আসামের পর্যটন স্থান (Tourist places in Assam)
আসামের পর্যটন স্থান
সূচীপত্র
আগকথা
আসামের দর্শনীয় স্থানের সংক্ষিপ্ত আভাস
কাজিরঙ্গা জাতীয়
উদ্যান
মানাস জাতীয়
উদ্যান
মাজুলি নদী দ্বীপ
কামাখ্যা মন্দির
উমানন্দ দেবালয়
নামেরি জাতীয়
উদ্যান
ডিব্রু-চৈখোয়া জাতীয় উদ্যান
চরাইদেও
মৈদাম
ওরাঙ
জাতীয় উদ্যান
পবিতোরা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
জাটিঙ্গা
আগকথা
ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা সবুজ অসম শুধু চা-বাগান আর গণ্ডারের দেশ নয়। এর প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন। তাই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অসম এক অনন্য গন্তব্য স্থান।এই স্থানগুলোর বিষয়ে বাংলাভাষী লোকদের অবগতের জন্য এই ক্ষুদ্র বইটিতে ১২ টি দৰ্শনীয় স্থানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। আমার অজানিতে হওয়া ভুল-ত্রুটির জন্য আমি পাঠকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল-ত্রুটিগুলো আমার দৃষ্টিগোচর করলে পরবর্তীতে সংশোধন করার চেষ্টা করব। ইতি
লেখক-
আসামের দর্শনীয় স্থানের সংক্ষিপ্ত আভাস
আসাম ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের প্রধান ও প্রাচীনতম রাজ্য এবং এটি সাতভনী
রাজ্যেগুলোর প্রবেশদ্বার। রূপালী নদী ও সবুজ পাহাড়ের এই রাজ্যটি তিনটি প্রধান
ভৌগোলিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত: ব্রহ্মপুত্র নদীর পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে বিস্তৃত
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, লেজের মতো প্রসারিত বরাক উপত্যকা এবং এর মধ্যবর্তী কার্বি মালভূমি ও উত্তর
কাছাড় পাহাড়। আসামের সীমান্ত মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংযুক্ত; এবং তাদের রাজধানী শহরগুলোতে যাওয়ার জন্য জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে। এটি
ভুটান ও বাংলাদেশের সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্তও ভাগ করে এবং মিয়ানমারের খুব কাছে
অবস্থিত। মিয়ানমারের সাথে আসামের কোনো সরাসরি আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মিয়ানমার সীমান্তটি উত্তর-পূর্বের চারটি রাজ্য
জুড়ে বিস্তৃত: অরুণাচল প্রদেশ (৫২০ কিমি), মিজোরাম (৫১০ কিমি), মণিপুর (৩৯৮ কিমি)
এবং নাগাল্যান্ড (২১৫ কিমি)। আসাম এই রাজ্যগুলো দ্বারা মিয়ানমার সীমান্ত থেকে
বিচ্ছিন্ন। প্রাচীনকালে আসাম প্রাগজ্যোতিষপুর এবং কামরূপ নামে পরিচিত ছিল।
৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর তারিখে গুয়াহাটিতে শুরু হয়েছিল।
প্রধান আকর্ষণীয় স্থান- পর্যটনের উদ্দেশ্যে কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যান, মানস জাতীয় উদ্যান, পবিতরা বন্যপ্রাণী
অভয়ারণ্য, নামেরি জাতীয় উদ্যান, ডিব্রু-সাইখোয়া জাতীয় উদ্যান ইত্যাদির মতো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে।
ব্রিটিশ দখলের আগে বহু শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল শাসনকারী আহোম রাজবংশের
সময়কাল থেকে আসামের একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলি নীচে তালিকাভুক্ত করা হলো।
গুয়াহাটি- আসাম তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম শহর গুয়াহাটির
উপকণ্ঠে অবস্থিত কামাখ্যার বাইরেও অন্যান্য বিখ্যাত স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে
ব্রহ্মপুত্র, শঙ্করদেব কলাক্ষেত্র, উমানন্দ মন্দির, আসাম রাজ্য চিড়িয়াখানা, শিল্পগ্রাম ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে চান্দুবি হ্রদ, মদন কামদেব, চন্দ্রপুর এবং পবিতরা
বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। মদন কামদেব ভ্রমণের সময় পর্যটকরা দেউদুয়ার গ্রামে অবস্থিত
প্রাচীন গোপেশ্বর মন্দিরও দর্শন করেন।
মাজুলি- ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে অবস্থিত মাজুলি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম নদী দ্বীপ। মাজুলি তার বৈষ্ণবসত্ৰ যেমন, কমলাবাড়ি সত্ৰ, দক্ষিণপাট সত্ৰ, গড়মুড় সত্ৰ, আউনিয়াটি সত্ৰ, বেঙ্গেনাআটি সত্ৰ এবং চামগুরি সত্ৰেৰ জন্য বিখ্যাত।
কাজিরাঙ্গা
জাতীয় উদ্যান- এই সংরক্ষিত এলাকাটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান
এবং এটি ভারতীয় একশৃঙ্গী গণ্ডারের জন্য
বিখ্যাত। এছাড়াও দৰ্শনীয়
স্থানের মধ্যে রয়েছে মানস জাতীয় উদ্যান এবং
ওরাঙ জাতীয় উদ্যান।
দিমা হাসাও- দিমা হাসাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আসামের একটি
পার্বত্য জেলা। দিমা হাসাও-এর সদর দপ্তর হাফলং একটি সুন্দর পাহাড়ি শহর এবং আসামের
একমাত্র শৈলশহর। জাতিঙ্গা গ্রামটি পাখিদের রহস্যময় আত্মহত্যার জন্য বিখ্যাত।
এখানকার কিছু উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান হলো উমরাংসো, পানিমুর জলপ্রপাত, মাইবাং, সেলকাল শৃঙ্গে তুমজাং ট্রেক ইত্যাদি।
শোনিতপুর- এই জেলায় দেখার মতো সংরক্ষিত এলাকাগুলো হলো নামেরি জাতীয় উদ্যান, বুড়া-চাপরি বন্যপ্রাণী
অভয়ারণ্য, সোনাই-রূপাই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং ওরাঙ্গ জাতীয় উদ্যানের একটি অংশ।
ভালুকপুঙও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। তেজপুর ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ
একটি ছোট শহর। এখানকার কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হলো অগ্নিগড়, মহাভৈরব মন্দির, চিত্রলেখা উদ্যান, বামুনি পাহাড়, উষা পাহাড় ইত্যাদি। তেজপুর
থেকে ৭৫ কিমি দূরে অবস্থিত বিশ্বনাথ চারিয়ালি শহরটি বিশ্বনাথ ঘাটের জন্য বিখ্যাত। শহরটি জনপ্রিয়ভাবে
"গুপ্ত কাশী" নামেও পরিচিত।
যোরহাট- দ্রুত বর্ধনশীল একটি নগর যোরহাট। যোরহাট আহোম
রাজ্যের শেষ রাজধানী এবং আসামের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। আহোম যুগের বহু ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ এবং ব্রিটিশ শাসনামলে শহর ও তার
আশেপাশে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির জন্য যোরহাট বিখ্যাত। যেমন রাজা মৈদাম, লাচিত বরফুকন মৈদাম, যোরহাট জিমখানা ক্লাব, কাজিরাঙ্গা গলফ রিসোর্টের
বুড়া সাহেবের বাংলো, থেঙ্গাল ভবন ইত্যাদি। মাধবদেবের নির্মিত ঢেকিয়াখোয়া বর্নমঘর এবং বরভেটির
মতো তীর্থস্থানগুলিও এখানকার দর্শনীয় স্থান। হুলোংগাপার গিবন অভয়ারণ্য (হুলক
গিবনের আবাসস্থল), মনুষ্যসৃষ্ট মোলাই বন, সু-কা-ফা সমন্বয় ক্ষেত্র, যোরহাট বিজ্ঞান কেন্দ্র ও প্ল্যানেটেরিয়াম, টোকলাই চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখানকার অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থান।
শিবসাগর- শিবসাগর যেহেতু আহোম রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল, তাই এটি আহোম যুগের বহু
প্রাচীন নিদর্শন দ্বারা সমৃদ্ধ।
সেই আকর্ষণীয় স্থানগুলি হলো- রং ঘর, তলাতল ঘর, শিবদৌল, গোলাঘর, গড়গাঁওয়ের কারেং ঘর, জয় দৌল, শিবসাগর ট্যাঙ্ক (বরপুখুরি), জয়সাগর লেক, গৌরীসাগর লেক, জয়মতি মৈদাম, বিষ্ণু দৌল, দেবী দৌল, গৌরীসাগর দৌল, চরাইদেও, নামদাং শিলের সাঁকো ইত্যাদি
আহোম যুগের ইতিহাস প্রদর্শন করে। পানিদিহিং পাখির অভয়ারণ্যটি ২৫০ টিরও বেশি প্রজাতির পাখির আবাসস্থল।
হাজো- হাজো হিন্দু, মুছলমান ও বৌদ্ধ
ধর্মের একটি প্রাচীন তীর্থকেন্দ্র। হাজোর কয়েকটি বিখ্যাত মন্দির হলো শ্রী
হয়গ্রীব মাধবদেব মন্দির, শ্রী
কেদারনাথ মন্দির, শ্রী
কামেশ্বর মন্দির, শ্রী
গণেশ মন্দির এবং শ্রী কমলেশ্বর মন্দির। মুছলমানদের পোয়া মক্কা হাজোয় অবস্থিত।
তিনসুকিয়া- তিনসুকিয়ায় অনেক নামকরা দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
ভারতের অন্যতম বৃহত্তম জাতীয় উদ্যান, ডিব্রু-সাইখোয়া জাতীয় উদ্যান
তিনসুকিয়ায় অবস্থিত। ডিব্রু-সাইখোয়া জাতীয় উদ্যানটিকে একটি জীববৈচিত্র্যের
কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিলিঙ্গা মন্দির (ঘণ্টা মন্দির)তিনসুকিয়া
শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি সুপরিচিত মন্দির। এশিয়ার প্রাচীনতম শোধনাগার ডিগবই
শোধনাগার এখানে অবস্থিত। একটি রেলওয়ে পার্ক এই শহরের একটি সাম্প্রতিক সংযোজন। দিহিং
পাটকাই উৎসব তিনসুকিয়া জেলার লেখাপানিতে অনুষ্ঠিত একটি বার্ষিক উৎসব। ভারতের
একমাত্র কয়লা জাদুঘর তিনসুকিয়া জেলার মার্গেরিটা শহরে অবস্থিত। তিনসুকিয়া জেলার
আদিবাসী সম্প্রদায় এই অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে উৎসাহিত করার জন্য উদ্যোগ
নিয়েছে। মার্গেরিটা-পেঙ্গেরি সড়কের সিংফো ইকো ট্যুরিস্ট লজ এবং লেখাপানির ফানেং
ভিলেজ স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য দুটি উদ্যোগ।
ডিব্রুগড়- ডিব্রুগড়কে বিশ্বের চা রাজধানী বলা হয়। শহরটি
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। বিস্তৃত চা বাগানের মাঝে অবস্থিত ডিব্রুগড়
পর্যটকদের চা বাগানের অভিজ্ঞতা আহরণ করার সুযোগ প্রদান করে।
সম্প্রতি, চা পর্যটন জনপ্রিয় হতে শুরু
করেছে, যেখানে গ্রিনার পাস্টারস এবং পূর্বী ডিসকভারির মতো ভ্রমণ
সংস্থাগুলি চাবাগান
ভ্রমণের আয়োজন করছে। টিপাম ডিব্রুগড়ের একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। টিপাম একটি
জাতিগত গ্রাম(জাতিগত গ্রাম হলো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী দ্বারা অধ্যুষিত
বসতি বা সম্প্রদায়) তার ঐতিহাসিক স্থানগুলির জন্য বিখ্যাত। টিপাম ছাড়াও, দেহিং পাটকাই জাতীয় উদ্যান আরেকটি আকর্ষণের স্থান। বর্তমানে শহরটিতে আসামের সবচেয়ে বড় রেল স্টেশন রয়েছে, যেখানে ২০০৯ সালে ১৮টি লাইন চালু করা হয়েছে। রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেন ডিব্রুগড় এবং ডিব্রুগড় শহর থেকে যাত্রা শুরু করে।
উদালগুড়ি- বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বহুবিধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ছাড়াও উদালগুড়ি
জেলায় বেশ কিছু পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো-
বাথৌ মন্দির ও গবেষণা কেন্দ্র, নামঘর, হনুমান মন্দির, ভৈরবকুন্ড পিকনিক স্পট, গেথসেমানে মনুষ্যসৃষ্ট বন(ভৈরবকুন্ড) এবং বগামাটি। আসামের বগামাটি ভারত-ভুটান সীমান্তের কাছে বরনদী নদীর মোহনায় অবস্থিত
একটি মনোরম স্থান ও প্রাকৃতিক পিকনিক স্পট হিসেবে বিখ্যাত। ভুটান পাহাড়ের
মনোমুগ্ধকর দৃশ্য,
শান্ত পরিবেশ এবং বরনদী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কাছে
হোয়াইট-ওয়াটার রাফটিং,
জিপ-লাইনিং ও ট্রেকিং-এর মতো রোমাঞ্চকর কার্যকলাপের
জন্য স্থানটি জনপ্রিয়।
মরিগাঁও- মধ্য আসামের একটি পর্যটন কেন্দ্র। আসামের মরিগাঁও জেলার রহার কাছে মরিগাঁও অবস্থিত। এটি জাতীয় মহাসড়ক NH-37/AH 37 থেকে 4.5 কিমি দূরে
অবস্থিত। কিংবদন্তী তিওয়া রাজার নামে এর নামকরণ করা হয়েছে জঙ্গল বলহু। এটি
চাপারমুখ জংশন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৬.৫ কিমি এবং লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৩০ কিমি দূরত্বে
অবস্থিত। নগাঁও শহর থেকে
মরিগাঁয়ের দূরত্ব ২৭ কিমি।
ব্যবহারিক
তথ্য- আসামের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। এখানকার নিচু এলাকাগুলিতে, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র
উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকায়, গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। তবে, পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে যতই ওপড়ে
ওঠা যায়, শীতকালে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে ততই হ্রাস পায়। আসামে প্রচুর
বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা দেখা যায়– বর্ষাকালে বজ্রসহ বৃষ্টি একটি সাধারণ ঘটনা এবং শীতকালে ভোরবেলা কুয়াশাও
একটি সাধারণ দৃশ্য।
পরিবহন
ব্যবস্থা
বিমান:- গুয়াহাটির লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ভারতের
প্রধান শহরগুলির সাথে সুসংযুক্ত। শহরে যাতায়াতের জন্য বিমানবন্দরে প্রিপেইড
পরিষেবা সহ ট্যাক্সি পরিষেবা পাওয়া যায়। এছাড়াও শিলচর, ডিব্রুগড়, যোরহাট এবং তেজপুরে
বিমানবন্দর রয়েছে, যেখান থেকে কলকাতা এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের অন্যান্য অংশে বিমান
চলাচল করে।
রেল পথ:- আসামের বৃহত্তম রেলওয়ে স্টেশন গুয়াহাটি থেকে নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং গুয়াহাটিতে
সরাসরি ট্রেন চলাচল করে।
সড়কপথ: আসাম রাজ্য পরিবহন কর্পোরেশন বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে মিলে
গুয়াহাটির সঙ্গে তেজপুর,
যোরহাট, ডিব্রুগড়,
তিনসুকিয়া, শিলচর,
ডিমাপুর, কোহিমা,
ইম্ফল, আইজল এবং ইটনগরের
সংযোগকারী বাস পরিষেবা পরিচালনা করে।•
কাজিরঙ্গা জাতীয় উদ্যান
কাজিরঙ্গা জাতীয়
উদ্যান ভারতের আসাম রাজ্যের গোলাঘাট, শোনিতপুর, বিশ্বনাথ এবং নগাঁও জেলায় অবস্থিত। এই উদ্যানটি
বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ ভারতীয় গণ্ডারের আবাসস্থল এবং এটি একটি ইউনেস্কো বিশ্ব
ঐতিহ্যবাহী স্থান। আসাম সরকারের বন
বিভাগ এবং কিছু স্বীকৃত বন্যপ্রাণী এনজিও দ্বারা যৌথভাবে পরিচালিত ২০১৮ সালের
মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত আদমশুমারি অনুসারে কাজিরাঙ্গা
জাতীয় উদ্যানে গণ্ডারের সংখ্যা ২,৬১৩। এর মধ্যে ১,৬৪১টি প্রাপ্তবয়স্ক গণ্ডার এবং ৩৮৫টি শাবক
রয়েছে।
২০০৬ সালে কাজিরঙ্গা
জাতীয় উদ্যানকে বাঘ সংরক্ষণাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই উদ্যানটি
ভারতীয় হাতি, বুনো জল মহিষ এবং
হরিণের বিশাল প্রজননের আবাসস্থল। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক কাজিরঙ্গাকে
একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। পক্ষী প্রজাতি
বলতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল,
সময়কাল বা
পরিবেশে পাওয়া পাখি বা পাখির প্রজাতিকে বোঝায়। ভারতের অন্যান্য সংরক্ষিত অঞ্চলের
তুলনায়, বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণে কাজিরঙ্গা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
কাজিরঙ্গা হলো
লম্বা হাতি ঘাস, জলাভূমি এবং ঘন
ক্রান্তীয় আর্দ্র অরণ্যের এক বিশাল বিস্তৃত অঞ্চল। অভয়ারণ্যটি ব্রহ্মপুত্র
নদীসহ চারটি প্রধান নদী দ্বারা বিভক্ত এবং এই অভয়ারণ্যটিতে অসংখ্য ছোট
জলাশয় রয়েছে। কাজিরঙ্গাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বই, গান এবং
তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। কাজিরঙ্গাকে ১৯০৫ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করা হয়েছিলো এবং ২০০৫ সালে পার্কটির শতবর্ষ উদযাপন করা হয়েছে।
নামের উৎপত্তি- কাজিরঙ্গা নামের উৎপত্তি
সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, যদিও স্থানীয় কিংবদন্তি এবং নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে
নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি কিংবদন্তি
অনুসারে, নিকটবর্তী
গ্রামের রাঙ্গা নামের এক মেয়ে এবং কার্বি আংলং-এর কাজী নামের এক যুবক একে অপরের
প্রেমে পড়েছিলো। এই সম্পর্ক তাদের পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল
না। ফলে এই যুগল
জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো। অদৃশ্য হওয়ার পরে তাদের আর কখনও
দেখা যায়নি। তাদের নামানুসারে জঙ্গলের নামকরণ করা হয়েছে বলে বিশ্বাস
করা হয়।
এই নামের দীর্ঘ
ইতিহাসের প্রমাণ কিছু নথিতে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে যে সপ্তদশ শতকে আহোম স্বর্গদেউ
প্রতাপ সিংহ যখন এই অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি মাছের স্বাদে বিশেষভাবে মুগ্ধ
হয়েছিলেন। তিনি মাছ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তাঁকে বলা হয়
যে মাছগুলো কাজিরঙ্গা থেকে এসেছে। এই কাজিরঙ্গা শব্দের অর্থ "লাল
ছাগলের(হরিণের) দেশ"ও হতে পারে, কারণ কার্বি ভাষায় কাজী শব্দের অর্থ
"ছাগল" এবং রাঙ্গাই শব্দের অর্থ "লাল"।
সংরক্ষিত এলাকা
হিসেবে কাজিরঙ্গার ইতিহাস- ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের
স্ত্রী মেরি কার্জন এই এলাকা
পরিদর্শন করেছিলেন। একশৃঙ্গী গণ্ডারের জন্য এই এলাকাটি বিখ্যাত ছিল, কিন্তু গণ্ডার দেখা নাপেয়ে
তিনি তার স্বামীকে এই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিকে
রক্ষার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজি করিয়েছিলেন এবং তার স্বামী গণ্ডারের
সুরক্ষার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুসারে ১৯০৫ সালের ১ জুন ২৩২ বর্গ কিমি
(৯০ বর্গ মাইল) এলাকা নিয়ে কাজিরঙ্গাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিলো।
১৯৫০ সালে বন
সংরক্ষণবিদ পি. ডি. স্ট্রেসি শিকারের আকর্ষণ দূর
করার জন্য কাজিরঙ্গা গেম স্যাংচুয়ারির নাম পরিবর্তন করে "কাজিরঙ্গা ওয়াইল্ডলাইফ
স্যাংচুয়ারি" রাখেন।
সাম্প্রতিক
দশকগুলিতে কাজিরঙ্গা বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে
বড় বন্যা। ব্রহ্মপুত্র নদীর জল উপচে পড়ার কারণে সৃষ্ট বন্যা, যার ফলে উল্লেখযোগ্য
সংখ্যক প্রাণী প্রাণ হারায়। ২০২৪ সালে জলে ডুবে যাওয়া
শত শত হরিণের সাথে ছয়টি গণ্ডারও মারা গিয়েছিলো।
কাজিরাঙ্গা
ভারতের আসাম রাজ্যের তিনটি জেলার মধ্যে ২৬°৩০' থেকে ২৬°৪৫' উত্তর অক্ষাংশ
এবং ৯৩°০৮' থেকে ৯৩°৩৬' পূর্ব
দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। নগাঁও জেলার কালিয়াবর মহকুমা, কার্বি আংলং
জেলার বোকাজান মহকুমা এবং গোলাঘাট জেলার বোকাখাত মহকুমায় এই পার্কটি বিস্তৃত।
পার্কটি পূর্ব
থেকে পশ্চিমে প্রায় ৪০ কিমি (২৫ মাইল) দীর্ঘ এবং
উত্তর থেকে দক্ষিণে প্ৰায় ১৩ কিমি (৮.১ মাইল) প্রশস্ত। কাজিরঙ্গা জাতীয়
উদ্যান ৩৭৮ বর্গ কিমি (১৪৬ বর্গ মাইল)
এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার মধ্যে
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রায় ৫১.১৫ বর্গ কিমি (১৯.৭৫ বর্গ মাইল) ব্রহ্মপুত্র
নদের ভাঙনের ফলে নদীর বুকে বিলীন হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণীর সংখ্যা
বৃদ্ধির জন্য বর্ধিত আবাসস্থল প্রদান করতে অথবা কার্বি আংলং পাহাড়ে প্রাণীদের
নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি করিডোর হিসেবে পার্কের বর্তমান সীমানা বরাবর মোট ৪২৯ বর্গ কিমি (১৬৬ বর্গ মাইল)
এলাকা যুক্ত করা হয়েছে এবং এটিকে একটি পৃথক জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা প্রদান করা
হয়েছে। পার্কটির উত্তর এবং
পূর্ব সীমানা ব্রহ্মপুত্র নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং দক্ষিণ সীমানা মরা দিফলু নদী দ্বারা বেষ্টিত। পার্কের মধ্যে প্রবাহিত
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল দিফলু এবং মরা ধনসিরি নদী।
পার্কটিতে উন্মুক্ত
বালুচর, নদীর বন্যায়
সৃষ্ট বিল এবং চাপরি নামে পরিচিত উঁচু অঞ্চল রয়েছে, যা বন্যার সময় প্রাণীদের জন্য আশ্রয় ও নিরাপদ
স্থান প্রদান করে। প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর
সহায়তায় পার্কটিতে অনেক কৃত্রিম চাপরি নির্মাণ করা হয়েছে। কাজিরঙ্গা উপ-হিমালয়
অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম সংরক্ষিত এলাকা এবং বৈচিত্র্যময় ও দৃশ্যমান প্রজাতির
উপস্থিতির কারণে এটিকে "জৈববৈচিত্র্য হটস্পট" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
খরার মৌসুমে বিল এবং নালা
খালগুলি শুকিয়ে যায়। বর্ষাকাল জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং কাজিরঙ্গার বার্ষিক ২,২২০ মিমি (৮৭ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাতের বেশিরভাগের জন্য বর্ষাকাল দায়ী। জুলাই এবং
আগস্টের মাসগুলিতে ব্রহ্মপুত্রের জলস্তর সর্বোচ্চ বৃদ্ধির কারণে পার্কের পশ্চিম অঞ্চলের
তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চল জলে ডুবে যায়। প্ৰায় প্রতি বছর বন্যার সময় জাতীয়
উদ্যানের ৭০%-৮০% অংশ অঞ্চল অন্ততঃ ৫-১০ দিনের জন্য
প্লাবিত হয়। বন্যার কারণে বেশিরভাগ প্রাণী পার্কের দক্ষিণ সীমানার বাইরের উঁচু
এবং বনভূমি অঞ্চলে- যেমন মিকির
পাহাড়ে চলে যায়। ২০১২ সালের অভূতপূর্ব বন্যায়
১৩টি গণ্ডার এবং
প্রধানত হগ ডিয়ার সহ ৫৪০টি প্রাণী মারা গিয়েছিল।যাইহোক, মাঝে মাঝে শুষ্ক
সময়ও সমস্যা তৈরি করে, যেমন খাদ্যের
অভাব এবং মাঝে মাঝে দাবানল।
পার্কের গাছপালা
এবং প্রাণীদের আবাসস্থলে ঋতুগত পরিবর্তন লক্ষণীয়। শীতকালে অগভীর বিল এবং নালা
(ছোট জলধারা) শুকিয়ে যায় এবং ছোট ছোট ঘাসে তলদেশ ঢেকে ফেলে। বারোমাসি বিলের
চারপাশেও ঘাস জন্মায়। বর্ষা মৌসুমের শেষে তৃণভোজী প্রাণী বিশেষ করে গণ্ডার চারণের জন্য এইসব
এলাকাগুলিতে ছুটে আসে।
ডিসেম্বর এবং
জানুয়ারী মাসের মধ্যে পার্কের অন্যান্য অংশের লম্বা মোটা ঘাসগুলি শুকিয়ে যায়
এবং পার্কের কর্মীরা সেগুলি নিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ফেলে। এই ধরনের
পোড়ানোর পরে কিছু প্রাণী পোড়া জায়গাগুলিতে জড়ো হতে শুরু করে এবং ছাই ও
নলখাগড়ার আধা-পোড়া কাণ্ডগুলি খায়। শীতের সময় বৃষ্টি পড়লে পোড়া জায়গাগুলিতে
নতুন ঘাসের ডগা গজিয়ে ওঠে এবং নতুন ঘাসের ডগাগুলি বেশি সংখ্যক প্রাণীকে এই
এলাকাগুলিতে আকর্ষণ করে। গ্রীষ্মকাল শুরু হওয়ার সাথে সাথে নতুন বৃষ্টির জল পেলে পোড়া
জায়গাগুলিতে দ্রুত ঘাস বেড়ে ওঠে এবং নরম ডগাগুলি মোটা পাতায় পরিণত হয়। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে
যায়। ফলে প্রাণীরা জলের উৎসের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। বিশেষ করে
পার্কের ভিতরে অবস্থিত অসংখ্য বারোমাসি বিল এবং জলধারার আশেপাশে থাকতে পছন্দ করে। বর্ষাকালে, অগভীর বিল এবং
নালাগুলি প্রথমে বর্ষার বৃষ্টিতে এবং পরে বন্যার জলে ভরাট হতে শুরু করে। প্রাণীরা
ধীরে ধীরে উঁচু ভূমির দিকে যেতে শুরু করে। যখন বন্যার জল
বেশিরভাগ এলাকা ঢেকে ফেলে,
তখন প্রাণীরা
নিকটবর্তী কার্বি আংলং পাহাড় এবং অন্যান্য সংলগ্ন এলাকায় চলে যায়।
গাছ-গাছড়া- এই পার্কে চার
ধরনের প্রধান উদ্ভিদ দেখা যায়।এগুলো হলো পলিমাটিযুক্ত প্লাবিত তৃণভূমি, পলিমাটিযুক্ত
সাভানা বনভূমি, ক্রান্তীয়
আর্দ্র মিশ্র পর্ণমোচী(শীতকালে পাতা ঝরে যায় এমন,
পত্ৰত্যাগী) বন এবং ক্রান্তীয় আধা-চিরসবুজ বন। ১৯৮৬ সালের
ল্যান্ডস্যাট(ল্যান্ডস্যাট প্রোগ্রাম হল পৃথিবীর
স্যাটেলাইট চিত্র সংগ্রহকারী দীর্ঘতম চলমান উদ্যোগ। এটি NASA/USGS এর যৌথ প্রোগ্রাম।)এর তথ্য অনুসারে, উদ্ভিদের শতকরা ৪১% লম্বা ঘাস, ১১% খাটো ঘাস, ২৯% খোলা জঙ্গল, ৪% জলাভূমি, ৮% নদী ও জলাশয় এবং
৬% বালু।
জলাশয়, পুকুর এবং নদীর
তীরে বিভিন্ন ধরণের জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। আগ্রাসী কচুরিপানা প্রায়শই জলাশয়গুলিকে ঢেকে ফেলে। তবে বিধ্বংসী
বন্যার সময় এগুলি পরিষ্কার হয়ে যায়। তৃণভোজীদের জন্য
বিষাক্ত আগ্রাসী লজ্জাবতী (Mimosa invisa), উদ্ভিদ ২০০৫ সালে ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’র সহায়তায় কাজিরঙ্গার কর্মীরা পরিষ্কার
করেছিলেন।
প্রাণীজগত- কাজিরঙ্গায় ৩৫টি
স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্ৰাণী রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম
ভারতীয় গণ্ডার(২,৪০১), বন্য জল মহিষ(১,৬৬৬)এবং পূর্বের জলাভূমিতে
হরিণের (৪৬৮) আবাসস্থল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে এই পার্কটি। বড় তৃণভোজী
প্রাণীদের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় হাতি (১,৯৪০), সাম্বার হরিণ
(৫৮)। ছোট তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় মুন্টজ্যাক হরিণ, ভারতীয় বন্য
শূকর এবং ভারতীয় হগ ডিয়ার। বিশ্বের প্রায় ৫৭% বন্য জল মহিষ রয়েছে কাজিরঙ্গায়। ভারতীয়
গণ্ডার, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, এশীয় হাতি, বন্য জল মহিষ এবং
জলাভূমির হরিণ সম্মিলিতভাবে কাজিরঙ্গার 'বিগ ফাইভ' নামে পরিচিত।
কাজিরঙ্গায় বেঙ্গল
টাইগার এবং ভারতীয় চিতাবাঘের মতো একাধিক প্রজাতির বড় বিড়ালের অন্যতম আবাসস্থল। ২০০৭ সালে কাজিরঙ্গাকে
বাঘের সংরক্ষণাগার হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য বিড়াল
প্রজাতির মধ্যে রয়েছে জঙ্গল ক্যাট, ফিশিং ক্যাট এবং
লেপার্ড ক্যাট। কাজিরঙ্গা ভারত তথা বিশ্বের সোনালী বাঘের একমাত্র আবাসস্থল।
ছোট স্তন্যপায়ী
প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বিরল প্রজাতির হিসপিড খরগোশ, ভারতীয় ধূসর
নেউল, ছোট ভারতীয় নেউল, বড় ভারতীয়
খাটাশ, ছোট ভারতীয় খাটাশ, বেঙ্গল শিয়াল, সোনালী শেয়াল, স্লথ বিয়ার, চীনা প্যাঙ্গোলিন, ভারতীয়
প্যাঙ্গোলিন, নিশাচর ও স্তন্যপায়ী প্রাণী, চীনা
ফেরেট-ব্যাজার এবং বহুবর্ণের উড়ন্ত কাঠবিড়ালি। ভারতে প্রাপ্ত
১৪টি প্রাইমেট(প্রাইমেটরা হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি বৈচিত্র্যময় বর্গ, যার মধ্যে মানুষ, বানর, শিম্পাঞ্জি এবং
প্রোসিমিয়ান(লেমুর, টারসিয়ার) অন্তর্ভুক্ত।) প্রজাতির মধ্যে
নয়টি এই পার্কে পাওয়া যায়।এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অসমীয়া ম্যাকাক(ম্যাকাক
হলো ম্যাকাকা প্রজাতির অন্তর্গত একটি মাঝারি আকারের, পুরাতন বিশ্বের
বানর।), ক্যাপড ও গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর এবং ভারতে
প্রাপ্ত একমাত্র বনমানুষ, হুলক গিবন। ২০২৪ সালে এই পার্কে বিন্টুরং(বিন্টুরং (Arctictis binturong), যা
বেয়ারক্যাট নামেও পরিচিত, বিন্টুরং
হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্ষারণ্যের, বিড়ালের
মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী।) এবং এশীয় ছোট-নখরযুক্ত উদবিড়াল দেখা
গিয়েছিল।
বার্ডলাইফ
ইন্টারন্যাশনাল কাজিরঙ্গাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কাজিরঙ্গা বিভিন্ন ধরণের
পরিযায়ী পাখি, জলচর পাখি, মৃতদেহভোজী এবং শিকারযোগ্য পাখির আবাসস্থল। ছোট
সাদা-কপাল বিশিষ্ট রাজহাঁস, ফেরুজিনাস হাঁস(ফেরুজিনাস
হাঁস (Aythya nyroca), যা
ফেরুজিনাস পোচার্ড বা সাদা-চোখ পোচার্ড নামেও পরিচিত, এই হাঁস ইউরেশিয়া
জুড়ে পাওয়া যায়), বেয়ারের পোচার্ড হাঁস
এবং ছোট অ্যাডজুট্যান্ট, বড় অ্যাডজুট্যান্ট(লেসার অ্যাডজুট্যান্ট (Leptoptilos javanicus) হলো
সারস পরিবারের একটি বৃহৎ ও বিপন্ন জলচর পাখি, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়।
এক মিটারেরও বেশি লম্বা এই পাখিটির মাথা পালকহীন ও লালচে-হলুদ, শরীরের উপরের
অংশ কালো এবং নিচের অংশ সাদা।), কালো-গলা সারস
এবং এশীয় ওপেনবিল সারসের মতো পাখিরা শীতকালে মধ্য এশিয়া থেকে এই পার্কে পরিযায়ী
পাখি হিসাবে আসে। নদী
তীরবর্তী পাখিদের মধ্যে রয়েছে ব্লাইথের মাছরাঙা, সাদা-পেট বক, ডালমেশিয়ান
পেলিক্যান, দাগ-ঠোঁট পেলিক্যান, নর্ডম্যানের
সবুজপাখি এবং কালো-পেট টার্ন। শিকারী পাখিদের মধ্যে রয়েছে বিরল ইস্টার্ন ইম্পেরিয়াল, গ্রেটার স্পটেড
ঈগল, সাদা-লেজ ঈগল, প্যালাসের মাছ
ঈগল, ধূসর-মাথা মাছ ঈগল এবং লেসার কেস্ট্রেল।
একসময়
কাজিরাঙ্গা সাত প্রজাতির শকুনের আবাসস্থল ছিল, কিন্তু
ডাইক্লোফেনাক নামক ঔষধযুক্ত পশুর মৃতদেহ খাওয়ার ফলে শকুনের সংখ্যা প্রায়
বিলুপ্তির পথে চলে এসেছে। শুধুমাত্র ভারতীয় শকুন, সরু-ঠোঁট শকুন
এবং সাদা-কোমর শকুন টিকে আছে। শিকারযোগ্য পাখিদের মধ্যে রয়েছে সোয়াম্প
ফ্রাঙ্কোলিন, বেঙ্গল ফ্লোরিকান এবং পেল-ক্যাপড পিগন।
কাজিরঙ্গায়
বসবাসকারী অন্যান্য পাখি পরিবারের মধ্যে রয়েছে গ্রেট পাইড হর্নবিল এবং রিথড
হর্নবিল, ওল্ড ওয়ার্ল্ড ব্যাবলার যেমন জারডন'স এবং মার্শ
ব্যাবলার, বাবুই পাখি যেমন কমন বায়া উইভার, বিপন্ন ফিন'স উইভার এবং
ব্রিসলড গ্রাসবার্ড। অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক-ব্রেস্টেড
প্যারটবিল।
বিশ্বের দুটি
বৃহত্তম সাপ, রেটিকুলেটেড পাইথন এবং ইন্ডিয়ান রক পাইথন, সেইসাথে বিশ্বের
দীর্ঘতম বিষধর সাপ কিং কোবরা, এই পার্কে বাস
করে। এখানে পাওয়া অন্যান্য সাপের মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান কোবরা, মনোকলড কোবরা, রাসেল'স ভাইপার এবং কমন
ক্রেইট। পার্কে পাওয়া মনিটর টিকটিকি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বেঙ্গল মনিটর এবং
এশিয়ান ওয়াটার মনিটর।অন্যান্য সরীসৃপের মধ্যে রয়েছে পনেরো প্রজাতির কচ্ছপ, যেমন স্থানীয়
আসাম রুফড টার্টল এবং বাদামী কচ্ছপ। এই এলাকায় ৪২ প্রজাতির মাছ
পাওয়া যায়, যার মধ্যে টেট্রাওডন(টেট্রাওডন
(Tetraodon) হলো
পাফারফিশ পরিবারের (Tetraodontidae)
মাছ, যা আফ্রিকার মিঠা পানিতে পাওয়া যায়।) রয়েছে।
প্ৰশাসন ব্যবস্থা- আসাম সরকারের বন
বিভাগের বন্যপ্রাণী শাখা কাজিরঙ্গার প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে
রয়েছে। বন বিভাগের প্ৰশাসনের সদর দপ্তর বোকাখাটে অবস্থিত। পার্কের প্রশাসনিক প্রধান হলেন প্রধান বন
সংরক্ষক-স্তরের কর্মকর্তা। একজন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হলেন পার্কের প্রশাসনিক
প্রধান নির্বাহী কৰ্মকৰ্তা। তাঁকে সহকারী বন সংরক্ষক পদমর্যাদার দুজন
কর্মকর্তা সহায়তা করেন। পার্ক এলাকাটি পাঁচটি রেঞ্জে বিভক্ত। রেঞ্জগুলি বন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে থাকে। পাঁচটি রেঞ্জ হল বুড়াপাহাড় (সদর দপ্তর: ঘোড়াকাঠি), পশ্চিম (সদর
দপ্তর: বাগুরি), মধ্য (সদর দপ্তর: কহরা), পূর্ব (সদর দপ্তর: আগারাতলি) এবং উত্তর (সদর দপ্তর:
বিশ্বনাথ)। প্রতিটি রেঞ্জ বিট উপ-বিভাগে বিভক্ত, যার প্রধান একজন
ফরেস্টার। সাব-বিটের প্রধান
হলো একজন ফরেস্ট
গার্ড।
পার্কটি রাজ্য
সরকার এবং ভারত সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু
পরিবর্তন মন্ত্রকের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং অ-পরিকল্পনা বাজেটের অধীনে
আর্থিক সহায়তা পায়। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রজেক্ট এলিফ্যান্টের অধীনে
অতিরিক্ত তহবিল পায়। এই তহবিলের বেশিরভাগই কর্মীদের মজুরি ও বেতন
প্রদান এবং চোরা শিকার বিরোধী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। প্রাপ্ত তহবিলের
শুধুমাত্র একটি
ছোট পরিমাণ অর্থ পার্কের উন্নয়নের জন্য অবশিষ্ট থাকে। সরকারি তহবিল থাকা সত্ত্বেও
পার্কটি তহবিলের ঘাটতির সম্মুখীন হয়। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ফান্ড থেকে টেকনিক্যাল
কো-অপারেশন ফর সিকিউরিটি রেইনফোর্সমেন্ট প্রকল্পের অধীনে US$ ১০০,০০০ অনুদান পাওয়া গিয়েছিল।
স্থানীয় লোকেরা
পার্ক থেকে শ্রম এবং সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের মাধ্যমে কর্মসংস্থান পায়। পার্কের
জন্য শ্রমের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছে চোরাশিকার বিরোধী কার্যকলাপ এবং সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণের জন্য শ্রম। তৃণভোজী
প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর আগাছা মিমোসা অপসারণের জন্য প্রতিটি রেঞ্জে প্রায় ১০০
থেকে ২০০ জন লোক নিয়োগ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে পার্ক কর্তৃপক্ষ পার্কের ভিতরে
পর্যটকদের জিপ রক্ষা করার জন্য নিরাপত্তা রক্ষীও নিয়োগ করেছে। পার্কটি তার
আশেপাশের গ্রামগুলিতে একটি খুব ভালো গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। প্রতিটি
গ্রামে মূল তথ্যদাতা রয়েছে, যারা চোরা শিকারিদের
গতিবিধি সম্পর্কে রিপোর্ট করে এবং পার্ক কর্তৃপক্ষকে তথ্য প্রদানের জন্য তাদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃত
করা হয়।
সংরক্ষণ
ব্যবস্থাপনা- বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণের জন্য ভারতীয় আইনের অধীনে কাজিরঙ্গা জাতীয় উদ্যানকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্ৰদান
করা হয়েছে। উদ্যানের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার জন্য ১৮৯১ সালের আসাম বন বিধান এবং
২০০২ সালের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন সহ বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। চোরাশিকার, বিশেষ করে
গণ্ডারের শিং-এর জন্য তাদের শিকার, কর্তৃপক্ষের জন্য
একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে, চোরাশিকারিদের দ্বারা ৫৬৭টি গণ্ডার শিকার করা
হয়েছিল।বিগত কয়েক বছর ধরে গণ্ডার
নিধনের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। ২০০৭ সালে চোরাশিকারিদের দ্বারা মাত্ৰ ১৮টি ভারতীয়
গণ্ডার হত্যা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই চোরাশিকার কার্যকলাপের
সাথে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির অর্থায়নের যোগসূত্র রয়েছে।
চোরাশিকার বিরোধী
শিবির নির্মাণ এবং বিদ্যমান শিবিরগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, টহল, গোয়েন্দা তথ্য
সংগ্রহ এবং পার্কের চারপাশে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণের মতো
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলি গণ্ডারের হতাহতের সংখ্যা
হ্রাস পেয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে সশস্ত্র
চোরাশিকারিদের হাত থেকে গণ্ডারকে রক্ষা করার জন্য পার্কটিতে ড্রোন ক্যামেরা
ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রোনগুলি নিরাপত্তা
রক্ষীরা পর্যবেক্ষণ করে।
কাজিরঙ্গায় ঘাস
নিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ানো- বার্ষিক বন্যা এবং ভারী বৃষ্টির ফলে
বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর সাথে সাথে সংরক্ষণ
পরিকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।পার্কের দক্ষিণ সীমানা ঘেঁষে থাকা জাতীয় মহাসড়ক-৩৭
জুড়ে প্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য বেশ কয়েকটি করিডোর স্থাপন করা হয়েছে।
চা বাগানে কীটনাশকের ব্যবহার এবং নুমলিগড়ের
পেট্রোলিয়াম শোধনাগার থেকে দূষিত পদার্থ প্রবাহের কারণে
সৃষ্ট জল দূষণ এই অঞ্চলের জীবজগতের জন্য বিপদ ডেকে
আনে। দাবানল এড়াতে প্রতি বছর তৃণভূমি ব্যবস্থাপনার
কৌশল- যেমন নিয়ন্ত্রিত দহন কৌশল প্রয়োগ করা হয়।
পরিবেশ পর্যটন- পার্কের ভিতরে
এবং আশেপাশে পাখি দেখা সহ বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণই দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। হাতি বা জিপে করে
‘গাইডেড ট্যুরে’র ব্যবস্থা আছে।
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে পার্কে হাইকিং নিষিদ্ধ।
বন্যপ্রাণী দেখার জন্য সোহোলা, মিহিমুখ, কাঠপাড়া, ফলিয়ামারি এবং
হরমতিতে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। বরফে ঢাকা নিম্ন হিমালয়ের চূড়াগুলো পার্কের
গাছপালা ও ঘাসে ঘেরা ভূ-দৃশ্যকে ঘিরে রেখেছে, যার মাঝে মাঝে
রয়েছে অসংখ্য পুকুর। দর্শনার্থীদের পার্ক সম্পর্কে অধিক জানার জন্য সাহায্য করার
জন্য কাজিরঙ্গার বাগরি পর্বতমালায় একটি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধির ফলে পার্কের
প্রান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরা পর্যটন সম্পর্কিত কার্যকলাপের মাধ্যমে
অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।এর ফলে সুরক্ষার গুরুত্ব
সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি হয়েছে। পর্যটকদের উপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৮০ শতাংশ পর্যটক গণ্ডার দর্শনকে সবচেয়ে আনন্দদায়ক বলে মনে করেন। সম্প্রতি দুর্গাপুর
গ্রামে প্রতিষ্ঠিত কাজিরঙ্গা জাতীয় অর্কিড ও জীববৈচিত্র্য পার্ক পর্যটকদের জন্য
একটি নতুন আকর্ষণ। এখানে ৫০০-এর বেশি প্রজাতির অর্কিড, ১৩২ ধরনের টক ফল
ও শাকসবজি, ১২ প্রজাতির বেত, ৪৬ প্রজাতির বাঁশ
এবং বিভিন্ন প্রজাতির স্থানীয় মাছ রয়েছে।
পর্যটন পার্কের
প্রান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের অৰ্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে। ২০০৭ সাল
পর্যন্ত পার্ক সংলগ্ন
এলেকায় প্রায় ৩৫টি বিভিন্ন ধরণের হোটেল বা লজ অবস্থিত ছিল, যার মধ্যে চারটি
সরকার দ্বারা পরিচালিত হত। এগুলিতে প্রায় ৩০০ জন লোক নিযুক্ত ছিল। কিছু
পরিবার পার্কের ঠিক বাইরে হোম স্টে সুবিধাও প্রদান করে যাতে পর্যটকরা স্থানীয়
জীবনের স্বাদ পেতে পারে এবং গৃহস্থরা দর্শনার্থীদের পার্কে নিয়ে যেতে ও পথ প্ৰদৰ্শন করতে
পারে। এছাড়াও স্থানীয় লোকদের মালিকানাধীন অথবা পরিচালিত স্থানীয়ভাবে হাতে বোনা কাপড়
বিক্রির ২৬টি দোকান রয়েছে পার্ক সংলগ্ন এলেকায়।ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রক এবং
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) যৌথভাবে কাজিরঙ্গার কহরা
পর্বতমালার পরিধিতে অবস্থিত দুর্গাপুর গ্রামে গ্রামীণ পর্যটনকে সমর্থন করে সমগ্র ভারত
জুড়ে ৩১টি স্থানে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অর্থনৈতিক
মূল্যায়ন- কাজিরঙ্গা টাইগার রিজার্ভ এর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৯.৮ বিলিয়ন রুপি বলে অনুমান
করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবাগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল
বন্যপ্রাণীর জন্য বাসস্থান এবং আশ্রয়স্থল (৫.৭৩ বিলিয়ন), জিন-পুল সুরক্ষা(জিন-পুল সুরক্ষা হলো পরিবেশগত পরিবর্তন, রোগব্যাধি এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে
দীর্ঘমেয়াদী অভিযোজন ক্ষমতা ও টিকে থাকা নিশ্চিত করার জন্য কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে
জিনগত বৈচিত্র্য (অ্যালিল) সংরক্ষণ করা।)(৩.৪৯ বিলিয়ন), বিনোদনমূলক মূল্য
(২১ মিলিয়ন), জৈবিক নিয়ন্ত্রণ
(১৫০ মিলিয়ন) এবং কার্বন শোষণ (১৭ মিলিয়ন)।
জনপ্রিয়
সংস্কৃতিতে- কাজিরাঙ্গা বিভিন্ন বই, গান এবং তথ্যচিত্রের বিষয়বস্তু হয়েছে বা
সেগুলিতে এর উল্লেখ করা হয়েছে। পার্কটি প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে যখন
চিকিৎসক থেকে ফটোগ্রাফার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে আত্মপ্ৰকাশ করে রবিন ব্যানার্জী 'কাজিরাঙ্গা' শিরোনামে একটি
তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তথ্যচিত্ৰটি ১৯৬১ সালে বার্লিনের টেলিভিশনে
প্রচারিত হয় এবং সেটা ব্যাপক সাফল্য লাভ করে।
জাতীয় উদ্যানে
গণ্ডার শিকার নিয়ে অরূপ দত্তের লেখা শিশুদের গল্পের বই 'কাজিরঙ্গা ট্রেইল' শঙ্কর পুরস্কার("শঙ্করের পুরস্কার" বলতে সাধারণত শঙ্কর নামের
বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের নামে প্রদত্ত বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র পুরস্কারকে
বোঝায়; যার
মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নাট্যকারদের জন্য শঙ্কর নাগ থিয়েটার পুরস্কার, চক্ষুসেবায়
অবদানের জন্য শঙ্কর রত্ন পুরস্কার, অথবা
রবি শঙ্কর বা শঙ্কর মহাদেবনকে প্রদত্ত পুরস্কার।) লাভ করে। অসমীয়া
গায়ক ভূপেন হাজরিকা তার একটি গানে কাজিরঙ্গার কথা উল্লেখ করেছেন।বিবিসির
সংরক্ষণবিদ এবং ভ্রমণ লেখক মার্ক শ্যান্ড, কাজিরঙ্গার প্রথম মহিলা
মাহুত—পার্বতী বড়ুয়ার জীবনের উপর ভিত্তি করে 'কুইন অফ দ্য এলিফ্যান্টস' নামে একটি বই এবং
বিবিসির তথ্যচিত্র রচনা করেছেন। বইটি ১৯৯৬ সালের থমাস কুক ট্র্যাভেল বুক
অ্যাওয়ার্ড এবং প্রি লিটেরেয়ার ডি'আমিস পুরস্কার জিতে, যার জন্য মাহুত
পেশা এবং কাজিরঙ্গা প্রচার লাভ করে।•
মানস জাতীয় উদ্যান
ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থিত। জাতীয় উদ্যানটি প্রজেক্ট টাইগার
রিজার্ভ এবং হাতি সংরক্ষণাগার। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই উদ্যানটি ভুটানের রয়্যাল
মানস জাতীয় উদ্যানের সাথে সীমান্ত ভাগ করে। উদ্যানটি তার বিরল এবং বিপন্ন স্থানীয়
বন্যপ্রাণী যেমন আসাম ছাদযুক্ত কচ্ছপ, হিসপিড খরগোশ, সোনালী হনুমান
এবং পিগমি হগের জন্য পরিচিত। এটি বিশ্বের একমাত্র পিগমি হগের বাসস্থানের জন্যও পরিচিত।মানস
জাতীয় উদ্যান তার বন্য জল মহিষের জন্যও বিখ্যাত। এর ব্যতিক্রমী জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য এবং বিভিন্ন ধরণের আবাসস্থলের কারণে মানস জাতীয় উদ্যানটি বায়োস্ফিয়ার(মানুষ ও জীবমণ্ডল কর্মসূচি (এমএবি) হলো ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৬৮
সালে চালুকৃত একটি আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি, যার লক্ষ্য হলো মানুষ ও তাদের
পরিবেশের মধ্যে 'সম্পর্কের
উন্নতির' জন্য একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন
করা।) রিজার্ভ এবং একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী
স্থান।
নামের উৎপত্তি- পার্কটির নাম
মানস নদী থেকে এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর প্রধান উপনদী মানস নদী এই
জাতীয় উদ্যানের কেন্দ্রস্থল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ইতিহাস- আজকের মানস জাতীয়
উদ্যান এলাকাটি ১৮৬৫ সালে সংঘটিত দুয়ার যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ভুটান রাজ্যের অধীনে
ছিল। দুয়ার যুদ্ধের পর এলেকাটি ব্রিটিশ ভারতের কাছে
হস্তান্তর করা হয়েছে।
১৯২৮ সালের ১
অক্টোবর ৩৯১ বর্গ কিমি (১৫১ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে অবস্থিত মানস বন্যপ্রাণী
অভয়ারণ্যকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণার আগে এই এলাকায় মানস সংরক্ষিত
বন এবং উত্তর কামরূপ সংরক্ষিত বন নামে দুটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল।এই বনাঞ্চল কোচবিহারের
রাজপরিবার এবং গৌরীপুরের রাজা শিকারের জন্য ব্যবহার করতেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো
এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৮৯ সালে মানস
বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে মানস বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে
কাহিতামা সংরক্ষিত বন, কোকিলাবাড়ি সংরক্ষিত বন এবং পানবাড়ি সংরক্ষিত
বনকে এর সাথে যুক্ত করে মানস জাতীয় উদ্যান গঠন করা হয়েছে। ১৯৯২ সালে ব্যাপক চোরা
শিকার এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে ইউনেস্কো এটিকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান
হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অভয়ারণ্যটির আয়তন বৃদ্ধি করে ৫০০
বর্গ কিমি (১৯০ বর্গ মাইল) করা হয়। ২০১১ সালের ২১ জুন এটিকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ
দেওয়া হয় এবং সংরক্ষণের প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা করা হয়।
জাতীয় উদ্যানের
কেন্দ্রস্থলে পাগ্রাং নামে একমাত্র বনগ্রামটি রয়েছে। এই গ্রামটি ছাড়াও
উদ্যানটিকে ঘিরে আরও ৫৬টি গ্রাম রয়েছে। আরও অনেক প্রান্তিক গ্রাম প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে উদ্যানটির উপর নির্ভরশীল।
ভূগোল- পার্ক এলাকাটি
ভারতের আসাম রাজ্যের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল অর্থাৎ বিটিআর-এর
অন্তর্গত চিরাঙ ও বাকসা জেলায় অবস্থিত।
পার্কটি তিনটি বিভাগে বিভক্ত। পশ্চিম বিভাগটি পানবাড়িতে, কেন্দ্রীয়টি বরপেটা রোডের কাছে বাঁশবাড়িতে
এবং পূর্ব বিভাগটি পাঠশালার কাছে ভুইয়াপাড়াতে অবস্থিত। মানস জাতীয় উদ্যানের কেন্দ্রীয় অঞ্চল হলো, বরপেটা রোডের
কাছে অবস্থিত বাঁশবাড়ি। বাঁশবাড়ি পর্যটকদের জন্য
প্রধান প্রবেশদ্বার ও কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে উদ্যানের
অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগের সাথে সাথে বন্যপ্রাণী
দর্শন ও প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের সুযোগ
প্রদান করে। বিভাগগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো নয়; বাঁশবাড়ি থেকে পানবাড়িতে
যাওয়ার জন্য দুটি প্রধান নদী পার হতে হয়। কেন্দ্রকে পূর্ব বিভাগের সাথে সংযোগকারী
একটি দুর্গম পথ (দৈমারি রোড) রয়েছে। বেশিরভাগ দর্শনার্থী বাঁশবাড়িতে এসে ভুটান
সীমান্তে মানস নদীর তীরে জঙ্গলের ভেতরে অবস্থিত মথনগুড়িতে কিছু
সময় পার করে।
মানস অভয়ারণ্য পূর্ব হিমালয়ের
পাদদেশে অবস্থিত এবং এটি ঘন জঙ্গলে আবৃত। মানস নদী পার্কের পশ্চিম দিক দিয়ে
প্রবাহিত হচ্ছে এবং এটিই পার্কের প্রধান নদী। মানস নদী ব্রহ্মপুত্র নদীর
একটি প্রধান উপনদী এবং সমভূমিতে পৌঁছানোর পর এটি বেকী ও ভালকাডুবা
নামে দুটি পৃথক নদীতে বিভক্ত হয়েছে। মানস নদী ভারত ও ভুটানকে বিভক্তকারী একটি
আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবেও কাজ করে। উদ্যানের উত্তরের সাভানা অঞ্চলের
ভিত্তিপ্রস্তর চুনাপাথর ও বেলেপাথর দ্বারা গঠিত, অন্যদিকে
উদ্যানের দক্ষিণের তৃণভূমিগুলো সূক্ষ্ম পলিমাটির গভীর স্তরের
উপর অবস্থিত।উদ্যানটি ৯৫০ বর্গ কিলোমিটার (৩৭০ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং
এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬১–১১০ মিটার (২০০–৩৬১ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত।
জলবায়ু: সর্বনিম্ন
তাপমাত্রা প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং সর্বোচ্চ
তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।মে থেকে সেপ্টেম্বর
মাসের মধ্যে অভয়ারণ্যটিতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের
পরিমাণ প্রায় ৩৩৩ সেন্টিমিটার (১৩১ ইঞ্চি)।
উদ্ভিদ- মানসের মৌসুমি বনভূমি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার
অর্ধ-চিরসবুজ বন বাস্তুঅঞ্চলে অবস্থিত। উপ-হিমালয় ভাবর(ভাবর হলো ভারতের শিবালিক পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত মোটা পলি, কাঁকর ও বোল্ডার দ্বারা গঠিত একটি
সংকীর্ণ ও ছিদ্রযুক্ত বলয়।) তরাই অঞ্চলের সাথে নদী তীরবর্তী অনুক্রমের ফলে
হিমালয়ী উপক্রান্তীয় প্রশস্তপত্রী বনের সংমিশ্রণ এটিকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ
জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে।
প্রধান উদ্ভিদের
প্রকারগুলি হল: উত্তরাঞ্চলে উপ-হিমালয়ী হালকা পলিমাটিযুক্ত অর্ধ-চিরসবুজ বন। পূর্ব
হিমালয়ী মিশ্র আর্দ্র ও শুষ্ক পর্ণমোচী বন। নিম্ন পলিমাটিযুক্ত সাভানা বনভূমি এবং আসাম
উপত্যকার অর্ধ-চিরসবুজ পলিমাটিযুক্ত তৃণভূমি যা পার্কের প্রায় ৫০% জুড়ে রয়েছে। নদী
তীরবর্তী শুষ্ক পর্ণমোচী বনের বেশিরভাগই ক্রমবিকাশমান পর্যায়ের প্রাথমিক পর্যায়ে
রয়েছে। মূল অঞ্চল থেকে মোট ৫৪৩ প্রজাতির উদ্ভিদ নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭৪টি প্রজাতি
ডাইকোটাইলেডন (৮৯টি গাছ সহ),১৩৯ টি একরঙা এবং ৩০ টি টেরিডোফাইট
এবং জিমনোস্পার্ম।
প্রাণীজগত- এই অভয়ারণ্যে ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৮০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৩ প্রজাতির উভচর প্রাণী
নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ২১টি স্তন্যপায়ী প্রাণী ভারতের
প্রথম তফসিলভুক্ত(মানস জাতীয় উদ্যানে ভারতের ১৯৭২
সালের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইনের প্রথম তফসিলের অধীনে তালিকাভুক্ত ২১-২২টিরও বেশি
স্তন্যপায়ী প্রজাতি রয়েছে, যা
চোরা শিকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। এখানকার প্রধান
প্রজাতিগুলির মধ্যে রয়েছে বেঙ্গল ফ্লোরিকান, পিগমি
হগ, ভারতীয় গণ্ডার, সোনালী হনুমান, বাঘ, মেঘলা চিতা, হিসপিড খরগোশ এবং এশীয় বুনো মহিষ) এবং এদের মধ্যে
৩১টি প্ৰাণী বিপন্ন।
এই অভয়ারণ্যের
প্রাণিকুলের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় হাতি, ভারতীয় গণ্ডার, গৌর(ভারতীয় বাইসন), বুনো জল মহিষ, বারাসিংহা, বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় চিতাবাঘ, ক্লাউডেড চিতা, এশীয় সোনালী বিড়াল, বনবিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, মেছো বিড়াল, মার্বেল ক্যাট, বুনো কুকুর, সোনালী শেয়াল, টুপিওয়ালা হনুমান, সোনালী হনুমান, অসমীয়া ম্যাকাক(আসাম
ম্যাকাক (Macaca assamensis) বা
অসমীয়া ম্যাকাক হলো পুরাতন বিশ্বের বানর পরিবারের একটি প্রজাতি), রিসাস ম্যাকাক(এক
প্রকার বানর), ধূসর হনুমান, স্লো লরিস, হুলক গিবন, মসৃণ-লোমযুক্ত
উদবিড়াল, স্লথ ভালুক, বার্কিং ডিয়ার, হগ ডিয়ার, সাম্বার হরিণ এবং
চিতল হরিণ এবং বড় ভারতীয় সিভেট, সাধারণ পাম সিভেট, স্পটেড লিনসাং, হলুদ-গলা মার্টেন, কালো দৈত্যাকার কাঠবিড়ালি, ভারতীয় সজারু, ভারতীয়
প্যাঙ্গোলিন, চীনা প্যাঙ্গোলিন, বুনো শুয়োর।
পার্কটি বিরল এবং
বিপন্ন বন্যপ্রাণীর প্রজাতির জন্য সুপরিচিত, যা বিশ্বের অন্য
কোথাও পাওয়া যায় না, যেমন আসাম ছাদযুক্ত কচ্ছপ, হিসপিড খরগোশ, সোনালী হনুমান
এবং পিগমি হগ। ২০২৪ সালে পার্কে ৯টি পিগমি
হগ বন্য পরিবেশে ছাড়া হয়েছে, যার ফলে মানসে
এদের সংখ্যা বেড়ে ৬৩ হয়েছে।
মানসে ৪৫০ টিরও বেশি
প্রজাতির পাখি রয়েছে। এখানে বিপন্ন বেঙ্গল ফ্লোরিকানের সবচেয়ে বড় সংখ্যা
রয়েছে। অন্যান্য প্রধান পাখি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বড় ধনেশ, বনমুরগি, বুলবুল, রুডি শেলডাক, কালিজ ফেজ্যান্ট, বক, পেলিকান, ছোট মাছরাঙা ঈগল, ঝুঁটিওয়ালা সর্প-ঈগল, বাজপাখি, স্কারলেট মিনিভেট, মৌমাছিখেকো, ম্যাগপাই-রবিন, ডোরাকাটা ধনেশ, ধূসর ধনেশ, মার্গানসার(এক প্রকার মাছ
খেকো হাঁস), হ্যারিয়ার(শিকারি পাখি
পরিবারের এক প্রকার পাখি), ভারতীয় ময়ূর, মাছরাঙা এবং বক।•
মাজুলি নদী দ্বীপ
মাজুলি উত্তর-পূর্ব
ভারতের আসাম রাজ্যের একটি বৃহত্তম নদী দ্বীপ। এর দক্ষিণে ও পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদী, পশ্চিমে সুবনসিরি
নদী। দ্বীপটির
উত্তর-পশ্চিমে ছোট ছোট উপনদী, যেমন—রঙ্গানদী, দিকরং, দুবলা, চিচি ও টুনি
দ্বারা বেষ্টিত। ব্রহ্মপুত্রের একটি ছোট শাখা খেরকাটিয়া সুঁতিও দ্বীপটির উত্তর-পূর্ব দিকে
অবস্থিত।
এই দ্বীপে মিসিং, দেওরি এবং
সোনোয়াল কাছারি উপজাতির সদস্যরা বাস করে এবং এটি অসমীয়া নব্য-বৈষ্ণব সংস্কৃতির কেন্দ্র
হিসেবে বিখ্যাত। দ্বীপটি গুয়াহাটি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। যোরহাট থেকে
ফেরি বা নৌকার মাধ্যমে এই দ্বীপে পৌঁছানো যায়।
২০১৬ সালে মাজুলি
ভারতের প্রথম নদী দ্বীপ হিসেবে জেলার মর্যাদা লাভ করে। মাজুলি ২০০৪ সালের মার্চ
মাস থেকে ইউনেস্কোর অস্থায়ী তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং বিশ্ব ঐতিহ্য মনোনয়ন
প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাংস্কৃতিক বিভাগে শ্রেণীবদ্ধ হয়েছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড
রেকর্ডস দ্বারা মাজুলি বিশ্বের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ নদী দ্বীপ হিসাবে স্বীকৃত।যাইহোক, এনসাইক্লোপিডিয়া
ব্রিটানিকায় ব্রাজিলের বানানাল দ্বীপ(বানানাল দ্বীপ
হলো ব্রাজিলের দক্ষিণ-পশ্চিম টোকানটিন্সে অবস্থিত একটি বৃহৎ নদী দ্বীপ, যা আরাগুয়াইয়া নদীর দ্বিবিভাজনের
ফলে গঠিত হয়েছে। বানানাল দ্বীপ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দ্বীপ।
দ্বীপটি ৩২০ কিলোমিটার (২০০ মাইল) দীর্ঘ এবং ৫৫ কিলোমিটার (৩৪ মাইল) প্রশস্ত। এর মোট আয়তন
১৯,১৬২.২৫ বর্গ কিলোমিটার(৭,৩৯৮.৫৯ বর্গ মাইল)।) মাজুলিকে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ হিসাবে
উল্লেখ করা হয়।
ইতিহাস- মাজুলি ভারতের আসাম রাজ্যে ব্রহ্মপুত্র নদীর
মাঝে অবস্থিত একটি দীর্ঘ ও সরু নদী দ্বীপ। বন্যা এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে
সৃষ্ট ভূ-রূপতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে দ্বীপটি গঠিত হয়েছে। দ্বীপটি দুটি নদীর
উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত: উত্তরে ব্রহ্মপুত্র এবং দক্ষিণে বুড়ি দিহিং নদী। ব্রহ্মপুত্র এবং
এর অন্যতম প্রধান উপনদী দিহিং একসময় একে অপরের সমান্তরালভাবে এবং কাছাকাছি
প্রবাহিত হতো। ১৬৬১ থেকে ১৬৯৬ সালের মধ্যে ধারাবাহিক ভূমিকম্প, ১৭৫০ সালের একটি
ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলের রূপ পরিবর্তন করে দেয়। ১৭৫০ সালের সেই
ভয়াবহ বন্যা ব্রহ্মপুত্রের নদীর একটি অংশকে তার পূর্ববর্তী সঙ্গমস্থল থেকে প্রায়
১৯০ কিমি উজানে দিহিং নদীর মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এর দক্ষিণ
শাখাটি বুড়ি সুঁতি নামে পরিচিত হয় এবং উত্তর শাখাটি
লুইত সুঁতিতে পরিণত হয়। কালক্রমে লুইত সুঁতি হ্রাস পেয়ে
খেরকটীয়া সুঁতিতে পরিণত হয়, অন্যদিকে বুড়ি সুঁতি বর্তমান
ব্রহ্মপুত্রের প্রধান জলধারা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
দিহিং এবং
ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী ভূমি, যা মূলত বর্তমান মাজুলির সমতুল্য মূলত চুটিয়া রাজ্যের অংশ ছিল। বুরঞ্জী থেকে
জানা যায় যে, চুটিয়া বিষয়া মানিক চন্দ্র বরুয়া সর্বপ্রথম দিহিং/মাজুলিতে আহোম
আক্রমণের খবর পান এবং তাদের বাধা প্রদান করার জন্য অগ্রসর হন। তখন মাজুলি অঞ্চলের
দিহিং-মুখ (বর্তমান দক্ষিণ মাজুলি), দিখৌ মুখ, শিরা আতি এবং
চেরুয়াকাটাতে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে আহোমদের বিজয়ের পর ১৫২৫ সালে সুহুংমুং দ্বারা নিযুক্ত দিহিংগীয়া
গোঁহাইর অধীনে এটিকে আহোম রাজ্যের মুং-ক্লাং (দিহিং) প্রদেশ হিসেবে পুনর্গঠন ও
শাসন করা হয়।
সপ্তদশ শতাব্দীর
প্রথমার্ধে, আহোম স্বর্গদেউ প্রতাপ সিংহ মাজুলিতে মেরাগড় নামে একটি
প্রাচীর নির্মাণ করেন। আরেকজন আহোম স্বর্গদেউ লক্ষ্মী সিংহ ১৭৬৯ থেকে ১৭৮০ সাল
পর্যন্ত এখানে রাজত্ব করেছিলে, তিনি ১৭৭৬ সালে একটি
অনুদানপত্র লেখেছিলন। সেই অনুদান পত্রে "মাজুলি প্রদেশ" এবং এর
কমলাবাড়ি সত্র, অগ্নিচাপরি, গজালা সত্র এবং
টুনি নদীর কথা উল্লেখ ছিল। মোয়ামারিয়া বিদ্রোহের সময় দ্বীপটি মোয়ামারিয়া বিদ্রোহী নেতা রাঘব
মরাণের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
ষোড়শ শতাব্দীতে
সমাজ সংস্কারক শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের সফরের পর মাজুলি আসামের একটি সাংস্কৃতিক ও
ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নব্য-বৈষ্ণব
আন্দোলনের নেতা শঙ্করদেব এই দ্বীপে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার করেন এবং মঠ (সত্র নামে
পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন। কালক্রমে এই প্রতিষ্ঠানগুলি অসমীয়া ধর্ম, সংস্কৃতি এবং
শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সত্র প্রতিষ্ঠার
ফলে মাজুলি বৈষ্ণব ধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এবং ১৯৪৭ সালে
ভারতের স্বাধীনতার পরেও এই দ্বীপটি অসমীয়া সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে
স্বীকৃত। দ্বীপটি বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ হিসাবেও
পরিচিত।
১৯শ এবং ২০শ শতকে
মাজুলি ব্রহ্মপুত্রের
তীব্র ভাঙনের কবলে পড়ে। যার ফলে এর আয়তন
উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৭৯০-এর দশকে দ্বীপটির আয়তন
ছিল প্রায় ১,৩০০ বর্গ কিমি (৫০০ বর্গ মাইল)। ২০শ শতকের শুরুতে এর আয়তন সামান্য
হ্রাস পেয়ে ১,২৫৫ বর্গ কিমি (৪৮৫ বর্গ মাইল) হয়। ২০২৪ সাল নাগাদ ক্রমাগত ভাঙনের
ফলে মাজুলির আয়তন হ্রাস পেয়ে বর্তমান প্রায় ৮৮০ বর্গ কিমি (৩৪০ বর্গ মাইল) অবশিষ্ট
রয়েছে।
সংস্কৃতি এবং
জনসংখ্যা- ৪৬.৩৮%
তফসিলি উপজাতি এবং ১৪.২৭% তফসিলি জাতি এবং সেই সাথে অ-উপজাতি জাতি অসমীয়া হিন্দু
নিয়ে মাজুলি নদী দ্বীপটি গঠিত। দ্বীপের
জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯৯.০৪% হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মিসিং (৪১.০১%) দেওরি, কৈবর্ত এবং
সোনোয়াল কাছারি উপজাতির সদস্যরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
অ-উপজাতি অসমীয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কোচ, কলিতা, আহোম, চুতিয়া এবং যোগীরা অন্তর্ভুক্ত। প্রচলিত
ভাষাগুলো হলো মিসিং, অসমীয়া এবং দেওরি। দ্বীপটিতে ১৪৪টি গ্রাম
রয়েছে। যার জনসংখ্যা ১,৫০,০০০-এর বেশি। ফলে প্রতি বর্গ
কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৩০০ জন।
মাজুলি থেকে যোরহাট
পর্যন্ত দিনে পাঁচ/ছয়বার ফেরি চলাচল করে এবং গুয়াহাটি থেকে লখিমপুর হয়ে মাজুলি
পর্যন্ত নৈশ বাস চলে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও চিকিৎসা কেন্দ্র
এবং বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে দ্বীপটিতে আধুনিকীকরণের স্পর্শ লেগেছ। আবাসিক গৃহ ঐতিহ্যবাহী
বাঁশ ও মাটির কাঠামো থেকে কংক্রিটের ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে।
উৎসব- মাজুলিতে
রাসলীলা, আলি আই লিগাং উৎসব ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে পাঁচ দিন ধরে পালিত হয়। উৎসব চলাকালীন পুরং
আপিন (প্যাকেটজাত সেদ্ধ ভাত), আপং (চালের মদ) এবং বিভিন্ন
ধরনের শূকর, মাছ ও মুরগির মাংসের পদ পরিবেশন করা হয়। ভালো ফসলের জন্য
দনি পোলো (সূর্য মাতা ও চন্দ্র পিতা)-কে পূজা করতে প্রতিটি গ্রামে গুমরাগ সোমান
নামক ঐতিহ্যবাহী মিসিং নৃত্য পরিবেশিত হয়।
উচ্চ মাজুলিতে মিসিং উপজাতির অধিকাংশ খ্রিস্টান লোকেরা বিশেষ
করে জেংরাইমুখ গ্রামে বড়দিন উদযাপন করেন। গত অর্ধ সহস্রাব্দ ধরে মাজুলি অসমীয়া
সভ্যতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে আসছে।
নব্য-বৈষ্ণব সত্র- মাজুলি দীর্ঘকাল
ধরে অসমীয়া নব্য-বৈষ্ণব সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে একশরণ
বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীমন্ত শঙ্করদেব এবং তাঁর শিষ্য মাধবদেবের নির্দেশনায়
শুরু হয়েছিল। শঙ্করদেবের নির্মিত অনেক সত্র আজও মাজুলিতে বিদ্যমান, যা প্রাণবন্ত
অসমীয়া সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। শঙ্করদেব মাজুলিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং
পশ্চিম মাজুলির বেলগুড়িতে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। সেখানেই তিনি
প্রথমবারের মতো মাধবদেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই সাক্ষাতকে ঐতিহাসিক মণিকাঞ্চন
সংযোগ বলা হয়। মাজুলির প্রথম সত্রটি মহাপুরুষ শঙ্করদেব
বেলগুড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার ফলে মোট ৬৫টি
সত্র তৈরি হয়েছিলো। তবে, বর্তমানে মূল
৬৫টির মধ্যে মাত্র ২৩টি সত্র সক্রিয় রয়েছে। আসামের মূল ৬৬৫টি সত্রের মধ্যে ৬৫টি
মাজুলিতে অবস্থিত ছিল।
বর্তমানে টিকে থাকা
প্রধান সত্রগুলি হলো:
দক্ষিণপট
সত্র:- দক্ষিণপাট সত্র বনমলিদেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, এটি রাসলীলা উৎসব
উদযাপনের জন্য পরিচিত। এই রাস উৎসব এখন আসামের অন্যতম জাতীয় উৎসব
হিসেবে স্বীকৃত।
গরমুড় সত্র:- গরমুড়
সত্র লক্ষ্মীকান্তদেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, গরমুড় সত্র দুটি
ভাগে বিভক্ত: গরমুড় বর সত্র এবং গরমুড় ছোট সত্র। উভয় সত্রই শরতের শেষে রাসলীলা
উদযাপন করে এবং তাদের কাছে বরটোপ বা কামান নামে পরিচিত প্রাচীন অস্ত্র রয়েছে।
আউনিয়াটি সত্র: আউনিয়াটি সত্র
নিরঞ্জন পাঠকদেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই সত্রটি পালনাম
এবং অপ্সরা নৃত্যের জন্য বিখ্যাত। এর পাশাপাশি সত্রটি
প্রাচীন অসমীয়া শিল্পকর্ম, বাসনপত্র, গহনা এবং
হস্তশিল্পের বিশাল সংগ্রহের জন্যও পরিচিত। সত্রটির ১২৫ জন শিষ্য এবং বিশ্বজুড়ে ৭
লক্ষেরও বেশি অনুসারী রয়েছে।
কমলাবাড়ি সত্র: কমলাবাড়ি সত্র
বদলপদ্ম আতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। সত্রটি এই নদী দ্বীপের
শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং শাস্ত্রীয় অধ্যয়নের একটি
কেন্দ্র। এই সত্রটির শাখা উত্তর কমলাবাড়ি সত্র দেশ ও বিদেশে সত্র শিল্পের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
পরিবেশন করে আসছে।
নরসিংহ সত্র: নরসিংহ সত্র ১৭৪৬
সালে আহোম রাজা প্রমত্ত সিংহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, আলেঙ্গি নরসিংহ
সত্রও এই দ্বীপের একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
বেনেগেনাটি সত্র: বেনেগেনাটি সত্রটি
সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পুরাকীর্তির একটি সমৃদ্ধ ভান্ডার এবং পরিবেশন শিল্পের
একটি উন্নত কেন্দ্র। সত্রটি শঙ্করদেবের সৎ মায়ের নাতি মুরারিদেব দ্বারা
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলির মধ্যে রয়েছে আহোম
রাজা স্বর্গদেও গদাধর সিংহের সোনার তৈরি রাজকীয় পোশাক। সত্রটিতে সোনা দিয়ে তৈরি
একটি রাজকীয় ছাতাও সংরক্ষিত রয়েছে।
চামগুড়ি সত্র: চামগুড়ি সত্রটি
ভারতে মুখোশ তৈরির জন্য বিখ্যাত।
বিহিমপুর সত্র:- বিহিমপুর সত্র
বরগীত, মাটিয়াখারা এবং সত্রীয়া নৃত্যের জন্য বিখ্যাত। নৃত্যের বিভিন্ন
রূপ রয়েছে, যেমন ঝুমুরা, চালি, নটুয়া, নন্দী ভৃঙ্গি, সূত্রধর, ওজাপালি, অপ্সরা, সত্রিয়া কৃষ্ণ
এবং দশাবতার নৃত্য, সবই শঙ্করদেব দ্বারা প্রচারিত। পীতাম্বর দেব
গোস্বামীর প্রচেষ্টার জন্য সত্রটি উত্তর-পূর্ব ভারতে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি কেন্দ্রে
পরিণত হয়েছে।
সাহিত্য- নব্য-বৈষ্ণব ধর্মের
প্রচারক মাধবদেব এই দ্বীপে তাঁর গুরু নব্য-বৈষ্ণববাদের প্রতিষ্ঠাতা শঙ্করদেবের সাথে একটি
অনুষ্ঠানে মিলিত হয়েছিলেন। মাধবদেব এবং তাঁর গুরু শঙ্করদেব অন্যান্য রচনার পাশাপাশি
নাম ঘোষা, বরগীত এবং ভাটিমা লিখে অসমীয়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
এই বৈষ্ণব গুরুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সত্রগুলি নাটক
এবং ভক্তিগীতি রচনার জন্য উৎসাহিত হয়েছিল।
মাজুলি বহু
সাহিত্যিকের জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ধ্রুব জ্যোতি বরা, কবি ও সমালোচক
রাজীব বরা, দ্বিভাষিক সমালোচক ও লেখক ভাস্করজ্যোতি নাথ, জুরি বরা বরগোহাঁই, দেবভূষণ বরা, ঐতিহাসবিদ ডম্বরুধর
নাথ, ঔপন্যাসিক গোবিন খাউন্ড এবং কবি ড্যানি গ্যামের মতো
সুপরিচিত লেখক।
দ্বিতীয় অসমীয়া
সংবাদপত্র অসম বিলাসিনী, ১৮৭১ সালে মাজুলি
থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো।
বাস্তুবিদ্যা- মাজুলি একটি জলাভূমি অঞ্চল, যা বিভিন্ন বিরল
এবং বিপন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে সুপরিচিত। বিশেষ করে
শীতকালে আসা পরিযায়ী পাখিদের রম্যভূমি মাজুলি। পাখিদের প্রজাতিগুলির
মধ্যে রয়েছে গ্রেটার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক, পেলিক্যান, সাইবেরিয়ান
ক্রেন এবং হুইসলিং টিল(ছোট শিস হাঁস)। রাতের অন্ধকার নেমে আসার পর বুনো রাজহাঁস এবং
পাতিহাঁস দূরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়ে চলে যায়। শিল্প
কার্যকলাপের অনুপস্থিতি এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে দ্বীপটি তুলনামূলকভাবে
দূষণমুক্ত থাকে।
নদীর তীরবর্তী
অঞ্চলে ব্যাপক ভূমি ভাঙনের কারণে মাজুলি বর্তমান উল্লেখযোগ্য ভাবে হুমকির
সম্মুখীন। বর্ষাকালে নদীর ভাঙন রোধ করার জন্য উজানের নিকটবর্তী শহরগুলিতে নির্মিত
বড় বাঁধগুলির জন্য মাজুলির নদীর তীরবর্তী অঞ্চল অপ্রত্যাশিত ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছে।
উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদী দ্বীপের বেশিরভাগ অংশে ভাঙন সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদন থেকে
জানা যায় যে, ১৮৫৩ সাল নাগাদ মাজুলির মোট আয়তন ছিল ১,১৫০ বর্গ
কিলোমিটার এবং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই ভূখণ্ডের প্রায় ৩৩% নদীর ভাঙনের
কবলে পড়েছিলো। ১৯৯১ সাল থেকে ৩৫ টিরও বেশি গ্রাম নদীর বুকে বিলীন
হয়ে গেছে এবং এক সমীক্ষায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের
মধ্যে মাজুলির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।
দ্বীপটিকে
বাঁচাতে ভারত সরকার মাজুলির সুরক্ষার জন্য ₹২.৫০ বিলিয়ন (US$৫৫ মিলিয়ন)
অনুমোদন করেছে। জলসম্পদ বিভাগ এবং ব্রহ্মপুত্র বোর্ড গত তিন দশক ধরে নদীর ভাঙন
সমস্যা সমাধানের জন্য সংগ্রাম করে আসছে, কিন্তু ভাঙন রোধে তেমন ভাবে সফল হতে পারেনি। সম্প্রতি, পরামর্শ দেওয়া
হয়েছে যে, মাজুলির দক্ষিণ সীমানা বরাবর একটি কংক্রিট ম্যাট দ্বারা সুরক্ষিত
চার-লেনের মহাসড়ক নির্মাণ এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর তলদেশ খনন করলে এই সমস্যার সমাধান
হতে পারে। এই প্রকল্পে ব্রহ্মপুত্রের একটি উপনদী খেরকাটিয়া সুঁতির জন্য দুটি
জলকপাটও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পটি এখনও সরকার
দ্বারা বাস্তবায়িত করা হয়নি। তবে, মাজুলিকে বিশ্ব
ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করার জন্য ইউনেস্কোতে মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশ
কর্মী যাদব পায়েং দ্বীপের ভাঙন রোধ করার জন্য মোলাই বন(মোলাই বন ভারতের আসাম রাজ্যের মাজুলি জেলায় কোকিলামুখের কাছে ব্রহ্মপুত্র
নদীর তীরে অবস্থিত একটি বন। ভারতীয় পরিবেশ ও বনকর্মী যাদব পায়েং-এর নামানুসারে এই
বনের নামকরণ করা হয়েছে।) নামে পরিচিত এক প্ৰকার বন ৫৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে
রোপণ করেছেন। দ্বীপের বেশিরভাগ অংশ একসময় ভাঙনপ্রবণ অনুর্বর বালুচর ছিল, কিন্তু পায়েং-এর
বনায়ন প্রচেষ্টার ফলে মাজুলির এক উল্লেখযোগ্য এলেকা সবুজ বনে পরিণত হয়েছে। এই বন
বর্তমান হাতি, বাঘ, হরিণ এবং শকুন সহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থলে
পরিণত হয়েছে।
ইতিহাস- যাদব মোলাই
পায়েং এক প্রকার বন রোপণ করেছেন। ভারতীয় পরিবেশ এবং বনকর্মী যাদব 'মোলাই' পায়েং-এর নাম
অনুসারে এই বনের নাম মোলাই বন হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালে গোলাঘাট জেলার
সামাজিক বনায়ন বিভাগের প্রাথমিক ২০০ হেক্টর (৫০০ একর) বৃক্ষরোপণ পরিত্যক্ত হওয়ার
পর, পায়েং ৩০ বছর ধরে এককভাবে এই বনের পরিচর্যা করে আসছেন এবং
বর্তমানে এই বন প্রায় ১,৩৬০ একর / ৫৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। পায়েং
ব্রহ্মপুত্র নদীর মাজুলি দ্বীপের একটি বালুচরে গাছ লাগিয়েছিলেন এবং সেগুলোর
পরিচর্যা করতেন, যা অবশেষে একটি সংরক্ষিত বনে পরিণত হয়েছে।
মোলাই বনে এখন
বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় গণ্ডার, ১০০টিরও বেশি
হরিণ ও খরগোশ ছাড়াও বানর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি (যার মধ্যে
প্রচুর সংখ্যক শকুন রয়েছে) বাস করে। এখানে
কয়েক হাজার গাছ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভদকা, অর্জুন (Terminalia
arjuna), প্রাইড অফ ইন্ডিয়া (Lagerstroemia speciosa), রয়্যাল
পইনসিয়ানা (Delonix regia), রেশম গাছ (Albizia procera), মোজ (Archidendron
bigeminum) এবং তুলা গাছ (Bombax ceiba)। বাঁশ ৩০০
হেক্টরের (৭০০ একর) বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
প্রায় ১০০টি
হাতির একটি পাল প্রতি বছর নিয়মিত এই বনে আসে এবং সাধারণত প্রায় ছয় মাস থাকে।
তারা এই বনে ১০টি শাবকের জন্ম দিয়েছে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতি
মোলাই বন- মোলাই বন এবং পায়েংকে নিয়ে বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র
নির্মিত হয়েছে। ২০১২ সালে জিতু কলিতা প্রযোজিত স্থানীয়ভাবে নির্মিত একটি
তথ্যচিত্র, 'দ্য মোলাই ফরেস্ট' জওহরলাল নেহেরু
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শিত হয়েছিল। পায়েং-এর বাড়ির কাছে বসবাসকারী জিতু কলিতা
তার তথ্যচিত্রের মাধ্যমে পায়েং-এর জীবন সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রস্তুত করার জন্য
স্বীকৃতিও পেয়েছেন। মোলাই বন ২০১৩ সালে ভারতীয় তথ্যচিত্র নির্মাতা আরতি শ্রীবাস্তব
পরিচালিত 'ফরেস্টিং লাইফ' তথ্যচিত্রে এবং
উইলিয়াম ডগলাস ম্যাকমাস্টারের ২০১৩ সালের তথ্যচিত্র 'ফরেস্ট ম্যান'-এও প্রদর্শিত
হয়েছিল।
হুমকি- জলাভূমি
সঙ্কুচিত হওয়া এবং চরম জলবায়ুর কারণে দ্বীপটি সম্পূর্ণ বিলুপ্তির হুমকির মুখে
রয়েছে। দ্বীপটি বর্ধিত বন্যা, ভূমিক্ষয়, স্থানচ্যুতি, অভ্যন্তরীণ
অভিবাসন এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের হুমকিরও সম্মুখীন।
অর্থনীতি- মাজুলির প্রধান
শিল্প হলো কৃষি, যেখানে অপরিশোধিত চাল বা ধান প্রধান ফসল হিসেবে ব্যবহৃত
হয়। এই দ্বীপে ১০০টিরও বেশি জাতের ধান চাষ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে
কোমল শালি, বাও(আমন) ধান এবং আঠালো বাদামী চাল, যা ঐতিহ্যগতভাবে
জলপান এবং পিঠায় ব্যবহৃত হয়। তাঁত বয়ন, মাছ ধরা, দুগ্ধ খামার, মৃৎশিল্প এবং
নৌকা তৈরিও অর্থনীতির উৎস।
শিক্ষা খাত- মাজুলির পাবলিক
স্কুল ব্যবস্থা আসাম সরকার দ্বারা পরিচালিত এবং আসাম রাজ্য স্কুল শিক্ষা বোর্ড
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।এই দ্বীপে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক এবং
স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম প্রদানকারী বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং
ইনস্টিটিউট রয়েছে, যার মধ্যে মাজুলি ইউনিভার্সিটি অফ কালচার, ন্যাশনাল
ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি, মাজুলি কলেজ, জেংরাইমুখ কলেজ, রঙ্গাচাহি কলেজ
এবং পাব মাজুলি কলেজ উল্লেখযোগ্য।
পর্যটন খাত- দ্বীপের
আশেপাশের বেশ কয়েকটি স্থান পাখির জন্য জনপ্রিয়। যোরহাট থেকে মাজুলি প্রায় ২০
কিলোমিটার (১২ মাইল) দূরে অবস্থিত। পর্যটকরা নিমাতি স্টিমার ঘাট থেকে বাস এবং
ফেরির সমন্বয়ে এই দ্বীপে যেতে পারেন। এই যাত্রায় তিন
ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে এবং একাধিকবার যানবাহন বদল করতে হয়। মাজুলির পার্শ্ববর্তী
শহরাঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তর লখিমপুর, গোলাঘাট, শিবসাগর এবং
ডিব্রুগড়।
মাজুলির দর্শনীয়
স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব সত্র এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প যেমন মৃৎশিল্প, মুখোশ তৈরি শিল্প
এবং হাতে বোনা মেখলা চাদর। এই দ্বীপে আলি আই লিগাং, পাল নাম, ফলকু এবং পোরাগের
মতো বেশ কয়েকটি উৎসবও পালিত হয়।
মাজুলির
দক্ষিণাঞ্চল পাখি দৰ্শনের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান, বিশেষ করে
নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। কারণ তখন এখানকার
আবহাওয়া অনুকূল থাকে এবং পাখির আনাগোনা বৃদ্ধি পায়।পাখি দর্শনের অন্যান্য
উল্লেখযোগ্য স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে সাকুলি বিল, ভেরকি বিল এবং
মাগুরমারি বিল।
পরিবহন- মাজুলিতে ফেরি
পরিষেবা চালু আছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ (Inland
Waterways Authority of India) দ্বারা পরিচালিত হয়। এই পরিষেবাতে দুটি জাহাজ
ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি জাহাজ প্রায় ২০০ জন যাত্রী, চারটি গাড়ি এবং
দুটি ট্রাক বহন করতে সক্ষম। জল-ভিত্তিক
পরিবহনের পাশাপাশি, মাজুলি এবং যোরহাটের মধ্যে সরাসরি সড়ক সংযোগ
স্থাপনের জন্য একটি দুই-লেনের সেতু নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২১ সালের ১৮ই
ফেব্রুয়ারি সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং সেতুটি নিমাতীঘাটের সাথে
কমলাবাড়িকে সংযুক্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
কামাখ্যা মন্দির
কামাখ্যা মন্দির আসামের
গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির। মন্দিরটি দেবী কামাখ্যার
প্রতি উৎসর্গীকৃত তান্ত্রিক অনুশীলনের অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে শ্রদ্ধাশীল
উপাসনার কেন্দ্র। এই মন্দিরটি কুলাচার তন্ত্রমার্গের কেন্দ্র এবং অম্বুবাচী মেলার সময় অর্থাৎ দেবীর ঋতুস্রাব
উদযাপনের সময় বার্ষিক উৎসব পালিত হয়। স্থাপত্যগতভাবে মন্দিরটি ৮ম-৯ম
শতাব্দীর বলে ধারণা করা হয় এবং পরবর্তীকালে মন্দিরটি অনেকবার পুনর্নির্মাণ করা
হয়েছে। এর চূড়ান্ত সংকর(মিশ্রণ)স্থাপত্যশৈলী নীলাচল নামক একটি স্থানীয় শৈলীকে
সংজ্ঞায়িত করে। মন্দিরটি শাক্ত ঐতিহ্যের ৫১টি পীঠের প্রাচীনতম ৪টি পীঠের একটি। ইতিহাসে
বেশিরভাগ সময় এটি একটি অখ্যাত উপাসনালয় ছিল, কিন্তু ঔপনিবেশিক
শাসনের সময় ১৯ শতকে এটি বিশেষ করে বাংলার মানুষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে
জন্য পরিণত হয়।
মন্দিরটি মূলত
একজন স্থানীয় দেবীর আদি উপাসনালয়, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে পাথরে স্থাপিত প্রতিমাবিহীন
যোনির পূজা করা হয়। কামরূপের ম্লেচ্ছ রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে
কামাখ্যা মন্দির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে পরিচিতি লাভ করেছিলো এবং পরে পাল, কোচ এবং আহোমরা মন্দিরটির
পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। পাল শাসনামলে রচিত কালিকা পুরাণ কামরূপ রাজাদের বৈধতাদানকারী পূর্বপুরুষ নরকের
সাথে এই অঞ্চল এবং কামরূপ রাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী দেবী কামাখ্যার সংযোগ স্থাপন
করে।
ধারণা করা হয় যে,
ঐতিহাসিকভাবে এই পূজা তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল— ম্লেচ্ছদের
অধীনে যোনি, পালদের অধীনে যোগিনী এবং কোচদের অধীনে মহাবিদ্যা। মূল
মন্দিরটি শাক্তধর্মের দশ মহাবিদ্যা, যথা, কালী, তারা, ত্রিপুরা সুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী এবং
কমলাত্মিকার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত পৃথক পৃথক মন্দিরের পরিসর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এদের
মধ্যে ত্রিপুরা সুন্দরী, মাতঙ্গী এবং কমলা
মূল মন্দিরের ভিতরে অবস্থান করেন এবং বাকি সাতজন পৃথক পৃথক মন্দিরে অবস্থান করেন। স্বতন্ত্র
মহাবিদ্যাদের জন্য একই পরিসরে মন্দির নির্মাণ একটি বিরল ও অস্বাভাবিক ঘটনা।
২০১৫ সালের জুলাই
মাসে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মন্দিরের প্রশাসন কামাখ্যা দেবোত্তর
বোর্ড থেকে বরদেউরি সমাজের কাছে হস্তান্তর করেছে।
কামাখ্যা
মন্দিরের নকশা—উপর থেকে চারটি কক্ষ হল: গর্ভগৃহ, কালন্তা, পঞ্চরত্ন এবং
নৃত্য-মণ্ডপ।
মন্দিরের বর্তমান
কাঠামো এবং আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা শিলা- খোদিত ভাস্কর্য ইঙ্গিত করে
যে, মন্দিরটি ৮ম-৯ম, ১১শ-১২শ, ১৩শ-১৪শ
শতাব্দীতে এবং এমনকি পরেও বহুবার নির্মিত ও সংস্কার করা হয়েছে।১৬শ শতাব্দীর
বর্তমান রূপটি একটি সংকর(মিশ্রণ) দেশীয় শৈলীর জন্ম দিয়েছে। এই শৈলীকে কখনও
কখনও নীলাচল শৈলী বলা হয়: এটি একটি ক্রুশাকার ভিত্তির উপর নির্মিত অর্ধগোলাকার
গম্বুজযুক্ত মন্দির।
শিখর এবং গর্ভগৃহ
গর্ভগৃহের উপরের
শিখরটি পঞ্চরথ(হিন্দু মন্দিরকে পঞ্চরথ বলা হয়, যখন মন্দিরের চূড়ায় বা শিখরে
পাঁচটি রথ (নকশায়) থাকে।) পরিকল্পনা অনুসরণ করে নির্মিত, যা তেজপুরের সূর্য
মন্দিরের মতো ভিত্তিস্তম্ভের উপর স্থাপিত। ভিত্তিস্তম্ভের উপরে পরবর্তীকালের
ড্যাডো(স্থাপত্যে, ড্যাডো হল দেয়ালের নীচের অংশ) রয়েছে। ড্যাডোগুলি খাজুরাহো
বা মধ্য ভারতীয় শৈলীর, যেখানে স্তম্ভের সাথে পর্যায়ক্রমে নিমজ্জিত
প্যানেল রয়েছে। প্যানেলগুলিতে গণেশ এবং অন্যান্য হিন্দু দেব-দেবীর মনোরম ভাস্কর্য
রয়েছে।
শিখরের ভেতরের
পবিত্রতম স্থান গর্ভগৃহ ভূগর্ভে অবস্থিত
এবং এতে কোনো মূর্তি নেই, বরং যোনির (স্ত্রী জননাঙ্গ) আকৃতির একটি শিলা
ফাটল রয়েছে।
গর্ভগৃহটি ছোট, অন্ধকার এবং সরু
খাড়া পাথরের সিঁড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছানো যায়। গুহার ভিতরে একটি পাথরের স্তর
রয়েছে যা উভয় দিক থেকে ঢালু হয়ে নেমে প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর একটি যোনির মতো
গর্তে মিলিত হয়েছে। এই গহ্বরটি একটি ভূগর্ভস্থ চিরস্থায়ী ঝর্ণার জলে সর্বদা
পূর্ণ থাকে। এই যোনি-আকৃতির গর্তটিকেই স্বয়ং দেবী কামাখ্যা রূপে পূজা করা হয় এবং
দেবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
কালন্ত, পঞ্চরত্ন ও
নাটমন্দির-
মন্দিরটিতে তিনটি
অতিরিক্ত কক্ষ রয়েছে- কালন্ত, পঞ্চরত্ন ও
নাটমন্দির।
কলান্ত-কামাখ্যা
মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহের পশ্চিমে অবস্থিত কলান্ত (বা চলন্ত) হলো একটি বর্গাকার, আটচালা-শৈলীর
কক্ষ। এটি একটি কেন্দ্রীয় মণ্ডপ হিসেবে কাজ করে, যেখানে দেবীর ছোট, স্থানান্তরযোগ্য
মূর্তিগুলি (চলন্ত প্রতিমা) রাখা থাকে, যা পূজার্চনা ও
শোভাযাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর ফলে, ভূগর্ভস্থ গর্ভগৃহে
প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ থাকলেও ভক্তরা দেবীকে দর্শন করতে পারেন।এই কক্ষের দেয়ালে
নর নারায়ণের খোদিত চিত্র, সম্পর্কিত শিলালিপি এবং অন্যান্য দেবতাদের
মূর্তি রয়েছে।
পঞ্চরত্ন- পঞ্চরত্ন হল
কামাখ্যা মন্দির চত্বরের প্রধান গর্ভগৃহের পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রধান, বৃহৎ আয়তাকার
হল। এর একটি স্বতন্ত্র ছাদের কাঠামো রয়েছে, যেখানে পাঁচটি
ছোট চূড়া বা গম্বুজ আছে, যা মূল মন্দিরের স্থাপত্যের অনুরূপ এবং এটি মূল
মন্দিরে প্রবেশের জন্য একটি দ্বিতীয় কক্ষ হিসেবে কাজ করে।
নাট মন্দির- নাটমন্দিরটি
পঞ্চরত্নের পশ্চিমে বিস্তৃত, যার এক প্রান্ত অর্ধবৃত্তাকার এবং ছাদটি আহোম
শৈলীর খাঁজকাটা রঙ্গঘর ধরনের। এর ভেতরের দেয়ালে রাজেশ্বর সিংহ (১৭৫৯) এবং
গৌরীনাথ সিংহের (১৭৮২) শিলালিপি রয়েছে, যা এই স্থাপত্যটি
নির্মাণের সময়কাল নির্দেশ করে। বাইরের দেয়ালে পূর্ববর্তী সময়ের পাথরের ভাস্কর্য
খচিত রয়েছে।
ইতিহাস- ঐতিহাসিকরা ধারণা করেছেন যে কামাখ্যা মন্দির
সম্ভবত খাসি এবং গারো জনগোষ্ঠীর জন্য একটি প্রাচীন যজ্ঞস্থল ছিল এবং নামটি খাসি
দেবী, কা মেইখা (আক্ষরিক অর্থে: বৃদ্ধা- বৃদ্ধা-মা) থেকে উদ্ভূত হয়েছে; এবং এই দাবিগুলি
এই জনগোষ্ঠীর লোককাহিনী দ্বারা সমর্থিত। কালিকা পুরাণ (১০ম শতাব্দী) এবং যোগিনী
তন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী বিবরণগুলিতেও লিপিবদ্ধ আছে যে দেবী কামাখ্যা কিরাত বংশোদ্ভূত এবং
কামাখ্যার পূজা কামরূপ প্রতিষ্ঠার (৪র্থ শতাব্দী খ্রিস্টাব্দ)পূর্ববর্তী।
কামরূপের
প্রাচীনতম ঐতিহাসিক বর্মণ রাজবংশ(৩৫০-৬৫০) এবং সপ্তম শতাব্দীর চীনা পর্যটক হোয়ানসাং, কেউই কামাখ্যা
মন্দিরের কথা উল্লেখ করেননি; ধারণা করা হয় যে, অন্তত সেই সময় পর্যন্ত পূজা
ব্রাহ্মণ্য পরিধির বাইরে কিরাত-ভিত্তিক ছিল। সম্ভবত অষ্টম শতাব্দীর প্রাচীনতম
বৌদ্ধ তন্ত্রগুলির মধ্যে একটি, হেবজ্র তন্ত্রে কামরূপকে একটি পীঠ হিসাবে
উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে দেবী কামাখ্যার প্রথম শিলালিপির উল্লেখ
ম্লেচ্ছ রাজবংশের নবম শতাব্দীর তেজপুরের বনমালবর্মাদেবের লিপিতে পাওয়া যায়। শিল্প
ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ এবং মন্দিরের নিম্ন স্তরগুলি
ইঙ্গিত করে যে, মন্দিরের প্রাচীন কাঠামো পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দীর মতো পুরানো হতে
পারে। ম্লেচ্ছ রাজবংশ কামাখ্যাকে যে গুরুত্ব দিয়েছিল তা থেকে বোঝা যায় যে তারা হয়
এটি নির্মাণ করেছিল অথবা পুনর্নির্মাণ করেছিল। ভিত্তি এবং বন্ধনের কারুকার্য থেকে, মূল মন্দিরটি
স্পষ্টতই সম্ভবত মালব শৈলীর নাগর ধরন(নাগর উত্তর
ভারতের হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের একটি বিশিষ্ট শৈলী, যা আনুমানিক খ্রিস্টীয় পঞ্চম
শতাব্দীতে উদ্ভূত হয়।)এর ছিল।
মধ্যযুগ- একটি প্রচলিত
ধারণা আছে যে, সুলাইমান কররানির (১৫৬৬-১৫৭২) সেনাপতি কালাপাহাড় মন্দিরটি
ধ্বংস করেছিলেন। যেহেতু পুননির্মাণের তারিখ (১৫৬৫), তাই সম্ভাব্য ধ্বংসের তারিখের
পূর্বে পুননির্মাণ করা হয়েছিলো এবং যেহেতু কালাপাহাড় এত দূর পূর্বদিকে অগ্রসর হয়েছিলেন
বলে জানা যায় না, তাই এখন বিশ্বাস করা হয় যে, মন্দিরটি
কালাপাহাড় দ্বারা নয় বরং হুসেন শাহের কামতা রাজ্য আক্রমণের (১৪৯৮)সময় ধ্বংস করা
হয়েছিল।
বলা হয় যে, কোচ রাজবংশের
প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বসিংহ(১৫১৫-১৫৪০) মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছিলেন এবং সেই
স্থানে পূজা-অর্চনা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন; কিন্তু তাঁর
পুত্র নর নারায়ণের (১৫৪০-১৫৮৭) শাসনামলে ১৫৬৫ সালে মন্দিরের পুননির্মাণের কাজ
সম্পন্ন করা হয়েছিলো। ঐতিহাসিক নথি এবং শিলালিপির প্রমাণ অনুসারে, মূল মন্দিরটি
চিলারায়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল। মূল মন্দিরগুলির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা
উপাদানগুলি পুননির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার কিছু অংশ আজও
বিদ্যমান। মন্দিরের পাথরের শিখর পুনরুদ্ধারের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, কোচ কারিগর
মেঘমুখদম ইটের গাঁথুনির আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং বর্তমানে অবস্থিত
গম্বুজটি তৈরি করেন। বাংলার ইসলামী স্থাপত্যের সাথে অধিক পরিচিত কারিগর এবং স্থপতিদের
দ্বারা নির্মিত গম্বুজটি গোলাকার এবং অর্ধগোলাকার হয়ে ওঠেছিলো। মেঘমুখদমের
উদ্ভাবিত শিখর নীলাচল ধরণের একটি নিজস্ব শৈলী হয়ে ওঠেছিলো এবং আহোমদের মধ্যে
জনপ্রিয় হয়েছিলো।
রাখাল দাস ব্যানার্জি
(১৯২৫) উল্লেখ করেছেন যে আহোম রাজ্যের শাসকরা কোচ কাঠামোর উপর নতুন কিছু নির্মাণ
করেছিলেন। তখন পূর্ববর্তী কোচ মন্দিরের অবশিষ্টাংশগুলি যত্ন সহকারে সংরক্ষিত ছিল। ১৬৫৮
সালের শেষের দিকে রাজা জয়ধ্বজ
সিংহের অধীনে আহোমরা কামরূপ জয় করে এবং ইটাখুলির যুদ্ধের (১৬৮১) পর আহোমরা
মন্দিরের উপর নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। শৈব বা শাক্ত সম্প্রদায়ের সমর্থক
রাজারা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার অব্যাহত রাখেন।
আহোম যুগে
রাজেশ্বর সিংহ দ্বারা নির্মিত নাটমন্দিরের দেয়ালে কামরূপ যুগের পাথরের ভাস্কর্য খোদিত
রয়েছে।
রুদ্র সিংহ
(১৬৯৬-১৭১৪) নদিয়া জেলার শান্তিপুরের নিকটবর্তী মালিপোতায় বসবাসকারী শাক্ত
সম্প্রদায়ের একজন বিখ্যাত মহন্ত কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে কামাখ্যা
মন্দিরের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন এবং তাঁর
উত্তরসূরি ও পুত্র শিব সিংহ (১৭১৪-১৭৪৪)সিংহাসনে আরোহণের পর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ
করেন। মহন্ত ও তাঁর উত্তরসূরিরা পার্বতীয় গোসাঁই নামে পরিচিত হন, কারণ তাঁরা
নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় বাস করতেন। আসামের অনেক কামাখ্যা পুরোহিত এবং আধুনিক
শাক্তরা হয় পার্বতীয় গোসাঁই কিংবা নটি ও গোসাঁইদের শিষ্য বা বংশধর।
পূজা- সংস্কৃত ভাষায়
রচিত একটি প্রাচীন গ্রন্থ কালিকা পুরাণে কামাখ্যাকে সকল ইচ্ছার পূরণকারী, শিবের নববধূ এবং
মোক্ষদাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কামাখ্যা শক্তি কামাখ্যা নামে পরিচিত।
মাতৃদেবী কামাখ্যার এই প্রাচীন মন্দির প্রাঙ্গণে পূজার মূল ভিত্তি হলো তন্ত্র।
আসামে সকল নারী
দেবীর পূজা আর্য ও অনার্য উপাদানের "বিশ্বাস ও রীতিনীতির
সংমিশ্রণের"প্রতীক। দেবীর সাথে যুক্ত বিভিন্ন নামগুলি স্থানীয় আর্য এবং
অনার্য দেবীদের নামের সাথে যুক্ত। যোগিনী তন্ত্রে উল্লেখ আছে যে যোগিনী পীঠের
ধর্ম কিরাত বংশোদ্ভূত। বাণীকান্ত কাকতির মতে, নরনারায়ণ দ্বারা
প্রতিষ্ঠিত পুরোহিতদের মধ্যে একটি ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল যে, গারোরা মাতৃতান্ত্রিক জনগোষ্ঠী, তারা পূর্ববর্তী
কামাখ্যা তীর্থস্থানে শূকর বলি দিয়ে পূজা করত। বলিদানের ঐতিহ্য আজও অব্যাহত
রয়েছে, ভক্তরা প্রতিদিন সকালে পশু ও পাখি দেবীকে নিবেদন করেন।
দেবীকে বামাচারা
("বামপন্থী পথ") এবং দক্ষিণাচারা ("ডানপন্থী পথ") উভয় উপাসনা
পদ্ধতিতেই পূজা করা হয়। দেবীকে সাধারণত ফুল নিবেদন করা হয়, তবে পশু বলিও
অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। সাধারণভাবে স্ত্রী পশুদের বলিদান থেকে অব্যাহতি দেওয়া
হয়, এই নিয়মটি গণবলির সময় শিথিল করা হয়।
কিংবদন্তী- কালিকা পুরাণ অনুসারে কামাখ্যা মন্দির
সেই স্থানকে বোঝায় যেখানে সতী শিবের সাথে দৈহিক মিলনের জন্য গোপনে নির্জনে যেতেন এবং এটি সেই
স্থান যেখানে সতীর মৃতদেহ নিয়ে শিবের তাণ্ডব নৃত্যের(ধ্বংসের নৃত্য) সময় তাঁর
যোনি (জননাঙ্গ এবং গর্ভ) পতিত হয়েছিল। দেবী ভাগবতে এর কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না, যেখানে সতীর
দেহের সাথে সম্পর্কিত ১০৮টি স্থানের তালিকা রয়েছে, তবে একটি পরিপূরক
তালিকায় কামাখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরবর্তীকালের
গ্রন্থ যোগিনী তন্ত্র, কালিকা পুরাণে প্রদত্ত কামাখ্যার উৎসকে উপেক্ষা
করে এবং কামাখ্যাকে দেবী কালীর সাথে যুক্ত করে ও যোনির সৃজনশীল প্রতীকবাদের উপর
জোর প্রদান করে।
দেবীর একটি
কিংবদন্তীমূলক অভিশাপের কারণে কোচবিহার রাজপরিবারের সদস্যরা মন্দিরে যান না
এবং পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন।
উৎসব- তন্ত্র
উপাসনার কেন্দ্র হওয়ায়, অম্বুবাচী মেলা নামে পরিচিত একটি বার্ষিক উৎসবের
সময় এই মন্দিরটিতে হাজার হাজার তন্ত্র সাধক ভক্তের সমাগম হয়। আরেকটি বার্ষিক
উৎসব মনসা পূজা প্রতিপালিত হয়। শরৎকালে নবরাত্রির সময় কামাখ্যায় প্রতি বছর
দুর্গাপূজাও পালিত হয়। পাঁচ দিনের উৎসবে কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
উমানন্দ দেবালয়
উমানন্দ দেবালয় আসামের
ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝখানে উমানন্দ দ্বীপে (ময়ূর দ্বীপ) অবস্থিত একটি শিব মন্দির।
মন্দিরটি গুয়াহাটির
কামরূপের ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় বা কাছারি ঘাটের ঠিক বিপরীতে ব্রহ্মপুত্র
নদীর মাঝে অবস্থিত।
এটি বিশ্বের
ক্ষুদ্রতম নদী-দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে উপলব্ধ দেশীয় নৌকা যোগে দর্শনার্থীরা এই
দ্বীপে যেতে পারেন। যে পাহাড়ের উপর মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে সেই পাহাড়টি ভস্মাচল পাহাড় নামে পরিচিত। মন্দিরটি ১৬৯৪
খ্রিস্টাব্দে আহোম রাজা গদাধর সিংহের আদেশে নির্মিত হয়েছিল; কিন্তু ১৮৯৭ সালে আসাম সংঘটিত ভূমিকম্পে মন্দিরটি ভেঙে পড়েছিলো।
কিংবদন্তি- কথিত আছে, শিব এখানে
ভয়ানন্দ(ভয়ানন্দ হলেন ভগবান শিবের একটি রূপ, যিনি হিন্দু পুরাণ এবং কালিকাপুরাণ
অনুসারে, তাঁর পত্নী পার্বতীর সঙ্গে
ব্রহ্মপুত্র নদীর ময়ূর দ্বীপে (উমানন্দ দ্বীপ) এর নির্মল সৌন্দর্য উপভোগ করার
জন্য বাস করতেন। এও বিশ্বাস করা হয় যে, তিনি
এখানে ভস্ম (ছাই) ছিটিয়েছিলেন, যার
ফলে এই টিলাটির নাম হয় ভস্মচল।) রূপে বাস করতেন। কালিকাপুরাণ অনুসারে, সৃষ্টির শুরুতে
শিব এই স্থানে ভস্ম ছিটিয়েছিলেন এবং তাঁর পত্নী পার্বতীকে জ্ঞান দান করেছিলেন।
বলা হয়, যখন শিব এই টিলার উপর ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তখন কামদেব তাঁর ধ্যান
যোগে বিঘ্ন ঘটান এবং ফলস্বরূপ শিবের ক্রোধের অগ্নিতে কামদেব ভস্মীভূত হন। একারণেই
টিলাটির নাম ভস্মাচল হয়েছে।
এই পাহাড়কে
ভস্মকূটও বলা হয়।(উমানন্দ মন্দিরকে ভস্মকূটও (বা ভস্মাচল)
বলা হয়। কারণ
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, ভগবান
শিব এই পাহাড়ে তাঁর তৃতীয় নয়ন দ্বারা কামদেব(প্রেমের দেবতা)কে ভস্মীভূত
করেছিলেন। কামদেব শিবের গভীর ধ্যানে বিঘ্ন ঘটালে, শিবের কোপানলে তিনি ভস্মীভূত হন এবং
পাহাড়টি ছাইয়ে ঢেকে যায়।) কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে যে, উর্বসীকুণ্ড
এখানেই অবস্থিত এবং এখানে দেবী উর্বশী বাস করেন, যিনি কামাখ্যার
ভোগের জন্য অমৃত নিয়ে আসেন। একারণেই দ্বীপটি উর্বশী দ্বীপ নামেও পরিচিত।
অধিষ্ঠাতা দেবতা- মন্দিরের
অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন উমানন্দ। 'উমানন্দ' নামটি দুটি
হিন্দি শব্দ থেকে এসেছে, যথা 'উমা', যা ভগবান শিবের
স্ত্রীর অপর নাম ছিল এবং 'আনন্দ', যার অর্থ সুখ।
প্রকৃতপক্ষে, ময়ূর দ্বীপ ক্ষুদ্রতম জনবসতিপূর্ণ দ্বীপগুলির মধ্যে একটি। আকৃতির
কারণে দ্বীপটিকে ময়ূর দ্বীপও বলা হয়।কারণ দ্বীপটি দেখতে প্রায় ময়ূরের মেলে ধরা
পালকের মতো। ঔপনিবেশিক শাসনামলে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা
দ্বীপটির অনন্য রূপ পর্যবেক্ষণ করার পর এই নামটি দিয়েছিল।
ইতিহাস- উমানন্দ পাহাড়ে
গুপ্ত পরবর্তী যুগের একটি পাথরের মন্দিরের প্রমাণ পাওয়া যায়। স্থানটিতে
প্রারম্ভিক মধ্যযুগের পাথরের ভাস্কর্য এবং খোদাইকর্ম রয়েছে। এখানে গণেশের
শিলা-খোদিত মূর্তি এবং পাথরের অচতুর্ভুজা নারী মূর্তিও বিদ্যমান।
আহোম রাজবংশের
অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী শাসক রাজা গদাধর সিংহের (১৬৮১-১৬৯৬) আদেশে ১৬৯৪
খ্রিস্টাব্দে বর ফুকন গড়গন্য সন্দিকৈ(বর ফুকন গড়গন্য
হ্যান্ডিক (যিনি গড়গন সন্দিকৈ বরফুকন নামেও পরিচিত) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আহোম
সামরিক সেনাপতি ও প্রশাসক, যিনি
আহোম রাজা গদাধর সিংহের (১৬৮১–১৬৯৬)
শাসনামলে নিম্ন আসামের বরফুকন (ভাইসরয়/গভর্নর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।) উমানন্দের ইটের
মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। মুঘল সেনাবাহিনী একবার মন্দিরটি অপবিত্র করেছিল। পরে
গুয়াহাটি আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে এলে তিনি মন্দিরটিকে জায়গীর প্রদান করেছিলেন।
কাঠামো- খাড়া সিঁড়ি
বেয়ে মূল মন্দিরে পৌঁছানো যায়। ভগবান শিব ছাড়াও এখানে আরও ১০ জন হিন্দু দেবতার
মূর্তি রয়েছে। বিষ্ণু এবং তাঁর দশটি অবতারের মূর্তির পাশাপাশি এখানে সূর্য, গণেশ, শিব এবং দেবীর
(বিচ্ছু প্রতীক সহ) মূর্তিও রয়েছে। এখানকার ভাস্কর্যগুলো থেকে বোঝা যায় যে, উপাসকরা সকল প্রধান হিন্দু দেবতার আরাধনা করতেন।
মন্দিরটিতে উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু শিলা-খোদিত মূর্তি রয়েছে।
তবে, ১৮৯৭ সালের
ভয়াবহ ভূমিকম্পে মূল মন্দিরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে, একজন স্থানীয় ধনী
বণিক মন্দিরটি পুননির্মাণ করেন, যিনি শিব মন্দিরের অভ্যন্তরভাগে বৈষ্ণব স্লোগান
খোদাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
নামেরি জাতীয় উদ্যান
নামেরি জাতীয়
উদ্যান ভারতের আসাম রাজ্যের শোনিতপুর জেলায় পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি
জাতীয় উদ্যান। উদ্যানটি তেজপুর থেকে প্রায় ৩৫.৫ কিমি উত্তর দিকে
অবস্থিত। নিকটতম গ্রাম চারিদুয়ার থেকে নামেরি জাতীয় উদ্যান প্রায় ৯ কিমি দূরে
অবস্থিত। উদ্যানের উত্তর সীমানা অরুণাচল প্রদেশের পাখুই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সাথে
সংলগ্ন। নামেরি এবং পাখুই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য মিলে ১,০০০ বর্গ কিমি
(৩৯০ বর্গ মাইল) এর বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার মধ্যে
নামেরির মোট এলাকা ২০০ বর্গ কিমি (৭৭ বর্গ মাইল)। নামেরি জাতীয় উদ্যান ২০০০ সালে
দ্বিতীয় বাঘ সংরক্ষণাগার হিসাবে ঘোষিত হয়েছে এবং মানস বাঘ সংরক্ষণাগারের পরে এটি
আসামের দ্বিতীয় বাঘ সংরক্ষণাগার। এর দুটি মূল এলাকা রয়েছে: নামেরি জাতীয় উদ্যান
এবং সোনাই-রূপাই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। জীয়া-ভরলি নদী নামেরি জাতীয় উদ্যানের জীবনরেখা। নদীটি উদ্যানের
দক্ষিণ সীমানা বরাবর উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত। জীয়া-ভরলি নদীর
উপনদী বর-দিকরাই উদ্যানের দক্ষিণ সীমানা বরাবর উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম
দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
নদীসমূহ- আসামের কামেং নদী
ব্রিটিশ আমল থেকেই সোনালী মহাশীর মাছ(মহাশীর হলো
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাপ্ত এক প্রকার বড় মিঠা পানির কার্প মাছ, যা তার প্রচণ্ড
শক্তি ও আকারের কারণে প্রায়শই "নদীর বাঘ" বা "ভারতীয় নদীর
রাজা" নামে পরিচিত।) এর জন্য বিখ্যাত
ছিল। হিমালয়ান মহাশীর মাছ বিশেষত গোল্ডেন
মহাশীর (Tor putitora), হলো একটি বিপন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ। এই মাছ হিমালয়ের
দ্রুত-প্রবাহিত নদী ও হ্রদে পাওয়া যায়। "নদীর বাঘ" নামে পরিচিত এই
পরিযায়ী সাইপ্রিনিড মাছটি তার সোনালী আঁশ, বিশাল বড় আকার
এবং অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ার জন্য বিখ্যাত। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মাছ ধরা
নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নামেরি জাতীয়
উদ্যানের প্রধান নদী দুটি হলো, জীয়া-ভরলি এবং বর দিকরাই। এই দুটি নদীর অন্যান্য
উপনদীগুলো হলো, দিজি, দিনাই, নামেরি, খারি, আপার দিকিরি। নদীগুলি অরুণাচল
প্রদেশের হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে পাক্কে টিআর এবং নামেরি টিআর-এর মধ্য দিয়ে
প্রবাহিত হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের পাক্কে টাইগার রিজার্ভ (টিআর) এবং আসামের
নামেরি টাইগার রিজার্ভ (টিআর) হলো পূর্ব হিমালয়ে অবস্থিত দুটি সংলগ্ন জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ
সংরক্ষিত এলাকা। এগুলি বাঘ, হাতি এবং বিরল প্রজাতির পাখির জন্য ১,০০০ বর্গ
কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত ক্ষেত্র গঠন করেছে।
ইতিহাস- ১৯৭৮ সালের ১৭ই
অক্টোবর পার্কটিকে একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৮৫ সালের ১৮ই
সেপ্টেম্বর নদুয়ার বন রিজার্ভের অংশ ১৩৭ বর্গ কিলোমিটার (৮৫ মাইল) এলাকা নিয়ে
এটিকে নামেরি অভয়ারণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালের ১৫ই
নভেম্বর এর সাথে আরও ৭৫ বর্গ কিলোমিটার (৪৭ মাইল) এলেকা যুক্ত করা হয়েছে এবং
এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
গাছ-গাছড়া- নামেরি ন্যাশনাল
পার্কে গেমেলিনা আরবোরিয়া, মিকেলিয়া চম্পাকা, আমুরা ওয়ালিচি, চুক্রাসিয়া
ট্যাবুলারিস, লেজারস্ট্রোমিয়া স্পেসিওসা, ইউরিয়াম পোমা, ভেলু, আগর উড, রুদ্রাক্ষ, বন জলকীয়া, হাতিপোলিয়া
আখাকান, টারমিনালিও মায়্যারিয়া, টের্মিনালিয়াস
সহ ৬০০ টিরও বেশি ফুলের প্রজাতি রয়েছে।
প্রাণীজগৎ- নামেরি জাতীয়
উদ্যান বন্য হাতি, বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় চিতাবাঘ, মেঘলা চিতাবাঘ, মার্বেল ক্যাট, লেপার্ড ক্যাট, হগ ডিয়ার, সাম্বার, ঢোল, গৌর, বার্কিং ডিয়ার, বন্য শূকর, স্লথ বিয়ার, হিমালয়ান কালো
ভালুক, ক্যাপড ল্যাঙ্গুর এবং ভারতীয় দৈত্যাকার কাঠবিড়ালির
আবাসস্থল। এছাড়াও সাদা ডানার কাঠহাঁস, বড় ধনেশ, রীথড হর্নবিল, রুফাস নেকড
হর্নবিল, কালো সারস, আইবিসবিল, নীল-দাড়িওয়ালা
মৌমাছি খাদক, ওল্ড ওয়ার্ল্ড ব্যাবলার(দেখতে বাবুই পাখির মতো), প্লোভার এবং আরও
অনেক পাখি রয়েছে উদ্যানটিতে। ২০০৫ সালে নামেরি জাতীয় উদ্যানে ৩৭৪ প্রজাতির
পাখি নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
সংঘাত এবং হুমকি- নামেরি জাতীয় উদ্যান দুটি হুমকির সম্মুখীন:-
একটি হলো শোনিতপুর এলাকায় ক্রমাগত সরকারিভাবে গাছ কাটা। আরেকটি প্রধান হুমকি হলো
প্রায় ৩০০০ গবাদি পশু বনে
চরে বেড়ানোর কারণে মানুষ/প্রাণীর সংঘাত। নামেরিতে হাতির
বিশাল দলের কারণে মানুষ-প্রাণী সংঘাত রয়েছে। মূলত ভারতীয় হাতির পাল দ্বারা ফসল
নষ্ট করা, ঘরবাড়ির ক্ষতিসাধন করা এবং গবাদি পশু হত্যা করার কারণে এই সংঘাত
উদ্ভূত হয়েছে। কারণ ৩০-৪০% বনভূমি হ্ৰাসের ফলে ২০০১ সালে ১৮ টি হাতির মৃত্যু
হয়েছিল।
মানবসৃষ্ট চাপের
কারণে আসামের বনভূমি হ্রাস পাচ্ছে এবং ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট (আইএসএফআর)এর ২০২৩ সালের রিপোৰ্ট অনুসারে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের
মধ্যে প্রায় বর্গ কিমি বনভূমি হ্রাস পেয়েছে। এর প্রধান
কারণগুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চ হারে জমি বেদখল, কৃষি জমির সম্প্রসারণ, রাস্তা নির্মাণ, বন্যা এবং
দাবানল।
ডিব্রু-চৈখোয়া জাতীয় উদ্যান
ডিব্রু-চৈখোয়া জাতীয়
উদ্যান ভারতের আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড় এবং তিনসুকিয়া জেলায় অবস্থিত। ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে
এটিকে একটি বায়োস্ফিয়ার(জীবমণ্ডল) রিজার্ভ হিসেবে
ঘোষণা করা হয়েছে। এর আয়তন ৭৬৫ বর্গ কিলোমিটার (২৯৫ বর্গ মাইল), যার মধ্যে ৩৪০ বর্গ কিলোমিটার (১৩০ বর্গ মাইল)
মূল এলাকা এবং ৪২৫ বর্গ কিলোমিটার (১৬৪ বর্গ মাইল) বাফার জোন (বাফার
জোন হলো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা স্থান, যা দুই
বা ততোধিক প্রায়শই সংঘাতপূর্ণ এলাকাকে নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করতে, সংঘাত প্রতিরোধ করতে বা সুরক্ষা
প্রদানের উদ্দেশ্যে পৃথক করে।) রয়েছে।
উদ্যানটি সাগর পৃষ্ঠ থেকে গড় ১১৮ মিটার
(৩৮৭ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত। যার উচ্চতা ১১০ থেকে ১২৬ মিটার (৩৬১ থেকে ৪১৩
ফুট) পর্যন্ত বিস্তৃত। উদ্যানটির উত্তরে ব্রহ্মপুত্র ও লোহিত নদী এবং দক্ষিণে
ডিব্রু নদী অবস্থিত। উদ্যানটি প্রধানত আর্দ্র
মিশ্র অর্ধ-চিরসবুজ বন, আর্দ্র মিশ্র
পর্ণমোচী বন, বেতঝাড় এবং তৃণভূমি নিয়ে গঠিত। এটি
উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম স্যালিক্স জলাভূমি বন। স্যালিক্স জলাভূমি বন হলো এক
প্রকার জলাভূমি বন, যেখানে স্যালিক্স
(উইলো) প্রজাতির গাছের প্রাধান্য দেখা যায় এবং যা জলাবদ্ধ মাটি বা ক্রমাগত
প্লাবিত এলাকায় পাওয়া যায়। এখানকার জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি প্রকৃতির, যেখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও আর্দ্র এবং শীতকাল
শীতল ও সাধারণত শুষ্ক থাকে। উদ্যান এলেকায় বার্ষিক ২,৩০০ থেকে ৩,৮০০ মিমি (৯১
থেকে ১৫০ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। উদ্যানটি মাছের বৈচিত্র্যে
সমৃদ্ধ এবং বহু বিপন্ন প্রজাতির মাছের আশ্রয়স্থল।
ইতিহাস- ১৮৯০ সালে
এলাকাটিকে ডিব্রু সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিলো। ১৯২০ সালে ডিব্রু
সংরক্ষিত বনের সাথে অতিরিক্ত এলাকা যুক্ত করা হয়েছে। ১৯২৯ সালে চৈখোয়া সংরক্ষিত
বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৩৩ সালে ডিব্রু
সংরক্ষিত বনের সাথে আরও এলাকা যুক্ত করা হয়েছে। তবে, ১৯৩৩ সালে যুক্ত হওয়া জমির নির্দিষ্ট পরিমাণ
স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই। ১৯৮৬ সালে ৬৫০ বর্গ কিমি (২৫০
বর্গ মাইল) এলাকাকে প্রাথমিকভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যার মধ্যে ৩৪০
বর্গ কিমি (১৩০ বর্গ মাইল) এলাকাকে ১৯৯৫ সালে চূড়ান্তভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ডিব্রু-চৈখোয়া
বায়োস্ফিয়ার(জীবমণ্ডল) রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার আয়তন ছিল ৭৬৫ বর্গ কিমি (২৯৫ বর্গ মাইল)
এবং এর মধ্যে ৩৪০ বর্গ কিমি (১৩০ বর্গ মাইল)ছিল মূল এলাকা। ১৯৯৯ সালে মূল
এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২০ সালের
ডিসেম্বরে গুয়াহাটি হাইকোর্ট সংরক্ষিত এলাকার অভ্যন্তরে
সাতটি স্থানে হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের জন্য অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডকে প্রদান করা অনুমতির ওপর
স্থগিতাদেশ জারি করেছে।












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন