শহীদ কারবালা উদ্ধার পর্ব( KARBALA UDDARPARBA)

           


 শহীদ কারবালা (উদ্ধার পর্ব)

প্রথম অংক                          প্রথম দৃশ্য-

-ব্রাহ্মণালয়-

ব্রাহ্মণের প্রবেশ্)

                ব্রাহ্মণ- কোথায় ব্রাহ্মণী! শীঘ্র পূজা সামগ্রী নিয়ে এসো। সন্ধ্যা পূজার সময় আসন্ন

                                                (পূজার সামগ্রী নিয়ে ব্রাহ্মণীর প্রবেশ।)

    ব্রাহ্মণী- এইযে পূজা সামগ্রীএখন পূজা আরম্ভ করুন, স্বামী।

               ( ব্রাহ্ম পূজার সামগ্রী গ্রহ করে পূজার মন্ত্রপাঠ আরম্ভ করেন)

            (হোসেনের খণ্ডিত শির নিয়ে শিমা প্রবেশ)

    শিমার- ব্রাহ্মণ! ব্রাহ্মণ মহাশয় কি বাড়ি আছেন?

    ব্ৰাহ্মণী- কে আপনি? আপনি কিজন্য ডাকতেছেনকি চান আপনি?

    শিমার- আমি কিছুই চাই না।ব্রহ্মণ মহাশয় কি গৃহে আছে?

    ব্রাহ্মণী- হ্যাঁ, তিনি গৃহেই আছে। কিন্তু তিনি এখন পূজায় ব্যস্ত। আচ্ছা বলুন, কি চান আপনি?

    শিমার- আজকের রাত্রে জন্য আপনাদের গৃহে আমি অতিথি থাকতে চাইথাকতে পা কি?

    ব্রাহ্মণ-(পূজা শেষ করে) হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারবেন। তবে, আপনি কি দরিদ্রের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করবেনযদি দয়া করে আতিথ্য গ্রহণ করেন, তাহলে আসন গ্রহণ করুন

    শিমার-(আসন গ্রহণ করেআমি খুবই সুখী হলাম আতিথ্য প্রদানের জন্য।

    ব্রাহ্মণ- আচ্ছা মহাশয়,  আপনার অনুমতি পেলে আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?

    শিমার- আচ্ছা, কি জিজ্ঞেস করবেন, করুন কিন্তু অতি সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করবেন আমি এখন বেশি কথা বলতে পারব নাকারণ আমি এখন খুবই ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত

    ব্রাহ্মণ- আপনার হাতে যে খণ্ডিত শির দেখতেছি, শিরটি কার? দয়া করে খোলে বলুন

    শিমার- সে অনেক কথা, ব্রাহ্ম সংক্ষেপে বলছি শুনুন। এই খণ্ডিত শিরটি হজরত মহম্মদের দৌহিত্রফাতেমার অঞ্চলের নিধি, মহাত্মা হাসানের কনিষ্ঠ ভ্রাতামদিনা শাসক হজর মাম হোসেনের।

    ব্রাহ্মণ- কেনকি অপরাধে আপনি এ কার্য্য করেছেন?

    শিমার- দামেস্করাজ জাহাঁপনা এজিদের সঙ্গে মাম হাসান ও হোসেনের মনোমালিন্য হয়। মাম হাসানকে জাহাঁপনা জিদের আজ্ঞায় মন্ত্র মারোয়ানের বুদ্ধি কৌশলে জহর প্রয়োগে প্রাণ নাশ করা হ

    ব্রাহ্মণ-তারপর! তারপর কি হলো?

                িমার-তারপর কুফাধিপতি  আব্দুল্লা জেয়াদের চক্রান্তে মাম হোসেনকে মদিনা হতে কারবালা প্রান্তরে এনে তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করে পরে আমি হোসেনকে হত্যা করে তাঁর খণ্ডিত মস্তক নিয়ে এসেছি। এই মস্তক আমি যদি জাহাঁপনা এজিদে দরবারে হাজি কতে পারি তাহলে জাহাঁপনা এজিদ আমাকে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা এবং মিশর ও  ইরাণের বাদশাহী দান করবেন

    ব্রাহ্মণ- মহাশয়, বেশ করেছেন পাঁচ লক্ষ টাকার লোভে আপনি মহাত্মা হোসেনকে হত্যা করে তাঁর মস্তক নিয়ে দামেস্কে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনি এখন খুবই ক্ষুধার্ত ও পথশ্রমে ক্লান্ত এরকম অবস্থায় মূল্যবান মস্তকটি এখন আপনার নিকটে রাখা উচিত হবে না কারণ আপনাকে দুর্বল মনে করে পাঁচ লক্ষ টাকার লোভে কেউ মস্তকটি ছিনিয়ে নিতে পারে

    শিমার- তুমি কথাটা যথার্থ বলেছ কিন্তু আমি এখন মস্তকখানা কোথায় রাখি? এতো এখন আমার জন্য মহাসমস্যা হলো ব্রাহ্মণ, তুমি কি মস্তকটি তোমার গৃহে রাখতে পারবে?

 

                ব্রাহ্মণ- যদি আপনি আমাকে বিশ্বাস করে  মস্তকটি রাখতে দিনতাহলে নিশ্চয়ই রাখতে পারব।

    শিমার- আমি ব্রাহ্মণ জাতিকে সর্বদায় বিশ্বাস করি, কিন্তু ব্রাহ্মণ, তোমার নিকট মহামূল্যবান মস্তকটি রাখতে আমার অনেক সন্দেহ হচ্ছে। কারণ লক্ষ টাকা লোভে হয়তো তুমি........

    ব্রাহ্মণ- মহাশয়, ব্রাহ্মণ জাতিকে কি টাকার লোভে কোনোদিন কোনো অবিশ্বাসের কাজ করতে দেখেছেন?

শিমার-তা হয়তো দেখিনি! আচ্ছা ব্রাহ্মণমস্তকটি তোমার নিকটে রাখলে কাল প্রত্যুষে নিশ্চয়ই আমাকে ফেরৎ দিবে

    ব্রাহ্মণ- কেন দেব না, নিশ্চয়ই দিবো। আচ্ছা, মস্তক পেলেইতো আপনি চলে যাবেন?

    শিমার- নিশ্চয়. মস্তক পেলেই চলে যাব আচ্ছা ব্রাহ্মণ, তবে গ্রহ কর এই মহামূল্যবান মস্তক(শিমার মস্তক প্রদান)

    ব্রাহ্ম- তবে দিন মহামূল্যবান মস্তকখানা (মস্তক গ্রহ)

    িমার- ব্রাহ্মণমনে থাকে যেন কাল প্রত্যুষে যদি তুমি মস্তক আমাকে না দিতে চাওঁ,  তাহলে আমার হস্তে তোমার বংশ নিপাত হবে।

                                                (প্রস্থান)

    ব্রাহ্মণ- আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, মহাশয় আপনি  নিশ্চিন্ত বিশ্রাম করুন গিয়ে। ব্রাহ্মণী- ব্রাহ্মণী-

                     (ব্রাহ্মণীর প্রবেশ)

    ব্রাহ্মণী-বলুন স্বামী।

    ব্রাহ্মণ- ভাগ্যক্রমে যে মস্তকখানা আমরা পেয়েছিএই মস্তক আর ফিরিয়ে দেব না। কারণআমি বহুদিন যাবত হজরত মহম্মদে বংশধরদের পদসেবা করার জন্য আশা পোষণ করে ছি। কিন্তু আজ পর্য্যন্ত তা আমার ভাগ্যে জোঁটেনি আজ যখন হজরত মহম্মদে দৌহিত্র হজরত মাম হোসেনের খণ্ডিত মস্তক পেয়েছি, তখন এই মস্তকখানা পাপাত্মাকে না দিয়ে জীবিতকাল পর্যন্ত এই মস্তকের পূজা করব

    ব্রাহ্মণী- কিন্তু এর জন্যে যদি বিপদ ঘটে? মস্তক না দিলে পাপাত্মা আমাদের হত্যাও করতে পারে!

    ব্ৰাহ্মণ- সেজন্য ভাবছ কেন ব্রাহ্মণী? এই মস্তকের জন্য কারবালা প্রান্তরে যদি সহস্র লোক প্রাণ বিসর্জন দিতে পারেন, তাহলে আমরা কেন পারব না

    ব্রাহ্মণী- আচ্ছা স্বামী, এই মস্তক পূজিলে সত্যিই কি আমরা স্বর্গবাসী হতে পারব?

    ব্রাহ্মণ- নিশ্চয পারব এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই

        ব্রাহ্মণী- এতো নির্জীব খণ্ডিত মস্তকএর পূজা করলে কি স্বর্গলাভ হবে?

    ব্রাহ্মণ- নিশ্চয় হবে আমরা এই মস্তকটিকে জীবিত মনে করে পূজো করব মনে কর, আজ হতে আমাদের স্বর্গের পথ মুক্ত হবে। আজ হতে আমাদের আনন্দের সীমা থাকবে না। এই মস্তক ক্ষা করতে যদি আমাদের সকলের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তাও আমরা দেব, তবু আমরা শিমারকে দেব না।। চল ব্রাহ্মণী, এখন আমরা বিশ্রাম করিগে (উভয় প্রস্থান)

* * *

 

 

প্রথম অংক                                    দ্বিতীয় দৃশ্য

- ব্রাহ্মণ আলয়-

(শিমারের প্রবেশ)

    শিমার-ব্রাহ্মণ! কোথায় ব্রাহ্মণ মহাশয়? শীঘ্র আমার মস্তক নিয়ে এসো আমি এখন দামেস্ক অভিমুখে যাত্রা করব

             (প্রথম পুত্রে মস্তক লইয়া ব্রাহ্মণের প্রবেশ)

    ব্রাহ্ম- আমায় কি জন্য ডাকছেন, মহাশয়?

    শিমার-আমার সেই রক্ষিত মস্তকটি দাও এখনই আমি দামেস্ক অভিমুখে যাত্রা করব

    ব্রাহ্মণ- আপনি মস্তক পেলেইতো চলে যাবেন?

    শিমার- হ্যাঁ, মস্তক পেলেই চলে নিশ্চয় যাব যান, নিয়ে আসুন মস্তক।   

    ব্রাহ্মণ- তাহলে এই নিন মস্তক (কাপড়ের আড়াল থেকে ১ম পুত্রের মস্তক বের করে দিলেন) 

    শিমার-(চমকে উঠে) একি ব্রাহ্মণ, একি করছ তুমিযে তোমাদের পুত্রের মস্তক। ব্রাহ্মণ, শীঘ্র আমার সেই গচ্ছিত মস্তক নিয়ে এসো

    ব্রাহ্মণ- মহাশয়, সত্যিই কি আপনি মস্তক পেলে চলে যাবেন?

    িমা- হ্যানিশ্চয়ই চলে যাবোএতে কোনো সন্দেহ নেই

ব্রাহ্মণ- আচ্ছা আপনি একটু অপেক্ষা করুন; আমি এক্ষুনি মস্তক এনে দিচ্ছি।

(ব্রাহ্মণ প্রস্থান)

    শিমার- বাঃ কি চমৎকারআমার সাথে ছলনা কোথায় ব্রাহ্মণ, শীঘ্র আমার 'সেই গচ্ছিত মস্তক নিয়ে এসো

                                                             ব্রাহ্মণ দ্বিতীয় পুত্রের মস্তক লইয়া প্রবেশ।

    ব্রাহ্মণ- এই নিন আপনার প্রাপ্য মস্তক (দ্বিতীয় পুত্রের মস্তক দিলেন)

    শিমার- দাও(মস্তক গ্রহণ) একি ব্রাহ্মণ?  এ তুমি কি করছযে তোমার দ্বিতীয় পুত্রের মস্তক। ভাল চাও তো আমার সেই গচ্ছিত মস্তক নিয়ে এসো। লক্ষ টাকার লোভে তুমি তোমার দুই পুত্রের শির এনে দিলে- যদি বাঁচতে চাও, তাহলে শীঘ্র আমার গচ্ছিত মস্তক এনে দাও নছে - (তরবারি প্রদর্শন)

    ব্রাহ্মণ-আচ্ছা,  আপনি যখন মস্তক নাপেলে যাবেন নাতখন একটু অপেক্ষা করুন। আমি এখনই আপনার মস্তক এনে দিচ্ছি আচ্ছা মহাশয়মস্তক পেলে যাবেনতো?

    িমার-হ্যাঁ,নিশ্চয় যাবো আমার সেই গচ্ছিত মস্তক পেলেই আমি চলে যাব। কিন্তু জেনে রেখো ব্রাহ্মণ,  এবারো যদি আমার সাথে লনা করতাহলে তোমার এবার নিস্তার নেই। আমার এই অস্ত্র দ্বারা আমি তোমার শিরশ্ছেদ করবো

    ব্রাহ্মণ-আমার শির যাওয়ার জন্য আমি ভয় করিনা, মহাশয়;  আপনি একটু ধৈর্য্য ধরুনআমি এক্ষুনি মস্তক এনে দিচ্ছি প্রস্থান)

    শিমার- বাহঃরে লোভ! আমাকে ঠকিয়ে ব্রাহ্মণ ধনবান হওয়ার আশা করছেকিন্তু না, তুমি যা আশা করছ, তা কখনও পূরণ হবে না

              (তৃতীয় পুত্রের মস্তক লইয়া ব্রাহ্মণের প্রবেশ)

    ব্রাহ্মণ- এই ি মহাশয়, আপনার প্রাপ্য মস্তক

    শিমা একি ব্রাহ্মণ!  আমার সেই গচ্ছিত মস্তক কোথায় এ তুমি কি করছ? এতো দেখছি তোমার তৃতীয় পুত্রের মস্তক যদি বাঁচবার আশা আছে, তাহলে আমার গচ্ছিত হোসেনের মস্তক নিয়ে এসো নতুবা-

    ব্ৰাহ্মণ- নতুবা কি করবে ?

    শিমার- নতুবা তোমার প্রাণ বধ করব

     ব্রাহ্মণ- হাঃ- হাঃ-হাঃ- মহাত্মা হোসেনের জন্য কারবালায় যদি সহস্র জবন অম্লান বদনে উৎসর্গ করতে পারে, তাহলে আমরা প্রাণ বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হব কেন? একটি শিরের জন্য তিনটি মস্তক দিলুম, তবু তোমার মস্তকের বাসনা পূর্ণ হলোনা প্রয়োজন হলে আমার নিজের মস্তকও দিব, তবু হোসেনের মস্তক দিব না

    িমার- চুপ কর- চুপ কর, বিশ্বাসঘাতক ব্রাহ্মণ আমার সেই গচ্ছিত মস্তক এনে দাওনতুবা প্রাণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হ

    ব্রাহ্মণ- উত্তম। আমি জীবন দেওয়ার জন্যই প্রস্তুততবুও সেই পবিত্র মস্তক আমি দেব না পাপাত্মা শিমার, যদি ক্ষমতা থাকে আমাকে হত্যা করে মস্তক ছিনিয়ে নে আমার প্রাণ থাকতে আমি হোসেনের খণ্ডিত মস্তক দেব না

                শিমার- ব্রাহ্মণ। এইবার তাহলে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। কারবালা প্রান্তরে সহস্র লোককে হত্যা করে এই মস্তক ছিনিয়ে এনেছি, এখন তোমার মত ব্রাহ্মণকে হত্যা করে মস্তক ছিনিয়ে নেওয়াটা আমার জন্য পুতুল খেলা বই অন্য কিছুই নয় ব্রাহ্মণ, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও-

    ব্রাহ্মণ- আমি প্রস্তুত হয়েই আছি- কর আঘাত-

         (উভয়ের যুদ্ধ ও শিমার ব্রাহ্মণকে আঘাত করলো)

    ব্রাহ্মণপারলুম না- পারলুম না, প্রভু হোসেনের পবিত্র মস্তক আমি রক্ষা করতে পারলুম না হে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ(সাঃ)তুমি চেয়ে দেখ, তোমার দৌহিত্রের পবিত্র মস্তক রক্ষা করতে গিয়ে এই ক্ষুদ্র ব্রাহ্মণের কি শোচনীয় দুর্দ্দশা হলো! আমায় ক্ষমা কর প্রভু- আমায় ক্ষমা কর।

                   (ব্রাহ্মণ টলতে টলতে প্রস্থান)

    শিমার- হাঃ- হাঃ- হাঃ- বিশ্বাসঘাতক ব্রাহ্মণ; - এইবার দেখে নে- দেখে নে ব্রাহ্মণ, বিশ্বাসঘাতকতার কি ফল কি ভয়ানক! কোথায় ব্রাহ্মণী? শীঘ্র আমার সেই গচ্চিত মস্তক নিয়ে এসো

         (অস্ত্র হস্তে হোসেনের মস্তক লইয়া ব্রাহ্মণীর প্রবেশ)

    ব্রাহ্মণী- একটি মস্তকের পরিবর্তে তিনটি পুত্র ও স্বামীর মস্তক দিলুমতবুও বলছ, সেই গচ্ছিত মস্তক কোথায় এখনও তোমার মস্তকের বাসনা পূর্ণ হলোনা। শীঘ্র এস্থান হতে প্রস্থান কর, নতুবা এই ব্রাহ্মণীর হস্তে তোমার প্রাণ যাবে

    শিমার- হাঃ-হাঃ-হাঃ- ব্রাহ্মণী, তুমি ভেবেছ, তোমার ভয়ে আমি আমার সেই গচ্ছিত মস্তক না নিয়ে আমি চলে যাব! না, তা কখনও হবে না, ব্রহ্মণী আমার গচ্ছিত মস্তক না নিয়ে আমি যাব না যাও, শীঘ্র হোসেনর মস্তক নিয়ে এসো

     ব্রাহ্মণী- শিমার,  তোমার দুখানি পা ধরে বলছি- তুমি শীঘ্র এই চারটি মস্তক নিয়ে চলে যাও আমার জীবন থাকতে মহাত্মা হোসেনের মস্তক তোমাকে আমি দেব না

    শিমার- তুমি দেবে না- আর আমি হোসেনের মস্তক না নিয়ে যাব না প্রয়োজন হলে আমি তোমাকেও হত্যা করব

    ব্রাহ্মণী- তুমি বীর হয়ে অবলা নারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে?

    শিমার- আমি টাকার লোভে  সব কিছুই করতে পারি

    ব্রাহ্মণী- বেশ! এসো তবে। আমি জীবনের মায়ামমতাসবই ত্যাগ করলাম স্বামী ও তিনটি পুত্র যে পথে চলে গেছে- আমিও যাব সেই পথের সন্ধানে। পাপাত্মা শিমার, শক্তি থাকে তো অস্ত্র ধর, নতুবা এস্থান স্থান ত্যাগ করে চলে যাও

    শিমার- সেকি, নারীর সাথে মহাবীরের যুদ্ধ! এখন আমি কি করি?  না-না- লক্ষ টাকার লোভে আমি  নারী হত্যা করতেও আমি কুণ্ঠিত হব না। ব্রাহ্মণী, এখনও বলছি, বৃথা কেন জীবন হারাবে শীঘ্র আমার সেই গচ্ছিত মস্তক দিয়ে আমাকে বিদায় কর

    ব্রাহ্মণী-বিনা যুদ্ধে আমি শির দেব না

    শিমার- তবে ধর অস্ত্র। এইবার তোকে হত্যা করতে আমি দ্বিধাবোধ করব না তোকে হত্যা করেই আমি উদ্ধার করব আমার লক্ষ টাকার মস্তক আমি চাই, শুধু লক্ষ টাকা হাঃ-হাঃ-হাঃ-

    ব্রাহ্মণী-আয়- আয় তবে পাপাত্মা

     (উভয়ের যুদ্ধ শিমার ব্রহ্মণীর বক্ষে অস্ত্রাঘাত করল ব্রাহ্মণী টলতে টলতে প্রস্থান)

 শিমার-সব শেষ এখন হোসেনের খণ্ডিত মস্তক নিয়ে আমি দামেস্কে চলে যাব হাঃ-হাঃ-হাঃ- আমি চাই শুধু লক্ষ টাকা হাঃ-হাঃ-হাঃ- প্রস্থান

 

* * *

 

            

প্রথম অংক                           তৃতীয় দৃশ্য

-জয়নাল শিবির-

(জয়নালকদভানু,সহরভানু; সখিনা ও  জয়নবের প্রবেশ ও পরে সৈন্যসহ অলিদ ও মারোয়ান প্রবেশ)

    মারোয়ান-কোথায় জয়নাল-কোথায় বিবি সখিনাএইযে সখিনা এখানে (সখিনাকে ধরতে উদ্যত)

    দৈববাণী:- সখিনা! ছিঃ-ছিঃ, এখনও তোমার স্বামীর চিন্তা! এখনও তুমি স্বামী শোকে বিভোরা হয়ে রয়েছ? পরপুরুষ তোমার অংগ স্পর্শ করার জন্য উদ্যততবুও তুমি নিশ্চিন্ত!শীঘ্র সাবধান হও সখিনা।

     (সখিনা সংযত হয়ে মারোয়ানের প্রতি লক্ষ্য করে বলতে লাগল)

    সখিনা- দূরাত্মা কাফেরগণ, আমরা অসহায় অবলা ও নিরাশ্রয বলেই কি আমাদের শিবিরে এসেছিস? তোদের এতো সাহসতোদেরকে গালাগাল দিয়ে আমার পবিত্র মুখ আমি অপবিত্র করব না। স্বামী! তোমায় আমি এই জন্মের মতো ভুললাম নারী জীবনের উদ্দেশ্য কামনা বাসনা সকলই ভুললাম। স্বামী, তুমি যে  পথে গিয়েছ- আমিও সেই পথের সন্ধানে আসতেছি। বিদায় মা! বিদায় ভ্রাতা জয়নাল আব্দীন!! আমি মরার পর  তোমরা আমার জন্য নয়ন বারি ফেলনা। স্বামী যে পথে যায়তার স্ত্রীও সেই পথে যাওয়া উচিত। (অস্ত্র বের করে)কাফেরগণ, তোরা এখানে কিসের জন্য এসেছিস?  তোরা যে অভিপ্রায়ে এসেছিসসে আশা তোদের কখনও পূর্ণ হবে না। চোখ যদি থাকে, তাহলে চেয়ে দেখ সখিনার সাহানাবেশ দুরাত্বানরাধমের দলচণ্ডালের অমৃতের আশা- মহাপাতকীর হুরের আশাশয়তানের বেহেস্থের আশা কখনও পূর্ণ হয় না এই দেখ, যার প্রাণ তাঁর নিক্‌ট চলল। যে স্থানে কাশেম, সেই স্থানেই সখিনা!! (বক্ষে ছুরিকাঘাত ও মৃত্যু।)

        সহরভানু সহ সকলে- উঃ- সখিনা!(সকলেই সখিনার ওপর আছাড় খাইয়া পড়ল)

    সহর ভানু- মা- সখিনা, তুমিও আমাদের ফেলে চলে গেলে, মা হায় খোদা, এই কি তোমার বিচার খোদা! সখিনা- সখিনা!!

    জযনাল- অধৈর্য্য হইওনা মা অধৈৰ্য় হইওনা! ললাটের লেখন কেউ খণ্ডাতে পাে না, মা। এখন শোক-তাপ ভুলে, একটু পে আমাদে কি দশা হবে সেই কথা চিন্তা কর, মা।

    মারয়ান- সৈন্যগণ, তোমরা হোসেন পরিজনের প্রতি কোনো প্রক অন্যায় অত্যাচা ক না। প্রত্যক্ষ প্রমাতো স্বচক্ষেই দেখলে, সামান্য একটি বালিকাতার কি সাহস! কি তেজ! কেমন স্বামী ভক্তি! এদে সাথে অতি সাবধানে কথা বলতে হবে। এদের অন্তরে দুঃখের চিহ্নমাত্র নেই। স্বামীপুত্রপরিজন বিয়োগ বেদনা ভুলেসমর সাজে সজ্জিত হয়ে শত্রুর সম্মুখীন হওয়া এদের চরিত্র। ধন্য- ধন্য সতীসাধ্বী আরবীয় রমণী! আমি জানলামএই জগতের বুকে তোমরাই ধন্যা। শুন সৈন্যগ, এরা আমাদের প্রতি অস্ত্রচালনা করুক বানা করুক, আমাদের পক্ষ হতে কেউই এদের বিরুদ্ধে অস্ত্র চালনা করবে না (নতশিরে) আরবের সাতীসাধ্বী দেবীগণতোমাদের বিরুদ্ধে আমরা কিছুই বলব না। কিন্তু কি করবো জাহাঁপনা এজিদের আদেশে, আমরা  তোমাদের সুখ তরী বিষাদ সিন্ধুতে ডুবিয়ে দিয়েছি 'এখন তোমরা আমাদের বন্দী। তোমরা এখন সকলে স্ব-সম্মানে আমাদের সাথে দামেস্কে চলো

    অলিদ-সৈন্যগণ, জয়নাল আব্দীনকে বন্দী কর। শোন দেবীগণ, তোমাদের এখন কোনো চিন্তা নেই- ভাবনা নেই তোমাদের যখন যা প্রয়োজন হবে, আমাদের নিকট  বিনা সঙ্কোচে চাইবে, আমরা তা-ই তোমাদের সামনে হাজির করব জয়নাল আব্দীন! ভাবছ কি? তুমি স্বইচ্ছায় বন্দীত্ব স্বীকার কর আমরা আজই তোমাদের সকলকে জাহাঁপনা এজিদের নিকট নিয়ে যাবে। শীঘ্র বন্ধীত্ব স্বীকার কর

    জয়নাল-না-নাকেন আমি তোমাদের হস্তে বন্দীত্ব স্বীকার করবো? আমিতো সামান্য পতংগ নইযেতোমাদের মত পশুর হস্তে বিনাযুদ্ধে বন্দীত্ব স্বীকার করব?

    অলিদ-জয়নাল, এতো অহংকার তোমার তোমার এতোদূর সাহস?  সামান্য একজন বালক হয়েএতো অহঙ্কার ভালো নয়আমি ইচ্ছা করলেএই মুহূর্তে তোমার দর্পচূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে পারি, তা কি তুমি জানো?

    জয়নাল- জানি- জানি অলিদ। আমি সামান্য বালক হলেও সবকিছুই আমি জানি। কিন্তু! কি করবো। শুধু পিতৃ-আদেশ বলেই এখনও কথা বলবার সাহস পাচ্ছিস। না-না,  আমি আর পিতৃ আদেশ পালন করবো না। শত্রুগণের অত্যাচার- আর আমি নীরবে সহ্য করব না অলিদ, তুই সাবধানে আমার সঙ্গে রসনা সঞ্চালন কর নতুবা আমি তোদের মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলব আমি বিনাযুদ্ধে তোদের বন্দীত্ব স্বীকার করব না

    সহর ভানু-(বাধা দিয়া) বৎস জয়নাল! অধৈর্য হইওনা, বৎস! পিতৃ আদেশ লঙ্ঘন করা মহাপাপ আমার জীবন থাকতে তোমাকে আমি রণে যেতে দেব না   

    জয়নাল-কিন্তু শত্রুদের আস্ফালন যে সহ্য হচ্ছেনা, মা

    সহর ভানু-সহ্য করতে হবে, বৎস তা নাহলে তোমার অবিহনে পবিত্র ইসলাম ধর্ম যে রসাতলে যাবে, বৎস। তুমি অস্ত্রধারণ না করে এদের বন্দীত্ব স্বীকার কর বৎস। খোদাতায়ালা আমাদেরকে নিশ্চয় রক্ষা করবেন

    অলিদ- জয়নাল, এস বন্দীত্ব স্বীকার কর নতুবা তোমাকে আমরা জোর করে বন্দী করবো?

    জয়নাল- চুপ কর বেইমান! শক্তি থাকে তো আমায় বন্দী কর

    অলিদ- সৈন্যগণ। চতুর্দিক হতে জয়নালকে ঘিরে ফেলো

(সৈন্যসহ অলিদমারোয়ানজয়নালকে বন্দী করতে উদ্যত হলজয়নাল ছুটা ছুটি করতে লাগল। হঠাৎ করুণ সুর রেজে উঠলো-এই সুযোগে শত্রুগণ জয়নালকে বন্দী করল)

গীতকণ্ঠে বিবেক প্রবেশ-

    বিবেক- (গীত) ভয় নাই ভয় নাই রে জয়নাল

                 গুরু গুরু বল

                 আশা পাশে কাফের যত

                 ঘূরছে তারা অবিরত

                 ভয় নাই, ভয় নাইরে জয়নাল

                 গুরু গুরু বল।।

                 

                 হানিফ যখন সময় আসবে দেশে

                 তোমার হস্তের বন্ধন যাবে খসে

                 ভয় নাই, ভয় নাইরে জয়নাল

                 গুরু গুরু বল।।

               (বিবেক প্রস্থান)

        জয়নাল- মা, তাপস কি যেন বলে গেলো?

    সহর ভানু- সত্য কথাইতো বলে গেলো, বৎস! তাপসের কথা কখনও মিথ্যা হয় না কেঁদনা বৎস! তুমিতো একা যাবেনা, আমরাও তোমার সাথে যাবো, বৎস! যখন সময় আসবে তখন নিশ্চয়ই হস্তের বন্ধন খোলে যাবে

    মারোয়ান- শোন অলিদ, শোন সৈন্যগণ! তোমরা বন্দীদেরকে খুব সাবধানে রাজদরবারে নিয়ে এসো আমি জাহাঁপনার নিকট সংবাদ দিতে চললাম তবে হ্যাঁ, একটা কথা ভলোভাবে স্মরণ রাখবে, বন্দীদের প্রতি যেন কোনোরূপ অন্যায় অত্যাচার করা না হয়  খুব সাবধানে নিয়ে এসো (প্রস্থান)

    অলিদ- জয়নাল, আর কেঁদে লাভ হবেনা এখন চলো কারাগারে কারাগারে বসে বসে সুখের কান্না কাঁদতে পারবে সৈন্যগণ, নিয়ে চল বন্দী জয়নাল আবদীনকে

                      (জয়নালকে নিয়ে সকলের প্রস্থান)

* * *

 

 

                        প্রথম অঙ্ক                                চতুর্থ দৃশ্য

                                            (এজিদের প্রবেশ)

                এজিদ- আজ অনেকদিন কালের বুকে বিলীন হয়ে গেলো, কিন্তু মন্ত্রী মারোয়ান ও সেনাপতি অলিদের কোনো সংবাদ পাচ্ছিনা কেন? কি হলো তাদেরতবে কি, তাঁরা ছয় সহস্র সৈন্যসহ কারবালা প্রান্তরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেনা-না, এ কীভাবে সম্ভবআমার ছয় সহস্র সুশিক্ষিত সৈন্য সামান্য কয়েকজন মদিনাবাসীর হাতে প্রাণ বিসর্জন দেওয়াটা কখনও সম্ভব নয় তবেকী- তাঁরা আমার মনোবেদনা ভুলে গেছে? জয়নব বিহীন মম এ তৃষিত প্রাণ ছটফট করছে সর্বদা পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো মন্ত্রী মারোয়ান সেও কি আমায় ভুলে গেছে?

.

                                        (দ্রুত মারোয়ানের প্রবেশ্)

        মারোয়ান- না-না, জাহাঁপনা ভুলিনি আমি কি আপনাকে ভুলতে পারি!

      এজিদ- কে ও মন্ত্রী মারোয়ান। বল- শীঘ্র করে বল, খবর কি?

    মারোয়ান- খবর ভালো, জাহাঁপনা। একেবারে সবাই শেষ। তবে..

    এজিদ-বল, বলতে গিয়ে থেমে গেলে কেনহোসেনকে কী শেষ করা হয়নি?

    মারোয়ান- হয়েছে জাহাঁপনা, হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে।

    এজিদ- উত্তম  হয়েছে।(হাতে তুরি দিয়ে) খবর শুনে আমার কলিজাটা শীতল হয়ে গেলো

    মারোয়ান- আরও সুসংবাদ আছে, জাহাঁপনা

     এজিদ- সুসংবাদ! বল কি সেই সুসংবাদ?

    মারোয়ান- হোসেন নন্দন জয়নাল আব্দীনকে বন্দী করা হযেছে তবে তাঁকে এখনও শেষ করা হয়নি, জাহাঁপনা

    এজিদ-তবে কি করেছ তাঁকে?

    মারোয়ান- হোসেন পরিজনসহ জয়নাল আব্দীনকে বন্দী করে এনেছি।

    এজিদ– উত্তম করেছ এর জন্য তোমাকে পুরস্কৃত করা হবে কোথায় রেখেছ বন্দীদেরকে? মন্ত্রী মারোয়ানঐ সংগে আমার ধ্যানের প্রতিমা- প্রাণ প্রেয়সী জয়নবকে এনেছ তো?

    মারোয়ান- নিশ্চয়ই এনেছি, জাহাঁপনা আপনার আদেশের জন্য বন্দীদেরকে রাজ দরবারের বাইরে রাখা হয়েছে আপনার আদেশ পেলে, এখনই তাঁদেরকে রাজ দরবারে হাজির করা হবে। আপনি আদেশ করুন, এখনই আপনি আপনার ধ্যানের প্রতিমা জয়নব বিবিকে স্বচক্ষে দেখতে পারবেন।

    এজিদ- বেশ; আদেশ দিলুমএখনই বন্দীদেরকে রাজদরবারে হাজির করতে বল। আচ্ছা

        মারোয়ান-সৈন্যগণ, বন্দীদেরকে এক্ষুনি রাজ দরবারে হাজির কর

     এজিদ- আচ্ছা মন্ত্রী মারোয়ান, হোসেনের খণ্ডিত মস্তক কোথায় রেখেছ?

    মারোয়ান- হোসেনের খণ্ডিত মস্তকশিমার বাহাদুরের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে, জাহাঁপনা। একটু পরেই সেই খণ্ডিত মস্তক আপনি দেখতে পারবেন।

    (বন্দী জয়নাল আব্দীনসহরভানুকদভানুজয়নব ও সালমাকে নিয়ে অলিদের প্রবেশ)

    এজিদ– হাঃ-হাঃ-হাঃএইবার আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। বন্দীগণ, তোমরা এখানে বসো। (বন্দীগণ বসিল) কিগো বিবি জয়নব- এখন তুমি কার ভরসা করবেকাকে স্বামীরূপে বরণ করবেতুমি না আমার ধনরত্নরূপ যৌবন সকলই তুচ্ছজ্ঞান করেছিলে! এখন তোমার মান,সন্মান, অহংকার, গৌরব কোথায় গেলো? এতো হত্যাকাণ্ড কার জন্য সংঘটিত হলো? একমাত্র তোমার জন্য কি কারণে তুমি দামেস্কের পাটরাণী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলে? যাক, যা হবার ছিলো, তা হয়ে গেছে এখন তুমি আমাকে স্বামীত্বে বরণ কর। আমি সবাইকেই মুক্ত করে দেব

    জয়নব-(উত্তেজিত হইয়া)- নরাধম, কাফের তোর কর্মের শাস্তিস্বয়ং খোদা তায়ালা একদিন নিশ্চয়ই তোকে দিবেন! তুই আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে বন্দী করে এনেছিস বলে এত দর্প তোর  তুই ভেবেছিস, আমাকে তোর বেগম করবি কিন্তু না, আমার জীবন থাকতে তোর সে আশা পূর্ণ হবে না। (অস্ত্র প্রদর্শন)-এ রকম প্রিয় অস্ত্র যার সহায়বলতো কাফের, তার আবার কিসের ভয়?

এজিদ- হ্যাঁ বুঝেছি। এখনো তোমার অহংকার দূরীভূত হয়নি।(জয়নালের প্রতি লক্ষ্য করে) কিহে, ছৈয়দ জাদাতুমি এখন কি করবে 

    জয়নাল- আমি তোমাকে হত্যা করে- দামেস্কের ব্রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবো

      এজিদ- হাঃ- হাঃ- হাঃএখন তোমার আছে কিকিচ্ছু নেই এখন তুমি শুধু একা এবং আমারই আদেশে এবং আমারই রাজদরবারে তুমি এখন বন্দী অবস্থায় দণ্ডায়মান এ অবস্থায় আবার তোমার রাজা হবার আশা? ধিক, শতধিক্ জয়নাল আব্দীনধিক্ তোমার সাহসের- আর শতধিক্ তোমার বাহুবলের। আমি ইচ্ছা করলে, তোমাকে জীবন্ত খণ্ড খন্ড করে শৃগাল কুকুরের উদরস্ত করাতে পারিসে কথা তোমার স্মরণ আছে?

    জয়নাল- বেশ স্মরণ আছে। আমার মাথায় যা উদয় হয়েছেআমি তাই বলেছি। এখন তোমার যা ইচ্ছাতুমি তাই করতে পারোআমার কোনো আপত্তি নেই।

    এজিদ- হুঃ- বুঝেছি, এখনও তোমাদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হয়নি তাই তোমার মুখের ধার কমেনি

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীন, ওপড়ের দিকে চেয়ে থাকলে কি হবেঐ উর্দ্ধে আকাশ এবং তারকা ব্যতীত অন্য কিছুই নেই।

    জয়নাল- তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই

    এজিদ- বেশতাহলে আমার সাথে কথা বল

    জয়নাল- তোমার সাথে কথা বললেআমার খুব গৌরব বৃদ্ধি পাবেতাই নাআমি তোমাদের কারও সাথে কথা বলব না। তোমাদের যা ক্ষমতা আছেপ্রয়োগ কর

    এজিদ- কি এখনও আমাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে? মন্ত্রী মারোয়ানএর কথা আমার সহ্য হচ্ছেনা। আমার ইচ্ছা যেআজই জয়নালকে......

    মারোয়ান– ক্রোধ সম্বরণ করুন, জাহাঁপনা জয়নাল আব্দীনকে হত্যা করে জয়নব লাভ যত গৌরবের হবে- তাঁর চেয়ে বেশি গৌরবের হবেআপনার নামে জয়নাল আব্দীন খোৎবা পাঠ করলে এবং আপনাকে প্রভু বলে স্বীকার করলে

    এজিদ- তোমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করেইতোআমি এতোদূর অগ্রসর হয়েছি, মন্ত্রী মারোয়ান। আচ্ছা, আগামী জুম্মাবারে জয়নাল আব্দীন আমার নামে খোৎবা পাঠ করে আমাকে যাতে প্রভু বলে স্বীকার করে তুমি তার ব্যবস্থা করে আমাকে সংবাদ দেবে। আরও শোন, বন্দীদেরকে অতি সাবধানে কারাগৃহে রাখবে। আর হোসেনের খণ্ডিত মস্তক বন্দী গৃহের সম্মুখে বর্শা দ্বারা বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখবে যাতে সেই মস্তক বন্দীগৃহ হতে জয়নাল আব্দীন এবং হোসেন পরিজন দেখতে পারে। ঐ সাথে দামেস্কের সমস্ত নর-নারীআবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই যেন বর্শাবিদ্ধ মস্তকটি দেখতে পারে সেই ব্যবস্থাও করবে। (প্রস্থান)

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীন, তুমি আমার কথা শুন। আমার কথা মতো আগামী জুম্বাবারে তুমি জাহাঁপনা এজিদের নামে খোৎবা পাঠ করবে এবং তাঁকে প্রভু বলে স্বীকার করবে আমার কথা মতো কাজ না করলে জাহাঁপনা এজিদ তোমার শিরশ্ছেদ করবে

    জয়নাল- মারোয়ান, আমি কি কাপুরুষ যে তোদের ভয়েজীবনের মায়ায় পরে আমি পবিত্র ইসলাম ধর্মের নীতি ত্যাগ করেপাপিষ্ঠ এজিদের নামে খোৎবা পাঠ করবোআমার দেহে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্তদাসীপুত্র হারামজাদ এজিদের নামে আমি খোৎবা পাঠ করব না!!এতে যদি আমার শিরশ্ছেদ হয়আমি হাসিমুখে শির দিতে প্রস্তুত আছি। মন্ত্রী মারোয়ান, তোমার জাহাঁপনাকে বল গিয়েআমি তার নামে শির দিতে প্রস্তুতকিন্তু খোৎবা পাঠ করতে প্রস্তুত নই।

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীনএমন কথা ভুলেও আর উচ্চারণ করোনা জাহাঁপনা এ কথা শুনলেনিশ্চয়ই তোমার শিরশ্ছেদ করবে

    জয়নাল- তুমি বার বার আমাকে প্রাণের ভয় দেখিও না প্রাণের ভয় আমি করিনা আমার হাত দুখানা লৌহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ না থাকলে, এমন কথা বলবার তুমি অবসর পেতেনা        

    মারোয়ান-জয়নাল আব্দীন- আমি তোমাকে এখনও বলছিতুমি ক্রোধ সম্বরণ করে আমার কথা মতো কাজ কর। বন্দী অবস্থায় তোমার ক্রোধ করা শোভা পায় না তুমি জাহাঁপনার নামে খোৎবা পাঠ করে পরিজনসহ মুক্তি লাভ কর এবং মদিনায় গিয়ে সুখেশান্তিতে রাজত্ব কর গিয়ে তাতে তোমার মঙ্গল হবে

    জয়নাল- পাপাত্মা মারোয়ান, তুই ধর্মের লাভ ক্ষতি কি বুঝিস! নরাধম, আবার যদি আমার সম্মুখে পাপিষ্ঠ এজিদের নাম উচ্চারণ করিস, তাহলে তোর জিব্বা আমি টেনে ছিড়ে ফেলব

    সালমা- ধৈর্য্য ধারণ কর, বৎস জয়নাল, ধৈর্য ধারণ কর এ সময়ে তুমি রাগ করা উচিত নয়। তুমি মন্ত্রীর কথা মতে কাজ করলেআমরা সকলেই মুক্তি পাব। আর তুমি যদি এজিদের নামে খুৎবা পাঠ করলে মদিনার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হতে পার, তাহলে ক্ষতি কি?

    জয়নাল- আপনিও এ কথা বলছেন, বুঢ়ীমা? কারাদণ্ড হতে মুক্তি পাবার জন্যপবিত্র ইসলাম ধর্মের মর্য্যাদা নষ্ট করতে বলছেন আপনিনা-না, যাই বলুন না কেন, আমি এই জাহান্নামী কাফেরের ভয়ে এবং রাজ্য লোভে ইসলাম ধর্মের মর্য্দা নষ্ট করতে পারব না, বুঢ়ীমা !

    মারোয়ান- তুমি নিত্যান্তই নির্বোধ, জয়নাল আব্দীন তাই ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা তোমার লোপ পেয়েছে

    জয়নাল- আমি নির্বোধ নাহলে, বন্দী হয়ে তোমাদের কারাগারে আসব কেনদোহাই লাগে খোদারতুমি আর আমার সম্মুখে ঐ পাপাত্মার নামে খুৎবা পাঠ করার কথা প্রকাশ করোনা

    সালমা- মন্ত্রীবর! তুমি কিছুক্ষণের জন্য অন্দর মহলে চলে যাও। আমি একে নীরবে বুঝিয়ে দেখি হয়তো আমার কথা মানবে

    মারোয়ান- আচ্ছাআপনি খুব ভালো করে বুঝিয়ে রাজি করান তবে জয়নাল আব্দীন যদি এজিদের নামে খুৎবা পাঠ না করে,  তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের বিপদ হবে।                                                             (প্রস্থান)

    সালমা- শোন বৎস জয়নাল আব্দীন, আমি তোমার জীবন রক্ষার জন্যই ঐ পাপিষ্ঠের নামে খোৎবা পাঠ করার কথা বলেছি কারণ একটু সময় পেলেই আমি তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারব

    জয়নাল- কি ব্যবস্থা আপনি করবেন, বুঢ়ী-মাশীঘ্র খোলে বলুন

    সালমা- তবেই শোন, তোমার পিতামহ হজরত আলী(কঃ)আম্বাজ নামে এক রাজ্যের এক কুমারী বীর নারীকে যুদ্ধে পরাস্ত করে বিবাহ করেছিলেন। সেই বিবির একে একে নয়বার গর্ভ হয় এবং জগত মাতা ফাতিমার অভিশাপে আটটি গর্ভ নষ্ট হয়ে যায় অবশেষে একটি মাত্র পুত্রসন্তান জন্ম হয় ফাতিমার ভয়ে সেই সন্তানকে এনে নবী(সাঃ)এর পদপ্রান্তে ফেলে দেয় দীনের নবী সেই ছেলেটিকে ক্রোড়ে নিয়ে আহ্লাদ করে ফাতিমাকে লক্ষ্য করে বলেন- ফাতিমা, তুমি এই ছেলেটিকে হাসান ও হোসেনের ন্যায় ভালোবাসবে কারণ যে সময় তোমার নয়নের মণি হাসান ও হোসেন শত্রুহস্তে প্রাণ বিসর্জন দিবে, তখন পুরুষ সদস্যের মধ্যে একমাত্র হোসেন নন্দন জয়নাল আব্দীন এজিদের কারাগৃহে বন্দী থাকবে সেই কারাগৃহ থেকে তখন এই পুত্র ব্যতীত অন্য কেউ তাঁকে মুক্ত করতে পারবে না আমি সেই জন্যই ছেলেটির নামআমার নামের সাথে মিলাইয়া মহম্মদ হানিফা রাখলাম। এভাবে বলে নবী(সাঃ) হানিফাকে চুম্বন করতে লাগিলেন তুমি চিন্তা করোনা, জয়নাল। আম্বাজ নগরে এখনও তোমার চাচাজান জীবিত আছে।

    জয়নাল-এ কি বুঢ়ী-মা! আম্বাজ নগরে এখনও আমার চাচাজান জীবিত রয়েছেনউঃ- চাচাজান, আপনি কোথায়শীঘ্র চলে আসুন এই দামেস্ক নগরে (জয়নাল মূর্চ্ছা গিয়া ঢলিয়া পড়লেন এবং মূর্চ্ছা হতে উঠে গীত)

   

ও তুমি কোথায় রইলেন

দূর দেশে গো- ওগো চাচা।

নবীর বংশ- করল ধ্বংস

এজিদ মাতাল এসেগো

ওগো চাচা!

তুমি রইলে দূর দেশে

চাচা আমি কাঁদি-বিদেশেতে গো-

ওগো চাচা!!

আমি মরে গেলে কাঁদবে চাচা

ও চাচা সহর মদিনাতে এসেগো

ওগো চাচাii 

        সালমা- বংস জয়নাল! তুমি অধৈর্য্য হয়োনা আমি আজই একখানা পত্র লিখেতোমার চাচাজানের নিকট পাঠিয়ে দিব

    জয়নাল- আপনার পত্র লিখতে হবে না, বুঢ়ী মা! আমি আজ নিজ হস্তেই চাচাজানের নিকট পত্র লিখবো। কিন্তু, বুঢ়ীমা আমি যে পত্র লিখবো, সে পত্র আম্বাজ সহরে পৌঁছোবে কেকে এমন বান্ধব হবেহজরত মহম্মদ(সাঃ)এর উম্মত কেউ কি এই দামেস্কে নগরে আছেযে সেই পত্র আম্বাজ সহরে পৌঁছিয়েআখেরের বান্ধব হবে?

    সালমা- ওগো! যদি কেউ হজরত মহম্মদ(সাঃ)এর উম্মত এই দামেস্ক নগরে আছ, তাহলে দয়া করে শীঘ্র এসে উপস্থিত হও

                    -দ্রুত কাসেদের প্রবেশ-

    কাসেদ- হজরত মুহম্মদ(সাঃ)এর উম্মত আমি আছি বুঢ়ীমা

    জয়নাল-সত্যি কি তুমি হজরত মহম্মদ(সাঃ)এর উম্মত?

      কাসেদ- হ্যাঁ ভাই! সত্যি আমি মহম্মদ(সাঃ)এর উম্মত। বলুন, আমাকে কি আদেশ পালন করতে হবে, ভাই?

    জয়নাল- সত্যিই যদি তুমি হজরত মহম্মদে(সাঃ)এর উম্মততাহলে তুমি কি আমার একখানা পত্র আম্বাজ নগরের মহম্মদ হানিফার নিকট পৌঁছে দিতে পারবে?

    কাসেদ- আমায় বড় সমস্যায় ফেললেন ভাই! কেমনে আমি সেই আম্বাজ নগরে যাবো?

    জয়নাল- অ বুঝেছি! আমি দীনদরিদ্রতোমাকে আমি কিছু দিতে পারবোনা বলে তুমি যেতে অসন্মতি প্রকাশ করছ! কিন্তু ভাই! আমার নিকট ধনরত্ন নাথাকলেও তোমাকে দেবার মতো আমার একটি জিনিষ আছে, ভাই

    কাসেদ-সেটা আবার কি জিনিষ, ভাই! বলুন ভাইআপনি আমাকে কি দিবেন?

    জয়নাল-আমি যা দেবোতুমি কি তা নেবে ভাই?

    কাসেদ-নিশ্চয়ই নিবো ভাই

    জয়নাল- আমি শুধু তোমাকে একটি প্রতিশ্রুতি দিবো। বল ভাই! তুমি কি তা গ্রহণ করবে?

    কাসেদ- নিশ্চয় গ্রহণ করবো, ভাই

    জয়নাল- ভাই কাসেদ। আমি তোমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিব মরণের পরপারে যদি খোদা তায়ালা আমাকে বেহেস্তে স্থান দেন, তাহলে ভাই কাশেদ, তোমাকে অগ্রে বেহেস্তে না দিয়েআমি বেহেস্তে প্রবেশ করব না। এর চেয়ে বেশি তোমাকে দেবার মতো সম্বল আমার নেই, ভাই!

        কাসেদ-দিন ভাইশীঘ্ৰে পত্রখানা দিন। আমি আপনার পত্রখানা মাথায় নিয়ে চলে যাই সেই আম্বাজ সহরে। চাইনা আমি ধনরত্নচাইনা আমি দুনিয়ার সুখ সম্পদ। যে ধনে মরণের পরপারে বিনা হিসাবে আমি বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারব সেই মহামূল্য ধন আজ বিনা তপস্যায় আমার ভাগ্যে মিলেছে। মন, আর চাই কিশীঘ্র উড়ে চল সেই আম্বাজ সহরে শত সহস্র বাধা বিপত্তি এলেও আমি ক্ষ্যান্ত হব না। বিদায়, ভাই জয়নাল আব্দীন। বিদায় বুঢ়ীমা! আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুনযেকোনো প্রকারে হোক আমি পত্র আম্বাজ সহরে পৌঁছে দিব আমি উল্কা বেগে উড়ে চলে যাব বিদায়-বিদায় ভাই জয়নাল আব্দীন, বিদায় বুঢ়ী মা, বিদায়-

    জয়নাল- যাও ভাই তুমি যাত্রার জন্য প্রস্তুত হওগেআমি পত্র লিখে একটু পরেই তোমার নিকট পাঠিয়ে দিব

     কাসেদ- যথা আজ্ঞা ভাই (প্রস্থান)

        জয়নাল- বুঢ়ী মা!

        সালমা- তুমি আমার কথা মত কাজ করতাতে তোমার ভালোই হবে

        জয়নাল- আমি আপনাদের পরামর্শ মতোই কাজ করব, বুঢ়ী মা আপনি চিন্তা করবেন না আমি এখন পত্র লিখতে চললাম (প্রস্থান)

        সহর ভানু- দাদী সাহেবান, জয়নাল যদি আগামী জুম্মায় এজিদের নামে খোৎবা পাঠ না করে তাহলে আমাদের বিপদ অনিবার্য এখন উপায়?

      সালমা- তার জন্য তোমরা চিন্তা কর না, বোন খোদা তায়ালার নাম স্মরণ কর তিনি নিশ্চয়ই আমাদের সহায় হবেন

                        (মারোয়ানের প্রবেশ)

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীন কোথায় গেছে, বুঢ়ী মা?

      সালমা- সে বিশ্রাম নিতে গেছে

        মারোয়ান-সে কি আমাদের জাহাঁপনার নামে খোৎবা পাঠ করতে রাজী হয়েছে?

    সালমা- সে কথা সে সেদিন জুম্মায় গিয়েই প্রকাশ করবে

        মারোয়ান- বেশ।আপনারা এখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন জয়নাল যদি জাহাঁপনার নামে খোৎবা পাঠ করে, তাহলে আপনাদের আর কোনো ভয়ের কারণ থাকবে না। জুম্মার পরেই আপনাদেরকে মুক্ত করে দিব। আপনারা সকলেই নির্বিঘ্নে মদিনায় গিয়ে সুখশান্তিতে বাস করতে পারবেন। তবে হ্যাঁ, আগামীকাল জয়নাল আব্দীনকে অবশ্যেই জুম্মায় পাঠিয়ে দিবেন। অন্যথা যেন না হয় আমি এখন চললাম জাহাঁপনাকে সুখবরটা দিতে (প্রস্থান)

    সালমা- আচ্ছা পাঠিয়ে দিব হে খোদা, তুমি বৎস জয়নালকে সুমতি দাও, খোদা! সুমতি দাও

                                                                                     (সকলের প্রস্থান)

* * *

 

 

                    প্রথম অঙ্ক                              প্রথম দৃশ্য

                                        -মসজিদ-

                  (এজিদ ও মারোয়ানের প্রবেশ)

        এজিদ-মন্ত্রী মারোয়ান। বন্দী জয়নাল আব্দীন কি অদ্য জুম্মায় আমার নামে খোৎবা পাঠ করতে রাজী হয়েছে?

    মারোয়ান- হ্যাঁ জাহাঁপনা। আমি সব ঠিক করে রেখে এসেছি। আপনার আদেশ পাওয়া মাত্র সেনাপতি অলিদ বন্দী জয়নাল আব্দীনকে মসজিদে নিয়ে আসবে।

    এজিদ- উত্তম! কোথায় সেনাপতি অলিদ,বন্দী জয়নাল আব্দীনকে মসজিদে নিয়ে এসো

             (বন্দী জয়নাল আব্দীনকে লইয়া অলিদের প্রবেশ)

    এজিদ- সেনাপতি অলিদ!

    অলিদ-আদেশ করুন, জাহাঁপনা

     এজিদ- জয়নাল আব্দীনের হস্তের বন্ধন খুলে দাও।

             (অলিদ জয়নাল আব্দীনের হস্তের বন্ধন খুলে দিল)

    এজিদ- জয়নাল! তুমি এখন আমার নামে খোৎবা পাঠ কর। খোৎবা পাঠের পর আমি তোমাকে মুক্ত করে দিব। তখন তুমি পরিজনসহ মদিনায় গিয়ে সুখশান্তিতে রাজত্ব করতে পারবে

     জয়নাল-(স্বগত) এখন আমি কি করিপাপাত্মা এজিদের নামে খুৎবা পাঠ করলেই আমি মুক্ত হতে পারব নাহলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত আত্মীয় পরিজনের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। কিন্তু আমি জীবনের মায়া করে, পরিজনের সুখশান্তির কথা চিন্তা করে, কেমনে পবিত্র ইসলাম ধর্ম রসাতলে ডুবিয়ে দিই পবিত্র ইসলাম ধর্ম রক্ষার চেয়ে কি আমার জীবন রক্ষা, পরিজনের সুখশান্তিই বেশি বড় হলোনা-নাআমি কখনই এই পাপিষ্ঠ এজিদের নামে খোৎবা পাঠ করব না। এর নামে আজ যদি খোৎবা পাঠ নমে করি তাহলে মরণের পরপারে হজরত নূরনবী (সাঃ)এর সম্মুখে গিয়ে আমি কি জবাব দিব? না-নাআমি পাপাত্মা এজিদের নামে খুৎবা পাঠ করব না- আমি নবীজির নামেই খুৎবা পাঠ করবো

    এজিদ- কি ভাবছ জয়নাল আব্দীনখুৎবা পাঠের সময় এতো বিলম্ব করা চলে না। শীঘ্র আমার নামে খুৎবা পাঠ কর অলিদ, জায়নামাজ বিছাইয়া দাও

(অলিদ জায়নামাজ বিছাইয়া দিল এবং জয়নাল আব্দীন সেই জায়নামাজ নিজ পা দ্ধারা সরাইয়া নিজের জায়নামাজ বিছাইয়া - খোৎবা পাঠ আরম্ভ করিল।)

    জয়নাল- বিসমিল্লাহের রহমানের রাহিম। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার,আসাহাদু আল লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-

    এজিদ-(এজিদ ক্রোধে অধীর হইয়া) জয়নাল আব্দীনএখনও ছলনা, এখনও আমাকে ঘৃণাএখনও আমার সাথে চাতুরিএই দেখ, এখনই আমি তোমার চাতুরি শেষ করে দিচ্ছি। (অসি নিষ্কাসন)

    মারোয়ান- (বাধা দিয়া) ক্রোধ সম্বরণ করুন, জাঁহাপনা। এখনও আমরা বিষাদ সিন্ধু পার হতে পারিনি আমি গোপন সূত্রে জেনেছি, জয়নাল আব্দীনকে শেষ করলেও ইমাম বংশ শেষ হবে নাবরং সমরানল দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠবে সেই দুর্দান্ত সিংহকে শেষ না করা পর্যন্ত আমাদের সুখ নাই-শান্তি নাইআর আমাদেরও বাঁচবার আশা নাই?

    এজিদ- সেকি কথাএখনও হোসেন বংশে আলী সম বীর জীবিত আছেকোথায় সেই বীর? আমিতো তাঁকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা

    মারোয়ান- আছে- আছে জাহাঁপনা! শীঘ্র জয়নাল আব্দীনকে কারাগারে পাঠিয়ে দিন। তারপর আমি সকল কথা আপনার নিকট প্রকাশ করব

    এজিদ- সেনাপতি অলিদ, জয়নাল আব্দীনকে কারাগারে নিয়ে যাও। তবে হ্যাঁ, জয়নাল আব্দীনকে খুব সাবধানে কারাগারে রাখবে। যাও–এক্ষুনি জয়নাল আব্দীনকে আমার চোখের সন্মুখ থেকে নিয়ে যাও।জয়নাল আব্দীনকে আমি সহ্য করতে পারছিনা

            (বন্দী জয়নাল আব্দীনকে নিয়ে অলিদ প্রস্থান।)

    এজিদ- চল মন্ত্রী, গুপ্তকক্ষে গিয়ে আমি তোমার সেই গোপন তত্ত্ব শুনব তারপর, জয়নালকে হত্যার পর নিষ্কণ্টক হয়ে জয়নবকে লাভ করব।

    মারোয়ান- তবেই চলুন জাহাঁপনা! জাহাঁপনার জয় হোক- জাহাঁপনার জয় হোক                                           (উভয়ের প্রস্থান)

 

* * *

 

                দ্বিতীয় অংক                    প্রথম দৃশ্য

                                      -আম্বাজ নগরের পথ-

      (জয়নাল আব্দীনের পত্র লইয়া কাসেদ প্রবেশ হঠাৎ সামনে নদী দেখে কাসেদ হতাশা ব্যক্ত করতে লাগলো)

        কাশেদ- হায়! হায়!একি বিড়ম্বনা! সামনে দেখছি বিশাল নদীএই বিশাল নদী আমি কেমনে পার হব? হায় খোদা! এখন আমি কি করি? আমি বোধহয়ভাই জয়নাল আব্দীনের পত্রখানা আম্বাজ সহরে পৌঁছে দিতে পারবোনা। হে দয়াময় খোদা! কত নদনদী,পাহার পর্বতপার হয়ে এলামকোথাওতো আমি এরকম বিপদে পড়িনি। নদীতে নৌকা নেইকাণ্ডারী নেই! ওঃ- খোদা, কেমনে আমি এই নদী পার হবনা-নাকেন আমি হতাশ হচ্ছিকেন আমি নদী দেখে ভয় পাচ্ছিআমি ভয়ে ভীত হব না। আমি এই সাগরসম নদীর জলে জাঁপ দিয়ে সাঁতরে আমি নদী পার হব এতে যদি আমার মরণ হয়- সেটাও আমি হাসিমুখে বরণ করে নেব। আর যদি নদী পার হয়ে যেতে পারি তাহলে সেটা আমার জন্য সৌভাগ্য না-নাভয়ে বিতত হয়ে আমি আর যাত্রাপথ বিলম্বিত করব না, আমি এক্ষুনি নদীর জলে জাঁপ দেবো (প্রস্থান)

         (বাঘের রূপ ধারণ করে জিব্রাইল (আঃ) প্রবেশ)

    জিব্রাইল- আও-আও

                    (কাশেদ পুনঃপ্রবেশ)

    জিব্রাইল- আও-আও- (কাশেদকে ধরতে উদ্যত)

    কাশেদ- খোদা! একি বিড়ম্বনা খোদা! আবার সামনে বাঘ তাহলে আমি কি ভাই জয়নাল আব্দীনের পত্র নিয়ে জীবন্তে আম্বাজ নগরে পৌঁছোতে পারবো না হায় খোদা! আমায় তুমি একি সংকটে ফেললে খোদা! সাঁতরে নদী পার হয়ে এলাম এখন আবার এই অরণ্যের মাজে বাঘের সন্মুখে ফেলে দিলে। ওরে দুরন্ত বাঘ! তুই কেআমার সন্মুখে এভাবে দাঁড়ালে কেনআমাকে গ্রাস করবে? করো বাঘ, আমাকে গ্রাস করতাতে আমার আপত্তি নেই। আমি হাসতে হাসতে জীবন দেবো আমি খোদা তায়ালার দরবারে গিয়ে বলবো, হে খোদা, আমি হজরত জয়নাল আব্দীনের পত্র নিয়ে আম্বাজ নগরে যাচ্ছিলামকিন্তু দুরন্ত বাঘ আমায় নির্মমভাবে গ্রাস করেছে পত্র নিয়ে আম্বাজ শহরে পৌঁছোতে দেয়নি। ওরে বাঘ! তুই আমায় গ্রাস কর- আপত্তি নেই। কিন্তু বাঘ! তুই এই পত্রখানা আম্বাজ নগরে মহম্মদ হানিফার নিকট পৌছে দিস তা নাহলে খোদা তায়ালার দরবারে গিয়ে তোমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে।

    জিব্রাইল- (বাঘের আবরণ খোলে বললেন),ভাই কাসেদ! তুমি ভয় করোনা চক্ষু মেলে চেয়ে দেখ! আমি বাঘ নই আমি আল্লাহর প্রেরিত দূত জিব্রাইল তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য আমি বাঘের রূপ ধারণ করে বেহেস্ত হতে এসেছি। ধন্য- ধন্য কাসেদধন্য তোমার ঈমান। তুমি আজ বিনামূল্যে বেহেস্তের উদ্যান ক্রয় করলে। যাও-ভাই কাশেদ, তোমার আর কোনো ভয় নেই। ঐতো, সন্মুখে আম্বাজ সহর দেখা যাচ্ছে।তুমি দ্রুত আম্বাজ নগরে গিয়ে মহম্মদ হানিফার নিকট জয়নাল আব্দীনের পত্রখানা পৌঁছে দাও  (প্রস্থান)

        কাসেদ-এখন আর আমার ভয় নাই আমি দ্রুত আম্বাজ নগরে গিয়ে জয়নাল আব্দীনের পত্রখানা মহম্মদ হানিফার নিকট পৌঁছে দিব (প্রস্থান)

* * *

 

                        দ্বিতীয় অংক                               দ্বিতীয় দৃশ্য

                                        -মহম্মদ হানিফার শয়নকক্ষের সন্মুখ-

(মহম্মদ হানিফা শয্যায় শুইয়া নিদ্রায় বিভোরদ্বাররক্ষী দ্বাররক্ষা করতেছে। দ্রুত কাসেদের প্রবেশ)

        কাসেদ- কে তুমি ভাই?

        প্রহরীআমি দ্বাররক্ষীকে তুমিকি চাও তুমি?

     কাশেদ- আমি কিছুই চাইনা ভাই এই পথে কি আমি মহম্মদ হানিফার নিকট যেতে পারব?

    প্রহরী-এই বেতমিজতুই আমার সন্মুখে আমার প্রভুর নাম উচ্চারণ করছিস? এই দেখপ্রভুর নাম উচ্চারণ করার ফল কি মধুর। (বেত্রাঘাত)

    কাশেদ উঃ-কোন অপরাধে তুমি আমায় বেত্রাঘাত করছো, ভাইআমিতো কোনো অপরাধ করিনি, ভাই। বল-বল, আমি কি এই পথে মহম্মদ হানিফার  নিকট পৌঁছোতে পারব?

    প্রহরী-এই আবারআবার সেইনাম  উচ্চারণচুপ কর বেতমিজ! (বেত্রাঘাত) আমি তোকে বেত্রাঘাত করতে করতেই মেরে ফেলব(বেত্রাঘাত)

    কাশেদ- তুমি আমায় মের না,ভাই। উঃ- খোদা! তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি আমাদের নেই! হায় হায়আমি কত নদনদীপাহাড়পর্বতঅতিক্রম করে এলুমজলের কুম্ভীর পর্যন্ত আমায় ভক্ষণ করেনি। বনের দুরন্ত বাঘের কবল হতেও রক্ষা পেয়ে এসেছিকিন্তু হায়। আজ বোধহয়এই প্রহরীর হস্তে আমার মরণ হবে! ভাই, আমি শুধু এই পত্রখানা মহম্মদ হানিফার নিকট পৌঁছে দিয়ে এখনই আবার স্বদেশে ফিরে যাব

     প্রহরী- আবারও সেই নাম উচ্চারণ করছিস! বেতমিজ, আমি তোকে বেত্রাঘাত করতে করতেই মেরে ফেলব(বেত্রাঘাত)

        কাসেদ- হায় খোদা! আমাকে জয়নাল আদীনের পত্র পৌঁছাতে দিলেনা! ভাই, জয়নাল, তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও

    প্রহরী আয় বেটা, নিঃশব্দে আমার সাথে চলে আয়। নছেৎ, তোকে আবার বেত্রাঘাত করবো

(গীতকন্ঠে পথিক প্রবেশ)

পথিক- (গীত)

জাগ জাগ-ওরে হানিফ

কত নিদ্রা যাও।

ও-সুখের তরী ডুবে গেল-

চক্ষু মেলে চাও।

কত নিদ্রা যাও । ঐ

 

কাঁদবি বসে ভাইয়ের শোকে

হায় হাসান-হায় হোসেন বলে

কাঁদবি বসে হায়-হুতাশে

হায় হাসান  হায় হোসেন রাও

কত নিদ্রা যাও। ঐ

                                                                           (গীতান্তে পথিক প্রস্থান)

    হানিফ- (চেতন হয়ে)-একি!কে যেন বলে গেলজাগ জাগ ওরে হানিফ- কত নিদ্রা যাও! কাঁদবি বসে- হায় হুতাসেহায় হাসান, হায় হোসেন বলে। কোথাওতো কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা! এ কি সত্য- না স্বপ্ন! তবে কি! মদিনায় আমাদের ভাই হাসান ও হোসেনের কোনো বিপদ হয়েছেআজ অনেক দিন হয়ে গেলো, আমার মদিনার আত্মীয়স্বজনের কোনো সংবাদ পাচ্ছিনা। একি! হঠাৎ আমার অন্তরটা ভাই-ভাই বলে কেঁদে উঠল কেন? ভাইদের কথা মনে পরার সংগে সংগে আমার শরীর শিহরে উঠল কেন? উঃ- খোদা! আমি যে আর স্থির থাকতে পারছিনাআমার মনটা হঠা এতো চঞ্চল হয়ে উঠল কেননা-নাআর রাজকার্য নিয়ে বসে থাকব না। আমি আজই মদিনা অভিমুখে যাত্রা করবো। মদিনায় গিয়ে ভাই হাসান ও হোসেনের সংগে সাক্ষাৎ করবো। একি হঠাৎ যেন আমার মন বলে উঠল, আমার ভাইদের সংগে ইহ জগতে আর দেখা হবে না না-নাআমি এমনিভাবে বসে থেকে আর সময় নষ্ট করব না। কে কোথায় আছশীঘ্র চলে এস। কোথায় মন্ত্রী গাজি রহমানকোথায় রক্ষীতোমরা শীঘ্র চলে এসো

(গাজী রহমানের প্রবেশ)

    গাজী- আমাকে কেন আহ্বান করছেন, জাহাঁপনা?

    হানিফা- ভাই গাজী রহমান, আমার মন বলছে, মদিনায় আমাদের ভাইদের সাথে আমার আর দেখা হবেনা পথিক যেন বলে গেল, কাঁদবি বসে হায়-হুতাশে, হায় হাসান, হায় হোসেন বলে

    গাজী- হয়তো আপনার আত্মীয়স্বজনদের মধ্য কারও কোনো বিপদ হয়েছে, জাহাঁপনা

    হানিফ- তোমার অনুমান মিথ্যে নয়, মন্ত্রীবর! তবে ভাইআমি অদ্যই মদিনা যাত্রা করবে। যে পর্যন্ত আমি আমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করতে না পারবোসে পর্য্যন্ত আমার সুখ নেই- শান্তি নেই।

(প্রহরীর প্রবেশ)

    প্রহরী- বন্দেগী খোদাবন্দ। আজ রাতে কোথা হতে একটি লোক এসে আপনার নাম ধরে উন্মাদের ন্যায় প্রলাপ বকতেছে

    হানিফা কোথায় সেই লোক?

    প্রহরী- আমি তাকে বেত্রাঘাত করে অর্দ্ধমৃত অবস্থায় রাস্তার ধারে ফেলে রেখে এসেছি, জাহাঁপনা

    হানিফ- রক্ষী! তুমি করেছ কি? বোধহয় সে আমাদের মদিনার কোনো আত্মীয় হবে। মদিনার লোক ব্যাতীত কেউ আমার নাম উচ্চারণ করার সাহস পাবেনাযাও রক্ষী, তাকে অতি শীঘ্র আমার সন্মুখে হাজির করো যে পর্যন্ত তার মুখ দর্শন করতে না পারব, সে পর্যন্ত আমার মনে সুখ নেই- শান্তি নেই মন্ত্রী গাজী রহমান?

    গাজী- আদেশ করুন, জাহাঁপনা!

    হানিফ– রক্ষীর কথা শুনে, আমার রাত্রের একটি স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেলো, মন্ত্রীবর

    গাজী- কি সেই স্বপ্ন, জাহাঁপনা?

    হানিফা- শোন ভাই! মদিনায় আমার যত আত্মীয়স্বজন আছেআমি সকলকে নিয়ে একটি নৌকা সাজিয়ে সমুদ্রের মাজে মাজে কোথাও যেন যাইতেছিলাম। হঠাৎ কোথা হতে যেন ভীষণ গর্জন করেএক মহাপ্রলয়ের সৃস্টি হলোসেই প্রলয়ে আমাদের নৌকা মাঝ সমুদ্রে ডুবে গেলো তখন আমার আত্মীয় স্বজন কে কোথায় গেলোবলতে পারবনা। তারপর-

    গাজী- তার পর কি হলো, জাহাঁপনা?

      হানিফ- তারপর আমি একটি মাত্র শিশু সন্তানের হাত ধরে ভাসতে ভাসতে এক পারে গিয়ে উঠলাম এই স্বপ্ন দেখার পর থেকে আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে গাজী- ধৈর্য ধারণ করুন, জাহাঁপনা বিপদে ধৈর্য ধারণ করার বাহিরে অন্য উপায় নেইঐ দেখুন, জাহাঁপনা, প্রহরী সেই লোকটিকে নিয়ে আসছে

             ( কাশেদকে লইয়া রক্ষীর প্রবেশ)

    প্রহরী- জাহাঁপনা, এই যে সেই লোকটিকে নিয়ে এসেছি। এই লোকটি বারবার আপনার নাম উচ্চারণ করছিলো

    কাসেদ-অধীনের অপরাধ মার্জনা করুন, জাহাঁপনা

    হানিফ- কে তুমিকোথা হতে এসেছশীঘ্র বল-

    কাসেদ- আমি মদিনার কাসেদ আমি বড়ই দুঃখের সংবাদ বহন করে নিয়ে এনেছি, জাহাঁপনা আমি বর্তমান দামেস্ক হতে এসেছি, জাহাঁপনা

    হানিফ-গাজী রহমান- তুমি দামেস্ক হতে এসেছ?

      কাসেদ- হ্যাঁ জাহাঁপনা, আমি দামেস্ক হতে এসেছি

 

      হানিফ– বল- বল কাসেদ, তুমি কি সংবাদ নিয়ে এসেছ?

    কাসেদ- আপনার জেষ্ঠ ভ্রাতা ইমাম হাসান দামেস্কারাজ এজিদের আজ্ঞায় তার প্রধান মন্ত্রী মারোয়ানের চক্রান্তে জহর পানে প্রাণ ত্যাগ করেছেন

    হানিফ– উঃ ভাই হাসান! তুমি এই সংসার থেকে বিদায় নিয়েছো!আমি বেঁচে থাকতে এই মর্মান্তিক সংবাদও আমাকে শুনতে হলো খোদা! এ তুমি কি করলে!

        গাজী- জাহাঁপনা, এতো বিচলিত হচ্ছেন কেনআচ্ছা কাসেদ, বল, তারপর কি হলো?

    কাসেদ- হজরত ইমাম হোসেন, কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদের চক্রান্তেপরিজন সহ কুফায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথ ভুলে কারবালা প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছান এজিদের আজ্ঞায় মন্ত্রী মারোয়ান ফোরাতকূল অবরোধ করার ফলে হোসেন পরিজনসহ সহস্র লোক পানি বিহনে শুষ্ককন্ঠে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। শুধু তাই নয়;দুগ্ধপোষ্য শিশুকে পর্যন্ত কাফেরগণ তীর মেরে হত্যা করেছে। কাফেরদের নিৰ্যাতন সহ্য করতে না পেরেহোসেন জায়া সখিনা আত্মহত্যা করেছেন। দুঃখের কথা আরও কত বলবোবলতে গেলেআমার বুক ফেটে যায়

    হানিফ- উঃ- খোদা, আমার ডান-বাম দুটি হস্ত ভেঙ্গে ফেলেছ খোদা! হায় খোদা! আমাকে কেন এই সংসারে বাঁচিয়ে রেখেছোআমাকেও নিয়ে চল ভ্রাতা হাসান-হোসেনের গমন পথে!! ভাই গাজী রহমান! আমার ভ্রাতৃগণের মৃত্যু সংবাদ শ্রবণে আমার বুকখানা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো! তুমি আমায় মৃত্যু দাও খোদা- তুমি আমায় মৃত্যু দাও!

    গাজী- ধৈর্য্য ধারণ করুন, জাহাঁপনা যা হবার তা হয়ে গেছে এখন কাঁদলে কোনো লাভ হবেনাআপনি বীরআপনার দেহ বীরের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে বীরের চোখের পানি শোভা পায়না, জাহাঁপনা ভাই কাসেদ, ইমাম বংশে বাতি জ্বালাবার মতো কেউ কি জীবিত আছেন?

    কাসেদ- আছে- আছে মন্ত্রীবর! পুরুষের মধ্যে একমাত্র হোসেন নন্দন জয়নাল আব্দীন জীবিত আছেন

    গাজী- সে এখন কোথায় আছে?

    কাসেদ- সে এখন এজিদের কারাগৃহে বন্দী!

    হানিফ-বন্দী-বন্দী-বন্দী! উঃ-জয়নাল আব্দীনও বন্দী। (মুর্চ্ছাগতপ্রায়)

    গাজী- ধৈর্য ধরুন, জাহাঁপনা!এতো অধীর হবেন না। যে পর্য্যন্ত আপনার ভ্রাতৃগণের নির্মম হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে না পারবো- আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র জয়নাল আব্দীনকে এজিদের কারাগার থেকে উদ্ধার করতে না পারবো, সে পর্যন্ত আমাদের বিশ্রাম নেবার অবসর নেই- সুখ নেই- শান্তি নেই-স্বস্তি নেই। আমরা আজই দামেস্ক অভিমুখে যাত্রা করব দামেস্কে গিয়ে দেখবো,দাম্ভিক পাপাত্মা এজিদ কত শক্তি ধরেশোন ভাই কাসেদমন্ত্রী হামামও কি মরেছেন?

    কাসেদ- না, মন্ত্ৰীবর মরেননি।

    গাজী-মন্ত্রী হামাম বেঁচে থাকতে এতো বড় হত্যাকান্ড সংঘটিত হলোতবে কি সেও ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলো?

    কাসেদ-না-মন্ত্রীরর। সেও এখন এজিদের কারাগারে বন্দী।

    গাজী-মন্ত্রী হামামও বন্দী! বুঝেছি, আমি সব বুঝেছি। তোর পরিত্রাণ নেই ,এজিদ! তুই সমুচিত শাস্তি পেতেই হবে।

    হানিফ- ভাই গাজী রহমানআমি হতভাগ্য জীবিত থাকতে ভ্রাতৃগণের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো! জীবিত অবস্থায় ভ্রাতৃগণের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা হলোনা।

    গাজী- দুঃখ প্রকাশ করে কোনো ফল হবে না, জাহাঁপনা। তাঁদের সাথে ইহজগতে সাক্ষাৎ আপনার ভাগ্যে নেই। তাই সাক্ষাৎ হয়নি! অবশ্যে মরণের পরপারে বেহেস্তে তাঁদের সঙ্গে অবশ্যেই সাক্ষাৎ পাবেন। এখন এসমস্ত কথা ভুলে পাষণ্ড এজিদের কারাগার হতে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র জয়নাল আদীনকে মুক্ত করার চিন্তা করুন। চলুন, জাহাঁপনা! আজই আমরা মদিনা অভিমুখে যাত্রা করবো।

    হানিফ– ঠিকই বলেছ ভাই! আজই আমরা মদিনা অভিমুখে যাত্রা করবো। কিন্তু আমরা মাত্র কয়েকজন চুপচাপ মদিনা যাব না। আমাদের শুভাকাংক্ষী সকলকে সংবাদ দিয়ে তারপর মদিনা অভিমুখে যাত্রা করবো মন্ত্রী গাজী রহমান?

      গাজী- আদেশ করুন, জাহাঁপনা

    হানিফ- তুমি এখনই অন্তপুরে গিয়ে পত্র লেখবে। তুরানতুরস্কইরানে আমাদের যত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আছে সবাইকে আমাদের বিপদের বার্তা জানিয়ে পত্র লিখবে ইরানের মসহাব কাকা, আক্কেল আলী, তালেব আলী এঁরা সকলেই যেন পত্র পাওয়ামাত্র চলে মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেআরও আনজাম নগরের ইব্রাহীম, ওয়াহিদ এবং অন্যান্য মোহাম্মদী শিষ্যগণকে ইমাম বংশের শোচনীয় হত্যাকাণ্ড ও এজিদের দৌরাত্মের কথা পত্র লিখে জানাবে যদি পবিত্র ইসলাম ধর্ম জগতে কায়েম রাখতে চায়, কাফেরের রক্তে ইসলামীয় তরবারি রঞ্জিত করে বসুন্ধরায় রক্তের প্লাবন বহাইবার ইচ্ছা থাকে, যদি ইমাম হাসান ও হোসেন হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার বাসনা থাকে, নবী (সাঃ) এর প্রতি অটল বিশ্বাস ও ভক্তি থাকেতাহলে অতিসত্বর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে মদিনায় গিয়ে যেন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। চল মন্ত্রী গাজী রহমান, আজই আমরা মদিনায় যাত্রা করবো মদিনায় গিয়ে নবীজির রওজা মোবারক জিয়ারত করেসেখান থেকে দামেস্ক নগরে গিয়ে শুধু জয়নাল আব্দীনকে পরিজনসহ উদ্ধার করেই আমরা ক্ষান্ত হব না। যে পর্যন্ত পাপিষ্ঠ এজিদের ভবলীলা শেষ করতে না পারব- সে পর্যন্ত আমরা আর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করব না

    গাজী- সৈন্যগণ, কে কোথায় আছ শীঘ্র রণসাজে সজ্জিত হওআমরা আজই মদিনা অভিমুখে যাত্রা করব চলুন জাহাঁপনা, আমরা যাত্রার আয়োজন করিগে

    হানিফ- চলুন, মন্ত্রীবরযত শীঘ্র সম্ভব আমরা যাত্রার আয়োজন করিগে                                                                                   (সকলের প্রস্থান)

* * *

 

 

দ্বিতীয় অংক                           তৃতীয় দৃশ্য

-এজিদের রাজ দরবার-

(এজিদ ও মারোয়ানের প্রবেশ)

        এজিদ-মন্ত্রী মারোয়ান?

    মারোয়ান- আদেশ করুন, জাহাঁপনা।

    এজিদ- আমার ইচ্ছা যেজয়নাল আব্দীনকে হত্যা করে মদিনার সিংহাসন অধিকার করি এবং জয়নবকে লাভ করে আমার মনোবাসনা পূর্ণ করি। যে আমার বশ্যতা স্বীকার করলনাযে আমার নামে খোৎবা পাঠ করল নাযে আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করল নাতাকে ইহ জগতে জীবিত রেখে লাভ নাই। এবিষয়ে তোমার মতামত কি?

      মারোয়ান- আমার মতে জয়নাল আব্দীনকে আরও কয়েকদিন কারাগারে শাস্তি প্রদান করা হোক। তারপর মহম্মদ হানিফাকে পরাস্ত করে উভয়কে এক সঙ্গে হত্যা করে মদিনার সিংহাসনে উপবেশন করাই আমার মতে শ্রেয় হবে, জাহাঁপনা

    এজিদ- সত্যি কি এখনও ইমাম বংশে কোনো মহাবীর জীবিত রয়েছে? কই, কোথায় সেই বীরআমিতো কোথাও ইমাম বংশের কোনো বীর দেখতে পাচ্ছিনা।

    মারোয়ান- আছে জাহাঁপনা, আছে!ইমাম বংশে এখনও শক্তিশালী মহাবীর জীবিত রয়েছে শৌর্যবীর্যে তাঁরা ইমাম হোসেনের চেয়েও কম নন

    এজিদ- সেই বীরের নাম কি? কোথায় তাঁর বাসস্থান?

    মারোয়ান- সেই বীরের নাম মহম্মদ হানিফা আম্বাজ নগরে তাঁর বাসস্থান

    এজিদ-(ভীত হয়ে)তাহলে এখন উপায় কি, মন্ত্রী মারোয়ান?

    মারোয়ান- এখনই ভয়ের কিছুই নেই, জাহাঁপনা মহম্মদ হানিফা মদিনাবাসীদের সংবাদ না নিয়ে এবং রওজা মোবারক দর্শন না করেদামেস্কে আসবেন না।

    এজিদ-সত্যি কি মহম্মদ হানিফা দামেস্কে আসবেকেন, কি তাঁর উদ্দেশ্য?

    মারোয়ান- উদ্দেশ্য আছে, জাহাঁপনা। তিনি হাসান ও হোসেন হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে আসবেন

    এজিদ-এখন তাঁদের বাধা প্রদানের উপায় কি, মন্ত্রী মারোয়ান?

    মারোয়ান- উপায় আছে, জাহাঁপনা। আপনি এখনই সেনাপতি অলিদকে মদিনা অভিমুখে পাঠিয়ে দিন সে মদিনায় গিয়ে যেন মহম্মদ হানিফার প্রবেশ পথে বাধা প্রদান করে এবং তাঁকে যুদ্ধ পরাস্ত করার পর বন্দী করে দামেস্কে নিয়ে আসে।

    এজিদ- উত্তম তাহলে ডাক সেনাপতি অলিদকে

    মারোয়ান- কোথায় সেনাপতি আলিদশীঘ্র চলে এসো

             (শিমার ও অলিদের প্রবেশ)

    অলিদ- আদেশ করুন, জাহাঁপনা।

    এজিদ- শোন অলিদ, শোন শিমার, তোমরা লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে এখনই মদিনা অভিমুখে যাত্রা কর মদিনায় গিয়ে মহম্মদ হানিফার মদিনা প্রবেশে বাধা প্রদান করবে। শুধু বাধাই নয়- মহম্মদ হানিফাকে যুদ্ধে পরাস্ত করেতাঁকে বন্দী করে আমার রাজ দরবারে হাজির করবে এ কাজের জন্য আমি তোমাদের যথেচ্ছা পুরস্কার প্রদান করব

    অলিদ- জাহাঁপনার আদেশ শিরোধার্য জয় জাহাঁপনা এজিদের-

    শিমার- জয়-

                                        (অলিদ ও শিমার প্রস্থান)

   

    মারোয়ান- চলুন জাহাঁপনা, আমরা এখন বিশ্রামাগারে চলে যাই।

    এজিদ- উত্তম! তবেই চলুন।

                                            (উভয় প্রস্থান)

* * *

 

 

দ্বিতীয় অংক                       চতুর্থ দৃশ্য

-হানিফার শিবির প্রাংগ-

(গাজী রহমান ও পরে অলিদের কাসেদের প্রবেশ।)

    কাসেদ- বন্দেগী মন্ত্রীবর!

    গাজী- বন্দেগী কে তুমিকোথা হতে এসেছে?

    কাশেদ-আমি সেনাপতি অলিদের কাসেদ। অলিদ শিবির হতে এসেছি। সেনাপতি অলিদজাহাঁপনার নিকট এই পত্রখানা প্রেরণ করেছেন এই নিন সেই পত্র (পত্র প্রদান)

    গাজী- আচ্ছা দাও। (পত্র গ্রহণ ও পত্রপাঠ) মহম্মদ হানিফা- তুমি কি জাননা যেজাহাঁপনা এজিদ বর্তমান মদিনার বাদশাহ তুমি কি ভুলে গেছ যেসৈন্যসহ অন্যের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে হলেস্থানীয় বাদশাহের অনুমতি গ্রহণ করাটা একান্তই আবশ্যকতুমি যে আমাদের জাহাঁপনার অনুমতি অবিহনে মদিনায় প্রবেশ করেছ- ইহা তোমাদের চরম অন্যায় হয়েছে এখন যদি তুমি আর একপদও অগ্রসর হও, তাহলে তোমাকে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী করে জাহাঁপনা এজিদ সমীপে হাজির করা হবে। এ কথাও স্মরণ রেখো, তুমি যদি হোসেন পরিজনকে উদ্ধার হেতু এসে থাকোতাহলে তোমরা স্বদেশে ফিরে যাবার জন্য প্রার্থনা করলেও আর তোমাদের ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। ইতি- সেনাপতি অলিদ-

    গাজী- বাঃ কি চমৎকারশোন কাসেদতোমাদের সেনাপতি অলিদকে বলবেনিজ সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে হলেঅন্য কারও অনুমতি আবশ্যক হয়না। আরও বলবে, হোসেন পরিজনকে উদ্ধার করাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ইমাম বংশের ওপর তারা যেরূপ অন্যায়-অত্যাচার করেছেআমরাও ঠিক সেরূপ শাস্তি বিধান করতে ভুলব না। আমাদের পৈতৃক দামেস্ক সাম্রাজ্যকে মাবিয়া পুত্র এজিদ নিজ রাজ্যজ্ঞানে সিংহাসনে বসেযে অন্যায় করেছে এর সমুচিত প্রতিকার না করা পর্য্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হবে না শুধু মদিনা দখলেই আমাদের গতি রুদ্ধ হব না পাপাত্মা এজিদের লক্ষাধিক সৈন্যের শোণিতে ধরা সিক্ত না করা পর্যন্ত আমাদের রক্ত পিপাসা নিবৃত্তি হবে না। যাও কাসেদ, তোমাদের সেনাপতি অলিদকে এই সংবাদ দাওগে

                                            (সকলের প্রস্থান)

* * *

 

তৃতীয় অঙ্ক                         প্রথম দৃশ্য

-এজিদের মন্ত্রণাকক্ষ-

(এজিদ, মারোয়ান ও গুপ্তচরের প্রবেশ)

 

    এজিদ- তাদের তুমি কোন দিকে যেতে দেখলে এবং সন্ধানই বা কি করে জানলে?

                গুপ্তচর- আমি বিশেষভাবে জানতে পেরেছি যে, তারা বিভিন্ন দেশ থেকে হানিফার সাহায্যার্থে মদিনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে

    এজিদ- মহম্মদ হানিফা কি সত্যিই মদিনায় এসেছে?

    গুপ্তচর- হ্যাঁ জাহাঁপনা মহম্মদ হানিফা মদিনায় এসে পৌঁছেছে

    এজিদ- তুমি কি করে জানলে?

    গুপ্তচর- স্বয়ং আমি নিজেই দেখেছি, জাহাঁপনা মহম্মদ হানিফা প্রথমে কারবালা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু কি ভেবে যেন তিনি এখন মদিনার দিকে গেছেন

    এজিদ- তবে কি তারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে?

    গুপ্তচর- যুদ্ধে অবতীর্ণ না হলে এতো সৈন্য তাঁদে সাহায্যার্থে আসবে কেন, জাহাঁপনা?

     এজিদ- আচ্ছা! কি পরিমা সৈন্য যাইতেছে?

                গুপ্তচর- প্রায় দুই লক্ষাধিক সৈন্য হবে, জাহাঁপনা

    মারোয়ান- আচ্ছা, ঐ সকল সৈন্য কোথা হতে এসেছে?

                গুপ্তচর- ঐ সকল সৈন্য  তুরান ও তুরস্ক হতে এসেছে, মন্ত্রীবর শুধু সৈন্য নয়ঐ দুই দেশের দুইজন সম্রাটও এসেছেন তাদের সংগে

    মারোয়ান- ঠিক আছে, তুমি এখন যাও নতুন খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অবগত করবে

    গুপ্তচর- যথা আজ্ঞা, মন্ত্রীবর                         

                                            (গুপ্তচর প্রস্থান)

    জিদ-মন্ত্রী মারোয়ান, এখন উপায় 

    মারোয়ান-কোনো ভয় নেই, জাহাপনা। কারণ এইসকল সৈন্যের জন্য যদি আহারাদি মদিনায় যেতে নাপারে,  তাহলে কারবালা প্রান্তরে যেভাবে পানি পানি বলে  হোসেন পরিজন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেঠিক তেমনই ভাবে ঐ সকল সৈন্য খাদ্য অভাবে হাহাকার করে প্রাণ বিসর্জন দিবে

    জিদ- কি আশ্চর্য! বিভিন্ন দেশ হতে লক্ষ সৈন্য যাইথেছে, তাদের জন্য আহারাদি যাইতেছে সংবাদ কি অলিদ খনও পা নি?

                      (দ্রুত শিমারের প্রবেশ)

    শিমার- সংবাদ নিশ্চয় পেয়েছে জাহাঁপনা। কিন্তু এখনও তাঁদের বাধা প্রদান করা সম্ভব হয়নি, জাহাঁপনা

    জিদ- কেন, বাধা প্রদান করা সম্ভব হয়নি কেন?

        শিমার-মহম্মদ হানিফা মদিনায় প্রবেশ করেছে এবং  তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ বেধেছে।

    এজিদ- হুঃ বুঝেছি! মহম্মদ হানিফা স্বয়ং মহাবীর। তার ওপর এতো সৈন্য সাহায্য। আচ্ছা শিমার বাহাদুর, ঐ সকল সৈন্য যাতে মদিনায় গিয়ে  মহম্মদ হানিফাকে সাহায্য করতে না পারেতার ব্যৱস্থা কি তুমি করতে পারবে?

                শিমার- নিশ্চয় পারব, জাহাঁপনা আমি শুধু আপনার আদেশের অপেক্ষায় রয়েছি। আপনার আদেশ পেলেইতুরান ও তুরস্ক সম্রাটদের যুদ্ধে পরাস্ত এবং  বন্দী করে দামেস্কে নিয়ে আসতে কতক্ষণ! যে হস্তে কাবালা প্রান্তর ইমাম বংশে শিরোমণি হোসেন কে হত্যা করে তার মস্তক কেটে এনেছি, সেই হস্তে তুরান ও তুরস্ক সম্রাটকে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী করে আনতে  কতক্ষণ

    ি- তুমি নিশ্চয় পারবে তুমি ব্যতীত কেউই এ কাজ করতে পারবে না। যাও, তুমি অবিলম্বে তিন লক্ষ সৈন্য নিয়ে মদিনা অভিমুখে যাত্রা কর

    শিমার- এই আমি এক্ষুনি চললাম, জাহাঁপনা জয় জাহাঁপনা এজিদের জয়-                                                 (শিমার প্রস্থান)

    এজিদ-মন্ত্রী মারোয়ান ?

    মারোয়ান- আদেশ করুন, জাহাঁপনা

    এজিদ- মহম্মদ হানিফা যদি একাধিক্রমে শতবর্ষ আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে,  তবুও সে আমাদের সৈন্য শেষ করতে পারবে না ঐদিকে যুদ্ধ চলতে থাকুকআর এদিকে আমরা জয়নাল আব্দীনের ভবলীলা শেষ করে দিই জয়নাল আব্দীনের মৃত্যু সংবাদ  শুনলে মহম্মদ হানিফা আর দামেস্ক নগরে আসবে না কার যার জন্য সে দামেস্কে আসবেসেই যদি নাথাকেতাহলে দামেস্কে এসে কি করবেআমার মতে, জয়নাল আব্দীনকে হত্যা করার জন্য এটাই উত্তম সময়। দ্বিতীয়তঃ মহম্মদ হানিফা বন্দী অথবা মৃত্যুই আমাদের কাম্য। এই বিষয়ে তোমার মত কি?

    মারোয়ান- জাহাঁপনা! সেনাপতি অলিদ ও মহাবীর শিমার বাহাদুরের কোনো সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত জয়নাল বধের ভাল-মন্দ আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারব না  জয়নাল আব্দীন যদি আপনার বশ্যতা স্বীকার করেআপনাকে প্রভু বলে মান্য করে এবং মদিনার সিংহাসনে বসে কর প্রদান করে তাতে আপনার যে গৌবব্ হবে, ইমাম বংশ সমূলে ধ্বংস করে  মক্কা ও মদিনার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে আপনার তত গৌরব হবেনা, জাহাঁপনা আমার মতামত আপনাকে অবগত করলাম এখন আপনার ইচ্ছা-

    এজিদ- তুমি যথার্থ বলেছো, মন্ত্রী মারোয়ান তবে, জয়নাল আব্দীন যে বংশের সন্তান, কালেতে সুয়োগ পেলে তাঁর পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সে কুণ্ঠিত হবে না হয়তো এখন নয়, মুক্তি লাভের পর মক্কা ও মদিনার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে, সে আমার বিরুদ্ধে য়ুদ্ধ ঘোষণা করবে সেজন্যই জয়নাল আব্দীনকে বাঁচিয়ে রাখা চলবে না এখন তোমার যা ভালো বিবেচনা হয়, তাই করো

    মারোয়ান- আপনি যাই বলুন জাহাঁপনা জয়নাল বধের কথা আমরা পরে বিবেচনা করব এখন চলুন, আমরা বিশ্রামাগারে চলে যাই।

    জিদ- উত্তম। তবে তাই চলমন্ত্রী মারোয়ান-

                                            (সকলের প্রস্থান)

* * *

 

            

তৃতীয় অংক                                  দ্বিতীয় দৃশ্য

-রণভূমি-

(একদিকে মহম্মদ হানিফার জয়ধ্বনি করে মসহাব কাকা ও ওমর আলী সৈন্যসহ            প্রবেশ ও অন্যদিকে সৈন্যসহ এজিদের জয়ধ্বনি করে শিমার প্রবেশ।)

 

    মসহাব- নারায়ে তকবীর-

    সৈন্যগণ- আল্লাহু আকবার!

    শিমার- জয় জাহাঁপনা এজিদের-

    সৈন্যগণ-জয়

    মসহাব- জয় মহম্মদ হানিফার-

    সৈন্যগণ- জয়

    শিমার- সৈন্যগণ, তোমরা যে উদ্দেশ্যে নিয়ে মদিনায় যাইতেছ, তা তোমাদের জন্য এখন আর সম্ভব হবে না। যদি তোমাদের বেঁচে থাকবার বাসনা থাকেতাহলে আর একপদও অগ্রসর হয়োনা তোমরা এখন জাহাঁপনা এজিদের আজ্ঞায় আমাদের হস্তে বন্দী

    মসহাব- ক তোরা বেইমানের দল? শীঘ্র পরিচয় দে

    শিমার বন্দীত্বের কথা শুনে ভয় পেয়েছ নাকি?

    মসহা- ভয় ভয় কাকে বলে তা আমি জানিনা। তবে, তোর পরিচয় না পেলে  আমি তোর সঙ্গে কথা বলবো না।

    শিমার- শোন তবে আমার পরিচয়, আমি দামেস্কধিপতি জাহাঁপনা এজিদের প্রধান সৈন্যধ্যক্ষ আমার হস্তেই কারবালা প্রান্তর মাম হোসেন নিহত হয়েছে এবং তাঁর খণ্ডিত মস্তক দামেস্কধিপতি জিদের দরবারে পৌঁছে দিয়ে আমি পাচ লক্ষ টাকা পুরস্কার লাভ করেছি। এখন নিশ্চয় চিনতে পেরেছ, আমি কে তবে শোনআমা নাম মহাবীর শিমার বাহাদুর

    সহাব ও ওমর- তুই সেই শিমার?

    শিমার- হ্যাঁ-হ্যাঁআমি সেই শিমা এখন তোমরা তোমাদের পরিচয় দাও

    মসহা- আমাদের পরিচয় নিশ্চয় দিবো, পাপাত্মা শিমার  তার আগে তু যেভাবে আমাদের ভ্রাতৃ ইমাম হোসেনে বুকের ওপর বসে তাঁর শিরশ্ছেদ করেছিস, তার প্রতিশোধ নেব মনে কর শিমার, আমরা তোর পাপরক্তে মদিনার পথ ধৌত করবো

    শিমার-চুপ কর বাচাল শক্তি থাকেতো অস্ত্র ধর আর না হলে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়ে যা নচেৎ তোর নিস্তার নেই। পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে না পালালে আমার হস্তে তোদের মৃত্যু অনিবার্য

    মসহাব- বেরে পাষণ্ড ধর অস্ত্র

             (তমুল যুদ্ধ ওমরের হাতে শিমার বন্দী)

    মসহাব- বন্ধুগপাপাত্মা শিমার আমাদের হস্তে বন্দী এখন এই পাপিষ্ঠ শিমারকে মহম্মদ হানিফার শিবিরে নিয়ে চলো। আজ এই পাপিষ্ঠ শিমারকে মহম্মদ হানিফার পদমূলে পুষ্পাঞ্জলি দেবো। সকলেই বল- নারায়ে তকবীর-

    সৈন্যগণ- আল্লাহু আকবার

    মসহাব- জয় মহম্মদ হানিফার-

     সৈন্যগণ জয় !

                                   (শিমারকে লইয়া সকলের প্রস্থান)

* * *

 

 

তৃতীয় অঙ্ক                                  তৃতীয় দৃশ্য

-এজিদ রাজদরবার-

(এজিদ ও মারোয়ানের প্রবেশ)

    এজিদ- কোথায় প্রহরী? শীঘ্র বন্দী জয়নাল আব্দীনকে দরবারে নিয়ে এসো

                  (বন্দী জয়নাল আব্দীনকে লইয়া প্রহরীর প্রবেশ)

        প্রহরী- বন্দী জয়নাল হাজির, জাহাঁপনা

    এজিদ- জয়নাল আব্দীন আজ তোমার জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণ উপস্থিত এসময়ে যদি তোমার কিছু বলবার থাকে, তা নিঃসঙ্কোচে বলতে পার আমি আশা করেছিলাম, তুমি আমার বশ্যতা স্বীকার করবে এবং আমাকে প্রভু বলে মান্য করে আমার নামে খোবা পাঠ করবে কিন্তু তুমি তা কিছুই করলে না। এমত অবস্থায় তোমাকে আর ইহজগতে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না জয়নাল আব্দীন! ঐ উর্দ্ধ দিকে আকাশের পানে চেয়ে কি দেখছ? ঐ অনন্ত উর্দ্ধ আকাশে চন্দ্রসূর্য ও লক্ষাধিক তারকা ব্যতীত অন্য কিছুই নেই। আমি এখন বলছি যদি তুমি আমা বশ্যতা স্বীকার কর  আমাকে প্রভু বলে স্বীকার করতাহলে আমি তোমাকে এখই মুক্ত করে দিব

                জয়নাল- আমি চাইনা তোমার মুক্তিআমার জীবনলীলা শেষ করাই যখন তোমার কাম্যতখন আমি বেচে থাকলেও তোমা নিস্তার নেই আর মরে গেলেও তোমার রক্ষা নেই। তবে শোন এজিদ, আমাকে যদি তুমি আজ হত্যাই করবে, তখন আমি হাসিমুখে তোমার হস্তে জীবন দিতে কণ্ঠাবোধ করব ন তবে জেনে রেখো, পরম দয়ালু খোদাতায়ালা যদি আমাকে তৌফিক দেন,  তাহলে পরজনমে এসে তোর বুকের ওপর বসে আমার আব্বাজানের হত্যার শোধ নেবো

    এজিদ- কিএখনও স্পর্দ্ধাএখন অহংকারএখনও আমাকে ঘৃণাআমি এখনই তোকে হত্যা করে অন্তরের জ্বালা নিবারণ করব (অস্ত্র উত্তোলন)

    মায়োরান- জাহাঁপনা, ধৈর্য্য ধারণ করুন ঐ দেখুন, মহামতি অলিদ কীভাবে অস্থির হয়ে এদিকে ছুটে আসছে। শীঘ্র জয়নালকে বন্দী গৃহে পাঠিয়ে দিন, জাহাঁপনা। আগে অলিদের সংবাদ শুনে নই। তারপর  জয়নাল বধের কথা বিবেচনা করব

    জিদ- প্রহরী, তুমি শীঘ্র জয়নাল আব্দীনকে বন্দী গৃহে নিয়ে যাও। (প্রহরী জয়নালকে লইয়ে প্রস্থান)

                 (কম্পিত অবস্থায় অলিদ প্রবেশ)

    অলিদ – জা-জা-জাহাঁপনা! সব শেষ, জাহাঁপনা

    জিদ- কি শেষ অলিদ?  কেন তুমি কাঁপতেছ?

    লিদ- জাহাঁপনা! মহম্মদ হানিফা স্বয়ং যুদ্ধে এসেছে

    জিদ– মহম্মদ হানিফা যুদ্ধে এসেছে বলে তুমি ভয়ে কঁপতেছ কেমন? আরও কি হয়েছে তাই বল?

    অলিদ- জাহাঁপনা! আমি গুপ্তচরের মুখে অবগত হলাম,  তুরস্কের সম্রাট মসহাব কাক্কা শিমার বাহাদুরকে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দী করে হানিফার শিবিরে নিয়ে গেছে

    এজিদ– বড় চমৎকার সংবা নিয়ে এসেছ, তাই না অলিদশিমার বাহাদুরকে তুরস্কের সম্রাট বেঁধে নিয়ে গেছে। অলিদ, তোমার হস্তে অস্ত্র ছিল না? শিমারকে একা যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়ে তুমি অন্দর মহলে বসে নারীর রূপ দর্শন করছিলে কেমন নির্লজ-কাপুরুষ কম্পিত অবস্থায় শৃগালের ন্যায় আমাকে এই সুসংবাদ দিতে এসেছ?

    অলিদ- না-না জাহাঁপনা। আমি মদিনার প্রবেশের পথে  আম্বাজী সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় মসহাব কাকা  শিমার বাহাদুরকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। আম্বাজী সৈন্যের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলাম বলে-

    জিদ– তুমি কিছুই করতে পারনি, তাই না?  বুঝেছিআমি  বুঝেছি! মন্ত্রী মারোয়ান, এখন উপায়?

    মারোয়ান- চিন্তা করবেন না, জাহাঁপনা। এইবার আমি স্বয়ং যুদ্ধে যাবো। আমি দেখবো, মহম্মদ হানিফা কত বড় বীর ও কত শক্তিধর সেআজই যুদ্ধে গিয়ে মহম্মদ হানিফাকে পরাস্ত করে তাকে বন্দী করে এনে, আমি তাঁকে আপনায় সম্মুখে হাজির করব, জাহাঁপনা

     িদ- শোন্ অলিদ, তুমি অবিলম্বে তিন লক্ষ সৈন্য নিয়ে আমাদের শিমার বাহাদুরকে যে পথে বন্দী করে নিয়ে গেছে  সেই পথে যাও এবং তুরস্ক সম্রাটকে যুদ্ধে পরাজিত করে শীঘ্র শিমারকে উদ্ধার করে নিসো

    অলিদ- জাহাঁপনার আদেশ শিরোধার্য আমি এক্ষুনি তুরস্ক সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করব জাহাঁপনার জয় হোক- জাহাঁপনার জয় হোক- (প্রস্থান)

    জিদ- মন্ত্রী মারোয়ান!

    মারোয়ান- আদেশ করু, জাহাপনা

    জিদ- আদেশ  নয়, আদেশ নয়,  আজ আমি স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করবো। আমি দেখতে চাই,  মহম্মদ হানিফার বাহুতে কত শক্তি আজই আমি মহম্মদ হানিফাকে বন্দী করে এনে  আমার রাজদরবারে হাজি করব। আমি তাঁর এমন কঠোর বিচার করবো, আমার বিচার দেখে যেন সমস্ত জগতবাসী আতঙ্কে শিউরে উঠে চল, আমারা এক্ষুনি যুদ্ধক্ষেত্রে যাত্রা করবো

                                                                                (উভয় প্রস্থান)

* * *

 

                        তৃতীয় অংক                                ৪র্থ দৃশ্য

                                                - সমক্ষেত্র-

                                ( মহম্মদ হানিফা ও গাজী হমান প্রবেশ)

        গাজী– জাহাঁপনা, গতকালের যুদ্ধে সৈন্যগ ক্লান্ত হয়ে পরেছে। গতকল্য এজিদ পক্ষের অনেক সৈন্য হত্যা করা হয়েছে তবু এজিদ সৈন্য শেষ করা সম্ভব হচ্ছেনা। এখন উপায় কি জাহাঁপনা?

    হানিফা- গতকালের যুদ্ধে উভয় পক্ষের অনেক সৈন্য ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে আমাদের চেয়ে এজিদ পক্ষের সৈন্যই ক্ষতি হয়েছে অধিক তবু সেনাপতি অলিদ পরাজয় স্বীকার করছে না মন্ত্রী গাজী রহমান, আমার বিশ্বাস যে এজিদের সমস্ত সৈন্যও যদি আমরা শেষ কবি তবুও সেনাপতি অলিদ পরাজয় স্বীকার করবেনা। কিন্তু আমা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এই যে,  যে পর্যন্ত অলিদ পরাজয় স্বীকার না করবে, সে পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ ক্ষ্যান্ত দেবো না। চল, আজকের যুদ্ধের পরিকল্পনা করিগে

    গাজী- তাই চলুন, জাহাঁপনা-

                                            (উভয়ের প্রস্থান)

                     -দ্রুত অলিদের প্রবেশ-

    অলিদ- গতকালের যুদ্ধে আমাদের অনেক সৈন্য হতাহত হয়েছে গুপ্তচর মুখে খবর পেয়েছি স্বয়ং জাহাঁপনা এজিদ আমাদের সহায়ের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেছেন-

             (নেপথ্যে ) মারোয়ান- জয়, জাহাঁপনা এজিদ-

                                      সৈন্যগণ-জয়

    অলিদ- ঐ যে দামেস্ক হতে জাহাঁপনা জয়ধ্বনি করে সৈন্যে আমাদের সহায়ের জন্য আসতেছে সৈন্যগণবাজাও ডংকা- উড়াও নিশান;  আর আমাদের ভয় নে শত সহস্র হানিফাকেও এখন আমরা পরোয়া করি না। হানিফার সম্মুখে ও পশ্চাতে চতুর্দিকে আমাদের সৈন্যগণ ঘিরে ফেলেছে আজ মহম্মদ হানিফার নিস্তার নেই হানিফা যে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে সেই ঈশ্বরের দোহাই, একটিবার পশ্চাতে চেয়ে দেখ, তোমার শত্রুসৈন্য কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে তুমি তরবারি কোষাবদ্ধ করে আমার সন্মুখে নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা কর নতুবা তোমাদের আর জীবন নিয়ে স্বদেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দিয়ে পরাজয় স্বীকারপূর্বক আত্মসমর্পণ কর বীরের মর্যদা বীরেই রক্ষা করতে জানে আমি দিব্য চোখে দেখতেছি তোমার পরাজয় অনিবার্য

    (নেপথ্যে হঠাৎ মহম্মদ হনিফার জয়ধ্বনি)জয় মহম্মদ হানিফার

         সৈন্যগণ- জয়

    অলিদ- একি!এতো জাহাঁপনা এজিদের জয়ধ্বনি নয় এযে দেখছি মহম্মদ হানিফার জয়ধ্বনি সৈন্যগণ সাবধান মহম্মদ হানিফা স্বয়ং দলেবলে যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেছে তোমরা নিজের নিজের স্থানে সাবধানে অবস্থান গ্রহণ কর-

                                         (অলিদ দ্রুত পলায়ন)  

                       (হানিফার প্রবেশ)

    হানিফা- এর কারণ কি মন্ত্রীবর, আমাদের জয়ধ্বনি শুনেই অলিদ পলায়ন করল কেন?

                গাজী রহমান- জাহাঁপনা, অলিদ সৈন্যের যুদ্ধ বাজনা শুনে আমি আমার চিন্তাকে ভুল পথে পরিচালনা করেছিলাম সবই খোদা তায়ালার মহিমা ঐ দেখুন তারকাখচিত নিশান উড়ায়ে যারা এদিকে আসতেছে, তাঁরা আমাদেরই সৈন্য হবে

             (জয়ধ্বনি করতে করতে মসহাব কাক্কা সৈন্যসহ প্রবেশ)

    মসহাব- জয় মহম্মদ হানিফার-

    সৈন্যগণ- জয়

    মসহাব- নারায়ে তাকবীর-

    সৈন্যগণ- আল্লাহু আকবার

     হানিফা- এতো বিলম্ব কেন ভ্রাতা?

                মসহাব- (হানিফার হস্তে চুম্বন করে) বিলম্বের কারণ পরে বলবো, ভ্রাতা এখন কি করতে হবে তাই বলুন

     হানিফা-হ্যাঁ, তোমার বিলম্বের কারণ পরেই শুনব আগে তরবারি ধারণ কর মারো কাফের, তাড়াও অলিদ মনের দুঃখ শুনার সময় পরেও পাওয়া যাবে তোমাদের তরবারি এদিকে চলুক, আর আমরা চললাম, অন্যদিকে এসো মন্ত্রী গাজী রহমান-                                          (হানিফা ও গাজী রহমান প্রস্থান)

    মসহাব- অলিদ, কোথায় লুকিয়েছ শীঘ্র বাহির হও তোমার বীরত্ব দেখার জন্য আমি আজ ক্লান্ত শরীরে অস্ত্রধারণ করেছি দৌহাই তোমাদের ঈশ্বরের, শীঘ্র যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হও আর বিলম্ব কেন তুমি যে কতবড় বীর, তোমার বাহুতে কত শক্তি, আজ তা ভালোরূপে পরীক্ষা করবো আজ আমি তোমার তরবারির তেজ দেখবো আর যদি ভাগ্যক্রমে সময় পাই তাহলে তোমার বর্শার ধারও দেখবো তীরের লক্ষ্যভেদ, খঞ্জরের ঘাত, গদার আঘাত, সকলই আজ দেখবো যুদ্ধপিপাসূ শত্রু সৈন্য আজ তোমার দ্বারপ্রান্তে ছিঃ-ছিঃ- অলিদ, তুমি সেনাপতির নাম ডুবালে এতো বড়ই ঘৃণার কথা শীঘ্র শিবির থেকে বের হও চিন্তা নাই আমি তোমাকে অস্ত্রাঘাতে মারব না

                 (দ্রুত অলিদের প্রবেশ)

    লিদ- মহাবীরের দর্প দেখোআমাকে অস্ত্রাঘাতে মারবে না! মারবে কথার আঘাতে কেমন?

    মসহাব- পাপাত্মা অলিদ কথা রাখ সাহস থাকেতো অস্ত্র ধর।

    অলিদ- বুঝলে বীঅতি দর্পে হত লংকা তুমি এই মাত্র এসেছযে শুনবে সেই বলবে, যখনই দেখা তখনই যুদ্ধ তাই পরাস্ত তাই তোমাকে আমি আগে অস্ত্রাঘাত করব না সাহস থাকেতো তুমি আগে অস্ত্রাঘাত কর

    মানহার- আগেই বলেছি, আমি তোকে অস্ত্রাঘাতে মারব না এই দেখ শয়তান (মসহাব কাকা াফ দিয়ে এসে অলিদকে ধরে ফেললো)- এইবার দেখঅস্ত্রাঘাত না করে, আমি আছাড় মেরে তোর ভবলীলা শেষ করে দিব(আছাড় মারতে উদ্যত)

                 (দ্রুত হানিফ ও গাজী  রহমান প্রবেশ)

    হানিফা-(বাধা দিয়া) ভাই মসহাবঅলিদকে প্রাণে মেরনাঅলিদ তোমার বধ্য নয়    

    মসহাব আপনার আদেশ শিরোধার্য তবে আমি কে হাল্কা একটা আছাড় না মেরে ছাড় না। এতে যদি এর ভবলীলা শেষ হয়ে যায় তখন আমার দায়দোষ নেবেন না দেখুন, এজিদ সেনাপতি অলিদের বাহুবল(অলিদকে আছাড় মারলে অলিদ দ্রুত পালাইয়া গেলো)

    মসহাব- আয় কাফেরের দল। কে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হবিশীঘ্র আয়।

    গাজী- বীরবর মসহাব!

    মসহাব- আদেশ করুন, মন্ত্রীবর

     গাজী রহমান- আজই আমরা দামেস্কে প্রবেশ করবো। এখান থেকেই আমরা সরাসরি দামেস্কে অভিমুখে যাত্রা করবো তবে যাত্রার আগে  মদিনা রক্ষার জন্য আমাদের কিছু সৈন্য এখানে রেখে যেতে হবে কারণ দামেস্ক মন্ত্রীসেনাপতি  ও এজিদকে কখনও বিশ্বাস করতে নেই। কারণ ছল চাতুরীপ্রবঞ্চনা ও প্রতাড়নাই এদের জাতিগত ধর্ম ও স্বভাব

    মসহাব- জাহাঁপনা

     হানিফা- তোমাদের আরও কোনো কথা আছে?

    মসহাব- আরও একটি শুভসংবাদ আপনার নিকট প্রকাশ না করে স্থির থাকতে পারলুম না, জাহাঁপনা। যে মহাপাপী ইমাম হোসেনের বুকে বসে তাঁর শিরশ্ছেদ করে, এজিদের নিকট হতে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার লাভ করেছিলআজ আমি সেই মহাপাতকী শিমারকে বন্দী করে আমাদের শিবিরে রেখে এসেছি। এখন শুধু আপনার আদেশের অপেক্ষায়  আছি আপনি সেই মহাপাপীর বিচারের জন্য আদেশ করুন- জাহাঁপনা

    হানিফা- ভাই মসহাব কাকা। তুমি আমার হৃদয়ের মণি বন্ধু- ভাই এসো ভাই, তোমার সঙ্গে আলিঙ্গন করে আমার দগ্ধ প্রাণ শীতল করি তুমি পাপিষ্ঠ সীমারকে বন্দী করে এনেছ তোমার এই কীর্তি জগতের বুকে অক্ষয় হয়ে থাকবে শিমারকে বন্দী করে আজ তুমি আমায় বিনামূল্যে ক্রয় করলে ভাই শিমারের নাম শুনে আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠেছে শিমারকে দেখার জন্য আমি খুবই লালায়িত ছিলুম সেই শিমারকে তুমি বন্দী করে এনেছ- উত্তম করেছ তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি, ভ্রাতা এখনই শিমারকে এখানে আনার জন্য আদেশ দাও, ভ্রাতা

     মসহাব- কোথায় প্রহরী,  বন্দী শিমারকে দরবারে নিয়ে এস।

                    (বন্দী শিমারকে লইয়া প্রহরীর প্রবেশ)

     মসহাব- জাহাঁপনা। এই দেখুন সেই পাপিষ্ঠ শিমার

    হানিফা- হ্যাঁ  দেখেছি, ভাই মসহাব, দেখেছি এখন তোমার কাজ তুমি করোআমার এখন আর বিলম্ব সহ্য হচ্ছে না

    মসহাব- শিমার, আজ আমি তোমার কর্মের বিচার করবো। তোমার কোনো কথা বলবার থাকলে বলতে পারো

    শিমার- না, আমার কিছুই বলবার নেই। এখন তোমাদের যা ইচ্ছে তাই করতে পার

     মসহাব- শিমার, আজ আমি তোমার এমন বিচার করব, জগতবাসী তোমার বিচারের কথা শুনে এবং মনে করে যেন হু-হু করে চোখের জল ফেলে প্রহরী ও সৈন্যগণ তোমরা শিমারকে ঐ বৃক্ষের সাথে বেঁধে তীর নিক্ষেপ করে হত্যা কর   (শিমারকে শিকল দিয়ে বেঁধে সৈন্যগণ টানিতে টানিতে নিয়ে গেল)

                                    (সাথে সাথে সকলের প্রস্থান)

* * *

                     

                       তৃতীয় অংক                                ৪র্থ দৃশ্য

                                           - সমক্ষেত্র-

 

 

 

 

                   (দ্রুত মারোয়ানের প্রবেশ)

    মারোয়ান- কোথায় সৈন্যগণ, শীঘ্ৰ রণক্ষেত্রে উপস্থিত হও                               (ওমর আলীকে লইয়া সৈন্যগণ প্রবেশ)

    মারোয়ান- সৈন্যগণ। তোমরা সকলেই ওমর আলীকে– চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেল(সৈন্যগণ ঘিরে ধরিল)ওমর আলী, এখনো সময় আছে তুমি যদি জাহাঁপনা এজিদের বশ্যতা স্বীকারপূর্বক, জাহাঁপনা এজিদকে প্রভু বলে মান্য কর, তাহলে জাহাঁপনা তোমাকে প্রাণদণ্ড হতে মুক্তিও দিতে পারেন। তাছাড়া তোমাকে মুক্তি দেবার ক্ষমতা অন্য কারও নেই?

    ওমর- চুপ করবিশ্বাসঘাতক বেঈমান! আমি চাইনা তোদের মুক্তি। তোদের যদি শক্তি থাকে, তাহলে আমাকে শূলের নিকট নিয়ে চল

    মারোয়ান- তোমাকে একাই হেঁটে ঐ শূলের নিকট যেতে হবে।

    ওমর- না, আমি যাবনা।

    মারোয়ান- ওমর আলী! তুমি ঐ শূলের নিকট স্ব-ইচ্ছায় না গেলে আমি জোর করে শূলের নিকট নিয়ে যাবো। কারণ ঐ শূলেই তোমার মৃত্যু হবে

    ওমর- তোমাদের যদি শক্তি আছে, তাহলে আমাকে ঐ শূলের নিকট নিয়ে চল আমি স্ব-ইচ্ছায় ঐ শূলের নিকট যাব না- যাব না- যাব না আমার প্রাণবধই যদি তোদের কাম্য, তাহলে তরবারি আছে আঘাত কর, তীর আছে বক্ষ পেতে দিচ্ছি নিক্ষেপ কর, প্রয়োজন হলে ফাঁসি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা কর কিন্তু আমার দেহে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত আমি নিজ ইচ্ছায় ঐ শূলের নিকটে যাব না তোমাদের যদি ক্ষমতা আছে, আমায় শূলের নিকট নিয়ে চল             

    মারোয়ান- কেনশূলে প্রাণ দিলে কি তোমার মান যাবে বাহঃরে মান- বাহঃরে সন্মান!

    ওমর- শোন মারোয়ারীর বাচ্ছাআর একটি কথাও যদি মুখে উচ্চারণ করিস-তাহলে দোহাই লাগে তোদের পূজ্য দেবতার। এই আমি দাঁড়াইলামএখান থেকে এক পদত্ত আমি স্বইচ্ছায় অগ্রসর হব না।

    মারোয়ান- দেখ ওমর আলী! মুহূর্ত পরেই তোমার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। এখনও অহংকারএখনও বাহাদুরী?

    ওমর- নির্লজ্জ, কাপুরুষ মারোয়ান তোকে আর কি বলবোআমার হস্ত-পদ লৌহ শৃংখলে বাঁধা আছে বলেই এখনও কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিস, না হলে তোর মুখের শাস্তি দিতে ওমর আলীর এক মূহুর্ত সময়ও লাগতো না, বুঝেছিস নরাধম?

    মারোয়ান- কি এখনও বাহাদুরী! চল, আমি তোমাকে পায় হাটিয়েই শূলের নিকট নিয়ে যাবেো

    (মারোয়ান ওমর আলীকে ধাক্কা দিলো, কিন্তু এক ইঞ্চিও নাড়াইতে পারল না

    মারোয়ান- একিএতো দেখছি পাথরের মতো ওজন!এ কোনো যাদু জানে নাকি? সৈন্যগণ, তোমরা সকলে একসঙ্গে ধরে একে শূলের নিকট নিয়ে চল

    ওমর- হাঃ-হাঃ-হাঃ- মারোয়ান, সকলে ধরে নিয়ে গেলে তোমার গৌরব কোথায় থাকলো?  

     মারোয়ান– আমার গৌরব থাক, আর না থাক তাতে কিছু যায় আসে না তোকেতো শূলে চড়াইলাম     

    ওমর- তোরা এখান থিকে নিতে পারলে তো শূলে চড়াইবি?

    মারোয়ান- হ্যাঁ, শূলে চড়াইব কারণ শূলেই তোর মৃত্যু নির্ধারিত করা হয়েছে সৈন্যগণশীঘ্র ধরএর কথা এখন একেবারে অসহ্য সবাই মিলে একে শূলের নিকটে নিয়ে চলো

    (সকলেই একসঙ্গে ওমর আলীকে ধরলো, কিন্তু কোনোপধ্যেই নাড়াইতে পারলো না)

    সৈন্যগণ- না মন্ত্রীবর আমরা একে শূলে নিয়ে যেতে পারব ন

    মারোয়ান- এতো দেখছি মহাবিপদ! এ নিশ্চয়ই যাদুকর যদি তাই না হবেতাহলে এতোগুলো সৈনিক এক সঙ্গে ধরেও কেন নাড়াইতে পারছেনাএতো দেখছি মহাচিন্তার বিষয়

    ওমর-চিন্তার বিষয় কিছুই নয়তোমরা যদি আমাকে এখান থেকে শূলের নিকট নিতে পারোতাহলে তোমাদেরকে আমায় ধরে শূলে চড়াইতে হবে না। আমি ইচ্ছাপূর্বক শূলে চড়ে হাসি-মুখে খোদার নাম স্মরণ করে প্রাণ বিসর্জন দিবো। একটা জেনে রাখআমি যতদিন জগতের বুকে বেঁচে থাকবো- ততদিন হাসি তামাসা করেই বেঁচে থাকব

    মারোয়ান- না-এর বাচালতা একেবারে অসহ্য। কোথায় আব্দুল্লাহ জিয়াদ, শীঘ্র তোমার সেই নতুন সৈন্য নিয়ে এখানে উপস্থিত হও

    ওমর– কোন আব্দুল্লাহ জিয়াদসেই নিমখ হারাম বিশ্বাসঘাতক আব্দুল্লাহ জেয়াদনা, অন্য কেউ?

    মারোয়ান- তা জেনে তোমার লাভ কি?

    ওমর- না, আমার তেমন লাভ নেই শুধু সেই পাপাত্মার মুখদর্শন করার ইচ্ছা। ডাক, তাঁকে শীঘ্র আসতে বল

    মারোয়ান-তোমার অন্তিম কাল যে অতি নিকটে তা কি তুমি জানোএই অন্তিম সময়ে আবার আব্দুল্লাহ জিয়াদকে দেখবার ইচ্ছা কেনতোমার অন্তিম সময় এখন সমাগত

    ওমর চুপ কর বেইমান। কার মৃত্যু কোন সময় হবেতা কি তুই জানিস?

    মারোয়ান- আমিতো তোমার মত মূর্খ নই যেকারণ না জেনে ঈশ্বরের দিকে চেয়ে থাকবো? তুমি মনে করছো, আমরা তোমাকে শূলে চড়ায়ে প্রাণ বধ করতে পারব না ওমর আলী মনে রেখআঙ্গার যদি হলুদের ক্লান্তি পায়শামুক যদি সমুদ্র শুকিয়ে ফেলেসূর্যদেব যদি পশ্চিম গগনে উদিত হয়তবু তুমি আজ আমার হাত থেকে রক্ষা পাবেনা

    ওমর খোদা তায়ালার মহিমা বুঝবার শক্তি কারও নেই। তোমারও নেই- আমারও নেই তবে খোদা তায়ালা অসীম শক্তিধর তিনি রাজাকে পথের ফকীর এবং ফকীরকে রাজা বানাতে পারেন হে দয়াময়, কৃপাসিন্ধু খোদা, তুমি হজরত ইব্রাহীমকে অগ্নিকুণ্ড হতে, হজরত ইউছুফকে অন্ধকূপ হতেনূহ নবীকে তুফান হতে উদ্ধার করেছিলে আজ আমাকে তুমি মৃত্যুর কবল হতে রক্ষা করো, খোদা

     মারোয়ান- কোথায় আব্দুল্লাহ জেয়াদতোমার সেই নব নিযুক্ত সৈনিককে নিয়ে শীঘ্র চলে এসো।

             (আব্দুল্লাহ জেয়াদ বাহরামকে নিয়ে প্রবেশ)

        জিয়াদ- কি হয়েছে, মন্ত্রীবরএখনও ওমর আলী এখানেওমর আলীকে এখনও শূলের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়নি কেন?

    মারোয়ান- আমরা শতবার চেষ্টা করেও ওমর আলীকে শূলের নিকট নিয়ে যেতে পারছিনা একে শূলের নিকট  নিয়ে যাওয়াতো দূরের কথা, এক পদও নাড়াইতে পারতেছিনা তুমি এখন বন্দী ওমর আলীকে শূলের নিকট নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর

    জিয়াদ- উত্তম আমি একে শূন্যে তুলে শূলের নিকট নিয়ে যাবো (জিয়াদ ওমর আলীকে ধরিল, কিন্তু নাড়াইতে পারল না) এতো দেখছি পাথরের চেয়েও বেশি ওজন! এখন উপায়?

    ওমর- হাঃ-হাঃ-হাঃ- জিয়াদ উপায় আর কি করবে? আর কতজনকে তুমি ঠকাইতে চাও স্বপ্ন বিবরণে প্রভু হোসেনকে প্রতাড়ণা ও বিশ্বসঘাতকতা করে হত্যা করেছ মদিনার বিখ্যাত বীর হজরত মোসলেমকে ষড়যন্ত্র করে নিধন করেছ তুমি বেইমান, তুমি বিশ্বাসঘাতকতোমার পাপের তরী এখন পূর্ণ হয়েছে তুমি আর বেশিদিন লোকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না

    জিয়াদ- হুঃ- বুঝেছি, বন্দী ওমর আলী, তোমারঅস্ত্রের ধার কমেছে ঠিকই, তবে তোমার মুখের ধার এখনও কমেনি আমি উপযুক্ত সৈনিক নিয়ে এসেছি। সেই সৈনিক এখনই তোমাকে ঐ শূলের নিকট নিয়ে যাবে

    ওমর- উপযুক্ত সৈনিক হলে অবশ্যই আমি পরাজয় স্বীকার করবো। তবে জেনে রেখ, জন্মমৃত্যু সবই খোদার হাতে!

    জিয়াদ- আরে মূর্খ! তোর জন্মমৃত্যু এখন খোদার হাতে নয়? তোর জন্মমৃত্যু এখন জাহাঁপনা এজিদের হাতে একমাত্র জাহাঁপনা এজিদ ছাড়া তোমাকে অন্য কেউ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না

    ওমর– জানি, বিশ্বাসঘাতক জিয়াদ সে কথা আর আমাকে স্মরণ করে দিতে হবে না। কিছুক্ষণ পরেই সে কথা তুমি নিজেই ভালোভাবে বুঝতে পারবে

    জিয়াদ- বাহরাম, এই বাচালের কথা মোটেই সহ্য হচ্ছে না। শীঘ্র একে শূলের নিকটে চলো

    বাহরাম- আপনার আদেশ শিরোধার্য জয় জাহাঁপনা এজিদের! (বাহরাম ওমর আলীকে ধরে শূন্যে তুলে বললেন)- হুকুম পেলেইএকটি আছাড়ে আমি এর অস্থি-চর্ম একাকার করে ফেলবো

    মারোয়ান-(বাধা দিয়া) বাহরামওমর আলীকে প্রাণে মের না। জাহাঁপনার আদেশ, ওমর আলীকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে হবে

     বাহরাম- ঠিক আছে, আমি একে প্রাণে মারব না

     (ওমর আলীকে বাহরাম শূন্য থেকে নামিয়ে নিজের বাম পার্শে দাঁড় করাইলেন)

    জিয়াদ- মন্ত্রীবর,  আমার ইচ্ছা,  যে পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ না হবেসে পর্যন্ত ওমর আলীকে ঐ শূলে বিদ্ধ করে টানিয়ে রাখা হোক

    মারোয়ান- তবে আমার ইচ্ছা তা নয়। কারণ মৃতদেহের সাথে কোনো শত্রুতা থাকতে নেই। আমাদের অভিপ্রায় হচ্ছেশত্রুদের প্রাণে মারামৃতদেহ প্রদর্শন করা নয় তবে আপনি যখন বলছেন, তখন আমি জাহাঁপনার অভিপ্রায় জেনে আসি সৈন্যগণ তোমরা ওমর আলীকে শূলের নিকট নিয়ে যাও

                                           (মারোয়ান প্রস্থান)

    জিয়াদ- বাহরাম! ওমর আলীর অন্তিম সময় উপস্থিত। যদি ওমর আলীর কোনো কথা বলবার থাকে তাহলে তা নিঃসঙ্কোচে বলতে পারবে

    বাহরাম- ওমর আলী! তোমার কি কোনো কথা বলবার আছে?

    ওমর- আমার বলবার তেমন কিছু নেই। কিন্তু মৃত্যুর সময়ে খোদা তায়ালার উপাসনা করার একান্ত ইচ্ছা ছিলো

    জিয়াদ- তোমার শেষ ইচ্ছা আমরা অপূর্ণ রাখব না বাহরাম ওমর আলীর হস্তের বন্ধন খুলে দাও! (বাহারাম ওমর আলীর বন্ধন খুলে দিলেন)

    ওমর- (নামাজের কায়দায় বসেহে খোদা! তুমি অনন্তঅসীমতুমি মহান তোমার মহিমার অন্ত নেই এবং তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি ইহজগতে কারও নেই তুমি আদম (আঃ) কে গোনা হতে মুক্ত করেছিলে, হজরত ইউসূফকে অন্ধকার কূপ হতে উদ্ধার করেছিলে এবং ইউনুস নবীকে মাছের উদর হতে উদ্ধার করেছিলে, হজরত ইব্রাহীমকে অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেছিলে, নূরনবী হজরত মহম্মদ মোস্তাফা(সাঃ)কে কাফেরদের নির্মম অত্যাচার হতে রক্ষা করেছিলে! হে মাবুদ, আমার শেষ প্রার্থনা বান্দার সর্বপ্রকার অপরাধ মার্জনা কর, খোদা। আমিন- আমিন সুম্মা-আমীন

         (ওমর আলী উঠে দাঁড়াইল ও বাহরাম ছদ্মবেশে খুলে ফেললো)

    বাহরাম- আহাম্মক জিয়াদ, তোমার বিশ্বাসঘাতকতার ফলভোগ করার সময় সমাগত আজ হজরত হোসেন ও হজরত মোসলেমের নির্মম হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হও। দেখ-দেখ, পাপিষ্ঠ জেয়াদ, আমি কেআমি অন্য কেউ নই। আমি স্বয়ং মসহাব কাক্কা শুধু ওমর আলীকে মুক্ত করার জন্য বাহরামের ছদ্মবেশ ধারণ করে তোর আশ্রয় গ্রহণ করেছি আমি কৌশলে ওমর আলীকে মুক্ত করে নিয়ে চললাম

     জিয়াদ- বিশ্বাসঘাতক, বেইমানআমার সাথে প্রবঞ্চনা?

    বাহরাম- হাঃ হাঃ হাঃ জেয়াদ। প্রবঞ্চকের সাথে প্রবঞ্চনা করাই তো সৃষ্টির নিয়ম তোকে আজ আমি সুযোগ মতো পেয়েছি-এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করব না এইবার তোর কৃতকর্মের ফলভোগ করার জন্য প্রস্তুত হ, শয়তান (বাহরাম জেয়াদকে অস্ত্রাঘাত করলেন। জিয়াদ ভূ-পতিত হলো)

    জিয়াদ-উঃ- আমার জীবন গেলো। আহঃ আমার আর সহ্য হচ্ছেনাউঃ-খোদা। আমায় মৃত্যু দাও খোদা- আমায় মৃত্যু দাও (টলতে টলতে জিয়াদ প্রস্থান)

    বাহরাম- এজিদএইবার তোমার নিস্তার নাই শীঘ্র শিবির থেকে বাহি হও বিলম্ব করছ কেনএইবার তোমার প্রিয় বন্ধু আব্দুল্লাহ জিয়াদের অন্তিম দৃশ্য একটিবারের জন্য নিজ চোখে দেখে যাও। দেখে যাও, আজ আমি কি কৌশলেতোমার প্রিয় বন্ধু পাপিষ্ঠ জিয়াদকে হত্যা করে ওমর আলীকে উদ্ধার করে নিয়ে চললাম। আমরা অন্য কেউ নইআমরা মহম্মদ হানিফার অনুগত দাস। হে মহম্মদীয় ভ্রাতৃগণ, আর বিলম্ব কেনএখন খোদার নাম স্মরণ করেজয়নাল আব্দীন উদ্ধারের জন্য ছুটে চলো যে পর্যন্ত এজিদের বন্দীগৃহ হতে জয়নাল আব্দীনকে উদ্ধার করতে না পারবসে পর্যন্ত আমরা তরবারি কোষবদ্ধ করব না ভাই ওমর আলী, শীঘ্র চলো—এক্ষুনি আমরা প্রভুর অনুমতি নিয়েএই বীর বেশেই এজিদের বন্দীগৃহে চলে যাবে।

    ওমর- উত্তম! তবেই চলুন ভাই। (উভয়ের প্রস্থান)

 

* * *

                     

                       তৃতীয় অংক                                পঞ্চম দৃশ্য

                                           - সমক্ষেত্র-

 

                      (দ্রুত এজিদ প্ররেশ)

    এজিদ- আশা ছিল কি- আর হলো কিকোথায় ওমর আলীর শূলবিদ্ধ শরীর  প্রত্যক্ষ করবো! তার পরিবর্তে আব্দুল্লাহ জিয়াদের খণ্ডিত দে আমাক দেখতে হলো। বাহরাম চক্রান্ত করেকৌশলে ওমর আলীকে মৃত্যুর কবল হতে উদ্ধার করে নিয়ে গেলো আর ঐ সঙ্গে বন্ধুবর জিয়াদকে হত্যা করে তাঁর খণ্ডিত মৃতদেহ আমাদের প্রদর্শনের জন্য রেখে গেলো না- নাকেন আমি এ সমস্ত চিন্তা করছি? আজই আমি র পূৰ্ণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। ওম আলীকে হত্যা করার জন্য যে শূল প্রস্তুত করা হয়েছিলো সেই শূল এমনই ভাবেই থাকবে। আমি আর কারো কথা শোনব না। জয়নাল আব্দীনকে বন্দীগৃহ হতে বের করে এনে ঐ শূল্য চড়ায়ে বধ করে প্রিয় বন্ধু আদুল্লাহ জেয়াদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবো।শত বাধা আসলেও আমি জয়নাল বধে ক্ষ্যান্ত হব না। আমি জগতবাসীকেমহম্মদ হানিফাকে এবং দামেস্ক নগরের নরনারীকে দেখাবোশূলে চড়ায়ে আমি জয়নাল আব্দীনকে হত্যা করতে পারি কিনামন্ত্রী মারোয়ান ও অলিদ, তোমরা এখনই ঢোলডগরের বাজনা সহিতনগরে নগরেসর্বক্ষেত্রেহানিফার শিবির প্রাঙ্গণে এবং বন্দীগৃহের সম্মুখে ঘোষণা করে দাও যেওমর আলীর জন্য যে শূল প্রস্তুত করা হয়েছিল সেই শূলে হানিফা ভাতুষ্পুত্র জয়নাল আব্দীনকে চড়ায়ে আগামী কাল জয়নাল বধ কার্য সমাধা করা হবে।

                    (মারোয়ান প্রবেশ)

    মারোয়ান- হানিফাএখনও তুমি ঘুমিয়ে রয়েছশীঘ্র জাগো- যার জন্য তুমি আম্মাজ নগর হতে দামেস্কে এসেছ- আজ নয়, কাল প্রত্যুষে তার জীবন লীলা শেষ করা হবে। এখন তুমি এজিদ বধ নয়, তোমার নিজের জীবন বাঁচাবার চেষ্টা করো। কেন তুমি বিলম্ব করছ? এখনও তোমার জীবন বাঁচাবার উপায় আছে। তুমি শীঘ্র জাহাঁপনা এজিদের বশ্যতা স্বীকার করে তাঁকে প্রভু বলে মান্য করো না হলে তোমার নিস্তার নেই। মহম্মদ হানিফাকেন তুমি শিবিরে বসে রয়েছশীঘ্র শিবির হতে বাহির হও চোখ মেলে চেয়ে দেখ, আজ যমদূত তোমার শিয়রে দাঁড়িয়ে!

                                            (সকলেই প্রস্থান)

 

               (মহম্মদ হানিফা ও গাজী রহমান প্রবেশ)

    হানিফা- যার জন্য এই মহাসংগ্রামআজ কয়েকদিন যাবত যার জন্য খাওয়া নেই- চোখে নিদ্রা নেইঅবিরাম সংগ্রাম করতে করতে দামেস্ক পর্যন্ত এলাম রাস্তায় আসতে কত শোণিত প্রবাহিত হলো, শত শত বীরের জীবন বিসর্জন হলো। তারপরও সেই জয়নাল আব্দীনের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো। আমার সকল আশা- সকল ভরসা ভষ্মে পরিণত হলো। কেনএত পূণ্যাত্মার জীবন বধ করলাম! ওমর আলীকে কেন কৌশলে উদ্ধার করে আনলাম। যার উদ্ধার হেতু আত্মীয়স্বজনবন্ধু-বান্ধব হারালাম। তার প্রাণ বধের সংবাদ শুনতে হলো! ওমর আলীর প্রাণ দিয়েও যদি বৎস জয়নাল আব্দীনকে উদ্ধার করতে পারতামতাহলেও আমার উদ্দেশ্যে সাফল্যমণ্ডিত হতো। আমার বুদ্ধির বিপর্যয়ে ভাতুষ্পুত্র জয়নাল আব্দীনকে হারাতে হলো! চিরহিতৈষী মন্ত্রী গাজী রহমান?

    গাজী- আদেশ করুন, জাহাঁপনা?

    হানিফা- আদেশ নয় ভাই। আদেশ নয় আদেশ প্রদানের শক্তি এখন আমার নাই, ভাই গাজী রহমান

    গাজী- এত বিহ্বল হচ্ছেন কেন, জাহাঁপনা? সঠিক সংবাদ পাওয়ার আগে আপনার এতো দুর্বল হওয়া সাজেনা, জাহাঁপনা। কারণ এজিদ ও মারোয়ানের কু-চক্রান্ত বুঝবার-শক্তি আমাদের নেই। তাঁরা কপট, মিথ্যাবাদী, শঠ প্রবঞ্চক আমাদের দুর্বল করার জন্য তাঁরা ভুল সংবাদও প্রচার করতে পারে আগে সঠিক খবর সংগ্রহ করি তারপর ব্যবস্থা গ্রহণ করব এখন ধৈর্য্য ধরুন, জাহাঁপনা

    হানিফা- কি করে ধৈর্য্য ধারণ করি ভাই, গাজী-রহমান তুমি খুঁজে নিয়ে দেখ, ওমর আলীমসহাব কাকা ও আক্কেল আলী কোথায়শীঘ্র তাঁদেরকে ডাকোতোমরা সকলে মিলে জয়নাল পরিজনকে এজিদের কারাগার হতে উদ্ধারের ব্যবস্থা কর

    গাজী- স্থির হোন, জাহাঁপনা! ধৈর্য ধারণ করুন। সত্যি যদি জয়নাল আব্দীন ইহজগতে নাইতাহলে আমরা আজই হোসেন পরিজনকে এজিদের কারাগার হতে উদ্ধার করবো। কোথায়-ভাই মসহাব কাকা,ওমর আলী, আক্কেল আলী তোমরা শীঘ্ৰ জাহাঁপনার সকাশে চলে এসো

           (দ্রুত মসহাব কাক্কা, ওমর আলী ও আক্কেল আলীর প্রবেশ)

    ওমর-কি জন্য আমাদের স্মরণ করছেন, মন্ত্রীবর?

    গাজী- বন্ধুগণ! ভেবেছিলাম, আজই যুদ্ধের শেষ জয়নাল আব্দীন ও তাঁর পরিজনকে উদ্ধার করে কয়েকদিনের মধ্যে আমরা স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করব কিন্তু শুনতে পাচ্ছি জয়নাল আব্দীনের জীবন বিপন্ন আব্দুল্লাহ জিয়াদের হত্যার পর ঢোল পিটিয়ে জয়নাল আব্দীনের বধের কথা প্রচার করা হচ্ছে তবে সঠিক সংবাদ কি তা এখনও আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি তাই কথাটা কতদূর সত্য তা জেনে আমাদের পরবর্তী কার্যপন্থা গ্রহণ করতে হবে যদি সত্যিই জয়নাল আব্দীনকে পাপিষ্ঠ এজিদ হত্যা করে থাকে, তাহলে আমরা আজই এজিদ বধ সমাপন করে হোসেন পরিজনকে উদ্ধার করব বলুন বন্ধুগণ, নারায়ে তাকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার-

    গাজী- নারায়ে তকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার-

    গাজী- জয় মহম্মদ হানিফার-

    সকলে- জয়-

                             (জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান)

 

পঞ্চম অংক                                 দ্বিতীয় দৃশ্য

-এজিদ শিবির-

(এজিদ প্রবেশ)

    এজিদ- ঐযে শত্রু সৈন্যের জয়ধ্বনি! যে দিকে তাকাই সেই দিকেই শুধু বাধা এই বাধা কীভাবে যে অতিক্রম করি?

                     (কাসেদের প্রবেশ)

        কাসেদ-বন্দেগী জাহাঁপনা

    এজিদ- কি সংবাদ, কাসেদ?

    কাসেদ-জাহাঁপনা। সংবাদ ভালো নয়। মহম্মদ হানিফা অজস্র সৈন্য নিয়েআমাদের শিবির অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে মন্ত্রীবর মারোয়ান শিবিরে নেই। যুদ্ধের কোনো আয়োজন নেই। আমাদের সৈন্যগণ সবাই আতংকিত ও দিশাহারা মন্ত্রীবর মারোয়ানের অনুপস্থিতিতে তাঁরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না

    এজিদ-হুঃ-বুঝেছি। তুমি এখন যাও- আমাকে ভাবতে দাও।

    কাসেদ- যথা আজ্ঞা জাহাঁপনা         (কাসেদ প্রস্থান)

                 (দ্রুত মারোয়ানের প্রবেশ)

    মারোয়ান- জাহাঁপনা! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে!

        এজিদ- সব শেষ হয়ে গেছেসে কি রকম?

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীন কারাগারে নেই, জাহাঁপনা

    এজিদ- জয়নাল আব্দীন কারাগারে নেই মানেকেনকারাগৃহে দ্বাররক্ষী ছিল না?

     মারোয়ান- ছিল জাহাঁপনা তবে আব্দুল্যাহ জিয়াদের হত্যার পর তারা ভয়ে অন্যত্র লুকিয়ে ছিলো

    এজিদ- হুঃ- বুঝেছি জয়নাল আব্দীনের সন্ধানে কেউ যায়নি?

    মারোয়ান- গেছে জাহাঁপনা সেনাপতি অলিদ গেছে তবে আমি সংবাদ নিয়ে জানতে পেরেছি, এখন পর্যন্ত জয়নাল আব্দীনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি

    এজিদ- তাহলে এখন উপায়?

    মারোয়ান- উপায় নেই বললেই চলে, জাহাঁপনা তবে এখন আসন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উপায় বের করতে হবে জাহাঁপনা, আপনি খুব সাবধানে থাকবেন কখন কি বিপদ হয় বলা যায় না জয়নাল বধের সংবাদ শুনে মহম্মদ হানিফা ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে তিনি যেকোনো মুহূর্তে প্রাসাদ আক্রমণ করতে পারে আপনি এখন গুপ্তকক্ষে গিয়ে লুকিয়ে থাকুনগে আমি এখন চললাম জয়নালের সন্ধানে                                                                                    (মারোয়ান প্রস্থান)

    এজিদ- যাও মন্ত্রীবর- যাও। শীঘ্র জয়নাল আব্দীনের সন্ধানে যাও জয়নালকে আমার চাই যেকোনো প্রকারেই হোক, জয়নালকে খুঁজে বের করতেই হবে। জয়নাল আব্দীনকে যদি এইবার পাইতাহলে তাঁকে আর জীবিত রাখবোনা। যে পর্যন্ত জয়নাল আব্দীনকে খুঁজে বের করেহত্যা করতে না পারবো, সে পর্যন্ত আমি আর যুদ্ধ করব না আমি আজ এই মুহূর্তে মহম্মদ হানিফার কাছে সন্ধির প্রস্তাব প্রেরণ করবো। এই কে আছিস?

                    (দ্রুত কাসেদ প্রবেশ)

    কাসেদ- বন্দেগী জাহাঁপনা

    এজিদ- তুমি অবিলম্বে মহম্মদ হানিফার শিবিরে গিয়ে বলবে- জাহাঁপনা এজিদ আর যুদ্ধ করবে না।তিনি সন্ধি করতে রাজি হয়েছেন। যাওসন্ধির নিশান উড়িয়ে শীঘ্র হানিফা শিবিরে চলে যাও

    কাসেদ- তবেই আমি যাচ্ছি, জাহাঁপনা! (কাসেদ প্রস্থান)

    এজিদ- একবার মহম্মদ হানিফা সন্ধি করতে রাজি হলেই হয়। সন্ধির সুযোগ নিয়ে আমি অতর্কিতে মহম্মদ হানিফার শিবির আক্রমণ করবো। তারপর মহম্মদ হানিফাকে বন্দী করে এনেওমর আলীর জন্য যে শূল নির্মাণ করা হয়েছিল সেই শূলে চড়াইয়ে তাঁকে হত্যা করব তারপর মক্কামদিনার সিংহাসনে বসে জয়নবকে নিকাহ করে আমি আমার মনস্কামনা পূর্ণ করবো হানিফা! এইবার তোমার নিস্তার নেই। সূর্য্যদেব যদি পূর্ব গগন থেকে পশ্চিম গগনে উদিত হয়তবুও তোমাকে কেউ ঐ শূলে হতে রক্ষা করতে পারবে না মহম্মদ হানিফা, তোমার মৃত্যু অনিবার্য্য

                                             (এজিদ প্রস্থান)

* * *

 

 

পঞ্চম অংক                            তৃতীয় দৃশ্য

-হানিফার শিবির প্রাঙ্গণ-

     (সৈন্য-সামন্ত সহ মহম্মদ হানিফা ও গাজী রহমানের প্রবেশ এবং পরে সাদা নিশান লইয়া এজিদের কাশেদের প্রবেশ)

   

    হানিফা- কে তুমি?

     কাসেদ- আমি এজিদের কাসেদ আমি সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছি, জাহাঁপনা

    হানিফা- রাখ- রাখ তোর সন্ধি (কাসেদকে আঘাত করিতে উদ্যত)

    গাজী- বোধা দিয়া) ক্ষ্যান্ত হোন, জাহাঁপনা! কাসেদ আপনার বধ্য নয় ও একজন সামান্য বেতনভোগী কর্মচারী ক্রোদ্ধে অধীর হয়ে রাজবিধি দলিত করবেন না, জাহাঁপনা। শীঘ্র অস্ত্র কোষাবদ্ধ করুন। আগে কাসেদের অভিপ্রায় শুনুন

    হানিফা-(অস্ত্র কোষাবদ্ধ করে) চির হিতৈষী গাজি রহমান। তুমি যথার্থই আমার বুদ্ধি ও বল ক্রোদ্ধেই লোকের মূর্খতা প্রকাশ পায়। শোন কাশেদ, তুমি তোমার অভিপ্রায় প্রকাশ কর

    কাসেদ– (কুর্নিশ করে) আমাদের জাহাঁপনা এজিদ জয়নাল আব্দীন বধ কার্য প্রত্যাহার করেছে এবং আপনার সঙ্গে বিনাযুদ্ধেই পরাজয় স্বীকার হেতু সন্ধি করতে সন্মত হয়েছে। আপনার অনুমতি পাওয়া মাত্র জাহাঁপনা এজিদ আপনার শিবিরে এসে আত্মসমর্পণ করবে।

    গাজী– শোন দূত, তোমাদের জাহাঁপনা এজিদকে বলবেযদি জয়নাল আব্দীনকে কোনোরূপ অন্যায় অত্যাচার না করা হয় এবং এজিদ যদি জয়নাল আব্দীনের প্রাণ রক্ষার জন্য রাজি হয়, তাহলে এজিদ  যতদিন যুদ্ধ বন্ধ রাখতে বলবেততদিন পর্যন্তই যুদ্ধ বন্ধ রাখবো। কিন্ত বিনাযুদ্ধে যদি এজিদ পরাজয় স্বীকার করে, তা আমরা কখনও মেনে নেব না রণক্ষেত্রে যখন তোমাদের অস্ত্রের তেজ কমবে, প্রাণের ভয়ে যখন তোমাদের সৈন্যগণ শৃগাল কুকুরের ন্যায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে থাকবে, মৃত দেহগুলো যখন রক্তস্রোতে ভাসবেঅর্ধমৃত সৈন্যরা যখন হাত-পা আছড়াতে থাকবেতখন আমরা বীরদর্পে জয়-পতাকা উড়ায়ে দামেস্কের কারাগার হতে জয়নাল আব্দীনকে উদ্ধার করব এবং জয়নাল আব্দীনকে দামেস্ক ও মক্কা-মদিনার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে তাঁর সন্মুখে দণ্ডায়মান হবো। তোমাদের মধ্য যদি কেও জীবিত থাকেসেও আমাদের অনুসরণ করে পবিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে পারবে আজ আমরা এজিদের অনুরোধ মর্মে যুদ্ধ বন্ধ রাখলাম শোন দূত, এ সমস্ত কথাতোমাদের জাহাঁপনা এজিদকে খুলে বলবে যাও দূত, তুমি এখন নির্ভয়ে তোমাদের শিবিরে চলে যাও

     কাসেদ- যথা আজ্ঞা মন্ত্রীবর(প্রস্থান)

    গাজী- চলুন সম্রাট, এখন আমরা শিবিরে চলে যাই

    হানিফ-উত্তম তাই চলো।

                                                                                                                                            (সকলেই প্রস্থান)

* * *

 

             পঞ্চম অংক                                  চতুর্থ দৃশ্য-

                                                -নির্জন পথ-

    (ছদ্মবেশে অলিদ প্রবেশ করে পদচালনা করতে থাকে একটু পরে মারোয়ান ছদ্মবেশে প্রবেশ করে জয়নালের অনুসন্ধান করে! অলিদ আড়াল থেকে মারোয়ানকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপের জন্য অগ্রসর হওয়া মাত্র মারোয়ান তা লক্ষ্য করে বলে-)

    মারোয়ান- অলিদ! এ তুমি কি করছো? তুমি তীর নিক্ষেপ কর না আমায় তুমি চিনতে পারনিআমি মন্ত্রী মারোয়ান!

    অলিদ- সেকি কথাতুমিই প্রধানমন্ত্রী মারোয়ানআমি ভেবেছিলুমতুমিই হবে আমাদের সেই পলাতক ব্যক্তি ভাগ্যিস কথা বলেছ,  তা নাহলে-

    মারোয়ান এখন এসব কথা ছেড়ে দিয়ে আমাদের বাঁচবার উপায় চিন্তা কর বর্তমান আমাদের সন্মুখে যে বিপদ খড়্গ তুলে ধেয়ে আসছেএতে একদিন আগপাছ আমাদের মৃত্যু অনিবার্য জাহাঁপনা এজিদেরও বাঁচাবারও উপায় দেখছি না এসব দুঃশ্চিন্তা আমার চোখের নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে

    অলিদ- দুঃশ্চিন্তা করে লাভ নেই, মন্ত্রীবরজয়নালকে খুঁজে বের করতে পারলেই আমরা বেঁচে যাব বর্তমান আমাদের একমাত্র লক্ষ্য জয়নালকে খুঁজে বের করা। তবে মন্ত্রীবর, যদি জয়নালকে খুঁজে নাপাইতাহলে আমাদের উপায়?

    মারোয়ান- তাহলে মৃত্যুর বাইরে আমাদের অন্য কোনো উপায় নেই, সেনাপতি এখন যুদ্ধ করতে হলেও জয়নাল আব্দীনের প্রয়োজন এবং সন্ধি করতে হলেও জয়নাল আব্দীনের প্রয়োজন চল ভাই অলিদ! আমরা চুপি চুপি মহম্মদ হানিফার-শিবিরে গিয়ে সন্ধান করে দেখি, জয়নাল আব্দীন সেখানে আছে কিনা?

    অলিদ- মন্ত্রীবর, আর এক পদও অগ্রসর হয়ো নাঐ দেখ, কে যেন এই দিকে আসতেছে?

    মারোয়ান- সত্যিতো। শীঘ্র এখানে বস পরআর কথা বল না নাহলে আমাদের বিপদ হতে পারে

                      (ছদ্মবেশে জয়নাল আব্দীনের প্রবেশ)

    জয়নাল-(অধীর কণ্ঠে) কে, কে  তোমরা? এই গভীর রাতে কে এখানে কথা বলতেছ?

    মারোয়ান- আমরা পথিক। পথ হারায়ে হঠাৎ এখানে এসে পরেছি!

    জয়নাল- এটা তো যুদ্ধক্ষেত্রতোমরা পথ হারায়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছো কেন? তোমরা কি বিদেশী?

    মারোয়ান- হ্যাঁ, আমরা বিদেশী। অজানা অচেনা দেশ। পথঘাট আমরা ভালোভাবে চিনি না। তাই এখানে এসে পরেছি আমরা বর্তমানে দামেস্ক রাজদরবারে চাকরির আশায় যাইতেছি। দিনের বেলা সৈন্যসামন্তের ভয়। সেজন্য রাত্রিযোগে দামেস্ক নগরে প্রবেশ করবো বলে পথে বের হয়েছি

    জয়নাল- একটু ফর্সা হলেই যেতে পারবে আচ্ছা! তোমরা কোথা হতে এসেছো?

     মারোয়ান- আমরা মদিনা হইতে এসেছি।

    জয়নাল- তোমরা মদিনাবাসীকিন্তু এটাতো একেবারেই অসম্ভব(আপন মনে) এরা নিশ্চয় এজিদের গুপ্তচর (প্রকাশ্যে) এ সময়ে কি এখানে কেউ নেই? যদি নিকটে কেউ আছ, তাহলে শীঘ্র এখানে চলে এসো

                      (তিনজন প্রহরীর প্রবেশ)

    প্রহরী- কে- কে তোমরাএ গভীর রাতে এই সমর প্রাঙ্গণে কেন?

    জয়নাল- আমরা পথিক! পথ হারায়ে এখানে এসে পরেছি

    প্রহরী- চুপ, আর একটি কথাও বলবে না। তোমাদের যা বলবার আছে কাল জাহাঁপনার নিকটে বলবে সৈন্যগণ বন্দী কর এদেরকে

    মারোয়ান- কেনআমাদেরকে বন্দী করছ কেনআমরাতো কোনো অপরাধ করিনি

              (প্রহরী 'তিনজনকে বন্দী করিল)

    প্রহরী- অন্যায় করেছ কিনা কাল প্রত্যুষেই তা বুঝতে পারবে এখন নিঃশব্দে আমাদের সাথে চলে এসো। নছেৎ, তোমাদের মহাবিপদ হবে। শীঘ্র চলো?

                                             (সকলের প্রস্থান)

* * *

 

     পঞ্চম অংক                          পঞ্চম দৃশ্য

-এজিদের প্রমোদকক্ষ-

( মদিরার বোতল হস্তে এজিদের প্রবেশ)

     

     

    এজিদ- (মদিরা পান) কেন, কেন হেরিলাম সেই অপরূপ রূপছিঃ- ছিঃ, সামানয রূপের মোহে মোহিত হয়ে কত জীবন বিনাশ করলাম!(মদ্যপান) আমি আজ হতে আর যুদ্ধ করব না আমি কুপথ ছেড়ে, সুপথে চলব শিমার মরেছে, ভালই হয়েছে। (হাতে তালি দিয়ে) মহাত্মা হোসেন আমার শত্রু! পাষান্ড শিমার, তুই তাঁর মস্তক ছেদন করলি কেন(মদ্যপান) যে ব্যক্তি টাকার লোভে মানুষের মস্তক কাটতে পারে- তার ধরে মস্তক থাকবে কেন? (মদ্যপান) আব্দুল্লাহ জেয়াদ মরেছে ভালই হয়েছে বিশ্বাসঘাতকের এমন শাস্তি হওয়াই উচিত। যেমন কর্ম তেমন ফল যেমন কুকুর, তেমন মুগুর! আগে করেছে- পরে তার ফল ভোগ করেছে! সে জাহান্নামে গেছে ভালই হয়েছে (মদ্যপান) সে বাহাদুরী করে শত্রুর হস্তের বন্ধন খুলে দিল কেন? (মদপান) আঃ- কেন আমি জয়নব রূপ নয়নে হেরিলামআব্দুল জব্বারকে কেন প্রতাড়ণা করলামযে আমাকে ভালবাসল নাযে আমার হস্তগত হয়েও আমার বশ্যতা স্বীকার করল নাআমার বসে এল নাতার জন্য আমি এতো কু-কাণ্ড করলাম কেন? (মদ্যপান) বুঝলামএজিদের ইহকালেও শান্তি নাই, আর পরকালেও নিস্তার নেই। কেন, আমি জয়নাল বধের হুকুম প্রচার করলামসেই হুকুম প্রচার করেইতো আজ আমি সর্বহারা! আমি অগ্নি প্রজ্বলিত করেছি সেই অগ্নি দুগুন বেগে জ্বলে উঠেছে হ্যাঁ বুঝেছি, সেই অগ্নিতে এজিদ জ্বলুক, পোরে মরুক, শাস্তিভোগ করুক আমি আর কারও কথা শোনব না আমার মন যা বলবে, আমি তাই করবো কোথায় সেনাপতি ওমর?

                (সেনাপতি ওমরের প্রবেশ)

    ওমর– আদেশ করুন, জাহাঁপনা।

    এজিদ- কি সংবাদ সেনাপতি?

    ওমর- জাহাঁপনা! মহম্মদ হানিফার শিবির হতে ঘোষণা হয়েছেযে গত রাতে তাঁর প্রহরীরা তিনজন লোককে বন্দী করেছে। আমাদের বন্দীগৃহে জয়নাল আব্দীন নেই। মন্ত্রী মারোয়ান ও সেনাপতি অলিদেরও কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না

    এজিদ– অন্যকে ঠকাতে গিয়েছিলো, এখন নিজেরাই ঠকেছে আচ্ছা সেনাপতি, তুমিই বলতোছল-চাতুরী করে কে কত দিন এ জগতের বুকে বেঁচে থাকতে পারেতাঁরা নিশ্চয় ছদ্মবেশে মহম্মদ হানিফার শিবিরে জয়নালের সন্ধানে ধরতে গিয়েছিলসেই সুযোগে মহম্মদ হানিফার লোকেরা তাঁদেরকে বন্দী করে নিয়ে গেছে।

    ওমর- জাহাঁপনা। এ সংবাদ আমাদের জন্য মহা দুঃশ্চিন্তা কারণ, জাহাঁপনা এখন আপনি এর উপায় বের করুন।

    এজিদ- ভয় কি সেনাপতিআমার নেশার শেষ এবং আমারও শেষ। তাই বলে দামেস্ক অধিপতি এজিদ যুদ্ধ ক্ষ্যান্ত দিবে না যাও,  এখনি যুদ্ধের নিশান উড়িয়ে দাও! আমি রাজাধিরাজ এজিদ আর তুমি সেনাপতি ওমর চিন্তা কি- ভয় কিআমরা দুজনেই আজ নব বলে বলীয়ান হয়ে আজ যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হব যে পর্যন্ত মহম্মদ হানিফাকে বন্দী করে আনতে না পারব, সে পর্যন্ত যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দেব না। যাও সেনপতি ওমর! সৈন্যদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বল গিয়ে। এখন আমি চললাম সমর সাজে সজ্জিত হতে                                          (এজিদ প্রস্থান)

    ওমর- যথা আজ্ঞা, জাহাঁপনা! আমি চললাম সৈন্যদের আপনার আদেশ জানিয়ে দিতে আমার মন বলছে, আজকের যুদ্ধই হয়তো আমার জীবনের শেষ যুদ্ধ হবে                                                                                                                (প্রস্থান)

* * *

 

পঞ্চম অংক                          ষষ্ঠ দৃশ্য

-মহম্মদ হানিফার বিচার কক্ষ-

 (মহম্মদ হানিফাগাজী রহমানমসহাব কাক্কাআক্কেল আলীতালেব আলীওমর আলী এবং বন্দী মারোয়ান ও অলিদকে লইয়া প্রহরীর প্রবেশ)

    হানিফা-মন্ত্রী গাজী রহমান, তোমাকে এই বন্দীগণের বক্তব্য শোনার জন্য আদেশ দিলুম

    গাজী- সম্রাটের আদেশ শিরোধার্য (অলিদের প্রতি) আপনি যেই হোন, সত্য পরিচয় দিন মিথ্যা বলবেন না কারণ মিথ্যা বলা মহাপাপ। মিথ্যার পরাজয় ও সত্যের জয় অনিবাৰ্য্য। আচ্ছা আপনি এখন বলুন- আমি মিথ্যা বলব না।

    অলিদ- আমি মিথ্যা বলব না, যা বলব সত্য বলব

    গাজী- শুনে সুখী হলাম। আচ্ছা, আপনি কোন ধর্মে দীক্ষিতকি উদ্দেশ্যে গভীর রাত্রিযোগে এখানে এসেছিলেনসত্য ঘটনা প্রকাশ করুন

    অলিদ- আমি পৌত্তলিক ধর্মে দীক্ষিত আমি জাহাঁপনা এজিদের প্রধান সেনাপতি অলিদ। শত্রু শিবির হতে গুপ্ত সংবাদ সন্ধানের জন্য এখানে এসেছিলাম ইহাই আমার সত্য পরিচয়। আমি ছদ্মবেশী। এই দেখুন, আমার প্রকৃত বেশ (ছদ্মবেশ উন্মোচন করল)

    গাজী- আপনার পরিচয় পেয়ে আমি তৃপ্তি লাভ করলাম। আচ্ছা, আপনার সঙ্গী দুজনের পরিচয় আপনি কিছু জানেন কি?

    অলিদ- মন্ত্রীবর! দুজনের একজনকে আমি খুব ভালভাবেই চিনি। দ্বিতীয় জনকে আমি চিনি না আমি আজ আপনাদের সম্মুখে সত্য স্বীকার করে আমার তরবারি রাখলাম। জীবনে আর কোনোদিন আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করব না।(হানিফার সন্মুখে তরবারি রাখিল)

    গাজী- আচ্ছা আপনি ঐখানে বসুন (মারোয়ানের প্রতি) এখন আপনার পরিচয় প্রকাশ করুন আপনি কোন ধর্মে দীক্ষিত এবং কেন এখানে এসেছিলেন?

    মারোয়ান- আমি নূর নবী মোহাম্মদের শিষ্য। চাকরির আশায় এখানে এসেছিলুম।

    গাজী- মিথ্যা বলা মহাপাপ! ধর্মমাত্রেই মিথ্যার বিরোধী।

    মারোয়ান- প্রাণ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলাও বিধি আছে।

    গাজী- তাহলে কি আপনি মিথ্যা বললেন?

    মারোয়ান- আমি মিথ্যা বলিনি। বিধি আছে তাই বললাম।

    গাজী- সেকি কথাতবে অলিদ যে পরিচয় দিয়েছে, সেকি মিথ্যা কথা বলেছে?

    মারোয়ান- অলিদ যে সত্য কথা বলেছে- তা আপনার বিশ্বাস হলো কি করে?

    গাজী- সত্য-মিথ্যার প্রমাণ আমি এখনই দেখাতে পারি। কিন্তু এর জন্য তৃতীয় বন্দীর পরিচয় আবশ্যক প্রহরী, এই বন্দীর বসন খুলে ফেল? (প্রহরী মারোয়ানের বসন খুলে ফেললো)

    সকলে- মারোয়ান! এতো দেখছি মারোয়ান?

    গাজী- ক্ষান্ত হোন আপনারা। মারোয়ান! একি ঘৃণার কথাজাহাঁপনা এজিদের প্রধান মন্ত্রীর একি দুর্দশামারোয়ান, তোমার মনোবৃত্তি এতো নীচতুমিই না এজিদের প্রধান মন্ত্রীযাহোকতোমাকে এখন আর কিছুই বলব না। হ্যাঁতুমি ঐখানে বস প্রহরী, এখন তৃতীয় বন্দীকে হাজির কর

         প্রহরী জয়নাল আব্দীনকে লইয়া প্রবেশ

    গাজী- (জয়নালকে উদ্দেশ্য করে) আচ্ছাআপনি আপনার পরিচয় বলুন?   জয়নাল-সমস্ত মুরব্বীগণ! আপনাদের প্রতি আমার শতকোটি সালাম জানিয়ে বলতেছিপ্রথমে আমার একটি অনুরোধ রক্ষা করতে হবে

    গাজী- বলুন, আপনার কি অনুরোধ?

    জয়নাল- আমার সঙ্গে যারা বন্দী তাঁদেরকে আমার দেখতে ইচ্ছা?

    গাজী- (অলিদকে দেখাইয়া) এই দেখুন, এই সেই বন্দীদের একজন।

    জয়নাল একে আমি ভালরূপেই চিনি- এ সেই পাপিষ্ঠ এজিদের প্রধান সেনাপতি অলিদ। এখন দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দেখতে ইচ্ছা?

    গাজী-(মারোয়ানকে দেখাইয়া) এই দেখুন দ্বিতীয় বন্দী।

    জয়নাল- ওরে পামর, আমি তোকে রাতেই চিনেছিলুম। কিন্তু আমার হস্তে অস্ত্র ছিল না বলে তখন কিছুই করতে পারিনি

    মারোয়ান- আমার হস্তে অস্ত্র থাকতেই বা কি করলাম?

    জয়নাল-সভাস্থ মুরববব্বী ও বন্ধুগণ, আমার পরিচয় আমি পরেই দিবো। কিন্তু এই পাপিষ্ঠের পরিচয় না দিয়ে আমি স্থির থাকতে পারছি না। (মারোয়ানের দিকে ইঙ্গিত করে) এই নরাধম এজিদ পক্ষ হতে মক্কা ও মদিনার কর চেয়ে পাঠিয়েছিল এই পামর ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে বিনা কারণে যুদ্ধ ঘোষণা করে সহস্র সৈন্যসহ মদিনায় গিয়েছিলো এই পাপিষ্ঠ মহাত্মা হাসানের সাথে যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ময়মনা কূটনীর সহযোগেহীরক চূর্ণ বিষ দ্বারা মহাত্মা হাসানের প্রাণ বিনাশ করেছে। এই দুরাচারই ষড়যন্ত্র করে কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জেয়াদকে টাকায় বশীভূত করে মিথ্যা ছলনায় আরবের শ্রেষ্ঠ বীর মোসলেমের জীবন নাশ করেছে। এই পাতকী কারবালা প্রান্তরে মহাসংগ্রাম ঘটিয়েছিল। কৌশলে লক্ষাধিক সৈন্য দ্বারা ফোরাৎকুল আবদ্ধ করেশিশু সন্তানের প্রাণ নাশ করেছে। মর্মান্তিক তীর দ্বারা দুগ্ধপোষ্য বালকের বক্ষ ভেদ করেছে। এই পাপাত্মার চক্রান্তে অন্যায় যুদ্ধে-মহাবীর আব্দুল ওহাব এবং বৃদ্ধ উজির আব্দুর রহমানের জীবন লীলার অবসান ঘটিয়েছে। এই পাপাত্মার বুদ্ধিকৌশলে হাসান নন্দন কাশেম এবং আলি আকবরের-জীবন নাশ হয়েছে! আর কত বলব! এই নরাধম নারকীর কু-কীৰ্ত্তি সহ্য করতে না পেরেহোসেন তনয় সখিনা আত্মহত্যা করেছে। সভাস্থ মুব্বীগণ! এই নরাধমের কথা বলতে গেলে প্রাণ বিদরীয়া যায়- জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় কলিজা দগ্ধ হয়ে যায়। এই মহাপাপিষ্ঠের চক্রান্তে আমার মাতৃগণ এবং অন্যান্য বিবিগণ এজিদের কারাগারে বন্দীনি। এই জাহান্নামী কাফের মারোয়ানই আমার পূণ্যাত্মা পিতৃ মহাত্মা হজরত হোসেনের জীবন নাশ করেছে!

    হানিফা- জয়নাল! তুমি আমার বক্ষে এসো, বৎস! তুমি আমার দগ্ধপ্রাণ শীতল কর। বৎস জয়নাল, তুমিই আমাদের ইমাম বংশের শিরোমণি! তুমিই আজ হতে মক্কামদিনা ও দামেস্কের শাসক। বৎস জয়নাল, তোমাকে আজই এই শুভক্ষণে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে মহাত্মা হাসান ও হোসেনের শোচনীয় মৃত্যুশোক দূর করবোসভাসদগণ, আজ হতে জয়নাল আব্দীন মক্কামদিনা ও দামেস্কের অধিপতি। সকলেই বলুন - নারায়ে তাকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার!

    হানিফা- জয় শাহেনশাহ জয়নাল আব্দীনের

    সকলে-"জয়"

    হানিফা-বৎস জয়নাল! তুমি এখন অলিদ ও মারোয়ানের সম্বন্ধে যে বিচার করবেআমরা সকলেই তা অবনত মস্তকে মেনে নেবো। আর কাল বিলম্ব না করেএদের বিচারকার্য শীঘ্র সমাধা করো

    জয়নাল- আপনার আদেশ শিরোধার্য্। অলিদা! তোমার কিছু বলবা আছে?

    অলিদ- আমার বলবার অবশ্যে তেমন কিছু নেই। শুধু আমার এইটুকু অনুরোধযদি দয়া করে আমাকে পরিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতেন তাহলে আমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারতাম আমি জীবনে আপনাদের প্রতি এবং আপনাদের বংশের প্রতি অনেক অন্যায়-অত্যাচার করেছিআজ আমি মুক্তকন্ঠে ঘোষণা করছিজীবনে আর আমি আপনাদের প্রতি কোনো অত্যাচার করব না। আপনি যা আদেশ করবেন, আমি তা অবনত মস্তকে পালন করবো। হে মহান সম্রাট! আমার জীবনে যত প্রকার অন্যায়-অত্যাচার করেছি সকলই আপনি দয়া করে ক্ষমা করুন।ইহাই আমার শেষ অনুরোধ! আজ হতে আমি আপনার দাস হয়ে থাকবো?

    জয়নাল- (অলিদের হস্ত ধারণ করে) আজ আমি তোমাকে পবিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করলাম। বল, লা ইলাহা-ইল্লাল্লা মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। তুমি আজ হতে পবিত্র মুসলমান। তোমার পূর্বের সকল অপরাধ আমি মার্জনা করলাম তোমার আর কোনো চিন্তা নেই।(সভাস্থদের প্রতি লক্ষ্য করে) (হে আমার মূরব্বী ও বন্ধু-বান্ধবগণ! আপনারা সকলেই চতুর্দিক হতে অস্ত্রাঘাত ও তীর বর্ষণ করে মারোয়ানকে হত্যা করুন। আর অপেক্ষা করতেছেন কেনএই পাপিষ্ঠ দূরাচারমিথ্যাবাদীপ্রবঞ্চক এতোদিন জগতবাসীকে কাঁদিয়েছে! আজ এর পাপ রক্তে সকল দুঃখ ধুয়েমুছে যাক সকলে তীর বর্ষণ ও অস্ত্রচালনা করুন।

    (সকলে মার-মার বলে চতুর্দিক হতে তীর বর্ষণ ও অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিল।)

    মারোয়ান- জয়নাল আব্দীন, আমার পাপের উপযুক্ত শাস্তিই হলো। আমি সম্মুখে একটি ভয়ংকর মূর্ত্তি প্রত্যক্ষ করতেছি, সেই মূর্ত্তির হাত হতে তুমি আমায় রক্ষা করো, জয়নাল আব্দীন!

    জয়নাল- তোমাকে রক্ষা করবার ক্ষমতা আমার নেই। তুমি সৃষ্টিকৰ্ত্তার নাম স্মরণ কর তিনি ভিন্ন অন্য কারো রক্ষা করার ক্ষমতা নেই।

     মারোয়ান- হে বন্ধুগণ! তোমরা আমাকে আর অস্ত্রাঘাত করোনা। আমি আজ সত্য পরিচয় দিচ্ছি। আমি দামেস্করাজ মহারাজ এজিদের প্রধান মন্ত্রী মারেয়ান হে ঈশ্বর! আমার কৃতর্মের শাস্তি যথেষ্ট হয়েছে। তুমি আমায় ক্ষমা কর, প্রভু। তুমি আমায় ক্ষমা কর তুমি আমায় মৃত্যু দাও, প্রভু তুমি আমায় মৃত্যু দাও- (মৃত্যু)

    মসহাব- জয় শাহেনশাহ জয়নাল আব্দীনের-

    সকলে- জয়

    মাসহাব- জয় মহম্মদ হানিফার-

    সকলে- জয় !!!

    মসহাব নারায়ে তাকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার-

    জয়নাল- চাচাজান?

    হানিফ তোমার কোনো ভয় নেই, বৎস জয়নাল। আমরা এখনই তোমার মাতৃগণকে এজিদের কারাগার মুক্ত করার জন্য যাত্রা করবো

    অলিদ- আর বিলম্ব কেনআমি আজ ইসলামী তরবারি ধারণ করলাম। যে পর্য্যন্ত মহাপাপিষ্ঠ এজিদের জীবন লীলা শেষ করতে না পারবো, সে পর্যন্ত আমার এই তরবারি ক্ষ্যান্ত হবে না আপনারা সবাই বলুন- নারায়ে তাকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার-

     অলিদ- জয় শাহেনশাহ জয়নাল আব্দীনর-

    সকলে- জয়-

     হানিফা- এখন আপনারা সকলেই নিজা নিজা তরবারি ধারণ করুন। তারপর প্রথমে পবিত্র খোদা তায়ালার ও ভবপারের কাণ্ডারী নূরনবী(সাঃ)এর নাম জপ করে এজিদের বন্দীগৃহের দিকে যাত্রা করুন প্রথমে আমাদের পরিজনকে উদ্ধার করবো। তারপর এজিদ বধকার্য্য সমাপ্ত করব এজিদ বধকার্য সমাপ্ত না করে আমরা অস্ত্র ত্যাগ করব না আজ হতে আমি ভূপতি জয়নাল আব্দীনের আজ্ঞাবহ এবং আপনাদের সঙ্গী মাত্র। আমি ধর্মতঃ প্রতিজ্ঞা করে বলতেছিএজিদ বধকার্য সাফল্যমণ্ডিত না করা পর্য্যন্ত আমরা যুদ্ধের বেশ ত্যাগ করব না। সকলে বলুন, নরায়ে তাকবীর-

    সকলে- আল্লাহু আকবার-

    হানিফা জয় জয়নাল আব্দীনের-

    সকলে- জয়-

    হানিফা- জয় নব ভূপতি জয়নাল আব্দীনের-

    সকলে- জয় !!

                 -উদ্ধার পর্ব যবনিকা-

* * *

 

 

                      প্রতিশোধ পর্ব

প্রথম অঙ্ক                            প্রথম দৃশ্য

এজিদের প্রাসাদ

(এজিদ ও সৈন্যসহ ওমরের প্রবেশ)

    এজিদ- সেনাপতি ওমর! এখন উপায়? মন্ত্রী মারোয়ান নেইসেনাপতি অলিদ ও বিপক্ষ দলে যোগ গিয়েছে। এখন আমাদের কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত?

    ওমর-জাহাঁপনা! এখন আমাদের বাঁচবার তেমন কোনো উপায়ই দেখছি না। এখন আমাদের মাত্র কয়েকজন সৈন্য অবশিষ্ট আছে। এরাও বর্তমানে দুর্বল হয়ে পরেছে। এসময়ে মহম্মদ হানিফার নিকট আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখতেছিনা, জাহাঁপনা

                 (দ্রুত বেগে ভয়াতুর কাসেদের প্রবেশ)

    কাসেদ- জাহাঁপনা। মহম্মদ হানিফা রাজধানী আক্রমণ করতে স্বসৈন্যে অগ্রসর হচ্ছে। শীঘ্র শত্রুপক্ষের গতিরোধ না করলে দামেস্ক রক্ষা করা সম্ভব হবেনা, জাহাঁপনা

    এজিদ–(ক্রোধে) করুক আক্রমণ তারজন্য এজিদ ভীত নয়। যাও, এস্থান হতে শীঘর প্রস্থান কর। তোমাকে আর সংবাদ নিয়ে আসতে হবে না। আমি এখন স্বচক্ষেই সব দেখতে পারবো। সেনাপতি ওমর! এখন মহম্মদ হানিফাকে বন্দী করার জন্য কোথাও যেতে হবেনা সে স্বইচ্ছায় আমাদের হাতের মুঠোর মধ্য এসে পৌঁছেছে। এখনি আমরা মহম্মদ হানিফাকে বন্দী করে এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করে হত্যা করবো।

    ওমর- সে আশা দুরাশা, জাহাঁপনা এখন আমাদের যুদ্ধে গেলেও বিপদআর না গেলেও বিপদ। আমার মতেএখান থেকে এখন পালিয়ে যাওয়াই উচিত হবে, জাহাঁপনা। নছেৎআর বাঁচবার কোনো উপায় দেখছিনা।

    এজিদ- কি বললেআমি পালাবো?

    ওমর- পালানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই, জাহাঁপনা সম্মুখে আমাদের মহাবিপদ।

    এজিদ- সেনাপতি ওমর! এত ভয় পাচ্ছ কেনকোনো ভয় নেই। আমি স্বয়ং আজ মহম্মদ হানিফার দর্পচূর্ণ করতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাব

    ওমর- তাই চলুন, জাহাঁপনা                       (উভয়ে প্রস্থান)

* * *

 

প্রথম অঙ্ক                            দ্বিতীয় দৃশ্য

-রণভূমি-

(তরবারি হস্তে গাজী রহমান ও সৈন্যসহ অলিদের প্রবেশ)

    গাজী- অলিদ। অদ্যকার যুদ্ধের ভার আমি তোমার ওপর অর্পণ করলাম। শুনেছি, আজ স্বয়ং এজিদ যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেছে। সেজন্য তুমি তোমার পূর্বের প্রভুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হও। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তুমি যুদ্ধ করতে করতে যখন অবসন্ন হয়ে পরবেতখন আমরা তোমাকে সহায় করবো এই ধর, আমাদের ইসলামী তরবারি (তরবারি প্রদান) । শোন অলিদ, তুমি এজিদের প্রতি তুমি অস্ত্র নিক্ষেপ করো না। কারণ এজিদ সম্বন্ধে ভালমন্দ বিবেচনা করবে আমাদের সম্রাট মহম্মদ হানিফা। এজিদ রণক্ষেত্রে আসা মাত্রেই আমরা ছুটে এসে তোমাকে সহায়তা করবোযাও ভাইসৃষ্টি কৰ্তার নাম স্মরণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হও। (গাজী রহমান প্রস্থান)

     অলিদ- পাপিষ্ঠ কাফের এজিদঅদ্যকার যুদ্ধে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হও। আর বিলম্ব কেনশীঘ্র চলে এসো। তুমি এখনও শিবিরে নিশ্চিন্তে বসে রয়েছ কেনআজ তোমার আর রক্ষা হবে না। এসো, শীঘ্র চলে এসো। জীবন ভর যে পাপ করেছআজ তার প্রায়শ্চিত্ত করতে রণক্ষেত্রে চলে এসো বল সৈন্যগণ, জয় শাহেনশাহ জয়নাল আব্দীনের 

    সৈন্যগণ- জয়-

     অলিদ-জয় সম্রাট মহম্মদ হানিফার-

     সৈন্যগণ- জয়

                  (সেনাপতি ওমরের প্রবেশ)

    ওমর- অলিদ, তুমি এতো নিমখ হারাম? রাত্রিযোগে শিবির হতে বাহির হয়েশত্রুদলে মিশে গেছপ্রভাত হতে না হতেই আশ্রয়দাতাপালন কর্তা তোমার প্রভুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করছধিক, শতধিক তোমার অস্ত্রেধিক তোমার বীরত্বে?

    অলিদ- ভ্রাতা! ক্রোধে অধীর হয়ে নীচত্ব প্রকাশ করোনাযথার্থ তত্ত্ব না জেনে কটূ বাক্যও প্রয়োগ কর না। ধীর-সুস্থিরে কথা বল।

    ওমর- তোমার সঙ্গে কথা বলার প্রবৃত্তি আমার নাই, প্রবঞ্চকতুমি বিশ্বাসঘাতকতুমি নিমখহারামতুমি বীর কুলের কলঙ্ক

    অলিদ- আমি বিশ্বাসঘাতক বীরকূলের কলঙ্ক, নিমখহারাম নই মারোয়ানের সাথে আমি বন্দী হয়েছিলাম পরাজয় স্বীকার করে, আত্মসমর্পণ করে সত্যধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছি তোমাকে আমি গালাগাল দিব না তোমার কার্য তুমি কর, আমার কার্য আমি করি

                     এজিদের প্রবেশ

    এজিদ- সেনাপতি ওমর! এই নিমখহারাম, কুলাঙ্গার, বিশ্বাসঘাতককে শীঘ্র হত্যা কর বাঃ কি চমৎকার! এতোদিন এতো যত্ন করলাম, পদোন্নিত করলাম, কত অর্থ সাহায্য করলাম, আর শেষে এভাবে তার প্রতিদান দিলে?

    অলিদ- আমি নিমখহারামী করিনি, জাহাঁপনা অর্থের লোভে বশীভূত হয়ে কোনো শত্রুদলে মিশিনি শুধু পরকালের মুক্তির জন্য আমি কাফের বধে অস্ত্র ধরেছি

    এজিদ- সেনাপতি ওমর, এখনও অলিদের শির ভূ-লুণ্ঠিত হলোনা কেনআক্রমণ করহত্যা করো, এই বিশ্বাসঘাতককে।

    অলিদ- কর, হত্যা কর হত্যার জন্য আমি প্রস্তুত হয়েই আছি! চিন্তা করবেন না জাহাঁপনা, আমি আপনার প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করব না। মহম্মদ হানিফার নিষেধ আছে স্বয়ং মহম্মদ হানিফা আজকের যুদ্ধের সেনাপতি

    এজিদ- ওরে মূর্খ! একরাত্রি মূর্খদলের সহবাসে থেকেই তোর হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে। স্বয়ং রাজা আজ যুদ্ধের সেনাপতি? আমরা কোন মূর্খের স্বর্গে বাস করছি?

     অলিদ- আমি মূর্খ নই, জাহাঁপনা সম্রাট নিজে সেনাপতি পদ গ্রহণ করেন না তা আমি ভাল ভাবেই জানি। মহম্মদ হানিফা তাঁর রাজ্যের বাদশাহ তিনি মদিনার কে?

     এজিদ- মদিনায় আবার কোন রাজার আবির্ভাব হলো?

    অলিদ- যিনি মদিনার বাদশাহতিনি দামেস্কেরও বাদশাহ। তিনিই সমগ্র মুসলমানের বাদশাহ যার শিরে রাজমুকুট শোভা পাওয়ার কথা আজ রাজমুকুট তাঁরই শিরে শোভা পাইতেছে!

    এজিদ– অলিদ, তোমার বুদ্ধি এরূপ নাহলেতুমি ভিক্ষারীর ধর্ম গ্রহণ করবে কেন?

    অলিদ- ধর্মের সঙ্গে হাসি তামসা কেনআপনার জ্ঞান থাকলেআজ আপনি হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন না। আপনি মন্ত্রীহারাজ্ঞান হারাআত্মহারা হয়েছেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আপনি রাজ্য হারা হবেন! বলুন, আজকের যুদ্ধে আপনার স্বার্থ কি?

    এজিদ- আমার স্বার্থ হানিফার জীবন নাশজয়নাল আন্দীনের বন্দী এবং মদিনার সিংহাসন

    অলিদ- খোদার ইচ্ছায় আপনার সকল স্বার্থই অন্তরে চাঁপা থাকবে। বলুনতো, জয়নাল আব্দীনকে আপনি কীভাবেকিপ্রকারে বধ করবেন?

    এজিদ-কেনবন্দীর প্রাণবধ করতে অসুবিধা কি?

    অলিদ- তাহলে রাতের কথা বুঝি আপনার মনে নেই? থাকবেই কেন?

    এজিদ- হাঃ-হাঃ,হাঃ- মনে থাকবে না কেন? জয়নাল আব্দীন বন্দীগৃহ হতে পালিয়েছে। বন্দীগৃহ থেকে পালালেও সে তো আমার রাজ্যেই রয়েছে- যাবে কোথায়?

    অলিদ- যেখানে যাবারতিনি সেখানেই গিয়েছেন। ঐ শুনুনকার জয় ঘোষণা করতেছে?

    এজিদ- জয়নাল কি মহম্মদ হানিফার দলে মিশেছে?

    অলিদ-আপনি নিজেই বিবেচনা করুন, কার দলে মিশতে পারে। আরও ভালভাবে কান পেতে শুনুন কাহার জয়ধ্বনি ঘোষণা করতেছে।

    এজিদ- অলিদ। তুমি আমার চিরকালের অনুগত। তুমি শীঘ্র আমার দলে এসে হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয় লাভ করো। আমি তোমাকে দামেস্কে সাম্রাজ্যের প্রধান মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত করবো।

    অলিদ- ও কথা বলে এখন আর লাভ হবে না, জাহাঁপনা আপনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করুননা হয় এখান থেকে পালিয়ে যান আমি আজ জয়নাল আব্দীনের দাস। মহম্মদ হানিফার আজ্ঞাবহ সৈনিক। ঐ দেখুন, আপনার মন্ত্রী মারোয়ানের দেহ শত শত খণ্ডে বর্শার অগ্রভাগে বিদ্ধ হয়ে কি বিকট রূপ ধারণ করেছে

    এজিদ- নিমখহারাম কমবক্ত বেতমিজ আমার সঙ্গে তামশাএই এখনই আমি তোর কথা বলবার পথ বন্ধ করে দিচ্ছি। নিমখহারাম- বেইমান-

    (এজিদ ও অলিদের যুদ্ধ এজিদের অস্ত্রঘাতে আহত হয়ে অলিদ ভূপতিত এবং মৃত্যু)

     (হানিফা, মসহাব কাক্কা জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি করে প্রবেশ হানিফাকে দেখে এজিদ ও ওমরের পলায়ন)

              (সাথে সাথে সৈন্যসহ ওমর আলীর প্রবেশ)

    ওমর আলী- এজিদ। ঐদিকে কেনমহম্মদ হানিফার দিকে যাও। সেদিনও দেখেছ, আজও বলছিআমি তোমার ওপর অস্ত্র নিক্ষেপ করব না তোমার শোণিতে রঞ্জিত হবে শুধু হানিফার তরবারি। চিন্তা কর না, আমি তোমার পাশ্চাদধাবন করব না। আমি এখন চললাম তোমার সৈন্য নিধন করতে জয় জয়নাল আব্দীনের-

    সৈন্যগণ- জয়-

    ওমর-জয় নব ভূপতির জয়নাল আব্দীনের-

    সৈন্যগণ- জয়

                                                                                                                        (সকলের প্রস্থান)

* * *

                                প্রথম অংক                          তৃতীয় দৃশ্য

                                           -দামেস্ক রাজসিংহাসন-

        (গাজী রহমানজয়নালমসহাব কাকা, আক্কেল আলিসৈন্যগণের প্রবেশ)

        জয়নালকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে গাজী রহমান বলতে লাগলেন।

    গাজি রহমান- (সিংহাসন চুম্বন করে) মহামান্য ভূপতিগণ! রাজন্যবর্গমাননীয় প্রধান প্রধান সৈন্যাধক্ষ্যগণসৈন্যগণএবং সভাস্থ বন্ধুগণ। দয়াময় ঈশ্বরের কৃপায় আপনাদের বলবিক্রমের জন্য আজ জগতে অপূর্ব কীৰ্ত্তি স্থাপিত হলো। ধর্মের জয়- অধর্মের ক্ষয়।তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অংকিত হলো। এই দামেস্ক সিংহাসনে আজ যে ভূপতিকে উপবেশন করার অধিকার দিয়েছ, তা হলো এই নব ভূপতির পৈতৃক সিংহাসন মহাত্মা মাবিয়া যে কারণে এজিদের প্রতি বিরক্ত হয়ে যাদের রাজ্য তাঁদেরকে পুনরায় ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু এজিদ প্রবঞ্চনা করে মহামান্য হাসান ও হোসেনকে রাজসিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে নিজের অধীনে রেখেছিলেন, সেকথা কারও অবিদিত নয় এজিদ ইমাম বংশ ধ্বংস করে নির্বিবাদে দামেস্ক রাজসিংহাসন ভোগ করার জন্য অগ্রসর হয়েছিলো আজ এজিদের সে স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়েছে এখন জয়নাল আব্দীনের বিজয় ঘোষণা করতে করতে বন্দীগৃহ হতে ইমাম পরিজনদেরকে  উদ্ধার করাই হবে আমাদের প্রধান কৰ্তব্য বলুন সকলে, জয় জয়নাল আব্দীনের-

    সকলে- জয়-

    গাজী- জয় নব ভূপতির-

    সকলে- জয়-

    গাজী- জয় মহম্মদ হানিফার-

    সকলে- জয়-

                                                                                                     (সকলের প্রস্থান)

* * *

প্রথম অংক                          চতুর্থ দৃশ্য

-দামেস্ক বন্দীগৃহ-

(জয়নবশহরভানুসালমা ও অন্যান্য পরিজনের প্রবেশ)

    জয়নব- দয়াময় খোদা। তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি কারও নেই কোথা হতে কোথায় এসেছি, আবার কোথায় যেতে হবে শুনেছি, আম্বাজ অধিপতি দামেস্ক নগরের সীমান্তে সসৈন্যে প্রবেশ করেছে এজিদের সঙ্গে তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছে। হায় খোদা। এখন ইমাম বংশের একমাত্র ভরসা জয়নাল আব্দীন। একি শুনতেছি। ঐ কে যেন জয়নাল আব্দীনের বিজয় ঘোষণা করতেছে তবে কি- তবে কি জয়নাল আব্দীন মুক্তি পেয়েছে? সত্যিই তো জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি। এতো কোলাহল কিসের জন্যতবে এ জয়ধ্বনি কার জন্যতোমরাও কি জয়ধ্বনি শুনতেছ বোন?

    সহরভানু- সত্যিই তো জয়ধ্বনি শুনতেছি এ জয়ধ্বনি কর্ণে প্রবেশ করা মাত্র আমার প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠলো কেনএযে নব ভূপতির জয়ধ্বনি শুনতেছিজয়নালই কি এই নব ভূপতিজয়নাল আব্দীনের কথা মনে পড়ামাত্র আমার সর্বশরীর শীতল হয়ে উঠল কেন? জয়নাল, বাপ আমার কোথায় তুই? আমার কোলে আয় বাবা (কাঁদতে লাগলেন)

    জয়নব- হায় খোদা! আমার জন্যই প্রভু পরিবারের এই দুর্দশা এজিদের বিবাহের প্রস্তাবে সন্মত হলে, মদিনার সিংহাসন কখনও শূন্য হতো না জায়েদার হস্তে মহাবিষ উঠত না সখিনাকেও সদ্য বৈধব্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হত না মহাত্মা হোসেনের মস্তকও বর্শা অগ্রে বিদ্ধ হয়ে শিমার হস্তে দামেস্ক আসত না আজর ব্রাহ্মণও স্বহস্তে তিনটি সন্তান বধ করতেন না সকল অনর্থের কারণ এই হতভাগিনী শুনেছি, শিমারের প্রাণ, মদিনা প্রান্তরে সপ্তবীরের তীরের আঘাতে বের হয়েছে আম্বাজ অধিপতি দামেস্ক নগরের প্রান্ত সীমায় উপস্থিত ইমাম বংশের মহাবীর নরপতিগণ সৈন্যসহ এসে এজিদের সঙ্গে তমুল সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে হায় খোদা! কারবালা প্রান্তরে সর্বস্ব হারালাম দামেস্কে এসে হারালাম ইমাম বংশের একমাত্র ভরসা জয়নাল আব্দীনকে একি! কে যেন জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি ঘোষণা করতেছে তবে কি- তবে কি জয়নাল আব্দীন মুক্তি পেয়েছ?

    সহরভানু- মুক্তি! আমাদের জয়নাল আব্দীন মুক্তি পাবেকে দিবে মুক্তি? এজিদ? না আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা নেপথ্যে জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি) একি, সত্যিই তো জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি আজ এতো কোলাহল কেন? কিসেরই বা বাজনার ধূমধাম! কিসেরই বা জয় নিনাদ? (নেপথ্য জয়নাল মা-মা বলে ডাকতে লাগলো) ঐযে কে যেন আকুল কণ্ঠে মা-মা বলে ডাকতেছেওরে কে তুই আমায় মা-মা বলে ডাকছিস? সত্যিইতো জয়নাল আব্দীনের কন্ঠস্বর! জয়নাল আব্দীন, শীঘ্র এসে দুঃখিনীর তাপিত প্রাণ শীতল করো, বৎস!!

                   (জয়নাল আব্দীনের প্রবেশ)

    জয়নাল- মা-মা- আমি এসেছি মা!

    জয়নাব, সহরভানু সকলে- জয়নাল! তুমি এসেছ, বৎস?

    জয়নাল- হ্যাঁ মা, আমি এসেছি। (সকলে জয়নাল আব্দীনকে জড়ায়ে ধরিল)

    জয়নাল- মা- মাগো! এতো বিচলিত হচ্ছ কেন, মাতোমরা সকলে ধৈর্য্য ধারণ কর মা! তোমরা কেঁদনা মা।

    সহরভানু- কেমনে ধৈর্য্য ধারণ করবো বাবাতুই কেন আবার এই কারাগারে প্রবেশ করলি, বাবা?

    জয়নাল- আর আমাদের কারা যন্ত্রণা ভোগ করতে হবেনা, মা! আমরা আজ সকলেই মুক্ত!

    সকলে- আমরা আজ মুক্ত!

    জয়নাল- হ্যাঁ মা। আমরা সকলেই মুক্ত। দুষ্ট পাপাত্মা এজিদের ভয় আর নেই মা ঐ শোনশত সহস্র মুখে দামেস্ক নগরেযুদ্ধ ক্ষেত্রেসর্বত্র কার জয়ধ্বনি দিতেছে (নেপথ্যে জয়নালের জয়ধ্বনি) ঐ শোন মা, আমাদের হিতাকাংক্ষী বীরগণ কীভাবে আমার জয়ধ্বনি ঘোষণা করে নিশান উড়িয়ে আমাদেরকে নিয়ে যেতে আসতেছে

    সহরভানু- খোদা তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি আমাদের নেই।

(জয়নাল আব্দীনের জয়ধ্বনি করে গাজী বহমান,মসহাব কাক্কাআক্কেল আলিতালেব আলি ও অন্যান্য বীরগণের প্রবেশ)

    গাজী- জাহাঁপনার জয় হোক! জাহাঁপনার জয় হোক। এখান আমাদের আর দুঃখের কান্না কাঁদবার সময় নেই। এখন সৃষ্টিকর্তার নাম ভরসা করে আমরা মক্কামদিনা ও দামেস্কে রাজত্ব করবো আমাদের মহাশত্রু এজিদ বধকার্য্য সমাপ্ত না করেআমরা কেউই স্বদেশে ফিরিব না। জাহাঁপনা, আপনি এখানে কাল বিলম্ব না করে পরিজনদের নিয়ে স্ব-দেশে চলে যান। আমরা চললাম আম্বাজ সম্রাট মহম্মদ হানিফার অনুসন্ধানে। তিনি কোথায় কি করতেছেতার ঠিক নেই। আসুন বন্ধুগণ, আপনারা শীঘ্র আণাদের পেছনে চলে আসুন। আমি ভবিষ্যত বিশেষ ভালো দেখতেছিনা। দয়াময়ের অপার মহিমা বুঝবার শক্তি মানুষের নেই। সকলে বলুন- জয় মহারাজাধিরাজ জয়নাল আদীনের-

    সকলে- জয়

    গাজী- জয় নব ভূপতির!

    সকলে- জয় ।

 

        (গাজী রহমানমসহাব কাক্কাআক্কেল আলি ও অন্যান্য বীরগণের প্রস্থান)

    জয়নাল- মাতৃগণ আর কোনো ভয় নেই। আমরা আজই দামেস্ক পরিত্যাগ করে মদিনায় চলে যাবো। মদিনায় গিয়ে অগ্রে পবিত্র রওজা মোবারক জিয়ারত করবো। তারপর রাজদণ্ড হাতে নেবো

    সকলে- আচ্ছা তাই চল ।

    সহরভানু- হে পরম দয়াবান খোদা! তুমি জয়নাল আব্দীনকে রক্ষা করো খোদা- রক্ষা করো!

                                                                                                                       (সকলের প্রস্থান)

* * *

প্রথম অংক                                  পঞ্চম দৃশ্য

-সমরক্ষেত্র-

(নেপথ্যে  হানিফার জয় ধ্বনি ও ব্যস্তভাবে এজিদের প্রবেশ)

    এজিদ- এখন কোথায় যাইকি করি! কোনো উপায় দেখতেছিনা! আমি যতই দৌড়াচ্ছিততই মহম্মদ হানিফা যেন প্রবল বেগে আমার নিকট ছুটে আসছে। মহম্মদ হানিফার সেকি বিকট মূর্তি! ঐ- ঐ কীভাবে ছুটে আসছে! আমি কোথায় পালাইকত বন জংগলপাহাড়-পর্বতমরু-প্রান্তর অতিক্রম করলামতবুও মহম্মদ হানিফার চোখের আড়াল হতে পারলাম না। আজই বুজি আমার জীবনের অন্তিম সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঐ- ঐ হানিফা এলো বলে। (দ্রুত প্রস্থান)

                 (দ্রুত হানিফার প্রবেশ)

    হানিফা- ঐ- ঐযে সেই পাপিষ্ঠ এজিদ! দুষ্ট এজিদতুই যতই চেষ্টা করিস না কেন, আজ তোর নিস্তার নেই। পাপাত্মা এজিদআমি তোকে দূর থেকে প্রাণে মারব না। আমি তোকে জীবন্ত ধরবো! তোর খণ্ডিত শির ধরাপৃষ্ঠে লুণ্ঠিত হতে দেখবো আমি কাপুরুষ নই যে আমি তোর পশ্চাৎ হতে অস্ত্র নিক্ষেপ করবোহানিফার অস্ত্র কোনোদিন কারও পৃষ্ঠদেশে নিক্ষেপ হয়নি তোরও হবে না। তুই পালাবি কোথায় পাষণ্ড! তো মত মহাপাপীর স্থান কোথায়? আজ আর তোর নিস্তার নেই (দ্রুত প্রস্থান)

                    (দ্রুত এজিদের প্রবেশ)

    এজিদ- এখন আমি কি করি, কোথায় যাই! আমি যে আর দৌড়োতে পারছি না আমার হস্তপদ সর্বশরীর অবশ হয়ে আসছে এই ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমি কোথায় যাই? কোথায় গিয়ে লুকাই? আমি যেদিকেই অগ্রসর হই, সেই দিকেই মহম্মদ হানিফার সহস্র প্রতিমূর্তি মহম্মদ হানিফা সন্মুখ হতে, পশ্চাৎ হতে, চতুর্দিকে হতে আমায় আক্রমণ করতে ধেয়ে আসছে এই ঘোর বিপদে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সৈন্যসামন্ত কারও দেখা পাচ্ছিনা ঐযে আমার গুপ্তপুরী দেখা যাচ্ছে, আমি ঐ গুপ্তপুরীতে গিয়ে আত্মগোপন করবো তবুও মহম্মদ হানিফার হস্তে ধরা দেব না ঐতো সেই বিকট মূর্তি আমার দিকে ধেয়ে আসছে এসো হানিফা, এসো এখন আমি ব্যঘ্রমূর্তি ধারণ করে এক লাফে গিয়ে তোমার গর্দান চেপে ধরবো একি! আমার শরীর দুর্বল হয়ে আসছে কেনঐতো- ঐতো হানিফা তীব্রবেগে ধেয়ে আসছে একি ভয়ঙ্কর মূর্তি! না-না, আমি পালাই- (দ্রুত প্রস্থান)

                     (দ্রুত হানিফার প্রবেশ)

 

    হানিফা- দূরাত্মা এজিদ! পালাবি কোথায়? মনে করেছিস, তুই আমার চোখের আড়াল হবিতা কখনই সম্ভব হবে না জ্বলতে জ্বলতে তোর জীবন প্রদীপ নিভে যাবে তোর জন্য বর্তমান দামেস্ক রাজপূরী, সাক্ষাৎ যমপূরী তুই কি আশায় ঐদিকে দৌড়োচ্ছিসনরাধম, তুই আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হোসেনকে কৌশলে হত্যা করেছিস আজ আমি সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছি আর তোর নিস্তার নেই আমি আবার তোর পেছনে ছুটলাম তুই দুনীয়ার বুকে যেদিকে পালাবি, যেখানেই লুকিয়ে থাকবি, আমি সেখান থেকেই তোকে খুঁজে বের করে ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবোপ্রতিশোধ পর্বের সমাপ্ত না করে আমি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করব না কারও বাধানিষেধ মানব না আজই ভ্রাতৃহত্যার সমূচিত প্রতিশোধ গ্রহণ করবো প্রতিশোধ-প্রতিশোধ-প্রতিশোধ

                                             (দ্রুত প্রস্থান)

                   (দৌড়িয়ে এজিদের প্রবেশ)

    এজিদ- একি ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করে হানিফা আমার দিকে ছুটে আসছে আমি কোয়ায় যাই- কোথায় পালাই? আমায় আর এই দুনীয়ায় বেঁচে থাকা হল না এই মুহূর্তেই মহম্মদ হানিফা আমায় ধরে ফেলবে ঐ- ঐযে হানিফা আমার দিকে ছুটে আসছে আমি এখন পালাই- (দৌড়িয়ে প্রস্থান)

    (গাজী রহমান, মসহাব কাক্কা, ওমর আলী ও আক্কেল আলীর প্রবেশ)

    গাজী- বন্ধুগণ, ঐ দেখুন, কীভাবে এজিদ পালাবার চেষ্টা করছে আমাদের সম্রাট ব্যাঘ্রমূর্তি ধারণ করে এজিদকে ধারবার জন্য কীভাবে পেছন পেছন ছুটছেন ভেবেছিলাম, আজই এই বিষাদ সিন্ধু পার হয়ে সুখ সিন্ধুর তটে উঠব আজই বিষাদের শেষ যবনিকা পড়বে, কিন্তু তা হলো না আপনারা শীঘ্র চলে আসুন আমি ভবিষ্যত বড়ই অমঙ্গল দেখতেছি সম্রাটের মনোবৃত্তি ভালবোধ হচ্ছে না বর্তমান বড়ই কঠিন সময় উপস্থিত দয়াময়ের লীলা বুঝবার শক্তি মানুষের নেই চলুন, এখন আমরা সম্রাটের পেছনে ছুটে যাই                       

                                            (সকলের প্রস্থান)

 

                  (দ্রুত এজিদের প্রবেশ)

    এজিদ- কি বিকট মূর্তি! এখন কি করি? আজ আমার নিস্তার নাই ঐ অন্ধকূপে লুকানো ব্যতীত আমার আর উপায় নেই ঐযে বিকট মূর্তি আমার দিকে ছুটে আসছে হানিফা তুমি ক্ষ্যান্ত হও আর কেন আমার দিকে ছুটে আসছ? তোমার আশা, তোমার প্রতিজ্ঞা, এই জনমে পূর্ণ হবে না এই দেখো, এজিদ এক্ষুনি চিরতরে তোমার চোখের আড়াল হবে এই আমি চললাম

                                                  (প্রস্থান)

    (এজিদ অন্ধকূপের মধ্যে জাঁপ দিলো সঙ্গে সঙ্গে কূপ মধ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো)

                 (দ্রুত হানিফার প্রবেশ)

    হানিফা- কোথায় পালাবি নরাধম! আমি এখনই তোর জীবন প্রদীপ নির্বাপিত করবো

     দৈববাণী- হানিফা ক্ষ্যান্ত হও এজিদ তোমার বধ্য নয়

     হানিফা- সেকি কথা! এজিদ আমার বধ্য নয়? এই বাণী কোথা হতে হলো? না-না, আমি কারও কথা শুনব নাঐ অন্ধকার কূপ থেকেই এজিদকে আমি জীবন্ত ধরে আনবো আমি ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবো

     দৈববাণী- হানিফা, এজিদ তোমার বধ্য নয়

    হানিফা- আবার সেই দৈববাণী! এজিদ আমার বধ্য নয় আর কি করবো? আমি ইচ্ছা করলে, তীক্ষ্ণ তীর বরিষণে নরাধমের কলিজা ভেদ করতে পারতাম হৃদয়ের শোণিতধারে আমার তরবারি রঞ্জিত করতে পারতাম নারকীর শরীর খণ্ড-বিখণ্ড করতে পারতাম কিন্তু এজিদ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়েছে, তাই তাকে অস্ত্রাঘাত করতে পারলাম না সেজন্য আমার মনের আশা পূরণ হলোনা ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারলাম না

     দৈববাণী- হানিফ! দুঃখ করোনাএজিদ তোমার বধ্য নয় রোজ কিয়ামত পর্যন্ত এজিদ ঐ অন্ধকূপে জলন্ত হতাশনে জ্বলতে থাকবে, অথচ তাঁর প্রাণ বিয়োগ হবে না

    

-

 

 

    হানিফ- এখন আমি কি করিকোথায় যাইযেদিকে অগ্রসর হই, সেই দিকেই শুধু বাধা আমার মনের আশা, মনের দুঃখ চিরকাল মনেই থাকবে! না-নাআমি ক্ষান্ত হবোনা। এখনই আমি এজিদের পশ্চাদধাবন করব। যাকে যেখানে পাবোসেখানেই তাকে হত্যা করবোআমি ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবো

    দৈববাণী- মোহম্মদ হানিফা। একটি জীব সৃষ্টি করাটা কত কঠিন তা তুমি জানো? সৃষ্ট জীব বিনাশ করার জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়নিবিনা কারণে জীবহত্যা করতে তোমার হাতে তারবারি তুলে দেওয়া হয়নি বিনাশ করা অতি সহজ, কিন্তু সৃষ্টি করাটা খুবই কঠিন তোমার হিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য মনুষ্যকূলে তোমার জন্ম হয়নি জয়ের জন্য জীবহত্যা করা, নিরপরাধের প্রাণ বিনাশ করা অপেক্ষা পাপের কার্য জগতে আর কি আছে? হানিফা তুমি মহাপাপী তোমার প্রতি খোদা তায়ালার এই আজ্ঞা যে, দুলদুল অশ্ব সহিত রণবেশে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তুমি প্রস্তরময় প্রাচীরে আবদ্ধ থাকবে আজ হতে মহম্মদ হানিফা তুমি চিরবন্দী! চিরবন্দী!!          

    (নিকটস্থ পর্বতমালা হতে প্রচণ্ড শব্দ করে প্রস্তরময় প্রাচীর বের হয়ে হানিফাকে ঘিরে ফেলল মহম্মদ হানিফা প্রস্তর প্রাচীরে বন্দী হলেন)

                    -যবনিকা-

(বিঃদ্রঃ- শহীদ কারবালা উদ্ধারপর্ব যাত্রাপালাটি ঐতিহাসিক ঘটনা চিহ্নিত করে নানাটকটির মূল পণ্ডুলিপি  নাটকটির মূল পণ্ডিলিপি ছবুর উদ্দিন মাস্টারের আমি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছি            

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

ভাৰত তথা অসমৰ সাধাৰণ নিৰ্বাচনৰ সাৰাংশ-১৯৫২-২০২৪

শাস্তি (অনুবাদ উপন্যাস)