশ্য আজও তার মনে জ্বাজল্যমান হয়ে রয়েছে। মাতৃ মাহিম বেগমের আগমনে পিতৃ যেভাবে আনন্দিত ও উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন সেকথা ভাবলে আজও সে পুলকিত হয়ে উঠে। মাতৃর প্রতি পিতৃর এতো ভালবাসা! বাবরের বাইরে কোন মোগল সম্রাটই নিজের পত্নীর প্রতি এতো সন্মান প্রদর্শন করেনি বলে লোকেরা পরস্পরে বলা-কওয়া করাও সে শুনেছে।
এই গুলবদনই পরিণত বয়সে ‘হুমায়ূন নামা’ লিখেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি তীক্ষ্ণ অনভূতি এবং সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। সেজন্য তিনি পিতৃ-মাতৃর মাঝে সংঘটিত বাক-বিতণ্ডার কারণ খুঁজে চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিলেন।
বাবরের অনুভূতিতেও গুলবদনের এই ভাবান্তর ধরা পড়লো। যারজন্য তিনি অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেয়ে পরিস্থিতি থেকে গুলবদনকে সরাতে থালা থেকে একগুচ্ছ আঙুর হাতে নিয়ে গুলবদনের দিকে বাড়িয়ে বললেন- যাও, এই আঙুরগুলো বাগানে বসে খাওগে’ যাও।
বিশেষ আপত্তি না করে গুলবদন আঙুরের গুচ্ছ নিয়ে বাগনের দিকে চলে গেলো।
উত্তেজনা ও ক্ষোভে বাবরের চোখ থেকে জল গড়াতে লাগলো। বাবরের চোখে জল দেখে মাহিম বেগম বিচলিত হয়ে উঠলেন। তিনি সাদরে বাবরের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন- আমার বাদশাহ, আপনি আমার উপরে অসন্তুষ্ট হবেন না। আমি একজন
অবলা নারী এবং আপনি বাদশাহ। আমি আপনার সাথে অভিমান না করে কার সাথে করব? আপনার নিকট থেকে একটু সহানুভূতি পেলেই আমার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠে, জাহাপনা।
হ্যাঁ, আমি বাদশাহ। বাবর অভিমান ভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন- হ্যাঁ, আমি বাদশাহ। সেজন্য সকল বিপদ, সকল অন্যায়ের বোজা আমি-ই বহন করতে হবে! যুবাবস্থায় আহম্মদ তনয়ালের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে একবার আমার সিংহাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছিলো। তখন আমি সিংহাসন হারিয়ে নেপাতোলা নামক একটি গ্রামে ছিলাম। নেপাতোলার দহকতের পাহাড়ীয়া অঞ্চলের কৃষকের আড়ম্বরহীন সুখী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমি সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে একজন কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলাম। তার প্রস্তুতি হিসাবে আমি পাহাড়ীয়া অঞ্চলে খালী পায় কিছু সময় হেঁটেও বেড়িয়ে ছিলাম। আমি ক্ষমতার শিকল ছিঁড়ে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। তখন এমন একজন বান্ধব পেলাম না, যে আমার মাথা থেকে ক্ষমতার বোজা নিজের মাথায় নিয়ে আমাকে মুক্ত করবে। বর্তমান আমি ক্ষমতার বোজা বহন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি- ক্ষমতার বোজা বহন করার শক্তি আমি এখন হারিয়ে ফেলেছি। সেজন্য আমি ক্ষমতার বোজা হুমায়ূনের মাথায় তুলে দিয়ে মুক্ত হতে চাইছি।
বাবর কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, মাহিম বেগম তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করতে পারলেন। কিন্তু তিনি নিজের অনুমানের উপর বিশ্বাস করতে কষ্ট পেয়ে বিমূঢ়ের মতো বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাবর আবার বললেন- বেগম, আপনি হুমায়ূনকে পত্র লিখে তাকে আগ্রা ডেকে পাঠান। আমি জীবিত থাকতেই সে আমার চোখের সন্মুখে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমি কামনা করি। আমাকে মুক্তি দিন।
কিন্তু জাহাপনা, আপনি তো নিজেই জানেন, হুমায়ূনের সিংহাসনের প্রতি মোটেই লোভ নেই। আপনি বর্তমান থাকতে সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমিও কামনা করি না। আমি শুধু সে আমার চোখের সন্মুখে থাকাটা কামনা করি।
আমার ইচ্ছার কথা জানিয়ে পত্র লিখে তাঁকে ডেকে আনুন। কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তের কথা আপনি অন্য কারো নিকটে প্রকাশ করবেন না।
আপনি কাবুল ফিরে যেতে চাইছেন নাকি, জাহাপনা?
আমার উপলব্ধি হচ্ছে যে, আমাকে অতিসত্বর চোখ মুদতে হবে। তখন আমার মৃতদেহ কাবুল নিয়ে গিয়ে কবর দিবেন। জীবিত দিন কয়টা আমি আগ্রাতে কাটাব। হয়তো আমি আর বেশিদিন জীবিত থাকব না। আমার অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু শাসনকার্য পরিচালানোর জন্য সময় পাইনা। আমার আর সিংহাসনের প্রয়োজন নেই, বেগম।
বাবরের অন্তরে দুঃখ দেওয়ার জন্য মাহিম বেগমের অন্তর অনুশোচনায় ভরে উঠলো। তিনি ক্ষমা খুঁজার ভংগীতে বললেন- আমাকে ক্ষমা করবেন, জাহাপনা। আপনি সিংহাসন থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়ে হুমায়ূনকে আমি পত্র লিখতে পারব না।
বাবর দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে বললেন- তাহলে আমাকেই লিখতে হবে। এভাবে বলেই বাবর নির্ভিকারভাবে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে চলে গেলেন।
বাবরের পত্র যথাসময়ে এসে চম্ভল পৌঁছোল।
হুমায়ূন তখন জ্বরে ভূগতেছিলেন। পত্র পড়ে তিনি পিতৃর সিদ্ধান্তের সম্ভেদ পেয়ে বিচলিত হয়ে উঠলেন।
হিন্দু বেগ তখন হুমায়ূনের সাথে ছিলেন। হিন্দু বেগকে ডেকে এনে হুমায়ুন বললেন- হিন্দু বেগ সাহেব, আপনি অতিসত্বর আমাকে আগ্রা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
হুমায়ূন প্রচণ্ড জ্বরে ভুগে একেবারে কাহিল হয়ে পড়ছিলেন। যারজন্য হিন্দু বেগ হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠাতে ভরসা পেলেন না। তিনি হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠানোর পরিবর্তে হুমায়ূনের অসুস্থতার সংবাদ জানিয়ে বাবরের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন এবং দিল্লী থেকে হেকিম ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন।
দিল্লী থেকে হেকিম এসে চিকিৎসা শুরু করলেন যদিও চিকিৎসায় কোনো ফল দিলো না। হুমায়ূনের অসুখ ধীরে ধীরে বেশি হতে লাগলো। জ্বরে ভুগে হুমায়ূনের শরীর একেবারে কয়লার মতো কালো পড়ে গেলো।
হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হিন্দু বেগ বিচলিত হয়ে উঠলেন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি মাহিম বেগমকে ডেকে আনালেন।
হুমায়ূনরে অবস্থা দেখে মাহিম বেগমের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। একমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁর চোখের ঘুম দূরীভূত হলো। দিনরাত তিনি হুমায়ূনের শুশ্রূষা করার সাথে সাথে পুত্রের আশু আরোগ্য কামনা করে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা জানাতে লাগলেন। কিন্তু আরোগ্যের কোনো লক্ষণ না দেখে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন।
হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হেকিমও চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি উন্নত চিকিৎসার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হুমায়ুনকে আগ্রা পাঠানোর পরামর্শ দিলেন- আমার সাধ্যানুসারে চিকিৎসা করলাম। কিন্তু রোগীর অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছেনা। সেজন্য শাহজাদাকে আগ্রা নিয়ে যাওয়াই উচিত হবে। সেখানে চিকিৎসাও ভালো হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন হলে রোগের প্রভাবো কমে আসবে। আসলে চম্ভলের জলবায়ু শাহজাদার স্বাস্থ্যের প্রতিকূলে ক্রিয়া করতেছে।
হুমায়ূন তখন প্রায়ই অচেতন অবস্থায় আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকতেন। সেজন্য হুমায়ূনকে কীভাবে আগ্রা নিয়ে যেতে পারে মাহিম বেগম সেই বিষয়ে হিন্দু বেগের পরামর্শ চাইলেন- বেগ সাহেব, হেকিম সাহেব হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু হুমায়ূনের অবস্থা বর্তমান খুবই কাহিল। সেজন্য বর্তমান অবস্থায় কীভাবে আগ্রা নিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করুন।
মাহিম বেগমের কথা শুনে হিন্দু বেগ চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন- এই অবস্থায় ঘোড়ায় চড়িয়ে আগ্রা নিয়ে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব হবে না। এমনকি পাল্কীতে তুলে নেওয়াও সম্ভব হবে না। সেজন্য বর্তমান আগ্রা নিয়ে যাওয়াটা খুবই কঠিন কাজ হবে।
মাহিম বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- তাহলে উপায়?
হিন্দু বেগ পরামর্শ দিলেন- একটি উপায় অবশ্যে আছে, নৌকাযোগে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাত্রাপথ দীর্ঘ ও কষ্টকর হলেও শাহজাদার কোনো প্রকার অসুবিধা হবে না।
অবশেষে নৌকাযোগে আগ্রা নিয়ে আসার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলো। শুভ দিনবার দেখে হুমায়ূনকে নৌকায় তুলে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করলেন।
দীর্ঘ নৌকাযাত্রার শেষে হুমায়ূনকে নিয়ে আগ্রা পৌঁছোলেন। হুমায়ূন তখনও অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। অচেতন অবস্থায়ই তাঁকে পাল্কীতে তুলে আটজন পাল্কী বাহক হুমায়ূনকে জাফরসন বাগে বয়ে আনতে লাগলো।
হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে আসার সংবাদ পেয়ে বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে হুমায়ূনকে দেখতে দৌড়ে এলেন।
হুমায়ূন অচেতন অবস্থায় পাল্কীতে পড়ে ছিলেন। হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় দেখে হৃদয়ের কোন একটা তন্ত্রী ছিঁড়ে যাওয়া যেন অনুমান হলো বাবরের। পাল্কী বাহকেরা বয়ে আনা পাল্কী মৃতকের শবদেহ বয়ে আনা শবাধারের মতো অনুমান হতে লাগলেন বাবরের মনে। মুহ্যমানের মতো তিনি স্তব্ধ হয়ে পড়লেন পুত্রের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে।
জাফরসনবাগে আনার পরে হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় অতি সাবধানে এনে বিছানায় শোইয়ে দেওয়া হলো। প্রচণ্ড জ্বরের বিকারে হুমায়ূন প্রলাপ বকতে লাগলেন। সারারাত সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পার হলো। বাবর এবং মাহিম বেগম সারারাত হুমায়ূনের শিতানে বসে কাটালেন। পূর্বে ফর্সা হওয়ার সময়ে কিছু সময়ের জন্য হুমায়ূনের চেতনা ফিরে এলো। শিতানে অবসন্নভাবে বসে থাকা বাবরকে তিনি চিনতেও পারলেন।
হুমায়ূন বিছানায় উঠে বসতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু তিনি উঠতে না পেরে ছট্ফট্ করতে লাগলেন।হঠাৎ তাঁর মাথা একদিকে ঝোঁকে গেল এবং তিনি অচেতন হয়ে বিছানায় ঢলে পড়লেন।
হুমায়ূনের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠলো। তিনি আবার প্রলাপ বকতে লাগলেন- আমি.....আপনার সেবায়....... আপনার অবর্তমানে....না…..না....।
হুমায়ূন যেন কিছু একটা স্বপ্ন দেখছিলেন। একবার তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- এগিয়ে যাও....... আক্রমণ কর........তাকে হত্যা কর.....না না, চলে গেলো। দাঁড়িয়ে পড়.....
দীর্ঘদিন চললো এই সংকটাপন্ন অবস্থা। হেকিম রোগ নিরাময়ের জন্য নিয়মিতভাবে ওষুধ প্রয়োগ করে যেতে লাগলেন যদিও রোগ নিরাময়ের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। রোগীর অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যেতে লাগলো।
একমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় মাহিম বেগম শোকে ভেঙে পড়লেন। বন্যার জলের মতো তাঁর চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরতে লাগলো।
বাবরও বিচলিত হয়ে উঠলেন। প্রত্যেকটা কঠিন পরিস্থিতিতে সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করায় অভ্যস্ত ছিলো। এবারো তার ব্যতিক্রম হল না। সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করতে লাগলো। তবে, এবার তিনি নিজেই বুদ্ধিহীন। স্বয়ং তাঁকেও সান্ত্বনা দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লো।
বাবরকে শোকাভিভূত এবং বিচলিত দেখে শেখ-উল-ইসলাম বাবরকে সান্ত্বনা প্রদানের উদ্দেশ্যে বললেন- জাহাপনা আল্লাহর উপরে বিশ্বাস রাখুন। ধৈর্য হারাবেন না। আল্লাহই শাহজাদাকে নিশ্চয় আরোগ্য করবেন। তবে শাহজাদার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ হেকিমও অসফল। শেখ-উল-ইসলাম রহস্যময় ভঙ্গীতে বলতে লাগলেন- আমার ধারণা রোগের অন্তরালে নিশ্চয় কোনো অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে। হয়তো আল্লাহ আপনার থেকে কোরবাণি খুঁজতেছেন। আপনি কোনো মহামূল্যবান জিনিস আল্লাহর নামে দান করুন, জাহাপনা।
মহামূল্যবান জিনিস! মাহিম বেগম ইতিমধ্যে অনেক ভেড়া আল্লাহর নামে কোরবাণি করে দুস্থ-গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণ করেছেন। গরিবদের সহায় করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। মাহিম বেগম এই কথা ভেবেই হুমায়ূনের আরোগ্য কামনায় মুক্তহস্তে দান-খয়রাত করতেছেন। শেখ-উল-ইসলাম আবার কী মহামূল্যবান জিনিস দান করার কথা বলছেন!
বাবর এইসব কথা ভাবা-গুণা করে থাকতেই শেখ-উল-ইসলাম আবার বললেন- জাহাপনা, আপনি সেই বড় হীরাখণ্ড আল্লাহর নামে দান করুন।
কোন হীরা? কহিনূর? বাবর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ, জাহাপনা। কহিনূর হীরা। শেখ-উল-ইসলাম সন্মতিসূচক মাথা নাড়িযে বললেন।
বাবর শেখ-উল-ইসলামের কথায় আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠলেন। কহিনূর হীরার মূল্য একশত মোন সোনার মূল্যের সমান। হীরাখণ্ড হুমায়ূনই তাঁকে এনে দিয়েছিলো। হীরাখণ্ড হুমায়ূনের হাতে আসার বিস্ময়কর কাহিনীর কথা বাবরের মনে পড়ে গেলো। হুমায়ূনের মুখে হীরাখণ্ডের কাহিনী শুনে বাবর অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠেছিলেন হিন্দু রমণীর ত্যাগের কথা ভেবে।…
সেটা ছিলো পানীপত যুদ্ধ বিজয়ের পরে প্রথম দিল্লীতে আসা সময়ের কথা।
বাবর সেদিন সন্ধ্যেবেলা যমুনা নদীর বুকে দুই মহলার একটি নৌকায় বসে হিন্দু স্বামীর চিতায় উঠে মহিলাদের আত্মদাহের বিস্ময়কর কাহিনীর কথা ভেবে বিচলিত হয়ে কবিতা লিখছিলেন। এমন সময় চারটে পাল খাটানো ভব্য সুসজ্জিত একটি নৌকা এসে বাবরের নৌকার নিকটে থেমে গেলো।
রক্ষী একজন উচ্চকণ্ঠে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো- কে? কার নৌকা?
সেই নৌকাটা থেকে উত্তর এলো- শাহজাদা হুমায়ূনের নৌকা। শাহজাদা জাহাপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন।
কথাটা বাবরের কর্ণগোচর হলো। বাবর নিজেও হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে রয়েছিলেন। যারজন্য রক্ষী সেনাটি কোনো মন্তব্য করার আগেই বাবর রক্ষী সেনাটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শাহজাদাকে আসতে দাও।
কিছুক্ষণ পরেই হুমায়ূন বাবরের নিকটে এলেন। হুমায়ূন পিতৃর সাথে কুশল সংবাদ বিনিময় করে কোমরবন্দ ঢিলা করে বুকের মধ্যে লুকিয়ে আনা কারুকার্যখচিত ছোট সুদৃশ্য বাক্স একটি পিতৃর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই বাক্সটা খুলে দেখুন, আব্বা হুজুর।
বাবর আস্তে আস্তে বাক্সের ঢাকনা খুললেন। বাক্সের ভেতরে মখমলের কাপড়ের উপরে সযত্নে রক্ষিত তারার মতো ঝলমলে একখণ্ড পাথর দেখে তাঁর চোখ ছানাবড়া করতে লাগলো। এটা কী? আখরোট একটার সমান বড়। বাবর জীবনে অনেক হীরা দেখেছেন; কিন্তু এতো বড় হীরা! এতো বড় হীরা দেখেছে বলে তাঁর মনে পড়ছে না। হীরা এতো বড় হতে পারে বলে তিনি কোনোদিন কল্পনাও করেন নি।
বাবর আশ্চর্যচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- এটা কীরকম পাথর?
এটা হীরা। হুমায়ূন গর্বসহকারে বললেন।
পাথর থেকে রশ্মি বিকিরণ হচ্ছিল। বাবর পাথরখণ্ড হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন- ওজন কত?
সাত-আট মিস্কাল হবে। (এক মিস্কাল প্রায় ৪.৬৮ গ্রামের সমান)।
এতো বড় হীরা?
আব্বা হুজুর, আমি একজন জহুরিকে হীরাখণ্ড পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি, এটা বিখ্যাত কহিনূর হীরা। পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় হীরা দ্বিতীয়টি নেই। সিন্দুক ভর্তি সোনার চেয়েও এর মূল্য বেশি।
আমি শুনেছি, সুলতান আলাউদ্দিনের একখণ্ড বড় হীরা রয়েছে। কথিত রয়েছে যে, সেই হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে একটি বিশাল সাম্রাজ্যের লোকের একমাসের আহার্যের খরচ অনায়াসে চালানো যাবে। বাবর বললেন।
জহুরি বলা মতে, কহিনূর হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর লোকের আড়াই দিনের আহার্যের ব্যবস্থা করা যাবে। এভাবে বলেই হুমায়ূন খিল খিল করে হেসে ফেললেন।
আপনি হীরাখণ্ড কোথায় পেলেন?
হুমায়ূন আমতা আমতা করে বললেন- গোয়ালিয়রের রাজার তরফ থেকে আমি দানসূত্রে পেয়েছি।
দানসূত্রে পেয়েছেন? কিসের বিনিময়ে?
হুমায়ূন কাহিনী শুরু করলেন- আব্বা হুজুর, আপনি হয়তো শুনেছেন, মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধরেরা বিগত একশত বছর গোয়ালিয়রের শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। দিল্লীর সুলতানদের বিরুদ্ধে তাঁরা অনেকদিন যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধেও তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। ইব্রাহীম লোডীও তাঁদের প্রথমাবস্থায় পরাভূত করতে পারেন নি। কিন্তু শেষমুহূর্তে তাঁরা গোয়ালিয়র সহর ছেড়ে শস্মাবাদ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
হ্যাঁ, বাবর সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, গোয়ালিয়রের মহারাজাদের বীরত্বের অনেক কাহিনী আমি শুনেছি, কিন্তু তার সাথে কহিনূরের সম্পর্ক কী?
হুমায়ূন দানসূত্রে হীরাখণ্ড পাওয়ার যে কাহিনী বলে গেলেন তার সারাংশ এরকম-
পানীপত যুদ্ধে জয়ের পরে বাবরের অশ্বারোহী বাহিনী হুমায়ূনের নেতৃত্বে বাবরের আগেই দিল্লী এসে বিনাযুদ্ধে দিল্লী দখল করার পরে শস্মাবাদ আক্রমণ করে দখল করেছিলেন।
শস্মাবাদ দখল করার পর হুমায়ূন সসৈন্যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে এবং দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করার পর মহারাজার বিধবা পত্নী, দু’জন যুবতী কন্যা এবং বিশ বছরের একটি পুত্রের সাথে হুমায়ূনের সাক্ষাৎ হয়।
মহারাজার বিশ বছরের পুত্র তখন হুমায়ূনকে আশ্বাস দিয়ে বলেন- ইব্রাহীম লোডী শুধু আপনাদেরই শত্রু ছিল না- সে আমাদেরও শত্রু ছিলো। সে নিধন হওয়াতে আমরাও আনন্দিত। এখন আপনি আমাদের শস্মাবাদ থেকে গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য অনুমতি দিন।
হুমায়ূন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন- গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য আপনাদের আমি অনুমতি দিতে পারব না? আপনারা আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত বৈচ বেগ আপনাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে।
এভাবে আশ্বাস দিয়ে হুমায়ূন দূর্গের বাইরে তাঁবু খাঁড়া করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাতে হঠাৎ দূর্গের ভেতরে চিৎকার হুলস্থূলের শব্দ শুনে হুমায়ূনের ঘুম ভেঙে যায়। হুলস্থূলের উৎস খুঁজে তিনি দেহরক্ষী সৈন্য নিয়ে দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করেন।
দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে হুমায়ূন রাজপ্রাসাদের দিকে দৌড়ে আসেন। কারণ চিৎকারের শব্দ রাজপ্রাসাদ থেকে আসছিলো। রাজপ্রাসাদের প্রবেশদ্বারে বৈচ বেগের একজন সৈন্য রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন। মৃত সৈনিকটি থেকে অল্পদূরে আঠারো বছরের একজন রাজকুমারী সিরির উপরে বসে শাড়ীর আঁচল দিয়ে নিজের অনাবৃত বুক ঢাকতে চেষ্টা করছিলেন এবং কয়েকজন সৈনিক রাজকুমারকে ঘিরে অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
ঘটনাটা ছিলো এরকম-
স্বর্গীয় মহারাজার যুবতী কন্যা দু’টিকে দেখে বৈচ বেগের হৃদয়ে কামনার অগ্নি জ্বলে উঠেছিলো। কামনা চরিতার্থ করার জন্য সে কয়েকজন সৈনিকসহ মৃত সৈনিকটিকে রাজকুমারীকে ধরে আনতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।
মৃত সৈনিকটি রাজকুমারীকে বলপূর্বক ধরে নেওয়ার চেষ্টা করতেই তাঁর ভ্রাতৃ সেখানে এসে উপস্থিত হোন এবং ভগ্নীর ইজ্জত বাঁচাতে তিনি সৈনিকটিকে আক্রমণ করে নিহত করেন।
রাজকুমারের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে হুমায়ূন ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন এবং তিনি সৈনিক কয়জনের দিকে রোষায়িত নেত্রে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দেন- রাজকুমারকে ছেড়ে দাও। ভগ্রীর ইজ্জত বাঁচাতে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া বীরকে তোমরা সন্মান প্রদর্শন করা উচিত।
তবুও সৈনিক কয়জন নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তখন তিনি বাবরের নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন- বাদশাহ বাবর হিন্দুস্থানের লোকদের সাথে শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। সে কথা তোমরা এখনই ভুলে গেলে নাকি? শাহী নির্দেশ অমান্য করে বৈচ বেগ অন্যায় করেছে। এভাবে বলে তিনি তাঁর সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, এখনই তাকে বন্দি করে বন্দিশালে ভরিয়ে রাখগে’ এবং তাকে সহায় করা সৈনিকদের দশ ঘা করে চাবুক মেরে ছেড়ে দাওগে’।
এভাবে আদেশ দিয়ে হুমায়ূন রাজকুমার এবং রাজকুমারীকে নিয়ে বিধবা রাণীর নিকট এলেন।
মহারাণী সভ্রান্ত এবং সুশিক্ষিতা ছিলেন। তিনি কয়েকটা ভাষা জানতেন। তিনি হুমায়ূনের দিকে সুদৃশ্য একটি বাক্স বাড়িয়ে ধরে ফার্সি ভাষায় বললেন- এই বাক্সের ভেতর আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি রয়েছে। কিন্তু আমার জন্য সকল মূল্যবান জিনিসের চেয়ে আমার সন্তানরা বেশি মূল্যবান। আপনি আমার কন্যার সন্মান রক্ষা করেছেন- আমার পুত্রের জীবন রক্ষা করেছেন। এমন কী আমার জীবনও আপনি রক্ষা করেছেন। সেজন্য এই বাক্সের ভেতরে রক্ষিত হীরাখণ্ড কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপে আপনাকে প্রদান করতে আমাকে অনুমতি দিন।
এটাই সেই হীরাখণ্ড। শেখ-উল-ইসলাম সেই হীরাখণ্ড দান করার জন্য পরামর্শ দিতেছেন। কিন্তু হীরাখণ্ড আমি কাকে দান করব? শেখ-উল-ইসলামকে, না অন্য কাউকে? কারণ আল্লাহ নিজেতো কোনো পার্থিব জিনিস হাত পেতে গ্রহণ করেন না। সেজন্য আল্লাহর সৃষ্ট মানুষকে দান করতে হবে। কিন্তু কে সে? বাবর এভাবে মনে মনে ভেবে শেখ-উল-ইসলাম-এর মনোভাব মাপতে বললেন- কিন্তু আল্লাহর নামে কাকে দান করা যায়?
আল্লাহর নামে কোন জিনিস দান করলে সেই জিনিসটি ইসলাম ধর্মীয় গুরুর প্রাপ্য এবং শেখ-উল-ইসলামই তাঁদের ভেতরে প্রধান। শেখ-উল-ইসলাম সমিধান দিলেন।
বাবর ভাবলেন, শেখ-উল-ইসলাম সরাসরি নিজের কথা বলতে সাহস না পেয়ে নিশ্চয় এভাবে ঘুরিয়ে পাকিয়ে বলছেন। সেজন্য বাবর কিঞ্চিত ক্ষোভের সহিত ভাবলেন, আল্লাহর নামে দান করা হীরাখণ্ড অবশ্যে হজরত মূর্তজার মাজারেও দেওয়া যায়! কিন্তু ভাবী সম্রাট হুমায়ূনের রাজকোষের সবচেয়ে মূল্যবান হীরা কোন মাজারে প্রদান করলে নিশ্চিয় এই লোভী বৃদ্ধের হাতে এসে পড়বে! শেখ-উল-
ইসলাম হুমায়ূনের সংকটজনক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে পিতৃ-মাতৃর নিকট থেকে হীরাখণ্ড ছিনিয়ে নিতে চাইছেন। কারণ তিনি জানেন, বর্তমান পুত্রের আরোগ্যের জন্য পিতৃ-মাতৃ নিজের জীবন পর্যন্ত দান করতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
সেজন্য বাবর ভাবলেন, হীরার পরিবর্তে তিনি নিজের জীবন আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। ভাবামতেই তিনি শেখ-উল-ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলেন- মৌলানা সাহেব, আপনি স্পষ্ট করে বলুন, আমার জীবনের চেয়েও হীরাখণ্ডের মূল্য বেশি নাকি?
জাহাপনা, হাজার হাজার কহিনূর হীরা আপনার কনিষ্ঠ আঙুলের সমানও হবে না।
আচ্ছা, সেটাই যদি হয়, সবাই যাতে শুনতে পারে এরূপ উচ্চকণ্ঠে বাবর বললেন- আমি হুমায়ূনের জীবনের পরিবর্তে একটা বড় জিনিস কোরবাণি করব। আমার সেই কোরবাণি কোন আল্লাহর বান্দা নয়, স্বয়ং আল্লাহ-ই গ্রহণ করুন।
কক্ষে সমবেত সবাই ভয়ার্ত এবং বিস্মিতভাবে বাবরের দিকে তাকালেন। বাবর বসা থেকে দাঁড়িয়ে অচেতন হয়ে পড়ে থাকা হুমায়ূনের শিতানে এলেন।
বাবর আচ্ছন্নের মতো প্রার্থনার সুরে বলতে লাগলেন- মোর প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনের জন্য আমি প্রার্থনা জানাই যে- হে পরওয়ার দেগার আল্লাহ, আপনি হুমায়ূনকে ভয়ানক কঠিন রোগ থেকে মুক্ত করে আমার শরীরে সেই রোগ বিস্তার করে দিন।
বাবরের প্রার্থনা শুনে কক্ষে সমবেত সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন।
বাবর প্রার্থনা করে করে হুমায়ূনের বিছানার চতুর্দিকে তিনিবার প্রদক্ষিণ করলেন- হে পরোয়ার দেগার, আমি বাদশাহ জহিরুদ্দিন বাবর আমার নিজের জীবন প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনকে দান করলাম। আপনি আমার কোরবাণি কবুল করুন, আল্লাহ—হুমায়ূনকে আপনি আরোগ্য করে দিন।
মাহিম বেগমো স্তম্ভিত। তিনি ক্রন্দন করতে ছিলেন। ক্রন্দন বন্ধ করে তিনি ভয়ার্ত, আশান্বিত দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ শেখ-উল-ইসলাম বাবরের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন হুমায়ূন তখনই রোগশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াবেন এবং বাবর সেই রোগশয্যায় পরে যাবেন।
কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বাবর মুখের ভেতরে কিছু বড়বড়াতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণ মৌন হয়ে থেকে চিন্তাক্লিষ্টভাবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে হুমায়ূন সত্যিই আরোগ্য হয়ে উঠলেন।
* * *
বর্ষা ঋতুর শেষে শরত ঋতু আগমন হলো। মেঘশূন্য পরিস্কার রাতের আকাশ। নীল আকাশে তারাগুলো মুক্তার মতো ঝলমল করে জ্বলতেছিলো।
বাবর নির্মল আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। কয়েকদিন যাবত তিনি অনিদ্রা রোগে ভূগতেছেন। জ্বরেও তাঁকে দিগদারি দিতেছে কয়েকদিন ধরে। রাতে রাতে জ্বর উঠাটা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়াছে।
বাবর তারাপূর্ণ আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর অনুমান হলো, যেন আকাশটা কাঁপতেছে এবং তারাগুলো বিচরণ করতেছে। শরীরে জ্বর উঠা অবস্থায় বাইরে বেরোলেই যেন তাঁর এরূপ অনুমান হয় আজকাল। কথাটা তিনি কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করতেছেন।
দিনের বেলা সভাসদ, হিতাকাংক্ষী এবং অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন পূর্বের মতোই বাবরের খোঁজ-খবর নেন- প্রয়োজনীয় শলা-পরামর্শ খুঁজে। অবশ্যে সবাই যেন তাঁর সাথে আজকাল কম কথা বলে। তাঁর প্রতি সবার ব্যবহার যেন কিছু পরিবর্তন হওয়াটাও তিনি লক্ষ্য করে আসছেন। সবার ব্যবহার যেন পূর্বের থেকে কিছু গম্ভীর এবং শিষ্টতাপূর্ণ। কী যেন এক দুঃশ্চিন্তার ছাপ সবার চোখে-মুখে। সবাই যেন
তাঁর সাথে আগের থেকেও অধিক অন্তরঙ্গ হতে চায়। অনুকম্পা দেখাতে চায়। মৃত্যু পথযাত্রীর সাথে করা আচরণই যেন সবাই করছে তাঁর সাথে। বাবর কিন্তু এগুলো লক্ষ্য করে অস্বস্তি অনুভব করেন। সবারই একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, পুত্রের প্রাণরক্ষার জন্য পিতৃর দ্বারা করা কোরবাণি আল্লাহ স্বীকার করেছেন। বাবরের প্রার্থনা অনুসারেই যেন আল্লাহ হুমায়ূনকে নিশ্চিত মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং সেই মৃত্যুর অদৃশ্য তরবারি যেন যেকোনো মুহূর্তে বাবরের মাথায় আঘাত করার জন্য উদ্যত হয়ে রয়েছে।
কোন মৃত্যু পথযাত্রী লোকের প্রতি প্রদর্শন করা সভ্রমপূর্ণ ব্যবহার, অনুকম্পার হাসি, শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার, অভিবাদন সুখপ্রদ হতে পারে না। বাবরের ক্ষেত্রেও সেটাই হলো। তাঁর প্রতি প্রদর্শন করা অতিরিক্ত আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার দেখে দেখে তাঁরো ধীরে ধীরে অস্বস্তি অনুভব হতে লাগলো। সেজন্য তিনি ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে লাগলেন। অধিকাংশ সময় তিনি মাহিম বেগমের সান্নিধ্যে এবং ‘খিলাবত গাহে’ কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন।
এদিকে বাবরের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো। তাঁর শরীরে কোথাও কোনো ফুট ছিলো না। স্পর্শ করলে কোন যন্ত্রণাও তিনি অনুভব করতেন না। অথচ তিনি যেন হৃদয়ে কোন কিছু জ্বলে থাকা অনুভব করতে লাগলেন এবং বিষণ্ণ ক্লান্তিতে তাঁর দেহ-মন আলোড়িত হতে লাগলো।
হেকিমগণ বাবরের রোগের প্রকার নির্ণয় করতে না পেরে বিচলিত হয়ে উঠলেন। তাঁরা দিনরাত নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলেন এবং সেই অনুসারে চালিয়ে যেতে লাগলেন ওষুধপথ্যের আতিশয্য। বিষের প্রভাবে রক্তের দোষ হয়েছে বলে অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্তে এলেন এবং প্রচুর পরিমাণে বেদানার রস পান করানোর ব্যবস্থা করলেন।
কিন্তু কোন ওষুধেই রোগের উপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না। বাবর দিনে দিনে কৃশকায় হয়ে পড়লেন এবং তাঁর জীবনী শক্তিও যেন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসতে লাগলো।
বাবরের স্বাস্থ্যের অবনতির সংবাদ পেয়ে হুমায়ূন চম্ভল থেকে আগ্রা এলেন।
বিশাল শয়নকক্ষে সাদা বিছনায় কৃশকায় পিতৃকে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকতে দেখে হুমায়ূনের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। বিষাদ বেদনাই তাঁর হৃদয় চেপে ধরলো।
হুমায়ূন পিতৃর শিতানে বসে শুকনো অস্থিসার শূন্য মলিন হাতে চুমু খেলেন।
খানজাদা বেগম বাবরের শিতানে বসে ময়ূরের পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলেন। হুমায়ূনকে বিচলিত দেখে তিনি সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- ধৈর্য ধরুন, শাহজাদা। মনে সাহস সঞ্চয় করুন।
হুমায়ূন পিসির কথার উত্তর না দিয়ে বাবরকে উদ্দেশ্য করে ব্যথা বিগলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনার কী হয়েছে আব্বা হুজুর? এভাবে জিজ্ঞাসা করেই হুমায়ূন অভিযোগের সুরে বললেন- এটা অন্য কিছুই নয়, এটা আমার জন্য করা কোরবাণির ফল।
হুমায়ূনের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে মাহিম বেগমের বুক হাহাকার করে উঠলো। কথা বলতে অসমর্থ হয়ে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবর সতৃষ্ণ নয়নে হুমায়ূনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন; কিন্তু শ্বাসকষ্টের জন্য তিনি কথা বলতে সক্ষম ছিলেন না। শ্বাসকষ্ট অল্প কম হওয়াতে তিনি থেমে থেমে ফিসফিস করে বললেন- আমার পুত্র! আমার রোগ এখন রক্তে মিশে গেছে।
আব্বা হুজুর আমাকে আদেশ দিন....আপনাকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমি সব করতে প্রস্তুত।
আমার রোগ সম্পর্ণরূপে আরোগ্য করাটা সম্ভব নয়, পুত্র। যন্ত্রণা শুধু লাঘব করা সম্ভব।
কীভাবে? বলুন, আব্বা হুজুর আমি সেটাই করব। হুমায়ূন ব্যগ্রভাবে বললেন।
উজির-এ-আজমকে ডাকুন.......সাথে পাত্র-মিত্রদেরকেও আসতে বলবেন। আমি তাঁদের সন্মুখে আপনার হাতে শাসনভার সমর্পণ করব।
কিন্তু আব্বা হুজুর, আপনি বিশ্বাস করুন....আপনার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কহিনূর হীরার চেয়েও অধিক মূল্যবান আমার জন্য।
এটা এখন প্রয়োজন, পুত্র। আমি যা বললাম তাই করুন। বাবর দৃঢ়ভারে হুমায়ূনকে নির্দেশ দিলেন।
খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর বিছানা ঠিক করে দিলেন। বাবর মাথার তলে আরও একটি বালিশ দিতে বললেন।
অর্ধশায়িত হয়ে দুই একটা প্রয়োজনীয় কথা বলে বাবর ‘দেওয়ানী খাসে’ যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।
দেওয়ানী খাসে এসে বাবর সবার সম্মুখে হুমায়ূনের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন। পিতৃঋণ পরিশোধ করে বাবর প্রাসাদে ফিরে এসে আবার বিছানায় শোয়ে পড়লেন।
* * *
বাবর তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো বিছানায় পড়ে ছিলেন। বাদশাহ হুমায়ূন, মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগম বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন।
মাহিম বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন- জাহাপনা, হুমায়ূন নিজেকে আপনার বর্তমানে হিন্দুস্থানের মতো বিশাল সাম্রাজ্যের গুরুদায়িত্ব বহন করার যোগ্য বলে বিবেচনা করতে সাহস পাচ্ছে না।
হুমায়ূনের হাতে সিংহাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে বাবর কিছু স্বস্তি অনুভব করছিলেন। মাহিম বেগমের অভিযোগ শুনে তিনি বললেন- এটা ঋণ, বেগম। নিজের সন্তানের হাতে ঋণ ফিরিয়ে দিতে পেরে আজ আমি মুক্ত। বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমি তৈমূরের উত্তরপুরুষ। তৈমূরের উত্তর পুরুষদের অধিক সংখ্যকই নিজেদের মাঝে মারামারি করে মরেছে। পুত্র পিতৃকে হত্যা করেছে, ছোট ভাই বড় ভাইকে নিধন করেছে। সবাই লোভ এবং কূট-চক্রান্তের শিকার হয়েছে। তাঁদের ভেতরে যারা সৎ ছিলেন, তাঁরা নিজের সজ্জনতার বলি হয়েছেন। খানজাদা বেগমের দিকে ইশারা করে বাবর আবেগিক কণ্ঠে বললেন- যেভাবে আপাজান আমাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারাটা জীবন বন্দিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। আপাজান ভ্রাতৃর মঙ্গলের জন্য নিজের সুখ-স্বচ্ছন্দ, কামনা-বাসনা ত্যাগ করে নির্বাসিতা জীবন অতিবাহিত করছেন। আপাজানের নিকট থেকে আমি ত্যাগের পাঠ শিখেছি। হুমায়ূনও নিজের ভ্রাতৃ, সন্তান-সন্ততিকে আত্মত্যাগ ও সজ্জনতার পাঠ শিখাতে হবে।
বাবর মাথা ঘুরিয়ে শিতানের দিকে টানিয়ে রাখা রেশমি পর্দার দিকে তাকালেন। হুমায়ূন দেখলেন শিতানের দিকে মাটির মূর্তির মতো নির্বিকার নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাহির বেগ।
তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বাবর বললেন- তাহির বেগ, আপনি আমার গ্রন্থটি এখানে নিয়ে আসুন।
পর্দার পেছনে দেয়ালের সাথে সংলগ্ন একটি রেক। রেকের মাঝে সাজিয়ে রাখা ছিলো বিভিন্ন মূল্যবান গ্রন্থ। গ্রন্থসমূহের মাঝে পাকাবান্ধা একটি গ্রন্থ একটি চামড়ার থলেতে ভরিয়ে সযত্নে রাখা ছিলো। বাবরের নির্দেশ পেয়ে তাহির বেগ রেক থেকে থলেটা বের করে এনে সসম্মানে বাবরের হাতে দিলো। বাবর থলেসহ গ্রন্থটি দু'হাতে ধরে হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- মনে পড়ে নাকি পুত্র, একদিন কাবুলের নিকটে একটি পাহাড়ে বসে থাকা অবস্থায় আপনি আমার আত্মজীবনী খুঁজার কথা? বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই যে নিন, আপনি খুঁজা সেই আত্মজীবনী। যতদূর সম্ভব আমার কথাগুলো আমি লিখে শেষ করেছি। এই গ্রন্থটি লিখতে আমি বার বছর সময় নিয়েছি।
সেদিন বাবর বলা কথাটা হুমায়ুনের মনে পড়ে গেলো। বাবর সেদিন একটি পাহাড়ের উপরে বসে নিজের আত্মজীবনী লিখছিলেন। কৌতূহলবশতঃ হুমায়ূন পাহাড়ের উপরে চড়ে গিয়ে বাবরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- কী করছেন, আব্বা হুজুর?
বাবর কাগজ কলম পাশের একখণ্ড পাথরের উপরে রেখে বলেছিলেন- আমার জীবনের ঘাত-সংঘাত, অভিজ্ঞতা-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয়ের সত্য কাহিনী লিখছি, পুত্র।
হুমায়ূন বালকসূলভ কৌতূহল প্রকাশ করে বলেছিলেন- আমি পড়তে পারব নাকি, আব্বা হুজুর?
বাবর তখন নির্বিকারভাবে বলছিলেন- নিশ্চয় পারবেন। তবে, এখনই নয়। কিতাপটি লিখা সমাপ্ত হলে তখন পড়তে পারবেন। একটা কথা জেনে রাখুন, এই কিতাপটি শেষ হওয়া মানে আমার জীবনের অন্তিম সময় উপস্থিত হবে। এভাবে বলে বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
বাবর বাড়িয়ে ধরা গ্রন্থটি হুমায়ূন দু'হাতে ধরে মাথায় স্পর্শ করলেন। তারপর গ্রন্থটি মাথা থেকে নামিয়ে চুমা খেলেন। চুমা খাওয়ার সময়ে হুমায়ূনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে একফোঁটা জল গ্রন্থের উপরে পড়ল।
বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমার অন্তিম ইচ্ছার কথা মনে রাখবেন। এই গ্রন্থটি আমার সন্তান-সন্ততিরা পড়া উচিত হবে। এই গ্রন্থটি পড়ে আমি করা ভুলগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি করা না হয় সেই শিক্ষা নিতে হবে। আমার ভালো কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে এবং খারাপ কাজগুলো পরিত্যাগ করতে হবে। এই গ্রন্থটির নকল প্রস্তুত করে সমরকন্দ, তাসকন্দ এবং আন্দিজান পাঠিয়ে দিতে ভুলবেন না। কে জানে, এই গ্রন্থটি-ই হয়তো একদিন হিন্দুস্থান এবং মাউরা উন্নহরের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে!
খানজাদা বেগমের উপলব্ধি হলো, বাবর যেন গ্রন্থটি নয়, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ‘উইল’(ইচ্ছাপত্র) একটি ছেড়ে যাচ্ছেন। তিনি ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না। অশ্রুসজল নয়নে আবেগিক কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন- বাবরজান, আমার প্রাণাধিক ভাই, আমি আপনার বড় বোন। আমি আপনার চেয়ে বয়সে পাঁচ বছরের বড়। যদি আমাদের দু'জনের মধ্যে একজন এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়, নিয়মমতে আমিই আগে যাব। আপনি আমার থেকে আগে যেতে পারবেন না, বাবরজান। বাবরজান.....আমার ভাই......না না। খানজাদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
খানজাদা বেগম ‘বাবরজান' বলে সম্বোধন করার সাথে সাথে বাবর তাঁর শৈশবে ফিরে গেলেন। মনে পড়ে গেলো পিতৃ-মাতৃর কথা। তাঁরা এখন নিশ্চিন্তে শোয়ে রছেছেন মাউরা উন্নহরের মাটিতে এবং তিনি.....মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরে গিয়ে সাথে সাথেই আবার বাস্তবে ফিরে এলেন।
দরবারের আদব-কায়দা অনুসারে বেগ, চাকর-বাকর, পুত্র, প্রিয়তমা পত্নী দ্বারা ‘জাহাপনা’ সম্বোধন বাবরের কছে অসহ্যকর হয়ে উঠলো। সেজন্য তিনি হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমাকে একবার আব্বা বলে সম্বোধন করুন, পুত্র।
আব্বা। আব্বাজান। হুমায়ূন ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
সাথে সাথে মহিলারা সমবেত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন।
সংযোগবশতঃ বাবর আত্মীয় পরিজনের নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ে হেকিম ইউসূফ বেগ এসে সেখানে উপস্থিত হলেন।
বাবর তখন ঘেমে-জেমে উঠেছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। কণ্ঠ থেকে ঘর্ঘর শব্দ বের হচ্ছিলো।
জাহাপনা, আপনি এখন বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। হেকিম ইউসূফ বেগ এভাবে বলে মখমলের সাদা কাপড় দিয়ে বাবরের মুখমণ্ডল মুছে দিলেন। তারপরে মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগমকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করে বললেন- আপনারা বাইরে যান।
উভয়ে নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
হেকিম হুমায়ূনের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- আপনার মাথায় এখন গুরু দায়িত্বের বোজা। আপনিও যান।
বাবরের শুকনো আঙুলে চুমা খেয়ে হুমায়ূন নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং হেকিমো তাঁর পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলেন।
পরিজনবর্গ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে বাবর আবার চেতনা ফিরে পেলেন। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি শিতানের দিকে দাঁড়িয়ে বাতাস করে থাকা তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি বাস্তুকার ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনুন।
তাহির বেগ দরজার কাছে এগিয়ে এসে ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনার জন্য একজন রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন।
শিল্পী ফজিলুদ্দিন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে বাবরের চর্মসার দেহ প্রত্যক্ষ করে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি মরণোন্মুখ বাবরের দিকে না তাকানোর প্রয়াস করে পালেঙের নিকটে বসলেন। তিনি কোনমতে বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, আপনি বিশ্বাস করুন, আপনার সৎকর্ম আপনাকে দীর্ঘজীবী করবে।
এখন আমাকেও মৌলানা বলে সম্বোধন করুন, কারণ আমি সিংহাসন হুমায়ূনকে সমর্পণ করেছি।
কিন্তু আপনার নিকট শায়েরির সিংহাসন এখনও সুরক্ষিত, জাহাপনা। হিরাতে আলীশের নবাইকে সবাই হজরত আলীশের বলে সম্বোধন করতেন। আপনি আমাদের মাতৃভাষাকে আরবি এবং ফার্সির সম মর্যদা সম্পন্ন করে তুলেছেন। আলীশের নবাই জীবিত অবস্থায় এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আপনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে তুলেছেন। সেজন্য রাজ সিংহাসন ত্যাগ করলেও শায়েরির সিংহাসন আপনি কোনদিন ত্যাগ করতে পারবেন না, জাহাপনা।
ধন্যবাদ মৌলানা। আপনি আগ্রা এবং ফতেহপুড় সিক্রিতে আশ্চর্য সৌধ নির্মাণ করেছেন। বেহেস্তের মতো বাগানও আপনি নির্মাণ করেছেন। আল্লাহ যদি আমার আয়ু আরও বাড়িয়ে দিতেন, তাহলে আমার অনেক দিনের স্বপ্ন.....সমরকন্দের ‘বিবি খানম’ মাদ্রাসার মতো একটি সৌধ নির্মাণ করাতাম। কী মনোরম সুন্দর সেই মাদ্রাসার সৌধ! আপাজানের নামে সেরকম একটি সৌধ নির্মাণ করা উচিত।
খানজাদা বেগমের নাম শুনে ফজিলুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। বয়সের আঁচড়েও ফজিলুদ্দিন এবং খানজাদা বেগমের পবিত্র প্রেমে ফাটল ধরাতে পারেনি। এখনও পরস্পরে পরস্পরকে আগের মতোই ভালবাসেন। অবসর সময়ে একজন আরেকজনের কথা ভেবে পুলক অনুভব করেন। সেজন্য খানজাদা বেগমের নামে নামকরণ করে সৌধ নির্মাণের কথা শুনে তিনি আগ্রহ সহকারে বললেন- আসলে মহিলাদের নামে নামকরণ করে সুন্দর সুন্দর সৌধ নির্মাণ করে মহিলাদের যশ ও গৌরব বৃদ্ধির পরম্পরা পূর্ব থেকেই চলে আসছে, জাহাপনা। সমরকন্দের বিবি খানম মাদ্রাসা বিখ্যাত মাদ্রাসা। হিন্দুরাও মহিলাদের খুব সন্মান করেন। তাঁরা যেসব দেব-দেবীর আরাধনা করেন তার ভেতর দেবীও রয়েছে--লক্ষ্মী, সরস্বতী, পার্বতী প্রভৃতি।
মৌলানা, আমার আপাজান খানজাদা বেগম, আপনি জানেন, নিষ্ঠুর নিয়তি ...…..আপনাদের দু'জনকে সুখী হতে দিলে না। আমার জন্যই আপনাদের স্বপ্ন বাস্তাবায়িত হলো না.……...বাবর আবার পূর্বের প্রসংগে ফিরে এলেন- মাদ্রাসা.....যার স্বপ্ন আপনি অনেকদিন থেকে দেখে আসছেন......যদি নির্মাণ করতে পারেন.......সেই মাদ্রাসার নাম ‘খানজাদা বেগম’ রাখবেন।
আপনি আমার মনের কথা বলেছেন, জাহাপনা। এটা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। ফজিলুদ্দিন আবেগিকভাবে সহজ সরল ভাষায় বললেন- যদি সেই সব কাজ সফল করার জন্য আয়ু আমাকে সহায় না করে, তাহলে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সেই দায়িত্ব আমার পুত্রকে দিয়ে যাব। সে হিন্দুস্থানী কারিকরের সাথে যুক্ত হয়ে নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করবে।
বাবর আবার ঘামে ভিজে উঠলেন। রেশমি সাদা কামিজ তাঁর শরীরে লেগে ধরলো।
মামাজান, তাহির বেগ শংকিত কণ্ঠে বললো- হেকিমের নির্দেশ— জাহাপনাকে যেন বেশি বিরক্ত করা না হয়।
ফজিলুদ্দিন সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বাবরের হাতে চুমা খেলেন।
ইতিমধ্যে বাবরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিলো। যারজন্য তিনি হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে লাগলেন- আপনার নিকট আমার..........আরও একটি অনুরোধ.......কাবুলে একটি বাগান রয়েছে.....সেটা আপনিই নির্মাণ করেছিলেন.......আমার শেষ আরামগাহ........ অনাড়ম্বরভাবে সেখানেই নির্মাণ করবেন।
বিষাদ-বেদনায় ফজিলুদ্দিনের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তিনি মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। শুধু সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে এক প্রকার দৌড়ে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তাহির বেগ বিছানার চাদর পরিবর্তন করে নতুন চাদর পেতে দিলো। বাবর রোগশয্যায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সকল প্রকার পরিচর্যার কাজ তাহির বেগই সামলাচ্ছিলেন। ওষুধ-পথ্য, পিপাসা লাগলে জল, ঘেমে উঠলে ঘাম মুছানো, বাতাস করা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে
কষ্ট হলে সহায় করে দেওয়া এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাজগুলো সে আন্তরিকতা ও দায়িত্ব সহকারে সামলাচ্ছিলেন। এইসব কাজের জন্য তাহির বেগ কাউকে পালেঙের নিকট পর্যন্ত আসতে দিত না।
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে থাকার জন্য সেদিন যথেষ্ট গরম পড়েছিলো। রাতের গভীরতা বেড়ে আসার সাথে সাথে গরমের মাত্রাও বেড়ে আসতে লাগলো। অত্যধিক গরমের জন্য বাবর অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন। যারজন্য তাহির বেগ কয়েকজন পরিচারকের সহযোগে পালেঙ বারান্দায় নিয়ে এলো।
বাইরে আন্দিজানের মতো পাতল ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় বাবর কিছু স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলেন।
বিছানায় শোয়ে বাবর আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
আকাশে তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছিলো। বাবর তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে পড়লেন। তাঁর অনুমান হলো, তারাগুলো যেন বিচরণ করতেছে। একটা তারা যেন আরেকটি তারাকে নির্দয়ভাবে ধাক্কা মারতেছে। দৃশ্যটা বাবরের মনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। প্রচণ্ড ভয়ে তিনি তাহির বেগকে ডাকলেন- তাহির বেগ আমার কাছে আসুন।
তাহির বেগ অল্পদূরে দাঁড়িয়ে পরিচারকদের সাথে কথা বলতে ছিলো। বাবরের ভয়ার্ত কণ্ঠের ডাক শুনে সে দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন- কী হলো, জাহাপনা? কিছু লাগবে নাকি?
বাবর চোখ মুদে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন- আমার শরীর শিথিল হয়ে আসছে, তাহির বেগ।
তাহির বেগ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- হেকিম ডেকে আনব নাকি, জাহাপনা?
না হেকিম ডাকতে হবে না। আপনি আমার শরীরটা একটু মালিশ করে দিন।
আচ্ছা, আপনি শোয়ে থাকুন। আমি আপনার হাত-পা মালিশ করে দিচ্ছি।
তাহির আস্তে আস্তে বাবরের কান্ধ, হাত-পা মালিশ করে দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে পড়ে থেকে বাবর আবার আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
বাবরের অনুমান হলো, যেন কালো আকাশের বিশালতায় তারাগুলো স্থির হয়ে আগুনের আংটার মতো গনগন করে জ্বলতেছে। এবার তিনি ভয় পেলেন না। তারাগুলোর মাঝ থেকে তিনি সপ্তর্ষিমণ্ডল, ধ্রুবতারা এবং পূর্ব আকাশের কৃত্তিকা নক্ষত্র খুঁজতে লাগলেন।
তাহির বেগও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। সে হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠলো-ওই যে, ঔই দিকে দেখুন, জাহাপনা। ঔই তারকারাজ্যের দিকে তাকান। আমাদের কুবা থেকেও তারকারাজ্য এরকমই দেখা যেতো।
বাবরের মন আন্দিজান এবং আন্দিজানে ছোটবেলা অতিবাহিত করা ছেলেবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেলো।
বাবর ছেলেবেলা শুনছিলেন, যে সপ্তর্ষিমণ্ডল হীরার ঘুড়ি। আকাশী বায়ুর সাহায্যে সপ্তর্ষিমণ্ডল মনের আনন্দে হীরার পুচ্ছ নাচিয়ে নাচিয়ে উত্তরোত্তর উপরের দিকে উঠতে থাকে; কিন্তু এক অদৃশ্য সূতো দিয়ে ধ্রুবতারার সাথে বেঁধে রাখার জন্য বেশি দূরে চলে যেতে পারে না।
ছেলেবেলা শুনা সেই কাহিনী বাবরের মনে পড়ে গেলো। আন্দিজানের আকাশের মতো আগ্রাতেও তারার অবস্থান একই হওয়াতে তাঁর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। ফলে তিনি ছেলেবেলার দিনগুলোতে কিছু সময় বিচরণ করতে মনস্থ করলেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
তারাগুলো আবার কুমারের চাকের মতো চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো। হঠাৎ যেন তারার সেই ঘূর্ণি বাবরের উপর খসে পড়লো। পরের মুহূর্তে এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাঁকে সাদরে ধরে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগলো।
এক সুগভীর অনুভূতিতে বাবর চোখ মুদলেন.......।।
সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন