ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ (IDIAN HISTORICAL MOSQUE)
সূচিপত্র
শাহী জামিয়া মসজিদ
পানবাড়ি মসজিদ
পাথর কী মসজিদ
শের শাহ সুরি মসজিদ
জামে মসজিদ, ভিলাই
ফতেহপুর সিক্রি মসজিদ
জামে মসজিদ, দিল্লী
কালান মসজিদ, পুরনা দিল্লী
খিরকি মসজিদ, দক্ষিণ দিল্লী
দিল্লির লাল মসজিদ
মতি মসজিদ, দিল্লী
সোনহেরি মসজিদ, চাঁদনি চ’ক
সুনেহরি বাগ মসজিদ
জিনাত-উল-মসজিদ, সেণ্ট্রাল দিল্লী
সাফা মসজিদ, গোয়া
জামে মসজিদ, আহমেদাবাদ
জামে মসজিদ, চম্পানের
দেলানপুর জামে মসজিদ, পোর্টব্লেয়ার
সিদি সাইয়্যিদ মসজিদ
কাবুলি বাগ মসজিদ
থানেশ্বর পাথর মসজিদ
হযরতবাল মাজার (মসজিদ)
জামিয়া মসজিদ,শ্রীনগর
আলী ফরহাদ খানের মসজিদ
আন্দু মসজিদ, বিজাপুর
এক মিনার মসজিদ , রায়চুর
জামে মসজিদ, বিজাপুর
জামে মসজিদ, কালাবুর্গি
কালী মসজিদ, বিদার
লঙ্গর কি মসজিদ
আলি মসজিদ, শ্রীনগর
মক্কা মসজিদ, বিজাপুর
নব গুম্বাজ, বিজাপুর
সেন্ট্রাল মহল্লু জুমা মসজিদ
চেরামন জুমা মসজিদ
মালিক দিনার মসজিদ
ওদাথিল মসজিদ
বিবি কি মসজিদ, বুরহানপুর
জামে মসজিদ, বুরহানপুর
জামে মসজিদ, চান্দেরি
জামে মসজিদ, মাণ্ডু
লাট মসজিদ. ধর (মধ্যপ্রদেশ)
মতি মসজিদ, ভূপাল
তাজ-উল-মসজিদ
আগকথা
ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদ
ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদগুলি স্থানীয় স্থাপত্য শৈলীর সাথে মিশে দেশের সমৃদ্ধ ইসলামী ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। অঞ্চল, ঐতিহাসিক সময়কাল এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের উপর নির্ভর করে ভারতের মসজিদগুলির নকশা ভিন্ন হয়।
ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদের মূল বৈশিষ্ট্য:
১. স্থাপত্য মিশ্রণ: অনেক ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদ স্থানীয় ভারতীয় শৈলীর সাথে গম্বুজ, মিনার এবং খিলানের মতো ইসলামী স্থাপত্য উপাদানগুলিকে মিশ্রিত করে।
২. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: ভারতের বিভিন্ন অংশের মসজিদ, যেমন উত্তর ভারতে মুঘল যুগের মসজিদ বা দক্ষিণ ভারতের মসজিদগুলি, স্বতন্ত্র আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে।
৩. ঐতিহাসিক তাৎপর্য: দিল্লির জামা মসজিদ বা বাবরি মসজিদের মতো কিছু মসজিদ (ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত) তাদের ইতিহাস এবং স্থাপত্যের জন্য উল্লেখযোগ্য।
৪. সম্প্রদায়ের ভূমিকা: মসজিদগুলি ভারতে প্রার্থনা, সম্প্রদায়ের সমাবেশ এবং ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদের মূল বৈশিষ্ট্য:
১. স্থাপত্য মিশ্রণ: অনেক ভারতীয় ঐতিহাসিক মসজিদ স্থানীয় ভারতীয় শৈলীর সাথে গম্বুজ, মিনার এবং খিলানের মতো ইসলামী স্থাপত্য উপাদানগুলিকে মিশ্রিত করে।
২. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: ভারতের বিভিন্ন অংশের মসজিদ, যেমন উত্তর ভারতে মুঘল যুগের মসজিদ বা দক্ষিণ ভারতের মসজিদগুলি, স্বতন্ত্র আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে।
৩. ঐতিহাসিক তাৎপর্য: দিল্লির জামা মসজিদ বা বাবরি মসজিদের মতো কিছু মসজিদ (ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত) তাদের ইতিহাস এবং স্থাপত্যের জন্য উল্লেখযোগ্য।
তাই ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদগুলি সম্পর্কে কিছু আভাষ প্রদানের জন্য ভারতের মসজিদগুলির বিষয়ে লেখার প্রয়াস করা হয়েছে। তথ্যগুলি উইকিপেডিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।তথ্যবিভ্রাটের জন্য সদাশয় পাঠকের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ইতি- লেখক
শাহী জামিয়া মসজিদ
শাহী জামিয়া মসজিদ ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদোনিতে অবস্থিত। মসজিদটি স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নিদর্শন। সকল শ্রেণীর সমাজ ও ধর্মের মানুষ এই ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন এবং ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে।এটি শহরের কেন্দ্রস্থলে বাজারের কাছে অবস্থিত। শহরের মধ্যে একটি অত্যন্ত ব্যস্ত স্থান।
নির্মাণ ও স্থাপত্য- মসজিদটি বিজাপুর সুলতান সিকান্দার আদিল শাহের অধীনে কর্মরত গভর্নর মাসুদ খান দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। মাসুদ খান ১৬৮৩ সালে আদোনিতে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। মাসুদ খান মোহাম্মদ শাহনাজ নামিয়ার কাছ থেকে ৭৭,০০০ টাকা দিয়ে জমি কিনে এবং মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে মোট ২০,০০,০০০ দিনার ব্যয় হয়েছিলো। এই মসজিদের স্থপতি ছিলেন ইরানিয়ান প্রকৌশলী মাল্লি সান্দাল। এই মসজিদের বিশেষত্ব হল এই মসজিদের আয়তন সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কাবার সমান।
মসজিদের সামনের দিকে ১৫টি কালো স্ল্যাব(নির্মাণের ক্ষেত্রে, স্ল্যাব বলতে সাধারণত একটি সমতল, অনুভূমিক এবং তুলনামূলকভাবে পুরু কংক্রিট প্লেট বোঝায় যা ভবনগুলিতে মেঝে, ছাদ এবং সিলিং তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।) পাওয়া যায়।সেখানে খানে মসজিদ সম্পর্কে আরবি ও ফারসি ভাষায় বর্ণনার পাশাপাশি কিছু কুরআনের কিছু আয়াতও লিখা রয়েছে। কিছু হাদিসও লিখা রয়েছে। মসজিদের বাম ও ডান মিনারের শিকল আরও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে।
পরিবেশ- মসজিদটি মসজিদ কমিটির আওতাধীন দোকানপাট দ্বারা বেষ্টিত। এর বাইরে মসজিদের আশেপাশের এলাকাগুলি হল-
সামনের দিক - বাজার, পি.এন. রোড।
পিছন দিক- মাসউদিয়া আরবি হাই স্কুল, মাসউদিয়া পুরা।
ডান দিক- ফুলের বাজার
বাম দিক- শ্রফ বাজার
মসজিদের চারপাশে একটি সমৃদ্ধ বাজার রয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- মসজিদ কমিটি মসজিদের ভেতরে মাসউদিয়া আরবি হাই স্কুল নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ও পরিচালনা করেন। বিদ্যালয়টি সিদ্দি মাসুদ খানের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
পানবাড়ি মসজিদ
পানবাড়ি মসজিদ, উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।।মসজিদটি ভারতের আসাম রাজ্যের প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে বিবেচিত।মসজিদটি ধুবড়ি শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার (১৬ মাইল) পূর্বে পানবাড়ি এবং রাঙ্গামাটির কাছে জাতীয় সড়ক ১৭-এর পাশে অবস্থিত। ১৫শ থেকে ১৬শ শতাব্দীর এই তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি বাংলার সুলতানির আমলের মহান স্থাপত্য কৃতিত্বের একটি চমৎকার উদাহরণ।
১৪৯৮ সালে কামতা বিজয়ের বিজয় উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বাংলার নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কর্তৃক মসজিদটি নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে, মসজিদের ইতিহাসের সঠিক বিবরণ অনিশ্চিত এবং নির্মাণের সম্ভাব্য তারিখ ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে বাংলার মুঘল গভর্নর দ্বিতীয় মীর জুমলা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে একটি কম প্রচলিত তথ্য রয়েছে। মীর জুমলা সম্ভবত ১৬৬২ সালে আসাম আক্রমণের সময় এই অঞ্চলটি অতিক্রম করেছিলেন এবং তখনই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদ কমপ্লেক্সের মধ্যে ঈদগাহ এবং একটি গভীর কূপ রয়েছে। বিস্তীর্ণ পাকা উঠোন এবং মিনার পরবর্তীতে নির্মিত হয়েছিল।
বলা হয় যে মসজিদটি এক সময গভীর বন দ্বারা বেষ্টিত গিয়েছিলো। ১৯২৮ সালে একজন গ্রামবাসী জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করার সময় রাঙ্গামাটির পাহাড় থেকে মিনার দেখতে পান। এরপর খবরটি ঢাকার নবাবের কাছে পৌঁছায় এবং তিনি বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি দলও পাঠান। তখনই মসজিদটির অস্তিত্বে আসেন।
ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই এলাকার স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে, স্থানীয় জনগণ সরকারের প্রতীকী পদক্ষেপে খুশি নন।
পটভূমি- কোচ শাসকদের রাজত্বকালে রাঙ্গামাটি এলাকা খুবই সমৃদ্ধশালী ছিলো। রাঙ্গামাটি কোচ শাসকদের সীমান্ত চৌকি ছিলো। বাংলার সুলতান এবং মুঘলদের আক্রমণকারী সেনাবাহিনীও রাঙ্গামাটি চৌকিটি ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, এই এলাকাটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সদর দপ্তর ছিল এবং এই মসজিদটি মুসলিম সৈন্যদের প্রার্থনা কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত।
কথিত আছে যে, প্রায় ২০০ বছর আগে এই স্থানের স্থানীয় লোকেরা ঘন জঙ্গলের নীচে পানবাড়ি "পাহাড়"-এ এই মসজিদটি খুঁজে পেয়েছিলেন। তারা এই স্থানটি পরিষ্কার করে সেখানে নামাজ পড়া শুরু করেছিলেন। সম্প্রতি পানবাড়ি "পাহাড়" পবিত্র আসন হিসেবে পরিচিত এবং মসজিদটি পশ্চিম আসামের মানুষের জন্য একটি পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি মসজিদের কাছে ইট-পাথর, পোড়ামাটির প্রাচীন নিদর্শন এবং মুদ্রার ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি আপাতদৃষ্টিতে মুঘল শাসনামলের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। মসজিদটিতে একত্রে ১৫০ জন মুসল্লির নামাজ পড়ার সুবিধা রয়েছে।
পরিচালনা- মসজিদটি স্থানীয় সংস্থা, পানবাড়ি মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি দ্বারা পরিচালিত।কমিটি ইমাম এবং অন্যান্য কর্মচারীদের নিয়োগ করে। ইমাম কর্তৃক ইমামতি এবং নামাজের ইমামতির মতো বিভিন্ন ধর্মীয় সেবা পরিচালিত হয়। মসজিদের ব্যয়ভার মসজিদ কর্তৃকপ্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের অনুদান থেকে বহন করা হয়। পশ্চিম আসামের সমাজে মসজিদটির একটি বিশেষ স্থান থাকার দরুন ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ উদারভাবে মসজিদটিতে দান করে।
পরিবহন- মসজিদটি জাতীয় মহাসড়ক ১৭ এর পাশে অবস্থিত। সেজন্য গুয়াহাটি, ধুবড়ি এবং কোচবিহার থেকে নিয়মিত বাস পরিষেবা পাওয়া যায়। নিকটতম রেলস্টেশন হল ফকিরাগ্রাম।মসজিদ থেকে ৩০ কিলোমিটার (১৯ মাইল) দূরে অবস্থিত। নিকটতম বিমানবন্দর রূপসী বিমানবন্দর মসজিদ থেকে ২১ কিলোমিটার (১৩ মাইল) দূরে অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্র নদ মসজিদ থেকে ৮ কিলোমিটার (৫.০ মাইল) দূর দিয়ে প্রবাহিত।
পাথর কী মসজিদ
বিহারের পাটনা শহরের তখত শ্রী হরমন্দির সাহেবের কাছে গঙ্গা নদীর তীরে পাথর কি মসজিদটি অবস্থিত। জাহাঙ্গীরের পুত্র পারভিজ মির্জা ১৬২১ সালে পাথর কী মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মসজিদের কাঠামোটি পাথর দিয়ে তৈরি, তাই এর নামকরণ হয়েছে পাথর কি মসজিদ। এটি সুলতানগঞ্জ এবং আলমগঞ্জের মধ্যে অশোক রাজপথে অবস্থিত।
পাথর কি মসজিদ স্থানীয় ইসলামী সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও, এই পুরাতন মসজিদটি শহরের একটি প্রধান ল্যান্ডমার্ক(একটি বস্তু (প্রায়শই ভবন) যা দূর থেকে সহজেই দেখা যায়।)।পাথর কি মসজিদকে সাইফ খানের মসজিদ, চিম্মি ঘাট মসজিদ এবং সাঙ্গি মসজিদও বলা হয়।
শের শাহ সুরি মসজিদ
শের শাহ সুরি মসজিদ, শেরশাহী মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনায় অবস্থিত। এটি আফগান স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। শের শাহ সুরি তাঁর রাজত্বের স্মরণে ১৫৪০-১৫৪৫ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটি ধাওয়ালপুরার কাছে পুরব দরওয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত।
ইতিহাস- শেরশাহ সুরির রাজত্বকালে ১৫৪০ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু এবং ১৫৪৫ সালে এটি সম্পন্ন হয়েছিলো।
স্থাপত্য- আফগান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত, এটি ভারতের অনেক ঐতিহাসিক মসজিদের মধ্যে একটি। মসজিদটি পাটনার একটি ল্যান্ডমার্ক। মসজিদের কমপ্লেক্সের ভিতরে একটি সমাধি রয়েছে। সমাধিটি একটি অষ্টভুজাকার পাথরের স্ল্যাব দ্বারা আচ্ছাদিত। শের শাহ সুরি মসজিদের প্রধান আকর্ষণ হল এর কেন্দ্রীয় গম্বুজ, যা চারটি ছোট গম্বুজ দ্বারা বেষ্টিত। এটিকে স্থাপত্যের এক বিস্ময় বলা হবে, যে গম্বুজটি যে কোণ বা দিক থেকে দেখা হোক না কেন, প্রতিবার মাত্র তিনটি গম্বুজ দৃশ্যমান হয়। বিশ্বজুড়ে পর্যটকরা এই মসজিদের সৌন্দর্য এবং অনুপ্রেরণামূলক স্থাপত্যের প্রশংসা করেন।
জামে মসজিদ, ভিলাই
জামে মসজিদ ভারতের ছত্তিশগড়ের ভিলাইতে অবস্থিত একটি সুন্নি ইসলাম মসজিদ। মসজিদটি ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল এবং একসাথে ৩,০০০ মুসল্লির নামাজ পড়ার জন্য উপযুক্ত এবং এটি রাজ্যের এবং এশিয়ার বৃহত্তম মসজিদগুলির মধ্যে একটি। এটি বিশ্বের প্রথম মসজিদ, যা আরবি লিপিতে "ইয়া আল্লাহ" শব্দটির আকারে নির্মিত। মসজিদটি নির্মাণে তিন বছর সময় লেগেছিল এবং ১৯৬৭ সালে সম্পন্ন হয়েছিল।
ইতিহাস-মসজিদটি নির্মাণের আগে ভিলাইয়ের মুসলমানরা তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় নামাজ পড়তেন এবং শুধুমাত্র ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার দিনে ভিলাইয়ের সেক্টর-১-এ নেহেরু হাউস অফ কালচারের কাছে সামূহিক নামাজ পড়ার জন্য একত্রিত হতেন।
ভিলাই ইস্পাত কারখানার মুসলিম নির্বাহীরা একটি কমিটি গঠন করে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য আবেদন করেন। এটি মধ্যপ্রদেশ পাবলিক ট্রাস্ট আইন ১৯৫১-এর অধীনে ভিলাই নগর মসজিদ ট্রাস্ট হিসাবে পঞ্জীয়ন হয়েছিল। ভিলাই ইস্পাত কারখানা মসজিদের জন্য এই কমিটিকে সেক্টর-৬-এ ১,১০০ বর্গমিটারের (১২,০০০ বর্গফুটের) একটি প্লট বরাদ্দ করে। নির্মাণ কাজ ১৯৬৪ সালে শুরু হয় এবং ১৯৬৭ সালে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ১৯৬৭ সালের ৩১ মার্চ নতুন মসজিদে প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
স্থাপত্য ও নকশা- মসজিদের বিশেষ নকশা ইসলামী স্থাপত্য জগতে একটি ইতিহাস তৈরি করেছে, যার বিশাল উচ্চতা আরবি শব্দ "ইয়া আল্লাহ" (یا الله) তৈরি করে। ৮০ ফুট উঁচু মিনারটি "ইয়া" আকৃতির, যেখানে প্রথম তলার কংক্রিটের দেয়ালগুলি তাশদীদের আকৃতির স্ল্যাব দিয়ে তৈরি, তাতে "আল্লাহ" লেখা রয়েছে। উপরের মার্বেল গম্বুজটি বিশ্বের অনন্য এই মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
স্থপতি খায়রুদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী দ্বারা মসজিদটি ডিজাইন করা হয়েছে।
মসজিদটি ১৮ মিটার (৫৯ ফুট) উঁচু, যার মধ্যে ৪.৯ মিটার (১৬ ফুট) উঁচু গম্বুজ রয়েছে। মসজিদটি ৩৭ মিটার (১২০ ফুট) লম্বা এবং ৩০ মিটার (১০০ ফুট) প্রশস্ত। মসজিদের সংলগ্ন ঈদগাহটি ৭৬ মিটার (২৫০ ফুট) লম্বা এবং ৭০ মিটার (২৩০ ফুট) প্রশস্ত। মসজিদের মিনারের ভিতরে এবং বাইরে মার্বেল টাইলস লাগানো হয়েছে। মসজিদটি প্রতিষ্ঠাতা কমিটি, ভিলাই নগর মসজিদ ট্রাস্ট দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
ইমামগণ- আলহাজ্ব হাফিজ সৈয়দ আজমালউদ্দিন হায়দার ১৯৬৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আলহাজ্ব হাফিজ সৈয়দ আজমালউদ্দিন হায়দার ১৯৪২ সালে পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আফজালউদ্দিন হায়দার ১৯৫২ সাল থেকে জামে মসজিদ দুর্গের ইমাম ছিলেন এবং তাঁর মাজার ভিলাইয়ের সুপেলা কাবরিস্তানে অবস্থিত। আলহাজ্ব হাফিজ সৈয়দ আজমালউদ্দিন হায়দার কাদিরিয়া চিশতিয়া আশরাফিয়া তরিকার সাথে যুক্ত এবং দারুল উলুম ইসলামিয়া নাগপুর থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন।
উন্নয়ন- ভিলাইয়ের মুসলমানদের সহায়তায় ভিলাই নগর মসজিদ ট্রাস্ট মসজিদের কাছে একটি মুসলিম কমিউনিটি হল তৈরি করেছেন। হলটি ২৭ মিটার (৯০ ফুট) লম্বা, ১৩ মিটার (৪২ ফুট) প্রস্থ এবং ৬.৭ মিটার (২২ ফুট) উঁচু। হলের মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক অংশ নিয়ে একটি মহিলা হল তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় তলাটি নির্মাণাধীন এবং ২০১৫ সালের জুলাই মাসের শেষ নাগাদ এটি সম্পন্ন হয়েছে।
ভিলাইতে আন্তঃধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব এবং শান্তির চেতনা প্রকাশ করার জন্য অমুসলিম সম্প্রদায় শিখ, খ্রিস্টান এবং আর্য সমাজের প্রতিনিধিরা প্রতি বছর মসজিদে আসেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
ফতেহপুর সিক্রি মসজিদ
ফতেহপুর সিক্রি মসজিদ জামে মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের আগ্রা জেলায় অবস্থিত ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ফতেহপুর সিক্রিতে অবস্থিত। মসজিদটি ১৬ শতকের সুফি সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত মসজিদ এবং দরগা কমপ্লেক্স। মসজিদটি মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল এবং নির্মাণের সময় এটি সাম্রাজ্যের বৃহত্তম মসজিদ ছিল। জামে মসজিদের নকশা বিভিন্ন প্রাক্-মুঘল সালতানাত দ্বারা নির্মিত পূর্ববর্তী মসজিদ থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী মুঘল স্থাপত্যে মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।
মসজিদটি জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ এবং ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ দ্বারা পরিচালিত হয়। মসজিদ কমপ্লেক্সের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে রয়েছে, বুলন্দ দরওয়াজা, যা মসজিদের দক্ষিণ গেট হিসেবে কাজ করে এবং সেলিম চিশতির সমাধি, যার সম্মানে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
ইতিহাস- আকবর তার নতুন রাজধানী শহর ফতেহপুর সিক্রির অংশ হিসেবে জামে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। শিলালিপি অনুসারে মসজিদটির নির্মাণ কাজ ১৫৭১ থেকে ১৫৭৪ সালের মধ্যে এটি সম্পন্ন হয়েছিল। মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল আকবরের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা সুফি শেখ সেলিম চিশতির সম্মানে। এটি শেখের বংশধরদের জন্য একটি খানকাহ হিসেবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে বিভিন্ন লেখক এবং ভ্রমণকারীরা সৌন্দর্য জন্য মসজিদটির প্রশংসা করেছিলেন।
১৫৭৯ সালে আকবর মসজিদে উপস্থিত জামাতের নামাজের জন্য খুতবা পাঠ করেছিলেন। খুতবা পাঠ সাধারণত ধর্মীয় নেতাদের (যেমন একজন ইমাম) জন্য নির্ধারিত ছিল এবং তাই উলেমারা এটিকে ক্রান্তিকারী হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। আকবর প্রার্থনায় জনগণের সাথে যোগ দিতেন এবং এমনকি তাঁকে মসজিদের মেঝে ঝাড়ু দিতেও দেখা যেত। কাভুরি-বাউয়ার(সাঁথি কাভুরি-বাউয়ার ইসলামিক এবং দক্ষিণ এশীয় শিল্পের একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন। তাঁর গবেষণা মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক উভয় যুগের ইসলামী স্মৃতিস্তম্ভের ইতিহাসের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।) যুক্তি দেন যে, এই সমস্ত কাজ আকবরের পক্ষ থেকে এক সচেতন পদক্ষেপ ছিল এবং মসজিদটিকে তিনি শাসকের পরিবর্তে নিজেকে একজন ঐশ্বরিক সার্বভৌম হিসেবে চিত্রিত করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
আকবরের শাসনামলের পরেও ফতেহপুর সিক্রির জামে মসজিদ "মুঘল ঐতিহ্য এবং গর্বের প্রতীক" হিসেবে বিদ্যমান ছিলো। আকবরের পুত্র এবং উত্তরসূরী জাহাঙ্গীর মসজিদটির খুবই প্রশংসা করেছিলেন এবং তিনি মসজিদটিকে তাঁর পিতার সর্বশ্রেষ্ঠ স্থাপত্য কৃতিত্বের মধ্যে একটি বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৬১৯ সালে ফতেহপুর সিক্রিতে থাকার সময় জাহাঙ্গীর তাঁর পুত্র খুররমের সাথে মসজিদ কমপ্লেক্সটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। খুররম পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট শাহজাহান হিসাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং এই মসজিদটিকে দিল্লিতে তাঁর নিজস্ব জামে মসজিদের মডেল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
স্থাপত্য- জামে মসজিদটি ফতেহপুর সিক্রির পাথুরে পাহাড়ের উপর সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত। এটি একটি উঁচু প্লিন্থে(একটি পাথরের খন্ড যার উপর একটি স্তম্ভ বা মূর্তি দাঁড়িয়ে থাকে।)র উপর অবস্থিত। মসজিদ কমপ্লেক্সটি(চৌহদটি) দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত; দক্ষিণ দেয়ালের ঠিক বাইরে একটি বৃহৎ বাওলি (অষ্টভুজাকার ধাপ-কূপ) রয়েছে। ফতেহপুর সিক্রির বাকি অংশের মতো মসজিদটি স্থানীয়ভাবে খনন করা লাল বেলেপাথর দ্বারা তৈরি। সৌন্দর্য বর্দ্ধনের জন্য হলুদ বেলেপাথর, মার্বেল এবং স্লেট ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে ফার্সি এবং আরবি ক্যালিগ্রাফি রয়েছে।
নির্মাণের সময় মসজিদটি মুঘল ভারতের বৃহত্তম মসজিদ ছিল। মসজিদটি ইসলামিক, হিন্দু এবং জৈন স্থাপত্যের মিশ্রণকে প্রতিনিধিত্ব করে। যার উপরে স্পষ্ট গুজরাটি প্রভাব পরেছে। আশের(আশের হিব্রু বংশোদ্ভূত একটি নাম, মূলত পুরুষদের জন্য একটি প্রদত্ত নাম, তবে মহিলাদের জন্য নামটি জনপ্রিয়। এর অর্থ "সুখী" বা "ধন্য"।) দাবি করেন যে, মসজিদটি নির্মাণের ক্ষেত্রে মুঘল-পূর্ব কাঠামো মান্ডুর জামে মসজিদ এবং চান্দেরির জামে মসজিদ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। আলফিয়েরি("আলফিয়েরি" বলতে বেশ কিছু জিনিস বোঝাতে পারে: আর্থার মিলারের নাটক "এ ভিউ ফ্রম দ্য ব্রিজ"-এর একটি চরিত্র, একজন ইতালীয় কবি এবং নাট্যকার, অথবা মাইট্রাল ভালভ মেরামতের জন্য একটি অস্ত্রোপচার কৌশল।) মুঘল-পূর্ব জামে মসজিদ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছন বলে উল্লেখ করেছেন। তবে পরিবর্তে তিনি আতালা এবং চম্পানেরের জামে মসজিদগুলির উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
গেট- মসজিদ কমপ্লেক্সে তিনটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করা যায়।পূর্ব দিকের দরজা, যা বাদশাহী দরওয়াজা (সাম্রাজ্যের দরজা) নামে পরিচিত। মসজিদে প্রবেশের জন্য আকবর এই দরওয়াজাটি ব্যবহার করতেন। এটি মোজাইক দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। উত্তর এবং দক্ষিণ দিকের দরজাগুলি ঐতিহাসিকভাবে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যদিও ১৫৭৩ সালে আকবর গুজরাটে তাঁর সামরিক অভিযানের সাফল্য উদযাপনের জন্য দক্ষিণ দিকের দরজাটি বুলন্দ দরওয়াজা নামে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। এটি সবচেয়ে বিশিষ্ট দরজা এবং নিজেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যার বহু তলা জুড়ে করিডোর এবং কক্ষ রয়েছে। আশের বলেন যে, সম্ভবত চিশতী তরিকার সাথে আকবরের সম্পর্ককে জোর দেওয়ার জন্যই এই দরজাটি নির্মিত হয়েছিল।
উঠোন- সেলিম চিশতির সমাধিসৌধের (বামে) এবং ইসলাম খানের সমাধিসৌধের (ডানে) প্রাঙ্গণের ভেতরের মাপ ১৬৫ বাই ১৩০ মিটার (৫৪১ বাই ৪২৭ ফুট। এর কেন্দ্রে ওযু করার জন্য একটি ওযু ট্যাঙ্ক রয়েছে। উঠোনের উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকগুলি দালান (তোরণ) দ্বারা ঘেরা। এগুলি একটি অবিচ্ছিন্ন, প্রক্ষিপ্ত ছাজ্জা দ্বারা ছায়াযুক্ত, যা কর্বেল(একটি প্রক্ষেপণ যা প্রাচীর থেকে বেরিয়ে আসে এবং তার উপরে একটি কাঠামোকে সমর্থন করে।) দ্বারা সমর্থিত। এই তোরণগুলির প্যারাপেটে(ছাদ, সেতু বা অন্যান্য উঁচু কাঠামোর ধারে একটি নিচু প্রাচীর, যা মানুষকে পড়ে যেতে বাধা দেয়।)র উপরে ছত্রী। তোরণগুলির অভ্যন্তরীণ হুজরায় বিভক্ত, সম্ভবত ভক্তদের ঘুমানোর জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হত।
উঠোনের উত্তর দিকে সেলিম চিশতির সমাধি এবং ইসলাম খানে(প্রথম ইসলাম খান, যিনি শেখ আলাউদ্দিন চিশতী নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন মুঘল সেনাপতি এবং সুফি সাধক সেলিম চিশতীর নাতি।)র সমাধিসহ চিশতি পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সমাধি রয়েছে। সেলিম চিশতির সমাধিসৌধটি জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতর লাল বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত।উঠোনের নীচে ভূগর্ভস্থ জলাধার রয়েছে।
প্রার্থনা কক্ষ- আয়তাকার প্রার্থনা কক্ষটি (৮৯ মিটার বাই ২০ মিটার মাপের) উঠানের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত।প্রার্থনা কক্ষটি ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে মক্কার দিকে মুখ করে নির্মাণ করা হয়েছে।এর সম্মুখভাগে একটি বিশাল পিশতাক(পিশতাক একটি ফার্সি শব্দ, যা মসজিদের নামাজ কক্ষে যাওয়ার প্রবেশপথকে বোঝায়।) রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। ছাদ থেকে তিনটি গম্বুজ উঠে গেছে। হলটি তিনটি উপসাগরে("বে"বা উপসাগর বলতে সাধারণত একটি কাঠামোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র, নিয়মিত ব্যবধানযুক্ত বিভাজনকে বোঝায়) বিভক্ত। কেন্দ্রীয় উপসাগরটি বর্গাকার এবং , জ্যামিতিক মার্বেল খিলান এবং পলিক্রোম ফুলের চিত্রকর্মসহ সমৃদ্ধভাবে সজ্জিত। এর পশ্চিম দেয়ালে অলঙ্কৃত মিহরাব রয়েছে, যার চারদিক মোজাইক এবং চকচকে টালি দ্বারা বেষ্টিত। দুই পাশের উপসাগরগুলি স্তম্ভযুক্ত হল এবং প্রতিটিতে বর্গাকার কক্ষ রয়েছে। এই হলগুলিতে নিজস্ব সজ্জিত মিহরাব রয়েছে এবং হিন্দু-শৈলীর স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত। প্রার্থনা কক্ষের প্রান্তে জেনানা (মহিলাদের গ্যালারি) রয়েছে।
জামে মসজিদ, দিল্লী
মসজিদ-ই-জেহান-নুমা, যা সাধারণত দিল্লির জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটি ভারতের বৃহত্তম মসজিদগুলির মধ্যে একটি। মসজিদটির নির্মাতা ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান। ১৬৪৪ থেকে ১৬৫৬ সালের মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। মসজিদটির প্রথম ইমাম সৈয়দ আব্দুল গফুর শাহ বুখারী এটি উদ্বোধন করেছিলেন। মসজিদটি মুঘল রাজধানী শাহজাহানাবাদে (আজ পুরাতন দিল্লি) অবস্থিত। ১৮৫৭ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত মুঘল সম্রাটদের রাজকীয় মসজিদ হিসেবে জনাজাত ছিলো। ঔপনিবেশিক যুগেও জামা মসজিদকে ভারতজুড়ে ইসলামী শক্তির প্রতীকী নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হত। ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে এটি রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান ছিল। দিল্লির সবচেয়ে প্রতীকী স্থানগুলির মধ্যে জামে মসজিদ একটি। মসজিদের কাঠামোটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ।
নাম- মসজিদের দুটি নাম রয়েছে। শাহজাহান কর্তৃক প্রদত্ত প্রাচীন নামটি হল মসজিদ-ই-জেহান-নুমা, যা "সমগ্র বিশ্বকে প্রতিফলিত করে এমন মসজিদ" হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্য নামটি নাম হল জামে মসজিদ। জামে মসজিদ শব্দটি কেবল এই মসজিদের জন্য ব্যবহৃত নয়; সপ্তম শতাব্দী থেকে এটি সম্প্রদায় মসজিদ বা শুক্রবার মসজিদ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই বিশ্বের অনেক জায়গায় এই নামএর বিভিন্ন মসজিদ রয়েছে।
অবস্থান- মসজিদটি ঐতিহাসিক শহর শাহজাহানাবাদে অবস্থিত। যা বর্তমানে পুরাতন দিল্লির এলাকা হিসেবে পরিচিত। মসজিদটির বিপরীতে লাল কেল্লা এবং সুনেহরি মসজিদ অবস্থিত। পুরাতন দিল্লির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জামা মসজিদ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্র দ্বারা বেষ্টিত। যেমন ঐতিহাসিক চাঁদনী চক।ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী আবুল কালাম আজাদের সমাধি মসজিদের পাশেই অবস্থিত।
নির্মাণ- মুঘল সম্রাট শাহজাহান ১৬৫০ থেকে ১৬৫৬ সালের মধ্যে শাহজাহানাবাদের সর্বোচ্চ স্থানে জামে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটি নির্মাণের জন্য প্রায় ৫,০০০ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছিল। ভারতীয়, আরব, পারস্য, তুর্কি এবং ইউরোপীয়দের সমন্বয়ে গঠিত কর্মীবাহিনী বৈচিত্র্যময় ছিল। নির্মাণকাজটি মূলত উজির (বা প্রধানমন্ত্রী) সাদুল্লাহ খান এবং শাহজাহানের পরিবারের নিয়ন্ত্রক ফাজিল খান তত্ত্বাবধান করেছিলেন। তৎকালীন নির্মাণ ব্যয় ছিল দশ লক্ষ (দশ লক্ষ) টাকা। ১৬৫৬ সালের ২৩ জুলাই উজবেকিস্তানের বুখারা থেকে আগত সৈয়দ আব্দুল গফুর শাহ বুখারী মসজিদটি উদ্বোধন করেছিলেন। শাহজাহান তাকে মসজিদের শাহী ইমাম (রাজকীয় ইমাম) হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
মসজিদটি শাহজাহানের আমলে নির্মিত শেষ স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে একটি ছিল। এটি মুঘল আমলের শেষ অবধি সম্রাটদের রাজকীয় মসজিদ হিসেবে বিবেচিত হত। মুঘল সম্রাট শুক্রবার দুপুরের নামাজের সময় মসজিদটিতে খুৎবা পাঠ করতেন। তাই মসজিদটি ভারতে মুঘল সার্বভৌমত্বের প্রতীক ছিল এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করত। এটি শাহজাহানাবাদের বাসিন্দাদের জন্য সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও ছিল। ১৭৫৭ সালে আফগান বিজেতা আহমদ শাহ দুররানির নামে খুৎবা পাঠ করা হয়েছিল, যাকে সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন।
ব্রিটিশ শাসন-১৮০৩ সালে ব্রিটিশরা শাহজাহানাবাদ দখল করেছিলো। তখন মুঘল সম্রাট মসজিদের ধর্মীয় রাজকীয় প্রধান হিসেবেই থাকলেও কিন্তু মুঘল শক্তি এবং পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছিলো। শহরে ব্রিটিশদের প্রাথমিক নীতি এর বাসিন্দাদের প্রতি অনুকূল ছিল এবং ব্রিটিশরা জামে মসজিদের মেরামত এমনকি সংস্কারও করেছিলো।সেই সময়ে দিল্লির অন্যান্য মসজিদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মসজিদটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত; উদাহরণস্বরূপে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হত।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছিল। বিদ্রোহের ফলে শহরে অনেক ব্রিটিশ নিহত হয়েছিলো এবং ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। এটা ব্রিটিশদের জন্য গভীরভাবে অপমানজনক ছিলো। ব্রিটিশরা বিদ্রোহকে মুসলিমদের দ্বারা প্ররোচিত বলে মনে করেছিলো। কারণ দিল্লির মসজিদগুলি বিদ্রোহীরা ব্যবহার করা হয়েছিল। একই বছর ব্রিটিশরা শহরটি পুনরুদ্ধার করার পর তাঁরা অনেক মসজিদ ভেঙে ফেলেছিলো এবং অবশিষ্ট মসজিদগুলিতে মুসলমানদের জামাত নিষিদ্ধ করেছিলো। এই সময়কালে জামে মসজিদটি ব্রিটিশদের দখলে চলে যায় এবং কোনও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এটি বারবার ধ্বংস করার কথা বিবেচনা করা হয়েছিল, কিন্তু ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত এটিকে তাঁদের শিখ এবং ইউরোপীয় সৈন্যদের ব্যারাক হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো। শহরের মুসলিম বাসিন্দাদের অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি করেছিলো বলে আজিজ বর্ণনা করেছেন ।আজিজ" একটি সাধারণ আরবি নাম যার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে।
ব্রিটিশদের কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের কারণে ১৮৬২ সালে মসজিদটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে জামা মসজিদকে কেবল একটি ধর্মীয় স্থান হিসেবে ব্যবহার করা। মসজিদ পরিচালনা করার জন্য দিল্লির সম্মানিত মুসলমানদের সমন্বয়ে জামা মসজিদ কমিটি (জেএমএমসি)গঠন করা এবং এই শর্তগুলি কার্যকর করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মসজিদটি মুসলমানদের তত্ত্বাবধানে ফিরে আসার পর জামা মসজিদকে মসজিদ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৮৮৬ সালে রামপুরের নবাব মসজিদটির মেরামতের জন্য ১,৫৫,০০০ টাকা দান করেছিলেন। ১৯২৬ সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম একই উদ্দেশ্যে ১,০০,০০০ টাকা অনুদান দিয়েছিল।
১৯১১ সাল থেকে দিল্লির মসজিদগুলিতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা দেখা দেয়। জামা মসজিদ প্রায়শই অ-ধর্মীয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হত। ঔপনিবেশিক আমলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা সত্ত্বেও, হিন্দুরা প্রায়শই মসজিদে মুসলমানদের সাথে একত্রিত হয়ে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংহতি প্রকাশ করত।
ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী যুগ- স্বাধীনতার পরেও জামে মসজিদ একটি রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছে। ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী আবুল কালাম আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৩শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার (জুমরাত) নামাজের সময় মসজিদের মিম্বর থেকে বক্তৃতা প্ৰদান করেছিলেন। ভারত বিভাগের প্রস্তুতি চলছিলো, ফলে দিল্লিতে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিলো। আজাদ দিল্লির মুসলমানদের ভারতে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে ভারত তাঁদের মাতৃভূমি।
১৯৪৮ সালে হায়দ্রাবাদের শেষ নিজাম আসফ জাহ সপ্তমের কাছে মসজিদের মেঝের এক-চতুর্থাংশ মেরামতের জন্য ৭৫,০০০ টাকা অনুদান চাওয়া হয়েছিল। পরিবর্তে নিজাম ৩,০০,০০০ টাকা অনুমোদন করেছিলেন এই বলে যে, মসজিদের বাকি তিন-চতুর্থাংশ যেন পুরনো না লাগে।
কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক বাবরি মসজিদ বিরোধের ক্ষেত্রে মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন জামা মসজিদের শাহী ইমাম আবদুল্লাহ বুখারী মসজিদ থেকে এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন, যেখানে তিনি হিন্দুদের রাজনৈতিক সমর্থনের নিন্দা জানিয়েছিলেন এবং মুসলিমদের অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। এর ফলে পুরাতন দিল্লিতে দাঙ্গা ও সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে জামা মসজিদ ছিল বাবরি মসজিদ বিতর্কের বিরুদ্ধে একটি বড় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মঞ্চ। ১৯৮৭ সালের ২৮ মে সারা ভারতে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং দাঙ্গার মধ্যে, ইমাম জামা মসজিদটি বন্ধ করে কালো কাপড়ে সজ্জিত করেছিলেন, যা তৎকালীন সরকারের পদক্ষেপের প্রতি মুসলিমদের বিরক্তির প্রতীক ছিলো। এই সিদ্ধান্তটি ইসলামী নেতৃত্বের মধ্যে অত্যন্ত বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলো।
আধুনিক যুগ- জামে মসজিদটি দিল্লির প্রধান মসজিদ হিসেবে কাজ করে এবং এখানে মূলত জামাতের অনুষ্ঠান হয়। ঐতিহ্যগতভাবে শহরের মুসলমানরা এখানে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য এবং ঈদের মতো বড় উৎসবগুলিতে সমবেত হন। মসজিদটি একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ এবং বিদেশীদের ভ্রমণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করে।
আধুনিক যুগেও স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক স্থান হিসেবে মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে (৯/১১ হামলার পর) আফগানিস্তানে মার্কিন বোমা হামলার বিরুদ্ধে মসজিদটি প্রতিবাদের একটি স্থান ছিল।২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে এই স্থানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিলো।
সংস্কার- ২০০৬ সালে মসজিদটির জরুরি মেরামতের প্রয়োজন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিলো। ফলে সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহ এর জন্য অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইমাম বলেন যে, তিনি সরাসরি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছেন, তবে, ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তাঁদের অনুরোধ করেছিলেন। তবে, দিল্লি হাইকোর্ট বলেছিলেন যে, এই বিষয়টির কোনও "আইনি মর্যাদা" নেই, যা ইমামকে কোনও "বিশেষ অধিকার" প্রদান করেনা।
বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক এবং লজিস্টিক বাধার কারণে জামা মসজিদ এবং এর আশেপাশের এলাকা সংস্কারের লক্ষ্যে ধার্যকৃত একটি প্রকল্প ২০০০ সালের গোড়ার দিক থেকে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
২০০৬ সালের জামা মসজিদ বিস্ফোরণ- ২০০৬ সালের ১৪ এপ্রিল তারিখে জুমার নামাজের পরপরই পর পর দুটি বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিলো। বিস্ফোরণগুলি কীভাবে ঘটেছিলো তা স্পষ্ট নয়। হতাহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতরভাবে এবং অন্য আটজন সামান্য আহত হয়েছিলো। ইমাম আহমেদ বুখারী মন্তব্য করেছিলেন, "আমাদের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে, তবে আমি তাঁদের শান্ত থাকার জন্য আবেদন করছি"।
২০১০সালের জামা মসজিদ আক্রমণ- ২০১০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে, মসজিদের তিন নম্বর গেটের কাছে পার্ক করা একটি বাসে মোটর সাইকেলে আসা বন্দুকধারীরা গুলি চালালে দুই তাইওয়ানিজ পর্যটক আহত হয়েছিলেন। হামলার পর, পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩০ জনকে আটক করেছিলো এবং পুলিশ মোতায়েন করার ফলে এলাকাটি দুর্গে পরিণত হয়েছিলো।
স্থাপত্য- জামে মসজিদটি বাদশাহ শাহজাহানের নতুন রাজধানী দিল্লির শাহজাহানাবাদে নির্মিত হয়েছিল। নির্মাণের সময় এটি ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ ছিল। শাহজাহান দাবি করেছিলেন যে, মসজিদটি ফতেহপুর সিক্রির জামা মসজিদের আদলে তৈরি করা হয়েছে। তবে, মসজিদের অভ্যন্তর ভাগ আগ্রার জামা মসজিদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।মসজিদটি নির্মাণের ক্ষেত্রে মূলত লাল বেলেপাথর ব্যবহার করেছিলো এবং সাদা মার্বেলের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এটি তাঁর পূর্বসূরীদের থেকে আলাদা করেছিলো। কালো মার্বেলও একটি সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলো।২৫০টি আরবি এবং ফারসি ক্যালিগ্রাফিক টুকরো কাঠামোর বিভিন্ন পৃষ্ঠে পাওয়া যায়, যার বিষয়বস্তু ধর্মীয় থেকে শুরু করে শ্লোগান পর্যন্ত বিস্তৃত।
পাহাড়ের উপর নির্মিত মসজিদটি আশেপাশের শহর থেকে ১০ মিটার (৩৩ ফুট) উঁচু একটি স্তম্ভের উপর অবস্থিত। ইম্পেরিয়াল কলেজ, ইম্পেরিয়াল ডিসপেনসারি এবং মাদ্রাসা কাঠামোর পাশে অবস্থিত ছিল, কিন্তু ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় সেগুলি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।
গেট-মসজিদটিতে প্রবেশের জন্য তিনটি বেলেপাথরের দরজা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল তিনতলাবিশিষ্ট উঁচু পূর্ব দিকের দরজা, যা ঐতিহাসিকভাবে শাহী (রাজকীয়) প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করত। দরজাটি শুধুমাত্র সম্রাট এবং তার সহযোগীদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। অন্য দুটি প্রবেশদ্বার হল উত্তর এবং দক্ষিণ দিকের দরজা, যেগুলি দুই তলাবিশিষ্ট উঁচু এবং সাধারণ জনগণ এটি ব্যবহার করত। প্রতিটি দরজার সাথে একটি তিন-পার্শ্বযুক্ত বেলেপাথরের সিঁড়ি রয়েছে, যেখানে নামাজের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য সাদা চিহ্ন রয়েছে। উত্তর দিকের দরজায় অবস্থিত ক্যাবিনেটে হজরত মুহাম্মদ(সাঃ)এর একটি সংগ্রহ রয়েছে। দিল্লির জামা মসজিদে প্রকৃতপক্ষে নবী মুহাম্মদ(সাঃ)এর সাথে সম্পর্কিত সামগ্রী রয়েছে। ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া এবং একটি ভ্রমণ ব্লগ অনুসারে, বিশেষ করে, এতে নবীর দাড়ির একটি চুল, হরিণের চামড়ায় লেখা একটি কুরআন এবং নবীর এক জোড়া স্যান্ডেল রয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষ মসজিদের উত্তর গেটে অবস্থিত একটি আলমারিতে রাখা আছে।
উঠোন- বর্গাকার সাহন (আঙিনা) লাল বেলেপাথর দিয়ে পূর্ব দিকের দরজার দিকে মুখ করে তৈরি। এর পার্শ্ব দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ৯৯ মিটার (৩২৫ ফুট) এবং এতে ২৫,০০০ মুসল্লি বসতে পারেন। এর কেন্দ্রে ১৭ মিটার (৫৬ ফুট) লম্বা এবং ১৫ মিটার (৪৯ ফুট) প্রস্থের একটি মার্বেল নির্মিত অজুর ট্যাঙ্ক রয়েছে। উঠোনের প্রান্ত বরাবর খোলা তোরণ রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে মসজিদের চারপাশের দৃশ্য দেখা যায়।
প্রার্থনা হল- নামাজ কক্ষটি ৬১ মিটার (২০০ ফুট) লম্বা এবং ২৭ মিটার (৮৯ ফুট) প্রস্থ। এর ছাদ থেকে তিনটি মার্বেল গম্বুজ উঠে গেছে, যার সোনালী চূড়া রয়েছে। নামাজ কক্ষের সম্মুখভাগে কেন্দ্রে একটি বিশাল পিশতাক রয়েছে, যার দুপাশে পাঁচটি ছোট, খাঁজযুক্ত খিলানপথ রয়েছে। নামাজ কক্ষের প্রতিটি খিলানপথের উপরে কিছু ক্যালিগ্রাফিক টুকরো রয়েছে। হলের অভ্যন্তরে পশ্চিমে কিবলা দেয়ালে সাতটি মিহরাব (নামাজের কুলুঙ্গি) রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি মার্বেল দিয়ে সজ্জিত, এর ডানদিকে একটি মার্বেল মিম্বার রয়েছে। হলটি সাদা এবং কালো অলঙ্কৃত মার্বেল দিয়ে নির্মিত, যা দেখতে মুসলিমদের নামাজের মাদুরের মতো।
মিনার- মসজিদের গম্বুজগুলি উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি বেলেপাথরের মিনার দ্বারা বেষ্টিত। এগুলি ৪১ মিটার (১৩৫ ফুট) উঁচু এবং সাদা মার্বেল দিয়ে লম্বালম্বিভাবে ডোরাকাটা। প্রতিটি মিনারে ১৩০টি ধাপ রয়েছে, যার উপর তিনটি স্থানে দেখার জন্য গ্যালারি রয়েছে।
শাহী ইমাম- শাহজাহানের ইচ্ছা ছিল ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ নির্মাণ করা, যার মুঘল সাম্রাজ্যের কোথাও কোনও তুলনা নেই। তিনি আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, এর ইমাম তাঁর রাজত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা হবেন। এইভাবে জামা মসজিদের ইমাম শাহী ইমাম (সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত ধর্মীয় নেতা) উপাধি লাভ করেন। আওরঙ্গজেব থেকে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (১৮৩৭-১৮৫৭) পর্যন্ত পরবর্তী সকল মুঘল সম্রাটকে দিল্লির জামা মসজিদের শাহী ইমাম দ্বারা রাজমুকুট পরানো হয়েছিল।দিল্লির জামা মসজিদের ইমামরা ঐতিহ্যগতভাবে মসজিদের প্রথম ইমাম সৈয়দ আব্দুল গফুর শাহ বুখারীর সরাসরি বংশধর ছিলেন, যাকে শাহজাহান স্বয়ং নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁদের পদ শাহী ইমাম বা রাজকীয় ইমাম নামে পরিচিত। এই পদের পরবর্তী ব্যক্তি নায়েবে ইমাম বা উপ-ইমাম নামে পরিচিত।শাহী ইমামদের শেষ নাম বুখারী, যা তাদের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বুখারা (আধুনিক উজবেকিস্তানের) থেকে এসেছে। এই পদে অধিষ্ঠিত ইমামদের তালিকা নিচে প্রদান করা হলো-
সাধারণ নাম শিরোনাম মেয়াদ শুরু মেয়াদ শেষ অফিসে সময় অবস্থান
1 আব্দুল গফুর শাহ বুখারী ইমাম-উস-সুলতান 23 জুলাই 1656
2 আব্দুল শাকুর শাহ বুখারী
3 আব্দুল রহিম শাহ বুখারী
4 আব্দুল গফুর শাহ বুখারী থানি
5 আব্দুল রহমান শাহ বুখারী রহ
6 আব্দুল করিম শাহ বুখারী
7 মীর জীবন শাহ বুখারী
8 মীর আহমদ আলী শাহ বুখারী
9 মোহাম্মদ শাহ বুখারী 16 অক্টোবর 1892
10 আহমদ বুখারী শামস-উল-উলামা
11 হামিদ বুখারি 20 ফেব্রুয়ারি 1942 8 জুলাই 1973 31 বছর, 138 দিন
12 আবদুল্লাহ বুখারি 8 জুলাই 1973 14 অক্টোবর 2000 27 বছর, 98 দিন
13 আহমেদ বুখারি প্রথম 14 অক্টোবর 2000 25 ফেব্রুয়ারি 2024 23 বছর, 134 দিন
14 শাবান বুখারি 25 ফেব্রুয়ারি 2024 বর্তমান 1 বছর, 171 দিন
কালান মসজিদ, পুরনা দিল্লী
কালান মসজিদ ভারতের পুরাতন দিল্লিতে অবস্থিত। মসজিদটি ১৪শ শতাব্দীতে নির্মিত। এটি খান-ই-জাহান তিলাঙ্গানি কর্তৃক নির্মিত সাতটি মসজিদের মধ্যে একটি।মালিক মকবুল (যুগন্ধারু), যাকে খান-ই-জাহান মকবুল তিলাঙ্গানি এবং জাহান খান (মৃত্যু ১৩৬৯) নামেও ডাকা হত, তিনি ছিলেন কাকাতিয়া সাম্রাজ্যের একজন ভারতীয় সেনাপতি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং ফিরুজ শাহ তুঘলকের (মৃত্যু ১৩৫১-১৩৮৮) অধীনে দিল্লি সালতানাতের উজির হয়েছিলেন।
ব্যুৎপত্তি- মসজিদের নাম কালান মসজিদ, যার অর্থ প্রধান মসজিদ। এটি কালী মসজিদ বা কালো মসজিদ নামেও পরিচিত। কালো শব্দটি কালান শব্দের বিকৃত রূপও হতে পারে।
ইতিহাস- ফিরুজ শাহ তুঘলকের রাজত্বকালে ১৩৮৭ সালে খান-ই-জাহান মকবুল তিলাঙ্গানি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদটি বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত। এটি একটি আয়তাকার কাঠামো, যার দৈর্ঘ্য ৪৩ মিটার (১৪০ ফুট) এবং প্রস্থ ৩৭ মিটার (১২০ ফুট)। এর দুটি তলা বিশিষ্ট মসজিদ, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ২০ মিটার (৬৬ ফুট)।
মসজিদে প্রবেশ করা দরজাটির উপরে একটি নিচু গম্বুজ রয়েছে, যার পাশে দুটি শঙ্কুযুক্ত স্তম্ভ রয়েছে। দরজার উপরে একটি মার্বেল পাথরের স্ল্যাব রয়েছে, যার উপর নাসখ লিপি(নাসখ লিপি হল ইসলামী ক্যালিগ্রাফি এবং হাতের লেখার একটি ধরণ, যা এর স্পষ্টতা এবং সুস্পষ্টতার জন্য পরিচিত, যা এটিকে লেখা, বিশেষ করে কুরআনের অনুলিপি করার জন্য উপযুক্ত করে তোলে। এটি একটি অভিশাপ লিপি, যার অর্থ অক্ষরগুলি একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং এটি সহজেই পাঠযোগ্য হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়।)তে একটি শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপিটি মসজিদের নির্মাণ সমাপ্তির তারিখ এবং ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে খান জাহান কর্তৃক এটি নির্মিত হয়েছিল বলে বর্ণনা করে।
খিরকি মসজিদ, দক্ষিণ দিল্লী
খিরকি মসজিদ ভারতের দক্ষিণ দিল্লির সাতপুলার কাছে খিরকি গ্রামে অবস্থিত একটি মসজিদ। মসজিদটি বর্তমানে আংশিক ধ্বংসাবশেষ প্রাপ্ত। মসজিদটি তুঘলক রাজবংশের ফিরোজ শাহ তুঘলকের (১৩৫১-১৩৮৮) প্রধানমন্ত্রী খান-ই-জাহান জুনান শাহ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা দ্বারা পরিচালিত।
ব্যুৎপত্তি- মসজিদটিতে ব্যবহৃত 'খিরকি' শব্দটি একটি উর্দু শব্দ, যার অর্থ "জানালা" এবং তাই মসজিদটিকে "জানালার মসজিদ"ও বলা হয়।
ইতিহাস- খান-ই-জাহান জুনান শাহ এবং ফিরোজ শাহ তুঘলক স্থাপত্য স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ক্ষেত্রে খুবই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তাঁরা একসাথে বেশ কয়েকটি সমাধি, দুর্গ এবং মসজিদ পরিকল্পনা এবং নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষ করে তেলঙ্গানিকে অনন্য নকশার সাতটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কৃতিত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
জাহাপানাহ শহরে নির্মিত মসজিদটির নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট শিলালিপি নেই, যদিও মসজিদের পূর্ব গেটে নির্মাতার নাম 'খান-ই-জাহান জুনান শাহ' খোদাই করা আছে। মসজিদটি ১৩৫১ থেকে ১৩৫৪ সালের মধ্যে নির্মিত। ফিরোজ শাহ তুঘলক জাহাপানায় অবস্থানকালে এই মসজিদটি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদটি ৫২ বাই ৫২ মিটার (১৭১ বাই ১৭১ ফুট) বর্গাকার আকারের, যার আয়তন ৮৭ বর্গমিটার (৯৪০ বর্গফুট)। এটি ৩ মিটার (৯.৮ ফুট) একটি প্লিন্থের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারটি খোলা উঠোন (প্রতিটি পাশে ৯.১৪ মিটার (৩০.০ ফুট)বর্গাকার আকারের, যা ১৮০টি বর্গাকার কাঠামোগত স্তম্ভ এবং ৬০টি স্তম্ভ দিয়ে নির্মিত তোরণ দ্বারা বেষ্টিত। খোলা উঠানগুলি অভ্যন্তরীণ নামাজের স্থানগুলিতে আলো এবং বায়ুচলাচলের উৎস হিসাবে কাজ করে।
ছাদটি সমান আকারের ২৫টি বর্গাকারে বিভক্ত, প্রতিটি বর্গাকারে নয়টি ছোট গম্বুজ (মোট ৮১টি গম্বুজ) রয়েছে এবং ছাদটি ঢেকে রাখার জন্য ১২টি সমতল ছাদ দ্বারা পর্যায়ক্রমে স্থাপন করা হয়েছে। চারটি উঠোন আলো এবং বায়ুচলাচল সরবরাহ করে। মসজিদের চার কোণে মিনার রয়েছে যার তিনটি করে প্রসারিত প্রবেশপথ রয়েছে, প্রতিটি প্রবেশ মুখের মাঝখানে একটি, এবং প্রতিটি গেটের পাশে সরু বুরুজ রয়েছে। প্রধান প্রবেশপথে মনোরম সিঁড়িসহ দক্ষিণ গেটটি খিলান এবং ট্রাবিটেড নির্মাণের সংমিশ্রণ প্রদর্শন করে। এটিতে একটি অলঙ্কৃত সরলরেখার ফ্রেম রয়েছে। দক্ষিণ এবং উত্তর দরজার পাশে অবস্থিত বুরুজগুলি বৃত্তাকার আকৃতির।
পশ্চিম দেয়ালে কিবলার দিকে প্রসারিত প্রধান গেটে একটি প্রক্ষিপ্ত মিহরাব রয়েছে। খিলানযুক্ত প্রথম তলার কক্ষগুলির উপরে ছিদ্রযুক্ত পর্দা বা জালি বা ট্রেসারী সহ, যা "খিরকিস" নামে পরিচিত, দ্বিতীয় তলায় দেখা যায়। তবে, মিহরাবের সামনের প্রবেশপথটি ভালভাবে আলোকিত নয় কারণ দ্বিতীয় তলার জালিযুক্ত জানালাগুলি থেকে আলো এই স্থানটি প্রবেশ করে না। পূর্ব দিকের গেট দিয়ে মসজিদের ছাদে ওঠার পথ।
মসজিদের দেয়ালগুলি ধ্বংস্তূপ(ধ্বংস্তূপ এর নির্মাণ হল এমন কটি নির্মাণ কৌশল যা কাঠামো তৈরির জন্য ইট, পাথর বা কংক্রিট ব্লকের মতো পৃথক ইউনিট ব্যবহার করে)এর তৈরি এবং বাইরের দিকে প্লাস্টার করা। ভেতরের দেয়ালগুলি নরম কিন্তু খোদাই করা পাথরের পর্দা দিয়ে সজ্জিত। নকশা করা প্রশংসনীয় মসজিদটিকে "সুলতানি ইতিহাসের সেরা স্থাপত্য রচনাগুলির মধ্যে একটি" হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মসজিদটিকে ফিরুজ শাহের স্থাপত্য কল্যাণ হিসাবে বিবেচনা করা হত।
পুনরুদ্ধার- বছরের পর বছর ধরে, মসজিদের উত্তর-পূর্ব দিকের কয়েকটি গম্বুজ ভেঙে পড়েছিলো এবং কয়েকটি দেয়াল জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। ছাদটি অনেক জায়গায় ভেঙে পড়ার পথে ছিল। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ (INTACH) এর দিল্লি শাখা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যের দিক থেকে স্মৃতিস্তম্ভটিকে "গ্রেড এ" হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। এটি ২০১০ কমনওয়েলথ গেমসের আগে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) দ্বারা পুনরুদ্ধারের জন্য চিহ্নিত ৪৩টি স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে একটি ছিলো। ২০০৯ সাল পর্যন্ত, পূর্ববর্তী মসজিদের ভিতরে ASI দ্বারা কিছু সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হয়েছিল।
দিল্লির ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা ASI দ্বারা করা খিরকি মসজিদের পুনরুদ্ধার কাজের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ এটিকে প্রাচীনকালের চুনের মর্টার(মর্টার হল একপ্রকার নির্মাণ সামগ্রী, সাধারণত বালি, সিমেন্ট (বা চুন) এবং জলের পেস্টের মতো মিশ্রণ) থেকে আলাদা করে একটি গোলাপী স্মৃতিস্তম্ভে (ছবিতে) রূপান্তরিত করেছিল। দিল্লির ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা ASI-কে মুঘল-যুগের স্মৃতিস্তম্ভগুলির সংরক্ষণ কাজের জন্য গৃহীত পুনরুদ্ধার পদ্ধতিগুলি পুনরায় পরীক্ষা করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। ASI মসজিদের সংস্কার কাজ স্থগিত করে এবং মুঘল স্মৃতিস্তম্ভগুলির যথাযথ সংস্কার সম্পর্কে তাঁদের কর্মীদের শিক্ষিত করার জন্য "প্রাচীনকালে চুনের গুঁড়ির ব্যবহার" বিষয়ে একটি কর্মশালা আয়োজন করেছিলো।
২০১৮ সালে, প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের সময়, ASI মসজিদের স্থানে প্রচুর পরিমাণে তামার মুদ্রা আবিষ্কার করে।২০২৩ সালের জুনে আরও সংস্কার কাজ ঘোষণা করা হয় এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়।
দর্শনার্থীদের তথ্য- দক্ষিণ দিল্লির সাকেতের কাছে খিরকি গ্রামের সরু গলি দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা যায়। সাকেত সিটিওয়াক মল থেকে প্রেস এনক্লেভ মার্গের অপর পাশে মসজিদটি অবস্থিত। নিকটতম মেট্রো স্টেশন হল মালব্য নগর। প্রধান রাস্তার সরু গলি দিয়ে মসজিদটি সহজেই দেখা যায়। এটি কুতুব মিনারের ৪ কিমি (২.৫ মাইল) পূর্বে এবং কন্নাট প্লেস থেকে ১৩ কিমি (৮.১ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত।
দিল্লির লাল মসজিদ
পুরাতন দিল্লির লাল মসজিদ, যা ফখর-উল মসজিদ নামেও পরিচিত, ১৭২৮ সালে কানিজ-ই-ফাতিমা কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। তিনি ফখর-ই-জাহান নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি তার স্বামী, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, সুজাত খানের স্মরণে মসজিদটি নির্মাণের করেছিলেন। পরে কর্নেল জেমস স্কিনার মসজিদটি মেরামত করলেও, মূল নির্মাণটি করেছিলেন কানিজ-ই-ফাতিমা করেছিলেন।
ইতিহাস- ১৮৪৪ সালে প্রকাশিত স্যার থমাস মেটক্যাফের "রেমিনিসেন্সেস অফ ইম্পেরিয়াল দিল্লি" বইয়ে মসজিদের চিত্র এবং বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।১৮৫৭ সালের দিল্লি অবরোধের সময় মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো এবং তারপর এটিকে মেরামত করা হয়েছে।
স্থাপত্য- মসজিদটি প্রায় ১২.২ বাই ৭.৩ মিটার (৪০ বাই ২৪ ফুট) উচ্চতার, একটি উঁচু স্তম্ভের উপর অবস্থিত। রাস্তা থেকে ২.৫ মিটার (৮.২ ফুট) উপরে অবস্থিত। মূল কমপ্লেক্সটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে যার প্রতিটির নিজস্ব খিলানযুক্ত(Arched) প্রবেশপথ রয়েছে। কেন্দ্রীয় খিলানের উভয় পাশে দুটি ডোরাকাটা টাওয়ার, মসজিদের পিছনের কোণে অবস্থিত দুটি মিনার দ্বারা প্রতিফলিত। মসজিদের ছাদে একটি সজ্জিত প্যারাপেটে (ছাদ, সেতু বা অন্যান্য উঁচু কাঠামোর ধারে একটি নিচু প্রাচীর যা মানুষকে পড়ে যেতে বাধা দেয়।)র পিছনে তিনটি সাদা এবং কালো মার্বেল গম্বুজ রয়েছে। ভবনটিতে লাল বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সময়ের জন্য এি কাজ অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, যদিও মিনার এবং গম্বুজসহ এর অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট্য দিল্লির প্রধান মসজিদগুলির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
মতি মসজিদ, দিল্লী
মতি মসজিদ ১৭ শতকের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা ভারতের উত্তর দিল্লিতে লাল কেল্লা কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে অবস্থিত। মসজিদটি বর্তমান উপাসনার জন্য উন্মুক্ত নয়। এটি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। ভারতীয় বিদ্রোহের সময় দিল্লি অবরোধ কালে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এটি পুনরুদ্ধার করেছিল। মসজিদটি সাদা মার্বল দিয়ে তৈরি। যার জন্য মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে মতি মসজিদ। মসজিদটিতে ফুলের নক্সা খোদাই করা রয়েছে। এটি আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের মুঘল স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ইতিহাস-মোতি মসজিদ মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণের পরপরই নির্মিত হয়েছিলো। এর উদ্দেশ্য ছিল লাল কেল্লার অভ্যন্তরে সম্রাটকে তার ব্যক্তিগত কক্ষের কাছাকাছি নামাজের জন্য একটি মসজিদ প্রদান করা। সেই সময়ে দুর্গে কোনও মসজিদ ছিল না; দুর্গের নির্মাতা পূর্ববর্তী সম্রাট শাহজাহান জামা মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তেন। মতি মসজিদ নির্মাণে পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। মসজিদটির নির্মাণ কার্য ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত ব্যয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। আদালতের ইতিহাসে মা'আসির-ই-আলমগিরিতে মসজিদের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। মসজিদটি নির্মাণের পর আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যের কর্মকর্তাদের সাথে মসজিদটিতে প্রথম যোহরের নামাজ পড়েছিলেন। এর থেকে একটি নতুন আনুষ্ঠানিক রীতি চালু হয়েছিলো।
১৮৫৭ সালে, দিল্লি অবরোধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা লাল কেল্লা দখলের পর, মোতি মসজিদের সোনালী তামার গম্বুজগুলি প্রাইজ এজেন্টরা(পুরষ্কার এজেন্টরা ছিলেন ব্যক্তি বিশেষ, যাদের প্রায়শই সামরিক বা বণিক শ্রেণীর সাথে সম্পর্ক ছিল। যাদের যুদ্ধকালীন সময়ে দখলকৃত পণ্য পরিচালনা এবং বিতরণের জন্য নিযুক্ত করা হত।) দ্বারা ছিনিয়ে নিয়ে নিলামে বিক্রি করেছিলো। লুটপাটের ফলে গম্বুজগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। যার ফলে বৃষ্টির পানিতে নামাজের ঘরের ছাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো।পরবর্তীতে ব্রিটিশরা মসজিদের গম্বুজগুলিকে সাদা মার্বেল দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছিলো।
১৯২০-এর দশকে, ASI-এর উদ্যোগের ফলে লাল কেল্লায় পর্যটনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মতি মসজিদে পর্যটকের যাতায়াত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দর্শনার্থীদের ইসলামী আচরণ মেনে চলার জন্য নিয়মকানুন প্রণয়ন করা হয়েছিলো। বিদ্রোহ-পরবর্তী যুগে, ASI ব্রিটিশ সামরিক কর্মীদের দ্বারা মসজিদের মার্বেল মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলো। আধুনিক যুগে কাঠামোর ক্ষতি এড়াতে ASI দর্শনার্থীদের জন্য মসজিদটি বন্ধ করে দিয়েছে।
কাঠামো- মতি মসজিদের একটি প্রার্থনা কক্ষ এবং উঠান রয়েছে। যেগুলি প্রাচীর ঘেরা বেষ্টনীর মধ্যে অবস্থিত। স্থানটি ছোট ভিতরের পরিমাপ ৯ বাই ১৫ মিটার (৩০ বাই ৪৯ ফুট)। প্রাঙ্গণটি মাটির স্তর থেকে সামান্য উঁচু এবং পূর্ব দিক থেকে একটি সিঁড়ি দ্বারা প্রবেশ করা যায়। ঘেরের দেয়ালগুলি লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি। দেয়ালগুলি ভিতরের কাঠামোগুলি দেখতে বাধা দেয়। দেয়ালগুলির পুরুত্বও ভিন্ন ভিন্ন, যা মসজিদের অবস্থানের জন্য নির্মিত। বাইরের দেয়ালগুলি লাল কেল্লার অক্ষের সাথে সারিবদ্ধ, যখন ভিতরের দেয়ালগুলি মক্কার দিকে সারিবদ্ধ। মসজিদের উঠানটি আয়তাকার এবং সাথে একটি পুকুর রয়েছে।
উঠানের শেষে স্থাপিত প্রার্থনা কক্ষটি, একটি তিন-বেড কাঠামো যা দুটি আইলে(গির্জা, থিয়েটার ইত্যাদিতে আসনের সারির মধ্যবর্তী একটি পথ।) বিভক্ত। কাঠামোটিতে আদালতের মহিলাদের ব্যবহারের জন্য করিডোরও রয়েছে। প্রার্থনা কক্ষের সম্মুখভাগে স্তম্ভের উপর তিনটি প্রবেশ খিলান, পাশাপাশি একটি বক্ররেখার ইভ (বাংলা ছাজ্জা) রয়েছে। মসজিদ ভবনের উপরে তিনটি সূক্ষ্ম গম্বুজ রয়েছে, যা সম্মুখভাগের খিলানের সাথে সারিবদ্ধ। প্রার্থনা কক্ষের মার্বেল মেঝে আয়তক্ষেত্রাকারে বিভক্ত, সম্ভবত উপাসকদের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য তেমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিলো।
শৈলী- মতি মসজিদটি আওরঙ্গজেবের পূর্বসূরী শাহজাহান কর্তৃক আগ্রা দুর্গে নির্মিত ছোট আকারের একটি প্রাসাদের আদলে তৈরি। মসজিদটি নাগিনা মসজিদের সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। পণ্ডিত এব্বা কোচ এটিকে প্রায় আক্ষরিক অনুলিপি বলে অভিহিত করেছেন। উভয় স্মৃতিস্তম্ভেরই একই রকম পরিকল্পনা, উচ্চতা এবং নির্মাণ সামগ্রী (সাদা মার্বেল) রয়েছে। তবে, অলঙ্করণের ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মতি মসজিদটি নাগিনা মসজিদ থেকে আলাদা। নাগিনা মসজিদের পৃষ্ঠতল সমতল। অপরপক্ষে মতি মসজিদে মার্বেল পাথরের খোদাই এবং খোদাইয়ের মাধ্যমে অলঙ্কৃত ফুলের সাজসজ্জা রয়েছে। এগুলি মসজিদের দেয়াল, খিলান, স্তম্ভ এবং পেন্ডেন্টিভ(একটি গম্বুজ এবং তার সহায়ক খিলানের ছেদ দ্বারা গঠিত খিলানযুক্ত একটি বাঁকা ত্রিভুজ।)গুলিতে পাওয়া যায়।
কোচ("কোচ" বিভিন্ন জিনিসকে বোঝাতে পারে, যেমন একটি ভাষা, একটি জাতিগত গোষ্ঠী, একটি বর্ণ, একটি গাণিতিক ধারণা, অথবা একটি বৃহৎ কোম্পানি।) উল্লেখ করেছেন যে মসজিদের জাঁকজমকপূর্ণ নকশা আওরঙ্গজেবের শৈল্পিক কঠোরতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। তিনি যুক্তি দেন যে, এখানে সম্রাট সরাসরি জড়িত না থাকার বিষয়ে নির্দেশ করে। অন্যদিকে, দাদলানি স্মৃতিস্তম্ভটিকে আওরঙ্গজেবের 'সাম্রাজ্যিক দৃশ্য কর্মসূচির' অংশ হিসেবে দেখেন, যেখানে নিজেকে একজন ধার্মিক শাসক হিসেবে চিত্রিত করার জন্য মসজিদ নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল এবং পাশাপাশি শাহজাহানের রাজত্বকে স্মরণ করার জন্য অলঙ্করণও ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল।
সোনহেরি মসজিদ, চাঁদনি চ’ক
সুনেহরি মসজিদ ভারতের পুরাতন দিল্লির চাঁদনী চক এলাকায় অবস্থিত ১৮ শতকের মসজিদ। মসজিদটি সম্রাট মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে মুঘল সম্রাট রোশান-উদ-দৌলা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এটি চাঁদনী চকের গুরুদ্বারা সিস গঞ্জ সাহেবের নিকটে অবস্থিত, যা একসময় লাল কেল্লায় যাওয়ার জন্য একটি রাজকীয় বুলেভার্ড(দুই পাশে গাছ থাকা প্রশস্ত রাস্তা) ছিল।
মুসলিমদের বাসস্থান সম্প্রসারণ জন্য মসজিদটির আসল চেহারা বর্তমান পরিবর্তন করা হয়েছে। দখলদারিত্বের কারণে মসজিদটিও হুমকির মুখে রয়েছে।
ইতিহাস- সুনেহরি মসজিদটি ১৭২১-১৭২২ সালে মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের দরবারের একজন মুঘল আমির রোশান-উদ-দৌলা কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি রোশান-উদ-দৌলার আধ্যাত্মিক গুরু শাহ ভিককে উৎসর্গ করা হয়েছিল।
১৭৩৯ সালে, পারস্যের নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেছিলেন। তখন সুনেহরি মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি দিল্লি লুণ্ঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলে শহরের ব্যাপক প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো।
১৮৯৭ সালে ইসলামী পণ্ডিত আমিন আল-দীন সুনেহরি মসজিদে মাদ্রাসা আমিনিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরে মাদ্রাসাটি ১৯১৭ সালে কাশ্মীরি গেটে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
স্থাপত্য- মসজিদটি রাস্তার স্তর থেকে উঁচুতে একটি প্লিন্থের উপর অবস্থিত। সুনেহরি মসজিদে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়। মসজিদের উপরে তিনটি বাল্বযুক্ত, সোনালী গম্বুজ রয়েছে এবং এতে সরু মিনার রয়েছে। মসজিদের সম্মুখভাগে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরভাগ তিনটি উপসাগরে বিভক্ত। মসজিদের অভ্যন্তরভাগ এবং বহির্ভাগে স্টুকো(স্টুকো বলতে একটি আলংকারিক আবরণ বা ফিনিশ বোঝায়, যা প্রায়শই প্লাস্টার দিয়ে তৈরি, যা দেয়াল এবং ছাদে, অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়।) অলংকরণের কাজ আরবস্ক(একটি অলংকরণ নকশা যা পরস্পর সংযুক্ত প্রবাহমান রেখা দ্বারা গঠিত, যা মূলত প্রাচীন ইসলামী শিল্পে পাওয়া যায়।) এবং ফুলের নকশার আকারে দেখা যায়। •
সুনেহরি বাগ মসজিদ
সুনেহরি বাগ মসজিদটি ভারতের মধ্য দিল্লির লুটিয়েনস এলাকায় অবস্থিত। মসজিদটি মুঘল যুগে নির্মিত। এটি গ্রেড-III (তৃতীয় শ্রেণীর ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো হলো সেইসব ভবন যা শহরের দৃশ্যপটে অবদান রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, স্থাপত্য ।)ঐতিহ্যবাহী কাঠামো হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং এটি দুই তলা বিশিষ্ট। মসজিদটিতে একটি বাংলা গম্বুজ("বাংলা গম্বুজ" বলতে একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্য শৈলীকে বোঝায় যা বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) উদ্ভূত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে মুঘল স্থাপত্যে গৃহীত হয়েছিল।) এবং চারটি মিনার রয়েছে।
২০২৩ সালের আগস্টে নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) সুপারিশ করে যে, এলাকায় ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য মসজিদটি ভেঙে ফেলা উচিত। এনডিএমসি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জনমতের জন্য তাদের প্রস্তাব পেশ করে এবং সংখ্যালঘু কর্মী, ইতিহাসবিদ এবং জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ এবং ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসসহ বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে ব্যাপক সমালোচনা পাওয়া যায়। মসজিদের ইমাম দিল্লি হাইকোর্টে এই সুপারিশকে চ্যালেঞ্জ করেন। মামলার কার্যক্রম চলাকালীন, এনডিএমসি আদালতকে বলে যে, নোটিশটি প্রক্রিয়াগত এবং "দিল্লির সুনেহরি বাগ মসজিদের সাথে শীঘ্রই কিছু করা হবেনা"।
ইতিহাস- সুনেহরি বাগ মসজিদের ইতিহাস ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো বলে জানা গেছে এবং এটি ঔপনিবেশিক রাজধানী নয়াদিল্লির নির্মাণের পূর্বে নির্মিত।মসজিদটি মুঘল রীতিতে নির্মিত হয়েছিল; তবে এর সঠিক নির্মাণ তারিখ জানা যায়নি। ইতিহাসবিদ স্বপ্না লিডলের মতে, মসজিদটি সম্ভবত ১৭ শতক বা তারও আগে নির্মিত। এটি লুটিয়েন্সে(লুটিয়েন্সের দিল্লি হল ভারতের নয়াদিল্লির একটি এলাকা, যার নামকরণ করা হয়েছে ব্রিটিশ স্থপতি স্যার এডউইন লুটিয়েন্সের নামে, যিনি ব্রিটিশ রাজের সময়কালে, যখন ভারত ১৯২০, ১৯৩০ এবং ১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, স্থাপত্য নকশা এবং ভবনের বেশিরভাগ তাঁর পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছিলো।)র দিল্লি এলাকায়, শিল্প ভবন মেট্রো স্টেশনের কাছে অবস্থিত।
লুটিয়েন্সের দিল্লি এলাকাটি মসজিদটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বলে দাবি করা হয়। ১৯১২ সালে এডউইন লুটিয়েন্সের নেতৃত্বে নয়াদিল্লির ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন সহ বেশ কয়েকটি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মসজিদটি বেঁচে ছিল।মসজিদটি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীদের আবাসস্থল ছিল, যাদের মধ্যে হাসরত মোহানিও ছিলেন, যারা সংসদ অধিবেশনে যোগদানের সময় মসজিদটিতে থাকতেন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ-এর দিল্লি শাখা মসজিদটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে । মসজিদটি সংরক্ষণের যোগ্য, এবং "এই ধরনের ভবনগুলিকে আইনি সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করার জন্য" একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার ফলে পরবর্তীতে ২০০৯ সালের দিল্লি সরকারের একটি বিজ্ঞপ্তিতে মসজিদটিকে গ্রেড-III ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কাঠামো- সুনেহরি বাগ মসজিদটি একটি দ্বিতল ভবন। এতে একটি বাংলা গম্বুজ এবং চারটি মিনার রয়েছে। মসজিদের বেসমেন্টে এমন কক্ষ রয়েছে যা দোকান অথবা ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং নামাজের স্থানে যাওয়ার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে। নিচতলার চারপাশে একটি পার্ক রয়েছে।মসজিদটি লাখোরি ইট(লাখোরি ইট, যা বাদশাহী ইট বা কাকাইয়া ইট নামেও পরিচিত। ইটগুলো সমতল, পাতলা, লাল পোড়া মাটির তৈরি, যা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল এবং নবাবী স্থাপত্যে ব্যবহৃত হত।) দিয়ে তৈরি।
মসজিদ ভাঙার নোটিশ- ওখলার বিধায়ক এবং তৎকালীন দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান আমানতুল্লাহ খান ২০২১ সালের ৩ জুন তারিখে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন, যাতে লুটিয়েন এলাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলিকে সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্পর্শ করা না হয়। দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দিল্লি হাইকোর্টে একটি আবেদন দায়ের করে, যার প্রথম শুনানি হয় ২০২৩ সালের ৫ জুলাই তারিখে। আদালত ২০২৩ সালের ৭ জুলাই তারিখে স্থিতাবস্থা বজায় রেখে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করে এবং ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তারিখে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের আগস্ট মাসে নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (NDMC) হাইকোর্টে সুপারিশ করে এবং মসজিদটি অপসারণের জন্য প্রস্তাব দেন। এনডিএমসি জানিয়েছে যে, ১৫০ বছরের পুরনো মসজিদটি "একটি উচ্চ-নিরাপত্তা অঞ্চলে পড়ে, যেখানে সংসদ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস অবস্থিত", এবং অপসারণের ফলে "নিরাপদ এবং মসৃণ যান-বাহন চলাচল" নিশ্চিত হবে।
এনডিএমসি ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তারিখে জনসাধারণের মতামত এবং পরামর্শ চেয়ে একটি পাবলিক নোটিশ জারি করে। দিল্লি ট্র্যাফিক পুলিশের বিবৃতি অনুসারে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে যেখানে বলা হয় যে, মসজিদটি "এই এলাকায়, বিশেষ করে মঙ্গলবার এবং শুক্রবারে যানজট তৈরি করে।" এনডিএমসির মসজিদ অপসারণের প্রস্তাবটি কেন্দ্রীয় গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক জমা দেওয়া ২০২১ সালের ট্র্যাফিক স্টাডি রিপোর্টের সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবেদনে "তখন বা নিকট ভবিষ্যতে গোলচত্বরে কোনও যানজঁট" পাওয়া যায়নি। ১ জানুয়ারী ২০২৪ সালের মধ্যে এনডিএমসি ৮৫,০০০ এরও বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে, যার বেশিরভাগই মুসলিম এবং সংখ্যালঘু সংগঠন থেকে এসেছে এবং যার বেশিরভাগই মসজিদ ভাঙার বিরুদ্ধে। জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের সভাপতি মাহমুদ মাদানি প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে এই বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে আপত্তি প্রকাশ করে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি চিঠিতে লিখেছেন যে "এই ধরনের পদক্ষেপ আমাদের ঐতিহ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতি করবে"। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীণ স্থপতির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, "সুনেহরি বাগ মসজিদ কেবল ইট ও গাঁথুনির তৈরি একটি কাঠামো নয়; এটি আমাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর ধ্বংসের ফলে আমাদের শহরের সাংস্কৃতিক কাঠামো এবং সামগ্রিক পরিচয়ের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।"
দিল্লি হাইকোর্ট- সুনেহরি বাগ মসজিদের ইমাম আব্দুল আজিজ দিল্লি হাইকোর্টে এনডিএমসির জনমত চাওয়ার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিযোগ করেন যে, "কোনও বিবেক প্রয়োগ ছাড়াই অসৎ উদ্দেশ্যে নোটিশটি জারি করা হয়েছে এবং কাঠামোটি এলাকায় যানজঁটের সৃষ্টি করছে এই দাবির সমর্থনে কোনও গবেষণা বা তথ্য ছাড়াই কাঠামোটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।" এনডিএমসি আদালতকে বলেছে যে, "দিল্লির সুনেহরি বাগ মসজিদের খুব শীঘ্রই কিছু করা হবে না", এই বলে যে, পাবলিক নোটিশটি প্রক্রিয়াগত এবং হেরিটেজ সংরক্ষণ কমিটির মতামত প্রথমে গ্রহণ করা হবে। মামলাটি ১১ জানুয়ারী ২০২৪ তারিখে একটি দ্বৈত বেঞ্চে স্থানান্তরিত হয়।
ঐতিহাসিকদের প্রতিক্রিয়া- জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ইতিহাসবিদ নারায়ণী গুপ্ত লক্ষ্য করেছেন যে, "লুটিয়েন্স চতুরতার সাথে এই ছোট্ট মসজিদটিকে গোলচত্বরের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমাদের বর্তমান শহর নিয়ন্ত্রকরা কেবল ভিআইপি গাড়ির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে" এবং স্বপ্না লিডল বলেছেন যে, মসজিদের চারপাশের যানজঁট সমস্যা সমাধানের আরও বেশ কয়েকটি উপায় রয়েছে।
১০ জানুয়ারী ২০২৪ তারিখে, ভারতের সকল অঞ্চলের ইতিহাসবিদদের নিয়ে গঠিত ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, নয়াদিল্লি নির্মাণের সময় মসজিদের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং এর ইতিহাসের গুরুত্ব সাপেক্ষে, এনডিএমসির মসজিদটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব জারি করেছে। ঐতিহাসিকরা বলেছেন যে, মসজিদের অবস্থানটি স্মরণীয় এবং স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। •
জিনাত-উল-মসজিদ, সেণ্ট্রাল দিল্লী
জিনাত-উল-মসজিদ ঘাটা মসজিদ নামেও পরিচিত। ১৮ শতকের মুঘলদের দ্বারা নির্মিত মসজিদটি ভারতের মধ্য দিল্লির দরিয়াগঞ্জে অবস্থিত। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় কন্যা জিনাত-উন-নিসা মসজিদটি নিৰ্মাণ করেছিলেন।
অবস্থান-জিনাত-উল-মসজিদটি মধ্য দিল্লির দরিয়াগঞ্জে লাল কেল্লার দক্ষিণে এবং যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত।
ইতিহাস- জিনাত-উল-মসজিদটি ১৮ শতকের শুরুতে জিনাত-উন-নিসা তাঁর পিতা আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে নির্মাণ করেছিলেন।১৮ শতকে মুঘল অভিজাতদের মসজিদের প্রতি বর্ধিত পৃষ্ঠপোষকতার অংশ হিসেবে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল।
দিল্লি অবরোধের সময়, জিনাত-উল-মসজিদটি ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী দ্বারা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে সৈন্যদের জন্য একটি ব্যারাকে রূপান্তরিত করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে ভবনটি আংশিকভাবে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হত।
স্থাপত্য- জিনাত-উল-মসজিদটি একটি উঁচু ভিত্তির উপর নির্মিত। মসজিদটির তিনটি মার্বেল গম্বুজ রয়েছে যা লাল বেলেপাথরের ডোরাকাটা তৈরি এবং উপরে উল্টানো পদ্মফুল রয়েছে। মসজিদের পিশতাক মার্বেল দিয়ে সজ্জিত এবং পাতলা বুরুজ(একটি পাতলা বুরুজ বলতে একটি নির্দিষ্ট ধরণের বুরুজ কনফিগারেশনকে বোঝায় যা এর কম্প্যাক্ট আকার এবং পুরু বুরুজের তুলনায় কম দৈর্ঘ্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।) দ্বারা ফ্রেম করা হয়েছে। মসজিদের সম্মুখভাগে প্রধান প্রবেশপথের উভয় পাশে তিনটি খিলানপথ রয়েছে, যার প্রতিটি স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত। মসজিদের সম্মুখভাগের উভয় প্রান্তে তিন তলা মিনার রয়েছে। পিশতাক এবং গম্বুজের উচ্চতার বৈশিষ্ট্যগুলিতে শাহজাহানের জামা মসজিদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়; তবে গম্বুজের কন্দযুক্ত আকৃতি এবং সংকীর্ণ ঘাড় এবং মসজিদে প্রবেশের খিলানপথে আওরঙ্গজেব-যুগের স্থাপত্যের উপাদানগুলি স্পষ্ট।
সাফা মসজিদ, গোয়া
সাফা মসজিদ সাফা শাহৌরি মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের গোয়ার পোন্ডায় অবস্থিত। মসজিদটিতে বাগান এবং পুকুর নিয়ে গঠিত একটি চত্বর (কমপ্লেক্স) রয়েছে। পোড়ামাটির টাইল দিয়ে নির্মিত ছাদে একটি আয়তক্ষেত্রাকার প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত এই মসজিদটি গোয়ার একটি ASI-সুরক্ষিত জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস- ভি. টি. গুনের মতে, পোন্ডার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার (১.২ মাইল) দূরে বিজাপুরী শাসক প্রথম ইব্রাহিম আদিল শাহ ১৫৬০ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটি আদিল শাহ আমলের বা তারও আগেকার বলে ধারণা করা হয়। তবে, মসজিদটিতে কোনও শিলালিপি নেই এবং এর নির্মাণের উল্লেখ থাকা কোনও ঐতিহাসিক নথি নেই। তাই নির্মাণের সঠিক তারিখ অজানা।গোয়ায় পর্তুগিজ শাসনের সময়, পর্তুগিজরা মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত তথা পুড়িয়ে দিয়েছিলো। ১৯৮০-এর দশকে মসজিদটি আংশিকভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। পুনর্নির্মাণের আগে মসজিদটি ধ্বংসস্তূপের মতো পড়েছিল। •
জামে মসজিদ, আহমেদাবাদ
জামে মসজিদ জুমা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে অবস্থিত। মসজিদটি ১৪২৪ সালে প্রথম আহমদ শাহের রাজত্বকালে নির্মাণ করা হয়েছিলো। কেন্দ্রীয় মিহরাবের শিলালিপিতে ৮২৭ হিজরিতে (১৪২৩/১৪২৪ খ্রিস্টাব্দ) বা ৪ জানুয়ারী মাসে সুলতান আহমেদ শাহ প্রথম কর্তৃক মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়েছিলো বলে উল্লেখ রয়েছে।মসজিদটি পুরাতন প্রাচীরবেষ্টিত শহরে অবস্থিত এবং ভদ্র দুর্গ (ভদ্রা দুর্গ হল ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক দুর্গ। ১৪১১ সালে সুলতান আহমেদ শাহ কর্তৃক নির্মিত, এর নামকরণ করা হয়েছে নিকটবর্তী ভদ্রকালী মন্দিরের নামে।) এলাকার বাইরে অবস্থিত। পুরাতন প্রাচীরবেষ্টিত শহরটি পৃথক কোয়ার্টার(পৃথক কোয়ার্টার বলতে সাধারণত এমন থাকার জায়গা বোঝায় যা অন্যদের থেকে আলাদা এবং স্বাধীন) বা পোলে("POLS" বলতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি একাডেমিক শাখা বা রাজনীতিবিদদের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত, অনানুষ্ঠানিক শব্দ হিসেবে বোঝাতে পারে। ভারতের আহমেদাবাদের প্রেক্ষাপটে, POLS (বা "Pol") সংকীর্ণ রাস্তা, ভাগ করা উঠোন এবং সম্প্রদায়ের একটি শক্তিশালী অনুভূতি দ্বারা চিহ্নিত আবদ্ধ আবাসিক পাড়াগুলিকেও বোঝায়।) বিভক্ত এবং জামে মসজিদটি গান্ধী রোডে অবস্থিত। রাস্তার দক্ষিণ পাশে, মসজিদটি তিন দরওয়াজা বা ত্রিপোলিয়া গেট থেকে অল্প দূরে অবস্থিত।কাঠামোটি জাতীয় গুরুত্বের একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে চিহ্নিত।
জামা মসজিদটি প্রথম আহমেদ শাহের রাজত্বকালে নির্মিত পঞ্চম মসজিদ কাঠামো ছিল। পূর্ববর্তী মসজিদগুলি হয় আকারে সামান্য ছিল অথবা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ছিল। জামা মসজিদটি তার পূর্বসূরীদের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল, কারণ এটি একটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ কাঠামো ছিল। মসজিদ কমপ্লেক্সে একটি বৃহৎ পাকা উঠোন রয়েছে যা তিনটি ভিন্ন দিক থেকে প্রবেশ করা যেতে পারে। উঠোনের মাঝখানে অযুর জন্য একটি পানি ট্যাঙ্ক রয়েছে। ভবনের পশ্চিম দিকে প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। পুরো মসজিদটি গুজরাটি শৈলীর স্থাপত্যের প্রতীক।
অবস্থান- আহমেদাবাদের জামে মসজিদ সম্ভবত সেই সময়ে নির্মিত ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ ছিল।এটি প্রাচীরবেষ্টিত পুরাতন শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। মসজিদের উত্তরের দেয়ালটি একটি শোভাযাত্রা পথ(শোভাযাত্রার পথ হল একটি আনুষ্ঠানিক হাঁটার পথ বা রাস্তা, যা প্রায়শই ধর্মীয় বা সরকারি অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত, যা শোভাযাত্রা এবং কুচকাওয়াজের জন্য ব্যবহৃত হয়।) বরাবর অবস্থিত। মসজিদটি সুলতান আহমেদ শাহ প্রথমের কাঙ্ক্ষিত একটি প্রধান পরিকল্পনার অংশ হিসাবে নকশা করা, মসজিদটি ময়দান-ই শাহ থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রার অক্ষের উত্তরে অবস্থিত, যার দরজায় তিনটি খিলান রয়েছে।।একটি সিঁড়ি দিয়ে উত্তর দিক থেকে মসজিদে প্রবেশ করা যায়। মসজিদের পূর্বে বাদশা-কা-হাজিরা, যা আহমদ শাহের সমাধি নামেও পরিচিত। এটি আহমদ শাহ প্রথম, তার পুত্র এবং নাতির সমাধি। সমাধিটি জামে মসজিদের মতো একই স্থাপত্য শৈলী ব্যবহার করেছিল। কিছু স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে একাধিক গম্বুজ, কলাম কোর্ট("কলাম কোর্ট" বলতে সাধারণত আদালত ভবনগুলিকে বোঝায় যেখানে স্থাপত্য নকশার অংশ হিসেবে বিশিষ্ট স্তম্ভ থাকে, যা প্রায়শই কর্তৃত্ব এবং ঐতিহ্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।) এবং ছিদ্রযুক্ত পর্দার দেয়ালের ব্যবহার। যদিও সমাধিতে কোনও অভিনব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা হয়নি, এটি আহমেদাবাদে এই ধরণের প্রথম স্থাপত্য। কাছাকাছিই সুলতান আহমেদ শাহ প্রথমের রানী এবং অন্যান্য স্ত্রীদের কবর রয়েছে, যাকে রানী নো হাজিরো বা হাজিরা(রানি নো হাজিরো, যা মুঘলাই বিবির সমাধি বা আহমেদ শাহের রাণীদের সমাধি নামেও পরিচিত) বলা হয়। এই সমাধিটিতে আহমদ শাহের সমাধির অনুরূপ স্থাপত্য শৈলী ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইতিহাস- সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, স্থানীয় কর্মকর্তারা মসজিদের মূল উপাদানগুলির সংরক্ষণের জন্য লড়াই করে চলেছেন এবং উপাসকদের জন্য কাঠামোটি ব্যহারযোগ্য করে রেখেছেন। সুন্নি মুসলিম ওয়াকফ কমিটি মসজিদের মূল উঠোনের বেলেপাথরের মেঝে মার্বেল দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে। মসজিদের উঠোনের মাঝখানে অবস্থিত হাউজ (ট্যাঙ্ক), যা উপাসকরা নামাজের আগে ওজু করার জন্য ব্যবহার করেন, তাও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।জানালায় লোহার ফ্রেম লাগানো হয়েছে।প্রত্নতাত্ত্বিক সোসাইটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের অবশেষ আইন লঙ্ঘনের জন্য সুন্নি মুসলিম ওয়াকফ কমিটির সদস্য এবং স্থানীয়দের বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছে। সুন্নি মুসলিম ওয়াকফ কমিটি বলেছে, "মসজিদের ক্ষয় রোধ করার জন্য এএসআই-এর সম্পদ বা ইচ্ছাশক্তি নেই। যখন এএসআই কোনও ভেঙে পড়া স্মৃতিস্তম্ভ মেরামত করতে ব্যর্থ হয়, তখন কাজটি করার দায়িত্ব আমাদের উপর বর্তায়। আমরা প্রার্থনা করতে আসা লোকদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান থেকে পালাতে পারি না"।
স্থাপত্য- দিল্লির মুসলিম শাসন থেকে অনেক দূরে ১৪১১ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি আহমেদাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফলে আহমেদাবাদ নিজস্ব প্রাদেশিক স্থাপত্যশৈলী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলো। আহমেদাবাদের প্রাদেশিক স্থাপত্যশৈলীকে সাধারণত প্রদেশের নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গুজরাট শৈলী বলা হয়। গুজরাট স্থাপত্যশৈলী আহমেদাবাদের স্থাপত্যশৈলী, ইন্দো-ইসলামিক এবং ঐতিহ্যবাহী হিন্দু মন্দির স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ। ১৫শ শতাব্দী এবং তার পরে গুজরাট শৈলীর বিকাশ ঘটেছিলো, একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মারু-গুর্জার শৈলী ছিল গুজরাট ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর নমুনা। কারণ প্রথম আহমেদ শাহ ক্ষমতায় আসার এবং আহমেদাবাদ প্রতিষ্ঠার এক শতাব্দী আগে গুজরাটে ইসলামের উপস্থিতি ছিল।আহমেদ শাহ-পূর্ব যুগে গুজরাটের প্রাথমিক মসজিদগুলি বেশিরভাগ লুণ্ঠিত মন্দিরের উপাদান থেকে তৈরি করা হয়েছিল, যা মসজিদের মতো কাঠামোতে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।
আহমেদাবাদের গুজরাট স্থাপত্যশৈলীর অনেক উদাহরণের মধ্যে জামে মসজিদটি অন্যতম। পুরাতন শহরের ভেতরে এবং আশেপাশের স্মৃতিস্তম্ভগুলি মোটামুটি দুটি বিভাগে বিভক্ত। প্রথম বিভাগটি পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রথম আহমদ শাহের সাথে সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয়টি পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এবং তার পরে মাহমুদ বেগাদার সাথে সম্পর্কিত।হলুদ বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত, মসজিদ কমপ্লেক্সটি ৭৫ মিটার (২৪৬ ফুট) লম্বা এবং ৬৬ মিটার (২১৭ ফুট) প্রশস্ত একটি বৃহৎ আয়তাকার উঠানের উপর কেন্দ্রীভূত। একটি প্রবেশপথ দক্ষিণ দিকে, পূর্ব এবং উত্তরে তিনটি প্রবেশপথ দিয়ে চত্বরে প্রবেশ করা যায়। প্রাথমিক প্রবেশপথটি দক্ষিণমুখী প্রবেশপথ; পূর্বের বারান্দাযুক্ত প্রবেশপথটি সুলতান আহমদ শাহ প্রথমের সমাধিতে পর্যন্ত প্রসারিত1 উঠানটি তিন দিকে একটি কলোনিয়া(পাথরের স্তম্ভের সারি যার মাঝখানে সমান ফাঁক থাকে) দিয়ে সারিবদ্ধ, প্রার্থনা কক্ষটি পশ্চিম দিকে অবস্থিত। উঠানের কেন্দ্রে অজুর জন্য একটি আয়তাকার বেসিন রয়েছে।
মসজিদের দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথটি বিশাল এবং স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত, যার মধ্যে কিছু স্তম্ভ হিন্দু বা জৈন মন্দির থেকে আহরণ করে পুনঃব্যবহৃত হয়েছিল। বারান্দাটি উঁচু করা হয়েছে যার প্রতিটি পাশে বারোটি ধাপ রয়েছে। এর উপরে একটি ছাদ রয়েছে। ছাদটিতে একসময় একটি গম্বুজ ছিল যা এখন ভেঙে পড়েছে।
ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যে, মসজিদটিতে অনেক সমন্বয়মূলক উপাদান রয়েছে যা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট নয়: কিছু কেন্দ্রীয় গম্বুজ পদ্ম ফুলের মতো খোদাই করা হয়েছে, যা জৈন মন্দিরের সাধারণ গম্বুজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত; এবং কিছু স্তম্ভ একটি শিকলের উপর ঝুলন্ত ঘণ্টার আকারে খোদাই করা হয়েছে, যা প্রায়শই হিন্দু মন্দিরে ঝুলন্ত ঘণ্টার সাথে সম্পর্কিত।
প্রার্থনা কক্ষ- প্রার্থনা কক্ষটি আয়তাকার এবং পনেরটি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রার্থনা কক্ষের ছাদটি তিন স্তরে সাজানো। প্রধান প্রার্থনা কক্ষে ঘনিষ্ঠভাবে স্থাপন করা প্রায় ২৬০টি স্তম্ভ রয়েছে যা ছাদকে সমর্থন করে। ছাদটিতে ১৫টি গম্বুজ রয়েছে, যা হলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আলো এবং ছায়ার একটি সুন্দর গোলকধাঁধা তৈরি করে। সাদা মার্বেল দিয়ে মোড়ানো প্রশস্ত খোলা উঠোনটি বিশাল আরবি ক্যালিগ্রাফি দিয়ে আঁকা একটি স্তম্ভ দ্বারা আবদ্ধ এবং কেন্দ্রে ওযুর জন্য একটি ট্যাঙ্ক রয়েছে। মসজিদ এবং তোরণগুলি হলুদ বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত। প্রধান প্রার্থনা কক্ষটি পনেরোটি উপসাগরে বিভক্ত। প্রতিটিতে একটি গম্বুজ রয়েছে যার ফলে মোট ১৫টি গম্বুজ রয়েছে। কেন্দ্রে অবস্থিত কাপোলা(একটি গম্বুজ আকৃতির একটি ছোট কাঠামো, যা প্রায়শই ছাদের উপরে পাওয়া যায়।) গম্বুজটি বাকিগুলির চেয়ে উঁচু।প্রার্থনা এলাকার কেন্দ্রীয় নেভ(গির্জা ভবনের কেন্দ্রীয় অংশ, যা বেশিরভাগ ধর্মসভার জন্য উপযুক্ত।) তিন তলা উঁচু।
মসজিদটিতে মোট পাঁচটি মিহরাব রয়েছে যা মূল নামাজ কক্ষের উপরে পাঁচটি বর্গাকার 'বে'র সাথে যুক্ত। পাঁচটি মিহরাব কিবলা প্রাচীর(কিবলা প্রাচীর হল মসজিদের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট প্রাচীর যা মক্কার কাবার দিক নির্দেশ করে, যে দিকে মুসলমানরা নামাজের সময় মুখ করে থাকে।) বরাবর অবস্থিত। কিবলা প্রাচীরটি পশ্চিম দিকে মুখ করে রয়েছে এবং মিহরাবগুলির সাথে রঙিন মার্বেল দিয়ে সজ্জিত। একটি সাদা অর্ধচন্দ্রাকার মার্বেল, সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে, যেখানে ইমামের আসন। কেন্দ্রীয় খোলা অংশের দুটি স্তম্ভের মধ্যে ছিদ্র করা পাথরের পর্দা ('জালি') স্থাপন করা হয়েছে।
মিনার- প্রধান প্রবেশপথটি দুটি স্তম্ভ দ্বারা নির্মিত। এগুলি হল ১৮১৯ এবং ১৯৫৬ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া দুটি মিনারের ধ্বংসাবশেষ। ১৮১৯ সালের ভূমিকম্পে, উঁচু মিনারগুলি তাদের উচ্চতার অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং সেজন্য মিনারগুলি "কাঁপানো মিনার" নামে পরিচিত। ১৯৫৬ সালের ভূমিকম্পে অবশিষ্ট "কাঁপানো মিনার" ধ্বংস হয়ে গেছে। •
জামে মসজিদ, চম্পানের
জামি মসজিদ, যা জামে মসজিদ নামেও পরিচিত। যার অর্থ "সার্বজনীন মসজিদ"। বর্তমানে মসজিদটি ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে সুসংরক্ষিত।মসজিদটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের চম্পানেরে অবস্থিত। মসজিদটি জাতীয় গুরুত্বের একটি স্মৃতিস্তম্ভ এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলির সাথে চম্পানের-পাবগড় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানের অংশ। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।মসজিদটি বরোদা হেরিটেজ ট্রাস্ট দ্বারা তালিকাভুক্ত ১১৪টি স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে একটি। মসজিদটি শহরের দেয়াল (জাহদনপান্ধ) থেকে প্রায় ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) পূর্বে, পূর্ব গেটের কাছে অবস্থিত।
ইতিহাস- মসজিদটি ১৫১৩ সালে নির্মিত। মসজিদটির নির্মাণ কাজ ২৫ বছর ধরে চলছিল। এটি সুলতান মাহমুদ বেগাদা কর্তৃক নির্মিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে একটি। বলা হয় যে মুঘল স্থাপত্যটি সুলতানি আমলের স্থাপত্য থেকে উদ্ভূত, যা জৈন ধর্মীয় ভাবধারা এবং মুসলিম নীতির সাথে কারিগরি দক্ষতার মিশ্রণ; বৃহৎ গম্বুজগুলি এই ধরণের মিশ্রণের ইঙ্গিত প্রদান করে।১৮৯০-এর দশকে মসজিদটির সংস্কারের কাজ করা হয়েছিল।
স্থাপত্য- মসজিদটিতে জৈন এবং মুসলিম স্থাপত্যের মিশ্রণ রয়েছে, যা ইসলামী নীতিমালা প্রতিনিধিত্ব করে। মার্জিত অভ্যন্তরীণ নক্সার সাথে মসজিদটি পশ্চিম ভারতের সেরা মসজিদগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। মসজিদ এবং সমাধির পৃষ্ঠতলের অলঙ্করণে সূর্যের প্রতীক, হীরা, পাত্র, লতা এবং পদ্মের প্রতীক রয়েছে। এগুলি পূর্ববর্তী মন্দিরগুলিতে ব্যবহৃত হত। এই অঞ্চলের শিল্পীরা যারা এই স্থাপনাগুলিতে কাজ করেছিলেন তাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এসব কারুশিল্প আত্মস্থ করেছিলেন। হিন্দু, মুসলিম বা জৈনদের প্রদত্ত কাজ করার কারণে তাঁরা সাম্প্রদায়িক চরিত্রের ছিলেন না- ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন। এই মসজিদে তিনটি আয়তাকার দেয়াল ফলক ছিল, একটি মিম্বরের উপরে এবং অন্য দুটি পাশে ছিলো। এগুলিতে কোরানের স্তোত্র খোদাই করা ছিল।
ইসলামী এবং হিন্দু উভয় ধরণের অলঙ্করণসহ ভবনটি দ্বিতল ছিলো। মসজিদের পরিকল্পনা আহমেদাবাদের সিদি সাইয়্যেদ মসজিদের মতো ছিলো। মসজিদটি আয়তাকার এবং পূর্ব দিকে প্রবেশদ্বার অবস্থিত। সন্মুখভাগে পোর্টিকো রয়েছে, যার উপরে একটি বৃহৎ গম্বুজ নির্মিত হয়েছে। মসজিদে উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে সিঁড়ি রয়েছে। মূল প্রবেশপথের উভয় পাশে ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) উঁচু অষ্টভুজাকার খোদাই করা দু’টি মিনার অবস্থিত। দু’টি মিনারের মধ্যে একটি ১৮১২ সালে সিন্ধিয়ার গভর্নর পাটঙ্করের বন্দুকের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো।মসজিদটিতে সাধারণ গুজরাট স্থাপত্যশৈলীর ওরিয়েল(জলপরা বাধা প্রদানের জন্য ছাদ) জানালা দেখা যায়, যার বাইরের পৃষ্ঠে স্বতন্ত্রভাবে খোদাই করা রয়েছে। ছাদে বেশ কয়েকটি গম্বুজ রয়েছে। উঠোনটি প্রশস্ত। মসজিদটিতে সাতটি মিহরাব রয়েছে এবং খোদাই করা প্রবেশদ্বারগুলি সূক্ষ্ম পাথরের জালি দিয়ে সজ্জিত।
একাধিক প্রার্থনা কক্ষ প্রায় ২০০টি স্তম্ভ দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। প্রধান প্রার্থনা কক্ষে এগারোটি গম্বুজ রয়েছে, যার কেন্দ্রীয় গম্বুজটি একটি দ্বিতল কাঠামো তোরণ আকারের স্তম্ভের উপর নির্মিত। শাসকের প্রার্থনা কক্ষটি জালি দ্বারা মূল এলাকা থেকে পৃথক করা হয়েছে। একটি গম্বুজে একটি দ্বিতল স্তম্ভ রয়েছে। অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে একটি খিলানযুক্ত মাকসুরা পর্দা(ইসলামী স্থাপত্যে মাকসুরা হলো একটি ঘেরা জায়গা বা পর্দা, যা প্রায়শই কাঠ বা ধাতু দিয়ে তৈরি, মসজিদের মিহরাবের কাছে অবস্থিত।), ট্রাবিয়েট হাইপোস্টাইল লওয়ান (স্থাপত্যে, একটি হাইপোস্টাইল হলের একটি ছাদ থাকে যা স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত।), বর্গাকার পার্শ্ব ডানা, জানানা আবরণ এবং উত্তরের মিহরাবের পর্দা।
ভূমি- মসজিদের পাশেই সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা বর্গাকার পরিকল্পনায় তৈরি করা হয়েছে। সমাধি সৌধের উপরে স্তম্ভ এবং গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং অলংকরণও করা হয়েছে। ভবনের কাছে অষ্টভুজাকার কুণ্ড আকৃতির একটি অযু ট্যাঙ্ক রয়েছে; ট্যাঙ্কটি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নামাজের আগে অযু করার জন্য ব্যবহৃত হত। বাগানের এক কোণে সমাহিত পীরের কাছ থেকে আশীর্বাদ গ্রহণকারীদের জন্য মসজিদটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
অন্যান্য মসজিদ- চম্পানের-পাবগড় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানের মধ্যে আরও বেশ কয়েকটি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বাওয়ামান, কেভাড়া, লীলা গুম্বাজ কি এবং নাগিনা মসজিদ। •
দেলানপুর জামে মসজিদ, পোর্টব্লেয়ার
দেলানপুর মসজিদ বা জামে মসজিদ নামেও পরিচিত, ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারের দেলানপুর এলাকায় মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটিতে শুক্রবারের নামাজ পড়া হয়।
স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-জুহার উৎসবে এই মসজিদটিতে ঈদের নামাজ উদযাপন করা হয়। মসজিদটিতে প্রতিদিন ওয়াক্তিয়া নামাজ আদায় করা হয়।
সিদি সাইয়্যিদ মসজিদ
সিদি সাইয়্যিদ মসজিদ, স্থানীয়ভাবে সিদি সাইয়্যিদ নি জালি মসজিদ নামে পরিচিত। একটি সুন্নি মসজিদ। মসজিদটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে অবস্থিত। মসজিদটি ৯৮০ হিজরিতে (১৫৭২/১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে) সিদি সাইয়্যাদ নামক একজন হাবশী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। কাঠামোটি জাতীয় গুরুত্বের একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস- সিদি সাইয়্যেদ মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে সিদি সাইয়্যেদ কি/নি জালি নামে পরিচিত, ৯৮০ হিজরিতে (১৫৭২/১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ) আহমেদাবাদে নির্মিত একটি মসজিদ।
মসজিদের দেয়ালে লাগানো মার্বেল ফলক দ্বারা প্রমাণিত যে মসজিদটি শেখ সাইয়্যেদ আল-হাবশি সুলতানি দ্বারা নির্মিত হয়েছিলো। সিদি সাইয়্যেদ মূলত একজন তুর্কি সেনাপতি রুমি খানের দাস ছিলেন, যিনি ইয়েমেন থেকে গুজরাটে এসেছিলেন এবং আসার সময় তিনি হাবশি দাসদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সিদি সাইয়্যেদ পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদ তৃতীয়ের সেবা করেছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর আবিসিনিয়ার সেনাপতি ঝুঝার খানের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। সিদি সাইয়্যেদ সামরিক চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ঝুঝার খান তাঁকে একটি জায়গির প্রদান করেছিলেন। সিদি সাইয়্যেদ তার কর্মজীবনে একজন বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হয়ে ওঠেছিলেন এবং তিনি একটি গ্রন্থাগার সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি একশোরও বেশি দাসের মালিক হয়েছিলেন এবং হজযাত্রা করেছিলেন। তিনি একটি লঙ্গরও (জনসাধারণের রান্নাঘর) প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্বে সেইস্থানে একটি ছোট ইটের মসজিদ ছিল, যা সিদি সাঈদ পুনর্নির্মাণ করেছিলেন এবং ১৫৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে মসজিদের কাছে সমাহিত করা হয়েছিলো। গুজরাট সালতানাতের অস্তিত্বের শেষ বছরে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে মসজিদটি দাসক্রোহি তালুকের মামলতদারের অফিস বা কাচারি হিসেবে কাজ করত। অফিস চলাকালীন সময়ে, দরজা স্থাপন করা হয়েছিল এবং অভ্যন্তরটি সাদা করা হয়েছিল। আহমেদাবাদে সরকারী সফরের সময়, ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণের বিস্তৃত নীতির অংশ হিসাবে মামলতদারের অফিসটিকে খালি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে খিলানযুক্ত এবং এর পাশে এবং পিছনের খিলানগুলিতে দশটি জটিলভাবে খোদাই করা পাথরের জালির জানালা (জালি) এর জন্য পরিচিত। পিছনের দেয়ালটি জ্যামিতিক নকশায় বর্গাকার পাথরের ছিদ্রযুক্ত প্যানেল দিয়ে পূর্ণ। কেন্দ্রীয় আইলে(একটি কেন্দ্রীয় আইল বলতে প্রধান হাঁটার পথ বা পথকে বোঝায় যা একটি স্থানের মাঝখান দিয়ে চলে যায়, সাধারণত একটি ভবন বা কাঠামো, যেমন একটি গির্জা, থিয়েটার বা সুপারমার্কেট।)র পাশে দুটি উপসাগরে জালিকাযুক্ত পাথরের স্ল্যাব রয়েছে, যা গাছ, পাতা এবং একটি তালের মোটিফের নকশায় খোদাই করা হয়েছে। এই জটিলভাবে খোদাই করা জালিকাযুক্ত পাথরের জানালাটি হল সিদি সাইয়্যেদ জালি, যা আহমেদাবাদ শহরের অনানুষ্ঠানিক প্রতীক এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, আহমেদাবাদের লোগো ডিজাইন করার জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছে।
মসজিদের কেন্দ্রীয় জানালার খিলান পাথর দিয়ে ঘেরা। সম্ভবত এর কারণ হল মুঘলরা গুজরাট আক্রমণ করার আগে মসজিদটি পরিকল্পনা অনুসারে নির্মাণ করা হচ্ছিলনা। •
কাবুলি বাগ মসজিদ
কাবুলি বাগ মসজিদ ভারতের হরিয়ানার পানিপথে অবস্থিত। ১৫২৬ সালের পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম লোধির বিরুদ্ধে বিজয়ের স্মরণে ১৫২৭ সালে সম্রাট বাবর মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছিল বাবরের স্ত্রী কাবুলি বেগমের নামে। মসজিদ এবং এর চারপাশের প্রাচীর জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ।
অবস্থান- পানিপথ জেলার পানিপথের কাবুলি বাগ কলোনিতে অবস্থিত কাবুল বাগ নামক ঐতিহাসিক মসজিদটি পানিপথ শহর থেকে ২ কিলোমিটার (১.২ মাইল) দূরে অবস্থিত।
ইতিহাস- প্রধান মসজিদ ভবনটি ১৫২৭ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। তৈমুরিদ রাজবংশের সম্রাট বাবর ১৫২৬ সালে পানিপথে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেছিলেন। এটি ছিল হিন্দুস্তানের উপর মুঘলদের প্রথম বিজয়। তৈমুর লুং এর বংশধর বাবর ভারতের পাঠান শাসকদের উপর মুঘলদের বিজয়ের স্মৃতি হিসাবে ১৫২৭ সালে কাবুল বাগ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।
দরজা এবং বাগান সংযোজন- ১৫২৭ সালে দরজা এবং এর চারপাশের বাগানটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। বাবরের পুত্র হুমায়ুন পানিপথের কাছে শের শাহ সুরির বংশধরদের পরাজিত করে সেখানে একটি পাথরের প্ল্যাটফর্ম(চত্বর) তৈরি করেছিলেন এবং এর নাম দিয়েছিলেন "চাবুতরা"।
স্থাপত্য- মসজিদের স্থাপত্য কিছুটা হলেও সমরকন্দের রাজকীয় মসজিদের প্রতিরূপ, যেখানে বিশাল খিলানযুক্ত গম্বুজ রয়েছে। বাবর তৈমুরীয় স্থাপত্যের সম্পূর্ণ প্রতিরূপ তৈরি করতে পারেননি, কারণ ভারতে এই ধরণের স্থাপত্য তৈরির জন্য প্রশিক্ষিত কারিগর এবং প্রকৌশলী তখন পাওয়া যেত না।
১৫২৭ সালের একটি শিলালিপি রয়েছে, যেখানে বাদশাহ, রানী এবং নির্মাতা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। এই শিলালিপিটি একটি স্বতন্ত্র কালো মার্বেল পাথরের উপর লেখা হয়েছিলো। পুরো ফটক(সদর দরজা)টি ইট এবং লাল বেলেপাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল।
আকৃতি- ইট এবং স্টুকো প্লাস্টার দিয়ে নির্মিত মসজিদটি একটি প্রাঙ্গণ প্রাচীরের মধ্যে অবস্থিত। মসজিদের কোণগুলিতে উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অষ্টভুজাকৃতির টাওয়ার রয়েছে।
ইট এবং লাল বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত এর প্রবেশদ্বারে একটি ঘেরা "ব্র্যাকেট টাইপ লিন্টেল" রয়েছে, যার আকৃতি একটি বৃহৎ খিলানের মতো। এর স্প্যান্ড্রেল(স্প্যান্ড্রেল হল একটি স্থাপত্য বা জৈবিক উপাদান যা প্রায়শই দুটি খিলানের মধ্যবর্তী স্থানে, অথবা একটি খিলান এবং একটি পার্শ্ববর্তী আয়তক্ষেত্রের মধ্যবর্তী স্থানে পাওয়া যায়।)গুলিতে অলঙ্করণ রয়েছে, যা খিলানযুক্ত খাঁজ সহ আয়তক্ষেত্রাকার প্যানেলে আবদ্ধ। প্রার্থনা কক্ষটি বড় এবং এর পরিমাপ ৫৩.৭৫ বাই ১৬.৫ মিটার (১৭৬ বাই ৫৪ ফুট) এবং এটি একটি বৃহৎ গম্বুজ দ্বারা আবৃত।
প্রার্থনা কক্ষের দেয়ালে একটি কিবলা(ইসলামে, কিবলা হল সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কাবার দিকের দিক, যেখানে মুসলমানরা তাদের প্রতিদিনের নামাজের সময় মুখ করে থাকে।)রয়েছে, যা মক্কার দিকে মুখ করে অবস্থিত। এই কেন্দ্রীয় উপসাগরটি এর প্রশস্ত প্রবেশপথের মধ্য দিয়ে বাইরে থেকেও দৃশ্যমান। এখানে মিহরাবের একটি এপিগ্রাফ রয়েছে যার মধ্যে "কুরআনের আয়াত"লেখা রয়েছে।
থানেশ্বর পাথর মসজিদ
থানেশ্বর পাথর মসজিদ পাথর মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের থানেশ্বর শহরে অবস্থিত একটি পুরানা মসজিদ। মসজিদটি একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। মসজিদটি ১৭ শতকে নির্মিত বলে বিশ্বাস করা হয়। মসজিদটি কুরুক্ষেত্র জেলায় অবস্থিত এবং জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস-মসজিদটি ১৭ শতকে জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে নির্মাণ করা হয়েছিলো। মসজিদটি লাল বেলেপাথরের তৈরি একটি ছোট ভবন। মসজিদটি মুঘল স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি। স্তম্ভের উপর স্থাপিত ছাদটি খোদাই করা ফুলের নকশা দ্বারা সজ্জিত। এটি শেখ চিলি(সুফি আবদুর রহিম আবদুল করিম আবদুর রাজ্জাক, যিনি শেখ চিলি নামে পরিচিত। তিনি মুঘল যুবরাজ দারা শিকোহের কাদিরিয়া সুফি গুরু ছিলেন।)র সমাধির কাছে অবস্থিত।
হযরতবাল মাজার (মসজিদ)
হযরতবাল মাজার মসজিদটি দরগাহ শরীফ নামে পরিচিত। মসজিদটি ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের হযরতবাল এলাকায় অবস্থিত। এই স্থানে একটি ধ্বংসাবশেষ, মোই-ই-মুক্কাদাস(মোই-ই-মুক্কাদাস বলতে একটি পবিত্র ধ্বংসাবশেষকে বোঝায়, বিশেষ করে নবী মুহাম্মদ(সাঃ)এর দাড়ির একটি চুল বলে মনে করা হয়।) রয়েছে, যা ইসলামী নবী মুহাম্মদ(সাঃ)এর চুল বলে বিশ্বাস করা হয়।এটি শ্রীনগরের ডাল হ্রদের উত্তর তীরে অবস্থিত এবং কাশ্মীরের সবচেয়ে পবিত্র মুসলিম মাজার হিসাবে বিবেচিত।
ব্যুৎপত্তি- মাজারের নামটি আরবি শব্দ হজরত (অর্থাৎ 'সম্মানিত') এবং কাশ্মীরি শব্দ বাল (অর্থাৎ 'স্থান') এর সংমিশ্রণে হযরতবাল নামটি এসেছে।
ইতিহাস- হযরতবাল মাজারটি খাজা নূর-উদ্দিন এশাইয়ের কন্যা এবং ধ্বংসাবশেষের রক্ষক(একটি ধ্বংসাবশেষের রক্ষক হলেন একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাকে একটি ধ্বংসাবশেষের যত্ন, সুরক্ষা এবং কখনও কখনও প্রদর্শনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়, যা ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ একটি বস্তু, প্রায়শই একজন সাধু বা পবিত্র ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত।) ইনায়েত বেগম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই মাজারের প্রথম ভবনটি ১৭ শতকে সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে মুঘল সুবেদার সাদিক খান কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। প্রথমে এর নাম ছিল ইশরাত জাহান। ১৬৩৪ সালে শাহজাহান ভবনটিকে প্রার্থনা কক্ষে রূপান্তরিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমান কাঠামোর নির্মাণ কাজ ১৯৬৮ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৯ সালে শেষ হয়েছে।
নবী মুহাম্মদ(সাঃ)এর দাড়ি প্রথম কাশ্মীরে নিয়ে এসেছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মাদানী। তিনি মুহাম্মদ(সাঃ)এর বংশধর ছিলেন এবং মদিনা (বর্তমান সৌদি আরব) ছেড়ে ১৬৩৫ সালে দক্ষিণ ভারতীয় শহর বিজাপুরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময়ে ইসলামী মুঘল সাম্রাজ্য ভারত জুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল।
আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর, তাঁর পুত্র সৈয়দ হামিদ ধ্বংসাবশেষটি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন। এর কিছুদিন পরেই মুঘলরা এই অঞ্চল জয় করে এবং হামিদ তাঁর পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। তখন তিনি এই ধ্বংসাবশেষের যত্ন নিতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তাই তিনি একজন কাশ্মীরি ধনী ব্যবসায়ী খাজা নূর-উদ্দিন এশাইর কাছে দাড়ির চুল হস্তান্তর করেন।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন এর অস্তিত্ব এবং স্থানান্তর সম্পর্কে অবহিত হন, তখন তিনি এটি জব্দ করে আজমিরের সুফি রহস্যময় মু'ইন আল-দিন চিশতির মাজারে পাঠিয়ে দেন এবং নূর-উদ্দিন এশাইকে দিল্লীতে বন্দী করেন। নয় দিন পর আওরঙ্গজেব চার খলিফা: আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী(রাঃ)এর সাথে হজরত মুহাম্মদ(সাঃ)কে স্বপ্নে প্রত্যক্ষ করেন। স্বপ্নের মাঝেই মুহাম্মদ(সাঃ) তাঁকে আজমির থেকে মোই-ই-মুকাদ্দাসকে কাশ্মীরে পাঠাতে নির্দেশ প্রদান করেন। তখন আওরঙ্গজেব এটি এশাইয়ের কাছে ফেরত দেন এবং তাঁকে এটি কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। যাইহোক, নূর-উদ্দিন এশাই ইতিমধ্যেই কারাবন্দী অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। ১৭০০ সালের মধ্যে এশাইয়ের মৃতদেহসহ ধ্বংসাবশেষটি কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে এশাইয়ের কন্যা ইনায়েত বেগম ধ্বংসাবশেষটির রক্ষক হন এবং হযরতবাল মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে, তাঁর পুরুষ বংশধররা মসজিদে ধ্বংসাবশেষের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করে আসছেন। ইনায়েত বেগমের পুরুষ বংশধররা বান্দয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনজন প্রধান সদস্য ধ্বংসাবশেষের যত্নের কাজে নিয়োজিত হয়েছন: মনজুর আহমেদ বান্দয়, ইসহাক বান্দয় এবং মহিউদ্দিন বান্দয়। ধ্বংসাবশেষটি কেবলমাত্র বিশেষ ইসলামী অনুষ্ঠানে, যেমন মুহাম্মদ(সাঃ)এবং তাঁর চার প্রধান চাহাবীর জন্মদিনে জনসাধারণের দর্শনের জন্য প্রদর্শিত হয়।
১৯৬৩ সালে ধ্বংসাবশেষ অন্তর্ধানের পর্ব- ১৯৬৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর মাজার থেকে মোই-ই-মুক্কাদাস নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলো বলে জানা গিয়েছিলো। এর নিখোঁজের পর, রাজ্যজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, লক্ষ লক্ষ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে। ৩১ ডিসেম্বর ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু জাতির উদ্দেশ্যে একটি বেতাঁর সম্প্রচার করেন এবং সন্দেহভাজন চুরির তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো থেকে একটি দল জম্মু ও কাশ্মীরে প্রেরণ করেন। ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারী, সৈয়দ মীরক শাহ কাশানি এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এটি উদ্ধার করে।
আলী বিন আবু তালিবের স্মরণে ১৯৬৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই ধ্বংসাবশেষের একটি প্রদর্শনী জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হয়েছিলো।
এই ঘটনার ফলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং দাঙ্গা দেখা দিয়েছিলো, যার ফলে ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে প্রায় ২,০০,০০০ লোক শরণার্থী আগমন হয়েছিলো।
দাবি করা হয়েছিল যে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবীণদের দ্বারা চিহ্নিত করা হোক। এমনও অভিযোগ করা হয়েছিল যে, রাজনৈতিক কর্তারা দাড়ির চুল চুরি করেছেন, যাতে তাঁরা পরে এটি পুনরুদ্ধারের কৃতিত্ব নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারেন।
জামিয়া মসজিদ, শ্রীনগর
জামিয়া মসজিদ জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের পুরাতন শহরের নওহাট্টায় অবস্থিত শুক্রবারের নামাজের মসজিদ। মসজিদটি ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দার কর্তৃক নির্মাণ কার্য শুরু হয়ে ১৪০২ খ্রিস্টাব্দে মীর সাইয়্যেদ আলী হামাদানির পুত্র মীর মোহাম্মদ হামাদানির তত্ত্বাবধানে মসজিদটির নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়েছিল। মসজিদটি কাশ্মীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ হিসেবে বিবেচিত। মসজিদটি শ্রীনগরের ধর্মীয়-রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। প্রতি শুক্রবার মুসলমানদের ভিড়ের কারণে এটি শহরের একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
মসজিদটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভের স্থান হয়ে আসছে এবং কাশ্মীর সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক এবং আলোচনা করার জন্য মানুষের কাছে একটি প্ল্যাটফর্ম(মঞ্চ)হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস-শিখ যুগ (১৮১৯-১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ)- ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে ২১ বছর ধরে মসজিদটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো, যখন শ্রীনগরের তৎকালীন গভর্নর মতি রাম জামিয়া মসজিদে নামাজ পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। ফলে ২১ বছর মসজিদে কোন নামাজ পড়া হয়নি এবং মসজিদ থেকে কোন আজান দেওয়া হয়নি। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর গোলাম মুহিউদ্দিন এটি পুনরায় খুলে দিযেছিলেন এবং তিনি মসজিদে মেরামতের জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। ১১ বছর ধরে শাসকরা কেবল শুক্রবারে নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন শুক্রবারে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য মসজিদটি খোলা হয়েছিল এবং আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৩১ সালের কাশ্মীর আন্দোলন- ১৯৩১ সালের কাশ্মীর আন্দোলনের সময় ডোগরা পুলিশের গুলি চালানোর পর ২২ জন মুসলিম দাঙ্গাবাজ নিহত হয়েছিলো এবং নিহতের জামিয়া মসজিদে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের জানাজার নামাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো। নিহতদের মৃতদেহ শ্রীনগরের খাজা নকশবন্দ সাহাব খাজা বাজারের মাজার প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছিল, যেখানে শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, মিরওয়াইজ মৌলভী মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ এবং অন্যান্য নেতারা ডোগরা মহারাজা হরি সিংহের বিরুদ্ধে বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের পর- ফলে কাশ্মীরি মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রসারের সাথে সাথে, মসজিদটি রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে, শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহকে জামিয়া মসজিদে কাশ্মীরি মুসলিম রাজনীতির রহস্যের সূচনা করেছিলেন।
রাজ্যের বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে জামিয়া মসজিদ তীব্র রাজনৈতিক আলোচনার একটি উত্তপ্ত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এবং ফলে এখানে জামাতগুলিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মসজিদটি কাশ্মীর সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক এবং আলোচনার একটি প্ল্যাটফর্মও হয়ে উঠেছে।
২০০৮ সালে অমরনাথ জমি বিরোধ শুরু হওয়ার পর মসজিদটির দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ কার্যকর হয়েছিলো। রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে জুমার নামাজ পড়া বন্ধ হওয়ার ফলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিলো এবং এটিকে বিদ্রোহ দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিলো। এই বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থল ছিল পুরাতন শহরের এলাকা, বিশেষ করে জামিয়া মসজিদের আশেপাশের এলেকা।
মেহবুবা মুফতির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় অর্থাৎ ২০১৬ সালের অস্থিরতার সময় মসজিদটি আবার তিন মাসের জন্য এবং আবার ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে বিভিন্ন সময়ের জন্য তালাবদ্ধ করা হয়েছিল।
২০১৮ সালের অপবিত্রতা- ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে শুক্রবারের জামাতের নামাজের পর মসজিদটি প্রায় খালি থাকাকালীন একদল মুখোশধারী যুবক আইএসআইএসের পতাকা নিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়ে এবং ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং মসজিদের মীরওয়াইজ এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ বিভিন্ন সংগঠন এবং জনসাধারণের নিন্দার ঝড় তোলে। পরের সপ্তাহে মসজিদটিকে "শুদ্ধ" করার জন্য একটি দিন এবং এর গুরুত্ব ও পবিত্রতা পুনর্ব্যক্ত করার জন্য আরেকটি দিন পালিত হয়েছিলো।
বিভক্ত হওয়ার পর থেকে- পূর্ববর্তী রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হওয়ার পর ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারিখে এবং কাশ্মীরে কোভিড-১৯ মহামারীর উত্থানের পর সরকার ১৩৬ দিনের জন্য মসজিদে নামাজের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলো।
স্থাপত্য- জামিয়া মসজিদটি পারস্য স্থাপত্য দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। মসজিদটির বৌদ্ধ প্যাগোডার সাথেও মিল রয়েছে। কাঠামোটি চতুর্ভুজ আকৃতির এবং চারটি বুরুজ(চূড়া) রয়েছে। প্রতিটি পাশের মাঝখানে এগুলি পিরামিড আকৃতির ছাদ দিয়ে আচ্ছাদিত। বুরুজগুলি প্রশস্ত হল দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত, শ্যাওলা ইটের পথের উপর উজ্জ্বল হলুদ পপি গাছ রয়েছে এবং পুরো কাঠামোটি চার দিকে প্রশস্ত লেন দ্বারা বেষ্টিত এবং মাঝখানে একটি বর্গাকার বাগান রয়েছে। মসজিদের দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথে একটি ছিদ্রযুক্ত পোর্টিকো রয়েছে, যা আরও একটি অভ্যন্তরীণ উঠোনের দিকে প্রসারিত। এই উঠোনটি ঐতিহ্যবাহী চারবাগ(চার বাগ, যা চাহার বাগ নামেও পরিচিত, একটি পারস্য এবং ইন্দো-পার্সিয়ান চতুর্ভুজীয় বাগান নকশা, যা পথ বা জলের নালা দ্বারা চারটি ভাগে বিভক্ত।) পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং কেন্দ্রে একটি ট্যাঙ্ক রয়েছে। পুরো উঠোনটি সূক্ষ্ম খিলানযুক্ত ইটের তোরণ দিয়ে তৈরি। মূলত চিনার(এক প্রকার গাছ,)এর একটি সিরিজ দিয়ে রোপিত উঠোনটি খিলানযুক্ত লিওয়ান (ক্লোস্টার) দ্বারা ঘেরা, যা দুই স্তরযুক্ত ঢালু ছাদ দিয়ে আচ্ছাদিত।
পশ্চিম ও পূর্ব দিকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১১৬ মিটার (৩৮১ ফুট) এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দৈর্ঘ্য ১১৭ মিটার (৩৮৪ ফুট)।ভেতরের উঠোনটি ১১৪ বাই ১১৩ মিটার (৩৭৫ বাই ৩৭০ ফুট) এবং এর মাঝখানে একটি ১০ বাই ১০ মিটার (৩৩ বাই ৩৪ ফুট) জলের ট্যাঙ্ক রয়েছে। যার মাঝখানে একটি ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। সুতরাং মসজিদের স্থান ক্ষেত্রফল ১৩,৬০০ বর্গমিটার (১৪৬,০০০ বর্গফুট)।
পোড়া ইট দিয়ে তৈরি এর দেয়াল ১.২ মিটার (৪ ফুট)এরও বেশি পুরু। দেয়ালের নীচের অংশ আয়তাকার পাথর দিয়ে তৈরি। মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে তিনটি বড় প্রবেশদ্বার রয়েছে যা দেওদার কাঠের উঁচু স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পূর্ব দিকে শাহ গেট নামে একটি বৃহৎ প্রবেশপথ রয়েছে যা পিরামিড আকৃতির ছাদ দিয়ে আচ্ছাদিত। যার উপরে একটি বর্গাকার খোলা প্যাভিলিয়ন (শাখা) এবং উপরে একটি চূড়া রয়েছে। মোট ৩৭৮টি কাঠের স্তম্ভ দিয়ে ছাদটিকে সমর্থন করা হয়েছে। প্রতিটি বুরুজ ১৫ মিটার (৪৮ ফুট) উঁচু এবং ১.৮ মিটার (৬ ফুট) পরিধির আটটি উঁচু স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত। মিহরাবের উপরেও একই রকম একটি বুরুজ রয়েছে। মসজিদের বাকি অভ্যন্তরে ৩৪৬টি স্তম্ভ রয়েছে যার উচ্চতা ৬.৪ মিটার (২১ ফুট) এবং পরিধি ১.৫ মিটার (৫ ফুট)। প্রাথমিকভাবে ছাদটি বার্চ(বার্চ গাছের বাইরের আবরণ হল বার্চের ছাল, যা এর মসৃণ, প্রায়শই সাদা বা হালকা রঙের পৃষ্ঠ এবং পাতলা চাদরের মতো)এর ছাল এবং কাদামাটি দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে কালো কাশ্মীরি মার্বেল দিয়ে তৈরি একটি মিহরাব রয়েছে। মিহরাবটি ক্যালিগ্রাফিক কাজ দিয়ে সজ্জিত এবং এতে আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম খোদাই করা আছে। মসজিদটিতে ইমাম ছাড়াও ৩৩,৩৩৩ জন মুসল্লি এক সাথে নামাজ পড়তে পারেন।
জামিয়া মসজিদের ফলক- চারটি বুরুজের দেয়ালে বৃত্তাকার সিঁড়ি রয়েছে যা প্রতিটি বুরুজের লাউঞ্জে শেষ হয় এবং সিঁড়িগুলি মসজিদের ছাদে নিয়ে যায়। এই উঁচু বুরুজ থেকে শ্রীনগর শহর দেখা যায়। ছাদটি কাঠ এবং লোহার বার দিয়ে তৈরি। ছাদের উপরের বার্চের ছাল এখন ঢেউতোলা লোহার পাত দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরীণ উঠোনে একটি জলের ফোয়ারা রয়েছে, যা অজুর জন্য ব্যবহৃত হয়। ফোয়ারার চারপাশে চারটি লন চিনার গাছ দিয়ে সজ্জিত। উঠোনের জলের ট্যাঙ্কটি মূলত লাচমা কুয়াল নামে পরিচিত একটি জলের নালা দ্বারা জল সরবরাহ করা হত।
আগুনের কারণে মসজিদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং তিনবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং প্রতিটি দুর্যোগের পর এটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। বিদ্যমান নির্মাণটি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের ইতিহাসে পুনর্গঠন এবং প্রধান সংস্কারগুলি পরিচালনা করেছেন:-
৭৯৬ হিজরিতে (১৩৯৩/১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দ):- সুলতান সিকান্দার("সুলতান সিকান্দার" কোন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নয় তবে সম্ভবত সিকান্দার নামে একাধিক ঐতিহাসিক শাসকের যেকোনো একজনকে বোঝায়।) ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং এটি ১৪০২ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়েছিলো।
৮৮৫ হিজরিতে (১৪৮০/১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ):- প্রথম আগুনে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে এবং তৎকালীন শাসক সুলতান হাসান শাহ তৎক্ষণাৎ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। মেরামত কাজ শেষ হওয়ার আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। মুহাম্মদ শাহ এবং ফতেহ শাহের শাসনামলে কাশ্মীর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ইব্রাহিম মাগরে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটির নির্মাণ কার্য সম্পন্ন করেছিলেন।
১০৮৩ হিজরিতে জাহাঙ্গীর (১৬৭২/১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ):- মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আধিপত্যের সময় অগ্নিকাণ্ডের কারণে মসজিদটি আরেকবার মারাত্মক ধ্বংসের মুখোমুখি হওয়ার পর, কাশ্মীরের একজন স্থপতি অর্থাৎ সোদুরের মালিক হায়দারের অধীনে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিলো। সম্পূর্ণ মেরামত কাজ সম্পন্ন হতে ১৭ বছর সময় লেগেছিল।
১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব:- তৃতীয়বারের অগ্নিকাণ্ডে কাঠামোটিকে বিকৃত করেছিল। অগ্নিকাণ্ডটি ঘটেছিলো আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে। কথিত আছে যে, আওরঙ্গজেব যখন দুর্ঘটনার কথা শুনতে পান, তখন তিনি কেবল জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চিনারগুলি নিরাপদ কিনা, কারণ 'মসজিদটি অল্প সময়ের মধ্যে পুনর্নির্মাণ করা যেতে পারে। কিন্তু একটি পূর্ণ বয়স্ক চিনার কখনও প্রতিস্থাপন করা যাবে না।তিনি শহরের সমস্ত ইটভাটা মিস্ত্রি এবং রাজমিস্ত্রিদের একত্রিত করেছিলেন এবং তিন বছরের মধ্যে জামিয়া মসজিদটি পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন।
আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুলতান জয়ন-উল-আবেদীন মসজিদটি সম্প্রসারণ করেছিলেন এবং প্রাথমিক কাঠামোতে একটি বুরুজ নির্মাণ করেছিলেন। শেষ সংস্কার কাজটি মহারাজা প্রতাপ সিংহের রাজত্বকালে সম্পন্ন হয়েছিল। মহারাজা প্রতাপ সিং বহুবার মসজিদটির পুনর্নির্মাণকে উৎসাহিত করেছিলেন এবং এমনকি আর্থিক সহায়তাও করেছিলেন। তবে, সমস্ত সংস্কার কাজ মূল স্থাপত্যের প্রতিফলন এবং শতাব্দী ধরে পরিচালিত মসজিদের ঐতিহাসিক মূল্য ধরে রাখার জন্য করা হয়েছিল।
রক্ষণাবেক্ষণ- জামিয়া মসজিদটি একটি বেসরকারি উদ্যোগ আঞ্জুমান-ই-আউকাফের অধীনে পরিচালিত। মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড ১৯৭৫ সালে গঠিত হয়েছে। আয়ের প্রধান উৎস আসে মসজিদের আশেপাশের ২৭৮টি দোকানের (আউকাফের মালিকানাধীন) ভাড়া এবং জনসাধারণের তহবিলের অন্যান্য উৎস থেকে। আয় নির্দিষ্ট নয় এবং বার্ষিকভাবে পরিবর্তিত হয়। আউকাফ প্রতিষ্ঠার আগে, মসজিদের তহবিল ধনী দাতাদের কাছ থেকে আসত। মসজিদের কল্যাণের জন্য, INTACH ২০১২ সালে সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। •
আলী ফরহাদ খানের মসজিদ
আলী ফরহাদ খানের মসজিদ কালী মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের আলান্দে অবস্থিত একটি মসজিদ এবং দরগাহ। মসজিদের কাঠামোটি রাষ্ট্রীয় সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ।
বিজাপুর সালতানাতের রাজত্বকালে আদিল শাহী রীতিতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।মসজিদটি নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন সেনাপতি আফজাল খানের ভাই আলী ফরহাদ খান।
বহির্ভাগ- মসজিদটি ২.২৯ মিটার (৭ ফুট ৬ ইঞ্চি) উঁচু একটি আয়তাকার ভিত্তির উপরে অবস্থিত। ভিত্তিটির দৈর্ঘ্য ২৪.৪৯ মিটার (৮০ ফুট ৪ ইঞ্চি) এবং প্রস্থ ১৬.৯২ মিটার (৫৫ ফুট ৬ ইঞ্চি)। উত্তর দিকের মাঝখানে অবস্থিত প্রবেশদ্বার দিয়ে মসজিদে পৌঁছানো যায় ।, মসজিদে পৌঁছোতে এগারোটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। মসজিদটি পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো একটি উঠোনের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। মসজিদের বিপরীতে একটি বড় রাজমিস্ত্রির কূপ(রাজমিস্ত্রির কূপ হল এমন একটি কূপ, যার দেয়ালগুলি ইট বা পাথরের মতো পৃথক ইউনিট ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যা মর্টার দিয়ে একসাথে আবদ্ধ থাকে।) রয়েছে, পাশাপাশি দুটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম- একটি দরগা রয়েছে, যেখানে আলী ফরহাদ খান এবং তার স্ত্রীর সমাধি রয়েছে।
মসজিদটি পাথরের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি, এবং সম্মুখভাগে পূর্ব উঠানে প্রবেশের জন্য তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। প্রতিটি খিলানের প্রস্থ ২.৫১ মিটার (৮ ফুট ৩ ইঞ্চি)এবং কেন্দ্রীয় খিলানের উপরে একটি ফারসি শিলালিপি রয়েছে। নাসখ লিপিতে লেখা শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলী ফরহাদ খান মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে এর নির্মাণের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। খিলানগুলির উপরে একটি চাজ্জা খোদাই করা বন্ধনী(বন্ধনী হল একটি কাঠামোগত বা আলংকারিক স্থাপত্য উপাদান যা সাধারণত ওজন বহন করার জন্য এবং কখনও কখনও "কোণকে শক্তিশালী করার জন্য" দেয়াল থেকে প্রক্ষেপিত হয়।)র উপর স্থাপিত। অবশেষে, সম্মুখভাগের দৈর্ঘ্য জুড়ে একটি প্যারাপেট(প্যারাপেট হল ছাদ বা বারান্দার মতো কাঠামোর প্রান্ত থেকে প্রসারিত একটি বাধা, যা মূলত প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল কিন্তু এখন প্রাথমিকভাবে গার্ড রেলিং এবং অন্যান্য কার্যকরী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।) রয়েছে, যা ছোট ছোট বুরুজ দিয়ে ছেদ করা হয়েছে।
সম্মুখভাগটি দুটি অভিন্ন অষ্টভুজাকার মিনার দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিটি মিনার প্রায় 9.1 মিটার (30 ফুট) উঁচু এবং 3.7 মিটার (12 ফুট) পরিধির এবং বর্গাকার পাদদেশের উপর অবস্থিত। প্রতিটি মিনারের উপর সমান ব্যবধানে চারটি অলঙ্কৃত ব্যান্ড(অলংকরণ ব্যান্ড হল কাপড় বা অন্যান্য উপকরণ, যেমন ধাতু, দিয়ে তৈরি আলংকারিক স্ট্রিপ যা অলংকরণ হিসেবে পরিধান করা হয় অথবা শিল্প ও স্থাপত্যে আলংকারিক উপাদান যোগ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।) স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি মিনারের উপরে একটি কক্ষ রয়েছে, খোদাই করা পদ্মের পাপড়ির চাকতির উপর অবস্থিত, যার উপর একটি পাথরের চূড়ান্ত( চূড়ান্ত ফিনিয়াল বা হিপ-নব হল এমন একটি উপাদান যা কোনও বস্তুর উপর বা শেষ অংশ চিহ্নিত করে, যা প্রায়শই একটি আলংকারিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে তৈরি হয়।)অংশ রয়েছে।
উত্তর, দক্ষিণ এবং পশ্চিম দেয়ালের প্রতিটি জুড়ে উনিশটি খিলান নিয়ে গঠিত একটি তোরণ রয়েছে। পিছনের দেয়ালের কোণে দুটি বুরুজ অবস্থিত।
অভ্যন্তর- নামাজ কক্ষটি ৯.৩৭ মিটার (৩০ ফুট ৯ ইঞ্চি) লম্বা এবং ৬.১ মিটার (২০ ফুট) প্রশস্ত। পশ্চিম দেয়ালের কেন্দ্রে অবস্থিত মিহরাব কালো পাথর দিয়ে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। এর চারপাশে দুটি ছোট মিহরাব রয়েছে, যার একটি কালো পাথরের রূপরেখা রয়েছে। মিহরাবের উপরে বিসমিল্লা(বিসমিল্লা ইসলামী বাক্যাংশ যার অর্থ "পরম করুণাময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে", ইসলামে একটি মৌলিক অভিব্যক্তি, যা সাফল্য এবং সুরক্ষার জন্য দৈনন্দিন কার্যকলাপ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের আগে পাঠ করা হয়।) খোদাই করা হয়েছে। মেঝেটি ধূসর পাথরের স্ল্যাব(চেপ্টা পাথর) দিয়ে পাকা করা হয়েছে। •
আন্দু মসজিদ
আন্দু মসজিদ, যা আন্দা মসজিদ নামেও পরিচিত, ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিজাপুরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। মসজিদটি জাতীয় ঐতিহ্যের স্মৃতিস্তম্ভ।মসজিদটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ দ্বারা পরিচালিত।
স্থাপত্য-মসজিদের প্রবেশপথে স্থাপিত খোদাই করা একটি শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মসজিদটি ই'তিবার খান কর্তৃক ১০১৭ হিজরিতে (১৬০৮/১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ) নির্মাণ করা হয়েছিল। ইতিবার খান একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় ইব্রাহিম আদিল শাহের রাজত্বকালে বসবাস করতেন।
স্থাপত্যবিদ হেনরি কাউসেনস মনে করেন যে, মসজিদটি মহিলাদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। পর্দার বিধিনিষেধের কারণে নামাজের হলের মধ্যে মিম্বরের অনুপস্থিতি এই সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে, কারণ মসজিদটিতে কোনও পুরুষকে প্রবেশ করতে এবং খুতবা দিতে দেওয়া হত না। এই তত্ত্বকে সমর্থনকারী অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে ভবনের ছাদের চারপাশে একটি প্যারাপেট(ছাদ, সেতু বা অন্যান্য উঁচু কাঠামোর ধারে একটি নিচু প্রাচীর যা মানুষকে পড়ে যেতে বাধা দেয়।, যা এর বাসিন্দাদের নিজেদের দেখা না দিয়ে শহরের দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দেয়)। তবে, ২০১৬ সাল থেকে, মসজিদে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদের নিচতলা মাদ্রাসা হিসেবে কাজ করে এবং উপরের তলাটি পুরুষদের জন্য নামাজের হল হিসেবে কাজ করে।
ভবনটি দ্বিতল। উপরের তলায় মসজিদ এবং নিচতলায় একটি হল যা সম্ভবত ক্যারাভানসেরাই(ক্যারাভানসেরাই ছিল উত্তর আফ্রিকা থেকে পশ্চিম চীন পর্যন্ত পাওয়া একটি রাস্তার ধারের সরাইখানা, যা ব্যবসায়ী এবং তাদের ক্যারাভানদের থাকার ব্যবস্থা, খাবার এবং জল সরবরাহ করত, পাশাপাশি মানুষ এবং পণ্যের নিরাপত্তাও দিত।) হিসেবে ব্যবহৃত হত। মসজিদটি পাথরের তৈরি। উপরের তলাটি অলঙ্কৃতভাবে সজ্জিত এবং নিচতলাটি সমতল।
মসজিদটি প্রথম তলার পশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং এর সম্মুখভাগে সমান আকারের তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। প্রবেশপথগুলি বারান্দা পর্যন্ত প্রসারিত। দুটি সিঁড়ি দিয়ে বারান্দার বাইরের কোণে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এর চারপাশে একটি নিচু প্যারাপেট রয়েছে। নামাজ-কক্ষটি প্রায় ৬ মিটারের (২০ ফুট) বর্গক্ষেত্রাকার। এর পশ্চিম দেয়ালে একটি বৃহৎ মিহরাব রয়েছে, যার চারপাশে দুটি ছোট কুলুঙ্গি রয়েছে। মসজিদের মধ্যে কোনও মিম্বার নেই।
ছাদের উপরে একটি গম্বুজ রয়েছে, যা ষোলটি পার্শ্বযুক্ত বিশিষ্ট একটি তোরণযুক্ত ড্রামের উপর অবস্থিত। গম্বুজের পিছনে একটি প্রক্ষিপ্ত বাট্রেসে(পাথর বা ইটের কাঠামো যা কোনও দেয়ালকে সমর্থন করে বা এটিকে শক্তিশালী করে তোলে।)র উপরে চারটি মিনার রয়েছে, যা নীচের মসজিদের মিহরাবের সাথে সারিবদ্ধ। ভবনের প্রতিটি কোণে একটি করে আরও চারটি মিনার রয়েছে। প্রধান গম্বুজটি তরমুজের আকৃতির এবং প্রতিটি মিনারের শীর্ষে ছোট ছোট গম্বুজ রয়েছে। •
এক মিনার মসজিদ , রায়চুর
মসজিদটি একটি মিনারবিশিষ্ট সেজ্ন্য মসজিদটি এক মিনার নামে পরিচিত। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রায়চুরে অবস্থিত। মসজিদটি সুরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ। মসজিদ প্রাঙ্গণের কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ২০১৬ সালে মসজিদ সংলগ্ন রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ইতিহাস- মসজিদের চৌকাঠে লিপিবদ্ধ ফারসি শিলালিপি অনুসারে, এটি মাহমুদ শাহ বাহমানির রাজত্বকালে ৯১৯ হিজরিতে (১৫১৩/১৫১৪ খ্রিস্টাব্দ) আহমেদনগর সালতানাতের পেশোয়া(প্রধানমন্ত্রী) মালিক আম্বর কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছিল।
ব্যুৎপত্তি- মসজিদটির নাম এক মিনার মসজিদ হিসেবে নামকরণের কারণ হলো, মসজিদটির একটি মাত্র মিনার রয়েছে। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে কুতুব মিনার এবং চাঁদ মিনার-এর মতো স্বতন্ত্র মিনারগুলি সাধারণত বিজয় মিনার হিসেবে কাজ করত, অন্যদিকে মসজিদের সাথে সংযুক্ত মিনারগুলি নান্দনিক শোভাবর্দ্ধনের জন্য নির্মাণ করা হত। তবে, এই মসজিদের স্বতন্ত্র একটি মাত্র মিনার এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিলো।
স্থাপত্য- মসজিদের সামনে একটি উঠান রয়েছে এবং, সেখানে দুটি কবর রয়েছে। উঠানের মাথায় একটি জলাশয় রয়েছে। দক্ষিণ দিক থেকে মসজিদে প্রবেশ করা যায়, প্রবেশপথের ছাদ আটটি চালুক্য স্তম্ভ(চালুক্য রাজবংশ, একটি ধ্রুপদী ভারতীয় রাজবংশ, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের বিশাল অংশ শাসন করেছিল এবং তাঁরা, তিনটি সম্পর্কিত রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিল: বাদামি চালুক্য, পূর্ব চালুক্য এবং পশ্চিম চালুক্য; তাদের রাজত্ব কর্ণাটকের ইতিহাসে একটি স্বর্ণযুগ চিহ্নিত করেছিল, দক্ষ প্রশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং একটি অনন্য স্থাপত্য শৈলীকে উৎসাহিত করেছিল, পাশাপাশি কন্নড় ও তেলেগু সাহিত্যের প্রচারও করেছিল।)এর উপর স্থাপিত।
নামাজ কক্ষটি আয়তাকার, যার পরিমাপ প্রায় ১২.২ বাই ৯.১ মিটার (৪০ বাই ৩০ ফুট)। মসজিদটির একটি সমতল ছাদ রয়েছে এবং ছাদের উপরে একটি ব্যাটলমেন্ট প্যারাপেট(একটি ব্যাটেলমেন্ট হল একটি প্রতিরক্ষামূলক, পর্যায়ক্রমে খোলা জায়গা এবং দুর্গের প্রাচীর বা অন্যান্য দুর্গের উপরে শক্ত সোজা অংশএর একটি সিরিজ, যা এক ধরণের প্যারাপেট তৈরি করে।) রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালটি কুরআনের আয়াত এবং পাথরের স্ল্যাবে খোদাই করা হাদিস দিয়ে সজ্জিত।
মিনার- যে মিনারটির নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে, সেটিই হলো মসজিদের প্রধান স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য। মিনারটি প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে প্রবেশপথের ঠিক উপরে অবস্থিত। এটি প্রায় ২০ মিটার (৬৫ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট এবং এর ব্যাস প্রায় ৪.০ মিটার (১৩ ফুট)। মিনারটি পারস্য শৈলীতে নির্মিত। মসজিদটির মিনারের চাঁদ মিনারের সাথে খুব মিল, সেইসাথে মাহমুদ গাওয়ান মাদ্রাসার মিনারের সাথেও সাদৃশ্য রয়েছে।দুটি মিনারই পূর্ববর্তী বাহমনি ধাঁচের শৈলীতে নির্মিত।
মসজিদটি দুই তলাবিশিষ্ট। প্রত্যেক তলায় আলো এবং বাতাস প্রবেশের জন্য জানালা রয়েছে এবং প্রতিটি তলায় পাথরের বালাস্ট্রেড(সেতুর ধারে নির্মিত, উপরে একসাথে সংযুক্ত খুঁটির সারি, ইত্যাদি) দিয়ে ঘেরা গ্যালারি রয়েছে। ভিতরে একটি ঘূর্ণায়মান সিঁড়ি মিনারের উপরের তলায় উঠে গেছে। মিনারটি ধীরে ধীরে নিচ থেকে উপরে দিকে সরু হয়ে গেছে এবং একটি সাধারণ বাহমানি গোলাকার গম্বুজ উপরে উঠে গেছে, যার নীচে ফুলের সাজসজ্জা রয়েছে। গম্বুজের উপরে একটি অর্ধচন্দ্রাকার চূড়া রয়েছে। •
জামে মসজিদ, বিজাপুর
জামে মসজিদ, যা জামিয়া মসজিদ বা জুম্মা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিজাপুরে অবস্থিত। মসজিদটি ১৬ শতকে বিজাপুর সুলতানি আমলের প্রথম আলী আদিল শাহ কর্তৃক নির্মিত। এই মসজিদটির নির্মাণ কার্য কখনও সম্পন্ন হয়নি। মসজিদটি বিজাপুরের বৃহত্তম মসজিদ এবং এতে ৪,০০০ জন মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।
২০১৪ সালে, ইউনেস্কো এই ভবনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দাক্ষিণাত্য সুলতানতের স্মৃতিস্তম্ভ এবং দুর্গ নামে "অস্থায়ী তালিকায়" স্থান দিয়েছে।
ইতিহাস- ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আলী আদিল শাহ জামে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। ১৫৬৫ সালে তালিকোটার যুদ্ধে দাক্ষিণাত্য সুলতানদের একটি জোট বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক নির্ণায়ক বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন। তালিকোটার যুদ্ধ থেকে লুট করা অর্থ দিয়ে মসজিদটির নির্মাণ কার্য শুরু করেছিলেন। যদিও মসজিদের বেশিরভাগ অংশ ১৬৮৬ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিলো, তবুও কাঠামোটি কখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ইব্রাহিম আদিল শাহ প্রথম কর্তৃক নির্মিত পুরানো মসজিদটি বিজাপুরের প্রধান মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
পরবর্তী শাসকরা মসজিদটির কিছু বর্ধিতকরণ করেছিলেন। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবের কাছে দেয়ালচিত্র সংযোজন সম্ভবত মুহাম্মদ আদিল শাহ করেছিলেন।মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মসজিদের পূর্ব দিকের একটি দরজা স্থাপন করেছিলেন এবং নামাজের ঘরের মেঝে পরিবর্তন করেছিলেন।
স্থাপত্য- জামে মসজিদটি বিজাপুর শহরের বৃহত্তম মসজিদ, যেখানে ৪,০০০ মুসল্লি ধারণক্ষমতা রয়েছে। মসজিদটি আদিল শাহী স্থাপত্যের অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। বিয়াঙ্কা আলফিয়েরি মন্তব্য করেছেন যে, মসজিদটি পূর্ববর্তী বাহমানি স্থাপত্যের উপাদান দিয়ে নির্মিত।রিচার্ড ইটন উল্লেখ করেছেন যে, মসজিদটি ইরানি প্রভাবের প্রতীক, এবং পরবর্তী বিজাপুরী স্থাপত্যের মতো স্থানীয় ঐতিহ্যকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মসজিদের নকশা এবং অলঙ্করণ বেশ সহজ। আর্চনেট এটিকে আলী আদিল শাহের শিয়া ধর্মের স্থাপত্যের সাথে তুলনা করেন, কারণ এই সম্প্রদায়ের অনুসারীরা সাধারণত উপাসনালয়ে কম সাজসজ্জা পছন্দ করেন।
আয়তাকার মসজিদ কমপ্লেক্সটি ৫০৪০ বর্গমিটার (৫৪,৩০০ বর্গফুট) জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি দেয়াল দ্বারা ঘেরা। কমপ্লেক্সের প্রধান প্রবেশদ্বার হল পূর্ব দিকের গেট। কমপ্লেক্সের ভিতরে ৫০ মিটার (১৬০ ফুট) দৈর্ঘ্যের একটি বর্গাকার উঠোন (আঙিনা) রয়েছে, যেখানে ঝর্ণা এবং একটি ওযু জলাধার রয়েছে।
প্রধান প্রার্থনা কক্ষটি ৭০ বাই ৩৬ মিটার (২৩০ বাই ১১৮ ফুট) মাপ বিশিষ্ট এবং কমপ্লেক্সের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। মসজিদটির উপরে একটি অর্ধগোলাকার গম্বুজ রয়েছে, যার চূড়ায় অর্ধচন্দ্রাকার স্তম্ভ রয়েছে। নীচে একটি বালাস্ট্রেড(একটি বালাস্ট্রেড হল সমানভাবে ব্যবধানযুক্ত উল্লম্ব সাপোর্ট (বালাস্টার) এবং একটি হ্যান্ড্রেলের একটি স্থাপত্য সমাবেশ, যা সাধারণত সিঁড়ি, বারান্দা এবং বারান্দায় পাওয়া যায় যা পতন রোধ করে সুরক্ষা প্রদান করে।) দ্বারা বেষ্টিত। প্রার্থনা কক্ষের সম্মুখভাগে সাতটি খিলানযুক্ত খোলা অংশ রয়েছে।
স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত, প্রার্থনা কক্ষের অভ্যন্তরটি পাঁচটি উপসাগরে বিভক্ত, যা পশ্চিম কিবলা প্রাচীরের সমান্তরালভাবে অবস্থিত। অভ্যন্তরটি অতিরিক্ত অলঙ্করণের চেয়ে পরিষ্কার রেখার উপর জোর দেয়া হয়েছে; সেখানে কেবলমাত্র ন্যূনতম প্লাস্টার-কাজ দেখা যায়। মসজিদটির মেঝে ২২৫০টি আয়তাকার বক্সে বিভক্ত। যা দেখতে একটি প্রার্থনা মাদুরের মতো। এটি পরে আওরঙ্গজেব দ্বারা সংযোজিত হয়েছিল।
কিবলা দেয়ালে কেন্দ্রীয় মিহরাবের চারপাশে ভারী দেয়াল অলঙ্করণের ফলে অভ্যন্তরের প্রকৃতি সাধারণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নীল, কালো এবং সোনালী রঙে সজ্জিত সোনালী রঙের মিহরাবটিতে বিভিন্ন চিত্রকর্ম রয়েছে এবং এতে কুরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ রয়েছে। অলঙ্করণটি সম্ভবত মুহাম্মদ আদিল শাহের আমলে পরবর্তীকালে সংযোজন করা হয়েছিল, যা মিহরাবের কাছে কিছু ফার্সি শিলালিপি দ্বারা প্রত্যায়িত। এর বিলাসবহুল অলংকরণ মিশেল এবং জেব্রোস্কিকে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসাবে বিবেচনা করেছেন এবং তাঁরা এটিকে কর্ডোবার মসজিদ-ক্যাথেড্রালের মিহরাবের সাথে তুলনা করেছে।
অসম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য- মসজিদের পূর্ব দিকের সম্মুখভাগে বাট্রেসিং রয়েছে, যা সেখানে দুটি মিনার নির্মাণের অসম্পূর্ণতার ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়াও, উঠোনের চারপাশের গ্যালারির প্যারাপেটে মেরলন(মেরলন হলো একটি ক্রেনেলেটেড ব্যাটেলমেন্টের শক্ত, খাড়া অংশ, যা দুর্গগুলিতে পাওয়া দাঁতযুক্ত প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল।)অনুপস্থিত। •
জামে মসজিদ, কালাবুর্গি
গুলবার্গা দুর্গের মহান জামে মসজিদ আনুষ্ঠানিকভাবে জামেয়া মসজিদ- কিলা-ই-হাশাম নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের কালাবুর্গিতে (পূর্বে গুলবার্গা নামে পরিচিত) অবস্থিত। মসজিদটি কালাবুর্গির গুলবার্গা দুর্গ কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত।
ইতিহাস- ওয়ারাঙ্গলের কাপায়া নায়ক(কাপায়া নায়ক ছিলেন একজন বিশিষ্ট সামরিক নেতা এবং মুসুনুরি নায়কদের সর্দার, একটি তেলেগু রাজবংশ যারা কাকাতিয় সাম্রাজ্যের পতনের পর দিল্লি সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল।)এর পরাজয়ের পর গুলবার্গায় রাজধানী প্রতিষ্ঠার স্মরণে ১৩৬৭ সালে বাহমানি সুলতান প্রথম মোহাম্মদ শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। পারস্যের স্থপতি রফি দ্বারা মসজিদটির নকশা করা হয়েছিল এবং কালাবুর্গী দুর্গ কমপ্লেক্সের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদটি দক্ষিণ ভারতের প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে অন্যতম।
স্থাপত্য- কালাবুর্গী মসজিদটি তৎকালীন সাধারণ মসজিদ স্থাপত্য থেকে ভিন্নতার জন্য উল্লেখযোগ্য। মসজিদটির মূল বিন্যাসটি একটি উঠোন মসজিদ(একটি উঠোন মসজিদ হল এক ধরণের মসজিদ স্থাপত্য যেখানে প্রার্থনা কক্ষের পাশে একটি বৃহৎ, খোলা কেন্দ্রীয় উঠোন (যাকে সাহন বলা হয়) থাকে, যেখানে প্রায়শই ধর্মীয় পবিত্রতা (ওজু) এর জন্য একটি পাবলিক ফোয়ারা থাকে।) এর মতো, তবে কেন্দ্রীয় উঠোনটি তেষট্টিটি ছোট ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। মসজিদটিতে মিনারও নেই, পরিবর্তে মসজিদের প্রতিটি কোণে চারটি করে বড় গম্বুজ রয়েছে। •
কালী মসজিদ, বিদার
কালী মসজিদ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিদার শহরের একটি মসজিদ।
ইতিহাস- মসজিদটিতে কোন শিলালিপি নেই, তাই এর নির্মাণের সঠিক তারিখ অজানা। তবে, এর নির্মাণশৈলী দেখে মনে হয় এটি সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বারিদ শাহী আমলের প্রথমার্ধে নির্মিত হয়েছিল। আলী বারিদ শাহ প্রথম ছিলেন বিদারের বারিদ শাহী রাজবংশের তৃতীয় শাসক। তিনি ১৫৪০ সালে তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং ১৫৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদটি বিদার রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। মসজিদ প্রাঙ্গণের মধ্যে একটি কূপও রয়েছে। কূপটি পরবর্তীতে সংযোজন করা হয়েছিল।
বাইরের অংশ- মসজিদটি চুন সহযোগে ফাঁদ পাথর দিয়ে তৈরি। সম্মুখভাগে তিনটি খিলানযুক্ত খোলা অংশ রয়েছে এবং এর পাশে দুটি অসম্পূর্ণ মিনার রয়েছে। মিনারগুলি হয় অসম্পূর্ণ ছিল অথবা পরবর্তী সময়ে ভাঙচুরের ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মিনারগুলি অষ্টভুজাকার আকৃতির এবং বর্গাকার ভিত্তির উপরে অবস্থিত।
খিলান(আর্ক)এর উপরে ফ্রিজ(ভাস্কর্যযুক্ত বা আঁকা অলঙ্করণের একটি প্রশস্ত অনুভূমিক ব্যান্ড, বিশেষ করে সিলিংয়ের কাছে দেয়ালে অবস্থিত।)এর আকারে পালিশ করা হর্নব্লেন্ড(হর্নব্লেন্ড হল অ্যাম্ফিবোল গ্রুপের অন্তর্গত একটি সাধারণ, জটিল ইনোসিলিকেট খনিজ।)এর দুটি ব্যান্ড রয়েছে। সম্ভবত এখানে একটি শিলালিপি উপস্থিত ছিল, যেখানে মসজিদের নির্মাণকাল এবং এর প্রতিষ্ঠাতার বিবরণ দেওয়া ছিল। এর উপরে চাজ্জা সমর্থনকারী বন্ধনী রয়েছে। কাঠামোর উপরে একটি ট্রেফয়েল(মটর পরিবারের একটি ছোট ইউরোপীয় উদ্ভিদ,) প্যাটার্নযুক্ত প্যারাপেট প্রাচীর উঠে গেছে। এই প্যারাপেটটি কেবল পাশের এবং পিছনের দেয়ালে অবস্থিত।
বর্গাকার ভিত্তির উপর ভবনের পশ্চিম প্রান্তে একটি গম্বুজ মিহরাবের ঠিক উপরে উঠে গেছে। গম্বুজের বর্গাকার ভিত্তির চার পাশে খোলা খিলান রয়েছে। খিলানটি দেখতে আলী বারিদ শাহের সমাধির মতো। মিহরাবের উপরে অবস্থিত চিমনির মতো গম্বুজটি আল-জায়তুনা মসজিদ(আল-জায়তুনা মসজিদটি তিউনিসিয়ার তিউনিসে মদিনার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। মসজিদটি ইজ-জিতুনা বা এল-জিতুনা নামেও পরিচিত, রাজধানীর বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম মসজিদ।) এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য মসজিদের গম্বুজের মতো।
অভ্যন্তরভাগ- মসজিদটি স্তম্ভের সাহায্যে ছয়টি 'বে'তে বিভক্ত, যার উপর ছাদ সমর্থনকারী খিলান রয়েছে। প্লাস্টার দিয়ে সুসজ্জিত সিলিংটি, পিছনের দিকের মাঝখানের 'বে'("বে" বলতে ভবনের এমন একটি অংশকে বোঝায়, যা কাঠামোগত সহায়তা দ্বারা পৃথক করা হয়, অথবা একটি বড় জানালা সহ একটি ঘরের প্রসারিত অংশকে বোঝাতে পারে, যা "বে" জানালা নামে পরিচিত)তে কাসকেট আকৃতির এবং অন্যান্য সমস্ত 'বে'তে অগভীর গম্বুজ আকৃতির। অভ্যন্তরভাগের পরিমাপ ১৩.৯৭ মিটার (৪৫ ফুট ১০ ইঞ্চি) বাই ১১ মিটার (৩৫ ফুট)। নামাজের মিহরাবের ভিত্তি দশভুজাকার।
লঙ্গর কি মসজিদ
লঙ্গর কি মসজিদ লঙ্গর মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের কালাবুর্গিতে অবস্থিত। মসজিদটি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। মসজিদটি বর্তমানে আংশিক ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রয়েছে। মসজিদটি রাজ্য সরকার দ্বারা সুরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস- মসজিদটি ১৪ শতকের, বাহমানি সালতানাতের সময়কার।
স্থাপত্য- ভবনটির নকশা চতুর্ভুজাকার এবং চার কোণে চারটি ছোট ছোট মিনার রয়েছে। সম্মুখভাগ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। এই খিলানগুলি ৫.৫ মিটার (১৮ ফুট) উঁচু এবং ৩.০ মিটার (১০ ফুট) প্রশস্ত এবং তাদের স্প্যান্ড্রেলে(একটি খিলানের বাইরের বক্ররেখার একপাশে, একটি প্রাচীর এবং ছাদ বা কাঠামোর মধ্যে প্রায় ত্রিভুজাকার স্থান।) প্লাস্টারের কাজ দিয়ে অলঙ্কৃত পদক (অলঙ্কৃত পদক" হল একটি বৃত্তাকার বা ডিম্বাকৃতির আলংকারিক উপাদান, যা প্রায়শই একটি ফলক বা প্যানেল। যেখানে জটিল নকশা, খোদাই, রিলিফ বা চিত্রকর্ম থাকে, যা স্থাপত্য, আসবাবপত্র, টেক্সটাইল বা অন্যান্য পৃষ্ঠতলের সৌন্দর্য এবং বিশদ বিবরণ থাকে।) রয়েছে। খিলানগুলির উপরে, একটি চাজ্জা পাথরের বন্ধনীর উপর স্থাপিত। ছাদের দৈর্ঘ্য জুড়ে, চার পাশে ক্রুশের মতো নকশাযুক্ত প্যারাপেট রয়েছে। ছাদটি খিলান আকৃতির এবং প্যারাপেটের মাঝখানে স্থাপিত খিলানের পর্দা দিয়ে আচ্ছাদিত। যথাক্রমে উত্তর এবং দক্ষিণ দেয়ালের সাথে সংযুক্ত মসজিদের দুটি সম্প্রসারণ(এক্সটেনশন) রয়েছে, যা পরবর্তীতে যুক্ত করা হয়েছে।
১৪.৯ বাই ৯.৮ মিটার (৪৯ বাই ৩২ ফুট) পরিমাপের প্রার্থনা কক্ষটি দুটি খিলান দ্বারা তিনটি বেতে বিভক্ত। এই খিলানগুলি ৮.২ মিটার (২৭ ফুট) উঁচু এবং ৯.১ মিটার (৩০ ফুট) প্রশস্ত। মসজিদের প্রধান স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য হল ছাদ, বৌদ্ধ চৈত্যের মতো।বৌদ্ধ চৈত্য হলো একটি বৌদ্ধ মন্দির, পবিত্র স্থান বা প্রার্থনা কক্ষ যেখানে একটি স্তূপ থাকে, যা উপাসনা এবং ধ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
সমাধি- মসজিদের উত্তর-পশ্চিমে একটি বাহমানি ধাঁচের সমাধি রয়েছে। সমাধির উপরে একটি বর্গাকার ভিত্তি রয়েছে যা একটি অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ দ্বারা স্থাপিত। ভিত্তির প্রতিটি পাশের পরিমাপ ১৬ মিটার (৫২ ফুট)। ভিত্তিটি প্রায় ৭.৯ মিটার (২৬ ফুট) উঁচু, গম্বুজটি আরও ৭.৯ মিটার (২৬ ফুট) উঁচু, এবং এভাবে পুরো সমাধিটি ১৬ মিটার (৫২ ফুট) উঁচু। সমাধির উত্তর এবং দক্ষিণ দেয়ালে দুটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। এর পশ্চিম দেয়ালে কুরআনের কিছু আয়াত লিপিবদ্ধ রয়েছে। সমাধিতে ১৪৩৪ সালের একটি শিলালিপিও রয়েছে।
আলি মসজিদ, শ্রীনগর
আলি মসজিদ ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল শ্রীনগরে অবস্থিত। মসজিদটি ১৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান জয়ন আল-আবেদীন (বুদ্ধশাহ) এর বড় ভাই সুলতান আলী শাহ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং তার নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছিল। মসজিদটি ১৪৭১ খ্রিস্টাব্দে শামিরি রাজা সুলতান হাসান শাহের রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল এবং মসজিদটির নামকরণ সাইয়্যিদ আলী হামাদানীর (শাহ হামদান) নামে করা হয়েছিল বলেও বিশ্বাস করা হয়।
স্থাপত্য- মসজিদটি শ্রীনগরের ঈদগাহ প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত একটি বৃহত্তম মসজিদ। সাইয়্যেদ আলী হামাদানির নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। শ্রীনগরে অবস্থিত জামিয়া মসজিদের পরে এটি কাশ্মীর উপত্যকার দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। ভবনটি মধ্য এশীয় এবং স্থানীয় কাঠের স্থাপত্যের ঐতিহ্যের একটি অনন্য স্থাপত্য। মসজিদটি ৪ বাই ৫ মিটার (১৩ বাই ১৬ ফুট) গ্রিড (গ্রিড হল ছেদকারী সমান্তরাল রেখার একটি নেটওয়ার্ক,)এর উপর তৈরি, যা ১৫১টি কাঠের স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত। প্রতিটি স্তম্ভ ৫ মিটার (১৬ ফুট) উঁচু এবং ০.৯৫ মিটার (৩ ফুট ১ ইঞ্চি) প্রস্থ। নিচতলার প্রধান হলটির পরিমাপ ৬১.২ মিটার (২০১ ফুট) বাই ২০.৫ মিটার (৬৭ ফুট) এবং এতে ৭৫টি মডিউল(এমন একটি ইউনিট যা বৃহত্তর কিছুর অংশ গঠন করে) রয়েছে। ১৫১টি দেওদার(উদ্ভিদবিদ্যা সংক্রান্ত বর্ণনা: একটি চিরসবুজ গাছ, যার উচ্চতা ৬০ মিটারের বেশি এবং পরিধি ১০ মিটার, যার বাকল এর রং ধূসর বাদামী।) স্তম্ভ বিভিন্ন নকশার খোদাই করা পাথরের পাদদেশে স্থাপিত। মসজিদের মোট আয়তন ১,৮৪৪ বর্গমিটার (১৯,৮৫০ বর্গফুট)।
মক্কা মসজিদ, বিজাপুর
মক্কা মসজিদ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিজাপুরের বিজয়পুরা জেলায় অবস্থিত। ১৬৬৯ সালের দিকে মসজিদটির নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়।
ইতিহাস- মসজিদটি নির্মাণের তারিখ জানা যায়নি। দ্য নিউ কেমব্রিজ হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়াতে এটি দ্বিতীয় আলী আদিল শাহের রাজত্বকালে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে হেনরি কাউসেনস(১৮৭৫ সালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের কাজ শুরু করা হেনরি কাউসেনস একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং আলোকচিত্রী ছিলেন। ১৮৯৫ সাল নাগাদ তিনি পশ্চিম সার্কেলের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ১৯১০ সালে অবসর গ্রহণ করেছিলেন।) ১৩ শতকের শেষের দিকে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেয়ালের পূর্ব প্রান্তে একজন সাধুর সমাধি রয়েছে। তিনিই সম্ভবত মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মিনারগুলি বাহামনী রাজবংশের সময় নির্মিত পূর্ববর্তী কোনও মসজিদের অবশিষ্টাংশ বলে ধারণা করা হয়। মসজিদের চারপাশে নির্মিত উঁচু দেয়াল প্রত্যক্ষ করে কাউসেনস মনে করেন যে, জায়গাটি এক সময় হাতির আস্তাবল হিসেবেও ব্যবহৃত হত। তিনি মনে করেন যে, নতুন মসজিদটি নির্মাণের আগে পূর্ববর্তী মসজিদটি ধ্বংসাবশেষ অবস্থায় পড়েছিলো, তখন এটি হাতির আস্তাবল হিসেবে ব্যবহৃত হত।
স্থাপত্য- মসজিদটি একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত এবং চারদিকেই খিলানযুক্ত মঠ দ্বারা ঘেরা। মঠের খিলানগুলিতে কালাবুর্গীর জামে মসজিদের মতো নিচু স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের সম্মুখভাগে পাঁচটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদের উপরে একটি অর্ধগোলাকার গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজটি আটটি খিলানসহ একটি সোপানের উপর স্থাপিত। সম্মুখভাগের উপরে একটি দ্বি-স্তরযুক্ত প্যারাপেট উঠে গেছে এবং প্রতিটি বাট্রেস(একটি পাথর বা ইটের কাঠামো যা কোনও দেয়ালকে সমর্থন করে বা এটিকে শক্তিশালী করে ধরে রাখে।) এর উপর একটি করে ছত্রী স্থাপন করা হয়েছে।
মিহরাব ধারণকারী পশ্চিম দেয়ালটি খোদাই করে সজ্জিত। মসজিদের অভ্যন্তরে কোনও মিম্বর নেই, কারণ মহিলাদের নামাজের আগে খুতবা পাঠ করা হয় না।
নব গুম্বাজ, বিজাপুর
নব গুম্বাজ (আক্ষরিক অর্থে "নয়টি গম্বুজ"), যাকে নৌ গুম্বাজও বলা হয়, ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিজাপুরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি বিজাপুর সুলতানাতের রাজত্বকালে নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের কাঠামোটি জাতীয় ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
মসজিদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে এর একাধিক গম্বুজ, বিজাপুর সুলতানাতের স্থাপত্য শৈলীর বিপরীতে গুজরাটের স্থাপত্য শৈলী সমর্থন করে। মসজিদের নয়টি গম্বুজ নয়টি উপসাগরীয় অংশের সাথে মিলে যায়, যেখানে প্রার্থনা কক্ষটি বিভক্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজ এবং কোণার চারটি গম্বুজ খণ্ডিত, অন্যদিকে চারটি মধ্যবর্তী গম্বুজ পিরামিড আকৃতির খিলানযুক্ত। সম্মুখভাগের কোণার উপর একটি ছত্রী উঠে গেছে।
অভ্যন্তর- খিলানের মাধ্যমে অভ্যন্তরভাগ নয়টি উপসাগরে বিভক্ত। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে পালিশ করা কালো ব্যাসল্ট দিয়ে তৈরি মিহরাব রয়েছে। মিহরাবের পাশাপাশি কুরআনের আয়াতের শিলালিপি রয়েছে। মসজিদটিতে শিয়া ধর্মবিশ্বাস সম্বলিত একটি বৃহৎ শিলালিপিও রয়েছে।
সেন্ট্রাল মহল্লু জুমা মসজিদ
সেন্ট্রাল মহল্লু জুমা মসজিদ ভারতের কেরালা রাজ্যের এর্নাকুলাম জেলার মুভাত্তুপুজায় অবস্থিত। মসজিদটি শাফিই সুন্নি জুমা মসজিদ। মসজিদটি কাভুমকারা বাজার সংলগ্ন।
মসজিদের জন্য জমি কেনা হয়েছিল ১৯২৭ সালের প্রথম দিকে এবং ১৯২৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী (২৭ শাবান ১৩৪৬ হিজরি) মসজিদ ভবনে প্রথম জুমুআর নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
সদস্যপদ- ২০১১-২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে মহল্লু এগারোটি ব্লক নিয়ে গঠিত যার মধ্যে ১,৮২৪টি পরিবার এবং প্রায় ৮,৯৬০ জন সদস্য (৪,৫৯৪ জন পুরুষ এবং ৪,৩৬৬ জন মহিলা) বাস করে। মহললু সদস্যরা সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করে। তাঁদের লক্ষ্য দারিদ্র্য ও রোগমুক্তি করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণ, শিক্ষাগত সংস্কার প্রতিষ্ঠা এবং গৌরবের পথে ইসলামী সমাজকে নেতৃত্ব দিয়ে দরিদ্র ও অসহায় লোকেদের সহায়তা করা। তাঁরা সামাজিক এবং কল্যাণমূলক কর্মকান্ডের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
চেরামন জুমা মসজিদ
চেরামন জুমা মসজিদ ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিশুর জেলার কোদুঙ্গাল্লুরে অবস্থিত। কিংবদন্তি অনুসারে, দাবি করা হয় যে, মসজিদটি ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনার দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয় যদিও কিছু পণ্ডিত ১৪শ-১৫শ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে মনে করেন। এই দাবির কারণে মসজিদটিকে ভারতে নির্মিত প্রথম মসজিদ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম মসজিদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে, ঐতিহাসিক গবেষণা এই দাবির উপর সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাঁরা মনে করে যে, এর উৎপত্তির গল্পটি বাস্তবের চেয়ে কাল্পনিক কিংবদন্তিকে সমর্থন করে। মসজিদটি কেরালা-ইসলামী ঐতিহ্যবাহী বাস্তুশাস্ত্র স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত হয়েছিল।মসজিদটি পারাভুর-কোদুঙ্গালুর রোডে অবস্থিত।
মূল ভবনটিকে ঘিরে থাকা আধুনিক করিডোর এবং হলগুলি ১৯৮৪ সালে যুক্ত করা হয়েছিল এবং মূল কাঠামোর প্রায় সমস্ত বহির্মুখী বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রেখেছিল। ১৯৯৪ সালে একটি গম্বুজ এবং মিনার যুক্ত করা হয়েছিল এবং ২০২২ সালে ভবনটির সংস্কারের পর সেগুলি অপসারণ করা হয়েছে।
চেরামন পেরুমলের কিংবদন্তি- কিছু কিংবদন্তি অনুসারে, চেরামন রাজা চেরামন পেরুমল কুরআনে উল্লিখিত একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। গল্পটি হল যে চেরামন পেরুমল মুহাম্মদ(সাঃ) এবং তার সঙ্গীদের জন্য আদার আচার উপহার নিয়ে আরবে পৌঁছেছিলেন এবং "নবী মুহাম্মদের কাছে" ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
ঐতিহাসিক এম.জি.এস. নারায়ণনের মতে, "শেষ চেরামন রাজা ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় গিয়েছিলেন এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কারণ এটি কেবল মুসলিম ইতিহাসেই নয়, বরং কেরালোলপট্টির মতো হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ইতিহাসেও স্থান পেয়েছে। ব্রাহ্মণ বা হিন্দু জনগোষ্ঠীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে না এমন একটি গল্প তৈরি করবে বলে কোনওভাবেই আশা করা যায় না। তবে ঐতিহাসিক গবেষণায় এই গল্পটি কাল্পনিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এই অঞ্চলের দর্শনার্থী- মধ্যযুগীয় সময়ে বেশ কয়েকজন মুসলিম বা আরব ভ্রমণকারী কেরালা ভ্রমণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলাইমান, ৯৫১ খ্রিস্টাব্দে পারস্য ভ্রমণকারী নাখুদা বুজুর্গ; ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে ইবনে ই বতুতা এবং ১৪৪২ সালে আবদ-আল-রাজ্জাক প্রভৃতি। তাঁদের নিজ নিজ লেখায় চেরামন জুমা মসজিদের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
২০০৫ সালে ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে. আব্দুল কালাম এবং তিরুবনন্তপুরমের সংসদ সদস্য ড. শশী থারুর মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন।
আভেন (পুরোহিত) নিয়োগ- হিন্দু মন্দির ট্রাস্টের সভাপতি চেল্লিক্কাটিল সুন্দরনের মতে, মালাপ্পুরমের তানুরের শোভাপারম্বা শ্রীকুরুম্বা ভগবতী মন্দিরের আভেন (পুরোহিত) ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় পাজায়াখাথ ইলোমের ব্রাহ্মণ পরিবারের একজন সদস্য দ্বারা থিয়া পরিবার("থিয়া পরিবার" বলতে ভারতের উত্তর কেরালার মালাবার অঞ্চলের ঐতিহাসিকভাবে বিশিষ্ট জাতি থিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত একটি পরিবারকে বোঝায়।) থেকে নিযুক্ত হন। এক সময় পাজায়াখাথ ইলোমের ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্যরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, যদিও মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং ইলম ব্রাহ্মণ পরিবার উভয়ই সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। মন্দিরের হিন্দু পুরোহিত প্রতি ১২ বছর অন্তর একটি বিশেষ রীতিতে নিযুক্ত হন, যার সভাপতিত্ব করেন পাজায়াখাথ পরিবারের একজন মুসলিম সদস্য। এই সৌহার্দ্যের জন্য চেরামন পেরুমলের প্রতি স্থানীয়রা কৃতজ্ঞ।
মালিক দিনার মসজিদ
মালিক দিনার মসজিদ স্থানীয়ভাবে মালিক দিনার জুমা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে হযরত মালিক দিনার গ্র্যান্ড জুমা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি সুফি সুন্নি মসজিদ এবং দরগাহ। মসজিদটি ভারতের কেরালা রাজ্যের কাসারগোদ শহরের থালাঙ্গারায় অবস্থিত। মসজিদটি মালিক দিনার দ্বারা আনুমানিক ২২ হিজরি (৬৪২/৬৪৩ খ্রিস্টাব্দ) সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি ভারতের প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে একটি। দ্বিতল মসজিদটি কেরালা-ইসলামিক ঐতিহ্যবাহী শৈলীতে নির্মিত হয়েছিল এবং ২০১৮ সালে ইসলামী শৈলীতে ব্যাপকভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ এবং দরগাহ ছাড়াও চত্বরটিতে ( কমপ্লেক্সটিতে) একটি মাদ্রাসা, কবরস্থান এবং এতিমখানা রয়েছে।
ইতিহাস- ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত মসজিদটি ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে বছরের পর বছর ধরে কাসারগোডে যথেষ্ট গুরুত্ব অর্জন করে এসেছে। মালিক দিনার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদগুলির মধ্যে এই মসজিদটিও একটি। কিসাত শাকরওয়াতি ফারমাদের মতে, কোদুঙ্গাল্লুর, কোল্লাম, মাদায়ি, বারকুর, ম্যাঙ্গালোর, কাসারগোড, কান্নুর, ধর্মদাম, পান্থালয়িনি এবং চালিয়ামের মসজিদগুলি মালিক ইবনে দিনারের যুগে নির্মিত হয়েছিল এবং এগুলি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে অন্যতম। বিশ্বাস করা হয় যে, মালিক দিনার থালাঙ্গারায় মারা গিয়েছিলেন। মালিক বিন দিনার ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত এবং ভ্রমণকারী। তিনি ভারতে ইসলাম প্রচারকারী প্রথম মুসলিমদের একজন হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বিশেষ করে কেরালায় ধর্মপ্রচার কাজের জন্য পরিচিত। তিনি ইরাকের বসরা থেকে ধর্ম ও শিক্ষা প্রচারের জন্য একদল সাহাবী নিয়ে কেরালায় এসেছিলেন। তিনি কেরালার কাসারগোদে মালিক দিনার মসজিদসহ বেশ কয়েকটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত ছিলেন।
২২ হিজরির (৬৪২/৬৪৩ খ্রিস্টাব্দ) ১৩ই রজব তারিখে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। পরে ১৮০৯ সালে মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে আবার টি. এ. আব্দুল রহিমান হাজির নেতৃত্বে অতিরিক্ত গম্বুজ এবং মিনার যুক্ত করার সময় ব্যাপকভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কাসারগোদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য মসজিদ হল থেরুভাথ মসজিদ। মসজিদটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।
পবিত্র কবর- মসজিদটিতে মালিক দিনারের দরগা রয়েছে এবং এই স্থানটি মুসলমানদের কাছে পবিত্র। মসজিদটি কাসারগোদ জেলার একটি বিশিষ্ট তীর্থস্থান।
উরুস- মালিক দিনার উরুস ভারতীয় মুসলমানদের অন্যতম প্রধান উৎসব। কেরালায় মালিক দিনারের আগমন উপলক্ষ্যে উদযাপন করা হয়। উৎসব মহররম মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং এক মাস জুড়ে চলে। এর মধ্যে রয়েছে জিয়ারত (সমাধি পরিদর্শন), পাতক উয়ারথল (পতাকা আতিথেয়তা) এবং উরুসের শেষ দিনে সকল জাতির জন্য খাবার পরিবেশন করা। খাবার পরিবেশনকে অন্নদানম বলা হয়।
ওদাথিল মসজিদ
ওদাথিল মসজিদ ওদাথিল পল্লী মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের কেরালা রাজ্যের থালাসেরি শহরে অবস্থিত। মসজিদটি আনুমানিক ১৮০৬ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল।
ওদাথিল মসজিদ, বা ওদাথিল পল্লী মসজিদ কেরালার থালাসেরিতে অবস্থিত ২০০ বছরের পুরনো একটি মসজিদ। মসজিদটি ১৮০৬ সালে কেয়ি পরিবারের মুসা কাক্কা দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদটি তার অনন্য স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। মসজিদটি ইসলামিক এবং কেরালার ঐতিহ্যবাহী মন্দির শৈলীর মিশ্রণে নির্মিত। এতে তামার প্রলেপযুক্ত ছাদ, অসংখ্য জানালা এবং সোনালী ফিনিয়াল রয়েছে। একসময় আখ বাগানের জমিতে নির্মাণ করা মসজিদটি বর্তমান একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ, পর্যটন কেন্দ্র এবং উপাসনালয়।
বিবি কি মসজিদ, বুরহানপুর
বিবি কি মসজিদ (আক্ষরিক অর্থে মহিলার মসজিদ) বিবি সাহেবা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের বুরহানপুরে অবস্থিত। ভবনটি জাতীয় ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিস্তম্ভ। মসজিদটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) দ্বারা পরিচালিত।
ইতিহাস- মসজিদটি ১৬ শতকে ফারুকী রাজবংশের রাজত্বকালে বুরহানপুরের জামে মসজিদের প্রায় একই সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্ভবত এটি আদিল খান ফারুকী তৃতীয়ের রানী বেগম রোকেয়া কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছিল। বেগম রোকেয়া গুজরাটের সুলতান তৃতীয় মুজাফফর শাহের কন্যা ছিলেন। ২০১৬ সালে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে মসজিদের দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়েছিলো।
বর্ণনা- স্থাপত্যশৈলী গুজরাট সুলতানি আমলের বিশেষ করে চম্পানেরের জামে মসজিদের অনুরূপ। মসজিদের সম্মুখভাগটি বন্ধন যুক্ত ধরণের এবং এতে একটি বৃহৎ খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে, যার চারপাশে দুটি মিনার রয়েছে। মিনারগুলি পাঁচতলা। নীচের দোতলা পাথর দিয়ে তৈরি এবং উপরের তিনটি তলা ইট দিয়ে তৈরি। মিনারের উপরের অংশগুলি ওরিয়েল জানালা দিয়ে সজ্জিত এবং সেগুলির উপরে একটি গম্বুজ রয়েছে। একটি মিনার সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়েছে।
মসজিদটি আয়তাকার পরিকল্পনায় তৈরি। মসজিদটিতে পূর্বে তিনটি বড় গম্বুজ ছিল, যার মধ্যে কেবল একটি গম্বুজ টিকে রয়েছে। এ ছাড়া, ছাদে বেশ কয়েকটি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের স্তম্ভগুলিতে দুটি ফার্সি শিলালিপির পাশাপাশি গেটের উপরে একটি আরবি শিলালিপি রয়েছে।
জামে মসজিদ, বুরহানপুর
জামে মসজিদ একটি সুন্নি শুক্রবার মসজিদ। মসজিদটি ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের বুরহানপুরে অবস্থিত। মসজিদটি জাতীয় ঐতিহ্যের স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস- মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থিত সংস্কৃত ও আরবি শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি ষোড়শ শতাব্দীর বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটি ফারুকী রাজবংশের মুবারক শাহের পুত্র আদিল শাহ চতুর্থ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বুরহানপুরের রাজকীয় মণ্ডলীর মসজিদ হিসাবে নির্মিত হয়েছিল। ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো এবং ১৫৮৮-৮৯ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছিলো। মুঘল সম্রাট আকবর এবং আওরঙ্গজেব তাঁদের রাজত্বকালে মসজিদটির মেরামত করেছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদের একটি খোলা উঠোন রয়েছে এবং পশ্চিম দিকে প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। প্রার্থনা কক্ষটি সমতল ছাদযুক্ত এবং সম্মুখভাগে পনেরটি খিলানযুক্ত খোলা অংশ রয়েছে। মসজিদের প্রধান আকর্ষণ হল কালো পাথর দিয়ে তৈরি প্রতিসম স্তম্ভগুলি। কালো পাথরগুলি ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধর জেলার মাণ্ডু থেকে আনা হয়েছিল। পাথরগুলি এত ভারী ছিল যে, এর পরিবহন ব্যয় সোনার মূল্যের সমান ছিল। স্তম্ভগুলি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যে, চারটি স্তম্ভ আলাদা আলাদা করে তৈরি করা হয়েছিল এবং একেবারে শীর্ষে মিলনস্থলের কেন্দ্রে উপরের অংশগুলি একত্রিত করে ছাদ তৈরি করা হয়েছিল। ব্যালমেন্ট(ব্যাটেলমেন্ট দুর্গ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর শীর্ষে পাওয়া যায়। পর্যায়ক্রমে ফাঁক এবং শক্ত অংশ বা ক্রেনেলেশনসহ সুরক্ষিত, নিচু দেয়াল।) দিয়ে তৈরি একটি প্যারাপেট ছাদ বরাবর চলে গেছে। সম্মুখভাগটি দুটি পাঁচতলা মিনার দ্বারা বেষ্টিত।
অভ্যন্তর- নামাজ কক্ষটি পাঁচটি উপসাগরে বিভক্ত। মসজিদটিতে পনেরটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপরে একটি আরবি শিলালিপি রয়েছে। দক্ষিণ মিহরাবের উপরে একটি দ্বিভাষিক শিলালিপি রয়েছে, যার উপরে আরবি পাঠ এবং নীচে সংস্কৃত পাঠ রয়েছে। শিলালিপিতে উদ্বোধনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে "পৌষ" [দিন], "সংবত" [মাস], ১৬৪৬ "শক" [বছর], অর্থাৎ ৫ জানুয়ারী ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দ। ১৬০১ সালে ফারসি ভাষায় একটি অতিরিক্ত শিলালিপি যুক্ত করা হয়েছিল।
জামে মসজিদ, চান্দেরি
শুক্রবারের জামে মসজিদ ভারতের মধ্য প্রদেশের অশোকনগর জেলার চান্দেরিতে অবস্থিত। মসজিদটির নির্মাণ কাজ ৮৫৩ হিজরিতে (১৪৪৯/১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ) সম্পন্ন হয়েছিলো এবং এটি জাতীয় ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিস্তম্ভ।দিল্লি সালতানাতের শাসক গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজত্বকালে চান্দেরিতে জামে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিলো এবং মসজিদটির নির্মাণ কাজ মালওয়া সালতানাতের শাসনামলে সম্পন্ন হয়েছিল।
মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলি প্রতিটি উপসাগরের উপরে সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি। প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশের জন্য এগারোটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটির উত্তর এবং দক্ষিণ তোরণে নয়টি করে প্রবেশপথ রয়েছে।
জামে মসজিদ, মাণ্ডু
জামে মসজিদ, মাণ্ডু ভারতের মধ্য প্রদেশের ধর জেলার মান্ডুতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শুক্রবার মসজিদ। মুঘল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত মসজিদটি হিশাম শাহের রাজত্বকালে নির্মিত এবং ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ খিলজির রাজত্বকালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিলো বলে মনে করা হয়। হিশাম আল-দীন হোশাং শাহ (১৪০৬-১৪৩৫) ছিলেন মধ্য ভারতের মালওয়া সালতানাতের প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত সুলতান। যাকে হোশাং শাহ ঘোরিও বলা হত।
মসজিদটিতে তিনটি বড় গম্বুজ, একটি উঠোন, ৫৪টি ছোট গম্বুজ এবং স্তম্ভযুক্ত হল রয়েছে। মসজিদে একটি প্রার্থনা কক্ষ এবং সজ্জিত স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের পুরো আয়তন ৭,৭২৫ বর্গমিটার (৮৩,১৫০ বর্গফুট)। মসজিদটি ৪.৬ মিটার (১৫ ফুট) উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত। বারান্দার পূর্ব দিকে অবস্থিত প্রবেশপথের শিলালিপি থেকে বোঝা যায় যে, মসজিদটি দামেস্কের মসজিদের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে মান্ডুর স্মৃতিস্তম্ভগুলি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের ভোপাল সার্কেল দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালিত হয়।
মান্ডু মধ্য প্রদেশ রাজ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভের সাথে, ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, স্মৃতিস্তম্ভটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ দর্শনার্থী ভির করে। মধ্যপ্রদেশের পর্যটন বিভাগ কর্তৃক স্মৃতিস্তম্ভটিতে বার্ষিক শো-এর আয়োজন করা হয়।
ইতিহাস- ১৪০১ সালে তৈমুর যখন দিল্লি দখল করেছিলেন, তখন মালওয়ার গভর্নর আফগান দিলওয়ার খান তাঁর নিজস্ব ছোট্ট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখনই ঘুরি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েঠছিলো। আফগান দিলওয়ার খানের পুত্র হোশাং শাহ ধর থেকে রাজধানী মান্ডুতে স্থানান্তরিত করেন এবং মাণ্ডুকে সর্বোচ্চ জাঁকজমকভাবে উন্নীত করেন। ১৪৩৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববর্তী ঘুরি রাজবংশকে উৎখাত করে মাহমুদ খলজি মালওয়ায় খলজি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী ৩৩ বছর ধরে শাসন করেন। তাঁর রাজত্বকালেই মালওয়া সালতানাত সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছিলো। মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিলো এবং ১৪৫৪ সালে মাহমুদ খলজির রাজত্বকালে নির্মাণ কাজ ম্পন্ন হয়েছিল। মাহমুদ খলজি ৫৫ বছর বয়সে তাঁর পিতাকে হত্যা করে মান্ডুর রাজা হয়েছিলেন। বিশ্বাস করা হয় যে তাঁর ১৫,০০০ মহিলার একটি হারেম ছিল এবং শিল্পের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক ছিল। পশ্চিম দেয়ালে ৪৩ সেন্টিমিটার (১৭ ইঞ্চি) পরিমাপের সুন্দর নকশা এবং খোদাইর কাজ রয়েছে।আধুনিক সময়ে, মান্ডুর স্মৃতিস্তম্ভগুলি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের ভোপাল সার্কেল দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালিত হয়।
স্থাপত্য- মসজিদের প্রধান প্রবেশপথটি পূর্ব দিকে অবস্থিত। মসজিদের পুরো আয়তন ৭,৭৪৪ বর্গমিটার (৮৩,৩৬০ বর্গফুট) এবং এটি ৪.৬ মিটার (১৫ ফুট) উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত। বারান্দার পূর্ব দিকের প্রবেশপথে অবস্থিত খোদাই করা শিলালিপি থেকে বোঝা যায় যে, মসজিদটি দামেস্কের মসজিদের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। প্রবেশপথটিতে মার্বেল পাথরের জাম্ব(মার্বেল জ্যাম হল স্থাপত্য উপাদান, সাধারণত দরজা বা জানালার ফ্রেমের পাশ এবং উপরের অংশ, যা প্রাকৃতিক পাথর বা কৃত্রিম মার্বেল দিয়ে তৈরি।) এবং লিন্টেলও রয়েছে যা হিন্দু কাঠামোর মতো নয়। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি একটি বৃহৎ উঠানে নিয়ে যায়, যার তিন পাশে স্তম্ভযুক্ত বারান্দা রয়েছে। স্তম্ভযুক্ত বারান্দাগুলি প্রার্থনা কক্ষগুলিতে নিয়ে যায়, যা ৫৮টি ছোট গম্বুজ এবং তিনটি বড় গম্বুজসহ স্তম্ভ দ্বারা আবৃত। প্রার্থনা কক্ষটি খিলান দ্বারা পূর্ণ। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি কুরআনের আয়াত দিয়ে সজ্জিত। কিবলার দিকে মার্বেল দিয়ে তৈরি একটি ক্ষুদ্র মিম্বার রয়েছে। উত্তরের দেয়ালে দুটি প্রবেশপথ রয়েছে, একটি উঠানে এবং অন্যটি প্রার্থনা কক্ষ পর্যন্ত প্রসারিত।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে- মান্ডু মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভের সাথে, ২০২০ সালের হিসাব অনুসারে, স্মৃতিস্তম্ভটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ দর্শনার্থীর ভির করে। কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯-২০ সালে ৩.৭৯ লক্ষ দর্শনার্থী এসেছিলেন এবং কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারীর কারণে ২০২০ সালে ৫০% দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছিলো। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, শহরের বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ প্রদর্শনের জন্য ছয় দিনের মান্ডু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, যার মধ্যে মসজিদটি প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলো।জামে মসজিদটিকে শহরের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ভবন এবং প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
লাট মসজিদ. ধর (মধ্যপ্রদেশ)
লাট মসজিদ (সংস্কৃত: লাট মসজিদ, অর্থ: 'স্তম্ভ মসজিদ') ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের ধর শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি লাট কি মসজিদ, লাড মসজিদ বা লাঠ মসজিদ নামেও পরিচিত। লাট মসজিদটি জাতীয় ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিস্তম্ভ। মসজিদটি প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং অবশেষ আইনের অধীনে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ দ্বারা সুরক্ষিত।
ইতিহাস- ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে দিলওয়ার খান দিল্লি থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মালওয়া সালতানাত প্রতিষ্ঠার স্মরণে শুক্রবার মসজিদ হিসেবে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। জামে মসজিদটি চান্দেরির মসজিদের মতো শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত। মসজিদটির নাম প্রাঙ্গণে অবস্থিত খণ্ডিত লোহার স্তম্ভ (হিন্দিতে লাট) থেকে এসেছে। দিলওয়ার খান ছিলেন মধ্য ভারতের মালওয়া প্রদেশের একজন আফগান বা তুর্কি-আফগান গভর্নর। ১৩৯২ সালে তাঁকে দিল্লির সুলতান গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে দিল্লি সালতানাতের পতনের সময় তিনি মালওয়া সালতানাতের প্রথম সুলতান হিসাবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
স্থাপত্য- মসজিদটিতে একটি বিশাল উঠান রয়েছে এবং উঠোনের চারদিকে খুঁটি এবং লিন্টেল তোরণ রয়েছে। উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকের তোরণগুলি অগভীর এবং শুধুমাত্র একটি উপসাগর(ভবন নির্মাণে, "বে"(উপসাগর) বলতে সাধারণত একটি কাঠামোর মধ্যে একটি বগি বা বিভাগকে বোঝায়, যা কলাম, দেয়াল বা স্তম্ভের মতো কাঠামোগত সহায়তা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি মূলত বৃহত্তর ভবনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করে।) গভীর। প্রার্থনা কক্ষে চারটি উপসাগর এবং মিহরাবের উপরে একটি গম্বুজ রয়েছে। প্রার্থনা কক্ষের ভিতরের উঁচু প্ল্যাটফর্মটি সম্ভবত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদের প্ল্যাটফর্মের সাথে তুলনীয়। প্ল্যাটফর্মটি সুলতানের রাজকীয় গ্যালারি হিসাবে কাজ করত। মিহরাব এবং মিম্বার হল মান্ডুর জামা মসজিদের মতো, যা মসজিদটি নির্মাণের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে হোশাং শাহ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। প্রবেশপথগুলিতে চৌদ্দ এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর পছন্দসই সারগ্রাহী(প্রতিটি উৎস থেকে সেরাটি বেছে নেওয়া) শৈলীতে নির্মিত একটি গেটহাউস রয়েছে। এরকম গেটহাউস(একটি প্রবেশপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাড়ি) মান মন্দির, গোয়ালিয়র দুর্গ, দাতিয়া, চান্দেরি এবং আগ্রাতেও দেখা যায়। কিছু স্তম্ভ এবং লিন্টেল মসজিদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল এবং অন্যগুলি পুরানো মন্দির ও অন্যান্য কাঠামো থেকে সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। কানপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির রামমূর্তি বালাসুব্রহ্মণ্যম লৌহস্তম্ভ সম্পর্কে তাঁর গবেষণায়, স্তম্ভগুলির উৎপত্তি এবং সাম্প্রদায়িক পরিচয় অপ্রমাণিত বলে দাবি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, স্তম্ভগুলির মূল অবস্থান, সম্ভাব্য ব্যবহার এবং তারিখগুলি অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
লোহার স্তম্ভ- মসজিদের নাম এসেছে এর লোহার স্তম্ভ থেকে, যার টুকরোগুলো ভবনের বাইরের প্রাঙ্গণের বাগানে পড়ে রয়েছে। দিল্লির প্রাথমিক শাসকরা জামে মসজিদে স্তম্ভ ব্যবহার করতেন, যা কুতুব মিনার কমপ্লেক্স এবং হিসারের লাট কি মসজিদেও দেখা যায়। স্তম্ভটিতে তারিখ, উদ্দেশ্য বা কার পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো সেকথা উল্লেখ নেই। হেনরি কাউসেনস পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, স্তম্ভটি পরবর্তী পরমার রাজা অর্জুনবর্মণের অধীনে ১২১০ খ্রিস্টাব্দে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে ধর গুজরাট সুলতানাতের বাহাদুর শাহের আধিপত্যে আসে। গুজরাটের সুলতান স্তম্ভটি গুজরাটে স্থানান্তর করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এটি তখন ভেঙে গিয়েছিলো। তখন থেকে স্তম্ভটি প্ল্যাটফর্মের বিপরীতে তির্যকভাবে পড়েছিলো বলে ১৯১২ সালের নথিপত্রে উল্লেখ থাকা দেখা যায়।
ডকুমেন্টেশন এবং মেরামত- লাট মসজিদ সময়ে সময়ে দর্শনার্থী, পণ্ডিত এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসেছে। সর্বপ্রথম মসজিদটির গুরুত্বপূর্ণ দর্শনার্থী ছিলেন সম্রাট আকবর, যিনি লৌহস্তম্ভের উপর একটি ফার্সি শিলালিপি স্থাপন করেছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে, ক্যাপ্টেন ই. বার্নস, ধর দরবার কর্তৃক স্মৃতিস্তম্ভটির মেরামতের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং সংরক্ষণের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।
১৯৩৯-৪০ সালে, সাংবাদিক অ্যানেমারি শোয়ার্জেনবাখ ধর পরিদর্শন করেছিলেন এবং মসজিদটির ছবি তুলেছিলেন। তার ছবিগুলি সেই সময়ের স্মৃতিস্তম্ভের অবস্থার একটি অপরিহার্য রেকর্ড।
ষোড়শ শতাব্দীতে গুজরাটের সুলতান লোহার স্তম্ভটি অপসারণের চেষ্টা করার পর স্তম্ভটি মূলত প্রাঙ্গণের বাগানের এক কোণে পড়ে ছিল। ১৯৮০-এর দশকে, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ধ্বংসাবশেষগুলিকে একটি প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত করে। ফলে এখন লৌহ স্তম্ভের সমস্ত অংশ দেখা যায়। স্তম্ভটির উচ্চতা ২৪ ফুট (৭.৩ মিটার)ছিলো।বর্তমান স্তম্ভটি তিন টুকরোয় বিভক্ত। টুকরোগুলোর দৈর্ঘ যথাক্রেম ১১ ফুট (৩.৩ মিটার) এবং ৭ ফুট (২.১ মিটার) এবং ৬ ফুট (১.৯ মিটার)। ব্যাস প্রায় ৪১ সেমি (১৬ ইঞ্চি)।
মতি মসজিদ, ভূপাল
মতি মসজিদ ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভূপালে অবস্থিত। মসজিদটি সিকান্দার জাহান বেগম কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল এবং ১৮৬০ সালে মসজিদটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। মসজিদটি দিল্লির জামা মসজিদের একটি প্রতিরূপ। মসজিদটির নির্মাণে লাল বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছিল।
সিকান্দার জাহান ভয়ঙ্কর এবং শক্তিশালী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি আধুনিকীকরণ এবং সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সিকান্দার জাহান বেগম মার্শাল আর্টে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং তাঁর রাজত্বকালে (১৮৪৪-১৮৬৮) অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সিকান্দার বেগম জিসিএসআই(নাইট গ্র্যান্ড কমান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া উপাধি পেয়েছিলেন। এটি ব্রিটিশদের দ্বারা প্রদান করা একটি ঐতিহাসিক শৌর্যের উপাধি) (জন্ম ১০ সেপ্টেম্বর ১৮১৭ এবং মৃত্যু ৩০ অক্টোবর ১৮৬৮) তিনি ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৬৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ভূপালের নবাব ছিলেন।তিনি প্রাথমিকভাবে ১৮৪৪ সালে তাঁর নয় বছর বয়সী কন্যা শাহজাহান বেগমের অভিভাবক হিসাবে ভূপালের নবাব নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৮৬০ সালে তিনি স্বয়ং নবাব হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
মুঘল সম্রাজ্ঞী সিকান্দার জাহান বেগম প্রগতিশীল আদর্শের জন্য বিখ্যাত, সিকান্দার বেগম দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছিলেন এবং শহরে নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে, সিকান্দার জাহান বেগম আধুনিকীকরণের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যার মধ্যে অসংখ্য স্মৃতিস্তম্ভ, রাস্তা এবং সেতু নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মতি মসজিদ ছিল তার দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নির্মাণগুলির মধ্যে একটি। মসজিদটি কেবল উপাসনার স্থান হিসেবেই নয় বরং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যও ডিজাইন করা হয়েছিল, একই সাথে ভারতের মুসলিম মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রতীকও ছিল। দিল্লির জামা মসজিদের সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও, মতি মসজিদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল এর পাথরগুলি ফুলের মতো খোদাই করা হয়েছে।
শাহজাহান বেগম জিসিএসআই(জন্ম ২৯ জুলাই ১৮৩৮ এবং মৃত্যু ১৬ জুন ১৯০১) দুই মেয়াদে ভূপালের শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন: প্রথমত ১৮৪৪-১৮৬০ সাল পর্যন্ত তাঁর মা অভিভাববক হিসেবে ভূপালের নবাব নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর মাতৃ সিকান্দার জাহান বেগম এর ১৮৬৮ সালে মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয়ত ১৮৬৮ সাল থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ভূপালের নবাব ছিলেন।
তাজ-উল-মসজিদ
সমাপ্ত













































🫶❤️
উত্তরমুছুন❤️🫶
উত্তরমুছুন