জীবনের গল্প
জীবনের গল্প
সূচীপত্র
প্রস্তাবনা
কলকাতার যাত্রাপালা
ভাষা বিড়ম্বনা
নিজের ভেবে পরের জিনিষে হাত
ভুল দিক নির্ণয়
শিক্ষকের সাথে অযথা তর্ক
স্কুল ছুটি
সেবার নয় ডাক্তারদের এখন ব্যবসায়িক মনোভাব
লেখামেলা প্ৰসংগ
খবরের কাগজে লেখা নিয়ে কিছু কথা
দৃষ্টি ভ্রম
নেদুর জনপ্রিয়তা
ছাতু আমার জীবন বাঁচিযেছিলো
ধর্মীয় বিশ্বাস
দুধ পানকরে জোলাপ
ঘোটা পান
মানুষ ভেড়ার পাল
নৌকা বাইচের চরণধার
হা-ডু-ডু খেলার জাজ
ক্ৰিকেট খেলার আম্পায়ারিং
সভাপতি হিসাবে সভা পরিচালনা
একটি ভিন্নস্বাদের গল্প
চিকিৎসার সাথে জড়িত
অন্ধবিশ্বাস
পাথর চূণের গাছ
সেদিন ঘোরতর অন্যায় করেছিলাম আমি
স্ফুর্লিঙ থেকে খাখ্ডব দাহ
অন্য দু’টি গল্প
জীবনের গল্প
প্রস্তাবনা- আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ নবেম্বর। তবে আমার একাডেমিক জন্ম তারিখ ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসের ১ তাৰিখ। আমার একটু জ্ঞান হওয়ার পর মা বলেছিলেন, আর এক মাস আগে জন্ম হলেই তোর নাম এনআরসিতে উঠত। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের সনাক্ত করার জন্য ১৯৫১ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে আসামে প্রথম নাগরিকপঞ্জী প্রস্তুত করা হয়েছিলো। ভারতের স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংসদ ১৯৫০ সালের অভিবাসন (আসাম থেকে বহিষ্কার) আইন পাস করে, কারণ তখন উদ্বেগ ছিল যে, ভারত বিভাজনের পর পাকিস্তানের অংশ পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা অভিবাসীদের দ্বারা আসাম প্লাবিত হচ্ছে। এই উদ্বেগ নিরসন এবং আইনটি বাস্তবায়নের জন্য ১৯৫১ সালে প্রথম জাতীয় নাগরিকপঞ্জী প্রস্তুত করা হয়েছিল। তখনকার সচেতন লোকদের ভাষ্য অনুসারে এনআরসি বর্ষার মরশুমে অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো এবং সেপ্তেম্বরের শেষের দিকে এনআরসি পঞ্জীয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছিলো। যারজন্য অনেক লোকের নাম এনআরসির পঞ্জীয়ন থেকে বাদ পরেছিলো বলে নাগরিক পঞ্জীয়ন অধ্যক্ষ স্বয়ং সি, এস মোলান সাহাব স্বীকার করেছিলেন।
আমার মামাত বোন সামর্ত বানু আমার থেকে এক বছরের বড়। ১৯৫১ সালের এনআরসিতে তাঁর নাম উঠেছে। এনআরসিতে তাঁর বয়েস ছিলো ১ বছর।মার মুখে শুনামতে, আমার জন্ম কার্তিক মাসের শেষের দিকে
হয়েছিলো।কার্তিকের শেষ মানে নভেম্বরের প্রথম। এদিকে আমাদের মেজো মামা
শিরাজুল হক একদিন আমাকে বলেছিলেন য়ে, আমার জন্ম শীতের দিনে
সমবার ফজরের সময়। আমার জন্মের পরেই আমাদের নানা ধনাই হাজি মসজিদে আজান দিয়েছিলেন। তখন নভেম্বর মাসে প্রচণ্ড শীত পরতো।বলতে গেলে সেপ্তেম্বর
মাস থেকেই শীত শুরু হয়ে যেত। সেই হিসেবে মার মুখে শুনা বয়স সঠিক বলে ধারণা হয়। কাৰ্তিক মাসের শেষে ১৯৫১ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম
সপ্তাহে সমবার পড়েছিলো ৫ তারিখে এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে সমবার পড়েছিলো ১২ তারিখে। এদিকে
বাংলা ক্যালেণ্ডারের হিসেবে
নভেম্বরের ১২ তারিখ ছিলো বঙ্গাব্দ ১৩৫৮ সালের কার্তিক মাসের ২৭ তারিখ এবং নভেম্বর মাসের ৫ তারিখ ছিলো
কাৰ্তিক মাসের
২১ তারিখ।
তাই ১৩৫৮ সালের কাৰ্তিক মাসের ২১ তারিখ ধরলে
কার্তিক মাসের প্ৰায় মাঝামাঝি সময়ে হয়ে যায়।
কিন্তু মা বলেছিলেন আমার
জন্ম কার্তিকের একবারে শেষের দিকে। তাই
কার্তিকের ২৭ তারিখ এবং নভেম্বরের
১২ তারিখই আমার সঠিক জন্ম তারিখ হবে
বলে ধরে নিতে পারি।
আমি আমার সুদীর্ঘ জীবনে অনেক লোকের সান্নিধ্যে এসেছি এবং অনেক অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় হয়েছে। সেই সব কিছু অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থটিতে তুলে ধরার প্রয়াস করব। কিছু কিছু অভিজ্ঞতার কথা আমার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আমার ছেলেবেলা এবং ফিরে দেখা গ্রন্থে ইতিমধ্যে সন্নিবিষ্ট করেছি। সেই সব কিছু অভিজ্ঞতার কথা এই গ্রন্থটিতেও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।•
কলকাতার যাত্রাপালা-
আমাদের গ্রামটা খুবই রিমোট (অনুন্নত) এলেকায় ছিলো। তাই কোন শিক্ষানুষ্ঠান
ছিল না আমাদের গ্রামে। আমাদের পাশের পাড়ায় একটি প্রাইমারি স্কুল ছিলো যদিও
প্রাইমারি পাসের পর অনেকে অন্যত্র গিয়ে লিখা-পড়া অব্যাহত রাখতো। আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছিলাম ৩৭১ নম্বর আলীগাঁও প্রাইমারি
স্কুলে, গড়লা-চাচরা এম,ই মাদ্রাসায় এবং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করেছিলাম কাদং হাইস্কুলে। কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন কালে আমি প্রথমে লজিং ছিলাম
রূপাকুছির জালাল উদ্দিন সাহেবের বাড়িতে এবং পরে রূপাকুছিরই আমাদের মামাতো বোনের
জামাই আব্দুল আলীর বাড়িতে। আব্দুল ভাই খুবই যাত্ৰা পাগল ছিলেন। তিনি নিজেও অভিনয় করতেন
এবং কোন জায়গায় কোন ভালো যাত্রাদলের যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হলে নদী সাঁতরে হলেও
দেখতে যেতেন। সংগী নাপেলে আমাকেও অনেক
সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন সেই যাত্রাপালা দেখতে।তখন কলিকাতা থেকে নট্ট
কোম্পানী, সত্যম্বর অপেরা, বীনাপানি অপেরা, আর্য অপেরা, ঘোষ কোম্পানী যাত্রা দল
এসে আসামের বিভিন্ন জায়গায় সুনামের সাথে অভিনয় করে বেড়াতেন। আমাদের বরপেটা রোড,
হাউলি, শেষের দিকে মন্দিয়া বাজারে এসেও অভিনয় করতেন এবং এই অঞ্চলের যাত্রাপ্রেমী
জনতা সেই অভিনয় চুটিয়ে উপভোগ করতেন।
আগেই
বলেছি, আব্দুল ভাই নিজে অভিনয় করার পাশাপাশি আশেপাশে কোথাও যাত্ৰাগান বা নাটক হলে প্রায়ই উপভোগ করতে যেতেন। তখন সঙ্গী সাথী না পেলে ভগ্নীপতি হিসাবে তিনি আমাকেও মাঝেমধ্যে
সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একবার তাঁর সাথে নাটক দেখেতো বিপদেই পড়েছিলাম। সেবার কলকাতার যাত্রাদল ঘোষ কোম্পনীর কয়েকটি নাটক অভিনীত হয়েছিলো মন্দিযা
বাজারে। মন্দিযার সপ্তাহিক হাট এখনকার
মতো তখনও সোমবারে অনুষ্ঠিত হতো। তাই সোমবার থেকে সেই যাত্রা পালা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৯৬৯ সাল। আমি
তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। একদিন আব্দুল ভাই সন্ধ্যে বেলা বললেন- নাটক দেখবি? কলকাতার দল। ঘোষ কোম্পানী। খুবই ভালো দল। দেখতে চাস তো আমার সাথে যেতে পারবি।
এমনিতে ছাই, তাতে আবার বাতাস। ছেলেবেলা চুরি করে যাত্রাগান শুনার কথা আমার ছেলেবেলা
বইয়ে আগেই লিপিবদ্ধ করেছি, তাই এখানে সেই কথা আর উল্লেখ করলাম না। জালু কাকার বাড়িতে থাকাকালীন দরবেশের
পাল্লায় পড়ে সিনেমা, থিয়েটার দেখার অভ্যেসও গড়ে উঠেছিল। মামার সাথে একবার
হাউলিতে কলকাতার যাত্রাদলের নাচমহল নাটকও দেখেছিলাম। খুবই ভালো লেগেছিল সেই নাটক
দেখে। তাই কলকাতার দলের নাটকের কথা শুনে খুবই খুশি হলাম এবং কোনো দ্বিধা না করে এক কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম।
আব্দুল ভাই, আসান আলী (আসান আলীও আমার ভগ্নিপতি ছিলেন। খালাত বোনের জামাই।) এবং আমি পায়ে হেঁটে মন্দিয়া এলাম। সেদিন ছিল সোমবার।নাটকটির নাম
ছিল গৃহলক্ষ্মী। তখন এখনকার
মতো চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল না। সাধারণ যাত্ৰাগান হলে তখন মাটিতে খানখড় বিছিয়ে দিত এবং টিকেট কেটে যাত্রা দেখলে মাটিতে বিচালি
বিছিয়ে ওপড়ে ফরাশ(কাৰ্পেট) বিছিয়ে দিতো। টিকেট কেটে
যাত্রা। তাই সেদিন ফরাশে বসে নাটক দেখে খুবই রোমাঞ্চিত হলাম এবং নাটক দেখে পায়ে হেঁটে বাড়ি আসতে আসতে বেলা প্রায় সাতটা বেজে গেল। আব্দুল ভাই বাড়ি এসেই সটান শোয়ে পড়লেন।তবে স্কুলে যেতে পারব না বলে আমি শোইলাম না। গোসল করে, খাওয়া-দাওয়া সেরে সময় মতো স্কুলে গেলাম।
বিকেলে স্কুল থেকে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে
সন্ধ্যেয় আবার মন্দিয়া রওয়ানা হলাম। নাটক দেখলাম। সকালে বাড়ি এসে স্কুলে গেলাম। এভাবেই না
ঘুমিয়ে চারদিন নাটক দেখলাম।
পাঁচ দিনের মাথায় বিকেল বেলা স্কুল থেকে আসার
পর আব্দুল ভাই বললেন- আজ দু’টি নাটক দেখাবে এক টিকটে। যা, ভাত খেয়ে রেডি হয়ে নে।
চোখে ঘুম। শরীর ঢুলছে। তবুও দু’টি নাটকের কথা শুনে নাটক দেখতে গেলাম। নাটক
শুরু হল। ঘুমে চোখ মেলতে পারছি না। কার নাটক কে দেখে! মাঝে মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ছি।
আমার অবস্থা দেখে আব্দুল ভাই এক টোপলা মোয়া
কিনে এনে দিয়ে বললেন- মোয়া চাবা। ঘুম চলে যাবে।
টোপলা খুলে মোয়া মুখে দিলাম। মোয়াও চিবোতে পারছি না। মোয়া মুখে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ছি। ঘুমিয়ে পড়তে দেখলেই আব্দুল ভাই ধাক্কা
দিচ্ছেন। ধাক্কা খেয়ে আবার জেগে উঠছি। এভাবেই খুব
কষ্ট করে সেদিন নাটক দেখলাম। সকাল বেলা মদ খাওয়া মানুষের মত ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি
এলাম। আব্দুল ভাই বাড়ি এসেই শোয়ে পড়লেন। ঘুমালে স্কুলে যেতে পারব না বলে আমি ঘুমালাম না। ন’টা বাজায় স্কুলে গেলাম। দ্বিতীয় পিরিয়ডের
পরেই বেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। (কারণ দ্বিতীয় পিরিয়ড ছিলো কাশেম স্যারের। কাশেম স্যার কঠোর প্রকৃতির শিক্ষক ছিলেন। তিনি লঘূ দোষে গুরু শাস্তি দিতে কুণ্ঠিত হতেন না। সেই ভয়েই আমি দ্বিতীয় পিরিয়ড পর্যন্ত জেগে
ছিলাম।)সেদিন ঘুমিয়েই স্কুলের সময়
কাটিয়ে দিলাম। স্কুলের ছাত্র কিংবা মাস্টর মশায়রা কেউ আমাকে ডেকে জাগায় নি।
স্কুল ছুটির পরেও না। ছুটির পরেও আমাকে ঘুমিয়ে রেখেই সবাই চলে গিয়েছিল। স্কুল ছুটি হয়েছে। আমি ঘুমিয়ে রয়েছি! স্কুলের চৌকিদার পেস্কার আলী ডেকে ঘুম তোলে সেদিন আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আমার অবস্থা এমন হয়ে ছিল যে, প্রায় এক মাস পর্যন্ত রাতে পড়তে পারি নি। সন্ধ্যেয় ভাত খেয়ে শোইলেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
ভাষা
বিড়ম্বনা-
আমাদের
মাঝে অনেকেরই নিজের মাতৃভাষা ছেড়ে আসামের সংখ্যাগুরুর অসমিয়া ভাষা আকঁড়ে ধরার
প্রবণতা রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত
চাকরিজীবী লোকের মাঝে এই প্রবণতা বেশি। তাঁরা ছেলেমেয়েদের সাথে বাড়িতে
অসমিয়া ভায়ায় কথা বলে। ফলে অসমিয়া ভাষা শিখে ঠিকই, তবে
অসমিয়া সংস্কৃতি শিখতে পারেনা। কারণ আমরা বাংলা সংস্কৃতির লোক,
প্রকৃতার্থে আমরা অসমিয়া সংস্কৃতির লোক না। তাই তখন আমরা বাঙালীও হতে পারিনা এবং অসমিয়াও হতে পারিনা। গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের সাথে মিশতে পারি না। অর্থাৎ গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এরকম বিড়ম্বনায়
হয়তো অনেকেই পরেছে। তবে নাম
বলে আমি তাঁদের ছোট করতে চাইনা। অসমিয়া ভাষাকে ছোট করে দেখার জন্যও আমি এই কথা লিখিনি। অসমিয়া ভাষাকে আমরা রাজ্যিক ভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম
হিসেবে মেনে নিয়েছি এ বিষয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই। তবে মার মুখের ভাষা ত্যাগ করার আমি পক্ষপাতি নই। এর মধ্যে
কিছু ব্যতিক্রম লোকও আমি পেয়েছি। তাঁরা শহরে গিয়েও মাতৃভাষা ছেড়ে দেয়নি। তাঁদের মধ্যে
হানিফ মামার নাম না বললেই নয়। হানিফ মামার সাথে আমাদের কোন
রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তিনি আমাদের মামাদের বাড়ি লজিং
ছিলেন প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়। হানিফ মামা আমার চেয়ে কিছুটা বড়
ছিলেন। আমি যখন ক-শ্রেণিতে পড়তাম তখন হানিফ মামা পড়তেন তৃতীয়
শ্রেণিতে। হানিফ মামা আমাদের ছোট মামা ফয়জল হকের সমসামিয়ক ছিলেন এবং তিনি মামাদের
ভাই বলে ডাকতেন। সেজন্যই আমি তাঁকে মামা ডাকতাম।
হানিফ মামাদের বাড়ি ছিল বাঘবরের মোয়ামারি। সেখানে স্কুল ছিল না বলে তিনি মামাদের বাড়িতে লজিং থেকে
প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন। হানিফ মামা পাঁচ বছর ছিলেন
মামাদের বাড়ি। তাই মামাদের বাড়ির লোকদের সাথেতো বটেই, তাঁদের
আত্মীয়স্বজনদের সাথেও সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। সেই সুবাদে আমাদর বাবা মিঠু মিয়াকে হানিফ মামা মিঞাভাই বলে
সম্বোধন করতেন। আমি ম্যাট্রিক পাস করেছিলাম ১৯৭১ সালে। মামা তখন গুয়াহাটির লাখটকিয়ার
আজাদ হোটেলের মালিক। একেবারে খাস মালিক নন, ভাড়ায়
চালাতেন আজাদ হোটেল। ম্যাট্রিক পাসের পর আমি বরপেটার
মাধব চৌধুরি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছিলাম বিজ্ঞান শাখায়। তখন বরপেটায় বিজ্ঞানের সব পাঠ্যপুস্তক পাওয়া যেতনা, তাই কিছু বই গুয়াহাটি থেকেও আনিয়ে
নিতে হতো। অন্যকে দিয়েও
আনানো যেতো, তবে গুয়াহাটী হানিফ মামা আছে বলে আমি বই কেনার জন্য উক্ত সালেরই আগস্ট
মাসে একাই গুয়াহাটি গিয়েছিলাম। তখনকার দিনে গুয়াহাটি বা শ্বিলং যাওযা মানে বড় কিছু একটা
করা। আমার জন্য বলতে গেলে এভারেস্ট শৃংগ জয় করার মতো ঘটনা। বরপেটা থেকে বিকেল বেলা বাসে চড়ার জন্য আমি রাত ছটা
সাতটায় গিয়ে গুয়াহাটির মাছখোয়া পৌঁছেছিলাম। মাছখোয়া থেকে বার আনা ভাড়া দিয়ে পানবাজার থানা হয়ে আজাদ
হোটেলে পৌঁছেছিলাম। সোজা গেলে লাগতো আট আনা। সোজা রাস্তায় নো-এণ্ট্রি ছিলো, তাই রিক্সা পানবাজার থানা
হয়ে আজাদ হোটেল পৌঁছেছিলো।
তখন এখানকার মতো ফোনের সুবিধা ছিল না। আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফোনের সুবিধা হয়েছে বলতে গেলে আশীর
দশকের শেষ ভাগ থেকে। আমি প্রথম ফোনের ব্যবস্থা
দেখেছিলাম আমারই সহপাঠি গড়লা হাইস্কুলের শিক্ষক আব্দুল হালিমের বাড়িতে। ল্যাণ্ড ফোন। মোবাইলতো এসেছে অনেক পরে। আমাদের ভারতে প্রথম মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন পশ্চিম বংগের
মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুই ১১৯৫ সালের ৩১ জুলাই। আসামে
মোবাইল ফোন এসেছে ২০০৩ সালের মাঝামাঝি থেকে। তাই ফোনের ব্যবস্থা
না থাকার দরুন আমি হানিফ মামাকে আমি আগে খবর দিয়ে যেতে পারিনি। আমি হোটেলে পৌঁছোনোর সময় হানিফ মামা কয়েকজন কাবুলিয়ালার
সাথে রসালাপে ব্যস্ত ছিলেন। তখন কাবুলিরা খুবই আসতেন আসামে। তাঁরা সুদের ব্যবসা করতেন। আমাদের
গ্রামেগঞ্জে এসেও তাঁরা সুদের ব্যবসা চালাতেন। যা হোক,
হানিফ মামা আমাকে দেখে আচরিত হয়ে কাবুলিদের ছেড়ে আমার সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে
পড়েছিলেন। তাঁর প্রথম কথা ছিলো- আরে আবুল! তুমি কোথা থেকে এলে? মিঞাভাই-বু(মানে বুবুজান) ভালো তো? এ আজ থেকে পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় আগের কথা। তবু আমার কথাগুলো স্পষ্ট মনে আছে। হয়তো বাংলা, মানে আমাদের ঘরুয়া তথা মাতৃভাষা বাংলায় কথা
বলার জন্য।
নিজের ভেবে
পরের জিনিষে হাত-
১৯৯৩ সালের কথা। আমাদের বাড়ি তখন রাণীর পাম। নদী ভাঙনের ফলে চার পাঁচবার বাড়ি স্থানান্তর
করতে হয়েছে। প্রথম বাড়ি
ভাঙনের পর জাহানারপার থেকে বাঘবর পাথারে উঠে এসেছিলাম। বাঘবর পাথার ভাঙনের কবলে পরার পর বাঘবর পাথার থেকে প্রথমে
আলীগাঁও বাজারে উঠে এসেছিলাম। আলীগাঁও বাজারে বাড়ি বানিয়ে
ছিলাম শিরাজুল হক মামার বাড়িতে। সেই বাড়ির জমি শিরাজুল হক
মামারো ছিল না। সেই জমি ছিলো আলীগাঁও বাজারের। মানে পরের জমি। তাই আলীগাঁও বাজারে এক বছর থাকার পর রাণীর পামে জমি কিনে
আলীগাঁও বাজার থেকে রাণীর পাম উঠে আসি। রাণীর পামে বাড়ি স্থানান্তর করার পরও সকাল বিকেল সব সময় আমরা
আলীগাঁও বাজারেই যেতাম, সকাল বেলা চা পান করার জন্য এবং বিকেল বেলা গল্পগুজব করে
অবসর সময় কাটানোর জন্য। আমাদের বাড়ির কাছেই পূর্ব দিকে
অল্প দূরেই মাণিকপুর বাজার ছিলো যদিও সেই বাজারে আমরা খুব কমই যেতাম। মাণিকপুর মঙ্গলবারে সপ্তাহিক হাট বসত। হাটে অবশ্য
তেমন লোক সমাগম হতনা। হাতে গোনা কিছু স্থানীয় লোক আসত
হাটে। বেচাকেনা হত
তরু-তরকারি, শাক-সব্জি, মাছ প্রভৃতি। বাজারের কাছেই ছিলো মাণিকপুর জনকল্যাণ হাই মাদ্রাসা। এখন অবশ্যে হাই মাদ্রাসাকে হাইস্কুলে রূপান্তর করা হয়েছে এবং ২০১৩ সালে হাইস্কুল প্রাদেশিকরণ হয়েছে। হাইস্কুলটা বাজারের নিকটে ছিলো। স্কুলের
সামনে খেলার ফিল্ড ছিলো এবং স্কুল ফিল্ডের ঠিক উত্তর পাশেই বাজারটা ছিলো। ফিল্ডে বিকেল বেলা প্রায় নিয়মিত ভলিবল খেলা হত। হাটের দিন আমরাও মাঝেমধ্যে গিয়ে ভলিবল খেলতাম।
ঘটনার দিনও
আমি হাটে গিয়েছিলাম। অবশ্যে হাটের উদ্দেশ্যে নয়, ভলিবল
খেলার উদ্দেশ্যে। ভলিবল খেলে বাড়ি ফেরার সময় ঘটেছিলো ঘটনাটি। ঘটনা না বলে
দুর্ঘটনা বলাটাই ভালো হবে। ঘটনাটা ভেঙে বলি। আমি সাইকেল
নিয়ে গিয়েছিলাম। সাইকেলটা ফিল্ডের পাশে রেখে ভলিবল খেলছিলাম। খেলা শেষে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় ঘটলো দুর্ঘটনাটা। আমি যখন সাইকেল রেখে গিয়েছিলাম তখন সেখানে দুই চারটা
সাইকেল ছিলো। ইতিমধ্যে একদল পুলিশ এসে সেখানে সাইকেল রেখে পাশেই একটি
দোকানে চা খেতে গিয়েছিলো। তাই সেখানে বেশ কয়টি সাইকেল
স্ট্যাণ্ড করা ছিলো। আমি আমার সাইকেল নিয়ে কিছুদূর
আসার পর একজন পুলিশ এসআই পেছন থেকে ডেকে বললেন-মশায়, যাচ্ছেন নাকি?
প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি আমায় ডেকেছে বলে। তাই সেই ডাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে সাইকেলে উঠতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় এসআই সাহেব আবার বললেন- আপনি সাইকেলটা একটু লক্ষ্য
করুন।
তখন ভাবলাম, এসআই মহাশয় মনে হয় আমাকেই বলেছেন। যেহেতু আমিই সাইকেল নিয়ে যাচ্ছি। তখন সাইকেলের প্রতি লক্ষ্য করে দেখি সাইকেলটা আমার নয়। আমারটাও রেলি সাইকেল ছিলো, সেটাও রেলি সাইকেল ছিলো। তবে পার্থক্য এটুকুই ছিলো যে, সাইকেলটার সামনে একটা ছোট
ব্যাগ ঝুলানো ছিলো, আমার সাইকেলে কোন ব্যাগ ছিল না। তার মানে আমি
ভুলক্রমে আমার সাইকেল রেখে পুলিশের সাইকেল নিয়ে যাচ্ছি। ভুলটা ধরতে পেরে আমি সাথে সাথেই ফিরে এসে পুলিশের সাইকেলটা
রেখে আমার সাইকেল নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। আসার সময় কাচুমাচু মুখ করে এসআই সাহেবেকে উদ্দেশ্যে করে
বললাম- ছরি, এক রকম সাইকেলের জন্য ভুল হয়েছিলো। তখন এসআই লোকটি বললেন- ও কিচ্ছু না। এরকম ভুল হতেই পারে। আমি মনে মনে বললাম- ভুল হওযাটা স্বাভাবিক, তাই বলে পুলিশের
সাইকেল নিয়ে ভুল! এটা মানা যায় না।
ভুল দিক নির্ণয়-
আমার
মতো ভুল মনে হয় সবারই হয়। দিক নির্ণয় নিয়ে ভুল। পূবকে পশ্চিম, পশ্চিমকে পূব বলা আর কি! আমি কয়েকবার দিক ভুলের ফাঁদে পড়েছি। বিশেষ করে
রাতে কোন জায়গায় গেলেই বেশি দিক ভুল হয়। বিশেষ করে শহরে গেলে।
আগেই বলেছি, আমি ম্যাট্রিক পাশ করেছিলাম ১৯৭১ সালে। নাম ভর্তি করেছিলাম বিজ্ঞান
স্ট্রীমে। বিজ্ঞান স্ট্রীমের সব বই তখন বরপেটায় সূলভ ছিল না। গুয়াহাটী থেকে বই আনতে হত। নিজে যাওয়ার অবশ্যে
প্রয়োজন হত না। বইয়ের দোকানীকে বললেই এনে দিত। আমি তখনও গুয়াহাটী যাইনি। তাই গুয়াহাটী যাওয়ার খুব ইচ্ছে। গুয়াহাটী হানিফ মামা থাকেন। আজাদ হোটেলের ম্যানেজার। হানিফ মামা আমাদের নিজের মামা নয়। এক সময় হামিফ মামা, মামাদের বাড়ি লজিং ছিলো, সেই সুবাদে
মামা। এই বিষয়ে আগেই বিশদভাবে বলেছি, তাই এখানে বিশদ বললাম না।
বই কেনার
জন্য গুয়াহাটী যাচ্ছিলাম। যে কারণেই হোক, আমি বিকেল বেলা রওয়ানা দিয়েছিলাম। তখন গুয়াহাটী যাওয়ার জন্য দুইটি রাস্তা ছিলো। একটি ছিলো
নলবারী হয়ে এবং অপরপটি ছিলো মোকালমুয়া হয়ে। নলবারী হয়ে গেলে ভাড়া ছিলো পাঁচ টাকা এবং মোকালমুয়া হয়ে
ভাড়া লগত সাড়ে তিন টাকা। তখন গাড়ীর ছিট এখনকার মতো ছিল না। মাঝে বেড়া ছিলো। বেড়ার সামনে কয়েকটা ছিট ছিলো এবং বেড়ার পেছনেই বেশির ভাগ
ছিট ছিলো। সামনে এবং
পেছনে বসার জন্য ভাড়া আবার দুই রকমের ছিলো। নলবারী হয়ে গেলে সামনে বসলে ভাড়া লাগত পাঁচ টাকা এবং
পেছনে বসলে লাগত সাড়ে চার টাকা। এদিকে মোকামুয়া হয়ে গেলে সামনে
বসলে ভাড়া লাগত সাড়ে তিন টাকা এবং পেছনে বসলে লাগত তিন টাকা। মোকালমুয়া হয়ে গেলে রাস্তা ভালো ছিল না, তাই ভাড়া বেশি
লাগলেও সবাই নলবারী হয়েই তখন গুয়াহাটী যাওয়া আসা করত। আমি সেদিন নলবারী হয়েই গুয়াহাটী যাচ্ছিলাম। গুয়াহাটী পৌঁছোতে রাত হয়ে গিয়েছিলো। রাত মানে সন্ধ্যে সাত বা সাড়ে সাতটা হবে আর কি! বাস থেকে নেমে রিক্সার কাছে গেলাম। তখন গুয়াহাটীতে
এখনকার মতো আমাদের মুসলমান
রিক্সাওয়ালা ছিল না। সবই ছিল বেহারী রিক্সাওয়ালা। রিক্সার কাছে গেলে রিক্সাওয়ালা বলল- সরাসরি লাখটকীয়া গেলে
আজাদ হোটেল কাছে হত, আট আনা ভাড়া দিলেই হত। কিন্তু এখন সেই রাস্তায় নো এণ্ট্রি দিয়েছে, তাই পানবাজার
হয়ে যেতে হবে। ভাড়া বার আনা লাগবে। অগত্যা বার আনা দিয়েই আজাদ হোটেলে গেলাম। আমায় দেখে মামা যেরকম আচরণ করেছিলো, তা আগেই বলেছি।
কিন্তু
রাতে যাওয়ার জন্যই মনে হয় আমার দিক ভুল হয়ে গেল। আজাদ হোটেলের পেছন অর্থাৎ দক্ষিণ দিক দিয়ে রেল যায়। আমার মনে হতে লাগল আজাদ হোটেলের পশ্চিম দিক দিয়ে রেল যায়। লাখটকীয়ার ফেন্সি বাজার থেকে আজাদ হোটেলের দিকে যে রাস্তা
উঠে এসেছে, সেই রাস্তা আসলে পূব দিকে উঠে এসেছে, আমার কাছে এখনও মনে হয় দক্ষিণ
দিকে উঠে এসেছে। আমি পরে এই
ভুল শোধরানোর জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু শোধরাতে পারিনি। আমার সেই দিক
নির্ণয় ভুলটা এখনও রয়ে গেছে।
এই দিক ভুল হওযার কারণ হলো ব্রহ্মপুত্র নদ। আমরা সচরাচর জানি ব্রহ্মপুত্র নদ পূব থেকে পশ্চিম দিকে
প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু গুয়াহাটীর ঐ জায়গাটায় নদ খানিকটা উত্তর থেকে দক্ষিণ
দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। যার জন্য আমাদের অনেকেরই দিক নির্ণয়ে এই ভুলটা হয়।
আরেক জায়গায় আমার দিক নির্ণয়ে ভুল হয়েছিলো। যে ভুল আমি অনেক চেষ্টা করেও
শোধরাতে পারিনি। আমি ১৯৭৫ সালে রঙিয়াতে বেসিক ট্রেইনিঙে ছিলাম। আমি মনে হয় জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখে রঙিয়া গিয়েছিলাম। কারণ ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিলো। বারটা মনে হয় ছিলো শুক্রবার। আমি বেসিক সেণ্টার পৌঁছোতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিলো। এই ধরুন আটটা সোয়া আটটা হবে আর কি। এডিআইর কথা মতোই আমি
ফেব্রুয়ারির এক তারিখে রঙিয়া বেসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছেছিলাম। এতো সঠিক সময়ে সেণ্টারে পৌঁছোনোরও
কারণ ছিলো। কারণটা একটু বিস্তারিত বলি। আমি
স্থায়ীপদের (পারমানেণ্ট) চাকরিতে যোগদান করেছিলাম ১৯৭৪ সালের জানুয়ারির চার তারিখে।
চাকরি যখন করতেই হবে তখন যত তাড়াতাড়ি ট্রেনিং নিয়ে আসা যায় ততই মংগল। তাই
আমি আমাদের কেন্দ্র সম্পাদক রবিউল্ল্যাহ সাহেবকে বলে রেখেছিলাম ট্রেনিঙে লোক
পাঠালে যেন আমাকে খবর দেওয়া হয়।
তখন বাৎসরিক পরীক্ষা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শেষ হতো। তারপর ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে শুরু করে ৩১ তারিখের ভেতরে রেজাল্ট ঘোষণা কৰা হতো। ১৯৭৪ সালের বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রেজাল্টও
ঘোষণা করা হযেছিলো। এর মধ্যে একদিন খবর পেলাম শিক্ষকদের বেসিক ট্রেংনিঙে
পাঠাবে।
খবর দিলেন আমাদের কেন্দ্র সম্পাদক রবিউল্যা স্যার। তখন আমাদের ১ নং মন্দিয়া সাৰ্কেলের স্কুল এসআই ছিলেন ধর্মেশ্বর শর্মা। স্কুল
এসআইদের তখন খুব ক্ষমতা ছিলো। বদলি, ট্রেনিঙে পাঠানো কাজগুলি এসআই সাহেবই
করতেন। ডিআই সাহেবেরও অনেক ক্ষমতা
ছিলো। তিনি এপইণ্টমেণ্ট দিতে
পারতেন। তাই আমি বরপেটা গিয়ে ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি বললেন-
আপনার নামও আমি লিষ্টে দিয়েছি। দেখা যাক কি হয়!
আমি বললাম- স্যার, যেভাবেই হোক, আমাকে
প্রশিক্ষণে পাঠাতে হবে।
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- নিশ্চিন্ত থাকুন। প্রশিক্ষণে যেতে পারবেন।
একদিন খবর পেলাম প্রশিক্ষণের চূড়ান্ত তালিকা বের হয়েছে। তাই খবর নেওয়ার জন্য বরপেটা এলাম। বরপেটা এসে দেখি প্রশিক্ষণের তালিকা (লিস্ট) বেড়িয়েছে ঠিকই, তবে সেই তালিকায় আমার নাম নেই।
আমি তখনই ধর্মেশ্বর শর্মার সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম- লিষ্টে
আমার নাম নেই, স্যার।
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- হ্যাঁ, লিষ্ট
আমিও দেখেছি। আমিতো নাম দিয়েছিলাম। ডি, আই স্যার সম্ভবতঃ নাম কেটে দিযেছে।
আমি বললাম- এখন কি হবে, স্যার?
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- সামনের বছর পাঠিয়ে দিব। চিন্তা করবেন না।
আমি বললাম-না, এই বৎসরই পাঠাতে হবে, স্যার।
লিষ্ট বেড়িয়ে গেছে। ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- এখন আর উপায় নেই।
আমি খুব পীড়াপীড়ি করতে লাগলাম। তখন ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- আচ্ছা, চলুন, এডিশ্বনাল ডি, আই স্যারের কাছে গিয়ে দেখি কিছু করতে পারি কি-না।কারণ তখন
ট্ৰেইনিঙে পাঠানোর দাযিত্বে ছিলেন এডিআই।
এডিশ্বনাল ডি, আইর কাছে গিয়ে কথাটা বলাতে তিনি বললেন- লিষ্ট
বেড়িয়ে গেছে। এখন কি করে সম্ভব?
ধর্মেশ্বর শর্মা বললেন- দেখুন কিছু করা যায় কিনা। আমাকে খুব জোর
দিয়ে ধরেছে।
এটা ওটা অনেক কথার পর এডিশ্বনাল ডি, আই
কেরানিকে প্রশিক্ষণের তালিকা নিয়ে আসতে বললেন। কেরানি প্রশিক্ষণের তালিকা নিয়ে
এল। তখন ছেঙা, হাউলি, রঙিয়া, কোকরাঝার, মির্জা প্রভৃতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বরপেটা মহকুমার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের
জন্য পাঠানো হত। একটা অর্ডারেই সবার নাম থাকত। এডিশ্বনাল ডি, আই রঙিয়া বেসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাদের নাম পাঠিয়ে ছিল তাদের
একেবারে নিচে আমার নাম হাত দিয়ে লিখে কেরানিকে বললেন- যান, লেটু করে কপি বের করে নিয়ে আসুন। এক্ষুণি আনবেন।(বিঃ দ্ৰঃ-আমার কাছে
এখনও সেই অর্ডারের কপি আছে। সেখানে আমার নামটা হাত দিয়ে লিখা রয়েছে।)
তখন এখনকার মতো ফটোষ্টেট অথবা ডিটিপির সুবিধা ছিল না। তাই কোনো
অর্ডার প্রথমে টাইপ করা হতো এবং সেই টাইপ করা অর্ডারে অফিসারের দস্তখত হওয়ার পরে ‘লেটু’ করে প্রয়োজনীয় কপি বের করা হতো।
কেরানি তৎক্ষণাৎ লেটু করে কপি বের করে এনে এ ডি, আই স্যারের হাতে দিল। এ ডি, আই স্যার একটা কপি
আমার হাতে দিয়ে বললেন- যান, ফেব্রুয়ারির এক তারিখে রঙিয়া গিয়ে জইন করবেন।তাই এডিআইর কথামতোই আমি সঠিক
সময়ে জইন করার উদ্দেশ্যে জানুয়ারির ৩১ তারিখে রঙিয়া গিয়েছিলাম।
প্রশিক্ষণ
কেন্দ্র পৌঁছোতে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো। সেদিন আমরা মাত্র চারজন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছেছিলাম । সেদিন
আমার মতো আরও তিনজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ
কেন্দ্রে এসেছিলেন। টঙ্কেশ্বর বরা, হিলারিউস এক্কা এবং
মিনারাম পাটর। তিন জনই নগাঁও জেলার লোক ছিলেন। টঙ্কেশ্বর
বরা (চাপানালা), হিলারিউস এক্কা (হাতীগাঁও চাহ বাগান, মিচা) এবং মিনারাম পাটর ১ নম্বর কাকীর লোক ছিলেন।
পরের দিন সকালে উঠে আমি উত্তরকে পশ্চিম এবং
পূবকে দক্ষিণ বলতে লাগলাম। আমাদের প্রার্থনা হলটা ছিলো আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে। আমার সব সময় মনে হতো প্রার্থনা হলটা পর্শিক্ষণ কেন্দ্রের
পূব পাশে অবস্থিত। এক বছর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছিলাম। খুব চেষ্টা করেছি দিক ঠিক করার
জন্য, কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পারিনি।
আমি সিআরসিসি হিসাবে কাজে যোগদান করেছিলাম ২০০৩
সালের ডিসেম্বর মাসে। আমার ক্লাস্টার এলেকায় সরকারী এবং প্রাইভেট সহ মোট ৩৭ টা স্কুল ছিলো। তাই স্কুল
খোলা থাকলে দৈনিক কমেও দুই তিনটা করে স্কুল
পরিদর্শন করতে হতো। আমার ক্লাস্টার এলেকা দক্ষিণ-পশ্চিমে জাহোরপাম থেকে পূবে পাকা বেতবারী ও ডঙ্গরকুছি
পর্যন্ত বিস্তৃত স্কুল ছিলো। এমনিতে সব ঠিকই ছিলো, কিন্তু
ডঙ্গরকুছি স্কুলে যাওয়ার সময় আমার দিক নির্ণয় ভুল হতো। আমি আসলে বরপেটা-বরপেটারোড রাস্তা
থেকে ডঙ্গরকুছি রাস্তায় উঠে পূব দিকে যেতাম, কিন্তু আমার কাছে মনে হতো আমি উত্তর
দিকে যাচ্ছি। আমার এলেকাধীন দেউরিকুছিতে দুটি স্কুল ছিলো। ১৮৫২ নং দেউরিকুছু প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং৪৪৫ নং দেউরিকুছি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুল দুটি ডঙ্গরকুছি থেকে একটু
উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে অবস্থিত ছিলো। একদিন ১৮৫২ নং দেউরিকুছি স্কুল থেকে চক কোণাচা
সরাসরি ডঙ্গরকুছির দিকে আসার পর
একটি রাস্তায় উঠলাম। রাস্তাটা ঠিক পূব-পশ্চিম দিকে প্রসারিত। ভাবলাম, এ রাস্তাটাতো কোনদিন দেখনি। এই রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে গেলে কলনী বাজারে গিয়ে উঠতে হবে। কিন্তু আমায় যেতে হবে পূব দিকে
বরপেটা। তাই আমি পশ্চিম দিকে না গিয়ে পূব
দিকে এলাম। কিছুদর আসার পর বুঝতে পারলাম, এটা নতুন কোন রাস্তা নয়,
ডঙ্গরকুছির রাস্তা। ঘটনাটা বুঝতে পারলেও আর ঘূরে পশ্চিম দিকে এলাম না। সরাসরি গিয়ে ডঙ্গরকুছি স্কুলে
গেলাম। সেদিন বুঝতে পারলাম লোকে যে বলে, ডঙ্গরকুছি যেতে হলে বরপেটা-বরপেটারোড
রাস্তা থেকে পূব দিকে যেতে হয়, সেদিন তার প্রমাণ পেয়েছিলাম। কিন্তু তবুও আমি পরে সঠিক দিক নির্ণয় করতে পারিনি। আগের মতোই মনে হতো, পূব দিকে নয়,
আমি উত্তর দিকে যাচ্ছি।
আমার বড় ছেলে ছোহরাব আলী আহমেদ ধুবুরী জেলার পূব
প্রান্তের একেবারে শেষ সীমা রঙামাটি অঞ্চলের কঠালবারী প্রাইমারী বিদ্যালয়ে
শিক্ষকতা করে। টেট শিক্ষক। ২০১২ সালে নিযুক্তি পেয়েছে। আগে ভাড়াঘরে থাকতো, এখন জমি কিনে
নিজস্ব বাড়ি করেছে। বাড়ি করেছে রঙামাটি বাজারের নিকটে, বাজার থেকে একটু
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। সেখানেও আমার দিক নিৰ্ণয়ে ভুল হয়। দক্ষিণকে মনে হয় পশ্চিম এবং পশ্চিমকে মনে উত্তর। অনেক চেষ্টা করেও এই দিক ঠিক করতে
পারিনি। এই দিক নির্ণয় ভুলের কারণ হলো, আমরা যখন বরপেটা রোড থেকে ৩৭ নং রাষ্ট্রীয় রাস্তা ধরে ধুবুরীর দিকে যাই তখন মনে হয়
আমরা সোজা পশ্চিম দিকে যাচ্ছি। কিন্তু প্রকৃতার্থে লাহে লাহে আমরা কিছু দক্ষিণ-পশ্চিম
দিকে যাই। ধুবুরী বরপেটা রোড থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে নয়, একটু
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। রঙামাটি যেতে হলে বহলপুর থেকে পশ্চিম দিকে যেতে হয, কিন্তু
ধুবুরীর দিকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছি ভেবে মনে হয়, আমরা বহলপুর থেকে উত্তর দিকে উঠে
যাচ্ছি। ভুল দিক নির্ণয়ের কারণ এখানেই। সব কিছু জেনেও অনেক চেষ্টা করেও
এখন পর্যন্ত সঠিক দিক নির্ণয় করতে পারিনি। কারণ আমার অবচেতন মনে ধুবুরী
বরপেটা রোড থেকে পশ্চিম দিকে বলে মনে গেঁথে আছে। যার কারণে আট দশ বছরেও সঠিক দিক
নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষকের
সাথে অযথা তর্ক-
পূর্বে
ছোট ক-মান, বড় ক-মান, খ-মান, প্রথম মান, দ্বিতীয় মান এবং তৃতীয় মান হিসেবে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শ্রেণী ছিলো। ১৯৬২ সালে আমি প্রথম শ্রেণীর ছাত্র
ছিলাম। তখন আমাদের বিদ্যালয়ে দুজন শিক্ষক
ছিলেন। হেড স্যার ফজর আলী আহমেদ এবং সহকারী শিক্ষক হোসেন আলী
স্যার। ১৯৬২ সালে হোসেন আলী স্যার গুরুকূল
ট্রেইনিঙে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর ছুটীর পোষ্টে যোগদান করেছিলেন বরবালার আলতাব হোসন
স্যার। সেবারই আমাদের বিদ্যালয় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পতিত
হয়েছিলো এবং বিদ্যালয় স্থানান্তর করে আমাদের খালু সুলতান মিয়ার বাড়িতে অবস্থিত একটি
পরিত্যক্ত গৃহে কয়েকদিন পাঠদান করেছিলেন। তখন আমি ‘বিপরীত’ শব্দটা নিয়ে আলতাব হোসেন স্যারের
সাথে অযথা তর্ক লিপ্ত হয়েছিলাম। তর্ক করার সাহস পেয়েছিলাম হয়তো তিনি নতুন শিক্ষক ছিলেন বলে। হোসেন আলী স্যার থাকলে অবশ্যেই
তর্ক করার দুঃসাহস করতাম না। আলতাব হোসেন স্যার বিপরীত শব্দের অর্থ বললেন
ওল্টা, বিরুদ্ধ। আমি বললাম, না স্যার বিপরীত শব্দের অর্থ হবে মস্ত বড়। আমি যুক্তি দিলাম- স্বাভাবিকের
চেয়ে বড় সাপ দেখলে আমরা বলি বিপরীত বড় সাপ। সেই হিসেবে বিপরীত শব্দের অর্থ
মস্ত বড়ই হবে। স্যার আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন, না বিপরীত মানে ওল্টা
অর্থাৎ য়েরকম আছে তার বিপরীত। যেমুন দিনের বিপরীত রাত, গরমের বিপরীত শীত। স্যার এরকম অনেক উদাহরণ দিয়ে
বিপরীত শব্দের অর্থ বুঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমি তাঁর কথা কোনভাবেই মেনে
নিলাম না। কিছুদিন পরে অবশ্যে আমি কথাটা বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছিলাম। কিন্তু আমি তর্ক করার কিছুদিন পরেই
তিনি বিদ্যালয় থেকে চলে এসেছিলেন। কারণ তিনি দশ মাসের জন্য হোসেন আলী স্যারের ছুটীর পোস্টে
যোগদান করেছিলেন। হোসেন আলী স্যার ট্রেইনিং শেষে
বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর আলতাব হোসেন স্যার চলে এসেছিলেন। আলতাব হোসেন স্যার ১৯৮৪
সালের ৩০ ডিসেম্বর পরপারে চলে গেছেন এবং আমি
অনুশোচনার পাহাড় বুকে নিয়ে পরপারের অপেক্ষায় বসে আছি। স্যারের সাথে অযথা তর্ক করেছিলাম,
তার কাছে ক্ষমা চাওয়া হল না, কীযে
দুৰ্ভাগ্য আমার!
স্কুল ছুটি
১৯৬৯ সাল। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। সেদিন স্কুলের একেবারে শেষ পর্যায়। ষষ্ঠ পিরিয়ড শেষ হয়েছে। সপ্তম পিরিয়ডে কোন কোন ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ
করেছে, আবার কোন কোন ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ করেন নি। আমাদের ক্লাসে তখনও শিক্ষক প্রবেশ করেন নি। আমি সেদিন প্রথম বেঞ্চে দরজার কাছে বসেছিলাম। তাই শিক্ষক আসেনি বলে আমি
শ্রেণীকোঠার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের
বিদ্যালয় গৃহটা এল প্যাটার্ন ছিলো। পূব-পশ্চিম বরাবর একটি গৃহ এবং
উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটি গৃহ।
পূব-পশ্চিম বরাবর গৃহটি দৈর্ঘে একটু বড় ছিলো। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর গৃহে একেবারে
দক্ষিণ প্রান্তে ছিলো গার্লচ কমন রুম, গার্লচ কমনরুমের পরে শিক্ষক কমনরুম এবং লাইব্ৰেরী, তারপর দশম শ্রেণীর কোঠা, দশম শ্রেণীর
শ্রেণী কোঠার পরে চতুর্থ শ্রেণী(বি সেকশন)র শ্রেণী কোঠা। এদিকে পূব-পশ্চিমের লম্বালম্বি গৃহটির
একেবারে পশ্চিম প্রান্তে ছিলো পঞ্চম শ্রেণী, তারপর ষষ্ঠ শ্রেণী, ষষ্ঠ শ্রেণীর পরে
চতুর্থ শ্রেণী(এ সেকসন), চতুর্থ শ্রেণীর পরে সপ্তম শ্রেণী, তারপর নবম শ্রেণী, নবম
শ্রেণীর পরে অষ্টম শ্রেণী। চতুর্থ
শ্রেণীর শ্রেণী কোঠার সাথে দক্ষিণ পাশে সংলগ্ন ছিলো হেড স্যারের ছোট একটি কমনরুম। চতুর্থ শ্রেণীর শ্রেণী কোঠা এবং হেড স্যারের কমনরুমের মাঝে একটি পর্টিকো মতো ছিলো। সেই পর্টিকোতে বিদ্যালয়ের বেল
ঝুলানো থাকত। আমাদের স্কুলের চৌকিদার পেস্কার আলী প্রতিটি পিরিয়ড
শেষে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে সেই বেল বাজাত। যে কয়টা পিরিয়ড শেষ
হত, বেলে সেই কয়টা টোকা দিত- ঢং ঢং ঢং……। সেদিন ষষ্ঠ পিরিয়ডের বেল বাজিয়ে
পেস্কার আলী হাতুড়িটা হাতে নিয়ে বেলের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বেল বাজানোর পর কোন
কোন ক্লাসে শিক্ষক গিয়েছেন, আবার কোন কোন
ক্লাসে শিক্ষক যাননি। যাইতেছেন। আগেই বলেছি
আমাদের
ক্লাসে তখনও শিক্ষক আসেন নি। পেস্কারকে
বেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে তার কাছ থেকে হাতুড়িটা হাতে নিয়ে বললাম- পেস্কার ভাই, তুমি কেমনে বেল বাজাও? আমি বাজাতে পারব না?
পেস্কার আলী বলল- পারবে না কেন? বাজানো তো সোজা। এরকম ঢং ঢং ঢং করে বাজালেই হল। পেস্কার আলী হাতুড়িটা বেলের কাছে নিয়ে বাজানোর
মুদ্রাটা করে দেখাল।
বিষম কালে হত বুদ্ধি। আমারও তাই হল। আমি কাল
বিলম্ব না করে বেল বাজাতে লাগলাম। ঘন ঘন টোকা। ঢং ঢং ঢং! মানে স্কুল ছুটির টোকা।
স্কুল ছুটি হয়েছে বলে শিক্ষকরা শ্রেণী কোঠা থেকে বেড়িয়ে এলেন। সাথে সাথে ছাত্ররাও বেড়িয়ে এল
হইহুল্লোড় করে। আমি হতভম্ভ! কি করলাম
আমি? স্কুল ছুটি দিয়ে ফেললাম নাকি? এখন কি হবে? এবার পিঠে বেতের সপাৎ সপাৎ কোপ পড়বে নিশ্চয়!
হেড স্যারের কমন রোমের সাথেই ছিল স্কুলের
বেলটা। বেলের ঢং
ঢং ঢং ছুটির শব্দ শুনে হেড স্যার বেড়িয়ে এলেন হন্তদন্ত হয়ে- কে, কে ছুটি দিল?
পেস্কার আলী ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল। হেড স্যার কালবিলম্ব না করে সোজা এসে আমার কানে ধরলেন। কানে ধরলেন তো ধরলেনই। কিছুই বলছেন না। কিছুক্ষণ মৌন হয়ে
দাঁড়িয়ে থেকে বললেন- বাপু, কি করলে তুমি? এমন কাজ আর করবে না। এভাবে বলেই আমার কান ছেড়ে দিয়ে পেস্কারকে বললেন- যাও। বল, স্কুল ছুটি হয়নি। সবাইকে ক্লাসে আসতে বল।
পেস্কার আলী ছাত্রদের ডেকে ডেকে বলতে লাগল-
স্কুল ছুটি হয়নি। সবাই ক্লাসে যাও।
যারা স্কুলের বাউণ্ডারি(চৌহদ্দি)র ভেতরে ছিল তারা আবার ক্লাসে ফিরে এল আর যারা বাউণ্ডারির বাইরে চলে গিয়েছিল তাদের দুই একজন ফিরে এল যদিও অনেকে ফিরে এল না। সেই স্মৃতি ছাপান্ন, সাতান্ন বছর
পরেও আমি ভুলতে পারিনি।
সেবার
নয় ডাক্তারদের এখন ব্যবসায়িক মনোভাব
আমরা কমবেশি সব মানুষই কোন না কোন
এক সময়ে ডাক্তরের শরণাপন্ন হয়েছি।
ডাক্তারদের অনেকে বেশি বেশি আবার অনেকে খুব কম ওষুধ প্রেচক্রিপশন করেন। আমার মতে বরপেটার সবচেয়ে কম ওষুধ
প্রেচক্রিপশন করা ডাক্তার ছিলেন স্বর্গীয় ডাঃ ধরণীধর দাস। তিনি সব সময় কম ওষুধ লিখতেন। তিনটা ওষুধের বেশি তিনি লিখতেন
না। তাঁর কাছে আমি নিজে কয়েকবার চিকিৎসা
হয়েছি।অন্তত আমার চিকিৎসার ক্ষেত্রে
তিনি তিনটার বেশি ওষুধ কোনদিন লিখেন নি।
আমি আজ এমন একজন ডাক্তারের কথা বলব,
যিনি বেশি ওষুধ লিখেন বলে দুর্নাম ছিলো। প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা।আমার শ্যালক হাসমত আলীর
এ্যানেমিয়ার মতো কিছু একটা হয়েছিলো।লালীর মতো
পায়খানা। সে নিরূপায় হয়ে সেই বেশি ওষুধ
লিখা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলো। ডাক্তার
রোগের বিবরণ শুনে বললেন- তোমার সাথে আর কে এসেছে?
হাসমত আলী একাই গিয়েছিলেন। তাই সে বললো- আমার সাথে কেউ
আসেনি। আমি একাই এসেছি।
ডাক্তার বললেন- কেমনে এসেছ,
রিক্সা নিয়ে?
হাসমত সাইকেল নিয়ে গিয়েছিলো? তাই সে বললো- না, সাইকেল
নিয়ে এসেছি।
ডাক্তার অবাক{ সাইকেল নিয়ে এসেছ
মানে? এটা কেমন করে সম্ভব? যাইহোক,
আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি, এখন তুমি রিক্সা করে যাবে। সাইকেলে চড়বে না।
হাসমত আর কি বলবে1সে মাথা নেড়ে
সন্মিত জানাল- হ্যাঁ, রিক্সা নিয়েই যাব।
ডাক্তার এক গাঁদি ওষুধের সাথে তিন
চারটে সেলাইন লিখে দিলেন।ভাগ্যিস্
তখন অত পরীক্ষার প্রচলন ছিল না। ডাক্তারা
চোখ দেখে, জিভা দেখে এবং রোগীর মুখে রোগের বিবরণ শুনে প্রেচক্রিপশন লিখতেন।এখনকার মতো পরীক্ষার সুবিধা থাকলে
হয়তো কয়েকটা পরীক্ষাও করতে দিতেন সেদিন!
হাসমত আলী ওষুধ নিয়ে ডাক্তারের
চেম্বার থেক বেড়িয়ে এসে চিন্তা করলেন, ডাক্তার আমাকে রিক্সা করে যেতে বললেন,
কিন্তু আমিতো সাইকেল চালিয়েই যেতে পারব। মিছেমিছি কেন রিক্সার টাকা ভরব!এভাবে ভেবে
সে সাইকেল চালিয়েই বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো।
বরপেটা থেকে তাদের বাড়ি যেতে প্রথম
আমাদের বাড়ি পরে। তাই সে আমাদের বাড়ি এসে ব্যাগ
থেকে সেলাইনের বোতল বের করে বললো-সেলাইন নিতে হবে। বলেন তো কাকে দিয়ে নিই?
ওষুধের বহর দেখে আমি বললাম-
ডাক্তার এতো ওষুধ দিয়েছে! তোমার অসুখ কি?
হাসমত আলী তখন অসুখের বিবরণের সাথে
সাথে ডাক্তার তার সাথে করা আচরণের কথাও ভেঙে বললো।
তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম- তোমার এখন
কেমন লাগতেছে?
তখন হাসমত বললো-খারাপ কিছুই না। তিন চার
বার লালীর মতো পায়খানা হয়েছিলো সেই প্রায় তিন চার ঘণ্টা আগে। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে আমার কোন পায়খানা হয়নি। বলতে গেলে এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। সাইকেলতো সাধারণ কথা, দৌরোতে বললে এখন আমি দৌরোতেও পারব।
তখন আমি বললাম- সেলাইন নিতে হবেনা। আজ রাত আমাদের এখানেই থাক।যদি বেশি কিছু অসুবিধা হয়, তখন
দেখা যাবে।
সে ভাত খেয়ে শোয়ে পড়লো। রাতে কিছুই হল না।দিনে কয়েকবার পায়খানা করার কারণে
শরীরটা একটু দুর্বল হয়েছিলো। তাই রাতে ঘুমও ভালো হলো। আমি পরের দিন তাকে অন্য একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। সেই ডাক্তার সামান্য কয়েকটা ওষুধ
লিখে দিলেন। সেই ওষুধ খেয়েই তার রোগ ভালো হয়ে
গেলো।আগের ডাক্তার যে ওষুধগুলি
লিখেছিলেন সেগুলি ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
ইদানীং সময়ের একটি ঘটনা বলি।বেশিদিন আগের কথা নয়, কয়েক মাস
আগের কথা। আমার নাতি চাকলিন আহমেদ একদিন
সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ এসে উপস্থিত। আমার বড় ছেলে সোহরাব আলীর ছেলে। আমার বড় ছেলে চাকরিসূত্রে
চাপরের রঙামাটি থাকে। সেখানে সে
জমি কিনে বাড়ি করেছে। নাতি নবম
শ্রেণীতে পড়ে। সচারচর সে একা আসে না। তার মা-বাবার সাথে আসে। কোন খবর না দিয়ে তাকে একা আসতে
দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম- দাদুভাই, এরকম একা এলেন যে! কারণ কি?
তখন নাতি বললো- আমার গলায় অসুবিধা
হয়েছে। ঢোক গিলতে গেলে বিষ করে। তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি।
গলায় কিছু একটা অসুবিধা হওয়ার কথা
আগেও শুনেছিলাম। সেই অসুবিধার জন্য বঙ্গাইগাঁয়-এ
ইতিমধ্যে ডাক্তার দেখানোর কথা আগেই শুনেছি। তাই এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
আমাদের মামত ভাই মাজিদুল ম্যাডিক্যাল
সেণ্টারে ফার্মাসি করে। পরের দিন
সকালে চাকলিন তার ফার্মাসিতে গেলো। মাজিদুল তাঁকে
বরপেটার একটি ব্যক্তিগত নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়ে ডাক্তর দেখালো। ডাক্তার এক গাদি মানে তিন হাজার
দুশ টাকার ওষুধ লিখে দিলেন এবং সাথে এক্সরে, সিটি স্ক্যান, এণ্ডুচকপি করতে দিলেন।
নাতি বাড়ি আসার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম- কি কি
ওষুধ লিখে দিলেন ডাক্তার? নাতি ওষুধ দেখালো এবং পরীক্ষা করতে দেওয়ার
কথা বললো।
ডাক্তারের কাণ্ড দেখে আমি ভাবলাম,
এতো ওষুধের পরে আমার এতোটা পরীক্ষা! ডাক্তারতো আসলে পরীক্ষা করেই
ওষুধ প্রেচক্রিপশন করা উচিত ছিলো! আমি সাথে সাথে সোহরাব আলীকে ফোন করে কথাটা বললাম।
তখন সোহরাব আলী বললো- কথাতো ঠিকই। ওষুধ লেখার পরে পরীক্ষা করতে
দেওয়াটা আমার মতেও মোটেই ঠিক হয়নি। এভাবে বলে সোহরাব বললো- তাহলে এখন
কি করতে বলব?
আমাদের মেজ ছেল শাহজাহানের বউ লাকীয়ারা
একটি নার্সিং হোমে কর্মরত। সে কাছেই
ছিলো। সে বললো- গলার ভাল একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার
আছে। কাল তাঁকে দেখালেই হবে।
সোহরাব আলীকে কথাটা বললাম। সে তখন বললো-
তাহলে তাই কর।
পরের দিন ছেলের বউ লাকীয়ারা চাকলিনকে
নিয়ে গিয়ে সেই ডাক্তার দেখালো। ডাক্তার
রোগী দেখে কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে বললেন- পনের দিনের ওষুধ দিলাম। ওষুধ খেয়ে যদি রোগ উপশম না হয়,
তাহলে এন্ডুসকপি করে আসবে। তখন এণ্ডুসকপি
দেখে ওষুধ লিখে দিব।
ডাক্তারের ওষুধ খেষে রোগ ভালো
হওয়াতো দূরের কথা রোগ বেশি হওয়াতে কয়েকদিন আগে সে গুয়াহাটী গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে
ওষুধ খেয়ে এখন তার রোগ ভালো হয়েছে। আগের
ডাক্তার দিয়েছিলেন গলব্লাডারের ওষুধ। গুয়াহাটীর
ডাক্তার গলার একটি সিরা কিছুটা ফুলেছে বলে ওষুধ দিয়েছেন।
ডাক্তারের আরেকটি চিকিৎসার কথা
বলব।ডাক্তারজন খুব নামী। অপারেশন করায় ওস্তাদ। সেই ডাক্তারই কয়েক বছর আগে একটি
মারাত্মক ভুল করেছিলেন। তাহলে কথাটা বুঝিয়ে বলি। আমাদের গ্রামে একটি ব্যক্তিগত
খণ্ডের বিদ্যালয় আছে। সানরাইজ
আ্যাকাডেমি। অঙ্কুর থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত
ক্লাস। একবার প্রথম শ্রেণীর একজন ছাত্র
দুষ্টুমি করতে গিয়ে একই শ্রেণীর একজন ছাত্রকে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত করেছিলো। ঘটনাটি ঘটেছিলো এভাবে-
আঘাতপ্রাপ্ত ছাত্রটি দাঁড়িয়েছিলো
এবং তার সহপাঠী ছাত্রটি একটি কাঠপেঞ্চিল তার বসার জায়গায় খাড়া করে ধরে রেখেছিলো। ছাত্রটি বসার সাথে সাথে
কাঠপেঞ্চিল তার নিতম্বের মাঝে গেঁথে পড়েছিলো। কাঠপেঞ্চিলটা সাথে সাথে বের
করলেও কিছুটা অংশ নিতম্বের মাঝে ভেঙে থেকে গিয়েছিলো। কাছেই শহর। তাই সাথে সাথে হাস্পতালে নিয়ে
গিয়েছিলো। ডাক্তার এক্সরে করে ভেতরে
কাঠপেঞ্চেলর ভাঙা টুকরো নেই বলে ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। পনের দিন ওষুধ খাওয়ার পরেও ঘাঁ
ভালো না হওয়াতে আবার ডাক্তারের কাছে যাওয়াতে ডাক্তার আবারও ওষুধ লিখে দিলেন। চার পাঁচদিন ওষুধ খাওয়ার পরেও
বিষ না কমাতে তখন অন্য একজন ডাক্তারের কাছে গিয়ে এক্সরে করার পর ভেতরে পেঞ্চিলের
টুকরো ধরা পরে এবং অপারেশন করে সেই পেঞ্চিলের টুকরো বের করে দেয়।
বলবো না আগের ডাক্তার ভালো ছিল না। ডাক্তার ভালোই ছিলো, তবে রোগীর
প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কম ছিলো।
এতক্ষণ ডাক্তারদের দোষের কথা
বললাম। এখন গুণের কথা বলি। ১৯৮৯ সাল। নদী
ভাঙনের জন্য আমাদের মাঝেমধ্যে বাড়ি স্থানান্তর করতে হয়েছে। আমি তখন রাণীরপামের বাসিন্দা। সকালে উঠে প্রাতকৃত্য সমাপন করে
হাতমুখ ধোয়ে আলীগাঁও বাজারে যাওয়াটা আমার দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে ছিলো। দুই চারজন তখন ঠাট্টা করে বলতও,
তোমরা সকালে জাগো শুধু বাজারে যাওয়ার জন্য।বাজার না থাকলে মনে হয় তোমরা সকালে জাগানাই
পেতে না। সত্যি ঝড়-বৃষ্টি যাই থাকক না
কেন, সকালে উঠে বাজারে গিয়ে তোতার চায়ের দোকানে চা না খেলে আমার পেটের ভাত হজম হত
না। আলীগাঁও বাজারে সকাল বেলা আলীগাঁও,
পালারপাম, রাণীরপাম, বরলি, মাণিকপুর, সারগাঁও প্রভৃতি গ্রামের লোক এসে জড়ো হতো। একদিন পালারপামের পলান নামের
একজন রাজবংশী লোকের সাথে পাশাপাশি বসে তোতার দোকানে চা খাচ্ছিলাম। দেখলাম পলানের গার (গর্দান)এর
মধ্যে চুলের একটু নিচে দাউদের মতো ঘাঁ।ঘাঁ দেখে
আমি জিজ্ঞেস করলাম- আপনার গারে দেখছি ঘাঁ। আপনারতো খুব অসুবিধা হয় মনে হয়!
পলান বললো- অসুবিধের কথা আর বলবেন। মাঝেমধ্যে চুলকায়। যখন চুলকায় তখন আমার হুঁস থাকে না।পাগলের মতো হয়ে যাই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম- চিকিৎসা করেন
নি?
পলান উষ্মার সাথে বললো- চিকিৎসা করিনি মানে! ডাক্তারী,
কবিরাজী সব ধরণের চিকিৎসাই করিয়েছি। কিন্তু
কোন ফল পাইনি। একেক সময় মনে কয় আগুন দিয়ে ঘাঁটা
পোরে ফেলি।
তখন আমার কোন অসুখবিসুখ হলে
গুয়াহাটীর দেবিচরণ চৌধুরীর শরণাপন্ন হতাম। তাই আমি বললাম- একদিন চলুন আপনাকে গুয়াহাটীর
দেবিচরণ চৌধুরীর কাছে নিয়ে যাব। খুব
নামকরা ডাক্তার। অভিজ্ঞতাও অনেক।১৯৫২ সালে এমবিবিএস পাস করেছে। গুয়াহাটী মেডিক্যাল কলেজের
প্রফেসর ছিলেন।এখন অবসর নিয়েছেন।
পলান বলল- তাহলে চলুন, কোনদিন
যাবেন। আমিতো কালই যেতে পারব। আপনি কোনদিন য়েতে পারেন সেদিন
গেলেই হলো।
তিনদিন পর পলানকে নিয়ে গুয়াহাটী
গেলাম। ডাক্তারের চেম্বার শিলপুখুরী। আদাবারী বাস থেকে নেমে সিটি বাসে
চড়ে শিলপুখুরী ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম। ডাক্তার দেখলাম। ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। মাত্র একটি ওষুধ। ডিডি মলম।ওষুধ দেখে পলান হতাশ। আমিও হতাশ। এতদূর বাসভাড়া দিয়ে এলাম শুধু
কী একটা ডি, ডি মলমের জন্য! কী আর করব। এমবিবিএস অভিজ্ঞ ডাক্তার। করার কি আছে!
আমি তখন পলানকে আমার নিজের জীবনে
ঘটে যাওয়া একটা উদাহরণ দিলাম। ১৯৭৩ সালের কথা। আমার সাইটিকা বিষ হয়েছিলো। নানা ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানোর পর হতাশ হয়ে গুয়াহাটী
গিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য। হানিফ মামার আজাদ হোটেলে গিয়ে উঠেছিলাম। পরের দিন হানিফ মামা একটি পরিচিত
রিক্সা ডেকে এনে প্রফেসর ডাক্তার আব্দুল হামিদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আব্দুল হামিদ তখন গুয়াহাটী
মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর। গুয়াহাটীর
নামকরা ডাক্তার। তখন তাঁর অন্য একটি পরিচয় ছিলো,
আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী
আহমেদ সাহেবের ভাতিজী জামাই হিসেবে।
ডাক্তার আমাকে দেখে দুই প্লেট
এক্সরে করার জন্য লিখে দিলেন। দুই প্লেট
এক্সরে করতে আমার খরচ হলো ৩২ টাকা। ডাক্তারের ফিস নিলেন পনের টাকা।
এক্সরে নিয়ে জমা দেওয়ার পর মাত্র বার টাকার
ওষুধ লিখে দিলেন। মরিচ খাওয়া নিষেধ করে দিলেন।অগত্যা মরিচ ছাড়া খেতে না পারলে, সামান্য গোলমরিচ দিয়ে তরকারী খেতে বললেন। সেই
ওষুধের মাঝে একপ্রকার ট্যাবলেট দিয়েছিলেন। সেই একেকটা ট্যাবলেটের দাম ছিলো মাত্র দশ
পয়সা করে। তবে একমাস ওষুধ খাওয়ার পর আমার
রোগ ভাল হয়েছিলো।
সেযাত্ৰা বাসভাড়া ৭ টকা নিয়ে
চিকিৎসা বাবদ আমার খরচ হযেছিলো মোট ৬৬ টাকা।
খাওয়া-দাওয়া, রিক্সাভাড়া ও অন্যান্য খরচ হানিফ মামাই বহন করেছিলেন। হানিফ মামা ২০১০ সালে এন্তেকাল করেছেন।
আমার সেই অভিজ্ঞতার কথা বলে আমি
বললাম- হাতুরে ডাক্তারতো নয়- এমবিবিএস ডাক্তার! ব্যবহার করে দেখেন কি হয়। ওষুধ কম
দামী হলেই যে রোগ ভালো হবেনা, এমন কথাতো কোথাও লেখা নেই!
বলতে গেল খারাপ মন নিয়ে সেদিনই বাড়ি চলে এলাম। সেই ডি,ডি মলম ব্যবহার করার পর পলানের ঘাঁ অবশ্যে ভালো হয়েছিলো।
ডাক্তারের
চিকিৎসা
সম্পর্কে এরকম অনেক ঘটনা আছে। সেগুলি সব
লিখতে গেলে ছোটখাট একটি বই হয়ে যাবে।
লেখামেলা প্ৰসংগ
ছোটবেলা
থেকেই আমি বই পড়ার প্রতি আসক্ত হয়েছিলাম। আমি যখন খ-মানে পড়ি তখন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আলীগাঁও অঞ্চলের
শিক্ষিত যুবকেরা আলীগাঁয় ‘রজনী প্রভাত’ নামে একটি লাইব্রেরী স্থাপন করেছিলেন। লাইব্রেরীটার কার্যালয় ছিলো মামাদের বাড়িতে। লাইব্রেরীতে
দু’টি আলমারি ভর্তি বই ছিল। লাইব্রেরী স্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের মামা সিরাজুল
হক এবং ফজল হকের প্রচুর অবদান ছিল। আরও যারা লাইব্রেরী স্থাপনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে আলীগাঁয়ের এলাহি বক্স, সিদ্দিকুর রহমান, তমছের আলী, মহির উদ্দিন, মানিক পুরের আজাহার আলী, আব্দুল করিম, আক্কাস আলী, আলমস আলী, চাচরার রজব আলী এবং দলাগাঁর আফসার আলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রজব আলী এবং আফসার আলী ম্যাট্রিক পাসের
পরেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে চলে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। শুনেছি, রজব আলী নাকি সেখানে সেনা
বাহিনীতে চাকরি করতেন এবং মেজর পদে
অভিষিক্ত হয়েছিলেন। আফসার আলীও ব্যাংকে উচ্চ পদে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন। আফসার আলী দশ বার বছর আগে বাংলাদেশ থেকে আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করতে আসাম এসেছিলেন এবং আমার সাথে দেখা করার জন্য একদিন আমাদের যতিগাঁয়ের বাড়ীও এসেছিলেন। সম্ভবত আমার চেয়ে দশ বার বছরের বড় হবেন তিনি। তিনি বলা মতে, আমার বিষয়ে ছোটবেলার অনেক কথাই মনে
আছে তাঁর।যাই হোক, লাইব্ৰেরীর সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই
ছাত্র ছিলেন। এরা বিভিন্ন জায়গায় জাইগীর থেকে
লেখা-পড়া করতেন। গরমের বন্ধের সময় যখন সবাই বাড়ী আসতেন, তখন মামাদের বাড়ি সরগরম হয়ে উঠত। তখন সবাই লাইব্রেরীর বই পড়তেন এবং কীভাবে গ্রামের উন্নতি করা
যায় সে নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। আফসার আলীর বাড়ী দলাগাঁয় হলেও
বন্ধের দিনগুলি তিনি মামাদের বাড়ীতেই কাটিয়ে দিতেন। আলীগাঁও থেকে দলাগাঁও চার পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে অবস্থিত ছিলো।
দলাগাঁও নিয়ে
আমার
একদিনের এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন বৈশাখ জৈষ্ঠ মাসে প্রায় সবাই ঘুড়ি উড়াত। চং, চিলা, পত্তিংগা প্রভৃতি।
চঙের মাথায় বেত মিহি করে বেঁধে দিত। কুম্ কুম্ শব্দ করে ডাকত
সেই বেত। তখন খেত নিড়ানোর সময়। খেতে খেতে কামলারা ক্ষেত নিড়াত এবং ধূয়া গান
গাইত। তার সাথে যোগ হত সেই চঙের বেতের ডাক! একেবারে সরগরম হয়ে উঠত
পরিবেশ।
আমরা ছোটরা
পত্তিংগা এবং চিলা উড়াতাম। মাঝে মাঝে চং বানানোর চেষ্টাও করতাম এবং দুই একটা বানাতামও, তবে সেই চং উড়ত না। কিছু সময় দৌড়া-দৌড়ি করে ভেঙে-মুচরে ফেলে
দিয়ে বাড়ী চলে আসতাম। একদিন অবশ্যে আমি বানানো একটি চং উড়েছিল। সেদিন সেকি আনন্দ! ছোট ছোট ছেলেদের কাছে আমি হিরো বনে গিয়েছিলাম
সেদিন। কিন্তু আমার সেই হিরোগিরি স্থায়ী হয়নি। তারপরে অনেক চং বানিয়েছি, কিন্তু একটি
চঙও আর উড়ে নি। তাই পত্তিংগা নিয়েই
সন্তুষ্ট থাকতে হত। কোন কোনদিন দিনে দুই তিনটি করেও পত্তিংগা বানাতম। কারণ কাগজের অভাব ছিল না। মামারা বৎসরের শেষে খাতার কাগজ বাড়িতে এনে রেখে দিতেন। সেই কাগজগুলিই পত্তিংগা বানানোর
কাজে ব্যবহার করতাম। তখনকার দিনে
বই-পত্রের মলাটের জন্য বাঁশ তাও(ঘি রঙের এক প্রকার কাগজ) ব্যবহার করত। পরে সেই বাঁশতাও দিয়েও পত্তিংগা বানাতাম। একটি পত্তিংগা বানাতে আধা তাও
বাঁশ তাও ব্যবহার করতাম। আধা তাওযের সেই পত্তিংগা নিয়ে একদিন একটি ঘটনা ঘটেছিলো।সেখানেই দলাগাঁয়ের প্রসংগ এসেছিলো।
আলীগাঁও
অঞ্চলের জমি ধান-পাটের জন্যে খুবই উপযোগি ছিল। এক কোমরের ওপড়ে জল হত না। প্রচুর
পাট এবং আমন ধান হত। তাই কৃষকদের সহায় করার জন্য আলীগাঁও প্রাইমারি স্কুলের পশ্চিম পাশে গ্রামসেবকদের থাকার জন্যে সরকার একটি আবাসগৃহ নির্মাণ করেছিল। সেই আবাসগৃহ নির্মাণের
সময় ঘটেছিলো ঘটনাটা। সেদিন আমি আধা তাও বাঁশতাও দিয়ে
পত্তিংগা বানিয়ে উড়াচ্ছিলাম। মামাত ভাই আব্দুর রহমানও ছিলো আমার সাথে। কিছু সময় ঘুড়ীটা উড়ানোর পর
ঘুড়ীর ডোরের কাঠিতে পাটকেল চাপা দিয়ে অন্য কিছু একটা খেলা খেলছিলাম। কি খেলছিলাম
তা এখন মনে নেই। হঠাৎ ঝাপটা বাতাস এসে পাটকেল চাপা থেকে কাঠিটা সরে গিয়ে ঘুড়ীটা ওপরে উঠতে লাগল।
বাতাস পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে বইছিল। তাই ঘুড়ীটা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। আমি
ঘুড়ীর পেছন পেছন দৌড়োতে লাগলাম।
তখনকার দিনে
আনারস মার্কা সূতার খুবই নাম-ডাক ছিল। চিকণ মিহি এবং খুব শক্ত ছিল সেই সূতা। এক গাড়ী সূতা কিনে এনে আমি আর
রহমান ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। আমার সুতাটুকু আমি একটা বাঁশের কাঠিতে পেঁচিয়ে
নিয়েছিলাম।বলা বাহুল্য, আমি সেই সূতা দিয়েই সেদিন ঘুড়ীটা
উড়াচ্ছিলাম। ঘুড়ী ওপড়ের দিকে উঠছে আর কাঠি থেকে সূতা খসে সূতার
কাঠিটা নিচের দিকে নেমে আসছে। এই ধরি, এই ধরি করে ঘুড়ির পেছনে ছুটতে
লাগলাম। রহমান কিছুদূর আমার সাথে দৌঁড়ে এসেছিল যদিও কিছুদুর আসার পর সে দাঁড়িয়ে
পড়ল। আমি ডাকলাম যদিও সে আর অগ্রসর হল না।আমি একাই ছুটতে লাগলাম ঘুড়ীর পেছনে। ছুটতে ছুটতে
দলাগাঁয়ের মাথাউরির মাথা পর্যন্ত গেলাম।(বহরি আলীরপাম হয়ে আসা মাথাউরিটা
দলাগাঁয় এসে শেষ হয়েছিল। মাথাউরির মাথা থেকে একটু পুব দিকেই মাথাউরির উত্তর পাশে তখন দলাগাঁয়ের শনিবারের হাট বসত। আমি মাঝে-মধ্যে
দলাগাঁয়ের সেই হাটে যেতাম। তাই রাস্তা-ঘাট আমার চেনা ছিল।) কিন্তু ঘুড়ীটা ধরতে
পারলাম না। বেলার দিকে চেয়ে দেখি বেলা বেশি নেই। একটু পরেই বেলাটা ডুববে। ডিমের কুসুমের মতো লাল হয়ে উঠেছে বেলা। বেলার অবস্থা দেখে আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে উঠলাম। তাই আর এগোতে সাহস হল না। হতাশ হয়ে ঘুড়ীর দিকে চেয়ে রইলাম।
ঘুড়ীটা একটু একটু করে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ঘুড়িটা এক সময় মেঘের আড়াল হয়ে আমার দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিফল মনোরথ হয়ে আমি সেখান থেকে বাড়ী ফিরে এলাম। বাড়ী ফিরতে সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, সেদিন নানীর গালাগাল শুনতে হয়েছিল।
ছুটির দিনে ছাত্ররা সবাই লাইব্রেরীর বই পড়তেন। অন্যান্য সময়ে গ্রামের কিছু বয়সিয়াল লোকেরা লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে পড়তেন। সেই বই
পড়ুয়েদের মধ্যে বাবর আলী(আমার খালাতো বোনের
জামাই)র কথা আমার বিশেষভাবে মনে আছে। মামারা যখন বাড়ি থাকতেন তখন লাইব্রেরীর চাবি
মামাদের কাছেই থাকত। মামারা বাড়ি না থাকলে লাইব্ররীর চাবি হানিফ মামার কাছে থাকত। একদিন বাবর আলী বই ফেরত দিতে এসে দেখে হানিফ মামা বাড়ি নেই। তখন কার
কাছে বই জমা দেয়! আমাকে দেখে তিনি বললেন- হানিফ আলীকে দেখছি না! সে কোথায় গেছে?
আমি বললাম-
বাজারে যেতে পারে, বসুন।
বাবর আলী বললেন- না, বসতে পারব না।
কাজের তাড়া আছে। দেরি করলে অসুবিধা হবে। তিনি ভ্রূ কুঁচকে ভেবে বললেন- এক কাজ করি। তোমার কাছেই বই দু’টি রেখে যাই। হানিফ আলী এলে তাকে দিও। দিতে পারবে না?
আমি বললাম-
পারব। পারব না কেন?
বাবর আলী আমার
হাতে বই দু’টি দিয়ে বললেন- এই নাও। সাবধানে রেখ।বই যাতে না ছিঁড়ে।
আমি বই দু’টি হাতে নিয়ে
বললাম- না, ছিঁড়বে না। আমার বই রাখার জায়গায় রেখে দিব।
আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বাবর আলী বই দু’টি রেখে চলে গেলেন। আমি বই দু’টি নিয়ে আমার পড়ার জায়গায় এলাম। বই দু’টির মধ্যে একটি ছিল হিতেশ ডেকার ভাড়াঘর। অন্যটির নাম
মনে নেই এখন। সম্ভবতঃ আনোয়ারা ছিল। কারণ তখন বাংলা পুস্তকের মাঝে আনোয়ারা এবং
মনোয়ারা উপন্যাস দু’টি খুবই জনপ্রিয় ছিলো। শিক্ষিত অথবা অৰ্দ্ধ শিক্ষিত লোকের বিয়েতে উপন্যাস দু’টি প্রায়
সবাই উপহার দিত।আমি পড়ি অসমিয়া মাধ্যমে, তাই আমি ভাড়াঘর উপন্যাসের পাতা
উল্টাতে লাগলাম। তখন সবে আমি খ-মানে উঠেছি। যুক্তাক্ষরের জ্ঞান তখনও সম্পূর্ণ
হয়নি। তাই আমি বর্ণ জোঁটিয়ে জোঁটিয়ে পড়তে লাগলাম। ভালোভাবে
বুঝতে না পারলেও পড়ে ভালো লাগল। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া শুরু করে দিলাম।
লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া মানে, যদি বড়রা বাহিরা বই পড়তে দেখে তাহলে রাগ করবে! তাই
লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া আর কি। বর্ণ জোঁটিয়ে জোঁটিয়ে পুস্তকটা
শেষ করতে আমার মনে হয় সাত আটদিন
লেগেছিল। বইটা পড়ে
খুব ভালো লেগেছিলো। তাই এর পর থেকে সুযোগ পেলেই আমি লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। আমার বই পড়াটা শেষে একপ্রকার নেশার মত হয়ে গিয়েছিল। সুযোগ পেলেই পড়তাম। অৱশ্যে
সুযোগ খুব কমই হতো। বড়দের ভয়, তার ওপড়ে ছিল স্কুলের পড়ার
তাড়া। আমাদের দুজন শিক্ষকই পড়ার ক্ষেত্রে খুব কড়া ছিলেন। পড়া মুখস্থ না হলে
বেত দিয়ে দস্তরমতো পিটাতেন। হোসেন আলী স্যার এক অভিনব
পদ্ধতিতে শাস্তি দিতেন। জুলফিতে ধরে পেন্সিল দিয়ে মাথায় টোকা মারতেন। তখন খুবই কষ্ট হত ভূক্তভোগী
ছাত্রের। তাই পড়ার সুযোগ থাকলেও সব সময়
পড়া সম্ভব হতো না।
পাঠ্য পুস্তকের বাইরে অন্য বই পড়ার কথাই যখন উঠেছে তখন নাটকের কিতাব পড়ার কথাটাও
এই ফাঁকে বলে রাখি। মামারা বাৎসরিক পরীক্ষা শেষে বাড়ীতে এলে নাটক করতেন। লাইব্রেরীর সাথে যারা যারা যুক্ত ছিলেন তারাই নাটকে অভিনয় করতেন। সবগুলি নাটকের নাম এখন মনে নেই যদিও বন্দির ছেলে, রক্ত তর্পণ, রঘুবীর নামক তিনটি নাটকের নাম আমার মনে আছে। নাটকগুলি কলকাতা থেকে
পার্সেল করে আনতেন। সুযোগ পেলে
সেই নাটকগুলি আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। সেখান থেকে
নাটকের প্রতিও আমার আগ্রহ জন্মেছিল। কিতাপ পড়া সম্পর্কে আরও অনেক কাহিনী আছে।
সেগুলি আমার লেখা ‘ফিরে দেখা’ নামক আত্মকাহিনীতে সন্নিবিষ্ট করেছি।
পড়ার আগ্রহ থেকে এক সময় লেখার আগ্রহ জন্মাল। আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিলো
আমাদের কাদং হাইস্কুলের সাধনা নামক আলোচনীতে। এর পর কিছু কবিতা,গান, একাংকিকা
নাটক এবং একটি উপন্যাস লিখেছিলাম যদিও সেগুলি প্রকাশ করার সুবিধা পাইনি।
শিলোচি থেকে যতিগাঁয় উঠে আসার পর
একদিন গরেমারীর বুলবুল হোসেন আমার কবিতা এবং গানগুলি দেখে বললেন- আপনি গান কয়টা
ভালো করে লিখে রেড়িও সেণ্টারে এবং সম্ভব হলে প্রবন্ধ লিখে খবরের কাগজে পাঠিয়ে দিন। কয়েকদিন পরেই গান কয়টা লিখে গুযাহাটী রেডিও সেণ্টারে এবং ছোট
একটি নিবন্ধ লিখে অগ্রদূত কাগজে পাঠিয়ে দিলাম। একসপ্তাহ পরে ২০০১ সালের ১৩ সেপ্তম্বর লেখাটা কাগজে ছাপা হয়ে
বেরোল। তখন থেকে খবরের
কাগজে লেখার প্রবণতা বেড়ে গেলো। আমি খবরের কাগজে গল্প প্রবন্ধ লিখতাম। একবার একটি প্রবন্ধে ভুল তথ্য
দিয়ে বসলাম। তথ্যও ছোট খাট নয়, শ্রী শ্রী
মাধবদেবের জন্মস্থান সম্পর্কে। মাধব
দেবের বড় ভাই নারায়নের জন্ম হয়েছিলো বর্তমানের বাংলাদেশের বণ্ডুকায়। আমি ভুলক্রমে লিখে ফেলেছিলাম
মাধব দেবের জন্ম হয়েছিলো বণ্ডুকায়। তিন
চারজনের কাছ থেকে ফোন এলো। তাঁরা
বললেন- আমরা জানি মাধবদেবের জন্ম লক্ষ্মীমপুরের নারায়ণ পুরে, আপনি লিখলেন
বাংলাদেশের বণ্ডুকায়। কথাটা
বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে। বলুনতো
আসলে কথাটা কি?
তখন আমি বললাম আমি এখন পর্যন্ত
প্রবন্ধটা দেখিনি। প্রবন্ধটা দেখলে তখন বলতে পারব
আসলে ঘটনা কি হয়েছে। বরপেটা
গিয়ে খবরের কাগজে প্রবন্ধটা দেখে আমার মাথায় চক্কর মাড়ল। সত্যিইতো ভুল হয়েছে। এখন কি করা যায়। বাক্যটা দেখে আমার মাথায় একটা
বুদ্ধি খেলালো। বাক্যটা ছিলো মাধবদেবের জন্ম
বণ্ডুকায়। তখন আমি তাঁদের বললাম- আসলে
বাক্যটা ছিলো এরকম- মাধবদেবের বড় ভাইয়ের জন্ম বণ্ডুকায়। মাঝে মাধবদেবের বড়ভাই শব্দটা
ওঠেনি। প্রিণ্ট মিসটেক হয়েছে।তাঁরা আমার কথা মেনে নিলো, ফলে
আমি সেযাত্রা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
খবরের কাগজে লেখা নিয়ে কিছু কথা
লেখা-মেলার
জন্য অনেকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। সবার কথা এখন মনে নেই। মনে থাকলেও সবার বিষয়ে লেখা
সম্ভবও হতনা। একদিনের একটি ঘটনা বলি। সঠিক মনে নেই, মনে হয় সেদিন আমার
অসমে একটি লেখা বের হয়েছিলো। একজন আমাকে ফোন দিয়ে বললেন-
নমস্কার, আপনি আবুল হোসেইন নাকি?
আমি বললাম-হ্যাঁ, বলুন, আমি আবুল
হোসেইন।
তখন সে প্রান্ত থেকে বললেন- আমি
খবরের কাগজে একটি প্রবন্ধ পড়ে আপনার সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য ফোন করেছি। লেখাটা পড়ে ভালো লেগেছে। আপনার বাড়ি কোথায়?
আমাদের বাড়ি বরপেটার যতিগাঁয়। বরপেটা ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ
মেডিক্যাল কলেজ থেকে হেঁটে দশ মিনিটের পথ। এভাবে বলেই আমি বললাম- আপনি কোথা থেকে ফোন করেছেন?
সে প্রান্ত থেকে বললেন- আমি
নগরবেড়া থেকে ফোন করেছি। আমার নাম
দীননাথ দাস। নগরবেড়া সার্কেলের এসডিসি। এভাবে বলেই তিনি বললেন-আপনার বা
আপনার আত্মীয়ের নগরবেড়া সার্কেল অফিসে কোন কাজ থাকলে পাঠিয়ে দিবেন। আমি তাঁদের কাজ করে দিব।
আমি অবশ্যে যাইনি। তবে নগরবেড়ার কাছেরই একটি চরের একজন
মাস্টারকে কথাটা বলেছিলাম। সেই
মাস্টার সাহেব একদিন আমাকে বললেন, আমার এক আত্মীয়কে আপনার কথা বলেছিলাম। সে এসডিসির নিকট আপনার কথা বলে
একটি কাজ করেছে। এসডিসি সাহেব খুব আন্তরিকতার
সাথেই বোলে কাজটা করে দিয়েছে।
আমি খবর কাগজে লেখা পাঠিয়ে
কোনোদিন তোষামোদ করিনি। সম্পাদকের ইচ্ছে হলে ছাপা করেছে, না
করলেও কোনো ক্ষেদ ছিল না।। অবশ্যে দুই একটির বাইরে বেশির ভাগ লেখাই প্রকাশ
হয়েছে। সেগুলি আমি নিজে ডিটিপি করে পুস্তক আকারে প্রকাশ করেছি। অবশ্যে পুস্তকগুলি তেমন
বিক্রী হয়নি। লাইব্রেরির মাগনা পুস্তক পড়ারই লোক নেই,
আমার পুস্তক টাকা দিয়ে কে কিনে পড়বে! তবে মনের
তাগিদে লিখে চলেছি।
লেখালেখির মাধ্যমে আমার অনেক স্বনামধন্য
ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়েছে। তাঁর মধ্যে একজন ছিলেন জামুগুরিহাটের মহেন্দ্ৰ বড়ুয়া।
তাঁর মৃত্যু তিথিতে তাঁর সুযোগ্য সন্তানেরা ২০১১ সালে একটি স্মৃতিগ্রন্থ প্রকাশ
করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ
করে নিয়েছিলন। তাঁদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখনও তাঁদের বাড়ির সবাই আমার
সাথে যোগাযোগ রেখে চলছে। সেই অনুষ্ঠানে আমার সাথে গিয়েছিল জাহোরপামের বাহার
উদ্দিন তালুকদার। সেও মুগ্ধ হয়েছিল তাঁদের আতিথেয়তায়।
ডিব্রুগড়ের বৌথন গগৈর সাথেও লেখামেলার মাধ্যমেই
আমার পরিচয় হয়েছিল। লোকটি আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড়
ছিলেন। তিনি ফোন করলে বিশ মিনিটের কম কোনোদিনই কথা বলতেন না। প্রফুল্ল কুমার
গোস্বামীর সাথেও আমার লেখামেলার মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল। তাঁর সাথেও আমি অনেকদিন ফোনালাপ করেছি।
একদিন আমাকে ফোন করেছিলেন
গুয়াহাটী থেকে একজন পাঠক। তিনি আমার সম্পূর্ণ পরিচয় নেওয়ার পরে আমি তাঁকে
জিজ্ঞাসা করলাম- আপনি কে?
আপনি তো আমার সব পরিচয় নিলেন, আপনার পরিচয় তো পেলাম না।
তখন তিনি বললেন- আমি পুলিসের লোক। এসপি।
গুয়াহাটী এলে আমাকে ফোন করবেন।
গুয়াহাটী গিয়েছি যদিও তাঁকে কোনদিন ফোন
করিনি। পুলিসের লোক, কি ভেবে ফোন করেছিল কে জানে!
এখন নিশ্চয় মনে নেই, এই ভেবেই ফোন করা হয়নি।
লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখানার ত্রৈলোক্য শইকীয়া
আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করতেন এবং লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতেন। সে কিছু ‘টপিকো’
দিতেন লেখার জন্য।
লেখা প্রকাশ হলে অনেকেই আমাকে ফোন করেছেন। সকলের কথা লেখা এখন সম্ভব নয়। তাই লেখলাম না।
একদিনেব কথা না বললেই নয়। সেদিন নিয়মীয়া
বার্তায় ‘মুছলমানসকলে আত্মপক্ষ সমর্থনর নীতি ত্যাগ করিবর হ’ল’
শীর্ষক অসমিয়া ভাষায় একটি লেখা প্রকাশ হয়েছিল। সেদিন সাড়াদিনে
বাইশটা ফোন এবং চারটে মেসেজ পেয়েছিলাম।
২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিলে গণ অধিকার খবরের কাগজে
বিবাহ এবং যৌতুক শীর্ষক অসমিয়া ভাষায় একটি
লেখা প্রকাশ হয়েছিল। তখন মঙ্গলদৈ থেকে একজন
যুবক ফোন করে বলেছিল- স্যার, আপনার লেখা পড়ে আমার চোখ খোলে গেছে। আমি
অবিবাহিত। আপনাকে কথা দিচ্ছি বিবাহে আমি যৌতুক
নেব না।
এমন অনেক স্মৃতি আছে লেখামেলা সম্পর্কে।সব কথা
এখন লেখা সম্ভব নয়। অবশ্যে মনেও নেই সব কথা।
থানেশ্বর মালাকার দেব আমাদের
বরপেটায় কয়েক বৎসর উপায়ুক্ত হিসাবে কার্যনির্বাহ করে গেছেন। উপায়ুক্ত হিসাবে তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে। তিনি সকল শ্রেণীর লোকের সাথে সমন্বয় রক্ষা করে চলতেন।
বিশেষ করে লেখামেলার সাথে জড়িত ব্যক্তির সাথে তিনি
সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। তিনি নিজেও একজন সুলেখক। তাঁর
সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল একটি লেখার মাধ্যমে। জনীয়া গ্রন্থমেলার স্মৃতিগ্রন্থে
তিনি একটা প্রবন্ধ লেখেছিলেন। প্রবন্ধটা পড়ে আমার ভালো লেগেছিল তাই ফোন করে আমি
তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিলাম। পরে তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল কয়াকুছি প্রেসগীল্ডের
একটি অনুষ্ঠানে।তখন তিনি আমায় তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন- নিঃসঙ্কোচে
ফোন করবেন কোন রাজহুয়া কাজে আমার প্রয়োজন হলে।তেমন কোন প্রয়োজন হয়নি. তাই ফোন করাও
হয়নি।
তারপর অনেকদিন কেটে
গেছে। একদিন তাঁর সাথে আবার দেখা হয়েছিলো আমাদের গ্রামেরই একটি ক্লাবের বার্ষিক
অধিবেশনে। জমি সংক্রান্ত আমার ব্যক্তিগত অসুবিধে ছিলো।একজন আমাকে
পরামর্শ দিয়েছিলো, উপায়ুক্তর সাথে আলোচনা করলে আপনার কাম হয়ে যাবে। এনআর করে জমি
আপনার নামে তুলে দিবে। কিন্তু আমি ভরসা পাইনি। সেদিন হঠাৎ সেই লোকটির কথা মনে
পরাতে ভাবলাম, কথাটা বলে দেখি স্যার কি বলেন। তাই আমি স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললাম-
স্যার, আপনার সাথে আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে একটি আলোচনা ছিলো বলতে পারব কি?
স্যার বললেন- কাল
সকাল সাতটায় আমার রেসিডেন্সে যাবেন, তখন আলোচনা করব।
স্যারের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে পরের
দিন সকাল ঠিক সাতটায় বড় ছেলে সোহরাব আলী আহমেদকে সংগে নিয়ে উপায়ুক্তের রেসিডেন্সে
গেলাম। গেটে পহরারত পুলিশের কাছে গিয়ে আমি বললাম- স্যার আমাকে আসতে বলেছিলেন,
ভেতরে যেতে পারব কি?
পহরারত পুলিশ আমাদের আপাদমস্তক
লক্ষ্য করে বললেন- তাই নাকি! একটু দাঁড়ান আমি
জিজ্ঞেস করে আসছি।
গেটের ভেতরে কয়েকজন লোক সিভিল
ড্রেসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। পহরারত পুলিশ ভেতরে গিয়ে
তাঁদের কথাটা বললেন এবং ফিরে এসে আমাকে বললেন- যান, ভেতরে যান।
আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। একজন লোক
বললেন- স্যার এখন স্নান করছেন, ভেতরে গিয়ে বসুন।
লোকটি একটি রুম দেখিয়ে দিলেন। আমরা
লোকটির নির্দেশিত রুমের ভেতরে গিয়ে বসলাম। দশ মিনিট বসার পর অন্য একজন লোক এসে
বললেন- আসুন আমার সাথে।
লোকটির পেছন পেছন গেলাম। লোকটি একটি
রুমের সামনে গিয়ে বললেন- যান, ভেতরে যান।
ভিতরে প্রবেশ করে নমস্কার জনালাম। মালাকার
স্যার ভেতরে বসে ফাইল দেখছিলেন। তিনি মাথা তুলে প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললেন- বসুন।
কুশলবার্তা বিনিময়ের পর আমি তাঁকে আমার
কয়েকটা বই উপহার দিলাম। স্যার বই কয়টা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন- খুব ভালো কাজ করছেন
আপনি। আপনি চলে যাবেন, কিন্তু আপনার বইগুলো থেকে যাবে।
পরে লেখামেলার প্রসংগ নিয়ে প্রায়
আধাঘণ্টা আলোচনা হলো। আলোচনার মাঝেই একবার
পিঠা দিয়ে চা গেলাম। তিনি নিজের লেখা দুটি বই আমাকে উপহার দিলেন। তারপর আমি আমার
অসুবিধার কথা বললাম। সাথে সাথেই তিনি এক টুকরো কাগজে এসডিসির কাছে একটা কিছু লিখে
কাগজ টুকরো আমার হাতে দিয়ে বললেন-যান, দশটার সময় অফিসে গিয়ে কাগজটা এসডিসিকে দিবেন।
আমি ফোন করেও বলে দিব কথাটা।
প্রায় আধাঘণ্টা পর আমরা উপায়ুক্তের
রুম থেকে বেড়িয়ে এলাম। কাগজটা এসডিসিকে দিয়েছিলাম।এসডিসি খুব গুরুত্বসহকারেই আমার
কথা শুনেছিলেন। কিন্তু মালাকর স্যার চার পাঁচদিন পরেই পদন্নোতি হয়ে চলে গিয়েছিলন।
তাই আমার কাজটা অবশ্যে হয়নি।
অবসরের পর আরেকদিন মালাকার স্যারের
চচলের বাসায় গিয়ে দেখা করেছিলাম। সেদিন আমার সাথে ছিলো আমাদের গ্রামেরই বিষয়
শিক্ষক নুরুল হক এবং তাঁর ছেলে অভয়দুল্যা।স্যারের বাসা চিনিনা। সেজন্য ফোন করে
তাঁর বাসার ঠিকানা নিয়েছিলাম। আমরা তাঁর বাসার সামনে গিয়ে দেখি তিনি তাঁর বাসার
সন্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাদের দেখে তিনি বললেন- বাসা চিনবেন না বলে আগেভাগে এসে
রাস্তায় দাঁড়িযে রয়েছি।
সেদিন তাঁর অতিথেয়তা দেখে আমরা
মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ঘরুয়াভাবে আলোচনার মাধ্যমে সেদিন প্রায় একঘণ্টা সময় তাঁর
বাসায় ছিলাম।
দৃষ্টি ভ্রম
সালটা সঠিক মনে নেই, তবে ঘটনাটা অনেক আগের এটুকু শুধু বলতে পারি। আমার বয়েস
তখন ছয় সাত বছর হবে। সেই হিসেবে ১৯৫৬ বা ১৯৫৭ সাল হবে।
কাদঙের রূপাকুছি অঞ্চলে আমাদের আত্মীয় আছে। বাবার সাথে নৌকায় চড়ে সেদিন সেই আত্মীয়দের বাড়ি
যাচ্ছিলাম।আমরা চাউলখোয়া নদী দিয়ে যাচ্ছিলাম।দুজন লোক ডাঙায় নেমে গোন টেনে
নিচ্ছিলেন নৌকা। কাদং বাজার পাওয়ার মাইলখানেক আগে বন্দুকের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি
নিজে অবশ্যে বুঝতে পারিনি সেটা বন্দুকের শব্দ। নৌকায় অনেক লোক ছিলো। তাঁদের মাঝ
থেকেই একজন শব্দটা শুনে বলেছিলেন- বন্দুকের শব্দ। মনে হয় কেউ পাখি শিকার করতে গুলী
করেছে।
কিছুদূর আসার পর দেখা গেলো, পাখির
মতো কিছু একটা জলে ভেসে আসছে। একজন বললেন- মনে হয় পাখি। একটু আগে যে গুলী করেছেন
মনে হয় সেই পাখীটাই জলে পড়ে ভেসে আসছে। সেই পাখিটার কাছাকাছি আসার পর নৌকারই একজন
লোক খুব তাড়াতাড়ি সেই পাখিটা জল থেকে তুলে চরঠের তলে লুকিয়ে ফেললেন। কাদং বাজার
পার হয়ে চরঠ তুলে পাখিটা বের করলেন। কিন্তু একি!এটা তো পাখি নয়, পাখির ছাল। অর্থাৎ কেউ পাখি জবাই করে ছাল নদীর জলে ভাসিয়ে
দিয়েছ।কেউ দেখে ফেলবে ভেবে তাড়াহুড়ো করে ছালটা জল থেকে তোলার সময় বুঝতেই পারেনি
সেটা পাখি নয়- পাখির ছাল।কি আর করবে! ব্যাজার মনে
ছালটা আবার নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন।
নেদুর
জনপ্রিয়তা
নেদু মিঞা কাদং অঞ্চলের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। নেদু মিঞাকে নিয়ে একদিনের একটি ঘটনা বলি। তখন
রূপাকুছির একটি গীতি নাট্য দল ছিল। তারা অভয়-দুলাল পালা অভিনয় করত। সেই দলে
আব্দুল আলী (ধনপতি রাজা), জহিলা (অধর্ম), নবি মিঞা (অভয়), হরিদাস শীল (দুলাল) এবং নেদু মিঞা ধর্মের চরিত্রে
অভিনয় করতেন। স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করত- কদম আলী এবং সুরত আলী। আলীগাঁয়ের জইনুদ্দিনের মেয়ে
সোনাভানুর বিয়ে হয়েছিল রূপাকুছির রহিমুদ্দিনের ছেলে আব্দুল
বারেকের সাথে। সেই বিয়েতে জয়নুদ্দিনের বাড়িতে অভয়-দুলাল যাত্রাপালা অভিনীত
হয়েছিল। আমি তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি। এমনিতে আলীগাঁয়ের মামাদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম এবং সেখান থেকে গান শুনতে গিয়েছিলাম। বাকর মামা
সেই দলে হারমনিয়াম বাজাতেন। বাকর মামা আমাকে দেখে আদর করে তাঁর পাশে বসিয়েছিলেন।
আমার খুবই উৎসাহ। এর আগেও আমি বাঘবর বাজারে
অভয়-দুলাল যাত্রাপালা উপভোগ করেছিলাম বাকর মামার পাশে বসে। তখনও বাকর মামা
হারমনিয়াম বাজাতেন। আমার উৎসাহের কারণ ছিল দু’টো। এক, কেরামত আলির ‘অ’ আমার প্রাণের হুক্কারে’ গানের সাথে কৌতুক অভিনয় এবং নেদু মিঞার মন জুড়ানো ধর্মের চরিত্রে প্রাণবন্ত অভিনয়। যাত্রা আরম্ভ হল। সবই ঠিকই আছে।
কিন্তু নেদু মিঞা রূপী ধর্মকে দেখছি না। নেদু মিঞার জায়গায় অন্য একজন ধর্মের
চরিত্রে অভিনয় করছেন। নেদু মিঞাকে না দেখে আমার ভালো লাগছিল না। সেই ধর্ম কেন আসছে না? কিন্তু কাউকে মুখ খোলে কথাটা বলতে পারছি না।অভিনয়
চলছে। বলতে গেলে ‘পিনড্রপ সাইলেন্ট’। আমার মতো হয়তো অনেকে মনে মনে
নেদু মিঞার অভিনয় দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল। হঠাৎ হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল।
একজন হঠাৎ বলে উঠল- ‘আগের ধর্মকে লাগে। এই ধর্মের অভিনয় আমরা দেখব না।’
তার সাথে সবাই সুর মেলাল- ‘হ্যাঁ, আগের ধর্মকে লাগে।’ সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ধনপতি রূপী আব্দুল ষ্টেজে এসে বললেন- নেদু মিঞার অসুখ। সে আসতে পারে নি। আপনাদের এই ধর্মের
অভিনয়ই দেখতে হবে।’
কে শুনে কার কথা! সবাই বলতে লাগল- কি হয়েছে, সেটা আমরা জানি না। আগের ধর্মকে আনেন। তারপর আমরা গান
শুনব। আগের ধর্ম না আসা পর্যন্ত আমরা গান শুনব না। গান বন্ধ রাখেন।
এভাবে চলল, চেঁচামেচি, হট্টগোল। অনেকে অনেক রকমে দৰ্শকদের শান্ত করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু কেউ কারও কথা শুনছে না।
নেদু মিঞার সাথে কোনো কথায় মতানৈক্য হয়ে
হয়তো সেদিন তাঁকে দলের সাথে আনেনি। দলের সাথে না আনলেও নেদু মিঞা নিজে থেকেই
দলের অগোচরে দলের সাথে এসেছিলেন। শীতের দিন। তিনি মাথায় পাগুড়ি বেঁধে দর্শকের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দর্শকদের একজন তাকে চিনে ফেলেছিল। সে বলে
উঠল- আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন। আগের
ধর্ম এসেছে। একটু আগেই আমার পাশে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আব্দুলের বড় ভাই নায়েব আলী ছিল দলের ম্যানেজার।
তিনি ষ্টেজে এসে নেদু মিঞাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-নেদু, তুমি যদি সত্যিই এসে থাক, তাহলে আমার সাথে দেখা কর। দেখতেই তো পাচ্ছ দর্শকের
অবস্থা। তুমি আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার কর।
নেদু মিঞা পায়জামা এবং সাদা সার্ট পড়ে গিয়েছিলেন। নায়েব আলী ষ্টেজ থেকে নেমে
যাওয়ার সাথে সাথে তিনি সার্টের ওপড়ে
ক্রস বেল্ট লাগিয়ে ষ্টেজে এলেন। সাথে সাথে ষ্টেজে পিনড্রপ
সাইলেন্ট বিরাজ করতে লাগল।
এই উদাহরণ
থেকে আপনারা নিশ্চয় নেদু মিঞার জনপ্রিয়তার কথাটা অনুমান করতে পারছেন! কিন্তু এই সব প্রতিভা বর্তমান বিস্মৃতির গর্ভে
হারাতে বসেছে। নেদু মিঞার মতো আরও অনেক প্রতিভা ছিল
আমাদের মাঝে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যুবকেরা তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উদ্যোগ
গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
ছাতু
আমার জীবন বাঁচিয়েছিলো
১৯৬৮ সালের কথা।তখন আমি আব্দুল ভাইয়ের বাডি লজিং
থেকে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি।একদিন সকাল বেলা দরবেশ এবং তাইজুদ্দিন সাইকেল নিয়ে আমার জাইগীর বাড়ি এসে রাস্তা থেকে আমাকে ডাক দিল। আমি ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে দেখি দরবেশ এবং তাইজুদ্দিন সাইকেল নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি যে ঘরে থাকতাম, সেই ঘরটা
একেবারে রাস্তার ধারে ছিলো। তাইজুদ্দিন আমার ভগ্নিপতি আসান উদ্দিনের বাড়িতে লজিং
থাকত। বাড়ি বাঘমারা চরে।(তাইজুদ্দিন পরবৰ্তীতে প্রাইমারীর শিক্ষক হয়েছিলো। অবসরের পূৰ্বেই সে অনেকদিন আগে
মৃত্যুবরণ করেছে।দরবেশ আলীও অনেকদিন পূৰ্বে মারা গেছে।)
তাইজুদ্দিন বলল- আমরা ইলিশ মাছ আনতে আলীরপাম
যাচ্ছি। রাস্তা চিনি না। তুই তো আলীরপামের বিষয়ে সব জানিস।কোন দিক দিয়ে গেলে ভালো হবে? ইলিশ কোথায় পাব?
আমি তাদের আলীগাঁয়ের রাস্তার কথা বলতেছি। এমন সময় আব্দুল ভাই বাড়ির ভেতর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসে বললেন- তোরা কোথায় যাচ্ছিস?
আলীরপাম যাচ্ছি ইলিশ মাছ আনতে। দরবেশ বলল।
ইলিশ মাছের কথা শুনে আব্দুল ভাই বললেন- টাকা নিয়ে যা। আমাদের জন্যও দু’টো আনিস।
দরবেশ বলল- আমাদের অনেক মাছ আনতে হবে। রাস্তাও তেমন চিনি না। আবুলকে
আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন।
আব্দুল ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- যাবি?
আমি বললাম- সাইকেল হলে যেতে পারি।
ঠিক আছে। আব্দুল ভাই বললেন- তাহলে সাইকেল নিয়েই যা।
আমি ভাত খেয়ে বেড়োতে বেড়োতে আরও দুই তিনজন
এল ইলিশ মাছের অর্ডার নিয়ে।
তিনজন আলীরপাম রওনা হলাম। আমি জানতাম, ইলিশ মাছ কোথায় পাওয়া যায়। সিধা সেখানে চলে এলাম। শ্লুইস গেট
বাজারের কাছেই সেবার ভাটা পড়েছিল। ভাটায় গিয়ে আমরা ইলিশ মাছের জন্য অপেক্ষা
করতে লাগলাম। অনেক নৌকা ইলিশ ধরা জাল দিয়ে ভাটা দিচ্ছে, কিন্তু ইলিশ মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র চার পাঁচ টা মাছ পেলাম। আমাদের অন্ততঃ দশটি
মাছ দর্কার।
একজন জেলে বলল- আজ তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।
কাল সকালে এলে পাবে। সকালে এসো।
অগত্যা উপায় না পেয়ে আমরা সন্ধ্যেয় মামাদের
বাড়ি এলাম। মামাদের বাড়িতে রাত কাটিয়ে সকাল বেলা পান্তা খেয়ে আবার ভাটায়
এলাম। কিন্তু ভাটায় ইলিশ মাছ নেই। জোয়ার
ভাটা পড়েছে। তাই ইলিশ মাছ তেমন আসছে না। জেলেরা মাছ ধরা বাদ দিয়ে বসে বসে বিড়ি
টানছে। মাত্র পাঁচটা ইলিশ পেলাম।
দরবেশ প্রস্তাব দিল-পাঁচটা ইলিশ দিয়ে আমরা কি করবো? আমাদের দর্কার কমপক্ষে দশটা মাছ। চল, এই পাঁচটা
ইলিশ নিয়ে ইষ্টি(কুটুম্ব) বাড়ি যাই। কাল সকালে আবার আসব।
তাইজুদ্দিন বলল- কোথাকার ইষ্টি বাড়ি যাবি?
ছাপারবড়ি। সেখানে আমাদের খালাদের বাড়ি। দরবেশ বলল- আজ রাতে খালাদের বাড়ি থেকে কাল সকালে আবার আসব।
আলীরপাম থেকে ছাপারবড়ি কত দূর সে সম্বন্ধে
আমাদের মোটেই ধারণা নেই। তাই আমরা রাজি হয়ে গেলাম এবং ছাপারবড়ি অভিমুখে রওয়ানা হলাম। মন্দিয়া এসে খুরমা দিয়ে চাহ খেলাম। তারপর
আবার ছাপারবড়ি অভিমুখে যাত্রা করলাম। বরপেটা পার হয়ে সুন্দরিদিয়া
পেলাম।
সুন্দরিদিয়া পাওয়ার পর আমার কিছু কিছু অস্থির লাগতে লাগল। সুন্দরিদিয়া পার
হয়ে আসার পর আমার অস্থিরতা অনেক বেড়ে গেল। আমি সাইকেলে বসে থাকতে পারছি না। ধারে
কাছে কোনও বাড়িঘরও নেই। আমি সাইকেল থেকে নেমে সাইকেল ঠেলে ঠেলে আসতে
লাগলাম। কিছু দূর আসার পর আমার অবস্থা এমন
হলো যে, আমি সাইকেলও ঠেলতে পারছি না।
দরবেশ আমাকে তার সাইকেলে বসিয়ে ঠেলে আনতে লাগল।
তাইজুদ্দিন তার নিজের এবং আমার, দুটো সাইকেল ঠেলে আনতে লাগল।
আমার সেদিন যেরকম অবস্থা হয়েছিল, এখনকার দিন হলে প্রথমেই সাপের বাতাস লাগা বলে সন্দেহ
করা হতো; কিন্তু তখনও সাপের বাতাসের তেমন
প্রচলন হয় নি। তাই কেউ সাপের বাতাস লাগা বলে সন্দেহ করে নি। সাপের
বাতাস প্রথম দেখেছিলাম আমাদের কাদং হাইস্কুলেই।
সেদিন স্কুলে প্রার্থনা চলছিল। প্রার্থনার মাঝেই হঠাৎ মোকদম আলী ঢলে
পড়ল। মোকদম তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ত। দরবেশের জেঠাত ভাই।(মোকদম আলী পরে গোবিন্দপুরের
আক্রাম আলী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন। সে অনেকদিন আগে মারা গেছে।)মোকদমের অবস্থা দেখে স্কুলে হুলস্থূল লেগে গেল। ওঝা ডেকে আনা হল। ওঝা এসে
হাত চালান দিয়ে ঝাড়ার পর সেই বিষ নেমেছিল। সেই প্রথম সাপের বাতাস দেখেছিলাম। এই
ঘটনাটা ঘটেছিল আমার ঘটনাটা ঘটার অনেক দিন পরে। ১৯৬৯ সালে। আমি তখন নবম শ্রেণীতে
পড়ি। আমার ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে। জৈষ্ঠ
মাসে। আমি তখন অষ্টম শ্ৰেণীতে পড়ি।
কিছু দূর আসার পর আমি বললাম- আমার সম্ভবতঃ
খিদে পেয়েছে। কিছু একটা খেতে পারলেই ঠিক হয়ে যাব। লক্ষ্য কর, যদি কোন দোকান পাওয়া যায়! বিস্কুট কিনে খাব।
ধারে-কাছে কোন দোকান পাওয়া গেল না। তখন দোকান পাওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ তখন আজকালের মত জায়গায়
জায়গায় দোকান ছিল না। দোকান ছিল একমাত্র বাজার শহরে।
কিছুদূর আসার পর একটি পাড়া দেখতে পেলাম। পাড়াটা ছিলো রাস্তার পশ্চিম ধারে। পাড়াটা নিন্মভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। বাড়িগুলো ফাঁক ফাঁক। পাড়ার প্ৰথম বাড়িটা রাস্তা থেকে খানিকটা
দুরে। দরবেশ বলল- চল, এই বাড়িতে গিয়ে দেখি কিছু
পাওয়া যায় কিনা!
পাড়াটা ছিল সুন্দরিদিয়া থেকে কিছুটা উত্তর দিকে অবস্থিত এখনকার কংক্ৰীট সেতু পার হয়ে।তখন সেখানে কংক্রীট সেতু ছিল না। কাঠের পুল ছিলো। সেই পুলের
খানিকটা উত্তর দিকে এখন বাজার বসেছে। কেওঁটপারা বাজার। তখন সেখানে কিছুই ছিল না।রাস্তাটাও
এখনকার মতো পাকা ছিল না। পাথর নুড়ি বিছানো কাঁচা রাস্তা
ছিলো।
আমার অবস্থা তখন খুবই শোচনীয়। দাঁড়াতে পারছি না। বসে বসে হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা থেকে নিচে নামলাম। দরবেশ আমাকে ধরে সেই বাড়িতে নিয়ে গেল। বাড়িটা নিন্মভূমিতে অবস্থিত। তাই ভিটে বেঁধে
বাড়ি করেছে। মূল ভূমি থেকে প্রায় আট দশ ফুট উঁচা সেই ভিটা।
আমার তখন হাঁটার শক্তি নেই। আমি হামাগুড়ি দিয়ে সেই ভিটেয়
উঠলাম। বাড়িতে চারটি ঘর। পূব পাশে ছোট্ট বসার ঘর। সে ঘরে দুজন বৃদ্ধলোক বসে হুঁকা
টানছিল। ঘরের ভেতর একটি ছোট্ট বেঞ্চ পাতা ছিল। আমি গিয়ে সেই বেঞ্চে সটান শোয়ে
পড়লাম।
লোক দু’টির একজন আমার আচরণ দেখে হতচকিত হয়ে বললেন- কি হয়েছে? ছেলেটা এমন করছে কেন?
দরবশে বলল- মনে হয় খিদে পেয়েছে। আপনাদের খাওয়ার কিছু থাকলে খেতে দিন।
লোকটি বললেন- বাড়ির সবাই ইষ্টি বাড়ি গেছে। সকালে রান্না করে ভাত
রেখে গিয়েছিল। আমি একটু আগেই খেয়েছি। তোমাদের দেখে তো ছাত্রের মতো মনে হচ্ছে!
তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- চল, পাশের বাড়ি। দেখি কিছু পাওয়া যায় কি-না!
পাশের বাড়ি গেলাম। বাড়িটা আগের বাড়ির মতো অতটা
উঁচা নয়। বাড়িতে গিয়েই দেখি বারান্দায় খেজুর পাতার একটি পাটি গোল করে
গুছানো আছে। আমি সেই পাটি বিছিয়ে শোয়ে পড়লাম।
দু’জন মেয়ে
মানুষ ঢেঁকিতে ধান ভানছিল। একজন একটু বয়স্কা এবং অন্যজন কিশোরী। বয়স্কা সম্ভবতঃ
কিশোরীর মা। মনে হল, কিশোরীর বিয়ে হয়নি। তখন ছোট্ট
বয়সেই আমাদের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো। এখনও সেই প্রথাই প্রচলিত আছে। বলতে
পারেন, এই
বাল্যবিবাহের জন্যই মুসলিম সমাজ পিছিয়ে রয়েছে।
বৃদ্ধ লোকটি বয়স্কা মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ছেলেটার খিদে পেয়েছে। তোমাদের খাবার থাকলে কিছু দাও।
মহিলাটি বললেন- ভাত নেই। ছাতু আছে। তবুও গুড় নেই।
কথাটা আমিও শুনলাম। বললাম- কিছু লাগবে না।
গুড় ছাড়াই দিন।
ছাতু এনে দিল। আমি জল দিয়ে ভিজিয়ে রাক্ষসের
মতো সেই ছাতু
গিলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ খাওয়ার পর
কিশোরীটি বলল- মা, শুঁটকি মাছের তরকারি আছে। দাও
না। সুদা খাচ্ছে। মনে হয়, খুব খিদে পেয়েছে।
পুরুল দিয়ে রান্না করা শুঁটকি মাছের তরকারি
এনে দিল এবং সাথে আরও এক বাটি ছাতু দিল। ছাতু খেয়ে আমার শরীর
অবশ হয়ে পড়ল। তবে, তখন আমি খানিকটা সুস্থতা অনুভব করতে লাগলাম। আমার তখন
লজ্জা করতে লাগল। এমন রাক্ষসের মতো খেলাম! কি ভাবল এরাঁ! কিছুক্ষণ শোয়ে থেকে মহিলাদের
কাছ থেকে বিদায় নিযে রাস্তায় এলাম। রাস্তায় তাইজুদ্দিন এবং দরবেশ
আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সাইকেলে
চেপে ছাপারবড়ি দরবেশের খালাদের বড়ি গেলাম।
সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন আলীরপাম গিয়ে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। সেদিন আমাদের প্রয়োজন
মত মাছ পেয়েছিলাম।
সেদিন থেকে কেউ ছাতু খেতে বললে, আমি কোনদিন ‘না’ করি না। কারণ ছাতুই একদিন আমার জীবন বাঁচিয়ে ছিল। বাড়িটা
এখনও আছে। বরপেটা থেকে সুন্দরিদিয়া হয়ে কয়াকুছির দিকে গেলে প্রথম সেতুটা পার
হয়ে প্রথম বাড়িটা। সেদিকে গেলে বাড়িটার দিকে এখনও তাকিয়ে থাকি। বাড়িটায়
যাওয়ার ইচ্ছাও জাগে। কিন্তু কোন দিন যাওয়া হয়নি। কেউ চিনবে না, এই ভেবে যাওয়া হয়নি। সেই লোকগুলোর দু’জন আমার চেয়ে
বয়েসে অনেকটা বড় ছিল। সেই বযস্ক লোক দু’জন হয়তো এখন আর বেঁচে নেই। তবে, মেযেটি বেঁচে থাকলে, থাকতেও পারে। কারণ সে প্ৰায় আমার সমবয়সী ছিলো।
ধর্মীয় বিশ্বাস
বর্তমান বিশ্বের আনুমানিক ১.৯
বিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ২৪.২%, মানুষ কোনও
নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে জড়িত নয়। সমাজবিজ্ঞানী
ফিল জুকারম্যানের মতে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী অনুমান ৫০০
থেকে ৭৫০ মিলিয়ন মানুষ ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসী ছিল।বর্তমান এই সংখ্যা আরও বাড়তে
পারে।
ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে একদিনের এক
অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৫ সালে ইউনাইটেড হাইস্কুল, শিলোসির অপেনিং
পারমিশন আনার জন্য গুয়াহাটীৰ ডিপিআই অফিসে গিয়েছিলাম রাহিম বাদশ্বাহ এবং আমি। অপেনিং পারমিশন আনতে হয় আণ্ডার
সেক্রটারীর নিকট থেকে।আমরা আগের দিন গুয়াহাটী গিয়ে দক্ষিণ গাঁয়ে নিয়েত আলীর
বাড়িতে রাত কাটিয়ে মনে হয় দশ বাজার একটু আগেই গিয়ে পৌঁছেছিলাম কাহিলিপারার ডিপিআই
অফিসে। তাই সেক্রেটারী না আসার জন্য
আমরা অফিসের পর্টিকোতে বসে সেক্রেটারীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের মতো বিভিন্নজন বিভিন্ন
কাজের জন্য এসেছিলেন এবং তাঁরাও আমাদের মতো অপেক্ষারত ছিলেন। প্রটিকোতে বসার জায়গা সীমিত ছিলো,
তাই আমরা মাত্র কয়েকজন বসেছিলাম যদিও,অনেকেই দাঁড়িযে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন
পর্যাপ্ত বাসার জায়গা না থাকার জন্য। একজন পঞ্চাশোর্দ্ধ একহারা গঠনের কোট-পেণ্ট
পরিহিত ভদ্রলোক আমাদের সামনে দিয়ে পায়চারি করছিলেন। লোকটির পরিচয় জানিনা, তবে তিনি যে
একজন গুণীমানি লোক ছিলেন এবিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। কারণ অফিসে যারা আসছিলেন, অনেকেই
তাঁকে নমস্কার দিচ্ছিলেন।
আমার ডানপাশে বসেছিলেন স্বাস্থ্যবান
হাট্টাকাট্টা সুদর্শন একজন মিরি ভদ্রলোক। লোকটির বয়েস চল্লিশের উপরে হবে। কোট-পেণ্ট পরিহিত ভদ্রলোকজন সেই
মিরি ভদ্রলোকটির সামনে এসে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন- আপনি ভগবান বিশ্বাস করেন?
মিরি লোকটি তৎক্ষণাৎ বললেন- না, করিনা।
কেন করেন না?
দেখা যায়না বলে।
কারেণ্ট বিশ্বাস করেন?
করি।
Have you ever
seen the electricity ? কারেণ্টতো দেখা যায়না, তবে কেন বিশ্বাস করেন?
লাইট জ্বলে কারণে।
দেখা যায়না, তবু বিশ্বাস করেন শুধু
লাইট জ্বলে কারণে। দেখুন, আমি ডাবুল এমএসসি। কেমেস্ট্রি এবং ফিজিক্সের। আমি শিবসাগর কলেজে অধ্যাপনা করি। কেমেস্ট্রির প্রফেসর। আমি ভগবান বিশ্বাস করি। ভগবানর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলে
মনে শান্তি পাওয়া যায়। আপনিও
বিশ্বাস করে দেখবেন, মনে শান্তি পাবেন।
কথাটা ঠিক, সুখের সময়ে না হলেও, বিপদের
সময়ে ভগবানের চরণে নিজেকে সমর্পণ করলে মনে বল পাওয়া যায়।
ভগবান বিশ্বাস সম্পর্কে আর একটি
গল্প বলি। গল্পটা মনে
হয় বলেছিলেন ঝারাবারীর ফয়েজুর রহমান সাহেব। তিনি বলেছিলেন, দেখা যায়না বলে বর্তমান
অনেকেই আল্লাহকে বিশ্বাস করতে চায়না। বেহেস্ত,
দোজখ, পরকাল, পরকালের পুরস্কার বা তিরস্কারও বিশ্বাস করতে চায়না অনেকে।আমাদের অনেকেই ভাবি মৃত্যুর পরে
কিছুই হবে না। মৃত্যু মানে সব শেষ।
ধরুন, আমাকে একটি জংঘলের মধ্য দিয়ে
যেতে হবে। আমি জানি, জংঘলে বাঘ, ভালুক বা
কোন হিংস্র প্রাণী নেই। কিন্তু
জংঘল! জংঘল মানেইতো বাঘ, ভালুকেরই বিচরণস্থল।আমি খালী হাতে যাচ্ছি। হঠাৎ যদি বাঘ বা ভালুক বের হয়
তখন কি করব? সেজন্য সতর্কতাবশতঃ আত্মরক্ষার জন্য হাতে
একটা কিছু নিয়ে গেলে ক্ষতি কি? সেরকমই
মৃত্যুর পর কিছুই হবেন জানি। তবে, হঠাৎ
যদি হয়ে যায়, তখন কি করব!সেজন্য সতর্কতার জন্য হলেও আল্লাহর
নির্দেশিত কর্মগুলি করা উচিত।
দুধ পান করে জোলাপ
১৯৭১ সালের কথা। ম্যাট্ৰিক পরীক্ষার পর মামাদের
বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। শীতের দিন। এমনিতে দুধ চার আনা সের। সেদিন কেন জানিনা দুধ দশ পয়সা
সের ছিলো। সস্তা পেয়ে বাজার ভাঙা ভাঙা অবস্থায়
আলী হোসেন, চান্দু এবং আমি চার সের দুধ কিনে তোতার চায়ের দোকানে জ্বাল দিতে দিলাম। তোতা তখন আলীগাঁও বাজারের
বিখ্যাত চায়ের দোকানী।মিশুক
প্রকৃতির লোক। ছোটবড় সবার সাথে ভালো ব্যবহার
করেন। আমাদের সাথেও ভালো। তোতা দোকানী আগ্রহ নিয়েই দুধ
জ্বাল দিয়ে দিলেন। আমরা তিনজনে মিলে সেই কুসুম
কুসুম গরম দুধ মজা করেই পান করলাম। মামাদের ঘুমটি দোকান ছিলো। তাই মামাদের বাড়ি গেলে রাতে আমি
সেই ঘুমটি দোকানে শোইতাম।আলী
হোসেনের বাজারে সাইকেল ম্যাকারের দোকান ছিলো। আলী হোসেনও বাজারেই শোইতেন। চান্দু আমার বাল্যকালের বন্ধু। সে অবশ্যে বাড়িতেই থাকতেন।
দুধ পান করার পর অনুমান দশটার সময়
আলী হোসেন এবং চান্দু নিজদের নিজের বাড়ি চলে গেলো। আমি এলাম মামাদের বাড়ি।পেট পূরে দুধ খেয়েছি, তাই খাওয়ার
তেমন তাগিদ নাই। তাই বিছানায় শোয়ে বিশ্রাম
নিচ্ছিলাম। একটু পরেই পেট গুর গুর করে ডেকে
উঠলো। সাথে সাথে পায়খানায় গেলাম। কয়লার মতো কালো পায়খানা হলো। আধাঘণ্টা পর পর তিনবার পায়খানায়
গেলাম। প্রত্যেক বারই কালো পায়খানা। পাঁচবারের মাথায় সাদা দুধের মতো
পায়খানা হলো। তারপর জোলাপের ক্রিয়া শেষ হয়ে
গেলো। পরে জেনেছিলাম আলী হোসেনেরও আমার
মতো জোলাপ হয়েছিলো। অবশ্যে চান্দুর কিছুই হয়নি। চান্দু খুব গাঞ্জা খেত। সেজন্যই বোধহয় হয়নি। এভাবেই আমরা তখন সিদ্ধান্তে
এসেছিলাম।আমি পরে দুধ খেয়ে জোলাপের জন্য
অনেকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু জোলাপ হয়নি।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের ফলে আমরা
সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছি। আমি উঠে
এসেছি বরপেটার যতিগাঁয় এবং চান্দু শিলোশি পাথারের কাছে মথাউরিতে বাড়ি বানিয়েছেন। চান্দু বর্তমানেও জীবিত। আমি চান্দুর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে
তাঁর সাথে ফোনে কথা বলে সেদিনের সেই দুধ পান করার ঘটনাটা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। চান্দুরও মনে আছে সেদিনের সেই দুধপানের
ঘটনাটা।
আলী হোসেনের বাবা আব্দুল হামিদ
সাহেব ঘরুয়া ডাক্তার ছিলেন।ডাক্তার
সাহেবের মৃত্যুর পর আলী হোসেন সাইকেলের ম্যাকারি বাদ দিয়ে বাবার পেশায় নিয়োজিত
হয়েছিলেন এবং বরপেটা রোডের নিচুকার শতান বজারে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তিনি কয়েকবছর পূর্বে মৃত্যুবরণ
করেছেন।
ঘোটা পান
আলীগাঁও বাজারে সাহা,
বসাক, বাকালি, শীল প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও পেশার প্রায় চল্লিশটি পরিবার বাস
করত।তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো
নিত্যানন্দ সাহা, সূর্য সাহা, তারাপদ সাহা, নারায়ন বসাক, ক্ষিতীশ শীল প্রভৃতি। তারাপদ সাহারা সাহা উপাধির লোক
ছিলেন যদিও তারাপদ সাহা নিজের উপাধি ফৌজদার লিখতেন। তারাপদ ফৌজদারের বাড়িতে প্রত্যেক
বছর ত্রিনাথের পূজা হত। ত্রিনাথ পূজা ত্রিনাথ মেলা নামেও পরিচিত। ওড়িশা,
বংগ এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ত্রিমূর্তি পূজা করা হয়: অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু
এবং শিব (মহেশ্বর) কে সম্মান জানাতে ভক্তিমূলক হিন্দু রীতিনীতি পালন করা হয়।
উপাসকরা তিনটি দুষ্ট শিখাযুক্ত প্রদীপে পান, শণ (গাঞ্জা) এবং তেল নিবেদন করেন।
এই পূজার লক্ষ্য হল জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সম্প্রীতি বয়ে আনা। সেই ত্রিনাথের মেলায় নাম কীর্তন করা
হত এবং স্ফূর্তিবশত অনেকে ঘোটা পান করত।
ছোটবেলা আমি মামাদের বাড়িতে থেকে
লেখাপড়া শিখেছি। সেজন্য আলীগাঁও অঞ্চলের অনেক
লোকের সাথে আমার পরিচয় ছিলো। তাই সুযোগ
পেলেই আমি মামাদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম।সেবার আমি মামাদের বাড়ি গিয়েছিলাম এবং
সন্ধ্যেয় ভাত খাওয়ার পর বাজারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাজারে গিয়ে দেখি তারাপদ
ফৌজদারের দোকানে অনেক লোক বসে রয়েছে। তাঁদের
মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে। অখিল
সূত্রধর, গোপাল সূত্রধর, বাদল বসাক প্রভৃতি। ঘটনাটা মনে হয় ১৯৭২ সালের। তাই সেখানে আরও অনেকে উপস্থিত ছিলো যদিও এখন সবার নাম আমার মনে নেই।অখিল সূত্ৰধর এবং গোপাল সূত্রধর আমার থেকে বয়সে বড়। অন্যরা প্রায় সবাই আমার সম বয়সী। অখিল সূত্রধর মামাদের সম বয়সী
ছিলেন। তাই তাঁকে আমি মামা বলে ডাকতাম
এবং তিনি আমাকে ভাগিন বলে ডাকতেন।
আমাকে দেখেই অখিল সূত্রধর বললেন-
এই ভাগিন এসেছে। ভাগিনকে প্রসাদ দে।
আমি বললাম- কিসের প্রসাদ?
অখিল
সূত্রধর বললেন- ত্রিনাথের মেলার প্রসাদ। দুধ দিয়ে তৈরি। খেতে খুব মজা।
গোপাল সূত্রধর একটি ছোট কাঁচের
গ্লাসে আমাকে প্রসাদ দিলেন।প্রসাদ
মানে দুধ।খুবই অল্প। দুধ দেখে আমার মন ভরল না।আমি এক চুমুকে দুধটুকু খেয়ে
ফেললাম। দুধটুকু খেয়ে বললাম-খুব মজা তো। থাকলে আর একটু দিন।
তখন অখিল সূত্রধর বললেন- এগুলো দুধ
না। খেলে নেশা হয়। আর খেয়োনা।যেটুকু খেয়েছ, সেটুকুতেই নেশা হবে।এগুলোকে ঘোটা বলে। দুধ এবং গঞ্জিকা দিয়ে বিশেষ
উপায়ে প্রস্তুত করা হয়। বেশি খেলে
প্রচুর নেশা হবে।তখন বাড়ি যেতে পারবে না।
ইতিমধ্যে মনে হয় আমার নেশা হয়ে
গেছিল। তাই কে শুনে কার কথা। আমি একগুঁয়ে
ভাবে বললাম- আর একটু দিতে বলুন। খেয়ে খুব
ভালো লাগছে।
অগত্যা গোপাল সূত্রধর আরও একটু ঘোটা দিলো।সেবার মনে হয় আগের থেকে একটু
বেশিই দিলো। সেটুকুও এক চুমুকে শেষ করে ফেললাম।
একটু পরেই আমার মাথা ঘূরাতে লাগলো। চোখে ঝাপসা দেখতে লাগলাম।যার দিকে তাকাই তার মুখই বেঁকা,
লম্বা দেখতে লাগলাম।আমি যেন
শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছি।আমার মতো
সবারই একই অবস্থা।সবাই বুঁদ হয়ে আবোলতাবোল বকতে
লাগলো এবং বসে বসে ঢুলতে লাগল।এক সময় আমি
বাড়ি যাওয়ার জন্য দোকান গৃহ থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। মামাদের বাড়ি বাজার থেকে হেঁটে
চার পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সেই
রাস্তাটুকু আসতে মনে হলো আমার যেন একঘণ্টা লাগলো।বাড়ি এসে শোয়ে পরলাম। শোয়ার পর বিছনা যেন চক্রাকারে
ঘূরতে লাগলো। আত্মা যেন বের হয়ে যাবে এরকম অনুমান
হতে লাগলো। বমি বমি ভাব হলো। চোখ মুদলে
একটু ভালো লাগে। একটু পরেই আবার মাথা ঘূরাতে থাকে। এভাবে একবার চোখ মুদে, আবার চোখ
খোলে অস্থিরভাবে সময় পার করতে লাগলাম। এক সময়
আমার অজান্তেই আমি ঘুমিয়ে পরলাম। পরের দিন
অনেক বেলায় ঘুম থেকে জাগনা পেলাম। আজ থেকে
প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের সেই স্মৃতি আজও আমার মনে সজীব হয়ে রয়েছে। তারপর অবশ্যে আর কোনদিন আমি ঘোটা
পান করিনি।
মানুষ ভেড়ার পাল
মানুষ
ভেড়ার পাল।এ বিষয়ে অনেক কল্প কাহিনী আছে। আমি সেই কল্প কাহিনীর দিকে না
গিয়ে আমার জীবনের দু’টি বাস্তব কাহিনী বলব। মানুষ ভেড়ার পালের মতো বলার অর্থ
হলো, আগের ভেড়া যেদিকে পেছনের ভেড়াগুলিও সেদিকে যায়। মানুষও ঠিক সেই রকম অর্থাৎ একজন
একটা কিছু করলে সেটা দেখে অন্যেও সেরকমই করতে চায় বা করে। এই সম্পর্কে দুটি উদাহরণ দিলে
কথাটা স্পষ্ট হবে। একবার
আমাদের কয়েক মোণ ধান সিদ্দ করার জন্য জলে ভিজানোর পর কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়াতে
ধানগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।নষ্ট মানে
গন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। পরে সেই ধান সিদ্দ করে চাল বার
করলেও ভাত রাঁধলে সেই ভাত কিছু গন্ধ করত। তাই কেউ
সেই ভাত খেতে চাইত না। প্রায় দুই
মোণ চাল ছিলো। প্রায় এক মাস খেতে হবে। তাই আমাদের চাচা ভেলু মিঞা একদিন
বললেন- চালগুলো বেচে দাও। এরকম গন্ধ
ভাত খাওয়া সম্ভব না।
১৯৬৬ সাল। আমি তখন
ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি মামাদের বাড়িতে থেকে গরলা-চাচরা এম,ই মাদ্রাসায়। গরমের বন্ধ ছিলো। তাই আমি বাড়িতে ছিলাম। আমি চাচার কথা শুনে প্রতিবাদ করে
বললাম- আমরা যে চালের ভাত খেতে পারি না, সেই ভাত লোকে খাবে কীভাবে?
তখন চাচা যুক্তি দর্শাল- আরে, আমরাও
তো খাচ্ছি না-কি? দৈনিক খেতে ভাল লাগছেনা তাই বিক্রীর কথা
বলছি। যারা চাল কিনে খায়, তারা এক দুই
কেজি করে চাল নিবে। তাই তারা নির্ঘাত খেতে পারবে।কোন অসুবিধা হবেনা।
অগত্যা বিক্রীর সিদ্ধান্ত
চূড়ান্ত হলো। তখন আমাদের জন্য সুবিধাজনক হাট
ছিলো গোয়ালপাড়া জেলার দলগোমা হাট। নৌকা করে
ব্রহ্মপুত্র নদ পারি দিয়ে হাটে যেতে হত। তখন অত্র অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র আমাদেরই বড়
নৌকা ছিলো। আমাদের নৌকায় করেই আমাদের পাড়ার
লোক দলগোমা হাটে যেত। চাল নিয়ে চাচার
সাথে আমি দলগোমা হাটে গেলাম। চালের হাটি
গিয়ে চাচা আমাকে চাল বিক্রী করতে দিয়ে তিনি গেলেন বাঁশ কিনতে। তখন আমাদের অঞ্চলের লোকেরা আম,
কাঁঠাল এবং প্রয়োজনীয় বাঁশ দলগোমা হাট থেকেই কিনতেন।
তখন চালের দর ছিলো আশী পয়সা কেজি। চাচা বললেন- আমাদের চাল যেহেতু
গন্ধ করে তাই পঁচাত্তর পয়সা হলে দিয়ে দিও।বাঁশ কেনা হলেই আমি চলে আসব।
আমি চালের বস্তা সন্মুখে নিয়ে বসে
রইলাম। গ্রাহকেরা দরদাম করতে লাগলো।আমি ৭৫ পয়সা দাম চাইলে গ্রাহকরা বলে সত্তর পয়সা। এভাবে অনেক গ্রাহক চলে গেলো। ইতিমধ্যে চাচা বাঁশ কিনে এসে চাল
বেচতে বসল। আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।একজন গ্রাহক এলো। চাচা দাম চাইল পঁচাত্তর পয়সা। গ্রাহক বললো- সত্তর পয়সা দিব।তখন চাচা বললেন- আপনাকে সত্তর
পয়সাই দিব, তবে অন্য গ্রাহক জিজ্ঞেস করলে পঁচাত্তর পয়সা বলতে হবে। গ্রাহক চাচার কথায় রাজি হয়ে গেলো। সেই গ্রাহক চাল নিবে দুই কেজি। দুই কেজি চাল মাফতে মাফতে অন্য
একজন গ্রাহক এসে জিজ্ঞেস করলো- চাল কত করে কেজি?
তখন চাচাকে আর দাম বলতে হল না। সেই আগের গ্রাহকই বললো- পঁচাত্তর
পয়সা।
তখন সেই গ্রাহক বললো- আমাকে তিন
কেজি দাও। সেই চাল জোখতে জোখতে অন্য একজন
গ্রাহক এলো। সে চার কেজি নিলো। এভাবে একঘণ্টার মধ্যে দুই মোণ
চাল পঁচাত্তর পয়সা দরে বিক্রী হয়ে গেলো।
গ্রাহকদের মনে এই মনোবিজ্ঞান কাজ
করছিলো, ও যদি ঠকেছে, আমিও ঠকব, তাতে কি এসে যায়!
এরকম অনেক
ঘটনা আছে। অনেকে এরকম ঘটনার সাক্ষীও হয়েছেন
নিশ্চয়। ইদানীং কালের একটি ঘটনা বলি। সালটা মনে হয় ২০১৪ ছিলো। আমি আর
আমার বাল্যবন্ধু সাকায়েত হোসেন হাউলি বাজারের একটি খোলা চায়ের দোকানে চিতি পিঠা
দিয়ে চা খাচ্ছিলাম। আমাদের পাশেই ছিলো একটি কাঁচা
মরিচের দোকান। দোকানটা ছিলো একেবারে হাতের
নাগালের মাঝে। সাকায়েত হোসেন একটি কাঁচা মরিচ
এনে চিতি পিঠা দিয়ে খেতে লাগলো।
কাচা মরিচ দিয়ে চিতি পিঠা খেতে দেখে
আমি কৌতূহলী হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তখন সাকায়েত হোসেন বললো- খেয়ে দেখ, কাঁচা
মরিচ দিয়ে চিতি পিঠা ভালই লাগে। তাঁর কথা
শুনে আমিও একটা কাঁচা মরিচ এনে পিঠা খেতে লাগলাম। আমাদের দেখাদেখি আরও অনেকেই
কাঁচা মরিচ দিয়ে চিতি পিঠা খেতে লাগলো। ধারণা হলো, মরিচের দোকানীর কমপক্ষেও
এক পোয়া মরিচের শ্রাদ্ধ হলো।
নৌকা বাইচের চরণধার
প্রত্যেক খেলা পরিচালনার জন্য
পরিচালক থাকে। যেমুন ফুটবল, ভলিবল খেলা
পরিচালনার জন্য রেফারি, ক্রিকেট, হকী খেলা পরিচালনার জন্য আম্পায়ার থাকে। নৌকা বাইচ পরিচালনার জন্য কমিটির
পাশাপাশি চরণধার থাকে। দু’টি নৌকা
বাইচ ধরলে তখন সেই বাইচ পরিচালনা অর্থাৎ বাইচ নীতি-নিয়ম অনুসারে পরিচালনা করা
হয়েছে, না হয়নি তা দেখার জন্য কমিটির তরপ থেকে দু’টি নৌকায় দু’জন লোক দেওয়া
হয় এবং তাঁদেরই চরণধার বলে।
আলীগাঁও বাজার তখন একেবারে নদীর
পারে। নদীটি বাজার থেকে অনুমান চার
পাঁচ রশি দক্ষিণ দিকে ছিলো। ১৯৮৮ সাল। আমরা আলীগাঁও বাজারের দক্ষিণ
পাশের ব্রহ্মপুত্র নদীতে একটি নৌকা
বাইচ অনুষ্ঠিত করেছিলাম। সোনার মেডেল দিয়ে নৌকা বাইচ। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিলো।তখন সেই কমিটিতে ছিলেন মুন্তাজ
দেওয়ানী, ফজল হক, আব্দুর রহমান, নারায়ন ঘোষ, মজিবর রহমান, নুরুল ইসলাম, হোসেন আলী,
আলী মহম্মদ, মাজম বেপারী, আশক আলী মাস্টার প্রভৃতিরাঁ। তখন এখনকার মতো অতো নৌকা বাইচের
প্রচলন ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র বাইচের
নোকা ছিলো তখন। আমাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত সেই বাইচে
তিনটি বড় নৌকা অংশগ্রহণ করেছিলো। আফছেরের
নৌকা, কিয়ামুদ্দিনের নৌকা, ভাতকুছির ছুনু গাওঁবুড়ার নৌকা, বিলাত গাওবুড়ার নৌকা প্রভৃতি। অবশ্যে অনেকগুলি ছোট ছোট নৌকাও
অংশগ্রহণ করেছিলো।
আফছারের নৌকা ছিলো ৪৭ হাত, কিয়ামুদ্দিনের নৌকা ৪২ হাত এবং ছুনু গাঁওবুড়ার নৌকা ৫২ হাত। বাইচের নৌকায় জারি গাওয়ার পরম্পরা রয়েছে। সেদিন আফছারের নৌকায় জারি গেয়েছিলেন মজর আলী এবং আব্দুল কাদের। পরবর্তীতে নৌকা বাইচ সম্পর্কে আফছার আলীর খুব নাম-ডাক হয়েছিলো।শুধু বরপেটা জেলাই নয়, গোয়ালপারা, কামরূপ(গ্রাম্য ও মেট্রো) এবং দরং জেলাও আফাছারের নৌকার নামডাক আছে। আফছারের নৌকা যেখানেই যেতো সেখানেই প্রথম হতো। দুৰ্ভাগ্যের বিষয় আফছার আলী কয়েক মাস আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। আফছার আলীর মৃত্যুর পর নৌকা বাইচের পরম্পরা অব্যাহত রাখার জন্য তাঁর সুযোগ্য ছেলে আব্দুল কাদের ৭৭ হাত একটি বাইচের নৌকা নির্মাণ করেছেন। নৌকাটা ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্তেম্বরে জলে নামিয়েছেন। সেই জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে মজিবর রহমান, কাশেম আলী, ডাঃ ছত্তর আলী,বাহাদুৰ আলী মাস্টাৰএবং স্বযং আমি উপস্থিত ছিলাম।
বর্তমান নৌকা বাইচের কথা বললেই
আফছারের নৌকার নাম প্রথমে উঠে আসে। তখন আফছার
আলী মনে হয় প্রথম বাইচের নৌকা বানিয়েছিলেন এবং আমাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত বাইচের আগে
মনে হয় তাঁরা শুধুমাত্র অন্য একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিয়ামুদ্দিনের নৌকা সর্বপ্রথম
আমাদের অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ করেছিলো।ছুনু
গাওঁবুড়ার নৌকাটা কিছু পুরানা ছিলো। সেই
প্রতিযোগিতায় আফছারের নৌকা প্রথম এবং ছুনু গাঁওবুড়ার নৌকা দ্বিতীয় হয়েছিলো।
আফছারের নৌকা এবং ছনু গাঁওবুড়ার
নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় আমি চরণধার ছিলাম। আমি চরণধার ছিলাম আফছারের নৌকায়
এবং গাঁওবুড়ার নৌকায় চরণধার ছিলেন আসক আলী মাষ্টার। হুইসেল দিয়ে যখন প্রথম বাইচ শুরু
করেছিলো, তখন অসাবধানতাবশত আমার মাথা নাওয়ের গলুইতে
লেগে আমি কপালে ভাল রকম আঘাত পেয়েছিলাম। সেই বাইচে আফছারের নৌকা জয়ী হয়েছিলো। সেটাই ছিলো আমার বাইচের নৌকার
প্রথম ও শেষ চরণধারগিরি।ফাইন্যাল
বাইচের সময় আলীগাঁও অঞ্চলের বিশিষ্ট মুরব্বী মুন্তাজ দেওয়ানী আফছারের নৌকার এবং
আলী মহম্মদ (ঠিকাদার) ছুনু গাঁওবুড়ার নৌকার চরণধার ছিলেন।
হা-ডু-ডু খেলার জাজ
১৯৮৩ সাল। আমি তখন সাতমুখী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তখন আমাদের বংগীয়মূলের মুছলমান অধ্যূষিত অঞ্চলে আমোদ-প্রমোদ বলতে শীতের দিনে ছিলো গীতিনাট্য যাত্রাপালার নাট্যাভিনয় এবং বর্ষার দিনে হা-ডু-ডু খেলা। যাত্রাগান শুরু হতো দূর্গাপূজার সময় থেকে এবং হা-ডু-ডু খেলা শুরু হতো বর্ষার প্রারম্ভে বৈশাখ মাস থেকে। হা-ডু-ডু খেলাগুলো বিশেষ করে ছোট খেলা থেকে অনেক সময় বড় খেলায় রূপান্তর হয়ে যেত। প্রথম এপাড়া ওপাড়া মানে পাড়া বেটে খেলা শুরু হত এবং সেই ছোট খেলাই কোন কোন সময় বড় খেলায় রূপান্তর হয়ে যেত। সেরকমই একটি ছোট খেলা থেকে বড় খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো মারাভাজ গ্রামে।ফাইন্যাল খেলায় অংশগ্রহণ করার কথা ছিলো জাউরিমারির হা-ডুডু দল এবং বাঘবরের হা-ডুডু দল।দুর্ভাগ্যবশত জাউরিমারির দল কোন বিশেষ কারণে খেলায় উপস্থিত না হওয়াতে বাঘবরের হা-ডুডু দল এবং মরাভাজের কমিটির হা-ডুডু দলের মাঝে খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বাঘবরের দলের হয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বাঘবরের হজার ছেলে হুরমূজ আলী, পলান আলী, হোসেন আলী(আমার ছোট ভাই),আশ্রব দেওয়ানীর ছেলে আনোয়ার হোসেন, মোন্নাফ আলী প্রভৃতিরা।আরও তিন চারজন ছিলো যদিও তাঁদের নাম এখন আমার মনে নেই। কমিটির দলের হয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বারণ গাঁওবুড়ার ছেলে অহেদ আলী, সাতমুখীর তমছের আলী, বাবুলাল সরকারের ছেলে নালে সরকার(লালমোহন সরকার), জলু মিঞা, বাক্কার আলী, শুকুর আলী, তমছের আলী, শিকিম আলী প্রভৃতিরা। নালে খুবই উচ্চমানের হা-ডুডু প্লেয়ার ছিলো। সেদিন নালের ক্ষেত্রে একটি অঘটন ঘটেছিলো। সে কথা পরে বলছি। আরও কয়েকজন প্লেয়ার ছিলো যদিও এখন তাঁদের নাম আমার মনে নেই। তারজন্য আমি দুঃখিত।
সেই খেলায় বিশিষ্ট ব্যক্তির মাঝে উপস্থিত ছিলেন, ইউসূফ সেক্রটারী, আব্বাছ দর্জি, বিল্লাল হোসেন মাস্টার, হালিম মাস্টার, আমজাদ আলী মাস্টার, কিতাব আলী (পোস্ট মাস্টার), মুন্নাফ আলী মাস্টার,ইনসান আলী মাস্টার প্রভৃতিরা এবং আমি স্বয়ং নিজে। খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো মরাভাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, কিন্তু জনসমাগম এতো বেশি হযেছিলো যে, খেলার জায়গা পরিবর্তন করে শেষমুহূর্তে গোবিন্দপুর রিজার্ভের পশ্চিমপ্রান্তে ইউসূফ আলী সেক্রেটারীর বাড়ির নিকটে অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো। সেই খেলায় রেফরী ছিলেন ইউসূফ আলী সেক্রেটারী। জাজ হিসেবে ছিলেন আব্বাছ আলী দর্জি এবং আমি স্বয়ং। আব্বাছ আলী দর্জি বসেছিলেন কোর্টের পশ্চিমপ্রান্তে এবং আমি বসেছিলাম কোর্টের পূর্বপ্রান্তে। সেদিন খুব রৌদ্র ছিলো। তাই রৌদ্রের উত্তাপে সবাই ঘেমে নেয়ে উঠেছিলো। খেলা মনে হয় তিনটের সময় শুরু হয়েছিলো। খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই নালের ঠেং ভেঙেছিলো। ঘটনাটা ঘটেছিলো একেবারে আমার চোখের সামনে। সেদিন বাঘবরের দল ছিলো কোর্টের উত্তরপ্রান্তে এবং কমিটির দল দক্ষিণপ্রান্তে। নালে একটু অহংকারের সাথেই খেলছিলো সেদিন। অহংকারই মনে হয় পতনের মূল হয়েছিলো। নালে ডাক দেওয়ার কয়েক সেকেণ্ড পরেই সঠিক মনে নেই, মনে হয় আশ্রব দেওয়ানীর ছেলে আনোয়ার তাঁকে ধরে ফেলেছিলো।আনোয়ারের সাথে সাথে পলান আলীও ধরে ফেলেছিলো। পলান আলী ধরার সাথে সাথে নালে মাটিতে পরে গিয়েছিলো। সাথে সাথে কে একজন প্লেয়ার জাম্প করে এসে নালের ডান ঠেঙের হাঁটুর নিচে হাঁটু গেঁড়ে বসে পরেছিলো এবং সাথে সাথে নালের ঠেং ভেঙ্গে গিয়েছিলো। সবাই ছেড়ে দেওয়ার পরেও নালে উঠছে না। তখন নালে বললো, মনে হয় আমার ঠেং ভেঙে গেছে। কেউ আমাকে ধরুন। কেউ একজন গিয়ে তাঁকে ধরে খাঁড়া করতে গেলো। নালেও দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। তখন নালের হাঁটু এবং গোড়ালির মাঝামাঝি জায়গায় চামড়া ফুটো হয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলো। অর্থাৎ রক্ত বের হওয়া স্থানেই ঠেংটা ভেঙেছিলো এবং ভাঙা হাড়ের খোঁচায় ফুটো হয়ে রক্ত বের হয়েছিলো। সাথে সাথে সাঙী করে তাঁকে গোয়ালপাড়া পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
আগেই বলেছি সেদিন খুব রৌদ্র ছিলো। সেই ঠেং ভাঙা দেখে সেদিন অনেকেরই
সাপের বাতাস লেগেছিলো। বলতে
লজ্জা লাগলেও বলতে হয়, সেই ঠেং ভাঙা দেখে আমিও সেদিন অস্থির অনুভব করেছিলাম।আমার অস্থিরতার কারণ ছিলো এই য়ে, যেহেতু
আমি জাজ, যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ঠেং কেমনে ভাঙলো, তখন আমি কি বলব! ঘটনাটা আমার চোখের সামনে ঘটলেও জঁটলার মাঝে আমি সঠিকভাবে লক্ষ্য করতে পারিনি, ঠেংটা কার দোষে, কেমনে
ভেঙেছিলো।যাহোক, ঠেং ভাঙা নিয়ে কেউ আমাকে
প্রশ্ন করেনি এবং আমাকেও উত্তর দিতে হয়নি। কারণ খেলায় সেরকম দুর্ঘটনা হতেই পারে।বলাবাহুল্য, পরে খেলাটা স্থগিত
রাখা হয়েছিলো।(তথ্য সংগ্রহে সহায়কারী খন্দকার বিল্লাল
হোসেন মাষ্টার, হোসেন আলী, পলান আলী এবং ময়সের আলী।)
ক্ৰিকেট খেলার আম্পায়ারিং
ক্রিকেট
খেলার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছিলো ১৯৭০ সাল থোকেই। এম, ই স্কুল আমি গরলা-চাচরা এম, ই
মাদ্রাসায় এবং হাইস্কুল কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করেছিলাম। তখন আমাদের বিদ্যালয়ে ‘নতুন অসমিয়া’ নামের দৈনিক খবর কাগজ রাখতেন। সেখানে ক্রিকেট খেলার খবর থাকত। সুনীল গাভাস্কারের বিষয়ে তখন
খুবই
প্রশংসা
করে লেখা হত খবরের কাগজে। খবরের
কাগজে ক্ৰিকেট খেলার বিবরণের সাথে স্কোর
বোৰ্ডও লেখা থাকত। আমি তখন ক্রিকেট খেলার বিষয়ে খুবই অনভিজ্ঞ ছিলাম। তাই স্কোরবোর্ড
দেখে কিছুই বুঝতাম না যদিও বুঝার চেষ্টা করতাম। তখন থেকেই আমি ক্রিকেটের
প্রতি কিছু আকর্ষিত হয়েছিলাম। বরপেটা গেলে মিউনিসিপাল ফিল্ডে ক্রিকেট খেলা হলে
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতাম এবং খেলাটা বুঝার চেষ্টা করতাম। তখন এখনকার মতো
ক্রিকেট খেলার জনপ্রিয়তা ছিল না। তাই ক্রিকেট খেলা কি অনেকে বুঝতই না। টিভি আসার
পর থেকে ক্রিকেট খেলার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এখন ছোট্ট শিশুও বুঝে ক্রিকেট
খেলা।
তখন আমাদের অঞ্চলের
কেউ ক্রিকেট খেলা বুঝতনা, তাই খেলার প্রতি কারো আগ্রহ ছিল না।এখনকার মতো ব্যাট-বল পাওয়ার কোন সূলভ উপায়ও ছিল না তখন। মনে হয় বরপেটাতেই তখন ক্রিকেট বল বা ব্যাট বিক্রী হতনা। ক্রিকেট খেলার প্রতি থাকা
আকর্ষণের ফলেই আমি ১৯৭৪ সালে গুয়াহাটী থেকে
একটি ক্রিকেট বল কিনে এনেছিলাম সাড়ে তিন টাকা দিয়ে। কিন্তু খেলার কেউ নেই বলে বলটা এমিনতেই বাড়িতে
পরেছিলো। ১৯৭৬ সালে আমি ১২৮৯ নম্বর সাতমুখি প্ৰাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করি। তখন আমজাদ
হোসেন, বিল্লাল হোসেন, ময়সের আলী, আব্দুল মান্নাফ, সেকান্দার আলী, জীবন আলী, সামেজ উদ্দিন এবং অন্যান্য কয়েকজনকে
খেলার
সাথী হিসাবে পেয়ে ছিলাম। এদের কয়েকজন কলেজের
ছাত্র ছিলো এবং কয়েকজন ছিলো নবগঠিত আলাবক্স এম,ই মাদ্রাসার শিক্ষক। এদের পেয়ে চেলাকাঠ দিয়ে ব্যাট বানিয়ে গুয়াহাটী থেকে কিনে
আনা সেই বল দিয়ে খেলা শুরু করে ছিলাম। চেলাকাঠের আঘাতে গুয়াহাটী থেকে আনা বলটা কয়েকদিনের মধ্যেই ফেটে গেলো। ফলে গাছের ডাল গোল করে কেটে ক্রিকেট বল
বানিয়ে সেই বল দিয়ে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করতাম। কোনো প্যাড নেই, এদিকে কাঠের
বল! তাই বল লেগে অনেকেই আহত হতাম। তবুও খেলা ছাড়তাম
না। স্কুল ছুটির পরে খেলা শুরু করতাম এবং বেলা ডুবার পর
খেলা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। তাই বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে
যেতো।
১৯৮৪ সালে আমি ৩৭১
নম্বর আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি।
আলীগাঁও আসাৰ পরও সেই চেলাকাঠের ব্যাট এবং গাছের ডালের বল দিয়ে ক্রিকেট
খেলা অব্যাহত রেখেছিলাম। আলীগাঁয় তখন খেলার সাথী ছিলো,
নারায়ন ঘোষ, নুরুল ইসলাম মাষ্টার, মোবারক দর্জি, জাকির হোসেন (জোনাব আলী)প্রভৃতিরা। এক সময় সবাই কমবেশি ক্রিকেট খেলা বুঝে উঠল এবং বলতে গেলে ১৯৯৪-৯৫ সাল
নাগাদ অনেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে খেলা শুরু করলো।
১৯৯৪-৯৫
সালে আমাদের অঞ্চলে কয়েকটি ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
হয়েছিলো। খেলা না বুঝলেও আমাকেই সেই সব খেলায়
আমাকেই
আম্পায়ারিং করতে হত। আমি লেগ বিফোর উইকেট আউট দিতাম না। অর্থাৎ আমি সঠিকভাবে লেগ বিফোর উইকেট আউট বুঝতামই না। তাই আউট দিতাম না।
একবার মন্দিয়ার ক্রিকেট দল এবং
মারাভাজের ক্রিকেট দলের মাঝে শিলোশি পাথারে অবস্থিত পালারপাম এম, ই স্কুলের নিকটে
একটি ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।সেই খেলার আগে নারায়ন ঘোষ আমাকে বলেছিলেন- আবুল, আজ আমি আম্পায়ারিং করব।
কথাটা শুনে আমি খুশীই হলাম। কারণ একটা খেলা পরিচালনা করা চারটি খানি কথা নয়! তবুও খেলার নিয়মনীতি অত ভালোভাবে জানিনা। সবার আবদারে খেলা পরিচালনা করি। তবে আমি খুবই নিরপেক্ষ ছিলাম। এজন্যই মনে হয় সবাই আমাকে খেলা পরিচালনার দায়িত্ব দিত।
খেলা শুরু হলো। নারায়ন ঘোষ আম্পায়ারিং করতে লাগলো। নারায়ন ঘোষ মাঝেমধ্যই ভুল ও পক্ষপাতিত্বমূলক সিদ্ধান্ত দিতে লাগলো। সেজন্য ক্রিকেট দল এবং দর্শকের মাঝ থেকে দাবি উঠলো, আমাকেই আম্পায়ারিং করতে লাগে। ফলে নারায়ন ঘোষ আম্পায়ারিং বাদ দিলো এবং আমি খেলা পরিচালনা করলাম।তখন সুষ্ঠুভাবে খেলা অনুষ্ঠিত হলো।পরে আমি বাঘবর এবং কাহিবারীতে অনুষ্ঠিত কযেকটা খেলায়ও আম্পায়ারিং করেছিলাম।
সভাপতি হিসাবে সভা পরিচালনা
১৯৯৬ সাল। পালারপাম এম, ই মাদ্রাসার বার্ষিক অধিবেশন।বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বসির উদ্দিন আহমেদ, সহকারী শিক্ষক
হুরমূত আলী, আম্বিয়া আহমেদ একদিন আমাদের বাড়ি এসে একটি লেফাফা আমার হাতে দিয়ে
বললেন- আমাদের স্কুলের বার্ষিক অধিবেশন। অনুমতি ছাড়াই আপনাকে খোলা অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নাম
দিয়েছি। চিঠি হাতে দিলো। চিঠি খোলে পড়ে দেখলাম সত্যিই সভাপতি হিসেবে আমার নাম
দিয়েছে। তখন আমি বললাম- আমি তো সভাপতি
হিসেবে এখন পর্যন্ত কোন সভা পরিচালনা করিনি। গতবারের অধিবেশনে রাধেশ্যাম গাঁওবুড়া সভাপতি ছিলেন। এবারও তাঁকে দায়িত্ব দিলেই তো পারতেন। আমার তো মনে হয় না আমি সভা পরিচালনা করতে পারব।
তখন বসির উদ্দিন
বললেন- পারবেন বলেই তো দিয়েছি। আপনারা নাটক করা লোক, তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে আপনি পারবেন।
অগত্যা নিরূপায় হয়ে
নির্দ্ধারিত দিনে সভাপতির আসন গ্রহণ করে সভা পরিচালনা করলাম। সেদিন আমি গতানুগতিক উপায়ে সভা পরিচলনা না করে একটু ভিন্ন
ধরণে সভা পরিচালনা করেছিলাম।প্রতিটি কার্যসুচি উপস্থাপনের আগে আমি বিষয়বস্তুটির সম্যক ধারণা দিয়ে যেতে
লাগলাম। যেমন, জিকিরজারি, বিহুগীত, ভাওয়াইয়া
প্রভৃতি গীত পরিবেশেনের আগে উক্ত গীত সম্পর্কে ধারণা দিয়ে গেলাম। যেমন কার্যসূচি ঘোষণা করার সময় জিকিরজারির
উৎপত্তি ও তাৎপর্য, বিহুগীতের উৎপত্তি ও তাৎপর্য, ভাওয়াইয়া গীত কি এই সম্পর্কে ধারণা দিয়ে গেলাম।গীত পরিবেশনের পরেও গীত পরিবেশনকারী শিল্পীদের উৎসাহিত করার
পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও করে যেতে লাগলাম। একজন বক্তাই বক্তৃতা প্রদান করার আগে বক্তা সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে গেলাম
এবং বক্তার বক্তৃতা শেষে বক্তৃতা সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে গেলাম। এভাবে একটু অগতানুগতিক উপায়ে সভা
পরিচলানা করলাম। সভা শেষে শিক্ষকরা বললেন- সভাপতি
হিসেবে আপনি আজ গতানুগতিকভাবে সভা পরিচালনা না করে নতুন একটি ধারা চালু করলেন। দেখবেন, পরবর্তীতে এই ধারা জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। শিক্ষকরা কথাটা যথার্থই বলেছিলেন। পরবর্তীতে আমি আমাদের অঞ্চলের অনেককেই আমার পদ্ধতি
অনুসারেই সভা পরিচালনা করতে দেখেছি। পরেও আমি স্কুল এবং ক্লাব পর্যায়ের কিছু সভা পরিচালনা করেছি এবং প্রশংসিতও
হয়েছি।
বাহুল্য হলেও আরও একটি
কথা বলে রাখি। আগে কোন যাত্রা, নাটক অনুষ্ঠিত হলে
প্রচারের সময় বলতেন- আজ অমুক রঙ্গমঞ্চে অমুক নাটক বা যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে। আমি রঙ্গমঞ্চের আগে অস্থায়ী শব্দটা
বসিয়ে দিলাম। এখন প্রায় সবাই রঙ্গমঞ্চের আগে
অস্থায়ী শব্দটা ব্যবহার করে। আরও একটা কথা এখানে যোগ করতে চাই। আমাদের অঞ্চলে মানে মাণিকপুর অঞ্চলে রোজার সেহেরি গ্রহণের আগে রোজাদারদের
সজাগ করার জন্য মাইক দিয়ে ডাকা-ডাকি প্রথম শুরু করেছিলেন আমার ছেলেবেলার বন্ধু তথা
অভিভাবক ইসমাইল হোসেন ডাক্তার। এর পর থেকে আমাদের অঞ্চলে মসজিদে মসজিদে মাইক ব্যবহার চালু হয়েছিলো।
একটি ভিন্নস্বাদের গল্প
১৯৯২ সালের
কথা। তখন আলীগাঁয়ের পুরানা বাজার ভেঙে আগের বাজার থেকে একটু উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত হাকিম মুন্সির ভাই হোসেন
আলীর জমিতে আলীগাঁও বাজার স্থাপন করা হয়েছিলো। আলীগাঁও বাজারের পূর্বপ্রান্তে তমছের ভাইর বাড়ি। তমছের ভাইর বাড়ির সামনে কিছু ফাকা জায়গা ছিলো। সেখানে বলতে গেলে নিয়মিত রামি, ফিস, ব্রীজ প্রভৃতি তাস
খেলা হত। আমার স্কুল ছিল বাজার থেকে একটু
পূবে রাস্তার দক্ষিণ পাশে। স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় তমছের ভাইর বাড়ির পাশ দিয়ে আমাদের বাড়ি
যেতে হত। তাই আমি স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি
যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে সেই খেলা উপভোগ করতাম।
সেদিন স্কুল ছুটি দিয়ে
বাড়ি যাওয়ার সময় অন্যান্য দিনের মতো তমছের ভাইর বাড়ির সামনে বসে তাস খেলা উপভোগ
করছিলাম। হঠাৎ করে আমার মৃদু মৃদু পেট ব্যথা
করতে লাগলো। তখন আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে নয়,
এমনি স্বগোক্তির মতো বললাম-পেট ব্যথা করতেছে। মনে হয়
গ্যাষ্ট্রিকের ব্যথা, কাঁচা পেপে খেতে পারলে ভালো হত। এভাবে বলে আমি পেট ধরে বসে রইলাম।
একটু পরে আমির বাদশাহ
নামের একটি ছেলে দুটি পেপে এনে আমার হাতে দিলো। পেপে দেখে আমি অবাক। ছেলেটি এক সময় আমার ছাত্র ছিলো। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম-পেপে! পেপে কোথা থেকে আনলি? কেন
আনলি?
তখন আমির বাদশাহ বললো-
আপনার বোলে পেট ব্যথা করতেছে। আপনি একটু আগে যে বললেন পেপে খেলে বোলে পেট ব্যথা ভালো হয়, তাই আনলাম।
তাই নাকি? আমি বললাম- কার গাছ থেকে এনেছিস। বলে এনেছিস তো?
আমির বাদশাহ বললো- না, বলে আনি নি। না বলেই ছিঁড়ে এনেছি।
আমি জানি, আমির
বাদশাহর স্বভাব ভালো নয়। লেখা-পড়া ছেরে তখন চুরি ছেঁচড়ামি করে। তাই আমি বললাম- নারে, এ পেপে আমি খাব না। তুই পেপে ফিরিয়ে দিয়ে আয়।
তখন আমির বাদশাহ বললো-
আমি পয়সা দিয়ে দিব। তাহলো তো খাবে?
পয়সা দিস তো খেতে
পারি এভাবে বলে আমি পকেট থেকে দু’টি টাকা বের করে আমির
বাদশাহর হাতে দিলাম। প্রথমে অবশ্যে আমির বাদশাহ টাকা নিতে চাইলনা। যখন আমি বললাম, পয়সা না নিলে খাব না, তখন সে পয়সা নিলো এবং
তমছের ভাইর বাড়ি থেকে একটা কাটারি এনে পেপে কেটে দিলো। তখন সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই সেই পেপে ভাগাভাগি করে
খেলাম।
এই ঘটনার দিনগত রাতে
অনুমান দুটোর দিকে বাজারের নিকট থেকে বিকট চিৎকারের শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। শব্দ খুবই বিকট। যেন অনেক লোকে মিলে কাউকে বেদম প্রহার করতেছে। আমাদের বাড়ি থেকে বাজার প্রায় তিন পোয়া মাইল দূরে। ফজল মামার বাড়ি আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে। আমাদের বাড়ির প্রায় পাশাপাশি। আমি ঘরের বাইরে এসে বাইর বাড়ি
দাঁড়িয়ে কান খাঁড়া করে শব্দের উৎস অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। শব্দটা হচ্ছিল বাজারের পশ্চিমপ্রান্তে।মনে হলো বাজারের একেবারে পাশাপাশি। কিছু সময় সেভাবে দাঁড়িয়ে থেকে মামাদের বাড়ি গিয়ে মামাকে
ডেকে বললাম- মামা, শুনতে পাচ্ছেন কি, বাজারের দিকে যে বিকট চিৎকারের শব্দ হচ্ছে?
হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। মামা বললেন- মনে হয় কাউকে বেদম প্রহার করতেছে। মনে হয়, বাজারের পশ্চিম পাশেরই কারো
বাড়িতে কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে। এভাবে বলে মামা বললেন- এতো রাতে আর কি করব। কাল সকালে বাজারে গেলেই সব শুনতে পারব। যাও, এখন শোয়ে থাকগে’।
বাডি় এসে আমি বিছানায়
শোয়ে পড়লাম যদিও আমার ঘুম এল না। কি হয়েছে, কাকে মারছে এই কথাটা
মাথায় ঘূরপাক খেতে লাগলো।
বেলা উঠার একটু আগে আগে মামা আমাকে
ডেকে বললেন- আবুল, এস তো।
আমি জেগেই ছিলাম। তাই সাথে সাথে গৃহের ভেতর থেকে বললাম- এক্ষুণি আসতে হবে?
হ্যাঁ, এক্ষুণি এস।
আমি মামাদের বাড়ি
গিয়ে দেখি মামা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আমির বাদশাহর পিতা জংসের আলীর সাথে কথা বলতেছে।আমাকে দেখে মামা বললেন- রাতে যে চিৎকারের শব্দ শুনতে পেয়েছি, সেটা ছিলো আমির বাদশাহর চিৎকারের শব্দ। চুরি করতে গিয়েছিলো মবেদ মুন্সির বাড়ি। ধরা পরেছে। তাই অমুকে অমুকে মারতেছে। চল, দেখি কি করা যায়।
জংসের আলী অনুনয়ের
সুরে বললেন- দয়া করে চলুন, না হলে ওরা আমির বাদশাহকে মেরে ফেলবে।
কে কে মারতেছে? আমি প্রশ্ন করলাম।
কয়েকজনে মিলে মারতেছে। তার মধ্যে অমুক অমুক রয়েছে।(নাম বলেছিলো, তবে নিরাপত্তার কারণে আমি নাম বললাম না)।
মামা জংসেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
এখন বাড়ি যাও, আমরা হাতমুখ ধোয়ে আসতেছি।
জংসের আলীকে বাড়ি
পাঠিয়ে দিয়ে আমরা হাতমুখ ধুয়ে মবেদ মুন্সির বাড়ি এলাম। মবেদ মুন্সির বাড়ি বাজারের পশ্চিম
দিকে একেবারে বাজারের নিকটে রাস্তার দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। ইতিমধ্যে ফরসা হয়ে উঠেছিলো। তাই অনেক লোক জড়ো হয়েছিলো মবেদ মুন্সির উঠোনে। আমির বাদশাহ উঠোনে শোয়েছিলো এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলো। তার ঠেং দুটো ঢোলের মতো ফুলে উঠেছিলো। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ঠেঙে বস্তা পেঁচিয়ে তাকে কুড়োল
দিয়ে প্রহার করেছে।
আমাকে দেখে আমির
বাদশাহ হামাগুড়ি দিয়ে কাঁতরিয়ে কাঁতরিয়ে আমার কাছে এসে বললো- আমাকে বাঁচান। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
আমির বাদশাহর অবস্থা
দেখে আমার মনে সহানুভূতি উদয় হলো। তবু আমি সহানুভূতি না জানিয়ে রাগ করে বললাম- কেন চুরি করার সময় মনে ছিল না। বদমাশ কোথাকার। ওরা তো তোকে কমই মেরেছে। আমি হলে আরও মারতাম। লেখাপড়া ছেড়ে এখন চুরি করে বেড়াস। তোদের মতো ছেলেদের মেরে ফেলাই উচিত।তোরা সমাজের আবর্জনা বই কি!যতসব বদমাশের দল।কেউ দাওতো একটা লাঠি, আমিও দুই এক ঘা
মারি।
যাহোক কেউ লাঠিও দিল না, আমি মারলামও না।
যারা যারা মেরেছে তাঁদের একজনকে
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমার সম্পর্কিত বেয়াই। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম- ঠিক মতো
মেরেছেন। আরও মারা উচিত ছিলো। কাজ অনুযায়ী শাস্তি কম হয়েছে।
তখন সেই লোকটি বললেন-
মারার আর জায়গা নেই। থাকলে নিশ্চয় মারতাম।
আমি বললাম- জবরদস্ত মার মেরেছেন। অবশ্যেই আর মারার জায়গা নেই। এক কাজ করেন, এখন একে পুলিশ খবর দিয়ে থানায় পাঠিয়ে দিন। বাজারে লোক আসতে শুরু করেছে। চোরের খবর পেলে সবাই দেখতে আসবে। চোর দেখলে তো সবারই হাত উসখুস করে। কে এসে কোথায় মারবে বলা যায়না। বেজায়গায় আঘাত লাগলে মরেও যেতে পারে।মরে গেলে, সব দোষ কিন্তু তখন আপনাদের দুই চারজনের ঘাড়ে
পরবে। কারণ আপনারা আগে মেরেছেন। তাই আর মেরে কাজ নেই। তাড়াতাড়ি থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
আমার কথা শুনার পর আর
কাউকে মারতে দিলনা। পুলিশ খবর দিয়ে থানায় পাঠিয়ে দিলো।অর্থাৎ আমির বাদশাহ বেঁচে গেলো।
এই ঘটনার প্রায় সাত আট
বছর পর একদিন আমির বাদশাহর সাথে আমার সত্রকনরা বাজারে দেখা। তখন নদী ভাঙার জন্য আমরা যতিগাঁয় উঠে
এসেছি এবং তখন যতিগাঁও থেকেই স্কুলে যাতায়াত করি। আমাকে দেখে আমির বাদশাহ এগিয়ে এসে বললো- চল।
আমি বললাম- কোথায়? আগে বল, তুই ভালো আছিস তো?
হ্যাঁ ভালোই আছি। এখন আমি ছোটখাট ঠিকাদারি করি।
তাহলো তো খুব ভালো কথা। আমি তো যতিগাঁয় উঠে গেছি। বরপেটা গেলে একদিন আমাদের হাড়ি যাস। কোথায় থাকি দেখে আসবি।
আমির বাদশাহ বললো-
বরপেটা গেলে নিশ্চয যাব। এভাবে বলেই সে বললে- চল, তোমাকে মিস্টি খাওয়াব।
মিস্টি খাওয়াতে হবে না। বলেছিস তাতেই আমি খুশি হয়েছি।
না আজ খেতেই হবে। না খেলে মনে খুব কষ্ট পাব।এখন আমার সব হালাল কামাই। অসৎ কামাইর পয়সা না।
শেষে একপ্রকার জোর
করেই আমাকে মিস্টির দোকানে নিয়ে গিয়ে মিস্টি খাওয়ালো। আমি দশ টাকা দামের দু’টি মিস্টি খেলাম।
আমি বুঝতে পারলাম, সাত
আট বছর পূর্বে যে উপকার করেছিলাম আমির বাদশাহ মিস্টি খাইয়ে অঘোষিতভাবে সেই উপকারের
প্রতিদান দিলো।
চিকিৎসার
সাথে জড়িত
১৯৮৩ সালে আমাদের
বাঘবর অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার তাণ্ডব শুরু হয়েছিলো এবং ম্যালেরিয়ায় আমাদের ছোট ভাই জহুরুল হকের
মৃত্যু হয়েছিলো। জহুরুলের মৃত্যুর পরেও
আমাদের অঞ্চলে মেলেরিয়ার
তাণ্ডব অব্যাহত ছিল, কিন্তু ডাক্তারের স্বল্পতার জন্য রোগীর ঠিক মতো চিকিৎসা হচ্ছিল
না।
তখন বাঘবর অঞ্চলে একমাত্র ডাক্তার ছিলেন
মোকসেদ আলী। গরেমারি পাথারের লোক। এমবিবিএস নয়। এলএমপি পাস ডাক্তার। অনেকে তখন
ডাক্তারি বিষয়ে অধ্যয়ন না করেই কোন একজন ডাক্তারের
অধীনে কিছুদিন প্রেকটিস করে কলকাতা থেকে সার্টিফিকেট কিনে এনেও ডাক্তারি
করতেন এবং ডাক্তারের স্বল্পতার জন্য সরকার তাঁদের অনেককে
গ্রাম্যাঞ্চলের হসপিটালে নিয়োগ করতো। তবে মোকসেদ আলী
সত্যিকারেই এলএমপি পাস ছিলেন। তিনি
প্রতিটি মেলেরিয়া ইনজেকশ্বনের জন্য দশ টাকা করে নিতেন। আমাদের পাড়ার সবাই তখন নদীর ভাঙনের কবলে পতিত লোক। জমি-জমা নদীর পেটে। আয়ের কোনো উৎস নেই। তাই দশ টাকা করে দেওয়াটাই তাদের
পক্ষে কঠিন ছিলো। টাকার জন্য অনেকেই
চিকিৎসা করাতে
পারত না।
বাঘবর সপ্তাহে দুদিন হাট বসত। বুধবার এবং রোববার। বাঘবর বাজারে
তখন মজিদভিটার আব্বাছ আলী নামের একজন লোক হাটবারে
ঔষধ বিক্রী করতেন। আমি প্রায়ই তাঁর দোকানে বসে
থাকতাম। কথায় বলে,
খাতির রেখ ওষুধের
দোকানী(ফার্মাসিষ্ট) এবং আতরের বেপারির সাথে। কারণ ঘ্রানেন অর্ধ ভোজনং। আমি অবশ্যে
সে জন্য নয়,
সময় কাটানোর জন্যই তাঁর দোকানে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমি হাটের দিন সময় কাটানোর জন্য আলীগাঁও বাজারের নিরোদ সাহার দোকানেও বসে থাকতাম মাঝেমধ্যে। নিরোদ সাহা কাপড়ের দোকানী ছিলেন। নিরোদ
সাহাকে
আমি মামা বলে ডাকতাম। তাঁর দোকানটা খুবই ছোট ছিল। কয়েকটা লুংগী, শাড়ী
এবং গামছা নিয়ে বসে থাকতেন তিনি। তাঁকে আমি একদিন এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি
বলেছিলেন- কাপড় অবশ্যে বেশি করে তুলতে পারি, কিন্তু
অসুবিধা আছে। কাপড় বেশি থাকলে গ্ৰাহকেরা বাকি নিবে। আমার চালান কম। তাই বাকি দিলে আমার দোকান লাটে উঠবে। তাই বেশি মাল তুলিনা। একটি কথা মনে রেখ, লাখ
টাকা চালান নিয়ে দোকান দিলে সেই দোকান আদৌ টিকে না। যে কম টাকা চালান নিয়ে দোকান
শুরু করে, তাঁর দোকানই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
তিনি অবশ্যে কথাটা মিথ্যা বলেনি। আমি পাণ-তাম্বুলের
দোকানী থেকে বড় গেলামালের দোকানী হতে দেখেছি। পক্ষান্তরে প্রথমেই
বেশি চালান নিয়ে দোকান শুরু করা বড় বড় দোকানীকে লাটে
উঠতে দেখেছি। শুধু টাকা থাকলেই ব্যবসায়ী হওয়া যায় না। ব্যবসা শিখে তবে ব্যবসা
করতে হয়।
এখন কাজের কথায় আসি। সেদিন আমি আব্বাস আলীর
দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ মেলেরিয়ার চিকিৎসার কথা উঠল।তখন আব্বাস আলী বললেন- না, মেলেরিয়ার
ঔষধের দাম তেমন বেশি না। পনের টাকা হলে ত্রিশ এম্পলের একটা ক্লুর’কুইনের শিশি পাওয়া যায়। দুই এম্পল করে
ইনজেকশন দিতে হয়। তাই একটা ইনজেক্শ্বন মাত্র এক টাকা করে পরে। আপনি
এক কাজ করুন। ইনজেক্শ্বন দেওয়া শিখুন। আমি শিখিয়ে দেব। আগামী হাটে আমি সিরিঞ্জ
নিয়ে আসব।
তখন এখনকার মতো ‘ওয়ান
টাইম’ সিরিঞ্জ ছিল না। কাঁচের সিরিঞ্জ ছিল।একটা সিরিঞ্জ এবং
সুঁই দিয়ে শত শত রোগীকে ইনজেক্শ্বন দেওয়া যেত। আব্বাস আলী পরের হাটেই সিরিঞ্জ ও সুঁই
নিয়ে এলেন। আমি পনের টাকা দিয়ে
একটি ক্লুর’কুইনের শিশি নিয়ে এলাম। পরের দিন থেকে মরণে শরণ
দিয়ে ইনজেক্শ্বন দেওয়া শুরু করলাম। ভাবটা ছিল, ইনজেকশন দেওয়ার দরুন, আমাকে যদি বিপদে পড়তে হয়, পড়ব,
তবুও যেন বিনা চিকিৎসায় মেলেরিয়া রোগী মারা না যায়।
সকাল বেলা রোগীর ভিড় লাগত। বিনা পয়সায়
ইনজেশ্বন দিতাম। রোগীও ভালো হতো।
এখনও আমি ভেবে ঠিক করতে পারি না, রোগীর
জীবন নিয়ে এভাবে খেলা করাটা কি ঠিক হয়েছিল? অবশ্যে আমার
হাতে কোনো রোগী মরেনি। বলতে গেলে, একশ শতাংশ রোগীই ভালো হতো।
রোগীর কথাই যখন উঠেছে তখন চিকিৎসা সম্পর্কিত দু’টি ঘটনা বলি। প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৩ সালে। আমার শশুড় আব্বার চোখের
অসুখ ছিল। তাঁকে নিয়ে একদিন আমি কোচবিহার গিয়েছিলাম। শীতের দিন। শশুড় বাড়ি
অর্থাৎ ভেড়ারপাম থেকে বিকেল তিনটেয় কোচবিহারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা
হলাম। বরপেটারোড থেকে বিকেল সারে পাঁচটার রেলে চড়লাম। মিটারগজ রেল। গরুর গাড়ীর মতো চলে। বাসের মতো রাস্তায় রেল থামিয়েও লোক
উঠা-নামা করে। সকাল ছয়টায় কোচবিহার পেলাম। স্টেশনের পাশের একটি চায়ের
দোকানে চা খেয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম। সকাল দশটায় ডাক্তার এলেন। রোগীর ভিড় লেগে ছিল। তাই ডাক্তার দেখিয়ে
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেড়োতে বারটা পার হয়ে গেল। একটি ফার্মাসিতে গিয়ে ওষুধও
কিনলাম।
আমার তখন খুবই ক্ষিদে পেয়েছে। আগের দিন বিকেল
তিনটেয় ভাত খেয়েছি। এর মাঝে রেলে শুধু তিন চারটে কমলা এবং কোচবিহার নেমে একবার
চা খেয়েছি। আমি আমার শশুড় আব্বাকে বললাম- আব্বা, ক্ষিদে পেয়েছে। চলুন
ভাত খেয়ে নিই।
শশুড় আব্বা বললেন-
চল, আমারও ক্ষিদে পেয়েছে। ভাত খেয়ে নিলে ভালো লাগবে।
একটি হোটেলে গেলাম। হিন্দু হোটেল। শশুড় আব্বা
হিন্দু হোটেলের কথা শুনেই বললেন- যদি কোথাও মুসলিম
হোটেল আছে, সেখানে চল। আমি হিন্দু হোটেলে ভাত খাব না। যদি মুসলিম হোটেল পাওয়া না
যায়, অসুবিধা নেই। তুমি খেয়ে নাও। আমি না খেলেও অসুবিধা
হবে না।চা-টা খেয়ে নিব।
একজনকে মুসলিম হোটেলের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে
বলল- কাছে কোথায় মুসলিম হোটেল নেই। মুসলিম হোটেল অনেকটা দূরে। রিক্সা নিয়ে যেতে
হবে।
দূরের কথা শুনে হতাশ হলাম। ভাত না খেয়েই
স্টেশনে এলাম। টিকট কাটতে গিয়ে দেখি আমার পকেটে টাকা নেই। আমি পাগলের মতো এ-পকেট
ও-পকেটে টাকা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু সব বৃথা! কোথাও টাকা নেই। শীতের দিনেও আমি
ঘেমে নেয়ে উঠলাম। শশুড় আব্বাকে কথাটা বলতেও লজ্জাবোধ হলো। শশুড় আব্বা কি ভাববে? কেমন
জামাই! সামন্য কয়টা টাকাও সামলাতে পারে না! এরকম দুঃশ্চিন্তা আর কি!
এক সময় আমার অবস্থা দেখে শশুড় আব্বা জিজ্ঞাসা
করলেন- কি হয়েছে?
পাগলের মতো কি খুঁজতেছ?
তখন আমি নিরুপায়
হয়ে বললাম- টাকা পাচ্ছি না।
শশুড় আব্বা বললেন-
টাকা পাচ্ছ না,
মানে? ভালো করে খুঁজে দেখ।
আমি বললাম- ভালো করেই খুঁজেছি। কোথাও নেই।
শশুড় আব্বা বললেন-
তাহলে এখন কি হবে?
টিকেট ছাড়া যাব কেমনে?
আমি বললাম- দেখি কি করতে পারি!
আমি স্টেশন মাষ্টারের কাছে গিয়ে টাকা হারানোর
কথা বললাম। স্টেশন মাষ্টার লোকটা ভালো ছিলেন। তিনি আমার মুখের দিকে চেয়ে বললেন-
যান, বসে থাকুনগে’। ট্রেইন এলে ট্রেইনে
চড়ে যাবেন। আমি টি,টি,ইকে বলে দেব।
টিকেটের সুরাহা
হওয়ার পরে আমি ঠাণ্ডা মাথায় টাকা খুঁজতে লাগলাম। তখন টাকা পেয়ে গেলাম। আমি টাকা
রেখেছিলাম আণ্ডার প্যান্টের পকেটে। তখন এখনকার মতো জাঙ্গিয়া ছিল না। সুতির কাপড় দিয়ে ঢোলা করে আণ্ডারপ্যান্ট বানিয়ে পড়তে হতো। ঢোলা
আণ্ডারপ্যন্টের পকেটটা আমার পেছনের দিকে গিয়েছিল। তাই
টাকা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পেছনে হাত দিতেই টাকা পেয়ে গিয়েছিলাম
এবং দস্তুর মতো টিকেট কেটে বরপেটা রোড এসেছিলাম। রাস্তায় টিটিই(ট্রেভেলিং টিকেট এক্সজামিনার)অবশ্যে আমাদের টিকেট চেক্
করেনি।
সেখান থেকে আমার একটা শিক্ষা হয়েছিল, টাকা
কোনোদিন এক জায়গায় রাখতে নেই, ভাগ ভাগ করে দুই
তিনটি জায়গায় রাখা দর্কার।
আমার জীবনে আমি সাতজন লোকের উকিল হয়েছি।
হায়েত আলী নামের একজন লোকেরই আমি চার বার উকিল হয়েছি। প্রথম বউ ফাঁসিতে
ঝুলিয়ে এবং দ্বিতীয় বউ মেলেরিয়া হয়ে মারা গিয়েছিল। তৃতীয়
বউয়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তালাক দিয়েছিলেন। চতুর্থ বউ এখনও জীবিত।মৃত্যুর
আগে পৰ্যন্ত তাঁকে নিয়েই ঘর-সংসার করে গেছেন।
বয়েসে ছোট হলেও উকিল শশুড় হিসাবে হায়েত আলী
আমাকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ছেলেমেয়েরাও আমাকে আপন নানার মতোই শ্রদ্ধা-ভক্তি এবং ডাকা-খোঁজা
করে। আমিও তাদের আপন নাতি-নাতনির মতোই স্নেহ করি।হায়েত আলী ২০২২
সালের অক্টোবর মাসে এন্তকাল
করেছেন।
হায়েত আলীর কানের রোগ হয়েছিল। অসুখ-বিসুখের
ক্ষেত্রে এক সময় তিনি আমার পরামর্শ ছাড়া কিছুই করতেন
না।
তাই তাঁর কানের চিকিৎসার জন্য কয়েকবার তাঁকে নিয়ে বরপেটা, গুয়াহাটীতে
গিয়েছি। কিন্তু অসুখ ভালো হচ্ছে না। তাই তিনি
চিকিৎসার জন্য কোচবিহার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
১৯৭৬ সাল। তখন এখনকার মতো ভাবলাম, আর চলে গেলাম এরকম সুবিধা ছিল না। বাঘবর থেকে বরপেটা
আসতে হলেই
চার
পাঁচ দিন আগে থেকে ভাবতে হতো। আর কোথায় কোচবিহার! পনের দিন আগে আমরা সিদ্ধান্ত
নিলাম অমুক দিন কোচবিহার যাব। আমরা কোচবিহার যাওয়ার কথা শুনে পাড়ার আরও দশজন লোক আমাদের
সাথে কোচবিহার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। জানি, এতগুলো লোক নিয়ে গেলে আমার
অসুবিধা হবে। কারণ কেউ লেখা-পড়া জানে না। রাস্তায় চলাফেরা করারও জ্ঞান নেই। তবুও
মানা করতে পারলাম না। অগত্যা নির্দ্ধারিত দিনে আমরা কোচবিহার রওয়ানা
হলাম।
বরপেটা এসে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু আব্দুল
জব্বারের সাথে সাক্ষাৎ হলো। বলে কইয়ে তাকেও আমাদের সংগী করলাম। বরপেটা রোড
গিয়ে রেলে চড়লাম। রেলে যাত্রীর ভিড়। তেরজন লোকের সবাই বসার জায়গা পেলাম না।
চার পাঁচজন দাঁড়িয়েই থাকতে হলো। ডাবাটায় কয়েকজন মিলিটারি ছিলেন। আমাদের সাথে হায়েত আলীর ছোট ভাই পলান আলী ছিল। তার পাশেই একজন
বৃদ্ধগোছের মিলিটারি শোয়ে ছিলেন। পলান তাঁর শরীরে ধাক্কা দিয়ে বলল- উঠেন, জায়গা
দিন। আপনারা শোয়ে যাবেন, আর আমরা দাঁড়িয়ে
যাব নাকি?
আমিতো থ মেরে গেলাম। মিলিটারির শরীরে ধাক্কা!
কি যে হয়! কিন্তু মেলিটারি লোকটি কিছু বললেন না। তিনি
শোয়া থেকে উঠে পলানকে বসতে দিলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
সকাল আটটায় কোচবিহার পৌঁছোলাম। সরকারি হাসপাতালে গেলাম। তখনও ডাক্তার আসেনি। এতোগুলো লোক! কিভাবে ডাক্তারকে দেখাব এ নিয়ে ভাবা-গোনা
করতেছি। এমন সময় একজন পঞ্চাশোর্দ্ধ বাবরি চুলের বেঁটে লোক জিজ্ঞেস
করলেন- আপনারা কোত্থেকে
এসেছেন?
আমি বললাম- আমরা আসাম থেকে এসেছি।
লোকটি আমাদের সবার দিকে
দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন- কয়জন রোগী
আছে?
এঘার জন। আমি বললাম।
এতগুলো রোগীকে হাসপাতালে দেখাতে গেলে অসুবিধা
হবে। লোকটি বললেন- সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাও তেমন ভালো হবে
না। প্রাইভেট ডাক্তার দেখালে ভালো হবে।
অবশেষে আমরা লোকটির কথা মতো প্রাইভেট ডাক্তার
দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। লোকটি আমাদের প্রথমে ডাক্তার সুভাষ
সাহার চেম্বারে নিয়ে গেলেন। সুভাষ সাহা তখন খুবই নামকরা ডাক্তার। আসাম থেকে রোগী গেলে তখন প্রথমে
তাঁর কাছেই যেতো। সুভাষ সাহা ছয়জন রোগী দেখলেন। তারপর লোকটি আরেকজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। সেই ডাক্তারের নাম এখন মনে নেই। তিনি দেখলেন
চারজন
রোগী।
একটি ফার্মাসিতে গিয়ে ওষুধও
কিনলাম। শেষে
রয়ে গেল একজন রোগী। হায়েত আলীর বোন হামেলা খাতুন। সে জন্মান্ধ ছিল। তখন বেলা
গড়িয়ে গেছে। আমি লোকটিকে বললাম- আমাদের ক্ষিদে পেয়েছে। এখন আমাদের একটি হোটেলে
নিয়ে চলুন।
লোকটি আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে গেল।
সেখানে আমরা ভাত খেতে বসলাম। লোকটিকেও ভাত খেতে বললাম।
তখন লোকটি বলল- আমার বাড়ি কাছেই। আমি আপনাদের বিদেয় দিয়ে বাড়ি গিয়ে ভাত খাব।
ভাত খাওয়ার পর আমি লোকটিকে বললাম- আপনি
আমাদের জন্য অনেক সময় দিয়েছেন। এখন শুধু একজন রোগী আছে। আমরাই দেখাতে পারব।
লোকটি আমার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে রিক্সা
ডেকে আনলেন। অগত্যা আমরা রিক্সায়
চেপে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম।
ডাক্তার দেখালাম।আমার মনে তখন লোকটিকে নিয়ে
অন্য এক চিন্তা চেপে বসল। সারাদিন আমাদের সাথে ঘুরল। শেষে যে কত টাকা দাবি করবে, কে জানে! তাই আমি
বললাম- সব কয়জন রোগী দেখানো হলো। এখন আমরা বাড়ি যাব।
লোকটি বলল- চলুন, আপনাদের রেলে
উঠিয়ে দিয়ে আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেব।
রেল স্টেশনে এসে টিকেট কাটলাম। টিকেট কাটার পর
আমি লোকটিকে বললাম- আপনি আমাদের জন্য অনেক করেছেন। বলুন, আপনাকে
কত টাকা দিতে হবে?
তখন লোকটি বললেন-
আমাকে এক টাকাও দিতে হবে না। যা দেবার ডাক্তাররাঁই দেবেন। আমি এরকম সেবা প্রায় বিশ বছর যাবত করে আসছি। টাকার কথা আমি কমই ভাবি। লোকের উপকারের কথা মাথায় রেখেই আমি কাজ
করে যাচ্ছি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন বেঁচে থাকা দিন কয়টা
আমি লোকের সেবা করে যেতে পারি।
লোকটির সেই সেবার কথা মনে হলে এখনও বুকটা
গর্বে ফুলে উঠে। লোকটি সম্ভবতঃ এখন বেঁচে নেই। তিনি মুসলমান ছিলেন। আল্লাহ যেন
তাঁকে বেহেস্তে স্থান দেন!
অন্ধবিশ্বাস
কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস হল অযৌক্তিক বা অতিপ্রাকৃত ধারণার
উপড়ে বিশ্বাস বা যুক্তিবিহীনভাবে কোন ঘটনাকে বিশ্বাস করা। অন্ধবিশ্বাস প্রায়শই ভাগ্য, লক্ষণ বা জাদুর সাথে সম্পর্কিত।
উদাহরণস্বরূপ, আয়না ভাঙলে দুর্ভাগ্য হয় বলে বিশ্বাস করা,
অথবা বিড়াল মারলে বার বছরের দুঃখ হয়, খালী কলশ দেখলে যাত্রা ভঙ্গ
হয়। এরকম অনেক কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত আছে
আমাদের সমাজে। সেরকম কুসংস্কারের বিষয়ে একটা গল্প বলব।
১৯৭৭ সালের কথা। ব্রহ্মপুত্র নদ তখন ভাঙতে ভাঙতে আলীগাঁয়ের একেবারে
উত্তর-পশ্চিম সীমায় এসে পৌঁছেছিলো। ফলে কছিমুদ্দিন মামাদের বাড়ি একেবারে নদীর পারে পরেছিলো। কছিমুদ্দিন
মামাদের বাড়ির পূব পাশে অনেক দিনের পুরানা বিশাল একটি হিজল গাছ ছিলো। হিজল গাছ বা
শেওড়া গাছে ভূতপ্রেত বা দেবতারা বাস করে বলে আমাদের সমাজে একপ্রকার অন্ধবিশ্বাস
প্রচলিত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ দুইবার কছিমুদ্দিন মামাদের হিজল গাছ
পর্যন্ত ভেঙে এসে ফিরে গিয়েছিলো। সেজন্য হিজল গাছে কোন দেবতা বাস করে বলে অনেকেই বিশ্বাস
করত এবং সেই দেবতার কৃপায়ই নদী দুইবার গাছ পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে বলেও বিশ্বাস করত। এই
বিশ্বাসের ফলেই গাছটাকে অনেকে তখন সমীহের চোখে দেখত।
একদিনের একটি
ঘটনার জন্য লোকের মনে এই বিশ্বাস অধিক দৃঢ় হয়েছিলো। তখন ব্রহ্মপুত্র নদীতে খুব বাগাড় মাছ পাওয়া যেত। ফলে বড় বড়
ফাঁসিজাল দিয়ে তখন জেলেরা বাগাড় মাছ শিকার করত। প্রথমে
বাগাড় মাছ ধরা ফাঁসি জালের প্রচলন করেছিলো বিহার থেকে আগত জেলেরা। শুধু বাগাড়
মাছ ধরাই নয়, আমাদের অঞ্চলে তরমূজ খেতেরও প্রচলন করেছিলো বিহার থেকে আসা কৃষকেরা। তাঁদের দেখে
আমাদের অঞ্চলের অনেকেই তখন ফাঁসি জাল দিয়ে মাছ শিকার করতে শুরু করেছিলো। প্রথমে
ফাঁসি জাল দিয়ে মাছ শিকারের প্রচলন বাঘবর অঞ্চলে শুরু হয়েছিলো যদিও, পরে
ব্রহ্মপুত্র নদের পারের অনেক অঞ্চলে এই প্রথা প্রসারিত হয়েছিলো। আলীগাঁও অঞ্চলেও কয়েকজন মৎসজীবী ফাঁসিজাল দিয়ে
মাছ শিকার প্রচলন করেছিলো। একদিন একজন জেলে মানস করেছিলো যে, মাছ পেলে সে কছিমুদদ্দিন
মামাদের হিজল গাছে এক সের বাতাসা ভোগ দিবে।
কাকতালীয়ভাবে, এভাবে মানস করে জাল ফেলার সাথে সাথে সেই জেলের জালে একটি বড় বাগড়
মাছ ধরা পরেছিলো। জেলে মাছ ধরে পারে এসে সাথে সাথে এক সের বাতাসা এনে গাছের
নিচে ভোগ দিয়েছিলো এবং মানস করেছিলো য়ে, এইবার মাছ পেলে সে দুই সের বাতাসা দিবে। এভাবে মানস
করে জাল ফেলার পরে সেই জেলের জালে একসাথে দু’টি বাগাড় ধরা পরেছিলো। ফলে গাছে দেবতার বাস থাকাটা অনেকেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস
করতে শুরু করেছিলো এবং গাছের প্রতি লোকের সমীহের ভাবও আগের চেয়ে অনেক গুণ বৃদ্ধি
পেয়েছিলো। গাছের পাতা ছিড়লে হাত অবশ হয়ে যাবে, কেউ গাছটাকে অবিশ্বাস
করলে তার ক্ষতি হবে, মানস করে গাছে ভোগ দিলে দুরারোগ্য রোগ-ব্যধি ভালো হয়, পরে
এরকম অন্ধবিশ্বাসও প্রচলন হয়েছিলো।
ফলে রোগব্যধি উপশম, মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য অনেকে
মমবাতি, বাতাসা, কবুতর এবং টাকা-পয়সা মানস করা শুরু করেছিলো। এক সময়
দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক লোক নানা আবদার নিয়ে আসতে শুরু করেছিলো। কোন কোনদিন
অনেক মমবাতি, টাকা, বাতাসা এবং কবুতর জমা হত গাছের নিচে। সেই জিনিসগুলি
সবাই নেওয়ার সাহস করত না। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাহসী মহিলা কুরানের মা সেই
জিনিসগুলি ভোগ করতেন। কুরানের মা ছোটখাট কবিরাজও ছিলেন। তাই কেউ সে
কথায় গুরুত্ব দিত না। একদিন মজিবর রহমান নামক একজন ধুরন্ধর সাহসী ছেলে কয়েকজন
সংগীসাথী নিয়ে সেই গাছের নিচ থেকে মমবাতি এবং বাতাসা নিয়ে এসে মমবাতিগুলি মসজিদে
দিলো এবং বাতাসা ও টাকাগুলি ভাগ করে নিলো।
মজিবর রহমান ছিলো এক মায়ের এক ছেলে।
প্রতিদ্বন্ধী সৃষ্টি হওয়াতে কুরানের মা মজিবরকে ভয়-ডর দেখিয়েছিলো এই বলেছিলেন য়ে,
হায়, হায়, তুমি এক মায়ের এক ছেলে, এভাবে টাকা পয়সা নিও না, তোমার ক্ষতি হবে। কিন্তু কে
শুনে কার কথা। মজিবর রহমান সাহসী ছিলো, তাই সে আগের মতোই তার কাজ অব্যাহত
রেখেছিলো। অবশেষে কুরানের মা এবং মজিবর রহমান সেই জিনিসগুলি ভাগাভাগি
করে ভোগ করত। এভাবে অনেকদিন চলার পর একদিন কোত্থেকে একজন সালু কাপড়
পরিহিত সাধু এসে গাছের নিচে আস্তানা গেড়ে বসল। সে গাঞ্জা
টানত এবং লাল নিচান টানিয়ে আসন সাজিয়ে ধ্যানে বসে থাকত।
অন্ধবিশ্বাসী অনেকে সেই আসনে প্রণিপাত(ভক্তি) করতো। কেউ
প্রণিপাত করলে তখন সেই সাধু বাবা লোকটি লাল নিচানের গোড়ায় থাপড় মারত এবং থাপড়
মারলে লাল নিচানটা চক্রাকারে ঘূরত। ফলে ভক্তের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলো, তবে কুরানের
মা এবং মজিবরদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে
গেলো।
কুরানের মা
কবিরাজ, তাই মজিবর একদিন কুরানের মার কাছে গিয়ে নিচান ঘূরার রহস্য জানতে চাইলো। কুরানের
মাকে মজিবর দাদী বলে ডাকত। সেই জিজ্ঞেস করলো-দাদী, সাধুবাবা এসে আমাদের তো বটেই
তোমারও আয়ের উৎস বন্ধ করে
দিয়েছে। যা টাকাপয়সা
উঠতেছে সব সেই সাধুবাবা একাই ভোগ করতেছে। ভক্তি দিলে
নিচান ঘূরার জন্য দিন দিন ভক্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইতেছে। দাদী,
তুমিতো কবিরাজ, বলতো এই নিচান ঘূরার রহস্য কি?
কুররানের মা বললেন- আরে, সবই ঢং। রহস্য
টহস্যা কিছুই না। নিচানের নিচে কিছু একটা করেছে, যার জন্য জমিতে থাপর দিলে
নিচান ঘূরে। আমি মেয়ে মানুষ, তাই কিছু করতে পারছিনা। পুরুষ হলে
কবে রহস্য ভেদ করে ফেলতাম। তোরা গিয়ে তো দেখতে পারিস নিচানের নিচে কি আছে।
সে কি দেখতে
দিবে?
দিবেনা অবশ্যে, জোর করে দেখতে হবে।
জোর করলে যদি
কোন অন্যায় হয়. তখন?
কিচ্ছু হবেনা। আমি আছিতো। কিছু হলে তখন আমি দেখব। চিন্তা করিস
না।
কুরানের মার
নিকট থেকে সাহস পেয়ে মজিবর রহমান একদিন রাতে তার দলবল নিয়ে সাধুর আস্তানায় উপস্থিত
হলো। আস্তানাই গিয়েই মজিবর নিচান স্থাপন করা জায়গায় পা দিয়ে চাপ
দিলো। সাথে সাথে পা-টা জমিতে বসে গেলো। সাথে সাথে
সেই জায়গায় মাটি খুঁড়ে দেখা গেলো গর্তের মাঝে একটি ছোট কচ্ছপ রয়েছে। সেই কচ্ছপের
উপড়ে নিচানটা স্থাপন করা রয়েছে। জমিতে থাপড় দিলে কচ্ছপটা তখন ভয়ে চক্রাকারে ঘূরে। ফলে
নিচানটাও ঘূরে।
সাথে সাথে রহস্য উদ্ঘাটন হলো এবং মজিবররা সেই সাধুবাবাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলো। তবে, দুর্ভাগ্যের বিষয় কিছুদিন পরেই হিজল গাছটা নদের বুকে বিলীন হয়ে গেলো। সাধু বাবা আস্তানা ছেড়ে যাওয়ার জন্যই হিজল গাছটা নদীর বুকে বিলীন হওয়া বলে তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে লাগলো।•
পাথর চূণের গাছ
২০১৪-১৫ সালের কথা। আমি
তখন ১২৫৮ নং পূব জাহোরপাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
কর্মরত। তখন আমাদের
বিদ্যালয়ের বিদ্যালয় পরিচালনা সমিতির সভাপতি ছিলেন ওমর আলী আহমেদ। তাঁর বয়স তখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি ছিলো। একদিন শুনতে পেলাম তাঁর কিডনিতে পাথর হয়েছে। প্রায় ৯ এমএম-এর কযেকটা
পাথর। ওষুধে যাবেনা। তাই বরপেটার ব্যক্তিগত খণ্ডের এক চিকিৎসালয় তাঁকে যতদূর
সম্ভব তাড়াতাড়ি অপারেশনের পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ওমর আলী বরপেটায় অপারেশ্বন হবেনা, অপারেশ্বনের জন্য
পশ্চিমবংগের কালনা যাবে। কালনার কথা, টাকাপয়সা লাগবে,
সাথে লোক নিতে হবে। তাই একমাস পর
কালনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
সিদ্ধান্ত মতেই এক মাস পর তিনি কালনা গেলেন। আমি স্কুলে যাতায়াতের
সময় তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতে হয়। কালনা যাওয়ার চারিদন পর রাস্তায় তাঁর মেয়ের সাথে আমার দেখা। সাত আট বছরের মেয়ে। তাকে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম- কি খবর? তোমার আব্বার অপারেশ্বন হয়েছে কি?
মেয়েটি উত্তরে বললো- না, হয়নি।
আমার অবাক
করা প্রশ্ন – কেন. হয়নি কেন?
মেয়েটি
বললো- আব্বার কিডনিতে পাথর নেই। কাল রাতে কালনা থকে বাড়ি ফিরেছেন।
তাই নাকি? তিনি এখন
কোথায়?
মেয়েটি বললো- বাড়িতেই আছে?
আমি ওমর আলীর বাড়ি গেলাম। দেখলাম, তিনি বারান্দায় চেয়ারে বসে রয়েছেন। আমি গিয়ে
তাঁর পাশেই একটি চেয়ারে বসলাম। তখন আমি অপারেশ্বন না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তরে বললেন- কিডনিতে পাথরই নেই। ডাক্তার কি অপারেশ্বন
করবে!
তাহলে
এখানকার পরীক্ষা কি ভুল ছিলো? আমি বললাম।
না পরীক্ষা ভুল ছিলনা। ওমর আলী বললেন- এখানকার পরীক্ষা ঠিকই ছিলো। বরপেটায় পরীক্ষা করানোর পর আমি কালনা যাওয়ার জন্য একমাস সময় নিয়েছিলাম। এই একমাস মা আমাকে প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস করে পাথর চূনের রস খাওয়াতেন। সেই রস খাওয়ার ফলে আমার কিডনির পাথর গলে প্রসাবের সাথে বেড়িয়ে গেছে।•
সেদিন ঘোরতর অন্যায় করেছিলাম আমি।
১৯৭০ সালের কথা।তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাড়ি ছিলো অত্যন্ত অনুন্নত বন্যা প্রবণ
অঞ্চলে। সেজন্য আমাদের গ্রামে এম, ই বা হাইস্কুল স্কুল থাকা
তো দূরের কথা প্ৰাইমারি স্কুল পর্যন্ত ছিল না। তাই আমি নানাদের বাড়িতে থেকে আলীগাঁও প্রাইমারি স্কুলে এবং
সেখানে থেকেই গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেছিলাম। আমাদের লাগোয়া গ্রাম বাঘবরে ১৯৬৩ সালে এম, ই স্কুল স্থাপন হয়েছিলো। তাই আমি বাড়িতে থেকে বাঘবর এম,
ই স্কুলে পড়ার সুযোগ ছিলো যদিও বর্ষায় যাতায়াতের
অসুবিধার কথা চিন্তা করে পাইমারি পাশের পর গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় ভর্তি
হয়েছিলাম। কারণ তখন আলীগাঁও অঞ্চলের প্রায়
সবাই গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করত। ১৯৬৮ সালে বাঘবর হাইস্কুল স্থাপন হয়েছিলো। তাই আমি বাঘবর হাইস্কুলে পড়ার সুযোগ ছিল না। কারণ আমি হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৬৭
সালে। আমি গড়লা
হাইস্কুলে পড়ার সুযোগ ছিলো যদিও নতুন স্কুল কারণে আমি ১৯৬৭ সালে কাদং হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি
রূপাকুছির
আমাদের খালাত বোনের জামাই আব্দুল আলিম(আব্দুল)এর বাড়ি জাইগীর থেকে স্কুলে অধ্যয়ন করতাম।
১৯৭০
সালে প্রবল বন্যা হয়েছিলো। তাই আমাদের স্কুলে যাতায়াত করা রাস্তাটা জলে ডুবে গিয়েছিলো। সেজন্য আমি স্কুলে যাতায়াত করা অসুবিধা হয়েছিলো। তাই আমি কয়েকদিনের জন্য স্কুলের নিকটে অবস্থিত কাদঙের লাল
মিয়াদের বাড়ি জাইগীর ছিলাম। লাল মিয়াভাইদের বাড়িতে জাইগীর থাকা অবস্থায় আমরা কয়েকজন
ছাত্র মিলে ভোজের আয়োজন করেছিলাম। সেই ভোজভাতের সাথে জড়িত পনের ষোল জন ছাত্র ছিলাম যদিও মুক্তার
আলী(কান্দাপাড়া),আয়নাল হক(সোনতুলি),শমশের আলী(পিঠাদি গাওঁ), শুকুর আলী(রসুলপুর),
সাহেব আলী(পিঠাদি গাওঁ)এবং কায়েম উদ্দিন(পিঠাদি গাওঁ)এর নাম এখন মনে আছে- বাকীদের
নাম মনে নেই।
আমাদের হাইস্কুলের
সাথেই পূর্ব দিকে এবং কাদং বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে একটি কমিউনিটি সেণ্টার ছিলো। ভোজের আয়োজন করেছিলাম সেই কমিউনিটি সেণ্টারে। পাঁচ টাকা
করে পাঁচটা বড় বড় মুরগি কিনেছিলাম সেদিন। মনে হয়, মুরগির
তরকারি রান্না করেছিলো মুক্তার আলী, কায়েম উদ্দিন ও সমশের আলী। রান্না প্রায় হওয়ার পর্যায়ে। একটু পরেই তরকারি নামাবে। মিষ্ট সুঘ্রাণ
বের হচ্ছে। ভীষণ কালে
বিপরীত বুদ্ধি। আমি মাতাব্বরি
করে হঠাৎ-ই এক মুষ্ঠি নিমক দিলাম সেই তরকারিতে। সবাই আমরা এক সময় খেতে বসলাম। কিন্তু নিমকের তিতার জন্য মুখেই দেওয়া যাচ্ছে না তরকারি। বিশ্রী রকমের
তিতা। খাওয়া বাদ দিয়ে সবাই মুক্তার ভাইর দিকে তাকাল। কারণ মুক্তার ভাই-ই মেইন রান্ধনি ছিলো।
তখন মুক্তার
ভাই বললো- আমিতো নিমক ঠিকই দিয়েছিলাম। নিমক চেকেও দেখেছি। তখন নিমক ঠিকই ছিলো। হঠাৎ নিমক
বেশি হওয়ার কারণ কি? নিশ্চয়ই পরে কেউ নিমক দিয়েছে। কিন্তু দিলো নিমক?
একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কেউ নিমক দিয়েছে কিনা। কিন্তু কেউ স্বীকার করল না। স্বীকার করবেই বা কেন। কারণ তারাতো কেউ নিমক দেয়নি। নিমক দিয়েছি আমি। কিন্তু আমিও তখন ভয়ে স্বীকার করলাম না কথাটা। অগত্যা উপায় কি! তখন কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, মাংস জল দিয়ে ধুলে তিতা কমতে পারে। তাই জল দিয়ে ধোয়া যাক। পরামর্শ অনুসারে মাংস জল দিয়ে ধোয়া হলো । কিন্তু জল দিয়ে ধোয়ার পরেও তিতার জন্য তরকারি খাওয়া সম্ভব হল না। পরে সবাই কাচা মরিচ মেখে ভাত খেয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। তখন কথাটা স্বীকার না করলেও কিছুদিন পরে অবশ্যে আমি অনেককে নিমক দেওয়ার কথাটা বলেছিলাম।•
এপেলো হসপিটাল, চেন্নাই
স্ফুর্লিঙ থেকে খাখ্ডব দাহ
সালটা সঠিক মনে নেই।
মনে হয় ২০১২ সাল হবে।
তখন আমরা কয়েকজন সিআরসিসি মিলে শিক্ষকদের দরমহার বিল করতাম। সেই কয়জনের মাঝে খন্দারপারের ইন্তাজ আলীও ছিলেন।ইন্তাজ ভাই কালঝার মণ্ডল সমল কেন্দ্রের সমন্বয়ক ছিলেন।সমন্বয়কদের সংক্ষেপে বলা হয় সিরিসিসি। আমি সিআরসিসি ছিলাম ধানবান্ধা মণ্ডল
সমল কেন্দ্রের। আমার বাড়ি বরপেটার কাছে থাকার
দরুন, বেশিরভাগ সময়ই ইন্তাজ ভাই বিল সঁই করিয়ে বরপেটা নিয়ে আসতেন এবং আমি ট্রেজারি
থেকে বিলের টোকেন নিতাম।সেদিন ই্ন্তাজ ভাই বিল সঁই করিয়ে আনার কথা ছিলো। তাই আমি বরপেটায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মোবাইলে ইন্তাজ ভাইর সাথে কথা হয়েছে,
তিনি বিল নিয়ে আসতেছেন। ঠিকমতো বাস পেলে হাউলি থেকে বরপেটা আসতে সময় লাগে আধাঘণ্টা। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা পার হওয়ার পরেও ইন্তাজ ভাই আসছেন
না। চারটে বাজার পরে টোকেন পাওয়া যাবে
না। এদিকে প্রায় সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। তবুও ইন্তাজ ভাই আসছেন না। দেরি দেখে আমি ফোন করলাম, কিন্তু ইন্তাজ ভাইর মোবাইল সুইচ অফ। আমি বিরক্ত হয়ে মেইন রাস্তার দিকে এগিয়ে এলাম।তখন দেখি ইন্তাজ ভাই উল্টা দিকের রাস্তা ধরে অর্থাৎ পাঁচ আলির মোড়ের দিক থেকে আসতেছে। কাছে আসার সাথে সাথে আমি জিজ্ঞাসা করলাম- এতো দেরি কেন? অল্প পরেই তো ট্রেজারি বন্ধ হয়ে যাবে।
তখন ইন্তাজ ভাই বললেন-
ইচ্ছে করে দেরি করিনি। টেম্পোতে করে আসছিলাম। এসপি অফিসের কাছে টেম্পা একসিডণ্ট হয়েছিলো। তাই আমাদের সবাইকে ম্যাডিকেলে নিয়ে গিয়েছিলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেউ
মরেছে নাকি?
ইন্তাজ ভাই বললেন-
না, কেউ মরেনি। তেমন ঘোরতর আঘাতও কেউ পায়নি। সামান্য আঘাত পেয়েছে। আমি কপালে আঘাত পেয়েছি। তাই সামান্য ওষুধ লিখে দিয়ে সবাইকে ছেড়ে দিয়েছে।
লক্ষ্য করে দেখলাম
ইন্তাজ ভাইর কপালের ডানপাশে একটু ফোলা। ফোলা সামান্যই। একটি কাঁচের মার্বলের আকারের। ঠোসার মতো ফোলা।
আঘাত তেমন ঘোরতর না। সেজন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ট্রেজারিতে গিয়ে টোকেন
নিলাম। ইন্তাজ ভাইর কপালের ফোলা কয়েকদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে গেলো।
প্রায় ছমাসখানেক পর ইন্তাজ ভাই
বললেন- আমার মাথাটা কেমন যেন একটু একটু ঘূরায় এবং মাঝে মধ্যে বিষ করে।
আমি তখন ডাক্তার দেখানোর
পরামর্শ দিলাম।
ডাক্তার দেখানোর পর
ডাক্তার এক্সরে করার জন্য লিখে দিলেন। এক্সরে করার পর মাথায় টিউমার ধরা পরল। টিউমার বায়স্পি করে ধরা পড়ল
ক্যান্সার। চেন্নাই গিয়ে কেমো থেরাপি এবং
রেডিয়েশ্বন নিলো। মাথার চুল সব পরে গেলো। চেন্নাই থেকে চিকিৎসা হয়ে আসার পরে একদিন বরপেটায়
ইন্তাজ ভাইর সাথে আমার দেখা হলো। দেখলাম, ই্ন্তাজ ভাইর অবস্থা খুবই কাহিল। কথা বলতেও কষ্ট হয়। খবর নিয়ে অবগত হলাম, ঠিকমতো খেতেও পারেন না। এর কিছুদিন পর খবর পেলোম ইন্তাজ ভাই মারা গেছেন।
মৃত্যুর খবর পেয়ে খুবই
মর্মাহত হলাম। কারণ আমার ভালো লোকের তালিকায় ই্ন্তাজ ভাইর নামও ছিলো। লোক হিসেবে ইন্তাজ ভাই আমার দৃষ্টিতে খুবই ভালোলোক ছিলেন।আমার সাথে তাঁর সম্পর্ক খুবই ভালো ছিলো। সামান্য আঘাত থেকে ক্যান্সার হয়ে ইন্তাজ ভাই আমাদের মাঝ
থেকে চলে যাবে এটা আমি কোনোদিন কল্পনা করিনি। ইন্তাজ ভাই মারা গেছেন ২০১৩ সালে।এখনও তাঁর কথা আমার মাজেমধ্যে মনে
পড়ে। তাঁর কথা মনে হলে অন্তরাত্মা
হাহাকার করে উঠে। আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেস্তে স্থান দেন।
এর বাইরে আামার তাঁরজন্য করবার আর কিছুই নেই।
অন্য দু’টি গল্প
আমাদের বাড়ি খুবই অনুন্নত এলেকায়
ছিলো। না ছিলো রাস্তা, না ছিলো ঘাট। আমারা সাধারণত পা পথে চলাচল করতাম। গো হালট অবশ্যে ছিলো। তবে বর্ষার প্রথম জল এলেই সেই হালট তলিয়ে
যেত এবং বছরের প্রায় চার পাঁচ মাস জল থাকত। বর্ষায় নাও অথবা কলাগাছের ভেল ছাড়া চলাচলের
কোন উপায় ছিল না। বর্ষায় বাড়িগুলো দূর থেকে দেখা যেত যেন
কচুরি পানার মতো ভাসছে। তুফান
উঠলে তো কথাই নাই, সাগরের মতো ঢেউ উঠত।তখন নৌকা বা ভেল নিয়ে চলাচল করা সম্ভব হতো না। কেউ কোন জায়গায় গেলে সেখানেই আটকা পরে যেত। একবার তুফান তিন দিন স্থায়ী হয়েছিলো।আমাদের কাকার ভায়রা আসর উদ্দিন সেবার তুফানের
মধ্যে আটকা পড়ে আমাদের বাড়িতে তিনদিন ছিলেন।
আমাদের
গ্রামটা দ জলাশয় অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো বলে ধান তেমন হতোনা।ধান বুনলেও প্রায় প্রত্যেক বছর বর্ষার জলে সেই
ধান তলিয়ে যেত। তাই আমাদের পাড়ার লোকেরা ধান তেমন একটা
বুনত না।রবিশস্য এবং চিনাধানই বেশি বেশি বুনত। তাই বছরের অধিক সময় আমরা চিনাধানের ভাতই
খেতাম।অবশ্যে কোন কোন বছর আমন ধান হত জল কম হলে। বিশেষ করে বাউইজাক ধান হতো। কারণ বাওইজাক ধান জল বেশি হলেও অসুবিধা হতোনা। আমাদের পাড়ায় এবাদুল্যা নামের একজন
বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন। এবাদুল্যা
সেদিন বাওইজাক ধানের ভাত খাইতে ছিলেন। এমন সময় আমার ছোট ভাই হোসেন আলী
সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো। সে এবাদুল্যাকে জিজ্ঞাসা
করেছিলো- তাউই, কি দিয়ে ভাত খান? তখন এবাদুল্যা বললেন- বোয়াল
মাছের তরকারি দিয়ে। কিন্তু ভাত গলা দিয়ে নামতেছে না। আমি বাউইজাক ধানের ভাত খাইতে পারিনা।
কেন? কি হলো? তরকারিও ভালো, তবু গলা দিয়ে
নামছেনা কেন? হোসেন আলীর প্রশ্ন।
বাইউজাক
ধানের ভাত মোটা। তাই গলা দিয়ে নামেনা। এবাদুল্যা বললেন- আমার আবার চিকন ধানের ভাত খাওয়ার
অভ্যেসতো!
হোসেন আলী একটু রসিক প্রকৃতির লোক ছিলো। সে তখন ঠাট্টা করে বললো- আসলে কথা তা নয়, তাউই, আসলে
চিনাধানের ভাত খেয়ে গলা চাপিয়ে ফেলেছেন তাই বাউইজাক ধানের ভাত গলা দিয়ে নামছে না। হোসেন আলী এখনও একটু রসিক প্রকৃতির লোক। পুতুল নাচে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের সাথে সাথে জোকারের
অভিনয় করে।
হোসেন আলীকে
নিয়ে আর একটা গল্প বলি। ১৯৬১ সালে পূৰ্ব পাকিস্তান থেকে অনেক লোক আসামে এসেছিলো। তাদের আসাম সরকার আমাদের অনেকেরই খাস জমি এলটমেণ্ট দিয়েছিলো। আমরা সেই হিন্দু লোকদের রিফুজি বলতাম। সেই রিফুজিদের আমাদেরই প্রায় ১৬ পাকি খাস জমি এলটমেণ্ট দিয়েছিলো। সেই রিফুজিদেরই একজন লোকের নাম ছিলো বিদেশী। একদিন বিদেশী আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। এমন সময় বড় বড় ফোটার বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছিলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোটা দেখে বিদেশী বললেন- ফোটাগুলো কি বড়
বড়ে বাবা! একেবারে শ্বেখরে ফোটা।
তখন হোসেন আলী রসিকতার সুরে বলছিলো- না কাকা,
এগুলো শ্বেখরে ফোটা না, এগুলোকে আমরা চাড়াইলা ফোটা বলি।
সমাপ্ত











মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন